Breaking News

ব্ল্যাক বিউটি – ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

ব্ল্যাক বিউটি
– ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

——- অনেক আগের প্রথার কথা বলছি। আগেকার দিনে কোন বাড়িতে কালো মেয়ে হলেই সাত পাঁচ না ভেবেই তার নাম নির্ধারিত হত কালী বলেই। আর নাম যদিও বা হয়তো ভালো কিছু নির্ধারণ করা হত সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে সবাই কালো মেয়েটিকে কালী নামেই বেশি ডাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করত। এবার প্রশ্ন হল আমি আবার এসব নিয়ে কেন ঘ্যানঘ্যান করছি? আসল গল্পে না এসে আপনাদের জানা তথ্যের মার প্যাঁচে কেন সময় নষ্ট করাচ্ছি। তাহলে মূল গল্পে আসা যাক। কি বলেন?

—— গ্রামের একটি সাদামাঠা পরিবার। একদম গরিব সেই অর্থে নয়। আবার হাভাতে ঘর ও নয় কিন্তু। সেই পরিবারের তিন সন্তান। দুটি ছেলে একটি মেয়ে। সমর আর চম্পা এর দুই ছেলের কোলে তাদের মেয়ে জন্মায় একটি। মেয়েরা দাদাদের বা মা-বাবার খুব আদুরে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে বিধাতা অন্য কিছু লিখেছিলেন। মেয়ে জন্মালো অনেক রূপ নিয়ে কিন্তু রং টা ছিল কালো। মেয়ে জন্মানোর মুহুর্তে, কালো মেয়ের মুখ সমর দেখেনি। বলা ভালো দেখতে চায়নি। খুশিও হয়নি। কিন্তু চম্পা! সে তো মা। কি করে মেয়ের থেকে মুখ ঘোরায়? মেয়ে কালো হোক বা দুধে আলতা সেই মেয়ের সাথে মায়ের টান থেকেই যায়। নাড়ির টান।

——- আস্তে আস্তে তিন ভাইবোনেরা বড় হতে থাকল। এই দেখুন ওদের নাম গুলোই বলা হয়নি। অনেক সাধ ছিল চম্পার। মেয়ের নাম রাখবে পুতুল। তার পুতুল পুতুল মেয়ে। কিন্তু সমর ওসব পাত্তা না দিয়ে বলেছে, “কালো মেয়ের নাম আবার পুতুল! যত্তসব। কালো মেয়ের নাম কালীই ঠিক আছে”। সমরের কথাই শেষ কথা। আর কথা বাড়ায়নি চম্পা। ছেলেদের নাম খুব সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। বড়োটির নাম রুদ্র আর ছোটোটির নাম নীল। আপনারা আবার রুদ্রনীল ঘোষের কথা ভাববেন না যেন!

—— তা এই তিন ভাইবোন একটু একটু বড়ো হতে লাগল। স্কুলের গন্ডিতে পা পড়েছে তিনজনেরই। কালীর পড়াশোনা হতই না যদি তার মা জেদ না করত। চম্পা এদিক থেকে সমর কে হারিয়ে দিয়েছে। অনেকটা পরিমাণ ঘি পোড়ানোর পর তবে গিয়ে রাধা নেচেছে। মানে অনেক সাধ্য সাধনার পর, জোরাজুরির পর চম্পা তার মেয়ের পড়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে। ছেলেদের জন্য যেটা তাকে করতেই হয়নি।

—— বর্তমানে তিন ছেলে মেয়ে অনেকটা পরিনত। ছেলে দুটি রুদ্র আর নীল যাবে কোলকাতা। চাকরি সংক্রান্ত প্রস্তুতির জন্য। আর কালী? তার পড়াশোনা চলছিল মায়ের জেদেই। একটা রাত তার জীবনটাকে আমূল পাল্টে দিয়েছে।

—– সেদিন রাতটা ভয়ংকর ছিল। বিকেল থেকেই মেঘের মুখ ভার ছিল। অল্প অল্প হাওয়া বইছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় আকাশ তার ভয়াবহ রূপ ধারন করল। বজ্রপাতের সাথে ভারী বৃষ্টি। চলতেই থাকল। সমর আর সেদিন বাড়ি ফেরে না। অনেক রাতে কোথা থেকে একপেট নেশা করে বাড়ি ফিরেছিল। ফিরেই কালীর উপর ক্রোধে জ্বলে ওঠে। যা নয় তাই বলে কালীকে। কালো রঙের মেয়ে বলে তাকে যা নয় তাই শুনতে হয়। আরও কষ্ট পায় তার নিজের বাবার এহেন ব্যবহারে। সমর আরও জানায় সে, কালীকে কোলকাতা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। পাড়ার ছেলে রতন, কালীকে কোলকাতা নিয়ে গিয়ে একটা ভালো চাকরিতে যুক্ত করিয়ে দেবে। চম্পার ‘না’ সেদিন আর টেকেনি। সমরের জেদের কাছে সে পরাস্ত হয়েছিল।

—— কথামত পরদিন সকালে রতন হাজির হয় কালীর বাড়িতে। কোলকাতা নিয়ে আসার জন্য। কালীর চোখ গুলো জবা ফুলের মত লাল টকটক করছে। সাক্ষাৎ মা কালী লাগছে। তবে সেই চোখে তেজ নেই। আছে একরাশ কষ্ট। একরাশ কষ্ট। আর অপ্রকাশিত কিছু অভিমান। ওদিকে চম্পার অজান্তেই তার মেয়ের কত বড়ো ক্ষতি হয়ে গেল, চম্পা সে বিষয়ে অজ্ঞাত থেকে গেল।

—— চলে গেল কালী। মা কে ছেড়ে। পরিবার কে ছেড়ে। অনেক দূর। আর হয়তো তার ফেরা হবে না।

——- কোলকাতার এক ঘিঞ্জি গলি দিয়ে রতন কালীকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। কালী জানেও না কোথায় তাকে নিয়ে যাচ্ছে তার জীবন। শুধু রতনকে প্রশ্ন করেছিল,

—আমরা কোথায় যাচ্ছি?
—আর আমার কাজ?

—রতন উত্তর করেছিল অবিশ্যি।
— “তোকে নিয়ে যাচ্ছি একটা অন্য দুনিয়ায়। যেখানে অনেকরকম লাইট আছে। অনেকরকম অভিনেত্রী আছে। তুই আপাতত প্রশিক্ষণ পর্যায়ে থাকবি। তারপর আস্তে আস্তে স্থায়ী হয়ে যাবি। তোর কাজ পছন্দ হলে তোকে আর আটকায় কে”!

–আরও যোগ করেছিল রতন, “এখানে তোকে অভিনয় করতে হবে। ভাবিস না তুই কালো বলে। বিপাশা বসু কে চিনিস তো? ও যদে সিনেমা করতে পারে তুই নয় কেন? বিপাশাও আহামরি ফর্সা নয়”।

—–রতনের কথায় কালী যেন কোথায় আশার আলো একটু দেখতে পাচ্ছিল। অনেক অলিগলি পেরিয়ে তারা একটা বিশাল বাড়ির সামনে এলো। বলা ভালো অট্টালিকা। রতন, কালীকে বাইরে দাঁড় করিয়ে ভিতরে গেল।

——কিছুক্ষন পর কালীকে নিয়ে রতন ভিতরে গেল।ভিতরে ঢুকে কালীর চক্ষু চড়কগাছ। এলাহি ব্যাপার পুরো। দূরে নজর যেতেই দেখল, একটা বড়ো দোলনায় একজন অতি সুন্দরী মহিলা দোল খাচ্ছে আর পান চিবুচ্ছে। গোটা বাড়িতে পালোয়ান এর মতো অনেক লোকজন ঘোরাঘুরি করছে। এইসব দেখতে যখন কালী একেবারেই মগ্ন….

–“এই মেয়ে এদিকে আয়”।
—” কালো হলেও মুখশ্রী তো বেশ ভালোই তো তোর”।

—চামালীর কথায় কালীর হুঁশ ফিরল। সামনে গেল কালী।

—-রতন,কালীকে অতিসুন্দরী মহিলা চামেলীর হাতে তুলে দিয়ে বিদায় নিল।

—-চামালী বলল, “কালী তুই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। আমি পরে তোর সাথে কথা বলব”।

—–এখানে আসা ইস্তক কালী ভীষণ নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছে। তাকে যে স্বপ্ন দেখিয়ে রতন এখানে কালীকে এনেছিল। তার কিছু তো দূর ঘটা উল্টে রতন একদিন কালীকে জানিয়ে দিয়েছে যে সমর মানে কালীর বাবা কালীকে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। সেই টাকা নিয়ে তার দাদারা তাদের ভবিষ্যৎ গোচ্ছাতে ব্যস্ত। তারপর থেকে রতনকে আসতে দেখেনি সেরকম। আর আসলেও প্রতিবার একটা নূতন মেয়েকে নিয়ে আসতে দেখেছে। এটাই রতনের কাজ। কাজের টোপ দিয়ে মেয়েদের লালবাতির জগতে নামানো। আর চামেলি হল এখানে সব দন্ড মূর্তের কর্ত্রী। তার নির্দেশে কালীর ঘরে কত অজানা পুরুষ এসেছে। অনিচ্ছা সত্বেও তাকে ছুঁয়ে তাকে কালীমালিপ্ত করেছে। কোনো হিসাবের ইয়ত্বা নেই। এই হল কালীর স্বপ্নে দেখা “লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশান” এ মেশানো জীবন।

—— আজ অনেক গুলো বছর পেরিয়ে গেছে। কালীর নূতন নাম হয়েছে একটা। কলি। ফুলের কলি। এই নামটা সৌম্য এর দেওয়া। আজ কলি বা কালী অনেক যন্ত্রণা ভুলে একদম অন্যরকম একটা মানুষ। আগের থেকে আরও অনেক পরিনত। সব ভুলে সৌম্য কে আঁকড়ে সে আবার বাঁচার মন্ত্রে দিক্ষীত হয়েছে। তার নারকীয় জীবন সে আর ভুলেও কল্পনা করতে চায় না।

——সৌম্য সেদিন এসেছিল। লালবাতির এরিয়ায় থাকা চামেলীর অট্টালিকায় থাকা কালীর ঘরে। না! সৌম্য তাকে ছোঁয়নি সেদিন। কালী একটু অবাক হয়েছিল বৈকি। এরপর কালীর টানে সৌম্য এর যাতায়াত বাড়তে থাকে। কালী তাকে তার জীবনের সব কথা জানায়। কাছাকাছি আসতে থাকে সৌম্য আর কালী। এরপর থেকে সৌম্য একদম স্থায়ী করে নিয়েছিল কালীকে। শুধুমাত্র তার জন্য। সৌম্য ছাড়া কেউ কালীর ঘরে যেত না। কালক্রমে সৌম্য আর কালী ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সেই ভালোবাসার অধিকার থেকেই সৌম্য অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে চামেলীর কাছ থেকে কালীকে সেদিন উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

——- আজ আট-ই মার্চ। নারীদের জন্য নাকি স্পেশাল দিন। সেকথায় যাচ্ছি না। আজ সৌম্য এর কলি স্পটলাইটকে সঙ্গী করে বিখ্যাত ডিজাইনার সৌম্য সেন এর ডিজাইন করা সুন্দর ড্রেস পরে র‍্যাম্প ওয়াক করবে। এর থেকে ভালো নারীদিবস কি ই বা হতে পারে কালী ওরফে কলির জন্য। সৌম্য প্রমিস করেছিল কলিকে, “একটা স্পেশাল দিনে তোমাকে এমন সারপ্রাইজ দেবো। তুমি ভুলতেও পারবে না”।

——সৌম্য তার কথা রেখেছে। কলি ওরফে কালীকে এনেছে লাইম লাইটে। আজ তার জীবনের প্রথম র‍্যাম্প ওয়াকে সে সফল। জীবনের লড়াইয়ে ও সে সফল। সৌম্যর মতো মানুষকে সে আজ পাশে পেয়েছে। নারকীয় যন্ত্রণা ভুলে গেছে সৌম্যের অফুরান ভালোবাসায়। সৌম্যর কাছে সে কৃতজ্ঞ। রতনের দেখানো মিথ্যে স্বপ্ন আজ সত্যিই সত্যি হয়েছে। সৌম্য তার কারন অবশ্যই।

—– মিস কলি বর্তমান সিনেমা জগতের একটি বিখ্যাত নাম। একডাকে সবাই চেনে মিস কলি কে। সারাদিন “লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশান” এই গন্ডির মধ্যে জীবন যাপন তার এখন। রেডলাইটে থাকা একটি মেয়ে আজ এসে পৌঁছেছে লাইমলাইটে। এখন সে কেড়ে নিয়েছে সমস্ত স্পটলাইট, তার উপর।

—–সৌম্য আর কলি খুব শীঘ্রই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। গ্রাম থেকে শুধুমাত্র কলি ওরফে কালীর মা চম্পার আসার অপেক্ষা।

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।