Breaking News

বাবুর রথদেখা – ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

বাবুর রথদেখা
– ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

ঘরের মধ্যে খাট ভর্তি বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুকতারা, আনন্দমেলা আরও কতরকমের কমিক্স এর বই। পাখার হাওয়ায় বই এর পাতাগুলো ফটাফট আওয়াজ তুলে চলেছে ক্রমাগত। বই এর মেলার মাঝেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। মা’র সাথে সারা দুপুর রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমানের বিস্তর পর্ব চালিয়ে একসময় বইএর পাতায় মুখ গুঁজে, ঘুম পরীদের ডাকে চোখের পাতা মুদেছে। সুরঞ্জনা যখন ঘরে এল। দেখল যে ছেলে কিছুক্ষণ আগে মা’র সাথে আদর মাখা ঝগড়া বাঁধিয়েছিল, সেই এখন পরম তৃপ্তি তে ঘুম পরীদের দেশে পাড়ি দিয়েছে। পরম মমতায় মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়ে, বইএর মেলা সযত্নে গোছগাছ করে ছেলের ঘর থেকে খুব সন্তর্পনে বেরিয়ে গেল।

এবছর একটা ভাইরাসে সারা দেশ জর্জরিত। জাঁকিয়ে বসেছে সে। সব কিছু পন্ড করেছে এক নিমেষে। অস্বাভাবিক ছন্দে ছন্দপতন ঘটেছে সব কিছুর। স্বাভাবিক ছন্দে ফেরত আসা অবধি অপেক্ষা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সেই কবে থেকে ঘরবন্দি সবাই। বড়োদের থেকেও বেশী কষ্ট বাচ্চাদের। স্কুল বন্ধ। পার্ক বন্ধ। বন্ধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। স্বাভাবিক ভাবেই বিরক্ত হয়ে উঠেছে সুরঞ্জনার বছর দশের ছেলে বাবু। বন্ধুদের সাথে দেখা না হওয়ায় খেলাধূলা বিদায় নিয়েছে তার জীবন থেকে। একটা বাচ্চাকে কাঁহাতক বোঝানো যায়! সুরঞ্জনাও পারেনি। একটা সময় সেও বাবুর আবদার মেটাতে না পারায় নিজেকে অসহায় ভেবেছে।

বছরের পর বছর ধরে এই দিনটার জন্য বাবু অধীর আগ্রহে থাকে। এবছরও তার অন্যথা হয়নি। তার বাচ্চা মন। সে কি আর বোঝে! সবকিছুই এবারের মতো পন্ড হয়েছে। সুরঞ্জনা, বুঝিয়েও বোঝাতে পারেনি ছেলের শিশু মনকে। একটা সময় নিজের কাছে নিজেকেই পরাজিত মনে হয়েছে। মনে মনে রাগ ও করেছে সে।

আজ সেই রথের দিন। জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি যাবার দিন। এই সময়টায় বাবু’র বাড়ির সামনে রথের মেলা বসে। সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি চলে সেই মেলা। লোকে লোকারন্যে একটা জনসমুদ্রের ঢল নামে রাস্তা জুড়ে। খেলনা, গাছগাছালি, ঘুগনি-পাপড়; মন্ডা-মিঠাই আরও কত হরেকরকমের দোকানের উপস্থিতি বিরাজ করে গোটা মেলায়। সন্ধ্যা থেকে চলে হকারদের হাঁকডাক। এই দিনটার জন্যই বাবু মুখিয়ে থাকে।

প্রতিবছর মা’র সাথে বাজারে গিয়ে একটা পছন্দসই রথ কিনে আনে বাবু। বাড়ির বাগানে থাকা ফুল-পাতা দিয়ে সাজানো হয় সেই রথ। তিনতলার রথে একদম ওপরে থাকেন, জগন্নাথ -সুভদ্রা-বলরাম। মাঝে থাকে পাঁচরকমের মিষ্টি। নীচের টা শূন্য রাখা হয়। বিকেলে সাজানো রথ নিয়ে পাড়ায় বেরোলে, পাড়ার দাদু-ঠাকুমা, জেঠু-জেঠিমা; কাকু-কাকিমারা রথের নীচের তলা ভরিয়ে দেয় খুচরো পয়সা দিয়ে। বাবুর টানা রথে তাঁদের সাক্ষাৎ জগন্নাথ দর্শন হয়।

নিজের রথ টানা শেষ করে, মা-বাবার সাথে হাত ধরে বাড়ির সামনের রথের মেলায় যায়, বাবু। মেলায় গিয়ে নিজের পছন্দ মতো গাড়ি কিনে গোটা মেলা চরকির মতো মা-বাবার সাথে ঘুরে বেড়ায়। নানান রকমের আলো, হরেক রকমের দোকানের পসরা দেখে বাবু মাঝে মাঝে আপনমনে হাততালি দিয়ে ওঠে। ছোটোদের জন্য রাখা মেরি -গো -রাউন্ডে চড়ে মজা করে। বাড়ি ফেরার পথে ঠোঙায় মোড়া জিলিপি আর পাপড় নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফেরে।

এবছর সেসব কিছু না হওয়ায়, বাবুর রথ দেখায় ব্যঘাত ঘটায় খুবই বিরক্ত সে। দুপুরে মা’র সাথে অভিমান করে, অভিমান ভরা মুখে ঘুমিয়ে পড়ে। ছেলের অভিমান কাটাতে, সুরঞ্জনা স্টোর রুম থেকে খত বছরের পুরোনো রথটা বের করে। সেটাকে জল দিয়ে ধুয়ে ঝাঁ চকচকে করে, বরাবরের মতো বাগান থেকে ফুল-পাতা তুলে এনে রথটাকে মনের মতো করে সাজিয়ে তোলে। ঘরে থাকা ঠাকুরের সিংহাসন থেকে জগন্নাথ -সুভদ্রা-বলরামের মূর্তিটা বের করে রথের একদম ওপর তলায় রেখে দেয়।

ছেলের ঘুমোনোর ফাঁকে মিষ্টির দোকান থেকে কিছু মিষ্টি সমেত জিলিপি নিয়ে আসে। কিছুটা মিষ্টি রথের দ্বিতীয় তলায় রাখে। নীচের তলায় ভরিয়ে দেয় দেরাজে সযত্নে রাখা অনেক খুচরো দিয়ে। রথ সাজানোর কাজ শেষ করে, ছেলের জন্য একটা বড়ো হটপট ভর্তি করে পাপড় ভেজে রাখে। একটা ভাইরাস তার ছেলের ‘রথ দেখা’ আটকাতে পারে না! সুরঞ্জনা, মা হয়ে ছেলের খুশির জন্য শয়তান ভাইরাস কে হার মানাতেও দ্বিধা করে না। তাই সে, ছেলের অজান্তেই আয়োজন টা বেশ পরিপাটি করে সেরে রাখে।

সাজানো রথটা রেখে দেয় বাবুর ঘরে। ঘুম থেকে উঠেই প্রথম নজরে আসে সেই সাজানো রথ। ঘর থেকেই, ‘মা’ ‘মা’ করে চিৎকার করে ওঠে বাবু। তার গলার আওয়াজে খুশির ঝিলিক স্পষ্ট। একছুটে সুরঞ্জনা ছেলের ডাকে ঘরে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে,

-‘তুই যে আমার সোনা মাণিক’।
-‘তোর রথ দেখা হবে না! তোর মা থাকতে’?

বাবু, সুরঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরে দু’গালে দু’টো চুমু দেয়। ঘর থেকে দড়ি ধরে রথটা টেনে আসে। গোটা ঘর ঘুরতে থাকে খুশিতে। এরকম অবস্থায় সুরঞ্জনা ছেলের সামনে তুলে ধরে কয়েকটি জিলিপির সাথে কয়েকটি পাপড়।

আসছে বছর আবার হবে। এই আশায় বাবু পরম তৃপ্তিতে জিলিপির উপর কামড় বসায়। মা’র সাজানো রথ নিয়ে সারা ঘরে খুশিতে নাচতে থাকে। ছেলের এইরকম ছেলেমানুষি সব মা’র কাছেই পরম সুখের। এই সুখ স্বর্গীয় সুখ তুল্য। মান- অভিমান ভুলে মা-ছেলের আবারও কড়ি আঙুলের আড়ি থেকে বুড়ো আঙুলের ভাব হয়েছে। ছেলেকে খুশি করতে পেরে, সুরঞ্জনার চোখের কোন চিকচিক করে উঠল। বাবু তখনও পরম খুশিতে রথ নিয়ে এঘর – ওঘর করছে। সাথে জিলিপি-পাপড়ে কামড় বসাচ্ছে।
বাড়ি বন্দি থেকেও ছেলের রথ দেখার ঠিকঠাক আয়োজন করেছে সুরঞ্জনা। বাবুর রথ দেখাকে তার মা, সুরঞ্জনা সফল করেছে।

Check Also

নিষ্ফল প্রণয় – মোহন দাস

কেউ কেউ আজও হাসে বাঁচে মিথ্যা স্বপ্নকে আঁকড়ে ধ’রে, কেউ কেউ হারছে অনবরত হারছে; দুঃস্বপ্ন …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।