Breaking News

রাই-কৃশানু-দুটি মন একটি হৃদয় – মশিয়ুর রাহমান খোকন

রাই-কৃশানু – দুটি মন একটি হৃদয়
– মশিয়ুর রাহমান খোকন

আকাশ ছোঁয়া অনেক উঁচু একটি পাহাড়। মেঘের সাথে মিশে গেছে। চারিদিক দিয়ে মেঘ ভেসে যায়। পাহাড়ের উপর সবুজ ঘাস। মাঝখানে একটা দেবদারু গাছ।
দেবদারু গাছের নিচে সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে আছে পৃথা চক্রবর্তী। পৃথার পেটের উপর মাথা রেখে আড়াআড়ি শুয়ে কথা বলে শান্তনু দত্ত।
ওরা দুজন দুইজনকে ভালোবাসে পাগল পারার মতো।
রাধা কৃষ্ণের নামের সাথে মিলিয়ে ওরা দুজন দুজনের নাম রাখে ”রাই” আর ”কৃশানু”।
ওদের ভালোবাসার সম্পর্ক প্রায় তিন বছর হতে চললো। এই সম্পর্কের কথা সবাই জানে। দুই পরিবারে ওদের বিয়ে নিয়ে কথা চলছে।
রাই মনে করে, কৃশানু তাকে যত টুকু ভালোবাসে, সে কৃশানু থেকেও এক হাজার গুণ বেশী তাকে ভালোবাসে।
আবার কৃশানু মনে করে, রাই তাকে যতটুকু ভালোবাসে তার থেকেও লাখো গুণ বেশী সে রাইকে ভালোবাসে।
প্রায়ই দু’জন দু’জনের ভালোবাসা নিয়ে খুনসুটি প্রতিযোগিতা চলে। ভালোবাসার প্রতিযোগিতা থেকে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজী না।
-কৃশানু
-হুম
-তুমি কি বিয়ের পরও আমাকে এমন করে ভালবাসবে?
-এটা তুমি কি বললে রাই? আমি যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকবো শুধু তোমার জন্য। শুধু মাত্র তোমাকে ভালোবাসার জন্যই আমি বেঁচে আছি রাই।
-আমিও কৃশানু। আই লাভ ইউ।
-লাভ ইউ টু রাই। …রাই,
-হুম
-এই পাহাড়টা তোমার কাছে ক্যামন লাগছে।
-অসাধারণ কৃশানু, অপূর্ব, গায়ের সাথে মেঘ ভেসে যায়, কোলাহল অনেক দূরে। এমন একটা জায়গায় নিয়ে আসার জন্য তোমাকে উউম্মাআহহ,
-বলতো রাই, এই পাহাড়ের নাম কি?
-তা তো জানি না কৃশানু।
-এই পাহাড়ের নাম ”কালা পাহাড়”।
-কাল পাহাড়। দারুণ নাম তো।
-এই পাহাড়টা মাটি থেকে দুই হাজার নয়শো ফুট উঁচু। আর সমুদ্র থেকে তিন হাজার দুশো ফুট উঁচু। এশিয়ার মধ্যে এটাই একমাত্র উঁচু পাহাড়। এই পাহাড়ের কিন্তু একটা ইতিহাস আছে, জানো রাই?
-কি ইতিহাস কৃশানু?
-শুনবে রাই?
-বলনা কৃশানু, আমি শুনতে চাই।
-অনেক অনেক বছর আগে। বলতে পারো প্রায় সাতশো বছর আগের কথা। এই এলাকায় একটা ছেলে ছিলো। ছেলেটার নাম ছিলো কালান্তর। কালান্তর ছিল গরিব ঘরের চাষীর ছেলে।
সে একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসতো। মেয়েটার নাম ছিল পরী। যেমন নাম তেমন দেখতে ছিল। দশ গ্রামে পরীর মতো সুন্দর মেয়ে আর ছিল না।
পরী ছিল জমিদারের মেয়ে। জমিদার লোকটা ছিল খুব খারাপ।
তাদের ভালোবাসার কথা যখন জানাজানি হয়ে যায়। তখন কেউ তাদের সম্পর্কটা মেনে নেয় না। তাদের আরও একটা সমস্যা ছিল রাই।
-কি সমস্যা কৃশানু?
-কালান্তর ছিল সনাতন ধর্মের, হিন্দু ছেলে। আর পরী ছিল মসুলমান ধর্মের জমিদারের মেয়ে।
-তাদের সম্পর্ক যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন পরীর বাবা পরীকে ভুলে যাওয়ার জন্য পরীর সামনে, লাঠিয়ালদের দিয়ে কালান্তরকে দেবদারু গাছের সাথে হাত পা বেঁধে সারা গ্রামবাসীর সামনে অনেক মারে।
-কালান্তর থেকে থেকে অজ্ঞান হয়ে যায়। যখনি জ্ঞান ফিরে আসে, তখনি সে বলে উঠে, আমি মরে যাবো তাও পরীকে ভুলতে পারবো না।
-পরীর জমিদার বাবা, আরেক জমিদার বংশের ছেলের সাথে পরীর বিয়ে ঠিক করে।
-কালান্তরের সাথে পরী, বা পরীর সাথে কালান্তর আর কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে পারে না।
-থামলে কেন কৃশানু? তারপর কি হল?
-পরীদের জমিদার বাড়ীর সামনে ছিল একটা বড় দেবদারু গাছ। যে গাছের সাথে বেঁধে কালন্তরকে মারা হয়।
বিয়ের ঠিক পাঁচ দিন আগে, পরী তার জমিদার বাবার কাছে একটা চিঠি লিখে, সেই দেবদারু গাছে ঝুলে থাকে।
-বোলো কি কৃশানু? আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। তারপর? তারপর কি হল? কি লেখা ছিল সেই চিঠিতে?
-পরীর সেই চিঠিতে লেখা ছিল,
-বাবা,
আমার মৃত্যুর এক মাত্র কারণ, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম। যাকে না পেলে এই পৃথিবী আমার কাছে মূল্যহীন।
আমি জানি আমার কালান্তর যদি আমার মৃত্যুর সংবাদ পায়। সেও সাথে সাথেই আমার সাথে স্বর্গে মিলিত হবে।
তোমাদেরকে আরেকটা কথা বলা হয়নি। আমার কালান্তর শুধু আমার জন্য তার ধর্ম ত্যাগ করে মসুলমান হয়েছে।
মৃত্যুর পর তোমরা আমার কালান্তরকে আমার থেকে আলাদা করে দিয়ো না বাবা।
-পরদিন এই কথা যখন কালান্তরের কানে গেলো। সাথে সাথে কালান্তর গভীর জংগল পেড়িয়ে এই পাহাড়ে উঠে নিচে ঝাঁপ দেয়।
তাদের দুজনকে মুসলিম ধর্মের রীতি হিসাবে এই পাহাড়ের উপরেই কবর দেয়া হয়। তাদের কবরের মাথার কাছে একটা দেবদারু গাছের চারা লাগিয়ে দেয়া হয়। আমারা এখন তাদের কবরের উপরই শুয়ে আছি রাই।
-বোলো কি কৃশানু? কি বলছো তুমি?
রাই সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। সে কবরের জায়গাটা আর দেবদারু গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে।
-তাদেরকে এখানে কবর দেয়ার চল্লিশ দিনের মাথায় এই পাহাড়ে উঠার একমাত্র রাস্তার মাটি সম্পূর্ণ ধসে যায়।
-এরপর থেকে আজ পর্যন্ত এই পাহাড়ের উপর কোন মানুষের পা পরেনি। আজ এতো বছর পর আমারাই প্রথম কোন মানুষ, যারা কালন্তর আর পরীর কবরের কাছে দাঁড়িয়ে আছি রাই।
-ঐ সময় এই পাহাড়ের নাম ছিল, ”কালাপরী পাহাড়”। আস্তে আস্তে পরী নামটা মুছে এখন কালা পাহাড় নামে পরিচিতি পায়।
-তখন এই পাহাড়ে সহজে কেউ আসতে পারতো না। চারিদিকে ছিল ঘন বন আর গভীর জংগল। বাঘ সিংহের মতো ভয়ংকর জন্তু জানোয়ার থাকতো সেই জংগলে।
-এই ঘটনার কয়েক বছর পর থেকে আজ পর্যন্ত, এই পাহাড়ের গোঁড়ায় প্রেমিক প্রেমিকারা এসে মনের মানুষের জন্য মানত করে সুতা বেঁধে দিয়ে যায়। এখনে মানত করে সুতা বেঁধে দিলে নাকি সম্পর্ক কখনো ভেঙ্গে যায় না।
-আশ্চর্য তো!
-হুম, এবার বুঝেছো রাই? আমি যে তোমাকে তোমার থেকেও বেশী ভালোবাসি। আমি তোমাকে কালান্তরের মতোই ভালোবাসি। এই জন্যই তো তোমাকে কালা পাহাড়ে নিয়ে আনলাম।
-হুম, আর আমি তোমাকে পরীর মতো ভালোবাসি।
-কালান্তর কিন্তু পরীকে ভালোবেসে এই পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলো। আমিও তোমাকে ভালোবেসে এই পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতে পারবো। দেখবে রাই? তবে দেখো।
-না না কৃশানু. পাগলামো করো না.. না…কৃশানু…
কৃশানু রাইয়ের কপালে চুমু দিয়েই সাথে সাথে কালা পাহাড় থেকে নিচে ঝাঁপ দেয়। রাই বাধা দেয়ার আগেই চোখের পলকে কৃশানু নিচে হারিয়ে যায়।
রাই চিৎকার করে উঠে।
-কৃ…..শা……নু…
মাথার উপর সিলিং ফ্যান ঘুরছে। বাথরুমের কলে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার শব্দ। সেই শব্দের সাথে তাল মিলায় দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির কাঁটা টা।
খোলা জানালা দিয়ে পূর্ণিমা রাতের চাঁদের আলোয় সারা বিছান ভরে গেছে। পৃথা চক্রবর্তীর সারা শরীর ঘামতে থাকে।
পৃথা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না, সে এতক্ষণ কোথায় ছিলো?
বালিশের নিচে থেকে মোবাইলটা টেনে হাতে নেয়। ঘড়ির কাঁটায় রাত তিনটা।
পৃথা শান্তনু দত্তকে একটা ফোন দেয়। রিং হয় শান্তনু ফোন ধরে না। আবার দেয়… আবার… আবার…
পৃথা বারান্দায় এসে চেয়ারে বসে। শান্তনুর পাঠানো রাইয়ের মোবাইলের সব এস এম এস গুলি একটা একটা করে পড়ে।
শেষ রাতের সচ্ছ বাতাস পৃথাকে শীতল করে দেয়। আস্তে আস্তে আকাশ ফর্সা হয়ে উঠে। পৃথা বারান্দায় বসেই থাকে। হটাৎ ফোনটা বেজে উঠে…
-রাই, তুমি ফোন দিয়েছিলে। আমি টের পাইনি। ঘুমাচ্ছিলাম।
-তুমি ঠিক আছো কৃশানু? এখন কি করছ তুমি?
-রাই, কি হয়েছে তোমার? তুমি এমন করে কথা বলছ কেন? কাঁদছো কেন রাই? আমাকে বলো রাই, কি হয়েছে?
রাই কোন কথা বলে না। শুধু কাঁদতেই থাকে।
-জানো রাই, আমি আজ একটা দারুণ স্বপ্ন দেখেছি। কালা পাহাড়ের স্বপ্ন। দেখা হলে তোমাকে সব বলবো। তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।
-রাই চমকে উঠে। সে কিছুই বলে না। শুধু বলে উঠে,
-আই লাভ ইউ কৃশানু। আমি তোমাকে পরীর মতোই ভালোবাসি…।

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।