জুলাই 2020

বিভাগ : গদ‍্যকবিতা
শিরোনাম : যন্ত্রণা 
কলমে : সুমন মন্ডল

আঘাত শুধু শরীরেরই  করলে পারতিস। 
হয়তো কিছু সময় কাঁদতাম,কিছুটা ব‍্যথা অনুভব করতাম কিন্তু তার পর
ঔষুধে ক্ষতটা পূরণ হয়ে যেত।
কিন্তু আঘাতটা এমন জাগায় করেছিস
যা সহজে সারার নয়।
মনের গহীনে ঘটেছে রক্তক্ষরণ।
যার ঔষধি কেবলমাত্র সময়ের হাতে।
এ যন্ত্রণা বড়ো দুর্লভ যা মনকে কুড়ে কুড়ে শেষ করে।
আজ তা আমার বড়ো আপন হাজার হোক তোর স্মৃতি যে মিশে।
আজও সিগারেটের ধোঁয়ায় তোর ঠোঁটের পরশ অনুভব করি।
কি কারণে রে, এই পরিচয়হীন মানুষের পরিচয় দিয়ে সমস্ত সত্ত্বা কেড়ে নিলি।
আজ তোর দেওয়া আঘাত আর বুকের যন্ত্রণা ছাড়া কিছুই নেই রে আমার।
কিছুই নেই।

তারিখ : 30/07/2020

কবিতা - বন্ধু চল
কলমে - ঝুমা মল্লিক

বন্ধু মানে নীল আকাশে নতুন নতুন ঘুড়ি,
     আয় একটুখানি উড়ি।
বন্ধু মানে মজার ঠিকানায় চল।
       মনের কথা বল।
বন্ধু মানে আমরা সবাই সবুজ মাঠে।
        একটিবার আয় ছুটে।
বন্ধু মানে হুটোপুটি
      একটু হাসি ,লুটোপুটি।
বন্ধু মানে মায়ার বাঁধন।
    কাছাকাছি আমরা সবাই একটি মাত্র আসন।
বন্ধু মানে রঙের খেলা।
একটি রঙ ফিকে হলে অন্য রঙের জ্বালা।
বন্ধু মানে শব্দের নেই কোন বাঁধা।
চোখে লাগেনা ধাঁধা।
বন্ধু মানে একটু জলের খোঁজ।
প্রয়োজন টা বোঝ।
বন্ধু মানে সুখের চাবি।
কতো খেলার ছবি।
বন্ধু মানে  একটি বিপ্লব হোক।
বন্ধুত্ব আরো গভীর হোক।

করব প্রমাণ
- নূপুর আঢ‍্য

লক্ষ‍্যপথে যাবো এগিয়ে,
থাকব না অযথা ভয়ে।
আমরা আজও জীব শ্রেষ্ঠ,
করব প্রমাণ কর্মের মাঝে।
মানব না মেকি অদৃষ্ট,
থাকব কর্তব্যে একনিষ্ঠ।

কর্মের মাঝে আছে শক্তি,
কভু কোন কারণে,
কর্মে দেব না ফাঁকি।
বিজয় রথ চলবে এগিয়ে,
হবো হবোই জয়ী,
থাকবে না কোন ঝুঁকি।

এখনও যারা কর্ম বিমুখ,
অদৃশ্যের প্রলোভনে আছে বসে,
আপন হৃদয়ে ভরছে দুখ,
হারিয়ে যাবে সময়ের সাথে।
থাকবে না কোন স্মৃতি,
বিষাদে ভরবে শূন্য বুক।

৩০/০৭/২০২০

ভীষণ একা
- কিরণময় নন্দী

ঈশান দিকে কালো মেঘ
বৃষ্টি আসবে ঝেঁপে
বর্ষাতি তোমার বড়ই অপ্রিয়
তুমি খুশি বৃষ্টি গায়ে মেখে।

নিয়ম মেনে বৃষ্টি এলো
অঝোরে শ্রাবণ ধারা
শুধু আমার মন বিষাদ-কালো
তোমার শোকে আমি পাগল-পারা।

তুমি ছিলে কয়েক হাজার মাইল দূরে
তবুও আমার ভীষণ কাছে
সারাদিনে কতই না ফোনে কথা
আমি কষ্ট না পাই পাছে।

স্নানের শেষে কি পোশাকে
কেমন রূপে আমি
বারেবারেই তোমার খোঁজ
আমি আর খোকা নাকি তোমার বড্ড দামি।

জানো দূরেই তুমি ছিলে বটে
সেইতো বছরে একবার আসা
মজা করেই কাটতো কয়টা দিন
ফিরে যেতে কষ্ট পেতে, এটাই ভালোবাসা।

শেষের বারে যাবার আগে
খোকা তোমায় জড়িয়ে ধরে
কান্নায় বুক ভাসিয়ে দিলে
আমি গোপনে কাঁদি, তুমি কাঁদলে অঝোরে।

এবার ফিরে যাবো নাকো আর
বললে, থাকবো তোমাদের সাথে
খোকা সেকি ভীষণ খুশি
বিদায় দিলাম তোমায়, একরাশ আশাতে।

আকাশ ছুঁয়ে উড়লো তোমার
পশ্চিমের হাওয়াই জাহাজ
এবার ফিরে যাবে নাকো আর
অপেক্ষায় তোমার রুবিনা আজ।

তারপর কিযে হলো দুনিয়া জুড়ে
জীবাণুর তান্ডবলীলা
একে একে কত সংসার ছাড়খার
হে খোদা, এ কিসের মারণখেলা!

মায়ের কোল খালি করে
মৃত্যুর দেশে তাজা তাজা প্রাণ
তুমিও সেই একই পথের যাত্রী
তোমায় কেড়ে নিলো জীবাণু শয়তান।

বলো তোমার রুবিনা কেমন করে
থাকবে তোমায় ছেড়ে
বর্ষাতি তোমার ভীষণ অপ্রিয়
তোমার শেষ যাত্রা,সারাদেহ প্লাস্টিকে মুড়ে।

শেষ দেখাটুকু জুটলো না
পারিনি চুমু এঁকে দিতে তোমার ভালে
প্লাস্টিকে মোড়া ওই শেষ ছবিটুকু
তোমার ফোনে আর ঘুম ভাঙবে না সকালে।

অঝোর ধারায় ঝরেই চলে
ভরা শ্রাবণের বৃষ্টিধারা
জানালাপানে চেয়েই আছি
আমি ভীষণ একা,তোমায় ছাড়া।

অভিমান
- শর্মিষ্ঠা দে

তুমি আমার কবিতার মানে খুঁজতে যেও না,
কিছুই বুঝবে না তুমি..
আসলে সব কথা কি আর বলে বোঝানো যায় বলো?
তুমি তো আমার প্রেমিক বলো সবার কাছে,
আমার মন খারাপের হদিস কি তোমার জানা আছে?
আসলে তুমি যেটাকে প্রেম বলো
আমি সেটাকে প্রেম বলিনা।
সারাদিন ফোনে কথা বলা,
স্যোসাল সাইটে নিজেদের ক্যাপশন দিয়ে ছবি দেওয়া,
মুভি দেখতে যাওয়া,
এগুলোই কি ভালোবাসা! 
যদি তোমার চোখে এগুলো ভালোবাসা হয়,
তবে তুমি প্রেমিক হয়ে ওঠোনি।
যে প্রেমিক মনের কথা বোঝেনা,
চোখের অব্যক্ত ভাষা বোঝে না,
সে আর যাই হোক প্রেমিক সে নয়।
ভালোবাসতে গেলে সারাক্ষণ কথা না বললেও হয়,
চাওয়া না পাওয়ার হিসেব থাকে না
প্রেমে কখনো হিসেব মেলে না,
ভালোবাসা এক নীরাপদ আশ্রয় খোঁজে 
একে অপরের বুকে,
দিনের শেষে অঙ্ক গুলি হারিয়ে যায় উষ্ণ আলিঙ্গনে,
কর্তব্যের বন্ধনে জড়াতে ভালো লাগে। 
তুমি কখোনোই প্রেমিক হয়ে উঠতে পারো নি।

৩০.০৭.২০২০


গদ্যকবিতা - অন্য পৃথিবী
কলমে - শিখা গুহ রায়

দিনলিপির আশপাশে
যে মাঠের কাছাকাছি হতে পারিনাআ
শুধু অনুভবেই ছুঁয়ে যাই চন্দ্রিমাবাসর।
প্রায় বেলাশেষের মেঘলা আকাশের  নীচে
সবকিছুই অন্ধকারে ঢেকে আছে।
হঠাৎ এক অন্য হাওয়ার ছায়াপথ জেগেছে
আমার ভিতর ও বাইরে।
পথ ওলটপালট করে
প্রাচীন ঠিকানার দিকেই চলছি
কাছে-দূরের রোদছায়া প্রান্তর মেখে মেখে।
সেই শৈশবের সরলতা মাখা মুখটা
উড়ে যায় গ্রীষ্ম থেকে শীতের রাজ্যে
বিমান ছোঁয়া লম্বা হাতের টা-টা জানিয়ে।
আবেশের পরপারে সেই তো পা মাটিতে —–
আবারও খুঁজে পাই নিজের সীমানা
জেগে দেখি, পৃথিবী ঠিক যেখানে ছিল
সেখানেই রয়ে গেছে।

তারিখ -৩১/৭ /২০২০

#মেটামরফোসিস
#হৈমন্তী_ব্যানার্জী_পাঁজা

ভাঙাচোরা আবেগী কোলাজের ছায়ায়,
এলোমেলো সবটুকুই গচ্ছিত রেখেছি,
পাতার বুকের ভাঁজে সযত্নে_
নকশিকাঁথার জমাট বুননে এঁকেছি।
শব্দেরা মলাটের সঙ্গে ভাব জমিয়েছে বেশ,
হলদে পাতা আর পুরনো ক্ষয়াটে আমি,
কাটাকুটি শব্দদের আঁচড়ে বারবার 
শুক্তির বুকে ভালবাসার মুক্তো খুঁজি রোজ!

তোর ভালবাসার ছোঁয়াচে নেশা,
নিজের কর্কট সত্ত্বার পাশা খেলায় যখন, 
গিলেছে একটু একটু করে আমার,
মন মস্তিষ্কের অনুভূতিদের বাসস্থান!
আর, আমি রোজনামচায় তুলে রেখেছি,
তোর জং ধরা আবেগী আদর,
আমার নিষ্পাপ স্মৃতির সিন্দুকে!

আজও বৃষ্টির ছাঁট, ভেজা পর্দা
কাঁচের ফ্রেমের ওপারের জোড়া ছবি
যখন নিয়ে যায় সেই, 
রাকার জোৎস্নার প্রতিশ্রুতির ক্ষণে,
নিঃশর্ত বন্ধুর রেখা টানা বুকে হলদে পাতার 
লাল নীল, কালো রেখার অবয়বে,
আজও ঘটে কান্নাদের মেটামরফোসিস!

অতীতের পলাশ
- কিরণময় নন্দী

প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের প্রলয়লীলায় সামাজিক জীবনে বহু মানুষের ক্ষতি করে। একইরকম ভাবে মানসিক যন্ত্রনা ও একরাশ হতাশায় মানুষ ভীষণ ক্ষতির মুখে পড়ে। তফাৎ হলো মানসিক যন্ত্রণার ক্ষয়ক্ষতি আপাতদৃষ্টিতে চোখে পড়া মুশকিল। বুকের ভিতরের যন্ত্রণার পরিমাপ করার যন্ত্র আজও আবিষ্কার হয়নি। নাড়ি ছুঁয়ে ডাক্তারবাবুও অনুমান করতে পারেন না। মনস্তত্ববিদরা কিছু ক্ষেত্রে অনুমান করেন কিন্তু গভীরতা বুঝতে অসমর্থ হন বারেবারে।
     পরীর জীবনের আঠারো বছর বয়েসেই বিয়ের ফুল ফুটেছিলো। কিন্তু রাঙা পলাশের মতো বাহ্যিক এক বসন্তের শোভা দিয়েই ঝরে পড়েছিলো গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহে। আদিবাসী ভরত ওরাং এর জীবনের পথ প্রাণঘাতী কর্কট রোগ কেড়ে নেয় অকালে। উনিশ বসন্তের শিমুল পলাশের সৌন্দর্য্য উপভোগ করার আগেই পরীর জীবনে নেমে আসে একরাশ অন্ধকার। গর্ভে নতুন জীবন। এগারো ক্লাস পড়া শিক্ষিতা তরুণী পরীর কাছে এক অসম লড়াই। স্বামী-শ্বশুরের ভিটেই থেকে গর্ভের শিশুকে জন্ম দেওয়া শুধু নয়,মানুষ করার সামাজিক সংগ্রাম। বৃদ্ধ রুগ্ন শ্বশুর চেষ্টা করেও দুবেলা আহারের সংস্থান করতে অক্ষম। 
ছেলেবেলা থেকে সামাজিক লড়াই করা পরী বিয়ের পর স্বপ্ন দেখেছিলো ক্ষুদ্র বিলাসিতার। স্বামী পরিশ্রম করে অভাবের সংসারে কিছু আনবে আর পরী দুমুঠো রেঁধে পরিবারের সকলের মুখে তুলে দেবে। কিন্তু সব শেষ।
    পরীর এখন একমাত্র সম্বল ছয় বছরের ছেলে পলাশ। বছর দুয়েক আগে ভরতের বাবা মানে পরীর শ্বশুরও গত হয়েছেন। দু-কামরা মাটির বাড়ি। নিকোনা দেওয়াল। দেওয়ালে আদিবাসী পরম্পরার নানা ছবি। পাশের পাড়ার কানুরাম সর্দারের বাড়িতে পরী কাজ করে। খুব সকালে উঠে ছেলেকে নিয়ে চলে যায় কানুরাম বাবুর বাড়ি। পলাশকে পাশে বসিয়ে গৃহস্থ বাড়ির সকল কাজ করে। রান্নার সমস্ত উপকরণের ব্যবস্থা করে তবেই বাড়িতে ফেরা। তারপর নিজের বাড়িতে কাজকর্ম সেরে মা-বেটার রান্না। নিজেদের বাড়ির সামনে শাকপালা লাগিয়েছে পরী। গ্রীষ্মে পাশের পুকুরটা প্রায় শুকিয়ে গেলেও বছরের বাকি সময়ে জল থাকে। ফলে শাকপালা কয়টা ফলাতে খুব একটা অসুবিধা হয়না। প্রতি সন্ধ্যায় নিয়ম করে পরী ছেলেকে নিয়ে পড়াতে বসে। মুখে মুখে পলাশ অনেক কিছু শিখে গেছে। ওর গাঁয়ের নাম, জেলা,রাজ্য, দেশের নাম-অনেক কিছু। ও আদিবাসী সংস্কৃতি ছাড়াও বাঙালি আবেগ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেছে। শুনেছে ছোটবেলার রবি ঠাকুরের গল্প। ট্রেনে করে হিমালয়ে বেড়াতে যাওয়া, গন্ডির মধ্যে আটকে থাকা, বাড়িতে কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা কত কি?
    পলাশ মায়ের কাছে শোনে কবি নজরুলের কবিতা-গান। ও দেশ স্বাধীন হবার সংগ্রামী কাহিনী শোনে মায়ের কাছে। শোনে এতোয়া মুন্ডার কথা, তিতুমীরের লড়াই কিংবা সিধু-কানুর সংগ্রাম। শুনতে শুনতে কখনও কখনও মায়ের কোলে ঘুমিয়ে পড়ে আবার কখনও মায়ের কোলে শুয়ে একসাথে গান করে। 
      এইভাবেই বুক চেপে মুখ বুজে চলছিলো পরীর জীবন সংগ্রাম। হঠাৎ গাঁয়ের হাইস্কুলের হেড মাস্টারমশাই রামতনু বাবু পরীর বাড়িতে একদিন সন্ধ্যেবেলা এলেন। নিপাট ভদ্রমানুষ। দাওয়ায় বসলেন একটা চেটি পেতে। পলাশ বাতাসা-মুড়ি নিয়ে এলো বাটিতে করে। রামতনু বাবু মুড়ি খেতে খেতে পলাশের নানা খোঁজ নিলেন। আর শেষে একটি বাড়িতে দু-বেলা কাজ করে দেবার অনুরোধ করলেন পরীকে। অনেকদূর থেকে এক মাস্টারমশাই গাঁয়ের স্কুলে চাকরি করতে এসেছেন। একাই থাকেন ইস্কুলের পাশে শ্যামলাল বাবুদের বাড়িতে। শ্যামলাল বাবুরা কলকাতায় থাকেন। ওদের বাড়ির একটি ঘরে থাকেন মাস্টারমশাই। রান্নাঘর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছেন ওনারা। রামতনু বাবুর অনুরোধে আর কিছু বাড়তি উপার্জনের আশায় পরী রাজি হয়ে যায়। একটু ভোরে উঠতে হবে এই আর কি। দুঘরে কাজ করতে হবে। সামনে পলাশের ভবিষ্যৎ, আর অভাবের জ্বালা। পরীর কাছে বিকল্পই বা কি আছে।
      পরের দিন সকালে রামতনু বাবু নিজে নিয়ে যান পরীকে মাস্টারমশাই এর বাড়ি। পলাশও যায় সাথে। তখন মাস্টারমশাই বাজারে চলে গেছেন। পরী স্কুলের রান্না করতে হবে এইভেবে দ্রুত রান্না বসিয়ে দেয়। ভাত ডাল ডিমের কারি আর একটু বাটিপোস্ত বানিয়ে দ্রুত চলে আসে ওখান থেকে। আর এক বাড়িতে কাজ। তাই অপেক্ষা করলে চলবে না।
সন্ধ্যেবেলা অন্যবাড়িতে কাজ সেরে পলাশকে নিয়ে পরী হাজির হলো মাস্টারমশাই এর বাড়ি। ওখানে তখন হেডস্যারের সাথে গল্প করছেন মাস্টারমশাই। পরী সোজা রান্নাঘরে ঢুকে যায়। দুপুরের কটা বাসন ধুয়ে রান্না বসিয়ে দেয়। হেডস্যার কাজের তাড়া আছে বলে বেড়িয়ে গেলেন। পরীর ইচ্ছে হলো মাস্টারমশাইকে একবার দেখা। কেমন মানুষ একবার চোখে দেখা। রান্না করতে করতে উঁকি মেরে ঘরের দিকে তাকিয়ে দেখে পরী। পলাশের সাথে কথা বলছেন নতুন মাস্টারমশাই। হাতের বইটা দেখা যাচ্ছে কিন্তু মুখ দেখা যাচ্ছে না। একবার উঠে পলাশের জন্য খাতা-পেন আনতে গেলো মাস্টারমশাই। আর তখনই পরী মাস্টারমশাইকে প্রথম দেখলো। একি! পরী অবাক হয়ে গেলো। এতো সেই বেগনকোদার সুরঞ্জনদা। সুরঞ্জনদার বাবা তখন পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ। শ্বশুরবাড়ির ঠিকানা ঝালদা হলেও জন্মভিটা অযোধ্যা পাহাড়ের কোলঘেঁষে বেগনকোদা। সেখানেই পরিচয় সুরঞ্জনদার সাথে। পরী অনেক কষ্ট করে পড়াশোনা করতো। সারাসকাল সংসারের সবকাজ সেরে ইস্কুলে আসতো পরী। সুরঞ্জনদার সাথে পরীর কথাবার্তায় ভীষণ মিল হতো। পড়াশোনার বাইরে বহির্বিশ্বের নানা কথা নিয়ে আলোচনা হতো দুজনের। খুব কাছাকাছি হয়েছিলো দুজনে। কিন্তু কৈশোর থেকে তারুণ্যের দোরগোড়ায় পৌঁছানো পরী বা সুরঞ্জন দুজনের মধ্যে কোনো নতুন সম্পর্ক তৈরীর স্বপ্ন দেখেনি কিন্তু পাশাপাশি কিছু সময় কাটাতে ভালোবাসতো। উচ্চমাধ্যমিক দিয়ে সুরঞ্জন বেগনকোদা ছেড়ে কলকাতায় চলে যায়। আর পরী একাদশ ক্লাসের গন্ডি কাটিয়ে বাড়ির চাপে বিয়ে করতে বাধ্য হয় ঝালদার ভরত ওরাং এর সাথে। ভরত ভীষণ ভালো মানুষ ও পরিশ্রমী। ভরত লেখাপড়া না জানলেও ভীষণ ভালোবাসতো পরীকে, পরীর কাছ থেকে দেশবিদেশের নানা গল্প শুনত। 
   পলাশ ছুটে এসে মাকে মাস্টারমশাই এর জন্য চা বানানোর কথা বলে। পরীর অতীত ভাবনা কিছুক্ষণের জন্য ছেদ পড়ে। চা বানিয়ে পলাশকে নিয়ে যেতে বলে পরী। এইবেশে সুরঞ্জনদার কাছে যেতে পরীর ভয় লাগে। রাতের রান্না সেরে পলাশকে নিয়ে তাড়াতাড়ি বাড়ি চলে আসে পরী। মাঝরাতে ভীষণ বৃষ্টি আর বাজের শব্দে ঘুম ভেঙে যায় পরীর। উত্তর দিকের জানালা দিয়ে ঝড়ো হওয়া ঢুকছে আর আকাশ ভেদ করা বিদ্যুতের ঝলকানিতে  গোটা মাঠ আলোকিত হয়ে যাচ্ছে। দূরে দুই পলাশ গাছ বৃষ্টিতে কাঁপছে। উপায় থাকলে হয়তো এই দুর্যোগে একে অপরকে জড়িয়ে ধরতো। কিন্তু কাছাকাছি থেকেও এই সামান্য দূরত্ব অতিক্রম করে দুই পলাশ গাছ জড়িয়ে ধরতে পারছে না একে অপরকে।
      পরী এই দুর্যোগে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছে বেগণকোদার রাইচরণ হাইস্কুলের কথা। বাড়িতে অভাব থাকলেও কি হাসিখুসির দিন ছিলো। কত বান্ধবী, বাড়িতে মা-বাবা-ভাই, আর কল্পনা হোক বা বাস্তবের আলোচনা পাশে সুরঞ্জনদা। হঠাৎ করে হারিয়ে গেল সুরঞ্জনদা। তারপর পরীর জীবন এলোমেলো হয়ে গেলো। সাময়িক খুশি এনেছিলো ভরত। কিন্তু ভয়ঙ্কর রোগের থাবা সেই আনন্দটা কেড়ে নিলো। এখন একমাত্র ভরসা পলাশ। কিন্তু পরী কিভাবে যাবে সুরঞ্জনদার কাছে। মনে মনে পরী স্বপ্ন দেখেছিলো সুরঞ্জনকে। কিন্তু মুখ ফুটে বলার সাহস হয়নি কোনোদিনও। সেদিনও সুরঞ্জনদা ভীষণ কাছাকাছি আজও খুব কাছে কিন্তু বহুদূরে। 
বৃষ্টির বেগ বাড়লো। পরী বিছানায় এসে পলাশের গায়ে মোটা চাদর চাপিয়ে দিয়ে পাশে বসলো। পঁচিশ বছরের পরী জীবন সংগ্রামে আজ বড়ো অসহায় বোধ করছে। 
      সকালে পরী একাই সুরঞ্জনের বাড়ি গেলো। পলাশ পাশের বাড়ির ছেলেদের সাথে উঠোনে খেলছে। পরী দ্রুত রান্নাঘরে ঢুকে রাতের বাসনপত্র মেজে চা নিয়ে ঢুকলো সুরঞ্জনের ঘরে। সুরঞ্জন ডায়েরী লিখছে মন দিয়ে। পরী চা টেবিলে রেখে পিছন ফিরতেই সুরঞ্জন উঠে দাঁড়িয়ে পরীর মুখোমুখি হলো। দীর্ঘক্ষণ কোনো কথা হলো না। একে অপরকে দেখতে থাকলো। পরীর চোখের জল গাল বেয়ে ভেসে চলেছে। 
রান্না শেষে পরী বেড়িয়ে যাবে, সুরঞ্জন পথ আটকালো। ওর ডায়েরীটা তুলে দিলো পরীর হাতে। পরী ছুটে চলে গেলো বাড়ির দিকে।
সন্ধ্যেবেলা পরী রান্না করতে গেলো না সুরঞ্জনের বাড়িতে। মনের কষ্টে শরীরটাও ভারী। তার উপর ঋতুকষ্ট। প্রতিমাসেই দুতিনদিন বেশ কষ্ট পায় ও। আগে এমন হতো না। দিনদিন এই কষ্টও বেড়ে চলেছে। 
পলাশ খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লো আজ। সারাদিন খেলাধুলো করে ক্লান্ত।
আজও রাতে বৃষ্টি হচ্ছে। তবে ঝিমঝিম করে। উত্তরের জানালা খোলা। হ্যারিকেনের আলোয় পরী ডায়েরীর পাতা উল্টালো। প্রথমেই একটি ছবি আটকানো আছে। হাতে আঁকা ছবি। এতো পরীর নিজের হাতে আঁকা। দুই পলাশের ভাববিনিময়ের ছবি। তারপর একের পর এক কবিতা। ছত্রে ছত্রে শিমুল,পলাশ, কৃষ্ণচূড়া আর বেগনকোদার স্মৃতি। সানবাঁধানো ঘাট, রাইচরণ স্কুল, অনুর্বর মাটি, শীতের পুরুলিয়া, হৃদয়ের অযোধ্যা আরও কত কি! "দুই পলাশ" ছোটো গল্প।পরী পড়তে শুরু করে। 
  ভোর হয়ে এলো। বৃষ্টি থেমে গেছে। পূব আকাশ পরিষ্কার। পরী দাঁড়িয়ে আছে জানালার পাশে। আজও সুরঞ্জনের হৃদয়ে পরীর এতটা স্থান, পরী ভাবতেই পারে না।"দুই পলাশ" ওদের জীবনের কাহিনী। তারুণ্যের প্রবেশ করা দুই ছেলে-মেয়ের না-বলা অনেক কথার জীবন্ত প্রতিরূপ।  
পরী কি করবে বুঝে উঠতে পারে না। সামাজিকতা নাকি না-বলা কথার ইতি করে নতুন ভাবনা। সব গুলিয়ে যায়। সারারাত জাগার ধকলে পরী বেশ অসুস্থ বোধ করে। বিছানায় শুয়ে পরে। গায়ের উত্তাপ বাড়তে থাকে। পলাশ ঘুম থেকে উঠে দেখে মায়ের সারাশরীর জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। মা প্রায় অচেতন। ছুটে যায় হেডস্যারের বাড়ি।
পরী এখন বেশ সুস্থ। জ্ঞান ফিরতে ও বুঝতে পারে গ্রামীণ হাসপাতালের বিছানায় ও। পাশে বসে আছে পলাশ। একটু দূরে হেডস্যার ও সুরঞ্জন দাঁড়িয়ে আছে। নার্সদিদিমনি বললেন ও আপাতত সুস্থ হলেও শরীরের ভিতরে বেশ ইনফেকশন আছে। ভালো চিকিৎসার জন্য সদরে নিয়ে যেতে হবে। 
এম্বুলেন্সে পরী শুয়ে। গাড়ি চালকের পাশে হেডস্যার। আর পরীর পাশে পলাশ ও সুরঞ্জন। এম্বুলেন্স ছুটছে দ্রুতবেগে। সদর হাসপাতাল প্রায় ষাট কিলোমিটার। পলাশ গাড়ির ঝাঁকুনিতে ঘুমিয়ে পড়েছে। সুরঞ্জন পরীর হাতে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করলো, "পরী কেমন আছো এখন?"
পরী কাঁদছে। আর শক্ত করে ধরলো সুরঞ্জনের হাত। এম্বুলেন্স ভীষণ গতিতে ছুটে চলল সদর হাসপাতালের দিকে.....

স্রোতের টানে
- অঞ্জলী দাশ গুপ্ত

সময়ের অপেক্ষার মুহূর্ত ক্রমশই ভিজে যায়
চোখের নোনা জলে সিক্ত হয় হৃদয়, 
হাতের মুঠোয়  বিবেক শূন্য স্মৃতির আস্ফালন
মোমের গলনে হচ্ছে কেবল মনের ক্ষয় ! 

সময়ের বেড়া জালে পলি জমে স্মৃতিতে
স্মৃতির প্রেক্ষাপটে অকস্মাৎ জাগে ভালোবাসা,
অনুভূতিদের মৃত্যুতে রচে জরাজীর্ণ কবর
শূন্যে ভাসে মৃত অন্তরের দগ্ধ ভাষা।

স্রোতের টানে হারিয়ে যায় পথের দিশা
অজানা সংকেতে নিথর হয় মনের অস্থিরতা,
সমুদ্রতটের বালুচরে লুপ্ত ঝিনুকের খোলসে
ক্রমশ নিষ্প্রাণ হয়ে আসে স্রোতস্বিনীর খরতা।।

শিরোনাম - দূরত্ব
কলমে - ঝুমা মল্লিক

ভাগীরথীর জলে ভাগ্য করেছি দান।
মান সম্মান আগলে রেখেছি নেই কোন ভান।
অধিকার করেছি প্রদান।
ভাঙা মন ভেঙেছে তবুও করেছি দান।
মন্ত্রপাঠ করেছি ,কাছাকাছি জল।
জাতীয় শোক নয় ,বরং শিক্ষা।

যে দূরত্ব মেপেছি এতকাল।
তা আরো দীর্ঘ হলো গতকাল।
এ জন্মে কেন ,পরজন্মেও চাইনা শালপাতা গোছাতে।
চোখের জল মোছাতে।অথবা
ধানের জমির সীমানা বোঝাতে।
প্রশ্নহীন হোক মাটি।ফসল ফলবে খাটি।

জন্ম  এবং জন্মান্তরে বিশ্বাস করি।
মেয়ে জন্মে আমি তোমাদের কৃপা করি।

২৯।৭।২০২০

তোমার জন্য
- শ্যামল চন্দ্র ভাওয়াল

তোমার জন্য মেঘলা আকাশ,
রোদ উঠেনি সারাদিনে।
তোমার জন্য একলা আমি,
সাথী খুঁজিনি চলার পথে।
তোমার  জন্য কদম ফোটেনি,
বৃষ্টি ও নেই আষাঢ়ে।
তোমার জন্য স্রোতহীন নদী,
শরতে কাশ ফোটেনি। 
তোমার জন্য স্তব্ধ দুপুরে,
দাঁড় কাক শুধু ডেকে ফেরে।
তোমার জন্য জোয়ার আসেনি,
সচল সাগরের বুকে।
তোমার জন্য বসন্ত আসেনি,
বাগানে ফুল ফোটেনি।
তোমার জন্য সকাল হয়নি,
আলো আসেনি এখনো।
তোমার জন্য একলা আকাশ,
দূরে মাটিতে মিশেনি।
তোমার জন্য আঁধার রাত,
চাঁদ আলো দেয় নি।
তোমার জন্য উদাসীন আমি,
সংসারের ধার ধারিনি।

২৯/০৭/২০২০
দুপুর-১২টা।


গদ্যকবিতা - মন
কলমে - শিখা গুহ রায়

সম্পর্কের কাছে 
মানুষ দুর্বল হয়ে যায় বারবার
যখনি একা একা থাকি,
কাছের মানুষটির কথা মনে পড়ে ।
যতই দূরে থাকুক
ব্যাস্ততা তো সারা জীবনের জন্য, 
মাঝে মধ্যে একটা সময় বের করে নিতে হয়
নিজের প্রোয়োজনে। 
জমে থাকা কষ্টের পাহাড় গুলোকে
একটু হালকা করার জন্য
কাছা কাছি না থাকলেও,
 ছায়ার মত পাসে পাসে থাকি
সেটা তুমি উপলব্ধি করতে পারো?
কখনো সময় হলে
সেই অজানা প্রশ্নের উত্তর দিও। 
খুব ইচ্ছে করে দেখি, দু-চোখ মেলে,
মন বড় উচাটন চড়ুই পাখির মতো।
হৃদয়ের সাথে মনের  কোন মিল নেই,
তবুও তারা একসাথে মিলে থাকে।
মাঝে মাঝে মনে হয় হারিয়ে যাও!
কাছেই আছ,তবু কেন দূরে।
রাত যত গভীর হতে থাকে
দুটি চোখের পাতা একহয়ে যায়,
  মনে হয় সপ্নের ঘোরে সামনে এসে,
,ভেষে বেড়ায়। মনের সপ্ন মনেই থাক,
বাস্তবে কোনদিনই ফিরে আসবে না।
ভালো আছি, ভালো থেকো,
মাঝে মাঝে মেসেজ করো।

তারিখ-২৯/৭/২০২০

আমার পাগলি
- অলোক নস্কর

রোদ ঝলমল আকাশ আজ
কেমন আছিস তুই ?
চল দু'জনে পদ্মফুল আর
তুলে আনি জুঁই।

আর যদি না দেখা হয়
স্মৃতি থাকবে পড়ে ,
পরপারে যাবার সময়
থাকিস আমায় ধরে ।

কথা দিলাম যাবো দু'জন
এক‌ই সাথে চলে ,
সত্যি যদি ভালবাসিস
যাস তাহলে বলে।

তুই-যে আমার ইহকাল
পরকালের সাথী ,
তোকে নিয়েই সারাটাদিন
আনন্দ-তে মাতি ।

তুই-যে হলি জনম থেকে
আমার আপনজন ,
তোকেই আমি সব দিয়েছি
আমার তনু মন ।

তোর প্রাণেতে সদাই সুখ
ভরে দিতে চাই ,
তু‌ই বিনা-যে অন্ধকার
আমার আলো নাই ।

স্বর্গ নরক যেখানে হোক
থাকবো তোর সাথে ,
সব স্থানেতেই শান্তি আমার
হাত রেখে তোর হাতে ।


পবিত্র আলোর স্পর্শে জীবন হোক আনন্দময়
রচনাকাল - 27.07.2020

মানুষের বোধ
কলমে : সুমন মন্ডল

কিসের বন্ধু লকডাউন আর 
পুলিশ করবে কি?
মানুষের ভালো মানুষ না বুঝলে
সরকার করবে কি?

কোনদিন ওই লাঠির জোরে
কি বা করা গেছে।
দু'শো বছরের ইংরেজরা
বন্ধুক নিয়ে ছুটেছে।।

মানুষের বোধে জন্মেছিল
সরাজ আনার নেশা।
খন্ড হিন্দুস্থান স্বাধীন হল
পেয়ে স্বাধীনতার দিশা।।

মানুষ যেদিন ভৃত হবে
খোঁজবে বাঁচার পথ।
সেদিন সরকার বলতে হবে না
বন্ধ হবে, এ দৈরাত‍্যের রথ।।

পথ ঘট এমন শুনশান হয়
দেখেছে কখনও কেউ।
শাসক - বিরোধীর বন্ধে ও
আসেনি এমন ঢেউ ।।

মানুষের বোধে আসবে যেদিন 
আমি আমরা বাঁচবো।
সরকারের সেদিন বলতে হবেনা 
দেখবে আমরা কেমন সাজবো।।

আসুক সেদিন খুব তাড়িতাড়ি
আমরা আশায় আছি।
মাস্ক পড়ে দূরত্ব রেখে
পরিস্কার ভাবে বাঁচি।।

তারিখ : 28/07/2020

পাহাড় কোলে 
- উৎপল রাউত

সাদা মেঘ আলতো করে পাহাড় চূড়ায় আদর করে,
পাহাড় বুকে থরে থরে আঁধার আলো খেলা করে  !
নদী ছোটে চূড়ার কোলে ,খুশির হাসি স্বচ্ছ জলে
শৈল তারে বিদায় বলে ,বুকের ব্যাথায় অশ্রু গলে ।

নদী তুমি এগিয়ে চলো,শৈল মা'কে ওমনি ভোলো
 বরফ গলে  জন্ম হল, শীতল স্রোত খুব ধারালো ;
 প্রবল বেগে এই তটিনী,বহে যেতে ব্যস্ত জানি,
মায়ের ব্যথা কতখানি, ভুলেই গেছে কল্লোলিনী !

তরঙ্গিনী আনন্দধারা,  হাসতে থাকে নদী কিনারা
ছোট্ট ছোট্ট কুটিরে ভরা, শান্ত এই গ্রাম আত্মহারা;
ঢালু সবুজ ধানের ক্ষেত,গাঢ় সবুজ বিটপী সমেত,
অল্প নরের জমায়েত, নেই তাদের ভেদাভেদ ।

নিষ্পাপ ব'ইছে সমীর, শান্ত জীবন অধিবাসীর,
গ্রামে ঘেরা নদীর তীর, সাদা রঙের সব কুটির ;
টিভি, মোবাইল, ঠান্ডা ঘর, কিছুই নেই গ্রাম'ভর,
আছে সবার স্বচ্ছ অন্তর, রঙিন এক গ্রাম ভাস্বর !

২৯/০৭/২০

এ কথা না রাখার নাম দেশপ্রেম
- কিরণময় নন্দী

কথা দিয়ে কথা রাখেনি অনেকেই,
এই দেখোনা কবি সুবোধ সরকারের "শাড়ি" কবিতার মেয়েটির স্বামী কি কথা রেখেছিলো?
রাখেনি। তাই আলমারি ভর্তি থাকে থাকে সাজানো রঙ্গিন শাড়ি গুলো তার গায়ে বেমানান।
কথা রাখেনি রবিঠাকুরের "কাবুলিওয়ালা"র মিনি। দীর্ঘ জেলজীবন কাটানোর পর সাধের ছোটোপুতুলের মতো মিনি হয়ে আসেনি কাবুলিওয়ালার কাছে। মিনি তখন যুবতী। কথা না রেখেই সময়ের নিয়মে বড় হয়ে গেছে আর স্মৃতি থেকে মুছে ফেলেছে কাবুলিওয়ালা স্নেহ।

সেই রবিঠাকুরের কথায় আবার এলাম ফিরে। কথা রাখেনি "ছুটি" গল্পের ফটিক। ও ফাঁকি দিয়েছিলো গ্রাম্য শৈশবকে-আর শহুরে কৃত্রিম আতিথেয়তাকে-শহুরে মেকি বন্ধুত্বকে। কিন্তু বিধবা মা আর বোনের কাছে কথা রাখেনি ফটিক। না-ফেরার দেশে চলে গেছে ছুটি উপভোগ করতে।
এমনি করে আজও কথা রাখেনি অনেকেই। সংবাদ শিরোনামে আসা বেতাজ সম্রাটদের কথা বলছি না। কথা দিয়েও ওরা একবর্ণ কথা রাখেনি গরীবের কাছে মানুষের কাছে।
আমি বলছি ওদের কথা যারা কিছুটা সচ্ছলতা আর একরাশ দেশপ্রেমের জন্য ফৌজি হয়ে চলে গেছে লে-লাদাখ-ডোকালাম-সিয়াচেনে। 
ওরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে কথা রেখে যায় মাতৃভূমির কাছে। শুধু মায়ের কাছে-বাবা-বোন-ভাই-বন্ধুদের কাছে শেষবারের দেওয়া কথা রাখতে পারে না। কথা রাখেনা বছর পাঁচেকের ছেলের কাছে বা গভীর ভালোবাসার বউয়ের কাছে। 
তাইতো ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কফিন বন্দী তেরেঙ্গায় মোড়া নিথর লাশের উপর। এ কথা না রাখার নাম "দেশপ্রেম"।

ডানা ভাঙা পাখি
কলমে - জয়া গোস্বামী

অতঃপর...ক্লান্তহীন সামনে চলা ,
          পৃথিবীর রথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ
হতভাগ্য জীবনের সাথে নিয়তির 
          নিষ্ঠুর বিষাক্ত ছোবল জ্বালা 
ধরায় বুকে।সূর্যের কোমল 
         আলোয় দূর কুয়াশার ফাঁকে
আছে সব দাঁড়িয়ে,  জীবনের 
        একি পরিহাস আজ এসেছি 
আমরা সবাই একি জায়গায়
        চেনা মুখ রোজ খুঁজি ফেবুর 
পাতায় আছে  সব সুরক্ষিত 
          ভগবান আজ খুব  অসহায়
পারে না সব এক নিমিষে চমৎকৃত 
         আজ  হয়েছি ,খুব নিরুপায় 
কার বাঁচা কার মরা, কেউ  না  জানি 
          আমার আদরে মানুষত  সবাই
কাউকে ছেড়ে কখন কি থাকা যায় ?
           অহংকার সব গিয়েছে ধুয়ে রাজা প্রজা
সব এক জায়গায় কেউ বলতে পারবে না
           প্রাণ পাখিটা কখন যাবে উড়ে এই কটা 
দিন এখন সব থাকো হাসিমুখে
            প্রহর টা দিচ্ছে হানা  আর ঘরেতে
মনটা বসে না সবাইকে কে দেবে 
            সান্ত্বনা ভাল থাকি এই কথাটা 
কেউ বলে না নয়ত ভাল থাকার 
        ভান করি সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ি 
কল্পতরুর  বুকে, ডানা ভাঙা 
           পাখির  মত  মনে আশা 
নূতন সূর্য দেখবার।

২৯/০৭/২০২০

ভালোবাসার নিদর্শন!
- রোজী নাথ

সেই কবেকার তেপান্তরের আঁচলে আঁচলে ফেলে আসা দিনগুলো আজ নেহাতই স্মৃতির পাতায়।

সেদিনের স্ব-মাত্রিক সবুজ পথের ছায়ায় ছায়ায় ছিল কত প্রতিশ্রুতির শ্রাবণ চোখ।

নেই নেই করে প্রিয় নদীটির মোহনায় কেটে গেছে কত অমূল্য বসন্ত।

আকাশ ছোঁয়া মূল্যের তেমন কিছুই তো চাইনি দুজনে ----- চেয়েছিলাম চিরকালের একটা স্ফটিক জলের বন্ধুত্ব ; একে অপরের সুখ দুঃখে পাশাপাশি থাকার রামধনু শামিয়ানা।

সূর্যটা টাটকা পলাশের স্পর্শ সুখ পাওয়ার আগেই অপরিচিত ঝড়ের দাপটে তছনছ ফাগুন।

দু-কুলে ছিটকে পড়া দুজনের চোখের মণি জুড়ে এখন শুধুই স্মৃতির রোমন্থন।

আমার সকল আশা ভরসার চাঁদে যেন তিথি ছাড়াই এক পূর্ণগ্রাস গ্রহণ লেগে গেল ; সকল বাঁধন ছিন্ন করে আমি চলে গেলাম তোমার থেকে অনেক দূরে।

আমার ইচ্ছের বল কী দোষ ছিল?

মা বাবার ইচ্ছেতেই শেষমেশ পণের সাথেও নিলাম হলাম আমি।

অনতিকালের স্বামীর ঘরের রূপ দেখেছি অনেক 
মুখের উপর লেপ্টে ছিল মুখ ছাড়া সব মুখোশ।

একটা সময় লাগাম ছাড়া অত্যাচারের সাথে মিশে গেল আরও যৌতুকের বুঁদ হ‌ওয়া নেশা।

আত্মসম্মানের সাথে আমি কোনো আপোষ করিনি বলেই গৃহলক্ষীর পুজো হলো গায়ে আগুন লাগিয়ে।

অগ্নিদগ্ধ পবিত্র এই দেবীর শরীর হাসপাতালের শয্যায় বিশ্রাম নিতে নিতে একসময় স্তব্ধ হয়ে গেলো।

আমি এখন বাপের বাড়ীর দেয়ালে টাঙ্গানো মালা সমেত সুন্দর একটা দর্শনীয় ছবি ; এ সমাজ ইতিহাসের অনন্য নিদর্শন।

পরিশেষে একথাই বলি ------ " ভালো থেকো তোমরা ।"

বাসাহীন ভালোবাসা
- কিরণময় নন্দী

জানো অনিরুদ্ধ মা বলতো, ওসব ভালোবাসা বলে কিছু নেই....টাকা না থাকলে ভালোবাসা বাসা পর্যন্ত পৌঁছায় না। 
মা হয়তো মায়ের জায়গা থেকে অনুভূতি ঢেকে আবেগ চেপে কথাগুলি বলেছিলো।
অবশ্য আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেনি,পূবদিকের খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে অনেকটা বলার জন্যেই বলেছিলো।
কালের স্রোতে তুমি হারিয়ে গেছিলে আমার ভালোবাসার আঙিনা থেকে। তোমায় হারিয়ে নিজেকে অনেক গুটিয়ে নিয়েছিলাম অনিরুদ্ধ। হ্যাঁ, শামুকের মতো। শামুকগুলো যেমন বিপদের সংকেতে খোলোকের মাঝে আশ্রয় নেয়, আমিও পুরুষের ভয়ে,ঘৃনায় নিজেকে আবদ্ধ রাখতাম চারদেওয়ালের মধ্যে।
তোমার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবার প্রায় এগারো বছর পর আজ তোমায় দেখলাম অনিরুদ্ধ। ফেসবুকে। তোমার ঠিকানা এখন নিউ জার্সি। বাঃ অনিরুদ্ধ তোমার মেয়ে বেশ সুন্দরী। তোমার মতোই বেশ লম্বা নাক। 
জানো অনিরুদ্ধ তোমায় খুশি দেখে, পরিণত দেখে,সংসারী দেখে আমি কিন্তু ভীষণ খুশি। 
আমিও সংসারী। বাবা মায়ের চাহিদা অনুযায়ী বেশ বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে আমার। বর সরকারী অফিসে বড় চাকরী করে। আমারও মেয়ে। ভীষণ ভালোবাসে আমায়। কিন্তু সবের মাঝে ভালোবাসা নেই অনিরুদ্ধ। 
তোমায় হারিয়ে বেশ কিছুদিন গৃহবন্দী কালে আমি আবিষ্কার করেছিলাম মায়ের ডায়েরী। ছত্রে ছত্রে পেয়েছিলাম সম্পর্ক ভাঙার গল্প। শুধু সামাজিক প্রতিপত্তির জন্য একটা সুন্দর সম্পর্ক ভেঙে যাবার কাহিনী। এতো কান্না কষ্ট দুঃখ আবেগ চেপে এতগুলো বছর কাটিয়ে দিলো আমার মা। তাই সেদিন তোমায় ভুলে যাবার কথাটা আমার চোখে চোখ রেখে বলতে পারেনি।
জানো অনিরুদ্ধ আমার বরের সইয়ের অনেক দাম। মানুষটা টাকা ছাড়া কিছু চেনে না। অসদুপায়ে মানুষটা টাকা কামায়। আর প্রতিরাতে একপেট নেশা করে বাড়ি ফেরে। মেয়েটা ভয়ে যেতেই চায় না। না না মারধর করে না। চেঁচামেচি করে না। বড় সরকারী অফিসার। কিন্তু মেয়েটা হবার পর বিছানাটা সেই যে আলাদা হয়েছে....
আসলে আমাকে বোঝার চেষ্টায় করেনি কোনোদিন। 
যাক তোমায় দেখে আমার ভীষণ ভালো লাগলো অনিরুদ্ধ,যাক তোমায় নিয়ে সংসার করলে মায়ের কথা মতো ভালোবাসা বাসা পর্যন্ত পৌঁছে যেতো। 
ভালো থেকো অনিরুদ্ধ, খুব ভালো থেকো।

প্রতিবন্দী
- জয়া গোস্বামী

মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। জানালার ধারে বসে বৃষ্টি দেখছি। দৃষ্টি চলে গেছে ওই নদী পর্যন্ত। ঘন বৃষ্টি তাই ঝাপসা চারপাশ। হঠাৎ দৃষ্টিসীমায় একটি নারী মূর্তি ভেসে ওঠে। ধীরে ধীরে নদীর দিকে এগিয়ে যায় সে। বৃষ্টির রিমঝিম তানে বিভোর হয়ে ছিলাম আমি। তখনই তাকে দেখলাম। একটি শিশুকে কোলে নিয়ে, ভেজা কাকের মতো জবুথবু হয়ে নদীর ধারে গিয়ে দাঁড়াল। অবাধ্য বৃষ্টিটা দম নেয় একটু। এবার পরিষ্কার দেখতে পাই তাকে। একহাতে সন্তানকে জড়িয়ে ধরে আছে। অন্য হাতে কোদাল। নাড়িছেঁড়া ধনকে এবার মাটিতে নামিয়ে রাখে সে। দুহাতে কোদাল তুলে কোপাতে থাকে মাটি। নিজের মৃত সন্তানের কবর নিজেই খুঁড়ছে এক মা। সন্তানকে মাটি চাপা দিয়ে লুটিয়ে পড়ে কবরে। এক সময় উঠে দাঁড়ায়। মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে ফিরে আসে।
মেয়েটির নাম সালেহা। বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। ছোটবেলায় বাবা মারা গেলে মায়ের অন্যত্র বিয়ে হয়েছিল। কোথাও তার ঠাঁই হয়নি। যখন যেমন, তখন তেমন করেই দিন কাটায়। চেয়ে খেতে খেতে এক সময় ভিক্ষাবৃত্তি হয়ে যায় ওর পেশা। যথারীতি যৌবনে পা দেয়। টলটলে শরীরে বসন্ত ছুঁয়ে যায়। কালো হলেও মেয়েটি দেখতে খারাপ ছিল না। শুনেছি ছোটবেলায় কেউ ওর বা গালে ছাগল বাঁধার খুট দিয়ে গুঁতো মেরেছিল। সেই দাগ সামান্য গর্ত হয়ে টোল পড়ার মতো মুখের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছিল। এসবের কিছুই বোঝে না সে। ময়লা কাপড়েই থাকে দিনের পর দিন। নাওয়া–খাওয়াও ঠিকমতো হয় না। সবাই ওকে ডাকে পাগলি বলে। ঢিল ছুড়ে ওর গায়ে। তারপরও সে শুধু হাসে। কাউকে আক্রমণ করে না।একদিন ওকে নিয়ে সালিস বসল। জানা গেল সে গর্ভবতী। গ্রামের সবাই ওকে একঘরে করে দিল। আষাঢ় মাসের ঘন বর্ষায় ওর একটা ছেলে হল। কয়েক দিন পর নিউমোনিয়ায় বাচ্চাটা মারা গেল। কেউ আসল না সৎকার করার জন্য। কবরস্থানেও জায়গা দিল না। প্রতিবন্ধী মা নিজেই নদীর ধারে বাচ্চাটাকে কবর দিয়ে আসল। মেয়েটির এই অবস্থার জন্য দায়ী কে, সেটা জানা গিয়েছিল। অথচ সালিসে মেয়েটিকেই শাস্তি দেওয়া হলো একঘরে করে দিয়ে।
মেয়েটা প্রতিবন্ধী বলেই হয়তো আত্মহত্যার কথা ভাবেনি।

২৫/০৭/২০২০


ঘূর্ণিমায়া
কলমে - শক্তি কুন্ডু

ঝড়ো হাওয়া বইছিলো চারপাশে ,
ভেঙেচুরে যাচ্ছিলো যা ছিলো... হঠাৎ করে
নদীর ডাকে
 চমকে গেলাম আমি ...পা ভেজাবি ?
ভাসবি আমার বুকের ওপর ...!!!
আমি বললাম,
 একেই তো ঝড়ের দাপট ...
তার ওপরে নদীর বুকে ভাসতে যাওয়া ...না রে
আমার দ্বারা হবেনা এসব !!
নদী বললো তোর ভেতরে ভাসতে পারার ইচ্ছে আছে ,
তোর চোখ দুটো তো তাই বলছে ,
হাবভাবে ও একই শব্দ
 নীরব হলেও জীবন্ত সব ৷

ধরা পড়লাম ....ভাসতে গেলাম ,
মাঝ নদীতে নৌকা ডুবি,
 স্বপ্নগুলো গেলো ডুবে অতল তলে !

এখন শুধু ইতিহাস আর স্মৃতির ঘোরে জীবন কাটাই ৷

তবে শাখানদী উপনদী আশেপাশে ঘুরতে আসে মাঝে মধ্যে...
নানান রকম তোষামোদি কথা বলে অহেতুকি ....!কান পেতে দিই ...
মন পাতিনা ...নদীর থেকে তোষামোদী কথা শুনে 
নষ্ট হবার গল্পগুলো ভুলিনি যে!!

আজ অভিজ্ঞতার চাদর দিয়ে ...সামলে চলি
ঝড়ো হাওয়া ,
নদীর ডাক আর তোষামোদী !!
 ঋণীও বটে এদের কাছে ...জীবন তরী বাইতে এসে ওদের সাথে দেখা হওয়া জরুরি খুব 
শক্তি আসে মনে প্রাণে 
উজানে নৌকা টানার !!

ইচ্ছে আজ
- প্রতাপ মণ্ডল

ইচ্ছে আজ হারিয়ে যাওয়ার
তোমার  থেকে  অনেকদূরে
তুলসীতলায় সাঁঝের প্রদীপ
রাখাল  বাঁশির  মেঠো  সুরে।

গ্রাম্য  বধূর  সলাজ  হাসি
ঢেউ  খেলবে  দীঘির  জলে
ইচ্ছে আজ হারিয়ে যাওয়ার
    তোমার কিছু না বলে....

শ্রাবণ  মেঘে  বৃষ্টি  শুরু
খাবার খোঁজে ডাহুক তখন,
ব্যাঙের ডাকও লাগবে মিঠে
ঝিঁঝিঁর  সুরে  উদাসী  মন।

আকাশ আজ মেঘলা জানো!
সবুজ ধানে ঢেউ খেলে যায়
আলতো  পায়ে  আলপথে
খুঁজবো ফড়িং জোড়ায় জোড়ায়।

পুকুর ঘাটে হাঁসের মিছিল
ফিরবে  চাষী  কাজ  সেরে,
বলদ গুলো  ক্লান্ত ভারী
ফিরবে ওরাও লেজ নেড়ে।

গ্রাম-বাংলার রূপের বাহার
দেখবো আমি দু'চোখ ভরে
ইচ্ছে আজ হারিয়ে যাওয়ার
  তোমার থেকে অনেকদূরে।

কবিতা লিখে ঋদ্ধ
- শ্যামল চন্দ্র ভাওয়াল

অন লাইনে কবিতা লেখার 
আমন্ত্রণ চলছে মহোৎসব,
কেউ একজন করলো আমায় আমন্ত্রণ,
আমি একা বড় একা,
সাড়া দিলাম না তাতে।
নাক সিঁটকালো কি দূরে গেলো,
খবর নেইনি তাঁর।
লেখাজোখা মননের দায়,
জোর করে আমার আসে না।
আঘাত পেলেও তাতে আমার কিছু যায়- আসে না।
আমি বিচ্ছিন্ন, 
আমি আলাদা,
-নিয়ম নীতির বাহিরে।
মহা সমারোহে চলছে উৎসব,
কেউ বাহু তোলে নাচে।
আমি নীরব দর্শক -
তাই দেখি, দু'নয়নে।
মনে আমার বিশাল ক্ষত আমার,
কেউ করে ক্ষতি।
সময় আমার প্রতিকূলে,
তাই বলি না কোন কিছু।
আমার উৎসব কেড়ে নিয়েছে বিধাতার ই ইঙ্গিতে,
পদাঘাতে আঘাত প্রাপ্ত, তাই থাকি শুয়ে শুয়ে।
আমার আনন্দ নিরানন্দ,
-দেখে সবার নৃত্য।
কবিতা লিখে ঋদ্ধ মননে,
 উচ্ছ্বাসিত সবাই যেন দীপ্ত।

২৫/০৭/২০
সকাল-১১টা।

স্বরুপ
- শ্রাবণ বিশ্বাস

জীবের স্বরূপ ভুলিয়া সবে 
করেছি মোহের, মিছে চিত্তানন্দ।
ভেবে দেখো কেউ কারো নয় 
আজ পৃথিবী, তারই দৃষ্টান্ত।
পশুপাখির মুক্ত বিচরণ 
মানুষ খাঁচায় বন্দী! 
শেষ বিদায়ে হচ্ছে না কেউ 
বিদায় বেলার সংগী!
স্বার্থ নেশায় বদ্ধ মানুষ
বুঝিবে কি ইহার মর্ম ? 
থাকতে সময় বুঝিয়া লও 
ওহে অন্ধ,
মানুষের কি ধর্ম ?
পৃথিবী আজ হয়েছে নিরুপায় 
কি করিবে ভাবিয়া না পায়!
বিনা অস্ত্রে করিয়াছে বধ
থমকে দিয়েছে পৃথিবীর রথ।
তুমি-আমি দাম্ভিকতা 
অর্থ-সম্পদ যথাতথা।
সবই কেবল লুকোচুরি 
যতই করো জড়াজড়ি।
মানুষ হয়ে বাচঁ মানুষ 
ফুড়িয়ে এলো বেলা
সবাই মোরা খেলার পুতুল
সবই বিধাতার খেলা।

১৮-০৫-২০২০ইং

দ্বিখণ্ডিত
- কিরণময় নন্দী

তুমি তো সেই আগের মতো
হাসতে ভুলে গেছো
গালের টোলে মেকি হাসি
আড়ালে শুধু চোখের জল মোছো।

তুমি তো সেই আগের মতো
আবেগ দিয়ে গাও না আর গান
গুনগুনিয়ে একলা বসে
গাও শুধু ব্যর্থ প্রেমের গান।

তুমি তো সেই আগের মতো
বৃষ্টিধারায় নও চঞ্চলা হরিণী
অন্তঃকরণ গহীন রাত
পরাজিত বণিক হারিয়ে সপ্ত-তরণী।

তুমি তো সেই আগের মতো
শীতের দিনে বাড়াও না জানালাপানে হাত
শীতল শিশির চমকে ওঠে
অন্তরজুড়ে তীব্র লাভাপাত।

তুমি কি সেই আগের মতো
আমায় মনে করো?
দ্বিখণ্ডিত বক্র-পথ
তোমার মিছে আশা ছাড়ো!

সর্বনাশা বন্যা
- কিরণ মাহমুদ মান্না 


বাংলার মানুষ আজ নিরুপায়,বড় অসহায়, 
করোনার বিশাক্ত ছোবল শেষ হতে না হতেই, 
শুরু হলো আবার দুর্ভিক্ষ, সর্বনাশা বন্যা।
দিন দিন নদী গর্ভে ভেঙে পড়ছে বসতির ভিটা,
ভাঙছে অসহায় গরীব দুঃখীর বুকের পাঁজর। 
ভেসে যাচ্ছে গরীব দুঃখীর কাঁচা পাকা ঘরবাড়ি,
ডুবে মরছে চাষীর হালের বলদ,পালিত পশুপাখি।

প্লাবিত বন্যার জলে ডুবে যাচ্ছে গায়ের রাস্তাঘাট,
অভাব এসে ভিড় করেছে বন্যা দুর্গত এলাকায়।
চারিদিকে থৈথৈ বন্যার জল,এ যেন বিশাল সমুদ্র।
কলাগাছের ভেলায় বসে,বাঁশের ভেলায় বসে
নিজেকে কীটের মতন গুটিয়ে নিয়ে হাঁটু ভাঁজে
দিন কাটাচ্ছে অসহায় গরীব দুঃখী মানুষ।
সর্বস্ব ডুবে যাওয়া কিছু মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে 
স্কুল কলেজ কিংবা মাদ্রাসায়।
সেখানেও পাচ্ছে না ঠিকমত মাথা গুজার ঠাঁই। 

পেট মানে না বারণ, চুলায় জ্বলে না দহন,
অসহায় গরীব দুঃখী মানুষগুলোর না খেয়ে বাঁচন,
চাল নেই, চুলো নেই, সবই গ্রাস করে নিয়েছে বন্যায়।
ক্ষুধার জ্বালায় ছটফটিয়ে কাঁদছে কোলের শিশু 
শিশুর মুখে অন্ন দেবার নাইতো যে মায়ের সামর্থ্য।
দুঃসহ যন্ত্রণায় কাটছে প্রতিটি মানুষের প্রহর,
কে কার জন্য বাড়িয়ে দিবে সাহায্যের হাত,
সবারই যে একি দুরাবস্থা, একই হালচাল। 

সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষগুলোর শহরে বসবাস।
এমন বিপর্যয়, মহামারি তাদের কখনো পায় না,
চোখের সামনে ভেসে উঠে না অনাহারির মুখ,
তাদের বিলাসিতার মাঝে নিশ্চিন্তে বসবাস। 
গরীব দুঃখী,অনাহারির কষ্ট কি করে করবে অনুভব?
এমন দুঃসময়ে তাদের কি প্রাণ কেঁদে উঠে না?
তারাও তো মানুষ,তাদেরও তো বাঁচতে ইচ্ছে হয়।
একই ঈশ্বরের সৃষ্টি সবাই,মানবতাই শ্রেষ্ট ধর্ম যার,
পৃথিবীতে গরীব হওয়াটা কারো দোষ নয়,
যারা আজ উচ্চবিত্ত, এই দুর্যোগ, বন্যা কবলিত 
গরীব দুঃখীর পাশে দাঁড়িয়ে, সাহায্য সহানুভূতি
জানানো কি নৈতিক দায়িত্ব নয়?

২৩/০৭/২০২০ইং 
সিঙ্গাপুর প্রবাসী

বিনিময়ে প্লাস্টিক
- কিরণময় নন্দী

দেখো সোনা আভা রোদ আজও ওঠে পূব আকাশে
আজও আকাশ বেয়ে চলে পাখির সারি
বর্ষার জলে নদী বয়ে চলে কলকল
তুমি-আমি শুধু বসে, জানালায় উঁকি মারি।

আজও ঝমঝম করে বাদল নামে
ব্যাঙ ডাকে প্রাণভরে মিলনের তরে
আজও রাত জেগে ডেকে ওঠে শিয়ালের দল
শুধু তুমি-আমি অজানা ভয়ে ঘরের ভিতরে।

আজও গাছগুলি মাথা নাড়ে দখিনা সমীরণে
আজও বেলফুল সৌরভে মাতে প্রতিদিন
আজও গুনগুন গেয়ে চলে ভ্রমরের দল
খোলা মাঠ ভীষণ একা, ব্যর্থ প্রেমহীন।

এতদিন বারেবারে চিৎকারে কেঁদেছে ধরা
দূষণের জ্বালায় নীরবে নিভৃতে
শুনিনি কথা প্লাস্টিকে মুড়েছি ওরে 
আজ প্লাস্টিকে মোড়া আমরা নানা দেশে দেশে।

শিরোনাম - অশান্ত শ্রাবণ
কলমে - ঝুমা মল্লিক

নদী তুমি কেমন আছো?
এই শ্রাবণে চোখের জলে ভিজবে বলো।
এই শ্রাবণে বৃষ্টি এলে ভিজবে বলো।

নদী তুমি নীরব কেন?
একটি কথা বলতে পারো।
ঘুমপাড়ানিয়া গান গাইতে পারো?
দেখো ওইতো ঘুমিয়ে আছে যারা।
লাইন দিয়ে সাজানো ।ডেডবডি ,তারাই
অপেক্ষা করে ,যাবে তোমার ঘরে।তুমিও অপেক্ষা করো।
একটু অপেক্ষা করো। ওইতো লাইন এগিয়ে চলেছে।
দরজা গেছে খুলে ।এইবার ,আহা শান্তি।

“আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে। এ জীবন পুণ্য করো ।

স্বজন আছে দূরে ,ছোঁয়াছুঁয়ির ভয় শুধু কাছে।
ও নদী তোমার ভয় করেনা?নীরবে ঠাঁই দাও।
নীরব যাত্রা বুঝিয়ে দাও।নীরবে এগিয়ে দাও তোমার আঁচল।
একটু নীরবতা শিখিয়ে দাও।দাও শিখিয়ে।

এই শ্রাবণে ,নদী তুমি ভিজবে।বারেবারে ভিজবে শুধু চোখের জলে।

21/7/2020

রথ - উৎসবে মৃত্তিকা
- শ্রীসেন

হ্যাঁ এটা মৃত্তিকার রথ।

কিনে আনা রথটা সাজাতে সাজাতে খুলে বসলাম-
এই 'আমি' যাকে পড়ে ওঠার তেমন ফুরসত হয়নি তার প্রথম অধ্যায়

পৃষ্ঠা উল্টাতেই রথ-উৎসবে বৃষ্টিভেজা সেই দিন
সারা দুপুর ঘুমহীন আনন্দে রথ সাজানো সারা 
সামান্য ঘুমিয়ে নেওয়ার জন্য মায়ের হুকুম অগ্রাহ্য করে তক্ষুনি রথ নিয়ে বেরোতে যাব
এমনসময় ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি 
বৃষ্টি না থামার অধৈর্য্যে
ঘুম-ঘরের দরজা যখন খুললাম-রাত দশটা
বেগ কমলেও তখনও বর্ষার আবেগ কমেনি
ক্রমশঃ ফুঁসছি...
পারলে হয়ত বর্ষাকে তখন মেরেই ফেলতাম 
ওকে মারলে তার ক্ষতির পরিণামটা ঠিক কতটা তখন কী আর বুঝতাম সেসব?

এমনসময় কাক ভেজা হয়ে বাবার প্রবেশ 
বাবার সাথে ভিজে একসা নির্মল কাকু
ব্যাগের ভেতর থেকে প্লাস্টিকে মোড়ানো কয়েকটা পুতুল বের করে আমার হাতে ধরিয়ে দিতেই
কান্না জুড়ে দিলাম-
এক্ষুণি আমাকেও মেলায় নিয়ে চলো 
আমি ভিজেভিজেই মেলা দেখব

কাকু বলল-মেলা ভেঙেই গেছে মনা
দোকানীরা সব ফিরে যাচ্ছে...

চোখের জল মুছতে মুছতে বললাম-
কাকু রাধারানীও?

এপর্যন্ত পড়তে পড়তেই রথ সাজানো শেষ
আহ্লাদিত মৃত্তিকা রথের সামনে বসেই আছে
ওকে বললাম-
সোনা সেজে নে,বৃষ্টি আসার আগেই 
মায়ের সাথে রথের মেলা দেখে আয়।

এ বয়সে এসে বৃষ্টিকে তো আর মারতে পারি না
তারউপর এবছর আবার বৃষ্টির মন্দাতে
চারিদিকে জলের হাহাকার।

হাহাকার সে তো দোকানীর পেটেও...
@শ্রীসেন
রচনাকালঃ০৪/০৭/২০১৯

স্বপ্ন বিলাসী
কলমে - শৈলেন মন্ডল

শব্দের গোধূলী মিছিলে তোমার অবলীলায় আনাগোনা,
কবিতার দেশে 
ছাড়া আজও তোমায় 
কোনোদিন যায়নি যে চেনা।

কতই না অভিযোগ হয়েছে জমা কতশত অভিমান যত, 
আজও তোমার পাইনি দেখা 
ক্রমেই বেড়ে চলেছে 
ভালোবাসার 
খণ আছে যত।

স্মৃতি বড় বেদনাময় আশাতীত স্বপ্ন জাগায় মনে,
তবুও তৃষিত হৃদয় শুধু ভালোবাসা চায় সঘন সংগোপনে।

আশার আঁচলে বাড়িয়েছি যে হাত শুধু তোমারই ভালোবাসা পেতে,
সলাজ বদনে সজল নয়নে রয়েছি আমরন প্রতীক্ষাতে।

অভিমানের মেঘ কেটে, আসুক বৃষ্টি শত শত ভালোবাসার নামে,
আসুক সুখের পরশ আনন্দের মেলা পাহাড় অভিযোগ এবার যাক থেমে।

তুমি তো জানোই #ভালোবেসে_ভালোবাসি 
কাছে এসো মোর 
যা কিছু অনুযোগ ভুলে, 
বসন্তে পলাশ ফাগুন আর শ্রাবনে বৃষ্টির সন্ধি হবে, আলিঙ্গনে 
তোমায় পেলে।

০৪.০৭.২০

নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাই
- জাকিরুল চৌধুরী

আমি  আমাকে ছড়িয়ে দিতে চাই এই বাংলার দুয়ারে দুয়ারে, 
নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাই গন্ধ রাজ ফুলের মতো। 
নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাই মুক্তিযোদ্ধার মাঝে, 
আমি নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাই সকল মানবতার মাঝে। 
নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাই দখিনা বসন্তের হাওয়ায়, 
নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই এই বাংলার অসহায় মানুষের মাঝে। 
নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই, 
সখা বলেনি ঝুট। 
নিজেকে ছড়িয়ে দিতে চাই গ্রামের দুখিনী মায়ের বুকে, 
বক্ষ পরিপূর্ণ হয়ে থাক দুখিনী মায়ের কুল। 
নিজেকে বিলিয়ে দিতে চাই, 
এই বাংলার সবখানে। 

মনে পড়ে তোমার? 
- কিরণ মাহমুদ মান্না 

মনে পড়ে তোমার? 
আষাঢ়ের অঝোর বৃষ্টিতে তোমার বাড়ির পাশের 
ঐ খোলা জমিনে তুমি ছুটে আসতে।
আমিও সেই বৃষ্টিতে তোমার ভিজে যাওয়া শরীরের 
অপরুপ দৃশ্যের পানে মনের দৃষ্টিতে 
তাকিয়ে থাকতাম অপলকে অপর প্রান্ত থেকে। 
এভাবেই দু'জনার কাছে আসার শুরু।

মনে পড়ে তোমার?
তোমার আমার সম্পর্কের প্রথম বর্ষাকাল।
আমি ডিঙি নাও নিয়ে তোমার বাড়ির চারপাশে ঘুরে বেড়াতাম শুধু এক নজর তোমাকে দেখার আশে।
তুমিও চুপিসারে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে 
কলসি নিয়ে ঘাটে আসতে জলের ছলে।

মনে পড়ে তোমার? 
আষাঢ়ের বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় একগুচ্ছ কদমফুল 
যেইদিন তোমার হাতে তুলে দিয়েছিলাম, 
সেইদিন তুমি কদম গুলো পেয়ে আনন্দে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলে ভালোবাসি। 
আমিও মিশে গিয়েছিলাম সেদিন তোমাতে।

মনে পড়ে তোমার?
বরষার জোৎস্না ভরা রাতে সাঁকোর উপর 
বাঁশের বাঁশিতে যখন সুর তুলে তোমাকে ডাকতাম,
তুমি উতলা মনে ঘর থেকে বাহির বাড়ি ছুটে আসতে, 
টর্চ লাইটের আলোর জানান দিতে তোমার উপস্থিতি। 
কত মধুর স্মৃতি ঘেরা সেদিনের মূহুর্তগুলি।

আজও আসে আষাঢ়, 
আসে বর্ষা, আসে জোৎস্না ভরা রাত,
কদম গাছের ডালে ডালে 
থোকায় থোকায় ফুটে থাকে কদমফুল। 
শুধু তুমি আমি ছিটকে পড়েছি বহুদূর, বহুদূর। 

১৭/০৬/২০২০
সিঙ্গাপুর প্রবাসী।

জননী চোখের  জল
- জাকিরুল চৌধুরী

যখন দেখি মায়ের চোখ পড়ছে বেয়ে জল, 
কেমন করে সইবো আমি কায়া থাকে না বল। 
মায়ের মুখ যখন দেখি হয়েছে মলিন,
মায়ের জন্য নিজেকে করে দিব বিলিন। 
মা যে আমার ছিল আসমানী- চাঁদ,
সে যে আধার আদোও হয়নি প্রভাত।

অভিমানী স্বপ্ন
কলমে - শৈলেন মন্ডল

মেয়েটির মনে অনেক ছিল স্বপ্ন বুকে ছিল অনেক ছলাত্ছল ঢেউ
অনেক চাপা অভিমান জমিয়ে রেখে মনটাকে হয়তো ধূপের মতো পুড়িয়েছিল কেউ।
মনের গহীনে চাপা রাগে ফেটে যায় ছাই চাপা আগুনের মতো
বঞ্চিত বুকে সঞ্চিত অভিমানের দাগ অমলিন হয়ে যায় কত শত।
কাপুরুষ তুমি দিয়ে গেলে আঘাতের দাগ করে নকল ভালবাসার ক্ষত
সরল বিশ্বাসী মেয়েটি রেখেছে আজও পরম ভালবাসা যত।
আজও দেখা নাই সেই প্রেমিকের যার প্রেমেতে সে বিহ্বল
মনের যত্ন করেনি কোনোদিন  হয়েছিল অভিনয়ে পাগল।
অনুভূতিরা আজ বিস্মৃতি হয়েছে হৃদয়ে এসেছে রক্তক্ষরণ 
তবুও মেয়েটি অপেক্ষায় আজীবন চায় সে যে অন্তিম সহমরণ।

২৬.০৬.২০২০

শহরের পথে
- কিরণময় নন্দী

ধরো যদি হঠাৎ সন্ধ্যে
দেখা হলো শহরের পথে
পনেরো বছরে একটু রাগ থামিয়ে
তুমি কি আসবে কিছুক্ষন আমার কাছে?

হয়তো বা আবছা স্মৃতি তোমার
ভুলেই গেছো নানা কাজের চাপে
হয়তো বা তখনকার ছেলেমানুষি 
কেই বা মনে রাখে!

হয়তো বা মুচকি হেসে
আসবে কাছে জানবে কেমন আছি
হয়তো বা ইচ্ছে করে না দেখার ছল
আমি তো নই তোমার সাথী।

কি জানি কি হবে
যদি দেখা হয় পনেরো বছর পরে
আমি কিন্তু এগিয়ে যাবো তোমার কাছে
একরাশ কষ্ট বুকে করে।

জানি,তুমি অবাক হয়ে যাবে
হঠাৎ করে আমায় দেখে
হয়তো বা অতীত নাড়া দেবে
আমায় অসহায় পথিক দেখে।

জানো,তুমি সঠিক ছিলে সুমি
আমি অপদার্থ একজন
লক্ষ্যহীন স্বপ্নের কারিগর
বিচিত্র অবুঝ মন।

শীতের রাতে তুমি সাতপাকে
আলোর মালায় তোমাদের বাসর
আমার হৃদয় শান্ত নিশীথ
ভালোবাসার ফুল সাজাবে অন্যের ঘর।

কিছুটা সময়  ভীষণ একা
শুধু অতীতের মূল্যায়ন
কিছুটা সময় বন্ধ ঘরে
শুধু আত্ম-বিশ্লেষণ।

ডায়েরীর পাতা মিথ্যে কবিতা
ছিঁড়ে ফেলি একেএকে
সময়ের ভীড়ে অতীত ছেড়ে
কাজে ফিরি সংসারের চাপে।

বছর সাতেক পরে আর একজন সংসারে
আমার সাতপাকের ঘরণী
উজানের স্রোতে নতুন বেশে
ও আগামী ঘাটের তরণী।

এভাবেই হায়, অনেকেই কাটায়
সং সাজা সংসার 
আমিও তাই, একমাত্র উপায়
সুপ্ত বুকের হাহাকার।

হঠাৎ দেখায় কেন অতীতের কথায়
ভাবো বুঝি মনেমনে
ইচ্ছে তো হয়, কাটায় ক্ষণিক সময়
অতীতের সুখের জাল বুনে।

আমার মেয়ের মা, নাম পরমা
ভীষণ ভালোবাসে আমায়
ছোট্ট ঘরে, সারাদিন হাসিমুখে কাজ করে
আজ তিনমাস হাসপাতালের বিছানায়।

হৃদযন্ত্রে ছিদ্র অনেক, শ্বাস নিতে বেশ বেগ
দিনে দিনে আরও সঙ্গীন
তোমায় হারিয়ে, পরমারে পেয়ে
আমিতো ভুলেছি অতীত দিন।

তবুও কেন বারেবারে, আঘাত আমারে
স্বপ্নগুলো ভাঙে অবহেলে
আর নাকি দুটো মাস,আসছে সর্বনাশ
ও চলে যাবে আমাদের ফেলে!

রাতে ঘুম থেকে উঠে, মেয়েটা মাকে ডাকে
আমি থাকি বুকে চেপে ধরে
এইটুকু সান্ত্বনায়, মা হাসপাতালের বিছানায়
সবশেষ হলে,কি বলবো ওরে!

সভ‍্যতা শোনো
- মৌমিতা ঘোষ

আকাশে লিখেছি ক্ষত
মেঘের অক্ষরে 
সব শোক ,বঞ্চনা রাখা থরে থরে !
তোমারও কি মনে আছে ?
কত কত ব‍্যাথা
জীবন দুমড়ে দিলো ।
তবু সমঝোতা বাঁচিয়ে
রাখতে প্রান ,অসহায় হাত 
বাড়িয়েছে, পার হাতে
     দুঃসহ রাত !
কতটা পেরেছি সেই ব‍্যথা রাত মুছে
মুঠো ভরে আলো দিতে 
       যন্ত্রণা ছেঁচে!
  না পারা সে কান্নাকে লিখে রাখি রোজ 
 আকাশ, মাটির গায়ে
 জানি হবে না নিখোঁজ!
সাইক্লোন, মহামারী পার হয়ে ফের 
সভ‍্যতা এগোলেও সব লড়াইয়ের ইতিহাস খুঁজে পাবে,পাতায় পাতায় লেখা আছে,
মেঘে মেঘে, আকাশ খাতায়

লীলা
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

__ টলমল পায়ে বাড়িতে ঢুকেই শাক্য, লাথি মেরে সবটুকু ছত্রভঙ্গ করে; চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে এল। মুখভর্তি কটুক্তি। তার কটুক্তির খাড়ায় ঝুলে থাকে.....

__শাকম্ভরী,সিঁদুর লেপ্টে যাওয়া মুখে এলোমেলো চুলে; প্রচন্ড শক্তির উপর ভর করে উঠে দাঁড়িয়ে এগোতে থাকে ঘরটার দিকে। পরম মমতায় ছত্রভঙ্গ ঘরটাকে সাজিয়ে তোলে। ভিজে চোখে তাকিয়ে থাকে তার দিকে। ধূপ-ধূনার মিষ্টি গন্ধে ভরে ওঠে ঘর। হাজার প্রদীপের দীপ্তি ছড়িয়ে পড়ে মুখটায়। চারজোড়া চোখ একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। 

--"এবছরটা অন্ততপক্ষে সম্মতি দাও"।
--"মানত করেছিলাম "।

--"ওই টাকায় আমি......"

--"দোহায় তোমায়। থামো"।

__ অবসন্ন মনে শাকম্ভরী, তার সুখ-দুঃখের সাথীর কাছে গিয়ে উপস্থিত হয়। একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে মুখটার দিকে। মুখে ফুটে উঠেছে তৃপ্তিকর একটা হাসি। 

__ শাক্যর অবশ শরীরটা কে নিয়ে হসপিটাল থেকে হসপিটালে ঘুরেছে শাকম্ভরী। অবশেষে ঠাঁই মিলেছে। হাজারো পরীক্ষা নিরীক্ষা র পর,

--"এখানে ফেলে রেখে লাভ নেই"।

__ চেয়ারটা যেন পরম যত্নে বেঁধে রেখেছে শরীরটাকে। চেয়ারের চাকা ঘুরলে, শরীরটা সচল হয়। মুখাবয়বে পরিবর্তন ঘটেছে, শাক্যর। নীচের ঠোঁট টা ভীষণ অভিমানী হয়ে ওপরের ঠোঁটের থেকে আলাদা হয়ে গেছে। চোখ দু'টো স্থির। 

__ লাল পাড় সাদা শাড়ি, কপালে বড়ো লাল টিপে সেজে উঠেছে শাকম্ভরী। রোজকার মতো। শাক্য কে পরিপাটি করে সাজিয়ে এনেছে সে ঘরে। যে পা জোড়া কোনোদিন ও......

__ ব্যথাতুর চোখে  হাজার বাতি ঘুরিয়ে চলেছে দু'হাত। 
--"কেন"?

__ তার মুখের হাসি আরও চওড়া হচ্ছে। 

--" নাস্তিককে আস্তিক করার জন্য বড়ো প্রয়োজন ছিল"।

--"ক্ষমা করে দাও"।
--"ভুল করেছি"।

__ ভীষণ দাম্ভিকতায় সেদিন লাথি মেরেছিল নৈবেদ্য এর থালা। অপমান করেছিল তার পরম ভক্ত কে। 

__ ঘরের মন্দিরটা আজ সেজে উঠেছে অন্য সাজে। মন্দির মধ্যস্থ সেও। পাঁচ পাপড়ি সমেত রক্তের রঙের জবা গুলো যেন আরও বেশী করে খেলা করছে আজ। সারা বাড়িতে কলরব। 

__ মন্ত্রোচ্চারিত হচ্ছে। ঘরময় মিষ্টি সুবাস। 

__ শাক্যর দিকে তাকিয়ে আছে শাকম্ভরী। 

__ সবই তাঁর.....

নগ্ন দাম্পত্য
- সৌমিলী চট্টোপাধ্যায়

গভীর রাতের মেঘের আর্তনাদ
চাপা দিয়ে যায় গোঙানির শব্দ
দামাল হাওয়ার পরশ লাগে ক্ষতে
তমসা ভিজতে যায়, যদি
বৃষ্টির জল ধুইয়ে দিতে পারে কালসিটে।
সকালে ব্যস্ততার প্রলেপ আর
স্বাচ্ছন্দ্যের সাজসজ্জায়
ঢাকা পরে যায় ক্ষত,
তমসা ভাবে আজ রাতেও বৃষ্টি নামুক
বৃষ্টিস্নাতা হোক ভালোবাসার দানব রূপ।
এভাবেই বয়ে যায় দিন, কেটে যায় রাত্রি
তমসা-রা ভিজতে থাকে,
নগ্ন দাম্পত্য কী ভীষণ শাস্তি।

জন্মদিন
- মৌমিতা ঘোষ

অনেক গুলো ক্লান্ত দুপুর 
বিষন্ন রাত ফেলে 
আজকে আবার নতুন করে 
বাঁচার স্বাদ পেলে 
জীবন এতো তুচ্ছ নয় 
কেবল কেঁদে কেঁদে 
কাটিয়ে দেবে অনন্তকাল 
দুখের প্রহর গুনে 
যন্ত্রনা কে আগুন করে 
জ্বালিয়ে নিয়ে মশাল 
পুড়িয়ে দিও সব অবসাদ 
কান্নাভেজা সকাল 
জন্মবারের শুভেচ্ছা দিই 
হৃদয় উজাড় করে 
বছর বছর এই শুভ দিন 
আসুক ফিরে ফিরে 

শুভ জন্মদিন

দারুণ দুঃসময়
- সোমা চ্যাটার্জী সরকার

যখন,সন্ধ্যা নামে রক্ত হোলি খেলে
নষ্ট চোখে স্বপ্ন ডানা মেলে ।
মৃত্যু মাথায় নিচ্ছে দীর্ঘশ্বাস 
মনের ঘরে নতুন সূর্য আশ্ ।
আকাশ তখন শুধুই হীরক চূর্ণ -
রাতের গন্ধে বুকটা করি পূর্ণ।
অনেকটা পথ এখনও পরে বাকি
হাতের মুঠোয় জীবনটারে রাখি।
দুঃসময়ের এই উলঙ্গ বোধ,
নীরব ধরা নিচ্ছে বুঝি শোধ।
অভিমানের নভঃ পবন ছিঁড়ে
জীবাণু আজ তোমায় আমায় ঘিরে।
ভালবাসা নিষ্পেষিত, কাদা জলে মিশে,
বিবেকটুকু বিষাক্ত হয় আগাছাদের বিষে।
তেল মেখে রোজ সারমেয়দের পায়ে,
হয় কি গো জয় মহামারীর ঘা- এর!
এসব দেখেও কুলুপ আঁটি বেশ
ঘিলু বিহীন নির্বাচনের রেশ ।
হাতের মুঠোয় জীবন নিয়ে ছুটি।
অভুক্ত পেট বোঝে কেবল রুটি।
নিজের হাতে সৃষ্টিকে শেষ করি,
বলো বিধাতা,কেমনে আবার গড়ি?
মৃত্যু শিয়রে ফেলছে দীর্ঘশ্বাস।
মনের ঘরে নতুন সূর্য আশ্।
যখন, সন্ধ্যা নামে রক্ত হোলি খেলে-
আজও ,নষ্ট চোখে স্বপ্ন ডানা মেলে ।

বর্ষা মেঘ
 রচনা - শক্তি কুন্ডু         

রাগ হয়েছে বর্ষা মেঘের,ফিরিয়ে নিলো মুখ , 
       জল বুঝি আজ অন্য মেঘে খুঁজতে গেছে সুখ ! 
            আকাশ বলে কি হয়েছে ,আমায় বলতে পারো !!                                     
কিসের দুঃখ জলের হলো যে তোমায় ছেড়ে গেলো ?              
মেঘ বলে...টাপুর টুপুর সারা দুপুর ওর পড়ার ইচ্ছে ছিলো,
আর মাটির সঙ্গে দেখা করার কথাও বলেছিলো !        তাতেই আমার রাগ উঠলো,
ভেবে ছিলাম সারা বিকেল আঁকড়ে ধরে জলকে,         তোমার নীল হৃদয়ের মাঝ অংশে ভাসবো হাওয়ার সঙ্গে ৷    
গোধূলি বেলায় আবছা আলোয় স্বপ্ন গেলো ভেঙে,       তাই ছাদের ঘরে একলা আছি দুঃখ ভেজা মনে !
                     আকাশ বলে ...তোমার বুঝি একারই সব দুঃখ বোঝার দায়  ,
একলা হয়ে দুখি মনে জলের অপেক্ষায় ৷    
              মান অভিমান হতেই পারে সবার যেমন হয় ,তাই বলে কি মুখ লুকিয়ে একলা থাকতে হয় !!    
                                জলের সঙ্গে রাগ করোনা ও তো তোমার হৃদয় ,ওকে ছাড়া তুমি কেন ,সবার বাঁচা দায় ৷

আমি প্রবাসী
- কিরণ মাহমুদ মান্না

আমি প্রবাসী, আমি দুঃখ-বিলাসি।
নিজের কথা কখনও না ভেবে পরিবারের সুখে সুখী। 
আমি প্রবাসী, আমি দুঃখ- বিলাসি। 
সেই কৈশোর বেলায় দিয়েছি এই প্রবাস পাড়ি,
আর চুল দাঁড়ি পাকিয়ে বৃদ্ধতে ফিরে যাবো বাড়ি। 
কারণ-আমি প্রবাসী, আমি দুঃখ বিলাসি 
 আমি এমনই এক অভিশাপী।

গায়ের মহাজন থেকে ধার দেনা নিয়ে, 
বিক্রি করে পৈতৃক ভিটা মাটি,
জীবনটাকে এক স্বপ্নের রঙিন আলোয় 
সাজাবো বলে বেশ পরিপাটি। 
তাই দেশের মায়া মহব্বত ঝেড়ে ফেলে, 
এক বুক স্বপ্ন নিয়ে এই দূর-প্রবাসে ছুটে আসি।
আমি প্রবাসী, আমি দুঃখ বিলাসি 
 আমি এমনই এক অভিশাপী।

প্রতিমাসে লক্ষ টাকা কামাই করেও 
মাসের শেষে পকেট থাকে শূন্য, 
বুকের ভিতর শত কষ্টগুলো চেপে রেখেও  
হাসিখুশি থাকি শুধু প্রিয়জনের জন্য।
এত কষ্টে বেঁচে থেকেও মৃত যেন আমি 
যখন ভাবে কেউ আমায় অবিশ্বাসি।
আমি প্রবাসী, আমি দুঃখ বিলাসি 
 আমি এমনই এক অভিশাপী।

বাবার আদর, মায়ের মায়া মমতার স্নেহ 
জুটে না এমনই প্রবাসীদের পুড়া কপাল,
ছেলে মেয়েদের দেখি নাতো মায়া ভরা মুখ
লাগে যেন হয়ে গেছে কত শত মহাকাল। 
প্রায় প্রতিটি রাত যখনই নিঝুমে ঘনায়, 
তাদের কথা ভেবে দুচোখের জলে ভাসি।
আমি প্রবাসী, আমি দুঃখ বিলাসি 
 আমি এমনই এক অভিশাপী।
 
সিঙ্গাপুর প্রবাসী

জীবনের পরিষেবা
- অসীম দাস 

যে ক্ষণ বিগত রামধনু অভিমানে 
শাব্দিক ধ্যানে ছিলে কবি উদাসীন ,
অযাচিত হেম ফলেছে ধানের শীষে 
হা হুতাশ রাতে আটকে রয়েছে দিন ।

বেজেছিল বীণা অনতি সঙ্গোপনে 
বধিরতা ঘিরে রেখেছিল সাময়িক ,
অপেক্ষমান ছিল মিছিলের মুঠি 
ব্যস্ত ভুলেরা ভেসে গেছে অমায়িক ।

হালখাতা হীন জীবনের পরিষেবা
যেখানে ছেড়েছ তার তো পাবে না দেখা ,
ফাঁকি দিয়ে ফাঁকে দোলে রাবনের সিঁড়ি 
মোহানা আখরে নদী পঞ্জরে লেখা ।

কতটুকু শ্বাস এনেছিলে সংসারে ?
ধুকপুক গৎ এ মেতেছিল প্রতিবেশী ,
সময়ের ফাঁদ পাতা আছে চরাচরে 
ততটুকু পাওয়া যতটুকু মেশামেশি ।

যন্ত্রণা
- প্রসেনজিৎ ঘোষ

তেত্রিশ বছর কেটে গেছে!
যন্ত্রণা তুমি আমায়  কেন ছাড়োনা ?
মুক্তির স্বাদ আসেনি কখনো
দাসত্বে কেটেছে দিন,
ক্ষুধার্ত পেটে কেটেছে কত রাত 
হয় নি কখনো বুক ভরে  শ্বাস নেওয়া,
তবুও স্বপ্নেরা ছিল চোখে
যন্ত্রণা এসে ভেঙে দিল শেষে
স্বপ্নের  রাত গুলি দুঃস্বপ্নের  মতো কাটে !
ফাগুন বিদায় নেওয়ার পরে
কেঁদেছি শ্রাবণের মতো অঝোরে 
জননীর মতো করে সূর্যের আলো এসে ,
প্রায় মৃত বৃক্ষের'উপর পড়ে  
কচি কচি পাতা ভরে যায় অবশেষে,
তবে  এক দিন কালো মেঘ 
ছেয়ে যায় আকাশে
বৃক্ষের কাতর আর্তনাদে  
ভেসে যায় বাতাসে !

অ্যাওয়ার্ড
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

 বিগত দু'মাস ধরে চলা হরে কর কম্বার মতো হরেক রকমের বাগ্বিতন্ডা, মোর্চা উঁচিয়ে মতবিরোধ; আপত্তি -অনাপত্তি; অস্থায়ী ভোটাভুটি এসব প্রহসনের পর একটা সার্বিক মতামতে আসা গেছে। বিষে বিষে বিষক্ষয় করে বিশ সালের অনুষ্ঠিত অ্যাওয়ার্ড ফাংশান অনুষ্ঠিত হবে পাটুলিতে। তারিখ ও ঠিক হয়ে গেছে। শীতর কাতুকুতু খেতে খেতে ডিসেম্বরের একুশে অনুষ্ঠিত হবে এই অনুষ্ঠান। হাতে আর মাত্র দিন দশেক মতো। এর মধ্যেই সেরে ফেলতে হবে বাকি কাজটুকু। সবাই গামছা জড়িয়ে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে সেই কাজে। আমি এই পরিবারে নূতন সদস্যা। তাই ভরসা করে আমাকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। একদম নূতন না হলেও, আমাকে ঠিক ভরসা করা যায় না। আমার ইয়ার্কি জনিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যর সাথে পরিবারের সবাই ইতিমধ্যেই পরিচিত হয়েছেন। তাই সাহস করে আমার উপর কেউ সবিশেষ ভরসা করতে পারেনি। তার জন্য মনে মনে একটু দুঃখু পেয়েছিলাম ঠিকই। পরে যখন শুনলাম, আগত সমস্ত সদস্য-সদস্যার জন্য বিরিয়ানীর ব্যবস্থা পাকাপাকি ভাবে পাকা করা হয়েছে, দুঃখ সেই মুহূর্তে পালিয়ে গেছে। বিরিয়ানীর জন্য সব কুর্বান। 




   দশ দিনের মধ্যে কেকে দি, নবনীতা দিভাই আমার মেসেঞ্জার বক্সে মেসেজ করে রোজ জিজ্ঞেস করেছে, আমি আসছি কিনা। নবনীতা দিভাই তো দুগ্গা ঠাকুরের মতো চোখ পাকিয়ে ফোটোও দিয়েছে ফেসবুকে। যে না যাবে, তাকে মহিষাসুর সেজে, দিভাই বধ করবে। কার ঘাড়ে আর কয়টা মাথা আছ! বেশীরভাগই যাবে তাই। সবার কথোপকথন থেকে স্পষ্টতই সুস্পষ্ট বেশীরভাগ সদস্য-সদস্যা উপস্থিত থাকবেন। বিরিয়ানীর সাথে কিছু সদস্যবর্গ কে একটা করে অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হবে। স্বাভাবিক ভাবেই আমার লোভনীয় জিনিস দু'টোই। 




  সবকিছু ফাইনাল হতেই, মা কে সব জানালাম। মা বলে উঠল,


-'তুই কি ছাই পাঁশ লিখিস যে তোকে অ্যাওয়ার্ড দেবে'?


আমিও কম যাই না। বলে উঠলাম, 'তুমি পড়েছো'?




মা কিছুতেই ক্রিজ ছাড়বে না। 


-'বেশ পড়েছি। ওই তো ফেসবুকে কি সব লিখিস'।
-'তার জন্য ওনাকে অ্যাওয়ার্ড দেবে'!


আমিও 'বিনা যুদ্ধে না দিব সূচগ্র মেদিনী'। বলে উঠলাম, 'তোমার শিব ঠাকুর ছাই-পাঁশ মেখে তান্ডব নৃত্য করলে সেটা খুব মূল্যবান তোমার কাছে......'


কথা শেষ করতে না দিয়ে মা বলে উঠল, 


-'ঠাকুর দেবতা নিয়ে ইয়ার্কি আমি পছন্দ করি না। এই বলে রাখলুম'।
-'তোর লেখার সাথে শিব ঠাকুরের সম্পর্ক টা কি শুনি'?


এবার আমি, ঠিক নেতাদের মতো ভাষণ দিতে শুরু করলাম। শিব ঠাকুর ছাই মেখে তান্ডব নৃত্য করে যদি উমার হিল্লে করতে পারে। আমিও ছাই-পাঁশ লিখে অ্যাওয়ার্ড পাব না কেন শুনি? যদি না পাই সেক্ষেত্রে আমার সাথে নেপোটিজম করা হবে। 


মা আমার। জননী আমার। আমার এই রূপ দেখে চুপ করে গালে হাত দিয়ে বসে আছে তখনও। হঠাৎই বলে উঠল,


-'না! তোর অ্যাওয়ার্ড পাওয়া কেউ আটকাতে পারবে না'।
-'সাহিত্যে না জুটলেও, রাজনীতিতে তোর অ্যাওয়ার্ড পাওয়া আটকায় কোন পিসি'?


অকৃত্রিম রাগ দেখিয়ে, গোমড়া মুখ নিয়ে ঘর থেকে আমি বেরিয়ে গেলাম। আমার লেখা নিয়ে, মা'র অসাহিত্যিকের মতো মন্তব্য সহ্য হ'ল না। কিন্তু মনের মধ্যে কোথাও একটা কাকের ডাক শুনলাম মনে হ'ল যেন! 


*******************


    দেখতে দেখতে দশ দিন কোন দিক দিয়ে কেটেছে বুঝতে পারিনি। অ্যাওয়ার্ড ফাংশানে যাবার দিন উপস্থিত। উত্তেজনা তখন চরম সীমায় পৌঁছেছে। ঘড়ির কাঁটা যেন আজ, অন্যদিনের তুলনায় আরও আস্তে ঘুরছে। আর তর সইছে না। পিউ দি কে ফোনে ধরলাম। আমার যাবার সঙ্গী। লেকটাউন থেকে একসাথে সাক্ষাৎ করে আমরা আমাদের গন্তব্যস্থলে যাব। ঠিক করলাম একটু সকাল সকাল বেরোবো। প্রাতঃরাশটা সেরেই। 


     মা, আলমারি থেকে একটা আকাশের নীল রঙা একটা শাড়ি বের করে খাটের উপর রেখে দেখছে। ঘরে ঢুকতেই, 


-'আজ এটা পরে যাস। বিশেষ দিন তো আজ'।


একটু অবাক চোখেই মা'র দিকে তাকালাম। জিজ্ঞাসু চোখ দেখে মা বলে উঠল,


-'অ্যাওয়ার্ড পাবি না জানি। তাও.....'


মনের কথা মনেই রেখে দিলাম। জানোই যদি পাবো না তাহলে এত সাজুগুজুর প্রয়োজন কি শুনি? 


-'তোর মনে কি চলছে জানি'।
-'তোরই তো মা। একটু মজা করলাম। তোর মনকে হালকা করলাম'।
-'জীবনে অ্যাওয়ার্ড টাই সব নয়, তিথি। আনন্দ করে ভালোবেসে লেখ'।
এই সব কিছু লজিক্যাল জ্ঞানের কথা বলে, মা শাড়িটা তুলে ধরল আমার সামনে। যেটা দেখেই আমার শরীরের মধ্যেকার পারদের চলমান উর্ধ্বগামী হয়। 


 মনের মধ্যে আর একটা মনের উথাল পাথাল চলছে। আমি? শাড়ি? কদাপি নেহি। কেমন অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে যেন। আমি তো নীল ডেনিমের সাথে কালো টি শার্টে বরাবর স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। পুরো সেলেব লাগে আমাকে। একটু ভেবে বলে উঠলাম, মা তোমার মনে আছে? আমি যখন নবম শ্রেনীতে পড়ি। স্কুলে শাড়ি পরে যেতে হত। সাইকেল চালিয়ে, শাড়ি পরে স্কুলে যেতাম। সেদিনের কথাটা মনে আছে তোমার? 


-'কোন দিন'?
-'কি সব বলছিস'?




কোথাও বেরোনোর আগে মা'র সাথে ঝগড়া করতে ভালো লাগে না। অপেক্ষাকৃত হিমবাহ মিশ্রিত গলায় বললাম, স্কুল থেকে ফেরার সময় দমদমের খালটায় পড়ে গেলাম। সাদা শাড়ি রঙ পরিবর্তন করল। সাথে আমাকেও চেনা দুর্দায় হয়ে উঠল। তার সাথে একরকমের সুগন্ধি মিশ্রিত গন্ধে ম ম করতে লাগল আমার সারা শরীর। বন্ধুরা যখন আমাকে বাড়ি দিয়ে গেল, তুমি অস্বীকার করেছিলে আমাকে নিজের সন্তান বলে। সেটাই স্বাভাবিক। আমার যে তখন আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। রূপের। তার উপর একরাশ সুগন্ধি নিয়ে ঘরে ফিরেছি। যাইহোক, পরে বুঝলাম তুমি মজা করছিলে। 


মা'র মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, হাতুড়ির আঘাতটা ঠিক কোথায় মেরেছি। বুঝিয়ে কাজ না হলে, ইমোশনাল আঘাতে সব কাজ এক নিমেষে সমাপ্ত হয়। মা বলে উঠল,


-'থাক তবে। শাড়ি পরে কাজ নেই'।


মনেমনে যেটা ভাবছিলাম সেটাই ঘটল। অপেক্ষায় ছিলাম মা'র এই কথাটার জন্য। 


-'শাড়ি বাদ মানে এই নয় যে তুই কালো কাউয়া সেজে যাবি'।


 কোনোরকম শুভ কাজে, কালো জিনিস মা পছন্দ করে না। আমি আবার ঠিক উল্টো। তবে আজ আর মতবিরোধ করলাম না। নীল ডেনিমের সাথে হলুদ টিশার্ট আর মেরুন জ্যাকেট। আজ অ্যাওয়ার্ড পাওয়ার দিন। শান্তি বজায় থাকুক মনের সাথে ঘরে।


*******************


      বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে, টপাটপ দু চামচ দই-চিনি গিলিয়ে দিল, মা জননী আমার। যেন আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। কপালে চন্দনের ফোঁটাটা বাকি থাকে কেন? ও মা! ভাবতে ভাবতেই মা'র একটা আঙুল আমার কপালের দিকে এগিয়ে আসছে। ফোঁটা টা জাস্ট পড়ব পড়ব করছে..... না মা প্লিস। এটা থাক। আমার সেলেব ভাব টা নষ্ট হয়ে যাবে। জিন্স পরে কপালে টিপ পরে কেমন কীর্তনিয়া কীর্তনিয়া লাগবে। ঘ্যামা লুক টা নষ্ট হতে দিতে পারি না। আবার মা'কেও চটাতে পারি না। আমার অবস্থা এখন, না পারছি গিলতে না পারছি ফেলতে, ঠিক এরকম। কপালে চন্দনের টিপ টা জোর করেই পরিয়ে দিল মা। আমি একটু বিরক্ত হয়েই বলে উঠলাম, গলায় একটা তুলসী মালা আর একটা একতারা দিয়ে দাও। 'ভোলা মন' গাইতে গাইতে চলে যাই। বাড়িতে যখন সাইলেন্টলি আমার সাথে মা'র বাক্যযুদ্ধ চলছে মুঠোফোনটা বেজে উঠল। 


-'তুই বেরিয়ে গেছিস'?
-'নাগের বাজার চলে আয় একসাথে যাব'।


অমৃতাদির ফোন। আসছি বলে ফোনের লাইন কেটে পাদুকা যুগলে পা ঢেকে বেরিয়ে পড়লাম মা'র 'দুগ্গা' 'দুগ্গা' আওয়াজের সাথে দুগ্গা ঠাকুরকে সাক্ষী রেখে।




      নাগেরবাজার বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষারত অমৃতাদি কে দেখে দৌড়ে গেলাম। আর সময় নষ্ট না করে বাসে উঠে বসলাম। পিউ দি কে ফোনে জানিয়ে দিলাম। সময় মতো লেকটাউনে বাস পৌঁছালে, শুকতারা পরিবারের দুই অমূল্য রত্নের সাথে একটি তামার রত্ন একসাথে হলাম। আমার কপালে দিকে চোখ পড়তেই পিউ দির করা সব প্রশ্নের উত্তরে এক বিস্তৃত বিবরণ দিলাম। যা যা বাড়িতে ঘটল, কিছুক্ষণ আগে। শুনে পিউ দির সাথে অমৃতাদি ও গম্ভীর গলায় বলে উঠল,


-'তুই যখন তোর মা'র জায়গায় যাবি বুঝবি'।


আবার মনে মনে কথা। আমি অনেক কিছু সর্বসমক্ষে না বলতে পারলে মনে মনেই বলি। জেনে শুনে আমি যে ঐ বিপদে পা বাড়াতে চাই না। তা তোমরা জানোই না। মুখের মধ্যে একটা মুচকি হাসি ফুটে উঠল আমার।


**************************


      অবশেষে আমরা পাটুলি পৌঁছলাম। একটা কমিউনিটি হলে ফাংশানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাজানো গোছানো দুর্দান্ত। স্টেজের ঠিক পেছনটায় 'শুকতারা' পরিবারের ফেস্টুন টাঙানো হয়েছে। বেশ অভিভূত হলাম। পরিপাটি করে সাজানো হয়েছে পুরো হল টা। আমাদের দেখে নবনীতা আর কেকা দি এগিয়ে এল। দু'জনেই এসে আমার গাল দু'টো টিপে আদর করে দিল। দাঁড়িয়ে গল্প করছি। ইন্দ্রানী দি এসে জুড়ে গেল আমাদের সাথে। আর কিছুক্ষণ পর ফাংশান শুরু হবে। সবাই একে একে আসছে। 


         সবাই মোটামুটি হাজির। আমার ভেতরের উত্তেজনা যেন ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। খোলা চোখেই দেখতে পারছি। আমাকে স্টেজে ডাকা হয়েছে। প্রথমে গলায় একটা উত্তরীয় পরিয়ে দেওয়া হ'ল। তারপর এক এক করে সার্টিফিকেটের সাথে অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হল। মৌ দি কে বলে রেখেছিলাম একটা ঝক্কাস দেখে ছবি তুলতে। ফেসবুকে দিতে হবে সেই ছবি। ফুটেজ খাওয়ার জন্য। এসবের মধ্যে যখন বুঁদ হয়ে আছি, মৌমিতা আমাকে জোরে ঠেলা দিয়ে বলল,


-''কোন জগতে থাকিস''?
-''কখন থেকে ডাকছি''।


সম্বিত ফিরতেই কেন কি হয়েছে বলে চমকে উঠি। দেখি পরিবারের একজন আমার সামনে বিরিয়ানীর প্যাকেট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমার দিবা স্বপ্নের মধ্যেই কখন যে ফাংশান প্রায় শেষের পর্যায়ে চলে এসেছে বুঝতেও পারিনি। ইহ জগতে ফিরে আসতেই দেখি টেবিলে মাত্র চার থেকে পাঁচটি অ্যাওয়ার্ড আছে।  বিরিয়ানী প্যাকেট হাতে যেরকম ধরা অবস্থায় ছিল সেই অবস্থায় বসে রইলাম। নিশ্চয়ই চার বা পাঁচে আমার নাম আছে। 


     এবার আমার ফুঁপিয়ে কান্না শুরু হয়েছে। চোখের জল নাকের জল সব এক হচ্ছে। মুখের ভিতর নোনতা একটা স্বাদ পাচ্ছি। পাশে বসা মৌ দি খুব যত্নে অনেক গুলি ন্যাপকিন এগিয়ে দিল আমার দিকে। একটার পর একটা ভেজা অবস্থায় 'ইউস মি' বক্সে ছুঁড়ে ফেলছি। ফোঁপানো কান্নাকাটি একটা বিশেষ কান্নায় পরিণত হ'ল। কান্নার সাথে কি যে উর্দু-আরবি ভাষা বলছি কেউ বুঝতে পারছে না। সবাই তখন আমাকে ঘিরে রেখেছে। সবার হাতে অ্যাওয়ার্ড। কান্নার ভলিউম কখোনো বেশি, কখনও কম। সাথে কত রকমের ভাষা। কান্না মেশা ভাষা কেউ যে বুঝতে পারছে না, তাদের চোখ মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। অবশেষে নবনীতা দিভাই এর সাথে কেকা দি আমার এই নিদারুণ অবস্থার অবস্থান থেকে মুক্তি করার দায়িত্ব নিল। আমাকে প্রথমে ভাইব্রেশান অবস্থা থেকে জেনারেল অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে এল। তারপর.....


 নবনীতা দিভাই:- কি হয়েছে তোর? কাঁদছিস কেন?


কেকা দি:- আর বিরিয়ানীর প্যাকেট নিবি?


পিউ দি:- বল মা কি হয়েছে তোর!


অমৃতা দি:- আরে কাঁদছিস কেন?


আমি এসব দেখে আবারও ফুঁপিয়ে উঠলাম। ন্যাপকিন শেষ হয়ে যাওয়ায় মৌ দি এবার নিজের সালোয়ারের ওড়না এগিয়ে দিল। চোখের জলে নাকের জলে একাকার করলাম। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলে উঠলাম, তোমরা আমাকে এইভাবে চোখের জলে নাকের জলে করবে জানলে আসতাম না।


দুগ্গা ঠাকুরের মতো চোখ করে নবনীতা দিভাই এবার বলে উঠল, 'তোর কি হয়েছে বলবি'?


ভয়ে ভয়ে দিভাই এর হাতে থাকা অ্যাওয়ার্ড টার দিকে আঙুল উঁচিয়ে বললাম, আমি অ্যাওয়ার্ড পাবো না? পাবো না আমি অ্যাওয়ার্ড? এহেন কথায় সবার মনে হয় চা কাকুর কথা মনে পড়ে গেল। সবাই হো হো করে হেসে উঠল। তার মধ্যে থেকেই পিউ দি আর অমৃতা দি বলে উঠল, '' চল মা। তোকে ডায়মন্ড প্লাজা থেকে একটা অ্যাওয়ার্ড কিনে দেবো''। 


     আমার ফোঁপানো তখনও চলছে। সেই অবস্থায় বলে উঠলাম, মা কে কি বলব? মিথ্যে আমি আবার মা'কে অন্ততপক্ষে বলতে পারব না। আর অ্যাওয়ার্ড কিনলেও তার উপর 'শুকতারা' এর লোগো থাকবে কি কি করে? এই সমস্যা সমাধানের জন্য ত্রাতা হিসাবে এগিয়ে এল, নবনীতা দিভাই। এসে আমার হাতে, তার পাওয়া অ্যাওয়ার্ড টা ধরিয়ে দিয়ে গলায় একটা উত্তরীয় পরিয়ে দিল। পরম মমতায় বলে উঠল, '' তুই অ্যাওয়ার্ড পাসনি বলে এতক্ষণ ধরে কাঁদছিলি পাগলি''? সেই দেখে কেকা দি চোখের জল ধরে রাখতে না পেরে আমার কাছে এগিয়ে এসে, কেকাদির অ্যাওয়ার্ডটাও ধরিয়ে দিল। পরিবেশটা কেমন যেন ইমোশনাল হয়ে উঠেছে। সেটা ভাঙতে মৌ দি, আগের কথা মতো মুঠোফোনের ক্যামেরায় আমাদের বন্দি করে নিল। 


       ফুটেজ খাওয়ার জন্য দিভাই এর দেওয়া অ্যাওয়ার্ড নিয়ে ঝক্কাস দেখে কতকগুলো ছবি ফেসবুকে দিয়ে দিলাম। ছবি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মা'র কমেন্ট.....


"ছাই পাঁশ লেখায় অ্যাওয়ার্ড জুটল তবে"।
সাথে একটা লাভ সাইন।


 
   মা কে পরে সব সত্যি বলে দিই। তারপর থেকে মা আমাকে লেখার জন্য অনেক হেল্প করে। এখন আমার লেখার বয়স মাত্র ছয় মাস। কলমের ডগা ইঞ্চি খানেক প্রশস্ত হয়েছে। অনেকটা উন্নতি হয়েছে। জুটেছে অনেক ভার্চুয়াল সার্টিফিকেট। পরের বছর নিজের যোগতায় অ্যাওয়ার্ড নেব। দৃদৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নিজের কাছে।

দুর্মূল্য
-  সোমা চ্যাটার্জী সরকার

হরেক মিছিল রঙ বেরঙের,
জীবন জুড়ে বাজি,
শুধু একটি রঙের একটি মানুষ
ফুটতে ফুটতে সুরভীত,
এক থোকা জুঁই সাজি।

খুব দামী সব কাজের বোঝা
সারতে সারতে,জ্বলে পুড়ে ছাই।
অদরকারী একটি কাজই,
আপন মনে নাচতে নাচতে
মাঝ যমুনায় যাই।

লক্ষ কথা হারায় ভীড়ে,
ধুঁকতে ধুঁকতে হাঁটি।
একটি কথা বুনতে বুনতে,
গোপন সোহাগ গলতে গলতে
নিকষিত হেম খাঁটি।

ব্যস্থ জীবন সাজতে,গড়তে
হাসতে ,ভাসতে ঢেউ।
একটি জীবন লড়তে ,লড়তে
ডুবতে, ডুবতে মুক্ত তোলে,
জানলো না তো কেউ।

হিসেবে হিসেবে ভাঁড়ার বাড়ে -
অর্থে খোঁজে সুখ।
বেহিসাবি এক মধ্য জীবন-
ভাঙতে ভাঙতে,প্রথা ডিঙোয়
অনর্থতে অর্থ খুঁজে,
ক্যানভাসে আঁকে, প্রিয় মুখ ।

ওপারের নিশানা 
- কিরণ মাহমুদ মান্না

ওয়া ওয়া শব্দে কেঁদে উঠে 
এলাম মায়ের উদর থেকে,
হাজার কষ্ট মা'য়ে ভুলে গিয়ে 
মানিক বলে বুকে নিলো ডেকে। 

অনেক আদর সোহাগ যতনে
বাবা, মা'য়ে আমায় লালন করে, 
হাজার জ্বালাতন করেছি আমি
তবু আগলে রেখেছেন বুকে ধরে।

প্রথম হাঁটা,প্রথম কথা বলা 
তারাই আমার প্রথম শিক্ষা গুরু,
পাঠশালার ঐ হাতেখড়ি শিক্ষা 
তাদের কাছে প্রথম আমার শুরু।

স্কুল কলেজে আই এ বিএ
ভালো চাকরির অবদানে তারা,
টাকা কড়ি বিয়ে শাদী সবই 
তাদের নিয়ে মন আনন্দে ভরা।

সেই ছোট্ট খোকন মানিক যখন 
নিজেই সন্তানের বাবা হলাম, 
বাবা মা'যে আমায় কেমন কষ্টে 
মানুষ করেছে এখন টের পেলাম।

সন্তান ভালো একজন মানুষ হবে 
সব বাবা মায়ের মনে প্রাণে স্বপ্ন, 
স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অঘাত পরিশ্রম 
দিন রাত করেনি তারা কভূ ভিন্ন। 

চুল দাঁড়িতে ওপারের নিশানা 
আয়নায় সামনে দেখি দাঁড়িয়ে, 
কৈশোরে সেই দিনগুলি আজ 
কোথায় গেলো বলো হারিয়ে। 

হঠাৎ একদিন ডাক পড়িবে 
সেই উপর মহলে ছুটে যাবার, 
যেথা হতে আমি এসেছিলাম 
চলে যাবো সেখানে আবার।

১৪/০৬/২০২০
সিঙ্গাপুর প্রবাসী।

ধন্যি মেয়ে 
- মৌমিতা ঘোষ 

একটা মেয়ে ছোট্ট থেকেই বাধ্য ছিলো 
গুরুজন দের শুনতো কথা মন দিয়ে 
যখন তখন হাসতো না সে মন খুলে 
ভাসতো না সে কিশোর বেলার আনন্দে 

একটা মেয়ে ডানপিঠে আর দস্যি ভীষণ 
বাড়ির লোকের মুখঝামটা নিত্য আহার 
কিন্তু তাতে ভ্রুক্ষেপ তার  নেই মোটেই 
দিনে দিনে বেড়ে চলে গুন্ডামি তার 

বাধ্য মেয়ে রোজ সকালে ফুল তুলে 
ঠাকুর ঘরে সাজিয়ে রাখে অর্ঘ্য ,ধুপ 
সময় মতো পড়তে বসে ,কলেজে যায় 
রা কাড়ে না তেমন বেশী  থাকেই চুপ 

দস্যিটা তো জেগেই থাকে আধেক রাত 
ঘরটা যে তার বড়ো মাপের ডাস্টবিন 
কলেজ যাওয়া রইলো  পড়ে ,যদিও সে 
ক্যারাটে ক্লাস মিস করে না কোনোদিন 

কলেজ থেকে ফেরার সময় বাধ্য মেয়ের 
সেদিন একটু দেরিই হলো অকারনে 
পথ আগলে ধর্ষকামী চারটে মুখ 
বাধ্য মেয়ের চিৎকার আর কেই বা শোনে 

এক ঝটকায় ওড়না খোলে ,বুকে আঁচড় 
 দস্যি মেয়ের ফিরতে তো রোজ রাতই হয় 
ঝড়ের বেগে মার্শালআর্ট দু চার প্যাচ 
বোনের বুকে দিদির মাথা ,জীবন জয় |

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget