Breaking News

উপহার – অর্পিতা ঠাকুর চট্টরাজ

উপহার
– অর্পিতা ঠাকুর চট্টরাজ

হিয়াকে রুমকির সাথে একদম মিশতে দেয়না ওর মা অরুনা। যদিও মিস্টার অনিমেষ সেন মাঝেমাঝে ডেকে পড়াশোনা কেমন চলছে,কিছু দরকার কিনা সেসব খোঁজ খবর নেন। রুমকির মা মালা সেন পরিবারের রান্নার লোক। উচ্চবিত্ত পরিবারে রান্নার অন্ত: থাকেনা। চারবেলা আলাদা আলাদা খাবার। হিয়ার জন্য একরকম,সেনবাবুর মায়ের জন্য একরকম,সেন দম্পতির জন্য আরেকরকম। এই একটা বাড়িতেই ওর সারাদিন কেটে যায় । মালার মাঝেমাঝে মনে হয় দুটো-তিনটে ঘরে রান্নার কাজ নিতে পারলে মেয়েটাকে আরো ভালো করে রাখতে পারবে। হিয়া নামী ইংলিশ মিডিয়ামে থ্রিতে আর রুমকি বাংলা প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। তবে শুকনো বেতন ছাড়াও পুরোনো জামাকাপড়,খাবার,খাতা,পেন্সিল –অনেক কিছু দেয় বলে ও ঘরটা ছাড়তে পারছেনা। মেয়েটারও তো ভালো খাবার জোটে। তবে শনিবার বিকাল আর রবিবার সকাল থেকে রুমকি মায়ের সাথে সেনবাড়িতে চলে আসে। হিয়ারই পুরোনো ব্যাগে কয়েকটা শাড়ির ভেতরে থাকা সাদা কাগজের মলাট দেওয়া বই খাতা নিয়ে।এক ধারে বসে চুপ করে কখনো নিজের পড়া করে,কখনো দেখে হিয়া কি করছে। হিয়ার খুব ইচ্ছা করে ওর সাথে খেলতে,মায়ের চোখ এড়িয়ে দুএকবার কথা বলে যায় রুমকির সাথে।
হিয়ার জন্মদিনের প্রস্তুতি চলছে কয়েকদিন ধরে। সেদিন সকাল থেকেই ওর দিদা,দাদু,মামু,মিমি এসে গেছে । পিমনি,পিসন আর বুবলিদিদি যে কখন আসবে কে জানে? ওরা একটু দেরিতেই আসে। এত লোকের রান্না মালাকে করতে হয়,যদিও রাত্রে ক্যাটারিং বলা আছে। মালা নিজের সাধ্যমতো একটা বড় রংপেন্সিলের বাক্স উপহার দিলে,সকলেই বলে,—তোমার দেওয়ার কি দরকার ছিলো? বিকালে ওকে তাড়াতাড়ি আসতে বললেও রুমকিকে আনার কথা বলেনা। সন্ধ্যায় একা কার কাছে রেখে আসবে মেয়েটাকে,ও ভালো পরিবারের , মেয়ে যখন আটমাসের দুর্ঘটনায় ওর স্বামীর মৃত্যু হয়। বেসরকারি চাকরি ,যেটুকু টাকা পেয়েছিল শ্বশুরবাড়ির লোকেরাই কেড়ে নেয়। ওদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে লোকের বাড়ি কাজ নিয়েছে। আত্মসম্মান বোধ ওর প্রখর। রুমকি জানতে চায় ওখানে কি হচ্ছে না হচ্ছে,চোখ ফেটে জল এসে যায় মালার। বিকালে ওকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যায় মালা। তাড়াহুড়ো করছে বলে অরুনা রেগে যায়। হটাৎ হিয়া বলে,
—-মালাআন্টি রুমকি আসবেনা?
মেয়ের কথায় সম্বিত ফেরে অরুনার।
–না সোনা,এটা তোমাকে দিয়েছে রুমকি।
সাদা কাগজের ভেতরে গাছের পাতা,পাখির পালক,ফুল দিয়ে অপূর্ব কার্ড বানিয়েছে রুমকি,শুভ জন্মদিন হিয়া–লেখাটাও পরিস্কার,ঝরঝরে। হিয়া সবাইকে কার্ডটা দেখায়,অবাক হয় সকলেই। মিস্টার সেন অরুনার প্রতি খুব বিরক্ত হন,মালাকে অনুরোধ করেন রুমকিকে নিয়ে আসার জন্য। মালা বাড়ি গিয়ে রুমকিকে নিয়ে আসে। উপস্থিত সকলেই ওকে বাহবা দেয়। মিস্টার সেনের বোন মনিকা কলেজের অধ্যাপিকা,জহুরির চোখ রত্ন চিনতে ভুল করেনা। উনি খেয়াল করেন রুমকি হিয়ার মতোই বরং ভালো নাচছে। ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন কোথায় শিখেছে?
—-শনিবার,রবিবার হিয়া যখন অভ্যাস করে,আমি দেখে দেখে শিখেছি।
—-দেখে দেখে,আঁতকে ওঠেন নাচের ম্যাম। সাংঘাতিক প্রতিভা এই মেয়ের। আমি তোমাকে নাচ শেখাবো,শিখবে?
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রুমকির মুখ।
মনিকা মালাকে বলে,
—আপনার মেয়ে বিরল প্রতিভার অধিকারী,ওর সব দায়িত্ব এখন থেকে আমি নিলাম। আপনি রাজি তো?
মালা আনন্দে কেঁদে ফ্যালে মনিকার হাতদুটো ধরে। হিয়ার জন্মদিনে ওর মেয়ে রুমকি যে এত বড় উপহার পাবে এটা সে স্বপনেও ভাবেনি।

Check Also

স্বাধীন দেশের নেতৃত্ব কলমে – মায়া সাহা

স্বাধীন দেশের নেতৃত্ব কলমে – মায়া সাহা হে মহান – নেতাজি ! তুমি বলেছিলে – …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।