আপনার লেখা প্রকাশিত হলে তার লিংক সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন...।
এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি বা যাবতীয় কার্যকলাপের আইনগত দায়দায়িত্ব নবদিবাকর পত্রিকা বহন করে না...।

গল্পঃ আমাদের গল্প রচয়িতাঃ দীপঙ্কর সেনগুপ্ত


গল্পঃ আমাদের গল্প
রচয়িতাঃ দীপঙ্কর সেনগুপ্ত
রচনাকাল ঃ ০৬-০৬-২০২১
কৌশিক ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো পারমিতা কে। দুজন দুজনকে খুব ভালবাসত। কিন্তু কোথা থেকে কি হয়ে গেলো আজ পারমিতা তার বাবার বাড়ী । কোন যোগাযোগ নেই দুজনের। কৌশিক কয়েকবার ফোন করেছিলো । ফোন কেটে দিয়েছিল। কয়েকটা এসএমএস করেছিলো একবার দেখা করবার জন্য কিন্তু উত্তরে এসএমএস এসেছিলো ‘আমাকে আর ফোন বা এসএমএস করবেন না , না হলে আমি আইনের সহায়তা নেব, সেটা আপনার সুখের হবে না।“
কৌশিক আর কোন যোগাযোগ করেনি। কিন্তু মাঝে মাঝে পারমিতার বাড়ীর সামনে দিয়ে যায়, ওদের বারান্দায় তাকায়। কিন্তু দেখতে পায় না। খোঁজ রাখে। মাঝে নাকি কোথায় কিছুদিন গিয়েছিলো। পারমিতার অফিসের একজন স্বপ্না মাঝে মাঝে পারমিতার খবর দেয়। একদিন ওর ছবি তুলে কৌশিক কে পাঠিয়েছিলো।
কৌশিক ছবিটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো ওকে ছেড়ে থাকার কোন যন্ত্রণা পারমিতার চোখে মুখে ফুটে ওঠে কিনা। না সে খুঁজে পায়নি। পারমিতার হাসিটা সেই আগের মতই আছে। এই হাসিটা ওকে মুগ্ধ করেছিলো। আর ওর চোখদুটো যেন কোন চিত্রকরের আঁকা । ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলে বলত “ কি দেখো আমার চোখে? তোমার চোখে পোকা ঢুকে যাবে।“ কৌশিকের চোখে হাত দিয়ে বলত “ ধ্যাত কি হচ্ছে? আমার অস্বস্তি হয় ।“
আরো কত স্মৃতি ঘিরে আসছে মনে। প্রথম দেখা হবার দিনটা আজও মনে আছে। মনোজ এর বাড়ী তে গিয়েছিলো, মনোজ হল ওর সহপাঠী, এক বাল্য বন্ধু। মনোজের বাড়ীতে নিমন্ত্রণ ছিল। মনোজের বোন টিনার সাথে সেদিন ওখানে এসেছিলো। টিনা আলাপ করিয়ে বলেছিলো “ কু দা এর নাম পারমিতা আমার কলেজের বন্ধু। খুব ভালো আবৃতি করতে পারে আর খুব ভালো গান ও করতে পারে। আর পারমিতা এনার নাম কৌশিক দা, খুব কম কথা বলে বলে আমি কু দা বলেই ডাকি। তাতে আপত্তি করেনি। দাদার বাল্যবন্ধু। আর চাকরী করেন একটা বেসরকারী কম্পানীতে। আর একদিকে কবি ও সাহিত্যিক । নাম শুনেছিস বোধহয় লেখক চৈতন্য । এই কু দার ছদ্মনাম।“পারমিতা  বলে উঠেছিলো “ কি সৌভাগ্য আমার এত বড় সাহিত্যিক! নমস্কার।“ঝপ করে বসে পরে পাসের চেয়ারে বলে “এই টিনা আজ আমি অনাকে ছাড়ছি না তবে অনাকে কু নামে ডাকতে পাড়ব না কৌশিক বলেই ডাকব।“
সেদিন কৌশিক কেমন বোকার মত পারমিতার দিকে তাকিয়েছিলো আর কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল, ঘোর কেটেছিল মনোজের ডাকে। মনোজ বলেছিল “কি রে কি হোল তোর? চল আমরা ছাতে যাই। জো পলায়তি বো জীবতি… হেঁসে বলেছিলো।“
সেদিন থেকে পারমিতার চোখ আর কথাগুলো বার বার ভেসে উঠছিল। পরে টিনার কাছ থেকে পারমিতা কৌশিকের ফোন নং টা নিয়েছিলো। একদিন রাতে ফোন করে বলেছিল “ কি মশাই চমকে উঠলেন তো? আমি পারমিতা টিনার বন্ধু , আজ আপনার লেখা “পৃথিবীর আলো” আমাকে অভিভূত করে তুলেছে। কি করে লেখেন বলুন তো? পৃথিবীর আলোর চরিত্র কাকুলি কি আপনার প্রেমিকা?”
উত্তরে বলেছিলো “ কি যে বল? আমার আবার প্রেমিকা?”
------কেন? দেখতে তো বেস আর রসবোধ ও আছে। কিন্তু ওই যে সারাদিন কি ভাবেন কে জানে? কথা বলতে চান না কেন?
-------ওটা আমার স্বভাব ।
------দেখা করবেন আমার সাথে? কিছু মনে করলেন না তো?
কৌশিক থতমত খেয়ে কি বলবে ভেবে পাচ্ছিল না শুধু বলেছিলো “ভেবে দেখি।“
----অত ভাবার কিছু নেই , আমি আপনার একজন ফ্যান। সাম্নের রবিবার আমার জন্মদিন। আমার জন্য একটা কবিতা লিখবেন ?
------ও ঠিক আছে লিখব, কোথায় দেখা করব?
-----পুস্পিতা রেস্টুরেন্ট , ওই হাজরা আর হারিশ মুখার্জি রোডের ওপরে, রবিবার সন্ধ্যে ৬ টায় আসুন আমি থাকব।
সেই রবিবার কৌশিক পৌঁছে যায় পুস্পিতা রেস্টুরেন্টে। ছোটখাটো রেস্টুরেন্ট। কিন্তু বেশ পরিস্কার পরিছন্ন । ঢুকে দেখে পারমিতা বসে আছে। ওকে দেখামাত্র বলে ওঠে “ এই যে আমি এখানে, এখানে আসুন।“
কৌশিক গিয়ে বসে টেবিলে। বলে “ মেনি মেনি রিটার্ন অফ দা ডে, হ্যাপি বার্থ ডে ।“
---- ধন্যবাদ কিন্তু আমার গিফট?
কৌশিক বলে “ এই আমাআর গিফট আমার লেখা নতুন বই প্রথমা , কয়েকদিন বাদে পাবলিস্ট হবে। এটা আমার উপহার।“
----ওয়াও দারুন এটা বোনাস , কিন্তু এটা আমার গিফট নয়।
----আছে শুনিয়ে দেব আর বইটার ভিতরে লিখে দিয়েছি । পড়ে নিও। আজকের খরচ আমার ।
----- না আমি করব খরচ। আমি এটা করতে দেব না।
কৌশিক কিছু বলে না। পারমিতা খাবারের অর্ডার দিল। ফ্রুট জূষ এসে যায় । বলল “ খান আমার খুব প্রিয়। আজ ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করে যাবেন প্লীজ। অনেক কিছু জানতে চাই। বলবেন তো?”
----বেশ বলুন
----আমাকে যেটা লিখেছেন সেটা আবৃতি করে শোনাবেন?
----আমি কোনদিন আবৃতি করিনি। বেশ চেষ্টা করছি।
আকাশের চাঁদে আঁকা বাঁকা রেখাগুলো
কিছু কথা লিখে রেখেছে বলিরেখাগুলো।
বন্ধু সকল চেয়ে থাকে চাঁদের আঁখি ভরে
মিতার সাথে মিলবো আসব পথ ধরে।
জন্মদিনের অনেক শুভেচ্ছা প্রান ভরে
পাহাড়ের চুড়ায় নিঃশ্বাস পরে আকাশে
ভালোবেসে থাকবো তোমার আশেপাশে।

পারমিতা কেমন বিস্ময়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল “ সত্যি? থাকবেন আপনি? আমি কি তেমন ভাগ্যবতী?”
