Breaking News

দাহ – ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

দাহ
– ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

— গণেশ চন্দ্র পাইন। তাঁর তিন কন্যা সন্তান এবং স্ত্রী দূর্বা দেবী কে নিয়ে একটুকরো সংসার। ছেলের আশায় বুক বেঁধে ছিলেন পাইন দম্পতি। বোধহয় ভগবান তাঁদের দিকে মুখ তুলে চান নি। বছর ঘুরে চেষ্টা করেও পুত্র সন্তান লাভ হয়নি পাইন দম্পতির। শখ ছিল একটি পুত্র সন্তানের। পরপর তিনটি কন্যা সন্তানের পর কার্যত পাইন দম্পতি পুত্র লাভের আশা ত্যাগ করেন। যাই হোক। গ্রামের এক চিলতে কুঁড়ে ঘরে দম্পতি পরিবারের বাস। সেই অর্থে ধনী পরিবার নয়। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তাও বেঁচে থাকে পাইন পরিবার। বাঁচতে হয় বলেই বেঁচে থাকে।

— আমি আজ আপনাদের সামনে এই পাইন পরিবারের গল্প ফেঁদেছি।

— তিন বোন। বড় বোন অর্না। মেজ বোন পর্না। আর ছোট বোন ঝর্না। সবাই পিঠোপিঠি। সেরকম বয়সের ফারাক নেই। তাই তিনটি বোনের খুব ভাব।

–গরিব বাড়ির মেয়ে তিনজন। বাবা গণেশ বাবু আর মা দূর্বা দেবী গ্রামের ই লোকের জমিতে ভাগ চাষ করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন। নিজেদের সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। ওই এক চিলতে কুঁড়েঘর ছাড়া। তিনটি মেয়েকেই এক সাথে গ্রামের ই সরকারি স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করেন পাইন দম্পতি। কিছু না হোক, স্কুলে একবেলা মিড ডে মিল তো জুটবে ওদের।

— বছর গড়ায়। তিন জনেই বড়ো হয়ে ওঠে একসাথে। পড়াশোনা সেরকম চালাতে যথেষ্ট অক্ষম ছিলেন, পাইন দম্পতি। বড় মেয়ে অর্নার বয়স এখন বছর চোদ্দ। তাই তাঁরা ঠিক করেন এখনই মেয়ের বিয়ে দেবেন। যেমন করে পারেন। পুরো গ্রাম থেকে সাহায্য চেয়ে বিয়ে দেবেন। মেয়ে দিন দিন ডাগর হয়ে উঠছে। কেউ বলবে না বছর চোদ্দ এর মেয়ে। কথা মত গ্রামের ই এক ঘটকের দৌলতে একটি ছেলে জুটে যায়। সোনার কর্মকার। থাকে মুম্বাই তে। দেখাশোনা হয়ে গিয়ে বিয়ে হয়ে যায় বড় মেয়ে অর্নার। একটু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন পাইন দম্পতি। একটা “সমস্যা” তো ঘাড় থেকে নামল। গরিবের বাড়ি মেয়ে জন্মানো, সমস্যাই বৈকি।

— বড়ো জামাই এর দৌলতে পাইন পরিবারে একটু স্বচ্ছলতা ফেরে। এখন খাবার বা পরার জন্য চিন্তিত হন না পাইন দম্পতি। বড়ো মেয়ে অর্না, মায়ের কাছে এলেই মা’র হাতে টাকা দিয়ে যায়। বোনেদের জন্য জামা, বাবার জন্য জামা; মা’র জন্য শাড়ি নিয়ে আসে। এখন সবাই খুশি। বড়ো জামাই তাঁদের সবাই কে নিজের পরিবারের মত খেয়াল রাখে। বড়ো মেয়ে খুবই ভালো আছে। সময়ের চাকা ঘুরিয়ে বড়ো মেয়ের “মা” হবার খবর আসে।

–আরও কিছু সময় অতিক্রান্ত হয়। অনেকটা সময়। সেবছর হঠাৎই দম্পতি পরিবারে প্রথম ঝটকা টা লাগে। খবর আসে বড়ো মেয়ে অর্না আর নেই। জলে ডুবে মারা গেছে। মৃগী রুগী ছিল। পুকুরে স্নান করতে গিয়ে রোগটা শরীরে জাঁকিয়ে বসে। সামলাতে পারেনি। তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে অর্না। গণেশ বাবু- দূর্বা দেবী যান মেয়ের দাহ কার্যের হেতু। ইচ্ছে না থাকলেও যেতে হয়েছিল। শ্মশানে গিয়েছিলেন গণেশ বাবু, বড়ো মেয়ে অর্না কে দাহ করতে।

–বড়ো মেয়ে মারা যাবার পর বেশ কিছুদিন পাইন দম্পতি একদম শিথিল হয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন মুখে কিছু তুলতে পারেনি। তখন মেজ মেয়ে পর্না দায়িত্ব নিয়ে বাবা-মা কে সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনে।
-মেয়েটা যে মো’ল গো।
-এখন মোদের কি হবে?
কেঁদে ওঠেন দূর্বা দেবী।
–মেয়ে মরার শোক ভোলা কী এতো সহজ ! দশ মাস দশ দিন পেটে যাকে ধরলেন, তাকেই দাহ করে ফিরলেন।

— সময়ের জাঁতাকল পেরিয়ে আরও কয়েকটি বছর অতিক্রান্ত হল। পর্না আরও একটু বড়ো এখন। পড়াশোনা আর এগোয় নি তার। ছোট বোন এখনো ইতি টানেনি পড়াশোনার। অর্না মারা যাবার পর পর্না মা-বাবার সাথে সংসারের হাল ধরেছে। নিয়ম করে জমিতে যায়। মা-বাবা কে সাহায্য করে।

–পাইন দম্পতি আবারও ঠিক করেন এবার পর্নার বিয়ে দেবেন। সে এখন অষ্টাদশী। গ্রামের বুকে এটাই নাকি অনেক বয়স। বলা ভালো বিবাহযোগ্যা। আবারও সেই একই পন্থা।গ্রামের সবার সাহায্য আর গ্রামের ঘটকের সৌজন্যে পর্নার বিয়ে ঠিক হয়। এবারের পাত্রও পেশায় স্বর্ণকার। তবে এবার ঠিক হয় বিয়ের পর পর্না মা-বাবার কাছেই থাকবে। কারন কার্য সূত্রে পর্নার হবু স্বামী চেন্নাই নিবাসী। দিনক্ষন ঠিক করে একদিন শুভ মুহূর্তে চার হাত এক হয়ে যায়।

–পর্না এখন মা-বাবার কাছেই থাকে। তার স্বামীর ভালো রোজগার। সেখান থেকেই মা-বাবা কে সাহায্য করে। ছোট বোন ঝর্নার পড়াশোনা আর বন্ধ হয়নি। এখন আর তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা নয়। কিছুদিন হল পর্না নিজেদের কুঁড়েঘরকে বাড়ির রূপ দিয়েছে। ঘরে টিভি নিয়েছে। স্কুটি কিনেছে। স্বর্ণকারের বৌ বলে কথা। গা ভর্তি সোনার গয়না। পাইন দম্পতি ও খুশি।

— বছর পেরিয়ে পর্না এখন দুটি কন্যা সন্তান এর জননী। একটি আড়াই বছরের। আর একটি সাড়ে তিন বছরের। মামার বাড়িতেই তাদের বসবাস। সব দিব্যি চলছিল। পুরোনো ক্ষতচিহ্ন টা সবে ভরাট হচ্ছিল। পর্নার একদিন হঠাৎ রক্ত বমি হল। শরীর শীর্নকায় হতে থাকল। গ্রামের ডাক্তার কিছুই ধরতে পারলে না। শহরে নিয়ে আসা হল। সব কিছু পরীক্ষা করার পর জানা গেল ব্লাড ক্যান্সার। আবার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল পাইন পরিবারের।

–ট্রিটমেন্ট শুরু হল পর্নার। চলতে থাকল বছরের পর বছর ধরে। তার স্বামী কোন খামতি রাখেনি ট্রিটমেন্টের। লাখ লাখ টাকা জলের মত খরচ হতে লাগল। তাও ট্রিটমেন্ট বন্ধ হল না। সোনার মেয়ের সব সোনার গহনা বিক্রি হল টাকার জন্য। পি জি হসপিটাল থেকে ঠাকুরপুকুর। সেখান থেকে চেন্নাই। না! কোথাও কিছু হয়নি। একদিন পর্নার শীর্নকায় শরীর জবাব দিল। জানান দিল তার যুদ্ধ করার শক্তি শেষ। মারাত্মক মারণ রোগের কাছে সে হেরে গেছে। ভেঙে গেছে তার সব স্বপ্ন। তার ছোট বোনের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন, নিজের কন্যা সন্তানদের নিয়ে তিল তিল করে গড়ে ওঠা স্বপ্ন সব সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়েছে এই মারণ রোগ।

— মেজ মেয়ে পর্নার মৃত দেহের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছেন গণেশ বাবু। দূর্বা দেবী মূর্চ্ছা যাচ্ছেন বারবার।পাড়ার সবাই বলল, “আর দেরী করা যাবে না। বডি পচে যাবে এরপর। তোলো সবাই বডি কে”।

–আজ আবার একটা মেয়েকে দাহ করতে যেতে হবে শ্মশানে। বাবা হয়ে সন্তানকে দাহ করতে যাবেন আবারও।

— বলো হরি, হরি বোল…. ধ্বনি দিতে দিতে পাড়ার সবাই পর্নার মৃত শরীরটাকে খাটিয়া তে করে নিয়ে চলল শ্মশানের দিকে। বাবা হয়ে আবার একটা মেয়েকে দাহ করতে চললেন গণেশ পাইন।

— পর্নার আত্মা আজ ইহলোক ছেড়ে পরলোকের পথে যাত্রী। সদ্য দাহ করা মেয়ের শোক মা-বাবা কেউই ভুলতে পারেননি। পর্নার মা এখনও দুটি মেয়ের শোকে বিহ্বল। ভাবতেই পারছেন না কেউ যে পর্না আর নেই। পাইন পরিবারের মাথায় এবার যে আকাশ ভেঙে পড়েছে তা ভরাটের আশা আর নেই। সন্তান দাহ করার কষ্ট একমাত্র সেই বুঝবে যে তার সন্তান কে ছোট থেকে বড় হতে দেখে তার মৃতদেহ কাঁধে বহন করে শ্মশানে গেছে দাহ করতে। পাইন দম্পতির অবস্থা বর্ননা করা যায় না। পরপর দুটি মেয়ে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা পাইন দম্পতি সহ্য করতে পারেননি। দু’জনেই শোকে বিহ্বল। ছোট মেয়ে ঝর্না সব বুঝতে পারছে, দিদি আর নেই। কিন্তু তার সে ক্ষমতা নেই পর্নার মত, মা-বাবা কে সামলে সংসার সামলানোর।

— পর্নার মৃত্যুর সাথে সাথে তার ছোট্ট মেয়েটিকে তার একমাত্র পিসি নিয়ে গিয়েছে তাঁর কাছে। আর বড়ো মেয়েটি আপাতত তার বাবার কাছেই। সন্তানদ্বয় বুঝতে পারছে না তারা কী হারিয়েছে। তাদের বোধশক্তি নেই সেরকম। মায়ের আঁচল ছাড়া তারা কিভাবে থাকবে একমাত্র ভগবান ই জানেন।

— মা হারা সন্তান আর সন্তান হারা মা-বাবা এখন কী যন্ত্রনাদায়ক অবস্থায় থাকতে পারে ও পারেন সেই নিদারুন যন্ত্রনার প্রতিচ্ছবি আপনারা নিশ্চয়ই কল্পনা করতে পারছেন।

–পাইন দম্পতির ঘাড়ে এখন দুই মেয়েকে দাহ করার অসহ্য যন্ত্রণা ভীষণরকম ভাবে চেপে বসেছে। তাদের মেয়ের শেষ চিহ্ন স্বরূপ পর্নার সন্তানদ্বয়কে কাছে রাখার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা ভগবান কেড়ে নিয়েছে তাদের থেকে। দুই মেয়েকে দাহ করার অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে পাইন দম্পতি আজও বেঁচে আছে। তাদের অসহনীয় যন্ত্রণার একমাত্র সাক্ষী তাদের ছোট মেয়ে ঝর্না।

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।