Breaking News

তোর ভালোবাসাই আমার মরণ রে – মশিয়ুর রাহমান খোকন

তোর ভালোবাসাই আমার মরণ রে…
– মশিয়ুর রাহমান খোকন
-একটা পুরুষ মানুষ কখন ঘরের বাইরে যায় তুমি বোঝো? এমনি এমনি একজন স্বামী কখনো বাইরে যায় না। তোমরা ভালো স্ত্রী হতে পারো, কিন্তু ভালো বন্ধু হতে পারো না।
-একজন বান্ধবি একটা পুরুষকে যা দিতে পারে, একজন স্ত্রী তা দিতে পারে না। আবার একজন স্ত্রী যা দিতে পারে, একজন বান্ধুবি তা দিতে পারে না। কেন তোমারা তা পারো না, আমি তা জানি না।
-তোমরা শুধু একটা বিষয় খুবই ভালো পারো, সেটা হলো, শুধু শুধু স্বামীকে সন্ধেহের চোখে দেখা, আর খোঁচা মেরে কথা বলা। আরেকটা জিনিষও তোমরা খুব ভালো পারো। বেগুন ভাজির মতো কারনে অকারনে স্বামীদের সাথে উঠতে বসতে ক্যাটক্যাট করা।
-একটা বিষয় তোমরা কখনও বুঝো না যে, একজন পুরুষ মানুষ সারাদিন ঘরের বাইরে থেকে কাজ কর্ম করে। কত রকম চিন্তা ভাবনার মধ্যে সে থাকে সারাটা দিন। বাবা মা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন ছাড়াও নিজের সংসার নিয়ে, আয় ইনকাম নিয়ে, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, কত রকম চিন্তা করতে হয়।
-আমাদের পুরুষদের এক মাত্র বিনোদন নারী। মানে স্ত্রী। আর স্ত্রী কাছে যখন একজন পুরুষ বেগুন ভাজির আচরন পায়, তখন সে একটু বিনোদনের জন্য বাইরে দৌড়াবেই। এর জন্য দায়ী তোমারা মেয়েরাই। কারন তোমারা জানো না কি করে স্বামীদের ধরে রাখতে হয়।
-কথা গুলি বার বার করে লতার কানে বাজে। তার এখন কিছুই ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় ভুলটা সে নিজেই করেছে। আবার মনে হয়, না ঠিকই আছে। আবীরের কাছে কেন এতো মেয়েদের ফোন আসবে?
আবীর লতার দাম্পত্য সম্পর্ক আজ প্রায় চার বছর হল। অনেক আগে থেকে লতা আবীরের জানা শোনা আছে। আবীর তার খুব ভালো বন্ধু ছিলো। বন্ধু থেকে ভালোবাসা। তারপর বিয়ে। সংসার চার বছরের। দুই বছরের তাদের একটা মেয়ে আছে। মেয়ে নাম মাইশা।
লতা আবীরের সাথে এই সব নিয়ে প্রায় ঝগড়া লেগেই থাকে। ঝগড়ার ফলাফল লতা মাইশাকে নিয়ে বাপের বাড়ী চলে আসে।
বাবার বাড়ী এসেও তার কিছুই ভালো লাগে না। আজ এতো দিন হয়ে গেলো, আবীর কোন যোগাযোগ করে না। বাবার বাড়ীর সবাই কেমন জানি করে।
কেমন যেন পর পর মনে হয় সব কিছু। এমন কিছু বিষয় থাকে যা বলাও যায় না, আবার সয়াও যায় না। তখন নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়।
লতার এখন নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে লতা ভাবে, আবীর অন্য মেয়ে বন্ধুদের নিয়ে খুবই ভালো আছে।
-আচ্ছা,ও একবারও ফোন করে না কেন? কেন একটি বারের জন্য আসে না? ওর কি আমাকে দেখতে একটুও ইচ্ছা করে না? আমি না হয় বাদ ই দিলাম। মেয়েটার জন্য হলেও তো একবার যোগাযোগ করতে পারে। পুরুষ মানুষ সবই পারে।
-আমি কি আসলেই ওকে খুব বেশী সন্ধেহ করি? তাহলে ওর মোবাইলে মেয়েদের এতো ফোন আসে কেন?
লতার এখন কিছুই ভালো লাগে না। সে নিজের ভুল গুলি খোঁজার চেষ্টা করে। কোথায় যে তার ভুল, সে সেটা খুঁজে পায় না। কেন স্বামীরা বুঝে না যে, একটা মেয়ে মানুষ সব সম্পর্ক ত্যাগ করে স্বামীর ঘরে যায়।
মাথার উপর ছাদ আর পায়ের তলায় মাটি বলতে তারাই। তারপরও কেন সে অন্য মেয়ে মানুষের পিছনে ঘুরবে?
আজ এতদিন হোল আমি এখানে পড়ে আছি, একটা ফোন পর্যন্ত করে না। করবে কি করে? তার তো ফোন করার মানুষের অভাব নাই।
-আপু তুমি ছাদে বসে আছো? মা তোমাকে ডাকছে
-কেন রে?
-জানি না, তুমি গিয়ে দেখো
-মা, আমাকে ডাকছো?
-হ্যাঁ মা, এখনে বোস।
-বলো কি বলবে?
-আবীর কি তোকে ফোন করেছিলো?
-না মা, ও আর ফোন টোন করেনি, আমিও করিনি।
-তোদের যে কি হল? আমি কিছু বুঝি না। তবে আমার কাছে ছেলেটাকে খুবই ভালো মনে হয়।
-উপর দিয়ে সব ছেলেকেই তো তোমার ভালো মনে হয়। তোমার পা ছুঁয়ে যে ছেলে সালাম করবে, সেই তোমার কাছে খুব ভালো।
-এমন করে কথা বলছিস কেন? আমার মনে হয় তুই শুধু শুধু ওকে ভুল বুঝছিস,
-মা, ছাড়ো তো ও সব কথা। আমি আর ওর সাথে সংসার করবো না।
-ওসব কথা এক কালে তোর বাপকে আমিও অনেক বলতাম। শোন
-বলো কি বলবে?
-মেয়েদের এতো রাগ ভালো না। তুই আবীরকে একটা ফোন কর।
-না মা, আমি কোন দিন ই ওকে ফোন করবো না। ওর ইচ্ছা হলে করবে না হলে নাই। তোমার জামাই কি করে তুমি জানো?
-আমি সব জানি, এই বয়সের ছেলেদের মোবাইলে একটু আধটু ফোন টোন আসবেই। ও কিছু না। ছেলে হিসাবে আবীর খুবই ভালো।
-ঠিক আছে আমার আর বলার কিছু নাই। আমি আর তোমাদের জামাইয়ের সাথে সংসার করবো না ব্যাস।
-মিষ্টি খেয়েছিস?
-হ্যাঁ খেয়েছি,
-মাইশার জামা গুলি কেমন হইসে রে?
-দারুণ মা, তিনটা জামাই খুব সুন্দর।
-শাড়ি গুলি তোর পছন্দ হয়েছে।
-হ্যাঁ খুব পছন্দ হয়েছে। এতো দামি শাড়ি দিলে কেন মা? একটা কিনলেই তো পারতে। আমার তো শাড়ি আছেই।
-আমি দিলাম কোথায়?
-মানে?
-আজ দুপুরে আবীর এসেছিলো, তুই ঘুমাচ্ছিলি। কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে তোর মাথা ব্যাথা করে বলে, তোকে তুলতে মানা করেছে। যতক্ষণ ছিলো, মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে ছিল।
ছেলেটার মুখটা খুবই শুকনা লেগেছে। দুপুরে মনে হয় ভাত খায়নি। এতো করে বললাম খেয়ে যেতে তাও খেয়ে গেলো না। খুব মায়া হচ্ছিলো আমার। আর এই খামটা তোকে দিতে বলেছে।
লতা খামটা খুলে, ভিতরে নগদ বিশ হাজার টাকা আর একটা চিঠি।
-লতা,
-জানি তুমি ভালো নেই। সব সময় আমার কথা ভাবো। আর আমার বান্ধুবিদের উপর তোমার খুব রাগ। আমি তো আমার বান্ধুবিদের নিয়ে অনেক সুখে আছি, তুমি তো জানোই।
-শোন, তোমার হাত খরচের জন্য বিশ হাজার টাকা পাঠালাম। কারন তুমি এমন একটা মানুষ যে কষ্ট পেলেও কারো কাছে থেকে কিছু চাইবে না।
-দুইটা খবর আছে লতা। একটা সুখবর, একটা দুখবর। আগে সুখবর টা বলি,
-আমরা যে ফ্ল্যাটটা দেখতে গেছিলাম, সেটা ফাইনাল করে ফেলেছি। তোমার নামে রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে। সামনে মাসেই ওরা হ্যান্ড ওভার করবে। সেটা শুধুই তোমার ফ্ল্যাট। তুমি মনের মতো করে সাজাবে আর আমাকে নিয়ে বেগুন ভাজি করবে। আমি কিছু বলবো না। শুধু শুনবো।
-দ্বিতীয় খবরটা তোমাকে বলতে চাইনি। আবার না বলেও পারছিনা।
-তুমি তো জানো, আমার হার্টের সমস্যা আছে। বাইপাস সার্জারি করার কথা ছিলো। পরশু দিন আমার অপারেশন। আজ রাত থেকেই আমি হাসপাতালে থাকছি।
-দোয়া করো যেন বাঁচতে গিয়ে মরে যাই। তাইলে তোমার কষ্ট গুলি আর থাকবে না। মাইশার দিকে খেয়াল রেখো। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিয়ো। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করবে। বেশী চিন্তা করবে না।
-না লতা, তোমাকে আমি কোন দিনও আসার জন্য বলবো না বা জোর করবো না। আসা, না আসা বা সংসার করা না করা সব কিছু আমি তোমার উপর ছেড়ে দিলাম।
-কারন, আমার বিশ্বাস, আমার ভালবাসাই তোমাকে একদিন আমার কাছে নিয়ে আসবে। তুমি স্বামীদের শুধু দেখেছো, বাইরের মেয়েদের সাথে মিশতে। কিন্তু তুমি দেখনি, স্ত্রীর প্রতি স্বামীদের ভালোবাসা কতোটা গভীর হয়।
-আরেকটা কথা, আমার কাছে যে মেয়েটা বার বার করে ফোন করতো, সে অন্য কেউ নয়। সে তোমারই ছোট বোন পাতা।
-একটা বিরাট বড় গ্রুপ অফ কোম্পানিতে, গত মাসে তার চাকরী হয়। চাকরীটা আমি তাকে নিয়ে দেই। ইন্টারর্ভিউতে কি কি প্রশ্ন আসবে, ভাইভা তে কি হতে পারে, তাকে কি কি করতে হবে, এই সব নিয়েই ওর সাথে আমার প্রতিদিন ফোনে কথা হতো। ও খুবই নার্ভাস ছিলো। তাকে সাহস দিতাম।
-সে আমাকে বারণ করেছিলো, চাকরীটা না হওয়া পর্যন্ত যেন তোমাকে কিছু না বলি। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? পাতাকে জিজ্ঞাস করে দেখো, সব জানতে পারবে।
-এই চিঠি যখন লিখছি তখন আমার খুবই ভালো লাগছে। কেন ভালো লাগছে জানো লতা?
-পাঁচ বছর আগে আমরা যখন প্রেম করতাম, তখন তোমাকে চিঠি লিখেছি। আর পাঁচ বছর পর আবার তোমাকে চিঠি লিখছি।
-এই জন্য আমার খুব ভালো লাগছে। থ্যাঙ্কস তোমাকে, রাগ করে বাপের বাড়ী গিয়ে আমাকে আবার প্রেম পত্র লেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
ভালো থেকো তুমি। ভালো থেকো মাইশা। আর আমিতো বান্ধুবিদের নিয়ে বেশ ভালোই আছি। তারপরও বলবো, তোর ভালোবাসাই আমার মরণ রে…
ইতি
মাইশার আব্বু আর তোমার…
লতার চোখ ভিজে উঠে। আবীরের উপর যত রাগ ছিলো তা নিজের উপর উঠে। সে মোবাইলটা হাতে নিয়ে আবীরকে বার বার ফোন করে। আবীরের মোবাইল বন্ধ।
-কাকে ফোন করছিস?
-মা আবীর কে
-কেন? তুই তো ওর সাথে সংসারই করবি না। তো বার বার করে ফোন দিচ্ছিস কেন?
-মা বেশী কথা বোলো না তো। খুব রাগ হচ্ছে আমার। পাতা কৈ মা?
-কেন? ও তো ওর ঘরেই আছে।
-পাতা এই পাতা…
-আসছি, দাঁড়াও আপু, বলো আপু কি বলবে?
পাতার কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কানের নীচে একটা শব্দ হয়।
পাতাকে থাপ্পড় মেরে লতা নিজেই কষ্ট পায়। সে পাতাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে…
লতা লেগেজ গুছায়, সে চলে যাবে।
-কি করছিস তুই?
-আমি চলে যাবো মা।
-এখন রাত আটটা বাজে, এতো রাতে তুই কোথায় যাবি? তাছাড়া তোর বাড়ীতে এখন তালা দেয়া। আবীর নাই। সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কোন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আমাকে কিছু বলেনি। কাল খোঁজ নিয়ে দেখবো।
লতা কাঁদতে থাকে। আবীরকে দেখার জন্য মনটা খুব আনচান করে। আবীরের প্রতি তার ভালোবাসা আরও অনেক গুন বেড়ে ওঠে…

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।