Breaking News

অন্তরা কলমে – রাজদীপ দাস

অন্তরা
কলমে – রাজদীপ দাস

ভোর সাড়ে ৫টা নাগাদ আলসেমি ঝেড়ে নিদ্রা ত্যাগ করে তড়িঘড়ি তৈরি হতে লাগলাম… কারণ সকালের ট্রেনে নন্দাইগাজন যাত্রার কথা…
তাই কাধে চিত্রগ্রহণের যন্ত্রখানি নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম হাওড়া জংশনের উদ্দেশ্যে…..
শীতের ভোরে কুয়াশা ভেদ করে বাস ধরলাম…. শীতের আমেজে বাসটা বেশ জনশূণ্য বললেই চলে…. জানালার সিটে বসে চললাম হাওড়া….
স্টেশনে যখন পৌঁছোলাম একটু ভোরের আলো ফুটেছে…. অসংরক্ষরিত টিকিট কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করে ছুটলাম ১৪নং প্ল্যাটফর্মে…..
ট্রেনে উঠে রওনা গন্তব্যের উদ্দেশ্যে….

বেশ ঘন্টাখানেক পর নামলাম ট্রেন থেকে…. স্টেশনের পাশের দোকান থেকে একটা সিগারেট ধরিয়ে হেঁটে চললাম একটু ভিতরের দিকে….
গ্রাম্য সৌন্দর্য্য বেশ মন কাড়লো…. ব্যাগ থেকে বের করলাম আমার যন্ত্রখানি…
কিছু প্রাকৃতিক দৃশ্য ফ্রেমবন্দী করলাম…..
বেশ বেলা গড়ালো এই করতে করতে….
খানিক পর একজনকে নজরে এলো… এক শীর্ণকায় নারী … মুখটা কেমন যেন চেনা চেনা ঠেকলো.. কিন্তু সাহস হলো না এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করবার… অথচ সে আমাকে বারবার দেখছে…
কাজ সেরে আমাকে ঈশারা করলো আর তার পিছু নিয়ে হাঁটতে থাকলাম…. বেশ অনেক ক্রোশ হাঁটার পর একটা বৃক্ষের ছায়ায় স্থির হয়ে দাঁড়ালাম….
আমাকে পাশের কুঁড়ে ঘর থেকে এক ঘটি জল এনে আমার তৃষ্ণা নিবারন করলো.. তারপর শুরু করলো কথা….
বললো,
‘ আমাকে চিনতে পাইরছেন দাদা ?’

আমি : না, মানে !! চেনা তো লাগছে… কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছি না…

সে : আরে, আপনাদের কলকেতা শহরের ‘সবলা মেলা’তে আপনি আমার ছবি তুইলেছিলেন….. তারপর একখান ঝুড়ি কিইনেসিলেন…..

আমি : হ্যাঁ !!! হ্যাঁ !!!! মনে পড়েছে… তুমি সেই অন্তরা বিবি…..

সে : হ্যাঁ দাদা….

আমি : তা বলো কেমন আছো ? কাছ কেমন চলছে ???

সে : মোটের উপর ঠিকঠাক…. সবই তো বোঝেন দাদা….

আমি : হম্ ….

সে : এই গেরামের মাঠে কাজ কইরে যা পাই, কোনো রকমে সংসার চলে… সোয়ামীটা অসুখ বাঁইনধে পইড়ে আসে…. একার উপর কি যে করি দাদা…..

আমি : এক কাজ করো, আমার নম্বরটা নিয়ে রাখো, আমি চেষ্টা করছি যদি কিছু করা যায়….
তুমি যা যা নিজের হাতে বানাও তার একটা তালিকা আমাকে দাও, আমি সেগুলোর ছবি তুলে আমার নিজের Website -এ দেবো….. আর তোমার স্বামীর চিকিৎসা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না, তুমি কালই কলকাতা আসো, সেখানে আমার পরিচিত চিকিৎসক আছেন….. আর হ্যাঁ !!! আমাকে অবশ্যই ফোন করে আসবে, আসার আগে….. আজ আমি উঠি..

সে : সাবধানে যাবেন দাদা…..

আমি : হ্যাঁ, চিন্তা করো না…..

বেশ আবেগতাড়িত হয়ে পড়লাম সব শুনে…. বাড়ী ফিরেই ভাবতে বসলাম কি করা যায়….
ভদ্রমহিলার অবস্থা যা শুনলাম, তাতে তার জন্য কিছু একটা করা উচিত… এই বিকাশ বসু থাকতে একজন এভাবে অসহায়তায় ভুগবে তা হতে পারে না…
তাই কথামতো কাজ শুরু করলাম, পরদিন সকালে তার স্বামীর চিকিৎসা করার ব্যবস্থা করে দিলাম… তারপর তার ব্যবসার উন্নতির জন্য হাতে তৈরি সব জিনিস বিক্রির ব্যবস্থা করে তাকে একটা রোজগারের পথ খুঁজে দিলাম….

আজ অন্তরা আর জমিতে কাজ করে না… হস্তশিল্পের মাধ্যমে বেশ পরিচিতি লাভ করেছে সে…. তার স্বামী ইকবাল ঘরে বসে তাকে কাজে সাহায্য করে….. ব্যবসা করে পাকা বাড়ীও করেছে…..

৬ মাস পর যখন ওদের গ্রামে গেলাম, দেখলাম কত বদলে গেছে ওদের জীবনযাত্রা, তবে বদলায়নি মন… আমাকে দেখে ছুঁটে এলো, আতিথেয়তায় ভরিয়ে দিলো….
সত্যিই এমনও মানুষ আছেন যারা বেইমানি শব্দটাকে তাদের জীবনের অভিধানে স্থান দেন না….
আজীবন স্মৃতিতে অমর থাকবে অন্তরা বিবির আন্তরিকতা…..

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।