জুন 2020


বিবর্তনের ইতিহাস
- কিরণময় নন্দী

চলমান দুনিয়াটা
রোজ ঘটে চলে কত কি
মন-খারাপের মন নিয়েই
আমি শুধু লিখি।

জানি না ওদের বিবেকটুকু
ওরা কি বোঝে আমার কথা
আমি লিখেই চলি তাদের নিয়ে
যাদের শুধু বুক-ভরা ব্যাথা।

পায়ে পিষে চলছে ওদের
অধিকার আদায় বিলাসিতা
রোজনামচা, সেও ভীষণ কঠিন
ন্যায্য দাবি! ও আদিখ্যেতা।

কিন্তু আমি লিখে যাবো
লড়াইয়ে ঝরানো ওদের ঘাম
বিভেদ জালে তোমরা বন্দী থাকো
তোমরা, বুঝবে না ওদের দাম।

ওরা অগ্রগতির রথের বাহন
ওরা সভ্যতার চাকা
ওদের দিয়ে পত্তনের ইতিহাস
ওরা ছাড়া দুনিয়া ফাঁকা।

ওরা অর্ধবসনে ফসল ফলায়
খনির নিচে ওদের কাজ
ওরা ঝকঝকে রাজপথ বানায়
ওরা হাত পাতে না,এতোই ওদের লাজ।

ওরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে
ওরা রাস্তা বানায় পাহাড় কেটে
ওরা পরিচ্ছন্ন শহর বানায়
বড় রাস্তার নর্দমা ঘেটে।

ওদের কথা ভুলে যায় সবাই
শুধু "রাজার" গুণগান
নিজের দাবিতে মুখরিত হলে
ওদের পুরস্কার ওরা "বেইমান"।

যুগ যুগ ধরে নানা অবিচারে
ওরা আজও পাইনি মুক্তির স্বাদ
ওদের রক্তে বারেবারে লেখা
বিবর্তনের ইতিহাস।

পিতৃ দিবস
- সুমিতা সরকার ঘোষ

আজ ২১ শে মার্চ, শুভ পিতৃ দিবস, জানিনা ঠিক কি লিখব, জীবনে বাবা ছিলেন সবচেয়ে ভালবাসার মানুষ, আমার জীবন্ত ঈশ্বর। ২১ শে মার্চ আমার বাবা ইহলোক ত্যাগ করেছেন, বাবা নেই, একথা আমি আজও ভাবতেই পারিনা, বাবার প্রয়ানে আমার জগৎ শূন্য, বাকরুদ্ধ। আমার সেই পিতার চরণে নিবেদন করলাম আমার সামান্য রচনা.............

বাবা কি শুধুই দূর আকাশে??
আর আমি রয়ে গেলাম নীচে,

শুনেছিলাম তো পিতামাতা অলক্ষ্যে থাকে সন্তানদেরই পিছে।

চারদিকে এত আড়ম্বর আলোয় পরিপূর্ণ,

তবু কেন আজও একা বোধ করি সবটাই লাগে শূন্য।

রয়ে গেল বাবা অনেক দূরে, শ্মশানের ছাই হয়ে,

দূরত্ব শুধু বাড়তে বাড়তে সময় চলে ক্ষয়ে।

পরজন্ম বলে আদৌ কিছু আছে?
নাকি পুরোটাই একটা ধাঁধা?

পাপ পুণ্যের হিসেব নিকেশে ক্রমশ রহস্যে বাঁধা।

বলে যেতে পারত আমায় আসব তোর কাছে ফিরে?

কিম্বা তুইও আসতে পারিস এখনো
ওপারের কাজ মিটিয়ে ধীরে।

সংসার জগৎ আর শূন্য শ্মশান মাঝখানে রয়ে গেলাম আমি,

আজ তুমি অনেক অনেক দূরে,
বাবা? কোথায়?? কোথায়?? তুমি??

২১.০৬.২০২০

গর্জে
- কিরণময় নন্দী

জ্বলন্ত সিগারে আজও বিপ্লবের আগুনের প্রতিচ্ছবি
বুকে বাজে সমাজতন্ত্রের জয়গান
রাজপথ আজও তোমায় হৃদয়ে নিয়ে কাঁপে
আজও কমরেড তুফান তোলে সাথে তোমার শ্লোগান।

তোমার লড়াই জারি আছে সাথী
আজও পুঁজিবাদী মাথা উঁচু করে চলে
তোমার দেখানো পথের পথিক
উঠবে গর্জে আসমুদ্রহিমাচলে।

উপহার
- অর্পিতা ঠাকুর চট্টরাজ

হিয়াকে রুমকির সাথে একদম মিশতে দেয়না ওর মা অরুনা। যদিও মিস্টার অনিমেষ সেন মাঝেমাঝে ডেকে পড়াশোনা কেমন চলছে,কিছু দরকার কিনা সেসব খোঁজ খবর নেন। রুমকির মা মালা সেন পরিবারের রান্নার লোক। উচ্চবিত্ত পরিবারে রান্নার অন্ত: থাকেনা। চারবেলা আলাদা আলাদা খাবার। হিয়ার জন্য একরকম,সেনবাবুর মায়ের জন্য একরকম,সেন দম্পতির জন্য আরেকরকম। এই একটা বাড়িতেই ওর সারাদিন কেটে যায় । মালার মাঝেমাঝে মনে হয় দুটো-তিনটে ঘরে রান্নার কাজ নিতে পারলে মেয়েটাকে আরো ভালো করে রাখতে পারবে। হিয়া নামী ইংলিশ মিডিয়ামে থ্রিতে আর রুমকি বাংলা প্রাইমারি স্কুলে পড়ে। তবে শুকনো বেতন ছাড়াও পুরোনো জামাকাপড়,খাবার,খাতা,পেন্সিল --অনেক কিছু দেয় বলে ও ঘরটা ছাড়তে পারছেনা। মেয়েটারও তো ভালো খাবার জোটে। তবে শনিবার বিকাল আর রবিবার সকাল থেকে রুমকি মায়ের সাথে সেনবাড়িতে চলে আসে। হিয়ারই পুরোনো ব্যাগে কয়েকটা শাড়ির ভেতরে থাকা সাদা কাগজের মলাট দেওয়া বই খাতা নিয়ে।এক ধারে বসে চুপ করে কখনো নিজের পড়া করে,কখনো দেখে হিয়া কি করছে। হিয়ার খুব ইচ্ছা করে ওর সাথে খেলতে,মায়ের চোখ এড়িয়ে দুএকবার কথা বলে যায় রুমকির সাথে।
হিয়ার জন্মদিনের প্রস্তুতি চলছে কয়েকদিন ধরে। সেদিন সকাল থেকেই ওর দিদা,দাদু,মামু,মিমি এসে গেছে । পিমনি,পিসন আর বুবলিদিদি যে কখন আসবে কে জানে? ওরা একটু দেরিতেই আসে। এত লোকের রান্না মালাকে করতে হয়,যদিও রাত্রে ক্যাটারিং বলা আছে। মালা নিজের সাধ্যমতো একটা বড় রংপেন্সিলের বাক্স উপহার দিলে,সকলেই বলে,---তোমার দেওয়ার কি দরকার ছিলো? বিকালে ওকে তাড়াতাড়ি আসতে বললেও রুমকিকে আনার কথা বলেনা। সন্ধ্যায় একা কার কাছে রেখে আসবে মেয়েটাকে,ও ভালো পরিবারের , মেয়ে যখন আটমাসের দুর্ঘটনায় ওর স্বামীর মৃত্যু হয়। বেসরকারি চাকরি ,যেটুকু টাকা পেয়েছিল শ্বশুরবাড়ির লোকেরাই কেড়ে নেয়। ওদের অত্যাচার থেকে বাঁচতে লোকের বাড়ি কাজ নিয়েছে। আত্মসম্মান বোধ ওর প্রখর। রুমকি জানতে চায় ওখানে কি হচ্ছে না হচ্ছে,চোখ ফেটে জল এসে যায় মালার। বিকালে ওকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে যায় মালা। তাড়াহুড়ো করছে বলে অরুনা রেগে যায়। হটাৎ হিয়া বলে,
----মালাআন্টি রুমকি আসবেনা?
মেয়ের কথায় সম্বিত ফেরে অরুনার।
--না সোনা,এটা তোমাকে দিয়েছে রুমকি।
সাদা কাগজের ভেতরে গাছের পাতা,পাখির পালক,ফুল দিয়ে অপূর্ব কার্ড বানিয়েছে রুমকি,শুভ জন্মদিন হিয়া--লেখাটাও পরিস্কার,ঝরঝরে। হিয়া সবাইকে কার্ডটা দেখায়,অবাক হয় সকলেই। মিস্টার সেন অরুনার প্রতি খুব বিরক্ত হন,মালাকে অনুরোধ করেন রুমকিকে নিয়ে আসার জন্য। মালা বাড়ি গিয়ে রুমকিকে নিয়ে আসে। উপস্থিত সকলেই ওকে বাহবা দেয়। মিস্টার সেনের বোন মনিকা কলেজের অধ্যাপিকা,জহুরির চোখ রত্ন চিনতে ভুল করেনা। উনি খেয়াল করেন রুমকি হিয়ার মতোই বরং ভালো নাচছে। ওকে ডেকে জিজ্ঞেস করেন কোথায় শিখেছে?
----শনিবার,রবিবার হিয়া যখন অভ্যাস করে,আমি দেখে দেখে শিখেছি।
----দেখে দেখে,আঁতকে ওঠেন নাচের ম্যাম। সাংঘাতিক প্রতিভা এই মেয়ের। আমি তোমাকে নাচ শেখাবো,শিখবে?
খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে রুমকির মুখ।
মনিকা মালাকে বলে,
---আপনার মেয়ে বিরল প্রতিভার অধিকারী,ওর সব দায়িত্ব এখন থেকে আমি নিলাম। আপনি রাজি তো?
মালা আনন্দে কেঁদে ফ্যালে মনিকার হাতদুটো ধরে। হিয়ার জন্মদিনে ওর মেয়ে রুমকি যে এত বড় উপহার পাবে এটা সে স্বপনেও ভাবেনি।

কঠিন বাস্তবতা
কলমে - শৈলেন মন্ডল

জীর্ন আঁখিপাতের কাজলটা আজও অভিমানী হয়ে চিলেকোঠার ছাপোষা ঘরে কেমন যেন আবেগী নির্লিপ্তমান হয়ে বসে আছে।

ভালবাসায় সম্পর্কে চাদর জড়ানো রংমশালটাও নিভে যাওয়ার পূর্বে জ্বলে উঠবে বলে ক্ষীণ প্রচেষ্টায় বিলীন হতে চায় না।

সুগভীর নিশীথের আধোঘুমের ঢুলু ঢুলু চোখগুলি চাঁদের আলো মাখার বাসনায় অবিরত প্রিয়ার অপেক্ষার প্রহর গোনে।

ম্যাড়ম্যাড়ে আবহাওয়ায় ভিড় করে আসে নিকষকালো অন্ধকারের ঘনত্ব।

আর রেখে দিয়ে যায় তীব্র রক্তক্ষরণের দীর্ঘ নাভিশ্বাসের ছাপ।

পিলসুজের আলো আর জ্বলতে চায় না স্তিমিত মেকি সভ্যতার নাড়িছেঁড়া রক্তজলে ভেজানো সলতে নিয়ে।

রাতের অন্ধকারের গভীরে স্তিমিত ভালবাসার অভিমানী অনুভূতি বয়ে নিয়ে আসে শানিত বাক্যবানের ফলা।

কঠোর কঠিন বাক্যবানের ফলায় খুন হয়ে সুদূর তেপান্তরের মাঠ ভরে যায় সারি সারি জীবন্ত লাস।

বিরহকাতর যন্ত্রনায় ফুটে ওঠে বঞ্চিত ভালবাসার ব্যাথিত প্রেমের মর্মান্তিক দীর্ঘ নিঃশ্বাস।

স্তম্ভিত হয় আদি সভ্যতার ঐতিহ্য বহনকারী বেলোয়াড়ী ঝাড়বাতি আর বেহাগের সুরে তানপুরার আবেশ মাখানো সুরমুর্চ্ছনা।

বাস্তবের মাটিতে চলতে থাকে মেকি সভ্যতার শব ব্যবচ্ছেদের হিসেব নিকেশ।

২২.০৬.২০২০


জন্মদাতা
- ননীগোপাল অধিকারী

পথের দূর প্রান্তে যিনি হেঁটে আসছে,
যার হাতে আছে লাঠি;
ধীর পায়ে আস্তে আস্তে চলেছে-
চোখের পলক খুব কম পড়ছে;-
পরনে সাদা ধুতি
আর কায়া ঢাকা পাঞ্জাবিতে;
একান্ত মনে হেঁটে আসছে।
যার শীর্ণ কায়া ,
শরীর অসিতবরণ;
কুঞ্চিত ত্বকের সর্বময় দূর্বলতার ছাপ যার-
তোমরা দেখতে পাচ্ছ ?
স্থৈর্য পূর্ণ ধৈর্যের মহাসাগর
সর্বঅঙ্গে কম্পন ময় একটি ‘ মানুষ!'
যার চোখে ভাসে কত শত কষ্টের ছাপ!
হ্যাঁ ,উনিই-
উনিই ,আমার বাবা
আমার পিতা
আমার জন্মদাতা।
আমার বায়না মেটানোর
এক মাইলফলক।
আমার কষ্টে তার বুকে আসা যন্ত্রণা।
গভীর রাতে আমার পাশে
জেগে থাকা
পড়ার সাথী।
আমার দুঃখে যার স্নেহময় কর
ভুলিয়ে দিত কান্না’কে।
আমার শতরাগ কে
যে এক নিমিষে ভুলিয়ে দিতো
স্নেহময় ভালোবাসা দিয়ে-
যিনি আমার শত ভুল কে
তিরস্কারে করেছে সংশোধন।
যাঁর স্নেহ ,ভালোবাসায় আমি,
একটু একটু করে বড় হয়ে উঠেছি;
পেয়েছি অপার পিতৃ মমতা ,
আর অনেক আদর।
যার মুখে শোনা যায় ‘ খোকা' ডাক।
যার বৃদ্ধ অসহায় চেহারা মন
বাকি জীবন চাই একটুখানি অবলম্বন;-
সেই জন্মদাতা , মোর পিতা
নাহি ছাড়িবো তাহার চরণ।
সদা যারে ডাকি আমরা ‘ বাবা’ বলে-
তাহাদের না হয় যেন ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রম ।

## আন্তর্জাতিক পিতৃ দিবসে সকল পিতাদের প্রতি রইল আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা শুভেচ্ছা ও প্রণাম। জাকের দিনে আমার কবিতা সেই সকল পিতাদের জন্য উৎসর্গ করলাম । আর তার সঙ্গে প্রতিটা মায়েদেরও শ্রদ্ধা জানাই । আর এও জানায় পৃথিবীর কোন পিতা বা মাতার ঠিকানা যেন বৃদ্ধাশ্রম না হয়। সকল পিতা মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করি । সবাই ভাল থাকবেন, সুস্থ থাকবেন । সবাইকে ভাল রাখবেন।

গহীন নিশা
- কিরণময় নন্দী

উল্টো স্রোতে গা-ভাসিয়ে
অন্য গাঙে তোর ঠিকানা
আমার তরী ভেসেই চলে
শুধু ভালোবাসাই মানা।

প্রতীক্ষায় তোর মুঠোফোন
রাতের পর রাত
একটু কথা বলবো ভেবে
শুধুই অপেক্ষায় সারারাত।

পূবের জানালা বন্ধ তোর
হয়তো দক্ষিণ দুয়ার খোলা
আমার সাথে কাটানো ক্ষন
কেবলই ছেলেখেলা।

মাধবীলতার তলায় বসে
কতই না আগামীর স্বপ্ন!
মাধবীলতার পাতা খসে যায়
আমার রাত-ভরা দুঃস্বপ্ন।

বল না সুমি কি পেলি তুই
আমায় দূরে ঠেলে
কেনই এতো বাসলি ভালো
কেন দিলি ঠেলে এতো অবহেলে!

তুই তো আজ অন্য পথে
আমি পথ হারিয়ে একলা বসে আছি
তোর জন্যে সাজানো স্বপ্ন
ধুয়েমুছে মাটি।

রং-তুলিতে আঁচড় দিয়ে মাধবীলতা
আজও আমার দেয়াল জুড়ে
দূর আকাশে ক্লান্ত বলাকা
ফিরে চলে আপন নীড়ে।

তুই ঘর গুছিয়ে আপন বাসায়
মুঠো ভরা ভালোবাসা
আমার হৃদয় প্রেমহীন নির্দয়
শুধু অমাবস্যার গহীন নিশা।

পৌরাণিক ভীড়ে একা
- অসীম দাস

কবি তাঁর কবিতায় , ' আকণ্ঠ সংসারী 'শব্দবন্ধ
বদলে ' নিরস্ত নদী ' বসাতেই ,
হৈ হৈ বিচ্ছিন্ন বন্ধুরা নদীকে ঠেলতে ঠেলতে
নিয়ে গেল সমুদ্রের কাছে ।
যে নদী আকণ্ঠ আটকে ছিল এতোকাল
মুক্ত হলো আজ ।

আমারও মুক্ত -থাকা- ইচ্ছের কাঁধে
ভর করে আছে ,
.....ইত্যাকার মামদো মুদীখানার গন্ধমাদন পর্বত !
কবিকে চুপিচুপি বলি-- গন্ধমাদনটা সরিয়ে
কৈশোরের অনর্গল চোখ এঁকে দাও ।
কবি বলেন-- কাঁধের উপরে চোখ ?
বড্ড বেমানান হবে । দাঁড়াও বরং ,
ময়নাদ্বীপ থেকে এক ঝাঁক প্রসন্ন প্রজাপতি
এনে তোমার কাঁধে বসিয়ে দিচ্ছি ।
আমি বললাম-- উড়ে যাবে তো !
স্মিত হেসে কবি বললেন--তোমার কৈশোরের
পবিত্র বিমুগ্ধ চোখের ভালবাসা পেলে ,
ওরা তোমাকে ঘিরে রাখবে আজীবন ।

অনন্তর , আমারই কৈশোরের চোখ খুঁজতে খুঁজতে
প্রথম- সাঁতার- শেখা নিরস্ত নদীর পাড়ে
এসে দেখি , আমারই বিচ্ছিন্ন বন্ধুরা সমবেত
কখন সেই আবাল্য নাবাল থিতু নদীকে
ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেছে মোহনার কাছে ,
আমি টেরই পাইনি ।

মাথা নিচু করতেই দেখি , আকণ্ঠ সংসার
আমার নিম্নপ্রদেশে থিকথিক করছে !
আমার চক্রব্যূহ- চিৎকার বোধহয়
কবির কানে পৌঁছলো না ।
দায়িত্ববান কর্তব্যের পৌরাণিক ভীড়ে
দাঁড়িয়ে রইলাম একা ।

বাবাদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় এই নিবেদন।

বাবা
- কিরণ মাহমুদ মান্না

দুটি বর্ণের ছোট্ট কথা
বাবা যে তার নাম,
সেই নামের ওজন দিলে
দেয়া যাবে না তার দাম।

খোদার পরে মায়ের আসন
তারপরেই তো বাবা,
যেমন সেবা করবে বাবার
তেমন সেবাই তুমি পাবা।

বাবার তুলনা শুধুই বাবা
বাবা যে বড়ই মহিয়ান,
ভুলেও কভূ সেই বাবাকে
করোনা কেউ অপমান।

নম্র ভদ্রতায় কথা বলো
মেজাজ দেখাও নরম,
তুমিও একদিন বাবা হবে
তাই বাবাকে দিওনা বৃদ্ধাশ্রম।

বাবা থাকিতে বাবার মর্যাদা
করতে শিখো ও ভাই,
বাবা নাই যার এই সংসারে
সেইতো কেবল বুঝে মর্মটাই।

উৎস্বর্গঃ সকল বাবা'দের।

২০/০৬/২০২০ইং
সিঙ্গাপুর প্রবাসী

হৃদয়ের আকুলতা
কলমে - শৈলেন মন্ডল

হৃদয়ের জানালায় ভেসে আসে সুখস্বপ্ন প্রেমের নীল চিরকূটের চাঁদের জোছনা মাখা জোয়ারে।

সুদূরে অকুন্ঠ নিরবতায় ঝিঁঝিঁর গুঞ্জনে নিস্তব্ধতা জানান দেয় রাতের গভীরতার মাপকাঠি।

অবিরত আন্দোলিত হয় মন আবেশিত নৈসর্গিক আলিঙ্গনের অপেক্ষায়।

দুটি উষ্ণ আবেগী হৃদয় ক্রমান্বয়ে মিলিত হতে চায় কিছু মুহূর্তের কাছে সু-সংগোপনে।

কালের যবনিকায় মিলিত হওয়ার বাসনায় উপসংহারের লেশ মাত্র নাই।

প্রেমের উর্বরতায় অমোঘ অহীনকুল আলিঙ্গনের নিবিড়ময় বাসনায় লেপ্টে থাকতে চায় দুটি আকিঞ্চন ভরা তৃষিত হৃদয়।

প্রেমের রক্তজলে ভেজা সম্পর্কের চাদরখানি নাড়িছেঁড়া কাতর যন্ত্রণাতেও কাতর আর বিহ্বল থাকতে চায়নি নৈসর্গিক সুখের আশায়।

মহাকালের জাগতিক তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে আসে তনুমন নিবিড় গহীন মনের সংগোপনের সিক্ত আলিঙ্গনে।

২১.০৬.২০২০

অপাংক্তেয়
- মৌমিতা ঘোষ

কিছু মানুষ অযোগ্য ই থাক
সব মানুষ যোগ্য হলে পরে
যোগ‍্যতার হবে কি পরিমাপ ?
কিছু মানুষ বোকা হয়েই থাক !
হিসেবে কষা চালাক মানুষে রোজ
সকাল বিকেলে তাদের ঠকিয়ে যাক !
কিছু মানুষ সাদা মাটাই থাক
জঠীল মানুষ তাদের বুদ্ধি বলে
সরল মাথা সুখেই চেটে খাক !
কিছু মানুষ পাগোল হয়েই থাক
হিসেবীরা আখের গুছিয়ে নিতে
তাদের সাথে করুক হাজার পাপ ,
কিছু মানুষ ভালোইবেসে যাক
সব মানুষ আখের বুঝে গেলে
পৃথিবীতে বেঁচে থাকাই চাপ।।

দ্বিখণ্ডিত
- কিরণময় নন্দী

তুমি তো সেই আগের মতো
হাসতে ভুলে গেছো
গালের টোলে মেকি হাসি
আড়ালে শুধু চোখের জল মোছো।

তুমি তো সেই আগের মতো
আবেগ দিয়ে গাও না আর গান
গুনগুনিয়ে একলা বসে
গাও শুধু ব্যর্থ প্রেমের গান।

তুমি তো সেই আগের মতো
বৃষ্টিধারায় নও চঞ্চলা হরিণী
অন্তঃকরণ গহীন রাত
পরাজিত বণিক হারিয়ে সপ্ত-তরণী।

তুমি তো সেই আগের মতো
শীতের দিনে বাড়াও না জানালাপানে হাত
শীতল শিশির চমকে ওঠে
অন্তরজুড়ে তীব্র লাভাপাত।

তুমি কি সেই আগের মতো
আমায় মনে করো?
দ্বিখণ্ডিত বক্র-পথ
তোমার মিছে আশা ছাড়ো!


অপাংক্তেয় 
- মৌমিতা ঘোষ 

কিছু মানুষ অযোগ্য ই থাক 
সব মানুষ যোগ্য হলে পরে 
যোগ‍্যতার হবে কি পরিমাপ ?
কিছু মানুষ বোকা হয়েই থাক !
হিসেবে কষা চালাক মানুষে রোজ 
সকাল বিকেলে তাদের ঠকিয়ে যাক !
কিছু মানুষ সাদা মাটাই থাক 
জঠীল মানুষ তাদের বুদ্ধি বলে 
সরল মাথা সুখেই চেটে খাক !
কিছু মানুষ পাগোল হয়েই থাক 
হিসেবীরা আখের গুছিয়ে নিতে
তাদের সাথে করুক হাজার পাপ ,
কিছু মানুষ ভালোইবেসে যাক 
সব মানুষ আখের বুঝে গেলে 
পৃথিবীতে বেঁচে থাকাই চাপ।।

#ছদ্মবেশী_ফুচকা_ওয়ালা

Writer--#Omar

Part--01

মামা তিন প্লেট ফুচকা দেন‌‌ তো,,

দিচ্ছি মামা,,একটু বসেন,

--তাড়াতাড়ি করেন,,

---এইতো হয়ে গেছে,,এই নিন,,

খাওয়া শুরু করলো,,

---মামা আপনার তেঁতুলের টক টা তো খুব মজা,,কে বানাইছে,,

--আগ্গে আমি বানাইছি,,

--আপনাকে তো এখানে আগে দেখিনাই,,

--আগ্গে আমি আগে স্টেটিয়াম এর ওখানে বেচতাম,,

--ওটা স্টেডিয়াম হবে,,

---ওই একি হলো,,বুঝতেই তো পারছেন জীবনে ইস্কুলের বারান্দায় ঠেং রাখিনি,,

---আপনার ফুচকগুলো খুব মজা,, এখন থেকে আমরা প্রতিদিন খেতে আসবো,,

---জি মামা আইসেন,, আপনারা না আসলে আমার ফুচকা গুলো কে খাবে,,

--বিল কত আসছে,,

---৯০ টাকা

ওনারা একটা ১০০ টাকার নোট দিলো,,

---এই নিন বাকি দশ টাকা,,

+--এটা আপনার কাছে রেখে দেন,,,

-----এই হয়না মামা,,

---আরে রাখেন তো,,

---আইচ্ছা,,(মুখে একটা হিসি এনে)

তারপর ছেলেগুলো চলে গেল,,

আপনারা আগামাথা কিছু বুঝেন নাই মনে হয়

আসুন আপনাদের ‌ছোট্ট করে পরিচয় টা দিয়ে দি,,

(((আমি আফনান,,, এতক্ষণে হয়তো বুঝে গেছেন আমি একজন ফুচকাওয়ালা,, আমি সিটি কলেজের সামনে ফুচকা বিক্রি করি,,,এটা আমার ছদ্মবেশ,, আমার আরো একটা পরিচয় আছে,,,
আমি হলাম,,--থাক সেটা অস্তে আস্তে জানবেন, গল্পের সাথে থাকেন,,,
আপতত এই টুকুই,, এখন গল্প ফিরা যাক))

গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে ফুচকা বানাচ্ছি,,

বানানো‌ শেষে মোবাইল টা হাতে নিয়ে গত রাতের সিসি টিভি ফুটেজ গুলো দেখতে লাগলাম,,,
গত রাতে কলেজের গেইট থেকে শুরু করে রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় সিসি ক্যামেরা লাগিয়ে দিয়েছিলাম,,

(((আপনাদের মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে কিসের ক্যামেরা,,কি জন্যে বা আমি ফুচকাওয়ালার রুপ নিলাম,,সে কথা গুলো রহস্য হয়েই থাক,,)))

না তেমন কোন কিছু ধরা পড়ে নি,,

-----এই মামা ফুচকা দিন তো,,

মানুষের গলার আওয়াজ পেয়ে আমি তাড়াতাড়ি মোবাইল লুকিয়ে ফেললাম,,

---কই প্লেট মামা,,

---এই কে কি প্লেট খাবি,,

---আমি ২ প্লেট,,(একটা মেয়ে)

--আমার এক হলেই চলবে(আর এক মেয়ে)

---আমার ও এক,,(ছেলে)

--এক,,

---আচ্ছা মামা ছয় প্লেট দিন,,

--আইচ্ছা,,একটু বসেন,,

ছয় প্লেট বানিয়ে ওদের দিলাম,

---মামা টক টা তো খেতে সেই,,

---কে বানাইছে,,

--আগ্গে আমি,,

ওরা খাওয়া শেষ করে টাকা দিয়ে চলে গেল,,

বিকেলে বাসায় চলে আসলাম,,
বাসায় আসার আগে আগের রুপ নিয়ে নিলাম,,

রাতে ফুটেজ দেখতেছি,, ফুটেজ টা চালু রেখে বসে থাকলাম,,যদি কিছু ধরা পড়ে,,

এর মাঝে খাওয়া দাওয়া সেরে ফেললাম,,

এভাবে রাত এগারোটা পর্যন্ত দেখলাম,, কিন্তু কোন কিছুই চোখে পড়লো না,,

তাই ঘুমিয়ে পড়লাম,,

পরদিন ঘুম থেকে উঠে এগারোটার পরের ফুটেজ চেক করলাম,,নাহ কিছু নাই,,

সকালের নাস্তা করে বাসা থেকে বেরিয়ে যেখানে ফুচকার ভ্যান গাড়ি টা রেখেছিলাম ওখানে গিয়ে আবার ফুচকা ওয়ালার রুপ নিলাম,,

তারপর গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে কলেজের সামনে চলে আসলাম,,

গেইট থেকে কিছু টা দূরে দাঁড়ালাম,,

চারিদিকে ভালো করে ওকি ঝুঁকি দিতে লাগলাম,,

তেমন কেউ আসে নি,

আমি আমার কাজে মনোযোগ দিলাম

আস্তে আস্তে সবাই আস্তে লাগল,,,

সকালের দিকে তেমন বিক্রি হলো না,,

১২ টার দিকে গত কালকের ছেলে গুলো আসলো,,

--মামা কেমন আছেন,,?

---আগ্গে আপনাদের দোয়ায় ভালো আছি

---ফুচকা কই প্লেট দিবো মামা,,

--তিন প্লেট,,,

আমি--আইচ্ছা,,

আমি-----এই নিন,,

ওরা খেয়ে গতকালের মতো একশ টাকা দিয়ে চলে গেল,,

---মামা এক প্লেট ফুচকা দিন তো,,(একটা মেয়েলি কন্ঠের).

মেয়েটার দিকে তাকাতেই আমি অবাক,,

আমি--তু--

--আস্তে, সাবধানতা অবলম্বন করুন,, দেওয়ালের ও কান আছে,,ফুচকা দেন,,

আমি-----এই নিন আপা, আপনার ফুচকা

--একটা হাসি নিয়ে ফুচকা নিয়ে নিল,,
খাওয়া শেষ করে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে চোখের ইশারায় কি জানি বলে চলে গেল,,

আমি টাকার উপর তাকাতেই দেখলাম একটা লেখা,,

লেখা টা ছিল--আমি এখানে ভর্তি হয়েছি,,
তবে যাই বলেন আপনাকে ফুচকাওয়ালার বেসে জোস লাগছে,,

আমি--আমি একটা হাসি দিয়ে টাকা টা পকেটে ঢুকিয়ে নিলাম,,
((ওর নাম হচ্ছে সীমা,,)

রাতে ওকে ফোন করে পরবর্তী নির্দেশনা দিয়ে দিলাম,,

তারপর ফুটেজ চেক করলাম,,নাহ আজকেও কিছু ধরা পড়েনি,,

------

এভাবেই কয়েকদিন চলে গেল,,
এখন নিজেকে সত্যি সত্যি ফুচকা ওয়ালার মনে হচ্ছে,, আমার ফুচকা এই কয়দিন এ অনেকের মন জয় করে নিয়েছে,,,

সীমা ভিতরের খবরাখবর দিতে থাকে,,

এতে তেমন কোন ক্লু পেলাম না,,

--মামা ফুচকা দিন তো,,

আমি--দিতাছি মামা,,ছেলেটার দিকে তাকাতেই আবার অবাক হলাম,,কারণ এটা নাহিদ,,

--এভাবে দেখেন না,,ফুচকা দেন,,(ফিসফিস করে)

আমি-----দিতাছি মামা একটু বসেন

--হু,,

আমি-----এই নিন মামা,,

খাওয়া শেষ করে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট দিয়ে চলে গেল,,
আমি টাকার দিকে তাকিয়ে দেখলাম কিছু লেখা আছে,,

লেখা টা ছিল---

চলবে,,,,,,

আপনাদের মতামতের উপর ভিত্তি করে দিতীয় পর্ব লিখবো,,
সবার সাড়া পেলেই লিখবো,,
আর হে কেউ নেক্সট নেক্সট করবেন না,, আমি আমার টাইমে গল্প দিয়ে দিবো,,
সবাই গঠন মূলক মন্তব্য করবেন,,,

##শিরোনামঃ এমন বাদল দিনে
#কলমেঃ ননীগোপাল অধিকারী
#অঙ্কনেঃ চিরঞ্জিত কোড়া

আজি এমন বাদল দিনে
বৃষ্টির ধারা নামিল ধরণীর বুকে,
আমার মনের্ চেতনায় তুমি
আনিলে প্রেম মোর চোখে।
স্রষ্টা তোমায় বানাইছে রমণী
দিতেছো ব্যাথা মোরে কেমনে!

কেন গো তুমি আকাশের মেঘ হয়ে
রয়েছো সদা মুখ ভারে!
জমানো কোন সে বেদনা
একান্তে অন্তরে বাদল ধারা ঝরে?
সজনী কোন সে অভিসারে বাড়িয়েছো চরণ,
আবিল পথে, সংগোপনে।

সংশয় ভরা জীবন আজি
চঞ্চল করে সদা মোরে,
তোমা পানে চকিত রয়েছি
মোর হিয়া যে অকসর ডরে।
ওগো রাই আর হয়ো না অভিমানী-
আসো মোর কুটীরে আজি অঝোর বরষণে।

#কবিতাটি আমরা গান বা কবিতা হিসেবে পাঠ করতে পারি। বাদল দিনে মনের যে আকুতি তারই এক বহিঃপ্রকাশ কবিতা ও চিত্রে আনা হয়েছে।।। কেউ সুর দিলে আমার আরও ভালো লাগবে।। ভালো থাকুন সুস্থ থাকুন।

সব ফুল লাগে কি অঞ্জলিতে
- কিরণময় নন্দী

পূবদিকের জানালা খুলে
অতীত কেন ভাবছো আজ
এমনদিন কি আর দেখতে হতো
ভালোবেসে যদি ধরতে হাত।

তখন তোমার একুশ বছর
শরীর জুড়ে মাদকতা
তখন তোমার নতুন সুর
সজীব তোমার তানপুরাটা।

রোজ সন্ধ্যেয় আমি বসে
তোমার সুরে সুর মেলাতে
সেই পূবের জানালা আজও খোলা
শুধু তোমার কণ্ঠ নাহি ভাসে।

দিক বদল হয়নি তোমার
আজও পূব জানালায় বসে
ঠিকানাটাই বদলে ফেলে
আজ কেন এতো অবসাদে?

তোমায় নিয়ে বুনেছিলুম
হাজার স্বপ্নজাল
সেই তোমায় ভালোবেসে আমি
একাকী তেরোটি বসন্তের সকাল।

আমার কথা কেনই পড়লো মনে
এতো বছর পরে
কেন বা বাজালে তানপুরাটা
আমার হৃদয় অন্তঃপুরে?

দূরে থেকে আমিতো বেশ ভালোই আছি
তোমায় ভালোবেসে
এমনি করেই কাটিয়ে দেবো
"সব ফুল কি লাগে অঞ্জলিতে"?

ব্রেন আউট
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

-'তুমি এটা পারো'?

-'ট্রাই করি একবার'।

-'পারবে তুমি'?

-'কোথায় পেলি এটা'?
-'এক্সিলেন্ট'।
-'আগের গুলোর থেকে অনেকটাই বেটার'।
-'এটলিস্ট ব্রেন টা.........'

নাম্বার সিকোয়েন্সসেস, মিসিং নাম্বারস; সেভ দি কিটেন ফ্রম দি মনস্টার; ফাইন্ডিং ট্র্যাংগলস আরও কত কি!

সবে তো বছর পাঁচ। এতকিছু এইটুকু বয়সে! মনে মনে অ্যাপ্রিশিয়েট করলাম। এই বয়সে আমরা মাঠে ধূলো মেখে বেড়াতাম।

নেশাতুর আমিও একটু হয়েছি। সিগারেটের শেষ কাউন্টার অবধি পৌঁছে তবে বিরাম। মারাত্মক নেশা হয়ে গেছে।

-দেখো তো এটা কেন হচ্ছে না। কখন থেকে ট্রাই করছি।

ও এটা! জলবত তরল। জি আই করায় এক সময় হাত পাকিয়ে ফেলেছিলাম। ফটাকসে করে দিলাম। নেক্সট। ও বাবা এ আবার কি? চুলের ভিতর আঙুলের বিলি কাটছি। না! হবে না রে। 'টিপস' দেখি কি বলছে।

-ভিডিও স্কিপ করলে টিপস পাবে না।

অবাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করলাম। টিপস এ চোখ বুলিয়ে পরেরটা সমাধান করলাম। নেক্সট.....

আমরা দুজন।
নেক্সট.... নেক্সট.....
কিছু আটকাছে তো। কিছু নিমেষে সমাধান করছি। বছর পাঁচের লিলিপুট ও কম যায় না। ইংরেজি টা পড়ে দিচ্ছি। বুঝিয়ে দিচ্ছি। সেকেন্ডের মধ্যেই প্রবলেমস সল্ভড। পিঠের মধ্যে হালকা চাপড়ে দিচ্ছি। জিনিয়াস। ভেরি গুড।

একটা ব্রেনের বয়স, বছর তেত্রিশ। আর একটা সদ্য ফোটা কুঁড়ি। বেশ পাল্লা দিচ্ছে। ওজন আছে বস। অশেষ সময়ের টেস্ট ম্যাচ। পার্টনারশিপ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বিরতিতে আছি।

বাসি মালা
- প্রসেনজিৎ ঘোষ

তোমাদের নোংরা ফেলা ডাস্টবিন আজ আমার নতুন ঠিকানা ,
বসন্তের ডাকে মালীর লালনে
আমাকে ফুটিতে হলো নব কিশলয়ে ,
তার পর এক দিন রূপ, রস,গন্ধ ,বর্ণ ছড়িয়ে দিয়েছি সমীরনে ,
মধুর লোভে আমাকে ঘিরে ছিল যত পোকা মাকড়ের দল ,
তার পর এসেছিল হাজারো প্রতিশ্রুতি
এক দিন মালীর আঙুলে নরম পরশে আমাকে মালা হতে হলো ,
বহু অর্থ দিয়ে কিনতে হয়েছিল কারন তাতে ছিল অসাধারণ গন্ধ যা সবাই কে মুগ্ধ করে ছিল ,
আর রাত শেষে তোমাদের কাছ থেকেই পেলাম 'বাশি ' নামে এক 'উপাধি '
যেখান থেকে ঝরেছিল হাজার প্রতিশ্রুতি
আজ সেথা তিরস্কার
যারা আমার পাওয়ার লোভে
লালসার ধারালো নখ দিয়ে
আমার সারা দেহ ছিন্নভিন্ন করছে ,
আমার করেছে কলঙ্ক তারা আজ তারা আজ সমাজের মূল স্রোতে
আর আমি তোমাদের নোংরা ফেলা ফেলা ডাস্টবিনে
আজ আমার নতুন ঠিকানা।।

মন কেমনের জন্মদিন
কলমে - শৈলেন মন্ডল

আমার প্রতিদিন পালিত হয় মন কেমনের জন্মদিন।

আবেগের অশ্রুপাতে সম্পর্কের চাদরে রক্তজলে ভেজানো থাকে আমার নাড়িছেঁড়া যন্ত্রনাগুলো।

সুখের সকালগুলো বারে বারে শুধু কপাল ধুয়ে দেয় তোমারই।

আর দুঃখের মেঘগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকে আর বলে আগল ভাঙ্গা কষ্টের কথা ইশারায়।

মেঘভাঙ্গা রোদ্দুরে বৃষ্টির শেষে তোমায় দেখা অধরাই রয়ে গেল।

আমারও ভালবাসার দিনগুলো বুঝি সমাপনের আখড়ায় ম্রিয়মান।

জলে ভেজা চোখগুলো তোমার অবিরত খোঁজ নিয়ে যায় আর স্মৃতিগুলো এলোমেলো করে দিয়ে যায়।

চিলেকোঠার জানালার কাঁচগুলো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে আসে।

কাল বৈশাখীর ঝড়ে গাছের শুকনো পাতাগুলো ঝরে পড়ে মন কেমনের আশা নিয়ে আর বলে আমরা আর আসবো না।

বৃষ্টিভেজা দুপুরে আসে আবার সোনালী রোদ্দুর আর আনন্দে জাগে শত অভিমানের মেঘের পসরা।

১৮.০৬.২০২০

বাবুর রথদেখা
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

ঘরের মধ্যে খাট ভর্তি বই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। শুকতারা, আনন্দমেলা আরও কতরকমের কমিক্স এর বই। পাখার হাওয়ায় বই এর পাতাগুলো ফটাফট আওয়াজ তুলে চলেছে ক্রমাগত। বই এর মেলার মাঝেই ঘুমিয়ে পড়েছে সে। মা'র সাথে সারা দুপুর রাগ-অনুরাগ, মান-অভিমানের বিস্তর পর্ব চালিয়ে একসময় বইএর পাতায় মুখ গুঁজে, ঘুম পরীদের ডাকে চোখের পাতা মুদেছে। সুরঞ্জনা যখন ঘরে এল। দেখল যে ছেলে কিছুক্ষণ আগে মা'র সাথে আদর মাখা ঝগড়া বাঁধিয়েছিল, সেই এখন পরম তৃপ্তি তে ঘুম পরীদের দেশে পাড়ি দিয়েছে। পরম মমতায় মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে দিয়ে, বইএর মেলা সযত্নে গোছগাছ করে ছেলের ঘর থেকে খুব সন্তর্পনে বেরিয়ে গেল।

এবছর একটা ভাইরাসে সারা দেশ জর্জরিত। জাঁকিয়ে বসেছে সে। সব কিছু পন্ড করেছে এক নিমেষে। অস্বাভাবিক ছন্দে ছন্দপতন ঘটেছে সব কিছুর। স্বাভাবিক ছন্দে ফেরত আসা অবধি অপেক্ষা ছাড়া কোনো উপায় নেই। সেই কবে থেকে ঘরবন্দি সবাই। বড়োদের থেকেও বেশী কষ্ট বাচ্চাদের। স্কুল বন্ধ। পার্ক বন্ধ। বন্ধু যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। স্বাভাবিক ভাবেই বিরক্ত হয়ে উঠেছে সুরঞ্জনার বছর দশের ছেলে বাবু। বন্ধুদের সাথে দেখা না হওয়ায় খেলাধূলা বিদায় নিয়েছে তার জীবন থেকে। একটা বাচ্চাকে কাঁহাতক বোঝানো যায়! সুরঞ্জনাও পারেনি। একটা সময় সেও বাবুর আবদার মেটাতে না পারায় নিজেকে অসহায় ভেবেছে।

বছরের পর বছর ধরে এই দিনটার জন্য বাবু অধীর আগ্রহে থাকে। এবছরও তার অন্যথা হয়নি। তার বাচ্চা মন। সে কি আর বোঝে! সবকিছুই এবারের মতো পন্ড হয়েছে। সুরঞ্জনা, বুঝিয়েও বোঝাতে পারেনি ছেলের শিশু মনকে। একটা সময় নিজের কাছে নিজেকেই পরাজিত মনে হয়েছে। মনে মনে রাগ ও করেছে সে।

আজ সেই রথের দিন। জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি যাবার দিন। এই সময়টায় বাবু'র বাড়ির সামনে রথের মেলা বসে। সকাল থেকে মধ্যরাত অবধি চলে সেই মেলা। লোকে লোকারন্যে একটা জনসমুদ্রের ঢল নামে রাস্তা জুড়ে। খেলনা, গাছগাছালি, ঘুগনি-পাপড়; মন্ডা-মিঠাই আরও কত হরেকরকমের দোকানের উপস্থিতি বিরাজ করে গোটা মেলায়। সন্ধ্যা থেকে চলে হকারদের হাঁকডাক। এই দিনটার জন্যই বাবু মুখিয়ে থাকে।

প্রতিবছর মা'র সাথে বাজারে গিয়ে একটা পছন্দসই রথ কিনে আনে বাবু। বাড়ির বাগানে থাকা ফুল-পাতা দিয়ে সাজানো হয় সেই রথ। তিনতলার রথে একদম ওপরে থাকেন, জগন্নাথ -সুভদ্রা-বলরাম। মাঝে থাকে পাঁচরকমের মিষ্টি। নীচের টা শূন্য রাখা হয়। বিকেলে সাজানো রথ নিয়ে পাড়ায় বেরোলে, পাড়ার দাদু-ঠাকুমা, জেঠু-জেঠিমা; কাকু-কাকিমারা রথের নীচের তলা ভরিয়ে দেয় খুচরো পয়সা দিয়ে। বাবুর টানা রথে তাঁদের সাক্ষাৎ জগন্নাথ দর্শন হয়।

নিজের রথ টানা শেষ করে, মা-বাবার সাথে হাত ধরে বাড়ির সামনের রথের মেলায় যায়, বাবু। মেলায় গিয়ে নিজের পছন্দ মতো গাড়ি কিনে গোটা মেলা চরকির মতো মা-বাবার সাথে ঘুরে বেড়ায়। নানান রকমের আলো, হরেক রকমের দোকানের পসরা দেখে বাবু মাঝে মাঝে আপনমনে হাততালি দিয়ে ওঠে। ছোটোদের জন্য রাখা মেরি -গো -রাউন্ডে চড়ে মজা করে। বাড়ি ফেরার পথে ঠোঙায় মোড়া জিলিপি আর পাপড় নিয়ে হাসি মুখে বাড়ি ফেরে।

এবছর সেসব কিছু না হওয়ায়, বাবুর রথ দেখায় ব্যঘাত ঘটায় খুবই বিরক্ত সে। দুপুরে মা'র সাথে অভিমান করে, অভিমান ভরা মুখে ঘুমিয়ে পড়ে। ছেলের অভিমান কাটাতে, সুরঞ্জনা স্টোর রুম থেকে খত বছরের পুরোনো রথটা বের করে। সেটাকে জল দিয়ে ধুয়ে ঝাঁ চকচকে করে, বরাবরের মতো বাগান থেকে ফুল-পাতা তুলে এনে রথটাকে মনের মতো করে সাজিয়ে তোলে। ঘরে থাকা ঠাকুরের সিংহাসন থেকে জগন্নাথ -সুভদ্রা-বলরামের মূর্তিটা বের করে রথের একদম ওপর তলায় রেখে দেয়।

ছেলের ঘুমোনোর ফাঁকে মিষ্টির দোকান থেকে কিছু মিষ্টি সমেত জিলিপি নিয়ে আসে। কিছুটা মিষ্টি রথের দ্বিতীয় তলায় রাখে। নীচের তলায় ভরিয়ে দেয় দেরাজে সযত্নে রাখা অনেক খুচরো দিয়ে। রথ সাজানোর কাজ শেষ করে, ছেলের জন্য একটা বড়ো হটপট ভর্তি করে পাপড় ভেজে রাখে। একটা ভাইরাস তার ছেলের 'রথ দেখা' আটকাতে পারে না! সুরঞ্জনা, মা হয়ে ছেলের খুশির জন্য শয়তান ভাইরাস কে হার মানাতেও দ্বিধা করে না। তাই সে, ছেলের অজান্তেই আয়োজন টা বেশ পরিপাটি করে সেরে রাখে।

সাজানো রথটা রেখে দেয় বাবুর ঘরে। ঘুম থেকে উঠেই প্রথম নজরে আসে সেই সাজানো রথ। ঘর থেকেই, 'মা' 'মা' করে চিৎকার করে ওঠে বাবু। তার গলার আওয়াজে খুশির ঝিলিক স্পষ্ট। একছুটে সুরঞ্জনা ছেলের ডাকে ঘরে গিয়ে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বলে ওঠে,

-'তুই যে আমার সোনা মাণিক'।
-'তোর রথ দেখা হবে না! তোর মা থাকতে'?

বাবু, সুরঞ্জনাকে জড়িয়ে ধরে দু'গালে দু'টো চুমু দেয়। ঘর থেকে দড়ি ধরে রথটা টেনে আসে। গোটা ঘর ঘুরতে থাকে খুশিতে। এরকম অবস্থায় সুরঞ্জনা ছেলের সামনে তুলে ধরে কয়েকটি জিলিপির সাথে কয়েকটি পাপড়।

আসছে বছর আবার হবে। এই আশায় বাবু পরম তৃপ্তিতে জিলিপির উপর কামড় বসায়। মা'র সাজানো রথ নিয়ে সারা ঘরে খুশিতে নাচতে থাকে। ছেলের এইরকম ছেলেমানুষি সব মা'র কাছেই পরম সুখের। এই সুখ স্বর্গীয় সুখ তুল্য। মান- অভিমান ভুলে মা-ছেলের আবারও কড়ি আঙুলের আড়ি থেকে বুড়ো আঙুলের ভাব হয়েছে। ছেলেকে খুশি করতে পেরে, সুরঞ্জনার চোখের কোন চিকচিক করে উঠল। বাবু তখনও পরম খুশিতে রথ নিয়ে এঘর - ওঘর করছে। সাথে জিলিপি-পাপড়ে কামড় বসাচ্ছে।
বাড়ি বন্দি থেকেও ছেলের রথ দেখার ঠিকঠাক আয়োজন করেছে সুরঞ্জনা। বাবুর রথ দেখাকে তার মা, সুরঞ্জনা সফল করেছে।

শত রূপে মোর মা
- প্রসেনজিৎ ঘোষ

তুমি মা কমলা রূপে
ধরণীর বুক করিলে শ‍্যামল
র্নিমল বায়ু বয় পাখিরা গানগায় ,
রাখাল বালক গাভী দল লয়ে যায় মাঠে,
র্দুগা রূপে মাগো তুমি অসুর দলনী
করিলে মাগো তুমি পাপোহরনী ,
বিদ‍্যা দেবী রূপে মাগো তুমি জ্ঞানদায়িনী ,
জীবের বুদ্ধি দাও মাগো তুমি জগৎজননী,
জগদ্ধাত্রী রূপে মাগো তুমি মা জগৎজননী,
তুমি মা কল্যাণময়ী
দীন জনের দুঃখ দূর করো ,ওগো মা কল্যাণময়ী
শিবের শিবানী মাগো তুমি
তুমি মা গনেশের জননী,
অন্নপূর্ণা রূপে মাগো তুমি অন্নদায়িনী
জীবের ক্ষুধা তুমি করিলে হরনী,
ওগো মা তুমি জগৎজননী ,
ভবতারীনি রূপে মাগো তুমি
রামকৃষ্ণের জননী ,
মাগো তুমি শত রূপে
আমার জননী
তুমি মা জগৎজননী।।

মুখেভাত
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

ভেলভেটের কাপড়ে মোড়া লাল রঙের অ্যালবাম টা আজও একইরকম ভাবে ঔজ্জ্বল্যতার সাথে সুখ স্মৃতি বহন করে চলেছে। ছবি গুলো বারবার দেখলেও যেন আশা মেটে না, সুরঞ্জনার। অ্যালবাম টা অনেক যত্নে রেখেছে সে। একটা কোথাও কাটাকুটির দাগ তো দূর কালো ছোপ ও ধরতে দেয়নি ছবি গুলোর ওপর। আলসে দুপুরের আলসেমিকে সঙ্গী করে অ্যালবাম টা দেরাজ থেকে টেনে নিয়ে ছবি গুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে। কখন স্মৃতির দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে নিজের অজান্তেই। হুঁশ ফিরল কলিং বেলের আওয়াজে। বেডরুম থেকে বেরিয়ে মূল দরজায় এসে দেখল, সুরঞ্জনার একমাত্র সন্তান বাবু ঘেমে-নেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রীষ্মের দুপুরে বেজায় কাহিল সে। দ্রুত পদে চাবি খুলে বাবু কে নিমেষে ঘরে নিয়ে এল।

বাবুর বাবা মারা যাওয়ার পর, মা-ছেলে মিলে নিজেদের মতো করে একটা ছোট্ট দুনিয়া বানিয়ে নিয়েছে। না আছে কোনো অভাব। না আছে কোনো অভিযোগ। দু'টি হাস্যমুখ সর্বদা জ্বলজ্বল করছে। মনের গভীরের ক্ষত ঢেকেছে সদাহাস্য মুখ।

ফ্রেশ হয়ে, দুপুরে খাবার টা খেয়ে মা-ছেলে মিলে ঠান্ডা ঘরে গল্পগুজবে মত্ত। বাবুর চোখ গেল লাল অ্যালবামটার দিকে। নজর পড়তেই টেনে নিল সে। সুরঞ্জনাকে অনেকবার লক্ষ্য করেছে এই অ্যালবাম আঁকড়ে বসে থাকতে। কারণে -অকারণে অ্যালবামের পাতা ওল্টাতে দেখেছে, তার মা কে। সে ভালো মতো জানে অ্যালবামে কি আছে। ছোট্ট বেলায় তার মা তাকে অনেকবার দেখিয়েছে সে অ্যালবাম। তখন সে সদ্য ফোটা একটা কুঁড়ি। তারপরেও বার কয়েক দেখেছে। কিন্তু সেরকম গুরুত্ব দেয়নি।

একটার পর একটা পাতা ওল্টাচ্ছে। আর মুচকি মুচকি হাসছে। একটা ছবিতে দেখল, ফুটফুটে একটা বাচ্চার মাথায় টোপর লাগানো। পরনে ধুতি পাঞ্জাবী। ঠিক যেন বর বর। ছবিটা দেখেই মা'র দিকে তাকাল। সুরঞ্জনা বেশ বুঝতে পারল, ছেলের চোখের ভেসে ওঠা প্রশ্ন কে। অ্যালবাম টা টেনে নিয়েই সুরঞ্জনা বলে উঠল,

-'কত কিউট ছিলি'।
-'বেশ লাগছিল তোকে'।

বাবু অমনি বাচ্চার মতো বায়না করে উঠল,

-'বলো না মা সেই গল্প'।

সুরঞ্জনা, ছেলের মাথায় স্নেহের পরশ বুলিয়ে বলে ওঠে, 'তোর সেই গল্প শোনার নেশা এখনো গেল না। শোন তবে সেই গল্প'।

বাবু,ছোট বেলার মতোই দু'গালে দু'টো হাত রেখে পরিপাটি হয়ে বসল। ছেলের ছেলেমানুষি দেখে ঠোঁটে একটা মুচকি হাসি টেনে সুরঞ্জনা ভাবল, এ ছেলে আর বড়ো হবে না। সারল্য যেন তার ছেলের মুখে এখনো স্পষ্ট। যদিও মনে মনে খুশিই হল সে।

ছেলের গল্প শোনার আব্দারে কখনও ই না করেনি সুরঞ্জনা। বেশ জানে এ তার ছেলের পুরোনো অভ্যাস। যখন প্রতিটি বাচ্চা মোবাইলে নানান রকম গেম নিয়ে সময় কাটাত। বাবু ছিল ঠিক তার উল্টো। মা'র কাছে আব্দার জুড়ত গল্প শোনার। পছন্দের তালিকায় সর্বোচ্চ স্থানে থাকত, ভূতের গল্প। রোজ বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলতে হত, সুরঞ্জনা কে। আজও ছেলের আব্দার পূরণ করতে,

-' তুই যখন জন্মালি আমি যেন পৃথিবীর সব সুখ পেয়ে গেলাম। ওটি তে অর্ধ অজ্ঞান অবস্থায় ও আমার মুখের হাসি দেখে ডাক্তার বাবু তারিফ করেছিলেন আমার সাহসের। আমার সমস্ত ব্যথায়, সমস্ত যন্ত্রণার ঔষুধ যে তোকে পেয়েছি তখন। পাঁচদিন পর বাড়ি ফিরলাম প্রাইভেট হাসপাতালে থেকে। ফুটফুটে এক রাজপুত্রের মা হয়ে। তোর দাদু, বাবা সবাই কতটা যে খুশি ছিল! বলে বোঝাতে পারব না। এরপর আস্তে আস্তে তুই বড়ো হতে থাকলি। সাত মাসে এসে পৌঁছোলি। আমাদের বাড়ির নিয়মকানুন অনুযায়ী তোর এবার ভাত খাবার পালা।'

এটুকু বলে থামল, সুরঞ্জনা। বোধহয় একটু ঢুলু ঢুলু চোখ। বাবু বলে উঠল, 'তারপর বলো মা'। ছেলের কথায় সুরঞ্জনা,

-'খুব মজা লাগছে না'!

-' আমাদের ফ্ল্যাটবাড়িতে বিস্তর জায়গার অভাবে একটা বাড়ি ভাড়া করা হ'ল। তারিখ ঠিক হ'ল ৭ই জুলাই তোকে ভাত খাওয়ানো হবে। সবকিছু ঠিকঠাক করতে করতে সেই দিন উপস্থিত হ'ল। বাড়ির সবাই প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে ভাড়া বাড়িতে চলে গেলাম। সাথে আমাদের রাজপুত্র'।

বাবু হঠাৎই বলে ওঠে,

-'আমি রাজপুত্রই ছিলাম মা। চুলগুলো কি সুন্দর ঝাঁকড়া ছিল। কাল্পনিক নয় মা, বাস্তবের রাজপুত্র আমি'।

ছেলের কথায় সুরঞ্জনা এবার না হেসে পারলে না। হো হো করে হেসে উঠে ছেলের চুলে আঙ্গুলের বিলি কাটতে কাটতে বলল,

-'তুই তো আমার রাজপুত্তুর ই'।

তারপর শোন বলে যোগ করল,

-' সারা বাড়ি নীল-সাদা বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছিল। মূখ্য দরজায় ফুল দিয়ে গেট বানিয়ে সেখানে লেখা ছিল, 'কিগানের শুভ অন্নপ্রাসন'।

বাবু এবার একটু অন্যরকম প্রশ্ন করল, সুরঞ্জনাকে

-'তোমার আর বাবার কি আর্জেন্টিনা ফুটবল ক্লাব খুব প্রিয় ছিল'?

ছেলের কথা প্রথমটা বুঝতে পারেনি সুরঞ্জনা। আবারও হো হো করে হেসে উঠে বলল,

-'বেলুনের রঙের জন্য বলছিস'?
-'তা তো প্রিয় ছিলই'।
-'মেসিও আমাদের দু'জনের খুব পছন্দের ছিল'।
-'তার কারণে অবশ্য তোর অন্নপ্রাশনের বেলুন নীল-সাদা করা হয়নি'।

বাবু একটু হেসেই বলল,

-'তাই বলো'।
-'আমি ভাবলাম........'

স্নেহমাখা হালকা ধমকের সুরে সুরঞ্জনা ছেলেকে থামিয়ে বলে উঠল, 'তুই শুনবি কি গল্প'?

বাবু মুখ চেপে ফোক্কড়ের মতো হাসতে হাসতে বলল,

-'বলো বলো'।
-'রাগ করেনা আমার সোনা মা'।

সুরঞ্জনা, ছেলের এহেন ব্যবহারে রীতিমতো একটু জোরেই হেসে উঠে বলতে শুরু করল,

-' শুরু হ'ল নানারকম পূজাচারের অনুষ্ঠান। নিমন্ত্রিত দের তালিকায় অনেকেই ছিল। সব থেকে মূল্য বান যারা ছিল........'

সুরঞ্জনাকে খানিক থামিয়ে, বাবু অবাক চোখে জিজ্ঞেস করে, ' কারা ছিল মা'?

'বলছি' বলে সুরঞ্জনা বলে ওঠে, তার আগে এটা শোন।

-'একটা থালায় বই-পেন-টাকা-মাটির ঢেলা সমেত একটা জিনিস তোর সামনে রাখা হয়েছিল। মজার ঘটনা হ'ল সেখান থেকে তুই কোন জিনিসটা তুললি জানিস'?

গালে হাত দিয়ে প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে অবাক চোখে বসে আছে বাবু। সুরঞ্জনা বুঝতে পেরে বলে ওঠে,

-'সবকিছু ছেড়ে মাটির ঢেলাটা তুললি। উপস্থিত সবাই বলে উঠল তুই নাকি ইঞ্জিনিয়ার হবি'।

-'তুমিও কি তাই চেয়েছিলে মা'?

বাবুর কথায় সুরঞ্জনা বলে ওঠে,

-'আমি চেয়েছিলাম তুই মাটির মতো মানুষ হো। আর তুই যেটা ভালোবেসে করবি, আমি মেনে নেব'।

সুরঞ্জনার গলা জড়িয়ে বাবু ব'লে ওঠে,

-'তোমার মতো মা পেয়ে আমি ধন্য'।
-'তোমার সাপোর্ট এর জন্য আজ আমি গানের সাথে ছবিতে, জীবনের ক্যানভাসে রঙ তুলি দিয়ে রঙিন করে তুলেছি'।

-'আচ্ছা হয়েছে অনেক তত্ত্ব কথা। এবার একটু ঘুমোতে দে আমায়'।

মা'র কথায় বাবু বলে ওঠে,

-'তুমি বললে না তো আমার অন্নপ্রাশনে বিশেষ কারা এসেছিল'!

-'ও হো। আমি ভাবলাম ভুলে গেছিস', বলে সুরঞ্জনা গল্পের শেষ অংশ যখন বলা শুরু করল বাবুর চোখের কোন চিকচিক করে উঠল।

-'তোর ঠাকুরদা তোর মুখে প্রথম ভাতটা দিল। তুই বেশ চুকচুক শব্দ তুলে ফোকলা মুখে খাচ্ছিলি। মুখে নূতন স্বাদ লাগায় বেশ আনন্দ পেয়েছিলি। এরপর সেই বিশেষ জনদের তোর কাছে নিয়ে আসা হ'ল। আমার ইচ্ছেতে ওরাও তোর মুখে ভাত তুলে দেয়। একটা অনাথ আশ্রম থেকে গুটিকয়েক বাচ্চাকে আমন্ত্রিত করে এনেছিলাম। ওরা, তোর সাথে খুব আনন্দ করেছিল। অনেকে ভুলভাল কথা বলেছিল। আমি সে সব বিশেষ পাত্তা দিইনি। তুই ও বেশ ওদের সাথে খেলা করছিলি'।

সুরঞ্জনার কথা শেষ হ'লে বাবু ধরা গলায় বলে ওঠে,

-'আমার কাছে তোমার মতো মা আছে। যাদের কাছে নেই তাদের জন্য আমি কিছু করতে চাই মা'।

ছেলের এরকম মন্তব্যে এক বিশেষ অনুভূতি অনুভূত হয়েছিল সুরঞ্জনার। গর্বিত মা। আনন্দিত মা। ছেলের মুখেভাতের দিন মনে মনে সুরঞ্জনা চেয়েছিল, ছেলে মাটির মানুষ হোক। সার্থক তার চাওয়া।

#পঞ্চপান্ডব_সিরিজ(এক)
#পুরুলিয়ায়_পঞ্চপান্ডব
#ঝিলিক_মুখার্জী_গোস্বামী

_ ভুতুড়ে মেসবাড়ি ছেড়ে চলে আসার পর আস্তানা গেড়েছিলাম, উত্তর কোলকাতার রাজবল্লভ পাড়ার আর একটি বাড়িতে। ভূতের ভয়ে তো আর জীবন যুদ্ধে হেরে গেলে চলে না। তাহলে মরে ভূত হয়েও শান্তি পেতাম না। অতৃপ্ত আত্মাদের দলে নাম লিখিয়ে ফেলতাম। সেটি হতে দিতে পারিনা।

_এটা ঠিক মেসবাড়ি নয়। গঙ্গার ঠিক ধারে না হলেও মনোরম পরিবেশ ছিল থাকার পক্ষে উপযুক্ত। দক্ষিণের খোলা বারান্দা দিয়ে ফুরফুর করে বয়ে আসত মিষ্টি শীতল প্রাণবায়ু। সারাদিনের ক্লান্তি এক নিমেষে ধুয়ে মুছে সাফ করে দিত।

_এখানে একটি অন্যরকম নিয়মে বাঁধা পড়েছিলাম আমরা। চার-পাঁচটি ঘর মিলিয়ে, মেসবাড়ির মতন। এক একটি ঘর ছিল পাঁচজনের জন্য বরাদ্দ। নিয়ম করে এক একটি ঘরের সদস্যাদের উপর বর্তাত বাজার-ঘাট করার দায়িত্ব। মাসান্তরে একবার।

_আগের মেসবাড়ির মতো এত কড়াকড়ির বালাইও ছিল না। কারণ, মেসমালকিন সুদূরে অবস্থান করতেন। আমারা আমাদের মতো করে মেসবাড়ির সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়েছিলাম। একদম নিজেদের মতন করে। মাস গেলে টাকাটা তুলে দিয়ে আসতাম মালকিনের হাতে। মাঝে সাঝে উনি এসে দেখে যেতেন। আমাদের না! ওনার বাড়ি ঠিক ঠাক রেখেছি কিনা তা।

_আমাদের মেসের রান্নার দায়িত্বে এবং ঠিকে কাজের দায়িত্ব একজনের উপরই ন্যস্ত ছিল। আমরা যে যার এঁটো বাসন ধুয়ে নিতাম। ওইটুকু না করলে, চক্ষুলজ্জায় পড়তাম।

_ভালো ভাবেই দিন যাপন হচ্ছিল। সবাই যে যার মতো ব্যস্ত। আমি তখনও জুতোর সোল খোয়াচ্ছি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হয়নি।

_আমার ঘরে আমি ছাড়া আরও যে চারজন ছিল। তাদের সাথেও আগের মেসবাড়ির মতো বেশ সখ্যতা হয়ে গেছে।

_অনেকগুলো মাস কাটালাম ওদের সাথে। মেস জীবনে করেওছি অনেক কিছুই। সে সবের বিবরণ নিষ্প্রয়োজন।

_এবছর এপ্রিলের দোরগোড়ায় কোলকাতার গরম চাবুকের মতো মারছে যেন। বিকেলে যদিও গঙ্গার ঘাটে চলে যেতাম আমরা পঞ্চপান্ডব। সারা শহরে খোলা হাওয়া একমাত্র এখানেই মেলে। অকারণে লঞ্চে চড়ে হাওড়ার জেটিতে গিয়ে আবার ফিরে আসতাম।

_একদিন এরকমই গঙ্গার ঘাটে বসে প্রাণবায়ু সঞ্চয় করছি আর ঘটি গরম চিবোচ্ছি। পঞ্চপান্ডবের এক পান্ডব, রাকা বলে উঠল...

--"একটা হ্যাং আউট করলে কেমন হয়"?

__মন্দ হয়না। সবাই একসাথে বলে উঠলাম।

__শর্মী বলল,
--"কোথায় যাবি"?

__ সে একটা লাখ টাকার প্রশ্ন বটে।

__এখানে বলে রাখি মেসবাড়ি কান্ডের পর আমার সাহস একটু দীর্ঘায়িত হয়েছে।

__প্রস্তাবটা আমাও রাখলাম।
--"পুরুলিয়া"।

__বাণী বলে উঠল,
--"এই পচা গরমে পুরুলিয়া"?
--রক্ষে করো"।

__আমি আবারও বলে উঠলাম,
--"ওখানে একটা বিশেষ জায়গা আছে। গেলে নিরাশ হবি না"।

__অর্না জিজ্ঞাসু নেত্রে আমার দিকে তাকিয়ে....

__বাকী মেসে গিয়ে আলোচনা হবে। চল উঠি।

__রাতের খাবার সেরে পঞ্চপান্ডব প্ল্যান করতে বসলাম। ঠিক হল একটা শনিবারের সকালে বেরোনো হবে। রবিবার বিকেলে ফেরত। খরচ খরচার একটা লিস্টি করা হল।

__চাঁদা তোলা হল। টিউশন পড়িয়ে কিছু টাকা। বাড়ি থেকে মিথ্যে বলেও কিছু ঝাড়া হল। সত্যি বললে, টাকার বদলে অন্যকিছু জুটত। সবাই সত্যিটা বেমালুম চেপে গেলাম।

__ দু'দিনের জন্য কিছু শুকনো খাবার প্যাকিং করা হল। আর নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস।

__শনিবার আসার আগে মেস মালকিন কেও একটা তথ্য দিয়ে আসা প্রয়োজন। এখানেও একি রকমের মিথ্যে প্রয়োগ করলাম সবাই। যে যেভাবে পারল মেস মালকিন কে কনভিন্স করল।

__হাজির সেই দিন। সেই মুহূর্ত। শনিবারের ভোরে বেরিয়ে পড়লাম, পঞ্চপান্ডব। মিনি ধরে সোজা হাওড়া। সেখান থেকে পুরুলিয়া গামী ট্রেন ধরে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে ঘন্টা দুই এর একটু বেশী লাগল।

__স্টেশানে নেমে একটা টোটো ভাড়া করলাম। যে জায়গার নাম বললাম, তাতে টোটাওয়ালা আমাকে প্রায় দশ সেকেন্ড পর্যবেক্ষণ করলেন।

__দুপুর দুপুর পৌঁছে গেলাম। একটা আস্তানা দরকার। খুঁজতে খুঁজতে গ্রামের দিকে পা বাড়ালাম। গ্রামের একজনের দাক্ষিণ্যে একটি মাথা গোঁজার ঠাঁই হল বটে। সাথে আহারের ব্যবস্থাও।

__দুপুরে বেশ ভালোই খাওয়া দাওয়া হল। সাদা ধবধবে ভাত। চাপ চাপ মুসুর ডাল। আলুর চোখা। অমলেট। শেষ পাতে ঘরে পাতা দই। আহা। অমৃত।

__আমরা যেখানে আস্তানা গেড়েছি তার পাশেই আছে অযোধ্যা পাহাড়। মনোরম গ্রাম্য পরিবেশ। গরম এখানে মারাত্মক। দুপুরের মেঘ দেখে মনে হচ্ছে বরুণ দেব ঠান্ডা করবেন আজ।

__অর্না একটু বিরক্ত হয়েই বলল,
--"এখানে ছাই-পাঁশ কি আছে শুনি"?
--"বসে বোর হচ্ছি"।
--"ঘোরার কোনো জায়গা নেই"।

__আমি সেদিনের গঙ্গার পাড়ের অসমাপ্ত কথাটা শুরু করলাম।
--"এখানে যেটা দেখতে নিয়ে এসেছি ঠিক দেখতে পাবি"।
--"আমরা কোন স্টেশানের কাছে আছি সেটা লক্ষ্য করেছিস"?

__রাকা বলে উঠল,
--"কই, কিছু লক্ষ্য করলাম না তো"।

__বাণী বলল,
-- "ওয়েট। ওয়েট"।
--"বেগুন....."

__এবার শর্মী,
--"মনে পড়েছে"।
--"বেগুনকোদর স্টেশান"।

__রাকা এবার বলে উঠল,
--"এটা তো ভুতুড়ে স্টেশান"।

__অর্না এবার আরও বিরক্ত হয়ে বলল,
--"বিজ্ঞান বলে ভূত বলে কিছু নেই"।
--"আমি ভূতে বিশ্বাস করি না"।
--"চোখে না দেখা অবধি তো নয়ই"।

__আমি এবার একটুও বিরক্ত না হয়ে বললাম,
--"তুই জানিস কি এর পেছনে কত ইতিহাস আছে"?

__অর্না হঠাৎই বলে বসে,
--"রাখ তোর গুগল বিদ্যা"।

__ অনেকক্ষণ থেকে মাথা ঠান্ডা রেখে কথা বলছি। বিদ্যা-বুদ্ধি নিয়ে কথা বললেই আমার মাথার ধুনি জ্বলে ওঠে। মেজাজ সপ্তমে চড়ে যায়। আমি হলাম গিয়ে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের দেশের লোক।

__একটা তর্কাতর্কি বেঁধে যেত। যদি বাইরে থেকে একটা গলা খাঁখারির আওয়াজ না আসত।

__যাঁর দাক্ষিণ্যে আমাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল। সেই ঘরের মালিকের প্রবেশ।

--"তোমাদের কথা লুকিয়ে শোনার জন্য ক্ষমা চাইছি। আসলে আমি আসছিলাম তোমাদের কাছেই। সন্ধ্যায় জলখাবারের কথা জিজ্ঞেস করতে। দরজায় এসে থমকে যাই। তোমাদের কথা শুনে"।

__একটু থেমে তিনি আরও শুরু করেন। আচ্ছা ওনার নাম উল্লেখ প্রয়োজন এখানে। শ্রীকুমার কাকু। তিনি আবার শুরু করলেন,
--"বেগুনকোদর আগে ছিল একটি ঝাঁ চকচকে স্টেশান। 1967 সালের দিকে বোধকরি এই স্টেশানের পত্তন হয়। দক্ষিণ -পূর্ব রেল শাখার রেল চলাচল শুরু হয় এই স্টেশানের ওপর দিয়ে। দিন থেকে রাত ট্রেনের বাঁশি আর লোকজনের আওয়াজে স্টেশানটি মুখরিত থাকত। স্টেশান লাগোয়া বাজার বসত। হঠাৎই একদিন...."

__এইটুকু বলে থামলেন, শ্রীকুমার কাকু।

__অর্না বাদে আমরা বাকি চারজন সেই গল্প খুব মনোযোগ দিয়ে শুনছি। অর্না ব্যস্ত টেম্পল রান গেমে।

__আমরা বাকি চারজন একসাথে বলে উঠলাম,
--"হঠাৎই কি কাকু"?

__তিনি আবারও শুরু করলেন,
--"কর্মরত স্টেশান মাস্টারের পুরো পরিবারের লাশ পাওয়া যায়,স্টেশান সংলগ্ন একটি কুঁয়োতে। তাদের মৃত্যুর কারন, ঝালদা পুলিশ উদ্ধার করতে পারেনি। অনেক ছানবিন করেও যখন কিছু উদ্ধার হল না, কেস ফাইল বন্ধ হয়ে গেল"।

__বাণী বলে উঠল, "তারপর"?

__"তারপর আর কি? ওই মৃত্যুর পর শোনা যায় কোনো এক মহিলার আত্মাকে দেখে নাকি স্টেশান মাস্টারের পরিবারের মৃত্যু হয়। তার আত্মা নাকি স্টেশানে ঘুরে বেড়ায়। শুধু রাতে না। দিনের আলোতেও সে আত্মা নাকি ঘুরে বেড়ায়। ভয়ে গ্রামবাসীরা ওমুখো হয় না। একসময় ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়। ভুতুড়ে স্টেশানের সাক্ষী হয়ে একা দাঁড়িয়ে থাকে বেগুনকোদর স্টেশান"।

__এতক্ষণ অর্না চুপ ছিল। বলে উঠল,
--"আজ সন্ধ্যায় তাহলে মিশন বেগুনকোদর হয়ে যাক"!

__আমরা ওই গল্প শুনে সাময়িক ভয় পেয়েছিলাম ঠিকই। অর্নার এই কথায় উৎসাহী হয়ে সম্মতি জানাতে যাব...

__"কেন ছেলে খেলা করছ ওনাদের নিয়ে? ফল কিন্তু ভালো হবে না। যেওনা"।

__শ্রীকুমার কাকুর কথার প্রতিবাদ করে, এই প্রথম পঞ্চপান্ডব একজোট হয়ে বলল....
---"মিশন বেগুনকোদর হবেই আজ"।

__শ্রীকুমার কাকু চলে গেলে আমরা তৈরী হই। টর্চ, আর একটি ক্যামেরা।ভূতের ছবি তোলার জন্য। যদি সে সত্যিই থাকে। বেরোনোর আগে পাঁচজন একটু শক্তি সঞ্চয় করে নিলাম, চা সহযোগে।

__দুপুরেই গ্রামবাসী এমুখো হয় না। আবার সন্ধ্যায় ! চারিদিক খাঁ খাঁ করছে। কেউ কোথাও নেই। আমরা এগোচ্ছি ভুতুড়ে স্টেশানের দিকে। স্টেশানে বেশী লাইটও নেই। একটি, দু'টি লাইট টিমটিম করে জ্বলছে।

__প্রথমে এলাম টিকিট ঘরের সামনে। ইতিউতি উঁকি মারলাম। গলা ছেড়ে হাঁক ডাক দিলাম। কোথায় কি!

__টিকিট ঘর পেছনে ফেলে ট্র্যাক পেরিয়ে স্টেশানে গেলাম। বসার জায়গা দখল করে বসলাম। সবাই চুপচাপ বসে আছে দেখে আমি একটা গলা ঝাড়া দিয়ে কথা পাড়লাম,
--"জানিসতো এই স্টেশান প্রায় ষাট বছর বন্ধ ছিল। 2009 সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে স্টেশানের পূনরায় নবীনীকরন ঘটে। একটি ট্রেন চালু হয়। সারাদিনে একটি ট্রেন মাত্র। কিন্তু কিছু দিন পর তাও বন্ধ হয়ে যায়"।

__রাকা প্রশ্ন ছোঁড়ে, "বন্ধ হবার কারন"?

__আমি আবার শুরু করলাম,
--"শুনেছি একটি মেয়েলী আত্মা নাকি স্টেশান চত্বর আগলে বসে থাকত। ' অনধিকার প্রবেশ নিষেধ' এর একটি অদৃশ্য বোর্ড হাতে। সেই......"

__কথা শেষ হয়না। পাঁচ জোড়া চোখ একটি জায়গায় স্থির হয়ে যায়। একটি মেয়ে হেঁটে আসছে আমাদের দিকে।

__অজান্তেই সবাই সবার হাত চেপে ধরি। আর মাত্র পাঁচ পা অতিক্রম করলেই আমাদের নাগাল পেয়ে যাবে।

__মেয়েটি আমাদের কাছে এসে মুখোমুখি একটা বসার চেয়ার দখল করে বসে।

__ নিস্তব্ধতা ভেঙে মেয়েটি শুরু করে,
--"তোমরা নূতন মনে হচ্ছে। আগে তো দেখিনি"।

__শর্মী-রাকা একসাথে,
--"হ্যাঁ। বেড়াতে এসেছি"।

__"বেড়াতে না ভূত দেখতে"?

__চমকে উঠি সবাই। অল্প অলোতেও মেয়েটির মৃদু হাসি চোখে পড়ে।

__"আমি রোজ আসি দুই বেলা। কিছুই চোখে পড়ে না। ওদিকে গ্রামবাসীরা রটিয়ে বেড়িয়েছে দিনের বেলায় ও কে নাকি গা ঘেঁষে চলে যায়। চুপি চুপি কথা বলে"।

__অর্না বলে উঠল,
--"যাক। তুমিও তাহলে বিশ্বাস করো ভূত নেই"।

__মেয়েটি বলে ওঠে,
--"তা তো বলিনি। বলেছি আমি কোনোদিনও দেখিনি।"
--"দেখিনি মানে যে, তেনারা নেই সে বিশ্বাস করি না"।
--"আছেন নিশ্চয়ই "।

___"সেটা দেখার জন্যই আমরাও উদগ্রীব", অর্না বলে ওঠে।

__আবার নীরবতা। এখন মনে হচ্ছে নীরবতাও কথা বলে।

__"তুমি রোজ আসো, একা"?
---"ভয় করে না তোমার "?
নিজের অজান্তেই ঠোঁট ছাপিয়ে প্রশ্ন গুলো করে ফেলি, মেয়েটিকে।

__"আমার ভয় পায় না। আগে খুব ভয় পেতাম। তারপর একদিন এই স্টশানেই...."
বলেই থমকে গেল মেয়েটি।

___আমরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছি। পরের কথাটা শোনার অপেক্ষায়।

___" একদিন একরাশ মন খারাপ নিয়ে বসে আছি এই স্টেশানে। প্রেমে দাগা। তখন স্টেশানে খুব ভিড় জমত। অনেকক্ষণ থেকেই বসে আছি। দূর থেকে একটা দূরপাল্লার ট্রেনকে আসতে দেখে স্টেশানের দিকে এগিয়ে যাই....."

__মেয়েটির কথা থামিয়ে অর্না বলে ওঠে,
--"এরপর বলবে ট্রেনে মাথা দিলে"।
--"তারপর ভূত রূপে অতৃপ্ত আত্মা হয়ে স্টেশানে ঘাঁটি গাড়লে"।
--"অনেক শুনেছি এ গালগল্প"।
--"সো স্টপ ইট ননসেন্স"।

__অর্নার গা জ্বালানি কথা বরাবরের। বিজ্ঞান নিয়ে পড়েছে বলে মাথা কিনে নিয়েছে যেন। যা মুখে আসে বলে যায়। ভেবেও দেখে না অপর মানুষটি কিরকম বোধ করছে।

__আমি, রাকা; বাণী আর শর্মী আর বসে থাকতে না পেরে আমাদের আস্তানার দিকে পা বাড়াই। পাকামো দেখিয়ে অর্না রয়ে যায় স্টেশানে একা। সাথে অবশ্য সেই অপরিচিত মেয়েটি ছিল। আমারা কিছুটা বিরক্ত হয়েই ফেরত আসি।

__ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে আটটা। অর্না বলেছিল মিনিট পনেরো এর মধ্যেই ফিরবে। আমরা আর দেরী না করে বেরিয়ে পড়ি। শ্রীকুমার কাকা এবার আমাদের সঙ্গী হন।

__দৌড়াতে দৌড়াতে স্টেশানে গিয়ে পৌঁছাই। গিয়েই যা দৃশ্য দেখি.....

___ অর্নার শরীরটা বেঞ্চ থেকে নীচে পড়ে আছে। অচৈতন্য না কি প্রাণ ত্যাগ দূর থেকে ঠাহর করতে পারি না।

__অর্নার শরীরের পাশে বসে আছে সেই স্টেশানের মেয়েটি। চোখ থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরুচ্ছে। সেই আগুন অর্নাকে ভস্মীভূত করে দেবে যেন।

__মেয়েটির সেই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে আমারা যেখানে স্থির ছিলাম সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম। এক পা ও এগোনোর সাহস হল না।

__কিছুক্ষণ বাদে দেখলাম, সেই মেয়েটির মাথাটি এমনি এমনিই আমাদের দিকে ঘুরে গেল। শরীর যেমন স্থির ছিল সেই অবস্থাতেই।

__ওই অবস্থায় মেয়েটি উঠে দাঁড়াল। অর্নার শরীর ছেড়ে। আমাদের দিকেই মুখ করে আমাদের উল্টো দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অন্ধকারে হারিয়ে গেল।

__অর্নার সামনে গিয়ে, নাড়ী টিপে বুঝলাম
---"বিজ্ঞানে বিশ্বাসী ভূতে অবিশ্বাসী অর্নাকে ভূতে কুপোকাত করে অজ্ঞান করে দিয়েছে"।

__অর্নাকে নিয়ে আস্তানায় ফিরলাম। মুখে চোখে জল ঝাপটা দিয়ে তার জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হল। একটু ধাতস্থ হয়ে উঠে বসল।

_"আমি বেঁচে আছি", এটুকুই মুখ থেকে বেরোল। অর্নার।

__এক কাপ গরম দুধ খেয়ে একটু মনে হল যেন সুস্থ বোধ করছে, অর্না।

__আমরা অপেক্ষায় আছি কি ঘটেছে শোনার জন্য।

__শ্রীকুমার কাকা বলে ওঠে,
--"দেখলে তো তেনাদের সাথে মজা করার ফল"!

__ প্রতিবাদী অর্না এখন একদম চুপ। শ্রীকুমার কাকুর কথায় কোনো প্রতিবাদ জানাল না।

__ভীষণ অস্থির হয়ে রাকা বলল,
--"কিসের কারনে তুই অজ্ঞান হয়েছিলি"?
--"ঠিক কি ঘটেছিল"?

__ আমাদের সবার অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অর্না মুখ খোলে। জানায়.,
---"বেশ খোশমেজাজে গল্প চলছিল। অশরীরী আত্মা নিয়ে বিতর্ক জমে উঠেছিল। হঠাৎই সে বলে উঠল,

---"আমি তোমাকে এমন কিছু দর্শন করাব, তুমি বিশ্বাস করতে বাধ্য হবে ভূত আছে"।

__আমরা সবাই চুপ করে শুনছি। ঘরে যেন পিন ড্রপ সাইলেন্ট।

__অর্না শুরু করল আবার,

---"হঠাৎই মেয়েটি পলকের মধ্যেই আমার পাশে চলে এল। অল্প আলোর মধ্যেই দেখলাম, তার চোখের কোটরে মণি গুলো উধাও। একটুও ভয় না পেয়ে প্রতিবাদী হয়ে বলললাম, আমাকে হিপনটিজম করা এত সহজ নয়। বোধহয় এই কথায় তার আঁতে ঘা লেগেছিল। ধরল তার আসল রূপ"।

__আমি বলে উঠলাম,
--"কি রকম রূপ"?

___ অর্না এবার একটা কৃতজ্ঞ পূর্ণ দৃষ্টি তে আমার দিকে তাকাল। বোধহয় বোধগম্য করেছিল, আমার গুগল তথ্য এতোটাও ভুলে ভরা নয়।

__সে আবার শুরু করল,
---"তার সে রূপ আমি ভুলব না। চোখ জোড়া থেকে ঠিকরে বেরুচ্ছে আগ্নেয়গিরি। অস্হিকোটর যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। গোটা শরীরের কোথাও এতটুকু মাংসের আবরণ নেই। মেদ বিহীন একটা শরীর হাওয়া তে ভেসে বেড়াচ্ছে। আর সাথে কানে তালা লাগানো একটা অট্টহাসি "।

---"সে এও বলেছিল, এই স্টেশান একান্তই তার। অকারণে কেউ কৌতূহল দেখাক, সে তার পছন্দ নয়"।

---"তার সেই বীভৎসতা দেখে মূর্চ্ছা যাই ক্ষণিকের মধ্যেই। তারপর আর জানিনা কিছু। প্রাণে যে মারেনি। এই রক্ষে"।
__একটানা বলে থামল, অর্না।

__আমরা পরস্পর মুখ চাওয়া চায়ি করলাম। মনে মনে ভাবলাম,
--"ভূতের সাথে বসে গল্প করে এলাম তার খাস তালুকে বসে"।

__ঘটনার পরদিন শ্রীকুমার কাকুর সহায়তায় পুরুলিয়া স্টেশান অবধি এসে সশরীরে সবাই মেসে ফিরি। সারা ট্রেনে কেউ একটিও কথা বলেনি। অর্নার মতো সবারই একটা ট্রমা হয়েছে।

__এই ঘটনার পর থেকে অর্নার ভূতে বিশ্বাস ফিরেছে। আমাদের সাথের ক্যামেরা টি ভুল করে স্টেশানে চলন্ত অবস্থায় ফেলে আসার ফলে সব রেকর্ডিং হয়ে যায়। আমারা অবশ্য পরে তা উদ্ধার করি। কারন সেই ট্রমা থেকে বেরোতে একটু সময় লেগেছিল আমাদের।

__অনেকদিন পর আজ আবার ভিডিও ক্যামেরাটা পরিস্কারের জন্য প্যাকেট খুলে বের করি। আমার আবার ইলেকট্রনিক জিনিসের প্রতি যত্ন খুব।

__ক্যামেরাটা ওপেন করতেই......

---" বেগুনকোদর স্টেশানে বসে থাকতে দেখা যায় স্টেশান মাস্টারের পরিবার সমেত সেই মেয়েটির অশরীরী আত্মা। তাদের মাঝে বসে আছি আমরা পঞ্চপান্ডব"।

_____________________☠☠__________________

দিন যায় আসে রাত
আলো আঁধারিতে সম্পাত,
কালের চক্রে যাওয়া
হারিয়ে খুঁজে পাওয়া।
সাথে ঘোরার খেলা
জীবন নদীর মেলা।
কেমন আছো তুমি?
আছো কী খুবই ভালো?
আজ সাদা রং হলো কালো।
কী হারিয়েছি, কী পেয়েছি
ভাবনা পাখির মেলা।
মৃত্যু সাথে চলা।
হারানো গতির খোঁজ
খুঁজে ফেরা রোজ রোজ।

বিরাম হারানো সময়
কলির চক্রে জীবন।
কথা এক,কথা দুই।
জীবন নদীর মাঝি আজ
কাব্য ঘটে ভূঁই।
নাম না জানা অজানা পাখি
দিন্দরদির মাঝরাত।
কবিতা আজ নতুন খেলা
পাখির চোখে খাম্বাত।
নতুন পালক, নতুন ডানা,
নতুন ঠিকানা পেলি তুই,
যা উড়ে যা ছোট্ট পাখি
আমি মাটির ভিতর শুই।

খবর
- কিরণময় নন্দী

আবার একটা নতুন দিনের সূচনা
হয়তো খবরের কাগজের অনেক খবরের ভিড়ে
তোর মৃত্যর খবর!
নয়তো এসিড দিয়ে ঝলসে দেবার একই খবর।

প্রশাসন সবদিক খতিয়ে দেখছে...দেখছে প্রকৃত অপরাধী কে,
ব্যাস! ওই পর্যন্ত...
আবার আগামীকাল সকালে খবরে জমা হবে তোদের অনেকের মৃত্যুর খবর।

আসলে তোরা খবর হয়ে যাস,
তোদের খবর কেউ রাখে না
পরিচারিকার কাজ দেবার নাম করে তোদের বিক্রি হবার গোপন ষড়যন্ত্র,
প্রথম প্রেমের আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখিয়ে ঘুরপথে শরীর ছিঁড়ে খেতে খেতে লাশ তৈরির খবর,
ঋতুচক্রের সময় আসার আগেই পাশের বাড়ির দাদু-কাকু-জ্যেঠুর ভয়াল আদরের স্বীকার হয়ে তার ইমেজ ঠিক রাখতে তোর মুখ থেঁতলে বিকৃত লাশের খবর,
তোর অতিরিক্ত সৌন্দর্য্যের প্রশংসা করে, কাছে আসার সস্তা সুযোগ না পেয়ে রাতের অন্ধকারে জোর করে পৌরুষত্বের পরীক্ষা চালিয়ে দেবার ব্রেকিং খবর.....

দুদিন চলবে মোমবাতি প্রজ্জলন-ফেসবুকে বিপ্লব-রাত আটটার টক শোয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ।
পরেরদিন খবরের কাগজ জুড়ে পাঁচ নম্বর পৃষ্ঠার বাঁদিকের কলামে ছোট খবরে "প্রতি চুয়ান্ন মিনিটে" ঘটে যাওয়া নারকীয় ঘটনার বেআব্রু নিদর্শন.....

মনপিয়নের ডাকবাক্স
- শৈলেন মন্ডল

কঠিন আবরনীতে মোড়া থাকে আমার মন পিয়নের ডাক বাক্সের অজস্র নীল খাম।

খামের চিঠি গুলোতে লেখা আছে অজস্র হৃদয় বিদারক প্রেমের নিদারুন আর্তনাদের কাহিনী।

আর লেখা আছে তোমার মনসীমান্তের মাঝে তাকিয়ে থাকা অবাক চাউনীর গোপন জবানবন্দী।

কালো রজনীতে ঘিরে আছে কালস্রোতের তীব্র বাতাস যা সুসময় পাওয়ার আবেদনে প্রতিমুহূর্তে শুধু হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে দ্বিধাগ্রস্হ।

স্মৃতির উপন্যাসে তীব্র ধ্বনিতে মিলন বাসর সাজায় ভালবাসার বিলম্বিত লয়।

কাব্যের কবিতার পাতায় ভরে যায় আত্মউন্মাদনাময় মিথ্যে প্রতিশ্রুতির অবাঞ্ছিত ধূলো ময়লা।

স্মৃতিরা তাই হাতড়ে বেড়ায় অদৃষ্ট অাষ্টে পিষ্টে জড়ানো নির্মমতার ললাট লিখন।

বৈচিত্রের বাহানায় ভালবাসার ঠাঁই হয় সুসজ্জিত সমাপিকা ভাজ্য কোমার অন্তর্গৃহে।

১০.০৬.২০২০

লকডাউনের জীবনবোধ
- রোজী নাথ

প্রতিটি গ্রাম শহর যেন ঘুমন্ত নৈঃশব্দ পুরী
এই বন্দিদশার প্রকৃতিও তার শ্রেয়কালের সাক্ষী
কালবৈশাখীর দাপট মাঝে মাঝে নিরবতা ভাঙ্গে
যেন বিশ্বামিত্রের ধ্যানে বিরতিবাহী অপ্সরা।

সৃষ্টির ষোলকলা তান্ডবে সমূলে ধরাশায়ী মহিরুহ
মনভাঙ্গা জনপদের রন্ধ্র জুড়ে বিষাদী মায়া।

মনটা কেমন যেন চিড়িয়াখানার বন্দি প্রাণীর মত ছটফট করছে।

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে লকডাউনের আপডেট দেখা হয়ে যাচ্ছে ঠিক , কিন্তু কে জানে আর কতদিন এই মুখথুবড়ে পড়া জনজীবন আর অর্থনীতির নিকষকাল চলবে।

গত দু'দিনের শিলাবৃষ্টিতে তছনছ হয়ে যাওয়া গৃহসুখের আর শ্যামলীমার আঁচলে তবুও যেন নতুনের স্পর্শ উঁকিঝুঁকি দেয়।

আকাশে মেঘের ফাঁকে ফাঁকে সোনালী রোদের লুকোচুরি আর পাখিদের প্রভাতফেরি স্মরন করিয়ে দেয় জীবনচক্রের কথা।

দুচোখে নতুন দিগন্তসন্ধানী জলহাঁস আর পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনায় ধরিত্রী আবার শকুন্তলাসুখ
মাখছে।

বিশ্বজুড়ে তাবড় সব বৈজ্ঞানিক আর গবেষকদের বিনিদ্র চোখের মণিতে যেন আলোর অনুসন্ধানী দৃষ্টি।

এই ফেরারী সময় আমাদের পরিচিতি রোজনামচার অনেক কিছুই ছিনিয়ে নিয়েছে কিন্তু পুরোটাই কি আর হারানোর উপাখ্যান?

জীবন আজ কী ভীষন সংযমী পথ!
কী ভীষন সাধনার রাজপথ !

আজ আমরা শিখে নিয়েছি বেঁচে থাকা মানেই রোদ জল মাটি মেখে থাকা।

দিন যায় আসে রাত
আলো আঁধারিতে সম্পাত,
কালের চক্রে যাওয়া
হারিয়ে খুঁজে পাওয়া।
সাথে ঘোরার খেলা
জীবন নদীর মেলা।
কেমন আছো তুমি?
আছো কী খুবই ভালো?
আজ সাদা রং হলো কালো।
কী হারিয়েছি, কী পেয়েছি
ভাবনা পাখির মেলা।
মৃত্যু সাথে চলা।
হারানো গতির খোঁজ
খুঁজে ফেরা রোজ রোজ।


কেউ কেউ আজও হাসে

বাঁচে মিথ্যা স্বপ্নকে আঁকড়ে ধ'রে,
কেউ কেউ হারছে
অনবরত হারছে;
দুঃস্বপ্ন দেখতে দেখতে
কেঁদে ওঠা জ্যৈষ্ঠের ভোরে ।
কেউ ভালোবাসার বুকে মাথা রেখে
রোজ রাত ঘুমায়
কেউ কেউ আগুন নিয়ে খেলে
কারোর বিষাক্ত চুমায় ।

বিরাম হারানো সময়
কলির চক্রে জীবন।
কথা এক,কথা দুই।
জীবন নদীর মাঝি আজ
কাব্য ঘটে ভূঁই।
নাম না জানা অজানা পাখি
দিন্দরদির মাঝরাত।
কবিতা আজ নতুন খেলা
পাখির চোখে খাম্বাত।
নতুন পালক, নতুন ডানা,
নতুন ঠিকানা পেলি তুই,
যা উড়ে যা ছোট্ট পাখি
আমি মাটির ভিতর শুই।

বিষয় : বনভূমি
আমরা বাঁচতে চাই!
- ননীগোপাল অধিকারী

মা গো আজ কোথায় চলেছো আমায় নিয়ে?
কোথায় আর!
একটু যাব লোকালয়ে।
আজ ভারি মজা ,
বল মা।
মজা আর কি!
তোর খিদের যোগান দেব বলে;
মা গো, আজ অনেক কিছু খাব?
হ্যাঁ মা, তুই অনেক কিছু খাবি।
বা, আজ খুব খুশির দিন --
বলো মা!
মা , আমাদের বাসা জঙ্গলে--
সেখানে কি খাবার নেই!
না মা, আছে,
তবে, এই কয়েক দিন আগে-
আসলে এক প্রলয় ঝড়,
করল তছনছ সবে।
ও-ও তাই, মা।
তুমি মা, আছো মোর পেটে;
জানবে কি করে মা তুমি মোটে;
বাঁচাতে তোমা মা,
আশ্রয় নিলাম নির্বিশেষে এক গুহাতে।
অবশেষে রক্ষা পেলাম,
বাঁচল আমার ছোট্ট মা-র প্রাণ।
তাই, মা এখন খাদ্যের সন্ধানে--
চলেছি গ্রামের প্রান্তরে।
মা ,গ্রামে কারা থাকে?
গ্রামে! মানুষ নামের এক প্রকার জীব থাকে।
ওরা! কি খুব ভালো মা?
হ্যাঁ মা, ওরা আমাদের খুব ভালোবাসে;
আমাদের ওরা বন্ধু ভাবে।
তাই, মা!
হ্যাঁ! আমাদের খেতে দেয়,
ভালো ভালো ফল-মূল।
ও! আজকে ,তাহলে খুব আনন্দের দিন।
মা! আমি খুব মজা করে খাব, বল।
হ্যাঁ! মা।
দেখতে পাচ্ছি,দূরে-
কেউ যেন এগিয়ে আসছে -
আমার দিকে কিছু একটা নিয়ে।
বলে ছিলাম না!
মানুষেরা কত ভালো!

শিক্ষিত কেরালা- র অচেনা এক মানুষ
কাছে এগিয়ে এল-
হস্তিনী প্রভা' রে খাবার রূপে দিল-
রসালো, সুমিষ্ট যা সুস্বাদু খাবার-
আনারস প্রভা শুঁড়ে তুলে নিল।
আনন্দে! মা তা ভক্ষণ করে ফেলল।
এমনি, খাবার খেয়ে প্রভা --
আবার, বনের দিকে ফিরে চলিল।
ভালো খাবার পেয়ে ,
প্রভা'র উদরে শিশু
আনন্দে খেতে লাগিল।
হঠাৎ!
পথ মাঝে
প্রভা'র পেটে বিকট আওয়াজ শোনা গেল।

পেট থেকে প্রভা শুনতে পেল।
তার গর্ভে থাকা শিশুর ক্রন্দন।
মা, আমাকে বাঁচাও-
আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছি-
আমার সর্ব অঙ্গ পুড়ে যাচ্ছে, মা!
আমার খুব যন্ত্রনা হচ্ছে, মা গো-
আমি বাঁচতে চাই মা!
মা! আমি বাঁচতে চাই।

কি করে বাঁচাবে,সে!
আজ তার শরীরটাও জ্বলছে।
জ্বলছে প্রতি অঙ্গ তার-
তার ক্ষমতার অবসান ঘটেছে-
একটাই ভুল!
যে ভুল, তার সব শক্তিকে কেড়ে নিয়েছে।
তা হল,
‘‘বিশ্বাস'
বিশ্বাস নামি শব্দটি!
সেতো অবলা একটি জীব,
তার সরলতার সুযোগ নিয়ে-
এইভাবে, ঠকাতে হল!
কেন?
খাবার তো একটি প্রাণকে বাঁচায়।
সেই খাবারে!
হাই, মানুষ জাতি!
কি দোষ করেছিলাম?
আমাদের বাঁচার অধিকার --
কেন কেড়ে নিলে?
তোমরা এত জ্ঞানী হয়ে-
হুঁশ বিসর্জন দিলে!
বিশ্বাস!বিশ্বাস!
বিশ্বাসের সেই মূল্য-
মিথ্যা প্রমান করলে তোমরা।
আমার অবলা শিশুকে হত্যা করেছো তোমরা।
তোমরা হত্যাকারী!
তোমরা খুনি,
জল্লাদ তোমরা!

আজও হস্তিনী প্রভার পেট থেকে ভেসে আসছে-
আমি বাঁচতে চাই!
আমি সকল শিশুর মতই বাঁচতে চাই।
আমার সে অধিকার মানব তোমারা কেড়ে নিও না।
আমি এই পৃথিবীর মৃত্তিকায় জন্মাতে চাই।
অরন্য আমাদের অধিকার!
প্রভার মত পৃথিবীর প্রতিটি মা,
আজও যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছে।
তাদের যন্ত্রণাময় কাতর কণ্ঠস্বর ভেসে আসছে,
চারিদিকে ধ্বনিত হচ্ছে-
আমরা বাঁচতে চাই;-
আমাদের মেরো না তোমরা;-
আমরা বাঁচতে চাই!
আমরা বাঁচতে চাই।
............
##বাঁচার অধিকার প্রত্যেকের আছে। সে অধিকার তার সতন্ত্র অধিকার। তাকে ক্ষুন্ন করে শক্তি ফলানো, তা লজ্জা সমান।।
হস্তিনী ‘প্রভা' নামটি সেই মায়েদের সম রূপ, যারা সমাজে প্রতি মুহূর্তে লাঞ্ছিত হচ্ছে, বাঁচার অধিকার হারিয়ে ফেলছে।
তাই কবির প্রশ্ন , সমাজের সেই জীবদের কাছে : কেন? কেন? কেন?

জীবন বাজি
- কিরণময় নন্দী

আঘাতে আঘাতে ভেঙে গেলো ওরা
অসহ্য সে যাতনা
রাস্তায় শুয়ে শত শত লাশ
তবুও লাল রক্তে ভাসলো না।

মাথা গেছে উড়ে কারও
শরীর ভেঙে খানখান
এতো মৃত্যুমিছিল
তবুও সেই জীবনের জয়গান।

ওরা সবুজরঙা প্রাণস্বত্তা
শুধু সেবা করে দান
ওদের দেহের হাতলে বানানো কুঠারে ওরা
দেয় জীবনের বলিদান।

ওরা শ্বাসবায়ু দান করে
ফুলে-ফলে দেয় ভরে
ওরা বুক পেতে ঝড় রোধে
ওরা বৃষ্টি আনে আকাশ ফুঁড়ে।

নিজের জীবন বাজি রেখে ওরা
প্রলয়ের সাথে লড়াইয়ে
অনুভূতিগুলো সবই বোঝে
নেই শুধু লাল-রক্তের বড়াইয়ে।

প্রকৃতির প্রতিশোধ
- মোহন দাস

(১)

আমি দেখছি দিনের পর দিন
বিজ্ঞান প্রযুক্তি আমাদের পরিবেশ হয়ে উঠছে
আমাদের ঘিরে ধরছে ঝাউ বনের মতন,
রাস্তা দিয়ে হাঁটলে ভাবি ---- এই কংক্রিট আর পাথরের নীচে
কত কচি কচি ঘাস মরে গেছে,
কত ঘাস ফড়িং নিশ্চিহ্ন ।
দূরবর্তী সারি সারি ফ্ল্যাট বাড়ি গুলোর দিকে তাকালে
আমার হিংসা হয়; রাগে গা জ্বলতে থাকে,
ওরা ভীষণ কুৎসিত; দানব ।
ওরা দিন-রাত গিলে নিচ্ছে জলপাই গাছের সারি, সবুজ অরণ্য আর
আমাদের হৃদয়ের উপর জন্মানো কিছু গুলবাহার ও
চাঁপা ফুলের বন ।

(২)

আমি দেখেছি দিনের পর দিন
ধ্বংসের পথে এগোচ্ছে মানব সভ্যতা,
নষ্ট হচ্ছে পৃথিবী ।
এই ঝড় বৃষ্টি, এই মহামারী, এই ভাইরাসের আক্রমণ
সব কিছুর জন্য মানুষ দায়ী,
তোমার মনে আছে ---- বিজ্ঞানী আইজাক নিউটন বলেছিলেন
"প্রতিটি বস্তুর সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে ।"

"সুস্থ থাকুক আমাদের হৃদপিণ্ড"
- ডাঃ ফারহানা মোবিন

বর্তমানে করোনা ভাইরাসের জন্য সারা পৃথিবীর মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

দুঃখ, কষ্ট, দুশ্চিন্তা আমাদের হৃদপিনডো ও মনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

তাই সুস্থ থাকতে হৃদপিনডো ও মন ভালো রাখতে হবে।

হৃদপিণ্ড আমাদের দেহের ভীষণ জরুরী একটি অংগ। আমাদের সারা শরীরে রক্ত সরবরাহ করে হৃদপিণ্ড।

আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি তখনও কাজ করতে থাকে। এক সেকেন্ড এর জন্য তার কাজ বন্ধ হয় না।

মায়ের পেটে থাকাকালীন সময় থেকেই আমাদের হৃদপিণ্ড তৈরী হওয়া শুরু হয়।

বাম পাশের বগলের গোড়া থেকে তিন বা চার ইঞ্চি দূরে আমাদের হৃদপিণ্ড এর অবস্থান।

হৃদপিণ্ডের কাজ অনেকটা পানির পাম্প এর মতো।

পানির পাম্প বিশাল একটা দালান এর নীচে থেকে সবচেয়ে উপরের অংশে পানি সরবরাহ করে ।

আমাদের দেহে হৃদপিণ্ড নামের জরুরী অংগ টি ঠিক সেই কাজটিই করে । পায়ের আঙ্গুল থেকে মাথা পর্যন্ত রক্ত পৌঁছে দেয় ।

পানির পাইপ লাইনে পানির ময়লা জমলে , পানি সঠিকভাবে চলাচল করতে পারে না । ঠিক তেমনি আমাদের শরীরের শিরা উপশিরা তে ময়লা জমলে , রক্ত সঠিকভাবে চলতে পারে না ।

রক্তের ময়লা বলতে রক্তের মধ্যে জমে যাওয়া চর্বি কে বোঝায়।

রক্ত নালী তে জমে থাকা চর্বি বা fat তৈরী হয় দেহের তুলনায় অধিক পরিমাণে চর্বি জাতীয় খাবার , মাদক দ্রব্য , ধূমপান থেকে ।

বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে , হৃদপিণ্ডর উপর অতিরিক্ত চাপ তৈরী হয় ।

তখন হৃদপিনডো সারা দেহে সঠিকভাবে রক্ত সরবরাহ করতে পারে না ।

পরিণামে তৈরী হয় হৃদপিনডের এর নানাবিধ অসুখ । যা কখনোই কাম্য নয় ।

হৃদপিনডের অসুখের জন্য দায়ী বিষয় গুলো হলো :
****************************

১) অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও অক্লান্ত পরিশ্রম ,

২) ভয়ানক দুশ্চিন্তা, হতাশা।

৩) বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী ওজন বেশী ,

৪) দীর্ঘ বছর সঠিকভাবে ঘুমের অভাব ,

৫) কোন ওষুধের দীর্ঘ বছরের পারশোপ্রতিক্রিয়া।

৬) অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ ,

৭) কিডনীর জটিল অসুখ

৮) মাদক দ্রব্য সেবন ও অতিরিক্ত ধূমপান।

সিগারেট এর নিকোটিন
রক্তনালীর সংকোচন করে। ফলে হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ কমে যায়।

৯) পারিবারিক ইতিহাস অর্থাৎ রক্তের আত্মীয় স্বজনদের হৃদরোগ থাকলে, আপনার হৃদরোগ হতে পারে।
যদি আপনি সঠিকভাবে নিজের যত্ন না নেন।

১০) কোন জটিল রোগের জন্যও হৃদপিণ্ডের অসুখ হতে পারে।

১১) হৃদপিণ্ডের অপারেশন বা কোন অসুখের পরে চিকিৎসক এর পরামর্শ মেনে না চলা।

হৃদপিণ্ড ভালো রাখার জন্য আমাদের করণীয় :
****************************

১) বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে ।

২) অতিরিক্ত মিষ্টি ও চর্বি জাতীয় খাবার , মাদক দ্রব্য , ধূমপান পরিহার করতে হবে ।

৩) ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে
হবে ।

৪) জীবন মানেই একটার পর একটা যুদ্ধ । মানসিক চাপ কমাতে নিয়মিত নিজেকে খুশী রাখা উচিত ।

৫) ধর্মের কাজ , মেডিটেশন মানসিক প্রশান্তি দেয় ।

হৃদপিনডো ভালো রাখার জন্য মানসিক প্রশান্তি ভীষণ জরুরী ।

৬) পারিবারিক ইতিহাসে কারো হৃদপিনডের অসুখ থাকলে , আগে থেকেই সচেতন হোন ।

৭) হার্ট এর অসুখ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন । নিয়মিত চেক আপ করানো ভীষণ জরুরী ।

৮) প্রতি বছর পুরো দেহের চেকআপ করান । আমাদের দেহ বিশাল এক কারখানা । একটা মেশিন দূর্বল হলে,
আশেপাশের মেশিনে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে । তাই সময় থাকতে সচেতন হোন ।

৯) অবশ্যই পুষ্টিকর খাবার খাবেন । নিয়মিত দুই লিটার পানি ভীষণ জরুরী ।

যারা রোযা রাখবেন তারা এফতারে অতিরিক্ত তেল , মশলা , চর্বি জাতীয় খাবার বাদ দিবেন।

১০) সুযোগ হলেই হাটবেন।

করোনা ভাইরাসের জন্য লকডাউনে থেকে ঘরের কাজ গুলো নিয়মিত করার চেষ্টা করবেন ( ঘর পরিষ্কার করা , কাপড় ধোয়া ............) ।

এতে ঘামের মাধ্যমে শরীরের বাড়তি calorie গুলো
ঝরে যায় । যা ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমায় ।

১১) সঠিক সময়ে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন ।

১২) সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা হার্ট এর জন্য ভালো । তবে হৃদরোগ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবন যাপন করবেন ।

১৩) হতাশা দূর করতে নিজেকে সৃষ্টিশীলতা ও মানবতার কল্যাণে নিয়োজিত রাখবেন । ভালো কাজ আমাদের কে দেয় আত্মতৃপ্তি । মন ভালো থাকলে , হার্ট ভালো থাকবে ।

হার্ট ভীষণ জরুরী অংগ। আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি , তখনও আমাদের হৃদস্পন্দন ( heart beat ) সচল থাকে । Heart beat থেমে গেলে , আমাদের জীবন টাও থেমে যাবে ।

আমার সবার উচিত হার্ট ভালো রাখার উপায় গুলো মেনে চলা এবং অন্যদের সচেতন করা ।

ডাঃ ফারহানা মোবিন ,

সহে না এ যাতনা
- ননীগোপাল অধিকারী

আমার পরান আছে চাহিয়া তোমা পানে
সখি কি বা করি, সহে না এ যাতনা,
যায় চলে দিবস গনিয়া গনিয়া
নাহি কাটে গৃহে একেলা
ব্যাথা মোর হৃদয় জানে ।

নীল অম্বরে ভাসে সখী তোমারই চিত্র
বৃক্ষ তরুদলে দেখি হে তোমারে
বসিয়া রহিয়াছ শাখে, নিত্য।
যমুনা তীরে ডাকে অচেনা কাহারে,
খোঁজে সদা মোর চিত্ত।

মোর অপলক নয়ন তোমারে দেখিতে চাই
নয়নের মাঝে তুমি নিয়েছো যে ঠাঁই
কিবা দোষ ছিল মোর,
কিবা অপরাধ, সখী!
সখি, কোন বিরাগে ত্যাজিলে মোরে, কোথা আমি যাই!

মনে যে বেদন সদা জাগে, করো না আর বঞ্চনা,
অন্তর মাঝে জাগিছ গোপনে, চক্ষে ভাসে কামনা।
সখী, হৃদয়ে হৃদয় রেখে
মিলিতে চাহি তোমার সকল দুখে
চাহিয়া রহিয়াছি, সহে না আর এ যাতনা।

অনুশাসনের শৃঙ্খলে
- কিরণময় নন্দী

কল্লোলিনী তিলোত্তমা প্রেমের শহর কলকাতা
টালির চালের ঝুপড়ি থেকে একপলকে না গুনতে পারা অনেক অনেক তলা ফ্ল্যাট।
মানিয়ে নিয়ে তোমার আমার কলকাতা।
ট্রাম লাইনের পাশে একইসাথে বাসের কালো ধুঁয়া উড়িয়ে গণপরিবহন আর উড়ালপুলে গতিময় ড্রাইভিং, একসাথে নিয়েই তোমার আমার প্রিয় কলকাতা।
দুর্গাপুজোতে চুটিয়ে ঠাকুর দেখার পা না ফেলা ভীড় থেকে রাজনৈতিক দলের শক্তি প্রদর্শনের সমাবেশ এগিয়ে আমার কলকাতা।
কফি হাউসের নস্টালজিয়া থেকে ইকো পার্কের পারিবারিক বিনোদন সবই আমার কলকাতা।
কিন্তু আজ কলকাতা বড়ই একাকী। বিশ্বজুড়ে করোনা থাবায় গতি হারিয়েছে নানা দেশ।
বাদ যায়নি আমাদের কলকাতা। গৃহবন্দী মানুষ-বাস ট্রেন উড়ান ট্যাক্সি অটো সব চাকায় বন্ধ। নেই তীব্র হর্ণ- নেই বাদুড়ঝোলা ভীড়-নেই অফিসের জন্য মরিবাঁচি দৌড়-নেই গতিময় ছন্দ-বিরামহীন হাওড়া ব্রীজের পরিশ্রম-নেই ব্রিগেড জনসভা- নেই রাস্তায় নেমে রাজনীতির কচকচানি-নেই প্রাণবন্ত হইহুল্লোড়-নেই ইসবেঙ্গল মোহনবাগান নিয়ে হাজারো বাকবিতন্ডা।

আছে শুধু কালো পিচে গুটিকয়েক গাড়ির আনাগোনা-আছে পুলিশি টহল-আছে সতর্কতা ও সচেতনতার পাঠ-আছে এখানে ওখানে পজিটিভের কানাঘুসো খবর-অমুকের কোয়ারিনটিন অমুকের আইসোলেসন-অনলাইন পড়াশোনা-আছে ওয়ার্ক ফ্রম হোম।

তবুও কমছে না ওই আণুবীক্ষণিক শত্রুটার দাপট। দিনে দিনে এগিয়ে চলেছে গ্রাম গ্রামাঞ্চলে। খাঁচায় বন্দী মানুষ আমরা। কলকাতা আছে সামাজিক অনুশাসনের শৃঙ্খলে।

কিছু অব্যক্ত হৃদয়ের কথা
কলমে - শৈলেন মন্ডল

কয়েক যোজন হেঁটে চলার ব্যর্থ প্রয়াসেও তোমার অকৃপন অদৃশ্য হাতছানি।

সম্পর্কের চাদরে জড়িয়ে থাকা অলীক স্বপ্নগুলোও ভাবনায় মিতব্যায়ী হতে চায় রোজ।

পরতে পরতে রাতের প্রহর গুনতে থাকি বেওয়ারিশ রঙিন জলে ডোবানো কিছু রঙীন স্বপ্নের আলমোড়া।

রাতের নিরবতায় খুলে যায় বিললাঙ্গ অকৃপন আদিম সভ্যতার গল্প বিন্যাস।

ব্যথার অশ্রুজলে হাতড়িয়ে বেড়ায় সুচেতনাময় উচ্ছ্বাসের বাঁধনহারা উল্লাস।

দুটি মনের বিবর্ণ ভালবাসার কর্ষনে উৎসারিত হয় অগ্নিস্ফুলিংগ যা বিদীর্ণ করে অন্তর হতে অন্তরে।

দীর্ঘ দহনের পর প্লাবিত হতে চায় দুটি তনুমন। নবরূপে মনের ঘরে আজন্মকাল স্হিতি চায় কয়েক যোজন পথ হাঁটার গল্প কথা।

মনোবীনার আকাশলীনায় হৃদপদ্ম নতুন সুরের মুর্চ্ছনায় গুমরে ওঠে।

সহস্র কামনার আগুনের শিখায় লেপ্টে থাকে প্রেমিক যুগলের অশান্ত বুক।

রাতের নিরবতায় হাতড়ে বেড়াই ঘুম ঘুম নির্লিপ্ত চোখের কিনারায় হাজার স্বপ্ন সুখের উল্লাস।

সময় স্রোতের বিপরীতে হেঁটে চলা স্মৃতির সরনীর আবেগী মুহুর্তরা আবার পুনারায় জোছনা মাখে অনাবিল আদরে আবদারে।

০৪.০৬.২০২০


চুলোচুলি
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

এইরে পনেরো টা কল মিস হয়ে গেছে। আজ আমি গেলুম। হালুম করে গিলে না নেয়, ক্রোধবহ্নি। ভয়ে ভয়ে দশটা নাম্বার টিপলুম। ওপ্রান্তের যে মেজাজ তখন সপ্তমে, তা ফলাও করে বলার দরকার পড়ে না। একবার রিং হওয়াতেই ফোনটা ধরল।

-'কি তোর আক্কেল বল দিকিনি'!
-' সেই কখন থেকে নেতাজীকে দর্শন করেই চলেছি'।
-'ঘোড়াটাও আমাকে দেখে, লজ্জায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে'।

আমার আক্কেল তখন গুড়ুম। হাসি চেপে রাখিদি কে বললুম, এই বেরিয়ে পড়েছি। তুমি আট্টু নেতাজী কে দেখো আমি চলে আসছি। রাগটা একটু গলানোর বিফল চেষ্টা।

নাগেরবাজার থেকে দুশো ঊনিশের বাস যখন পৌঁছাল পাঁচটি মাথার মোড়ে, আকাশে তখন গোধূলির লাল আভা লেগেছে। লাল লাইট তার রং পরিবর্তন করার আগেই নেমে গেলাম। নেমেই দেখি, বইপোকা রাখিদি রাস্তার মধ্যেও বই গিলছে। কাঁপা কাঁপা পায়ে নামলাম।

আমাকে দেখেই বকাবকি করার বদলে ঢিল ছোঁড়ার মতো প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল দূর থেকেই।

-'এ কেমন ধারা ইস্টাইল'?
-'মাথায় ফেট্টি বেঁধেছিস কেন'?

না মানে ইয়ে। ইয়ে মানে........
ইয়ে ইয়ে করতে গিয়ে কথাটাই বলতে পারলাম না। বেশী ইয়ে করতে গেলে, রাস্তায় ইয়ে পেয়ে গেলে মুস্কিলে পড়তে হবে।

হাত তুলে রাখিদি বলে উঠল,

-'থাক অনেক ইয়ে ইয়ে করেছিস'।
-'আর তোকে বলতে হবে না'।
-'ওদিকে সবাই ওয়েট করছে চল'।

দাঁড়াও। দাঁড়াও। একটা জিনিস নেব। গগনদা ফুচকা নিয়ে গপ্পো লিখতে বলেছে না! ব্যাটাকে আজ খাওয়াচ্ছি ফুচকা। এরপর আর কোনো দিন ফুচকা কেন চাউমিন, সমোসা নিয়েও লিখতে বলবে না। রাখি দি কে সঙ্গী করে পরিচিত ফুচকা দোকানে হানা দিলুম।

সত্য দা। ও সত্য দা। তোমার ইস্পেশাল ফুচকা টা বানিয়ে ভালো করে জামা কাপড় পরিয়ে দাও দিকিনি। দেখো আবার মাখামাখি না করে বসে। বেশী মাখামাখি হয়ে গেলে মুখ দেখাতে পারবে না। চেনা পরিচিত হলেও বিনামূল্যে চক্ষু দান, রক্ত দানের মতো ফুচকা দান! কদাপি নেহি। জিন্সের পকেট হাতড়ালাম। শুধু বাস ভাড়া পড়ে আছে। কাঁচুমাচু মুখে, শীত গ্রীষ্ম বর্ষা.... ঘুগনির হাঁড়ি ভরসা এর মতো রাখিদির দিকে তাকাতেই করুণ হৃদয়ের রাখিদি আমার করুণ মুখের প্রতি বিগলিত হয়ে টাকা বাড়িয়ে দিল।

ফুচকার প্যাকেট নিয়ে দেশবন্ধু পার্কে হাজির হলাম। পার্কের চেয়ার গুলো বসার উপযুক্ত ছিল না কস্মিন কালেও। পাখিরা একটু বেশী পরিমাণ দয়া পরবশ হয়ে সেগুলিতে নিজেদের ইচ্ছানুযায়ি সাদা রঙ দিয়ে, ভোটের কাগজে টিপ ছাপ দেওয়ার মতো সহস্রাধিক টিপ ছাপ দিয়েছে। কোথাও কোথাও সেই রঙের পরিবর্তন ঘটেছে। সেটাই স্বাভাবিক। এটা পশ্চিম বঙ্গ বস।

সে যাকগে। গগনদা কে মধ্য মণি করে সবাই বসে আছে ঘাসের উপর। একটা বৃত্ত তৈরী করেছে, পিন্টু ভাই, দাভাই; সৌভিক দা; ভাস্কর দা প্রমুখরা। দূর থেকে আমরা দেখলাম, হাত উঁচিয়ে নেতাদের মতো কি সব যেন বলছেন। আমাদের মাস্টারদা। সবাই গদগদ হয়ে সে সব গিলছে। আমরা এগিয়ে যেতেই রাখি দিকে ছেড়ে আমার উপর হামলে পড়ল সক্কলে।

সমস্বরে সবাই, "তোর মাথায় ফেট্টি কেন বাঁধা"।
কি জ্বালায় পড়লুম রে বাবা। হাতের ফুচকা ছেড়ে দিয়ে মাথার ফেট্টি নিয়ে সবাই পড়ল। অগত্যা। গোপনীয়তা ত্যাগ করে বলতেই হল। মাথার কিছু পরিমাণ চুল আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করেছে। আমাকে না বলে কয়ে, আমার অজান্তেই গিরগিটির মতো রঙ বদল করে অন্য পার্টি তে জয়েন করেছে। প্রতিবাদ স্বরূপ আমি বন্ধ ডেকেছি।

সবার জোরাজুরি তে মাথার ফেট্টি খোলানো হল আমার। এ অত্যাচার কাঁহাতক সহ্য করা যায়! সবাই সলিউশন দিল, মধ্যস্থতা করার। সবাই কে এক রঙে পরিণত করার। মতানৈকের কারণে একটু সমস্যা হবে বৈকি। এছাড়া আর যে রাস্তাও নেই। ফুচকা ছেড়ে সবাই পড়েছে আমার মাথার চুলের চুলোচুলি নিয়ে। কত্ত ভালোবাসে সবাই। এই ভালোবাসা দেখে, নিজেকে একটু অপরাধী মনে হ'ল।

চুল নিয়ে চুলোচুলি শেষ হবার পর, লোভনীয় জিনিসটা সবার মুখের সামনে তুলে ধরলাম। একটু দেরী হলেই মাখামাখি করে ব্যপারটা যা নয় তাই হয়ে যেত। মুখ লোকানোর জায়গা থাকত না তাদের। ইস্পেশাল ফুচকাটা গগনদার দিকে না এগিয়ে নিজে গিললাম। তার জন্য চারশো চল্লিশ ভোল্টেজের একটা ঝটকা লাগল। দু'টো কান দিয়ে আগুন বেরোতে লাগল। সে হোক। এত ভালোবাসা পাওয়ার পর, মাস্টারদার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করলে নিজের বিবেকের কাছে ছোট হয়ে যেতাম।

সবাই তখন পরম তৃপ্তিতে চাকুম চুকুম আওয়াজ তুলে সত্যদার ফুচকা খেতে ব্যস্ত। আমি ঢকঢক করে জল গিলছি তখন। এই পরিস্থিতিতেও মনে মনে, ফুচকা নিয়ে গল্পের প্লট ভেবে চলেছি।

আকবরের দরবার
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

(১)

দুকামরায় বিন্যস্ত ঘরের একটি কামরা জুড়ে রয়েছে নানান রকম ক্যামিকেলের ছোট-বড় বিকার। এদিক ওদিক অবিন্যস্ত ভাবে রয়েছে হরেক রকমের প্রযুক্তিগত মেশিন। কিছুটা জায়গা দখল করেছে পুরোনো- নূতন আবিষ্কার সহ তার রকমারি সাজ সরঞ্জাম। আতঙ্ক স্যারের ছোট্ট দুনিয়া। ইতিমধ্যে কিছু আবিষ্কারে তাঁর নাম-ডাক বাড়লেও সেই অর্থে প্রভাব প্রতিপত্তি হয়নি। তাও তিনি আবিরাম ভাবে চালিয়ে চলেছেন, তাঁর জিনিয়াস মস্তিষ্ক প্রসূত নিত্য নূতন আবিষ্কার। রোজই চলে কিছু না কিছু নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট। আমি মাঝেসাঝে যাই, স্যারের নূতন এক্সপেরিমেন্ট চাক্ষুষ করতে। আমার বন্ধু, চিকু। আতঙ্ক স্যারের নিত্য সঙ্গী। দু'জনে সমবেত ভাবে চালিয়ে যায় তাদের ও তাঁদের নব নব পরিকল্পনা। আমার সে সবে বিন্দু মাত্র ভূমিকা না থাকলেও বেশ ইন্টারেস্টের কারণে স্যারের ডাকে চলে যাই যাদবপুরের এক চিলতে বাড়িতে।

আতঙ্ক স্যারের সাথে পরিচয়, সেই স্কুল জীবন থেকে। নবম শ্রেণিতে আমরা তখন। আমি বরাবরের ফাঁকিবাজ ছাত্রী ছিলাম। উল্টো দিকে চিকু ছিল অসম্ভব মেধাবী। ফাঁকিবাজি তে আমি গোল্ড মেডেল পেলে, চিকুর জন্য বরাদ্দ থাকত মেধার জন্য। আর বিজ্ঞান ! ওই সাবজেক্টে আমি অজ্ঞান। রস কষ বিহীন একটা সাবজেক্ট কোনো কালেই ভালো লাগত না আমার। আমি ছিলাম সাহিত্যের প্রতি দুর্বল। তবুও সেই নবম শ্রেণি থেকেই বিজ্ঞান - সাহিত্যের একটা মেলবন্ধন ঘটে গেছে। যে বন্ধন আজও সুদৃঢ়।

আতঙ্ক স্যারের স্নেহের জায়গাটা আমি আর চিকু দখল করে নিয়েছিলাম। ছোট্ট বড়ো যে কোনো এক্সপেরিমেন্ট সফল হলেই স্যার সমেত চিকু আমায় ডেকে পাঠাত। আমিও যেন অপেক্ষায় থাকতাম সেই ডাকের। স্কুল জীবনে বিজ্ঞান জিনিসটা ভালো না বসলেও, স্যারের আবিষ্কৃত আবিষ্কার গুলি দেখে প্রেমে পড়ে যাচ্ছি দিন দিন। তাই স্যারের ডাক পড়লেই সুদূর দমদম থেকে একছুটে চলে যেতাম স্যারের বাড়ি, যাদবপুর।

(২)

ঠিক বিকেল পাঁচটা। অস্থায়ী দোকানটা নিয়ে বসে, সত্য দা। নাগেরবাজার ওভার ব্রীজের শেষ বা শুরু যেখানে, সেখান থেকে এগিয়ে এসে রেমন্ড শপের পাশেই একটা জায়গা দখল করে বসে। এ জায়গা তার চিরস্থায়ী। ঘন্টা দুই কি তিন। অস্থায়ী দোকানের ঝাঁপ ফেলে একটা পরিতৃপ্তিকর হাসি নিয়ে শিস দিতে দিতে রোজ বাড়ি ফিরে যায়, সত্য দা। বিক্রি বাটা যেদিন মন্দ হয়, শিসের ধ্বনি পাল্টে যায়। বৃষ্টির দিন গুলোতে, বিক্রির গ্রাফটা নিম্নমুখী হয়ে যায়।

ম্যাক্সিমাম দিন গুলোয় দোকানে ইট পেটে রাখতে হয়। নাম্বার এর জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এরকমই একটা দিন। ভিড় উপচে পড়ছে সত্যদার দোকানে। আমি রাস্তার রেলিং এ হেলান দিয়ে অরিজিৎ সিং এর গান এ মগ্ন। আমার নাম্বারটা আসতে দেরীই আছে। মুঠোফোন টা বেজে উঠল.....
ফোন ধরতেই চিকুর উত্তেজিত গলা, 'স্যার একটা দারুন জিনিস বানিয়েছেন। তুই চলে আয়'।
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই ফোন কেটে দিল।

এদিকে সত্যদার ডাক পড়ল। আমার নাম্বার এসে গেছে। দোকানের সামনে যেতেই শালপাতার ঠৌঙা ধরিয়ে দিল। বাম হাতের চাপে মাঝখানে ভাঙার শব্দ হ'ল। ঝালঝাল আলু, মটর-ছোলা দিয়ে মাখা। মাঝখানে ভরে, টকটক জলে স্নান করিয়ে আমার পাতায় পড়া মাত্র, সময়ের জন্য অপেক্ষা না করে তিমি মাছের ন্যায় একটা প্রশস্ত হাঁ করে মুখের মধ্যে প্রবেশ করিয়ে পরম তৃপ্তিতে চোখ বুঝলাম। আহ্লাদে আটখানা হয়ে সত্যদা কে উদ্দেশ্য করে বললাম, ওহ্। কি বানিয়েছো গো সত্য দা। পুরো চুমুর মতো। এই জন্যই লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি। গপাগপ কয়েকটা সাঁটিয়ে স্যার আর চিকুর জন্য কিছু পরিমাণ প্যাকেজিং করে যাদবপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম।
___________________________________

( ৩)

নাগেরবাজার থেকে শ্যামবাজার এসে সেখান থেকে যাদবপুর গামী একটি বাসে চড়ে সোজা আতঙ্ক স্যারের বাড়ি। যখন পৌঁছলাম, তখন ঘড়ির কাঁটা সন্ধ্যা সাতটার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। চিকুর হাতে প্যাকেটা দিয়ে স্যার কে শুধোলাম, নূতন কি বানিয়েছেন স্যার? আমাকে একটা মেশিনের কাছে নিয়ে গেলেন স্যার। লাল-নীল আলো জ্বলছে- নিবছে। আগেই বলেছি আমি সাহিত্যের ছাত্রী। স্যারের আবিষ্কার ততক্ষণ বোধগম্য হয় না যতক্ষণ না তিনি বুঝিয়ে বলেন। স্যার কথা শুরু করার পূর্বেই চিকু একটা প্লেটে খাবার গুলো নিয়ে হাজির।

তার থেকে স্যার একটা একটা করে মুখে টপাটপ পুরে সশব্দে শেষ করার পথে। আমি আর চিকু হাঁ করে তাকিয়ে আছি। চিকু যে খায়নি, স্যারের সে হুঁশ নেই। এ হ'ল সত্যদার হাতের যাদু। একসময় স্যার থামলেন। প্লেটে তখন দু'টি মাত্র অবশিষ্ট। তাই দিয়ে চিকু কোনোরকমে মুখভর্তি জল শুকনো করল। খাওয়া শেষে স্যার শুরু করলেন,

-'এটা একটা টাইম মেশিন। বলতে পারিস টাইম ট্রাভেলার্স। তুই তোর ইচ্ছে মতো যে কোনো সময়ে পৌঁছে যেতে পারবি এটার সাহায্য নিয়ে'।

আমি স্যার কে শুধোলাম, এরকম হয় নাকি? আমি চাইলেই সেই সময়ে কি করে পৌঁছে যেতে পারি?

স্যার আবার ও......
-' ওরে বোকা, তার জন্য তোকে সেই পিরিয়ডের সময় টা এই মেশিনে সেট করতে হবে। ঠিক পৌঁছে যাবি। আমি আর চিকু তো ঘুরে এলাম'।

বড়ো বড়ো চোখ করে, আমি নির্লিপ্ত ভাবে বললাম....
আমাকে ছাড়াই কোথায় ঘুরে এলেন?

আমার করুণ মুখের দিকে তাকিয়ে স্যারের বোধ করি একটু দুঃখ হল। আমাকে নিয়ে যাওয়ার প্রমিস করে বললেন,

-' নিউটনের সাথে দেখা করে এলাম'।

আমি আবারও প্রশ্নকারী, নিউটন! কি দেখে এলেন?
আমার প্রশ্নের উত্তরে আতঙ্ক স্যার,

-'দেখলাম একটা আপেল গাছের নীচে হেলান দিয়ে বসে কি সব লেখালিখি করছেন। আমি আর চিকু কিছু শুধোবার আগেই টাইম মেশিন এমন বিট্রে করল ফিরে আসতে হ'ল'।

মনে মনে বেশ খুশিই হলাম। বাড়ি ফেরার পথে, আতঙ্ক স্যারের থেকে প্রমিস টা পাক্কা করে নিলাম। আমার পচ্ছন্দসই একটা জায়গা নিয়ে যাওয়ার। ততদিনে টাইম মেশিনকে আরও পাকাপোক্ত করা যাবে।
______________________________________

(৪)

অনেকগুলো মাস কেটে গেছে। আতঙ্ক স্যার আর চিকু ব্যস্ত ছিল মেশিনের যান্ত্রিক গলযোগ নিবারণ কার্যে। ব্যস্ততার দরুন অনেক দিন স্যারের সাথে যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। ছুটির দিন। বাড়িতে শুয়ে -বসে, বই পড়ে সময় কাটাচ্ছি। বিকেলের দিকে স্যারের কাছে যাবার জন্য, ফোনে স্যার কে জানালাম। কদাপি আপত্তি করেন না স্যার। আজও তার ব্যতিক্রম হল না। শুধু একটি আদেশ ছাড়া। স্যারের আদেশ পালনে আমি আর চিকু সদা তৎপর।

সেদিন স্যারের বাড়ি থেকে ফিরে আসা ইস্তক ভাবতে বসেছিলাম। কোথায় টাইম ট্রাভল করা যায়। অনেক কিছুই মাথায় আসছে। আবার নিজেই সেসব বাদ দিচ্ছি একের পর এক। একসময় ভাবতে ভাবতে নিজের উপর বিরক্ত হয়ে চিন্তাদের ছুটি দিয়েছি। চিন্তিত মনকে রিফ্রেশ করার জন্য টেলিভিশন এর চ্যানেল গুলো এদিক ওদিক করছি। স্টার গোল্ড চ্যানেলে গিয়ে রোমোটকে বিশ্রাম দিলাম। রঙিন পর্দায় তখন আমার প্রিয় অভিনেতার মুখ। সিনেমা দেখার সাথে সাথে আমার প্ল্যানও রেডি হয়ে গেল। এখানেই যাব আমি।

বিকেলে স্যারের বাড়ি যাবার আগে, সত্যদার দোকানে একবার হানা দিলাম। আমাকে দেখেই সত্যদা একগাল হেসে........

-'কি ব্যপার তিথি দিদিমণি। এতোদিন আসোনি যে বড়ো'।

মনে মনে ভাবলাম। ফ্রিতে দিলে রোজ আসতাম। সেই কথা মনের মধ্যেই চেপে রেখে প্রতিহাসি দিয়ে ব্যস্ততার কারণ দেখিয়ে দিলাম। সাথে চটপটা চাটনি দিয়ে চটপট কয়েকটি বেঁধে দিতে বললাম। দোকানে ভীড় না থাকার দরুন বাঁধা ছাঁদা করতে বেশী দেরী হল না। আজ একটু বেশী সময় হাতে নিয়েই যেতে হবে। তাই বড়ো কাঁচের বাক্সটাকে ইগনোর করলাম। আমাকে ডাকলেও আমি আজ সাড়া দেবো ই না। যতই মুখ থেকে জল পড়ে রাস্তা ভিজে যাক। তাও না। যতই তারা অনুরাগ করুক আমার ওপর, পরে মানিয়ে নেওয়ার প্ল্যান করে সত্যদার দোকান ত্যাগ করলাম।

সময় মতো চারচাকার বাহনগুলি ঝটপট জুটে যাওয়ায় স্যারের বাড়ি পৌঁছতে বেশী সময় নিলাম না। ধূলোর মেকআপ করা পাদুকা জোড়া বাইরে খুলছি। ভেতর থেকে স্যার....

-'তিথি এলি বুঝি'!
-'এনেছিসতো'?

ঘরের ভেতরে ঢুকে স্যারের মুখের সামনে তুলে ধরলাম প্যাকেট টা। আগের মতোই চিকু কিচেনের জন্য বরাদ্দ জায়গা থেকে ভরা প্লেটটা স্যার কে এগিয়ে দিল। তবে এবার আর ভুল হয়নি চিকুর। আগের থেকে নিজের জন্য আর আমার জন্য গোটা কয়েক সরিয়ে রাখল।

এখন স্যার কে কোনোভাবেই বিরক্ত করা যাবে না। তাই দু'জনে এক কোনে দাঁড়িয়ে আছি। তার আগে অবশ্য সাঁটিয়েছি আমরাও। স্যারের খাওয়া শেষ হওয়া অবধি অপেক্ষায় আছি আমি আর চিকু।
একটার পর একটা চাটনি মাখিয়ে মাখামাখি করা রাউন্ড বল গুলো স্যার পরম তৃপ্তিতে গলধঃকরন করছেন। ওভারের শেষ বলটা ছোঁড়া হতেই, আমি বলে উঠলাম.......

স্যার। আমার কাছে একটা লাল্লনটাপ প্ল্যান আছে। স্যার কিছু বলার আগেই কথাটা পাল্টে দিলাম। ওকথা স্যারের কর্ণগোচর হওয়া মানে, আমার কানের নীচে পাঁচটি আঙুলের ছাপ জ্বলজ্বল করত। আমি কথা ভাঁজার আগেই, স্যার ধরলেন.....

-'কতদিন পর জিভের স্বাদ খানিক পরিবর্তন হল'।
-'এরকম মাঝে মাঝে.........'

স্যার মাঝপথে কথা থামিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আবারও বললেন,

-' তিথি। তোর টাইম যান তৈরী। বল কোথায় যেতে চাস'।

___________________________________________

(৫)

টেলিভিশনে যেদিন থেকে 'যোধা আকবর' দেখেছিলেম সেদিন থেকেই দৃদৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। এখানেই যাব। আমার হাজারো প্রশ্ন নিয়ে। সেই মতো স্যার কে জানালাম আমার মনের সুপ্ত ইচ্ছে। আইনস্টাইন এর মতো খোঁচা খোঁচা সাদা-কালো চুল গুলোয় আঙুল চালিয়ে কি একটু ভেবে বললেন,

-' এখানেই যাবার অভিমত হল কেন তোর'?

মিহি সুরে উত্তর দিলাম, না মানে ইয়ে.... আকবর রূপী হৃত্বিক রোশনকে দেখার পর থেকে মনটা ওই দিকেই পড়ে আছে স্যার। আমার কথায়, আতঙ্ক স্যারের ঠোঁটেও এক চিলতে হাসি ফুটল।

প্রথমটা ভেবেছিলাম, স্যার বুঝি বকা দেবেন। আমাকে অবাক করে দিয়ে স্যার আমাকে ভুল প্রমাণিত করে সহমত জানাতেই, একবার মনে মনে 'এক পল কা জিনা' গানটায় নেচে উঠলাম। মনে তখন গিটার বাজছে। আরও কিছু দিনের সময় চেয়ে নিয়ে স্যার আমাকে বিদায় জানালেন।

মনে একরাশ উত্তেজনা নিয়ে স্যারের বাড়ি থেকে ফিরছি। আমরা পাড়ি দেবো সেই ১৫০০ শতকের দিকে। টাইম ট্রাভেলার এ করে একঝটকায় পৌঁছে যাব মোঘলদের দরবারে। উফফ! কি সাংঘাতিক ব্যপার ঘটতে চলেছে। যা এতদিন ইতিহাসের পাতার পর পাতা জুড়ে পড়েছি! সেই জায়গা চাক্ষুষ করতে যাচ্ছি। কিছু দিনের অপেক্ষা।
___________________________________________

(৬)

কদ্দিন যাবৎ অঝোর কেঁদে চলেছে আকাশ। ন্যাপকিনও সেই জল মুছতে পারছে না। বাড়িতে বসে বিরক্ত হচ্ছিলাম। সাথে মনটাও বিষন্ন ছিল। খারাপ আবহাওয়ার জন্য আমাদের যাত্রা স্থগিত হয়ে যায়। রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনের অপেক্ষায় বসে আছি। গালে হাত। কবি সুকান্তের মতো পোজ।

মুড ভালো করার একটাই দাওয়াই। সত্যদার হাতের তৈরী রাউন্ড রাউন্ড বল। বৃষ্টির মধ্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। গন্তব্য সত্যদার দোকান। এই বৃষ্টির মধ্যেও সত্যদা কে দেখে মন-প্রাণ সব জুড়িয়ে গেল। সত্যদা ও আমাকে দেখে বিগলিত হল বৈকি। দোকানে মাছি তাড়ানোর থেকে একটা দুটো খদ্দের এলে যে কোনো দোকনদারের মুখের হাসি একটু চওড়া হয়ে যায়।

সত্যদা কে অনুরোধ করলাম। আলু মাখা, টক দই; লাল চাটনি; ঝুরি ভাজা দিয়ে গোল গোল ছোট্ট বলগুলো ভরে দিতে। একটি প্লেটে সাজিয়ে আমার মুখের সামনে এগিয়ে দিল, সত্যদা। আমার মনে তখন আর একটি গান বাজছে,

'আমারও পরাণ যাহা চায়। তুমি তাই। তুমি তাই গো'।

মনে মনে অবিশ্যি রবি ঠাকুরের থেকে ক্ষমাও চেয়ে নিয়েছি।

বেশ করে সাঁটিয়ে উদরপূর্ণ করে, প্রশান্তমনা হয়ে; বিজ্ঞদের মতো সত্যদা কে কমপ্লিমেন্ট দিচ্ছি। এমনসময় মুঠোফোনে ঝংকার ধ্বনি বেজে উঠল।
ওপ্রান্তে চিকুর গলা। স্যারের তলব আগামীকাল।

পরদিন সকালে কাকতালীয়ভাবে আকাশের ঘনঘটা কেটে গিয়ে সূর্যি মামার হাসিমাখা মুখ দেখা গেল। দীর্ঘশ্বাস পড়ল একটা। আশার আলো ফুটল মনে। অপচয় করার মতো সময় হাতে নেই। সকালেই বেরিয়ে পড়লাম, আতঙ্ক স্যারের বাড়ির উদ্দেশ্যে।

স্যারের বাড়ি পৌঁছে দেখলাম। টাইম মেশিনের কাছে বসে স্যার কি সব করছেন। কাছে এগিয়ে গেলাম। স্যার একবার মুখটা তুলে আবারও নামিয়ে নিয়ে জানিয়ে দিলেন,

-'আজই আমরা টাইম ট্রাভেল করব'।

_________________________________________

(৭)

স্যারের কথা মতো আমি আর চিকু রেডি। আমার আর চিকুর কোমরে একটা বেল্ট দিয়ে বেঁধে দিলেন। নিজেও কোমরে বেল্ট বাঁধলেন। মেশিনের উপর চড়ে বসলাম তিনজনে। স্যার একবার ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুল টা উঁচিয়ে আমাদের দিকে দেখালেন। আমরা মাথা নেড়ে সায় দিতেই, স্যার একটা সুইচ টিপে দিলেন।

তীব্রতার সাথে এগিয়ে চলেছি আমরা।মিনিট কয়েকের অভিযানের পর একটা শুকনো খটখটে জায়গায় আমরা অবতরণ করলাম। চারিদিকে শুধু বড়ো বড়ো স্তম্ভ। তিনজোড়া পা একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে। রাস্তায় সেই অর্থে জনপ্রাণী নজরে পড়ছে না। একটু এগিয়ে যেতেই একটা ঘোড়ায় টানা এক্কাগাড়ি চোখে পড়ল। গাড়ির মালিক সামনে এগিয়ে আসতেই, আতঙ্ক স্যার জিজ্ঞাসা করলেন আকবরের মহলের ঠিকানা। লোকটা দায়িত্ব করে টাঙ্গায় চড়িয়ে আমাদের গন্তব্যে পৌঁছে দিলেন।

আকাশচুম্বী প্রস্তরখণ্ড দেখে, চক্ষু ছানাবড়া হবার জোগাড়। যা সব ইতিহাসের পাতায় পড়েছি, আজ তার নৈসর্গিক সৌন্দর্য চাক্ষুষ করছি। চারিদিকে নাম না জানা হরেক রকমফুলের বাগান। গাছগাছালিতে ভর্তি পুরো রাজ্য।

আমাদের তিনজন কে ঘোরাঘুরি করতে দেখে একজন ষন্ডা মার্কা লোক আমাদের কাছে এগিয়ে এল। বাজখাঁই গলায় প্রশ্ন করল,

-'কৌন হো তুম লোগ'?

ভাঙাচোরা হিন্দিতে আতঙ্ক স্যার উত্তর দিলেন,

-'হামলোগ কোলকাতা থেকে আয়া হ্যায়'।

অবাক চোখে লোকটা আবারও প্রশ্ন করল,
-' ইয়ে কৌনসি জাগা হ্যায়'?

আবার আতঙ্ক স্যার,
-'এটা একটা জাগা হ্যায়। যো পশ্চিমবঙ্গমে পড়তা হ্যায়'।

প্রচন্ড রেগে গিয়ে ষন্ডামার্ক লোকটা,

-'মজাক করতা হ্যায়'?
-'চলো জাঁহাপনা কে দরবার মে'।
বলেই টানতে টানতে আমাদের নিয়ে চলল।


দরবারে প্রবেশ করতেই আমাদের চোখ আরও ধাঁধিয়ে গেল। রাজদরবার জুড়ে বসে আছেন কত মানুষ। মধ্যমণি একজন। যাঁর শরীর সিংহাসনে শোভা পাচ্ছে। চোখে মুখে দিপ্তী ঠিকরে পড়ছে। তাঁদের বেশ ভূষার সাথে আমাদের বেশভূষার আকাশ পাতাল ফারাক।সিংহাসন ত্যাগ করে সেই মূর্তি এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। যত সামনে এগিয়ে আসছে, আমার বুকের ধুকপুক আওয়াজ টা তীব্রতর হচ্ছে। এগিয়ে আসছে আমার স্বপ্নের নায়ক।

এগিয়ে আসতেই আমার মাথা ঘুরে গেল। এ তো হৃত্বিক রোশন নয়। তবে কে? ভাবতে ভাবতে প্রশ্ন করেই ফেললাম, কৌন হো আপ? আমার প্রশ্নে পুরো রাজদরবারে হৈচৈ পড়ে গেল। ষন্ডামার্কা লোকটা উচ্চস্বরে বলল,

-' আজ্ঞা হুজুর'।
-'ইসকা শির ধড় সে আলাগ......'

প্রচন্ড পৌরুষের অধিকারী সেই মূর্তি হাত তুলতেই পুরো রাজদরবার পিন ড্রপ সাইলেন্ট। আমাকে তাক করে বললেন,

-' ম্যায় হুঁ........'

এইরকম একটা গম্ভীর অবস্থা ও আমাকে চুপ করে রাখাতে অক্ষম। বলেই ফেললাম, ম্যাঁয় হুঁ না হামনে দেখি হ্যায়। বহত বার।

দূর্দন্ডপ্রতাপের মূর্তি কোনোরকম রাগ প্রকাশ না করে বলে উঠল,

-' ম্যায় হুঁ ইঁহা কা বাদশাহ......'

বাদশাহ এক হি হ্যায়। ও হ্যায় হামারা শাহরুখ খান। আমার কথায় সেই ষন্ডা মার্কা লোকটা আমাকে এই মারতে যায়। সিংহাসন থেকে নামা লোকটার হাত তুলে বাধা দেওয়ার কারণে থেমে যায়। এরপর কিছুটা শাহরুখ এর ইস্টাইলে দু'টো হাত দু'দিকে বিস্তৃত করে, লোকটা বলে ওঠে.....

-'ম্যায় হুঁ জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর'।

___________________________________________

(৮)

অনেক বাগ্বিতন্ডা, তর্ক-বিতর্কের পর আমাকে বিশ্বাস করানো গেল। ইনিই সেই সর্বশ্রেষ্ঠ শাসক। আকবর। সাহিত্যের ছাত্রী বলে, পরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ; প্রমাণ ছাড়া কি করে মেনে নিই! এই লোকটাই সেই আকবর। যাঁর কারণে ইতিহাসে আমি কম নাম্বার পেয়েছিলাম। উনি কবে কী করে গেছেন! কোথায় যুদ্ধ করেছেন! আমি কেন সে দায় নেব মনে রাখার? এসব করার সময় আমাকে জিজ্ঞেস করে করেছিলেন? তাই আমিও সুযোগের সদ্ব্যবহার না করে পারলাম না। যতই হোক আতঙ্ক স্যারের ছাত্রী তো। বাজিয়ে দেখে নিলাম, আদৌ জিনিসটি সঠিক কিনা। যদি চীনের মতো ঠকিয়ে দেয়।

স্বয়ং আকবর আমাদের তিনজনের আপ্যয়ন এর দায়িত্বে থাকলেন। চারিদিকে চকমকি পাথরের কারুকার্য করা বিশাল বিশাল স্তম্ভ। দেওয়াল জুড়ে অবস্থান করছে নানান রকমের অয়েল পেন্টিং। একের পর এক সেগুলির সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন, স্বয়ং বাদশাহ। একপ্রকার আপ্লুত আমরা। গোটা রাজপ্রাসাদ ঘুরে দেখে আমরা একটু ক্লান্তি বোধ করছিলাম। একটু বিশ্রাম দরকারি বুঝে আকবরের কাছে আর্জি জানালাম।

একটি বিশালাকার ঘরে আমাদের থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনটি বিশালাকৃতির পালঙ্ক। সারা ঘর জুড়ে চিত্রকলার উপস্থিতি আকবরের শিল্পী সত্বার পরিচয় বহন করছে। আমি, আতঙ্ক স্যার, চিকু বসে বসে গল্প করছি। এমন সময় জনা পাঁচেক দাসী পাঁচটি বড়ো বড়ো থালা নিয়ে আমাদের কক্ষে প্রবেশ করলেন। নানান রকম মোঘলাই খাবারের সাথে হরেকরকম ফল। থালার যা সাইজ! দু'টি থালা রেখে বাকি গুলি ফেরত পাঠালাম আমরা। পরম তৃপ্তিতে খেয়ে প্রশস্ত পালঙ্ক গুলিতে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলাম সবাই।


ঘুম ভাঙতেই, প্রবেশকারী বাদশাহ কে দেখে তিনজনেই উঠে বসি। তাঁর পিছু পিছু অনেক নারী-পুরুষ শরীরের প্রবেশ। তিনজন এর ওর দিক চাওয়া চাই করছি। পরম মমতার সাথে বাদশাহ বলে উঠলেন,

-'এঁরা আমার পরিবার'।

আকবরের মুখে বাংলা শুনে প্রথমটা ঘাবড়ে যাই তিনজনেই। উনিই জানালেন, ভারতে থাকতে থাকতে একটু বাংলা জেনেছেন বৈকি। সব তো আর ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকে না। এবার আমি আর চিকু ইশারায় চোখাচোখি করলাম। মনে মনে পরস্পরে আশ্বস্ত হলাম, আতঙ্ক স্যারের ভাঙাচোরা হিন্দি আর শুনতে হবে না ভেবে।

একে একে সবার সাথে পরিচয় পর্ব সারা চলছে। বেশী কেউ না। মাত্র জনা চৌদ্দ পত্নী আর জনা আষ্টেক সন্তান। চৌদ্দ জন পত্নীর বারো জন পরিচয় পর্ব সেরেই অন্দর মহলে বিদায় নিলেন। ভালো ভাব জমল জোধাবাই এবং রুকাইয়া সুলতানা বেগমের সাথে। একসময় তিনিও বিদায় নিলেন।

আটজন সন্তান, হাসান, হুসাইন; জাহাঙ্গীর; মুরাদ; দানিয়েল; আরাম -বানু-বেগম; শাকার-উন-নিসা-বেগম এবং শেহজাদী খানুমের মধ্যে শুধুমাত্র ছোট্ট জাহাঙ্গীরের সাথে আমাদের জমল ভালো। একসময় জাঁহাপনা আকবরের রাজদরবারে ডাক এলে তিনিও প্রস্থান করলেন। এখন আমরা পাঁচজন মিলে গল্প করছি। গল্পের মাঝেই একটি আর্জি করে বসলাম, জোধাবাই এর কাছে। রাতের খাবারের পাতে যদি একটু বিরিয়ানী পড়ে! এককথায় রাজী হয়ে তিনি আমাদের আর্জি রাখার প্রতিশ্রুতি দিলেন।

মোঘল দরবারে খানাপিনা- আয়েশ করার পর বেশ ফুরফুরে লাগছে। পরিবর্ত হিসাবে আমরা যদি কিছু না করি সেটা মনুষ্য ধর্মের চরম অকৃতজ্ঞতার পরিচয় বহন করবে। সেটি হতে দিতে পারিনা আমরা কেউ ই। ফুল পরিবেষ্টিত বাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আতঙ্ক স্যার কে বলে উঠলাম, স্যার সত্য দাকে আনা যায় না কোনো ভাবেই? আমার প্রশ্নের উত্তরে স্যার, কিছুটা উত্তেজিত হয়েই বললেন....

-'যায় না মানে'?
-'আলবাৎ যায়'।
___________________________________________

(৯)

পরদিন জাঁহাপনা আকবরের থেকে চিকু আর আতঙ্ক স্যার বিদায় নেবার জন্য আদেশ প্রার্থনা করল। আমি এখানে থাকব সেটা আলাপ আলোচনার পর ঠিক হয়েছিল। সত্যদার ঠিকানা সমতে সমস্ত রকম বিবরণ, আতঙ্ক স্যার কে দিয়ে রেখেছিলাম। ওদের ফেরত আসার কথা শুনে জাঁহাপনা, সেনাপতি মান সিংহ কে সবরকম ব্যবস্থা করার জন্য আজ্ঞা দেন। তা নিষ্প্রয়োজন জেনে, বাদশাহ কারন জানতে চাইলে...আতঙ্ক স্যার রাজদরবারে সবার সমক্ষে তাঁর আবিষ্কার টি তুলে ধরে বিস্তারিত বর্ণনা করেন। এসব শুনে, সবার চক্ষু ছানাবড়া।

আতঙ্ক স্যারের সাথে চিকুর বিদায় নেওয়ার পর নিজেকে একটুও একলা মনে হয়নি এখানে। রাজদরবারে, আকবরের নবরত্ন সভার সবার সাথে পরিচয় পর্ব সেরে ফেলেছি ইতিমধ্যে। বেশ কিছুদিন ধরে নিজেকে সম্রাজ্ঞী মনে হচ্ছে যেন। নবরত্ন সভায়, রাজা টোডরমল, তানসেন; বীরবল; আবুল ফজল; কবি ফৈজি; আব্দুল রহিম খান; ফকির আজিওদ্দিন; সেনাপতি মানসিংহ এবং মোল্লা দো পিঁয়াজা প্রমুখের সাথে আমার জন্যও একটি আসন সংরক্ষিত হয়েছে। একসময় ইতিহাস যেভাবে আমাকে চোখের জলে, নাকের জলে করিয়েছে আজ তার মিষ্টি প্রতিশোধ তুলছি মনে হচ্ছে। আহা। কি আনন্দ আকাশে বাতাসে।

আতঙ্ক স্যার-চিকুর আসার আগেই কতকগুলি মনোরম কাজ সেরে নিয়েছি। বীরবলের থেকে একটি গল্প শুনেছি। সেনাপতি মানসিংহের সাথে ঘোড় সওয়ার করেছি। তানসেন এর থেকে হেঁড়ে গলায় কিভাবে বাথরুম সিঙ্গার হওয়া যায় সে বিদ্যা রপ্ত করেছি। কবি ফৈজির থেকে বেশ কিছু আরবি ভাষায় কবিতা শুনেছি। যার বিন্দু মাত্র বোধগম্য হয়নি আমার মোটা মাথায়। ওদিকে জোধাবাই এর প্রিয় পাত্রী হওয়ার কারণে রোজ রাতে খাবার পাতে বিরিয়ানীর ব্যবস্থা করে ফেলেছি। যা আমিনিয়া বা আর্সেনালের থেকে শতাধিক সুস্বাদু।

বেড়ে কাটছে দিনগুলি। কিন্তু সেই দিনগুলি আর সোনার খাঁচায় রইল না বেশীদিন। আতঙ্ক স্যার, চিকু; সত্যদা এসে পৌঁছেছে। সর্বকালের মহান সম্রাট আকবরের মোঘল রাজদরবারে। আতঙ্ক স্যার কে দেখে একটু মনখারাপ হলেও, সত্যদা কে দেখে মুখের হাসি চওড়া হয়ে গেল। সত্যদার হাতে ধরা কাঁচের বাক্স দেখে, দিল পুরা গার্ডেন গার্ডেন হো গয়া।
__________________________________________

(১০)

একটি জায়গায় সত্যদা তার বাক্স টা নামিয়ে রাখল। সাথের জিনিস পত্র গুলোও। সত্যদা কে দেখে অন্দরমহল থেকে সবাই ছুটে এলেন। সত্যদার সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দিলাম। সবার নজর কাঁচের বাক্স টার দিকে। কি যেন একটা অদ্ভূত জিনিস। দাররক্ষী উচ্চস্বরে জানান দিল,

-'জাঁহাপনা আকবর পধার রহে হ্যায়'।

শুনেই সবাই সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল। আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছেন সম্রাট। যেখানে আমরা সবাই দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখানে এসে স্থিত হলেন। আতঙ্ক স্যার কে তাক করে,

-'এসব কি এনেছেন'?
-'সাথে কে'?
-'এই আপনার গুরুত্ব পূর্ণ কাজ'!

আতঙ্ক স্যার কাঁপা গলায় বললেন,

-'আজ্ঞে হুজুর। এটা সামান্য ভেট আমাদের তরফ থেকে আপনাদের জন্য'।

-'কিসের ভেট'?
বাদশাহের প্রশ্নে এবার আতঙ্ক স্যার, মনে যতটা সাহস আনা যায় এনে বললেন,

-'আজ্ঞে আপনাদের আন্তরিকতার'।
-'আপনাদের আতিথেয়তার'।

আমি আর চিকু স্যারের পাশে এগিয়ে গেলাম। স্যার কে সাপোর্ট করে আমরা দু'জন একই কথা বললাম। ওদিকে সত্যদা ফ্যালফ্যাল করে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। সবার বেশভূষা দেখে যৎপরোনায় অবাক। কোথায় এসে পড়েছে বুঝে উঠতে পারছে না।

এমন সময় বাদশাহ আকবর আবারও বলে উঠলেন,

-' ভেট পেশ কিয়া যায়ে'।

সত্যদার কাছে আমরা তিনজন এগিয়ে গেলাম। ফিসফিসিয়ে বললাম, তুমি ইতিহাসের যুগে এসে পড়েছো সত্য দা। এমন একটা ইতিহাস রচনা করে দাও যাতে মোঘলরা তোমার রচিত ইতিহাস ভুলতে না পারে। কি বুঝল সত্যদাই জানে। সব সাজসরঞ্জাম নিয়ে প্রথমে একপ্লেট দই ফুচকা আকবরের সম্মুখে পেশ করা হল। কিভাবে খাবেন বুঝে উঠতে না পেরে আমি আর চিকু সামনে গিয়ে ইশারায় দেখিয়ে দিলাম। একটা মুখে পুরতেই...... দু'চোখ বন্ধ করে চিবিয়ে চলেছেন। গপাগপ করে পরের গুলোও শেষ করে আদেশ দিলেন,

-'সবকে লিয়ে পেশ কিয়া যায়ে'

এর মাঝে আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন এই অপূর্ব লোভনীয় খাবারের নাম।

সবার হাতে আমি আর চিকু শালপাতার ঠোঙা ধরিয়ে দিয়েছি। সত্যদা একের পর এক ফুচকার মধ্যে আলু মাখা ভরে তেঁতুল জলে চুবিয়ে সবার পাতায় দিয়ে চলেছে নিরলসভাবে। জোধাবাই এর কাছে গিয়ে ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, সুস্বাদু না? মুখ ভর্তি ফুচকা নিয়ে মাথা নেড়ে সায় দিলেন।

এরপর একে একে নবরত্নের কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম গোলাকাকৃতি বলের স্বাদ সম্পর্কে। কেউ কোনো উত্তর না দিয়ে খেতেই ব্যস্ত। মাথা নাড়া ছাড়া কোনো উত্তর নেই। একসময় বীরবল আমাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করলেন। তথ্য সমেত আমি তাঁকে জানালাম, এটিকে বলে পানিপুরি বা গোলগপ্পে। এর প্রেমে যে একবার পড়েছে..........

দই ফুচকা, টক জল ফুচকা, চুড়মুড়, লাল চাটনি দিয়ে ফুচকা। সবাই তৃপ্তি ভরে খেয়ে সত্যদার ইয়া বড়ো কাঁচের বাক্স নিমিষে খালি করে দিল। আরও আব্দার হয়েছিল খাবার। কিন্তু টাইম ট্রাভেলের সময় ফুরিয়ে আসায় আমাদের ফিরতে হয়েছিল। সত্যদার সুস্বাদু ফুচকার একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার হয়েছিল, মোঘলদের রাজসভায়। পরিবর্তে মিলেছিল প্রচুরপরিমাণ উপঢৌকন। আমরা ফিরে আসার সময়, আকবর-জোধাবাই এর চোখের কোনে চিকচিক করে উঠেছিল। মনে হচ্ছিল ফুচকা প্রেম তাঁদের ছিন্ন হল। তাঁদের সবার নজর, সত্যদার কাঁচের বাক্সটার দিকে।

ওঁদের করুণ মুখ দেখে প্রথমে আমার একটু খারাপ লাগলেও পরে মনে মনে ভেবেছিলাম। তোমাদের ইতিহাস মনে রাখার সময় আমারও ঠিক এরকমই করুণ অবস্থা হয়েছিল। একদিন তোমারা ইতিহাস রচনা করেছিলে। আজ আমার যে ফুচকার ইতিহাস টা রচিত করে গেলাম। সে তোমরা কস্মিন কালেও ভুলতে পারবে না! একে বলে মধুর প্রতিশোধ।
_______________________________________

(১১)

মোঘলদের থেকে পাওয়া উপঢৌকন থেকে কিছু অংশ সত্যদা কে দেওয়া হয়েছিল। সেই দিয়ে সত্যদা একটা স্থায়ী দোকান কিনেছে। দোকানের নাম রেখেছে ' আকবরের দরবার '। পরে সত্যদাকে সব বিস্তারিত বলায়, সবটা বুঝতে না পারলেও কিছুটা বুঝেছিল।

প্রাপ্ত উপঢৌকনের কিছু পরিমাণ দিয়ে, আতঙ্ক স্যার একটা থ্রি বি এইচ কে ফ্ল্যাটবাড়ি সমেত একটি ল্যাবরেটরি বানিয়েছেন। বাকিটা গচ্ছিত আছে পরবর্তী এক্সপ্ররিমেন্টের জন্য।

ফিরে আসা ইস্তক আমি আর চিকু সেই স্বপ্নের রাজ্য থেকে নিজেদের বের করতে পারিনি। দু'জনে তখনো বুঁদ সেই ঐতিহাসিক কাহিনীর মধ্যে।
দু'জনে এটা ভেবে আরও উৎফুল্লিত। যে ইতিহাস আমাদের একটা সময়ে নাকানি চোবানি খাইয়েছে, সেখানে আমরা ফুচকার ইতিহাস রচনা করে এসেছি। অবশ্যই আতঙ্ক স্যারের আবিষ্কৃত 'টাইম মেশিন' এ ট্রাভেল করে। আর দ্বিতীয়, সত্যদার হাতের তৈরী ফুচকার জাদু দিয়ে। দু'জনের কাছেই আমরা কৃতজ্ঞ।

দু'জনে মিলে চিন্তায় বুঁদ হয়ে আছি। মুঠোফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে আতঙ্ক স্যারের নামটা ভেসে উঠছে। লাউড স্পিকারে দিলাম।

-' আর একবার টাইম ট্রাভেল করবি নাকি'?
-'জোধা-আকবর তো দেখে এলি'।
-'যাবি নাকি শাহজাহান -মুমতাজ কে দেখতে'?

বলাই বাহুল্য আমি আর চিকু উত্তেজিত। আবার একটা ঐতিহাসিক ভ্রমণের হাতছানি।

পরিযায়ী
- সুভদ্রা রায়

ভবঘুরে জীবন ওদের- ভ্রাম্যমান বোহেমিয়ান সর্বদা
নির্দিষ্ট ঘর নেই কোথাও - বহমান চলন্ত জীবনযাত্রা,
ভিটেমাটি ছিঁটেফোটা আবাদহীন- জীবন ভ্রমণ কথা
কাজের খোঁজে নানান ধরন যখন যেখানে বসতি গড়া-
দুমুঠো খাবার জুটলে ভালো নইলে আবার চলা অন্যত্র,
মেহনতী কাজের নেই কো বিচার - জুটলে সঠিক অন্নসত্র..!
দিবানিশি খাবার খোঁজা মাথা গোঁজার ঠাঁইটুকু -একমাত্র
ভীষণ শীতে অনেকেই চলে গরমের দেশে - জায়গা বদল
সাইবেরিয়ান পাখিরা যেমন ফিরে ফিরে আসে প্রতিবছর
বাইরে থেকে ভীষণ সুখের - ভিতরে গেলে বিনিসুতোর..! না আছে চাল নেই যে চূলো- চাঁদের গায়ে লাগে কলঙ্ক,
সারাটা বছর চলে সংগ্রাম কাজের খোঁজে ছুটে চলা-
নাম পরিচয় হীন গোত্র কেবল- পরিযায়ীর তকমা আঁটা
সংসার রয় পড়ে একপ্রান্তে - অস্থায়ী মানুষটির চোখ মজুরি কষে
মহামারীর প্রকোপে হঠাৎ যারা গেছে আটকে বিপদে বিভূঁয়ে -
কর্মহীন অর্থহীন কপর্দক দুরবস্থায়- কেউ স্বজন হারিয়ে
কতটুকু মেয়ে জয়িতা- বাবাকে বাড়ি ফেরাতে অদম্য তার প্রয়াস -
ধারের টাকায় সাইকেলে অন্নহীন অসুস্থ বাবাকে বারোশ
কিমি পথও অনায়াসে
করে পার- দিল্লির গুরুগাঁও থেকে ফিরায় বিহার নিজের বাড়ি সাতদিনে.!
কে বা তার রাখে খোঁজ - পরিযায়ী তারা, ফুরুৎ ফুরুৎ পালিয়ে বেড়ায় স্বপ্ন তাদের..

০২/০৬/২০২০

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget