মে 2020

প্রীতিলতা মন্ডল
- কিরণময় নন্দী

প্রীতিলতা মন্ডল। না, কোনো সোনালী বা রুপালি পর্দার বিখ্যাত অভিনেত্রী নয়- কোনো মডেল বা ফ্যাশন ডিজাইনার নন-টি টোয়েন্টি টিমে হরমনপ্রীত দের কোনো সদস্য নন।
প্রায় পনেরো বছর আগে কোলে এক বছরের মেয়েকে নিয়ে স্বামীহারা এক মহিলার নাম।
স্বামীর মৃত্যুর পর জীবনযুদ্ধে এক বীরাঙ্গনার নাম।
স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুতে বুক চেপে চোখ মুছে একরত্তি মেয়েকে মানুষের মত মানুষ করার এক অদম্য জেদের নাম প্রীতিলতা মন্ডল।

করমণ্ডল এক্সপ্রেস বা যশোবন্তপুর এক্সপ্রেসে চেপে বসলেন দক্ষিণে রুটিন-চেকআপে কিংবা ব্রিলিয়ান্ট ছেলেকে মাস্টার্সএ এডমিশনের জন্য। বালেশ্বর- জলেস্বর-ভদ্রক হয়ে চিলকার নীল জলের গাঁ ঘেঁষে এগিয়ে চলছে আপনার করোমণ্ডল-যশোবন্তপুর।গোদাবরীর রেলসেতু উঠে কপালে মাথা ঠুকে ছুঁড়ে দিচ্ছেন দু-পাঁচ টাকার কয়েন। এসি কামরায় উঠলে ওসবের সুযোগ নেই। তবে বাতানুকূল পরিবেশে ট্যাব বা মোবাইলে গান শুনছেন মনের সুখে। রঙীন পর্দা সরিয়ে টম্যাটো-স্যুপ খেতে খেতে উঁকি মারছেন বিজয়ওয়ারা- ভাইজাগ সংলগ্ন সবুজ পাহাড়ে। মুহূর্তের জন্য টের পাচ্ছেন না অতিদানব রেলের ট্র্যাক পরিবর্তনের ভয়ঙ্কর শব্দ। ওটা অবশ্য সেকেন্ড ক্লাস স্লিপারে অনুভূত হয় বারেবারে।

এই দ্রুতগতির উন্নতমানের ট্রেন দুটির রক্ষনাবেক্ষনের ভার নিয়েছেন প্রীতিলতা মন্ডল। কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার কথা ভুলে চোদ্দো বছর ধরে ভারতীয় রেলের দক্ষিণের দুই দ্রুতগামী ট্রেনের গতিশীলতাকে বহমান করে রেখেছে প্রীতিলতা মন্ডল।

চোখ বন্ধ করে ভরসা করেন রেলের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা আর নির্বিঘ্নে রোজ যাত্রা করি আমি-আপনি।
পিছনে কাজ করে চলে জীবনযুদ্ধের রুদ্রানী প্রীতিলতা মন্ডল। প্রতিদিনের আটঘন্টার নিরলস সংগ্রামে।

প্রকৃতির বিসর্জন
- হাবিবুর রহমান অনিক

প্রকৃতি তোমার সুখ-দুঃখ ভালবাসা মায়াখানি,
দিয়েছ তুমি বিসর্জন মানুষের মায়া টানি।
মানুষে কি নিয়েছে খোজ কেমন আছো কার মতো?
শুধু নিয়েছে,দেয়নি কিছু সার্থপরের মতো।

কোথায় আলো,কোথায় বাতাস,কোথায় উপকরণ?
প্রকৃতির মতো ভেবেছে কে,কোথায় অপূরণ!
কিসে আনন্দ, কিসে দুঃখ,কিসে বেদনার সুর,
প্রকৃতির মাঝে লুকিয়ে হাসে সব বেদনার দুর।

প্রকৃতি তোমার ছন্দে নামে বাতাসের পারাপার,
আলোর বেগে ছুটে আসে রহমত বারবার।
প্রকৃতি তুমি দিয়েছ কত মান অপমান খ্যাতি,
সেই থেকে যেন কর্মঠ হতে শিখেছে পূর্ব জাতি।

প্রকৃতি তুমি চঞ্চল মনে শিখিয়েছ কত ভাষা,
শিখিয়েছ তুমি বারবার বেঁচে থাকার নতুন আশা।
তুমি হাসলে রোদ হয়,আর কাঁদলে পড়ে বৃষ্টি,
মানব কল্যাণে নিহিত তোমার,মহত জগৎ সৃষ্টি।

প্রকৃতি তোমার গাছ,লতা,আলো,বাতাস আর পানি,
দিয়েছ মহান এ কল্যাণ,লওনি তো কোনো মানি।
প্রকতি তোমার ভালবাসা মোরা করি যে বিকিকিনি,
অধিক পাওয়ায়,অধিক চাওয়ায় হয়ে গেছি মোরা ঋণী!

কাগজের পুলিৎজার
- শম্পা বিশ্বাস

ভুল চিত্র এঁকে পুলিৎজার নিয়ে যাবো এমন স্বপ্ন আমি দেখিনা।
আঁকতে ভালোলাগে তাই এঁকে ফেলি ঝঞ্ঝাট জীবনের মিশ্ররঙে আমার ক্যানভাস ¡
স্ব-শিল্প আনন্দ আমায় কখনো-সখনো শিল্পী করে তোলে,
কিন্তু সৃষ্টির কাছে আমি কিছুই চাইনি কখনো।

যুগ পেরিয়ে যুগে
কাল থেকে কালান্তর
ঠিক ভুল সব হাতে হস্তান্তরিত হয়ে আসছে কতো পরিশ্রমের পুলিৎজার-

কাগজের ভেতরে তৈরী হয়ে চলেছে
আমাদের সঙ্গীত-সাহিত্য-সংবাদের বিশেষত্বের মূল্যবান পুলিৎজার।

রসের হাঁড়ি
- ফারজানা জান্নাত ঐশী

বেরিয়েছিলাম বিকেলবেলা

কিনতে রসের হাঁড়ি,

রাস্তায় নেই জনমানব

স্তব্ধ ঘরবাড়ি।

এগিয়ে গেলাম শাপলা মোড়ে

নেই যে দোকানঘর,

হতাশ হয়ে ভাবলাম তবে

হয়েছিল নাকি ঝর।

মিষ্টিপ্রিয় মানুষ আমি

ভালো লাগেনা ঝাল,

নিরাশ মনে বনের ধারে

পেরিয়ে গেলাম খাল।

গিয়ে দেখি নিঝুম পথ

নেইতো কোনো গাড়ি,

পথের মাঝে পরে আছে

রঙিন একটি হাঁড়ি।

হাঁড়ি দেখে চমকে উঠি

এগিয়ে গেলাম কাছে,

ঢাকনা খোলার আগে ভাবি

কি এতে বা আছে?

ঢাকনা খুলেই চোখ ছলছল

এ যে রসের হাঁড়ি,

ভাবলাম তবে নিয়ে যাব কিনা

এটা আমার বাড়ি।

এগিয়ে দেখি শূন্য পথে

বসে আছে চাষি,

বলল তার মাঠের ধান

পুড়েছে রাশি রাশি।

নিরবে তা শুনছি আমি

তার চোখে দেখি জল,

দুদিন নাকি খায়নি কিছু

গায়ে তার নাই বল।

নিরুত্তর এই ভাবছি আমি

রোজ ই তো খাই,

আজ না হয় রসের হাঁড়ি

চাষাকেই দিয়ে যাই।

হাঁড়ি দিয়ে বলি যাও

বাড়ি গিয়ে এটা খাও।

চোখ মুছে সে হেসে-

হঠাৎ করে হারিয়ে গেল

সাঁঝের বাতাসে,

মনে হলো প্রতিদিন নাকি

হাঁড়ি নিয়ে ভূত আসে।

পিছন ফিরে তাকিয়ে আমি

হলাম হতবাক,

চাষা হাতে দাড়িয়ে আছে

নিয়ে হাঁড়ির ঝাঁক।

চাষা তখন বলল আমায়

সে যে প্রভুর দূত,

শত খুঁজেও পায়নি সে

আমার মাঝে খুঁত।

আজ নাকি মোর বিজয়

শত শত হাঁড়ি আমার,

বলল এটা প্রভুর থেকে

সততার পুরস্কার।

ব্যর্থ সমীকরন
কলমে - শৈলেন মন্ডল

বুকের পাঁজর ভাঙ্গার কালসিটে দাগটাও এখনো শুকোয়নি। অস্তমিত সূর্য মুখ লুকোয় নীল দিগন্তের কোলে।

ঐদিকে পাখীরা তাদের নীড়ে ফেরার ব্যাস্ত মোর্ছনায় আনমনা।

আঁধারের ঘনঘটায় দলাপাকানো মনটা তিমির ভাবনায় আকুলতা বয়ে নিয়ে যায়।

নিশীথের সূদুর ভাবনাযাপন মনকে গ্রাসাচ্ছাদনের উপকরনের সমতুল্য মনে করে।

মনের যন্ত্রনাটা আরও ব্যাকুল করে বিদীর্ন আঘাতটাকে আরও নিশ্চুপ ভাবে ক্রমাগত কাটাছেঁড়া করে চলেছে।

তোমার শহরে তখন নিয়ন আলোর ঝলকানিতে সুখের আনন্দ মাখামাখি, ক্রমাগত আনন্দের হিল্লোল কাঁপুনি।

নিকষ কালো নীরব
রাত্রিযাপনে শুধু তোমায় না পাওয়ার যন্ত্রনায় চিনচিনে কষ্টের ব্যাকুলতাময় উচ্ছ্বাস।

অাশাতীত সুখের প্রলেপনের চেষ্টায় ওষ্ঠাগত ও মজ্জাগত প্রান।

অপেক্ষার প্রতিশ্রুতিরা আজ নির্মম নিষ্ঠুরতায় ভেজা কান্না নিয়ে আজও বেঁচে।

শুধু #রাজেন্দ্রানী তোমারই একান্ত অবিচল আসায় পথ চেয়ে প্রতীক্ষায়।

জানি তো, একদিন ঠিকই আসবে ফিরে এই হৃদয়ের বারবেলায়। আঙিনার আনাচে কানাচে সলাজ হাসি ও পরম ভালোবাসাময় আবেশ নিয়ে।

২৮/০৫/২০২০

ফ্রেন্ডশিপ ডে
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

সেক্টর ফাইভ। টি.সি.এস। সার্ভার প্রোভাইডার। ডেস্কটপে ঘাড় নামিয়ে, মুখ গুঁজে কাজে ব্যস্ত তিথি। ভীষণ চাপে, রক্তে জলের পরিমাণ বেড়েছে। ড্রাকুলাটা দিন দিন রক্ত শুষে নিচ্ছে শরীর থেকে। প্রেজেন্টেশান সাবমিট করার দিন। সাক্সেসফুল হলেই, প্রমোশান। সিঁড়ির প্রথম ধাপ থেকে উঠতে উঠতে, আজ এই শিখরে।
......

আই উইল উইন
নট ইমিডিয়েটলি!
বাট ডেফিনেটলি!

তিথির জীবনের মূল মন্ত্র।
.......

--"কিরে রোজের মতো ফোনটা কে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিস"?
--"আজকের দিনটা ভুলেই মেরে দিয়েছিস"?

অর্নবের কথায়, লম্বা জিভ কাটে তিথি।
........

ট্রাউজার্স থেকে ভিভো ভি নাইন টা বের করতেই.....
আজ কপালে নির্ঘাত জুটবে।
এক-দুই-তিন বারের পর যখন দশের নাম্বারটা এলো তখন ও প্রান্ত কল রিসিভ করল।
...........

সরি।
সরি।
তুই বেরো।
আমি জাস্ট পাঁচ মিনিটে বেরোচ্ছি।
এসপ্ল্যানেড।
সিটি মার্ট।
.......

অনেকক্ষণ থেকে অর্নব, চুমকি কে ফোনে ধরার চেষ্টা করছে। উত্তর নেই।
........

