Breaking News

মাতৃত্ব – অন্তরা রায়

মাতৃত্ব
– অন্তরা রায়

অতসীর বিয়ে হয়েছে বছর চারেক হলো | গুবলুর বয়েস প্রায় আড়াই | অতসী স্বপনের লাভের বিয়ে কিন্তু বর্তমানে পুরোটাই লোকসানে চলছে | স্বপনের পুরোপুরি হাতের বাইরে ও | বিয়ের পরেই স্বপন টের পেয়েছিলো এ বউ কন্ট্রোল করা ওর কম্মো নয় | ফলত গালাগাল মারামারির ওপরেই সম্পর্কটা যতটুকু টিকে থাকা আর কি |

অতসীর মুখের ঠেলায় শ্বশুর শাশুড়ি আলাদা হয়ে গেছে ও এবাড়িতে আসার পরপরই | অতসীর নাইটি থাকে হাঁটুর ওপর , ভুঁড়ির ওপর গিট্টু বাধা | দুটো ছমছমে নুপুরপরা লোমশ পা ভীষণভাবে কুচ পরোয়া নেহি | রাস্তার কলের জলের লাইন বা পাশের বাড়ির বৌদির রান্নার খবর নিতে যাওয়ায় পোশাক ও পোশাকের স্টাইলের কোনোরূপ পরিবর্তন হয়না |
অতসীর আর এক সাংঘাতিক গুন্ | সারাক্ষন হ্যা হ্যা | ওটা ঠিক হ্যা হ্যা নয় | ওর স্বাভাবিক গলার স্বরে সারা পাড়া চমকানোর ক্ষমতা রাখে একাই | কাছে গেলে তিরঙ্গার গন্ধে গা গুলিয়ে ওঠে | ওই লালকালো দাঁত বের করে যখন আলটাগরা বের করে হাসে তখন যে কোনো অর্ধ অসুস্থ মানুষ নিশ্চিন্তে দুম করে সগ্গ গমন ঘটা অনিশ্চিত নাও হতে পারে |

এই অতসীর একটা ছেলে হলো , গুবলু | গুবলু হওয়াতে অতসীর সাংঘাতিক বিপদ | আগে তবু পেটের ভেতর নিয়ে এদিকওদিক চরে বেড়ানোতে অসুবিধে হচ্ছিলো না কিন্তু এখন ? ওটাকে রেখে বেরোনো সমস্যা আবার নিয়ে বেরোনো আর এক ঝামেলা | শ্বশুর শাশুড়ির সাথে একটু মাখোমাখো হওয়ার চেষ্টা যে করেনি তেমনটা নয় | কিন্তু পাত্তা পায়নি তেমন একটা | অতএব ছোট্টো গুবলুকে একা ঘরে তালা দিয়ে রেখে অতসী বেরিয়ে যেত এদিক ওদিক | দোকান লন্ড্রি থেকে এখন শপিং মল সিনেমায় এসে দাঁড়িয়েছে | এর কিছুই টের পায়না স্বপন | রাতে ফিরে টকঝাল খাবার পেয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম দেয় লোকটা | অতসী নো কম্প্রোমাইজ | বিয়ে বাচ্চার পরেও ওর কোনোরূপ পরিবর্তন হয়নি |

অতসীর বড়ো জা অপর্ণা | এই অপর্ণার কোনো ছেলেপুলে হলোনা | শ্বশুর শাশুড়ি বাঁজা বৌয়ের মুখ দেখা বন্ধ করেছেন অনেককাল আগেই | সবজায়গায় প্রবেশ ওর জন্য নেই | অপয়া মুখ , পেটের খোলটাতেই পচন | এধরণের নিত্য বাক্য ওর প্রতিদিনকার | মুখটা অপয়ার হলেও ওকে দিয়েই সবটা করানো হয় | মুখ ঝামটা খায় তবুও মুখ বুজেই থাকে |
গোপালকে অনেকবারই অপর্ণা বলেছিলো একটা ডাক্তার দেখানোর জন্য | পাত্তা পায়নি | পরিষ্কার গোপালের বক্তব্য ..

— মা তো বলেইছে বাচ্চা বিয়োনো তোমার দ্বারা হবে না | ফালতু ডাক্তারের পিছনে পয়সা দিয়ে লাভ কি | আর তুমি তো এবাড়ি থেকে যাবেও না | আমারই বুকের ওপর বসে আমারই দাড়ি ওপড়াবে | আজব এক মাল মাইরি জুটেছে আমার কপাল গুনে |

অপর্ণা ঠাকুরবাড়ি , শিকরবাকর , তাবিজ কবজ এই সব আজগুবি বিশেষণেই নিজেকে জড়িয়ে নিয়ে বাঁচছিলো |
ওদিকে দিনদিন একলা হচ্ছিলো ছোট্ট গুবলু | অপর্ণা দেখছিলো মুড়ি বিস্কুটের বাটিটা উল্টে কিভাবে তারস্বরে কাঁদে ছেলেটা | জানলায় উঁকি দেয় অপর্ণা | কথা বলে গুবলুর সাথে ঘণ্টার পর ঘন্টা | মায়া লাগতো বড়ো ওর | কিভাবে মা তার সন্তানকে ছেড়ে এভাবে আমোদ আল্লাদ করতে পারে |

নিজে থেকেই একদিন সাহস করে কথা বললো অতসীর সাথে |

— তোমার যদি আপত্তি না থাকে তাহলে তুমি না থাকলে গুবলুকে আমার কাছে রেখে যাবে ? আমি ওকে দেখে রাখবো !

মিটি মিটি হাসে অতসী |এ যে মেঘ না চাইতেই জল |

— সে তো ভালোই তবে | থাকুক তোমার কাছে |

দিনদিন নিশ্চিন্ত হতে থাকে অতসী ওদিকে নীরবে মা হয়ে উঠতে থাকে অপর্ণা | স্কুলে ভর্তি হলো গুবলু | অপর্ণা ভোরে উঠে রান্না সেরে ছেলেকে খাইয়ে স্কুলে দিয়ে আসে | স্কুল থেকে ওরা মা ছেলে ফেরে কোনোদিন গেরুয়া কোনোদিন সবুজ জিব নিয়ে আইসক্রিম চাটতে চাটতে |গুবলু মা বলেই ডাকে জ্যেঠিমাকে |
গুবলু আসার পর থেকে সন্তানের মঙ্গলের জন্য সব উপোষ থাপোস করে ওর এই মা |

…….. আজকাল গুবলু খুব বকে অপর্ণা কে | সরকারি এক অফিসের বড়ো বাবু এখন সে | শাসন বেড়েছে ছেলের |
— বয়েস বাড়ছে মা , বন্ধ করো এখন এসব | রাজ্যের উপোষ মেনে শরীরটা খারাপ হচ্ছে | তোমার কিছু হলে আমার কি হবে ভেবেছো ?

চোখে জল আসে অপর্ণার | এর পরেও কেউ বলবে গুবলু ওর নিজের সন্তান নয় | নিজের ভাবনার শব্দগুলোকে কৌটো বন্দি করে ফেলে চুপটি করে | অফিস থেকে ফিরে মায়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে থাকে অনেক্ষন | অপর্ণা আজ খুব সুখী | ঈশ্বর বোধহয় কাউকেই কাঙাল হতে দেননা |

ওদিকে অতসীরও বয়েস বেড়েছে | হাঁটুর ব্যাথায় আজকাল ঘর থেকে খুব একটা বেড়োতে পারে না | সারাদিন বিছানায় পরেই থাকে | গুবলু অফিস ফেরত একবার দেখা করে যায় | মাসে মাসে টাকার এক অংশ মার হাতে তুলেও দেয় | ডাক্তার ওষুধ সবটাই করে তবু যা নেই তা পুরো জুড়েই নেই |
মা বলতে জানে অপর্ণাকেই | দুহাত দিয়ে আগলে রাখে অপর্ণাকে ওর আদুরে ছেলে গুবলু | মাতৃত্বের স্বাদ পেয়েছে অপর্ণা যা থেকে আজ বঞ্চিত গুবলুর একনাড়ির সম্পর্কও |

জন্ম দিলেই শুধু মাতৃত্ব লাভ হয় এমনটা নয় | মাতৃত্ব হলো ভেতর ঘরের সে এক কোমল স্পর্শ ||

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

2 comments

  1. খুব সুন্দর লেখা…শুভেচ্ছা ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।