নভেম্বর 2020


লহ প্রণাম 

কলমে - শ্রীকন্যা সেনগুপ্ত


(সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় স্মরণে)


ক্ষুদিত পাষাণে সাজিয়েছিলে প্রথম কদম ফুল,

আবার অরণ্যে ফুটিয়েছিলে পদ্মগোলাপ,

"জীবনে কি পাবোনা, ভুলেছি সে ভাবনা",

চিরদিন অমলিন তোমার এই বসন্তবিলাপ...


জীবন দিয়েছিল বারে বারে অশনি-সংকেত,

সব অসুখ দেহে শাখা-প্রশাখা করেছিল বিস্তার,

ধীরে ধীরে জীবনের সাঁঝবাতি হচ্ছিল স্তিমিত,

তবুও কোনি'র ক্ষিদ্দার আপ্রাণ চেষ্টা ছিল বাঁচার!!


চারুলতা, পরিণীতা, ময়ূরাক্ষী - তিনকন্যার দেশে,

পারমিতার একদিনেও পেয়েছিলে যোগ্য সম্মান,

বাঘিনী, বর্ণালী, অহল্যা, দেবী এবং মহাশ্বেতা,

এই পাঁচ অধ্যায়ে স্ত্রীদের সাথে তোমার অধিষ্ঠান।


সমান্তরাল পথ থেকে সোনার পাহাড়ের ঐ চূড়ায়,

অরণ্যের দিনরাত্রি হোক বা অতল জলের আহ্বান,

দেবদাসের নিশিযাপনে বা পাতালঘরের আতঙ্কে,

প্রতি পদক্ষেপে, ঘরে-বাইরে সর্বত্র তোমার অভিযান।


পোস্ত নামে ঐ একরত্তি ছেলেটার অবলম্বন হয়ে,

দেখিয়েছিলে আমাদের এক নতুন দিনের আলো,

বরুণবাবুর বন্ধু হয়ে থেকেছিলে সর্বদা পাশে পাশে,

ঘুচিয়েছিলে হেমলক্ সোসাইটির আঁধার কালো।


কাপুরুষ নও, গণশত্রু নও, তুমি তো গণদেবতা!!

হীরক রাজার দেশে শুরু তোমার ক্রান্তিকাল,

ঝিন্দের বন্দী হয়েও স্বাধীন সব চেতনার আড়ালে,

তোমার জন্য বিশ্বে সমৃদ্ধ বঙ্গসংস্কৃতির একাল-সেকাল।


সাত পাকে বাঁধা পড়েছিলে অপুর সংসার - এ,

তোমার হাত ধরেই জয় বাবা ফেলুনাথের পথ চলা,

এরপর ঘুরঘুটিয়ার ঘটনায় টানটান উত্তেজনা!!

গোলোকধাম রহস্যতেও জমে উঠেছিল খেলা...


জীবন সায়াহ্নে স্থায়ী ছুটির ফাঁদে পড়ে গেলে,

জীবনের সাথেই বাঁধনটা হয়ে গেলো চিরশিথিল,

সংসার-সীমান্তের মায়া ছেড়ে তিন ভুবনের পারে,

ময়ূরবাহন, তোমার শূন্য অঙ্ক-তে হলো গরমিল!!


শেষের গল্পটা কিছুটা বাক্সবদল, রূপকথা নয়!!

আত্মার এই শরীর ছেড়ে চলে যাওয়ার শোক,

শেষ চিঠি না দিয়েই চিরতরে কেড়ে নিল তোমায়, 

সোনার কেল্লার ছোট্ট মুকুলের সেই দুষ্টু লোক!!


অসময়ের শ্রাবণের ধারায় ভিজেছিল দুচোখ,

বন্ধ হলো মাস্টারমশাই-এর পাঠশালার ঝাঁপি,

জনজোয়ারে ভেসেছিল অলি-গলি-রাজপথ,

তোমার অন্তিম যাত্রায় কবিগুরুর স্মরলিপি...


বিদায়বেলায় শেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি কুচকাওয়াজে,

রজনীগন্ধার স্তবকে সজ্জিত শেষ মাল্যদান,

নদী থেকে সাগরে মিশে গেছিলে তুমি একদিন,

আজ অমরত্ব খুঁজে পেয়ে দিলে তার সেই প্রমাণ!!


তোমার রূপে-গুণে মন্ত্রমুগ্ধ আপামর বাঙালি সমাজ,

তোমার আবৃত্তিতে শেষের কবিতায় প্রাণের সঞ্চার,

তোমার পদাঙ্ক অনুসৃত হবে যুগে যুগে, সবসময়,

বিফলে যাবেনা কখনো তোমার সাজানো মণিহার।


গুরু-শিষ্য দ্বন্দ্বে কখনো জড়াওনি নিজেকে,

আজও তাই খুঁজে বেড়াই তোমায়, শিক্ষাগুরু।

বেলাশেষেও প্রাক্তন হবেনা কোনোদিনই তুমি,

থাকবে সবার হৃদয়ে, তোমার সবে তো বেলাশুরু.....


© মনভোমরা

(www.facebook.com/monbhomra)

 


রক্তের টান

- গৌতম নায়েক


মেয়ের স্থান পিতৃ বক্ষের অন্তঃস্থলে,

যেরূপ বৃন্ত আগলে রাখে ফুলের কুঁড়ি;

স্বচ্ছন্দে থাকে মেয়ে নিরাপদ ছাতের তলে,

পিতৃ শাসনেই মেয়ের অভিমান ভারি।


বৃক্ষ চারার ন্যায় বাড়ে সে পিতৃ ছায়ায়,

দূরে গেলেও থাকে নিকট রক্তের টানে;

একে অন্যকে বেঁধে রাখে স্নেহ ও মায়ায়,

অটুট বন্ধনের কাছে দীনতাও হার মানে।


যেতেই হয় শ্বশুর ঘরে প্রাপ্ত বয়সে,

চন্দ্র সূর্যের আকর্ষণে যেমন আসে জোয়ার;

বিয়োগে অশ্রুজল থাকে না কারো বশে,

অশ্রুজল মুছিয়ে দেয় বলো কে কাহার?


তবুও পিতার হৃদয় তো কঠিন - কোমল,

বুকে পাথর রেখে মোছান মেয়ের অশ্রুজল।


১৯/১১/২০২০


দীপাবলীর রাতে

- দেবাশিস বসু


আবারো দীপাবলী 

আবারো হেমন্তের রাতে মুক্তোর মালার মতো আলোর রোশনাই

অন্ধকার আকাশে মুখে আগুন নিয়ে ছুটে চলা হাওয়াই

মোমবাতির আলো আর চলন্ত জোনাকির মতো আতশবাজি 

হিমেল বাতাসে পটকার ধোঁয়া যেন মরুভূমির বুকে বালিয়াড়ি

রঙ্গোলির রঙ আর মিষ্টান্নে সেজেছে গোটা সমাজ

ফানুসেরা আকাশকে জাগিয়ে রেখেছে সারাটা রাত


ঘোর অমানিশা-অন্ধকারের আঁচল ঢেকেছে অযোধ্যার পথঘাট

চোদ্দ বছর বাদে ঘরে ফেরা দাশরথির রাজপাট

বদলে গেছে মানুষ -পাল্টে গেছে পুরনো সব সীমাচিহ্ন

অচেনা পথ গলিঘুঁজি অসংখ্য

অযোধ্যাবাসী প্রদীপ দিয়ে সাজায় বাড়ী

আবার সরযূ তীরে আলোর মালায় উজ্জ্বল নগরী

আলো জ্বলে হরমন্দির সাহেবে

গুরু হরগোবিন্দ ফিরেছিল গোয়ালিয়রের বন্দীশালা হতে

মহাবীর পেয়েছিল নির্বাণ ঋজুকুলা নদীর তীরে

আগমবাগীশ সাঁওতাল রমনীতে দেখেছিল আজকের কালীমূর্তি

গোবর্ধন পাহাড় আঙুলে তুলে ধরে দেবকী নন্দন-

নিষ্ফল ইন্দ্রের বজ্র আর  মুষলধারে বৃষ্টি

এই চতুর্দশীতেই হত নরকাসুর-মুক্ত সহস্র রমণী


ফুটপাথ নদীপাড় সমুদ্রসৈকত

নবনির্মাণ বা পরিত্যক্ত কারখানায় 

যখন শুনতে পাই রক্তাক্ত সতীচ্ছদের আর্তনাদ

যখন ভাঙা বোতল আর ধারালো লোহার রডে 

শুনতে পাই কুমারী যোনীর হাহাকার

ছিন্ন অন্তর্বাসে দেখতে পাই

এখনো লেগে থাকা যৌনগন্ধী ধূসর তরল

শরীরে অজস্র হায়নার নখের আলপনা

কিংবা মন্থনের নীলাভ বিষ সারাটা শরীরে

নিরালোক ল্যাম্পপোস্টের ধার ঘেঁষে

সার দিয়ে দাঁড়ায় যে মাতৃমূর্তি

কিংবা যে গৃহবধূ বাঁধা পরে জোতদারের কাছে


আজও জীবিত সে অসুর হাজারো আলোর অন্ধকারে

আজও তার মৃগয়া ভূমি-এই বাঙলার আলোকিত পথ ঘাটে


হাতে তুলে নিই কলম তরবারির মত

আমি ছিন্ন করবো যত মেকী সভ্যতা

ভেকধারী আইন-মিথ্যে সামাজিকতা

কেটে যাবে এই অমানিশা

দীপাবলী হবে ধ্বংসস্তূপে উজ্জ্বল আলোর দিশা


২১/১১/২০২০


দর্পণ

- কাকলি ভট্টাচার্য


আজ সাতাশি দিন পর ঘরে ফিরল অরুণ।

  অরুণ মুখোপাধ্যায় একজন নামী সরকারি অফিসার। 

    পদাধিকারীর পরিচয় জলাঞ্জলি দিয়ে দিনের পর দিন হাসপাতালে বসে থাকা।

     কে অরুণ?

     মা ছাড়া অরুণের প্রকাশ কী সম্ভব ছিল? 

   এ তো অরুণ নয়, মায়ের আদরের বাপী।


শরীর জুড়ে কেমন অদ্ভুত এক ক্লান্তি।

      এতদিন হাসপাতালের গন্ধটাই নাকে সয়ে গেছে। 

  বরং সহন নয় তৃপ্তিই ছিল গন্ধে। 


    এই তো সেদিন মায়ের ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক, তখন প্রায় মধ্যরাত।

         বাবা এসে দরজায় হালকা ধাক্কা দিলেন,

      :---বৌমা তোমরা কি জেগে আছ?

           বাপীকে একবার ডাকবে, ওর মা কেমন ছটফট করছে---!

  ঘুমের মধ্যে কথাগুলো অর্ধেক কানে এলো।

ধড়পড় করে দরজা খুলে মায়ের ঘরে।

     মা এতো ঘামছে কেন?

লক্ষণ ঠিক নয়।


সেকেন্ডে সিদ্ধান্ত অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে, এই মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া দরকার।

দুই একজন বন্ধুকে ফোনে ডাকাডাকি করে নিয়ে সোজা ক্যালকাটা হসপিটাল।

      বাবা ইতস্তত করছিলেন, কিন্তু ঐ ভীতু মানুষটির কোনো কথাই গ্রাহ্য করা যায় না।

অরুণের অবাক লাগত মায়ের মতন অমন আধুনিকা সপ্রতিভ মহিলা ঐ ভদ্রলোককে নিয়ে এতো বছর কেমন করে কাটাল!

     কোনো আকাঙ্ক্ষা নেই, কোনও উচ্চাশা নেই, অদ্ভুত নিরাসক্ত জীবন।

দশটা পাঁচটা কেরানি জীবনেই খুশি।

চাওয়া পাওয়ার বাসনাহীন জীবন। 


এতো সব ব্যাপারে নির্লিপ্ত থাকে কী করে এটাই অরুণকে ভাবায়!

    সাদামাটা স্বভাবের এই মানুষটি কারো উপরে কখনও কর্তৃত্ব করেননি!

    একমাত্র বোনের লেখাপড়া নিয়ে তবু কিছু বলতেন কিন্তু বাপীকে কখনও পড়তে বসতে বলতেন না -!

হতে পারে বাপী তুখোড় লেখাপড়ায় এটা উনি জানতেন।

বাপীর রেজাল্ট প্রতি বছরে অবাক করত। 

*******  

   

       কেমন তন্দ্রাচ্ছন্ন অবশ লাগছে। 

   গতকাল সকাল থেকেই মায়ের অবস্থা খারাপ হয়। 

ডাক্তারবাবু বললেন - - আর কোনও উপায় নেই। 

আপনি অনুমতি দিলে নল খুলে নেব মিস্টার মুখার্জি।


অনুমতি?

আমি দেব? 

  আমি দণ্ডদাতা?


    আচ্ছা তবে বেকসুর খালাস।

   দণ্ডিতের সাথে দণ্ডদাতা কাঁদে--! 

        এখন সময়ের Count-down...... 

   

     :----ছন্দিতা মুখার্জির বাড়ির লোক কে আছেন, কাউন্টারে দেখা করুন। 

          ভাসা ভাসা আওয়াজ এলো।


   আহা দাদু সেই সময়ে কী সুন্দর নাম রেখেছিলেন - - - ছন্দিতা!

   কী পছন্দের নাম ছন্দিতা।

ঘরময় নূপুরের আওয়াজ উঠত!


 এতদিন সাক্ষাতের আয়ু ছিল মাপা।

আইসিইউতে এক ঝলক।

 ধীরে ধীরে সেটাও বন্ধ তখন দরজার ফাঁক দিয়ে একবার দেখা--! 

  এবার অনন্ত সাক্ষাৎ।


   কটাদিন কিছুতেই বাপী বাড়িতে যায়নি। 

প্রথম প্রথম রুমা জোর করত। 

পরের দিকে মেনে নেওয়া। 

   বিকেলে আসার সময় একটা জামা প্যান্ট আর রাতের খাবারটা নিয়ে আসত।

স্নান খাওয়া শোওয়া সবটুকুই হাসপাতালে। 

    জানে তো জেদ!


বাপী ভাবছে----

  আজ ভালো লাগছে মায়ের বন্দিদশা ঘুচল এতদিনে। 

এখন নলের ঘেরাটোপ নেই। 

   উড়ে গেল আকাশে। 

আর ধীরে ধীরে আমার ভেতরে গজিয়ে উঠছে শিক--!

যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এই সংসারে। 

         

    ওয়ার্ডের একজন বয় এসে ঠেলে ডাকল! 

    :----দাদা, ডাকছে আপনাকে। 

  সম্বিত ফিরল---

হ্যাঁ যাই - - - - - - 


       বাপীর চিরদিনই মাকে পছন্দ।

  অফিসের গাড়ি আসত, মা ইংরেজিতে অদ্ভুত স্বচ্ছন্দ - - বড়ো বড়ো মানুষ মায়ের সঙ্গে কথা বলতেন রীতিমত সমীহ করে।

     কী অসাধারণ ব্যক্তিত্ব মায়ের! 

    বাপী ছিল তাই মায়ের কোলঘেষা।

     

        বাবার এক দিদি মানে পিসিমা থাকতেন ওদের সাথেই।

     বালবিধবা পিসিমার তেমন দাপট কখনও ছিল না সংসারে।

      পিসিমার রান্নাগুলো বাপীর খুব পছন্দ ছিল -!

কেমন ছোট্ট ছোট্ট বড়া ভেজে পেঁপের তরকারি করতেন, আলুসিদ্ধ মাখতেন হিং দিয়ে।

    বলতেন হিংয়ের ভিতরে পেঁয়াজের গন্ধ আসে।

     বিধবাদের কত নিয়মের মধ্য দিয়ে চলা। 

   আচ্ছা অবদমন কী অবচেতনের ইচ্ছে? 

     বাপী অপেক্ষা করত কখন পিসিমা খেতে বসবে!

একটু আধটু ছুঁড়ে দিতেন।

     

        আপাত নিরীহ পিসিমাও বাবার উপরে মাঝেমধ্যে রাগ করতেন।

  গজর গজর করে বলতেন - - - 

"আদারে ঠকায় বোদা

আর বোদারে ঠকায় খোদা"! 


কার উদ্দেশ্যে বলতেন বোঝা যেত না কিন্তু বাবা রেগে যেতেন এসব শুনলেই।

বলতেন - - - থামবে তুমি! 


      মায়ের বন্ধু ফুলরেণু গুহ খুব আসতেন মায়ের কাছে।

পাড়ার মধ্যে মায়ের সম্মান যেন আরও বেড়ে যেত।

         বাপীর গর্বে বুক ফুলে উঠত।

  বন্ধুদের মাঝে হিরো। 

সে সব দিনগুলিতে পড়ার উৎসাহ দ্বিগুণ হয়ে উঠত।

মায়ের মতো হতেই হবে।


     নন্দু বরাবরই বাবা নেওটা।

  দিনরাত মুখস্থ বিদ্যা দিয়ে ক্লাস ডিঙোন একের পর এক।

 দেখতে দেখতে একদিন এম-এ পাশও করে গেল।

বাবা খুব খুশি, মা-ও খুশি তবে মা বললেন - - এবার নন্দুর জন্য পাত্র দেখো।

   পিসিমাও মায়ের কথায় সহমত।

     ততদিনে বাপী সরকারি উচ্চপদে আসীন।


     পিসিমা হেসে বলতেন - - - আমাগো বাপী বাজারে লাউ আনতে পাডাইলে কদু লইয়া আসত! হ্যেয় এখন কত্তা হইছে আফিসে--!


    এটা সত্যিই মনে পড়লে হাসি পায় - -

তরিতরকারি তো চেনেই না তেমন!

পিসিমা একদিন দুপুরে বলল একটা লাউ আনতে,

বাজারে গিয়ে দেখি লম্বা লম্বা লাউ! কচি বেশ।

নিয়ে নেওয়া - -! 

ওমা লম্বা লাউ নাকি লাউ না! 

ওগুলোর নাম কদু।

বোঝো কাণ্ড!


      প্রথম মৃত্যু দেখা পিসিমার।

   সবাই বলছিল মারা গিয়েছেন একদিকে ভালোই হয়েছে।

এতদিন ধরে বৈধব্য জীবনের কষ্ট।

   বাপী ভাবল তবে বোধহয় মৃত্যু একদিকে ভালোই।

      


পিসিমা চলে যাবার পর মা উতলা হলেন বাপীর বিয়ে দেওয়ার জন্য।

    যোগ্য পাত্রীর খোঁজ।

বাবার বন্ধুর মেয়ে কলেজে পড়ান।

বাবা সম্বন্ধ আনলেন।

এক কথায় মায়ের নাকচ।

  দিদিমণি লাগবো না - - - সারা জীবন বাপীরে পড়াইব আনে।

    তাগো তো পড়ানোই কাম।

   আমাগো ঘরে দিদিমণির কাজ নাই। 

  ঘরোয়া মাইয়া দেখো, জীবনভর চাকরি কইরা বুঝছি দুইটা কাম একলগে সামলাইতে পারা মুশকিল।

 নেহাত দিদি আছিলেন তাই নন্দু বাপী ইস্কুল থেইকা আইসা ভাত বাড়াই পাইত।


    খবর আসল এক দূর সম্পর্কের পিসেমশাইয়ের গ্রাম থেকে।

গ্র্যাজুয়েট মেয়ে দেখতে শুনতে ভালো ভদ্র নম্র---

জরুরি কাজে রায়গঞ্জ যেতে হলো বলে বাবা মা পাত্রী দেখে বিয়ের দিন ঠিক করে এলেন।


    বর বেশে বৌ দেখা।

   সত্যিই খুব ভালো মেয়ে রুমা।

  বনেদি বাড়ির মেয়ে।

     বাড়িতে এসে মায়ের বৌমণি।

  গয়না দিয়ে ভরিয়ে সাজাল মা।

  নন্দুর একটু রাগ হলো - - -

অত গয়না একবারে কেউ দেয় নাকি?

   মা হেসে বললেন তোকেও তো দিয়েছি।


 দিন কাটছিল এভাবেই।

  হঠাৎ করেই বদলির নির্দেশ এলো।

       চাকরি ছেড়ে দিতে তৈরী বাপী।


    :---মা আমি অন্য চাকরি পেয়ে যাব।

কিন্তু তোমাদেরকে ছেড়ে ওখানে যাব না।


   মা সারারাত বোঝাল---: শোন বাপী তুই যে পদে ওখানে যাচ্ছিস জানিস কত গর্ব তোকে নিয়ে।

    আমি তো পারলাম না ট্রান্সফার নিতে-!

  আজ কোথায় চলে যেতাম আমি!

কিন্তু তোর বাবাকে ছেড়ে যেতে পারিনি!


রেগে গেছে বাপী। 

চিৎকার করে বলে উঠেছে---


:--কেন পারোনি?

কী পেয়েছ বাবার মধ্যে?


মা চুপ।

   শেষ পর্যন্ত রুমাকেও সাথে পাঠালেন।

ওখানে গিয়ে সিবেস্টিয়ান সাহেবের সাথে আলাপ!

    রুমা ধীরে ধীরে শহুরে বাতাস পেল। 

      মায়ের প্রবল ব্যক্তিত্ব থেকে খানিকটা মুক্তির স্বাদ যেন। 

   আট বছরে ক'বার কলকাতা এসেছে বাপী?

       উইক - এন্ড মানেই ওখানে জমজমাট পার্টি।

   মাঝেমধ্যে কলকাতা ঘুরে যাওয়া।

মূলতঃ মায়ের টানেই। 

বাবা তখন রিটায়ার্ড, মাও তাই।

    একে অপরের সঙ্গী।

  বাপীর টান চিরকাল মায়ের উপরেই।

  তাছাড়া বোন খোঁজ খবর নিত।

  এক সময় বাপী হোম টাউনে ফিরে এলো।


  ছুটির দিনে বাবাকে দেখলে আরও বিরক্ত লাগত।

     মা কী সুন্দর নানান ধরনের বই এনে পড়তেন।

গোলপার্কে যেখানে বিদেশী ভাষা শেখানো হয় সেখানে জার্মান ভাষা শিখতে ভর্তি হয়েছিলেন।

 বাপী অবাক হত মাকে দেখে।

      এমন মানুষ সংসারে এক সন্ন্যাসী যেন! 


রুমা আবার বাবার সাথেই স্বচ্ছন্দ।

প্যানপ্যানে মাখা-মাখা গানগুলো শুনলে পিত্তি জ্বলত।

অথচ ভদ্রলোক দিনরাত এগুলোই শুনছে।


রুমার কার্শিয়াং-এ দু'বার মিসক্যারেজ হয়।

শেষ পর্যন্ত জানা গেল বাচ্চা হওয়াই মুশকিল।

মূলতঃ মায়ের উদ্যোগে একটি সন্তান দত্তক নেওয়া হলো।

    এও এক অদ্ভুত ডিসিশন। 


  কিন্তু - - - - - 


    ঘোর কেটে গেল বাপীর। 

কোথায় চলে গেছিল। 

    হাসপাতাল থেকে বডি বের করে একবার বাড়িতে নিতে হবে। 

      জানি না জগতের কত নিয়ম যে মেনে নিতে হয়! 

      আমার মা ছন্দিত মুখার্জি এখন কেবলমাত্র পরিচয় লাশ! 


         শ্মশানে যন্ত্রের মতন মুখাগ্নি করল! 

     অথচ চোখ শুকনো! 

     বোধকরি চুল্লির তাপ সব আবেগ শুষে নিল।


      শ্মশানের চুল্লির দরজা খোলার পর সমবেত বলহরির মধ্যে কে যেন বলে উঠল - - দুগ্গা দুগ্গা! 

     এই যাত্রারও শুভ অশুভ হয়? 

        সব মিটল যখন তখন বাজে সকাল এগারোটা। 

   এবার ঘরে ফেরা। 

    আর কোথাও কোনও ডিউটি নেই। 

      আইসিউতে ছন্দিতা মুখার্জি কেমন আছেন - - - এই কথাটা জানতে কাউকে উত্যক্ত করতে হবে না আর। 


  আজ এতদিন পর ঘরে ঢুকে মায়ের ঘরের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। 

        এই ঘরের মানুষ চলে গেছে সব ধুয়ে মুছে। 


     কোনও রকমে স্নান খাওয়া সেরে সোজা মায়ের ঘরে। 

শেষ সময়ে যখন তবু কথা বলতে পারত একদিন মা কাছে ডেকে বলেছিল ওকে----বাপী আমি যদি না ফিরি তোর বাবাকে দেখিস। 

আর আমার খাটের নিচে যে ট্রাঙ্কটা আছে ওর চাবি বিছানার তোষকের নিচে। 

ওটা খুললেই একটা খাম পাবি। 

আমি যদি মরে যাই তবেই ওই খাম খুলবি।


  ঘরে ঢুকে সন্তর্পণে বাপী ট্রাঙ্কটা বের করল। 

  চাবি দিয়ে খুলল। 

    ওই তো শাড়ির ভাঁজে খামটা। 


  আঠা দিয়ে আটকে রাখা। 

  খোলার ধৈর্য হারাচ্ছে ক্রমশ। 

ছিঁড়ে ফেলল খাম। 


     আরে তার এই সাদাকালো ছবিটা এখানে কেন? 

    এ তো আমিই--!

       কবে তোলা এই সাদাকালো ছবি? 

     কিন্তু আমিই কী? 


    এই ঠাণ্ডায় বিন্দু বিন্দু ঘাম। 

         নিচে আরেকটি খাম। 

     একটি চিঠি! 

হাতের লেখা তো মায়ের!

খুলল চিঠি----


     স্নেহের বাপী, 


            এ চিঠি যখন পড়বে আমি তখন এই পৃথিবীতে থাকব না। 

              তোমার বহু প্রশ্নের উত্তর দিতে আজ সব লিখছি। 

            প্রথমেই যার ছবি দেখলে উনিই তোমার বাবা। 

             তুখোড় মেধাবী একজন মানুষ। 

           জীবিকা হিসেবে পাইলট হওয়া বেছে নেন। 

           আমাদের মেলামেশা বহুদিন। 

              আশীর্বাদ হবার পর একদিন মিলিত হয়ে ছিলাম। 

              মাস দুই তিন পরে যখন শরীর অন্য সংকেত দেয় তখনই তাকে চিঠি লিখি। 

             তিনি তখন সাত সমুদ্রের ওপারে। 

              উত্তরে বলেন--যত শীঘ্র সম্ভব দেশে ফিরবেন, চিন্তা না করতে। 

                এসেই বিয়ে করে নেবেন। 

                 তিনি ফিরছিলেন এমন সময়ে Plane Crash এবং তৎক্ষণাৎ মৃত্যু। 

                   খবরটি যখন এলো আমি দিশেহারা! 

                  ততদিনে তুমি চার মাস পেটে। 

                   বাড়িময় কান্নাকাটি হুলুস্থুল অশান্তি।

  বাবা - মা দুজনেই চাইলেন বাচ্চা নষ্ট করে ফেলা হোক।

আমি চাইলাম না ভাস্করের শেষ চিহ্ন মুছতে।

     নন্দুর বাবা আমার বাবার ছাত্র ছিলেন।

    আমাকে পছন্দ করতেন কিন্তু ভীরুতার জন্যে কখনও বলেননি, বরং আমার কোনও কাজ করতে পারলে ধন্য হতেন।

   সেদিন যখন ঘরে তুমুল বচসা চলছিল উনি কিছু একটা কাজে এসেছিলেন বাবার কাছে।

বাইরে থেকে সব শোনেন।

   পরের দিন আমি বাগানে দাঁড়িয়ে!

তখন তিনি আসেন আমার কাছে - -

  কী অদ্ভুত করুণ মুখে হাসি এনে জিজ্ঞেস করলেন - - কেমন আছি?

   এড়িয়ে চলে আসছিলাম....

তিনি বললেন - - ছন্দিতা আমি রাজি।

   বিস্ময়ে বলি--কিসের রাজি?

      তিনি স্বভাবসিদ্ধ ভীরুতা নিয়েই বলেন--বাচ্চা নষ্ট কোরো না।

আমি বিয়ে করে পরিচয় দেব।

    আমার তিনকুলে ওই দিদি ছাড়া কেউই নেই।

  জবাবদিহিতার প্রয়োজন নেই।


      একসাথে এতো কথা বোধকরি কখনও বলেননি।

হাঁফাচ্ছিলেন তিনি আর আমি ভাবছিলাম এ কোন ঈশ্বরের বাণী।


      তোমার পিসিমা প্রথমে কিছু জানতেন না কিন্তু তোমার জন্মের পর আন্দাজ করেন।

তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে পিসিমার বলা শ্লোকটা।

   আদারে ঠকায় বোদা

     আর

বোদারে ঠকায় খোদা--!


  জানি না ঠকিয়ে ছিলাম কিনা! 


    বাপী আমাকে তিনি আজীবন ঋণী করে রেখেছিলেন এমনকি স্বামীর অধিকার নিয়েও কখনও আসেননি।

   নন্দিনীর জন্ম ক্ষণিকের দুর্বলতা।

       তোমার মেধা আমাকে ভাস্করকে ভুলতে দেয়নি।

এমনকি তোমার নামটিও তার নামেই তোমার বাবা দিয়েছিলেন।

      অরুণ মুখার্জি। 

    তুমি যত বড়ো হয়েছ আমার চোখের সামনে ভাস্কর দাঁড়িয়েছে।

   তুমি জিজ্ঞেস করতে আমি তোমার বাবাকে সহ্য করি কেমন করে?

উত্তর দিতে পারিনি---

কী বলতাম বলো?

   তোমার বাবাই তো আমাকে সহ্য করেছেন দিনের পর দিন।

আমার স্বাধীনতায় কখনও হস্তক্ষেপ করেননি।


    বাপী আমি চললাম।

  তোমার বাবাকে আগলে রেখো।

তার তো কেউই নেই।

 যদিও তোমার বোন ওনার মতনই কিন্তু সেও তো সংসারী আর সংসারের খুঁটিনাটিতেই মন।

   বৌমা তোমার বাবাকে শ্রদ্ধা করে।

              তোমরা আমার আশীর্বাদ নিও।

                 তাঁর চরণে আমার শেষ শ্রদ্ধাটুকু জানিও। 


            ইতি------

                             মা


*******


      ঘোরের মধ্যে টলছে যেন পৃথিবী।

  ওই ঘরের লোকটাকে চিরদিন তো করুণাই করে এসেছে।

 জন্মদাতা তিনি নন--কিন্তু?


    পশ্চিমের আকাশ লাল হয়ে আসছে।

সূর্য ডুবছে।

  সূর্যের শেষ বিভাটুকু ছড়িয়ে পড়েছে ঘরের আনাচে কানাচে। 


  ওই ঘরে একবার যেতে হবে---কিন্তু কেমন করে?

     বাইরে থেকে বাপী বোনের গলা পেল।


     :----বাবা, মায়ের ওই মটরদানা হারটা আমি নেব।

   অনর্গল বোন কথা বলে চলেছে।


   বাবা স্থির কণ্ঠে বললেন ওটা বৌমার।

 ওটা আমার মায়ের হার, আমার বংশেই থাকবে, তুমি অন্য কিছু নিও।


দু'চোখে এতক্ষণে জল এলো বাপীর।

  শ্মশানেও সে কাঁদেনি।

         শূন্য হৃদয়ে কর্তব্য পালন করে গেছে কেবল।


         আজ ওই ঘরে কয়েক হাত দূরে ক্ষীণ শ্বাস ফেলছেন একজন মানুষ যাকে সে গোটা জীবন ভীরু অপদার্থ ছাড়া আর কিছুই ভাবেনি!

  জন্মদাতা তিনি নন---

   কে তবে তিনি?

  ঈশ্বর?

কিন্তু ঈশ্বরের অস্তিত্ব আদৌ আছে কী?

   অস্বস্তিকর নীরবতা।

  নীরবতায় এতো রব জানা ছিল না তো! 

    

আজ এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে - - - 

     কাকে এতদিন করুণা করেছে সে?

যে মানুষটা তাকেই বংশধর ভাবেন?

    ধীর পায়ে হেঁটে ঘরে গেল বাপী।


বহুদিন পর ডাকল-----বাবা---

  একটা হাহাকার ধ্বনি যেন!


:-----বাবা, মাকে ট্রেনে তুলে দিয়ে এলাম-

মা ঠিক পারবে সঠিক স্টেশনে নেমে যেতে -!

  তুমি ভেবো না!

  ওই ডেথ সার্টিফিকেটটা সত্যি নয়।

আসলে সত্যি বলে সত্যিই কিছু হয় না--!


   মৃত্যুশোক এই প্রথম এই ঘরময় ছেয়ে গেল-!

শোকের ধ্বনি প্রতিধ্বনিত। 

পিতাপুত্র জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।


*****


(পাত্র-পাত্রী সবটুকুই লেখকের কল্পনা।

বাস্তবের সাথে কোনো মিল নেই।)


পৃথিবী নয় জড়
- উদয় চাঁদ হাজরা

মাটির পৃথিবী, তবুতো সেথায়
জীবনেরা আশা রাখে
অস্বীকার করেনা জড়ের মতন
সকলেই বেঁচে থাকে।

গাছপালা পশু,লতাপাতা, পাখি
সকলের সাথে থেকে
পৃথিবী এখন জড় নেই আর
জীবন রেখেছে ঢেকে।

প্রতিদিন বহু জীবনের মাঝে
পৃথিবী রয়েছে পাশে
জীবন্ত ফুলের পাপড়িরা ঝরে
মাটিতে পরে,আশে।

পৃথিবী যদি সত‍্যিই জড়
তৃণ জীবন্ত জানো
জড় থেকে জন্ম জীবের
কেমন করে মানো!

বলা তো যায় না,পৃথিবীকে জড়
জীবন আঁকড়ে ধরে
সদা জীবন্ত আনাচে কানাচে
বিবিধ জীবন গড়ে।

তাং---১১ই অগ্রহায়ণ '১৪২৭(ইং-27.11.2020)



ফেসবুক ফ্রেন্ড

- অমিতাভ রায়


"আচ্ছা শ্যামু- শ্যামল কুমার, তোর প্রেমের পালাগুলো এতো হিট হয়েছিল- আর তুই নিজেই বিয়ে করলিনা!" শ্যামল বলে, "দেখ মানু, তুই বিয়ে করেছিস। বউকে লুকিয়ে একটা মেয়ের সঙ্গে জড়িয়েও গিয়েছিলি। এখন আবার বউ মরে যেতে বুড়ো বয়সে ফেসবুকে জোয়ান বয়সের ছবি প্রোফাইলে দিয়ে কচি কচি মেয়েদের বন্ধু বানাচ্ছিস। তোর মতো কয়েকজন থাকলে মেয়েদের প্রেমিকের অভাব কি?" মানব হাসতে থাকে। হাসি থামলে বলে, "এটাই তো জীবন রে। প্রেম ছাড়া জীবনে আর কি আছে! আর, আমার তোবড়ানো গালের ছবি দেখলে কোন মেয়েই আমার বন্ধু হবেনা।" দুজনেই হাসতে থাকে। মানব বলে, "আমার কথা বলছিস- আর তোর সঙ্গে যাত্রাপালায় যে ভিলেন সাজতো, সেই বিজন- সেতো দুটো বিয়ে করে, দুজায়গায় সংসার পেতে দিব্যি চালিয়ে গেলো। হপ্তার প্রথম দিকে থাকতো আইনি পথে বিয়ে করা বউয়ের সঙ্গে- আর হপ্তার শেষের দিকে থাকতো অবৈধ বউয়ের সঙ্গে।" ঠিকই বলেছে মানব। পাড়ার একমাত্র পার্কটায় ওদের চিরকালের আড্ডা। বন্ধুদের মধ্যে অধিকাংশই হারিয়ে গিয়েছে। এখন ওরা দুজনে ঠেকেছে। শেষ বিকেলের আলো গায়ে মেখে দুই বুড়ো আড্ডা দিয়েই যাচ্ছে। শ্যামল বিয়ে করেনি। অন্যদিকে মানব বিপত্নীক। কোনো পিছুটান ওদের নেই।


      শ্যামল সন্ধেবেলায় বারান্দায় বসে ফেসবুক খোলে। এখন এই এক অভ্যাস হয়েছে ওর। এরজন্য দায়ী অবশ্য ওর ভাইঝি নীলা। মোবাইলে ফেসবুক অ্যাপ ডাউনলোড করে দিয়ে বলেছে, "তুমি এতো সুন্দর সুন্দর কথা বলো আমায়। এখানে সেগুলো লেখো। লোকে দেখতে পাবে।" শ্যামলের এর মধ্যে বেশ কিছু বিভিন্নবয়সী বন্ধুও জুটে গেছে। কম বয়সে শ্যামল কবিতা লিখতো। এখন আবার লেখার চেষ্টা করে। যদিও নিজেরই পছন্দ হয় না। তবুও কেউ কেউ পছন্দ করে- উৎসাহ দেয়। সেজন্যই লেখে। নিজের অভিনীত যাত্রাপালাগুলোরও বিবরণ দেয়। গ্রীষ্মের সন্ধেবেলায় এই বারান্দায় বসতে খুব ভালো লাগে ওর। বেশ স্নিগ্ধ হাওয়া বয় মাঝেমাঝে। শরীরটা জুড়িয়ে আসে। মেসেঞ্জারের নোটিফিকেশনে শ্যামল দেখে সেই মেয়েটা আবার লিখেছে। কি চায় মেয়েটা কে জানে! রীতিমতো প্রেমপত্র। যদিও ভাষাটা পুরনো দিনের মতো। মালবিকাকে দেখতেও খুব মিষ্টি। গল্প লেখে খুব ভালো। কিন্তু, দোষ এই একটাই। মাঝেমাঝেই ওকে এইজাতীয় প্রেমপত্র পাঠায়। মেয়েটা ভালভাবেই জানে ও কতো বুড়ো। তবুও? ভেবে পায়না শ্যামল। চিঠিটা পড়তে থাকে শ্যামল। ওর যদি যৌবন থাকতো-এই প্রেমের ডাকে সাড়া না দিয়ে পারতো না শ্যামল। কিন্তু, তা বোধহয় হতোনা। স্মৃতির আলোয় নিজের অতীত জীবনটা দেখতে থাকে ও। বিষণ্ণ হেসে আবার চিঠিটা পড়তে থাকে। চিঠি শেষ হয়ে গিয়েছে। তবু, আরো কিছু লেখা আছে- "আমি আপনার সঙ্গে একবার দেখা করতে চাই। নন্দনে পরশু শনিবার বিকেল চারটেয় একবার আসতে পারবেন। প্লিজ আসুন না একবার।" এ আবার কি?


    মানব শুনে প্রায় লাফাতে থাকে। "তুইতো বাজি প্রায় মেরে দিয়েছিস রে!"

"না রে-আমার মনে হয় মেয়েটার অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে।" "কি আবার উদ্দেশ্য?" মানবের কথা শুনে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে শ্যামল। তারপর বলে, "তুই কালকে বললিনা- তোর তোবড়ানো গালের ছবি দেখলে কোনো মেয়ে তোকে পাত্তা দেবে না!" "না রে, এখন ভেবে দেখছি বার্ধক্যেরও একটা আলাদা সৌন্দর্য আছে- অনেকটা সূর্যাস্তের মতো। চিরকালের মতো পশ্চিমের আকাশে ডুবে যাওয়ার আগে শেষবার কিছু ভালবাসা বিলিয়ে যাওয়া। সূর্য তো পরেরদিন ভোরবেলায় আবার উঠবে। কিন্তু, আমরা আর ফিরবো না।" কেমন বিষণ্ণ লাগে মানবের কণ্ঠস্বর। "তোর হল কি? দার্শনিকের মতো কথা বলছিস যে আজ!" মানব কি যেন ভাবছে। সন্ধে নামছে। ধীরে ধীরে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। "আমার শরীরটা কয়েকদিন ধরে সুবিধের ঠেকছে না। কেন জানিনা মনে হচ্ছে শীতের গাছে আমি এক জীর্ণ পাতা। একবার ঝোড়ো হাওয়া দিলে ঝরে যাবো।" ডায়লগটা শ্যামলের খুবই চেনা। ওর নিজের যাত্রাপালারই সংলাপ। মানবের মতো হইচই করা মানুষের এই সংলাপ শুনতে মোটেই ভালো লাগছেনা ওর। উঠে পড়ে শ্যামল- মানবও। "তুই মেয়েটার কাছ থেকে ঘুরেই আয়৷ কি বলতে চায় শুনে নে। না হলে স্বর্গে গিয়ে আফসোস করবি।" বলে পরিচিত ঢঙে হাসার চেষ্টা করে মানব। কিন্তু, বড্ড বেসুরো ঠেকছে যে! শ্যামল বলে, "অনেকদিন কোথাও যাই নি। কনফিডেন্সটাই হারিয়ে গিয়েছে।" "ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাবি।" দুজনে ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকে। সামনে পাঁচিলের আড়ালে এক যুবক এক যুবতীর হাত ধরে কি যেন বলছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে শ্যামল দেখে চাঁদ উঁকি মারছে মেঘের আড়াল থেকে।


     ট্যাক্সি নিয়ে নন্দনের সামনে পৌঁছে যায় শ্যামল। এবার ভিতরে ঢুকে মেয়েটাকে খুঁজতে হবে। গেট পেরোতেই কে যেন পিছন থেকে হাত ধরে শ্যামলের। চিনতে অসুবিধা হয় না। সিঁড়ির উপরে বসে ওরা। একটু আগেই বিরক্ত লাগছিল শ্যামলের। কিন্তু, বহুদিন  পরে নন্দনের পরিবেশে এসে ভালোই লাগছে। "এই চিঠিগুলো তুমি লেখো কেন বলো তো?" মালবিকা মাথা নীচু করে কি যেন ভাবে। তারপর মোবাইল খুলে কি সব দেখছে। আবার বিরক্ত লাগে শ্যামলের। মেয়েটা কিছু বলছে না কেন? মালবিকা মোবাইলটা শ্যামলের হাতে তুলে দিয়ে বলে,"দেখুন।" স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে শ্যামল। এ কি দেখছে ও! দীপার ছবি! তবে ও যখন শেষ দেখেছে দীপাকে তার থেকে একটু বেশী বয়সের ছবি। দীপার তখন বিয়ে হয়ে গিয়েছে৷ মোবাইলটা মালবিকার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ওর দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে শ্যামল। মালবিকা বলে, "আমার সঙ্গে চলুন। যেতে যেতে বলছি।" বাইরে গিয়ে ড্রাইভারকে ডেকে নেয় মালবিকা। শ্যামলকে গাড়ির পিছনের সীটে হাত  ধরে বসিয়ে দিয়ে নিজে পাশে বসে। ড্রাইভারকে কিছু বলতে হলো না। গাড়ি এগিয়ে চলল। ওর যাত্রা দেখে প্রেমে পড়ে গিয়েছিল দীপা। কিন্তু, ওর বাড়ির লোক যাত্রার নায়ককে বিয়ে করবে মেয়ে,সেটা চায় নি। দীপা পালিয়ে যাবে ঠিক করেছিল। কিন্তু, ওকে আটকে রেখে জোর করে বিয়ে দেওয়া হয়। সেই অধ্যায় আর কখনো মনে করতে চায় নি শ্যামল। কিন্তু, আজ স্মৃতির আগল ভেঙে ওকে ভাসিয়ে দিল।


      "এবার আপনাকে বলি। আমার ঠাম্মা বিয়ের পর থেকেই খুব অসুখী ছিল। দাদু অত্যন্ত বদমেজাজি ছিল। শাশুড়িও সুবিধের ছিল না। বলা উচিত নয়, তবু বলি- দাদুর খারাপ পাড়ায় যাতায়াত ছিল। দাদু মারা যাওয়ার পরে ঠাম্মার কাছ থেকে আমি সব জানতে পারি। সে সময়ই আমি আপনার কথা জানতে পারলাম। ঠাম্মা আমায় খুব ভালবাসতো। যখনই ঠাম্মার মন খারাপ হতো - তখনই আপনাকে চিঠি লিখতো- তারপরে সেই চিঠি লুকিয়ে রেখে দিতো। সেই চিঠিগুলো টাইপ করেই আমি আপনাকে পাঠিয়েছি।" বুকের ভিতরে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে শ্যামলের। "আচ্ছা- তোমায় ভালবাসতো বলছো কেন?" শ্যামলের কথা শুনে ম্লান হাসে মালবিকা, "না গেলে বুঝতে পারবেন না।" একটা নার্সিংহোমের ভিতরে গাড়ি ঢুকলো। কার্ড দেখিয়ে শ্যামলের হাত ধরে মালবিকা পাঁচতলায় উঠে এল লিফটে। শ্যামলের আর কোন কথা বলার ক্ষমতা ছিলনা। ভিতরে ঢুকে শ্যামল দেখে বেডে শুয়ে আছে এক বৃদ্ধা। "ওনার জীবনের একমাত্র ইচ্ছা ছিল আপনাকে একবার অন্তত  দেখবার। আমি ফেসবুকে আপনাকে পেয়েও গেলাম। তখন ওনার লেখা চিঠিগুলো টাইপ করে আপনাকে পাঠাতে লাগলাম। ইচ্ছে ছিল, একবার আপনার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেব। কিন্তু, উনি ভীষণ অসুস্থ হয়ে কোমায় চলে গেলেন।" বলতে বলতে মালবিকার দুচোখ জলে ভরে গেল। শ্যামল কাছে গিয়ে দেখল- দীপা ঘুমিয়ে রয়েছে মনে হচ্ছে। এ ঘুম হয়তো আর ভাঙবে না। বাইরে প্রবল ঝড় উঠেছে। জানলা বন্ধ করে দিল নার্স। বাইরে দেখা যাচ্ছে গাছগুলো ঝড়ের দাপটে যেন নুয়ে নুয়ে পড়ছে। বেডের পাশের টুলটায় বসে দীপার হাত চেপে ধরলো শ্যামল। কতো কথা বুকে জমে রয়েছে। কিছুই তো বলা হলো না। মালবিকা জানলার ধারে দাঁড়িয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। শ্যামলের বুকের ভিতরটা কেমন করে ওঠে। গলার ভিতরে কান্না দলা পাকিয়ে উঠছে। মনে মনে শ্যামল বলে,"দীপা, একবার দেখবে না- আমি এসেছি।" দীপার মুখে একটু হাসির রেখা যেন ফুটে উঠেছে। কোমায় থাকা মানুষ কি স্বপ্ন দেখতে পারে?


হেমন্তের গান

- জাকিরুল চৌধুরী 


বাংলার ঘরে এই মাসে 

নব ধানের আগমন, 

যখন দেখি কৃষকের মুখে 

থাকে হাসি সারাক্ষণ। 

নতুন চালে নতুন গুঁড়ি 

বুনে রকম পিঠে, 

সেই পিঠা খেতে মোদের 

লাগে কতোই মিঠে। 

হেমন্ত আসে মোদের কাছে

নানা ফল নিয়ে, 

তাইতো কবি বলেছে এই

মাসকে বলে দিয়ে। 

হেমন্তকে বলা হয় 

সব মাসের রাজা, 

চারদিকে ফুটে দেন ফুল 

লাগে অনেক মজা। 

এই মাসে মৌমাছি বসে 

বুনে মধুর চাকে, 

সেই মধুর গন্ধ লাগে 

লাগে মোদের নাকে। 


সুরঞ্জন স্যারেরা

- কিরণময় নন্দী


শুন্য এ বুকে ফিরে আয় তোরা

ফিরে আয় আম-জাম-মেহগিনী ঘেরা স্কুল আঙিনায়

তোদের তরে মন উচাটন

তোদের ছেড়ে সুরঞ্জন স্যারেরা সুখে নাই।


বন্ধ ঘরে আজও টিকটিকি টিকটিক করে

জানালা ছেড়ে মাকড়শা জাল বোনে সাড়া ঘর জুড়ে

আগাছায় ভরেছে দেবদারু গাছের তল

ভূতুড়ে অনুভূতি আমাদের সাধের ইস্কুল ঘিরে।

কাছাকাছি বেঞ্চগুলো ফিসফিস কথা কয়

শুধু তোদের তরে দিনগোনে

তোদের বইয়ের ব্যাগে ভরবে ওদের বুক

এই রঙীন স্বপ্নের জাল বোনে।

কি জানি কবে মিটবে বিষের জ্বালা

ছুটি নেবে মারণ ভাইরাস

সুরঞ্জন স্যারেরা তোদের নিয়ে উঠবে মেতে 

প্রাণভরে নেবে বিশুদ্ধ বাতাস।


অমাবস্যার চন্দ্রিমা 

- রোজী নাথ


নিজের আয়নায় নিজেকেই দেখে কেমন যেন একটা হাসি পায়। এমনটাই মনে হয় যেন আমার অবচেতন মনকে সচেতন মন উপহাস করেই চলছে। নিজের অজান্তে সেই আয়নার কাঁচগুলো যেন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে ঝরঝরিয়ে পড়ছে। তার‌ই গোটাকতক তুলে আবার জীবন সাজানোর প্রয়াস।


এই হাড়ভাঙা জীবনের চড়াই-উৎরাই পেরোতে পেরোতে যখন ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসে , তখন ভাবি অনুভূতিগুলোও মৃত্যুর মতন মিশে যায় আমার সমাধির সাথে।


প্রতিটি মানুষের জীবনেই একটা গল্প থাকে । কারো গল্পটা রঙীন মোড়কে আবৃত আবার কারো বা বর্ণহীনতায় সাদাকালো। অসীম শূণ্যতার মাঝে তোমার অস্তিত্ব খুঁজতে খুঁজতে আজ আমি ভীষণ ক্লান্ত।


আমার অস্তিত্ব যেন পালছেড়া ডিঙ্গি নৌকার মতো , আর হৃদয়ের কোণের অস্থিরতা যেন ক্ষণিকের ঝড়- ঝাঁপটায় আমাকে যাযাবরের শিরোপা উপহার দিয়েছে। মনের ঘরের সেই ছোট রূপকথার রাজকুমারী আজ‌ও যেন সোনার কাঠি রূপোর কাঠি নাড়ানোর অধীর  অপেক্ষায়। কখন জেগে উঠবে এক নিটোল সুন্দর সন্ধ্যা নিয়ে। পরক্ষণেই ঘুম ভেঙে আমি নিজেকে খুঁজে পেলাম ঠিকানাবিহীন চাহিদার ধূসর ভীড়ে। স্বপ্নিল অনুভূতিগুলো হারিয়ে গেল দিশেহারা ভাষাহীন কোনো এক সুদূর প্রান্তরে।


একটা মেয়েকে জন্মের পর থেকে কত যে ত্যাগ স্বীকার করে করে বড় হয়ে ওঠার আকাশটাকে স্পর্শ করতে হয়। তার সাধারণ ইচ্ছে , পছন্দ-অপছন্দ , অনুভূতিগুলো অন্যের খুশির জন্য বিসর্জন দিয়ে তাকে নারীত্বের পথে চলতে হয়। মেয়েদের আছে একটাই ক্ষমতা ---- মায়ার বাঁধনে বাঁধার ক্ষমতা। অব্যক্ত আবেগগুলো পুরুষের নিকোটিনের ধোঁয়ায় যেমন আত্মহত্যা করে , আমিও সব ইচ্ছে জলাঞ্জলি দিয়ে চির দারিদ্র্যতায় সবে কৈশোরের সীমানা পেরিয়ে যৌবনে পদার্পণ করেছি।


তোমাকে ভালোবাসার এই ইচ্ছেটা আজ‌ও আমার প্রতিটি শিরা উপশিরায় মিশে আছে। অনিন্দ্য পুষ্পের পাপড়ির মৃদু ছোঁয়ায় তোমার হৃদয় স্পর্শ করতে চেয়েছিলাম। শুধু দারিদ্র্যতার কারণে সেই ইচ্ছেটা বাস্তবের মাটি ছুঁতে পারেনি , নিছক ইচ্ছেই রয়ে গেলো। সবার প্রত্যাখ্যানে আমি জর্জরিত।


আমি বাবার দ্বিতীয় সংসারের বেশি বয়সের কনিষ্ঠা কন্যা। আদর শুধুই ডাকে থাকে। মায়ের দেখাশোনা করার পাশাপাশি  ছাগল , গরু , হাঁস, মোরগ লালন পালন আমার গৃহকর্মের রোজনামচা ছিল। এতেই আদরের বাঁধন। জীবনের চলমান যাত্রায় জীবন কত যে মোড় পাল্টায় সে কারো জানা থাকে না। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রেই একথা সমানভাবে প্রযোজ্য।


আমি সমবয়সী ছেলেমেয়েদের সাথে স্কুলে যেতাম , মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়াতাম, সকল সরলতাকে সঙ্গী করেই , কখনও বা সবার সাথে গাছে চড়তাম , আবার কখনও অনাবিল আনন্দে জলে সাঁতার কাটতাম। কিন্তু ভগবান হয়তো তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না। হঠাৎই একরত্তি এই মেয়েটি হয়ে পড়ল অসুস্থ--- জ্বর , মাথাব্যথার প্রকোপ। কবিরাজ , বদ্যির আশ্রয় ছেড়ে শেষপর্যন্ত যা হয় , সরকারি ডাক্তারের শরণাপন্ন। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। আমার নার্ভের সমস্যা শুরু হলো , বারবার অচৈতন্য হতে লাগলাম। তারপর‌ই আমার স্কুলের পথে তালা পড়ল। বাবার প্রচ্ছন্ন ইচ্ছেতেই পুরোটা সময় মায়ের সাথেই গৃহবন্দি ।


ধীরে ধীরে কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে পদার্পন। বিয়ের বয়স হলে যা হয় , আমার‌ও বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রস্তাব আসতে শুরু হলো। কিন্তু আশপাশের পাড়া প্রতিবেশীর মুখে  ব্যামোর কথা শুনে আর কোনো পাত্রপক্ষ এগিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিল না। আমিও এই ইচ্ছের বিরোধী ছিলাম। একদিকে নিজেই তো অসুস্থ , অন্যদিকে বাবা-মায়ের বয়স হচ্ছে। ওদের বৃদ্ধকালীন দেখাশোনার দায়িত্বটা তো আমাকেই নিতে হবে। বড়ো দাদারা বোনেদের বিয়ে দিয়ে যে যার মতো আলাদা সংসার পেতেছে। ওদের নিতান্ত প্রয়োজনেই বাবার খোঁজ পড়ে। আমি তো ওদের কাছে অবাঞ্ছিত , যেন মায়ের অর্কিড। বাবার দিনমজুরীর রোজগার আর আমাদের পরিশ্রমে ফলানো শাকসবজির উপর নির্ভর করেই চলছিল এই সংসার। হঠাৎ সহৃদয় এক আত্মীয়া একটা বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসলেন। মা বাবা তো যারপর নাই খুশি। কন্যাদান করে যেন ওরা ঋণমুক্ত হতে চান।  আমি শুধু এক পরিবারের বাঁধন ছিড়ে ভিন রাজ্যে অন্য পরিবারের কুলবধূ হলাম। আড়ম্বরহীন এই বিবাহ অনুষ্ঠানে ছিল না কোনো আনন্দের অবগাহন। যেন বেঁচা-কেনার হাটে বিনে পয়সার পণ্য।


আমি না জানি ওদের ভাষা , না জানি ওদের মতো খাবার তৈরি করতে।বর-রূপী ভগবান যেন স্বয়ং নেমে এসেছেন মর্ত্যে। সারাদিন ক্ষেতের কাজ শেষে মদ্যপানে ক্লান্তি নিবারন করেন উনি। কোথায় সোহাগ আর কোথায় দুটো মনের কথা। একদিকে শ্বাশুড়ি আর জায়ের অত্যাচারে নববধূ অতিষ্ট , অন্যদিকে খাবার আর আশ্রয় হারানোর ভয়ে মুখে রা করা বারন। সারাদিন রান্নাবান্না আর ঘরকন্না শেষে ক্ষেতের কাজ আর গরু-মহিষের দেখাশোনা করতে করতে অসুখটা আবার জাকিয়ে বাসা বাঁধতে শুরু করল। অত্যাচারের চরম সীমা আর মানসিক নির্যাতনে আমি বিপর্যস্ত। চোখের জল ঝরানো ছাড়া আর কোনো বিকল্প পথ আমার জানা ছিল না। স্বামীকে বলে আর লাভ নেই। ও শুধু এটাই জানত ক্ষেত আর ফসলের বাইরে ও ক্ষমতাশূণ্য। টাকাপয়সা তো শ্বশুর আর ভাসুরের হাতে।


একদিন খুব শরীর খারাপ লাগছিল। শ্বশুর চা চাইলেন , শ্বাশুড়ি রুটি আর ননদ ঠান্ডা পানীয়। রান্নাঘরেই রুটি করতে করতে কখন যে জ্ঞান হারিয়ে উনুনের উপর পড়ে যাই। পাশের ঘরেই ছিলেন জা। কিছু একটা আঁচ করতে পেরে এসে আমাকে উদ্ধার করলেও শরীরের অনেকটাই ঝলসে গেল। জ্ঞান ফিরার পর যখন চোখ মেললাম , তখন নিজের ঠিকানা দেখতে পেলাম হাসপাতালের এক নির্জন কোণে। উদগ্রীব হয়ে চারদিকে তাকিয়ে কোনো প্রিয়জনকে দেখতে পেলাম না। মনে হল আমার স্বর্গলাভেই ওদের মুক্তির পথ খোলা।


বাবা মায়ের কানে আমার এই অসহায় অবস্থার খবরটা পৌঁছলেও ওদের কি আর সেই সামর্থ্য ছিল যে আমাকে এসে নিয়ে যাবেন? কঠিন সময়টা অতিক্রম করে যখন একটু একটু করে হাঁটা চলা শুরু করলাম তখন বর আমাকে আমার এক দিদির বাড়িতে রেখে চলে গেলেন। সেই যে উনি অন্যের আশ্রয়ে আমাকে রেখে গেলেন , তারপর থেকে আর খোঁজখবর নেওয়ারও প্রয়োজন বোধ করলেন না। শেষমেষ মা বাবার গলগ্রহ হয়ে পুনরায় পোড়া মুখ আর ঝলসানো হাত নিয়ে ওদের সংসারে ঠাঁই নিলাম। যার জন্য সিঁথির সিঁদুর আর গলায় মঙ্গলসূত্র নিয়ে মঙ্গল কামনা করতাম সে খোঁজ নেওয়ার প্রয়োজন হারিয়ে ফেলল। সেই হরিয়ানার সাথে ত্রিপুরার সকল সম্পর্ক চুকে গেল। বাবা না চাইলেও কাছেই রাখলেন তাঁর সন্তানকে। আমার কষ্টে মা'ও হলেন শয্যাশায়ী। তারপর একদিন বৃদ্ধ জরাজীর্ণ বাবার কাছ থেকে চিরবিদায় নিলেন।


মা চলে যাওয়ার পর দাদা দিদিরা সম্পত্তির জন্য প্রায়শ বাবাকে চাপ দিতে শুরু করল। বাবার শেষ সম্বল এই বাড়িটাও ভাগ হলো। আমি আর বাবা মাথা গোঁজার জন্য একটা কুঁড়েঘরে ঠাঁই পেলাম। তাতেও শান্তি নেই। বাড়ির গোবাদি পশুতেও ওদের ভাগ চাই। সবকিছুর ভাগাভাগি শেষে আমি বাবার ভাগের শেষ সম্বল হয়ে র‌ইলাম। বহু কষ্টে সংসার ঠেলে ঔষধের খরচ বহন করা সম্ভব হয়ে উঠেছিল না। তাই বারবার অচৈতন্য হতে লাগলাম। বাবাও শ্রবণশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন। জীবনীশক্তি ক্রমশ ক্ষীণ হতে হতে একদিন তিনিও বিদায় নিলেন আমাকে অকুল সাগরে নিঃস্ব করে দিয়ে। আমি দিশেহারা ও পাগলপ্রায় হয়ে গেলাম। বয়োজ্যেষ্ঠ সহোদরেরা এবার পুরো বাড়ির দখল নিল। আমার পরবর্তী ঠাঁই হলো ওদের সংসারে। বিনা বেতনের কাজের লোক পেলে এমন সুযোগ তো কেউ হাতছাড়া করে না। সঠিকভাবে ঔষধপত্র বা পোষাক পরিচ্ছদ কোনো কিছুই আমার জুটত না । চরম অবহেলা আর লাঞ্ছনা সহ্য করে ওদের মন জুগিয়েই আমাকে চলতে হতো।


একবার একজন আমাকে উনার বাসায় নিতে চাইলেন , কিন্তু এতে দাদাদের সম্মতি হলো না। নিজের বোনকে অন্যের আশ্রয়ে দেবে সেটা ওদের আত্মসম্মানে লাগছিল। আমার প্রচ্ছন্ন ইচ্ছে থাকলেও সেই নরক ছেড়ে বেরোনোর জো ছিল না। ঔষধের অভাব আর বিনা চিকিৎসায় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লাম। সকল অশান্তির অবসান ঘটিয়ে , স্বামীর অপেক্ষায় প্রহর গুনা বাদ দিয়ে চিরশান্তির খোঁজে শেষমেশ চিতায় উঠলাম। ভাগ্যের বিড়ম্বনায় সব হারিয়েও আজ আমি মহাখুশি।


আমি তো শরীর নামক রক্ত-মাংসের সেই অবয়ব ছেড়ে দিব্যি আছি । আমার সাজানো বাগান আর প্রিয় অবলা গোবাদিদের মায়াবী চোখে বেঁচে থাকব প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। আমার কি একটু আদর সোহাগ পাওয়ার অধিকার ছিল না? যত‌ই আমি সকলকে আপন করে নিয়ে সকলের সাথে একাত্ম হতে চেয়েছি , তত‌ই  বুকের মাঝে দূরত্বকে আশ্রয় দিয়েছি। আজ মরে গিয়েও বেঁচে আছি স্মৃতির পাতায়।


আমি চন্দ্রিমা হয়েও ঘোর অমাবস্যায় বেঁচে ছিলাম। তবে অন্যদের জীবনে আলোর চাদর বিছিয়ে দিতে পেরেই আমি পরম পরিতৃপ্ত । আমার স্নিগ্ধ সুমিষ্ট আলোয় রাতের পৃথিবী সেজে উঠে জোছনাময় প্রান্তর হয়ে।

 


প্রেমিকা নই

- জয়া গোস্বামী


সেদিন ছিলোনা আকাশে তারারা নিয়েছিলো 

বিদায়  চিরতরে মনের অভিমানে ছিলো দূরে সরে ..


রাত চরা পাখিরা গিয়েছিলো নীড়ে ফিরে 

আপন গতিতে মনের দুঃখ মনে রেখে ....


অভিযোগের সুরে বলেছিল কইবো না আর কথা কোনোদিনও যাবো চলে গভীর গহনে আসবো ফিরে নতুন সূর্যের আহ্বানে .....

শুনেছি সেদিন কথা অভিযোগ অনুরাগের সুরে ...

আমি প্রেমিকা নইতো বুঝিনি সে ভাষা সেদিনও

প্রেমিকা হলে দিতাম পাড়ি তোমাদের  সে ভাষার সাম্রাজ্যে..


চোখের ভাষা যদিও রহস্যে ঘেরা স্বপ্ন সেদিন ছিল দুচোখে আঁকা আবেশে !!

প্রেমিক  যে নই; যে বলবো আমার হৃদয়ের কথা আবেগের সুরে.....


অভিমান অনুযোগ শুনবে কে?; নেই যে সে আঁখি

বলতে পারিনি লজ্জায় ভালোবাসি তোমাকে....


হৃদয়ে রেখেছি সে কথা দিয়েছি বিদায় 

শুধু  হাহাকার আজ  নিরব বেদনার অশ্রুজলে

চিরতরে মন হতে ,

ঠিকানা যে রাখিনি তার কোনো খানে একাকী বসে আছি তাই তরণী তটে শূন্য তার মাঝে তোমার মুখ

বারে বারে আসে মনের ঘরে!!!


২১/১১/২০২০

 


রংমিলান্তি

- শ্রীকন্যা সেনগুপ্ত


আজ পঞ্চমী। ঘড়িতে কাঁটায় কাঁটায় বিকেল পাঁচটা বাজে। অফিস ছুটির পর সবাইকে দুর্গাপুজোর আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে মেঘনা অফিস থেকে যখন বেরোলো, তখন সোয়া পাঁচটা বাজে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ওর মনে হলো পশ্চিমের অস্তগামী সূর্যটা মেঘের আড়াল দিয়ে একচোখ দিয়ে যেন ওকে দেখছে। অক্টোবর মাস প্রায় শেষের পথে। এবারে পুজোটা বেশ দেরী করে হচ্ছে। মহালয়ার ঠিক একমাস পর। যত সব অদ্ভুতুড়ে কান্ড!! এত বছরে কোনোদিন এরকম দেখেনি মেঘনা। এমনটা কখনো শোনেওনি। এবার করোনা আবহে সবকিছুই কেমন যেন অন্যরকম। সব কেমন যেন মনখারাপ করা, বিষাদ মাখানো। কাল থেকে মেঘনার অফিস ছুটি। খুলবে সেই লক্ষ্মীপুজোর পর। এবারও অনেকদিনের পুজোর ছুটি পাওয়া গেল। প্রতিবছর পুজো আসলে এই লম্বা ছুটিটার কথা ভেবেই মনটা আনন্দে ভরে ওঠে মেঘনার। কিন্তু এবার ব্যতিক্রম, মনে ছিঁটেফোঁটা আনন্দটুকুও নেই। 

              মেঘনা ওর মা-বাবার একমাত্র মেয়ে। বয়স এখন প্রায় তিরিশ ছুঁই ছুঁই। রূপে-গুনে একেবারে যেন লক্ষ্মীপ্রতিমা। কিন্তু বিয়ে করার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই ওর। জিজ্ঞেস করলেই একপ্রকার হেসে উড়িয়ে দেয়। বেশি জোরজার করলে আবার রেগে যায়, বলে - "আমি বিয়ে করলে তোমাদের দুজনকে কে দেখবে শুনি? কপালে থাকলে বিয়ে এমনিতেই হবে, নাহলে নয়। এরজন্য অত চেষ্টা-চরিত্র করতে হবে না।" ওর মা-বাবাও বিয়ের কথা বলে বলে এখন হাল ছেড়ে দিয়েছেন। মেঘনার বাবা-মা দুজনেই হাই স্কুলের টিচার ছিলেন। বর্তমানে দুজনেই রিটায়ার করেছেন কয়েক বছর হলো। মেঘনাও ওনাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে আজ "সরকারী চাকুরিরতা"। প্রায় ছয় বছর হল সে এই চাকরি করছে। মাইনেপত্রও খারাপ পায়না। কাগজে-কলমে দশটা-পাঁচটার ডিউটি।  পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন - সবাই বলে - "এই মন্দার বাজারে এ তো একেবারে সুখের চাকরি!!" অনেকে আবার বলে - "সরকারী অফিসে বসে বসে কাজ না করে শুধু গল্প, পরনিন্দা-পরচর্চা করলে আর কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে তারপর ভোঁসভোঁস করে নাক ডেকে ঘুমোলেও নাকি চাকরি খোয়াবার কোনো ভয় নেই।" চাকরি পাওয়ার পর প্রথম প্রথম এরকম অদ্ভুত কথা শুনে খুব রাগ হতো মেঘনার। মনে মনে ভাবতো এ আবার কি কথা? মুখ দেখে তো কেউ ওকে চাকরিটা দেয়নি.... পেয়েছে পুরোপুরি নিজের যোগ্যতায়। রীতিমত দুরকম রিটেন টেস্ট, টেকনিক্যাল টেস্ট, পার্সোনাল ইন্টারভিউ, মেডিকেল টেস্ট - এতকিছু দিয়ে এই চাকরিটা পেয়েছে সে। সেটা কি এসব করার জন্য??? তখন মনে মনে খুব রাগ হলেও মুখ ফুটে কিন্তু কিছু বলতো না মেঘনা। আর এমনিতেও এসব ভুলভাল কাজকর্ম ওর কাছে কোন দিক থেকেই সুখের সংজ্ঞার পরিচায়ক নয়। তবে সরকারী চাকরিটা আজকাল যে প্রকৃত অর্থে একদমই সুখের নয়, সেটা মেঘনা মনে মনে জানে। মাঝেমধ্যেই অফিসে কাজের চাপ থাকলে বেরোতে দেরি হয় ওর। আর মিটিং থাকলে তো কথাই নেই! ওর মা-বাবাও সেটা জানেন। শুধু একটাই বাঁচোয়া - অফিসটা বাড়ি থেকে বেশী দূরে নয়.... এটাই যা একটু "সুখকর"। নইলে ওর বাকি বন্ধুদের কারুরই ওর মতো বাড়ির কাছেই পোস্টিং হয়নি। অবশ্য মেঘনা কিন্তু ভীষণ পারফেকশনিস্ট, যাকে বলে একেবারে "কাজ-পাগল" প্রকৃতির। অফিসে এজন্য ওর বেশ সুনামও আছে। তাই এত বছর চাকরির পর লোকের এসব কথায় এখন আর ওর কিছুই যায় আসে না।  

                মেঘনার অফিসটা ওর বাড়ী থেকে বেশী দূরে নয়। হেঁটে ফিরতে চল্লিশ মিনিট মতন লাগে। তাই মাঝে মাঝে ইচ্ছে হলে অফিস ছুটির পর ও হেঁটেই বাড়ী ফেরে। তবে করোনা পরিস্থিতিতে আজ প্রায় সাত মাস হলো ওর হেঁটে বাড়ি ফেরা আর হয়না। আর ওর বাবা-মা দু'জনেই ওকে বারণ করে দিয়েছেন। প্রাণের ভয় তো কমবেশি সবারই রয়েছে। যদিও সমস্ত নিয়ম মেনেই মাথা-মুখ-হাত ভালভাবে ঢেকে মেঘনা বাইরে বেরোয়, অফিস করে, সমস্ত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলে; তবুও, কোথা থেকে কখন কি যে হয়ে যায়, কেউ কি বলতে পারে? সাবধানের মার নেই। তার ওপর আবার বাড়ীতে বয়স্ক মা-বাবা। তাই আরো চিন্তার ব্যাপার। এমনিতে মেঘনা ছোটবেলা থেকেই খুব স্বাবলম্বী ও সাবধানী মেয়ে। মা-বাবার খুব খেয়াল রাখে, যত্ন করে, আবার প্রয়োজনে শাসনও করে। তাই এই সঙ্কটজনক পরিস্থিতিতে ওদের গত সাত মাসে বাড়ী থেকে এক পা-ও কোথাও বেরোতে দেয়নি মেঘনা। নিজেই একা হাতে সব করেছে সে। যা কিছু প্রয়োজন, সবকিছুই অনলাইনে আনিয়ে নিয়েছে। কিংবা প্রয়োজনে খুবই অল্পস্বল্প সশরীরে দোকান-বাজারেও গেছে। তারপর ঠিকঠাকভাবে সবকিছু স্যানিটাইজও করে নিয়েছে। এভাবেই সংসারের অনেকটাই দায়িত্ব নিয়েছে মেঘনা। আর মা-বাবার জন্য করবে নাই বা কেন, একমাত্র মেয়ে বলে কথা!! তবুও আজ কেন জানিনা হঠাৎ করেই ওর এইসব বারণ অগ্রাহ্য করতে ইচ্ছে করছে। ঐ চেনা পথটা ওকে যেন হাতছানি দিয়ে বারবার ডাকছে। মেঘনার মনটা আজ হেঁটে বাড়ি ফেরার জন্য ভীষণ উতলা হয়ে উঠেছে। আর সাত-পাঁচ না ভেবে বাড়ীর দিকে হাঁটতে শুরু করলো মেঘনা। বাড়ী পৌঁছাতে আজ দেরি হবে। তাই একজায়গায় দাঁড়িয়ে আগেভাগেই মা'কে ফোন করলো মেঘনা। ফোনটা কানেক্ট হতেই বললো - "হ্যালো মা....!! আজ একটু দেরি হবে বাড়ী ফিরতে। একটু কাজ আছে। তোমরা চিন্তা কোরো না..., আমি সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরে আসবো।" ওদিক থেকে ওর মা "ঠিক আছে" বলতেই আর কোনো কথা না বাড়িয়ে তড়িঘড়ি ফোনটা কেটে দিল মেঘনা। বেশি কথা বলা যাবেনা এখন। হেঁটে বাড়ি ফিরবে শুনলে মা-বাবা সবাই যে চিন্তা করবে!! আবার হাঁটতে শুরু করলো মেঘনা। এই বছরটা বিষে বিষে একেবারে বিষাক্ত। করোনার করাল গ্রাসে কত নিরীহ মানুষ যে প্রাণ হারিয়েছে, তার হিসেব নেই। বিগত কয়েক মাসে, প্রতি মুহূর্তে মনে হয়েছে এই অতিমারী যেন একদম ঘাড়ের কাছে এসে নিঃশ্বাস ফেলছে। কি লাভ একরমভাবে ভয়ে ভয়ে বেঁচে থাকার??? এটা কি একটা জীবন?? রোজ রোজ এক অন্যরকম, অনভিপ্রেত, অস্পৃশ্য মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করার যে কি মানে, মাঝে মাঝে সেটা বুঝে উঠতে পারে না মেঘনা। এসব কথা ভাবতে ভাবতে, হাঁটতে হাঁটতে চারপাশ চেয়ে দেখে....একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মেঘনা। এবারের পুজোটা কিরকম যেন নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ। রাস্তাঘাট ফাঁকা, লোকজন তেমন একটা নেই। দুর্গাপুজো বলে যেন মনেই হচ্ছে না। কোন ঢাকের আওয়াজ নেই। মাইকে লাউডস্পিকারে গান তেমন বাজছে না। চোখ ধাঁধানো আলোর রোশনাই নেই। পঞ্চমী শেষ হতে চলল, আজ রাত পোহালেই ষষ্ঠী, কিন্তু দেখে কে বলবে এবার!! করোনার কৃপায় একটাও দুর্গাঠাকুরের মুখদর্শন হয়নি এবার মেঘনার। এমনকি পাড়ার ঠাকুরটা পর্যন্ত দেখেনি। অন্যান্যবার এই সময় মা-বাবা, বন্ধুবান্ধবদের সাথে ঘুরে বেড়িয়ে বেশ অনেকগুলো ঠাকুর দেখা হয়ে যায় ওর। প্যান্ডেল হপিং ওর ভীষণই প্রিয়। কিন্তু এবার পুজোর ক'দিন নিজেদের স্বাস্থ্যরক্ষার স্বার্থে মা-বাবাকে নিয়ে গৃহবন্দীই থাকবে বলে ঠিক করেছে সে। তাই তো এবার পুজোয় কারো জন্য কোনো নতুন জামাকাপড়ই কেনেনি সে। হাতঘড়িতে সময়টা একবার দেখে নিল মেঘনা। বেশী নয়, সবে সাড়ে পাঁচটা বাজে। হাতে এখন অনেকটা সময়। সন্ধ্যে প্রায় আসন্ন। আস্তে আস্তে অন্ধকার নেমে আসছে চারদিকে। আজকাল দিনের দৈর্ঘ্যটাও বেশ ছোট হয়ে গেছে। অনেকদিন পর আজ হাঁটতে বেশ ভালো লাগছে ওর। হাওয়ায় একটা খুব হালকা শীতের আমেজ। বাতাসে সপ্তপর্ণী গাছের গন্ধ। এই গন্ধটা মেঘনার ভীষণ প্রিয়....সেই ছোটবেলা থেকেই। নিঃশ্বাস ভরে এই গাছটার সুগন্ধ নিতে ও বরাবরই ভালোবাসে। একটা আলাদাই নেশার মতো মনে হয়। আজও সেই গন্ধটা পেয়ে কিছুক্ষণের জন্য হলেও মনটা একটু হালকা হয়ে গেল। একটু দূরে একটা মাঠের মধ্যে বড় করে একটা দুর্গাপুজো হয়। মেলা বসে। এছাড়া বছরের অন্যসময়েও আরো দু'বার মেলা বসে এই মাঠে। যাতায়াতের পথে এর আগে বহুবার এর পাশ দিয়ে হেঁটে গেছে মেঘনা...এখানে ঘুরতেও এসেছে বহুবার। আর একটু হাঁটলেই সেই মাঠটা পড়বে। এবছরের প্রথম দুর্গাঠাকুরের মুখটা দেখতে পাবে ভেবে মনটা ভালো হয়ে গেল মেঘনার। হাঁটতে হাঁটতে মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই সেই মাঠের সামনে পৌঁছে গেলো ও। মাইকে আস্তে করে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে - "আমার রাত পোহালো... শারদপ্রাতে...."। গান গাওয়া আর গান শোনা - দুটোই খুব ভালোবাসে মেঘনা। তবে এখন আর নিয়মিত চর্চা করার সময় পায় না। গানটা একটু গুনগুন করতে করতে মাঠে ঢুকে পড়ল সে। এবার পুজোয় আর মেলা বসেনি। পুজোটাও এবার ছোট করে হয়েছে। আশেপাশে কিছু দর্শনার্থীদের সমাগম দেখতে পেল মেঘনা। প্রত্যেকের মুখে মাস্ক। তার মধ্যে কয়েকটা বাচ্চাও আছে। সেটা দেখে মনে মনে খুব বিরক্তও হলো...বিড়বিড় করতে লাগলো - "এই সময় বাচ্চাদের নিয়ে বাইরে বেরিয়ে জীবনের ঝুঁকি নেওয়ার কি খুব দরকার?? উফ্!! এই আদিখ্যেতা আর ভালো লাগছেনা ওর।" ঢাকী এসেছে, ঢাকও বাজছে ঠিকই। কিন্তু তার তাল বা আওয়াজ কোনোটাই একটুও মনের মধ্যে প্রতিবারের মত দাগ কাটছে না। মনে মনে ভাবলো - নিউ নরম্যালে দুর্গাপুজোটা বোধহয় এরকমই হয়...!! প্যান্ডেলে ঢুকে সোজা প্রতিমার কাছে যেতে চাইলো মেঘনা। কিন্তু পারলোনা। হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা। প্রতিমার সামনে থেকে দশ মিটার পর্যন্ত ব্যারিকেড করা আছে। তাই সামনে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল নিমেষে। অগত্যা দূর থেকেই মা দুর্গার দিকে তাকিয়ে জোড়হাত করে মনে মনে প্রার্থনা করে মেঘনা বললো - "সবকিছু আবার আগের মত করে দাও মা... ঠিক যেমনটা ছিল। এরকম পরিস্থিতি আর ভালো লাগছেনা একদম। এরকম চলতে থাকলে করোনায় না মরলেও এমনিই দমবন্ধ হয়ে খুব শিগগিরই মরে যাবো একদিন। পৃথিবীটাকে তাড়াতাড়ি সুস্থ করে তোলো মা। আশীর্বাদ করো - আসছে বছর যেন সব ঠিক হয়ে যায়.... ।" এরপর নিজের মোবাইলে কয়েকটা ফটো তুলে প্যান্ডেলের বাইরে বেরিয়ে এলো মেঘনা। পৌনে ছ'টা বাজে। এখন পুরোপুরি সন্ধ্যে হয়ে গেছে। মোবাইলটা জিন্স- এর পকেটে ঢুকিয়ে এবার মাঠ থেকেও আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল মেঘনা। আবার সেই একই পথ ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা শুরু করার পালা। একটু অন্যমনস্ক লাগছে ওকে। কি যেন ভাবছে!! দু-পা এগোতেই হঠাৎই মেঘনার মনে হলো কেউ যেন ওকে "ও দিদিভাই" বলে ডাকছে। ডাকটা শুনে চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকাতেই দেখলো একটা বাচ্চা ছেলে, বয়স এগারো কি বারো হবে। চেহারাটা বেশ ভদ্র, শান্ত গোছের। মুখে একটা সাধারণ মাস্ক, মাথার চুলগুলো উস্কোখুস্কো। পরনের জামা আর প্যান্টটা বেশ ময়লা, আর পায়ে একটা পুরোনো জীর্ণ হাওয়াই চপ্পল - সবকিছু মিলিয়ে চেহারায় দারিদ্রের ছাপটা একেবারে স্পষ্ট। ঐ মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে বিভিন্ন রঙের সুন্দর সুন্দর গ্যাসবেলুন বিক্রি করছে। মেঘনার খুব খারাপ লাগলো দেখে। জিজ্ঞেস করলো - "অ্যাই...তুই আমায় ডাকছিস?" ছেলেটি করুণ সুরে বললো - "হ্যাঁগো, একটা বেলুন নাও না গো দিদিভাই..."। একটা অচেনা বাচ্চা ছেলের এরকম একটা অদ্ভূত আবদার-মিশ্রিত অনুরোধে মেঘনা খুবই অবাক হয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলো - "কেন রে? আমি বেলুন নিয়ে কি করবো?" ছেলেটি বললো - "কিছু মনে কোরোনা দিদিভাই। আসলে সেই কখন থেকে এখানে দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু এতক্ষণে একটাও বেলুন বেচতে পারিনি। ঐ করোনা অসুখটার জন্য সবাই ভয় পাচ্ছে কিনতে। কিন্তু একটাও যদি বেলুন আজ বেচতে না পারি, তাহলে তো একটা টাকাও পাবোনা। তাই তোমায় বললাম গো..."। মেঘনা স্তম্ভিত হয়ে গেল ছেলেটার কথা শুনে। বললো - "হ্যাঁ... কিনতে ভয় তো পাবেই! কিন্তু এসবের মধ্যে তুইও জেনেবুঝে বেলুন বেচতে বেরিয়েছিস কেন? তুই তো একটা বাচ্চা ছেলে!!! এই সময় তোর কি প্রাণের ভয় নেই? তোর বাড়ির লোক তোকে যেতে দিলো??" ছেলেটি এবার বলা শুরু করলো - "দিদিভাই, যে নিজের মরা বাপের লাশটা পর্যন্ত দেখতে পায়নি, তার কি অত প্রাণের ভয় করলে চলবে গো... ??" মেঘনা হতবাক। ঐ একরত্তি ছেলেটার মুখে এরকম একটা কঠিন কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে মেঘনা। ছেলেটি বলে চললো - "জানো....আমার বাবা পরিযায়ী শ্রমিক ছিল। কলকাতার বাইরে কাজ করতে যেত। জায়গাটার নাম আমি জানিনা। বাড়ীতে আমি ছাড়া মা আর ছোট বোন আছে। বোনের বয়স পাঁচ বছর। বাবা খেটেখুটে অল্প যা কিছু রোজগার করতো, তাতে আমাদের কষ্ট করেও দিন চলে যেত। এবারও বাবা কাজে গেছিলো। কিন্তু এই করোনা অসুখটা শুরু হওয়ার পর লকডাউন পড়ে গেল। কোথাও কোনো কাজ নেই। ট্রেন-বাস... সবকিছু বন্ধ হয়ে গেল। তারপর থেকে বাবা আর বাড়ি ফিরতে পারেনি। কিন্তু আমরা সবাই অপেক্ষা করছিলাম। মাঝে আমফানের ঝড়ে ঘরের চালটাও ভেঙে গেল। তবুও কোনোরকমে মেরামত করে থাকছিলাম। ভাবলাম বাপটা ফিরলে সব ঠিক হবে। কিন্তু বাবার কোনো খোঁজখবর পাচ্ছিলাম না। অনেকদিন পেরিয়ে গেল। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। টাকাপয়সা সব ফুরিয়ে গেছিলো। তখন পাড়ায় পাড়ায় সব্জি বেচতে শুরু করলাম। সেখান থেকে মালিক নিজের লাভের টাকাও কেটে নিত। তারপর যা হাতে পেতাম, তাতে কোনোরকমে চলছিল। প্রায়ই আধপেটা খেয়ে থাকতাম। একদিন শুনলাম সরকার থেকে নাকি ট্রেন দেবে শ্রমিকদের ফেরার জন্য। ভাবলাম বাপটা বুঝি এবার বাড়ি ফিরে আসবে। হঠাৎ একদিন খবর এলো বাবা ঐ অসুখে মরে গেছে। লাশটাও দেখতে দিল না। কত করে বললাম বাবাকে শেষবারের মত দেখতে দাও!! বলে কিনা ঐ লাশ নাকি দিতে নেই, আর দেখতেও নেই। দেখলে নাকি রোগ ছড়াবে। জানো তো দিদিভাই... কাঁদার সময়টুকুও পাইনি। মা আর বোনকে বাঁচাতে হবে তো...!! আমি ছাড়া ওদের তো দেখার আর কেউ রইল না গো! তাই রোজ সকালে সব্জি বেচেই দিন কাটছিলো। পুজো আসায় মনে একটু আশা জাগলো। ভাবলাম বিকেলে না হয় বেলুনই বেচবো। যদি ঘরে দুটো পয়সা বেশি আসে। জানো তো! আজ মালিক আমায় পঁচিশটা বেলুন দিয়ে বলেছে - এক একটা বেলুনের দাম কুড়ি টাকা। একটা বেলুন বেচলে আমায় পাঁচ টাকা দেবে আর সবগুলো বেচতে পারলে দেড়শো টাকা দেবে। আর না হলে একটা টাকাও দেবেনা। কিন্তু আমার কি পোড়াকপাল দেখো....!! একটাও এখনো বেচতে পারিনি। তাই ভাবলাম সবাইকে ডেকে বলি - যদি কেউ একটা নেয়। কিন্তু কেউই তো নিচ্ছে না গো দিদিভাই। তুমি একটা বেলুন নাও না গো... নেবে দিদিভাই???" কথাগুলো বলতে বলতে ছেলেটি তার সেই ময়লা জামার হাতায় চোখ মুছতে লাগলো। মেঘনা সম্পূর্ণ বাকরূদ্ধ। কষ্টটা যেন ওর গলার কাছে দলা পাকিয়ে আটকে আছে। ওর চোখদুটোও জলে ভরা। কি যে বলবে ভেবে উঠতে পারছে না। ছেলেটিকে কি বলে যে সান্ত্বনা দেবে তাও বুঝতে পারছে না। কোনোরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে মেঘনা বললো - "দেখ্ বাবু কাঁদিস না। মনটাকে শক্ত কর্। এই বয়সে তুই যে নিজে থেকে তোর সংসারের হাল ধরেছিস সেটাই বা ক'জন পারে!! নিজের ওপর বিশ্বাস রাখ। আর সময়ের ওপর ভরসা রাখ। একদিন দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। আচ্ছা! তোর নাম কি রে?" ছেলেটি চোখ মুছে বললো - "গোপাল..."। মেঘনা ওর ব্যাগ থেকে মানিব্যাগটা বের করলো। একটা ঝকঝকে দু'হাজার টাকা আর একটা পাঁচশো টাকার নোট বার করলো। গতকালই এ.টি.এম থেকে পাঁচ হাজার টাকা তুলেছিল মেঘনা। এখনো অবধি খরচ হয়নি। নোট দুটো গোপালের হাতে গুঁজে দিয়ে বললো - "এটা রাখ। তোর সবকটা বেলুন আমি নেব। আমায় দিস। পাঁচশো টাকার নোটটা তোর মালিককে দিস। মালিকের কথামতো তুই সবকটা বেলুন বেচতে পেরেছিস বলে ওখান থেকে দেড়শো টাকা তোর প্রাপ্য।" গোপাল অবাক চোখে মেঘনার দিকে তাকিয়ে আছে। একটা হিসাব যেন কিছুতেই ও মেলাতে পারছে না। একটু ইতস্তত করে বললো - "আর বাকি দু'হাজার টাকা?"মেঘনা হেসে উত্তর দিল - "ওটা তোর দিদিভাই এর তরফ থেকে পুজোর উপহার। গোপালের দুচোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ছে। কোনো কথাই আর বলতে পারছে না যেন সে। মেঘনা খানিক ধমকের সুরে বললো - "আবার কাঁদছিস বোকা ছেলে? বলেছি না আর কাঁদবি না? এখুনি চোখের জল মোছ্।" গোপাল কোনোরকমে চোখের জল মুছে বললো - "জানো দিদিভাই! আমার মা রোজ ভগবানকে ডাকে আর কাঁদে। আমি সেটা চুপিচুপি দেখি। কিন্তু কিছু বলতে পারিনা। আমি কোনদিন ভগবানকে দেখিনি গো। কিন্তু আজ থেকে তুমিই আমার ভগবান...!! তুমি আজ আমার জন্য যা করলে সেটা আমি কোনোদিনও ভুলবো না।" বলেই মেঘনার পায়ে একটা ঢিপ্ করে প্রণাম করে বসলো। মেঘনা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে একটু বিরক্তিভরে বললো - "আরে!! করছিসটা কি? সবাই দেখছে তো!!" মেঘনারও চোখে জল। এই আবেগের অনুভূতিটা অবশ্য একেবারে অন্যরকম। বললো - "এত পাকা পাকা কথা আর বলতে হবে না তোকে। দোহাই তোর! আমি কারো ভগবান নই, আর হতেও চাইনা!! দে... সবকটা বেলুন এবার আমায় দে দেখি...।" গোপাল সব বেলুনগুলো মেঘনার হাতে দিয়ে দিল। আশেপাশের লোকজন ওদের দুজনের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। হয়তো ভাবছে এই করোনা আবহে মেয়েটা একা এতগুলো বেলুন কিনে করবেটা কি?? মেয়েটার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে...?? আরো কত কি!! বেলুনগুলো হাতে নিয়ে মেঘনা আবার মাঠের মধ্যে  ঢুকলো। গোপালকে বললো -"তুই আমার সঙ্গে আয় দেখি।" একটা ফাঁকা জায়গা দেখে দাঁড়াল মেঘনা। পাশে গোপাল। এবার হাতের মুঠো খুলে দিল মেঘনা। কত রকম রঙের বেলুনগুলো একসাথে আকাশে উড়তে লাগল। দেখতে ভীষণ ভালো লাগছিল। যেন মেঘেদের দেশে এক নতুন রকম রঙমিলান্তি খেলা। মেঘনার মনে হলো - ওর মনটাও হঠাৎই কেমন যেন ভীষণ হালকা লাগছে। উড়তে চাইছে আকাশে। সারা মন জুড়ে কেমন যেন একটা অনাবিল তৃপ্তির আনন্দ। গোপালও এত বেলুন একসাথে আকাশে উড়তে আগে কখনো দেখেনি। ওর চোখদুটো এই সামান্য আনন্দেও যেন চকচক করে উঠলো।। দুজনেই আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যতক্ষণ না বেলুনগুলো দৃষ্টির বাইরে চলে গেল। 

           হাতঘড়ির দিকে এবার তাকালো মেঘনা। ছ'টা ছল্লিশ বেজে গেছে। মাকে সে বলেছিল সাতটার মধ্যে বাড়ি ফিরে যাবে। কথা বলতে বলতে এতটা সময় কখন যে চলে গেছে, মেঘনা সেটা একদম খেয়ালই করেনি। সুতরাং এবার জোরে পা চালাতেই হবে। আর উপায় নেই। মাঝপথ থেকে বাস, অটো বা রিক্সাও তো পাবেনা এখন। মেঘনা এবার ওর ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট সাদা কাগজ আর একটা পেন বের করলো। পেন দিয়ে কাগজটায় খসখস করে কিসব যেন লিখলো। তারপর কাগজটা গোপালের হাতে দিয়ে বললো - " এই নে ধর্। এই কাগজের টুকরোটায় আমার নাম, বাড়ির ঠিকানা, আর ফোন নাম্বার লেখা আছে। আমার বাড়িটা এখান থেকে বেশী দূর নয়। শিবমন্দির বাসস্টপে নেমে জোড়া বটতলা মোড়ে যে প্রগতি সংঘ ক্লাব আছে, ওখান থেকে চার-পাঁচটা বাড়ি পর আমার বাড়ি। কাউকে আমার নাম বললেই দেখিয়ে দেবে।‌ পারলে আসিস। আর কোন দরকার পড়লে জানাস আমায়। এবার ব্যাগ থেকে একটা স্যানিটাইজারের নতুন শিশিটা বার করলো। গতকালই ওষুধের দোকান থেকে চারটে নতুন শিশি কিনেছে মেঘনা। শিশি থেকে হাতে একটু ঢেলে হাতদুটো ভাল করে ঘষে নিল মেঘনা। তারপর শিশিটা গোপালকে দিয়ে বললো - "এই নে। তুইও মাখ আর এটা তোর কাছেই রেখে দে। তোর কাজে লাগবে। ভাল থাকিস। নিজের পরিবারকেও ভাল রাখিস। সাবধানে থাকিস। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। এবার আমি আসি রে...।" এই বলে অবশেষে বিদায় নিল মেঘনা।

               এবার লম্বা লম্বা পা ফেলে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগালো মেঘনা। সত্যি ওর আজ ভীষণ আনন্দ হচ্ছে। হাওয়ায় সপ্তপর্ণী গাছের গন্ধটা আরো গাঢ় হয়েছে এখন। চোখ বুজে নিঃশ্বাস ভরে গন্ধটা নেবার চেষ্টা করলো মেঘনা। আজ ওর দিদার কথা খুব মনে পড়ছে। দিদাকে যে ও "দিদিভাই" বলেই ডাকতো। তাই অনেকবছর পর একটা অচেনা গলায় এই চেনা ডাকটা শুনে মেঘনা প্রথমে চমকে উঠেছিল। দিদিভাইও ওকে ভীষণ ভালোবাসতো, আদর করে "মিষ্টু" বলে ডাকতো। প্রতি বছর পাড়ার কয়েকটা গরীব ছেলেমেয়েকে বাড়িতে ডেকে নিয়ম করে খাওয়াতো দিদিভাই। তারপর তাদের জামা-কাপড় দিয়ে বাড়ি পাঠাতো। ওরা দিদিভাইকে খুব ভালোবাসতো। তাছাড়া বাড়ির পুরোনো জামা-কাপড় সব দান করতো রামকৃষ্ণ মিশনে। মেঘনা তখন অনেক ছোট, স্কুলে ক্লাস ফোর-এ পড়ে। এইসব দান-ধ্যানের মানে সে কিছুই বুঝতো না। একদিন জিজ্ঞেস করেছিল - "দিদিভাই, তুমি এসব করে কি পাও?" দিদিভাই হেসে বলেছিল - "ভীষণ আনন্দ পাই রে মিষ্টু!! আনন্দ ভাগ করলে যেমন সেটা অনেকগুণ বেড়ে যায়, তেমন দুঃখ ভাগ করলে সেটা অনেকটাই কমে। তাই কোনো অসহায় মানুষের দুঃখের দিনে তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে মন থেকে কিছু সাহায্য করলে ভীষণ আনন্দ পাওয়া যায়। সেই আনন্দের সাথে অন্য কোনো আনন্দের তুলনাই চলে না রে...!! তবে তুই এখন এসব বুঝবিনা। বড় হলে সব বুঝবি দেখিস।" আজ দিদিভাই-এর এই কথাগুলো যেন ভীষণভাবে কানে বাজছে মেঘনার। আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে মেঘনা মনে মনে বললো - "দিদিভাই, তুমি একদম ঠিক বলেছিলে। তোমার কথাগুলো অক্ষরে অক্ষরে মিলে গেল। তুমি আজ বেঁচে থাকলে আমার এই আনন্দটা তোমার সাথে ঠিক ভাগ করে নিতাম। উপর থেকে তুমি আজ সবই দেখেছো নিশ্চয়ই। আশা করি ঐ রঙ-বেরঙের বেলুনগুলোর মাধ্যমে আমার ভালোবাসা ও প্রণাম তোমার কাছে পৌঁছাবে, তার রঙ তোমার হৃদয়কে স্পর্শ করবে। আশীর্বাদ কোরো যেন জীবনে মানুষ হিসেবে আরো অনেক বড় হতে পারি।" হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে মেঘনা। ঘড়িতে এখন সাতটা বাজতে তিন মিনিট বাকি। মনে মনে হাসলো মেঘনা। যাক... আজ ঠিক সময়েই বাড়ি ঢুকতে পারবে সে। বেলুনের রঙমিলান্তি আজ হোক বা না হোক, আজ জীবনের রঙমিলান্তি খেলায় জয়ী হয়েছে মেঘনা। প্রসন্নমুখে একটা তৃপ্তির হাসি নিয়ে বাড়ির বেলটা বাজালো মেঘনা। দরজা খুলতেই ওর মা জিজ্ঞেস করলো - "কি হয়েছে রে?" মেঘনা বললো - "মা...আগে ফ্রেশ হয়ে নি। তারপর সব বলছি।" পাড়ার পুজোর গান বাজছে মাইকে। দূর থেকে ভেসে আসছে গানটা - "আনন্দধারা বহিছে ভুবনে..."।।


-------সমাপ্ত--------


© মনভোমরা

(www.facebook.com/monbhomra)

 


অপেক্ষা

- মরিয়ম আক্তার


করোনা মুক্ত একটি সকালের অপেক্ষায়

আমরা সকল মানুষ,

যে সকালে ফুটবে

শিউলি, বকুল,মাধবী, বেলী

থাকবেনা মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়ার

কোন মানা....

থাকবে না কোন ভয় সংস্বয়।

সকালের সূর্যের আলো মতো

সেদিন দৃপ্ততা পাবে আমাদের হাসি,

কাটবে সকল অন্ধকার,অপয়া 

আছে যত এ পৃথিবী হতে।

ফোনের ওপাশ হতে আর ভেসে আসবে না

কোন সতর্কের বার্তা,

শুনতে পাবো প্রিয় মানুষের

চিন্তামুক্ত কন্ঠস্বর।

সেদিন আপনকে বাহুডোরে বাধতে

ব্যাকুল হবে হৃদয়

সবার চেপে থাকা আবেগ,ভালোবাসা

পূর্নতা পাবে সেই দিন

যে দিন সুস্থ হবে এ পৃথিবী।

আমি সেই সকালের 

অপেক্ষায় আছি।


জন্মভূমি 

কলমে - মধু পাল


মরুভূমির মত নিঃস্ব 

আজ জন্মভূমির মাটি 

অন্যায়ের পদপিষ্ট হয়ে 

ধূলোয় লুটোপুটি ।

আমার জন্মভূমির মাটি 

আহা সে যে বড়ই খাঁটি ।


জন্মভূমির টানে নাড়ীর টান 

জীবনের প্রতি ক্ষণে ক্ষণে 

প্রকৃতি গেয়ে ওঠে গুনগুন 

আকাশ গায় আনমনে 

সুরেরো বাতাসছন্দ খুঁজে পায় 

জীবনের জয়োগানে ।


হেসে খেলে বয়ে চলে 

ঐ শান্ত নদীর জল 

বাতাসের ছোঁয়া পরশ জাগায় 

করে ওঠে টলমল 

পানকৌড়িরা ঝাঁক বেঁধে 

সেথায় করতো কোলাহল ।


হারিয়ে গেছে সেই স্মৃতি 

বর্তমানের হাঁক ডাকে 

বিষাক্ত আজ নদী নালা 

মাটির দম বন্ধ হয়ে 

মৃত্যুর ছবি আঁকে 

সেই অচেনা নদীর বাঁকে ।


তারিখ - ২১|১১|২০২০

 


চাকরিটা খুব দরকার

- সুজয় যশ


গুলমোহরের নিচে ঘর্মাক্ত শরীর 

সারাদিনের ক্লান্তি মেখে বসে।

দুপুরের খাবার এখনো বাক্সবন্দি 

চাকরিটা পেলাম না আজও দিনের শেষে ।


শিড়দারা বেয়ে একঝাঁক কাঁকড়া বিছে ,

যন্ত্রণা তবু অবহেলিত , ক্ষুধাহীন।

হাজার প্রশ্ন ছিঁড়ে খায় 

আবার চেষ্টা,  না কি অর্থহীন!


সন্ধ্যে নামছে পার্কের রেলিং গড়িয়ে, 

বাড়ি ফেরাটা কি ভীষণ জরুরী?

ডিগ্রি আছে তো এক ব্যাগ, 

তবু কি চাকরি পাওয়া টা জরুরী?


ভোর পাঁচটার লোকাল ট্রেনে 

ব্যাগের হাতল চেপে পা রাখা আশার শহরে ।

এখন বিকেল পাঁচটা,  অনেকটা সময় 

তবু মূল্যায়ন হারালো আভিজাত্যের বহরে।


একটা চাকরি ! সময়ের থেকেও আজ দামি ।

না হলে আঙুল তুলবে সমাজ।

ফিসফিস আওয়াজ ভাসবে মেঘের মতো, 

একটা চাকরি খুব দরকার ছিলো আজ।


অবসন্ন শরীর টেনে তুলল অন্ধকার 

টিফিনবক্সে খাবারের টোকো গন্ধ ।

গুলমোহর ছাড়িয়ে বিষন্নতা হাঁটছে 

অন্য রুট, স্টেশনের রাস্তাটা বন্ধ।


২০|১১|২০


শ্রীহীন

কলমে - জয়া গোস্বামী


কুয়াশার চাদরে মুড়িয়ে এসেছিলে 

ধূসর সকালে নব বধূর বেশে নব উদ্যমে!!

নতুনের আহবানে দিয়েছিলে সবুজে ভরিয়ে

মনের সুখে এক এক করে সাজিয়ে তুলেছিলে 

রূপের ডালি নিয়ে অপরূপ সাজে !!!

ভরিয়ে ছিলে রং রূপে ফুলে ফুলে মোহিত হয়ে অপলক দৃষ্টির বিনিময়ে চেয়ে ছিলাম শুধু চেয়ে ছিলাম ভালোবাসার বন্ধনে হিমেলের সকালে !!

শ্রীহীন করার আগে যেতে হবে সবাইকে

ভালোবাসার বন্ধন মুক্ত করে মায়াজালে আবদ্ধ

হয়ে ক্রন্দন করে......

হঠাৎ খসে গেল পাতা ঝড়ো বাতাসে,

শ্রীহীন হয়েই তাই দিবস কাটে মোর  এই ভবে

ভালোবাসার বন্ধন মুক্ত করে!!!

পাতা খসার আগে নিজেকে সব নেবে চিনে

হৃদয় দিয়ে আগলে রাখবে আজ কি করে

সময় হলে হবে যে যেতে এই ধরনী হতে

নিয়মের বেড়াজালে বন্দী করে!!!

ভ্রমরার গুঞ্জন, মধুপের গুঞ্জন অলির বিলাপের সুরে

ফুলের মাধুরি যাবে শুকিয়ে সময় হলে পরবে খসে এক এক করে !!

দেবে নিমিষে শ্রীহীন করে গাছেদের কন্দন কে শুনেছে ?শুধু “তুমি আর আমি”!!

হয় তো এসব সত্যি নয় সময় হলে আবার উঠবে জেগে নতুনের আহবানে সাজাবে কিশলয় নব সাজে!!


২০/১১/২০২০

 


খুঁজলে আমায় 

- সুতপা ব্যানার্জ্জী


খোঁজ করলে পাবে আমায় ,

দিগন্তের খোলা প্রান্তরে ,

তোমারি অপেক্ষায় ,

খোঁজ করলে পাবে আমায় ।

উড়ে যাওয়া ক্লান্ত পাখির দলের সাথে ,

আছি আমি নিরবতায়, 

তোমারি অপেক্ষায় ,

খোঁজ করলে পাবে আমায় ।

দিগন্তের শেষে জোছনা ভাসে ,

সবুজের সীমানায়,

তোমারি অপেক্ষায় ,

খোঁজ করলে পাবে আমায় ।

যেখানে ভালোবাসা আছে নানারঙে ,

যাযাবর হয়ে ,

তোমারি অপেক্ষায় ,

খোঁজ করলে পাবে আমায় ।

খোঁজ করলে পাবে আমায়, 

তোমারি অপেক্ষায় ,

ঝড়ে বৃষ্টি পাহাড় থেকে ঝরনায়,

খোঁজ করলে পাবে আমায় ।

খোঁজ করলে পাবে আমায়, 

থাকি আমি, 

তোমারি অপেক্ষায় ,

যেখানে পাহাড় নীল আকাশ ছোঁয়।


তারিখ - 20.11.2020


দীপাবলি

কলমে - চায়না মন্ডল


আজ শনিবার কালীপুজো

তাইতো উঠেছি ভোরে,

আজ ফুলের বাগানে তুলেছি জবা ফুল,

ফুল তুলতে তুলতে শুনেছি দীপাবলীর গান,

সারাদিন উপোস করে

দেব ফুলগুলি সব মায়ের পায়ে।

বলবো মাকে; পৃথিবীর রোগ-শোক দূর করো মা

আনো ঘরে ঘরে সব সুখ, শান্তি।

সকলের মঙ্গল করো মা,

ঘরে সকলের মা আছেন

সব মায়েরা যেন সন্তানের কাছে ভালোবাসা পান।

এই টুকুই চাই মা তোমার কাছে,

এবার দীপাবলিতে জ্বালাবো বাতি,

ফাটাবো না কোন বাজি।

পুজো হলে নেব শ্যামা মায়ের প্রসাদ খানি।


তারিখ-১৪ই নভেম্বর

 


সোনার মানুষ 

- জাকিরুল চৌধুরী 


সোনা দেশে সোনার মানুষ 

করছে কতো চাষা, 

এজগতে আছে বড়ো মানুষ 

মানুষ বড়ই পাষা। 

এই দেখো সোনা রবি

পূর্ব গগনে হাসছে, 

আমার সোনা দেশে শশী

করছে খেলা ভাসছে। 

সোনা দেশে সোনা ইন্দু 

উঠবে আবার কবে, 

শশী যদি না উঠে মা 

নিশি তবে রবে। 

খোকা দেখো করছে খেলা 

সোনা রবি পানে, 

তুমি ছিলে তুমি রবে। 


 


।। ছোট গল্প।।


।। "কে জেগে রে" ।।


চাণক্য শ্লোকঃ


আগচ্ছতি যদা - লক্ষ্মীর্নারিকেলফলাম্বুবৎ।


নির্গচ্ছতি যদা লক্ষ্মীর্গজভুক্তকপিথুবৎ।।


...............


লক্ষ্মী আসেন যখন, তখন নারিকেলের মধ্যে জল জন্মায়। আবার যখন চলে যান তখন কীটের দ্বারা ভক্ষণ হয়ে মিলিয়ে যায়।  


লক্ষ্মী চঞ্চলা। তাই জীবনে উথ্থান  আর পতন দুইই আসে। আনন্দ বেশী করা যেমন উচিৎ নয় ঠিক তেমনই দুঃখে অতিরিক্ত কাতর হওয়ায় উচিৎ নয়।



এবিষয়ে আমার দেখা ঘটনা -- জীবন্ত ছবিঃ


#গল্পঃ     


     " কে জেগে রে "


           ✍ প্রদীপ দে~



অতিশয় এক কৃপণ ব্যক্তি রমনী রঞ্জনের ভাগ্য বদলে যায় তার  সহায়সম্বলহীনা এক মৃত পথযাত্রীর দান দৌলতে। মহিলা নিজে কৃপণ ছিলেন। ভাবলেন ভালোই হয়েছে উপযুক্ত ব্যক্তির হাতেই অর্থ , সম্পত্তি রইলো - নষ্ট হবার ভয় নেই। নিজে হাতে তিনি কোনোদিন কাউকে একআনাও দেননি। রমনী রঞ্জন ও তাই।



প্রচুর অর্থের মালিক হয়ে কেমন যেন পাগলের মতো আচরন করতে শুরু করলো।আশে পাশে প্রচুর লোক সমাগম হতে থাকলো -সবাই কিছু কামাতে চাইলো। 



নিজের ছেলেও লেখাপড়া ছেড়ে বাপের পয়সা গ্যাঁড়াতে লাগলো। বাবা বোকা, স্ত্রী পুত্রের হাত থেকে নিস্তার পেতে পারলো না। মায়ের উস্কানি, ছেলের বেহিসাবি মতলব, রমনী রঞ্জন বুঝেও অপারগ হলো। 



শেষে নিজেও ফুর্তির আড্ডায় গেল। সবাই ওৎ পেতে বসেছিল। যে কোনোদিন কোনো খরচে যায়নি, সেও মত্তহাতি হয়ে উঠলো। স্ত্রীর সঙ্গে মতের মিল ছিল না, বুড়ো বয়সে বেশ্যালয়ের গিয়ে ঢুকলো বন্ধুদের সাথে। মদ, মেয়ে নিয়ে বাপ আর ছেলে দেদার হয়ে গেল নিজের মত করেই। স্ত্রী ফ্যাসন দুনিয়ায় গা ভাসালো।  রমনী ভাবলো এতে আর কত খরচ হবে -- অনেকইতো আছে -- বরঞ্চ শেষবয়সে একটু আনন্দই করি। তাই সই -- আনন্দের বাঁধ ভেংগে পড়লো - এবার তো জলোচ্ছ্বাস হবেই!



মায়ের ফ্যসান দুনিয়ার এক কন্যেকে প্রেম করে বিয়ে করলো পুত্র। প্রচুর খরচে লোকসমাগমে বিয়ে হলো। বাড়ির ভিতরে আর বাইরে আমোদের বন্যা বয়ে গেল। 



কন্যা রূপসা রূপে আর কাজের দৌলতে অনেক ক্ষমতাশালী নেতাদের ঘনিষ্ঠ ছিল। স্ত্রী পুত্র ভাবলো ভালোই হয়েছে। অর্থ ক্ষমতা সবই করায়ত্ত হলো।


কন্যা কায়দা জানতো শ্বাশুড়ি- বরকে ছেড়ে শ্বশুরের গায়ে পড়া হয়ে পড়লো। মহিলার নেশা তখন রমনীর রঞ্জনের চোখে মুখে। রূপসা সুযোগ নিল। অন্তরঙ্গতা এমন পর্যায়ে পৌঁছুলো যে রূপসার অন্তর্বাস পর্যন্ত নিজে হাতে ধুয়ে দিতে লাগলো রমনী।



রমনী স্ত্রী পুত্রকে জব্দ করতে লুকিয়ে দলিল করে স্বেচ্ছায় সব রূপসার নামে করে দিল। ভাবলো এতে সকলেই বাঁচবে এবং কায়দায় তারই হাতে বাঁধা থাকবে রূপসা,  কারণ বৌমা আসলে তারই।



মাস ছয়েক কেটে গেল আনন্দ ফুর্তিতেই। এরপর একদিন ভোরে সকলে ঘুম থেকে উঠে দেখলো বাড়ির সদর দরজা খোলা। --চোর এলো নাকি?


খোঁজখবর করে দেখা গেল রূপসা নেই আর নেই বাড়ির মূল্যবান অলংকার সহ সমস্ত নগদ টাকা পয়সা।



থানায় যাওয়ার আগেই থানা থেকে পুলিশ এসে অভিযোগ জানিয়ে, ছেলে অপূর্ব কে এরেষ্ট করে নিয়ে গেল। অভিযোগ -- বৌ এর উপর অকথ্য  অত্যাচারের। বেশ বড় অভিযোগ -সাজিয়ে গুছিয়ে


সংগে ডিভোর্সের এবং ক্ষতিপূরণের মামলার হুমকি। একদল লোক এসেও ভয় দেখিয়ে গেল। সব শুনে বন্ধু বান্ধব পাড়াপ্রতিবেশীরা বিপক্ষে চলে গেল।



রমনী রঞ্জনকে দেখা গেল ছাদে। আনন্দে মাতোয়ারা যেন সে! অনেক খুশি অনেক পাওয়া হয়ে গেছে, লোভ আজ তাকে তাড়া করে এখানে এনেছে। দিশেহারা এক কৃপণকে হো হো করে হাসতে দেখেছিল সবাই। হয়তো এই দুঃখ তাকে অনেক কাতর করে দিয়েছিল - যা সে কাউকেই বুঝতে দিতে চায় নি -- চেয়েছিল শুধু নিজের জন্য, একান্তই নিজের জন্য সকল সঞ্চ‌িত করে রাখতে -- এটাও তার একপ্রকারের কৃপনতার অভিপ্রায়!



স্ত্রীর খবর কেউ জানে না। কিন্তু রমনীর ছাদ থেকে


নিচে পড়ে থাকা মৃতদেহটা দেখে সবাই ভয়ে কুঁকড়ে গেছিলো।

 


পরিপূরক

- কিরণময় নন্দী


কে বলেছে তোমরা পুরুষ সবাই খারাপ

কে বলেছে তোমরা সবাই চরিত্রহীন-দেহ পিপাসু

তোমার দলে আমার পিতাও

দুঃখ পেলে স্নেহভরে মোছায় আশু।


আমার ভাইও পুরুষমানুষ

নাট্যদলের নায়ক সাজে

প্রসব যাতনায় কোনো মা কষ্ট পেলে

হাসপাতালে দৌড়ে যায় সবার আগে।


পাশের বাড়ির তমাল দাদা

নিয়ম মেনে রক্ত দেয়

বছর পনেরোর সুলেখা থ্যালাসেমিয়া রোগী

নতুন করে স্বপ্ন দেখে তাই।


গাড়ি চাপায় প্রাণ গেল শুভদার

সুজাতা বৌদি অল্প বয়েসে স্বামীহারা 

ওইটুকু ছেলেটা নিয়ে কিকরে চলবে সংসার

সুজাতা বৌদি একেবারে দিশেহারা।


ফারুক চাচার ধূপের কারখানা

কত মেয়ে কাজ করে চলে

সুজাতা বৌদির হিল্লে হলো কারখানায়

ও আজ স্বাধীন মেয়ে নিজের পরিশ্রম বলে।


তবুও কত খারাপ খবরে

ভরে থাকে রোজকার নিউজ পেপার

পাট ক্ষেতে নগ্ন ধর্ষিতার লাশ

নয়তো এসিডে পুড়ে সবকিছু ছাড়খার।


পণের লোভে ঝুলছে কোথাও

সদ্য-বিবাহিত নববধূর লাশ

কাজের টোপে কিশোরী মেয়েরা পণ্যসামগ্রী

নীরবে নিভৃতে ঘটছে সর্বনাশ।


এরাও পুরুষ তবে এরা মানুষ নয়

এরা সমাজের ক্ষতিকারক

এদের কোমরে থাকুক আইনের রশি

নারী-পুরুষ উভয়ের পরিপূরক।


বাস্তবের শরসজ্জা

- কিরণময় নন্দী


তোমার ইচ্ছে সন্ধ্যেবেলায় জমিয়ে আড্ডা

চাপা স্মৃতি রোমন্থন

তোমার ইচ্ছে পুরানো বন্ধু

আর একটু ইচ্ছেডানায় ভ্রমণ।


ওরা দেখো ইটভাটাতে

ইটের উপরে ইট সাজায়

ওদের কাছে কাশের দোলা

পেঁজা মেঘ কি বা আসে যায়।


তোমার কাছে অগাধ সময়

সবেতন ছুটি

তোমার কাছে অন্য পৃথিবী

ইচ্ছে খুশি হাতের মুঠি।


ওদের দেখো ভাড়ার উপর 

ইটের গায়ে ইট গাঁথে

শিউলি তলায় বিছিয়ে ফুল

ওদের জীবন অন্য বাঁকে।


তোমার ইচ্ছে একটু কোথায়

যাই চলে প্রকৃতি প্রেমে

শারদ প্রভাতে শিশির ছোঁয়ায়

আবেগী ছবি একই ফ্রেমে।


ওদের দেখো ফেরির বোঝায়

এক গলি থেকে অন্য গলি

রূঢ় বাস্তব রাজপথে

এ এক সত্যিকারের বাহুবলী।


বছর ঘুরে নতুন বছর

আবেগ ভরা আবার মায়ের পূজা

দুই পৃথিবীর দুই রূপে

আজও বাস্তবের শরসজ্জা।


দাড়িয়ে আছো 

কলমে - মধু পাল


জানি তুমি অভিমানী 

তাইতো অভিমানিনী সুরে 

দাড়িয়ে আছো আমারই পাশে 

নিছক রুদ্ধদ্বারে ।


বহুবার করেছো কত ছল 

সমুখে এসেছো বার বার 

না চাইলেও ফিরে গেছো তুমি 

আঙিনা জুড়ে শিউলির মাঝে 

 সেথা পথ নেই পালাবার ।


দুরন্ত শিশুর মতো নিঃশ্পাপ 

সেই চিলে কোঠার কোণঠাসা বিশ্বাস 

ফানুস হয়ে উড়ে যাচ্ছে আবেগ 

কাগজ ফুলের মত একাকী তাই 

আমার বেঁচে থাকার নিশ্বাস ।


প্রভাত কিরণের প্রথম ছটায় 

তোমাকে পাবার উচ্ছ্বাস 

হালকা আলোর একমুঠো রোদ 

মনের কোণে কান পেতে রয় 

রঙিন ক্যান্ডেলের ক্যানভাস ।


হালকা হাওয়ায় উড়ে আসে ঐ 

পিপড়ের বয়ে আনা গল্প 

জোনাকিরা মিটিমিটি চেয়ে রয় 

আশমানে জমাট বেঁধেছে মেঘ স্বল্প ।


রঙিন চুড়ির রিনিঝিনি শব্দে

মন বেঁধেছে সাথ বুঝি 

কেনই বা তার লাগি হই দিশেহারা 

অকারণ পথ খুঁজি ।

 


অমৱ ক্ষত ( অমিত্ৰাক্ষৱ )

- বাপ্পাদিত্য মণ্ডল


যদি পাৱিতাম কভু,বক্ষ বিদাৱীয়া--

লক্ষ সমূহে,তপ্ত ভাষাৱ প্ৰাণান্তেৱ--

ৱোদনী ফুল ডালি--।তিতিত বক্ষ সবে,

প্ৰাণাবেগে ভৱি--,হেৱি মম ইতি কথা।

ৱক্তাক্ত হৃদয়েৱ অব্যক্ত ভাষাৱ-- গূঢ়,

মালিকা সম বঞ্চিত পদক্ষেপ। তেঁই---

পাশৱিনু পাষাণ বক্ষে লাঞ্ছিত পদ।

বিভুৱে স্মৱিয়া,-- যেমতি সে ভৃগু-পদ

--মোৱ ইষ্ঠ দেবে দানি,-- ভক্তি-দম্ভ ডোৱে---

নাৱিল মিলাইতে সে অমৱ বেদনা ।

ধৱি,পদ-ৱেণু বক্ষে,সোহাগিয়া তাৱে---

ধৱাৱ-ধাৱক-ধৱনে আজ-ও সুখে---

পৱম ভক্তি-ৱেণু স্মৱি।সেমতি মোৱ--

-অন্ত-কক্ষে ধাবিয়া অনল অবিৱতে।---

 


হৃদয় খুঁজে পাওয়া

- অজয় চক্রবর্তী


জানোনা তোমার অর্ধেকআকাশ চুরি হয়ে গেছে কবে,

চিনতে পারোনি তাইতো রাখোনি হৃদয়ের অনুভবে।

স্নেহের পরশ ছিলনা তোমার ছিল না তো ভালোবাসা,

ছিল নাতো কোন হৃদয়ের দাম ছিল শুধু প্রত্যাশা।


বিছানাতে শুধু চিনেছ প্রিয়াকে চেনোনি তো অন্তরে,

কখনো ভাবনি অকারণে কেন প্রিয়ার অশ্রু ঝরে!

শত যাতনায় ক্ষতবিক্ষত করেছো হৃদয় খানি,

গুমরিয়ে সদা কেটেছে দিবস হায় মোর অভিমানী।


অনুশাসন আর অবজ্ঞা সাথে করে গেছো শুধু হেলা,

আর কতকাল সইবে বলো না অনাদর অবহেলা?

তাইতো খুঁজেছে অর্ধেক আকাশ মানবিকতার বোধ,

আজ পলে পলে প্রতিক্ষনে তাই নিয়ে চলে প্রতিশোধ।


যার হৃদয়ে পাতা ছিল তব প্রিয়ার আসনখানি,

পাগলের মত খুঁজেছে তাকেই বোঝনি তা তুমি জানি।

হৃদয়টা যদি ভরা থাকে শুধু আর কিছু নেই চাওয়া,

জীবনের মানে জীবন দিয়েই চাই তাকে খুঁজে পাওয়া।

 


আগমনী

- সন্দীপ দে


হেমন্তিকার পরশ মেখে আসছে উমা ওই,

শত দুখের মাঝেও হৃদয় আনন্দে থইথই!

ঢ্যাং কুরা কুর ঢাকের বাদ্যি ওই শোনা যায় দূরে,

শরত বেলায় শিউলি ঝরে আগমনীর সুরে! 

কারো পেটে নেইকো ভাত,রয়ে গেছে অপূর্ণ সাধ,

তবু উৎসবের আড়ম্বরে খানিক ঘুচবে অবসাদ! 

করোনা কেড়েছে অনেক প্রাণ, দুর্যোগে গেছে বাসস্থান,

দলাদলি, হিংসার বলি, ঠুনকো আজও নারীর মান!

এভাবেই চলছে জীবন, লড়াই করে বাঁচার পণ,

একটু হাসি, একটু প্রেম, শারদীয়ার শুভ ক্ষণ!

 


বৃদ্ধাশ্রম

- পাপড়ি দাস


আজ ২৫শে বৈশাখ খোকা তোর আজ জন্মদিন

সকাল থেকে মনটা খুব উদাস লাগছে,

বৃদ্ধাশ্রমে একটি ঘরে বসে আমার স্মৃতিচারণ,

তোকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে আসবি কি?

যখন তোর জন্ম হল তোর বাবা  বলেছিল

তুই রবি ঠাকুরের মত বড় মাপের মানুষ হবি,

ভাঙা ঘরে চাঁদের হাট বসেছিল সেদিন,

অভাব অনটনের সংসারে তুই আমাদের মধ্যমণি ছিলি।

খোকা তুই আমাকে ছাড়া এখন নিশ্চিন্তে থাকিস,

ভাঙা বাড়ি ভেঙে অট্টালিকা তৈরী করেছিস,

 কত দাস দাসী থাকে তোর বাড়িতে---

শুধু আশ্রয় পেলনা তোর অভাগী মা।

আমার কিছু ভুল ছিল তাই সত্যিকারের মানুষ হলি না

সমাজের গড্ডালিকার  প্রবাহে নিজেকে ভাসিয়ে দিলি,

আমি অপেক্ষা করছি কবে তুই আসবি আমার কাছে?

এই ঘরটা হয়ে উঠবে তোর আমার আনন্দ আশ্রম।

 


পাশে এসে দাঁড়াও

- শংকর ব্রহ্ম


মানুষ বড় কষ্টে আছে  মানুষ বড় অভাবে

পাশে এসে দাঁড়াও বন্ধু ,কবি সুলভ স্বভাবে

নিঃস্ব দুঃস্থ লোকের দিকে দু হাত শুধু বাড়াও

আজকে দিনে বন্ধু কেবল পাশে এসে দাঁড়াও।


না হলে তুমি কবি কিসের কিসের জননেতা?

বলবে ওরা  আসলে তুমি পাক্কা অভিনেতা 

নেতা করতে পারে অভিনয় কবি কখনও নয়,

সত্য কথা বলুক কবি অনেকে তা চায় না

সত্য কথা বলার স্বভাব তবু কবির যায় না

কবি হলে অনেক কথা মিথ্যে বলা যায় না।


নিঃস্ব যারা সর্বহারা দাঁড়াবে কে পাশে

কষ্টে তারা দুঃখ পেলেও বোকার মত হাসে,

আসলে দেখলে বুঝবে সে'টা হাসি তো নয় 

কান্না থাকে লুকিয়ে ওদের হাড় মজ্জ্বা মাসে।

 


তমসা 

- কৃষ্ণ দাস সরকার


স্নেহ , ভালোবাসা , মমতা , 

দেয়া নেয়ার এই সংসার ,

 অনাবিল আনন্দের ভাবধারায় _

 হয়ে যায় একাকার ।

কটুকথার অলংকার আবর্তিত হয় ,

 ইট কাঠ বালি দিয়ে তৈরি _

অট্টালিকার প্রাসাদ ঘিরে ।

সহানুভূতি , সহমর্মিতা , 

সততা  ঢাকা পড়ে  যায় _                             

অসহিষ্ণুতার চাদরে ।


যে বাঁধনে বেঁধেছো আমায় ,

এক দিন ছিন্ন করে সকল বাঁধন 

চলে যেতে হবে মাঝ দরিয়ায় ।

কুলের মাঝি হাঁক দিয়ে যায় শত ,

আয় ফিরে আয়!

ফেরার পথ মিলিয়ে যায়_

দূর থেকে বহু দূরে গহন তমসায় ।

 


অহৈতুকী প্রেম প্রচার

- পার্থ সারথি ওঝা


দেখেছি তোমাকে কতোবার 

একদৃষ্টে তাকিয়ে

গগনের অগণিত তারাদের মাঝে

ধ্রুবতারা রূপে।

মনের মন্দিরে তোমাকে 

রেখে অতীব যতনে

করবো আরাধনা দিবসরাতি 

দহিয়া হৃদয়ধূপে।

ভেবেছি কতোকাল

তোমারি স্নেহভরা কারণসুধা পিয়ে

ধন‍্য করবো আমি

আমার মানব জীবন।

দুজনে মিলে একসাথে

প্রচারিব বিশ্বময়

অহৈতুকী প্রেমের বারতা

ঘৃণার কাঁটা করে চয়ন।।

 


অরণ্যের রোদন

- দীপঙ্কর সেনগুপ্ত


মা ও মা কি হলো চা টিফিন দেবে না!

সেকি কে কি দেবে চা তোমার বৃদ্ধ মা?

কি যে বলো ভেবে বলো ঠিক বলছো!

ঘুম ভাঙলো বৌয়ের ডাকে ওঠো ওঠো 

পাখি ডাকে গাছে গাছে ফুল গাছে ফোটে

চোখ কচলে মা কে খুঁজি চোখে জলে ভাসে l

পড়ছে মনে মা যে আমার আছে বনবাসে

চির শান্তির আশায় বিদায় মাকে বৃদ্ধ আবাসে!

কাল যে মাকে মিথ্যে কথায় আশা দিয়ে এলাম

সেইজন্য স্ত্রীর গলায় নরম গরম কথা পেলাম!

ছেলে এসে গলা জড়িয়ে বলে ঠাম্মি কোথায়?

গিন্নি বলে ঠাম্মি যে আছে মন্দিরের আলোয় l

ছেলে বলে তাহলে তোমরা তবে যাবে একদিন

চাকরি পেয়ে বিদায় দেবো তোমায়  সেইদিনl

গিন্নি ছেলের দুই গালে দিলো সপাটে দুই চর

আমিও কাঁদি ছেলের গলা ধরে মা হয়েছে পর l


ত্রাসের মেঘ
- উৎপল রাউত

এই কঠিন সময় দেখেনি কেউ নিশ্চয়
আমাদের পূর্বসূরিরাও,
অদৃশ্য সর্পর ফণা, উদ্যত কেউ জানে না,
পলকে ডোবে জীবন নাও !

দীন মানুষের দিন কষ্টে কাটে সীমাহীন,
অন্নের জোগাড়ে ব্যতিব্যস্ত,
ফণা দোলে ভয়ঙ্কর, এদিকে জ্বলে জঠর,
জীবন ঝঞ্ঝায় বিপর্যস্ত !


দীন ধনী নির্বিশেষে কাটায় দিবস ত্রাসে,
এই বুঝি সর্প দংশায় !
লাখো লাখো শবদেহ, আতঙ্কে ছোঁয় না কেহ,
বাধা পারলৌকিক ক্রিয়ায় !

অনেক নিয়েছ প্রাণ, দোহাই হে ভগবান !
মানুষের যাতনা পাপের,
ভুগেছে তারা অনেক,সুস্থতার অভিষেক
হোক, কাটুক মেঘ ত্রাসের !

 


তাই মুক্তি চেয়েছি

- রীনা ঘোষ


জীবনের শেষ প্রান্তে মরীচিকাময় লালচে ধূসর যে অনুর্বর মাটি তাতে গড়াগড়ি খেয়ে ক্ষতবিক্ষত শরীরে আমি মুক্তি চেয়েছি ।


শরীরের ক্ষত অপেক্ষা মনের ক্ষত যে আরও গভীর। সূচাগ্র স্থান নেই সে ব্যথা উপশমের , এই নিভাতুর জীবন থেকে আমি মুক্তি চেয়েছি।


এই ক্ষয়ে যাওয়া সমাজ এই ধসে পড়া মনুষ্যত্ব, সেই কালো কাপড়ে চোখ বাঁধা বিচারের দেবী আর ফিরিয়ে নেওয়া বিচারকের মুখ  থেকে আমি মুক্তি চেয়েছি।


ক্ষুধা কাতর ফুটপাত, কীটনাশক খাওয়া চাষী, অট্টালিকা থেকে পড়ে যাওয়া মজুর আর শ্বশুর ঘরে পুড়ে যাওয়া বধূর ঝলসানো দৃশ্য থেকে আমি মুক্তি চেয়েছি।


 


হৃদয় খুঁজে পাওয়া

- অজয় চক্রবর্তী


জানোনা তোমার অর্ধেকআকাশ চুরি হয়ে গেছে কবে,

চিনতে পারোনি তাইতো রাখোনি হৃদয়ের অনুভবে।

স্নেহের পরশ ছিলনা তোমার ছিল না তো ভালোবাসা,

ছিল নাতো কোন হৃদয়ের দাম ছিল শুধু প্রত্যাশা।


বিছানাতে শুধু চিনেছ প্রিয়াকে চেনোনি তো অন্তরে,

কখনো ভাবনি অকারণে কেন প্রিয়ার অশ্রু ঝরে!

শত যাতনায় ক্ষতবিক্ষত করেছো হৃদয় খানি,

গুমরিয়ে সদা কেটেছে দিবস হায় মোর অভিমানী।


অনুশাসন আর অবজ্ঞা সাথে করে গেছো শুধু হেলা,

আর কতকাল সইবে বলো না অনাদর অবহেলা?

তাইতো খুঁজেছে অর্ধেক আকাশ মানবিকতার বোধ,

আজ পলে পলে প্রতিক্ষনে তাই নিয়ে চলে প্রতিশোধ।


যার হৃদয়ে পাতা ছিল তব প্রিয়ার আসনখানি,

পাগলের মত খুঁজেছে তাকেই বোঝনি তা তুমি জানি।

হৃদয়টা যদি ভরা থাকে শুধু আর কিছু নেই চাওয়া,

জীবনের মানে জীবন দিয়েই চাই তাকে খুঁজে পাওয়া।

 


চিলেকোঠা

- স্বপ্না দে


আমার স্বপ্নে ভরা ...             

                       আবেগ মাখানো...

ছোট্ট চিলেকোঠা...

তুই যে আমার সুখ দুঃখের... 

          অনেক ভালোবাসা...

তোর আচ্ছাদনে আমার...      

অবাধ স্বাধীনতা...

কখনো ফোনের কথোপ-কথনে...

কখনো হাসি- কান্নায়...

কখনো আবার,ধুপ হয়ে পুড়ি...

অপার সুগন্ধি ছড়াই...

সিক্ত এলো কেশ মুছিয়া... 

দাঁড়িয়ে প্রিয়জনের অপেক্ষায়।

দিবানিশির তুই আমার... 

রচনাশৈলীর প্রেরণায়... 

পরম বন্ধু তুই যে আমার, থাকিস কাব্যগাথায়।

 


স্বপ্নের নীল খাম

- মৃণাল কান্তি পণ্ডিত


শিউলি তলায় কে এঁকেছে

লাল সাদাতে আল্পনা,

খুসির রঙে বাতাস হাসে

উৎসবেরই জল্পনা।


সুখ-দুঃখ এক ঝাঁপিতে

ঝুমকো জবার দুল,

প্রান্ত সীমা ছুঁয়ে ছুঁয়ে 

ক্লান্ত মনের বোল।


জেগে থাকি আঁধার ছুঁয়ে

আলোছায়ার ছবি এঁকে,

চিরনুতন ভালোবাসার

সৌরভ মেখে গায়ে।


ভাবাবেগে নির্জনতায় ঠোঁটে ঠোঁট রেখে

অকপটে পরশ মাখি তোমায় ভালবেসে,

রোজ লিখি তাই একটি চিঠি

আতরমাখা স্বপ্ন-বিভোড় খামে।

 


আসছে মা

- মধু পাল


শারদের আমন্ত্রণে

মোদের আহ্বানে

দিয়েছে সাড়া মা ,,,,

দুর্যোগ এবার কাটবে ওরে

ছিল অভিশপ্ত যা।


মা যে বড় দয়ার সাগর

সবার ভালো চায় ,,,,

সন্তানের ডাকে মুখ ফিরিয়ে

তাই কি থাকা যায় ?


ছোটো হয় হোক না কেন

মা যে তাতেই খুশি ,,,,

মায়ের আগমন সবাই চায়

চায় না কিছু বেশি।


কতদিন পর খুশির জোয়ার

সবার মনে জাগে ,,,,

পুজো মানেই দূর্গা পুজো 

বাঙালির শ্রেষ্ঠ অনুরাগে ।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget