মার্চ 2021


আগষ্ট মাস

- জাকিরুল চৌধুরী

 

ইতিহাসের পাতায় এই মাসটি দুঃখজনক মাস,

একটি পরিবারের কাছে টেনে নিয়ে যায় জলোচ্ছ্বাস।

এই মাসে আবার সূর্য অস্ত্র যায়,

তাকে খুঁজে আমি নাহি পাই।

হাজার বছরের শ্রেষ্ট তিনি হাজার লোকের প্রাণ,

এই মাসে যেন বাঙালি হারায় সকল সম্মান।

তিনি না হলে আমাদের করতো এখনো শোষণ,

তিনি জন্ম নিয়েছিলেন বলে পাইযে আসন।

আগষ্ট মাসে একটি পরিবার থেকে রক্ত যেন ঝরে,

আজও যেন সেই স্মৃতি সবার দিলে মনে পরে।

দেখো বাঙালি ঝরছে রক্ত শেখ পরিবার থেকে,

মন কি চায়না ঘাতককে ধরতে কঠিন হস্তে।

তিনি আর কে? তিনি মোদের জাতির পিতা,

তিনি আর কেও নন?  তিনি মোদের জাতির নেতা।

আগস্ট মাসে রক্ত ঝড়চে দেখো বাঙালি চেয়ে,

যদি তিনি আদোও বেচে থাকতেন খুশি সবাই পেয়ে।


একটুই হোক বিদায়ের আগে

- রোজী নাথ


ছেলেটি কাছে ছুঁয়ে থাকার কথাই বলেছিল, তবে কেন উড়ো পাখির মতো সুদূর মেখে চলে গেল?


আজ সকল কথারাই শীতের শেষের ঝরাপাতা।


বিবর্ণতায় মলিন চারপাশে পুরোনো প্রতিশ্রুতি প্রতিধ্বনিত হয়।


কোথাও কেউ হাত ধরে নেই , শুধু একটা প্রশ্নের‌ই আসা-যাওয়া ,' তবে কি সে মিথ্যেবাদী প্রবঞ্চক ছিল?"


হয়তো সে অন্য কোনো মনের গলিতে আলোপথ রচনা করে নিয়েছে।


ভীষন রকম সুখে কিংবা কারো হৃদয়ের বাহির ঘরেই থাকুক না কেনো, সে আমার ভিতর ঘরের‌ই বিগ্রহ ।


কত বসন্তপথ পেরিয়েও সে আমার ঝরা সন্ধ্যার ধ্রুবতারা; বার বার অনুভবে খুঁজে পাওয়া প্রিয় প্রান্তর।


সকল সুদুরতার সীমানা পেরিয়ে সে আবারও ফিরে আসুক আমার এই শেষ বেলার বালিয়াড়িতে ; আমার চিরবিদায়ের পথে শেষ স্পর্শটা এঁকে দিতে।


এতো ভালোবাসাই

কলমে - ঝুমা মল্লিক


ভালোবাসো !

তবে তোমার অভিমান কিসের ?

একা একা শহরের পথে হেঁটে দেখো 

দেখো, বাস ,ট্রাম আর মুখোশধারী মানুষের দাম।

তারপর পথ ছেড়ে এসো দাওয়ায়।

মুখোমুখি বসে থাকো  সহস্র বছর ।


ভালোবাসো বলেছিলে।

প্রতিদিন বলো।

আবার যদি বলো।

তোমায় জিজ্ঞেস করবো?

ভালোবাসো যদি, চাওয়া পাওয়া আরো কতকিছুর অভিলাষ।

তোমার  আরো কতকিছুর লোভ।


যদি ভালোবাসো

এই শহরে বটগাছের মতো দাঁড়িয়ে থাকো।

রোদ ,জলে ,পুড়তে থাকো।

যদি ছাই হয়ে যাও।

তবে বাতাসে জানিয়ে দেব তোমার দাম।

যদি ভালোবাসো ।

এই শহরে মোমবাতি মিছিল করো।

অপেক্ষা করো শেষ ফাগুনের।


প্রেমিক যদিও পুরুষ নয়।

যদি সে প্রজাপতি হতে পারে।

তবেই  সে ভালোবাসতে পারে।


১৯।৩।২০২১

 


ভুল প্রেম

- শামরুজ জবা 


কত প্রাণ দেখলাম এ ধরায়

 কত বিরহে, কত আনন্দে 

কত বসন্তে- বৈশাখে- বরষায়, 

সুখে- দুঃখে কত হাস্য- লাস্য উপমায়! 

এ এক আশ্চর্য  সম্পর্ক-

স্বপ্নে- গন্ধে অপরূপ মধুরিমায়।


প্রেমিক যে জন বেসেছে ভাল

দেখেছি দিনশেষে-

চোখে তার ঘন রাতের কালো

কখনো আবার বিপুলা অশ্রু রাশি রাশি, 

কখনো অকারণ জীবনের বলিদান;

আস্থা- অহম রুগ্ন- শীর্ণ পরবাসী-

কোন এক অচেনা মোহনায়

জানিনা এর শেষ কখন কোথায়।


কখনো অজান্তে-

ঋষিবর প্রেমিকের অবুঝ চোখের জলে 

আমার দুটি চোখ ভেসেছে ব্যথায়

জ্বলেছে বুনো আগুন কোমল বুকের তলে। 

ভেবেছি একা-- কোন সে মোহ মায়ায়

নিরন্তর ভাসা এই ভালবাসায়!


মাঝে মাঝে মনে হয়--

বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা, 

বহু দিবসের সুখে- দুঃখে আঁকা

এই প্রেম প্রেম খেলার করি প্রতিবাদ;

আবার ভাবি গোপনে নিরালায়--

কেন মিছে এত ক্রোধ, এত দ্রোহ?

যার যা আছে থাক না তা থাক-

ধীর পায়ে নেমে আসা শুদ্ধতায়।


 আজ বলি আপনার মনে একা-

থেমে যাক ভুল প্রেম, ব্যথা- ক্রন্দন

সত্যালোকে ভরে থাক জীবন

 ছিঁড়ে যাক মরীচিকাময় মিছে বন্ধন।


 চড়ুই পাখি

- জাকিরুল চৌধুরী


অনেক দিন পর লিখতে বসলাম একটি পাখির মনের কথা । আমি যখন কলেজ থেকে আসলাম এবং ঘরে এসে জামা কাপড় পরিদান করলাম । আর আমি মাকে বললাম যে মা আমি ভাত খাব । মা বলল যে তুই হাত মুক ধোয়ে আস আমি ভাত আনতেছি । আমি হাত মুক ধোয়ে বসলাম , মা চলেগেলেন । আমি খাইতেছি হঠাৎ একটি চড়ুই পাখি কোথায় থেকে এসে উড়াল দিয়া বসল দরজার চাওউনিতে । তার পর আমি দেখলাম যে পাখিটি কি জানি বলতেছে । আর আমি এর পেঠে চেয়ে দেখলাম যে এর পেটে খুব পিপাসা । তার পর আমি কতগুলো ভাতের দানা দিলাম তারপর পাখিটি খেতে লাগল । আর সে চটপট করতে লাগল ।আমার খাওয়া শেষ তারপর আমি দেখেতে পেলাম যে পাখিটি ডানে একবার আর বামে একবার তাকায় । পাখিটা মনের সুখে খেয়ে সে চলে গেল । আর ও দিগে আমার খাওয়া দাওয়া সম্পূন হল । তার পর যখন আমি চলে গেলাম ঘর থেকে বের হয়ে । পাখিটি উড়ে গিয়ে বস একটি ছোট গাছে । সে গাছটির নাম পেয়ারা গাছ । পেয়ারা গাছে সে মনে হয় বসবাস করে ।

এই আমাদের সমাজে অনেক মানুষ আছে যারা নিম্ন শ্রেণির মানুষ । যারা দিনে একবার ও খেতে পায় না । এখানে তাদের কথা বুঝানো হয়েছে ।আর এখানে চড়ুই পাখিকে উপস্থাপন করা হয়েছে একজন দরিদ্র মানুষ হিসেবে ।


ভৌতিক গল্প - দমকা হাওয়া

- প্রদীপ দে


একটা দমকা ঝড় সঙ্গে বিকট আওয়াজে বাজ পড়ার শব্দ, মৃত্যুর আর্তনাদ কে চেপে উদ্দাম উল্লাশে কোনো নারীর উচ্ছ্বসিত হাসি, অন্যদিকে   গৃহবধূ সরিতা' র তিনতলার ছাদে জলের রিজার্ভারের ঢাকনায় গলাটা আঁটকে ছটফট করতে থাকার, বাঁচার শেষ আকুতি টুকুও নিচের ঘরে এসে পৌঁছুলো না।


কয়েক মিনিটের ব্যবধানে সবকিছুই নিশ্চুপ, নিস্তব্ধতা, আগের মতোই যেমন ছিল ঠিক তেমনই, কোথাও কোন পরিবর্তন নেই, শুধুমাত্র ঢালাই করা রিজার্ভারের ঢাকনা চাপা পড়ে ঝুলে পড়ে থাকা সরিতার মৃতদেহটাই যেন একটু বেমানান, এই ভোর দুপুরবেলা উজ্জ্বল সূর্যালোকে।


বাড়ির গৃহকর্তা ভূপেন বাবু সরিতাকে কোথাও খুঁজে না পেয়ে ছাদে এসে এই ঘটনা দেখে প্রথমেই বিহ্বল হয়ে পড়েন, এবং পুলিশকে খবর দেন।


পুলিশ আসে, আসে সঙ্গে তদন্তকারী এক পুলিশ অফিসার। ওরা সমস্ত ইনভেস্টিগেশন করে বুঝে উঠতে পারেন না এই মৃত্যুর কারন কি? আদৌ মৃত্যু না আত্মহত্যা নাকি খুন। টিমের সন্দেহের তালিকায় ভূপেন এক নম্বরে থেকে যায়, কারণ তখন এই বাড়িতে কেউ ছিলেন না, এবং পারিপার্শ্বিক সমস্ত বিবেচনায় প্রাথমিক তদন্তে এটা খুন বলেই মনে হয়। ভূপেন কে পুলিশ লকআপে নিয়ে বডি ময়নাতদন্তে পাঠায়।


দুদিন বাদ ময়নাতদন্ত রিপোর্ট আসে। এটা একটা খুন। সরিতা খুনিকে দেখে যে ভয় পেয়েছিল তার স্পষ্ট প্রমান তার দেহে ছিল। কেউ তার চুলের মুঠি ধরে রিজার্ভারে মাথাটা ঢুকিয়ে,উপরের ঢাকনা চেপে ধরে প্রথমে তাকে আঘাত এবং পরে শ্বাসরোধ করে। মৃতের চোখ বেরিয়ে পড়েছিল।


এবার প্রশ্ন হলো খুনি কে? ওই বাড়িতে ওরা স্বামী স্ত্রী দুজনেই থাকতেন। সেদিন বাড়িতে কেউ আসেও নি। আশেপাশে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলে তেমন কিছু পাওয়াও  যায়নি। স্বভাবতই ভূপেনবাবুর দিকেই আঙুল উঠে গেলো। পুলিশ ভূপেন বাবুকে অনেকরকম ভাবে চাপ দিয়েও কিছু বার করতে পারলো না। ডাকা হলো গোয়েন্দা সহ সরকারী তদন্তকারী দলকে।


তিনদিনের মাথায় দুইজনের এক টিম এলো। দলের প্রধান হলেন ভাস্কর চৌধুরী, আর অন্যজন পবন সেন। থানার ওসি সুভাষ সরকার কে নিয়ে ওরা কিছু আলোচনা করে ঠিক হলো ভূপেন কে লকআপ থেকে বার করে সঙ্গে নিয়েই ওই বাড়িতে তদন্তে যাবে।


পরের দিন তারা চারজনে ওই বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল। বাড়ি পৌঁছেই প্রথমেই তারা ভূপেনকে কিছু প্রশ্ন করার জন্য, সবাই মিলে নিচের ঘরে বসলো। ভূপেন তখন বাঁচার জন্য সব প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলো।


ভাস্কর -- আচ্ছা ভূপেন বাবু আপনি চান না, কে এই খুনি তা জানতে?


ভূপেন -- আমি কেন চাইবো না। আমিতো সরিতাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু সবাই আমাকেই খুনি বলে ধরে নিয়েছে যে! আমার কথা কেউ বিশ্বাসই করছে না যে?


ভাস্কর চোখ বুঝে রইলো কিছুক্ষণের জন্য। চশমাটা আবার চোখে পড়ে বললেন -- আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। আমিও মনে করি এ খুন আপনি করেন নি। আপনি আপনার ফেলে আসা জীবন নিয়ে,পুরোনো কথা কিছু বলবেন।


ভূপেন মাথা নিচু করে ছিল। মাথা তুলতে দেখা গেল তার দুচোখে জল। তর্জনী আর বৃদ্ধাঙগুলি দিয়ে জলটা সরয়ে দিল, চশমাটি ঠিক করে বসিয়ে দিল নাকের উপর। অসহায় ভাবে একবার করে সকলের মুখের দিকে চাইল, যেন সাহায্য চাইছেন। সকলেই তার চোখে চোখ রেখে ইশারা করলো যেন আশ্বস্ত করছেন সকলেই। 


-- এটা আমার দ্বিতীয় বিয়ে। প্রথম বিয়ে হয়েছিল দেখেশুনেই। তা প্রায় ১৯৯০ সালে তখন আমার বয়স ৩২ বছর। স্ত্রী  অগ্নিকা 'কে নিয়ে সুখেই কাটছিল। ১৯৯২ সালে আমাদের পুত্র সন্তান জন্মায়। অগ্নিকা আমাকে আর তার নবজাতককে নিয়ে খুব আনন্দে ছিল। হঠাৎই বিপদ ঘটে গেল।একদিন ছেলের দুধ গরম করতে গিয়ে স্টোভ বাষ্ট করে পুড়ে যায় অগ্নিকা। নব্বই শতাংশ পুড়ে গেছিল সে,আমি তখন অফিসেই ছিলাম -----

এই পর্যন্ত বলে কেঁদে ফেলে ভূপেন, আর বলতে পারে না, গলা ভারি হয়ে যায়।


ভাস্কর উঠে ভূপেনের মাথায় হাত রাখে, শান্ত করার চেষ্টা চালায়। ওসি সুভাষ বাবু, যে এতদিন ভূপেন কে খুনিই ধরে নিয়েছিলো, তারও মায়া হয় ঘর থেকে এক বোতল জল এনে দেয় তাকে।


চোখে মুখে জল দিয়ে, ভূপেন শুর করে -- বাঁচানো যায়নি অগ্নিকা 'কে। তার অনেক আশা ছিল ছেলে আর সংসারের প্রতি। তা ছেড়ে ওকে চলে যেতে হয়। আমিও অসহায় হয়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ি। শ্বশুর বাড়ির লোকেরা সেই সময় ছেলেটার দায়িত্ব নেয়। আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে যাই, এক বন্ধুর কাছে। ওরা আমার সেবাযত্ন করে।বছর দেড়েক কাটার পর ওরাই আমার আবার বিয়ের ব্যবস্থা করে,এক প্রকার জোর করেই। শেষে অবশ্য নিজেকে বাঁচাতে আমি আবার বিয়ে করি ১৯৯৪ সালে। তখন আমি ৩৬। সব জেনে শ্বশুর বাড়ি সকল যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ছেলেকে ওদের মতোন করেই মানুষ করতে থাকে,

আমার বাঁধা দেওয়ার উপায় ও ছিল না।


কিছুটা সময় নেয় ভূপেন।  টেবিলের উপড় থেকে আনা মা আর ছেলের ছবি দেখায় ওদের।


আবার বলতে শুরু  করে --- নতুন বাড়িতে এসে সরিতাকে নিয়ে সব ভোলবার চেষ্টা চালালাম। নতুন বউ সরিতাকে নিয়ে এত মত্ত হলাম যে অগ্নিকার সমস্ত স্মৃতি গুলোকে নষ্ট করে, অগ্রাহ্য করতে লাগলাম। অন্য বিপদ শুরু হলো, সরিতা এই বাড়িতে আসার পর থেকেই এক অশরীরী আত্মার গুমরানো যেন শুরু হয়ে গেল। সরিতা প্রায়ই বলতো -- দেখো আমার পিছনে পিছনে যেন কেউ ঘোরে। কিরক্ম একটা  গা ছমছম করে, ভয় লাগে।আমি এসব কথা এড়িয়ে যেতাম ,ওকে সাহস দেবার জন্য। কিন্তু  সত্যি  বলছি আমিও অগ্নিকার কান্না শুনতে পেতাম। ছাদে গেলে অথবা সিঁড়িতে যেন কেউ আমাকে তাড়া করতো - আমি তা অনুভব করতাম। একদিন মাঝরাতে আমি ঘুম ভেঙ্গে গেলে, দেখি অগ্নিকা তার সারা শরীরে আগুন নিয়ে আমাকে শাসাচ্ছে -- আমি ছাড়া, এ বাড়িতে আর কোনো মহিলাকে, আমি আমার এই সংসার করতে দেব না। এটা আমার সংসার!


পবনবাবু এতক্ষণ পরে মুখ খোলে -- শান্ত হোন ভূপেনবাবু। এবার একটু বাড়িটা ঘুরে দেখতে হবে।


সকলে মিলে বাড়ি দেখতে লাগলো। বাড়িটি অনেকদিন অব্যবহৃত অবস্থায় থাকায় অপরিচ্ছন্ন ছিল। নাহলে বেশ সুন্দর। ভয়ের কিছু বোঝা গেলো না। দোতলায় পৌঁছে ভূপেন বাবু ওদের তিনজনকে  প্রশ্ন করলেন -- কিছু দেখতে পেলেন ?


সবাই অবাক, -- না কিছুতো দেখিনি?


-- সে কি অগ্নিকা তো আমার পিছনেই ছিলো।


-- কি বলছেন ভূপেন বাবু?


-- হ্যাঁ, হ্যাঁ  ঠিকই বলছি। আপনারা বুঝতে পারেন নি, ও আমার সংগে সংগে উপরে উঠে এসেছে।


তিনজনে একটু হকচকিয়ে যায়।এদিক ওদিক দেখে, তারপর নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়া চাওয়ি করে। হয়তো ভূপেনের ভয় পাওয়ার কথা ভাবে।


ভাস্কর বাবু আচমকা ভূপেনকে প্রশ্ন করে -- আচ্ছা উনি কি এখন আপনাকে কিছু বলতে চাইছেন?


--  হ্যাঁ , এখন আমায় বলছে ওর কাছে চলে যেতে!

-- বলছে তুমি একা থাকতে পারবে না। পুরুষ মানু‌ষেও আমার আর বিশ্বাস  নেই।


তিন অফিসার কিছু না বলে ভূপেনকে নিয়ে ছাদে ওঠে।ছাদের উপরের সিঁড়ির ছোট ছাদে, জলের রিজার্ভার টায় চোখ যায়। ওঠার লোহার সিঁড়ি ছিল।


-- চলুন, ভূপেন বাবু একটু উপরে গিয়ে দেখি?


-- যাবেন? চলুন -- ভূপেনের মুখে ভয়ের অনুভূতি প্রকাশ পায়।


চারজনে সিঁড়ি  বেয়ে ওঠে। উপড়ে ছোট্ট ছাদ। প্যারাপিড নেই। বেশ হাওয়া বইছিল। সকলেই সাবধানে পদচারনা করছিল। তিনজনে ব্যস্ত ছিল পরীক্ষণের কাজে। হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া সঙ্গে বিকট আওয়াজ, যেন কোন নারীর কান্না শোনা গেল, ভাস্কর - পবন আর সুভাষ বাবুরা ভয় পেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন -- ভূপেন বাবু নেই ---


প্যারাপিড বিহীন ছাদ থেকে নিচে তাকিয়ে, ওরা তদন্তকারী তিন অফিসার দেখলো ভূপেন বাবুর তাজা শরীরটা রক্তাক্ত অবস্থায় নিচে, একেবারে একতলার রান্নাঘরের পিছনে গিয়ে পড়েছে।


তাড়াতাড়ি নেমে তিনজনে পিছনে ছুটে যায় তারা। - ভূপেনবাবুর শরীরটাকে ছুঁয়ে দেখে, উল্টে পড়ে থাকা বডিকে চিৎ করে দেয়, ওর মাথা ভেঙ্গে গেছিল, অনেক রক্ত বের হচ্ছিল। আর কিছু করার ছিল না।


ভাস্কর বাবু রুমাল বার করে কপালের ঘাম আর চশমা মুছে নিল ,

-- না আমাদের আর কিছু করার নেই, সব শেষ! হি ইজ নো মোর!


সমাপ্ত 


একান্ত কথন

- শামরুজ জবা 


কত যে দিন গিয়েছে কেটে 

অন্ধকারে একা

আমার দূয়ারে এসেছে ভোর

পাইনি তোমার দেখা।


দিনের আলোতে খুঁজেছি যারে

গহন হৃদয় মাঝে

মুখ ফিরানো সে-ই আজ আসে

আমার নিভৃত সাঁঝে।


কেউ তো জানে চাঁদের নৃত্যে

অথবা অমানিশায়

বাজায় কাঁকন অশ্রুতে বোসে

তোমারই গান গাই।


সেই যে তোমার মায়ামাখা হাসি

এক বসন্তে দেখা,

সেই তো আমার চেতনে- হৃদয়ে

অমর প্রেমের রেখা।


এখনো ফুলেতে সবুজ ফসলে

তোমারই ছায়া ভাসে

বলে দাও তুমি আর পথিকেরে

চলে যাও পরবাসে।


এখনো তোমার প্রতীক্ষাতেই

আমার অনন্ত সুখ

এখনো আমার অবুঝ ব্যথাতে

খুঁজি যে তোমার বুক।


জানি, কখনো ফিরবে না আর

সাথে নিয়ে অভিমান,

তবুও আমি ভালবেসে গা'বো

তোমার নামেই গান।


আসুক না ঝড়, প্রখর তপন

আমার মাথার 'পরে,

স্বপনে না হয় দেখে যাব সুখে

ঐ আস ফিরে ঘরে।

 


নিশীথ রাতে

মিন্টু উপাধ্যায়

আমতায় যখন লাস্ট ট্রেনটা এসে থামলো, রাত তখন অনেক । গোটা কয়েক যাত্রী মাত্র । স্টেশনটা যেন অন্ধকারে ডুবে আছে ।
চারপাশ নিঝুম নিথর, একটানা ঝিঁঝিঁ পোকা ক্রমশ ডেকেই চলেছে ।
তারা যেন বিনোদকে সাবধান করতে চায় ।
বিনোদ ট্রেন থেকে নেমেই সোজা তার গ্রামের পথ ধরল । কিছুদূর চলার পর সে একটা পায়ে চলা মাটির পথ ধরলো ।
চারপাশে ধূধূ মাঠ, তার মধ্যে দিয়েই রাস্তা । আকাশটাও আজ মেঘলা । আকাশের দিকে তাকিয়ে একটাও তারা নজরে এল না বিনোদের । এক অজানা আতঙ্কে হয়তো ওরা আলো নিভিয়ে চুপকরে গেছে । হয়তো বৃষ্টি হলেও হতে পারে । মিশকালো অন্ধকারে পথ প্রায় দেখাই যায় না, একহাত দূরের কিছুই প্রায় চোখে পরেনা । এই অন্ধকারেই বিনোদ পথ চলতে লাগলো, যাবে সে মাখমপুর । স্টেশন থেকে প্রায় ক্রোশ তিনেক দূরে ।
দেশলাই জ্বেলে ঘড়ি দেখল বিনোদ, রাত সাড়ে দশটা বাজে । বাড়ি পৌছাতে আজ অনেক দেরি হয়ে যাবে তার । তাই হাঁটার গতি সে বাড়িয়ে দিল ।
বিনোদ কলকাতায় একটা প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করে । সপ্তায় মাহিনা । তাই সে সপ্তায় সপ্তায় বাড়ি আসে । বাড়িতে তার মা, স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা প্রিয়াঙ্কা আছে । অবশ্য তার স্ত্রীর কোন অসুবিধাই হয় না । পাশাপাশি তার কাকাদের বাড়ি । বাবা কয়েক বছর হল মারা গেছেন । কাকাদের সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ক ।
হটাৎ বিনোদ শুনতে পেল একটা অপরিচিত কণ্ঠস্বর ...
দাদাবাবু অতো কি ভাবছেন ?
বিনোদ চমকে পেছন ফিরে দেখল একজন লোক টর্চ জ্বেলে তারই পেছন পেছন আসছে ।
এতক্ষন নিশ্চয়ই লোকটা তার পেছন পেছন আসছিলো, শব্দ না করেই ।
লোকটার উদ্দেশ্য ঠিক বলে মনে হল না ।
বিনোদ একবার গলাটা ঝেরে নিয়ে বললে - আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না ?
লোকটা দেঁতো হাঁসি হেঁসে বললে - না চেনারই কথা । আমি আপনার কাকার বাড়িতে কাজে লেগেছি এক সপ্তাও হয়নি । আপনি আমায় আগে কোনদিনও দেখেন নি । আমার নাম নিমাই, বাড়ি জয়পুর । আপনার কাকা খুবই ভালোমানুষ । কাজ না থাকায় এদিক ওদিক করছিলাম । আপনার কাকাই আমায় কাজে নেন ।
বিনোদ হেঁসে বললে -তাই বলুন, খবর সব ভালো তো ?
নিমাই বললে - হ্যাঁ বাবু খবর সব ভালো । দাদাবাবু আপনি আমায় তুমি করে বলুন । আমি চাকর মানুষ । আপনি আমার মনিব ।
বিনোদ বললে - তা তুমি এতো রাতে কোথায় গিয়েছিলে ?
নিমাই বললে - আপনাকেই আনতে ।
আমাকে আনতে ? বিনোদ বিস্মিত হয়ে বললে । কিন্তু তোমায় তো স্টেশনে কই দেখতেই পেলাম না ।
নিমাই ফিক করে হেঁসে বললে - আপনি আমায় দেখতে পাননি ঠিকই, কিন্তু আমি আপনাকে দেখতে পেয়েছিলাম ।
বিনোদ আরও বিস্মিত হয়ে বললে - তুমি আমায় দেখতে পেয়েছিলে, তাহলে কথা বলোনি কেন ?
নিমাই খিক খিক করে হেঁসে বললে - অপরাধ নেবেন না দাদাবাবু, আমি আপনাকে একটু ভয় দেখাতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি দেখছি খুবই সাহসী মানুষ, ভয় পাননি ।
আমায় ভয় দেখিয়ে তোমার কি লাভ ? বিনোদ রেগে বললে ।
লাভ কিছুই নাই... তবে ...!!! নিমাই বললে ।
বিনোদ বললে - তবে কি ?
নিমাই ফিস ফিস করে বললে - বুঝলেন দাদাবাবু, কিছুদিন থেকেই এখানে ডাকাতের উপদ্রব শুরু হয়েছে । ঐ নিমদীঘির পাড়েতে । যাকেই সামনে পাচ্ছে, মারধোর করে সব কিছু কেড়ে নিচ্ছে । এদের জ্বালায় রাতে পথ চলাও দুস্কর হয়ে উঠেছে ।
পথ চলতে চলতে বিনোদ থমকে দাঁড়িয়ে পরল । তারপর বললে - ডাকাতের উপদ্রব ? এখানে ? হতেই পারেনা ।
নিমাই নম্র ভাবে বললে - সত্যি বলছি দাদাবাবু ।
বিনোদ বললে - তাহলে এখন কি করা যায় নিমাই ? সব টাকাকড়ি তো ওরা কেড়ে নেবে । প্রাণটাও যেতে পারে ।
অন্ধকারেই ফিস ফিস করে নিমাই বললে - আপনি অতো ভয় পাবেন না দাদাবাবু, আপনাকে কিচ্ছু করতে হবে না । যা করার আমিই সব করবো ।
কি করবে তুমি ? বিনোদ প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠলো ।
তখনই দেখতে পাবেন, কি করি আজ ওদের । নিমাই বললে ।
বিনোদের মনটা তবুও খুঁতখুঁত করতে থাকে । ডাকাতরা নিশ্চয়ই সংখ্যায় অনেক হবে । আর তারা মাত্র দুজন । ওদের কাছে অস্ত্রও থাকতে পারে । এতো জনের সাথে কি ওরা খালি হাতে লড়তে পারবে, যদি হাতে লাঠিসোঁটা কিছু থাকতো তাহলেও বা দেখা যেত ।
বিনোদের সন্দেহ হতে লাগলো যে, নিমাই ডাকাত দলের কেউ নয় তো, তাহলে তো সব গেল ।
বিনোদের মনের কথা যেন পড়ে ফেলল নিমাই । সে বললে আমাকে বিশ্বাস হচ্ছে না তো দাদাবাবু । আপনি ভাবছেন আমি বুঝি ওদেরই লোক । কি... তাইতো...দাদাবাবু । আপনি আমায় বিশ্বাস করতে পারেন । আমি আজ ওদের শায়েস্তা করে ছাড়বো ।
* * *
পথ চলতে চলতে ওরা দুজনে একসময় নিম দীঘির খুব কাছে চলে এল । আকাশের মেঘ কেটে গিয়েছিল । এক টুকরো চাঁদ অবাক নয়নে পৃথিবীর দিকেই তাকিয়েছিল । নিম দীঘির পাড়টা আধো আলো আধো অন্ধকারে ছেয়ে ছিল ।
পথ চলতে চলতে নিমাই বলে উঠল - দাদাবাবু সাবধান । এখানেই...।
তার কথা শেষ হতে না হতেই দীঘির পাড়ের ঝোপ জঙ্গল থেকে দশ বারো জন ষণ্ডামার্কা লোক বেরিয়ে এসে ওদের দুজনকে ঘিরে ফেলল । সবাইয়ের হাতেই লাঠি, মুখে মুখোশ ।
একজন বেঁটে মোটা লোক এগিয়ে এসে নিমাইকে উদ্দেশ্য করে বললে - এই তোদের কাছে যা টাকা পয়সা আছে সব দিয়ে দে, না হলে কিন্তু তোদের খুন করে পুঁতে ফেলবো দীঘির পাড়ে ।
নিমাই হাতজোড় করে ভয়ার্ত কণ্ঠে বললে - আমাদের কাছে কিছুই নাই ডাকাতদা ।
চুপকর শালা - একজন ডাকাত গর্জে উঠল পেছন থেকে ।
ততক্ষনে ঢ্যাঙা ডাকাতটা এগিয়ে এসে নিমাইয়ের পকেট হাতড়াতে লাগলো । আরেকজন এসে বিনোদের পকেট হাতড়াতে লাগলো । ঠিক তখনই ঘটনাটা ঘটল । নিমাই বিকটস্বরে হেঁসে উঠল । সেই রক্তজল করা হাঁসির শব্দ শোনামাত্রই ডাকাতরা থমকে দাঁড়ালো । নিমাইয়ের চোখদুটো আগুনের গোলার মতোই দপ করে জ্বলে উঠল । নিমাইয়ের পকেট যে হাতড়াচ্ছিল সে ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে একপাশে সরে দাঁড়িয়ে ওকে দেখতে লাগলো । সবাই বিস্মিত হয়ে দেখল যে নিমাইয়ের পোশাকের সাথে ওর শরীরের গলা পচা চামড়াও শরীর থেকে ঝড়ে ঝড়ে পরছে । তাদের সামনে নিমাইয়ের কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে । তার আগুনের মত দুচোখে একরাশ জিঘান্সা । এরপরই নিমাইয়ের কঙ্কাল ডাকাতদের উপর ঝাঁপিয়ে পরে উত্তম মাধ্যম দিতে লাগলো । চোখের সামনে এই অদ্ভুতুড়ে কাণ্ড দেখে ভয়ে বিনোদের শরীর অবশ হয়ে গেল । নিমাইয়ের সে কি রণচণ্ডী মূর্তি । আচমকাই একটা ডাকাত সজোরে লাঠির ঘা বসিয়ে দিল বিনোদের মাথাটাকে উদ্দেশ্য করে । বিনোদ চোখ বুঝল । টাল সামলাতে না পেরে সে আছড়ে পড়ল মাটির উপর । বিনোদ আবছা শুনতে পেল ডাকাতদের পরিত্রাহি চিৎকার । ডাকাতরা চিৎকার করছে...ও...রে... ম...রে গেলাম রে । ও...রে মা...রে । ছে...ড়ে... দেনা রে... । ওরে মা...রে ।
আরেক জন চেঁচিয়ে উঠল...
ভূ...ত । ভূ...ত । ভূত ।
বিনোদ চোখ খুলে দেখল দুজন ডাকাত মাটির উপর পরে কাতরাচ্ছে । নিজের মাথায় হাত দিয়ে দেখল তরল কিছু গড়িয়ে নামছে । মাথাটাও অসহ্য যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে ওর ।
হটাৎ একজন ডাকাতকে লাঠি হাতে নিজের দিকেই ছুটে আসতে দেখল । আর তখনই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল নিমাইয়ের কঙ্কাল খানা । ডাকাতটা থমকে দাঁড়ালো । চোখের নিমেষে নিমাই ওকে দুহাতে শূন্যে তুলে ছুঁড়ে ফেলে দিল দীঘির জলে ।
তারপর সব চুপচাপ, ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক কানে এসে লাগলো বিনোদের । নিমাইয়ের কঙ্কালটা আর দেখা গেল না ।
বিনোদ ভয়ে থর থর করে কাঁপতে থাকল ।
* * *
হটাৎ বিনোদ নিমাইয়ের কণ্ঠস্বর শুনতে পেল... কিন্তু তাকে দেখতে পেলো না ।
দাদাবাবু সব ডাকাত ভেগে গেছে । আপনি এবার নিশ্চিন্তে ঘরে যান । এরা আর জ্বালাতন করবে না কোনদিনও ।
বিনোদ মুখতুলে চারপাশটা দেখল, কিন্তু কোথাও কাউকে দেখতে পেলো না । ভয়ে বিনোদের মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না । তখনও সে থর থর করে কাঁপছিল ।
টলতে টলতে বিনোদ কোনরকমে ঘরে পৌঁছেই জ্ঞান হারাল । পরের দিন জ্ঞান ফিরতে ওর মুখে এসব কথা শুনে সবাই আশ্চর্য হয়ে গেল ।
স্ত্রীর মুখেই জানতে পারল যে একদিন রাতে ওই পথ দিয়ে আসার সময়ই নিমাই ডাকাতের হাতে প্রান হারিয়েছিল ।
-:: সমাপ্ত ::-


কথার খেলাপ

কলমে - শ্রীকন্যা সেনগুপ্ত


কথা দিয়েছিলে আমার সাথে দেখা করবে।

বলেছিলে - সুখবর আছে, দেখা হলে বলবে।

তাই যতই দেরি হোক, তুমি সেদিন আসবেই....

আমি অপেক্ষায় ছিলাম.... গভীর অপেক্ষা!!

প্রতিটা মুহূর্ত গুনছিলাম সজাগ হয়ে।

আমার ঘন ঘন নিশ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দে,

অপেক্ষারা ক্রমশঃ আরো ঘনীভূত হচ্ছিল!!

পার্কের সেই পছন্দের একঘেয়ে কোণ ঘেঁষে

কংক্রিটে বাঁধানো সেই ধূসর কাঠের বেঞ্চে,

সেদিন একাই বসে ছিলাম আমি!!

তুমি ছিলে না আমার পাশে প্রতিবারের মত,

তাই একটা ভীষণ অপ্রস্তুত অনভ্যাস.....

সন্ধ্যে গড়িয়ে আসছিল একটু একটু করে।

আস্তে আস্তে চারপাশটা ফাঁকা হচ্ছিল।

তারপর নিঝুম পার্কে আমি একদম একা.....!!

সন্ধ্যের আকাশে একদল পাখিদের ঝাঁক,

তাদের কলতানেও সেদিন একটা অন্যরকম সুর।

যেন তাদের একটু বেশিই তাড়া ছিল বাড়ী ফেরার।

কিন্তু, আমার একটুও তাড়া ছিল না সেদিন।

কারণ, তুমি তো কথা দিয়েছিলে আসবে....

সময়টা পেরিয়ে যাচ্ছিল একটু একটু করে।

কিন্তু নাহ্! তোমার আর দেখা নেই!

সেদিন তোমার দেওয়া সেই শাড়ীটা পরেছিলাম।

চাকরি পেয়ে প্রথম মাইনের টাকায় কিনে দিয়েছিলে। 

ময়ূরকন্ঠী রঙের এই শাড়ীটা আমার খুব প্রিয়!!

অবশ্য রঙটাও আমাদের দুজনেরই ভীষণ পছন্দের।

মেঘের গর্জনে সম্বিত ফিরে এলো হঠাৎ...

চারপাশটা কেমন যেন অদ্ভূত থমথমে হয়ে এসেছে!!

যেন প্রকৃতির কোনো প্রাণ নেই, কোনো সাড় নেই।

যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে প্রমাদ গুনছে....

আমারও উদ্বেগ, উৎকন্ঠার পারদ চড়ছিল ক্রমশঃ,

শাড়ীর আঁচলে আঙুলের আঁকিবুঁকি কাটছিলাম।

তোমার আসতে দেরী হচ্ছিল দেখে একটা সময় পর,

ফোনও করেছিলাম তোমায় বেশ অনেকবার।

ওপাশ থেকে স্বভাবসিদ্ধ যান্ত্রিক এক নারীকন্ঠ...

কখনো বলছিল - তোমার ফোন বন্ধ, 

কখনো বা যোগাযোগ সীমানার বাইরে,

তোমার সাথে কথা হয়নি আর... 

আর কোনোদিনও না...

সেদিন তুমি প্রথম কথার খেলাপ করেছিলে!!!

কথা দিয়ে কথা রাখোনি.... আর আসোনি!!

আর কোনোদিনও আসোনি ফিরে....

ফোন এসেছিল - তুমি আর নেই....!!!

নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারিনি সেদিন।

খবরটা ঠিক শুনলাম তো???

জীবনে শুধুই তখন নৈঃশব্দ, নৈরাশ্যের অন্ধকার।

সুখবরটা কি ছিল আর জানা হয়নি...

তোমার সাথে শেষ দেখাটাও অধরা থেকে গেছিল!!

ক্ষতবিক্ষত আমি, ভেঙে টুকরো টুকরো ভিতরে,

সেদিন হঠাৎ বৃষ্টি নেমেছিল মুষলধারে....

আকাশ ভেঙে, বুক ভেঙে আর আমার দুচোখেও,

আমি একাই ভিজেছিলাম সেই বৃষ্টিতে...

শুধু শেষবারের মত বলা হয়নি - 

"তোমায় আমি ভীষণ ভালোবাসি"!

আমার চোখের জল বৃষ্টির জলের সাথে ধুয়ে গেছিল।

জনমানবহীন পার্কে কেউ তা দেখতে পায়নি।

আর তুমিও আর কখনো তা জানতে পারোনি।

আমায় একলা করে চলে গেলে তুমি,

এভাবেই....চিরকালের মতো....!!

কথার খেলাপ বুঝি এভাবেই করতে হয়....


@মনভোমরা


উল্টোরথ ও পথ
কলমে - দীপঙ্কর সেনগুপ্ত

সিদ্ধার্থ আর মায়া দুজনে হাতে হাত রেখে হেটে চলেছে বেনুবনের ছত্রাছায়ায় l বেনুবন এক অসাধারণ মায়াময়ী প্রেমের নিবিড় সংযোগ স্থল l বিশাল দীঘি, চারিদিকে সবুজে সবুজে ভরে আছে, তারই মাঝে সবুজদিয়ে ঢাকা এক একটি মনোরম বসবার জায়গা l সেখানে যুগলে বসলেই মনে পরে যাবে শকুন্তলা আর রাজা দুসন্তর গন্ধর্ব বিবাহের দৃশ্য যেন যুগলে অবতীর্ণ এই কলিযুগে l
সিদ্ধার্থ আর মায়া বসল দুটি গাছের সংযোগস্থলে, সামনে দীঘিতে ফোয়ারা জানান দিচ্ছে তার উপস্থিতি আর পাখির কিচির মিচির বলে দিচ্ছে তারা প্রহরারত l সিদ্ধার্থ আলতো করে মায়ার হাতে হাত রেখে বলল " মায়া তুমি যেন মায়াবিনী লাগছো l"
মায়া হাত থেকে হাত টা সরিয়ে বলল  " দেখো দেখো ওই যে হাঁসগুলো কেমন জলে খেলা করছে!"
সিদ্ধার্থ হাসগুলোর দিকে তাকিয়ে মোবাইলে ছবি তুলে নিলো, তারপর দুজনের সেলফি নিয়ে বলল " তুমি কি দুরে সরে থাকবে? "
---- না গো আজ আর ভালো লাগছে না
---- কেন শরীর খারাপ?
----- না তাও না l তুমি একটা কথা জানো " রথ ভাবে আমি দেব পথ ভাবে আমি... " আমরাও তাই দুজনেই ভাবি তুমি আমার আমি তোমার l কিন্তু.... হেসেছে অন্তর্যামী l"
---- কি সব হেয়ালী কথাবার্তা বলছো?
---- একটা কথা বলি, তুমি কি আমাকে সত্যি ভালোবাসো?
------ এ আবার কেমন কথা! আমি তোমাকে ছাড়া এক পাও পথ চলতেই পারব না l
---- সিদ্ধার্থ তাহলে তোমাকে আমাকে ছাড়াই পথ চলতে হবে এবার থেকে l ওই দেখ দেখো  ওই চিলটা  জল থেকে একটা মাছ কে ছোবল মেরে তুলে নিয়ে গেলো যাঃ l
সিদ্ধার্থ দেখলো এবার কেমন যেন ভয় পেয়ে বলল " কি হয়েছে তোমার মায়া? আজ এতো অন্যমনস্ক কেন? কি সবাই হাঁস, চিল  এসব দেখছো? "
---- কিছু না সিদ্ধার্থ, সব আমার ভাগ্য l তুমি কিছু ভাবলে? জ্যৈষ্ঠ মাস পার হয়ে আষার  মাস এসে গেলো l
----- না এখন কিছুই ভাবতে পারিনি l চাকরি না পেলে কিছুই করতে পারব না তো l
----- বুঝলাম আজ জানো তোমাকে খুব খুব আদর করতে  মন চাইছে, কিন্তু শরীর বিদ্রোহ করে বলছে, যে তোর আদরের মর্যাদা দিতে পারবেন না তাকে আদর করিস না l
----- মানে? কি যাতা বলছো?
------ সিদ্ধার্থ ওই দেখো সবাই চুপ, পাখিরাও  শুনতে চাইছে l তারা অপেক্ষায় শুধু তুমি শুনতে পাও না l ওরা সবাই শুনেছে l ওই দেখো ফোয়ারাটা আর হাওয়ায় দুলছে না, হাঁসগুলো তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে l চিল টাও আকাশে একজায়গায় দাঁড়িয়ে l ওই দেখো কালো মেঘটা ধীরে ধীরে পূব আকাশ থেকে পশ্চিমে যেতে যেতে থমকে গেছে l ওই দেখো বৃষ্টি শুরু হলো l তবুও তুমি শুনতে পাচ্ছো না?
মায়া এবার সিদ্ধার্থর মাথাটা টেনে মায়ার বুকের ওপর রেখে বলল " সিদ্ধার্থ তুমি শুনতে পাচ্ছো কিছু? "
সিদ্ধার্থ কিছু শুনতে চেষ্টা করে l শুধু দ্রুত হৃদস্পন্দন শুনতে পায় l এমন সময় মাথার ওপর জল পরে l সিদ্ধার্থ মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখে বৃষ্টি নেই l তাহলে জল কোথা  থেকে! অবাক হয়ে দেখে মায়ার চোখে জল l সিদ্ধার্থ দুই চোখের জল মুছিয়ে বলল " এই বলো না কি হয়েছে তোমার? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না l শুধু বুঝেছি আবহাওয়া থমথমে l"
মায়া মুচকি হেসে বলল " তুমি বুঝবে না l চল যেতে যেতে কথা  হবে l ও শোন আজ তোমার জন্য দুই প্যাকেট ফিল্টার উইলস কিনে এনেছি l এই নাও l"
সিদ্ধার্থ সিগারেট নিয়ে পকেট এ রেখে দিলো l মায়া বলল " এই নাও পাঁচ হাজার টাকা l"
সিদ্ধার্থ অবাক হয়ে বলল " পাঁচ হাজার টাকা! কেন "
----- ওই দেখ  উবের এসেগেছে  আমি যাবো এখন l মায়া উবের এ উঠে পরে, সিদ্ধার্থ উঠতে যায় l মায়া বারণ করে বলে " সিদ্ধার্থ সবাই শুনতে পেলো শুধু তুমি শুনতে পাওনি l শোন আজ রথযাত্রা, বাড়ি ফিরবো সবাই পথ চেয়ে বসে আছে l অনিন্দর বাড়ির লোকজন আসবে l"
---- অনিন্দ! কেসে?
---- অনিন্দ পাকাপাকি ভাবে সিদ্ধার্থর জায়গায় চলে আসছে l আজ আমার আশীর্বাদ l উল্টো রথের দিন বিয়ে তার পর সোজা ইউরোপ l আসি l দাদা চলুন l
সিদ্ধার্থ কি করবে বা বলবে বুঝে  উঠতে পারে না l উবেরের  গাড়িটা হুস করে বেরিয়ে গেলো l সেই পথে চেয়ে রইলো l কি হলো চোখে কিছু দেখতে পাচ্ছে না কেন? ও জল? বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে পথ চলতে শুরু করলো l আর কাকে যেন বলতে লাগলো "চাকরিটা দিলে না? মায়া তুমি আর অপেক্ষা করলে না? মা কে কি বলবো?

রচনা কাল : ১১-০৩-২০২১


যদি মন্দ হই

কলমে - দীপঙ্কর সেনগুপ্ত


আজ ভাষা দিবসে আমি একমাত্র বাঙালি

ভুলেছি রক্তের স্রোত ভুলেছি বলিদান

আমি এক বেইমান মীরজাফর বাঙলি ll


রক্তে মিশে আছে রবীন্দ্রনাথ নজরুল

ভুলে গেছি কে সেই সত্যেন্দ্রনাথ, মাইকেল

ভুলে গেছি নবীনচন্দ্র কিংবা শরৎ নিরঞ্জন ll


আমি গর্বিত বাঙালি আজ  জপি রাম রাম

আমি জপি সেই গান যার নেই কোন সংস্কৃতি

বন্দুকের নলের মুখে রাখি আমার সংস্কৃতি ll


আমি মন্দ ক্ষতি কি যদি মজে থাকি পরকীয়ায়

ক্ষতি কি যদি ইশ্বরের নামে মিথ্যে পরি  নামাবলী

যদি মন্দ হই  লুটের টাকায় গীতা নিয়ে মিথ্যে বলিll


মধুসালায় বসাই আসর কিছু মধু করি আহরণ

সুন্দরী দের দেহ সুধা করি পান যদিও কন্যাসম

নিজের বিবেক কে বিক্রি করি ব্যবসায়ীর হাতে ll


ক্ষতি কি যদি মা দুর্গাকে বিসর্জন দিয়ে দেই

বৃদ্ধাশ্রমে বিসর্জন দিয়ে আসি নিজের জন্মদাতা

যদি বিকিয়ে দেই নিজের স্ত্রী পরিবার কন্যা সব ll


মন্দ হব ক্ষতি কি থাকবো টাকার অমূল্য গদিতে

যেদিকে তাকাবো দেখবো আমার দাস দাসীকে

মন্দ হলেই কার কি প্রশাসনকে নিয়ে চলবো সাথেll


ভালোবাসা থাকবেশুধু মদ মেদিনী আর কামিনীতে

ভগবানের বেশ ধরে ঘুরবো প্রতি গ্রামে শহরে

ফুল বর্ষাবোস দর্শণার্থীর চারিদিকে কর জোরেll


যদি মন্দ হই ক্ষতি কি বাংলায় যদি না বলি কথা

ছবি নিয়ে ঘুরবো রবি নজরুর স্বামজি রামকৃষ্ণের

মন্দ হলে ক্ষতি কি ভন্ড বাঙালি হলেও সন্যাসী যেll


রচনা কাল : ২১-০২-২০২১


জন্মদিন

কলমে - পাপড়ি দাস


ওপূজা পূজা ওঠ মা অনেক বেলা হয়ে গেল মেয়েকে ডাকে। গোপাল দেখে মেয়ে উঠছে না তখন কাছে গিয়ে মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে আদর করে। পূজার ঘুম ভেঙে গেছে অনেক আগে কিন্তু ঠান্ডায় আলসেমি লাগছিল তাই চুপ করে শুয়েছিল। পূজা ভাবছে আজ বাবা রিকশা নিয়ে বের হয়নি অন্যদিন কত সকাল সকাল বের হয়ে যায়। পূজা বিছানা থেকে উঠে বলে বাবা তুমি আজ রিকশা নিয়ে বের হলে না। গোপাল বলল আজ এই বেলা বের হব না। তুই তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে পড়তে বস। আমি বাজার থেকে আসছি।


 গোপাল একটা ব্যাগ নিয়ে বাজারের দিকে হাঁটল। মনে মনে ভাবল আজ পূজার জন্মদিন একটু পায়েস রান্না করে মেয়েকে খাওয়াবে। এই দিনে পূজার মা কত পদ রান্না করে দিত। গত বছর মারা গেছে মাত্র তিনদিনের জ্বরে। সেই থেকে মেয়েটাকে আগলে রেখেছে ভালোবাসার বন্ধন দিয়ে।দুধ গুড় চাল কিনে বাড়িতে এসে খুব মনোযোগ সহকারে বানালো যেমন ভাবে মালাকে দেখেছিলো বানাতে।তারপর মেয়েকে পাশে বসিয়ে পায়েস খাওয়াতে লাগল।


দুচামচ পায়েস খেয়ে পূজা বলে উঠল কি পায়েস বানিয়েছ বাবা একটু ও ভাল হয়নি। আমি আর খেতে পারবনা। এই বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। গোপাল প্রথমে হকচকিয়ে গেল ভাবল এত যত্ন করে পায়েস বানালাম কি হল বলে এক চামচ মুখে দিল দেখল না মিষ্টি ঠিক আছে।  আবার এক চামচ মুখে দিয়ে দেখল না স্বাদ ঠিক আছে। তাহলে মেয়েটা খেল না কেন ভাবছে গোপাল। পূজা দরজার পাশে লুকিয়ে লুকিয়ে বাবার পায়েস খাওয়া দেখছিলো। তার চোখ দুটো জলে ভরে উঠল। মনে মনে বলল আমি যদি মিথ্যা রাগ না দেখাতাম  তাহলে তুমি পায়েস খেতে না বাবা। আজ আমার  জন্মদিন সঠিক ভাবে পালন হল।


তাং-০৫|০৩|২০২১|

 


কবিতার বয়স বাড়ে না

- অসীম দাস 


তুমি আমি সহমত বলে 

চাঁদের পাপড়ি খুলে টুপটাপ কোজাগরী 

ফুটফুটে ফুল হয়ে ফোটে ।


এ বিশ্বের যত বিস্মিত 

জ্যামিতিক উপপাদ্য - পদ ,

কিৎ কিৎ খেলা করে কল্প- উঠোনে ।

অনন্ত অনুভূতি এলোমেলো জমে জমে 

গণিতের মেঘ হয়ে খিলখিল ঝরে !


বিজ্ঞ বৈয়াকরণগণ অবধ্য আবেগের হাতে ,

সব স্মৃতি জমা রেখে শেষ মেস 

ডুবে যান কবিতার কাব্যিক- টোলে !

মৎস্যগন্ধা জলে কবিতার স্বপ্নপরী 

তিলে তিলে তিলোত্তমা হয়ে 

জাগতিক যুদ্ধ থামায় ।

বিবর্ণ হলুদ মনে বয়ে আনে পর্ণমোচী-শ্বাস ।


শুধু তুমি আমি সহমত তাই 

যুগে যুগে কবিতার বয়স বাড়ে না ।


পত্র ঠিকানা
কলমে - দীপঙ্কর সেনগুপ্ত

গল্প লিখবো বলে কাগজ কলম নিয়ে বসলাম l প্লট কি হবে চিন্তা করতে করতে বেশ কয়েকটা পৃষ্ঠা  ছিড়ে  ফেললাম l কিছুতেই যেন মনটা বসাতে পারছি না l লেখা ছেড়ে উঠে , ভাবলাম কোনো একটা গল্পের বই পড়ি  যদি কোনো প্লট খুঁজে পাই l খুঁজতে খুঁজতে হাতে পেলাম ধনঞ্জয়  বৈরাগী মহাশয়ের লেখা " এক মুঠো  আকাশ " বেশ ভালো লাগে পড়তে, প্রাণ আছে গল্পটায় l
বইটা খুলে বসলাম l দেখি তার মধ্যে একটা পুরোনো খাম l সুন্দর অক্ষরে তার ওপর আমার নামটি লেখা আছে l কিন্তু কে রেখেছে খামটা! তাই  উৎসাহ নিয়ে খামটা  খুলে ফেললাম l তার মধ্যে  দুটো চিঠি আর একটা শুকনো গোলাপ l ব্যাপার টা কি কিছুই বুঝতে  পারছি  না l তাই খুলেই ফেললাম l দেখি একটা চিঠি আমার লেখা কোন এক অচেনা রূপালী কে লেখা l তারিখ দেখে মনে করবার চেষ্টা করলাম সে তো আমার সদ্য উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেছি l কে এই রূপালী? মনে করতে পারলাম না l তাই পরের  চিঠিটা খুলে ফেললাম l
কি বলে সম্বোধন  করবো? প্রিয়তম নাকি নিকৃষ্টতমো সিদ্ধার্থ? বুঝতে না পেরে চিঠিতে কোনো সম্বোধন  করলাম না l রূপালী নামটা মনে পড়ছে না! জানতাম পড়বে না l বেশ তাহলে মনে করিয়ে দেবার চেষ্টা করি l জানতাম তুমি আমাকে দেখেও চিনতে পারোনি l
সেদিন তুমি পরীক্ষা দিয়ে বেরিয়ে এলে আমার দাদা রূপ ব্যানার্জী র সাথে l মনে পরে দাদা কে? মনে পড়ছে আমাকে?
চিন্তা করতে লাগলাম হ্যাঁ রূপ, রূপ আমার ক্লাস ফ্রেন্ড ছিল l দুজনে তখন এক আত্মা এক প্রাণ l হ্যাঁ রূপের বাবার সাথে টিফিন আর ছুটির পরে ওর বোন আসতো l বেশ আমার কাছে দাঁড়িয়ে থাকতো l পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা বেশি চলত l মনে পড়েছে  রূপ বলেছিলো ওর বোন রূপালী তখন নবম শ্রেণীতে পরে l দেখি কি লিখেছে?

আশা করি মনে পড়েছে আমাকে l সেদিন পরীক্ষা শেষে কি বৃষ্টি শুরু হলো l দাদা বাবা মা ওই ঝড় বৃষ্টিতে কোথায় গেলো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না l তুমি আমার হাতটা শক্ত করে  ধরে স্কুলের একটা ঘরে টেনে নিয়ে গিয়েছিলে l আমি ভয়ে তোমাকে জাপটে ধরে ছিলাম l তুমি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিলে যে তুমি আছো ভয়ের কিছুই নেই l কখন যেন স্কুলের ঘরে তালা মেরে চলে গিয়েছিলো l তুমি আর আমি ভয়ে অন্ধকারে কত চিৎকার করলাম কেউ শুনতে পায় নি l দুজন দুজনকে ধরে কত গল্প কত কথা বলেছিলাম l তুমি আলতো করে আমার কপালে চুম্বন করে বলেছিলে " আমি আছি ভয় কিসের! কোন ভয় নেই l" আমি গভীর ভাবে বিশ্বাস করেছিলাম l তুমি আমার সব তোমাকে ছাড়া আমি যেন একা l কয়েকদিন বাদে তোমাকে চিঠি দিয়েছিলাম l তুমি তার উত্তরে চিঠি দিয়ে লিখেছিলে যে দাদা তোমাকে ভুল বুঝেছে l আগে সব ঠিক হোক l তুমি নিজে আত্মনির্ভর হয়ে আমাকে নিজের করে নিয়ে যাবে l
কিন্তু দেখো আজ প্রায় ত্রিশ বছর হয়ে গেলো তুমি এলে না l পালিয়ে গেলে সুদূর বিদেশে l সেখানে সংসার করলে l কিন্তু তোমার লেখা তুমি ছাড়োনি l প্রচুর গল্প কবিতা সাহিত্য তুমি লিখে যাও l সেদিন খুঁজে পেলাম তোমায় সোশ্যাল মিডিয়ায় l ছবিতে দেখলাম বেশ ভালো আছো l কিন্তু দেখতে একই রকম আছো l এক প্রকাশকের কাছ  থেকে তোমার ঠিকানা  নিয়ে গত পরশু  তোমার বাড়িতে এলাম এক এন জি ও র নাম করে l চাইলাম কিছু সাহায্য l তুমি এক মুহূর্ত আমার দিকে তাকিয়ে বসতে বললে l তোমার স্টাডি রুমে বসালে l আমি বসে রইলাম প্রায় ঘন্টা খানেক l তুমি এসে বললে " সরি ম্যাডাম কিছু মনে করবেন না আমার স্ত্রী রাজি নয় l কাল আসুন l পরের দিন এসে এই চিঠিটা বইয়ের ভিতর রেখে দিয়েছিলাম  সাথে তোমার সেই প্রতিশ্রুতি পূর্ণ চিঠি l ও হ্যাঁ গোলাপ টা চিনতে পারছো? আমার মাধ্যমিক পরীক্ষার পর তুমি দিয়েছিলে l সেটাও ফেরত দিয়ে গেলাম l ঠিকানা নাই বা দিলাম l আর ফিরবো না l অপেক্ষার শেষ হলো l তুমি ভালো আছো আর কি চাই? আমি সেদিন থেকে অপেক্ষা করে ছিলাম l ভেবেছিলাম সিদ্ধার্থ তার কথা রাখতে পারে l কিন্তু ভাবিনি প্রথম  দেখার প্রেম তুমি ভুলে যাবে l
ইতি
হতোভাগ্য রূপালী
কি লিখবো? জানি না আমিও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করবার নেশায় মেতে উঠেছিলাম l প্রতিষ্ঠিত হয়েছি l কিন্তু এ কি করলাম! রূপালী তোমার ঠিকানা  পেলাম না l তাই আমার লেখার মধ্যে পাঠক দের মাধ্যমে তোমার ঠিকানা খুঁজছি l হে পাঠক  আপনারা খুঁজে দিতে পারবেন তার ঠিকানা! আমি যে ক্ষমা প্রার্থী l......

রচনা কাল : ১৩-০২-২০২১



 প্রেমের বাঁধন

- জাকিরুল চৌধুরী


শহরের অদূরে একটি ছোট্ট গ্রাম আছে। গ্রামটির নাম অচিনপুর।

ঐ গ্রামে বসবাস করত আবু তাহের নামে একজন গরীব কৃষক। তাহার ঘরে জন্ম নিল এক পূর্ণিমা চাঁদের মতো এক কন্যা। সেই কন্যার নাম মারিয়া। সে যখন যৌবনে পর্দাপন হল তখন সে অনেক সুন্দরী। তাহার রুপে মুগ্ধ ঐ গ্রামের লোকজন। ঐ গ্রামের পাশে একটি গ্রাম রয়েছে। সে গ্রামের নাম তাহেরপুর।

তাহেরপুরে একজন জমিদার বসবাস করে। জমিদারের নাম অসীম। তাহার ঘরে জন্ম নিল এক ফুট ফুটে রাজপুত্র। রাজপুত্রের নাম আবির। গরীব কৃষকের মেয়ে আজ অনেক বড় হল। সে একদিন তাদের গ্রামের রাস্তা দিয়ে হাঁটছিল। সেই গ্রামে ছিল অনেক সুন্দর সুন্দর বাগান।

বাগানে দেখা যেত নানা রকম পাখি। পাখিদের মধ্যে একটির নামময়না। পাখিদের কলরবে ঐ গ্রামের মানুষদের ঘুম ভাঙত। মারিয়া এসব পাখিদের সঙ্গে সারাদিন খেলা করত। তার গ্রামের পরিবেশ তাকে মুগ্ধ করত। যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসত সে তখন ঘরে ফিরত।

এইভাবে তার দিনগুলো কাটতে লাগলো । একদিন সে আমের বাগানের নিচে পাখিদের সঙ্গে খেলা করতে লাগল। তখন সূর্য ঠিক যেন মাথার উপর। সেই সময় রাজপুত্রের সঙ্গে তার দেখা। রাজপুত্র তাঁর রুপে মুগ্ধ হল।

তারা তাদের পরিচয় জানতে লাগল।


  

একে অপরের পরিচয় জানা হল। অবশেষে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে লাগলো। সূর্য লালচে হয়ে যাচ্ছে। পাখিরা নিরবে ঘুমোবে। মারিয়া চলে গেল ঘরে ফিরবে। সে তার এভাবে দিনগুলো কাটতে লাগলো। জমিদারের ছেলে কৃষকের মেয়েকে দেখে তার ভালোবাসা জেগে ওঠে। সে রাতে তার স্বপ্ন যুগে কথা বলতে লাগলো।

পরের দিন সকাল হল। গ্রামের পাখিগুলো ভোরে কলরব করতে লাগল। পাখিদের কিচিরমিচির ডাক তার অনেক ভালো লাগতো। সকাল হল। সে আবার ঐ আম বাগানে ঘুরতে গেল।

সে গ্রামে অনেক রকম ফুল  গাছও রয়েছে। সে সেই ফুল গাছ থেকে ফুল তুলে ফুলের মালা গাথে। ফুল তুলার সময় ঐ জমিদারের ছেলে আবির তার সাথে দেখা করতে আসল।

এভাবে আসতে আসতে তাদের একের প্রতি আরেক জনের মনের কৌতুহল বৃদ্ধি পেতে লাগল।।

বেশ কয়েকদিন এভাবে চলতে লাগল। এভাবে তাদের মনে ভালোবাসা জন্ম হল। এক পযায়ে তারা তাদের ভালোবাসা হয়ে গেল। তারা তাদের গ্রামের ভিতর দিয়ে হাটে তারা দুজনের হাতে হাত ধরে।

তাদের মনে এমন ভাবে ভালোবাসা সৃষ্টি হল যে তারা একে আরেক জনকে না দেখলে বাসতে পারবে না।

তখন সূর্য একটু হেলে পড়েছে।

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে শুরু হল। বিকেল ভেলা শিমুল গাছের ডালেে পাখিরা ডাকতে লাগলো।



চারদিকে  আধার ঘনিয়ে আসতে লাগলো। সেই সময় কৃষকের কন্যা মারিয়া ঘরে ফিরে আসে। রাতে চাঁদ নীর রাত। এই চাঁদ নীর রাতে তার এত ভালো লাগলো সে কথা বলা মুশকিল। সে রাতে ঘরে যখন শুতে যায়। তখন তার ঐসব স্মৃতি ভাসতে থাকে তার সামনে। একদিন সে যখন ফুলের বাগানে ফুল তুলতে লাগলো। সেই কিছুক্ষণ পরে এক সাপ তার পায়ে কামড় বসিয়ে দিল। সেই সময় তার সাথে কেউ ছিল না।ঐ সময় রাজপুত্র বাগানের মাঝ খান দিয়ে যাচ্ছিল। এসে দেখে তো অনেক সমস্যা। সে মারিয়া কে কাঁদে করে নিয়ে যায় এক বেদের কাছে। বেদে তাকে উজা ঝাড়ে। ভালো হবার পর সে তার সঙ্গে কথা বলতে শুরু করে যে আমি এখানে কিভাবে। এসব এখানে শেষ  হয়ে যায়। মারিয়া ফুল অনেক ভালোবাসতো। সে সেই ফুল তুলে মালা গাথে। একদিন তারা তাদের এই আম বাগানে দেখা। এক দিন তারা তাদের আম বাগানে ঘুরে ঘুরে নানা রকম গাছ ও পাখপাখালি দেখল। তারা এই দৃশ্য দেখে খুব আনন্দ পেল। সেই দিন বেলা প্রায় শেষ।  সূর্য টা আকাশের নিচে মনে হয় জুলিয়ে রয়েছে। আর কিছুক্ষণ পর সূর্য টা অস্ত খাবে। মারিয়া ও রাজপুত্র তারা তাদের নিজ গৃহে চলে যায় । পরদিন সকালে তাদের আবার এই আম বাগানের নিচে দেখা মারিয়া বলল আবির সাহেব। আসেন পুরো গ্রামটি ঘুরে দেখি।

পুরো গ্রামটি ঘুরে দেখি। গ্রামটি দেখা শেষ  হল। তারা দুজন একটি বটগাছের নিচে বসে বিশ্রাম নেয়। তারা সারা গ্রাম ঘুরে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।

সূর্য লালচে হয়ে যাচ্ছে। আর অন্য দিকে পাবন বইছে। সমীরণের সঙ্গে আসছে নানা রকমের ফুলের গন্ধ। এ গন্ধ তাদের নাকের ডগায় আসতেই না আসতেই তারা সুগন্ধ পেতে লাগলো।

তাদের আর সময় নেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসতে লাগলো। আর অন্য দিকে ঝি ঝি রা ডাকছে। সন্ধ্যা বাতাসে সুদর্শন উড়ে বেড়ায়। রাজপুত্র রাতে বিছানায় ঘুমুতে গেলে তার ঘুম আসে না। সারা রাত নিদ্ররা হয়ে থাকে।

পরে তিনি হাটতে লাগলেন। আর রাতের বেলায় জোনাকি পোকাদের সাথে কথা ও খেলা করেন। তাতে করে তার মনে হয় আমার রাতটি কখন সকাল হবে। আর এই রাতে সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে যে আকাশে তো হাজার হাজার তারা উঠেছে। আর একটি মাত্র চাঁদ। চাঁদ যদি আকাশে না উঠে তাহলে তো তারকাদের মনে হয় যেন নিঃস্ব চাঁদ ছাড়া।

তিনি এসব দেখে শিক্ষা নেন যে ামাকে ছেড়ে যদি মারিয়া চলে যায়। তাহলে তো আমিও তারাদের মতো নিঃস্ব হয়ে যাব। পরের দিন সকাল হল। ভোরে পাখিরা ডাকছে। তাদের ঘুম ভাঙ্গলো। তাদের পাখিদের ডাক খুব ভালো লাগে।

এতে করে তাদের পাখপাখালিদের ডাকে অনেক মুগ্ধ হয়। সকালে সূর্য যেন হাসছে তাদের সামনে মনে হয় ।


পাখিরা কলরব করতে লাগলো। তারা অনেক সময় সভা করত শিমুল গাছের ডালে বসে মিটিং দিত। অচিনপুর গ্রামের মাঝ খানে দিয়ে বয়ে গেছে একটি ছোট্ট নদী। সেই নদী বর্ষাকালে পাতি ভরপুর হয়ে থাকে। আর এই নদীতে তাদের গ্রামের মকবুল, হাসান, অমিত,তারা ছোট মাছ ধরে। একদিন বর্ষাকালে সময় আসে। সে সময় মারিয়া আর রাজপুত্র নৌকায় বেড়াতে যায়। সে খানে তাদের প্রেমের কাহিনী সব ঘটনা একে আরেক জন কে সব কথা বলে। তারা নৌকায় বেড়াতে বেড়াতে অনেক সুন্দর দৃশ্য চোখে পড়তে দেখে। তাতে তারা অনেক মুগ্ধ হয়ে যায়। তাদের মনে হয় যেন তারা স্বপ্নের জগতে হারিয়ে গেছে। যেন মনে হয় তাদের পরিস্তানে চলে গেছে। তাদের সামনে ভাসতে লাগল ফুলের বাগান আর অনেক রকমের ফল। ফুলের সঙ্গে খেলা করতে লাগলো মৌমাছি, ভ্রমর, প্রজাপতি।প্রজাপতির ডানায় যেন রেশমী শাড়ির সুতা দিয়ে তৈরি। এতে করে তা তারা অনেক মুগ্ধ হল।আর এদিকে সূর্য হেলে পড়েছে। তারা নৌকা থেকে নেমে আসে একটি সুন্দর ব্রিজের কাছে। ব্রিজে এসে তারা হাতে হাত ধরে হাঁটতে লাগলো। তাদের এসব ঘটনা দিনের পর দিন এভাবে চলতে লাগলো। একদিন হটাৎ তাদের এ প্রেমের ঘটনা জমিদার জেনে গেলো। জমিদারের কাছে সমাচার


জমিদারের কাছে সমাচার পৌঁছায় সাগর নামে এক বালক। সে বালক এসে বলে জমিদারের কাছে রাজপুত্রের প্রেমের কথা । তার পর জমিদার সে রাজপুত্র ের প্রেমের কাহিনী সব দেখতে পেল। আর তারপর জমিদার বলল মেয়ে টা কে?তার খুঁজ নাও। জমিদারে কথায় মেয়েটির খুঁজ খবর নিল।নিয়ে দেখে এক দরিদ্র কৃষকের মেয়ে। বাবা জেলে সে সারাদিন নদীতে মাছ ধরে। আর সে মাছ বিক্রি করে তার সংসার চালায়। জমিদার মেয়েটিকে একদিন তার রাজ দরবারে ডাকে। মেয়ে টি তখন আসে।সেখানে সে সবকিছু ঘটনা খোলে বলে।।মেয়েটির নাম জিজ্ঞেস করলে বলে মারিয়া। এসব কিছুর শেষে জমিদার তাদের মাফ করলো না। মেয়েটি কে কারাগারে বন্দি করা হল।আর অন্য দিকে রাজপুত্র ব্রিজ থেকে নদীতে ঝাপ দিয়ে পানি খেয়ে ভেসে আসে নদীর তীরে। এমন সময় মারিয়া র বাবা রাজপুত্র কে তুলে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। সে নিয়ে রাজপুত্র কে সুস্থ করে তুলেন। আর অন্য দিকে তার মেয়ে ঘরে নেই। সে রাজপুত্র কে জিজ্ঞেস করে। তার সব পরিচয় বলে।রাজপুত্র সবশেষে জানতে পারল যে সে মারিয়া র বাবা।সে তাদের প্রেমের ঘটনা না বলে। কৃষকের মেয়ে র নাম জিজ্ঞেস করল। কৃষক বলল আমার মেয়ের নাম মারিয়া। রাজপুত্র তাকে চিনে পেলল।



চেনার পর সে বলে না। যে আমি তাকে চিনি। সে আপনার মেয়ে। সে বলল জমিদারের বাড়িতে একটি সুন্দরী মেয়ে কে কারাগারে অন্ধ কুটরে বন্দী করা হয়েছে। তারপর কৃষক জমিদারে দরবারে রওনা দেন।রওনা দেওয়ার সময় রাজপুত্র বলল আমি কি আপনার সাথে যেতে পারি। মারিয়া র বাবা বললনা।ামার সাথে যেতে হবে না। আর অন্য দিকে মারিয়া মুক্তির প্রহর গনছে। সে কখন এ অন্ধ কুটরি থেকে মুক্তি পাবে।এমন সময় তার বাবা দৌড়ে এসে জমিদারের দরবারে। এসে বলে হুজুর সাহেব আপনার এখানে আমার মারিয়া বন্দি। বলে হ্যা। আপনার মেয়ে র নাম কি। কৃষক বলে মারিয়া। কৃষক জমিদারকে বলেন হুজুর আমার মেয়ে কে কেন বন্ধি করা হয়েছে। জমিদার বলে আপনার মেয়ে একজন কৃষকের মেয়ে হয়ে কিভাবে আমার ছেলের সঙ্গে প্রেম করে। তাই আমি তাকে বন্ধি করে রেখেছি। জমিদার বলে আমার ছেলে কে আপনি কোথায় রেখেছেন। এমন সময় রাজপুত্র হাজির হলেন। বলেন আপনার মেয়ে এই আমার পুত্রের সঙ্গে মেলা মেশা করেছে দিনের পর দিন। কিছুক্ষণ পর মারিয়া বলে আমি আপনার ছেলে র সঙ্গে প্রেম করতে ও মেলামেশা করতে চাইনি। আপনার ছেলে আমার রুপ দেখে প্রেমে পড়েছে।


এক অজানা কাহিনী
কলমে - দীপঙ্কর সেনগুপ্ত

লিখতে গিয়ে ভাবছি কি লিখবো? গল্প না কবিতা না এক ভ্রমণের কাহিনী! মাথায় ঘুরছে কত কথার ফুলঝুরি l তাই যাই লিখবো মনে হবে আমার কোনো গোপন কথা বেরিয়ে এলো নাতো? এই সব ভাবতে ভাবতে কাগজে কলম চালাতে গেলাম অমনি ফোনটা বেজে উঠলো l দেখি এক অচেনা নম্বর l কণ্ঠস্বর অচেনা l ওপর প্রান্তে ভেসে এলো এক কণ্ঠ " হ্যালো সিদ্ধার্থ কেমন আছো? তুমি সিদ্ধার্থ সেনগুপ্ত তো? "
---- হ্যাঁ আপনি কে?
----- আমি? চিনতে পারছো না তাই তো?
সুরেলা নয় কেমন কর্কশ  কণ্ঠ l চিনতে না পেরে বললাম " হেয়ালি না করে বলুন আপনি কে? আগেই বলে রাখছি এখন আমার হাতে আর কোন লেখা নেই যা আপনাকে দিতে পারি l"
---- বুঝেছি তুমি চিনতে পারবে না l আমার গলার স্বর হারিয়ে গেছে l এই কণ্ঠস্বর  একদিন তোমার খুব প্ৰিয় ছিল l আর সেদিন তুমি ও লেখক  বাঃ কবি  ছিলে না l চেষ্টা করতে লিখতে l সব থেকে বেশি সমালোচনা করতাম আমি l বিশেষ করে তোমার বানান আর কিছু কমন কথা থাকতো l আজ বেশ লেখো l ভালো লাগে তোমার লেখা l
---- আরে কে বলছেন বলবেন তো? এখন এতো কথা বলার সময় নেই রাখছি l
---- আরে রোস  বৎস, চিনবে আমাকে ঠিক চিনবেl  জানো আমি খুব রাবীন্দ্রিক l আমার রবীদ্ৰনাথ  খুব প্ৰিয় l তোমার আবার শরৎচন্দ্র, আমার পাহাড়, তোমার পাহাড় ও সমুদ্র  সংযোগ স্থল l চিনতে পারলে?
অনেক ভেবে বললাম " নাঃ চিনতে পারলাম না l তবে আপনি কি করে জানলেন আমার পছন্দের কথা? "
---- তুমি চেনো আমাকে l
---- না চিনি না l
---- ঠিক আছে তাহলে তুমি একবার দেখা করে যাও আমার সাথে l আমি চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতালে ভর্তি আছি l ক্যান্সার ওয়ার্ড এ ২২১ নং বেড এ l প্লিজ এসো l তখন  বলো চিনতে পারো কিনা l একটা কথা বলি! এক সময় আমি ছিলাম তোমার খুব প্ৰিয় l প্লিজ এসো অপেক্ষা করে রইলাম l
খুব চিন্তায়  পরে গেলাম l কে এই মহিলা? কিছুতেই মনে করতে পারলাম না l সারারাত ভেবে গেলাম উত্তর  পেলাম না l পরেরদিন ঠিক করলাম হাসপাতাল এ গিয়ে দেখা করবো l সেই কথা মত  আমি চলে  গেলাম সেখানে l ২২১ নং বেডে শুয়ে হাতে গীতাঞ্জলি l খুব মন দিয়ে পড়ছে l মুখটা দেখতে না পেয়ে বললাম " হ্যালো আপনি আমাকে আসতে বলেছিলেন l আমি এসেছি l এবার বলুন আপনি কে!"
আসতে করে গীতাঞ্জলি বইটা সরিয়ে বলল  " সেই এলে এতো দেরি করে l কেমন রোগা হয়েগেছো l"
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম একি চেহারা, এতো সেজেগুঁজে থাকতো এতো সেই চন্দ্রানী l যাকে লোকে বলতো আমার চন্দ্রমুখী l আমি নাকি দেবদাস l হ্যাঁ চন্দ্রানী খুব ভালো কণ্ঠস্বর ছিল l ঘন্টার পর ঘন্টা ওর কথা শুনতে ভালোবাসতাম l দুজন দুজনকে ভালো বেসে ফেলেছিলাম l কিন্তু বাধ সাধলো  তার অতীত আর তার সমাজের চেনা মানুষগুলো l ক্রমাগত তার কানে বিষ ঢালতো l আর চন্দ্রানী সিদ্ধার্থ কে অপমানের চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলো l সেদিন থেকে সিদ্ধার্থ চন্দ্রাণীকে ঘৃণা করতো l
সিদ্ধার্থ বলে উঠলো " কি হয়েছে "
---- বোস কি হবে বলো l এখানে ভর্তি মানে কি জানো? থার্ড স্টেজ l ফুসফুস থেকে গলা  সব খেয়ে গেছে ওই ক্যান্সার নামক পোকাটা l বসন্তের সব ফুল ঝরে  গেছে l আমিও ঝরে পড়বো l হাতে আর সাথে থাকবে এই গীতাঞ্জলি l তুমি ভালো থেকো l তুমি জানো আমি কোনোদিন  কারোর কাছে হার মানিনি l ক্ষমা ও চাইনি l শেষ বেলায় শুধু  তোমায় মনে পড়েছে l  তাই তোমাকে একবার দেখবার জন্য ডেকেছি l তোমার কথা শুনবো বলে l জানো সেদিনগুলোর কথা কত মনে পড়ছে l কিন্তু বেশি মনে পরে তোমাকে যেদিন অপদস্ত  করে আমি আনন্দ পেয়েছিলাম  আর তোমার অসহায় মুখটা আমাকে সুখী করেছিলো l আজ সেই অসহায় মুখটার জন্য নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে l  না না ভেবো না কোনো ক্ষমা চাইব l কিন্তু কেন জানিনা তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো l আর একটা কথার উত্তর দেবে? আমাকে ভালোবেসেছিলে  তো? নাকি অভিনয় ছিল? কথাটা জানতে খুব ইচ্ছে করছে l শেষ ইচ্ছে বলতে পারো l
সিদ্ধার্থ থমকে দাঁড়িয়ে ছিল l কি উত্তর দেবে ভেবে পাচ্ছিলো না l কিছুক্ষন পরে মাথা নিচু করে বলল " আমি তো তোমার কোনো অপকার  চাইনি l মনে প্রাণে ভগবানের কাছে তোমার মঙ্গল কামনা করেছি l যদিও আমার জীবনের সব থেকে বড় ক্ষতিটা তুমিই করেছিলে l আবার আমার জীবনে লেখার প্রেরণা এনে দিয়েছিলে l কিন্তু কি করে? "
---- আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না l
---- কি উত্তর দেবো? সেদিনের অভিনয় না ভালোলাগা না ভালোবাসা! আজ উত্তর দিলে তার মর্যাদা দিতে পারবো না l তাই উত্তর চেও না l তোমার ভাবনা তোমার চিন্তা সত্যি মনে করে নাও l

চন্দ্রিমা উঠে বসে বলল  " বলবে না জানতাম l তুমি চিরকাল  ভীষণ  অন্তরমুখী l কিছুতেই তুমি তোমার মনের কথা জানতে দেবে না, এটা আমার বোঝা উচিত ছিল l "
সিদ্ধার্থ মুচকি হেসে বলল " তোমার রবি ঠাকুরের  কথায়  বলি তুমি রবে নীরবে... হৃদয়ে মম...  এবার বুঝে  নাও l"
--- বুঝলাম আর একটা অনুরোধ করবো রাখবে? তুমি জানো তো এখন আমার নিজের কেউ নেই l আমি একা l আমার মৃত্যু হলে আমার দেহটা পিজি হসপিটালে দান করে দেবে?
সিদ্ধার্থ বলল " আমরা একই ট্রেণের যাত্রী কার স্টেশন আগে আসবে জানিনা l যদি তোমার স্টেশন আগে এসে যায় তুমি নেমে যেও, ট্রেন চলতে থাকবে আমার স্টেশন পর্যন্ত l হয়ত এরকম ভাবে আবার দেখা হয়ে যাবে অন্য কোন  প্লাটফর্মে l ওই দেখো আমার ট্রেন এসেগেছে l আমি চলি l "
হসপিটালের  ঘন্টা বেজে উঠেছে l সিদ্ধার্থ আর দাঁড়ালো না l পিছনের দিকে আর তাকালো না l কিন্তু অনুভব করতে লাগলো চন্দ্রনীর দুটো চোখ তাকে অনুসরণ করছে l কি জানি সেই চোখে হাসি না অশ্রু ছিল l কিন্তু এই চন্দ্রাণীকে সিদ্ধার্থ দেখতে চায়নি l

রচনা  কাল : ০৪-০৩-২০২১


Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget