Breaking News

অভিশপ্ত বাংলোর সেই রাত – মৌ চক্রবর্তী

‘অভিশপ্ত বাংলোর সেই রাত’
কলমে – মৌ চক্রবর্তী

আমাদের মামাবাড়ি কোচবিহার জেলার পুন্ডিবাড়িতে।পাশ দিয়ে বয়ে গেছে শিলতোর্ষা নদী,মামাবাড়ি থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে।সেখানে ছোটোবেলায় আমরা সাঁতার শিখতাম।কত যে স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেখানে।সেসব বলতে গিয়ে মনকে আর স্মৃতিমেদুর করে তুলতে চাইনা।

প্রায় পাঁচ বছর আগের কথা।আমার তখনও চাকরি হয়নি। চাকরি পাওয়ার আগে আমি আর হিমেশ (আমার ছোটোভাই) ঘন- ঘন মামারবাড়ি যেতাম।আমরা যদিও মালদায় থাকি।তবুও আমাদের মন পড়ে থাকে মামার বাড়িতে।

তখন বর্ষাকাল।শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝি।অঝোরধারে বৃষ্টি পড়ছিল।কারেন্ট চলে যাওয়ায় আমরা সবাই এসে ছোটোদাদুর ঘরে বসেছি।টেবিলের উপর রাখা কাঁচের মোমদানিতে মোমবাতি জ্বলছিল।ঘরময় মোমবাতির ক্ষীণ আলো ছড়িয়ে ছিল।বাইরে বৃষ্টির আওয়াজ।ঘরের পাশের ডোবা থেকে অনবরত ব্যাঙের ঘ্যাঁতঘোঁত আওয়াজ।কেমন যেন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল,ঠিক গল্প শোনার মতো।

ঘরে হিমেশ,আমি,ছোটোদাদু আর আমাদের মাসতুতো ভাই অতীশ,যদিও তাকে আমরা পটলা বলেই ডাকি।ছোটোদাদুও আমাদের সাথে বন্ধুর মতো মেশেন।তিনি মানুষটা ভীষণ অদ্ভূত।দেখতেও খানিকটা তেমনই।ভীষণ লম্বা,পাতলা আর নাকটা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশ লম্বা।তাঁর মুখের পানে একবার চাইলেও নাকটা কারো নজর এড়িয়ে যাবে না।চোখে পড়বেই পড়বে।

সে যাইহোক,তিনি পড়াশুনাতেও ভীষণ আগ্রহী।সংস্কৃত ভাষাতেও অগাধ পান্ডিত্য তাঁর।রেলে চাকরি করতেন।কাজের তাগিদে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরে বেড়ালেও শখেও ঘুরেছেন দেশ-বিদেশ।সবকিছুতেই তাঁর আগ্রহ বেশি।তবুও তাঁর স্বভাবের গাম্ভীর্যের পাশাপাশি শিশুর মতো সারল্যই তাঁকে বাচ্চাদের সাথে সহজে মিশে যেতে সাহায্য করে।তাই যখন আমরা ছোটোবেলায় বড়দের এড়িয়ে চলতাম,তখনও ছোটোদাদুর সাথে আমাদের বেশ বন্ধুত্ব ছিল।তিনি বেশ জমিয়ে গল্প বলতেন আর আমরা হা করে শুনতাম।

-‘ছোটোদাদু,গল্প বলো না গো,খুব শুনতে ইচ্ছে করছে’,বলে উঠল হিমেশ।

সাথে – সাথেই পটলাও সুর ধরল,’ও ছোটোদাদু, বলো না গো…।’

আমি হিমেশ আর পটলার থেকে বয়সে অনেকটাই বড়।তাই ওদের সাথে তাল মিলিয়ে গল্প শুনতে চাওয়াটা আমার কাছে একটু কেমনতর লাগল।যদিও মনে – মনে আমিও ওদের দলেই ছিলাম।

এরই ফাঁকে ছোটোদিদা একপ্লেট বড়াভাজা,মুড়িমাখা আর চার কাপ ধোঁয়া ওঠা চা এনে রাখতেই ছোটোদাদুর মেজাজটা বেশ চনমনে দেখাল।

-‘আচ্ছা,তা বেশ,কি গল্প শুনতে চাস তোরা বল দেখি দাদুরা?’

তখন আমি  আর মুখ বুজে থাকতে না পেরে বললাম,’ভূতের গল্পেরই পরিবেশ এখন,ভূতের গল্পতেই জমত বেশ।’

সেই শুনে পটলার মুখটা হঠাৎ ফ্যাকাশে দেখাল।

-‘কিরে পটলা,ভয় পেলি বুঝি?’

-‘কই না তো।মোটেও নয় রীতেশ দাদা।তুমি যে কি বল না।আমি ভূতের গল্প শুনতেই বড্ড আগ্রহী’,বলেই হিমেশের পাশে চেপে বসল।

আলুর মুচমুচে বড়ায় কামড় বসিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিল ছোটোদাদু।।তারপর বেশ আরাম করে করে বসে বলতে শুরু করল।

-‘শোন তবে,গল্প নয়,সত্যি একটা ঘটনা বলছি।’

**********

সালটা 1980 – 82 হবে।আমি আসামে কর্মরত।তখন শীতকাল।পিকনিকের মরশুম চলছিল।আমি আর শশীদা (শশীভূষণ সামন্ত) কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে গেলাম ঝাড়খন্ড বেড়াতে।শশীদাও বেশ হৈ – হুল্লোড় করতে ভালোবাসে।ভ্রমণ করাটা নেশা ছিল তাঁর।আমরা দু’জনে মিলে চললাম ঝাড়খন্ডের হাজারিবাগ।সেখানে একটি বন বাংলোও উঠলাম।বেশ পুরোনো আমলের।পিকনিকের মরশুম হলেও বাংলো ফাঁকাই ছিল।সেখানে আমরা দুপুর নাগাদ পৌঁছলাম।বাংলোর কেয়ারটেকারই আমাদের খাবারের বন্দোবস্ত করে দিল।ভাত খেয়ে গায়ে কম্বলটা জড়িয়ে একটু টানটান হয়ে শুতেই দু’চোখের পাতা কখন যে বুজে এসেছিল,বুঝিনি।গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছিলাম।

ঘুম যখন ভাঙ্গল তখন বেলা পড়ে এসেছে।জানালার শিকের ফাঁক দিয়ে বাইরের গাছের পাতার ফাঁক গলে পড়ন্ত রোদের আলোছায়ার লুকোচুরি এসে  আলপনা এঁকে দিচ্ছে আমার মাথার বালিশের সাদা খোলের উপর।হালকা হলুদ আলো ঘরময় ছড়িয়ে পড়েছে।বাইরে তখন টুপটাপ পাতা ঝরার আওয়াজ।দূরে শোনা যাচ্ছে পাখিদের ঘরে ফেরবার সময়কার ডানার শব্দ।আমি তড়াক করে লাফিয়ে উঠি।মনে ভীষণ আফশোষ হচ্ছে।ইস্ এত সুন্দর বিকেলটা ঘুমিয়ে মাটি করলাম।

চোখে – মুখে জল দিয়ে এসে বসতেই বেশ শীত করতে লাগল।শালটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ভাবছি এইসময় এককাপ গরম চা হলে মন্দ হত না।হঠাৎ চোখ পড়ল ঘরের দেওয়ালে টাঙ্গানো একটি তেল রঙ করা চিত্রের দিকে।জানিনা,ছবিটার মধ্যে আকর্ষণ করার কি ছিল!আমি ছবিটাকে খুঁটিয়ে দেখতে – দেখতে  মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেওয়ালের পাশে ছবিটার একেবারে কাছে এসে দাঁড়ালাম।

কোনো এক ইংরেজ সাহেবের ছবি।বলিষ্ঠ চেহারা,পুরু গোঁফ,মুখে চুরুট,হাতে বন্দুক,ঘোড়ার পিঠে চেপে আছেন তিনি।দেখে মনে হচ্ছে যেন হাসছেন।চিত্রকরের দক্ষ তুলির ছোঁয়ায় যেন মুখভরা হাসি লুকিয়ে ছিল চিত্রটির মধ্যে!

-‘Taraknath…Taraknath…how do ye do?’

আমার সামনে সেই সাহেবটি দাঁড়িয়ে।একহাতে ঘোড়ার লাগাম ধরা,অন্য হাতে বন্দুক।সামন দিয়ে পথ চলে গেছে আরও গভীর অরণ্যের ভিতর।ঠান্ডা হাওয়া বইছে।

প্রত্যুত্তর না করে আমি একইভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম সাহেবের মুখপানে চেয়ে।যেন ঘোরে রয়েছি।বিস্ময়ের আরও অবধি রইল না যখন দেখলাম আমার পড়নের পোশাকগুলোও  সব বদলে গেছে।ধুতি,পাঞ্জাবী আর জহরকোট পড়ে আছি।গলায় আমার মাফলার জড়ানো।

-‘I’m extremely sorry…extremely sorry Taraknath’,মাথা ঝুঁকিয়ে দুঃখ প্রকাশ করছে সাহেবটি।

আরে বাবা,একি কান্ড !কেনই বা সরি,কে এই লোকটি,কিছুই তো বুঝতে পারছি না।তবে লোকটি যে মর্মাহত আর তার চোখগুলো আর্দ্র,এ স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে।কিন্তু আমায় তারকনাথ বলে সম্বোধন করছে কেন!আমি বাপু পুলিনবিহারী পুরকাইত।আমি হঠাৎ সাহেবের তারকনাথ হতে যাব কেন…

আমায় ভাববার অবকাশ না দিয়ে সাহেবটি বাংলা,হিন্দি আর ইংরেজি মিশিয়ে বললেন,
‘সেডিন টুমি যডি হামাকে রেসকিউ করটে না আসতে,তবে টুমি মরতে না।ইউ সেভ মাই লাইভ,মাই ফ্রেন্ড,ইউ রিয়ালি সেভ মি…বাট…ইউ লস্ট ইওর প্রেসাস লাইভ…ওহ্ নো…হামিও নিজেকে কখনও ফরগিভ করতে পারি নাই।’

আমি বিস্ময়মাখা দৃষ্টি নিয়ে শুনে চলেছি।

হামার হান্টিং এর hobby ছিল।তাই টুমায় ফোর্স করেই আনি…I thought…টুমি এনজয় করবে…তারপর…

তারপর দেখলাম সহসা অন্ধকার চারিদিক।ওই বুঝি নড় উঠল ঝোপটা! একটা বাল্বের মতো আলো ঝোপের ফাঁকে…একটা ভয়ানক গর্জন,বাঘের…হালুম…কেঁপে উঠল ভিতরটা…মুহূর্তে শুনলাম গুলির আওয়াজ…পরক্ষণেই নিঃস্তব্ধ চারিদিক।বন্দুক নিয়ে সাহেব ছুটছে ঝোপের দিকে কিন্তু পরক্ষণেই ঝোপ থেকে ভেসে এল মানুষের গলার আর্তনাদ…Save me…save…

সাহেবের গলা।আহত বাঘটা থাবা বসিয়েছে সাহেবের কাঁধে।মুর্হূতে সম্বিৎ ফিরল আমার।সেই তীব্র আর্তনাদ আমার বুকের ভিতর বিঁধতে লাগল।ক্ষণিকের জন্য চিন্তারা গেল থেমে।বাহ্যজ্ঞান শূন্য হয়ে ছুটলাম ঝোপের দিকে।কিন্তু কিভাবে বাঁচাব আমি? পাশে পড়ে থাকা বন্দুকটা উঠিয়ে নিলাম হাতে,সজোরে মারলাম বাঘের মাথায়।তখন বাঘ আর মানুষে টানাটানি চলছিল।তৎক্ষণাৎ তীব্র গগনভেদী হুঙ্কারে আমার উপর লাফিয়ে পড়ল বাঘটি।কিছুক্ষণের মধ্যেই অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলাম।ততক্ষণে গায়ের সমস্ত কাপড় রক্তে ভিজে চটচটে।দূর থেকে বন্দুকের গুলির শব্দ পেলাম আর সাথে – সাথেই মানুষের আর্ত – চিৎকার আর গোঙানির মধ্যেই সব নিশ্চুপ হয়ে পড়ল।আর বলতে পারিনা।

********************

মাথাটা ঘুরছে।দেখি দাঁড়িয়ে রয়েছি সেই ফটোটির সামনে।চায়ের প্লেট হাতে এক বৃদ্ধ হাসছে আমার দিকে তাকিয়ে।গালে কাঁচাপাকা দাড়ি,উশকোখুশকো চুল,কাঁধে একটা ময়লা মতন গামছা।কিন্তু চোখে যেন চেনা হাসির আভাস দেখতে পাচ্ছি।

-‘তারকবাবু,চায়ে লিজিয়ে,’চমকে উঠলাম আবারও।
বাবুসাব,ইতনা দিন বাদ ইঁয়াদ আয়া সবকুছ…আপ ইধার চলে আয়ে…কাঁহা থে বাবুসাব…’ বলছে সে।

-‘আপ কৌন?’

-‘মুঝে নেহি পহঁচানতে আপ?ম্যায় ভীম সিং হু…আপকা ভীম…উসদিন আপ কে মঔত হোনে কে বাদ ফরেস্ট আফসারকে গোলি গলতি সে ডেভিড সাবকো ভি খতম কর দিয়া।ঔর ম্যায় উসদিন সে লে কর আজ তক ইধার রহ্তা হু।আপ দোনো কা সামান দেখভাল করতা রহ্তা হু।ইয়ে তো মেরা ফর্জ হ্যায়।ম্যায় ক্যায়সে ইস্ সে ছুটকারা লে সকতা হু’,বলেই চায়ের প্লেট টেবিলে রেখেই ঘরের দেওয়াল ভেদ করে অন্য ঘরে চলে গেল।

সহ্য করতে পারলাম না আর।হচ্ছে কি এসব! আমি কি কল্পনায় চলে যাচ্ছি?নাকি চলে যাচ্ছি কোনো সুদূর অতীতে,আমার ফেলে রেখে আসা দিনে।কে আমি?তারকনাথ না পুলিনবিহারি! জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম মেঝেতে।

*****************

চোখ মেলে দেখি শশীদা জল ছিটিয়ে দিচ্ছে আমার চোখে-মুখে।পুলিন…পুলিন…

-‘কোথায় আমরা?’

-বনবাংলোয়।আমি তোকে ঘুমাতে দেখে বাইরেটা একটু ঘুরে দেখি ভেবে বেরিয়েছিলাম।পথেই এক বিট অফিসারের সাথে দেখা।তাঁর সাথে অনেক গল্প হ’ল।তাঁর বাংলোতেও গেছিলাম।কিন্তু কথায় -কথায় তিনি যখন শুনলেন আমরা এই বাংলোয় উঠেছি তেমনি তিনি ভীষণ ঘাবড়ে গেলেন।বললেন,’এক্ষুণি গিয়ে বন্ধুকে বাঁচান,নইলে বড্ড দেরী হয়ে যাবে।’তার কাছেই শুনতে পেলাম অনেক বছর আগে এই বাংলোতে থাকতেন এই ইংরেজ সাহেব।বাংলোটি তিনিই বানিয়েছিলেন।শিকাড়ের বড় শখ ছিল।তারই বন্ধু ছিলেন তারকনাথ,উচ্চ- শিক্ষিত বাঙালি,ভ্রমণপিপাসুও ছিলেন তিনি।বন্ধুত্বের সুবাদেই এখানে আসতেন,থাকতেন।সাহেব বন্ধুকে বাঁচাতে গিয়ে বেঘোরে বাঘের পেটে প্রাণ হারান।সেইসময় তখনকার ফরেস্ট অফিসার টহল দিতে গিয়ে এই ঘটনা দেখতে পেয়ে সাহেবকে বাঁচাতে গুলি ছোঁড়েন।কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সেই গুলিটি এসে সাহেবের বুকে বেঁধে।সেই গুলির আঘাতেই প্রাণ হারান ডেভিড সাহেব।তিনি আমায় যে ফটো দেখালেন তার চেহারার সাথে তোর চেহারার হুবহু মিল খুঁজে পেলাম।

এইসব কথা শুনে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল।শশীদা বলে চলল,উনিই আমায় বাংলোর কাছে নামিয়ে দিলেন।এখন বড় রাস্তায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।পথে আসবার সময়ে সব বিস্তারিত বললেন।তিনি বললেন এই বাংলোটি বর্তমানে ‘অভিশপ্ত বাংলো’ হিসেবেই হাজারিবাগে পরিচিত।কালেভদ্রেও কেউ আসেনা।পূর্বে বহু লোকের প্রাণ গেছিল এই বাংলোয় এসে।সবাই বলাবলি করে যে সেই সাহেব আর তার চাকর শুধুমাত্র তারকনাথের পথ চেয়ে থাকে। তাদের হয়তো বিশ্বাস আত্মার টানে ফিরে আসবে তারকনাথ।শশীদা আরও বললেন,’ওরা জেনে গেছে যে তুই ই তারকনাথ।তাই তোকে কিছুতেই যেতে দিতে চাইবে না।কিন্তু পাঁচ মিনিটের মধ্যেই আমাদের এখান থেকে পালাতে হবে।নইলে রাত যত বাড়বে ততই বাড়বে ওদের শক্তি।মনে শক্তি আর সাহস নিয়ে আয়,উঠে দাঁড়া।’

ততক্ষণে এই শীতেও পুরো ঘেমে নেয়ে গেছি আমি।শ্বাস যেন বন্ধ হয়ে আসছে ভয়ে।বুঝলাম,প্রাণের মায়া ত্যাগ করেই শশীদা এখানে আমায় বাঁচাতে এসেছে।মনের জোরে উঠে দাঁড়ালাম।পা কাঁপছে।তবুও ভাবছি বের হতেই হবে।

শশীদা আমার হাত ধরে আছে।আমরা দরজার দিকে এগোতেই প্রবল হাওয়া শুরু হল।সেই বাংলোর চেহারা যেন বদলে গেল নিমেষে।যত্রতত্র পড়ে থাকা শুকনো পাতাগুলো উড়ে এসে চোখেমুখে পড়তে লাগল।পুরো বাড়ির দরজা,জানালা দুমদাম্ আওয়াজে বন্ধ হয়ে যেতে লাগল।এমনকি আমাদের সামনের দরজাটিও।।সারা বাড়িতে ভ্যাপসা গন্ধ বের হচ্ছে।ঝুল জমে আছে চারিদিকে।তখন অসীম সাহস এসে যেন ভর করল শশীদার ভেতরে।এক হাতে আমায় ধরে ছিল আর পা দিয়ে সজোরে আঘাত হানল সামনের ভাঙ্গাচোরা,জীর্ণ কঠের দরজাটিতে।মুহূর্তে ক্যাড়ক্যাড় শব্দে খুলে গেল দরজাটি।বাইরে তখন ঘুট্ঘুটে আঁধার নেমেছে।ইতিউতি উড়ে বেড়াচ্ছে জোনাকিরা।সাথে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা মাথা যন্ত্রণা সৃষ্টিকারী আওয়াজ।দৌড়ে বের হলাম আমরা দরজা দিয়ে।

পিছন থেকে আর্ত – চিৎকার শুনতে পেলাম,’please don’t go Taraknath…Taraknath,please come back…we’re friend…I’ve been waiting for you for a long time…Taraknath…’

চারপাশে সব জিনিসপত্র পড়ে যাওয়ার আওয়াজ শুনতে -শুনতে আমরা সেই অন্ধকারেই পথ হাতড়ে রুদ্ধশ্বাসে বাংলোর গেট খুঁজে পেতে চলেছি।।কিছুদূর এগিয়ে শশীদা পকেট হাতড়ে টর্চ বের করে জ্বালাতেই দেখলাম আমরা গেটের কাছে পৌঁছে গেছি।আর একমুহূর্ত সময় নষ্ট না করে আমরা আবার সবকিছুকে পিছনে ফেলে,সেই অভিশপ্ত বাংলোকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চললাম।প্রায় দশ মিনিটের মতো পথ দৌড়ে গিয়ে  আমরা বিট অফিসারের জিপে উঠলাম।বাংলোয় প্রবেশের পথ সংকীর্ণ হওয়ায় জিপ নিয়ে বিট অফিসার সাহেব এখানেই আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।আমরা জিপে উঠতেই গাড়ি স্টার্ট দিলেন তিনি।তখন আমার বুকের ভিতরে যেন হাজার হাতুড়ির আঘাত অনুভব করছিলাম।অবশেষে সেই রাত বিট অফিসারের বাংলোয় থেকে আমরা আমাদের রুদ্ধশ্বাস সফর শেষ করে আসামে ফিরলাম।

এতক্ষণ আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম।গল্প থামাবার পর আমার চেনা ছোটোদাদুকেই ভীষণ অচেনা মনে হতে লাগল।কৌতূহলী হয়ে বললাম,’ছোটোদাদু,তবে কি তারকনাথ তোমার আগের জন্ম ছিল?’

কিছুক্ষণ বেশ চিন্তিত দেখাল তাকে।শেষে বললেন,’জানিনা ভাই,হয়তো তাই।তবে আমি আর সেইসব দুঃসহ স্মৃতিচারণ করে কষ্ট পেতে চাইনা।এই ঘটনা আমি আজ পযর্ন্ত কাউকেই বলিনি।’

বেশ ভারাক্রান্ত দেখাল ছোটোদাদুর মুখ।

ছোটোদিদা এসে বললেন,’তোমাদের চা যে ঠান্ডা হয়ে জল হয়ে গেল।আবার চা করে আনছি তাহলে।খাবারগুলো কতক্ষণ পড়ে রয়েছে, সবাইমিলে খেয়ে নাওতো এখন ঝটপট।’

হিমেশ বলল,’ছোটোদিদা,জানো ছোটোদাদু আগের জন্মে তারকনাথ ছিল।’

ছোটোদিদা হেসে বললেন,’ছাড় তো ভাই…তোর দাদু তো বানিয়ে কম গল্প বলে না।’

‘ও তারমানে তুমিও এতক্ষণ ধরে গল্প শুনলে তো?’,বলল হিমেশ।

‘না রে,এইমাত্র এলাম আমি।তোরা খাবার খাচ্ছিস কিনা দেখতে।এসে দেখি সবই পড়ে রয়েছে।ছাড় ওসব’,বলেই চায়ের কাপগুলো নিয়ে রান্নাঘরে গেল।

কিন্তু আমি ওই আলোতেও খেয়াল করেছি চোখের কোনটা জলে ভিজে চিকচিক করছিল ছোটোদিদার।বুঝলাম সব শুনেছে।কেন যেন এড়িয়ে যেতে চাইছে! নিজের স্বামীকে তারকনাথবাবু ভেবে অচেনা করে তুলতে হয়তো দিদার ভালো লাগছে না মোটেও কিংবা দাদুকেও আর চিন্তার গভীরে গিয়ে মন খারাপ করতে দিতে চান না তিনি।

পরিস্থিতি বুঝে আমি বললাম,’হিমু(হিমেশ),পটলা নে তো রে ভাই,খেয়ে নেতো।ও ছোটোদাদু,খাও।দেখো বড়াগুলোও ঠান্ডা হয়ে কেমন নেতিয়ে পড়েছে।’

-‘খাচ্ছি।(ধরা গলায় বললেন ছোটোদাদু)

সমাপ্ত~

Check Also

রুমমেট – সৌমেন ঠাকুর

রুমমেট – সৌমেন ঠাকুর প্রথম প্রথম ভেবেছিলাম সম্পূর্ণটাই আমার মনের ভুল । বন্ধুদের বলতে ওরা …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।