মে 2021


ধরে রাখো ধৈর্যের নাড়ি টান

- অসীম দাস 


এসো , কাগুজে কবিতা ছেড়ে 

অসুখ ললাটে লিখি নিরাময় ,

চিতার লালসা হও ঠুঁটো হাত 

সাহসী শব্দে লিখি বরাভয় ।


হে সময় , অসময়ে শোক নয় 

মুছে দাও শিশুদের কান্না ,

চাঁদের কপালে টিপ , জননীর 

আয়ু নিয়ে ছিনিমিনি আর না !


প্রতিবেশী , প্রকৃতির মায়া মুখ 

হেঁকে বলে-- অচ্ছুত কেউ নয় ,

ধরে রাখো ধৈর্যের নাড়ি টান 

ছেড়ে যাওয়া মানে থিতু পরাজয় ।


মহামারী আসে যায় , ইতিহাস 

অব্যয় অমৃতের সন্তান ,

নতজানু পতনের প্রান্তে 

গেঁথে যাবো সবুজের নির্মাণ ।


ফুটানিকা ডিব্বা

- প্রদীপ দে


ভ্যাবলা নাম তার। তার মুখে সবসময়ই শোনা যায় একটা কথা যার মানে অনেকেই তখন বুঝতো না -- তা হল --" ফুটানিকা ডিব্বা"। সুর্যের তেজ যেন ওর চোখে-মুখে। বৃষ্টির জলে আবার তরতাজা। প্রকৃতির ঋতু চক্রে ওর রুপ বদল হলেও ওর স্বভাবের কোন বদল হতে দেখিনি। মুখ ভর্তি হাসি, পকেট ভর্তি টাকা আর কথার ফুলঝুরি! আর তার কথা যে একবার শুনবে সে আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারবে না। একেবারে তার প্রেমে পড়বেই। পুরুষ মানুষ হলে একরকম, মহিলা হলেই বিপদ। ভালো লেগে যাবে - আশে -পাশে ঘুর -ঘুর করবে তারপরেই ব্যভলার চিন্তায় মাথা ঘুরে যাবে -- প্রেমের জোয়ারে ওকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখবে -কিন্তু ধাক্কা খেয়ে দেবদাস।( সরি!  দেবদাসী) হয়ে যাবে  -- কারণ? 

কারণ আর কিছু নয় , আমার পিসির বড় কন্যা ওদের সকলের গুড়ে বালি দিয়ে অনেক আগে ভ্যাবলাকে তার গাঢ় চোখে ধরে নিয়েছিল ।


যখনকার কথা লিখছি তখন প্রেম সবে শুরু হয়েছে খোলামেলা ভাবে।আগে লুকিয়েচুরিয়েই হত। কন্যা শ্রীময়ী ভাবলো যা হবে হোক এত ভাল পাত্রকে হাত ছাড়া করে লাভ নেই। যদিও মাথায় এলো না যে ভ্যাবলা লেখাপড়া যা করেছে তা তার থেকে কমই আর বয়স ছোট হলেও হতেই পারে, বড় কখনোই নয়। তা হোক প্রেম এসব কিছু মানে না। অফুরন্ত পয়সা, ঘোরাফেরা, খাওয়া -দাওয়া, সিনেমা -থিয়েথার ,শরীর ঘোষাঘোষির স্বাদই আলাদা। প্রেমের ঘোড়া কামের জোয়ারে টগবগ করে ছুটে চললো।


ভ্যাবলা পিসির বাড়ি ঢুকেই গান ধরতো, চেঁচাতো --ফুটানিকা ডিব্বা এসে গেছে। বাড়ি একেবারে গমগম করতো। চিৎকার করে সকলকে জানান দিতো -- আমি হলাম গিয়ে আপনাদের ফুটানিকা ডিব্বা। নৈহাটি থেকে আসতে যেটুকু সময় লাগে - তারপরেই চলে বক বকানি। মার দিয়া কেল্লা - কাকে বলে। অন্যভাবে  বলা যায় সবজান্তা! কারোর কিছু জানার থাকলে ভ্যাবলাই ছিল ওস্তাদ!


এহেন ভ্যাবলা সকলের প্রিয় পাত্র হয়ে পড়লো। প্রত্যেকের কাজে অকাজে সে এগিয়ে যেত। টাকা পয়সা দেদার খরচ করতো। পকেট ভর্তি টাকা থাকতো। সকলেই অবাক হয়ে ভাবতো এত টাকা  কোথা হতে আসে? সব্বাই জানতো ও বিরাট ব্যবসা করে। সবাই মজায় নিতো কথাটি  --- ফুটানিকা ডিব্বা।


তা এরকম গুনধর রূপবান ছেলেকে কোন মেয়ে অবহেলা করবে? শ্রীময়ী শিক্ষিত বুদ্ধিমতী মেয়েও যে মজে যায় তার প্রেমে! সিনেমা থিয়েটার খাওয়া দাওয়া সঙ্গে প্রেম - একেবারে সোনায় সোহাগা!


একদিন শ্রীময়ী কে কালীঘাটে নিয়ে গিয়ে মালা বদল সেরেও ফেললো। বাড়িতে আসতেই শ্রীময়ীর দাদা কিন্তু রেগে লাল হয়ে গেল। সে এইরকম বিয়ে মানতে পারলো না। প্রথম কথা- ভ্যাবলাকে সে মানতে পারেনি -বেশি রোজগেরে ছিল তার তুলনায়। দ্বিতীয় কারন- তার বড় দিদি যেখানে বর্তমান - সেখানে ছোটোর বিয়ে হয় কিভাবে?

তেড়েমেরে বোন ভগ্নিপতিকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল। আর ভ্যাবলার  পিসিও ব্যাপারটা মেনে নিতে পারেনি।


শ্রীময়ী আর ভ্যাবলা নৈহাটি চলে যায়। শ্বশুর বাড়ি গিয়ে ওঠে। সেখানে ভ্যাবলার অন্য ভাইয়েরা ছিল।

শ্রীময়ী দেখলো ভ্যাবলার বাড়ি একটি পুরানো ও জরাজীর্ণ বাড়ি। ভাইয়েরা কেউ বিয়ে মানতে পারলে না। বাবা মা কেই নেই। সব খেয়ে বসেছে ভ্যাবলা। শ্রী ময়ী বোঝে না কেন এদের মধ্যে এত ঝামেলা? 

ভ্যাবলা বেকার হলে না জানি কি হত?


কিছুদিনের মধ্যে পর্দা ফাঁস হয়ে যায়। শ্রীময়ী জানতে পারে তার স্বামী ভ্যাবলা আসলে দুনম্বরী লোক -- সাট্টাখেলে, মিথ্যাবাদী একজন। ততদিনে পেটে এসে গেছে বাচ্চা।

আসলে ভ্যাবলার নিজের কথায় নিজেই, সে এক ফুটানিকা ডিব্বা!


বিপদ বাড়ে যখন সাট্টার কারবার গুটিয়ে যায়। অসহায় হয়ে পড়ে ভ্যাবলা। ভায়েরাও বদমায়েশি করে। বাড়ি ছেড়ে ভাড়া বাড়িতে যেতে হয়। অর্থাভাবে অনটনে তখন এল দৈন্যদশা। উপায়ন্তর না থাকায় শ্রীময়ী তার সদ্যোজাত কন্যার জন্য টিউশনি শুরু করে। বাড়ি ফেরার দরজাও বন্ধ। নিজের বোকামির জন্য শ্রীময়ী আফসোস করে।


এরপর ভ্যাবলার নেশাগ্রস্ত জীবন-ডিব্বার ফুটো দিয়ে শ্রীময়ীর অর্জিত সামান্য রাশিও জল হয়ে বের হয়ে যেতে থাকলো - কিছুই করা গেল না। এক সুন্দরী শিক্ষিতা মেয়ের এই হাল! একটু বুদ্ধির ভুলে সব উল্টাপাল্টা হয়ে গেল। লোভে পাপ - আর পাপে মৃত্যু!  হয়তো একেই বলে -ভবিতব্য! 


ঝরা পাতা

- কিরণময় নন্দী


যে মেয়েটা রোজ কাজল টানে

প্রসাধনীর সম্ভারে সাজিয়ে রাখে নিজের শরীর

সেই মেয়েটার অতীত খুঁজে কেই বা দেখে

খিদে পেটেই রোজনামচা ওই অভাগীর।


ওই মেয়েটার স্বপ্ন ছিলো আকাশ ছোঁয়া

কেমন করে উড়োজাহাজ উড়ে বেড়ায় দূর আকাশে

ওই মেয়েটার ইচ্ছে ছিলো রংবেরঙের প্রজাপতি

কেমন করে ওড়ার মাঝে চুমু দেয় ফুলের দেশে।


ওই মেয়েটাও তেরো বছরে ছাড়লো বাড়ি

ভিনরাজ্যে পরিচারিকার কাজ নিয়ে

পাড়ার সতীশ দা নাকি ভীষণ ভালোমানুষ

মেয়েটার বাপ বেজায় খুশি আগাম কিছু টাকা পেয়ে।


পেটের খিদে-সে ভীষণ কঠিন জ্বালা

পিটুইটারীও দেয় না সাড়া কোনটা মন্দ কোনটা ভালো

দু-কাটা বন্ধ্যা জমিতে সারাবছরে কিবা ফলে

ওরা সরল মনের, ওরা বোঝে না শহুরে গলির নিশীথ কালো।


ওই মেয়েটার শরীর বেচে অনেক টাকা

এখন আর আধ-পেটাতে কাটে না রাত

প্রচুর মানুষ- অনেক আলো -অনেক টাকা

ওই মেয়েটাও বুঝে গেছে "দারিদ্রতা"র নিদারুন আঘাত।


নির্জন নাভিকুন্ড

- অসীম দাস 


এই যে সারাক্ষণ অশরীরী আততায়ীর মতো 

আত্মগোপন করে থাকা ,

অনুগত বাতিল শব্দের অভিশাপে দীর্ণ রাত জাগা ,

স্পর্শ -শূন্য ওম- হীন নিঃসঙ্গতার ধ্যানে 

নিমগ্ন ডুবে যাওয়া ,

পরমা পরমায়ুর অকাল বিসর্জনের ঢাক 

শুনতে পেয়ে ভিজে ঘুমে সপসপে জেগে ওঠা ,

এগুলো কি নিতান্তই ঐকান্তিক 

চিত্রকল্পের জীবন্ত অপব্যয় নয় ?


জনমনের নিবিড় আদর না পেলে 

নাকি কবিতা ক্ষণস্থায়ী হয় !

শুধু ভুলে যাই ,

ভালবাসার সুতীব্র অনুভূতির ভান্ডার 

ক্রমাগত খরচ করতে করতে কবিও কাঙাল হন ।

কবিও তো পেতে চান একান্নবর্তী লেপের উষ্ণতা ।

অথচ সকলের গুরুভার দুঃখ শোক 

অনুশোচনা আর অপরাধবোধের 

তাপে পুড়তে পুড়তে কবিও একদিন

নির্জন নাভিকুন্ড হয়ে যান !


একমাত্র উদ্বিগ্ন শব্দের মুখগুলি

জেগে থাকে কবির শিয়রে ,

একমাত্র শব্দই গড়ে চলে 

খন্ড খন্ড ক্ষণজীবী আনন্দধাম ,

এপিটাফে ঘাসফুল হয়ে ফোটে কবির কবরে !


ঊষার আলোয়

- কিরণময় নন্দী


ওই মেয়েটা রোজ রাতে চেয়ে থাকতো সুদূর আকাশে

বারেবারে দেখতো মোহময়ী চাঁদটাকে

তেরোর মেয়েটার সেকি অনুসন্ধিৎসু মন

শুধুই ভাবনা কি করে নভোচর পৌঁছবে ওই চাঁদের হাটে।


গ্লোবটা ঘুরিয়ে বারবার দেখতো মেয়েটা

ইটালী, জার্মানি ফ্রান্স,আরও কত দেশ

মনটা এক লহমায় ছুটে যেতো সাত সাগরের পাড়ে

পৃথিবীটা চিনে ওর লাগতো ভালো বেশ।


ক্লাস ফাইভের শেষের দিকে ইতিহাস ক্লাসে

ও শুনেছিলো মুঘল সাম্রাজ্যের ইতিকথা

বাবর, আকবর,হুমায়ুন, শাহজাহান

আর মুমতাজ বেগম ও তাজমহলের কথা।


নগেন স্যার চাইলেও ওর ইস্কুলে যাওয়া হয়নি

ওর তখন ঘরে থেকে তৈরী হবার পালা

ঘর বলতে রাতের স্বর্গ, পতিতা পল্লী

ওর মা সেই পনেরোতেই পতিতা-বালা।


স্কুলমুখো হয়নি ওর মা বিজলি

তখন মেয়েদের নাকি লেখাপড়া শেখা নিষেধ

তেরোতেই পালকি চড়ে শ্বশুরবাড়ী

লাল টুকটুকে সাজে লজ্জার রেশ।


লজ্জা--ওই দু-চার দিন

রাতের বেলায় অসম লড়াই

বুনো জন্তু বোঝে না সদ্য ঋতুমতীর কষ্ট

মাঝরাতে কাঁদতো তলপেটের অসহ্য যন্ত্রনায়।


মেয়েটা এলো ওর গর্ভে 

ওই বছর খানেক পরে

বাপটা ওর গেলো শহরে কাজের খোঁজে

বছর ঘুরলো,মেয়ে হলো,ওর বাপ এলো না ফিরে।


তারপর পেটের জ্বালায় হাত ঘুরেঘুরে

ওদের ঠিকানা বাবুদের নিষিদ্ধ কাননে

সারারাত বদ্ধঘরে শরীর বেচার হাট

মেয়েটার চোখ সেই দূর আকাশের পানে।


পৃথিবী তখন ইতিহাসের দোরগোড়ায়

মানুষ পৌঁছে যাবে কতো আলোকবর্ষ দূরে চাঁদে

কিন্তু, ওর মা বিজলী- বকুল মাসি-আয়েশা খালা

তখনও অন্ধগলির দাসি, ওরা ভোররাতে রোজ কাঁদে।


ঐবয়েসে মেয়েটা বুঝেছিলো সব

চেয়েছিলো গলি ছেড়ে রাজপথের ঠিকানা

ওর চোখে মোহময়ী চাঁদ আর লোহিত গ্রহের নেশা

ও চাইনি হতে বাবুদের রাতের কেনা।


ভোরের আলোয় নিভে গেছে গোঁসাই কাননের আলো

শেষ রাতে একটু আয়েশে সবার চোখে ঘুম ভরা

ওই মেয়েটা ছুটেই চলেছে, কাঁচা মাটির পথে

ঊষার আলোয় গোল চাঁদ হয়েছে আকাশ ছাড়া।


আকাশের ধ্রুবতারা
- দীপঙ্কর সেনগুপ্ত

আকাশে ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে। বিদ্যুতের ঝলকানি চলছে। মনে হয় আজ ঝড় উঠবে। মৌসুমি ছাতের থেকে জামা কাপড় তুলে নিয়ে নামবার সময় দরজায় মাথাটা ঠুকে গেলো। কেটে গেছে রক্ত বেরোতে লাগলো। ঘরে এসে জামা কাপড় গুলো খাটের ওপর রেখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে অশুধের বাক্স থেকে তুলো ও ওষুধ নিয়ে কাটা জায়গায় ওষুধ লাগাতে লাগাতে মনে পরে গেলো আজ থেকে বছর ছয়েকের সেই ভয়ানক ঝড়ের রাতের কথা। 
সেদিন সনত কে খুব ভালবাসত । সনত আর মৌসুমি দুজনে দুজনের একে অপরের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।
সনত তখন চাকরি করে একটা কর্পোরেট সংস্থায় বেশ ভালো পদে আসীন। প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে সনত দেখা করত মৌসুমির সাথে। দুজনে মিলে চলে যেত কোন রেস্টুরেন্ট বা কোন কাফেটারিয়াতে। দুজনের কত গল্প। যেন শেষ হতে চায় না। সনত তার অফিসের কথা আর মৌসুমি তার কলেজ আর তার বাড়ীর কথা। দুজনে মিলে একটা কফি, এক প্লেটে নানা খাবার একসাথে খেত। সনত মাঝে মাঝে একটু দুষ্টুমি ও করত। মৌসুমির বেশ লাগতো। সবার সামনে অথছ অলক্ষ্যে চলে কিছু প্রেম । সনত বলেছিল ঃ “ডিউ অনেক রইলো কিন্তু সব খাতায় লিখে রাখো, ।“ মৌসুমি হেসে বলত “ ভালোবাসো না আমায় তাই না? খালি ওই সব কথা। যাও আর দেখা করব না।“ বেশ লজ্জা লজ্জা করে বলত।
এই ভাবেই বেশ চলছিল। সনতের মা বাবা একদিন এসে মৌসুমির মা বাবার সাথে দেখা করে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। মা বাবা
ওদের ভালোবাসার কথা জানত না। কিন্তু সনতের ছবি আর পরিবার , আয় সব জেনে রাজী হয়ে যায়। বিয়ের দিন ঠিক হয় বৈশাখ মাসের আঠারো তারিখ বুধবার। গোধূলি লগ্নে বিয়ে। এটাও ঠিক হয় মৌসুমি যেহেতু মাঙ্গলিক তাই প্রথমে শিব  ঠাকুরের সাথে বিয়ে হবে তারপর সনতের সাথে বিয়ে হবে।  বিয়ের কার্ড ছাপানো হয়ে গেলো। মা বাবা নিমন্ত্রন করতে ব্যস্ত।
একদিন সনত অফিস থেকে ফোন করে বলল ঃ “মৌ আজ ছুটি নিচ্ছি , বস বলেছে নতুন বউকে কিছু গিফট কিনে দাও। তুমি চলে এসো লেক মার্কেটে, আধ ঘণ্টার মধ্যে এসো। কোন কথা শুনব না।“
----- শোন মা বাবা বাড়ি নেই, আমি কি করে যাবো?
-----ফোন করে নাও বাবাকে। ছাড়ো আমি তোমার বাবাকে ফোন করে বলি, বাবা আমার বউকে এখনি দরকার। দেখো। দাড়াও কনফারেন্স কল করি, তুমি কোন কথা বলবে না।
সনত কল করতেই বাবা বললেন “ বল কেম্ন আছো? কোন সমস্যা হোল নাকি?”
------ না মানে একটু দরকারে ফোন করেছি, মাসিমা আছেন?
----- হ্যাঁ এই নাও, ফোন টা দিচ্ছি। এই শুনছো জামাই ফোনে চাইছে তোমাকে। নাও
----- হ্যাঁ সনত বল, কি হোল?
------ মানে মেসো মশাইকে বলতে লজ্জা করছিলো। তাই ।
-----হ্যাঁ বল লজ্জা কিসের? তুমি তো এখন আমাদের পরিবারের ছেলের মত, বল।
----- বলছি আমি কি মৌ কে একটু মার্কেট এ নিয়ে যাব ? কিছু কেনাকাটি আছে।
-----মৌ কে বল না। আমাকে কেন?
-----না মানে অ নাকি বাড়িতে একা তাই।
-----ওকে বল আমি বলেছি , আমাদের কাছে ডুপ্লিকেট চাবি আছে। ও হ্যাঁ আকাশের অবস্থা ভালো নয়, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।
------ও লাইন এ আছে, আপনি বলে দিন, মৌ শুনছো?
মৌ লজ্জা পেয়ে গিয়ে বলেছিল – “ মা বাবা ? “
----বাবার মত আছে, তবে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো কিন্তু।
সেদিন সনতের দেওয়া শাড়ি পরে আর কিছু ইমিটেসন এর গহনা পরে খুব সুন্দর করে সেজে বেড়িয়েছিল। সনত ওকে দেখে বলেছিল “ এই না হলে আমার হবু বউ! কি সুন্দর লাগছে তোমাকে দেখতে। ইচ্ছে করছে এখনি হাগ করি। মৌসুমি লজ্জা পেয়ে বলেছিল “ রোস মশাই রোষ , দিন পরে রয়েছে।“
লেক মার্কেটে গিয়ে দুজন দুজনের পছন্দের জামা কাপড় কিনল তারপর একটা রেস্টুরেন্ট এ বসে ঘনিস্ট ভাবে বসে দুজনে বিরিয়ানি খেল। ওদিকে ঝড় উঠেছে । মুষল ধারে বৃষ্টি সাথে তুফান। কি হবে ? বিদ্যুৎ চলে গেলো। দুজন দুজনের হাত শক্ত করে ধরে এগিয়ে এলো দড়জার কাছে। সবাই এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। কেউ কাউকে চিনতে পারছে না। দড়াম করে সামনে কোথাও বাজ পড়লো। মৌসুমি শক্ত করে সনতকে জড়িয়ে ধরল। সনত বলেছিল “ ভয় করোনা আমি আছি তো। আমি থাকতে তোমার কোন ভয় নেই”। ঝড় থামার পর দুজনে হাতে হাত ধরে বেড়িয়ে এসেছিলো। কোন গাড়ি যেতে রাজী হোল না। সনত মোবাইল থেকে ফোন করতে গেলো দেখল নেট ওয়রক নেই। কাউকে কোন খবর দেওয়া যাচ্ছে না। মৌসুমি বলে উঠল “ কি হবে গো, মা বার বার বলেছিল তারতারি বাড়ী ফিরতে। এখন কি হবে? সবাই চিন্তা করবে তো?”
সনত কেম্ন গম্ভীর হয়ে বলল “ চিন্তা করো না আমি আছি তো। আমার হাত শক্ত করে ধরে চল হাঁটি । যেখানে গাড়ী পাব সেখানেই নেব। “
চারিদিকে অন্ধকার। মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকে উঠছে। সামনে কত গাছ পরে আছে, নানা রকম হোরডিং, টিন, বাসন পত্র , জামা কাপড় আরো কত কি পরে আছে। সব পায়ে লাগছে। এরকম চলতে চলতে সনত বলে ওঠে “ সাবধান সামনে এটা আছে, একটু দেখে চল।“ মোবাইলে চার্জ ফুরিয়ে গেছে। অন্য মানুষের মোবাইলের আলোয় যতটা দেখা যায়। মৌসুমির ভয় অনেকটা কমে গেছে। সাথে সনত যেন ওর শক্তি সাহস ।
এই ভাবেই দুজনে এগিয়ে যেতে যেতে একজায়গায় দেখল একজন চা বিক্রি করছে। মৌসুমি বলল “ এই শুনছো, গলা শুকিয়ে গেছে, চা খাবে?”
সনত না করে নি  ওর অ তেস্ত পেয়েছে। দুজনে দাঁড়িয়ে চা খেতে লাগলো । মৌসুমি বলে উঠল “ এই শোন আজ সারা রাত আমরা যদি একসাথে ঘুরি কি না আনন্দ হবে বল!”
----- হ্যাঁ তারপর আমার বউকে কেউ কিডন্যাপ করুক । আমার এত সুন্দরী আমার বউ।“ বলে আলত করে চুমু খেয়ে বলল “ এবার হাঁট , কোন গাড়ি তো দেখতে পাচ্ছি না। “
----- তুমি না যা তা লোক লজ্জার কোন বালাই নেই। অসভ্য একটা।
----- আমি আমার বউকে আদর করেছি কার কি?
----- এই এখন বউ হই নি কিন্তু। এখন আমরা প্রেমিক প্রেমিকা
----- ও তাই নাকি ? হবু বউ তো নাকি । চল হাঁট ।
দুজনে হেঁটে চলেছে দুজনের হাঁট ধরে।
“ কি গো  মৌ তুমি কোথায়? জানলাটা বন্ধ করে দিয়ে যাও, জল আসছে। “ পাসের ঘর থেকে জোরে জোরে কে বলছে।
মৌসুমি তাকিয়ে দেখে ঝড় উঠেছে। তাড়াতাড়ি ছুটে যায় । দেখে ঘরের ঝড়ে লন্ড ভন্ড। জালনাটা বহু কষ্টে বন্ধ করে দেখে বিছানায় ভয়ে কাঁপছে ।
মৌসুমি ছুটে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল “ ভয় পেয়েছ? আমি আছি তো তোমার বউ মৌ। কিসের ভয়?”
সেও মৌসুমিকে জাপটে ধরে বলে “ ঝড় উঠেছে গো ঝড়, তুমি যদি হারিয়ে যাও। “
----- তাই? আমি হারিয়ে গেলে কি হবে গো?
------ আমি আমি “ কান্না সুরু করে দিল
মৌসুমি তার চখ মুছিয়ে দিয়ে বলল “ জানো আমি  রোজ পুজো করতে যাই তোমার এই গাল রাঙিয়ে আবার পুজো সেরে ফিরে এসে দেই রাঙিয়ে। তুমি শিশুর মত আমাকে জড়িয়ে ধরে বল আমি নাকি তোমার মা। আবার  এই তুমি বল তুমি আমার বোঝা। কোণটা ঠিক বলনা।
-------একি তোমার মাথা ফাটল কি করে ?
------ ঝড় উঠেছে গো ঝড় , সেই ঝড় তুমি তুললে আমার মনে।
------- হ্যাঁ ঝড় সেই ঝড়, সেদিন ছিলাম পথে আজ ঘরে। সেই দুজনে। কিন্তু সেদিনের মত রেল লাইন নেই যে দুজনে লাইন ধরে হেঁটে যাব। কিন্তু সেদিন আকাশের ধ্রুবতারা উজ্জ্বল ছিল।
-------- চুপ আর নয় আর নয় থাম
-------না বলতে দাও মৌ। তুমি সেদিন রাতে ধ্রুব তারার সাথে সাথে আমাকে রঙিন থেকে রঙিন করে তুলেছিলে। হটাত ওই দৈত্য ট্রেনটা ছুটে এলো । তোমাকে আমি ঠেলে দিয়েছিলাম আর আমি ফিরতে পারিনি। আমার পা দুটো নিয়ে চলে গেলো।
------- প্লিজ চুপ প্লিজ চুপ কর
-------- না শোন তোমার মাথা ফেটে রক্ত ঝরছে, তুমি পাগলের মত চিৎকার করছ কে কোথায় আছো, আমার স্বামীর কি হোল, প্লিজ হেল্প, প্লিজ হেল্প…। আমি তোমার কোলে মাথা রেখে হাত দিয়ে রক্তটা মুছে দিতে গেলাম। তোমার সিঁথি কপাল লাল হয়ে উঠল। একটা ট্রেনের আলয় আমি তোমায় দেখলাম আমার বধু রুপে। তারপর আর মনে নেই।
-----প্লিজ বল না বল না ওই দিনের কথা। আমি ভয় পাই তোমাকে হারাবার। তোমার মৌ তোমাকে হারাতে চায় না।
-------জানি তো সবার অমতে সেদিন আমাকে বিয়ে করে আমাকে নিয়ে সোজা আমাদের বাড়ি তে উঠেছিলে।
আমার মা বাবা তোমাকে অপয়া, মাঙ্গলিক বলে কত কথা অত্যাচার করেছিল।
-----বল না এসব । অন্য কথা বল ,
------ না সেদিন আমার সাহেব সুকল্যান রয় তোমাকে চাকরি দিল। তুমি পরের মাসেই বাড়ি ভাড়া করে আমাকে নিয়ে এলে। আজো আমি তোমার বোঝা। দেখলে না ঝড় উঠল আমি পারলাম না ঝড় তাকে আটকাতে। আর আজো তোমার কপালে রক্ত।
------- এই শোন এই সব কথা বলবে না । জানতে চাইলে নাতো আমি ঠাকুরের কাছে কি প্রার্থনা করি?
------- কি?
------ বলি আমি যেন তোমার কোলে সারাজীবন এই ভাবেই মাথা রেখে ঘুমতে পারি। আর তুমি আমার চুলে হাত বুলিয়ে দেবে আর তোমার কত গল্প আমাকে শোনাবে। আমি বলব আমার কথা।  তুমি সেই আগের মত দুষ্টুমি করবে।
------মৌ এটা কি হচ্ছে ? আমাদের পরী মা এসে পড়বে, আবার বলবে বাবা তুমি মা কে আদর করো আমাকে কর না। রাগ করবে। ওই দেখ বেল বাজছে। দেখো শেলি পরী মা কে নিয়ে এলো।
মৌসুমি দরজা খুলতেই পরী ছুটে গিয়ে বাবার কাছে গিয়ে বসে বলল “ জানো বাবা কি হাওয়া, আমি আর আন্টী একটা দাদুর বাড়ীতে আটকে ছিলাম। দাদু টা কি ভালো। বাবা তুমি দুষ্টুমি করনি তো? মাম মাম খিদে পেয়ছে খাবার দাও আমি আর বাবা একসাথে খাব। আমি বাবাকে খাইয়ে দেব। বাবা আমাকে।
মৌ মুচকি হেসে রান্না ঘরের থেকে খাবার নিয়ে এসে ওদের দিয়ে বলল “ দাড়াও আমিও খাব, জানলাটা খুলে দেই।“
মৌসুমি জানলাটা খুলতেই পরী বলে উঠল “ বাবা বাবা ওটা কি? আকাশে জ্বল জ্বল করছে?
মৌসুমি সনতের পাশে বসে বলল “ মা ওটা আমাদের আশীর্বাদ ধ্রুবতারা।

রচনাকাল ঃ ০৩-০৪-২০২১



ভৌতিক গল্প :- পেত্নীর সাধের পিরিত

- প্রদীপ দে


আমি হলাম গিয়ে রাত জাগা এক পাখি। আর নামটা খুলে বলতে হবে? 

পাঠকেরা খুব গুনী আর অবশ্যই বিচক্ষণ ব্যক্তি।

ঠিক ধরে ফেলেছেন।

সারারাত অনেক বড় অনেক গভীর। কি যে করবো ভেবে কুলকিনারা করে উঠতে পারি না।

আমার স্বভাব কেমন জানেন?

কুটিল এবং জটিল। 

কেবলই খুঁতখুঁতে স্বভাবের।

সবেতেই সন্দেহবাতিক।

এটা কোন রোগ নয়।

সব মানসিক!

একদিন মাঝরাত তা প্রায় আড়াইটে হবে, ছাদে পায়চারি মারছি। হাতে জ্বল জ্বলন্ত নেভিকাট। টানছি আর ধোঁয়ার কুন্ডলী ছাড়ছি -এটা আমি ভালোই পারি।


হঠাৎই সো সো করে বাতাস বয়ে গেল। বেশ মিষ্টি বাতাস। গরমকালে একেবারে কোল্ডড্রিঙ্কের মত ডিস্পলে করে গেল। 


সঙ্গে সঙ্গে নেকী সুরে ভৎসনা -- আ মলো ব্যাটা আঙুল থেকে আগুনটা ফেল না!


চমকে উঠলাম -- মেয়েলি গলা মনে হওয়ায়।


আমিও কম যাইনা। নরম গলায় কাশলাম -- কেন রে হতচ্ছাড়ি - মুখপুড়ি!


আর যায় কোথায়। ?


তুইতো এক চোখো -কানা --আগে আগুনটারে ফেল, তারপর আমার আদিখ্যেতা দ্যাখ --কাকে বলে পিরীত!


হাত থেকে সিগারেট খসে গেল। আগুনের ফুলকি নিভে যেতেই কেলো কুচকুচে এক পেত্নীর উদয় হল। একদফা ধেই ধেই নৃেত্য জুঁড়ে দিল আমাকে চারিপাশ বেষ্টিয়ে। 

অন্ধকারে ভালো করে ঠাহর করে বুঝলাম সারা শরীর জুঁড়ে সাদা চামড়ার অস্পষ্ট এক প্রলেপ।


ও বুঝে গেল আমি কি দেখছি -- 

--  এই শোন বাঁদর, আমার নাম ছিল ইন্দ্রানী আর এগুলি হলো আমার পুড়ে যাওয়ার চিহ্ন।


-- ওহঃ বুঝেছি। তোকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল?


--  একদম ঠিক ঠাউরেছিস।


-- বল না শুনি একটু ---


-- অল্পবয়সে প্রেম। সে ছেলে হ্যাবলার আমার সাথে কত পেয়ার! মাঠে -ঘাঠে জঙ্গলে সব ঘুরে শেষে বিয়ে। ততক্ষণে ব্যাটা আমায় ছিবড়ে বানিয়ে ছেড়েছে। তারপরেই ছুঁকছুঁকানি শুরু। প্রথম প্রথম লুকিয়ে চুরিয়ে তারপরে সামনাসামনি। বাঁধা দিতেই মারধোর। শেষে কেরোসিন মেরে জ্বালিয়েই দিল নেশাখোর!


আমি কাঁদো কাঁদো মুখে জানালাম --  ছিঃ ছিঃ!


-- আর ছিঃ ছিঃ করতে হবেনি! সব ব্যাটার ছা-ই। এই এইরকমই।

পেত্নীর মুখ বেঁকে গেল।


আমি খুশি করার জন্য --  না না সবাই এক জাতের নয়। -- বললাম।


সাপের মত ফোঁস করে উঠলো সে -- চল তো তোর ইস্ত্রীর কাছে নিয়ে চল আমায়,  দেখা মুরোদ তোর?


এই ছেড়েছে!  যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই সন্ধ্যা হয়!

এইবার মানে মানে কেটে পড়াই ভালো।

এইসব ভাবছি। এমন সময়ে পেত্নী আমার একেবারে কাছে চলে আসতে চাইলো -- এই চল না আমরা ঘর বাঁধি -- আমার যে খুব সাধ জাগে -- মরেও যে আয়েশ হল না রে!


আমি বিপদ বুঝে কুঁকড়ে গেলাম --  তা কি করে হয়? ঘরে বউ আছে না?


--  তাতে কি রে? একটায় কি কিছু মেলে রে?


--  না,  আমি তো হলাম গিয়ে মানুষ -- আর তুই না ভুত?


--  তালে কি? মানুষ কি ভুত নয়? আর হতে কত সময় লাগে রে?  

বলেই আমার পাছায় এক জোরালো লাথি কষিয়ে দিল পেত্নী।

আমি হুড়মুড় করে ন্যাড়া ছাদ থেকে একবারে নীচে ধপাস!


--  কি হলো?  কি হলো? -- ধড়ফড় করে পাশে শোয়া গিন্নি চেঁচামেচি জুঁড়ে দিল। ছেলে, মেয়েরা দৌড়ে ছুটে চলে এল -- কি ব্যাপার? কি ব্যাপার?


আমি খাট থেকে সটান মেঝেতে ছিটকে পড়েছি।

হৈ হৈ ব্যাপার!


এতকিছুর মধ্যেও চালাক বউ মুখ ঝামতা দিয়ে উঠলো -- ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি পেত্নীর সঙ্গে প্রেম  পিরিতির ব্যাপার চলছিলো , না কি ?

------------------------------------------------------------------

শেষ ? প্রেম,পিরিত আর ভালোবাসার শেষ নেই!


দারিদ্র্যের যন্ত্রনা
- শিবানী সাহা

দীন দরিদ্র গরীব অসহায় ওরা
জন্ম ওদের ভাঙা কুঠির ঘরে।
দিন এনে দিন খেটে খাওয়া মা
আজ বিছানায় শুয়ে প্রবল জ্বরে।

অসহায় ছোট্ট দিশাহারা শিশু
হাত দিয়ে দেখে মায়ের কপালে।
কোনো পথ পায়না খুঁজে
মাকে ডাকে কান্নাভেজা চোখে।

আর ঘুমিও না চোখ খোলো মা
দেখো আমি বসে তোমার পাশে।
খাবার জন্য একটুও করছিনা বায়না
একসাথে খাব তুমি ভালো হলে।

বাবা যে তার কবেই গেছে হারিয়ে
দিন কাটে অতি কষ্টে আধপেটা খেয়ে।
কোথায় গেলে পাবে টাকা ভাবে খোকা
মাকে ডাক্তার দেখাবে কেমন করে।

কেউ নেয় না তাদের কোনো খোঁজ
গরিব বলে বাঁচতে হয় অবহেলার চোখে।
একমাত্র সম্বল মা সেও বিছানায় জ্বরে
ভগবান রক্ষা করলে তবেই মাকে ফিরে পাবে।

তারিখ:-০১/০৪/২০২১

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget