আগস্ট 2020

 


প্রতিবিম্ব

- অর্ণব মুখার্জী


ঘুম নেই দুচোখ জুড়ে,

বিশ্বাসের ভয়ঙ্কর হুঙ্কার,

আর একবার ক্ষত মুড়ে,

পুরানো গ্লুকোমার অভিসার।


আবার কোন সুদুর পথে,

মৃত ও জীবনের জড়তায়,

ফুরিয়ে যাওয়া মিছিলের শোকে,

নেশাতুর জনতা বুঁদ নেশায়,


বেহায়া মনের আষাড়ে রাত,

নিশিথে জাগে নির্ভেজাল প্রতিবিম্ব,

সম্পর্কের শিড়দাঁড়ার ঠান্ডা স্রোত,

অবিশ্বাসীরা নবজন্মের রুপে হতবম্ব,


রাত্রি যাপনের তীব্র দহন,

রহস‍্যের যবনিকা আপন নিভৃতে;

দিনান্তে ধুসর মেঘের কাঁদন,

শান্ত শরশয‍্যা রুগ্ন তরুনাস্থিতে,


বিবস্ত্র কঙ্কালের ভালোবাসার পাশায়,

আরও একবার নিরস্ত্র সৈনিক,

বধির দুচোখে প্রবাদত্তম হতাশায়,

ঘুমন্ত নদীতীরে মরা শালিক।।

 

ব‍্যারাকপুর

 


একটি রাতের ইতিকথা

- অঞ্জলী দাশ গুপ্ত


চোখের তারায় নিমজ্জিত হয়েছিল বহু আকাঙ্খিত  ভালোবাসা। যার রূপ রস গন্ধ সমস্ত কিছু মুহূর্তের মধ্যে তোলপাড় করে দিত। সর্ব শরীর জুড়ে শুধু আগুনের লেলিহান শিখা। চাতকের মত যেন নগ্ন শরীর নিয়ে লুটপাট হতে থাকে।  বিধাতার দেওয়া সমস্ত সৌন্দর্য যেন কয়েক মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যায়। নগ্ন অবস্থায় পড়ে থাকে " রক্ত ও কাদা " মাখা কেবল যেন একটা " মাংস পিন্ড "। 

   

   রাহু যেমন চন্দ্র কে গ্রাস করে , ঠিক তেমনি গ্রহণ লেগেছিল জীবনে। চাঁদের গায়ের সেই দাগ যেন আজ সর্ব শরীর জুড়ে বহন করছি। " অসম্ভব যন্ত্রণা আর জ্বালা " , সেই কষ্ট শোনবার বা বোঝবার মত কোনো লোক  নেই। নিজের আজ কোনো নাম নেই , নাই বা আছে কোনো ঠিকানা। নিস্তব্ধ রাত আর নিস্তব্ধ রাস্তা প্রতিদিন একটা একটা করে গল্প লিখতো আমার শরীরে। 


        রাত হতেই একটা একটা করে গাড়ি থামতো, আর দরকষাকষি শুরু হতো। সারারাত সেই পশুরা ফুটিয়ে তুলতো "নকশিকাঁথা" । আর আল্পনা হয়ে সজ্জিত হত অত্যাচারের  বহু চিহ্ন....


ওরা কেন পরাধীন থাকছে

- কিরণময় নন্দী


ওই দেখো সাদা মেঘ নীলাকাশে

তিনরঙা পতাকা উড়ছে

দূরে দেখো ইটভাটা

কালো ধুঁয়া ঘুরছে।


ছোটো শিশু ফুল হাতে

ছুটে চলে ইস্কুলে

ওই কিশোর খালি গায়ে

মাটি কাটে ইটভাটাতে।


শত শত ছেলেমেয়ে স্কুলে স্কুলে

মেতে ওঠে গান গেয়ে

ওই দেখো চাষি চলে মাঠেতে

সাথে ছেলে হাঁটে গরু লয়ে।


ওই দেখো "নেতাজী" সেজে

প্রভাতফেরীতে হাঁটছে

কালুকাকার চায়ের দোকানে

ইস্কুলছুট বিশু কাপ-প্লেট মাজছে।


মন খুশি আজকের শুভদিনে

তবু মন কাঁদছে

ওরাও তো মুক্তি চায়

ওরা কেন পরাধীন থাকছে?

 


আমার কান্নার আওয়াজ ভীষণ ভয়ঙ্কর

- কিরণময় নন্দী


আমার কষ্ট হয়, পাঁচ বছরের প্রেম শেষ হয় শুধু ভালো চাকরি না পাবার মেকি অজুহাতে....

আমার কষ্ট হয়, বোনের বিয়েতে রিটায়ার্ড বাবার হাতে কিছু টাকা তুলে দিতে না পেরে....

আমার কষ্ট হয়, মায়ের ভালো শাড়ি থাকা না সত্ত্বেও, অভিযোগহীনভাবে হাসিমুখে সব মেনে নেওয়া দেখে....

আমার কষ্ট হয়, ভীড় গাড়িতে আমার বয়েসি কিংবা জ্যেঠু, মেসো, কাকার মতো আর এক পুরুষমানুষের নারীদের শরীরে হাত দেওয়া দেখে...

আমার কষ্ট হয়,উচ্চশিক্ষায় উচ্চপদের মানুষের গিভ এন্ড টেক পলিসির নোংরা লিপ্সা দেখে....

আমার কষ্ট হয়,বন্ধুর বিপদে ঝাঁপিয়ে পরেও,ফাঁকা মানিব্যাগের চেহারা দেখে...

আমার কষ্ট হয়,ন্যূনতম স্বার্থের কথা না ভেবে পাড়ার বোনের পড়াশোনাতে একটু হেল্প করে,নোংরা প্রতিবেশীদের কটূক্তি শুনতে...

আমারও ভীষণ কষ্ট হয়, আমার প্রাক্তনীর সাথে হঠাৎ দেখার পরেও, বেকারত্বের খোঁচা শুনতে....

আমি পুরুষ, আমি কষ্ট পাই, চিৎকার করে কাঁদি না, সকলের অলক্ষ্যে আমার কান্নার আওয়াজ ভীষণ ভয়ঙ্কর.......

 


তোমার মৃত্যু আত্মবলিদান

- কিরণময় নন্দী


তোমার চোখে বিদ্রোহের আগুন। তোমার চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন। তোমার চোখে মুক্তির পথ। তুমি স্বাধীনতার লড়াইয়ে মগ্ন। 


তুমি কিশোর বীর। তুমি সংগ্রামের পথ। তুমি যুবকের বুকে আন্দোলনের ঢেউ। তোমার চিত্তে স্বাধীনতার শপথ।


তুমি শাসকের ত্রাস। তুমি ভারতবাসীর গর্ব। তোমার কণ্ঠে দেশমাতৃকার বন্দনা। তোমার চোখে স্বাধীনতার স্বর্গ।


তোমার শরীর সাধারণ। দীপ্ত তোমার আঁখি। তোমার অন্তঃকরণে প্রতিবাদের অগ্নিকুন্ড। তোমার কণ্ঠে," একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি।"


তোমার মৃত্যু আত্মবলিদান। হৃদয় নাড়িয়ে শৃঙ্খলমোচনের শপথ। তোমায় ত্যাগ দেশের জন্য। লড়াই বিপ্লবের পথ।


অভিমানী অপেক্ষা

- শৈলেন মন্ডল


তোমার অভিমানের মতো আকাশটাও বেশ অনেকটাই মুখ ভার করে আছে।


একপশলা বৃষ্টি এলেও আসতে পারে। 

সলাজ জীর্ণ আঁখিপাতের কাজলটাও ভালো করে পরে নিয়েছি।

 

অব্যক্ত গহীন মনের যন্ত্রনাটাও আবার তীব্র আকার নিয়েছে। রক্তক্ষরণের স্রোতটাও কেমন উন্মাদের মতো বয়েই চলেছে।


শরতের আকাশে কতো আদর মাখা মেঘ ভাসে আবার চোখের সামনে দিয়েও ভেসে ভেসে যায়। 


তোমার আমার স্বপ্নমাখা কতোই না রঙিন ছিল,আজ কেমন বড়ো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। 


ঝুল বারান্দায় গিয়ে আজও কেমন পথ চেয়ে থাকি। তোমার আসার আর সময় হোলো না!


স্মৃতির বিষন্নতায় বিভোর হয়ে থাকা মন আজ সুদূর নীল আকাশে আর ডানা মেলে না। নভনীল আকাশ গগণে শুধুই শূণ্যতা আর শূণ্যতা।


কালো মেঘের কানাগলি বেয়ে আসে অমোঘ বিদ্যুতের ঝলকানি। আগের মতো দুরুদুরু ভয়ে কাতর হয়ে তোমার বুকে লেপ্টে যেতে পারি না।


কেমন যেন নিশ্চয়তায় নিরাপত্তার অভাবে চমকে উঠি। 


আজও  অনুভব করি তোমার উষ্ণ রোমশ বুকে লেপ্টে যাওয়া পরম আলিঙ্গনের সংগোপন। 


এখন আর খেতে ইচ্ছে করে না আর রাতে ঘুম আসে না। 


প্রচন্ড ঘুম কেথায় যেন হারিয়ে গেছে। আধো জাগা ঘুমের মাঝেও শুধু তোমায় দেখতে পাই।


তোমার ছবিটা রঙিন বায়োস্কোপের মতো দেখি শুধু দেখি। ঠিক যেন লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির অবয়ব মোনালিসা। 


তোমায় ভাবনার অবসরে বুকটা কেমন যেন ধড়পড় করে আর মাঝে মাঝে খুব দীর্ঘ  নিঃশ্বাস পড়ে। শরীরটা কেমন অস্হির অস্হির মনে হয়। 


এসব শুনলে তুমি নিশ্চয় বলতে বদ্ধ পাগল  আমি।


দেখো, একদিন হয়তো সবকিছুই ওভারকাম করবো। অপেক্ষার পর আবারও তুমি আসবে আবারও তোমায় বলবে ভালবাসি ভালবেসে।


২৪.০৮.২০২০

 

পুকুর পাড়

- রহমান আলী


ভরদুপুরে পুকুর পাড়ে,

স্নিগ্ধ বাতাস আমায় ডাকে;

সবুজ মাঠে প্রাণের সুরে কহে,

ওহে ছোকড়া একটু  সাড়া দে!

দেখ না এসে আকাশ-নীচে,

কলার-চামর দুলছে কেমনে;

বায়ু বহে আপনবেগে দক্ষিণে।


সময় কাটে উদাস মনে,

তাই গেছিনু পুকুর ধারে!

পবন কথার সাড়া দিয়ে।

শষ্য  ভরা  সবুজ  মাঠে,

চোখ-জুড়ে যায় প্রাণেচ্ছ্বাসে।

সবুজ তো নয়,শ্যামবনানী!

ভূবন যেন দিচ্ছে সবুজ হাসি।


পুকুর ধারে সবুজ ঘাসে,

গোরু-ছাগল খাচ্ছে সুখে;

ওদের আছে যত, দ্বন্দ্ব ভুলে।

পুকুর মালিক আসছে তেড়ে,

ওসব কেন চড়ছে পাড়ে!

বাঁধ  ভাঙে যে  পা'ঘাতে।।

মাছ বেরোবে পাড় ভেঙে!

হব কি সর্বহারা সর্বনাশে?


নয়ন তুলি আকাশ পানে,

চকচকে চক করছে ব‌্যোমে;

বায়ু-ভেলায় খন্ড মেঘে ভাসে,

প্রতিযোগে এদিক-ওদিক উবে।

তারারা সব ছুটির আপন দেশে,

সুখ  সুখের‌ই  স্বর্গদেশে  ঘুমে।

নীলাকাশের শূন্য দেশে ঐ ভূবনে,

বিশ্ব-প্রদীপ জ্বলছে আপন তেজে।

 

ও পতাকায় ঢাকা

- কিরণময় নন্দী


মেল ট্রেন ছুটছে জোরে

আঁকাবাঁকা রেলপথ ধরে

রাজধানীর স্নিগ্ধ মাটি ছোঁবে

পনেরোই আগস্টের কাকভোরে।


তখন ভীষণ গভীর রাত

চিকেন-রুটিই ডিনার শেষে

অভিজাত স্কুলের একঝাঁক ছেলেমেয়ে

হাসি-ঠাট্টায় উঠেছে মেতে।


ঝরঝরে ইংরেজি বলে ওরা

কৃতির সুযোগে করেছে বিদেশ ভ্রমণ

আগামীকালের "ইন্ডিপেন্ডেন্স ডে"সেলিব্রেশনে

ওরা পেয়েছে আমন্ত্রণ।


ওরা ভীষণ খুশি

ভীষণ খুশি স্কুল-আত্মীয় পরিজন

নীল আকাশের বুকে উড়বে তিনরঙা পতাকা

ওদের হৃদয়জুড়ে ভিন্ন শিহরণ।


দুইঘন্টার বিলম্ব রেলপথে

ভিড়লো না ট্রেন কাকভোরে

নিজামুদ্দিন হয়ে সেন্ট্রাল যেতে

ঘড়ি তখন সাড়ে ছ'টার ঘরে।


ব্যস্ত যাত্রী হুড়মুড়িয়ে ছোটে

"স্বাধীনতার দিনে" ছোটে কুলি

স্টেশন জুড়ে দেশাত্ববোধক গান বাজে

দশের বালক ফেরি করে,মুখে মিষ্টি বুলি।


সেই চেনা ছবি 

কোলে শিশু বাটি হাতে মা

বিবর্ণ শাড়িতে অসহায় মুখ

পোড়া পেট হয়তো কথা শোনে না।


হঠাৎ নিদারুন আর্তনাদ

ফেরি-করা কিশোর রক্তেমাখা

শুয়েশুয়ে অসহ্য চিৎকার

বিক্রির পতাকা ওর গায়েই পড়েছে ঢাকা!


এতটুকু জল নিয়ে আসেনা কেউ

শুধু দেখে চলে যায়

ব্যস্ত সবাই সেলিব্রেশনে 

ভারতমাতার সন্তান ভুমিতে গড়ায়।


কেউ ভাবে পুলিশি ঝামেলা

ভাবে কেউ হয়তো বা নিচু জাত

কেউ মোবাইলে ছবি তোলে

এগিয়ে আসে না কোনো "ভারতবাসির হাত।"


দলবেঁধে চলে গেলো ওরা

নামকরা ইস্কুলের ছেলেমেয়ে

ওরা ঝরঝরে ইংরিজি বলে

ওরা ব্যথিত নয় "সমাজ" নিয়ে।


ওরা উঠবে মেতে সেলিব্রেশনে

সুরেলা কণ্ঠে গাইবে দেশের গান

রক্তমাখা পতাকায় ঢাকা কিশোরের দেহ

মেকি মানবিকতায় চলে গেলো প্রাণ।

 

স্রোতের টানে

- শৈলেন মন্ডল


প্রতি মুহুর্তে মিশে যাচ্ছো ভালবাসা নামক অগোছালো উন্মাদনায় ভরা এক আবেশী সায়াহ্নে।


ডুবে যাচ্ছো মনের অতল অবয়বে এক অচীনপুরের গহীন নিকষ কালো আঁধারে।


তৃষ্ণার্ত হৃদয় পান করে সিক্ত হতে চায় পরম তৃপ্তি ভরে এক চরম অাস্বাদের অনুপানের কামনায়।


ভালোবাসার অমোঘ টানে নীল যমুনায় তলিয়ে যাচ্ছো কূল ছেড়ে দূরে আরও দূরে।


সাঁতার জানো না তাই অনুশোচনায় মরছো ভালবাসার তরীর নোঙর ছোঁয়ার কামনায়।


প্রেম স্রোতের বিপরীতে চলে যেতে চেয়ে আটকে যাও বারে বারে। 


না পারো ফেলে আসা কূলে ফিরতে আর না পারছো অপর কূলে অবস্হান করতে। 


চরম দোটানায় আটকে যায় মন তাই আকন্ঠ পান নীল যমুনার জল।


নতুন ভালবাসার কোলে আশ্রয় ও নিতে চেয়েছো বার বার প্রতিবার। 


নীল যমুনা তোমায় কোনোদিন কূলে ফেরাতে চায় না আর। 


সেও চায় তোমার তনুমন সিক্ত করে পরম আবেশ দিয়ে ভালবাসায় ডুবিয়ে দিতে। 


ডুবে থাকো ভালবাসায় আজীবন নীল যমুনার জলে আর ভরে যাক আবেগী হৃদয়ের কানায় কানায়।


১৩/০৮/২০২০

 

মিথ্যে প্রেম

- সুগত ব্যানার্জী

     

দেখেছিলাম তোমায় ,

ওই মায়াবী নীল আলোয়,

প্রথম দেখাতে লেগেছিলো ভালো,

মিশে গিয়েছিলাম সাদায় আর কালোয়।


তারপরে হটাৎ দেখা

পাড়ার পুজো বাড়িতে―

তুমি এসেছিলে হলুদ পাঞ্জাবিতে,

আর আমি লাল শাড়িতে।

তুমি জানিয়েছিলে তোমার ভালোবাসা,

করেছিলে  প্রেমনিবেদন  সবারই সামনে,

সেদিন হতে রয়ে গেছো তুমি,

বসে গেছো আমার মননে।


আমিও  বেসেছিলাম ভালো,

তোমার মুগ্ধ নয়ন হয়েছিলো আলো,

তুমি প্রশ্ন করেছিলে ―

প্রিয়তমা ,আমায় কতদিন বাসবে ভালো ?

আমিও মুগ্ধ তখন,

বলেছিলাম "সারাজীবন"― 

সেইদিন গুলো আজ হারিয়ে গেলো,

এখন ভাবি ,কেন হয়না আমার মরণ ?


ভালোবাসার  অজুহাতে তুমি,

স্পর্শ করেছো শরীর বহুবার ,

বাস্তব টা  বুঝলাম যখন ,

কেবল ই করেছি হাহাকার ।

না,তোমার আত্মজ মুখ দেখেনি পৃথিবীর ,

বাধ্য করেছো করাতে এবরশন –

আচ্ছা ,মা আর শিশুর,

এত সহজে হয় কি সেপারেশন ?


আজও ভেবে চলেছি আমি -

তোমার প্রেমের নাটক হয়েছে স্পষ্ট ,

হয়তো বা আবার তুমি -

করতে চলেছো দুটো জীবন নষ্ট।

 

একলা জীবন

- শৈলেন মন্ডল


নারী তোমার ভাগ্য দেখো.........


জন্মের আগে আঁতুড় ঘরে।

সেখানেও তুমি একা,অশেষ যন্ত্রনা সহ্য করে রইলে পৃথিবীর আলো দেখার অপেক্ষায়। 


পৃথিবীর আলো দেখার জন্য জন্ম নিলেও তুমি একা।


অাস্তে অাস্তে মা পরিচয় ঘটালো বাবার সাথে তথা সারা পৃথিবীর সাথে তাও তুমি একা।


তারপর বাবার পরিচয় নিয়ে বড় হলে,সবাইকে কত আপনজন মনে হলো।


বড় হয়ে বিয়ে করে যেতে হলো স্বামীর বাড়ী একা। 


সেখানে সব আপনজনদের ছেড়ে গেলে একা।


নতুন জীবনে নতুন জায়গায় নতুনভাবে মহাসংগ্রামের পথে তুমি একা।


স্বামীর বাড়িতে সবাইকে আপন করতে সেই তুমি একা।


সংসার সংগ্রামে জীবনে মরণে কর্তব্যে প্রসব যন্ত্রনায় ব্যথা বেদনায় সবেতেই তুমি একা।


সন্তান ধারন লালন পালন সবেতেই অপরিসীম ভূমিকা পালনে একাই থেকে গেলে।


আবার শেষ বয়সে জীবন অতিবাহিত করার জন্য সন্তানদের ওপর নির্ভরশীলতায়, সেখানেও একা।


যদি তোমার কপালগুনে শেষ ঠাঁই বৃদ্ধাশ্রমে হয়, সেখানেও তোমার ঘর সংসার সন্তান সন্ততি সব ভূলে একাই থাকতে হয়।


সবকিছুই মনে না নিতে পারলেও মানিয়ে নিতে হয় সেই একাকেই।


সব শেষে সবমায়া কাটিয়ে যখন না ফেরার দেশে পাড়ি দিতে হয় সেখানেও তোমার সাথে কেউ থাকে না।

সবখানেই শুধু একা আর একা।


২২.০৮.২০২০

 

অসমাপ্ত আত্মজীবনীর নেপথ্যের কথা

- ডা. ফারহানা মোবিন

যুগে যুগে কিছু মানুষ পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করেন যে মানুষগুলো তাদের কর্মগুণে বেঁচে থাকা অবস্থায় হয়ে ওঠেছেন জীবন্ত কিংবদন্তী এমনই কিছু বিশাল বটবৃক্ষ হলেন বাংলা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, বীর নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা, মমতাময়ী জগত বিখ্যাত নারী মাদার তেরেসা, অমর বিপ্লবী নেতা চে গুয়েভারা, আমেরিকার প্রয়াত প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন প্রমুখ। যুগে যুগে পৃথিবীতে এই মানুষগুলোর কর্মগুণ, নেতৃত্ব, মানুষকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করেছে। এই মানুষগুলোর জীবন-যাপন পদ্ধতি, তাঁদের আদর্শ আমাদের জন্য হয়ে উঠেছে আলোর মশাল। 

আমাদের বাংলাদেশের জন্য এমনই একজন আলোর মশাল হলেন জাতির জনক বীর নেতা, সংগঠক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যে মানুষটি পৃথিবীতে জন্ম না নিলে পৃথিবীর ইতিহাসে লাল সবুজ এর পতাকার জন্ম হতোনা। আমরা পশ্চিম পাকিস্তানের দাস হয়েই থাকতাম। আমরা কোনও দিন মাথা উঁচু করে সার্বভৌম দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতামনা। 

আমাদের বীর নেতা, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তিনি জন্ম গ্রহণ করেন ১৯২০ সালে। কলকাতা বিশ^বিদ্যালয় থেকে বি.এ এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে আইন বিভাগে লেখাপড়া করেন। 

১৯৪৯ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম নেতা তিনি। তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্বে ১৯৭০ সালের জাতীয় ও প্রাদেশিক নির্বাচনে তাঁর রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচিত হয়। এই অর্জন ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্রের জন্মের জন্য অন্যতম মাইলফলক।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন কিংবদন্তী নেতা, একজন বড় মাপের সংগঠক, একজন সুবক্তা। লেখালেখিতেও  তিনি ছিলেন ভীষণ পারদর্শী। তাঁর লেখা বই “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” শুধু মাত্র বই নয় জাতির দিক নির্দেশনার এক জীবন্ত দলিল।

২০০৪ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য সন্তান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তাঁর পিতার লেখা চারটি খাতা এসে পৌঁছে। খাতাগুলোর পৃষ্ঠা জুড়ে সময়ের বিবর্তন অক্ষরগুলো প্রায়ই অস্পষ্ট, লালচে হয়ে যাওয়া পাতা। পিতার প্রিয় সন্তান মাননীয় শেখ হাসিনা মুহূর্তেই তাঁর পিতার হাতের লেখাগুলো চিনে ফেললেন। খাতা চারটা হাতে নিয়ে বাধভাঙ্গা কান্না আবেগ উনাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। 

ছোট বোন শেখ রেহানাকে খাতাগুলো দেখালেন। পাহাড় সম শোক, পরিবারকে হারানের ব্যথা অশুধারা হয়ে ঝরতে থাকলো দুই বোনের চোখ দিয়ে। খাতা চারটি ছিল বঙ্গবন্ধুর লেখা আত্মজীবনী। ১৯৬৭ সালের মাঝের দিকে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বন্দী থাকাকালীন সময়ে তাঁর লেখা তিনি লিখে শেষ করতে পারেননি। লেখাগুলো শুধু মাত্র লেখা নয় সেসব ছিল একজন মহীরুহের প্রবল দেশ প্রেম, মানব প্রেম আর চেতনার আলোয় আলোকিত এক প্রামাণ্য চিত্র। যে প্রামাণ্য চিত্র লেখা হয়েছে প্রবল দেশপ্রেম, মানব প্রেম, দেশের মানুষকে পশ্চিম পাকিস্তানীদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করার জন্য শপথ, খাতা চারটির পাতাগুলো ছিল একেবারেই জরাজীর্ণ। একটু আঘাত লাগলেই ছিড়ে যাবে এমন করুন অবস্থা। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ২০০৪ সালের ২১শেআগস্ট (হত্যার উদ্দেশ্যে) বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামীলীগের এক সমাবেশে চালানো হয় গ্রেনেড হামলা, হামলায় আওয়ামীলীগের সভানেত্রী আইভী রহমান সহ মোট চব্বিশজন মারা যান। সৌভাগ্যবশত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেঁচে যান। তিনি চোখের সামনে চব্বিশজন মানুষকে হারানের শোকে কাতর হয়ে পড়েন। দুঃখ কষ্টের সাগরে তিনি যখন ভাসছিলেন ঠিক তখনই এই চারটা খাতা উনার হাতে এসে পৌছে। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এক ফুফাতো ভই সেই চারটা খাতা উনাকে দেয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আরেক ফুফাতো ভাই হলেন শেখ ফজলুল হক মনি। তিনি ছিলেন বাংলার বাণীর সম্পাদক। উনার অফিসের টেবিলের ড্রয়ার থেকে পাওয়া গিয়েছিল সেই চারটা খাতা। ধারনা করা হয় বঙ্গবন্ধু হয়তো লেখাগুলো টাইপ করতে দিয়েছিলেন বই প্রকাশ এর জন্য।

খাতা চারটার মধ্যে ছিল বঙ্গবন্ধুর বংশ পরিচয় স্কুল-কলেজ, শিক্ষা জীবনের পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকান্ড, দেশের জন্য চিন্তা-চেতনার প্রতিফলন। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে দেশের অভাব, বিহার, কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ, প্রাদেশিক মুসলীম ছাত্রলীগ ও মুসলীমলীগের রাজনীতি সহ বিভিন্ন বিষয়ের বর্ণনা। 

দেশ ভাগ হয়ে যাবার পর থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত পূর্ব বাংলার রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, দেশের মানুষের  জীবন যাপনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষন ছিল খাতাগুলোর প্রতিটি লেখা জুড়ে। খাতার পাতাগুলো এতো নরম হয়ে গেছিল যে হাত দিলেই ছিড়ে যাবে, এমন একটা অবস্থা। 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, উনার ছোট বোন শেখ রেহানা, সাংবাদিক বেবী মওদুদ সহ আরো কয়েকজন পালাক্রমে লেখাগুলোকে খুব সাবধানে ফটোকপি করে বার বার পড়েছেন। কারণ অধিকাংশ লেখা ছিল ভীষন ঝাপসা। কোথাও কোথাও লেখা ছিল একেবারেই অস্পষ্ট। ম্যাগনিফাইং গøাস দিয়ে লেখা উদ্ধারের কাজ করতে হয়েছিল। 

খাতাগুলোর লেখা পড়তে যেয়ে অগনিত বার মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শেখ রেহানা চোখের জলে ভাসতেন। শেখ রেহানা অসংখ্যবার কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছেন, হলদে পৃষ্ঠা গুলোতে হাত বুলিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করতেন পিতার আঙ্গুলের স্পর্শ। বড় বোন শেখ হাসিনা বরাবরের মতোই শেখ রেহানার ভরসার আশ্রয়স্থল হয়ে ছোট বোনকে সান্তনা দিয়েছেন। বাবার লেখা আত্মজীবনী পড়তে যেয়ে বার বার স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন। অদম্য ইচ্ছা পিতৃ প্রেম আর দেশের মানুষকে মহান একা নেতার সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার মহৎ ইচ্ছা থেকেই প্রকাশ পায় বঙ্গ বন্ধুর লেখা। “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বইটির পুরো লেখা জুড়ে প্রবল দেশপ্রেম। জেলখানায় বন্দী অবস্থায় থেকেও দেশের মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্ন নক্ষত্রের মতো জ¦লজ¦ল করে জ¦লছে। 

একজন মানুষ দেশের মানুষকে ভালোবেসে নিজের জীবনের জন্য কতোটা ঝুঁকি নিতে পারেন জেল নির্যাতন কতোটা সহ্য করেছেন, মানুষের কল্যাণে নিজেকে কিভাবে বিসর্জন দিয়েছেন, লেখাগুলো সেই প্রত্যয়ের কথাই বলে। 

বহুবিধ তথ্যের সমৃদ্ধ এই বইটিতে পাকিস্তান আন্দোলন ভাষা আন্দোলন বাঙালির স্বাধীনতা, অধিকারের আন্দোলন, এই দেশের মানুষকে ধ্বংস করে দেবার জন্য পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠীর বিভিন্ন ধরনের চক্রান্তের ঘটনার উল্লেখ রয়েছে এই বইয়ে।

প্রধানমন্ত্রীর মতে, এই বই এর ঘটনাগুলোর সূত্রধরে অনেক অজানা ঘটনার গবেষণা করা সম্ভব। খাতাগুলোতে জেলারের সাক্ষর দেয়া অনুমোদনের পৃষ্ঠাগুলো অক্ষত ছিল। তারিখগুলো দেখে ঘটনার ব্যাখ্যা, বিস্তৃতি, লেখার সম্পাদনার কাজে সুবিধা হয়েছিল। 

লেখাগুলোর সম্পাদনা, সংশোধন এর কাজ করেছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও সাংবাদিক বেবী মওদুদ। এর পরে অধ্যাপক শামসুজ্জামান খান, প্রধানমন্ত্রী এবং বেবী মওদুদ পান্ডুলিপির সম্পাদনা, প্রæফ দেখা, টিকা লেখা, স্ক্যান, ছবি নির্বাচনের কাজগুলো সম্পন্ন করেন। সার্বিক তত্ত¡াবধানে ছিলেন শেখ রেহানা। 

এই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত লিখেছেন। ১৯৬৬-৬৯ সালে কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দী থাকাকালীন সময়ে একান্ত নিরিবিলিতে তিনি লিখেছেন জাতির জন্য অমূল্য এক ইতিহাস। আত্মজীবনী প্রকাশের ইচ্ছা থেকেই তিনি তার এই চারটা খাতার লেখাগুলো টাইপ করতে দিয়েছিলেন কিন্তু তিনি ঘাতকদের হাতে মারা যান। তাই বইটি আর প্রকাশ পায়নি। ভাগ্যের বিম্ময়কর খেলায় লেখাগুলো দীর্ঘ বছর পরে ২০০৪ সালে এসে পৌছে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যার হাতে। 

সীমাহীন পরিশ্রম আর ধৈর্য্যরে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অবশেষে মহামূল্য এই স্মৃতি কথাগুলো মুদ্রণে রূপ নেয়।

“অসমাপ্ত আত্মজীবনী” নামে জাতির হাতে পৌছে যায় এক চেতনার ইতিহাস, এক মহান নেতার স্বপ্নগাঁথা।

“অসমাপ্ত আত্মজীবনী” শুধুমাত্র একটি বই নয়, এটি একটি জীবন্ত দলিল, সোনার অক্ষরে মুদ্রিত মহান এক দেশপ্রেমী নেতার জীবনদর্শন। বইটি দেশ গড়বার জন্য বিরল এক দিক নিদের্শনা।

 

মুসাফির        

- মুহাম্মাদ সাইদুল ইসলাম রণি


কি র্নিমম এই অবণী!?

কি র্নিমম মানব!?

কেউ বুঝেনা কেহোর বেদনা; 

সবাই বুঝে নিজে স্বার্থ্য।

নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত সবাই,  

কেউ রাখে না কেহোর তথ্য; 

বিত্ত্ব পাইলে সবাই হয় হর্ষ।



দেয় না ভিক্ষান্ন,করে তিরস্কার;

দামী গাড়ী নিয়ে চলে,থাকে অট্রলিকায়; 

মুসাফির হেটে চলে,থাকে বৃক্ষ তলায়।

খায় দামী আহার,

মুসাফির থাকে অনাহারে। 

চাইতে গেলে অন্ন,

দেয় দূর দূর করে তাড়িয়ে।

কি র্নিমম মানুষ!



অশ্রু দিয়া বক্ষ ভরিয়া,

কহিত চাইল অন্তর বেদনা; 

কইতে না পারল র্স্পষ্ট করি----

চলিল মুসাফির আপনার রাহে;

কোনো দিকে না চাহি-----

চলিল মুসাফির প্রত্যন্ত ছাড়ি।

কল্পনার পদ্মা

কলমে - জয়া গোস্বামী


নদী পারের দুরন্ত এক রাশ কাশের বন

ঢলে পড়া সন্ধ্যেবেলা  পাখিদের ঘরে ফেরা

গোধূলির রক্তে আকাশ  হয়েছে রক্তিম 

ঢেউয়ের সাথে খেলছে খেলা 

বসে আমি আছি একা  আজ এক মনে

দূর থেকে আজ ভেসে আসছে

ভাটিয়ালীর বাউল গান 

মনটা আজ স্বাধীন স্বপ্নে ডানা মেলে হয়রান 


পদ্মা নদীর পারে তার জলের শোভা

অতি মনোরম  মনে হয় কুমারী কন্যা

তার বুকে নৌকা গুলো করে টলমল

ষোড়শী স্পর্শ । নৌকা ওঠে কেঁপে 

তাকায় নদী ভীষণ অনুতাপে 

পদ্মা আমার মনের অনুভূতির স্বপ্ন 

তাকে ছুতে এসেছি দূর থেকে দূরে

তার শোভায় আমি মুগ্ধহয়ে পরেছি প্রেমে


কিন্তু আমি এসেছিলাম সপ্ত সিন্ধু পার করে 

শুধু একবার তোকে ছুঁতে 

কিন্তু তুই অহংকারী তুই স্বার্থপর

তুই বর্ষার বৃষ্টি মাখা রূপে ভাসিয়ে 

দিয়েছিস দারিদ্র্যের জীবন,

ভেঙে দিয়েছিস সাধারণ মানুষের স্বপ্ন,কেড়ে 

নিয়েছিস সাধারণ মানুষের মুখের খাবার 

তুই হতে পারিস না কাউর প্রেমিকা 

তুই হতে পারিস না আমার স্বপ্নের কবিতা 

তোকে নিয়ে সমস্ত ভাবনা হল আজ মিথ‍্যা 

আজ লিখে দিলাম ব‍্যর্থ প্রেমের কবিতা।।


১৭/০৮/২০২০

 

হৃদয়ের সম্পর্কনামা

- শৈলেন মন্ডল

কবিতার দেশে জড়িয়ে পড়েছি তোমার হৃদয়াঙ্গম সম্পর্কনামায়।

সময়ের উড়োচিঠিগুলো আজ কেমন যেন নির্বাক সামাজিকতার আদর মাখতে চায়।

প্রেমের বিলাপে ফুটে ওঠে আদিম সভ্যতার ক্রন্দন বিলাপ ও উপসংহারনামার রক্তাক্ত প্রতিলিপি।

গহীন মনের আবহে ভাসে প্রেমের আবহ। তারা নান্দনিক সিৎকারে আরও সজীব ও প্রানোবন্ত হতে চায়।

তোমায় না পাওয়ার অনুভূতিরা বিদ্রোহী নিষ্প্রান আবহে মোড়া।

সময়ের যাঁতাকলে পিষে মরে ক্ষমাহীন নিষ্ঠুরতাময় অভিমানী ক্রন্দনরত অনুভূতির স্পন্দন।

মনের দরজায় কড়া নাড়ে মনকেমনিয়া অনুভূতিময় ভালবাসার আঘাতিয়া বিপ্লব।

থমকে যায় মন, আবেগ স্হিতি সঞ্চারনে নির্বাক হয় গহীন মনের আবেগী চুপকথারা।

কালেরস্রোতে নির্বাক চুপকথারাও বেবাগী আর সংগ্রামী হয়ে ওঠে।

তারাও উড়োখইয়ের মতো ভেসে বেড়ায় দেশ হতে দেশান্তরে।

১০.০৮.২০২০

 

অভিমান

- কিরণময় নন্দী


অভিমান, সে তোর কথায় কথায়

ভালোবাসা একরাশ

আমি তো হেসেই পাগল

আমায় পাবার বহিঃপ্রকাশ।


সপ্তাহান্তে কিংবা এক পক্ষকাল

নজর এড়িয়ে একটু দেখা

হয়তো বা এইটুকু ক্ষন

অনেকদিনের আবেগমাখা।


অন্যজনা কি কথা কয়

জানলো নাকি গোপন কথা

এই ভয়েতেই কাটতো সময়

ব্রাত্য ছিলো প্রেমের কথা।


সরাসরি হয়নি বলা

আমি তোকে ভালোবাসি

কিন্তু, কি জানিস, কি এক জাদু...

তোর কাছেই ছুটে আসি।


 মনে আছে তোর নদীর পাড়ে

পিয়াল গাছের তলে

চিরকুটে লেখা সময় মেনে

মিনিট দশেক আগেই তুই, সবকিছু ভুলে।


কখনও বা স্কুলের ড্রেসে

কালো-চুলে লাল-ফিতে বেঁধে

কখনও তুই নীল চুরিদারে

একটু হাসি একটু কেঁদে কেঁদে।


কিসের ভয়ে কাঁদিস তুই

চিঠির লেখা পেয়েছে কি কেউ হাতে!

ভীষণ জোরে কান্না বাড়ে

অভিমানে শক্ত মুঠি আমার বুকে।


সেসব কথা আজ ইতিহাস

সেই নদী মজে গতিহারা

পিয়াল গাছ কেটে চওড়া পথ

আমি একাকী পথিক আজ পথহারা।


অভিমানী তুই সবকিছু ভুলে

অন্যহাতে  বাঁধা সাতপাকে

আমি আজও অতীত নিয়ে

ব্যস্ত দুনিয়ার অন্যবাঁকে।


প্রাপ্তি শুধু তোর চিঠির সাথে

 তোর মনের কথার কবিতা

 আজ তুই সুখী অন্য ঘরে

আমার বুকে চাপা অভিমান আর হতাশা।

 

শুধু তোকেই যে চাই

- শৈলেন মন্ডল


যদি তুই আমায় দিস ভালবাসার চাদরখানি

ভিজবো আমি সারাবেলা আর ছুঁয়ে দেবো মনের অতল।


চুপটি করে মেঘের কোলে খাবো লুটোপুটি

মেঘের পালক দিয়ে এঁকে যাবো ভালবাসার সাতটি রংয়ে। 


ভালবাসার আঁচল পাতিস উজাড় করে

ভরিয়ে দেবো কানায় কানায় রংবাহারী ফুলের মেলা। 


তোর বিকেলে ভরসা রেখে জোছনা মাখি সারা গায়ে

ঐ নূপুরে আওয়াজ যে পাই মধূর ধ্বনি।


উঠোন জুড়ে বসতে দেবো আদরের ঐ শীতলপাটি

চাঁদ ভেজানো জোছনা মাখবো সারা গায়ে।


তোর বুকেতে মুখ যে লুকাই হাসনুহানার সৌরভ মেখে

স্পর্শ সুখে ডুব দিতে চাই অতল জলে।


আঁকবো ছবি  কল্পনারই আলিঙ্গনে

কালো মেঘের ছায়া ঘনায় তোর বেনীতে।


ভাসবো সুখে কালো নিকষ ঐযে রাতে

টুপুর টাপুর বৃষ্টিতে যে মনটা নাচে উচাটনে।


বাজিয়ে মাদল আবেশ ভরা আলিঙ্গনে

তোর বুকেতে লেপ্টে থাকি সপ্তসুরের  মূর্চ্ছনাতে।


তোর রূপেতে পাগলপারা মন যে আমার

ছন্দে নাচে মনময়ূরীর পেখম আদর।


তোর প্রেমেতে মন পবনের বৈঠা বাওয়া

তোকে ঘিরে মন কেমনের আজব নালিশ।


১৪/০৮/২০২০

 

চিঠি দিও ! 

- শক্তি কুন্ডু


তুমি আগুনের ঠিকানাতে দিয়ে রেখো চিঠি খানা ,

না বলা কথা গুলো সাজিয়ে আড়ম্বরে ...আমি পুড়তে পুড়তে ঠিক পড়ে নেবো...!!


তাতে সাহারা লিখে দিলে অথবা শান্তি কিছু ,

অথবা 

এমন কথা যেটা ভাবিনি এখনো ... লিখে দিও !


ছাই সাঁতরে সাঁতরে আমি,

 যখন নাভিমূলে পৌঁছাবো,

যাবো জলের কাছে ...তখনো যেন আমি তোমার লেখা কথা

 মনে মনে জপে যেতে পারি ,

লিখ এমন করেই চিঠি 

 জলের ভাষায় ৷৷

 

যাচ্ছি কিন্তু যাচ্ছিনা

- কাজী জুবেরী মোস্তাক 


তবে তাই হোক তোমাদেরই জয় হোক

আমার নাহয় ব্যারাকেই ফিরতে হোক

আমার জন্য দরকার নেই কোন শোক ৷


জয় হোক আজকে ওদেরই জয় হোক

যারা ভঙ্গুর সমাজে রক্ত খেকো জোক

আমরা নাহয় হলাম আজ ছোটলোক ৷


বেঁচে থাকো তোমরা শতাব্দীর সমদিন

বিবেকের কাছেই থাক তোমাদের ঋণ

শতায়ু হোক তোমাদের বাঁচার এইদিন ৷


আজকে আমরা ব্যারাকে ফিরে যাবো

আমাদের যাই আছে জমা দিয়ে দেবো

দেশপ্রেম আর প্রতিজ্ঞাটা রেখে দেবো ৷


আজকের মতো হয়তোবা ফিরে যাবো

নতুন করে আবারও সব গুছিয়ে নেবো 

ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয়ে স্বপ্নটা সাজাবো ৷

নতুন দিনের আশায়   

কলমে : সোমা চ্যাটার্জী সরকার


চারিদিকে ছুঁই ছুঁই

বাঁচা যে বিষম দায়,

মন আজ বড় একা

শুদ্ধ বাতাস চায়।

অশনি সংকেতে, 

বাতাস ভরে ওই ।

মন যে অবোধ শিশু

বয়স বাড়ে কই ?

কোনে দেখা মেঘ আর,

সোনালী ডানার আলো,

আশার কথা বোনে,

পৃথিবী হবেই ভালো।

উড়বে মহাকাশে,

হঠাৎ ডানা ঝেরে ।

মহামারী পরাজিত,

মানুষ উঠবে সেরে।

মৃত্যু ভয় পায় -

অবুঝ প্রেমের কাছে।

এটুকু সত্যি নিয়েই,

মানুষ আজও বাঁচে।

আমিও স্বপ্ন বুনি......

মানুষ মানুষের পাশে-

বাড়িয়ে দেবে হাত;

সুখ দুখ বারো মাসে।

বিপদে বাড়াব হাত ,

পথে হারে অসহায় ।

দারিদ্র পাপ নয়,

এ তো মানুষেরই দায়।

মহামারী ঐ ডোবে ,

ক্লান্ত রবির সাথে।

প্রিয় প্রানে কাছাকাছি,

উষ্ণতা হাতে হাতে।

অনাহারী মানুষের,

ঈশ্বরী আশিস্ সাথে-

"সবার সন্তান যেন 

থাকে দুধে ভাতে" ।

আজকের স্বাধীনতা

কবি - মোহন দাস


আজকের স্বাধীনতা মুখ বুজে থেকে

আজকের স্বাধীনতা ঈশ্বর ডেকে ডেকে,

আজকের স্বাধীনতা অনিশ্চিত জীবন বোধের

আজকের স্বাধীনতা --- চুরি গেছে মোদের ।


আজকের স্বাধীনতা গৃহ কোণ থেকে

আজকের স্বাধীনতা; চোখে জল ঢেকে,

আজকের স্বাধীনতা নিরস্ত্র সংগ্রামে

আজকের স্বাধীনতা --- পরাধীনতার নামে ।


আজকের স্বাধীনতা প্ৰিয়জন হারাবার শোকে

আজকের স্বাধীনতা, বিভীষিকা এ দু'চোখে;

আজকের স্বাধীনতা ভিক্ষুকের টানা রোদ্দুরে

আজকের স্বাধীনতা কোভিড আক্রান্ত, হাহাকার সুরে ।।

পরাধীনতার কবর
- কাজী জুবেরী মোস্তাক 

যখন অশালীন আগুন মানবতা, নীতি ও আদর্শকে
গ্রাস করে ;
তখন জ্বলন্ত আগুনের মতো চিৎকার করে রাষ্ট্রের প্রান্তর ।
আর একটা পাগল ক্রোধের আগুনে এই শহরটাকে
জ্বালিয়ে দেয় ;
এবং ঘৃণার চোখে তাকিয়ে থাকে এ পোড়া শহরের
আঙিনায় ।

যখন এই শহরের কোন ব্যালকোনীতে বসে ধর্ষনের
খবর পড়ি ;
তখন মনে হয় যেন আত্মঘাতী হই আর যা ইচ্ছা হয়
তাই করি ।
প্রতিনিয়ত যখন ভঙ্গুর শরীর থেকে জীবন ছিনতাই 
হয়ে যায় ;
অনাকাঙ্খিত মৃত্যু তখন এই শহরেই অনেক সস্তায় পাওয়া যায়।

পত্রিকার ব্যালকোনী জুড়ে যখনই স্থান পায় খুনির মুক্তির খবর ;
রাষ্ট্র তখন মানচিত্রের মাঝে খুঁড়ে চলে পরাধীনতার এক কবর ।

মাস্টারদাদু
-কিরণময় নন্দী

গতকাল রাতের উড়ানে ছেলেটা পোষ্ট-ডক্টরেটের জন্য ইসরায়েল চলে গেছে। শুভময় বাড়ীতে একা হয়ে গেছে। সকালে ঘুম থেকে উঠে আলসে ভাবেই বিছানায় শুয়ে আছে। স্মৃতির দৃপ্তপটে ভেসে উঠলো নিজের ছেলেবেলাকার নানা কথা। বাড়ীতে কত লোকজন। দাদু-ঠাকুমা-কাকা-জ্যেঠু-বাবা-মা-কাকিমা-জেঠিমা-জেঠুর মেয়ে সোনালী-জেঠুর ছেলে প্রীতম-ওর বোন সায়ন্তনী-কাকার ছেলে শান্তনু। একসাথে কত মজা। অভাব ছিলো। কিন্তু একসাথে থাকার কত আনন্দ। গ্রীষ্মের দুপুরে আমবাগানে মিছিমিছি পুতুল বিয়ের আয়োজন, বর্ষায় চাটুনি জালে পুঁটি মাছ ধরা, শরৎকালে পাশের গাঁয়ে একসাথে দুর্গাপুজো দেখতে যাওয়া, শীতে গরুর গাড়িতে করে ধান আনতে যাওয়া মাঠে আর সাথে গামছার পুঁটুলিতে নিয়ে আসা মুড়ি ভাগ করে খাওয়া কত আনন্দ। সুমিত-নীলু-সামলী-নন্দিতা-পাঁচু-ভোম্বল আর নয়নতারা। সকলে মিলে পিটু খেলা,লুকোচুরি, মাছ ধরা, বউ-বসন্ত, খোলাম কুচি নিয়ে টিকিট খেলা আরও কত নাম না জানা খেলা। সকালে বাড়ির উঠোনে দুলে দুলে সুর করে সরবপাঠ, তারপর দশটা বাজলেই পাশের শিকদারদের দীঘিতে সাঁতরে সাঁতরে স্নান করা। ফ্যান-ভাত আর আলুসিদ্ধ কোনোদিন সাথে মাছমোয়া দিয়ে খেয়ে সোজা হেঁটে হেঁটে ইস্কুল। ব্যানার্জীদের পুকুরপাড় দিয়ে, পালেদের ছোট মাঠ পেড়িয়ে আসগর চাচার আমবাগানের মাঝ দিয়ে কিছুটা হেঁটে শুভময়দের ইস্কুল চারুবালা প্রাথমিক বিদ্যালয়। সাধনবাবু হেডস্যার। কঠিন শাস্তি। অংক না পারলে টেবিলের নীচে মাথা গলিয়ে পিঠে বেতের মার। মারের কথা বাড়িতে বললে আবার মার না হলে ভীষণ বকা। পড়া না করলে মাস্টারমশাই মারবে না তো আদর করবে। ফলে শাস্তি পেয়ে চেপে যাওয়া ছিলো সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ। শুভ কোনোদিন মার খায়নি। শুভময় কে সকলে শুভ বলেই ডাকতো। ভীষণ বুদ্ধি ওর অংকে। ফলে সাধনবাবুর প্রিয় ছাত্র। সাধনবাবুর হাতে মার না খাওয়ায় অন্য বন্ধুদের কাছে কম কথা শুনতে হতো না শুভকে। সবার অনুযোগ ছিলো শুভর সামান্য ভুল হলেও সাধনবাবু মাফ করে দিতেন। বাকিদের বেলায় সেটা ছিলো না। 
শুভময় বিছানা থেকে উঠে বাথরুম থেকে ফ্রেস হয়ে এলো। নিজেই একটু কফি বানিয়ে বসলো দক্ষিণদিকের ঝুল বারান্দায়। খবরের কাগজের কয়েকটা পাতা উল্টে ভাঁজ করে রেখে দিলো। বারবার নিজের গাঁ সুন্দরপুরের কথা মনে ভাসতে লাগলো। মনে পড়লো সাধনবাবুর কথা। সরকারী বৃত্তি পরীক্ষায় অংকে একশো পেয়েছিলো শুভ। তাই একটা ঝর্ণা কলম উপহার দিয়েছিলেন সাধনবাবু। আজও যত্ন করে তুলে রেখেছে শুভ। তারপর সুন্দরপুরে হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক। তারপর সোজা কলকাতা। শুভর ভবিষ্যতের কথা ভেবে আর সাধনবাবুর জোড়াজুড়িতে শুভর বাবা কলকাতা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। চাষের জমি বিক্রী করে শুভর পড়াশোনা চলতে লাগলো। সাধনবাবু কলকাতা আসার সময় প্রচুর বই দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন সুন্দরপুরের সম্মান রাখিস শুভ। কলকাতার প্রতিযোগিতার দৌড়ে শুভ গ্রামের কথা ভুলতে থাকে। দাদা-দিদি-ভাই-বোন-পরিবার-বন্ধুবান্ধব-এমনকি সাধনবাবুর সাথে যোগাযোগ কমতে থাকে। বারো ক্লাসের পরীক্ষা দিয়ে বেশ কয়েকদিন গ্রামে ছিলো শুভ। ফিরে পেয়েছিলো আবার সেই শৈশব অনুভূতি। কিন্তু জেঠুর মৃত্যুর পর বাড়ির শোকের আবহে সব কিছু থমকে গেলো। আবার শহরে ফিরে কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয় তারপর রিসার্চ। ড.শুভময় ব্যানার্জী হয়ে ওঠার পিছনে অনেক চড়াই-উৎরাই পেরোতে হয়েছে। দিদি-বোনের বিয়ের পর টাকা পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। বাবাও রোগভারে জর্জরিত হয়ে যায়। ঠাকুমা-দাদু একেএকে ইহলোক ত্যাগ করেন। ফলে আনন্দের ব্যানার্জী বাড়িতে ধীরে ধীরে বিষাদের ছায়া নেমে আসে। শুভ ওইসময়ে গৃহশিক্ষকতা করে নিজের খরচ চালায়। 
শুভর মনে আছে একবার সাধনবাবু চোখ অপারেশনের জন্য কলকাতার হাসপাতালে এসেছিলেন। যোগাযোগ করেছিলেন শুভর সাথে। দূর সম্পর্কের এক আত্মীয়ের বাড়িতে উঠেছিলেন ছানি অপারেশন করে। শুভ প্রতিদিন বিকেলে দেখা করতে যেতো। সাধনবাবু বিয়ে করেন নি। স্কুলকেই পরিবার ভাবতেন। সারাদিন স্কুলের উন্নতির জন্য লাগামছাড়া পরিশ্রম। নিজের হাতেই স্কুলে ফুল-ফলের বাগান,বাঁশের প্রাচীর, আর পঞ্চায়েতকে ধরে ছেলেমেয়েদের জলপানের জন্য নলকূপ বসিয়েছিলেন। 
যেদিন সাধনবাবু সুন্দরপুরে ফিরে যাবেন সেদিন হাওড়া স্টেশনে শুভ সাধনবাবুকে তুলতে এসেছিলো। শুভর হাতে সঞ্চিত চারশ নব্বই টাকা তুলে দেন সাধনবাবু। শুভ নিতে অস্বীকার করে কিন্তু সাধনবাবু বলেন তুই বড় হয়ে যখন অনেক উপার্জন করবি তখন সুদসহ ফিরিয়ে দিবি গাঁয়ের প্রাইমারী স্কুলের জন্য। শুভ তারপর আর না করেনি। তখন ওর টাকার খুব প্রয়োজন। কিন্তু টাকার পরিমান তখনকার বাজারদরে অনেক বেশি। বাড়ির টাকা না পাঠানোর ঘটনা হয়তো সাধনবাবুর কানে গিয়েছিলো। তাই একপ্রকার জোর করেই টাকাটা দিয়েছিলেন।

      এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরী নিয়ে শুভ চলে গিয়েছিলো দিল্লী।গ্রামে ফোনের  চল ছিলো না। তাই মাকে চিঠি লিখেই চাকরীর খবর জানিয়ে দিয়েছিলো। তারপর শুভকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। সেমিনার, ক্লাস,মিটিং, বিদেশে বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে লেকচার এসব করে আর গাঁয়ে ফেরা হয়নি। বাড়িতে নিয়মিত টাকা পাঠাতো। একসময় সে প্রয়োজন বন্ধ হয়ে গেলো। মাস দুয়েকের ব্যবধানে শুভর মা-বাবা দুজনেই মারা যান। শুভ বাবার শেষকৃত্যে যেতে পারেনি। তখন ও অক্সফোর্ডে। মায়ের সেরিব্রাল এট্যাকের খবর পেয়েই ও দিল্লী থেকে ছুটে আসে। গ্রামের হাসপাতাল থেকে সোজা নিয়ে আসে কলকাতার বেসরকারি নার্সিংহোমে। কিন্তু পনেরদিনের চেষ্টা ব্যর্থ হলো। শুভর মা চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। একদিন শুভর মা কিছু বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু শুভ কিছু বুঝতে পারেনি। হয়তো বা শুভর স্ত্রী আর আদরের নাতিকে দেখতে চেয়েছিলো। দিল্লিতেই মারাঠী মেয়ে স্বপ্না পাতিলকে বিয়ে করে শুভ। স্বপ্না জে এন ইউর লেকচারার। ফলে ব্যাস্ত জীবনে আর আগামীর শিখর সাফল্যের পিছনে ছুটতে গিয়ে গাঁয়ের সাথে সব সম্পর্কই ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর একমাত্র ছেলের এডুকেশনের পিছনে দৌড়াতে গিয়ে সুন্দরপুর একেবারে আবছা হয়ে যায়। শুভ মানসিক দ্বন্দে ভুলে যায় সুন্দরপুরের প্রাইমারী শুভকে এতদূর এনেছে, তাহলে এতো ইঁদুর দৌড় ছেলের জন্য কেন?
    আসলে উচ্চতার শিখরে পৌঁছে খুব নীচে দৃষ্টি পৌঁছয় না। বছরখানেক আগে স্ত্রীর মৃত্যুর পর শুভ ভেবেছিলো একবার সুন্দরপুরে যাবে। কিন্তু যাওয়া হয়নি। খুব কম বয়সে স্ত্রী বিয়োগে ভীষণ একাকী হয়ে যায় শুভ। আর আজ আরও একা। ছেলেটা চলে গেলো বিদেশে।

পরেরদিন শুভ সকালের ফ্লাইটে কলকাতায় নামলো। তারপর গাড়ি ভাড়া করে সোজা সুন্দরপুর। প্রথমেই সাধনবাবুর বাড়ি। বিরাশি বছরের বৃদ্ধ শুয়ে শুয়ে বই পড়ছেন। বার্ধক্যের ছোঁয়া সারাঅঙ্গ জুড়ে। তবুও বই পড়ে চলেছেন। একজন পাশের বাড়ির নাতবউ দুবেলা দুমুঠো রেঁধে দেন। বাকি সবকাজ নিজে নিজেই করেন। প্রনাম করে কাছে বসলো শুভ। পরিচয় দিতেই শুভকে জড়িয়ে ধরলেন সাধনবাবু। একনাগাড়ে কেঁদেই চললেন। পাশের বাড়ির নাত-বউ ছুটে এলো। শুভকে কোনোদিন না দেখা ওই অল্পবয়সী মেয়েটি বললো আপনি কি শুভবাবু?
শুভ অবাক। বুঝতে পারলো না ওই বাইশ বছরের গৃহবধূ কিভাবে চিনলো ওকে...
মেয়েটি একনাগাড়ে বলে চললো শুভর কথা। বললো মাস্টারদাদু সবসময় আপনার কথা বলেন, আপনি ভীষণ ভালো, ভীষণ বুদ্ধিমান.....আরোও কত কি?
     শুভ এবার লজ্জিত হলো। ভাবলো, নেওয়া ছাড়া ও কি করেছে এই গাঁয়ের জন্য, এই স্কুলের জন্য বা সাধনবাবুর জন্য... কিছুই না।
তবুও এইভাবে এত মনে রাখা কেন? একজন তরুণী শুধু বর্ণনা শুনে চিনে ফেললো আমায়....
দুপুরে সাধনবাবুর কাছে খাওয়াদাওয়া করলো। তারপর বিকেলে পৌঁছলো সাধের চারুবালা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।সাথে সাধনবাবু। গাঁয়ের লোক জড়ো হয়ে গেলো। কংক্রিটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ভীষণ সুন্দর স্কুল।কোনো মিল খুঁজে পাচ্ছে না শুভ। সব বদলে গেছে। উত্তরদিকে ফলবাগানে চোখ পড়লো শুভর। ওই তো কাঁঠাল গাছটা। তৃতীয় শ্রেণীর বিজ্ঞান পড়াতে পড়াতে একদিন সাধনবাবু ওই গাছটি শুভকে দিয়ে লাগিয়েছিলেন। আর বলছিনেন গাছের প্রাণ আছে, দেখবি ও তোদের মতো বড় হয়ে যাবে আর কাঁঠাল ফলবে। আজ গাছে কাঁঠালে ভরা। অনেক বড় হয়ে গেছে সেই ছোটো গাছটি। একেবারে বৃক্ষ। 
পাশাপাশি অনেক ছেলেমেয়ে চলে এসেছে। ওরাও সাধনবাবুকে চেনে।ডাকে মাস্টারদাদু বলে।সাধনবাবু মাঠে বসলেন। সকলে গোল করে বসলো। শুভ বসলো সাধনবাবুর কাছে। খবর পেয়ে বর্তমান প্রধান শিক্ষক এলেন। 
    সাধনবাবু কাঁপা গলায় বললেন এই সেই শুভ..আমার প্রিয় ছাত্র। দেখো আজ ও সুন্দরপুরের নাম উজ্জ্বল করেছে। 
এবার সাধনবাবুর অনুমতি নিয়ে শুভ বলতে শুরু করলো ওর কথা। ছত্রে ছত্রে ও বুঝিয়ে দিলো সাধনবাবুর স্কুলের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। আর ওর নিজের ব্যর্থতার কথা... নিজের গ্রামকে ভুলে যাবার ধৃষ্টতার কথা। শুভর চোখে জল। 
শুভ এবার গাড়ি থেকে বার করে আনলো বিরাশিটি ছোটদের গল্পের বই। তুলে দিলেন বিরাশি বছরের মাস্টারদাদুর হাতে। আনন্দে গ্রহণ করলেন বর্তমান প্রধান শিক্ষক। এরপর একটি ল্যাপটপ ও প্রজেক্টর দিলেন স্কুলের জন্য আর দিলেন কুড়িটি কম্পিউটার কেনার রশিদ। কলকাতা থেকে আসার পথে ল্যাপটপ,প্রজেক্টর ও বইগুলি এনেছেন আর কুড়িটি কম্পিউটারের দাম মিটিয়ে এসেছেন। ওরা আগামীকাল স্কুলে ডেলিভারী দিয়ে দেবে। সকলে ভীষণ খুশি। 
পরেরদিন স্কুলের সময়ে সাধনবাবুকে সঙ্গে নিয়ে শুভ আবার স্কুলে এলো। ছেলেদের সাথে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা সংগীত গাইলো। ভীষণ ফ্রেস লাগছে নিজেকে। 
আজই ফিরে যাবে শুভ। ভীষণ মন খারাপ। কর্মজগতে ও ভীষণ ডেডিকেটেড। তাই থাকার উপায় নেই। ইতিমধ্যে কম্পিউটার সেজে উঠেছে একটি বড় ক্লাস রুমে। এখন ওগুলি টেবিলে আছে। তার জন্য যাবতীয় ফার্নিচার অর্ডার করে দিয়েছে। পাশের গ্রামীণ ব্যাংকের ম্যানেজার এসেছেন স্কুলে। ওনার হাতে দশলক্ষ টাকার চেক দিয়ে একটা একাউন্ট খোলার অনুরোধ করলেন। এই টাকার সুদে মেধাবী ও দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের পড়াশোনার খরচ চলবে। আর এটার নাম হবে "রামানন্দ আদক স্মৃতি স্কলারশিপ"। সাধনবাবু চমকে গেলেন। রামানন্দ আদক সাধনবাবুর বাবার নাম। শুভ সাধনবাবুকে প্রনাম করে বললো," আজ যা কিছু হয়েছি আপনার জন্য, আর আপনার কথায় আপনি যা হয়েছেন আপনার বাবার জন্য, তাই আগামীর দুঃস্থ ও মেধাবীরা আপনার বাবার আদর্শে এগিয়ে চলুক সাফল্যের পথে"।
নমস্কার প্রতিনমস্কার শেষে গাড়িতে ওঠার মুখে বর্তমান প্রধানশিক্ষকের হাতে সাধনবাবুর দেওয়া ঝর্ণা কলমটা তুলে দিলো শুভ। অনুরোধ করলো এই শক্তিশালী হাতিয়ারটি কোনো বলবান যোদ্ধার হাতে তুলে দিতে। প্রধান শিক্ষক হাসিমুখে গ্রহণ করলেন। 
সুন্দরপুর ছাড়িয়ে গাড়ি উঠলো বড়ো পাকা রাস্তায়। পিছনে পড়ে রইলো একরাশ ছেলেবেলা.....

প্রবাসীর কথা রাখা হলোনা
- কিরণ মাহমুদ মান্না

দশটা বছর! 
দশটা বছর জীবন থেকে কত দ্রুত গতিতে অতিবাহিত হলো চিন্তা করা যায়! সেই যে কবে এসেছি ঠিক মনেই পড়ে না, ছিল কি বার, ছিল কত তারিখ,ছিল কোন সময়! দেশে ছেড়ে এই সুদূর স্বপ্নের সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমিয়ে ছিলাম। এখনকার মত যদি তখন হাতে স্মার্ট ফোন থাকতো তবে সেই দিনটা প্রতি বছর বছর আমাকে মনে করিয়ে দিতো।
শুধু মনে আছে, বাড়ি থেকে একটা ডাইরি নিয়ে এসেছিলাম। বিমানের সিটে বসে বসে আমার যাত্রার কিছু প্যারা লিখেছিলাম। তারপর, শত ব্যস্ততায় আর প্রবাস জীবনের গল্পটা লিখা হলো না। সেটাও তো বাড়িতে পড়ে আছে। আর সেই ডায়েরিটা বাড়িতেও আধো আছে কিনা তাও জানি না।

সময় ঠিক চলে যায়,সময়ের কোন গতিরোধ নেই। 
এর মাঝেই জন্ম হলো কত না স্মৃতির। কত না জীবন গল্পের নতুন অধ্যায়। হলো সংসার, বাচ্চাকাচ্চা। 
শুধু হলো না বউ, বাচ্চা, মা বাবা, ভাই বোনদের সময় দেওয়া।এই দশটা বছরের মধ্যে তিন বার দেশে যাওয়ার  সৌভাগ্য হয়েছিলো। এই তিনবারে মিলে পরিবারের সাথে সম্ভবত সময় কাটিয়েছি বছর খানিকের মত।
বাকি নয় বছরই স্বপ্নের দেশ সিঙ্গাপুরে। কিছু স্বপ্নকে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অগাধ পরিশ্রম করে দিন পাড়ি করেছি। সেই স্বপ্নরা আজও ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেলো। মানুষের চাহিদার শেষ নেই। তাই তো হলো না স্ত্রী সন্তান,মা বাবা, ভাই বোন, আত্মীয় স্বজন পাশে থাকা।

এই দীর্ঘ দশ বছরে অনেকগুলো ঈদ এই প্রবাসে কেটেছে। যে কটা ঈদের দিন চলে গেছে তার মধ্যে একটি মাত্র ঈদ পরিবারের সাথে কাটানোর সৌভাগ্য হয়েছিলো। সেও তো ২০১৩ সালে। এর পর অনেক ইচ্ছে থাকার সত্যেও আর প্রিয়জনদের সাথে ঈদ আনন্দ উপভোগ করার সৌভাগ্য হয়নি।এক বছর আগে এই কোরবানির ঈদের নামাজ পড়ে নিয়ত করেছিলাম এবং  স্ত্রী, সন্তান, মা বাবা কে কথা দিয়েছিলাম। আগামী কোরবানির ঈদ তোমাদের সঙ্গে করবো। আমার সেই কথা রাখা হলো না। সেই স্বপ্নটাও আর ধরা দিলো না। হবে কি করে, মানুষের যে চাহিদার শেষ নেই। 

শুরু হলো করোনা নামের অদৃশ্য,অচেনা এক শত্রুর বিরুদ্ধে মোকাবিলা!যে কিনা সমস্ত পৃথিবীটাকে তছনছ করে দিলো। কেড়ে নিলো লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ।
সেই এপ্রিল থেকে সবাই নিজ ঘরে গৃহবন্ধি। 
এখনও সময় অতিবাহিত হচ্ছে তার নিজ গতিতে। 
শুধু থেকে গেছে পৃথিবীর মানুষের জনজীবন।
চাঁপা পরে গেলো হাজারও প্রবাসীর মনের স্বপ্ন 
চোখ বুজে স্বপ্ন দেখেছিলাম আগামী দিনের।
জ্বলবে সুখের আলো, শান্তি ভরে উঠবে জীবন। 

তিনটা মাস ধরে কোয়ারান্টাইন নামে ঘরবন্ধি।
এর মাঝে পাড় হলো,পবিত্র রোজা, ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা'র মত অনেক আনন্দের দিন। কখনোই কল্পনা ছিলো না। এমন গৃহবন্ধি হয়ে ঈদের আনন্দ মাটি হবে।
একেতে দশ বছর পরিবারের সাথে ঈদআনন্দ থেকে বঞ্চিত। এবার আবার হলো গৃহবন্ধিতে ঈদ। মনটা খুব খারাপ যাচ্ছে। কি যে এক দুঃসহ যন্ত্রণা কাটে দিন রাতের প্রতিটি প্রহর। সেটা বলার ভাষা থাকে না, একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই শুধু জানে।

আজ ঈদের দিন কোন মতে ফজরের নামাজ পড়ে, সোস্যাল ডিস্টেন্স মেনে ঈদের নামাজ পড়লাম। কিন্তু,নেই কোন আনন্দ, নেই কোন বিশেষ রকমারি খাবার, হলো না কারো সাথে মন খুলে দুটি কথা, হলো না একে অপরের সাথে কৌশল বিনিময়, হলো কোলাকুলি। মনের ভিতর হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত। না পারি বলতে, না পারি সইতে। জানি না, মানুষ কোন জনমে করেছিলো এমন পাপ। সেই পাপের সাজা আমরা পাচ্ছি তাই আজ। কবে হবো মুক্তি এই কারাগার থেকে। ছুঁটে যাবো আপন নীড়ে, আপন ঠিকানায়। আজও প্রিয়জন পথ চেয়ে বসে আছে শুধু আমারই অপেক্ষায়। 

লেখাঃ কিরণ মাহমুদ মান্না 
৩১/০৭/২০২০ইং
সিঙ্গাপুর প্রবাসী,

শুভ, এম.এ বি.এড
- কিরণময় নন্দী

মাগো জানি এ অপরাধ, আমারও ছিলো বাঁচার সাধ
পাশের পাড়ার সুরঞ্জনের মতো
দেখো ও তো এম এ, বি এড
আমার বেলায় ঝামেলা যতো!

তিন ক্লাস আগে ও, খেলার মাঠের সাথী যদিও
ওপেনিং জুটি একসাথে
ভীষণ জোরে চালিয়ে ব্যাট, শর্ট ছিলো নির্ঘাত
হারা ম্যাচ আমাদের পকেটে।

জড়িয়ে সেকি উল্লাস, অপনেন্ট ভীষণ হতাশ
তোমার শুভ সুরঞ্জনের কোলে
ফুটবল ম্যাচে ওই এক, শুভ-সুরঞ্জনে কুপোকাত
একেএকে সব বল গোলে।

খেলার মাঠে বারেবারে জয়, জীবনের খেলায় পরাজয়
আমি মা পারিনি মেনে নিতে
এ তো একবার নয়,বারবার পরাজয়
আমিও এম এ, বি এড কম বা কিসে?

তুমি কি বুঝবে মা, শিক্ষিত বেকারের যন্ত্রনা
সুচেতনা বিয়ে করে অন্য ঘরে
ডিগ্রীর নাকি দাম নাই, যদি চাকরি না পাই
সুচেতনা সাফ বলে দিলো পিছন ঘুরে।

তারপর কাটে দিন, আমি বড় সঙ্গীন
বেকারের স্টিকার বুকে এঁটে
আমিও তো কিছু কামাই, সারাদিন টিউশন পড়াই
কিন্তু,চাকরী নেই পকেটে।

বোনটারও বিয়ে হলো, সাদা-মাটা ঘর পেলো
সরকারী চাকুরে বর জুটলো না
ক্লার্ক বাবা অবসরে, বেশি পণ কি দিতে পারে?
আমি বেকার, কোনো কাজে লাগি না।

এভাবে চলে যাওয়া অপরাধ, আমারও ছিলো বাঁচার সাধ
আর পাঁচজন বেকারের মতো
সম্মানটুকু বলে নেই,যে যা খুশি মাইনে দেয়
বলে,"বেশি চেয়ো না স্কুল টিচারের মতো।"

সকালের টিউশন শেষে, আমি দোকানে দৈনিক হাতে
সুরঞ্জন স্কুলমুখী ঝোলা ব্যাগ কাঁধে 
দশ বছর শেষ হলো, একটা ইনক্রিমেন্টও পেলো
স্কুল-টীচারের স্বপ্ন আমার বুকের মাঝে।

ওর নাকি বেশ নাম, ইংলিশ জলপান
এক্সামে কনফার্ম সাজেশন
আমি তো খুঁটিয়ে পড়াই, বেসিকটা জানাতে চাই
তবুও টিউশন মাস্টারের দর কম।

ওই মাঝারী মেধার ছেলে, আসে দলবলে
মাজাঘষা করে চলে পাঠ
পাশ করা ছেলেও, মেজেঘষে সত্তর পেলেও
জমে না আমাদের ব্যবসা-পাট।

খুব কষ্ট পেতাম মা, সবকিছু এত নগ্ন বুঝতাম না
বুঝতাম না পিঠে স্ট্যাম্পের এত দাম
কোনোমতে পাশ করা, আজ ওরা সবার সেরা
কোন জাদুবলে এতো ধুমধাম!

আমি মা নই উন্মাদ,আমারও ছিলো বাঁচার সাধ
সকলের সাথে ভরা সংসার মাঝে
কি জানি কি যে হলো, সব যেন করাল কালো
ভীষণ একাকী আমি যে।

সেদিন স্টেশনের পথে, দেখা সুচেতনার সাথে
কি ভীষণ মিষ্টি ওর মেয়েটা!
নাচের স্কুল থেকে , যাচ্ছে দুজনে স্টেশনের পথে
দেখা হতে বলে," শুভদা হয়েছে চাকরীটা?"

আমি মুখ নীচু করে, কি বলবো উত্তরে
ও বলে," বিয়ে করে বেঁচে গেছি
 আমি কি মরে আছি, তুমি মা বলো দেখি
এরপর মরতে আর কি বাকি?

ভবের হাট
- জাকিরুল চৌধুরী 

ভবের হাট জমাও তুমি 
দেখো না যে চেয়ে, 
তুমি আজ খুশি সারা 
দুনিয়া হস্তে পেয়ে। 
থাকবে নাকো বেশি দিন 
তোমার ভবের হাট, 
ধ্বংশ একদিন হবে তোমার 
হবে লুট পাঠ। 
ভবের হাট পেয়ে তুমি 
আজ বিষণ খুশি, 
এই সবের জন্য আমরা 
খোদাকে কেন দোষী। 

#রচনা:২৮/৭/২০
#স্বরবৃত্ত:৪+৪+৪+১/২

কথায় চাপা পড়ব
- সিক্তা পাল

আমার কথা শুনবে কে আর
কথায় চাপা পড়বে।
আমার লেখা পড়বে কে আর
ধূলায় চাপা পড়বে। 
আমার ব্যথায় ঝরবে কি আর
অশ্রু ঐ পাষাণ বুকে!
জননী বুকের স্নেহে গড়া—
পাবে যখন ঠ্যাঙের জোর,
তারই তলায় দমিয়ে রাখে
ভ্রুকুটি আর পাষাণ ঠুকে।
কোমল হাতে গড়া পুতুল —
ধংসের খেলায় ওঠে মেতে। 
কঠোর আর কোমল মিশ্রণে 
গড়ে ওঠে হাই ব্রিট।
এদের হাতে সমাজ পরে
নাভিঃশ্বাস ওই উঠলো বুঝি!
জননী আজ বিপন্ন ,
অস্তিত্ব তার রাখা দায়।
দক্ষ মাঝির অভাবে 
নৌকা যে আজ টলমলায়।।

নীল যমুনায়
- কিরণময় নন্দী

কি জানি কিসের তরে,আসি ছুটে বারেবারে
তোর এক ইশারায়
কি জাদু তোর কাছে,দেখি না ফিরে পিছে
ঢেউ তোলে মোর হৃদ-যমুনায়।

হয়তো দিনের শেষে,ক্লান্ত বিহঙ্গ ফেরে অবশেষে
আপন নীড়ের পানে
বাঁশরীর শব্দ শুনি নাই,তবু মন ছুটে ছুটে যায়
আমার প্রিয় মাধবীলতার টানে।

শেষ খেয়া টেনে মাঝি, ফিরে যায় নিজ বাটী
বেলা শেষে নিজ কুটীরে
আমি বসি শাখী তলে,তোর পাশে অবহেলে
একরাশ জমা কথা মোর অন্তরে।

ভীষণ শান্ত তুই, স্থির আঁখি দিগন্ত ছুঁই
কত কবিতা আমায় ঘিরে
হয়তো বা বনলতা ভেবে, খোলা অলকের অনুভবে
নানা উপমা হাজার কথার ভীড়ে।

হঠাৎ ঘন মেঘ আকাশ জুড়ে, পথিক ছোটে আপন ঘরে
দুজনে বৃষ্টির অপেক্ষায়
বৃষ্টির প্রবলধারা, দুই দেহ দিশেহারা
ভীষণ ছন্দ মাধবীলতায়।

এইভাবে কাছে আসা, নয় শুধু শরীরী নেশা
আমি তোরে ভালোবাসি নীল
মোর দেহমন তোর তরে, রেখেছি সাজিয়ে বহুদিন ধরে
একদেহে হবো বিলীন।

কি জানি কিসের তরে,আসি ছুটে বারেবারে 
তোর এক ইশারায়
কি জাদু তোর কাছে,দেখি না ফিরে পিছে
ঢেউ তোলে মোর হৃদ-যমুনায়।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget