আপনার লেখা প্রকাশিত হলে তার লিংক সোশ্যাল মিডিয়ায় আপনার বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন...।
এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি বা যাবতীয় কার্যকলাপের আইনগত দায়দায়িত্ব নবদিবাকর পত্রিকা বহন করে না...।

গল্প - প্রাপ্তিযোগ কলমে - শ্রীকন্যা সেনগুপ্ত


গল্প - প্রাপ্তিযোগ

কলমে -  শ্রীকন্যা সেনগুপ্ত 


চাইলেই কি কারো দেখা পাওয়া যায়? আরে না মশাই! দেখা পাওয়ার জন্যও ভাগ্যের প্রয়োজন হয়! বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা! তবে খুলেই বলি। এই যেমন ধরুন এই দুদিন আগেকার কথা। দিনটা ছিল জামাইষষ্ঠী। আগের দিন রাত থেকেই অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। উদাস করা মন আর ব্যাজার করা মুখ নিয়ে শুতে গেলাম। ভাবলাম - সকাল হলে হয়তো সব ঠিক হবে। সূয্যিমামার দেখা পাবো। কিন্তু ঐ যে বললাম - চাইলেই কারো দেখা পাওয়া যায় না! সকালেও আকাশের মুখ ভার। থেকে থেকে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। যেন মনে হল সূয্যিমামা বলছে - "আমি আজ চাদর মুড়ি দিয়ে ঘুমাতে গেলুম। একদম ডাকবি না আমায়"!! সক্কাল সক্কাল আজ গিন্নী বাজারের থলি হাতে ধরিয়ে দিয়েছে, আর তার সাথে একগাদা ফিরিস্তি। আজ দুবছর হলো করোনা আর লকডাউনের জেরে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে জামাইষষ্ঠী করা বন্ধ। অগত্যা নিজের "জামাই আদর"-টুকু নিজেদেরই করতে হবে! কিন্তু এরকম বৃষ্টির মধ্যে বেরোতে কার আর ভালো লাগে বলুন তো? কোথায় বারান্দায় আরামকেদারায় বসে, পায়ের ওপর পা তুলে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে আর সাথে বৃষ্টি উপভোগ করতে করতে একটু আয়েস করবো.... তা না! এখন আবার মুখে মাস্ক পরে, পকেটে স্যানিটাইজার গুঁজে, ঘড়ির ধরাবাঁধা সময় মেপে, বাজারের থলি হাতে বাজারে দৌড়াতে হবে? শুধু কি তাই? বাজারে সব জিনিসের আজ যা আগুন দাম!! বেশী দরদাম করার জো নেই। করতে গেলেই তারা এমন কথা বলবে যেন মনে হবে ধারে কিনতে এসেছি অথবা এমনভাবে তাকাবে যেন তাদের দুটো কিডনীই আমি খুলে দিতে বলেছি!!! তাছাড়া বাজার করার পর সেই ভারী থলিগুলো বয়ে নিয়ে মুখে মাস্ক পরা অবস্থায় কুকুরের মত জিভ বার করে হাঁফাতে হাঁফাতে বাড়ী ফেরাটাও তো আছে!! যদিও মাস্কের ওপর থেকে সে দৃশ্য বোঝা যায় না বলে বাঁচোয়া। তার ওপর এই হতচ্ছাড়া বৃষ্টি। উফ্!! অসহ্য.... ভেবেই মুখটা আরো ব্যাজার হয়ে গেল। গিন্নীকে বললাম - "এই বৃষ্টিতে ভিজে বাজার করলে করোনা হোক না হোক, নিউমোনিয়া অবধারিত!!" গিন্নী অনেকটা "ঘজিনী" সিনেমার "শর্ট টাইম মেমারি লস্" হওয়া আমির খানের মত কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থেকে বলল - "তাহলে? আজ খাবে কি? আজ ভালোমন্দ রান্না করে তোমায় না খাওয়ালে মা'ও যে বকাবকি করবে আমায়! এদিকে সকাল থেকে ফেসবুক-ইনস্টা'তে বন্ধুবান্ধবদের ছবি দেওয়ার তো শেষ নেই দেখছি! লকডাউনে বাড়ীতে বসে দিন শুরু হওয়া থেকে প্রতিটা মুহূর্তের, প্রতিটা অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি দিচ্ছে! যেন মনে হচ্ছে - জামাইষষ্ঠী নয়, এ যেন এক অতি নাটকীয় সেলিব্রেটি ফোটোশুট চলছে!" মনে মনে ভাবলাম - নাহ্! আমিও বা কম যাই কিসে? বৃষ্টি কমলেই বেরোবো। চায়ের পর্ব সেরে বারান্দায় গিয়ে পায়চারি শুরু করলাম আর মাঝে মাঝে ঘড়ি দেখতে থাকলাম। সাড়ে আটটা বাজে। উঁহু, বৃষ্টি তো আর থামছেই না! দেরী হচ্ছে দেখে এবার জলখাবারটাও সেরে নিয়ে আবার চিন্তান্বিত মুখে পায়চারি শুরু করলাম। মুখচোখের ভাবখানা এমন যে দেখে মনে হবে, যেন ভারত-পাকিস্তান ক্রিকেট ম্যাচ চলছে.... কখন কি যে হয়ে যায়... তাই টানটান উত্তেজনা! এরকমভাবে বেশ অনেকক্ষণ কেটে গেল। শেষে বৃষ্টিটা একটু ধরতেই দেখলাম ঘড়িতে দশটা বাজে। এগারোটায় বাজার বন্ধ হয়ে যাবে। অতএব, আর হাতে মাত্র একটি ঘন্টা সময় বাকি। একটা লম্বা নিঃশ্বাস টেনে মনে সাহস সঞ্চয় করে অনেকটা সুপারম্যানের মত লাফিয়ে বাজারের থলি হাতে দিগ্বিজয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কিন্তু ঐ যে বললাম - চাইলেই কারো দেখা পাওয়া যায় না! ভাগ্যটা আজ আমার বড়ই খারাপ। বাজারে গিয়ে দেখলাম - শিবরাত্রির সলতের মত সবই প্রায় শেষের পথে। যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই সব ঝড়তি-পড়তি। এমনকি আমার পছন্দের কচি পাঁঠাটাও আর নেই! দুটো ইয়াব্বড়ো বুড়ো খাসি চোখ বন্ধ করে নিশ্চিন্তে জাবর কেটে চলেছে। ওরা কেমন যেন জেনে গেছে এই অবেলায় ওদের আর বিরক্ত করার মত কেউ নেই। দেখে খুব রাগ হলো। এবার গেলাম ইলিশ মাছের খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে একজায়গায় পেয়েও গেলাম। মাছটা দেখে চোখটা জ্বলজ্বল করে উঠলো। চোখেমুখে একগাদা উত্তেজনা আর মুখে হাসি নিয়ে "সোনারকেল্লা" সিনেমার লালমোহনবাবুর মত প্রায় লাফিয়ে উঠে "এটা আমার...." বলার মত ভাবখানা দেখিয়ে যেই মাছটা হাতে নিয়ে দাম জিজ্ঞেস করতে যাবো, মাছওয়ালা বললো - "বাবু, এ মাছ বিক্কিরি হয়ে গেছে। চিংড়িও শেষ। ভালো ভেটকি আছে.... নিয়ে যান। না নিলে আজ আর কোথাও পাবেন না।" আকাশের দিকে তাকিয়ে দু-চার অক্ষরের অশোভনীয় শব্দ বিড়বিড় করে বেরিয়ে এলো প্রায় মুখ থেকে। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে শেষমেশ কিছু সবজি, ফল, ভেটকি মাছ আর মুরগির মাংস কিনে কনস্টিপেশনের রুগীর মত পেঁচোমুখ করে বাড়ীর দিকে পা বাড়ালাম। মাঝপথে দই আর মিষ্টি কিনে শেষে বাড়ী ফিরলাম। গিন্নী দরজা খুলেই একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে জিজ্ঞেস করল - "সব পেয়েছো তো... নাকি?" আমি দরজার পাশে ধপাশ করে থলিগুলো নামিয়ে দিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকে গেলাম। রাগে মাথার পোকাগুলো তখন ডিসকো ডান্স করে চলেছে। বললাম - "নাহ্! বেলা দশটার সময় বাজার গেলে আর কিছু কি বেঁচে থাকে?? ব্যাটারা সব শেষ করে দিয়েছে!! জামাইষষ্ঠী না গুষ্টির ষষ্ঠী কে জানে!!" গিন্নী মিনমিন করে বলল - "তুমি আর মাথা খারাপ করো না। চটপট স্নানটা সেরে নাও। সাড়ে এগারোটা বাজে। আমি বরং বাজারগুলো ধুয়ে তুলে দেখছি কি রান্না করা যায়।" আমি অগত্যা স্নানে মনোনিবেশ করলাম। চোখ বুজে শাওয়ারের জলের তলায় দাঁড়াতেই মনে হলো হিমালয়ে আছি। সব রাগ যেন নিমেষে গলে জল হয়ে গেল। স্নান সেরে ঘরে যেতেই রান্নাঘরের সামনে থেকেই গিন্নী চেঁচিয়ে বলল - "শোনো, মায়ের সাথে কথা হয়ে গেছে। যা এনেছো ওতেই রান্না হবে।" আমি থতমত খেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে মাথা চুলকে ভীষণ কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম - "আচ্ছা! তাহলে মেনু কি"? গিন্নী এমনভাবে তাকালো যেন আমি পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস করার কথা বলেছি! ঝাঁঝের সাথে বলল - "হলে দেখতেই পাবে। হাতে সময় কম। তাই এখন একদম এই রান্নাঘরের চৌহদ্দিতে আসবে না।" অগত্যা নিরুপায় হয়ে নিজের ঘরে এসে বসলাম। প্রসঙ্গত বলে রাখি - আমার শাশুড়ি মায়ের হাতের রান্না একেবারে খাসা। আর আমার গিন্নীর হাতও ইউটিউবের কল্যাণে নিত্যনতুন রান্না করে করে এখন একেবারে পরিপক্ক হয়ে গেছে। জানলা দিয়ে বাইরে চোখ গেল। আকাশ কালো করে আবার বৃষ্টি নেমেছে। মনে হচ্ছে সারাদিনই এরকম চলবে। একটু একটু ক্ষিদে পাচ্ছে। কিন্তু উপায় নেই। বারোটা বাজে। এখন রান্না করতে কম করে দুই-তিন ঘন্টা সময় তো হেসে খেলে লাগবেই। তাই বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে মোবাইলে লাউডস্পিকারে এফ এম রেডিওটা চালিয়ে দিলাম। টিউন করতেই বেজে উঠলো - "তোমার দেখা নাই রে... তোমার দেখা নাই..."। মনে হলো আজ এও আমার সাথে বুঝি রসিকতা করছে! যাই হোক, গান শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি খেয়াল নেই। হঠাৎ গিন্নীর ডাকে ঘুম ভাঙলো। ধড়মড় করে উঠে দেখি ঘড়িতে দুপুর তিনটে বাজে। সারা ঘর খাবারের গন্ধে একেবারে ম' ম' করছে। বললাম - "এত তাড়াতাড়ি একা হাতে এত কি রাঁধলে বলো তো? ক্ষিদেতে তো পেটে একটা আস্ত চিড়িয়াখানা ডনবৈঠক দিচ্ছে!!" গিন্নী এবার হেসে শান্ত গলায় বললো - "এবার নিজেই দেখে নাও। তবে তার আগে যে নতুন পাজামা-পাঞ্জাবীটা অনলাইনে কেনা হয়েছে সেটা পরে নাও। খাবারের সামনে বসে ছবি তুলে পাঠাতে হবে মাকে।" আমি বাধ্য ছেলের মত প্রায় দৌড়ে গিয়ে সেজেগুজে চলে এলাম। এসে দেখি - গিন্নী ডাইনিং টেবিলে সব খাবারগুলো দারুণ করে সাজিয়েছে। মেনুটা দেখে জাস্ট জিভে জল এলো। সময় নষ্ট না করে রসাস্বাদনে বসে পড়লাম। শুরুতে বলেছিলাম - চাইলেই কি কারো দেখা পাওয়া যায়? দেখা পাওয়ার জন্যও ভাগ্যের প্রয়োজন হয়! আর সেটাই হলো "প্রাপ্তিযোগ"। কি? এবার বিশ্বাস হলো তো? নাকি এখনো বুঝলেন না? আরে মশাই! আসলে চেয়েছিলাম ইলিশ আর কচি পাঁঠা। তা বলে ভেটকি আর মুরগি যে আমার না-পসন্দ্ তা নয়, সেগুলোও পছন্দের তালিকাতেই রয়েছে। তবে আজ যা চেয়েছিলাম, ভাগ্যে সেগুলো ছিল না। কিন্তু শেষে যা ভাগ্যে জুটলো তা অভাবনীয়। আর সেই প্রাপ্তিটা কোনো অংশে কম নয়। বরং চাওয়ার চেয়ে বেশি হয়তো.....। সারাদিনের সমস্ত রাগ, মনখারাপ, বিরক্তি, সব এক নিমেষে স্পিরিটের মত উধাও হয়ে গেল। প্রতিটা রান্না দারুণ হয়েছিল আর সেগুলো কব্জি ডুবিয়ে চেটেপুটে খেয়ে যা তৃপ্তি পেলাম তা ভাষায় প্রকাশ করার মত ক্ষমতা আমার নেই। তবে গিন্নীর অনেক প্রশংসা করেছি... এটা তো ওর প্রাপ্তি। এমনকি আমার শাশুড়ি মাকে ফোন করেও বলেছি। 

এবার জামাইষষ্ঠীর মেনুটা শুনবেন নাকি??

স্যালাড, পিস্ পোলাও, চিকেন ফ্রাই, তাওয়া ভেটকি, আফগানি চিকেন, চাটনি, পাপড়, ম্যাঙ্গো সুফ্লে, দই, মিষ্টি। ব্যাস্! আর কি চাই!! একেবারে বাদশাহী খানাপিনা। ও হ্যাঁ, এই আয়োজন ও খানাপিনার ফোটোশুট করে ফেসবুকে দিতে আমিও ভুলিনি। কারণ, আমার গিন্নীর একক উদ্যোগ ও কৃতিত্ব বলে কথা....আর সেটাই তো আমার জামাইষষ্ঠীর প্রাপ্তিযোগ !!

More Shopping Online

গল্প - প্রাপ্তিযোগ কলমে - শ্রীকন্যা সেনগুপ্ত চাইলেই কি কারো দেখা পাওয়া যায়? আরে না মশাই! দেখা পাওয়ার জন্যও ভাগ্যের প্রয়োজন হয়! বিশ্বাস হচ্ছ

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

[disqus][facebook]

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget