Breaking News

ঈর্ষা কলমে – মল্লিকা গুহ ঠাকুরতা

ঈর্ষা
কলমে – মল্লিকা গুহ ঠাকুরতা

তিন বছরের মেয়েকে নিয়ে একটি ফ্ল্যাটে একাই থাকে সুমনা | একটি মন্টেসরি স্কুলে ভর্তি করেছে তার মেয়েকে| মেয়েকে স্কুলে দিয়ে আসা – নিয়ে আসার সময় সে দেখে ওই স্কুলের অন্যান্য বাচ্চাদের মায়েরা একসাথে দল বেঁধে গল্প করে | হাসি – ঠাট্টায় মেতে ওঠে নিজেদের মধ্যে | এমনকি তারা পরস্পর পরস্পরকে তুই বলে সম্বোধন করে | সুমনা একটু তফাৎ এ থেকেই তাদের দেখে | তার নজরে এলো এদের মধ্যে একজন মা স্কুল এর ঠিক উল্টো দিকের একটি বাড়ি থেকে তার ছোট্ট ছেলেকে স্কুল এ নিয়ে আসে | ছোট্ট ছেলেটি দেখতে খুবই আকর্ষণীয় | খুব হাসিখুশি আর ছটফটে|  বাচ্চাটিকে খুব ভালো লাগে সুমনার | বাচ্চাটির মতোই তার মা ও খুব হাসিখুশি আর মিশুকে | এমন মজা করে কথা বলে যে শুনে সবাই হাসতে  হাসতে  কুটিপাটি হয় | তার কথা গুলো যখন সুমনার কানে আসে,তফাতে থেকেও হাসি  ছড়িয়ে পরে তার মুখে | সুমনা জানতে পারে তার নাম অপু | ধীরে ধীরে সুমনাও পা বাড়ায় অপুর দিকে,যোগ দেয় হাসিতে,তারও বলতে ইচ্ছে করে অনেক মজার কথা | একদিন গল্পগুজব শেষে সব মায়েরা যখন ফিরে যাচ্ছে,সেইসময় সুমনা আরেকটু বেশি আলাপ জমায় অপুর সাথে | মোবাইল নম্বর ও আদান – প্রদান হয় নিজেদের মধ্যে | প্রায়ই সুমনা ফোন করে অপুকে | বন্ধুত্ত্ব বেড়ে ওঠে তাদের মধ্যে | একদিন ছেলেকে নিয়ে স্কুল এ আসে না অপু | সেইদিন অপুর খোঁজ নিতে তার বাড়িতে যায় সুমনা | অপুর সাজানো ঘর দেখে চোখ জুড়িয়ে যায় তার | জানতে পারে অপু’রা এখানে ভাড়া থাকে | কিছুদিন এর মধ্যেই তারা চলে যাবে তাদের নতুন বাড়িতে | ফোনেই সুমনা অপুকে জানায় – তার স্বামীর অত্যাচার ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেই স্বামীর সাথে তার বিচ্ছেদ এর সিদ্ধান্ত নেবার কথা|সব শুনে তাকে ভরসা দিয়েছে অপু | বলেছে – আমি তোর পাশে আছি , যখনই দরকার মনে হবে আমাকে জানাতে সংকোচ করবিনা কখনো |

সুমনা অপুর বাড়ি চিনলেও,অপু কিন্তু চেনেনা সুমনার বাড়ি | একসময় অপুরা তাদের পুরোনো বাড়ি পরিবর্তন করে চলে যায় নতুন বাড়িতে | তারা যে নতুন বাড়িতে যাবে সেকথা জানতো সুমনা | একদিন রান্না করতে করতে তার কানে ভেসে আসে খুব পরিচিত গলার স্বর | রান্নাঘরের জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির একটি ফ্ল্যাট এর বারান্দায় চোখ পড়তেই আনন্দে ফোন করে অপুকে | অপু ফোন ধরতেই তাকে বারান্দায় আসতে বলে | অপু বারান্দায় বেরিয়ে এলে,সে হাত নাড়ায় তার রান্নাঘরের জানালা থেকে | দুজনে দুজনকে দেখতে পায় | খুব আনন্দ হচ্ছে তাদের | এখন থেকে দুই বান্ধবী একে অপরের প্রতিবেশী | অপু,সুমনা কে বলেছিলো এখন থেকে তারা তাদের ছেলে – মেয়েদের নিয়ে একসাথেই স্কুল এ যাতায়াত করবে , কিন্তু নানান কাজে সঠিক সময় কখনোই দিতে পারে না সুমনা , তাই স্কুল এই দেখা হবে | অপু যে এখন সুমনার প্রতিবেশী সেই খবরটা আগেই স্কুল এর অন্য বান্ধবীদের আনন্দের সাথেই জানিয়ে দিয়েছিলো সুমনা|সেই খবরটা তাদের কাছ থেকেই জানলো অপু |
ইদানিং অপু তার ছেলেকে আর স্কুল এ নিয়ে আসে না | অপুর স্বামীই ছেলেকে স্কুল এ দিতে আসে,অপু নিতে আসে | খুব রাগ হয় সুমনার, বাবাঃ কী এমন ঘরের কাজ থাকে অপুর যে ছেলেকে স্কুল এও নিয়ে আসতে পারে না সে! আরো বেশি রাগ হয় যখন নিজের মেয়েকে স্কুল এ নিয়ে যাবার জন্যে তৈরী হতে হতে সে তার ঘর থেকে শুনতে পায় – ফোনে অপু তার স্বামীকে বলছে ছেলেকে স্কুল এ দিয়ে আসার সময় কি কি নিয়ে আসতে হবে | মাথাটা গরম হয়ে যায় সুমনার | সে তো তার সব কাজ একাই করে আর অপু কেমন ফোনে তার স্বামীকে আদেশ করে | সুমনা দেখেছে অপু বাড়িতে না থাকলেও তার স্বামী দিব্যি কাঁচা জামাকাপড় মেলে দেয় বারান্দায় | বাপরে! অপুর কতো কাজ করে দেয় তার স্বামী |অপুর স্বামী যে ঘরের কতো কাজ করে সেই খবরটা স্কুলের অন্যান্য মা এ দেরও তো জানা উচিৎ | তাই সকালে যখন ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে চলে যায় অপুর স্বামী , তখন দায়িত্ব নিয়ে সুমনা সবাইকে জানায় যে অপু কিভাবে তার স্বামীকে খাটায় |

প্রতিদিন কতো রাত করে অফিস থেকে বাড়িতে ফেরে অপুর স্বামী | তবুও ছুটির দিনে স্বামীর সাথে ছেলেকে নিয়ে কোথাও না কোথাও যেতেই হবে অপুকে| সুমনা জানে, অপু মাঝে মাঝেই ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়িতে যায় | সেইসময় সারাদিন অফিস করার পর-ও কত রাতে ছেলে,বৌকে নিয়ে বাড়ি ফেরে অপুর স্বামী | সুমনা মনে মনে ভাবে – ‘ কেন রে অপু?ছেলেকে নিয়ে একা একা বাপের বাড়ি যেতে পারিস, আর ফেরার সময় সাথে বর না হলে চলে না তোর,না ? যত্তসব ন্যাকামী!
একদিন ঠিক বাচ্চাদের স্কুল ছুটির সময় ঝিরঝিরে  বৃষ্টি শুরু হয় | ছাতা মাথায় দিয়ে বাচ্চাদের ছুটির অপেক্ষা করছিলো তাদের মায়েরা | ছুটির সময় অপুর ছেলের ঠিক আগেই স্কুল থেকে বেরোলো সুমনার মেয়ে | ঠিক তক্ষুনি একটা ফাঁকা রিক্সা পেয়ে,মেয়েকে নিয়ে বাড়ি চলে এলো সুমনা| পরে অপুকে ফোন কোরে হাসতে  হাসতে  বললো – ‘ কিরে কেমন চমক দিলাম ? নিশ্চই খুজঁছিলি আমাকে |’
প্রতিদিনের মতো আজও অপুর স্বামী তার ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিয়েছে | ছুটির সময় মেয়েকে আনতে যাবে বলে তৈরি হচ্ছিলো সুমনা |হঠাৎ তার মোবাইল টা বেজে উঠতেই বড্ড বিরক্ত হোলো সে – এইসময়ে আবার কে ফোন করলো ? মোবাইল টা হাতে নিয়ে দেখলো,অপু ফোন করেছে | ফোন ধরে বললো – হ্যা বল | ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে ধরা গলায় অপু জানালো তার শরীরটা খুব খারাপ, অনুরোধ এর স্বরে জানতে চাইলো সুমনা আজ তার মেয়ের সাথে অপুর ছেলেকেও স্কুল থেকে নিয়ে আসতে পারবে কিনা ? প্রথমে বিরক্ত হোলো সুমনা | তারপরেই মনে  হলো এইতো অপুকে একটু শায়েস্তা করার একটা সুযোগ পাওয়া গেছে | ধীর স্বরে বললো এখনো তো সময় আছে ,আস্তে আস্তে তৈরি হয়ে চলে যা না | একটু যদি দেরি হয়ে যায় কিছু হবে না তাতে | সুমনা স্কুল এ পৌঁছে দেখলো অপু তার আগেই স্কুল এ পৌঁছে গেছে | এই অবস্থাতেও অপু ছেলেকে নিতে এসেছে দেখে অন্য মায়েদের কতো আহা – উঁহু | অপু ছেলেকে নিয়ে চলে যাবার সময় সুমনা তার সাথে কথা বলতে এগিয়ে গেলো, কিন্তু অপু বললো, ‘ শরীরটা আজ ঠিক নেই পরে কথা হবে ‘ বাড়ি ফিরে সুমনার মনে হলো আজ স্কুলে অপুকে নিয়ে যা আদিখ্যেতা দেখলাম তার উপরে অপু যদি তার কথা সবাইকে বলে থাকে তবে তো না জানি অন্যরা তার সম্পর্কে কি ভাববে ? তাই আর একটুও সময় নষ্ট না করে তার কাছে যতজনের ফোন নম্বর ছিল একে একে সবাইকে ফোন করে জানালো আজকে ঘটে যাওয়া মজার কথা মানে অপুর মামাবাড়ির আব্দারের কথা| সাথে একথাও বললো যে এতোই যদি অসুস্থ থাকে তবে কি দরকার ছিলো ছেলেকে স্কুলে পাঠাবার |কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো একদিন ছেলেকে স্কুলে না পাঠালে ? তার উপরে অপুর ছেলে যা দস্যি, তাকে স্কুল থেকে নিয়ে আসা অন্তত তার পক্ষে সম্ভব ছিলো না মোটেই | স্কুল থেকে আনতে যখন বললো, তখন তো অন্তত বলতে পারতো তুই দুটো বাচ্চা কে রিক্সা করে নিয়ে আয়,ভাড়া আমি দিয়ে দেবো ইত্যাদি ইত্যাদি… | কথাগুলো জানাতে পেরে এখন অনেকটাই শান্তি বোধ হচ্ছে তার | স্কুল থেকে ফিরে খুব ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিলো তার মেয়ের,মাকে অনেকবার সেকথা বলেছেও সে | এবার শান্তি মনে  মেয়েকে খেতে দিলো সে |

কয়েকদিন পরেই সুমনার মেয়ের জন্মদিন, কিন্তু কাল থেকে কয়েকটা দিন স্কুলে পড়াশুনা বন্ধ| কাছেই একটা মাঠে বাচ্চাদের স্পোর্টস এর জন্যে তৈরি করতে ব্যাস্ত থাকবেন শিক্ষিকারা | তাই আজই মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষ্যে বাচ্চাদের উপহার দেবার ব্যবস্থা করেছে সুমনা | স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে মনে মনে  ভাবলো, এর আগে স্কুলে যখনি কোনো বাচ্চার জন্মদিন পালিত হয়েছে ঠিক তার পরেরদিনই নিজের ছেলের হাত দিয়ে সেই বাচ্চাটিকে কোনো না কোনো উপহার দিয়েছে অপু | তার মেয়েকে নিশ্চই কোনো উপহার অপু দেবে না | আরে বাবা বড়োদের মধ্যে যাই হোক না কেনো এতে বাচ্চার কি দোষ ? তার ভাবনায় বিরতি পড়লো যখন সে শুনতে পেলো অপু তার নাম ধরে ডাকছে,ঠিক শুনছে তো সে! হ্যা, ঠিকই শুনছে | অপু তার নাম ধরেই ডাকছে | রান্নাঘরের জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে উত্তর দিলো সে | অপু জানতে চাইলো কবে তার মেয়ের জন্মদিন ? সে জানালো, সাথে আজ কেন জন্মদিনের উপহার বিতরণ করেছে সেকথাটাও জানিয়ে দিলো | প্রথমে একটু হকচকিয়ে গিয়েছিলো ,পরে ভাবলো অপু যদি সবার সামনে তার মেয়েকে কোনো উপহার দেয় তবে কেমন হবে ব্যাপারটা |তাড়াতাড়ি মোবাইল থেকে ফোন করে স্কুল এর কয়েকজন মা বান্ধবীদের জানিয়ে দিলো তার মেয়ের জন্মদিন কবে,এই ব্যাপারে অপুর কতটা কৌতুহল| সব ব্যাপারে অপুর এতো বাড়াবাড়ির কথা সবাইকে জানাতে পেরে স্বস্তি পেলো সে |
পরের দিন থেকে শুরু হোলো বাচ্চাদের স্পোর্টস এর অনুশীলন | একে একে মায়েরা যে যার বাচ্চাকে নিয়ে পৌঁছচ্ছে মাঠে | অপু তার ছেলেকে নিয়ে আসতেই সুমনা কয়েকজন বান্ধবীর সাথে কিছুটা তফাতে গিয়ে জমিয়ে শুরু করলো গল্প | সাথে সাথেই সে নজর রাখছে অপুর ওপর | অনুশীলন শুরু হওয়ার আগে পর্যন্ত অপু তার ছেলেকে নিয়েই ব্যাস্ত আর শুরু হতেই কয়েকজন বান্ধবীর ডাকে মাঠের একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলো | মনে  মনে  যেন অপুর জন্যেই অপেক্ষা করছিলো সুমনা | অপু কিন্তু এল না, এদিকে ক্রমশ অন্য বান্ধবীরাও একে একে তাকে ছেড়ে যোগ দিচ্ছে অপুর পাশে | অনুশীলনের দিন গুলি পেরিয়ে স্পোর্টস এর দিন টাও কেটে গেলো | স্কুলে আবার শুরু হোলো পড়াশুনো |

সেই মাসটা ছিলো স্কুলের কয়েকজন বাচ্চার ওই স্কুল-এ শেষ মাস | তারা এবার মন্টেসরি স্কুল ছেড়ে ভর্তি হচ্ছে নতুন স্কুলে | সুমনা জানতে পারলো সেই দলে অপুর ছেলেও আছে | বাচ্চাগুলোর ওই স্কুলের শেষ দিন কাটলো ভালোভাবেই | তারা সবাই উপহার বিতরণ করলো স্কুলের বাকি বাচ্চাদের,কিন্তু কয়েকজন মা নিজেদের মধ্যেই শুরু করে দিলো চোখের জল ফেলা| অবশ্যই সেই দলে অপুও আছে | এসব দেখলে পিত্তি জ্বলে সুমনার |
কদিন হলো এই পাড়ায় এসেছে , এর মধ্যেই পাড়ার লোকজনের সাথে কেমন ভাব জমিয়ে ফেলেছে অপু’রা | ঘর থেকেই সুমনা শুনতে পায় ছেলের সাথে বারান্দায় দাঁড়িয়ে অন্য ফ্ল্যাটের লোকজনদের সাথে অপু কেমন গল্প করছে জোরে জোরে | স্বামীর সাথে যখন ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে যায় তখন অন্যদের সাথে এতো হাসাহাসির  কী আছে ? পাড়ার ছোটোখাটো অনুষ্ঠানে অপুর ছেলে যেন মধ্যমনি | এখনো অনেক রাত পর্যন্ত কান পাতলেই শুনতে পায় অপুদের ফ্ল্যাট থেকে ভেসে আসা মৃদু হাসির  শব্দ, আর মনে মনে  ভাবে স্কুলের মতোই কবে এই পাড়া ছেড়ে যাবে অপুরা ?

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।