Breaking News

ভৌতিক ছোটগল্প : ক্যানভাস – রাজীব চৌধুরী

ক্যানভাস
– রাজীব চৌধুরী

“আচ্ছা এ বাড়িটাতে নাকি ভুত আছে?”
– হটাত করেই অপ্রাসংগিক একটা কথা বলে উঠল চন্দন দা।
আমাদের চন্দন দা এমনই। যখন তখন যেখানে সেখানে হটাত করেই কি সব বলে উঠেন। এই যেমন এলাম পিকনিক করতে- উনি বলে উঠলেন-“আজ উনার নিরামিষ” । আমরা সবাই হা। এটা কোন কথা? পুরো দুটো ছাগল আর ছয়টা মুরগি কেটে পিকনিক হচ্ছে। যদিও এত খাওয়ার মানুষ নেই। এখন কে যাবে উনার জন্য সবজি আর শাক রান্না করতে? আমরা সবাই বেঁকে বসলাম। শেষে উনি সামান্য কিছু ডাল ভাত খেয়ে উঠে পড়লেন। তারপর এটা সেটা- এই আড্ডা এই গান- এই নাচ- এসব করতে করতে যখন কালাপানির আড্ডা বসল তখন উনি গাইলেন ভুতের কেত্তন। এটা কোন কথা?
“আছা চন্দন দা- ভুত এল কোত্থেকে? আপনাকে বলেছিলাম অন্তক্ষরী শুনাতে। আপনার অক্ষত ভ। কিন্তু ভ তে ভুত বানিয়ে দিয়ে কি শুরু করলেন? এটা নিয়মের ব্রেক আপ। এটা মানিনা।” বলে উঠলাম আমি।
আমার সাথে অনেকেই সায় দিল।
“শোন। আমার কাছে তোদের এসব আলাপ পানসে লাগছে। আর এই ভুতুড়ে বাড়িতে বসে বসে মদ খাব আর ভুতের গল্প হবেনা এটা কোন কথা?” বললেন চন্দন দা।
“শোন চন্দন দা – আমি আসলে খানিকটা ভুতে ভয়পাই…” বলল কনিষ্ক। কনিষ্ক এর মাঝেই দুপেগ বেশি মেরে দিয়েছে। ও আবার ভয় পেলে বেশি খেয়ে ফেলে। আমাদের স্টকে টান পড়বে ভেবে নিলু বোতলটা ওর কাছে টেনে নিল। এখন ও বাটোয়ারা করবে। স্প্রাইটের বোতল থেকে খানিকটা স্প্রাইট ঢেলে ঢেলে সে সবার গ্লাসে পুড়তে শুরু করেছে। আমি তাকিয়ে আছি চন্দনদার দিকে। উনার চোখ দুটো ঘোর লাগা। নেশা কি বেশি হল? অথচ মাত্র দুবার টার্ন গেছে। পাঁচ বার যাওয়ার আগে কেউ সহজে মাতাল হয়না আমাদের মাঝে। কিন্তু আজকে কি হল কে জানে… ভাবলাম আমি।
আমরা মোট ছয়জন আজকের এই আড্ডার সভাকবি। আমাদের মাঝে বন্ধুত্ব সেই ছোটবেলা থেকে। তবে মাঝে বেশ কবছর দেখা হয়নি। এর মাঝে চন্দনদার চুলে পাঁক ধরেছে। কনিষ্ক বেচারা বিশাল বপু বানিয়েছে অথচ মাধ্যমিকে ও কিসুন্দর দৌড়ুতো চিকন চাকন এক শরীর নিয়ে। সবার একই দশা। অনেক ভেবে চিন্তে আজকের দিনটা বেছে নেয়া হয়েছে। তারপর যোগাড়যন্ত্র করা হয়েছে। ফেসবুক থেকে মিলিত হয়ে শেষে বন্ধুদের মাঝে এই আড্ডা আর জলখাবারে এখন ভুতের গাড্ডা করতে কার ভালোলাগে?
“দেখো ভায়া আমি এই সব ভুত ফুতে নেই। আমি এসব বিশ্বাস করিনা” বলল চিন্তন। ব্যাটা এতোক্ষন বেশ খাচ্ছিল। হয়ত ধরেছে। ঘুমানোর তাল করছে। আমি সাথে সাথে চিৎকার করে উঠলাম…
“এই এই চিন্তন এভাবে ওঠা চলবে। পুরো দু বোতল খেয়ে শেষ করে উঠবি। ততক্ষন শাস্তি হিসেবে তুই নিজেই একটা ভুতের গল্প বলবি”।
“আ আ আমি? আমি ত ভুতে বিশ্বাস করিইনা…” বলল চিন্তন।
“আমরা ও কি করি নাকি?” ফোঁড়ন কাটল কনিষ্ক। বেচারা এখন ঢুলছে।
“আরে শোন। আমি ভুত ফুতে বিশ্বাস করিনা। তবে শুনেছি শয়তান টাইপের কিছু নাকি আছে। আমার মা দেখেছিল। আমার জন্মের আগে। বাড়ির পাশের একটা ডোবায়। আমার মাকে কিছু একটা যেচে ছিল খাওয়ার জন্য। মা খায়নি। দৌড়ে পালিয়ে এসেছিল। শুনেছি ওটা ছিল শয়তান। কেউ বলে জ্বীন”।
“ধুর কিসব শোনাচ্ছে। আরে শোন। আমার গল্পটা ভয়াবহ।…” বলতে শুরু করল কনিষ্ক।
“শোন- আমি তখন সবে কলেজ ছেড়েছি। গিয়েছিলাম আমার মামা বাড়িতে। ওখানে একটা পুরোনো বাড়ি ছিলো। আমি ওতে ভুতের দেখা পাওয়ার জন্য থেকেছিলাম। আমি ওখানে কিছু দেখিনি। কারন কি জানিস? কারন ওখান সম্পর্কে যা যা শুনেছিল সব ছিল গুজব। আমি নিজেও ভুতে বিশ্বাস করিনা। কিন্তু কেন যেন শেষ রাতে ভয় পেয়েছিলাম।
আমি শুয়ে আছি একটা বারান্দায়। আকাশে নিরেট একটা পুর্নিমার চাঁদ। আমি চাঁদের আলোয় শুয়ে আছি। আর আকাশ দেখেছি। জানিস সেদিন খুব কবিতা পেয়ে বসেছিল। আপন মনে জীবনানন্দ পাঠ করছিলাম। এমন সময় দেখি জিনিস টা।
ঠিক জিনিস না।
একটা ছায়া।
কেমন যেন একটা ছায়া।
ঠান্ডা হাওয়ায় সব দোলে। কিন্তু ছাড়া অনড়।
মানুষের ছায়া বলে মনে হল। প্রথমে মনে হল বিশাল কোন একটা কুমিড়ের ছায়া।
ধীরে ধীরে সেটা মানুষের ছায়ার মত রুপ নিলো। আমি ওটার দিকে তাকিয়ে আছি। ওটাও যেন আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে নাচতে শুরু করেছে।
অনেকটা কথক নৃত্যের মতোন।
নাচছে। নাচছে। নাচছে।
পুরোনো বাড়িতে একটা কিছু এভাবে নাচানাচি করছে অথচ ছায়াটাও ভালোমত দেখা যাচ্ছেনা। কিন্তু শোনা যাচ্ছে। নুপুরের শব্দ। তালে তালে নেচে চলেছে সেই ছায়া। পায়ে নুপুর। বেশ ভারী নুপুর। একসময় সে নৃত্য থেমে ও গেল। আমি ও ঘুমিয়ে পড়লাম।
তবে আসল মজা ছিল পরের দিন” বলতেই আমি থামিয়ে দিলাম।
“পরের দিন কি?”
“আরে পরের দিন আমি ঘুম থেকে উঠলাম। দেখলাম আমি শুয়ে আছি পুকুরপাড়ের ঘাটে। ওখানে একটা নৃত্যশালা ছিল। আমি ওখানের একপাশে শুয়ে আছি। আগের দিন আমি স্থানটা পুরো ঘুরে ঘুরে দেখে এসেছিলাম। তাই জানি এটা কোথায়। গোলাকার এই নৃত্যালয়ের পাশেই বিশাল পুকুর। আমি ওখানে একটা মেয়ের নৃত্যরত মুর্তি ও দেখেছিলাম। সেদিন ওটা ছিলোনা। ওটা চলে গিয়েছিল পুকুরের আরেক পাড়ে। কিন্তু আমি বেশ মনে করে বলতে পারি আগের দিন ও ওটা ওখানে ছিলোনা।
বুঝলি?”
আমি প্রায় মন্ত্রমুগ্ধের মত করে শুনছিলাম। হটাত যেন ধ্যান ভাঙল। আমরা প্রায় সবাই ঘোরের মাঝে চলে গেছিলাম। এমন সময় চন্দন দা কোত্থেকে একটা ক্যানভাস বের করলেন। বিশাল ক্যানভাস নয়। ছোট্ট একটা ক্যানভাস।
আমি বললাম- “দাদা ভুত ছেড়ে কি এখন ছবি আঁকা ধরবেন?”
“শুনো এটা একটা ভুতুড়ে ক্যানভাস”
“কি?” বললাম আমি।
“হ্যাঁ- একেবারেই অদ্ভুতুড়ে” কেমন যেন ঘোর লাগানো কন্ঠে বলল চন্দন দা।
“ কি হয় এতে?”
“এটা আমার ছেলের ক্যানভাস”
“তোর ছেলে? মানে কি যেন নাম ছিলো…” ঢেকুর তুলল কনিষ্ক। আমি নিজেও ওর ছেলের নাম জানিনা। এর আগে তো দেখাই হয়নি। কে কোথায় বিয়ে করেছে জানা নেই। আর বাচ্চার নাম তো না জানারই কথা।
“হ্যাঁ আমার ছেলে … মুন… মারা গেছে গতমাসে”
“আমার কেমন যেন কষ্ট লাগল ওর জন্য…”
চেয়ে দেখি কনিষ্কের চোখে জল এসে পড়েছে। বাকিদের অবস্থা তথৈবচ।
“কিন্তু এর সাথে ভুতের সম্পর্ক কি?” পরিস্থিতি হালকা করতে চাইলাম আমি।
“আছে। মুন মারা গেলেও ওর আত্মা আমার আশেপাশেই থাকে”
“ দাদা আপনার কি মাথা নষ্ট হইসে?” অবাক আমি।
“ধুর কি সব বলে পাগলটা। মাল কি বেশি টানছস নাকি?” খেপে উঠল কনিষ্ক।
আমার ও মন উঠে গেছে। এ আড্ডা জমবেনা। আমি উঠে যাচ্ছিলাম। দেখলাম আমার দেখাদেখি সবাই উঠে যাচ্ছে। আর চন্দন দা উনার ব্যাগ থেকে বের করে নিলেন একটা রঙের কৌটা। ওখান থেকে বের করে হাতে মেখে নিলেন রঙ। তারপর সেই ক্যানভাসের উপর হাতের ছাপ দিতে শুরু করলেন। ক্যাম্পফায়ারের আলোয় সেই ছাপ দেখা যাচ্ছিল। খানিক পরেই শুকিয়েও যাচ্ছিল। আমরা সেদিন চলে এলাম। আমার বিশ্বাস ছিল চন্দনদা পাগল হয়ে গেছেন। বাচ্চাদের মত করে হেসে হেসে পাগলের মত হাতের ছাপ দিতে পারে কজন?
ওদিনের পর আমি সব ভুলে গেছিলাম। পরদিন সকালে উঠে সবকিছুকে মদের নেশা বলেই কাটিয়ে দিলাম। কিন্তু এর পরের দিনই কনিষ্কের মুখ থেকে যা শুনলাম তারপর থেকে আমি তিনবার মুর্ছা গেছি।
হ্যাঁ ভাই
আমি তিনবার জ্ঞান হারিয়ে এখন দিশেহারা। কনিষ্ক ও বিশ্বাস করেনি প্রথমে। আমার মুখে শুনে শিওর হয়েছে। তারপর ওর অবস্থা আরো শোচনীয়।
আসলে সেদিন চন্দনদা হাতের ছাপ দিচ্ছিল ক্যানভাসে। ক্যানভাসটা মাটিতে রাখা ছিলো। আমরা কজন তখন উঠে দাঁড়িয়েছিলাম। আঁধো আলো আঁধারে তেমন ভাল দেখা ও যাচ্ছিল না। শুধু কনিষ্ক দেখেছিল। আমি ও দেখেছিলাম কিন্তু খেয়াল করিনি। আসলে এটা খেয়াল করার মত তেমন কিছু ছিলোনা। কিন্তু আসলে বিশাল কিছুই…
চন্দন দা হাত দিয়ে ছাপ দিচ্ছিল।
উনার পয়ত্রিশ বছরের বয়ষ্ক হাতের ছাপ ঐ ক্যানভাসে পড়ছিলোনা। ওখানে পড়ছিল একটা দুবছরের বাচ্চার হাতের ছাপ… তারপর মিলিয়ে যাচ্ছিলো ক্যানভাস থেকে…
মনে পড়তেই আবার ও মনে হচ্ছে মুর্ছা যাব। ব্যাপারটা আমি সহ্য করতে পারিনি।
আপনি?

Check Also

গল্পঃ পথের অঞ্জলী লেখাঃ দীপঙ্কর সেনগুপ্ত

গল্পঃ পথের অঞ্জলী লেখাঃ দীপঙ্কর সেনগুপ্ত রচনাকালঃ ১৬-০৬-২০২১ রাতে সারমেয়দের চিৎকার, কেউ কেউ করুন সুরে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।