Breaking News

প্রতিস্থাপন – মন্দিরা পাল

প্রতিস্থাপন
– মন্দিরা পাল

চোখটা লেগে গেছিলো | আচমকা মাছ ভাজার গন্ধে গা টা গুলিয়ে উঠল | অথচ একটা সময় এই গন্ধটাই আমার কত প্রিয় ছিল | যাক সে কথা, যেটা বলবার ছিলো, আর ঠিক আটটা মাস,আাগামী ফাল্গুনেই মিঠির বিয়ে | ভাবতেই অবাক লাগে| আমার সেই রান্নাবাটি খেলা মিঠি | ভরদুপুরে লুকিয়ে আচার খাওয়া মিঠি | দেখতে দেখতে সত্যি কত বড় হয়ে উঠল | মিঠি আমার ছোট বোন কম,মেয়ে বেশী | সেই যে মা মারা গেল দশ বছর আগে,সেই থেকে আমিই ওকে মানুষ করেছি | তখন আমারই বা কত বয়স,স্কুলে পড়ি | অপটু হাতে রান্নাঘর সামলাতে হল | সময় বয়ে গেলো,কলেজে উঠলাম | digitalization এর স্রোতে বাবার ফোটো স্টুডিও এর ব্যবসাটা লাটে উঠল | বাড়ির computer টা নিয়ে studio টে বসলাম | বাবার studio হয়ে উঠল আমার cyber cafe | প্রথম প্রথম half college করে cafe তে বসতাম | তারপর সপ্তাহে দুদিনের বেশী college যেতে পারতাম না| সংসারের খরচ আর customer এর সংখ্যা দুইই বাড়তে লাগল | বাবার একটা mild attack হলো| computer চালাতে না পারলেও যেটুকু সময় দোকানে বসত সেটাও বন্ধ হয়ে গেলো | আর যা হওয়ার,second year এ fail করলাম | বাকি পড়াশুনোটা কোনোভাবে distance এ শেষ করলাম | এখন আামাদের cafe এর সম্পূর্ণ দায়িত্ব বিতানের | বাবা সেটা ওর নামেই করে দিয়েছে | বিতানকে আমার বোন মিঠির হবু স্বামী বললেই বেশী ভালো হয় | ওদের সম্পর্কের কথাটা শুরুতে মিঠি আমাকে বলেনি | এখন আমি সবটাই জানি | আমাদের দুইবোনের একটাই ঘর | এখন রাতে আমার পাশে শুয়েই বিতানের সাথে কথা বলে | তিতিরের তাতে বিশেষ অসুবিধা হয়না | তিতির আমার এক বছরের মেয়ে | বড্ড ঘুমকাতুরে | এই দেখো আমার পায়ের কাছে কিভাবে ঘুমোচ্ছে | শোয়ার ঢং বড় অদ্ভুত | দিল্লীতে শোয়ালে বোম্বেতে গিয়ে উঠবে | সেই salt lake এর বাড়িতে আমরা তিনজন যখন একসাথে ঘুমোতাম তখন তিতিরের একটা পা আামার বুকে থাকত আর মাথাটা বিতানের বুকে | আমার cafeতেই বিতানের সাথে আমার আলাপ | চাকরির form fillup করতে আসত| অবশেষে ভালোবাসা আর আমার সাথে বিয়ে | বিতান চাকরী জোটাতে পারেনি | অবশেষে আমাদের cafe টা ওর নামে করে দেওয়া হয় | অন্য কোনো ব্যবসা শুরু করার মত অর্থবল ওর ছিলোনা | দুমাস হলো আমার blood cancer ধরা পড়েছে |last stage , doctor বলেছে বড়জোড় আর ছমাস | এখন বাপের বাড়িতে আছি | বিতানের আসা যাওয়া ছিল | সেদিন আমাকে দেখতে পিসিরা এল | মাঝরাতে দেখি বসার ঘরে আলো জ্বলছে | মিঠি পাশে নেই | ভাবলাম কেউ হয়তো আলো নেভাতে ভুলে গেছে | গিয়ে দেখি বড়দের মিটিং | মিঠি আর বিতানের বিয়ে | আমি মারা গেলে কিভাবে কাল অশৌচ,বার্ষিক শ্রাদ্ধ মিটিয়ে বিয়েটা সারা হবে সবটাই শুনে ফেলেছিলাম আড়াল থেকে | পালাতে চেয়েছিলাম | ছোটপিসি দেখে ফেলে | আমাকে বোঝানো হয় তিতিরের কথা ভেবেই নাকি এই বিয়ে | তিতির কথাবলতে শিখছে | সবাই চায় ও মিঠিকেই মা বলে চিনুক | তাতে নাকি ওর ই ভালো | আর বাবারও বয়স হয়েছে | মিঠির বিয়েটা দিতে পারলেই নাকি বাবা খুশি | কিন্তু এত ব্যাখ্যা আমাকে দেওয়া কেন? আমিতো কিছু জানতে চাইনি | মিঠি বিয়ের কেনাকাটা নিয়েই ব্যস্ত | তিতির বেশী কান্নাকাটি করলে ও রেগে যায় | তাই বোধহয় জীবনের শেষ কটা দিন তিতিরকে কাছে পাচ্ছি | তবে ওতো একদিন আমাকে ভুলেই যাবে | ভুলতেই হবে | শুধু ওর নরম স্পর্শগুলো লেগে থাকবে আমার মনে | এখন আর দেওয়ালে টাঙানো মায়ের ফোটো দেখে কষ্ট হয়না | মনে হয় আরতো কটা দিন,তারপর তো মায়ের কাছেই চলে যাব | তিতিরের থেকেও ছোট্ট হয়ে আবার জড়িয়ে ধরব মায়ের গলা | সব দায় দায়িত্বের শিকল ছিড়ে আবার মায়ের কোলে মাথা রেখে ঘুমোব | মনের ভুল কিনা জানিনা | তবে ছবিতে মায়ের হাসিটা যেন দিন দিন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে | মা যেন আমাকে ডাকছে, “আয় খুকু আয়……”

Check Also

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস

রবির কিরণে – নাজির হোসেন বিশ্বাস পড়ন্ত বৈকাল! একটা দুধ সাদা বলাকা নিঃসঙ্গ ভাবে উড়ে …

2 comments

  1. অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল আপনার জন্য…।

  2. সুন্দর লেখা , শুভেচ্ছা ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।