------আচ্ছা তুমি বলে খুব ভালো গান কর । একটা শোনাবে ?
---- এখানে? ঠিক আছে ছোট্ট গান করি, জানি না ভালো লাগবে কিনা। আজ আমার জন্মদিন আমি অখুসি রাখি কি করে ? শুনুন তাহলে, গানটা রবি ঠাকুরের, আজ কেন জানিনা গানটা খুব মনে পড়ছে শুনুন তবে
আমি    তোমার প্রেমে হব সবার কলঙ্কভাগী।
আমি    সকল দাগে হব দাগি॥
তোমার পথের কাঁটা করব চয়ন,    যেথা তোমার ধুলার শয়ন
     সেথা আঁচল পাতব আমার-- তোমার রাগে অনুরাগী॥
আমি    শুচি-আসন টেনে টেনে     বেড়াব না বিধান মেনে,
     যে পঙ্কে ওই চরণ পড়ে তাহারি ছাপ বক্ষে মাগি॥
কেমন লাগলো?
----কৌশিক কণ্ঠে ও সুরে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলো “ অপূর্ব অপূর্ব। আমি কি সেই প্রেম পাবো?”
পারমিতা হেঁসে বলেছিলো “ ঢিল ছুরছেন! “
কৌশিক লজ্জা পেয়ে বলেছিল “ কিছু মনে করো না? সরি।“
----- না না কিছু মনে করব কেন? আমি সোজা সাপটা মানুষ । আপনাকে ভালো লেগেছে এটুকু বলতে পারি। আপনি মানুষ টা ভীষণ ভালো তবে মনটা যেন কেমন ভীষণ কিপটে।
সেই দিনটা ভুলতে পারেনি । সেদিন রাতে ফিরে এসেছিলো। ভেবেছিলো ফোন করবে । একটা এসএমএস করে জানিয়ে ছিল “ দিনটা মনের খাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।“
উত্তর এসেছিলো ফোনে রাত সারে বারোটা র পর , “ হ্যালো মশাই শুধু এটুকুই? আপনি আর কিছু মনে রাখতে চান না?”
------ হ্যাঁ তোমাকে, আর তোমার গানে তুমি বলাটা বেশ সুন্দর।
-----তার মানে? সোজাসুজি বলতে পারেননা ? ঘুরিয়ে কেন বলেন? তুমি করে বলতে হবে?
-----অসুবিধা আছে?
------ও মা বেশ বললে তো!
----- আর একটা গান শুনতে চাই শোনাবে?
-----টিনা কে বলব? তুমি এতো রাতে আমাকে বিরক্ত করছ?
----এই না না থাক গুড নাইট কাল কথা হবে
ফোন কেটে দিয়ে চোখ বুঝে ছিল। একটা এসএমএস এলো “ বোকা হাদারাম একটা, কিছু হবে না লেখা ছাড়া, এই জন্য কেউ ধরা দেয়না। শুভ রাত্রি।“
সেই শুরু তারপর তিন বছর প্রেম, লেখার প্রেরনা পেয়েছিল অনেক , প্রতিটি লেখার সমালচক দের সমালোচনার জবাব দিত ও নিজেই।
প্রেম পর্ব কাটার পর বিবাহ পর্ব। দম্পত্য জীবন বেশ চলছিল কিন্তু মেঘ জমল এক সমালোচক কে নিয়ে, কৌশিকের লেখা “ বিবাহ বিভ্রাট” । সত্যি সেই বিভ্রাট তৈরী হোল। সেই সমালোচক লিখলেন “লেখক আপনার নাম কি শেখর? ছদ্ম নাম চৈতন্য? আপনি আমাকে চিনতে পারছেন না ? আমি রুচিরা আপনি যাকে বিবাহ মণ্ডপ থেকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন?’
পারমিতা জবাব দিয়েছিলো কঠিন ভাবে “ উনি আমার প্রান আমার স্বামী অনাক আসল নাম দিয়ে আপনার কি দরকার? আর ওর নাম শেখর নয়।“
উত্তরে কিছুদিন বাদে পুলিশ এসে কৌশিক কে গ্রেফতার করে নিয়ে গিয়েছিলো। অনেক উকিল ধরে তাকে মুক্তি করিয়েছিলো পারমিতা। কারণ এই সেই লেখক যে রুচিরা নামক মহিলাকে বিবাহ আসর থেকে উঠে চলে গিয়েছিলো । সেই মহিলা আত্মহত্যা করেছিলো শেখর কে দায়ী করে । কেন জানিনা সেই মহিলার পক্ষ নিয়ে অনেকে মিথ্যে সাক্ষী দিয়েছিলো। সেটাই পারমিতা কে বিশ্বাস করিয়েছিল । যেদিন চলে যায় সেদিন বলেছিল “ তুমি ঠকবাজ আর ধোঁকাবাজ, একটা মহিলার জীবন নষ্ট করে দিয়েছো। আর তোমার সাথে সংসার করা যায় না। আমি চললাম পরে ডিভোর্স এর কাগজপত্র পাঠিয়ে দেব।“ সেদিন বেড়িয়ে গিয়েছিলো। কিছু বলার সুযোগ দেয় নি।
কৌশিক অনেক চেষ্টা করেছিল। পারমিতার মা বাবা ও মুখের ওপর দড়জা বন্ধ করে দিয়েছিলো। আজ কেসের হেয়ারিং ছিলো। প্রমান অনেক দেও্যা হয়েছে। কৌশিকের উকিল জানিয়েছে কেস টা আমরা জিতব। কিন্তু এ কি হোল এত শরীর খারাপ লাগছে কেন ? বিছানা থেকে উঠতেও পারছে না। জ্বর বেরে চলেছে। ফোন বেজে চলেছে। ধরবার ক্ষমতা নেই । কখন যেন সব অন্ধকার নেমে এসেছিলো টের পায়নি।
কয়েকদিন পর হুঁশ আসে দেখে সে একটা রুমে একা শুয়ে আছে, সামনে একজন নার্স বললেন “ কেমন আছেন? একটু ভালো লাগছে?” বলেই পাল্স দেখল, বিপি মেসিন লাগিয়ে প্রেসার মাপল । বললেন “এই ওষুধ খান।“ একটু মাথাটা তুলে মুখে ওষুধ দিয়ে জল দিলেন। কৌশিক বলল “ আচ্ছা আমি কোথায় আছি বলুন তো?”
------আপনি আমাদের নার্সিং হোমে আছেন ।
----- নাম কি?
-----আপেক্স নার্সিং হোম ।
-----কতদিন ?
---আজ নিয়ে আট দিন। বেশি কথা বলবেন না, একটু ঘুমবার চেষ্টা করুন।
নার্স চলে গেলো। আট দিন ভর্তি? কি করে ও এলো? কিছুই মনে পড়ছে না। শুধু মনে পড়ছে ফোনটা বাজছিল। জ্বর হয়েছিলো , ফোনটা হাতে নিয়ে কোনরকমে হ্যালো বলেছিল তারপরে আর কোন হুঁশ ছিলো না।
কে নিয়ে এলো ? এই সব চিন্তা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়লো। এবার ঘুম ভাঙল । মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে কে?
“ এখন কেমন লাগছে?”
----তুমি পারমিতা?
-----হ্যাঁ তুমি অসুস্থ হয়ে ঘরে পরে ছিলে, কয়েকদিন যমে মানুষে টানাটানি। এখন কেমন আছো?
-----তুমি কেন এলে?
---কি করব? এখন তো অফিশিয়ালি আমি তো তোমার স্ত্রী তাই না?
----ও
-----তুমি আগের থেকে ভালো অনুভব করছ তো/
----হুম
---- শোন তুমি এখন সুপ ছাড়া আর ফলের রস খাবে । আমি ফলের রস করে এনেছি । ওঠ খেয়ে নাও।
-----আমি খাব না
----জেদ করবে না ওঠ খাও।
----আমার গলা দিয়ে নামবে না।
-----ওঠ খেয়ে নাও …
কৌশিকের মাথা ধরে তুলে বসিয়ে জুসের গ্লাস ধরে বলল “খাও”
কৌশিক খেতে খেতে বলল “ভালো লাগছে না। মুখে স্বাদ নেই।“
“কিরে কৌশিক কেমন আছিস? “মনোজ ঢুকল , “যা খেল দেখালি। উফ, আগে থেকে আমাকে বললে আমি ডাক্তার নিয়ে আসতাম।“
---- তুই আমাকে ভর্তি করেছিস?
“ তোমরা কথা বল আমি একটু ডাক্তার এর সাথে কথা বলে আসি শোন তোমাকে সূপ খেতে হবে কিন্তু। মনোজ দা তুমি বোঝাও ওকে। ওকে সুস্থ হবে।“ পারমিতা চলে গেলো।
মনোজ কাছে এসে বলে “ তুই এখন কেমন বোধ করছিস?
--- একটু ভালো। কি হয়েছিল রে আমার?
------জ্বর আর সাথে সেরিব্রাল । কি এত চিন্তা করিস তুই ?
---- কিন্তু পারমিতা? ও কি করে জানলো?
-----ওকে আমি খবর দিয়েছিলাম। তোকে আমি ফোন করেছিলাম তুই ফোন ধরে হ্যালো বললি তারপর একটা শব্দ, ফোনটা সুইচ অফ হয়ে গেলো। আমি তারতারি তোর ফ্লাটে এসে নক করলাম কোন সব্দ পেলাম না। সিকুরিটি কে বললাম একটা চাবি বানান লোক কে ধরে আনতে। আমি পারমিতা কে ফোন করে বলি যে তোদের ঘরের চাবি বানাচ্ছি ঢুকব বলে, কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। পারমিতা বলল যে ওর কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। ও কিছুক্ষণ বাদেই চলে আসে। দড়জা খুলে দেখি তুই নিস্তেজ হয়ে মাটিতে পরে আছিস।
পারমিতা আম্বুলেন্স দেকে আনে, তারপর তোকে এখানে ভর্তি করে। যমে মানুষে টানাটানি। কি দিন গেছে। সারাদিন পারমিতা তোর কাছে সারারাত আমি এখানে । মেয়েটা কি কান্নাকাটি করেছে রোজ আর প্রত্যকদিন সকালে পূজো দিয়ে তোর কপালে ফুল ঠেকিয়েছে আর চোখের জল ফেলেছে।
-------কিন্তু ও তো আমায় ডিভোর্স দেবে আমাকে তো ভালবাসে না।
“ মনোজ দা ওকে বলে দাও আমি ওকে ভালোবাসি না। কিন্তু ওকে সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরে যেতে হবে তারপর আমার ছুটি।“ পারমিতা ঘরে ঢুকল।
----ডাক্তার কি বলল ? কবে ছারবে?
----মনোজ দা ওকে এখন ৭২ ঘন্টা  অব্জারভেসন এ রাখবে তারপর। আমি কয়েকটা ওষুধ কিনে আনি । এই যে তুমি সূপ টা খেয়ে নিও প্লীজ।
পারমিতা বেড়িয়ে যায়। কৌশিক বলে “ এসবের মানে কি? ও কি আমাকে বাঁচতে দেবে না শান্তি তে মরতেও দেবে না?”
-----ধুর বোকা তুই বুঝবি না ওই দেখ টিনা এসেছে, টিনা কথা বল, আমি একটু আসছি।
----কেমন আছো কু দা? এ কি করলে? কি এত চিন্তা তোমার ? পারমিতা কে কাঁদালে? কি লাভ পেলে?
----টিনা আমি কিছুই করিনি । তোর বন্ধু আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমাকে অপমান করে গেছে ।
------কেন সেটা বোঝোনি?
------আমি তো কোন পরকীয়া করিনি?
----- তুমি বোঝাতে পারনি , উলটে তুমি রুচিরা কে মজা করতে গিয়েছিলে কেন?
------ আমি ? ও হ্যাঁ বলেছিলাম আমি শেখর যদি হই সে  আমাকে ছেরে চলে যাবে? সেদিন আমার সাথে কথা বলে নি। কিন্তু আমি তো শেখর নই । আর রুচিরা কে আমি তো চিনিও না।
------কিন্তু অনেকে তোমাকে শেখর বলে সাক্ষী দিয়েছিলো । তখন তুমি প্রতিবাদ করো নি কেন?
-----কি প্রতিবাদ করব? মারকুটে মানুষেরা আমাকে মেরে ফেলত।
“ ওকে বলে দে টুনি ও যে শেখর কে চিনত কেন বলেনি? মহান সেজেছিলো মহান হতে চেয়েছিল।“ পারমিতা ঘরে এলো।
“নে তোরা তোদের মান অভিমানের পালা মিটিয়ে ফেল আমরা কেউ কাবাবে হাড্ডি হতে চাই না।  পরে দাদা কে নিয়ে আসব। যা খেল দেখালি তোরা।“ টিনা বেড়িয়ে গেলো ।
---এই যে জুস খেয়েছ?
---- না ইচ্ছে করছে না
----- একটা কথা বলবে? শেখর কে তুমি চিনতে বলনি কেন?
----থাক না ওসব কথা।
-----রুচিরা কে তুমি চিনতে না?
----না কোনদিন দেখিনি তবে নাম শুনেছি শেখর এর কাছে।
-----শেখর কে বাঁচালে কেন ?
-----ও ক্যানসারে আক্রান্ত ভর্তি আছে চিত্তরঞ্জন হাসপাতালে, আয়ু আর মাত্র কয়েক মাস বা বছর তাই ওকে আর কষ্ট দিতে চাইনি
-----আমাকে বলনি কেন?
-----শুনতে চেয়েছ? আমি তো খারাপ
দু চোখ দিয়ে জল বেড়িয়ে আসে,বলে “ আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিয়ে কি প্রমান হয়েছিলো? আমাকে কাগজ দিও সই করে দেব, ও হ্যাঁ আমার চিকিৎসার টাকা কত খরচ হয়েছে বলে দিও তোমার আকউন্ট এ ট্রান্সফার করে দেব।“
------ হয়েছে বলা? এবার আমি বলি?
কৌশিক চুপ করে থাকে, পারমিতা ওর চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বলে “ পুরুষ মানুষের চোখে জল মানায় না । তুমি না আমার একান্ত আপন!”
কৌশিক চুপ করে থাকে, পারমিতা বলে চলে
“ শেখর তোমার ফোনে ফোন করেছিলো আমি ধরে ছিলাম , সে বলেছিলো সে পুলিশের কাছে যাবে সব বলবে, তার এই কঠিন রোগের খবর পেয়ে বিয়ের আসর ছেড়ে মিথ্যে বলে চলে গিয়েছিল। তুমি ওদের কথা বিবাহ বিভ্রাটে তুলে ধরেছিলে। শেখর তোমার লেখা বই দেখিয়ে সে বলেছিল চৈতন্য নামে সে লেখে। মেয়েটি সরল বিশ্বাসে সব বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু সে যে আত্মহত্যা করবে সেটা সে বঝে নি । আর তুমি একদিন ওর সাথে ওদের পাড়ায় গিয়েছিলে। তাই অন্যেরা তোমাকেই শেখর বলে পরিচয় দিয়েছে। জানো শেখর কোর্টে ওর নিজের বয়ান ও কিছু প্রমান দিয়েছে। ও এসেছিলো তোমাকে দেখতে, আর কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল “তুই আমার আগে চলে যাবি ? না তা হয় না হে ইস্বর আমার আগে ও যেন না যায় ওকে বাঁচিয়ে রাখুন।“ খুব কেঁদেছিল।
শেখর বলে “ আমার ফোনটা দাও।“
-----দেব এই নাও, সেদিন তোমার ফোনে অনেকবার ফোন করেছিলাম , সুইচ অফ বলেছিল। একদিন খুলেছিলাম ফোনটা তোমার অফিসে জানাই, সেদিন ই শেখর ফোন করেছিল।
-----আচ্ছা এবার ঘুমোব ঘুম পাচ্ছে।
-----আমাকে ক্ষমা করবে না? এত বোকা কেন তুমি? আমি যদি চলেই যেতাম তাহলে ডুপ্লিকেট চাবি কেন রাখতাম?
-------আমি ঘুমাব। তুমি এসো।
“কিরে কৌশিক আমি যে ভুল করেছি সেই ভুল তুই ও করছিস” শেখর । কেমন শীর্ণকায় চেহারা , হারের ওপর শুধু চামড়া।
পারমিতা ওকে ধরিয়ে বসায় বলে” শেখর দা আপনি কেন আবার এলেন? “
---- না বৌদি আম ওকে চিনি। ও ঘুমরে মরবে তবু মুখ ফুটে কিছু বলবে না। ও আমাকে বলেছিলো যে আপনাকে ছাড়া ওর জীবন অন্ধ। ওর অসুখের আগের দিন বলেছিলো “শেখর তোর রোগটা যদি
আমার হত কত না ভালো হত। তোর বৌদি ও শান্তি পেত। আবার নতুন করে সংসার পাবে, বিস্বাসী স্বামী পাবে। “ কি কান্না কেন্দেছিল।
কিরে কৌশিক আমি তো চললাম রুচিরার কাছে । তোর রুচিরা তোর কাছে আছে অবহেলা করিস না। …একটানা কথা বলে হাফিয়ে ওঠে।
পারমিতা থামতে বলে ওকে, শেখর বলে “ আমি আসি রে , জানিনা আর দেখা হবে কি না। “ বেড়িয়ে যায়।
পারমিতা কেবিনের দড়জা টা বন্ধ করে কৌশিকের কাছে এসে হাতে হাত রেখে বলে “ তুমি আর আমার চোখের দিকে তাকাও না কেন?”
-----তোমার চোখে কালি পড়েছে দেখেছি
-----ওমা কখন দেখলে?
---দেখেছি
----এই আমাকে ভালবাস?
----জানি না
---জানতেও হবে না আমি তো তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি, তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।
পারমিতা কেঁদে ফেলে, কৌশিক ওর চোখের জল মুছিয়ে বলে “ তুমি ঘরে যাও, একটু ঘুমিয়ে নাও , চোখের কোনে কালি তোমায় মানায় না। “
---- আমার একা একা ঘরে ঘুম আসে না
---কেন তোমার মা বাবা আছেন তো!
----আমি আমাদের বাড়ী আমাদের ফ্লাটে থাকি বাবা মার কাছে থাকি না। তুমি বাড়ী না গেলে আমার ঘুম আসবে না। তোমার বুকে মাথা রেখে ঘুমাবো। আমাকে থাকতে দেবে তো? যা বলবে সব শুনব ।
কৌশিক হেঁসে ফেলে বলে “দড়জা টা খোল টুনি মনোজ আসবে।“
পারমিতা “ এই তো আমার সোনা” বলে কৌশিকের গাল দুটো টিপে দেয় ।
মনোজ ও টিনা দুজনে এসে বলে “ আজ আসি রে । এবার তোদের ফ্ল্যটে গিয়ে একদিন জমাটি  আড্ডা দেব । আসি আমরা। “
পারমিতা বলে “ আড্ডা মাথা খারাপ? আমাদের গল্প লিখতে হবে যে। কি গো লিখবে তো?” সবাই হেঁসে ওঠে


গল্পঃ আমাদের গল্প রচয়িতাঃ দীপঙ্কর সেনগুপ্ত রচনাকাল ঃ ০৬-০৬-২০২১ কৌশিক ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো পারমিতা কে। দুজন দুজনকে খুব ভালবাসত। কিন্তু কোথা থেকে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

[disqus][facebook]

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget