Breaking News

সবুজ রঙের চোখ – সৌমেন ঠাকুর

সবুজ রঙের চোখ
– সৌমেন ঠাকুর

মাঝে মাঝে মনে হয় ঘটনাটা কি আদেও কোনোদিন ঘটেছিল ? সম্পূর্ণটা আমার মনের ভুল নয় তো ? কোন এক দুঃস্বপ্ন! কিন্তু নিজের চোখে যে ঘটনা আমি প্রত্যক্ষ করেছি , যে ঘটনা আমার জীবনটাই পাল্টে দিলো আমি তাকে অস্বীকার করবো কীভাবে ? যদিও মনে প্রাণে আমি আজও নানারকম যুক্তি খুঁজি নিজের চোখের সামনে ঘটে যাওয়া সত্যিটাকে মিথ্যা প্রমাণ করার জন্য । কিন্তু…? আমি জানি আপনিও আমার কথার এক বর্ণ বিশ্বাস করবেন না । আপনাকে আমি একথা বলবোও না যে আমাকে বিশ্বাস করুন । কারণ আমি নিজে প্রতি মুহূর্তে যে কথাগুলো বিশ্বাস করতে চাই না তা অন্যকে বিশ্বাস করতে বলবো কেমন করে ? কিন্তু বিশ্বাস না করতে চাইলেই কি তা মিথ্যা হয়ে যায় ?

সোহিনীর সাথে আমার বিয়েটা ঠিক পুরোপুরি প্রেমের বিয়ে নয় । সোহিনী হলো আমার জেঠতুতো বৌদির মাসতুতো বোন । দাদার বিয়েতেই ওর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় । তখন অবশ্য দাদার শ্যালিকা হিসেবেই । দাদার বিয়ের মাস ছয়েক পর সোহিনীর সাথে যখন আমার বিয়ে ঠিক হলো তখন আমি বেশ খুশিই হয়েছিলাম । সোহিনী তখন কলেজের ফাইনাল ইয়ারের স্টুডেন্ট । বেশ সুন্দরী স্মার্ট । সত্যি বলতে কি দাদার বিয়ের সময় আমারো ওকে বেশ ভালো লেগেছিল । কিন্তু বাড়ির বড়রা আমাদের বিয়ে ঠিক করলেও সোহিনী মাস্টার্স শেষ না করে বিয়ে করতে রাজি নয় । আমিও তখন সবে নতুন চাকরিতে ঢুকেছি সেজন্য আমিও চাইছিলাম আর কটা দিন পর বিয়ে করতে। তাই প্রথমে বাড়ির লোকের সম্বন্ধ ও পরে দু’বছর ধরে আমি আর সোহিনী রবীন্দ্রসদন, নিকোপার্ক , নন্দন , বইমেলা , কফিশপে আর বাকিটা মোবাইল ও ফেসবুক-হোয়াটসঅ্যাপে রাত জেগে কথা বলে চ্যাট করে শেষে আমরা বিয়ে করলাম।

বিয়ের চার মাস পর সোহিনী আমার সাথে জবলপুর এলো। ও একটা কথা আমি বলতে ভুলে গেছি আমি তখন চাকরি সূত্রে মধ্যপ্রদেশের জবলপুরে থাকতাম। আগে একটা পিজি তে থাকতাম বটে কিন্তু বিয়ে ঠিক হওয়ার পর একটা ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছিলাম। আমাদের ফ্ল্যাটটা ছিল তিনতলায়। তার উপরে আর কোনো ফ্ল্যাট ছিল না ছাদ ছিল। ঐ তিন তলা বাড়িটায় বাড়িওয়ালাকে নিয়ে সবসুদ্ধ পাঁচটা পরিবার বাস করতো । সবাই হিন্দিভাষী ।

বিয়ের পর সেই দুকামরার ফ্ল্যাটেই শুরু হলো আমার আর সোহিনীর নতুন সংসার । আর পাঁচজন নতুন দম্পতির মতোই ছিল আমাদের জীবন । সেই জীবনের আনাচে কানাচে উপচে পড়ছে ভালোবাসা সুখের আবেশ । সোহিনীকে একা রেখে অফিস যেতে আমার একটুও ইচ্ছে করতো না । অফিসে থাকার সময় সোহিনী আমাকে প্রতি ঘন্টায় একবার করে ফোন করতো ।”কি গো অফিস পৌঁছেছো ?” “লাঞ্চ করলে ? এখনো করনি তিনটে বেজে গেছে তো?” “কখন ফিরবে? আ্যায় আজ একটু তাড়াতাড়ি চলে এসো না…” সত্যি বলতে কি সোহিনীর এই ফোনগুলো আমিও ভীষণ উপভোগ করতাম । মনটা খুশিতে ভরে যেত। অফিস থেকে ফেরার সময় দেখতাম সোহিনী জানলা ধরে আমারি জন্য অপেক্ষা করছে । ছুটির দিনে আমরা দু’জন একসঙ্গে বাজারে যেতাম। সারা সপ্তাহের বাজার করে শহরের এদিকে ওদিকে একটু ঘুরতাম। বেশ সুখেই কাটছিল আমাদের মিষ্টি মধুর নতুন দাম্পত্য জীবন।

এভাবেই কেটে গেল কয়েক মাস। এরপর এলো সেই দিন। সেদিন সকাল থেকেই ঝিরঝিরে বৃষ্টি হচ্ছিল। এমন একটা রোমান্টিক দিনে সোহিনীকে একা ফেলে অফিসে যেতে আমার একটুও ইচ্ছে করছিল না । কিন্তু অফিস তো যেতেই হবে। দুপুরে সোহিনী ফোন করলো , আমি তখন অফিসে।
” আজ একটু তাড়াতাড়ি এসো না গো বিকালে ফিসফ্রাই করবো । ইউটিউব থেকে শিখেছি ।দেখো না চেষ্টা করে যদি তাড়াতাড়ি আসতে পারো …”
আহা! এমন বাদলা দিনে নতুন বৌ , চায়ের সঙ্গে ফিসফ্রাই ছেড়ে কোন পাগল অফিসে থাকতে চায়… ইচ্ছে করছিল এখুনি সোহিনীর কাছে চলে যায় । কিন্তু…
“ঠিক আছে…. আমি চেষ্টা করবো তাড়াতাড়ি ফিরতে । বাই…”
তাড়াতাড়ি ফিরবো বললেই কি তাড়াতাড়ি ফেরা যায় ? সেদিনই আমার ফিরতে রাত হলো ।

অফিস থেকে বেরনোর সময় থেকেই মনটা কেমন যেন খচখচ করছিল । ফ্ল্যাটের সামনে এসে দেখি অন্যান্য আর পাঁচটা দিনের মতো ব্যালকনিতে সোহিনী দাঁড়িয়ে নেই । ঘরের আলোও জ্বলছে না। বুকটা যেন কোনো এক অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠলো। আমি দৌড়ে তিনতলায় ফ্ল্যাটে গিয়ে দেখি দরজাটা হাট করে খোলা। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার । খোলা জানলা দিয়ে বয়ে আসা ঠান্ডা বাতাসে পর্দা গুলো তিরতির করে উড়ছে । কিন্তু সোহিনী কোথাও নেই । ফ্ল্যাটের ভেতরে শোবার ঘর রান্নাঘর বাথরুম কোথাও সোহিনী নেই । এখানে রাস্তা ঘাট কোনো কিছুই তো ও তেমন চেনে না । তবে ? এভাবে দরজা খোলা রেখে সোহিনী গেলটা কোথায় ? মোবাইলটাও খাটের উপর পড়ে আছে । একরাশ উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা নিয়ে আমি অন্যান্য ফ্ল্যাট গুলোতেও সোহিনীর খোঁজ করি । কিন্তু না সোহিনী সেখানেও যাইনি । শেষে কোনো উপায় না দেখে থানায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। আশেপাশের ফ্ল্যাট থেকে দু-চার জন আমার সঙ্গী হয় । থানায় যাওয়ার উদ্দেশে ঘর থেকে বের হতে যাবো এমন সময় খেয়াল হলো আচ্ছা ও ছাদে নেই তো ? যদিও সোহিনী আগে কোনদিন ছাদে যাইনি তবুও কেন জানিনা আমার মন বললো সোহিনীকে ছাদেই পাবো ।

গোটা ছাদটা ঘুটঘুটে অন্ধকারে মোড়া । শুধু ছাদে ঢোকার দরজার মাথায় একটা টিমটিমে হলদে লাইট জ্বলছে । ছাদে সোহিনীর নাম ধরে বেশ কয়েকবার ডেকে সাড়া না পাওয়ায় নামতে যাবো এমন সময় সিমেন্টের প্রকান্ড জল ট্যাঙ্কটার পাশ থেকে একটা গোঙানির শব্দ শুনতে পেলাম। ছাদের অল্প আলোয় দেখলাম সোহিনী ট্যাঙ্কের পাশে অচেতন হয়ে পড়ে আছে । ওর সারা শরীর বৃষ্টিতে ভিজে শপশপ করছে।
” সোহিনী… সোহিনী… সোহিনী চোখ খোলো ”
বারকয়েক সোহিনীর নাম ধরে ডাকতে সোহিনী যেন চেতনা ফিরে পেল । একবার আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল– “আ…,আ…,আমি কোথায় ? ”
কিন্তু উওর দেওয়ার আগেই ও আবার চোখ বুজলো । সোহিনীর সারাটা শরীর ঠান্ডায় কুঁকড়ে গেছে। ঠকঠক করে কাঁপছে । কি হয়েছে ও কেন এখানে এলো আমি তার বিন্দু বিসর্গও বুঝতে পারলাম না। সোহিনীকে নিচে ঘরে নিয়ে এসে বিছানায় শুইয়ে দিলাম।

“কি গো অফিস যাবে না? এতো বেলা অব্দি ঘুমাচ্ছো যে ?”
পরদিন সকালে সোহিনীর ডাকাডাকিতে আমার ঘুম ভাঙল। ধরফর করে বিছানায় উঠে দেখি সোহিনী চায়ের ট্রে হাতে দাঁড়িয়ে । ঘরটা জানলা দিয়ে আসা রোদে ভরে গেছে । সারারাত সোহিনীর পাশে বসে থাকতে থাকতে ভোরের দিকে কখন আমার চোখ লেগে গিয়েছে টেরও পায়নি । চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে লক্ষ করি সোহিনীকে আজ একদম স্বাভাবিক দেখাচ্ছে । কাল যে এতবড় একটা কান্ড ঘটে গেল তা ওকে দেখে কে বলবে ?
“যাও তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও আমি ব্রেকফাস্ট রেডি করছি ।”
সোহিনী চলে গেল । তবে কি কাল রাতের কথা ওর কিছুই মনে নেই ? ভেবেছিলাম আজকের দিনটা ছুটি নেবো কিন্তু এখন যখন সোহিনী ভালো আছে তখন শুধু শুধু ছুটি নেওয়ার কোনো মানেই হয় না।

সেদিন অফিস থেকে একটু তাড়াতাড়িই বাড়ি ফিরে আসি । যদিও অফিস থেকেই আমি বারকয়েক সোহিনীকে ফোন করেছিলাম। সোহিনী আর পাঁচটা দিনের মতো আমার সাথে স্বাভাবিক ভাবেই কথা বলে —
” লাঞ্চটা তাড়াতাড়ি করে নিও । বেশি বেলা করো না।”
ফ্ল্যাটে ফিরে দেখি সোহিনী চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে। চোখে আলোটা লাগছে বলে লাইটটা বন্ধ করে ঘরটা অন্ধকার করে রেখেছে। শুধু জানলা দিয়ে একফালি চাঁদের আলো ঘরে এসে পড়েছে। সোহিনীর কপালে হাত রেখে দেখি গায়ে ধুম জ্বর । হবে নাইবা কেন ? কাল যেভাবে ছাদে বৃষ্টিতে ভিজেছে তাতে…। আমি কয়েকটা ওষুধ ওকে জোর করে খাইয়ে দিই। খাবার খাওয়ার কথা বললে ও বলে — ” কিচ্ছু খাবো না… একটু শুয়ে থাকি না… ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে । ”
কথা না বাড়িয়ে ওকে শুইয়ে দিলাম।

কাল ওভাবে ছাদে সেন্সলেস হয়ে পড়ে ছিল আজ আবার জ্বর । দেখি আজ রাতটা । কাল না হয় ওকে একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো । মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতেই আমি কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম ঠিক খেয়াল নেই। হঠাৎ একটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেল। পাশ ফিরে দেখি বিছানায় সোহিনী নেই । চোখ চলে গেল সামনে টাঙানো দেওয়াল ঘড়ির দিকে। ঘড়ির কাঁটা বলছে এখন রাত একটা চল্লিশ। একা একা সোহিনী কোথায় গেল ? বাথরুম ? কথাটা ভাবতেই চোখ যায় বাথরুমের দিকে । বাথরুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। ঠিক তখনই আবার শব্দটা শুনতে পেলাম ঘরের বাইরে ড্রয়িংরুম থেকে আসছে। আমি পা টিপে টিপে দরজা পেরিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে দাঁড়ালাম । আর সেখানে যে দৃশ্য দেখলাম তাতে আমার সারাটা শরীর অবশ হয়ে গেল। পা দুটো যেন জমে পাথর হয়ে গেছে। কাঁচের জানালা দিয়ে আসা চাঁদের আলোয় আলো-আধারিতে দেখি সোহিনী ডাইনিং টেবিলের নিচে উবু হয়ে বসে । সামনে ফ্রিজে রাখা প্লাস্টিকের বক্সটা ঢাকনা খোলা অবস্থায়…আর তা থেকে একটুকরো কাঁচা মাছ নিয়ে সোহিনী একমনে চিবিয়ে চিবিয়ে খাচ্ছে।
” সোহিনী… কি করছো তুমি ? ”
আমার চিৎকারের সাথে সাথেই সোহিনী ক্ষিপ্র বেগে ঘুরে তাকায় আমার দিকে । ওর মুখটা অসম্ভব রকম ফ্যাকাশে চোখদুটো সবুজ । জ্বল জ্বল করছে । চাঁপা গর্জন করে ও যেন লাফিয়ে পড়ল আমার উপর । তারপর আস্তে আস্তে ঢোলে পড়ে আমার কোলে।

পরদিন সকালে যখন বিছানায় সোহিনীর ঘুম ভাঙল তখন ওর আর জ্বরটা নেই। বেশ স্বাভাবিক লাগছিল। তবে কি গতরাতের ঐ বিভৎস ঘটনাটা সত্যি নয় ? সবটাই একটা দুঃস্বপ্ন ছিল । চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটাকে ভুল , কোনো খারাপ স্বপ্ন বলেই মানতে মন চাইছিল কিন্তু তা বলে তো ঘটনাটা মিথ্যা নয়। কাল রাতে কি দেখেছি কি ঘটছে কিছুই যেন বুঝতে পারছিলাম না। আমি ঠিক করি আজ আর অফিস যাবো না । বরং সোহিনীর সাথে কিছুটা সময় কাটাবো আর ওকে একবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো। সেইমতো তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট সেরে ওকে নিয়ে বের হই । ডাক্তার দেখিয়ে এদিকে ওদিক একটু ঘুরে দুপুরে একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চ করে বাড়ি ফিরে আসি । ডাক্তার কিছু ওষুধ প্রেসক্রাইব করে দেন। সেই মতো ওকে ওষুধ খাইয়ে আমাকে একটু বেরতে হয় । সাড়ে তিনটের সময় বস একটা জরুরী মিটিং ডেকেছে… না গেলেই নয়।

মিটিং সেরে বেরতে বেরতে সাড়ে পাঁচটা‌ বেজে গেল। অফিস থেকে বেরিয়ে দেখি আজ আবার মেঘ করেছে বৃষ্টি আসবে। ঝড়ও উঠবে মনে হয় । তাড়াতাড়ি করে একটা ট্যাক্সি নিয়ে যখন বাড়ি পৌঁছালাম তখন সোয়া ছটা। চারপাশটা ভীষণ রকম থমথমে । প্রকৃতি যেন রুদ্ধশ্বাস প্রলয়ের প্রতিক্ষায় । আমি দৌড়ে সিঁড়ি টপকে টপকে উপড়ে উঠতে লাগলাম। ফ্ল্যাটের সামনে আসতেই সমস্ত আলো গুলো এক এক করে নিভে গেল । লোডশেডিং । দরজায় টোকা দিয়ে গিয়ে টের পেলাম দরজাটা খোলা । সারাটা ফ্ল্যাট ঘন কালো অন্ধকারে ঢাকা। একটা টিকটিকি ঠক্ ঠক্ করে দেওয়ালে ডেকে উঠল।
“সোহিনী… সোহিনী…”
সোহিনীর কোনো সাড়া পেলাম না । মোবাইলের ফ্ল্যাশ লাইট জ্বেলে আমি ধীরে ধীরে বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেলাম। দরজাটা ঠেলে খুলতেই দেখি সোহিনী খাটের উপর অন্ধকারে উবু হয়ে বসে । ঠিক যেভাবে আগের রাতে ডাইনিং টেবিলের নিচে বসে ছিল। মুখের বেশিরভাগই ওর খোলা চুলে ঢাকা। ওর নাম ধরে কয়েকবার ডাকলেও ও কোনো সাড়া দিল না । তখন এগিয়ে গিয়ে ওর কাঁধে একটা হাত রাখতেই ও বিদ্যুৎ বেগে মাথা তুললো। কী অসম্ভব ফ্যাকাশে সাদা ওর মুখ । যেন মুখে একফোটা রক্ত নেই । সারা মুখের অজস্র শিরা উপশিরা গুলো স্পষ্ট যেন ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসছে । চোখদুটো সবুজ । জ্বল জ্বল করছে । মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছে একটা চাপা অস্ফুট গর্জন । ও মুখটা ঠিক আমার সামনে এনে ফোঁস ফোঁস করে গরম নিঃশ্বাস ফেলে আমার উপর । আমার ঘাড়ের কাছে ঠান্ডা শিরশিরে ভয় অনুভব করলাম। সারা গায়ে যেন কাঁটা দিয়ে উঠলো। আমি ছিটকে দু’পা পিছিয়ে এলাম আর ঠিক তক্ষুনি সোহিনী গর্জন করে ঝাঁপিয়ে পড়ল আমার উপর । নিজের ব্যালেন্স ঠিক রাখতে না পেরে আমি হুমড়ি খেয়ে নিচেতে পড়ে গলাম । আমার ঠিক উপরে সোহিনী। ও যেন আমার বুকের উপর বসে ওর ধারালো নখগুলো দিয়ে আমার মুখ চোখ গাল গলা ক্ষতবিক্ষত করতে লাগলো। নিজের সবটুকু শক্তি জড়ো করে আমি ওকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করি ।প্রচন্ড আতঙ্কে আমার যেন গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। সোহিনী আমাকে ছেড়ে দিয়ে দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে যায় । আমিও ওর পিছু পিছু দৌড়ে যাই ।

ছাদে শনশন করে বাতাস বইছে। প্রচন্ড জোরে মেঘ ডেকে একটা বিদ্যুত সারা আকাশে শাখা প্রশাখা বিস্তার করে খেলে গেল। সেই আলোয় দেখলাম সোহিনী ছাদের কার্নিশে উঠে উবু হয়ে বসে।
” কি করছো ওখানে… সোহিনী… না সোহিনী… নেমে এসো… ওখান থেকে নেমে এসো”
আমার ডাক শুনে সোহিনী মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকালো । ওর চোখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না । ওর সবুজ জ্বল জ্বলে চোখের দৃষ্টি কী হিংস্র! চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে ওর গাল বেয়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে আকাশ বাতাস বিদীর্ণ করে পিছন থেকে ভেসে এলো একটা ডাক –“ম্যায়াও…” একজোড়া সবুজ চোখ। উফ্! কী অন্তর্ভেদী সে দৃষ্টি । আমার পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সেই সবুজ চোখের বিড়ালটা । কিন্তু তা কীভাবে সম্ভব ? ওটা তো…. । এখানে আসার পর থেকেই আমাদের ফ্ল্যাটে একটা বিড়াল ভীষণ উৎপাত করতো । ব্যাটা রোজ হয় মাছ নয়তো দুধ খেয়ে পালাতো । সোহিনী ভীষণ ভয় পেত বিড়ালটাকে দেখে । ও প্রতিদিন আমার কাছে নালিশ করে বলতো- ” ওটা এখানে কেন আসে ? আমার ভীষণ ভয় করে ওকে দেখে । ওটা মরে না কেন ?” এরপর সপ্তাহ খানেক আগে যেদিন বিড়ালটাকে মরে পড়ে থাকতে দেখলাম সেদিন আনন্দে সোহিনীর চোখ দুটো চকচক করে উঠেছিল। কেউ বিষ খাইয়ে বিড়ালটাকে মেরেছিল। বিড়ালটার শরীরটা বিষে নীল হয়ে গিয়েছিল । মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরোচ্ছিল । কিন্তু একটা মরা বিড়াল এখানে কীভাবে আসতে পারে ? উফঃ! আমার যেন সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে । তবে কি ওটা বিড়ালের প্রেতাত্মা ? তবে কি সোহিনীই ওকে… আর তার প্রতিশোধ নিতেই ও… । কি ঘটছে তার কিছুই যেন আমার মাথায় ঢুকছিল না । আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে নেশাচ্ছন্নের মতো ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। সোহিনী একটা কাতর চিৎকার করে তিন তলার উপর থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়লো। চোখের সামনে এ দৃশ্য দেখে আমি যেন সম্বিত ফিরে পেলাম। দৌড়ে গেলাম ছাদের কিনারে। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ। নিচে ঠিক যেখানে এক সপ্তাহ আগে বিড়ালটা মরে পড়ে ছিল এখন সেখানেই পড়ে আছে সোহিনীর নিথর দেহ ।
সোহিনীর পড়ে যাওয়ার শব্দ পেয়ে এক এক করে পাড়ার লোক জুটতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে আমাকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে গেল। নিচে ছাদ থেকে পড়া সোহিনীর মৃতদেহ আর ছাদের কিনারে আমি দেখে সবাই দুয়ে দুয়ে চার ধরে নিল । আমিও আর কাউকে কিছু বলিনি… কাকে বলবো ? আর কে আমার কথা বিশ্বাস করবে ? পুলিশ আইন আদালত কেউ এসব মানবে না স্যার ।

কথাগুলো আমি সৃঞ্জয়ের মুখেই শুনছিলাম। সৃঞ্জয় মাস ছয়েক আগে এই জেলে অর্থাৎ সংশোধনাগারে এসেছে স্ত্রীকে খুনের অপরাধে। ও এমনিতে খুব ভালো মানুষ । সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে কারো সাথে খুব একটা কথাও বলে না । ওর বিরুদ্ধে কারো কোনো অভিযোগও নেই । অত্যন্ত ভদ্র মার্জিত ভাষায় কথা বলে। এরকম একজন মানুষ কেন তার স্ত্রীকে খুন করলো জেলার হিসেবে ওর থেকে জানতে ইচ্ছে করছিল । কিন্তু ও যা বললো তাতে আমি যে কি উত্তর দেব ভেবে পেলাম না। মনে হয় ওর মাথাটাই গেছে কিন্তু ওর বৌকে বিড়ালের ভূত মেরেছে ও নিজে নয় এটা ছাড়া আর তো তেমন কোনো লক্ষণ কৈ দেখলাম না। ওর সম্পর্কে এরকম কথা আমাকে কেউ বলেও নি আগে । আমি টেবিলে রাখা দুধের গ্লাসটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললাম- ” দেখো যা হয়েছে তা অত্যন্ত দুঃখজনক কিন্তু তা বলে তুমি খাওয়া দাওয়া ঠিক করে করো না কেন ? নাও দুধটা খেয়ে নাও । ”
ঠিক তখনই কারেন্টটা চলে যায়। আমি উঠে ড্রয়ার থেকে একটা মোমবাতি বার করে জ্বালিয়ে দিই। মোমবাতির আলোয় ঘরটা আলোছায়া । মোমবাতির শিখার একটা ছায়া দেওয়ালে তির তির করে কাঁপছে। হঠাৎ একটা চপ চপ আওয়াজ শুনে ঘুরে দেখি সৃঞ্জয় গ্লাস থেকে দুধটা প্লেটে ঢেলে অদ্ভুত ভাবে টেবিলে ঝুঁকে জিভ দিয়ে চেটে চেটে খাচ্ছে ।
“আহ্! ওভাবে কেন ? গ্লাসটা ধরে খাও না…”
বিরক্ত হয়ে সৃঞ্জয়কে একথা বলতেই ও আমার দিকে তাকালো । কিন্তু একি! এ কি দেখছি আমি! ওকে দেখে আমি চমকে উঠলাম । ভয়ের একটা ঠান্ডা স্রোত আমার সারা শরীরের শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে গেল । ওর মুখটা অসম্ভব রকম সাদা , রক্তশূন্য ফ্যাকাশে আর চোখ দুটো কেমন যেন সবুজ… অন্ধকারে জ্বল জ্বল করছে।

Check Also

রুমমেট – সৌমেন ঠাকুর

রুমমেট – সৌমেন ঠাকুর প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম সম্পূর্ণটাই আমার মনের ভুল । বন্ধুদের বলতে ওরা …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।