সেপ্টেম্বর 2020

 


পরকীয়া

- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী


"আশ্বিনের শারদ প্রাতে" বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের গলায় পাড়ার মাইকে চলছে মহালয়ার আগমণীর বার্তা। ভোরে ওঠা ! কস্মিন কালেও আমার অভ্যাসের মধ্যে, একটি অভ্যাসগত কারণ হয়ে উঠতে পারেনি। বাড়ির লোকের অনেক চেষ্টায়, সমস্ত জল ঢেলে যখন আমি মনুষ্য রূপ পরিবর্তিত করে পেচক রূপ ধারণ করলাম। হায়!

হায়!

বলে বাড়ির লোক, আমার উপর 'হায়' লাগিয়ে তেজ্য সন্তানে পরিণত করল। আমিও কম যাইনা। বাক্স প্যাঁটরা, তলপি তলপা যা বংশগত সূত্রে পেয়েছিলাম সব কিছুকে লাইফ বয় সাবান মাখা বগলে, বগল দাবা করে বেরিয়ে পড়েছিলাম। বাড়ি ছেড়ে। গ্রাম ছেড়ে। 


কলকাতায় এসে থিতু হতে সময় লেগেছিল বৈকি। এখানে আমার মায়ের কোনো ভাই থাকে না। না মায়ের কোন বাবা। শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ের কাছে, রেলিং ক্ষয়ে যাওয়া একটা দোতলা বাড়িতে টুক করে ঢুকে পড়েছিলাম। দোতলায় ওঠার সময় নীচের যা পরিবেশ চাক্ষুষ করেছিলাম, ওটা আমার ভবিষ্যৎ হতেই পারত। নীচে সারি দিয়ে ইউজ এন্ড থ্রো চারপেয়েগুলো সাজানো। বৃত্তাকার রজনীগন্ধার চাকা গুলো থেকে ভেসে আসছে মিষ্টি গন্ধ। সে সব তোয়াক্কা না করে, ইটের হাসি মাখা সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেলাম। 


কলিং বেল বাজাতেই, "হরে রাম হরে কৃষ্ণ" বেজে ওঠায় নীচের পরিবেশ টা একবার কল্পনা করে নিলাম। মিনিট তিনেকর অপেক্ষায় থাকার পর, পাশবালিশ সাইজের এক ভদ্রমহিলা দরজা খুললেন। মুখ দেখে মনে হ'ল কতকাল তাঁর ইয়ে হয়নি। বা আমি এসেই কলিং বেল বাজাতে রাম-কৃষ্ণ মিলে তাঁর ইয়েতে ব্যঘাত ঘটিয়েছে। 


ভিতর থেকে একটা বাজখাঁই গলে এমন ভাবে ভেসে এল, আকস্মিক ভয়ে হাত থেকে বাবার দেওয়া জন্মদিনের উপহার অ্যালুমিনিয়াম ট্রাঙ্ক হাত থেকে ফসকে গেল। কোনো রকমে ট্রাঙ্ক টা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলাম। বাজখাঁই গলার আদেশ মিললে ঘরে প্রবেশ করলাম, পদযুগলে থাকা কিলো খানেক ধূলো নিয়ে। 


-"কোথা থেকে আসা হচ্ছে?"

-"বাড়ি থেকে পালিয়ে?"


কাউচের উপর বিশালাকার বপু নিয়ে বসে আছে, স্লিভলেস নাইটি পরিহিতা এক মধ্য বয়স্কা ভদ্রমহিলা। আমার আবার ভীষণ নজর খারাপ। কারণে-অকারণে এর ওর শরীরের দিকে চোখ চলে যায়। এর জন্য আমার চোখ জোড়া দায়ি। পাপিষ্ঠ চোখদ্বয়, সোজাসুজি ভদ্রমহিলার পেশিবহুল হাতের দিকে। মনে মনে ভেবে ভেবে অনেকক্ষণ মনে করার চেষ্টা করলাম, ওনাকে কোনও বক্সিং রিং এ দেখেছি কিনা!


আমি আমার ইতিহাসের ইতিবৃত্তি করে, ভদ্রমহিলার থেকে তাঁকে "কাকিমা" ডাকার অনুমতি নিয়ে, বিরহে কাতর ক্ষয়িষ্ণু রেলিংএর বারান্দা ধরে একটা কুঠুরিতে সেঁধিয়ে গেলাম। থাকা-খাওয়া বাবদ ভাড়া মাত্র হাজার টাকা। বাড়ি থেকে বাবার পকেট কাটা কিছু টাকা থেকে কাকিমা কে হাজার টাকা দিয়ে বাকিটা রেখে দিলাম। 


আরে! এনাকে তো কাল দেখলাম না। না কি জিরো ফিগারের বলে চোখে পড়ে নি। মনে হচ্ছে জামা-প্যান্টের ভিতর এক কাকতাড়ুয়া। যখন তেনার পরিচয় পেলাম, লজ্জায় কালীঘাটের মা কালীর মতো একহাত জীভ বেরিয়ে গেল। 

ছিঃ। ছিঃ।

ইনি হলেন বক্সিং ফিগার ওয়ালা কাকিমার, জিরো ফিগারের করিনা কাপুর ওয়ালা হাফপ্যান্ট। ইয়ে মানে হাজব্যান্ড।  কু চিন্তা আমার মাথায় সারাদিন ঘুরঘুরে পোকার মত ঘুর ঘুর করছে। আমার চিন্তার দাগ নীল হয়ে নীল দাগের সীমায় পৌঁছে গেছে। 

********   


নয় নয় করে কাকিমার কাছে বছর তিন হয়ে গেল। চুটিয়ে টিউশন পড়াচ্ছি। কাকিমার সাথে ঘনিষ্ঠতা  হিমালয়ের পিকে এমন ভাবে পৌঁছে দিয়েছি যে, হাজার এখন পাঁচশত তে এসে ঠেকেছে। বাকি টাকায় নিজের ডেনিমের পকেট গরম করে, সকাল বিকেল মোড়ের মাথায় ঠোঁট গরম করে আসি। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড মেশানোর দায়ভার ও দায়িত্ব করে নিয়ে নিয়েছি। এক এক সময় মনে হয়, সবুজ পাদপগুলো আমার দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে আছে। এইবুঝি ঠাঁটিয়ে একটা দিল।


আমার সুখবরের মতো আরও একটি সুখবর আপনাদের দিই। আমি তো আজকাল ভালোই আছি। রাত গুলোও আলো হয়ে আছে। কাকা-কাকিমার রাতগুলো নীল থেকে লালে এসে পৌঁছেছে। জিরো ফিগারের কাকার এত ক্ষমতা! 

একসাথে যমজ পুত্র-কন্যার জন্ম দিয়েছেন, আমার আপাতত হওয়া কাকিমা। সেই উপলক্ষ্যে একদিন লুচি-পায়েস খাওয়ানো হল আমাকে। 


তবে এই সুখ বেশী দিন টিকল না। কাকা-কাকিমার সংসারে শোকের ছায়া নামল। সেই ঘটনা বলি? 

আমার করিনা কাপুর কাকা। রাতের খাবার শেষ করে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিয়ে, গান গেয়ে হাই তুলে; হাঁ করা মুখের সামনে আঙুল দিয়ে টকাস টকাস আওয়াজ তুলে পায়েস খেয়ে আয়েস করছে। চোখে সবে নিদ্রা দেবীর আগমণ হচ্ছে হব করছে....


-" একটু সরে শুতে পার না?"


কাকিমার কথায়, জিরো ফিগারের কাকা হাড় জর্জরিত শরীরে ফতুয়া চাপিয়ে বেরিয়ে পড়ল।  পরদিন সকাল থেকে কাকার কোনো খোঁজ নেই। কাকিমার কান্নায়, দোতলা বাড়ির নীচ বন্যরা দখল করেছে। মিউনিসিপল কর্পোরেশন থেকে এসে জল ক্লিয়ার করা হচ্ছে বারবার। তাতেও কাজ হচ্ছে না। কর্পোরেশন এর লোক কাকিমার হাতে নোটিশ ধরিয়েছে। কান্নাকাটি বন্ধ করার নোটিশ। 


এরকম করে মাস খানেক যাওয়ার পর একটি চিঠি এল কাকিমার নামে। 


-"হাওড়া অবধি সরেছি। আর সরব?"


কাকার পাঠানো চিঠি পড়ে আমি আর কাকিমার মুখের মধ্যে একটি গহ্বর সৃষ্টি হল। সেই গহ্বর থেকে বত্রিশ নম্বর দন্তক লাইন স্ট্রিট বেরিয়ে এল। হঠাৎই কাকিমা বলে উঠল,


-"রোগা লিকলিকে। আমার কথার কি মানে করেছে!"


অনেক চিঠি চাপাটির পর, কাকতাড়ুয়া কাকাকে আবারও কাকিমার ক্ষেতে আনা সম্ভব হয়েছে। 

****** 


বিশ্বকর্মা পূজো সামনেই। কাকা আমাকে বগল দাবা করে বাজার থেকে তিন চারটে লাটাই। সুতো। চাঁদিয়াল, পেটকাটি; বগ্গা এরকম করে বেশ কিছু পরিমাণে ঘুড়ি কিনতে গিয়ে একরকম ঘুড়ির আড়ত তুলে নিয়ে এল। 


আমি আর কাকা মিলে ছাদে উঠে সুতোয় মাঞ্জা দিচ্ছি। এমন সময় কাকা,


-"জানিস? তোর কাকিমা আজকাল আমাকে আর লাভ করতে দেয় না।"

-"বাচ্ছা দু'টো কে নিয়েই ব্যস্ততা তুঙ্গে তার।"

-"আমিও তো মানুষ। আমারও তো....."

-"চুমুটা অবধি....."


আমার মতো ব্যাচেলার কে এসব কথা বলার মানেটা কি? এসব বলে যে....


বিরক্ত হয়ে কাকাকে অজান্তেই ধমক দিয়ে উঠলাম।

-"তুমি থামবে?"


আমার অকৃত্রিম রাগ দেখে কাকা মিইয়ে যাওয়া পটাটো চিপসের মতো চুপসে গেল। আবারও আমরা সুতোতে মাঞ্জা লাগানোর কাজে মন নিবেশ করলাম।


দেখতে দেখতে বিশ্বকর্মা পূজো চুকে গেল। ভোকাট্টা শব্দ টা মিলিয়ে গেল। কিন্তু কাকার ঘুড়ি ওড়ানো শেষ হল না। কি যেন একটা মাদকের নেশার মতো কাকা সারাদিন ঘুড়ি উড়িয়ে চলেছে। ঘুড়ি বানানোর দোকান থেকে স্পেশাল ডিজাইন ওয়ালা ঘুড়ি কিনে নিয়ে এসেছে গুচ্ছের। কাকিমার বকাবকি তে এক সময় এসে শুধুমাত্র চারটি গিলেই আবারও ছাদে চলে যাচ্ছে।  কাকিমার প্রতি, বাচ্ছাগুলোর প্রতি দিনের পর দিন চুম্বকত্ব কমতে থাকছে।


এরকম করে অনেকদিন গেল। কাকার পাগলামি চুড়ান্ত হয়ে উঠেছে। বাড়ির ছাদে ঘুড়ির বাস। হরেক রকমের হরেক ডিজাইনার ঘুড়ি। প্রথমটা ভেবেছিলাম, পাশের ছাদের প্রেমে পড়ে নি তো? ওই চুমুর বিরহে। এরকম আশঙ্কা নিয়ে একদিন ছাদের দিকে চুপিচুপি গেলাম। একটা লাটাই, নিজের ইচ্ছে মতো নীল-সাদা ঘুড়িটাকে এদিক ওদিক করছে। লাটাই টা বাঁধা আছে ছাদের কার্নিশে। আকাশে অন্য কোনও ঘুড়ি না থাকায় তার ভোকাট্টা হওয়ার আশা নেই।


কাকাকে কোথাও চোখে না পড়ায় এদিক ওদিক তাকিয়ে থাকতেই একটা কোণে চোখ গেল। একটা ঘুড়ি হাতে নিয়ে বসে আছে। চারিদিকে ছড়িয়ে আছে অন্য ঘুড়ি গুলো। একটু এগিয়ে গিয়েই দেখি, কাকার হাতে ক্যাটরিনা কাইফের ছবি ওয়ালা একটা ঘুড়ি। আর একটু কাছে যেতেই কাকার কথা গুলো কানে এল.....


-"ক্যাটরিনা তুমি আমার কাতলিনা।"

-"তোমাকে ছাড়া আমি আর থাকতে পারি না।"


আমি গলা খাঁকারি দিয়ে বলে উঠলাম,

-"ওটা হবে করিনা! আমি আর পারি না।"


আমার কথা শুনেই কাকা, ক্যাটরিনা কে ফেলে দিয়ে করিনা কে তুলে নিল।

****** 


আমার এখন অবস্থা, ন যযৌ। ন তস্থৌ।

কাকার এরূপ রূপ দেখে কাকিমার কাছে জানাতেও পারছি না। কাকাকেও বাগে আনতে পারছি না। এ কিরকমের পাগলের পাল্লায় পড়েছি রে বাবা।


মাথায় একগাদা চিন্তাদের সঙ্গী করে, আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে কয়েকটি সুখটান দিতে লাগলাম। যদি কোনো আইডিয়া মেলে।


হঠাৎই কাকিমার চিৎকার.....

পনেরো টাকা নষ্ট করে, কাকিমার ঘরের দিকে ছুটে গেলাম। ঘরে যেতেই.....


-"আতা গাছে তোতা পাখি।

ডালিম গাছে মৌ।

পাশ ফিরে চেয়ে দেখি,

পাশে নেই তোর কাকা!"


হাজার খানেক টাকা খরচ করে, লরিয়াল এর ব্রাউন কালার করা চুল গুলোকে ছিঁড়ে ফেলতে মায়া হলেও ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে করছিল। টাকার মায়া করে সেই কাজ থেকে নিজেকে বিরত করলাম। এদের সব ভুল ভাল কবিতায় পেয়েছে। ওই সিচুয়েশনেই  বলে উঠলাম। কাকিমা কি সব ভুল ভাল কথা বলছ? ওটা এরকম হবে,


-"আতা গাছে তোতা পাখি।

ডালিম গাছে মৌ।

পাশ ফিরে চেয়ে দেখি,

কাছে নেই বৌ!"


কাকিমার পুরোনো বাজখাঁই গলা ফিরে এসেছে। চেঁচিয়ে বলে উঠল....


-"তোকে আর ভয়ঙ্কর কবিতা জ্ঞান দিতে হবে নি বাপু।"

-"মিনসে টা কোথায় গেল দেখ।"

-"হাড়মাস আমার জ্বালিয়ে দিলে গা।"


বোঝো। 

কার ঝাল কার উপর।

******   


কাকাকে সেদিন পাওয়া গিয়েছিল ছাদের চিলেকোঠায়। একরাশ ঘুড়ির মাঝে। একরাশ সুতোর ভাঁজে। ক্যাটরিনা -করিনা-বিপাশা সবার মাঝে তিনি কলির কেষ্ট সেজে বসেছিলেন। কাকিমার বিশাল বপু ছাদ দখল করে নিয়েছিল। কাকা কে হিড় হিড় করে টানতে টানতে ছাদ থেকে নামিয়েছিল কাকিমার ডব্লিউ ডব্লিউ এফ ওয়ালা পেশী। বিড়ালের মতো কুঁই কুঁই করলেও, কাকিমার সে সব শোনার মতো সময় ছিল না। কাকিমার মধ্যে তখন নান, ব্যান্ডেড কুইন; গব্বর সিং সবার সমাবেশ ঘটেছিল। 


ছাদের চিলেকোঠা এখন সমাধিতে পরিণত হয়েছে। কাকা মাঝেই যায় সেখানে। এরকমই একটা মায়াবী রাতে কাকা, যেন কার ডাকে আবারও ছাদে চলে এসেছিল। ঘুড়ি ওড়ানোর নেশায়, সবে ঘুড়িতে সুতোটা পরিয়েছে। অমনি পেছন থেকে কাকিমা........


-"যতই ঘুড়ি ওড়াও রাতে।

লাটাই তো আমার হাতে।"


বলেই একটা সুতো জড়ানো লাটাই নিয়ে কাকার দিকে তাক করে থাকে।


****** 

এইসব দেখে আমি মানে মানে কাকিমার আরাম খানা ছেড়ে পালিয়ে এসেছিলাম। কাকার ঘুড়ি পরকীয়া, কাকিমার কারণেই হয়েছে। কি চেয়েছে জীবনে? কাকার তো একটাই চাওয়া ছিল। একটু চুমু। তবে চুমুর কারণে পরকীয়া ! এটাও বাড়াবাড়ি রকমের বাড়াবাড়ি। সে কাকা-কাকিমার ব্যক্তিগত ব্যপার। আমি আবার হেব্বি ভদ্দর। কারোর 'পাস্সনাল' ব্যপারে কথা বলি না। 


কাকিমার আদর খানায়, কাকিমার আদরে আদরে  নিজের মনুষ্য রূপ ছেড়ে বাঁদরে রূপান্তরিত হওয়ার আগেই কাকা-কাকিমা সমেত সমস্ত কিছু ছেড়ে আসার সময় , দাঁত বের করা সিঁড়ি গুলো আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত ইয়ে করে হেব্বি হাসছিল। মনে হচ্ছিল পতঞ্জলি দন্তকান্তি দিয়ে দাঁত মেজেছে। সেই রাশি রাশি হাসি উপেক্ষা করে, ওদের হাসি ডিঙ্গিয়ে মেইন রাস্তায় আসতেই অস্থায়ী চারপেয়ে গুলো আমার দিকে এগিয়ে এসে একটা আদর চাদর দিতে চাইছিল। আমার আবার আদর- ভালোবাসা এসবে বেগুনের মতো অ্যালার্জি, কচুর মতো চুলকানি। সেইসব জিনিস কে কিক মেরে একছুট্টে নেতাজীর পায়ের কাছে। 


আমি আর ওমুখো হইনি। ওমুখো হওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। কি জানি! সিঁড়ি গুলো আজও অবলীলায় হাসছে কিনা? তাদের হাসিতে কেউ ফেঁসেছে কিনা?  হাসি মতলব ফাসি। 

 জানিও না কাকার পরকীয়ার খবর।  কাকিমাকে আদর করার বিরহে, বিরহাতুর কাকা বর্তমানে কতটা 'মেদ' ঝরিয়েছে তাও অজানা। ওনার সাইজের আন্ডারওয়্যার থেকে শুরু করে জামা-কাপড়, শ্যামবাজার টু হাতিবাগান কোথাও মিলেছে কিনা তাও অজানা। কাকা-কাকিমার চুমুতে আমার কস্মিন কালেও 'ইন্টারেস্ট' ছিল না। চুমু পর্বের উপসংহারে কাকা কি কাকিমার সাথে 'লিপ লক' করতে পেরেছিল? গোদরেজের তালা-চাবি দিয়ে। সবই অজানা। অজানা তথ্য নিয়ে, বাবার দেওয়া সম্পত্তি গুলোকে কাকিমার দেওয়া বল সাবান মেখে ওই একই ভাবে বগল দাবা করে একটি অজানা জায়গায় ঘাঁটি গেড়েছি। সকাল বিকেল নিজর ঠোঁট গরম করছি। বর্তমানে আমার ঠোঁট পরকীয়ায় লিপ্ত হয়েছে, মোড়ের মাথার চায়ের ভাঁড়ে এবং  রাজুদার দোকানের নিকোটিনের সাথে। দিব্যি আছি। সুখেই আছি।

 


স্কুল তোর সাথেও আড়ি

-কিরণময় নন্দী


তুই কি সেই আগের মতোই

হাসিখুশি নাকি বেশ মনমরা

তুই কি ভাবিস মোদের কথা

নাকি শিকলে হৃদয়টুকু মোড়া!


রোজ সকালে ভাবি তোর কথা

স্বপ্ন দেখি তোরে নিয়ে

সেদিন যে ঝড় হলো ভীষণ

শুনেছি আমগাছটা ভেঙেছে পাঁচিল বেয়ে।


তোর গায়ে কেউ আঁচড় দিলে

ভীষণ ব্যাথা লাগে

তোর গায়ে ওই তুলির টানে

আদিবাসী পাড়ার সাজে।


দেখ না, সেই ছ মাস হলো

তোর সাথে দেখা নেই

তুই বা কেমন, বেশ আছিস আমায় ছেড়ে

কোনো দুঃখের বালাই নেই।


এই, বল না রে স্কুল

গন্ধরাজে আমোদে ওঠে তোর কানন

বল না তুই নীল অপরাজিতায়

খুব খুশি খুশি তোর মন!


দেবদারু তার উচ্চ শিখর

সবুজ পাতার সাজানো আসর

লাল গোলাপে সুবাস ঢেলে

ভ্রমররাজি ভীষণ কাতর।


কিন্তু, তোর সাথে আর নেই দেখা

পাইনা ছুঁয়ে তোর স্নেহ

খালি ঘরে সবকিছু আগলে নিয়ে

তোর খবর রাখে কি কেহ?


ক্লাস ফাইভের সেই টিকটিকিটা

আজ তার ভীষণ মজা

লুকিয়ে থাকার নেই প্রয়োজন

ফাঁকা ক্লাসরুমে সেই রাজা।


এই স্কুল, তোর মনে আছে

সেই "লক্ষ্মী" বিড়ালিনী

মিড-ডে-মিলের ভাত খেত

আজ কি না খেয়েই উপোসী!


বল না তুই, কবে হবে দেখা

তোর মাঠে প্রাণ খুলে করবো লুটোপুটি

তুই ও কি জানিস না কিছুই

যা, তোর সাথেও আড়ি, যা হিংসুটি।

 


বলে দাও অনায়াসে

- শক্তি কুন্ডু


ছিটেফোঁটা ভালোবাসা নেই 

জেনে ও....

 মনে মনে লুকোচুরি খেলা...অহেতুক মিথ্যের বেড়াজাল আঁকড়ানো বারবার !


সুরক্ষা বলয় ভেবে জড়িয়েছো যাকে

সেইতো অসুরক্ষিত,

দ্বন্দের দোলাচলে তার জীবন যাপন!


বলে দাও অনায়াসে..

মরা মরা খেলা আর লাগছে না ভালো !


সত্যের উন্মোচনে ভয় ?


দুঃখ বিসর্জনে সত্যের ছোঁয়া 

যে লাগবেই ...

তুমি কষ্টকে সময়ের কাছে ওড়িয়ে 

দেখো ....সে কিভাবে মিলিয়ে দেয়

সত্যের ঘ্রাণে !!

 


নতুন সকাল

- পাপিয়া চ্যাটার্জি


আবার হবে তো দেখা দূর্যোগ রাতের শেষে,

আসবে আবার বাসন্তী বসন্ত নব অভিনব বেশে। 

 হৃদয়ে আবার নতুন করে জাগবে নতুন আশা, 

মৃত্যুর বুকে উঠবে ফুটে বাঁচার নতুন ভাষা।

জাগবে পৃথ্বী ছাড়বে শয্যা প্রানে পূনঃ পাবে প্রান,

কবরের বুকে ধ্বনিত হবে জীবনের জয়গান।

ছুটবে পৃথিবী ছুটবে জীবন দূর্দাড় গতি বেগে 

অন্ধকারের উৎস হতে বিশ্ব উঠবে জেগে।

স্তব্ধ জীবন স্তব্ধ জগৎ বন্দী হয়েছে ঘরে,

ভাইরাস জ্বরে সব জড় সড় মৃত্যু দাঁড়িয়ে দোরে।

ঘর থেকে কেউ যেও না বাইরে ঘরেতেই থেকো ঘরে,

তোমায় আমায় দেখা হবে নতুন যুগের ভোরে।।

 


ও মোহিনী

কলমে - সুমন মন্ডল


আর একটিবার দেখতে চাই 

ওই নদীর পাড়ে।

রং বেরঙের ফলে গাঁথা 

বন ফুলের হারে।।


কাজলা কালো চোখের বরণ

হরিণী চাউনি খানি।

কি মোহিনী বিদ‍্যে জান,

বলো দেখি, শুনি।।


নাইলে কি আর আমি তোমার 

প্রেমে পাগল হই।

কাজ কর্ম শিকেয় তুলে

অপেক্ষাতে রই।।


তোমার দেখা পেলেই তবে

শান্ত মনের ঘর। 

নইলে যেন হয়ে থাকি

নিজেই নিজের পর।।


ও মোহিনী ও মোহিনী 

একটু কাছে এসো।

বট বৃক্ষের শান্ত ছায়ায় 

অমার পাশে বসো।।


তোমায় পেলে ধন‍্য জীবন

এই টুকুনি জানি।

ভালোবাসা সম্পূর্ণ আমার

এতো টুকুই মানি।।


"আমি ও ওরা"

কলমে - ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য


আমি শুধু 

হাতের থেকে ছিনিয়ে নিলাম হাত 

আলোর নিচে একলা ছায়ার ,অলীক সাক্ষাৎ |


আমি শুধু ..

জীবন থেকে মগ্ন ঘুড়ির সুতো ,

উড়িয়ে দিলাম মুক্তবেণী আলোর থেকে দ্রুত |


আমি শুধু ..

ঢেউয়ের থেকে কুড়িয়ে নিলাম মন 

রোদ ছায়ার লুকোচুরি খেলছে জীবন রোজ |


আমি শুধু ..

নিংড়ে নিংড়ে শেষ বিন্দু তে আজ ,

মন্দ যা আছে তাও দিও ..নিঃসংকোচে নির্দ্বিধায় |


আমি শুধু .

সাহস করে দেখতে পারি একবার ,

সব ভালোর আবরণে আভরণে 

ঠিক ঢাকা পড়বে সময় কাল |


কলমে ইন্দু (12/9/2020)

 


শ্রাবণ শুধু তোমার কথাই ভাবে

- শৈলেন মন্ডল


শ্রাবণ শুধু তোমার কথাই ভাবে 


দহন জ্বালায় পুড়বে যদি

শীতল করেই যাবে

শ্রাবণ জানে মনের কথা

ব্যথার কথাও আছে

কেন দুঃখ ঢেকে মুখটা লুকাও

সুখটা তো নয় যায় মুছে।


শ্রাবণ শুধু তোমার কথাই ভাবে


ভালবেসে ডাকলে কাছে

ঠিক সময়ে আসবে নিজে

বৃথাই মরো হায় হুতাশে

স্বপ্নসুখের সাম্পান ভাসে

ধৈর্য্য রেখো আর কিছক্ষণ

আবাহনে মধুর লগন।


শ্রাবণ শুধু তোমার কথাই ভাবে 


ছোঁয়াচ নিতে ভালবাসার

আলিঙ্গনের ইচ্ছা অপার

বৃষ্টি ভেজা অমলতাসে

সুখের স্বপ্ন ঐ যে ভাসে

শ্রাবণ মেঘের হাতছানিতে

প্রেমের পরশ নিয়ে আসে।


শ্রাবণ শুধু তোমার কথাই ভাবে 


আলিঙ্গনের ঐ আকিঞ্চনে

মিলবো মোরা আজ দুজনে

বৃষ্টি ছোঁয়া পরশ দিয়ে

দেবো তোমার পরশ দিয়ে

দেবো তোমার মন ভিজিয়ে

ঠোঁটটা দেবো ঠোঁটেই ছুঁয়ে

জ্বলবে তুমি উত্তাপ নিয়ে।


শ্রাবণ শুধু তোমার কথাই ভাবে 

কোথায় যেন মন হারিয়ে

আসবো আমি বৃষ্টি নিয়ে

সুখের আবেশে মত্ত হয়ে

যাবো সুখের পরশ দিয়ে

ভালবাসায় আসবে শীতল

রইবে গোপন মনের অতল।


শ্রাবণ শুধু তোমার কথাই ভাবে।


১৮/০৮/২০২০


বই....বড়ই বেমানান

- কিরণময় নন্দী


ও বই আজ বড় অভিমানী তুই

বন্দী সাজানো দেওয়াল আলমারি জুড়ে

মুঠোফোনের রঙীন দুনিয়ায় ব্যস্ত সবাই

তোর সাথে সম্পর্ক বহুদূরে।


বিকিকিনির হাত ঘুরে তুই

অভিজাত বৈঠকখানায়

আভিজাত্যের মাপকাঠি তুই

পাঠকহীন ঘরে তোরে কি মানায়!


তবুও তুই রয়েছিস 

আর পাঁচজনা বইয়ের সাথে

স্পর্শহীন কৃত্রিম ভালোবাসা

সাহিত্যের সম্ভার তোর বুকে।


কবিতা গল্প গানে

তুই ভরা আকাশের গাঙ

তোর ছত্রে ছত্রে লেখা

রবীন্দ্র-নজরুল জয়গান।


তোর বুকে আঁকিবুকি

ব্যর্থ প্রেমের "ন-হন্যতে"

তোর বুকে সমাজের ব্যাধি

"নিরুপমা" আজও আড়ালে চোখ মোছে।


তোর অন্তঃকরণ জুড়ে

বিদ্রোহের রণ দামামা

তোর বুকে লেখা "ফটিকের কান্না"

তবু অসহায় তার মামা।


না জানি কত কথা

চাপা পড়ে আছে কত অভিমান

তুই আজ সাজানো ঘরে একাকী

অগ্রগতির দুনিয়ায় বড়োই বেমানান।


রূঢ় বাস্তব

- কিরণময় নন্দী


তোমায় ডায়েরীতে প্রেমের কবিতা

পাহাড়ী জলপ্রপাতের ছবি

আমার ডায়েরীতে রোজনামচার হিসেব

শুধু বাস্তবের জলছবি।


তোমার ডায়েরীতে আনন্দের শৈশব

ইংরেজি স্কুলের ইতিহাস

আমার স্মৃতিতে গ্রামের স্কুল

অবাধ স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ।


তোমার ডায়েরীতে ছত্রে ছত্রে লেখা 

নিয়মানুবর্তিতার পাঠ

আমার স্মৃতিতে জাবর কাটে

এক ফুটবলে ব্যস্ত পাড়ার মাঠ।


তোমার ডায়েরীতে নিয়ম মেনে

আবার "বেটার স্কুলের" খবর

আমার কৈশোরের উত্তরণে

শুধু অভাব-দুনিয়ার সফর।


তোমার পাতায় জ্বলজ্বলে লেখা

অভিজাত কলেজের বর্ণনা

আমার কাঁধে সংসারের বোঝা

যৌবনেই নিদারুন যন্ত্রণা।


তুমি তখন স্বপ্ন দেখো

আকাশ ছুঁয়ে বিদেশ ভ্রমণ

আমার বাস্তব কারখানায় বন্দী

মেশিন ঘোরে বনবন।


তুমি আজও স্বপ্ন দেখো

হাজার তারার ভীড়ে

আমি আজও লোকাল ট্রেনে

হাজার লোকের ভীড়ে।


তোমার দেখা স্বপ্ন গুলো

আজও উঁচু আবাসনে ঘেরা

আমার মতো রোজনামচার জীবন

রূঢ় বাস্তবে মোড়া।


ও পতাকায় ঢাকা

-কিরণময় নন্দী


মেল ট্রেন ছুটছে জোরে

আঁকাবাঁকা রেলপথ ধরে

রাজধানীর স্নিগ্ধ মাটি ছোঁবে

পনেরোই আগস্টের কাকভোরে।


তখন ভীষণ গভীর রাত

চিকেন-রুটিই ডিনার শেষে

অভিজাত স্কুলের একঝাঁক ছেলেমেয়ে

হাসি-ঠাট্টায় উঠেছে মেতে।


ঝরঝরে ইংরেজি বলে ওরা

কৃতির সুযোগে করেছে বিদেশ ভ্রমণ

আগামীকালের "ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে"সেলিব্রেশনে

ওরা পেয়েছে আমন্ত্রণ।


ওরা ভীষণ খুশি

ভীষণ খুশি স্কুল-আত্মীয় পরিজন

নীল আকাশের বুকে উড়বে তিনরঙা পতাকা

ওদের হৃদয়জুড়ে ভিন্ন শিহরণ।


দুইঘন্টার বিলম্ব রেলপথে

ভিড়লো না ট্রেন কাকভোরে

নিজামুদ্দিন হয়ে সেন্ট্রাল যেতে

ঘড়ি তখন সাড়ে ছ'টার ঘরে।


ব্যস্ত যাত্রী হুড়মুড়িয়ে ছোটে

"স্বাধীনতার দিনে" ছোটে কুলি

স্টেশন জুড়ে দেশাত্ববোধক গান বাজে

দশের বালক ফেরি করে,মুখে মিষ্টি বুলি।


সেই চেনা ছবি 

কোলে শিশু বাটি হাতে মা

বিবর্ণ শাড়িতে অসহায় মুখ

পোড়া পেট হয়তো কথা শোনে না।


হঠাৎ নিদারুন আর্তনাদ

ফেরি-করা কিশোর রক্তেমাখা

শুয়েশুয়ে অসহ্য চিৎকার

বিক্রির পতাকা ওর গায়েই পড়েছে ঢাকা!


এতটুকু জল নিয়ে আসেনা কেউ

শুধু দেখে চলে যায়

ব্যস্ত সবাই সেলিব্রেশনে 

ভারতমাতার সন্তান ভুমিতে গড়ায়।


কেউ ভাবে পুলিশি ঝামেলা

ভাবে কেউ হয়তো বা নিচু জাত

কেউ মোবাইলে ছবি তোলে

এগিয়ে আসে না কোনো "ভারতবাসির হাত।"


দলবেঁধে চলে গেলো ওরা

নামকরা ইস্কুলের ছেলেমেয়ে

ওরা ঝরঝরে ইংরিজি বলে

ওরা ব্যথিত নয় "সমাজ" নিয়ে।

 


এক পৃথিবী হারিয়ে

- শৈলেন মন্ডল

মা গো তুমি আবার ফিরে এসো এজন্মে তো আর দেখা হোলো না।

জন্ম দিয়েই বিদায় তুমি নিলে
ব্যথায় ভরা বুকটা আজও শুন্যতাই রয়ে গেলো।

আজও বুঝলাম না মায়ের স্নেহ মায়ের আদর

সবাই বলে মা মানেই নাকি একটা পৃথিবী। 

যেথায় ফেলে গেলে মা তবে একোন পৃথিবী?

এখানে নেই কোনো আদর ভালবাসা নেই কোনো যত্ন,

এখানে শুধু শাসন বারন সবার কাছে ঘৃণ্য।

জন্ম দিয়েই হারিয়ে গেলে জানলে না গো মা আমি তোমারই ছেলে

কতো কষ্টে হচ্ছি বড়ো জানবে কেমন করে।

আমার ব্যাথা গোপন ভরে মরমে থাকে চোখের জলে

নীরব ব্যাথা গোপন থাকে
যন্ত্রনায় খুব গুমরে মরে।

ডাকলে কি আর তোমায় পাবো

একদিন আমি তোমার মতোই হারিয়ে যাবো।

সবার কেমন মা যে আছে
সুখে দুঃখে আগলে রাখে।

আমার এমন ভাগ্যদশা মা যে শুধু নাই
এজীবনে সবই পাবো
তোমায় না পাওয়া থেকে যাবে অধরাই।

০৪/০৯/২০২০

 


দিদিমণি

- কিরণময় নন্দী


অভিমানে চোখে জল আসে কি দিদিমণি

স্মৃতিপটে ভাসে অতীতের কথা

তোমার কোলে বসে হাতেখড়ি

তোমার কাছেই একরাশ ভালোবাসা।


বলো না খুব কষ্ট পাও তুমি

বড়ো হয়ে কেও রাখেনি মনে

স্মৃতির আঁধারে ঢেকে গেছো তুমি

তোমার অভিমানের কথা কেই বা শোনে!


আমার বেশ মনে পড়ে তোমায়

মায়ের কোল থেকে তোমার কোলে

কত না আদর করলে আমায়

হাত বাড়িয়ে চোখের জল মুছে দিলে।


স্লেটে আঁকিবুকি কাটা আর মোছা

মুখে মুখে কত ছড়া বলা

নাচ-গানে নতুন জগৎ

তুমি, নানা পশুপাখির রবে হরবোলা।


মনে আছে দিদিমণি সেই তিন্নির কথা

সে আজ নার্স দিদিমণি

মনে আছে সেই পলাশের কথা

সে রাজনীতি করে,সমাজের শিরোমণি।


মনে আছে সেই মালতির কথা

সে অল্পবয়েসেই বিধবা

জয়পুর কলেজের অঙ্কের দিদিমনি

তোমার কাছে যোগ ভুল করা শোভা।


মাল পাড়ার রোগা তরুণ মাল

আজ বিদেশে থাকে,মস্ত ইঞ্জিনিয়র

বামুন পাড়ার সবুজ অধিকারী

শহরের নামকরা ডাক্তার।


জানো দিদিমনি, ওরা কেও আসে না গাঁয়ে

ওরা কাজের চাপে ব্যস্ত ভীষণ

ওরা ভবিষ্যতেই মেতে আছে

ওরা তোমায় মনে রাখবে কখন?


তুমি অভিমান করো না

কষ্ট পেয়ো না বুকে

আবার হাজার ছেলেমেয়ে মানুষ হবে

এটাই তোমার প্রাপ্তি, এনিয়ে তুমি থাকবে সুখে।

 


জীবন যখন শুকায়ে যায়

- কিরণময় নন্দী


লড়াই শব্দ সুরঞ্জনার জীবন-অভিধানে খুব পুরোনো ও সত্য।  নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে হয়েও লড়াইকে সাথী করে সরকারী হাসপাতালের নার্সদিদিমনি। রবি ঠাকুরের গানে-কবিতায় খুঁজে পায় শক্তি সঞ্চয়ের কঠিনব্রত। সতেরো বছরের বিবাহিত জীবনে চড়াই-উৎরাই এ পাশে পেয়েছে স্বামী ও ছেলেমেয়েদের।

      এখন হাসিখুশির পরিবারে ভীষণ নীরবতা। সুরঞ্জনা জীবাণুযুদ্ধে প্রথমসারির সৈনিক। কিন্তু প্রতিবেশীরা আজ ওর পাশে নেই। সবাই ওকে রোগের বাহকের চোখে দেখে। কিন্তু সুবিনয়কাকা, রুবিনাচাচী,  অজয়দা সুরঞ্জনার সেবায় হাসপাতাল থেকে ফিরেছে জীবনযুদ্ধ জয় করে।

 কিন্তু আজ সুরঞ্জনা নিজের জন্য লড়াই করছে আই-সি-ইউ বেডে।  ছেলেমেয়ের কথা খুব মনে পড়ছে। এত মনেরশক্তির মাঝেও অন্তঃকরণে বাজছে,"আছে দুঃখ আছে মৃত্যু, বিরহ দহন লাগে...."

 ভীষণ শ্বাসকষ্ট। পাশে নেই পরিবার। শরীর ক্ষীণ। চোখ বুজে শুনতে পাচ্ছে," জীবন যখন শুকায়ে যায়, করুণা ধারায় এসো...."

 


ও আমার দেশের মাটি তোমার পায়ে ঠেকাই মাথা


ও আমার স্বাধীন ভারত

- শৈলেন মন্ডল


ও আমার স্বাধীন ভারত

আজ ভারত মাতার চোখে জল

হাহাকারে মরছে মানুষ

পুড়ছে শিশু ক্ষুধার জ্বালায়।


ভারতমাতার অবগুণ্ঠন আজ উন্মুক্ত

অতীন্দ্র তিমির বাসনায় যে অমোঘ উন্মাদনার হাতছানি।


স্বাধীনচেতা বিপ্লবীদের রক্তের বিনিময়ে দেশের স্বাধীনতায় আত্মবলিদান। 


সেই স্বাধীন ভারতের আত্মমর্যাদা, হৃদগৌরব আজ লুন্ঠিত।


বিনয় বাদল দিনেশ ক্ষুদিরাম সূর্যসেনের ভারত আজ যেন ক্রন্দনের ভারে ভারাক্রান্ত।


আজও মানুষের মধ্যে চলে খুন ধর্ষণ মারামারি রাহাজানি ও আদিম রিপুর লাম্পট্য খেলা।


নারী শিশু মানুষের মধ্যে মর্যাদার সহাবস্হানের বড়োই অভাব।


আজও আমরা নারীদের দিতে  পারিনি সঠিক মর্যাদা ও মান সম্মান।


শিশু থেকে বৃদ্ধ আজও লুন্ঠিত ধর্ষিত। নিশ্চিন্তে নির্ভয়ে থাকার অাশ্বস্তের বড়োই অভাব।


প্রতি মুহুর্তে বিপদের গন্ধ শুকতে শুকতে জীবন অতিবাহিত করতে হয়।


নিশ্চিন্তে শ্বাস প্রশ্বাস নিতে দেয় না ভালো মানুষের মুখোশ পরা নরপিশাচের দল।


এজন্যই কি দেশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার জন্য দেশ মাতৃকার শৃঙ্খল মোচন করেছিলেন গান্ধীজী নেতাজী সুভাস বোস।


স্বাধীনতার ৭৪ বৎসর পরেও কি আমাদের মধ্যে সচেতনতা ফিরে আসবে না?


দেশে আজও চলছে খুন ধর্ষণ মারামারি রাহাজানির মতো জঘন্যতম অপরাধ।


১৫ই আগষ্ট '২০২০

 


যদি বলি

- মিন্টু উপাধ্যায়


যদি বলি...

হ্যা, খুব খুব ভালোবাসি তোমায়...

কি বলবে তুমি উত্তরে...?

নাকি উত্তর না দিয়েই মুখ ফিরিয়ে নেবে...

ভীষণ ভয় হয় জানো...

তুমি যদি হারিয়ে যাও...

তাই মুখে কিছুই বলতে পারিনা....

হৃদয়ের বেথা হৃদয়েই রয়ে যাক না চিরকাল...

বাস্তবে গরীবদের ভালোবাসতে নাই...

গরীবদের ভালোবাসা কোন দিনও সম্পূর্ণ হয় না....

আমি চাই, আমার হাতটা তুমি ধর...

পারবে না তুমি ধরতে....?

এতটাই কি আমি অচ্ছুৎ...? 

গরীব হওয়াটাই কি আমার অপরাধ...? 

পারিনা, আমরা একে অপরকে ভালোবেসে বাকিটুকু জীবন কাটিয়ে দিতে...

পারিনা, আমরা জীবনের কঠিনতম মূহুর্তে একে অপরের হাতটাকে শক্ত করে ধরতে...

পারিনা, আমরা একে অপরের চোখের দিকে তাকিয়ে এক মায়াবী পৃথিবী গড়তে...

আমি চাই, দুজনেই এক সাথে বুড়ো বুড়ি হই....

তোমাকে কতটা ভালোবাসি আমি বলতে পারব না...

তবে তোমার মুখ ফিরিয়ে নেওয়াটা আমার জীবনে এক বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি করেছে....

তোমার বুকে মাথা রেখেই আমি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই...

 


সরল স্বীকারোক্তি  

- পলি রহমান 


চাল চুলো হীন বেকারকে মন দিও না, 

নিজের ভালো একটু হলেও বোঝার চেষ্টা করো,

নিজের ভালো তো পাগলও বোঝে,তুমি কেন বোঝ না,

আমাকে মন দিলে চটি পায়ে রাস্তায় হাঁটতে হবে,

হিল পরে বেশিক্ষণ হাঁটা যায় না বোঝ তো,,

রিকশার যে ভাড়া আজকাল,, মানিব্যাগ হালকা হয়ে যাবে,,

আমাকে মন দিলে টং দোকানে চা খেতে হবে,

বড়োজোর ঝালমুড়ি বা চিনাবাদাম খাওয়াতে পারবো,

রেস্টুরেন্ট ফেস্টুরেন্টে খাওয়াতে পারবো না,,

আমাকে মন দিলে ব্লকবাস্টার বা সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখাতে পারবো না,,

রবীন্দ্র সরোবরে মাটিতে বসে প্রোগ্রাম দেখতে হবে,

অনলাইন থেকে দামী গিফট দিতে পারবো না, 

জন্মদিনে একটা গোলাপ পাবে শুধু,, 

এখন ভেবে দ্যাখো কি করবে,,

জীবনের রঙিন দিক গুলো দেখেছো,

সাদাকালো জীবনকে যদি দেখতে চাও, তবে হাত ধরো আমার,, 

এক একটা দিন বেঁচে থাকার জন্য 

কতটা লড়াই করতে হয়,

যদি বুঝতে চাও, 

মন দিতে পারো,,


 


"যেদিন থাকবে না"

- জাকিরুল চৌধুরী  


যেদিন মাগো থাকবে না

এই জগতে তুমি,

সেদিন আমি র'বো পড়ে

তোমার পায়ে চুমি।


যেদিন তুমি থাকবে না মা

কেমনে যাবে রাত,

মাথায় সেদিন খোকা বলে

বুলাবে না  হাত।


তুমি ছাড়া খালি ঘরে

লাগবে বড়ো ভয়,

এই কথা যে বারেবারে

মোর মনে হয়!


যেদিন তুমি থাকবে না মা

হ'বো বড়ো একা,

স্বপ্ন যুগে মাগো তুমি

দিও না হয় দেখা।

 


শরীর, মন

- পলি রহমান 


শরীর ছোঁয়ার মধ্যে বাহাদুরির কিছু নেই 

মন অবধি ক'জন আসতে পারে,, 

ক'জন পারে দিন রাতের ঘুম কেড়ে নিতে 

ক'জন পারে কাঁচের চুরির মতো 

মনের ভেতর জমে থাকা ঠুনকো নিয়মের 

দেয়ালকে ভেঙে দিতে, 

কেউ তো আসে না কপালের বাঁকা টিপটাকে

সোজা করে দিতে, 

সবাই আসে টিপের অস্তিত্ব বিলীন করে 

কপাল জুড়ে কলঙ্কের দাগ দিতে,, 

 


টাকার নেশা

- জাকিরুল চৌধুরী 



টাকার খুঁজে ছুটছে মানুষ

নিত্য দিবা রাত,

টাকার জন্যেই বাড়ছে শুধু

কালো থাবার হাত।



যার পেটেতে ক্ষুধার অনল

ভাতের চাওয়া তার

পাঁচেক বিঘা জমি হলে

নেই প্রয়োজন অার।



যার বাড়িতে ধানের গোলা

তার ভাসনা এক।

নামের পাশে কেমনে হবে

উপাধি তার শেখ।



গ্রামেতে যে প্রধান মোড়ল

তারও কিছু চাই

যাহা দিয়ে শহর তলী 

বাসা করতে পাই।



দশ তালার ঐ মালিক বেটা

পুষে মনে সাধ

কানাডাতে বাসা উঠলে

হবে অাহ্লাদ।



টাকার নেশায় ছুটছে মানুষ

উড়ছে শুধু মন

মিটছে না তো অাদোও কারো

যা যা প্রয়োজন।

 


ক্যাপসিকাম এর পুষ্টিগুণ  

- ডাঃ ফারহানা মোবিন 


ক্যাপসিকাম দৃষ্টিনন্দন একটি সবজি। 


 উচ্চ মাত্রার ভিটামিন ‘সি’ তে ভরপুর।  মাছ, মাংস বা যেকোনো সবজির সঙ্গে মিশিয়ে খাওয়া যায় ক্যাপসিকাম।


 অল্প তেল, মশলা দিয়ে রান্না করে খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য, বদহজম, বুকের জ্বালাপোড়া (গ্যাস্ট্রিকের জন্য হয়) দূর হয়।


ঠাণ্ডাজনিত ইনফেকশানগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ক্যাপসিকাম।


 দাঁতের ক্ষয় হয়ে যাওয়া, দাঁতের গোড়ায় ব্যথা, আর্থ্রাটিসের ব্যথা কমাতে অবদান রাখে ক্যাপসিকাম।


 এই সবজিটি দেহের ক্ষতিকারক কোলস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে, বাড়িয়ে দেয় কাজ করার শক্তি। 


রান্না ক্যাপসিকামের চেয়ে টাটকা ও কাঁচাতে পুষ্টি বেশি। তাই কাঁচা খাওয়াই ভালো। 


জ্বর হওয়ার পরে বা যেকোনো অপারেশনের পরে মানুষের মুখের রুচি কমে যায়। ক্যাপসিকামের সালাদ রুচি বৃদ্ধি করে, দেহের শিরা উপশিরা ও স্নায়ুগুলোর পুষ্টি যোগায়। সারা শরীরে সঠিকভাবে রক্ত চলাচলে সাহায্য করে বলে হৃৎপিন্ড ভালো থাকে।


বমি বমি ভাব দূর করতে অবদান রাখে। হাই ব্লাডপ্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা না থাকলে কাঁচা লবণ (তরকারিতে খাবার লবণ) দিয়ে খেতে পারেন ক্যাপসিকাম।


 হাই ব্লাডপ্রেসার থাকলে কাঁচা লবণ খাওয়া অনুচিত। বাড়তি লবণ খেলে আর উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে দেহে শরীরে পানি জমতে পারে। পরিণামে তৈরী হবে নানান জটিলতা।


 এই সবজিতে চিনি ও ফ্যাট নাই। তাই ডায়াবেটিক ও হৃদরোগীরা ভয় ছাড়াই খেতে পারবেন। 


মাংসপেশীর ব্যথা, হাড়ের জয়েন্ট এর  ব্যথা দূর করে ক্যাপসিকাম। বার্ধক্যকে দূরে ঠেলতে এর অবদান অপরিসীম।


 রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় প্রচুর পরিমাণে। গর্ভবতী মায়েরা খেলে গর্ভস্থ শিশুর জন্য যথেষ্ট উপকার হয়।


ওজন কমাতে সাহায্য করে। এতে নেই কোনো কোলেস্টেরল বা চর্বি। তাই ওজন কমাতে চান যারা তারা নিঃসন্দেহে খেতে পারেন ক্যাপসিকাম। 


মাংসের সঙ্গে খেলে চর্বি কমায় মাংসের। ফলে ওজন কমাতে  গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। 


আমাদের মেরুদণ্ডের স্নায়ুগুলোকে পুষ্টি দেয় ক্যাপসিকাম। তাই যাদের মেরুদন্ডের ব্যথা বা কোমড়ে ব্যথা রয়েছে তাদের জন্য ভীষণ উপকারি হলো ক্যাপসিকাম। 


ক্যাপসিকামের খোসা পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত (পেটের একধরনের অঙ্গ), কোলনের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। কোলনের ক্যান্সারের রোগীদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভীষণ কোষ্ঠকাঠিন্যর  সমস্যা হয়।


 ইসবগুলের ভূষি, শাক, সবজি, ক্যাপসিকাম ও প্রচুর পরিমাণে পানি দূর করবে এই সমস্যা।


পুষ্টির গুণ বিচারে সালাদের বাটিতে,  তরকারি তে এই সবজি হোক আপনার উপকারী সংগী।


প্রেমিক তুমি

কলমে -  কুহেলী রায়


(1)

যখন তোমার বাড়ির ভেতর ঘরে ভীষণ ঝুল জমেছে, গীতবিতান ঢেকে গেছে ধুলোয়, তখন কোনো এক অতি সাধারণ রমণী পরম যত্নে মুছে দিয়েছে সে ধুলো। তুমি কি সেই সাধারণকে ভালোবেসেছো? 

(2)

যেদিন তোমার গা পুড়ে গেছে জ্বরে, ব্যথায় বিষিয়ে গেছে কণ্ঠ, সেদিন যে মেয়েটা পরম মমতায় তোমায় তার হাতের জাদুতে সুস্থ করে তুলেছে, আজকে কি তোমার তাকে মনে আছে? 

(3)

যে নারী তার শরীর উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো, তোমার কামনা মেটাবার সাধে। দিন শেষে রাত্রি যখন ঘন হয় কোনো নির্বাক শূন্য রাত্রে তুমি কি তাকে ভালোবেসেছো? 

(4)

তোমার বিমূর্ত চেতনার গূঢ় অর্থ যার সংস্পর্শে মূর্ত হয়েছিল দিকে দিকে. সেই চেতনাকে তুমি কি ফিরে দেখেছিলে? 

(5)

তোমার বন্ধ ঘরে তীব্র ভালোবাসা যে জ্বালিয়ে দিয়ে গিয়েছিলো। প্রদীপের শেষ শিখায় তোমার চোখ কি আজও তাকে খুঁজে পায়? 

(6)

কোনো এক অমবস্যার রাত্রে যেদিন তুমি আলো খুঁজছিলে। সেদিন তোমার চোখে মুখে পূর্ণিমার আলোক জাগানো নারীকে কি তুমি ভুলতে পেরেছো? 

(7)

দিন ফুরোলে রাতে পাখির মতো যার কোটরে লুকোও তুমি। যেই বৃক্ষের ছায়ায় তুমি শান্তির ঘুম ঘুমাও. সেই বৃক্ষরুপী মানবীকে ঝর্ণার মতো জল পান করাও কি  তুমি? 

(8)

রাতে সঙ্গমরত অবস্থায় যে নারীর যৌনাঙ্গ ঘেঁটে বেড়াও তুমি. তার বুঁকের পা পাশের ঘরের খোঁজ আদেও রাখো তো তুমি? 


~ কুহেলী ©

 


প্রাপ্তি

- সুজাতা চক্রবর্তী


কাঠফাটা রোদে ইট ভাঁটার আগুনের সামনে এতক্ষণ কাজ করে শরীরে আর দিচ্ছিল না চুমকির। একটু ছায়া দেখে জিরোতে বসলো। খিদেও পেয়েছে খুব। কিন্তু একটু মুড়ি-বাতাসা ছাড়া আর কিছুই আনতে পারেনি। গত সপ্তাহে মুনিয়ার হঠাৎ জ্বরে অনেকগুলো টাকা বেরিয়ে গেল। কদিন ধরেই তাই হাঁড়ির অবস্থা কাহিল। কোনও রকমে রাতে দুটো ফুটিয়ে খাচ্ছে। দিনে মেয়েটা স্কুলে মিড ডে মিল পায়, ও তাই নিজের জন্য কিছু করে না। একটু বাতাসা মুড়ি খেয়ে নেয়। 


আজও বাতাসা মুড়ি দিয়েই আধপেটা সারলো। একটু জল খেতে যাবে, এমনসময় মুনিয়া দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরলো। 

"এ কি রে, এত তাড়াতাড়ি ছুটি হয়ে গেল? "

"হ্যাঁ,  কোন এক দিদিমণি আগে ইস্কুলে পড়াতো। আজ সকালে মারা গেছে। ইস্কুলে তাই হাফছুটি। এই দেখ্ মা তুর জন্য কি লিয়ে এসেছি। " বলতে বলতে মুনিয়া চুমকির সামনে তার ছোট হাতের মুঠোয় খুলে ধরলো। 

চুমকির অবাক হয়ে দেখলো, মুনিয়ার হাতের মুঠোয় ধরা একটা ডিম সেদ্ধ। তারপর হঠাৎই ওর মাথায় রক্ত চড়ে গেল। 

"তুই ইস্কুল থেকে ডিম চুরি করেছিস্। এই শিখছিস্  তুই ইস্কুলে গিয়ে? "

মারমুখী চুমকিকে দেখে ভয়ে কেঁদে ফেলে মুনিয়া। কাঁদতে কাঁদতে বলে, "বিশ্বাস কর্, আমি চুরি করিস্ লাই। যখন খেতি দিল, তুর কথা খুব মনে হল। জানি তুই মুড়ি খেয়েই কাটাইবিক।আজ ছুটির তাড়ায় কেউ খেয়াল করে লাই। আমি আমার ডিমটা লুকিয়ে লিয়ে এলাম। "

বকতে গিয়েও চুমকির দুচোখ দিয়ে জলের ধারা বইতে লাগলো। ডিমটাকে অর্ধেক করে মেয়েকে খাইয়ে দিল, আর বাকি অর্ধেকটা মুনিয়া খাইয়ে দিল ওকে। 

মেয়ের হাতে ডিম খেতে খেতে চুমকির মনে পড়লো পুরানো কথা। প্রেমের ফাঁদে ফেলে চুমকিকে ব্যবহার করে মুন্না যখন পালিয়ে যায়, চুমকির শরীরে তখন মুনিয়া এসে গেছে। সবাই বলেছিল, জানাজানি হওয়ার আগেই, পেটের পাপ ধুয়ে ফেলতে। কিন্তু চুমকি রাজি হয়নি। সবাই বলেছিল, চুমকি ভুল করছে, এতে ও দুঃখ আর অপমান ছাড়া কিছুই পাবে না। চুমকি শোনেনি কারো কথা। ও নিজের গ্রাম ছেড়ে এই আদিবাসী গ্রামে এসে উঠেছিল। এখানেই ইটভাঁটায় কাজ নেয়, আর এখানেই জন্ম দেয় মুনিয়ার। সবাই জানে মুনিয়ার বাবা মারা গেছে। 

আজ মেয়ের হাতে ডিমসিদ্ধ খেতে খেতে চুমকির মনে হল, "কে বললো ও জীবনে সুখ পাবে না! এ কি কম প্রাপ্তি! "

 


দর্পন

- প্রিয়া ব্যানার্জী


 উমা হলেন গ্রামের সম্ভ্রান্ত মানুষ। ক্ষমা করবেন উমানাথ বলেই উনি এখন পরিচিত। আসেপাশের গ্রামের মধ্যে সজ্জন বিত্তশীল মানুষদের মধ্যে উমানাথ এর নাম সর্ব প্রথম বলেই মনে করে গ্রামবাসী। স্বভাব চরিত্র খুবই ভালো। লম্বাটে দোহারা চেহারার উমানাথ কে কেও ধরতে পারবেনা ষাটের ওপরে বয়েস তার। গ্রামের পঞ্চায়েতের প্রধান হিসেবে এবারে তার নামও তালিকা ভুক্ত করতে চাইছে গ্রামবাসী। 

ভরা সংসার তার। উপার্জন ও বেশ হয়, দুটো মুদির দোকান এবং একটা চলতি তেলে ভাজার দোকান, যা ওই তল্লাটে খুবই প্রসিদ্ধ।

একটাতে সে নিজে বসে আর অপরটিতে ছেলে রামসুন্দর বসে। 

দুই ছেলে,  এক নাতি, স্ত্রী, বৌমা ভরা সুখের সংসার তার। 

বাড়িতে সকলেই খুবই উদার মনস্ক, গৃহকর্তাকে সকলেই শ্রদ্ধা ভক্তি করে। উমানাথের নিয়ম শৃঙ্খলার বিরুদ্ধে কেও আজ পর্যন্ত যায়নি। 

 বলা যায় ভগবান তার জীবনে সুখ একেবারে ঢেলে গুছিয়ে দিয়েছে। 

কোনো চিন্তাই সে করেনা। বড়ো ছেলে রামসুন্দর একদম শ্রী রাম চন্দ্রের মতোই সুসন্তান। বাবার কথার কোনো অমান্য সে করেনা। ছোট ছেলে পড়াশুনোতে খুব মেধাবী তাই সে ডাক্তারি পড়তে দূরে অন্য রাজ্যে গেছে। তার ব্যবসাতে  কোনো কালেই মন ছিলোনা। ছোট থেকেই ভীষণ ন্যাক ছিল পড়াশুনার প্রতি তার। 

তবে কিছু দিন যাবৎ উমানাথের মাথায় চিন্তার উদয় হয়েছে, নাতি চরণনাথ কে নিয়ে। বারো বছর বয়েস তার, খুবই কৌতুহলী সকল বিষয়ে। রামসুন্দর ছোট থেকেই বাবা যা যেমন বলেছেন তেমনটি মেনে এসেছেন, প্রশ্ন করেনি কোনোদিন। আর সেই জায়গায় তার ছেলে এতো কৌতহুলী। এতো প্রশ্ন সকল বিষয়েই, তাই নাতিকে নিয়ে উমানাথ মাঝে মাঝে চিন্তিত হন।

গ্রামবাসী উমানাথ কে শ্রদ্ধা করে তাই কিছুই কেও বলেনা।

প্রাত্যহিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে রোজের নিয়ম অনুযায়ী উমানাথ তার দোতলার ঘরে যান, যথা সময় রোজই সেখানে কিছুটা সময় তিনি অতিবাহিত করেন। স্ত্রী মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন বিশ্বাস রাখতে তার ওপরে, পূজো করেন উনি সেখানে।

পূজোর ঘর সেটা ওনার।

রাম সুন্দর ছেলে বেলা থেকেই দেখে আসছে তার বাবা ঠিক একই সময় রোজ পূজাগৃহে যান, কোনো মন্ত্র বা পূজার দ্রব্বাদি কোনো কালেই বাড়িতে আনতে দেখা যায়নি.. কিন্তু কেও  আর এই বিষয়ে উমানাথ কে প্রশ্নোত্তর ও করেনি। কিন্তু নাতির খুব কৌতহল দাদাই এর ঠাকুর ঘরের প্রতি।

বারেবারে জিজ্ঞেস করে চরণনাথ তার দাদাই উমানাথকে,

"তোমার পূজোর ঘরে ফুল, ধুপ, প্রদীপ, শঙ্খ এসব কেন কিছুই নেই দাদাই "?

- উমানাথ উত্তরে শুধুই মুচকি হেসে অন্য প্রসঙ্গ তুলে নাতিকে অন্যমনস্ক করে দেন আর বলেন সময় হলে নিশ্চয় সে সব কেনোর উত্তর গুলো পাবে।


 - উমা থেকে উমানাথ হয়ে ওঠার গল্প টাও নিছক তুচ্ছ করার মতো নয়।

সেই সময় উমার বাপ্ তারাশঙ্কর ক্ষেত খামারি করেই সংসার চালাতো, স্ত্রী মারা গেছিলো উমার যখন চোদ্দ বছর বয়েস, ছোট ছেলে রাধানাথ,বড়ো ছেলে উমানাথ আর বাপ্ তারাশঙ্করের সংসার দিব্বি চলে যেতো চাষ আবাদ করেই।

 বয়েস কুড়ি হতেই উমার বিয়ে দিলেন, বাড়িতে নতুন বৌ এলো।

 সংসারের দায় ভার নিয়ে সে গুছিয়ে সংসার শুরু করলো। গরিব হলেও সুখীই ছিল তারা।

শশুর স্বামী দেওর ক্ষেতে যায়, যা চাষের ফসল বেচে পায় ওতে চলেই যায়.. এভাবে বিয়ের দুই মাস চললো, তারপরে নতুন বৌ এর চাহিদা এবং আনুসঙ্গিক ভাবে সংসারের মঙ্গলার্থেই অর্থাভাব অনুভব করতে লাগলো তারা।

তাই বাবা আর উমা মিলে ঠিক করলেন, সন্ধেতে তারা বাড়ি ফিরে ব্যবসা যদি শুরু করেন তবে নিশ্চই আর দুটো পয়সার মুখ দেখতে পাবে তারা এবং সংসারেরও হাল শুধরোবে।

ভবিষ্যৎ ভেবেই এগোনো, দুদিন বাদে ঘরে বাচ্ছা আসলেও খরচ বাড়বে।

কিন্তু ব্যবসা করবো বললেই তোহ হয়না ব্যবসা।সেই সময় মানুষ দিন এনে দিন খেয়েই সুখে সাচ্ছন্দে বাঁচে।

সংসারের হাল ফেরাতে হলে অর্থ উপার্জন করতেই হবে।

কি ব্যবসা করা যায়...

এসব ভাবতে ভাবতেই উমা ঠিক করলো সে ফুলুরির ব্যবসা করবে।

একবার কোনো এক বিয়ে বাড়িতে গিয়ে সে খেয়েছিলো সেই স্বাদ তার আজ ও জিভে লেগে আছে, উৎসাহিত হয়ে জেনেওছিলো কিভাবে তৈরী হয়েছিল সেই সুস্বাদু মুচমুচে লোভনীয় খাবার।


কথা মতো কাজ, মুদির দোকানের থেকে তেল ডাল বেসন মসলা ইত্যাদি সবই এনে সে সেই থেকে শুরু করলো তার ফুলুরির দোকান।

সেকালে গ্রামগঞ্জের দিকে ফুলুরির চল বিশেষ ছিলোনা তবে ধীরে ধীরে ফুলুরির চল শুরু হওয়া তে ব্যবসা রমরমা ভাবেই চলতো।

  বাপ্ আর দুই বেটাতে দিনে চাষবাস করে ফিরে, সন্ধে হলে দুই ছেলে মিলে দোকান দেখে।

ইতিমধ্যে এক কঠিন ব্যাধিতে তারাশঙ্কর মারা যায়, জমি চাষআবাদ সব যায় বাপের চিকিৎসায়, তবুও বাপকে বাঁচাতে পারেনা উমানাথ।

ছোট ভাই ভিন গাঁয়ে কাজ পেয়ে যায়, মনিহারি দোকানের দেখাসুনোর কাজ। থাকা খাওয়া সবই পায় তাই সে চলে যায়।

একা হয়ে পরে উমা। জমি জমাও সেরম না থাকায়, শেষ সম্বল তার হয়ে দাঁড়ায় ওই তেলে ভাজার দোকান টাই।

 

 দোকানে খরিদ্দার কম হতোনা চলছিল ভালোই তার মধ্যেই উমার স্ত্রী সন্তান সম্ভবা হয়ে পরে।

তাকে বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে উমা একাই বসে দিন কাটায় দোকানে, দোকানে তার আর মন বসতে চায়না। ওদিকে স্ত্রী এবং ভবিষ্যতের সন্তান এর কথা ভেবে দোকান বন্ধও করতে পারেনা।

 সাড়া রাত সে চিন্তা করে কাটায়, একলা ঘরটায় আর তার মন টিকছে না, উপায় কি যাতে দোকান ও থাকবে আবার ঘর থেকে বাইরে বেরিয়ে দুটো পয়সা রোজকারেরও পথ  মিলবে।©প্রিয়া ব্যানার্জী


শেষে সে ঠিক করে ফুলুরি বানিয়ে সে সকালেই নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়াবে। যদিও তার জানা নেই কেও রাস্তায় ফুলুরি কতটা খেতে পছন্দ করবে।

সাতপাঁচ না ভেবে সে দুদিন বাদেই সব ব্যবস্থা করে নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়ায়।

নদী পথে সারাদিনই যাত্রী দের আনাগোনা, কোলাহল।

মাথায় ঝুড়ি নিয়ে গরম গরম ফুলুরি কে শালপাতা তে মুড়ে নিয়ে সে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাকে দেখে অনেকে জিজ্ঞেস করে কোথায় চললো সে। কিন্তু সে লজ্জায় বলতে পারেনা যে  সে ফুলুরি বেচতে বেরিয়েছে।

 মনের দুঃখে গাছের নিচে এসে বসে। খিদে পায় তার সেই সকালে একটু শুকনো মুড়ি গুড় খেয়ে বেরিয়েছে, ঠিক করেছিল দুপুরের আগে বাড়ি ফিরে ভাত রান্না করবে।

গাছের নিচে বসে এসব ভেবে চলে। তখনই নদী থেকে নামেন গ্রামের মোড়ল সহপরিবারে,শিক্ষিত সাহেব ধাঁচের চেহারা তার, গ্রামের সকলেই ওনাকে সমীহ করে চলে।

উমা মনে আশা রেখে ঝুড়ি মাথায় এগিয়ে যায়।

মোড়ল সাহেবের ছোট ছেলেটি কাঁদছে খুব, উমা ওনাদের কাছে ফুলুরির কথা বলবে বলে এগিয়েও দুহাত পিছিয়ে আসে, ছেলে কাঁদলে কোন বাবা মার মাথা ঠান্ডা থাকে ওই ভেবেই।

মোড়ল সাহেব উমা কে দেখেই চিনতে পারেন, বেশ কয়েকবার সন্ধেতে আসেন উনি দোকানে ফুলুরি চা খান গল্প করেন।

ইশারায় ডাকেন উমাকে, উমা হুড়মুড়িয়ে এগিয়ে যেতেই উনি বলেন,

" আর বোলোনা উমা, ছেলে কান্না করেই চলেছে, খিদেতে, এসময় কোত্থেকে কি দি বলো দেখি।" " তা তুমি এখানে, কৈ চললে? "

- উমা সাহস করে এবারে বলে," সাহেব ফুলুরি আছে, যদি কিছু মনে না করেন তবে ছেলে টাকে খাওয়ান।"


ভদ্রলোক অবাক হয় এবারে, এই সময় ফুলুরি কোথায় পাবো ভায়া।

এবারে উমা ঝুড়ি থেকে মুচমুচে ফুলুরি শালপাতা তে হাতে তুলে সাহেবের হাতে দেয়, মোড়ল সাহেব খুব খুশি হন তাতে।

স্ত্রী পুত্র উনি সহকারে নদী ঘাটে আসা আরও অনেকেই ফুলুরি খায়।

 সেই থেকে রোজ উমা সকালে আসে ঝুড়ি সাজিয়ে ফুলুরি নিয়ে।

সব বিক্রি হয়ে যায় আবার সন্ধে তে দোকানে বসে।

দিন যায়,মাস যায়, বছর যায় তার দুই পুত্র নিয়ে সুখের সংসার।

কিন্তু নিয়ম করে উমা রোজ ঝুড়ি মাথায় নিয়ে নদীর ঘাটে যায়, চেনা অচেনা সকলেই ওর ফুলুরি খায়।©প্রিয়া ব্যানার্জী

সবার ভীষণ প্রিয় হয়ে ওঠে সে আসতে আসতে।

 ছোট্ট একটা মুদির দোকান সে কেনে। দোকান সকাল সকাল যায় তারপরে দোকানে স্ত্রী একটু বসতেই সে বেরিয়ে পরে ঝুড়ি মাথায়।


এখন ছেলেরা বড়ো হয়েছে দুটো বড়ো মুদিখানার দোকান তার তবুও সে ফুলুরির দোকান রেখেছে। লোক রেখেছে ফুলুরির দোকানে।

ফুলুরির স্বাদ সেই একই আছে তবে আর সে নদীর ঘাটে যাবার সময় পায়না। তবে সকাল থেকেই দোকান তার খোলা থাকে। চেনা অচেনা মানুষের ভীড় এখনো লেগেই থাকে।

নাতি মাঝে মাঝে দুস্টুমি করেই ফুলুরি তুলে খেতে যায়।

নাতির জন্যই সে আজকাল বেশ চিন্তায় থাকে।


আজ সকালে উঠে সে খেয়াল করলো নাতি তার পূজার ঘরে ঢুকতেই পেছনে পেছনে এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রয়েছে।

উমানাথ উঠে দাঁড়ালেন, এগিয়ে দরজা খুলতেই নাতি তো ভয়ে কাঠ। সস্নেহে নাতিকে ভেতরে আনলেন।

আলো অন্ধকার মেশানো ঘর, সামনের জানলা থেকে হালকা আলো প্রবেশ করছে, এবং মেঝেতে রাখা একটা ঝুড়ি আর একটা আয়না।

যা খুব যত্ন সহকারে একটা গামছা দিয়ে ঢাকা দেওয়া।©pb

ঢাকা সরিয়ে সে নাতিকে দেখিয়ে বললেন,

এই হলো আমার দেবতা আমার ঈশ্বর।

আমি কাল কি ছিলাম আজ কি হয়েছি সেটা যাতে ভুলে না যাই তার জন্যই আমি রোজ সময় করে এগুলোকে দেখি আর প্রার্থনা করি যেন আমার পরবর্তীসুরি অর্থাৎ তুমি একই পথে চলো।

নাতি চরণ প্রথমে কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলোনা, তবুও সে মন্ত্র মুগ্ধের মতো দাদাই এর প্রতিটা কথা শুনে চলেছে চুপটি করে।©priyabanerjee

- উমানাথ বলেন হাতে আয়না টা তুলে নিয়ে, জীবনে চলার পথে লোভ, দম্ভ আর মিথ্যের আশ্রয় কখনো নিয়োনা চরণ, কাল তুমি কি ছিলে আর আজ তুমি কি হয়েছো  সেটা সর্বদা মনে রেখো চরণ। নিজেকে এই দর্পনে রোজ দেখো যেন কোনোভাবে বদল না আসে মনের মধ্যে,নিজের পা যেন সর্বদা মাটিতেই থাকে। এই বদল শরীরের বদল নয় এই বদল মনের বদল.. মন যেন কখনো বদলে না যায় এটাই আমাদের মনে রাখতে হবে, এই যে দর্পন দেখছো বলে উনি আয়না টা চরণের সামনে তুলে ধরলেন, চরণ তাতে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে জিজ্ঞেস করলো দাদাই এটাও তোহ আমি.. তখন উমানাথ বললেন, এই প্রতিবিম্ব যে দেখছো এটা হলো তোমার বিবেক।কখনো অন্যায় করলে মিথ্যে বললে, অহংকার করলে, মানুষকে ঠকালে আমরা এই দর্পনে নিজের বিবেকের কাছেই পরাজিত হৈ। তাই কখনো এমন কোনো কাজ কোরোনা যাতে বিবেক অর্থাৎ আমাদের ঈশ্বরের কাছে জবাব দিতে হবে।

দাদাই এর কথা শুনে চরণ ঝুড়ির সামনে বসে দর্পনে নিজেকে দেখে হাত জোর করে প্রণাম করে।

তারপরে দাদাই কে জড়িয়ে ধরে। 

উমানাথ ও তৃপ্ত অনুভব করে নাতির মাথায় হাত রেখে নাতিকে বুকে আগলে ধরেন।


©প্রিয়া ব্যানার্জী

(সমাপ্ত)

 


ভেজা নীলখাম

- শৈলেন মন্ডল

অনাদরে ভেজা পড়ে বেনামী নীলখাম
তাতে লেখা এক অনাহুতের নাম।

যত্নের অপেক্ষায় মলাট যতো ধূসর
মলিন ততো আদরের শেষ বাসর।

মনপিয়নটা গুমরে মরে আজ
নেই মনেতে দামী কোনো সাজ।

বিদায় বলায় অজান্তে দিয়ে চিঠি
স্মৃতিগুলো একটা সময় খেত লুটোপুটি।

দিনটা ছিল স্বপ্নে মোড়া রঙীন
আজও ভাবলে মন হয় উদাসীন।

ফেলে যাওয়া টুকরো টুকরো স্মৃতি
আজও ডাকে মন কেমনের অনুভূতি।

আবেগ ছিল হৃদয় দেওয়ার বেলায়
অনুভূতিরা আজ একলা ফেলে পালায়।

দিয়ে গেছে আঘাতের পর আঘাত
ভিজিয়ে দিয়ে দুটি অাঁখিপাত।

চলেই যদি যাবে তবে এসেছিল কেন?
বুকটা শুধু আজকে হঠাৎ পাথর চাপা যেন।

পিঞ্জরেতে অাঘাত হানে রক্তক্ষরণ যতো
মনটা যে আজ নীলাম হয়ে কান্না আসে শত।

অবুঝ মনটা মানতে না চায় থাকে অপেক্ষায়
সব শুধাবে জেনো একদিন যদি দেখা পায়।

১৩/০৮/২০২০


#এক_সাধারণ_মেয়ের_জন্মদিন      #এক_অসাধারণ_মায়ের_জন্মদিন

- অনিরুদ্ধ চট্টোপাধ্যায়

“…কোনো অনুষ্ঠানে যেতে গেলে সোনার গয়না না থাকায় ইমিটেশন আর লিপস্টিকের বদলে সিঁদুর আর বোরোলিন মিশিয়ে ঠোঁট টাকে একটু লাল করা…তাঁদের মতো সাধারণ হতে গেলে হয়তো অনেকটা অসাধারণত্ব লাগে…”

বহু দিন ধরেই ভাবছিলাম এই লেখাটা লিখবো। কিন্তু কিছুতেই বসাও হচ্ছিলো না, আর কোনো না কোনো কারণে লেখাও হচ্ছিলো না। কিন্তু আজ সব কাজ ফেলে, সব বাধা দূরে সরিয়ে লিখতে বসলাম। আজকের লেখাটা যাঁকে নিয়ে তিনি খুবই সাধারণ একজন মহিলা। আর পাঁচ জন তথাকথিত সফল মহিলাদের মধ্যে তিনি কোনো ভাবেই আসেননা। অসংখ্য উল্লেখযোগ্য কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত থেকে সমাজের মুখ্য শ্রেণীর একজন হয়ে ওঠার বিন্দুমাত্র উদাহরণ নেই তাঁর কাজে। আদর্শ নাগরিকের সমস্ত গুণাবলীও যে প্রবল ভাবে প্রকট তাও নয়। তাহলে কেন লিখছি? প্রথম কারণ ২০ শে জানুয়ারি তাঁর শুভ জন্মদিন (বাংলা মতে আজকে) আর দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ বা বাদবাকি সব কারণ হলো আমি তাঁকে ভালোবাসি, শ্রদ্ধা করি তাই। তিনি আসলে তাঁরই মতো আরোও লক্ষ লক্ষ সাধারণ নারীর প্রতিভূ। যাঁরা কোনোদিনও প্রচারের আলোতে আসতে পারেন না। যাঁদের নিয়ে তুফানী চায়ের আড্ডায় কোনো চর্চা হয়না। বাড়ির বা পরিবারের সবচেয়ে কম আলোচিত মানুষ হয়েই থেকে যান যাঁরা বছরের পর বছর বা সারাটা জীবন। কিন্তু এখন অনুধাবন করি তাঁদের মতো সাধারণ হতে গেলে হয়তো অনেকটা অসাধারণত্ব লাগে। 

১৯৬০ সালের ২০শে জানুয়ারি ভবানীপুর নিবাসী শ্রী ব্রজেন্দ্র কুমার গুহবর্মন এবং শ্রীমতি শান্তিরানী গুহবর্মন এর কোলে আসে তাঁদের তৃতীয় সন্তান। নাম রাখা হয় মা কালির নামানুসারে - শিবানী। টাকি শ্রীপুরের মহারাজ প্রতাপাদিত্য রায়ের ২৫ তম বংশধর কিংবা ড: বিধান চন্দ্র রায়ের ভাগ্নে ব্রজেন্দ্র কুমার ছিলেন টাকি শ্রীপুরের জমিদার। ঝাড়গ্রামে নিজের বিশাল বাড়ি। তার সাথে ভবানীপুরে বলরাম বসু ঘাট রোডে গঙ্গার ধারে সবচেয়ে বড় বাড়ি (এখন যদিও তা সিকি ভাগে এসে ঠেকেছে)। শিবানীর ছোট বেলাটা তাই মোটামুটি বেশ দুধে ভাতেই কাটে। সমস্যা দেখা দেয় সরকারের পক্ষ থেকে জমিদারি কেড়ে নেওয়া হলে। সেই সময় বেশ কিছুদিন ঝাড়গ্রামে কাটালেও ব্রজেন্দ্র কুমার কে সপরিবারে ফিরে আসতে হয় ভবানীপুরে। বিভিন্ন জায়গায় কর্ম সন্ধানের পর এইচ.এম.ভি আর আকাশবাণী তে বেশ কিছু দিন কাজের পরে ব্রজেন্দ্র কুমার যোগ দেন ঊষা কোম্পানিতে। ততদিনে পরিবারে এসেছে আরোও চার পুত্র সন্তান। কিন্তু এক এক করে চলে গেছে সব বিষয় সম্পত্তি। বড় মেয়ের বিয়ে দিতে ঝাড়গ্রামের সম্পত্তি জলের দরে বেচে দিতে হয়েছে। জমিদারি চলে গেলেও সেই জমির মালিকানা বেশ কিছুদিন ছিল। কিন্তু তাও একসময় পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। আর এভাবেই চলতে চলতে ১৯৭৬ সালে ব্রজেন্দ্র কুমার ইহলোক ত্যাগ করেন। পিছনে রেখে যান স্ত্রী ও সাত সন্তান। ভগ্ন সংসারের হাল ধরতে শান্তিরানী শুরু করেন ঘরোয়া ব্যবসা। ধূপ, আচার, বড়ি এই জাতীয় খুব সামান্য উপকরণ তৈরী ও বিভিন্ন বাড়িতে সরবরাহ করার ব্যবসা। আর সেই কাজে মাকে সাহায্যে এগিয়ে আসে ছোট্ট শিবানীও। তার অনেক আগে থেকেই যদিও নিজের থেকে ছোট চার ভাইকে কিংবা বড়দির ছেলে মেয়েদের মানুষ করার আংশিক ভারও বর্তায় তাঁর উপর। সেই ছোট বয়স থেকেই সংসারের ভার বহন করার গুরুদায়িত্ব শিবানীর বেড়ে ওঠার সাথে জড়িয়ে যায়, যা কিনা আজও একই ভাবে বয়ে চলেছে।

ছোটবেলার মেয়েলি রান্নাবাটি খেলার পরিবর্তে হাতে উঠে আসে আসল হাতা খুন্তি। পুতুল নিয়ে খেলার পরিবর্তে কোলে এসে পরে ছোট ছোট ভাইরা বা বোনপো বোনঝিরা। তাঁর সম সাময়িক শিশু বা কিশোর অবস্থার অন্যান্য বচ্চাদের মননের বদলে তাঁর মনন কিছুটা আলাদা ভাবে গড়ে ওঠে। অসাধারণ হাতের লেখা কিংবা বাংলা সাহিত্যের ওপর ভালো দখল থাকা অথবা বিজ্ঞান বিষয়ে যথেষ্ট মেধা থাকা সত্ত্বেও শিশু মনের পূর্ণ বিকাশের খামতিতে আর যোগ্য সহায়তার অভাবে সে মোটামুটি ভাবে স্কুল ফাইনাল পাশ করে ভবানীপুর গার্লস থেকে। মেধাবী ছাত্রী হওয়া সত্ত্বেও উপযুক্ত গাইডেন্সের অভাবে এগজামিনোফোবিয়া বা পরীক্ষা ভীতির কবলে পরে সে। এরপর যোগমায়া দেবী কলেজ। আর তারপর কন্যা দায়গ্রস্ত বিধবা মায়ের ভার লাঘব করতে ১৯৮০ সালের ২৭শে এপ্রিল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। তাই নতুন কিছু করার বা নতুন কিছু ভাবার অবকাশ থাকেনা তাঁর কাছে। আরোও অনেক ভালো কিছু করতে পারতো হয়তো সে। কিন্তু পরিবেশ পরিস্থিতি তাঁর প্রতিকূল হয়ে দাঁড়ায়। পূর্ববঙ্গ থেকে আসা শ্রী সুরথ কুমার চট্টোপাধ্যায় ও শ্রীমতি রানী চট্টোপাধ্যায়ের মধ্যম পুত্র শ্রী নারায়ণ কুমার চট্টোপাধ্যায়ের সাথে শুরু হয় নতুন জীবন। ফুটবল খেলাকে পেশা করতে চাওয়া নারায়ণের জীবনটাও যে তখন খুব সাবলীল তা নয়। টানাটানির সংসারে বাবার পাশে থাকতে আর স্বপ্ন ভঙ্গ করা শারীরিক অসুস্থতা ফুটবল থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে ততদিনে। তাই রুজি রুটির দায়ে বাটা কোম্পানির সেলসম্যানের চাকরি। আর তারপর এক জেঠতুতো দাদার উৎসাহে পরীক্ষা দিয়ে  সি.এম.ডি.এ তে রাজ্য সরকারি কর্মী হিসাবে অন্তর্ভুক্তি। কিন্তু কাজ হলো পাম্প অপারেটরের। চাটার্ড একাউনটেন্সি পড়ার আশা করা বা ফুটবলার হবার স্বপ্ন দেখা ছেলে কিন্তু সেই কাজটিকেই মন প্রাণ দিয়ে করতে থাকেন আর তার সাথে তার পাম্প হাউসে শুরু করেন স্থানীয় যুবক দের নিয়ে গান বাজনার আসর আর শারীরিক কসরতের আখড়া। আর সেই গানের সূত্র ধরেই পরিচয় হলো শিবানীর ভাইয়ের সাথে। কারণ তার পাম্প হাউসের ঠিকানা যে ভবানীপুর আর ছোট থেকেই শিবানী খুব সুন্দর গান গায় যে। তাই পাম্প হাউসের আর পাঁচ জন যুবকের মধ্যে শিবানীর ভাইয়ের সাথে সখ্যতা বেড়ে ওঠে এবং তার সাথেই তাদের বাড়ি যাওয়া। এরপর ধীরে ধীরে সেই যোগাযোগ বিভিন্ন ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে প্রণয়ের শেষ সিঁড়ি পার করে।

ছোটবেলা থেকেই বাড়ির ভিতর বিভিন্ন সাংস্কৃতিক চর্চার পাঠ চলতে দেখেছে শিবানী। দাদা নাচ শিখেছে, সেজো ভাই সেতার, নভাই গান কিংবা বাবার এইচ এম ভি তে কাজের সূত্রে বিভিন্ন গায়ক গায়িকাদের কাজের খবর শোনা। আর এভাবেই বিভিন্ন মানুষের গান শুনে শুনে নিজে নিজে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে গান গেয়ে প্রস্তুতি নেওয়া। আর বাড়ির সব কাজে সাহায্যের পর যেটুকু সময় বেঁচেছে সেই সময় নিজে নিজেই হারমোনিয়াম বাজানো শেখা। সাথে সাঁইবাবার ভজন। তখনকার দিনে ভালো ভজন গাইবার সুবাদে বহু বড় বড় মানুষদের বাড়িতে যাবার সুযোগ মেলে। পার্ক স্ট্রিটের বিশিষ্ট ধনপতি বি.ডি. চোপড়া কিংবা সাঁই সাধিকা মাধুরী আম্মা থেকে শুরু করে টালিগঞ্জ ইন্ডাস্ট্রির প্রখ্যাত অভিনেতা ধীরাজ ভট্টাচার্য কিংবা সুপার ষ্টার রঞ্জিত মল্লিক - এরকম বহু মানুষের বাড়িতে তখন ভজন গাইবার জন্য ডাক পেত কিশোরী শিবানী। কলকাতার বাইরে যাবার জন্য গাড়িও পাঠানো হতো বাড়িতে। ছোট খাটো চেহারা, মাথায় এক ঢাল চুল, সুন্দর গান গায়, ভদ্র স্বভাবের কিশোরী শিবানীর বিবাহের জন্য প্রস্তাব আসে তখনকার দিনের বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এক অভিনেতার বাড়ি থেকে। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে কোনো প্রযোজকের নজরে পড়ায় বাড়ি বয়ে এসে ফিল্মে অভিনয় করার প্রস্তাব আসে। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই বাড়ির অমত আর লাজুক স্বভাবের শিবানীর কোনো উদ্যোগ না থাকা তাঁকে রুপালি পর্দার জগৎ থেকে দূরেই রাখে। আর বিয়ের পর স্বামী-সংসার-সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকাই জীবনের মুখ্য লক্ষ্য হয়ে ওঠে। শখ আহ্লাদের মতো ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র বিষয় গুলো নিয়ে তখন ভাবার সময় কৈ।

চট্টোপাধ্যায় পরিবারে বিয়ে হয়ে আসার পর প্রথম যে জিনিষটা শিবানীকে হারাতে হয়, তা হলো তার পিতৃদত্ত নাম। পরিবারে তার এক বড় ননদের নাম শিবানী হওয়ায় তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় মৌসুমী অর্থাৎ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় আর ডাক নাম শম্পা। জমিদার বংশের মেয়ে হওয়া সত্ত্বেও, বিয়ের সময় যেহেতু তাদের অবস্থা খুবই খারাপ ছিল তাই নারায়ণকে প্রভূত পরিমাণ ত্যাগ, পরিশ্রম এবং বুদ্ধি প্রয়োগ করতে হয় নিজের স্ত্রী এবং শ্বশুর বাড়ির সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে। আসলে প্রত্যেক পরিবারেই তো কম বেশি অনেক 'শুভাকাঙ্খী' আত্মীয় থাকেন। তাই তাদের প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে চায়নি। যাইহোক বেশ ভালো ভাবেই বিবাহ সম্পন্ন হয়। কিন্তু গোল বাঁধে বৌভাতের পরদিন থেকে। যৌথ পরিবারের একমাত্র কাজের দিদি প্রিয়বালার পরিবারের কেউ অসুস্থ হওয়ায় সে অনির্দিষ্ট কালের জন্য ছুটি নেওয়ায় বাড়ির বেশির ভাগ কাজের দায়িত্বই এসে বর্তায় শম্পার কাঁধে। কারণ বাড়িতে মহিলা বলতে তখন দুজন। শাশুড়ি মা রানী আর সে নিজে। রান্না করা, কাপড় কাচা, বাসন মাজা, তিন তলা বিশাল বাড়ির ঘর পরিষ্কার, কুয়ো থেকে জল তোলা, রান্নার জ্বালানির জন্য কাঠ কাটা বা কয়লার গুঁড়ো দিয়ে ছাতে গুল দেওয়া (কারণ তখনও গ্যাসে রান্নার প্রচলন হয়নি, তাই কাঠ এবং গুলের উনুনেই রান্না হতো) ইত্যাদি প্রভৃতি প্রায় সব কাজেই চলতে থাকলো তার সক্রিয় অংশগ্রহণ। যদিও শ্বশুর মশাই সুরথ কুমার এবং শাশুড়ি রানী সব সময়েই তাকে সাহায্য করে গেছেন। অভাবের সংসারে বিয়েটাই যেখানে বিশাল বড় ব্যাপার সেখানে মধুচন্দ্রিমা তো সত্যি আকাশের চাঁদ। তাই কোনোদিনই আর সেটা হয়ে ওঠেনি। বছর ঘুরে ১৯৮১ সালের ১৯ শে এপ্রিল বড় ভাসুর পার্থসারথির সাথে বিয়ে হয় পুরুলিয়া নিবাসী চাটার্জ্জী পরিবারের ছোট মেয়ে মীনাক্ষীর সাথে। সেই বিয়ের সাজ সরন্জাম প্রায় একা হাতেই সামলায় সে। কিন্তু যৌথ পরিবারে লোক সংখ্যা বাড়লে কাজের লোকেরও যে প্রয়োজন সে কথা অনুধাবন করে বৌভাতের দিন থেকে একজনকে নিয়োগ করেন শম্পার জেঠি শাশুড়ি।

৮১ সালের লক্ষ্মী পুজোর পর ঠিক হয় প্রথম বারের জন্য তারা জুটিতে কোথাও ঘুরতে যাবে। মধ্যবিত্ত পরিবারে ঘুরতে যাওয়াটা যেখানে বিলাসিতা সেখানে ভিনরাজ্যে যাওয়ার কোনো প্রশ্নই নেই, তাই দী.পু.দা-ই সেরা পছন্দ। শম্পার দিদি-জামাইবাবুদের দার্জিলিং-এ হোটেলের ব্যবসা, তাই একসাথে দুই বোনের পরিবার সেখানেই যাওয়া মনস্থির করলো। কিন্তু ভগবান বোধহয় অন্য কিছু চেয়েছিলেন। ঠিক লক্ষ্মী পুজোর আগের দিন সেলিমপুরের মোড়ে রিক্সার ধাক্কায় মারাত্মক ভাবে জখম হলেন শাশুড়ি মা। চোয়াল ভেঙে গেছে, হাত পা ভেঙে গেছে, প্রচণ্ড খারাপ অবস্থা। এদিকে বড় জা সীমা (মীনাক্ষীর বিয়ের পর নাম) তখন তার বাপের বাড়ি পুরুলিয়ায়। অতএব দার্জিলিং যাত্রা বাতিল। সেই ৮১ সালের স্থগিত হয়ে যাওয়া দার্জিলিং ভ্রমণ তাঁরা পূর্ণ করেন ২০১৫ সালের লক্ষ্মী পুজোর পরে তাঁদের বড় ছেলে ড: অভিষেক ও বৌমা উদিতার সাথে।

এর দুবছর পর ১৯৮৩ সালের ১৪ই জুন নারায়ণ মৌসুমীর কোলে আসে তাঁদের প্রথম সন্তান। প্রথম সন্তান তাই নাম হলো অভিষেক। কিন্তু যতটা সহজে বেশির ভাগ মানুষ বাবা মা হন এক্ষেত্রে তা ছিলনা। সন্তান ধারণের আগের বেশ কিছু জটিল সমস্যা উৎরে গেলেও এক কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে হয় তাঁদের। শারীরিক সমস্যা বা গাইনিক্যাল সমস্যার কারণে তাঁরা যান কলকাতার এক নাম করা ডাক্তার, ড: বাঙ্গার কাছে। বিভিন্ন ওষুধ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দিলেও সমস্যা কিছুতেই কমছে না। এরকম সময়ে পাড়ায় থাকা আর এক বিখ্যাত ডাক্তার ড: আর বি চ্যাটার্জ্জীর কাছে নিয়ে যান শাশুড়ি মা রানী এবং বড় জা সীমা। তিনি দুদিন আগেই আমেরিকা থেকে ফিরেছেন। দেখামাত্রই ড: চ্যাটার্জ্জী বুঝতে পারেন সমস্যা কোথায়। শম্পা মা হতে চলেছেন। কিন্তু পরীক্ষা করে যা জানা গেলো, তাতে বাড়ির সবার মাথায় হাত। ততদিনে নাকি   গর্ভাবস্থার সাড়ে পাঁচ মাস অতিক্রান্ত। যা কিনা সেই বিখ্যাত ডাক্তার ড: বাঙ্গা ধরতেই পারেননি। আর সেই সময় মধ্যবিত্ত্ব পরিবারের দম্পতিদের পক্ষে বোঝার মতো সরঞ্জামও বাজারে আসেনি। এবার শুরু হলো অন্য লড়াই। পাম্প অপারেটর থেকে সদ্য টাইপিস্ট পদে উত্তীর্ণ হওয়া সরকারি কর্মচারী নারায়ণের পক্ষে বড় কোনো হাসপাতালে নিয়ে যাবার সামর্থ্য নেই। আবার এতো দিন হয়ে গেছে, তাই সুস্থ ভাবে সন্তানের জন্ম হওয়াটাও জরুরি। তাই সবদিক বিবেচনা করে কার্ড করানো হলো শিশুমঙ্গল হাসপাতালে। কিন্তু সেখানেও বিভিন্ন বিষয় মিলিয়ে যা খরচ তখন তা দেওয়াও কিছুটা সমস্যার। কারণ সংসার খরচ সামলাতে ১৯৭৫ সালে বাটা কোম্পানিতে চাকরি পাবার পর থেকেই মাইনের সমস্ত টাকাই মায়ের হাতে তুলে দেয় নারায়ণ। যাইহোক এক আত্মীয়ের পরামর্শে তাঁরা গেলেন মাতৃভবন হাসপাতালে। কিন্তু সেখানকার প্রধান অর্থাৎ বড়মা কিছুতেই ভর্তি নেবেন না। কারণ ততদিনে সাড়ে ছয় মাস অতিক্রান্ত। সেই আত্মীয়ের পরামর্শেই এবার তাঁরা গেলেন মাতৃভবনেরই ড: এ কে ঘোষের বাড়িতে। তিনি দেখে বললেন অবস্থা খুবই সংকটজনক। দ্রুত কার্ড না করালে এরপর চূড়ান্ত অসুবিধায় পড়তে হবে। এর সাথে তিনি এই বলেও আস্বস্ত করলেন যে তিনিও বড়মা কে অনুরোধ করবেন। এবার হাসপাতালে গেলেন শ্বশুর মশাই সুরথকুমার। একজন বয়স্ক মানুষের অনুরোধ এবং ড: ঘোষের অনুরোধে বড়মা রাজি হলেন কার্ড করাতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের তখনও শেষ নেই। কিছুদিন যেতে না যেতেই তা বোঝা গেলো। প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। আল্ট্রাসনোগ্রাফি করে জানা গেলো "ব্রিচ বেবি" হয়েছে তাঁর। অর্থাৎ মাতৃ গর্ভে সন্তানের অবস্থান উল্টে গেছে। মাথা ওপরে পা নিচে। এবং ইম্পিরিয়াল কর্ডও গলার সাথে জড়িয়ে গেছে। অনতিবিলম্বে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। ৩৯ দিন হাসপাতালে থেকে, তিনটে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে ড: এ কে ঘোষ সেদিন বাঁচিয়ে আনেন তাঁর "মৌসুমী মা"- কে (ডাক্তার বাবু তাঁর শেষ দিন অবধি এই নামেই ডাকতেন) আর তাঁর পুত্র সন্তানকে। তিনি তখন চট্টোপাধ্যায় পরিবারের কাছে ভগবান, কারণ অপারেশনের আগেও এটাই ভবিতব্য ছিল যে, হয় মা বাঁচবে নয়তো সন্তান।

হাজারো সমস্যা জয় করে এলো প্রথম বার মাতৃত্বের অনুভূতি। এরপর আরোও দুবার মাতৃত্বের স্বাদ পেলেও প্রথম বারের অনুভূতি সব সময়েই আলাদা। সেটা হয়তো বলে বোঝানো যাবে না। হাসপাতাল থেকে এতদিন বাদে বাড়ি ফিরলো। শরীর খুবই ক্লান্ত। তাই দোতলার ঘরে প্রায় পাঁজাকোলা করে তুলে নিয়ে যায় নারায়ণের এক মাসতুতো ভাই - সেন্টু। তার গায়ে অসম্ভব জোর। কিন্তু দোতলার সিঁড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকতেই যে আক্রমণটা ঘটে তার কোলে থাকা শম্পা ও কোলের শিশুটির ওপর তার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিলেন না। বাড়ির পোষ্য কুকুর ঘাউড়ি (বিখ্যাত ক্রিকেটার কারসন ঘাউড়ির নামানুসারে) এক তীব্র লাফে একেবারে তাঁর কোলে। এতদিন বাদে বাড়ির মানুষটিকে দেখতে পেয়ে তার আনন্দ সবচেয়ে বেশি। কিন্তু এখানেই হয়তো মানুষের সাথে কুকুরের পার্থক্য। তার অত বড় শরীর নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার পরেও শম্পার শরীরে একফোঁটা আঁচড় পর্যন্ত লাগেনা। বলা যেতে পারে একটুও টের পায়নি সে, যে তার কোলে একটা মস্ত বড় প্রাণী ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একেই বলে ভালোবাসা। যাইহোক শুরু হলো এক নতুন জীবন। এই সময় ঘটলো এক অন্য ঘটনা। নতুন বাচ্চাকে দেখতে এলেন নারায়ণের এক মামা। তিনি সংগীত জগতের মস্ত পণ্ডিত মানুষ (বর্তমানে বলিউড বা টলিউড খ্যাত গায়ক অ্যাশ কিং অর্থাৎ আশুতোষ গাঙ্গুলীর জেঠামশাই)। বৌমার গানের প্রতি আগ্রহ দেখে শাশুড়ি মা প্রস্তাব দিলেন তাঁর দাদার কাছেই গান শেখার জন্য। বৌমাও খুশি। সারাদিনের রোজ নামচার পর কিছুটা অন্য কিছুতে নিজের মনের খোরাকি তো হবে। মামা বাবু বললেন সামনেই পরীক্ষা, তো ভালো করে থিওরি গুলো পড়ে নিজেকে তৈরী হতে। নতুন উদ্যমে শুরু হলো গানের জন্য পড়া। এদিকে পড়ায় মনোনিবেশ করায় বাড়ির কাজে তৈরী হলো ফাঁক। শাশুড়ি মায়ের একার পক্ষে সবটা সামাল দেওয়াও মুশকিলের। আর তার ওপর আশির দশকে মধ্যবিত্ত্ব বাড়ির বৌ গান শিখবে বলে বাড়ির কাজ করবে না এটা মানার মতন সামাজিক পরিকাঠামো তখন ছিলো না। তাই কিছুদিন পর স্বামীর সাথে পরামর্শ করেই ইতি টেনে দিলো সংগীত শিক্ষায়। কিন্তু কোথাও গিয়ে নারায়ণের মনের মধ্যে অন্য চিন্তা কাজ করে, তাই বেশ কিছুদিন পর ঢাকুরিয়ার বেঙ্গল মিউসিক কলেজে ভর্তি করে দেয় তাকে। এবারে বাড়ির কাজ সামলেই পাশাপাশি চলতে লাগলো প্রথাগত সংগীত শিক্ষা। যা চলে দীর্ঘ দশ বছর। সংগীত গীতপ্রভা ও সংগীত বিশারদ ডিগ্রি পাওয়ার পর আরোও এগোতে চাইলেও আর্থিক কারণে ও সন্তান প্রতিপালনের মাঝে তা আর করা হয়ে ওঠেনা। অথচ এই সময়েই বিশিষ্ট সংগীত পরিচালক শ্রী নারায়ণ গোস্বামী নিজে তাদের বাড়িতে দুবার এসে অনুরোধ করে যান। কিন্তু সেই সময় ক্যাসেট বের করার খরচ হিসাবে প্রায় ৫ হাজার টাকা দেবার সামর্থ্য নারায়ণের ছিলনা। তাই সেই স্বপ্ন অধরাই থেকে যায়।

দেখতে দেখতে সময় এগিয়ে চলে। ১৯৮৬ সালের ২১ শে জুলাই নারায়ণ শম্পার ঘরে আসে তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র। যদিও তাঁদের আশা ছিল কন্যা সন্তান। কিন্তু ভগবান যা চাইবেন তার উপরে তো কারোর কিছু করার নেই। অন্যরকম ইচ্ছে থাকলেও তার আসাকে যেহেতু কোনোভাবে আটকানো যায়নি তাই নাম হলো অনিরূদ্ধ। এবার প্রথম থেকেই সতর্ক থাকায় ও ড: এ কে ঘোষের তত্ত্বাবধানে থাকায় সেই অর্থে কোনো জটিলতা তৈরী হয়না ঠিকই, কিন্তু মুশকিল হয় অন্য জায়গায়। জুলাই মাসে সাড়ে সাত মাস গর্ভাবস্থায় শম্পা তাঁর বাপের বাড়ি যান কিছুদিন মায়ের সঙ্গে সময় কাটাবার জন্য। অফিস ফেরত নারায়ণ সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে ফিরে আসে নিজের বাড়ি সেলিমপুর। এদিকে ২০ শে জুলাই বিকেলে প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হলে তাঁর ভাইরা তাঁকে মাতৃভবন হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়। তখনকার দিনে টেলিফোনের ব্যবহার না থাকায় জানতে পারেনা নারায়ণ বা তাঁর বাড়ির কেউই। ২১ তারিখ নিয়ম মাফিক অফিস ফেরত শ্বশুরবাড়ি গিয়ে জানতে পারে সব কথা। তড়িঘড়ি হাসপাতালে গিয়ে তো আরেক কাণ্ড। সমস্ত স্টাফেরা অভিনন্দন জানাচ্ছেন - আপনি বাবা হলেন, এবারও ছেলে। কিন্তু প্রিম্যাচিওর বেবি। ওজন খুব কম। সারা শরীর ঠক ঠক করে নাকি কাঁপছে। অনেক ওষুধ কিনতে হবে। হাসপাতালের নার্স লম্বা ফর্দ ধরিয়ে দেয়। নারায়ণের মাথায় বজ্রাঘাত। কারণ সেই দিন অবধিও সে তাঁর পুরোনো অভ্যাস বদলায়নি। অর্থাৎ মাইনের সব টাকা মায়ের হাতেই দিয়ে দেয়। তাই তাঁর কাছে এতো টাকা নেই। আর তার ওপর আবার এরকম অকাল আগমন। দিশেহারা পিতা টাকা জোগাড় করতে ছুটলেন বাড়ি। এদিকে বাড়িতে মা নেই। আলমারির চাবিও তার সাথেই বাইরে। সাহায্য করতে এগিয়ে এলেন ছোটবেলার বন্ধু পাশের পাড়ার বাসিন্দা বিপুল রায় (আজ যিনি এই পৃথিবীতে আর নেই) আর অফিসের এক বন্ধু যিনি সারা জীবন নিঃস্বার্থ ভাবে পাশে থেকেছেন - প্রণব চৌধুরী। রাত্রি বেলা সেই টাকা নিয়ে হাসপাতালে জমা দেওয়া হলো । মাতৃগর্ভেই সন্তানের সব কিছুর প্রথম পাঠ। সেই পাঠ সম্পূর্ণ হলেই তার আবির্ভাব ঘটে পৃথিবীতে। কিন্তু এই পুত্রটি হয়তো তার সমস্ত পাঠ সময়ের আগেই সেরে নিয়েছে, তাই আর বেশি দেরি না করে আগে ভাগেই সশব্দে পদার্পন। যাইহোক আবার ২৫ দিনের দীর্ঘ হাসপাতাল সফর কাটিয়ে বাড়ি ফেরা।

দ্বিতীয় সন্তানের পর নারায়ণের চাকরিতে প্রমোশন হয়। রীতিমতো পরীক্ষা দিয়ে টাইপিস্ট থেকে অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট। এর সাথে অফিসের বামপন্থী ইউনিয়নের সক্রিয় সদস্য। গেমস ও স্পোর্টস সেক্রেটারি। বাড়িতে সময় দেবার মতো সময় নেই। তাই শম্পারও দিন এগোতে লাগলো দুই ছেলেকে মানুষ করতেই। তবে তার জন্য খুব একটা বেগ পেতে হয়না। বড়ই শান্ত বাচ্চা। যেখানে বসিয়ে রাখা হয় সেখানেই বসে থাকে। নিজেদের মধ্যে মারামারিও করে না। বড় ছেলেকে খাওয়ানোর জন্য তাও মামদো ভূতের ভয় দেখাতে হলেও দ্বিতীয় জনের সেসবের বালাই নেই। কারণ সে তো খেতেই চায় না। সেরেল্যাক পেলেই হলো, আর কিছু চাই না। আর খুব বেশি হলে চারটি সাদা ভাত। শম্পার নিজের পড়াশোনা বেশি না করার আক্ষেপ আর নারায়ণের খেলাধুলোয় অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা, তার ফলে প্রথম থেকেই তাঁরা ঠিক করে রেখেছিলো ছেলেদের সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেবে। নিজেরা না খেয়ে হলেও তাদের পড়াশোনায় কোনো কার্পণ্য করবে না। ১৯৮৯ সালের ২৬ শে জানুয়ারি ছোট দেওর গৌতমের সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয় কলকাতার স্যান্যাল পরিবারের ছোট মেয়ে রূপালীর (বিয়ের পর যা হয় রুপা)। আর বৌভাতের দিন অর্থাৎ ২৮ শে জানুয়ারি খবর আসে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাইমারি সেকশান শিশু বিদ্যা বীথির এডমিশন টেস্টে অভিষেক উত্তীৰ্ণ। শুরু হয় শম্পার জীবনের এক নতুন অধ্যায়। ৮৯ সালে বড় ছেলের জন্য নরেন্দ্রপুরের সাথে যে সম্পর্ক শুরু হয় তা চলতে থাকে ২০০৭ সালে ছোট ছেলের মাধ্যমিক পরীক্ষা অবধি। অর্থাৎ দুই দশক। আর এই পুরো সময়টার ৯৫ শতাংশেই শম্পার অবদান।

১৯৯০ সালের ৫ই জুন। এবার হ্যাটট্রিক। আবারও পুত্র সন্তান। আবারও মাতৃভবন হাসপাতাল। আবারও ড: এ কে ঘোষ। হাসপাতাল আর রোগীর মধ্যেও যে এতটা আন্তরিক বন্ধন হতে পারে তা হয়তো ঐদিনটা না দেখলে কেউ অনুধাবন করতে পারবেন না। হাসপাতালের সমস্ত স্টাফকে সেদিন মিষ্টি মুখ করিয়েছিলো নারায়ণ। আর তাঁরাও আন্তরিক আশীর্বাদে ভরিয়ে দিয়েছিলো তাঁদের তৃতীয় পুত্রকে। সমস্ত বিপক্ষকে দমন করতে পারার আশীর্বাদ, তাই তার নাম হলো অরিন্দম। জুন মাসে তার জন্ম হলো আর তার ঠিক চার মাস বাদে অর্থাৎ অক্টোবর মাসের লক্ষ্মী পুজোর আগের দিন ঘটলো চট্টোপাধ্যায় পরিবারের সবচেয়ে বেদনাদায়ক মুহূর্ত। এতদিনকার যৌথ পরিবার সামান্য কিছু কারণে ভেঙে গেলো। বাসস্থান এক থাকলেও হাঁড়ি আলাদা হলো। আর তার ফলেই পরিবারের জেষ্ঠ্য পুরুষ সুরথ কুমারের সেরিব্রাল এট্যাক। পুরো ডান দিকটা প্যারালাইসিস হয়ে গেলো। এই যন্ত্রণা ওনাকে ভোগ করতে হয় আরোও দশটা বছর। ২০০০ সালের ২৬ শে আগস্ট শেষ দিন অবধি তিনি থেকে গেলেন বিছানাতেই।

যাইহোক, ৭ বছর, ৪ বছর, আর ৪ মাসের তিন ছেলেকে নিয়ে শুরু হলো নতুন সংগ্রাম। এক কামরার একটা ঘরে ৫ জনের জীবন সংগ্রাম। ছোট ছেলেকে দেখা শোনার জন্য এবার লোক রাখতে হলো। কারণ তখন শম্পার জীবনের রোজনামচা ছিল ঠিক এরকম। ভোর বেলা মেজ ছেলেকে নিয়ে ১৩ কিমি দূরে নরেন্দ্রপুরে স্কুলে নিয়ে যাওয়া। স্কুলে পৌঁছে দিয়েই বাড়ি এসে রান্না করে বড় ছেলেকে খাইয়ে আবার সেই নরেন্দ্রপুরে স্কুলে পৌঁছে দিয়ে মেজ ছেলেকে নিয়ে বাড়ি আসা। তারপর তাকে আর ছোট ছেলেকে খাইয়ে আবার নরেন্দ্রপুর বড় ছেলেকে আনতে যাওয়া। তাকে বাড়ি ছেড়ে গানের ক্লাস করে রাতে বাড়ি ফিরে আবার রান্না করে বাকিদের মুখে ভাত তুলে দেওয়া। ছেলেরা আর একটু বড় হলে নরেন্দ্রপুর মিশনে ভর্তির জন্য বিভিন্ন টিচারদের কাছে পড়াতে নিয়ে যাওয়া। কখনো বারুইপুর তো কখনো খড়দা। কখনো সোনারপুর তো কখনো গড়িয়া। এর সাথে আবার ছেলেদের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক বিষয়ে চর্চার জন্য সেখানেও নিয়ে যাওয়া। বেঙ্গল মিউসিক কলেজেই বড় ছেলের গান, মেজ ছেলের তবলা, ঢাকুরিয়ার অবন মহলে ছোট ছেলের নাটক। বিভিন্ন জায়গায় বসে আঁকো প্রতিযোগিতায় নিয়ে যাওয়া। এরকম আরও হাজারটা কাজ, যা হয়তো গুনে শেষ করা যাবে না। না কোনো জায়গায় ঘুরতে যাওয়া, না কোনোদিন হোটেলে গিয়ে খাওয়া দাওয়া, না দামি শাড়ি বাড়ি গাড়ি নিয়ে মাথাব্যথা। কোনো অনুষ্ঠানে যেতে গেলে সোনার গয়না না থাকায় ইমিটেশন আর লিপস্টিকের বদলে সিঁদুর আর বোরোলিন মিশিয়ে ঠোঁট টাকে একটু লাল করা। আর এমনি সময় মেজ ছেলেকে পড়াতে নিয়ে যাবার পথে শিয়ালদহ স্টেশনে বসা হকারের থেকে কেনা ১ টাকা দামের কাঁচের দুল। তাও সেটা ছেলের জোরাজুরিতে কেনা। সিনেমা হলে যাওয়া শেষ বারের মতন ১৯৯১ সালে গুপী বাঘা ফিরে এলো। তারপর ২০১৪ সালে চতুস্কোন, তাও ভুল করে বেশি টিকিট কেটে ফেলার ফলে জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়। ছেলেদের পড়াশোনা নিয়ে যখন দিন রাত প্রাণপাত করে চলেছে সে, ঠিক তখনই বেশ কিছু আত্মীয় স্বজনের চোখা চোখা শব্দবাণেও জর্জরিত হচ্ছে। চাকরি করে স্বামীর পাশে দাঁড়াতে না পারলেও অন্য ভাবে সব সময় ব্যয় সংকোচন করে গেছে। শিক্ষকদের অনুরোধ করে গুরুদক্ষিণা বা স্কুলের মাইনে কম করিয়েছে। শখের মধ্যে গান, তাও বন্ধ করে দিয়েছে। মন ভালো রাখতে শুধু গাছ লাগিয়েছে। ফুলের গাছ ফলের গাছ। ওগুলোই তখন তার সঙ্গী। এদিকে নারায়ণ তখন অফিসে ইউনিয়নের সেক্রেটারি। প্রচুর দায়িত্ব। তার সাথে পাড়ায় নাগরিক কমিটির সেক্রেটারি, ক্লাবের সেক্রেটারি। শনি রবিবার কদাচিৎ সময় বের করতে পারলে ছেলেদের পড়াতে নিয়ে যাওয়া বা স্কুলে নিয়ে যাওয়ায় সাহায্য করতে পারে। তিনটে সিজার অপারেশনের ধাক্কা সামলে, প্রয়োজনীয় পথ্য না পেয়ে এরকম অমানুষিক দৌড়াদৌড়ি তে শম্পার শরীর ক্রমশ ভাঙতে শুরু করলো। মুঠো মুঠো পেইন কিলার খেয়ে সব জায়গায় যাওয়া শুরু হলো। বড় ছেলেকে পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে, মেজ আর ছোট ছেলেকে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে ভর্তি করতে পেরে যখন একটু শান্তিতে সময় কাটাবে বলে ভাবছে ঠিক তখনি ধরা পড়লো অস্ট্রিয় আর্থারাইটিস আর রিউমাটয়েড আর্থারাইটিস। তার সূত্রপাত অবশ্য বেশ কিছু বছর আগে। মেজ ছেলে, ছোট ছেলে আর দেওরের মেয়ে সুপর্ণা কে নিয়ে রিকশা করে বিবেক নগরে আঁকা প্রতিযোগিতায় যাবার পথে চলন্ত রিকশা থেকে পরে যায়। পায়ের হার বেড়ে যায়। আর সাথে ওই দুখানি রোগের সূত্রপাত।

২০০১ সালের জানুয়ারি মাসে মা শান্তিরানী দীর্ঘ ৪ বছর প্যারালাইসিস ও কথা বলতে না পারার থেকে মুক্তি লাভ করেন। মা চলে যাবার পর ভবানীপুরের বাড়ির প্রতি টানটাও কেমন আলগা হয়ে যায়। বিয়ের পর থেকে বাপের বাড়ি গিয়ে থাকার উদাহরণ খুবই কম ছিল আর মায়ের মৃত্যুর পর সেটা আরোও কমে যায়। বড় হয়ে যাবার পর ভাইদের মতাদর্শ আলাদা হয়ে যাবার ফলে তাঁদের সাথেও যোগাযোগ কমতে থাকে। ২০০৫ এর পর থেকে আস্তে আস্তে বিছানা নিতে শুরু করে। হাঁটাচলা বন্ধ। অমানুষিক যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়ার শুরু। বাইরে বেরোনো বন্ধ। ডাক্তার দেখাতে গেলেও হুইল চেয়ার। বাড়ির সবাই বাইরে চলে গেলে একা একা বাড়ির মধ্যে গল্পের বই আর খবরের কাগজ পড়ে কাটিয়েছে। কারণ ২০০৬ এর আগে ঘরে টিভি আনতে পারেনি। তাও সেটাকে টিভি বলা চলেনা। মেজ ছেলের ইঞ্জিনিয়ারিং এর পড়ার জন্য এডুকেশন লোনে কেনা কম্পিউটার এ টিভি টিউনার কার্ড লাগিয়ে টিভি দেখা। ২০১২ সালে ঘরে টিভি আসে। এর আগে সন্ধ্যে বেলা পাড়ার কারো বাড়িতে একটু টিভি দেখতে গিয়েও শুনতে হয়েছে হাজার রকমের কথা। ইচ্ছে অনুযায়ী অনুষ্ঠান দেখা তো দূর কি বাত। পুজোর সময় সারা কলকাতা যখন উন্মাদনায় ফেটে পড়ে, সেই সময় সে ঘরে টিভিতে পুজো পরিক্রমা বা সিরিয়াল দেখে আর পুরোনো কাপড় জামা সেলাই করে বা বাগানের গাছের তুলো দিয়ে বালিশ বানিয়ে সময় কাটিয়েছে। এক কথায় বলতে গেলে গৃহ বন্দী দশা। নিজের ভাই দিদি রা একে একে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে কিন্তু শেষ দেখা টুকু দেখতে যেতে পারেনি। পরিবারের কোনো অনুষ্ঠানেও যেতে পারেনি। ২০০৯ এ যখন একেবারেই শয্যাশায়ী তখন উপায়ান্তর না পেয়ে নারায়ণ ও তার তিন ছেলে আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব দের থেকে ধার নিয়ে ২০১০ সালের জুলাই মাসে হাঁটু প্রতিস্থাপন অপারেশন করায়। তারপর চলে দীর্ঘ ফিজিওথেরাপি। হাঁটা চলা আগের থেকে অনেক ভালো হলেও সেই পুরোনো রোগেরা শরীর ছাড়েনা। ধীরে ধীরে শরীরের সব হার গুলো ক্ষয়ে যাওয়া শুরু হয়। সমস্ত দাঁত ফেলে নতুন দাঁত বাঁধাতে হয়। দিনে ২০ - ২২ টা করে ক্যাপসুল আর ইনজেকশনের ওপর এখন দিন চলছে। গোড়ালি অবধি লম্বা চুল এখন পিঠে এসে ঠেকেছে। বয়সের তুলনায় একটু বেশিই জুবুথুবু হয়ে গেছে সে। দিন দিন ওজন বেড়ে চলেছে। সারা শরীরে এতবার  ছুরি কাঁচি চলার কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে এসেছে। সারা দিনের সঙ্গী বলতে সেই ফুল ফলের গাছ, ঠাকুর পুজো আর বাংলা সিরিয়াল। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার ব্যালেন্স রাখতে না পেরে সিঁড়িতে, ছাদে পড়ে গেছে। কিন্তু এখনও রান্নার দিদি না এলে রান্না করা, সবাইকে খেতে দেওয়া, বাড়ির লোকেদের জন্মদিনে পায়েস বানানো, শীতকালে পাটিসাপ্টা বানানো চলছে। শরীরের জোর কমে গেলেও মনের জোরে এগুলো চলছে আজও।

এতক্ষণ পড়ার পরে সবাই নিশ্চই ভাবছেন এত এত ভালো কথা লিখছি, খারাপ কি কিছু নেই। অবশ্যই আছে। তার মধ্যে অন্যতম হলো নিজের প্রতি কনফিডেন্সের অভাব, সংসারের বাকি দিক গুলো নিয়ে অত্যন্ত উদাসীন আর নিজের আইডেন্টিটি তৈরী করতে অপারগ। হয়তো ছোট বেলা থেকেই অন্যের দেখভাল করতে করতে নিজের কথা ভাবাও যে উচিত সেটা মনে করেনি। নিজের প্রতি আস্থা না থাকায় সবার সামনে কথা বলতে গিয়ে এলোমেলো হয়ে গেছে, গুছিয়ে কথা বলতে পারেনি। নিজের চাহিদার কথা জোর গলায় বলতে পারেনি। আর চেপে রেখে রেখে যখন তা বেরিয়েছে তা সামনের লোকের জন্য কঠোর বা কর্কশ হয়ে উঠেছে। ছেলেদের পড়াশোনা আর গেরস্থালি সামলাতে গিয়ে কোনোদিন মাথাই ঘামায়নি কিভাবে ইলেক্ট্রিসিটি বিল, ট্যাক্সের বিল, ব্যাঙ্কের কাজ, পোস্ট অফিসের কাজ ইত্যাদি সামলাতে হয়। রেশন কার্ড, ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, প্যান কার্ড কিভাবে বা কোথায় গেলে পাওয়া যাবে তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথা ব্যাথা নেই। টিভি, ফ্রিজ, এসি এসবের জন্যই বা কাকে খবর দিতে হবে সেসবও ভাবতে যায়নি কখনো। আসলে নারায়ণ বা তার ছেলেরাই সেসব করে দিয়েছে। যথেষ্ট শিক্ষা থাকা সত্ত্বেও মোবাইল ফোন বা সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করার প্রতি কোনো রকম ইচ্ছে প্রকাশও করেনি। আসলে সময়ের সাথে সাথে নিজেকে উপযোগী করে তোলেনি। আর তাই অন্যান্য ছিদ্রান্নেষী মানুষদের কটূক্তি হজম করেছে। তার হয়তো এই নিয়ে কোনো কিছু যায় আসেনা, কিন্তু তাঁকে যারা ভালোবাসে তাঁদের যে যায় আসে সেটা বুঝতে চায়নি কখনো।

এতক্ষনে নিশ্চয়ই সবাই বুঝে গেছেন আমি কার কথা বলছি। বা তার সাথে আমার কি পরিচয়। হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছেন, তিনি আমার মা। জন্মেরও আট মাস আগে থেকে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। ছোটবেলা থেকেই আমি শুনে এসেছি আমি নাকি মায়ের দলে আর দাদা নাকি বাবার দলে আর ভাই নিউট্রাল। ছোটবেলায় সব বাচ্চা দের যেমন মায়ের সাথে যোগাযোগ থাকে আমারও তাই ছিল। কিন্তু তাও একটা আলাদা ব্যাপার ছিল সেই সম্পর্কে। তাই ভাইয়ের জন্মের সময় মা যখন হাসপাতালে ভর্তি ছিল আমি কিছু খেতাম না, ইলেক্ট্রোল এর জল ছিল মূল খাদ্য। একা একা কাঁদতাম। বয়স কম থাকায় রোববার ছাড়া হাসপাতালে ঢোকার অনুমতি ছিল না, তাই প্রথম যেদিন গেলাম সেদিন লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে মায়ের বেডেই শুয়ে গেলাম। আর তারপর বাচ্চাদের রাখার ছোট দোলনাটাতে। ভাইকে পেয়ে আমার আনন্দ ছিল সবচেয়ে বেশি। আবার তার সাথেই যুক্ত হলো মাকে হারিয়ে ফেলার ভয়। তাই ভাই একপাশে আমি এক পাশে মধ্যিখানে মা। মায়ের গায়ের ওপর একটা পা তুলে দিয়ে শোয়ার মজাটাই আলাদা ছিল। মায়ের সাথে স্কুলে যাওয়া, পড়তে যাওয়া, মায়ের গানের ক্লাসেও মায়ের সাথে যাওয়া, গোলপার্কের কালচারাল ইনস্টিটিউটে আঁকা শিখতে যাওয়া, সব জায়গাতেই মা। বাড়ির কাজে মাকে সাহায্য করতে পারলে খুব ভালো লাগতো। টিফিনের পয়সা থেকে কিছু টাকা জমিয়ে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে ২ টাকা দামের কাঁচের দুল, কিংবা পুজোর সময় পাড়ার দোকান থেকে প্রথম লিপস্টিক কিনে দেওয়া, জোর করে সালোয়ার কিনতে বাধ্য করার মধ্যে একটা সীমাহীন আনন্দ ছিল। হাঁটতে না পারার সময় তিন ভাই মিলেই পালা করে হুইল চেয়ারে করে ঠাকুর দেখানোর মধ্যে কোনো ক্লান্তি ছিল না। মনের সব কিছু উজাড় করে কোনোদিন কিছু বলতে না পারলেও চুপচাপ পাশে বসে থেকে বা রাত্রে পাশে শুয়ে থেকেই মনে হতো আমি সম্পূর্ণ। এরপর মিশনের হোস্টেলে চলে গেলাম। সেখানেও তপন মহারাজ বলতেন - "এই চাটুজ্জে হলো গিয়ে ওর মায়ের ছেলে"। আসতে আসতে বড় হলাম। প্রাকৃতিক নিয়মেই ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ালাম। মায়ের মনে হলো আমি বোধহয় মাকে ভুলে যাচ্ছি। কিছুতেই বোঝাতে পারলাম না আমার মনের কথা গুলো। আর বয়ঃসন্ধির সময়ে আসতে আসতে তৈরী হলো দূরত্ব। কিন্তু কোনো দিনই চাইনি মাকে হারাতে। ভালোবাসার মানুষটার মধ্যেও মায়ের ছায়া খুঁজতে চেয়েছি। নিজের আইডেন্টিটি তৈরী করেই সম্পর্কে থাকতে চেয়েছি সবাইকে নিয়ে, একা একা নয়। যখন তা সম্ভব হয়নি বেড়িয়ে এসেছি সম্পর্ক থেকে। আসলে ছোটবেলায় বাবা মার মধ্যে ঝগড়া হলে কষ্ট হতো, খারাপ লাগতো, মায়ের কষ্ট করে বেঁচে থাকার কথা শুনে কান্না পেতো, তাই চাইনি আমার জীবনেও এরম কিছু ঘটুক। প্রথম বার চাকরি পেয়ে মায়ের হাতে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলাম নিজের মতো খরচ করো। কিন্তু সেটাও বাবা কে দিয়ে দিতে বলে। কারণ মার খরচ করবার কিছু নেই তো। বাবার পকেট থেকে কোনো দিনও একটা টাকাও নিতে দেখিনি। মাঝে মাঝে মনে হতো এতো নিরাসক্ত কেন? কেন কোনো চাহিদা নেই জীবনে? কেন নিজের পায়ে দাঁড়াবার জন্য ভাবলো না? তাই আগের বছর যখন নিজে মুখে বলল এবারে হায়দ্রাবাদ থেকে ফেরার পর আমায় একটা সোনার গয়না কিনে দিস তো সেদিন মনে হলো আমার চাকরি করা সার্থক। ছোটবেলার বেশিরভাগটাই হোস্টেলে কাটানো আর তার পর কলেজ অফিস ফিল্মের কাজে জড়িয়ে থাকায় মায়ের সাথে কাটানো সময় ছিল খুবই কম। তাই ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে মাকে আমার সাথে হায়দ্রাবাদে নিয়ে আসি। মা প্রথম বার প্লেন চড়ে। সে এক মিষ্টি অভিজ্ঞতা। তারপর একসাথে সিনেমা দেখি, রেস্ট্ররেন্টে খাই, বাড়িতে একসাথে রান্না করি, ঘর পরিষ্কার করি, একদিনের জন্য গোয়া যাই একটা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের প্রাইজ আনতে। মানে ওই সময়টা শুধু আমি আর মা, মা আর আমি। হায়দ্রাবাদে কাটানো ওই কটা দিনের স্মৃতি আমার সেরা কিছু স্মৃতির মধ্যে অন্যতম।

অনেক কে বলতে শুনি তাদের মা নাকি তাদের বন্ধু, সব কিছু শেয়ার করতে পারে। জড়িয়ে ধরে আহ্লাদীপনা করতে পারে। কিন্তু কেন জানি না, আমি সেভাবে ভাবতে পারিনি কোনোদিন। আমার কাছে মা হলো খুব আদরের, ভালোবাসার, সম্মানের আর সর্বোপরি শ্রদ্ধার জায়গা। তাই সেখানে আমি কোনোদিনও বন্ধু হতে পারিনি। বরাবরের চাপা স্বভাবের হওয়ার কারণে কোনোদিনও মনের কথা গুলো বলতে পারিনি, কিন্তু বাড়ি ফিরে মায়ের খোঁজ করেছি। চুপচাপ কিছু না বলে পাশে বসে থেকেও মনে হয়েছে কত কথা বলা হলো। ভাই যখন মাকে জড়িয়ে ধরে গালের মধ্যে গালটা ঘষে বা নাকের সাথে নাক লাগিয়ে মজা করে আমার মনটা ভরে যায়। আমিও ওদের দুজন কে একসাথে জড়িয়ে ধরে আনন্দ পাই। কত লোক বলে একা একা থাকিস মায়ের জন্য মন খারাপ করেনা? আমি বলি না। কারণ আমি চোখ তা বন্ধ করলেই ওদের দেখতে পাই। সব সময় মনে হয় ওরা আমার চার পাশেই আছে, টিভি দেখছে, গল্প করছে, রান্না করছে, কথা বলছে। তাই আমার হায়দ্রাবাদের তিন কামরার ফ্ল্যাটে একা লাগে না। পুজোর দিন গুলো বা অন্যান্য দিন গুলো মা একা একা কিভাবে কাটাতো সেটা অনুধাবন করে মনের জোর পাই। মায়ের জন্য হয়তো সত্যিই কিছু করতে পারিনি, কিন্তু চেষ্টা করেছি। খুব ছোট বেলায় ঘুম থেকে উঠে একদিন যখন দেখলাম মা পেট ব্যাথায় কাতরাচ্ছে আমিও কাঁদতে শুরু করে দিয়েছিলাম, কারণ জানি না। গভীর ঘুমে থাকা কালীন আচমকা কে যে সেদিন ধাক্কা দিয়ে ডেকে দিয়েছিলো বুঝিনি, যেদিন মা প্রথম সিঁড়ি থেকে পরে গেলো। ২ লাফে ঘর থেকে ছাদের সিঁড়ি তে গিয়ে একা মাকে কোলে তুলে নিয়ে এসেছিলাম। আমার গায়ে এত শক্তি তার আগে জানতামই না। ২০০৯ সালে যেদিন আমাদের বন্ধু অরুনাংশু জলে ভেসে যায় সেদিন মাকে জড়িয়ে খুব কেঁদেছিলাম। আগের বছর হায়দ্রাবাদে একদিন সকালে যখন সন্দেশের মুখে শুনি ওর বৌদি পরে গিয়ে মিসক্যারেজ হয়ে গেছে সেদিনও মাকে জড়িয়ে কেঁদেছিলাম। ২০১৬ সালের ২রা আগস্ট সৌদি যাবার প্লেন ধরতে গেলে মা কেঁদে ফেলে, আমি অনেক কষ্ট করে সংযত ছিলাম। এখন রোজ রোজ হয়তো কথা হয়না। কি রান্না করলাম বা কি খাবার কিনে আনলাম তা বলা হয়না, শরীর খারাপের খোঁজও নেওয়া হয়না, কিন্তু আমি জানি আমার পাশে মা ছিল, আছে, থাকবে। কোনোদিন যেটা করিনি বা করতে পারিনি আজ সেটা এই লেখার মাধ্যমে বলতে চাই, মাকে জড়িয়ে ধরে বলতে চাই - "মা, তোমায় অন্তর থেকে ভালোবাসি, মুখে বলতে পারিনি কোনোদিন, চিন্তা করোনা, আমি আছি তোমার পাশে।"

©অনিরুদ্ধ চট্টোপাধ্যায়

 


চল স্কুলে যাই

- কিরণময় নন্দী


ওই শুভ আয় ছুটে আয়

দশটা বাজে ঘড়িতে

ডুব দিয়ে স্নান সেরে 

একসাথে চল স্কুলেতে।


স্কুল, সে তো বন্ধ ছমাস

জীবাণুর চোটে লণ্ডভণ্ড

ভুলে গেছি সেই আনন্দের দিন

ভুলে গেছি ভালো-মন্দ।


আরে, সে তো আমিও জানি

ভয়াবহ মহামারী

ওই দেখ ভোলা-নীলু স্কুলে যায়

কত ভাব দুজনায়,আর নেই আড়ি।


কি জানি, হঠাৎ কি হলো

সব কিছু ঠিকঠাক!

চল যায়, ডুব দিই পুকুরে

সোজা স্কুলের মাঠ।


আজ বেশ মজা হবে

দীনু-শোভা-নটু সব একসাথে

টিফিনেতে ভাত খেয়ে

কত খেলা স্কুলমাঠে।


ঠিক তাই, কত মজা

বহুদিন স্কুল ছাড়া

পড়া-লেখা-খেলাধুলা

আর খুশি বাঁধন হারা।


এই বিশু বল ভাই

কি এমন হলো বল না

ভাইরাস কোথা গেলো

আর তর সয় না।


টীকা নাকি ভ্যাকসিন

জানি না ঠিক কি নাম

সব দেহে দিয়ে দেবে

বেঁচে যাবে সব প্রাণ।


কি মজা-কি মজা

আবার আগের মতো

খেলাধূলা-পড়াশোনা

নিষেধ নেই, ঘুরে বেড়ায় যতো।


ঠিক ঠিক,ঠিক তাই

মেলা কথা হবে পরে

চল, দুমুঠো মুখে গুঁজে

স্কুল যাই ব্যাগ পিঠে করে।

 


ছন্দের রাজা

- জাকিরুল চৌধুরী 


ছন্দের রাজা ছাদির ভাই 

তাঁর তুলনা নাই, 

যাহার মাঝে দেখতে পাই

তিনি ছাদির ভাই। 

ছন্দ ভুবন ঘুরেন তিনি 

এইতো মোদের আশা, 

তাহার জন্য পাইনা খুঁজে 

মোর মুখের ভাষা। 

শূন্য দশকে মোরা পাইছি

ছাদির মতো কবি, 

যিনি ছন্দের দেশের রাজা

আঁকেন প্রতিচ্ছবি। 

ছন্দ নিয়ে করেন যিনি 

ছন্দে করেন খেলা, 

যিনি লিখেন সারাটা দিন 

লিখেন সারা বেলা। 

ছন্দের রাজা সবাই চিনে

ছাদির নামে কবি, 

যাকে নিয়ে সবাই মিলে 

আকেঁ সবাই ছবি। 

 


নতুন জীবন 

কলমে - কুহেলী রায়


সৌরাশিষ আমি পাহাড় ভালোবাসতাম, আর তুমি সমুদ্র, 

কতদিন আমি পাহাড় দেখি নি জানো। 


তুমি মিষ্টি ভালোবাসতে না বলে, 

আমি মিষ্টি ফ্রিজে বাসা বাধঁতে দিতাম না। 


তুমি বৃষ্টি ভালোবাসতে না, 

অথচ আমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসতাম। 


তুমি কবিতা লেখাকে বড্ডো ফালতু কাজ মনে করতে, 

আর আমি কবিতা না লিখে শান্তি পেতাম না। 


বিকেলে এসে তুমি বলতে আমি বড়ো ছেলেমানুষ, 

আমি ব্যস্ত হাতে খাবার দিতে দিতে মুচকি হাসতাম। 


তারপর কত মুহূর্ত বয়ে গেলো সৌরাশিষ, 

তোমার চোখে আমি ঘৃনিতো হোলাম। 


তুমি চলে গেলে যেদিন, 

বিশ্বাস -অবিশ্বাসের দোলায় দুলে গেলো জীবন। 


সেদিন তুমি আমায় অন্ধকারে ঠেলে দিলে, 

কবিতা আমায় আলোর দিশা দিলো। 


প্রাণহীন পাথর সরে গেলো, 

আমি জলের কাছে গেলাম। 


আমি আবার আমি হয়ে উঠলাম, 

পাহাড়ের গায়ে গায়ে কবিতা লিখে দিলাম। 


কুয়াশা মেখে পাহাড়কে জড়িয়ে ধরলাম, 

মনে হলো নতুন আমাকে পাহাড়ে বিলিয়ে দিলাম।


আমি হতে পারি

- রোজী নাথ


সহস্র বসন্ত দরজা আমি উদারতায় খুলে দিতে পারি

একটা চাঁদ মাখা প্রান্তরের জন্য।


রূপালী চাদরে মোড়া একফালি জোছনা যদি

সবিনয়ে এসে পড়ে আমার হৃদয়ের আঙ্গিনায়,

হাজার আলোকবর্ষ আমি অপেক্ষায় থাকতে পারি

রজনীগন্ধা সুখ মাখা সোনালী মিঠে রোদের আশায়।


ঘাট ডোবা একটানা বৃষ্টির রিমঝিম কবিতা শেষে যখন প্লাবন বসন্ত এই জলাধার ,

আমি মধুকর ডিঙাখানি ভিড়াই সেই বুকের পরিধিতে

যেখানে হাজার কোটি ফাগুন কাটিয়ে দিতে পারি

শিমুল পলাশের রং মেখে।


কোকিলের কুহু তানে সেই তেপান্তরের ক্লান্তিহীন পথিক আমি হতে পারি , শ্রাবণ যদি পথ দেখায়।


সেই দীঘল পাহাড়ের শেষ সীমানায় আসমুদ্র বছরের

পথ চলার প্রতিজ্ঞাবদ্ধ আমি হতে পারি তোমারই প্রতীক্ষায়।

 


সর্ব দোষে হর গৌরা

- প্রিয়া ব্যানার্জী


কালো মেয়েদের নাকি সাজার অধিকারও

নেই।কারণ সাজলেও নাকি তাদের আরও বাজে

লাগে।

বউ,প্রেমিকা, গার্লফ্রেন্ড সব কিছুতেই গায়ের

রং সাদা হওয়া চাই।

নাহলে সমাজে নাকি সম্মান থাকবে না।

পুরো দুনিয়া তেই এই প্রথা আর যাই হোক তোমায় গৌরবর্ণ হতে হবে তবেই তুমি সুন্দর।

ছেলে কালো হলে দোষ হয়না তখন বলা হয় সোনার আংটি বাঁকা হলেও মূল্যবান।


কালো রঙের প্রতি ঘেন্না ভেদ চিরোকালেরই রীতি আর  এই রীতি যুগে যুগে হয়ে আসছে।

আমি নিজে ছোট থেকেই শুনে আসছি আমি কালো মোটা, সাজলেও আমায় কুৎসিত লাগে। যথারীতি সকল অনুষ্ঠানেই ক্যামেরার সামনে আমি আসতে ভয় পেতাম, আসলে লজ্জা পেতাম।

কারন অনুষ্ঠান উৎসব শেষে সেই ছবি সকলে দেখে তার মাঝে কালো মেয়েটিকেই খুঁজে খুঁজে অপদস্থ করা হত কারন একটাই বাড়ির সকল গোরা রঙের ছেলে মেয়ের মাঝে একটাই কালো জন্মেছে।©প্রিয়া ব্যানার্জী

তখন শুধু মা বলতো না আমার মেয়ে খুব সুন্দর। আড়ালে কাঁদলেও খুশি হয়ে যেতাম মায়ের কথা টা শুনে থেকে।

 সোশ্যাল মিডিয়া বা গ্ল্যামার ওয়ার্ল্ড এর ক্ষেত্রেও একই বিষয় যদিও। সুন্দরী তুমি তখনই যদি তোমার চামড়া টা সাদা হয়।

আর সুন্দরীর বর্ণনাটা শুধুই গোরা রঙ আর মেদ হীন দেহ দিয়েই বিচার হয় এখনো। তবে যুগ বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি।

তার জন্যই এই আমার মতো ছোট থেকেই হেরে যাওয়া মন নিয়ে বড়ো হওয়া মানুষ, নতুন করে বাঁচার সাহস পায় যখন দেখে একজন প্লাস সাইজ হয়েও মেয়েটি বিখ্যাত মডেল।©প্রিয়া ব্যানার্জী


হ্যাঁ একটা সময় লজ্জা পেতাম ক্যামেরার সামনে আসতে কারন আমি মোটা কালো, কালো একেবারে বলা না গেলেও শ্যামবর্ণ।

তবে এখন আর সেই লজ্জা টা আসেনা।

রোগা মোটা সাদা কালো এই ইস্যু সর্বকালের তার মধ্যে যেটা দরকার সেটা হলো ইচ্ছেশক্তি এবং আত্মবিশ্বাস।

ছোট মেয়েটিকে যখন লোকে কালো মোটা বলতো সেই মেয়েটি যা শুনতো সেটাই মানতো বিশ্বাস করতো, এখন বয়েস বাড়ার সাথে বোধ শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, মেয়েটা নিজেকে নিজে আবিষ্কার করতে শিখেছে।


 লন্ডনের এক মডেল ইন্সটাগ্রামে সম্প্রতি নেটিজেনদের চর্চার মুখ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি কালো চামড়ার সেই মডেলের ছবি ডিলিট করেছে ইন্সটাগ্রাম। কারন দেখানো হয়েছে যে নগ্নতা এবং যৌন কার্যকলাপ থাকায় ডিলিট করা হয়েছে বলে জানানো হয়।


ব্রিটেনের এক প্লাস সাইজ মডেল নিকোলাস উইলিয়ামস। মূলত কালো চামড়ার ভারি চেহারার মডেল তাঁর ফটোশুটের অর্ধনগ্ন ছবি শেয়ার করেন। ছবিতে দেখা গিয়েছে শরীরের ওপরের অংশে মহিলা কিছুই পরে নেই হাত দিয়ে শরীর ঢেকে রয়েছেন। চোখ দুটি বন্ধ এবং মাথা পিছনের দিকে হেলানো।


 

এরকমই একটি ছবি খুব দ্রুতই সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি নিকোলাসের প্রশংসায় ফেটে পড়ে কমেন্ট। এমনকি ফটোগ্রাফার অ্যালেক্সান্ডার ক্যামেরনেরও প্রশংসা করতে থাকেন নেটিজেনরা।


কিন্তু এই ছবিকেই অশালীন তকমা দিয়ে ইন্সটাগ্রাম ডিলিট করে দেয়।

সেক্ষেত্রে নিকোলাস এরই বিরুদ্ধে লেখেন, কোটি কোটি রোগা এবং সাদা চামড়ার মহিলার নগ্ন ছবি প্রত্যেক দিন ইন্সটাগ্রামে খুঁজে পাওয়া যায়। কিন্তু একজন মোটা কালো চামড়ার মহিলা যখন নিজের চেহারাকে সাহসের সঙ্গে প্রকাশ্যে আনতে চায় তা তুলে নেওয়া হবে? তিনি এও জানান, এই ঘটনায় তিনি অবাক হয়েছেন। তাঁকে বাকরুদ্ধ করা হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেছেন।


এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইন্সটাগ্রামের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু হয়। একই প্ল্যাটফর্মের এরকম বিভাজনমূলক কাজকর্মের জন্য সমালোচনার ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়াতে।

তারপএ ইন্সটাগ্রাম গোটা বিষয়টি দেখে ক্ষমা চেয়েছে এই ঘটনার জন্য। এবং ওই ঘটনার পরের সপ্তাহেই  পুনরায় ওই ছবিকে পোস্ট করা হয়েছে এই প্ল্যাটফর্মে।

 এর থেকেই বোঝা যায় সাদা কালো রোগা মোটা সবের উর্ধে হলো আত্মবিশ্বাস।


যা আজ দরকার। সেই সমস্ত মেয়েদের যারা নিজেকে নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে।

 আমরা কেও কুৎসিত নোই। কুৎসিত হলো মন গুলো। মন এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করলেই সব সুন্দর দেখায়। 

নিজের গল্পের নায়িকা একবার নিজেকে ভেবেই দেখোনা কতটা আনন্দ আসে জীবনে....

(সমাপ্ত)

 


আমিময়

- পলি রহমান 


তোমার মন হাতড়ে যা পেলাম সে আমারি নিজের চির চেনা মন,

চোখের গভীরে আমারি ছায়ামূর্তি,অবিকল,, 

তোমার বুকে যে গন্ধ পেলাম নিমিষে 

সে আমারি নিজস্বতার গন্ধ, 

তোমার চুলে আমারি হাতের গত জনমের পেলব ছোঁয়া, 

কতকাল তুমি আমায় বয়ে বেড়াচ্ছো, হে পথিক??

আমি তোমার কত যুগের সাধনা, হে যোগী?? 

কত সহস্র বার তুমি আমায় নব নব রুপে গড়বে হে শিল্পী ??

আমিময় পৃথিবী কত যুগের সাধনায় গড়েছো, হে প্রেমিক ?? 



 


আজব দেশে

কলমে - সুজাতা চক্রবর্তী


গিয়েছিলাম আজব দেশে

উল্টো যেথায় সব, 

দিনের বেলা পেঁচা ডাকে, 

রাতে পাখির কলরব।


সূর্য সেথায় রাতে ওঠে,

দিনে চাঁদের বাহার,

অমাবস‍্যায় জ‍্যোৎস্না খেলে,

পূর্ণিমাতে আঁধার ।


আকাশ সেথা সবুজবরণ,

নীল যে গাছের পাতা ।

বর্ষাকালে লেপ-কম্বল,

শীতকালেতে ছাতা ।


মাছেরা সব উড়ে বেড়ায়

মেলে দিয়ে ডানা,

মাঝ পুকুরে সাঁতার শেখে

ঈগল পাখির ছানা ।


ইঁদুর দেখে বিড়াল ডড়ায়,

মশা দেখে হাতি;

চাষীরা সব কাপড় বোনে,

ফসল ফলায় তাঁতি।


স্কুলবাড়ি নেইকো সেথায়,

শুধুই খেলার মাঠ;

সবাই বলে 'খেল রে সোনা,

পড়িস নাকো পাঠ !"


দিব‍্যি ছিলাম সেই দেশেতেই

সদাই খেলার ধুম‍।

সব মজাটাই কেটে গেল,

যখন মা ভাঙালো ঘুম ।

 


পরিত্যক্ত পঙ্কিল মন

- পলি রহমান 


মনের দেয়ালের পলেস্তারা খসে পরছে, 

রঙটাও বিবর্ন হয়ে গ্যাছে অনেক দিন, 

বহুদিন সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলেনি এ ঘরে, 

একটা গুমোট গন্ধ ছেয়ে আছে পুরো ঘর জুড়ে, 

আলো নেই, বাতাস নেই, নেই কারো পদচারণা, 

ঘর ময় ধুলো, এখানে সেখানে ঝুল,,

বন্ধ জানালার ভাঙা ফাঁকা দিয়ে যেটুকু বাতাস আসে 

দুলে ওঠে কবেকার পুরনো ক্যালেন্ডার,

যা কিছু মূল্যবান ছিলো, কেউ একজন 

সব নিয়ে চলে গ্যাছে আমারি সমুখ দিয়ে, 

মন আজ পরিত্যক্ত পঙ্কিল, 

এ মন কাউকে দেয়া যায় না,, 

এ মন নিজের কাছেও রাখা যায় না,, 

এ মন দীর্ঘশ্বাস ছাড়া কিছুই দেয় না,,

 


আজও অপেক্ষায়

- সিক্তা পাল


 আজও কি আমায় খুঁজছো তুমি ?

মনে পড়ছে আমার কথা ?

যে আমি অপেক্ষায় আছি—

তোমার পথ চেয়ে !

কবে তুমি নেবে আমায় একান্ত 

আপন করে? কত বসন্ত পার

 হয়ে গেছে, তোমার অপেক্ষায় 

 থাকতে থাকতে কখন যেন

 আমার চুলগুলো শ্বেতবর্ণ

 হয়ে গেছে। আমার সুন্দর

 দাঁতগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে,কিছু 

বিদায় নিয়েছে। জানো আজ আমি 

হাসি না! কেন জানি ইচ্ছে কবে না। 

তুমি কি আমায় চিনতে পারবে ?

যে রূপের মোহে ভোমরার

 মতো, আমার কাছে এসেছিলে!

 তোমার অপেক্ষায় দিন —

 গুনতে গুনতে কখন যেন,

 আমায় ছেড়ে চলে গেছে সেই রূপ!

 তুমি আমার চোখে সেই ত্রিশ

 বছর আগের চেহারাতেই আছো।

তুমি যে চির নবীন চির সুন্দর!

 বড়োভয় হয় যদি আর —

দেখা না হয় যাবার আগে!

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget