Breaking News

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে
– নাজির হোসেন বিশ্বাস

পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে চলেছে, উন্মুক্ত আকাশে। অদূরে আম গাছের পাতার গহীন আড়াল থেকে নাম না জানা পাখির কলতান অসীমা দেবীকে কেমন যেন উদাস করে তুলেছে! দোতলার ব্যালকনিতে রাখা ইজি চেয়ারে বসে এক কাপ ধূমায়িত চা নিয়ে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াতেই মনটা উড়িয়ে নিয়ে গেল কোন এক নিঃসীম নীলিমায় উড়ে যাওয়া বলাকার ডানায় ভর করে, বিশ বছর আগের মেয়েবেলায়! আসীমা দেবীর অন্তরে বেজে উঠলো রবি ঠাকুরের গান, “চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে, অন্তরে আজ দেখবো যখন আলোক নাহিরে…!”

“এই বিশাল একজনকে ভর্তি করে নে, টাইপ স্টেনো শেখা ভালো করে! ভালো শিক্ষক আছেন তো ইন্সটিটিউটে?”
“সে আপনাকে ভাবতে হবে না দিদি, এই নিন ফর্ম ভর্তি করে দিন!” বলে একটা ফর্ম সতী দেবীর হাতে ধরিয়ে দিল বিশাল বোস!
“এই যে শিক্ষক, দেখুন পছন্দ কিনা? নাম আকাশ বিশ্বাস!”
“সে কিরে বিশাল, আমি কি মেয়ের জন্য পাত্র দেখতে এসেছি?” বলে হেসে উঠলেন সতী দেবী! এই যে আমার ছাত্রী, নাম অসীমা, অসীমা ব্যানার্জী!” বেশ ছিপছিপে পাতলা মিতভাষী একটা মেয়ে, গৌর বর্ণা, মাথায় এক রাশ কোঁকড়ানো চুল, ঠোঁটের উপর সুন্দর একটি তিল, যেন ফুলের উপর ভ্রমর এসে বসেছে! “এটা আমার মেয়ের মত! ওরা ব্যানার্জী, আমি দাশগুপ্ত! আসলে ও আমার ছাত্রী সেই ছোট্ট থেকে! ওর ভালোমন্দের সব দায় আমার, বুঝলি বিশাল? আজ উঠলাম বিশাল, কালকে থেকেই ক্লাসে আসবে তাহলে!” বলেই জড়াজড়ি করে দুজনে বেরিয়ে গেলেন!

“স্টেনো শিখতে হলে প্রথমত প্রয়োজন একাগ্রতা, আই মিন কন্সেন্ট্রেট! কেননা পেন্সিল চলবে শব্দকে অনুসরণ করে! মুখের উচ্চারন শুনেই লিপিবদ্ধ করে নিতে হবে সাংকেতিক ভাষায়, আর সেটাই স্টেনো! অনুশীলন আর অনুশীলনের ফলেই এই সাংকেতিক ভাষা আয়ত্বে আসে, আমি বোঝাতে পেরেছি?”
মৃদু হেসে বলে উঠল অসীমা, “হ্যাঁ মাস্টামশাই!”
“আজ তাহলে এই দশটি সংকেত(অক্ষর) (পি-বি-টি-ডি-চে-যে-কে-গে-এফ-ভি) দিলাম অনুশীলনের জন্য, ধীরে ধীরে আমরা এগিয়ে যাবো, কেমন? আজ এই অবধি থাক!”

“দিদি, মাস্টামশাই খুব ভালো! আমাকে খুব যত্ন করে শেখাচ্ছেন!” বলেই জড়িয়ে ধরলো তার দিদিকে!
“কিরে এই ক’দিনেই মাস্টারের প্রেমে পড়ে গেলি? গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছেন বুঝি?” বলেই সতী দেবী গেয়ে উঠলেন রবি ঠাকুরের গান, “একটুকু ছোঁয়া লাগে, একটুকু কথা শুনে, তাই দিয়ে মনে মনে রচি মম ফাল্গুনি!”
“ধ্যাৎ, আমি কি তাই বলছি! আসলে মানুষটা খুব ভালো দিদি! খুব বড় মনের মানুষ!”
“তুই, কি করে বুঝলি?”
“দিদি, মানুষ দেখলেই আমি বুঝতে পারি, আর পাঁচটা মানুষের মত নয়! ইনাকে অন্তত বিশ্বাস করা যায়! মুসলিম ঘরের মানুষদের সম্বন্ধে আমার ধারনা বদলে গেল, সবাই খারাপ হয় না! এমন উদার মানুষ দেখা যায় না! ব্যাতিক্রমী মানুষ!”
“তোকে কে বলেছে মুসলিমরা খারাপ মানুষ? খারাপ মানুষ হিন্দুদের মধ্যে নেই? হিন্দু ছেলেরা মেয়েদের মুখে এ্যাসিড ছুঁড়ে মারে না? উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই ভালো মন্দ লোক আছে!”
“ঠিক বলেছেন দিদি!”
“দেখি তোর খাতা বের কর, ক’দিনে কতটুকু শিখলি দেখি!” ব্যাগ থেকে শর্টহ্যান্ড খাতাখানা বের করে দিদির সামনে মেলে ধরলো, মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে!
“সে কিরে এই তিন মাসে এতদূর এগিয়ে গেছিস? কি করে সম্ভব হোল? এটা অন্তত ছ’মাসের লেসন!”
“সোমবার থেকে “দি স্টেটস্ম্যান” থেকে ডিক্টেশন নেব! মাস্টামশাই বলেছেন! দিদি, মাস্টামশাইকে একদিন বাড়িতে আনলে হয় না?”
“আনবি? তোর মাস্টামশাই, তোর ভালোবাসার মানুষকে বাড়িতে ডেকে এনে আদর করবি, তাতে আমার আপত্তি থাকবে কেন? বলেই আবার সতী দেবী গেয়ে উঠলেন, “ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে, ও বন্ধু আমার, না পেয়ে তোমার দেখা একা একা দিন যে আমার কাটেনা রে!”
“সত্যি দিন কাটে না দিদি, ডেকে আনবো একদিন, নিজের হাতে সেবা করবো, আমার মাস্টামশাইকে!”
“বেশ, আসতে বলিস, রবিবার বৈকালে! কিরে এতো খুশি কেন? সত্যি করে বল দেখি, মাস্টারের প্রেমে পড়েছিস কিনা?”

“দিদি, প্রেম কিনা জানি না, তবে মানুষটার প্রতি আমার অগাধ শ্রদ্ধা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে! এমন মানুষ হয়, এত আন্তরিক, এত শান্ত মানুষ, আমাকে বিহ্বল করে দেয় দিদি, মাস্টামশাইয়ের দেওয়া ডিক্টেশন আমাকে মন্ত্র মুগ্ধ করে, আমি যেন নদীর বুকে ভেসে চলা নৌকা তিরতির করে বয়ে চলেছি, অপার্থিব সুখানুভূতি সমস্ত মনে শরীরে খেলা করে! এই মানুষটার মধ্যে একটা ভারতবর্ষকে দেখতে পাই দিদি, এটা আমার অকপট স্বীকারোক্তি!” বলেই গেয়ে উঠলেন, “তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার সাধের সাধনা, মম শূন্য গগন বিহারী…!”

“বেশ, শুনে খুশি হলাম! আমিও কোন ধর্ম মানি নারে, বাবার কাছে শিখেছি ‘সবার উর্দ্ধে মানুষ, তাহার উপরে নাই!’ মন্দির মসজিদ না বানিয়ে যদি দেশ নায়করা কটা হাসপাতাল বানাতো, এই দূর্দিনে মানুষকে অন্তত বিনা চিকিৎসায় মরতে হোত না! যে দেশে শিক্ষা আর চিকিৎসা পরিষেবা উন্নত, সে দেশ তত এগিয়ে! এখানে তো যত কর্মসূচি সব ভোট কেন্দ্রিক! বিজ্ঞানভিত্তিক মানসিকতার চর্চা না করে কিভাবে দেশের মঙ্গল হয় জানি না! অশিক্ষিত মানুষগুলো কি করবে? শিক্ষিত মানুষগুলোই যদি ………….! সারা বিশ্ব আজ মুখিয়ে আছে, কে কাকে ধ্বংস করবে, কে কত শক্তিশালী প্রমাণ করতে ব্যস্ত! দেশগুলো যদি অস্ত্রের প্রতিযোগিতায় না নেমে, ভালোবাসার, প্রেমের মৈত্রীবন্ধনে আবদ্ধ হোত, তবেই সেটা হোত মানুষের শ্রেষ্ঠ ধর্ম! আমরা এই শিক্ষায় তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিকট পেয়েছি! দু’দুটো বিশ্বযুদ্ধ করেও শিক্ষা হোলনা? তো ফাঁকা আওয়াজ দিয়ে ঐক্য নয়, দেশপ্রেম নয়, মানুষের পাশে থেকে দেশপ্রেম গড়ে তুলতে হবে, সেটাই সত্যিকারের ঐক্য! এটাই ইতিহাসের শিক্ষা, রবি ঠাকুরের সেই মহান ব্রত কোথায় গেল, “ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা, তোমাতে বিশ্বময়ীর তোমাতে বিশ্বমায়ের আঁচল পাতা!”
“আপনাকে সামনের নির্বাচনে দাঁড় করাবো দিদি, ভালো বক্তব্য দিতে পারেন দেখছি!”
“নারে এটা বক্তব্য নয়, মনের ক্ষেদোক্তি!”
“ঠিক দিদি, আমারও তাই মনে হয়! আমরা ধর্ম ধর্ম করেই জীবনটা কাটিয়ে দিলাম! প্রত্যেকটি মানুষ তার ধর্ম তো তার ঘরে বসেই করতে পারেন, জনগণের কাজ জনগণ করবেন, সরকার দেশের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবেন! সেটাই প্রকৃত রাজধর্ম?”
“ঠিক আছে, ওঠ একটু চা করে আন দেখি গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল!”
“দিদি আজকের চা পাতা ভালো না, দেখুন খেয়ে কেমন লাগে! এই যে বিস্কুট!”
চায়ে চুমুক দিয়ে বলে ওঠেন, “তোর মাস্টামশাই কবে আসবেন?”

“কালকে!” বলেই ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে হাসি ঝরিয়ে দিল একরাশ! “দিদি এখন রাত আটটা বাজে আমি বাড়ি চলে গেলাম কাল সকালে আসবো!”

“ঈশার মা ওঠো, সকাল হয়ে গেছে চা দাও একটু!”
হ্যাঁ উঠি, তুমি কখন উঠলে ঈশার বাবা?” সতী দেবী জানতে চাইলেন!
“অনেকক্ষণ উঠেছি, হেঁটে এলাম তিন কিমি রাস্তা! ওই দেখ অসীমা চলে এসেছে!”
“কিরে ভোরবেলা বকুল ফুলের মালা নিয়ে হাজির হয়েছিস কাকে পরাবি?”
কোন কথা না বলে গেয়ে উঠলেন, “এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, আমার মুক্তি ধূলায় ধূলায় ঘাসে ঘাসে!” তারপরেই বলে উঠলেন,
“দেখি কাকে পরায়, খুব সুগন্ধ ফুলগুলোর দেখুন!” বলে অসীমা ফুলের মালাটা দিদির দিকে এগিয়ে দিল!
“এই অসীমা আজ তোর মাস্টারমশাই আসবেন, কি খাওয়াবি? কেনাকাটা করতে হবে না?”
“সব এনেছি, আপনাকে ভাবতে হবে না!”
“একটু চা কর না অসীমা, আমি হাত মুখটা ধুয়ে আসি!”
**********************
দূরে কোথাও রবীন্দ্র সঙ্গীতের সুর ভেসে আসছে, প্রকৃতির বুকে ফিনফিন করে উড়ছে মন খারাপিয়া মেঘলা বাতাস! একটা হলুদ রঙের শাড়ি পরেছে অসীমা, যেন প্রজাপতির মতো উড়ছে ফুলে ফুলে! তার মনের মানুষ আজ আসবে তার দ্বারে, গুনগুন করে অসীমা রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে উঠলো, ‘আমি তোমারও সঙ্গে বেঁধেছি আমারও প্রাণ, সুরেরও বাঁধনে ……….!’ বাইরে একটি বকুল গাছের নিচে অস্থির ভাবে পায়চারি করছে অসীমা, তার মাস্টামশাইকে অভ্যর্থনা করার জন্য! তার অপেক্ষার মধ্যেই ঝরে পড়ছে অসীম চঞ্চলতা, হৃদয়ের অসীম ভালোবাসা!

“বাইরে দাঁড়িয়ে আছো দেখছি! আমিও চলে এসেছি!” আকাশ অসীমার পাশে এসে দাঁড়ায়! গেয়ে ওঠে, “নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগলো লাগলো, নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগলো…..!”
“সুন্দর গানটা, রবি ঠাকুরই পারেন মানুষের অন্তরের কথা শোনাতে, দাঁড়িয়ে আছি, আপনি প্রথম আসছেন যদি চিনতে না পারেন তাই!”

“বকুল গাছটাতে কত সুন্দর ফুল ফুটেছে, কি সুবাস!”
“হ্যাঁ, খুব সুন্দর, আমি তো রোজ বকুল ফুলের মালা গাঁথি! আজ সকালেও একটা মালা গেঁথেছি!”
“খুব সুন্দর লাগছে তোমাকে, হলুদ রঙের শাড়িতে তোমাকে অপূর্ব লাগে!”
মুক্ত ঝরানো হাসি দিয়ে অসীমা বলে উঠলো, “আপনার ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম, আসুন ভেতরে যাই!”
“হ্যাঁ চলো যাই!”
“মাস্টামশাই ইনি আমার মা, আর ইনি আমার দিম্মা, মানে মায়ের মা! দিম্মা একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী জানেন তো?”
“তাই, তাহলে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামীকে নিজের চোখে আজ প্রত্যক্ষ করলাম! প্রণাম নেবেন দিম্মা!” বলেই পায়ে হাত ছুঁইয়ে মাথায় ঠেকালেন আকাশ বিশ্বাস!
“ভালো থেকো ভাই! নাতনী তো তোমার বড়ো ফ্যান! দিনে দশবার তোমার কথা বলে!”
“সেটা আমার সৌভাগ্য দিম্মা!”
অসীমাদের বাড়িটা ছোট্ট হলেও, বেশ সুন্দর! একতলা বাড়ি বেডরুম, কিচেন, বাথরুম বেশ পরিপাটী করে সাজানো! বাড়িটার সদর দরজা কাঠের তৈরি সুন্দর নক্সা আঁকা! লনে সুন্দর সুন্দর ফুলের গাছ বাতাসে মাথা দুলিয়ে অভর্থনা করছে অনাগত ভবিষ্যৎকে!
“অসীমা, অনেকক্ষণ আসা হোল, এবার উঠছি!” বলেই আকাশ বিশ্বাস বেরিয়ে পড়লেন রাস্তায়! গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন, “ভালোবেসে সখি নিভৃতে যতনে আমার নামটি লিখ তোমার মনের মন্দিরে……!”
কেমন যেন একটি ভালোলাগা সমস্ত শরীর মন ছুঁয়ে গেল, মানুষের জন্য মানুষের মনে এই অদ্ভুত স্পন্দন কেন আসে! এযে স্বপ্নের সরোবরে ভেসে চলা! মাস্টার আকাশ বিশ্বাসের মনের ভেতর নানা আঁকিবুকির সঙ্গে দুলতে থাকে নানান ভাবনা। কেন মেয়েটা আমার মনে এই শিহরণ তুলে দিল? এটাকে কি প্রেম বলে? কেন সব সময় ওর কথা মনকে আচ্ছন্ন করে, স্বপ্নে কেন আসে, এই ভাবে সব কিছু উথাল পাথাল করতে! একটা একটা করে দিন গড়িয়ে যায়, মনের গভীরে ততই অঙ্কুর চারাটা অশ্বত্থ গাছের মতো ঝুরি বসিয়ে দেয় শরীর ও মনের আনাচে কানাচে!

অসীমা এসেই বলে উঠলো, “কালকে দক্ষীনেশ্বর যাবো, পূজো দিতে!”
“বেশ তো যাবে!”
“আপনাকেও যেতে হবে!”
“আমাকেও যেতে হবে, কেন?”
“আপনার জন্যই তো আজ আমি সফল হয়েছি, মাস্টামশাই!”
“আচ্ছা তাই, বেশ কখন যাবে?”
“সকাল দশটার বাস ধরবো! বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করবেন, আমি ঠিক চলে আসবো!”
ফুল প্রসাদের থালা সাজিয়ে নিয়ে অসীমা এগিয়ে গেল, মন্দিরের প্রবেশ দ্বারে! “মাস্টামশাই আপনিও আসুন!”
“হ্যাঁ আসি!” ওর হাত ধরে ঢুকে পড়লাম, মন্দিরে! মিনিট দশেকের মধ্যেই পূজো দেওয়া শেষ করে গঙ্গার ঘাটে এসে দাঁড়ালাম! গঙ্গার জল বয়ে চলেছে অগণ্য মানুষের হাহাকার ও পাপের বোঝা বুকে করে! এই গঙ্গার বুকেই তো হাজার হাজার মানুষের জীবনের সুখ দুঃখের কাহিনী লেখা রয়েছে সবার অজান্তে, কে তার খবর রাখে! আকাশ গেয়ে উঠলেন, “ শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে, তোমার সুরটি আমার মুখের পরে বুকের পরে পড়ুক ঝরে….!”
“চলুন মাস্টামশাই” অসীমার ডাকে আকাশের সম্বিত ফেরে!
আকাশ বলে, “হ্যাঁ চলো!” “অসীমা, আজকের মন্দির দর্শন আমার খুব মনে থাকবে, দক্ষীনেশ্বর মন্দির তোমার জন্য দেখা হয়ে গেল! এটা আমার প্রাপ্তির ঘড়া পূর্ণ হোল অসীমা! কালকে তো অফিস আছে তোমার?”

“হ্যাঁ, চলুন বাড়ি ফেরা যাক!”

অফিসের চেয়ারে বসে কম্পিউটার অন করে অসীমা রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনছে, রবীন্দ্র সঙ্গীত ওর বড়োই প্রিয়, গানটাও মন্দ গায় না অসীমা, এমন সময়, টেবিলের ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠলো-
“গুড মর্ণিং স্যার!”
“চেম্বারে চলে এসো, একটা ডিক্টেশন নিতে হবে!”
“ওকে স্যার!”
ক্রেডেলে ফোনটা রেখেই অসীমা মন্থর পায়ে এগিয়ে গেল স্যারের চেম্বারে,
“স্যার আসছি!”
“ও সিওর”
স্যার একটি দশ মিনিটের ডিক্টেশন দিলেন, দিয়েই বলে উঠলেন, “এটা এখুনি রেডি করে দাও, ভেরী আর্জেন্ট!”
দশ মিনিট পরে অসীমা দেবী বসের চেম্বারে মাথা গলিয়ে বলে উঠলেন, “আসছি স্যার!”
“হয়েছে, দাও দেখি কেমন হয়েছে!” অফিসার ঝকঝকে কাগজটার উপর এমনভাবে চেয়ে রইলেন, মনে হচ্ছে চোখদুটো সার্চ লাইটের মতো আলো ফেলে দেখছেন কোথাও ত্রুটি আছে কিনা! চোখ নাচিয়ে বলে উঠলেন, “ওকে ফাইন, খুব সুন্দর হয়েছে, আই লাইক ইট! ওয়েল ডান!”
“থ্যাঙ্ক ইউ স্যার, আমি আসছি স্যার!”

“দিদি, আজ প্রথম অফিসে স্যারের ডিক্টেশন নিয়েছি, স্যার খুব খুশি হয়েছেন!” বলেই খুশি মনে দাঁড়িয়ে রইলো!
“কি হোল, দাঁড়িয়ে রইলি যে, বসবিনা? মাস্টামশাইয়ের কাছে যাবি? বলেই গেয়ে উঠলেন, “নিশিদিন ভরসা রাখিস হবেই হবে/ওরে মন হবেই হবে/যদি পণ করেই থাকিস/ সে পণ তোমার রবেই রবে!”

“খুব দেখতে ইচ্ছে করছে দিদি, আমার মাস্টামশাইকে না দেখলে থাকতে পারি না! তাঁর কাছে থাকলে ভীষন শান্তি পাই মনে, এমন কেন হয় দিদি?”
“ঠিক আছে একটু চা করে নিয়ে আয়, খেয়ে সন্ধ্যায় যাবি আকাশের কাছে, খুশি তো? আমি যে তোর মন পড়তে পারি অসীমা!”

“অসীমা এসেছো, তোমার কথাই ভাবছিলাম, না এলে আমিই যেতাম! বলো অফিস কেমন লাগছে, ডিক্টেশন নিয়েছো অফিসে?”
“হ্যাঁ নিয়েছি, খুব প্রশংসা পেয়েছি, অফিসের স্যার খুব খুশি হয়েছেন!”
“জানি তুমি পারবে, এই যে কনফিডেন্স তৈরী হচ্ছে, এটাই তোমার সাফল্যের চাবিকাঠি! তোমার অনেক উন্নতি হবে দেখে নিও! আমিও ভীষন খুশি হলাম!”
“শনি রবি ছুটি চলুন কোথাও ঘুরতে যাই মাস্টামশাই!”
“রবীন্দ্র সদনে রক্ত করবী নাটক আছে, যাবে দেখতে? শনিবার সন্ধ্যা ছটা থেকে শুরু!”
“রক্ত করবী? খুব সুন্দর নাটক, যাবো!” বলে উঠলো অসীমা!
“অন্ধকার হয়ে গেছে, চলো তোমাকে একটু এগিয়ে দিয়ে আসি! অসীমা তোমার কথা আমার সব সময় মনে হয়, ভুলতে পারি না, তোমাকে না দেখলে মনের ভেতরটা হাহাকার করে! তুমি কি কিছু বুঝতে পারো?”

“সব বুঝতে পারি, আমিও তো আপানার ভাবনা ছাড়া থাকতে পারি না! কেন এমন হয় কি জানি! চলুন রবিবারে শান্তিনিকেতন ঘুরে আসি। ভানু সিংহের পদাবলী কেমন লেগেছে মাস্টামশাই?”
“অসাধরণ, মুগ্ধ হয়েছি! রবি ঠাকুরকে জানতে হলে, এই গ্রন্থ না পড়লে একটা দিক অনালোকিত থেকে যাবে!”
“এই জন্যই আপনাকে আমার খুব ভালো লাগে! আপনি সবার থেকে আলাদা! এটাই আমার অহংকার মাস্টামশাই! আপনি যখন কথা বলেন, আমার ভেতরে শিলাবৃষ্টি হয়!”
“অসীমা, অনেকদূর চলে এসেছি, তুমি এইটুকু একা চলে যাও, পারবে না?”
“না, আপনি বাড়ি অবধি চলুন! চা খেয়ে দিদির সঙ্গে দেখা করে চলে আসবেন!”
“অসীমা, আমি তো চাই তোমার সঙ্গে সারা জীবন কাটাতে, মনের ভেতরে যে নদী কুল কুল করে বয়ে চলেছে তার স্রোতধারা অনাদি অনন্তকাল ধরে বয়ে যাবে অসীমা, আমি তোমাকে কোনদিন মন থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবো না! হয়তো আমরা একদিন হারিয়ে যাবো, কিন্তু যতদিন বাঁচবো মনে রাখবো!” কন্ঠে ঝরে পড়ে, “কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আসো, সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো…!”
“জানি না কপালে কি লেখা আছে, তবে হারিয়ে গেলেও হৃদয়ের কুঠুরীতে যে নাম লেখা হয়ে গেছে সেতো মুছবে না কোনদিন মাস্টামশাই!”
“এই তো চলে এসেছি, একটু বসুন আমি চা করে আনি!” বলে অসীমা কিচেনের দিকে চলে গেল।
আকাশ ঘুরে ঘুরে রেকে সাজানো বইগুলো দেখতে লাগলো! একখানা বই টেনে নিয়ে পাতা ওলটাতে থাকে আকাশ!
“এই নিন চা! ওই বইটা পড়ছেন, ওটা আপনিই গত কলকাতা বইমেলাতে কিনে দিয়েছিলেন, মনে আছে?”
“হু মনে আছে, কত সুন্দর সুন্দর কথার সমাহার, রবীন্দ্রনাথ মানেই মুক্তির আলোয় ভাসানো বসুন্ধরা!”
“আমার মনে ভীষন দাগ কাটে রবীন্দ্রনাথ! রবীন্দ্রনাথে ডুব দিলে, হৃদয় ছুঁয়ে যায়, বইটা আমার ভীষন ভালোবাসার বই, রবীন্দ্রনাথের গীতবিতান!” গেয়ে উঠলেন, “আমার পরান যাহা চাই তুমি তাই তুমি তাই গো, তোমা ছাড়া আর এই জগতে আর কেহ নাই কিছু নাই …”

“বাহ্‌ তোমার কন্ঠে যাদু আছে অসীমা, রবীন্দ্র সঙ্গীত তোমার রক্তে আছে, আজ উঠি কেমন? তাহলে শনিবার ছটায় রবীন্দ্রসদন!”
*********************
“অসীমা আজই আমাকে গ্রামে ফিরে যেতে হচ্ছে, মা একা, বাবা পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন! শহরে থাকার পাট আমাকে চুকিয়ে দিতে হবে! কথা দিলাম মাঝে মাঝে এসে দেখা করে যাবো! মনে রাখবো তোমাকে চিরকাল!” বলে চোখের কোণটা রুমাল দিয়ে মুছে নিলেন আকাশ বিশ্বাস!
“সে কি চলে যাবেন? আমি তবে কি করে থাকবো মাস্টামশাই? গেয়ে উঠলেন, “যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙ্গলো ঝড়ে, জানি নাইতো তুমি এলে আমার ঘরে, যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙ্গলো ঝড়ে, ….!”
“সবই ভবিতব্য অসীমা, জানি না কি হবে! যেখানেই থাকি ঠিক যোগাযোগ থাকবে! আমি আসবো তোমার কাছে, মন খারাপ ক’রো না!”

“একটি দিনও আপনাকে না দেখে থাকি নি এই ক’বছর, আপনি চলে গেলে আমার ভালো লাগা, মন্দ লাগা কার সঙ্গে শেয়ার করবো মাস্টামশাই?”
“অসীমা আমি চিরকাল দূর থেকে তোমার সমব্যথী হয়েই থাকবো” কান্না জড়ানো কথাগুলো বলেই আকাশ মাথাটা নীচু করে!
“মাস্টামশাই, আমিও চিরকাল আপনাকে মনে রাখবো! আমার হৃদয়ে আপনি যে ভালোবাসার বৃষ্টি ঝরিয়েছেন, তা যে অনুক্ষন আমাকে উর্বর করে, সতেজ করে! আপনি আমার চোখের সামনে একটা খোলা আকাশ মেলে দিয়েছেন, গেয়ে উঠলেন, “যাবার বেলা শেষ কথাটি যাও বলে, কোনখানে যে মন লুকানো দাও বলে….!”
মাস্টারমশাই চলে যাচ্ছেন, দূরে পশ্চিম দিগন্তে ধীরে ধীরে রবির কিরণ অদৃশ্য হয়ে গেল, চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠলো অসীমা দেবীর, একটা হাহাকার বুকের ভেতর থেকে গুমরে বেরিয়ে যেতে চাইছে কিন্তু ঘূর্ণী বাতাসে চক্কর খেয়ে ধূলায় লুটিয়ে পড়লো! গেয়ে উঠলো, “কেটেছে একেলা বিরহের বেলা, আকাশ কুসুম চয়নে সব পথ এসে মিলে গেল শেষে তোমার দুখানি নয়নে….!”

“কৈ অসীমা একটু চা দেবে, বড্ড চা তৃষ্ণা পেয়েছে!”
স্বামী রূপঙ্করের ডাকে অসীমা দেবী বাস্তবে ফিরে আসেন, চোখের জলটা শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছে নিয়ে মৃদু পদ সঞ্চালনায় ডুবে গেলেন দৈনন্দিন সংসারের স্রোতে, বর্তমানের ব্যস্ত কোলাহলে!

(সমাপ্ত)

Check Also

শিউলি – নাজির হোসেন বিশ্বাস

গল্প – শিউলি – নাজির হোসেন বিশ্বাস অনুপ, আমি নিজে মেয়ে দেখেছি! তোর ভাবনার কিচ্ছু …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।