অনুপমের বিখ্যাত গান, 'বন্ধু চল'। গাইতে গাইতে লিফ্ট বেয়ে নিজের চারতলার ফ্ল্যাটে ঢুকল, চুমকি। উৎফুল্ল। দিনটা বেশ দারুণ কেটেছে। সোফায় শরীরটা এলিয়ে দিয়েছে। ওপো এর সাথে চুমকির সম্পর্ক অনেকক্ষণ ছিন্ন ছিল। হাত ব্যাগ থেকে ফোন টা বের করা মাত্র অর্নবের ফোন।

--"কিরে ছিলি কোথায় "?
--"কখন থেকে ট্রাই করছি"!
--"খবরটা শুনেছিস"?
.............

কাজের চাপে অর্নবের মাথাটা গেছে।

অন্ধকারময় ঘর। এন্গেজ ডিও এর গন্ধে ম ম করছে।

অর্নব ঠিকই বলেছে।
আমরা হরিহর আত্মা।
প্রমিস রেখেছি।
........

চেনা কন্ঠস্বর।

গাছ
- সম্পা মাজী

যে হাওয়ায় গাছ নিজের প্রানটা জুড়িয়ে নিত,
আজ তারই দাপটে মাথা নত করছে প্রতিনিয়ত।
যখনই ভাবছে এই বার মাথাটা তুলে দাঁড়াবে,
তখনই দমকা হাওয়ায় ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে আরও নিচে।
জানে না সে কোনা পাপের শাস্তি পাচ্ছে।
তবুও তাকে এসব মুখ বুজে সহ্য করতে হচ্ছে।
এই ভাবে আর কতক্ষন বারেবারে মাথা নত করবে,
নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাওয়ায় সাথে লড়বে।
অবশেষে জীবন যুদ্ধে হয়তো টিকে যাবে,
নয়তো দুমরে মুজরে উল্টে মাটিতে পড়বে।

অনুভবে নজরুল
- ননীগোপাল অধিকারী

সাহিত্যের পাতায় পাতায়
কবিদের মানস কোঠায়
আছো তুমি কবি নজরুল।
কবির অনুভবে ,স্মৃতিতে, স্মরণে
দীনের হৃদয়ে, বেদনায়, নয়নে
অস্তিত্ব খুঁজে পায় মানবকুল।

তুমি দীনের কবি, তুমি দুঃখির কবি
তুমি ভারতমাতার বীর যোদ্ধাদের কবি
নীল আকাশে দেখি তোমারই ছবি
অগ্নিবীণা মন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে কবি
তোমার খ্যাতি ছড়িয়েছে পৃথিবীর নবী
জগতের নাথ দিয়েছে তোমায় জয়ের চাবি।

মম জীবন যৌবন, মম হৃদয় ফুলসম
মম মানস মনন, মম অন্তর ভূবন
আছো জুড়ে তুমি হে কবি অদ্বিতীয়।
হিন্দু না ওরা মুসলিম, এই জিজ্ঞাসে কোন জনে?
জাতের নামে বজ্জাতিদের মারলে কবিতার বানে,
একই বৃন্তে, দুটি কুসুম জানালে সবারে, সমদ্বিতীয় ।

রবি ঠাকুর পরালে তোমারে ‘বিদ্রোহী কবি’র সম্মান,
শিশু কালে কাজের সূত্রে পেয়েছ দুখী নাম,
গান দিয়ে ভরালে ভারত মায়ের সুনাম।
সৈন্য দলে যোগ যে দিয়েছিলে মুক্তি যোদ্ধা হয়ে,
কান্ডারিদের জাগালে তুমি হুঁশিয়ারি গান গেয়ে,
বিপ্লবীদের মন্ত্র হলে, মায়ের ঘুচাতে বদনাম।

শিশুদের দিলে উপহার, কাঠবিড়ালী,কুকুর ছানারা ,
বাতাবি লেবু, বেড়াল বাচ্চা, লিচু আর পেয়ারা।
শিশুর চেতনায় ভিড় করল কল্প ভাবনারা।
গজল গানে ভরালে তুমি, প্রাণ পেলে মনেরা,
ফাঁসির মঞ্চে গেয়ে উঠল বিদ্রোহী সিপাহীরা
মায়ের কান্না ঘুচাল চির, স্বাধীনতাকামিরা।

লড়াই করে দেখিয়েছিলে চল্লিশ দিনের অনশনে ,
তোমার স্থৈর্য, অসিম বীর্য, ভারতবাসী সেদিন জানে।
আজও তাই রয়েছো ভারত প্রেমিদের হৃদয়ে।
শত শত বছর পরেও ভুলবে না কেউ সেই দিনদিন-
ফুলের মালায় সজ্জিত হোক, আজি শুভ দিন,
জন্মদিনে জানাই প্রনাম কবি তোমায় ,পদনত হয়ে।

## বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুল ইসলামের জন্মদিনে কবির প্রতি রইলো আমার অন্তরের শ্রদ্ধার্ঘ্য, ভালোবাসা ও সশ্রদ্ধ প্রনাম। 🙏

আমি এখন প্রাক্তন
- শৈলেন মন্ডল

আমি তো তোর এখন
অবিকল প্রাক্তন
তাই তো তোকে নিয়ে
নেই কোনো উচ্ছ্বাস
আর অমিল উন্মাদনা l

ভাবনারা আর কোনোদিন
হাত পা ছুড়ে খেলবে না
বলবে না আর সেই
চেনা নাম ধরে ডাকতে
একটু মুচকি হেসে দিতে l

নিটোল গালভরা সেই
সাজানো স্বপ্নের কথামালা
চোখের সামনে ভাসবে না,
দেবে না উস্কানো হাতের
কোমল আদর ভরা চপলতা l

আর তো কোনোদিন
বলবি না তুই দিব্বি কর
আমায় ছেড়ে যাবি না
আগের মতো একটু তো
ভালোবাসতে পারতিস l

সব যেন নিঃশব্দের মায়াজাল
সংগোপনে কোথায় হারালি
চার প্রকোষ্ঠের অব্যক্ত
নির্মম ও বেদনাময় রক্তক্ষরণ
লাগামছাড়া যন্ত্রণার উপস্থিতি l

২৬/০৫/২০২০

সহযাত্রী
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

__ মাস ছয়েক অতিক্রান্ত। আমার সাথে রক্তিমের, একপ্রকার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। অনেক চেষ্টা করেছি, যোগাযোগ রাখার। ফোন ও করেছিলাম বার কয়েক। প্রতিবার ই হতাশ হয়েছি। এর কারণে আমার পড়াশোনায় ব্যঘাত ঘটছিল বুঝতে পারছিলাম। এর কারণে স্যারের কাছে খুব বকা খেতাম। রাজবল্লভ পাড়া থেকে বাসে উঠলে, বুকটা হু হু করে উঠত। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় এলে সেই শব্দ আরও বাড়ত। মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠত, বন্ধু বিহীনে।

__ মানুষ অভ্যাসের দাস। সবরকম পরিস্থিতিতে মানিয়ে নিতে পারে। আমিও পেরেছিলাম। নিজেকে প্রচণ্ডভাবে ব্যস্ত করে নিয়েছিলাম। কারোর কারণে, জীবন তো আর থমকে থাকে না! কিন্তু, তবু; যদি এগুলো এসেই যেত। মনে হত রক্তিম থাকলে খুবই ভালো হতো।

__ সামনে আমার অনেক পরীক্ষা থাকার দরুন, রক্তিমের চিন্তা থেকে নিজকে মুক্ত করে পড়াশোনায় মন দিলাম। কারণ? এবছর কিছু না করতে পারলে বাড়ি থেকে, কপালে জুটত অনেক রকম 'মন্ডামিঠাই'।
আমার বাবা কে তো আর চেনা নেই আপনাদের। পুরোদস্তুর চলছে পরীক্ষা প্রস্তুতি। রক্তিম টপিক ভুলে মন এখন, মন দিয়েছে নিজের জীবনকে গড়তে।

___ পরীক্ষার হাঁসফাঁস অবস্থায় থাকার দরুন, কোনো দিকে মন ছিল না। সদ্য একটু চাপ কমেছে। হাঁফ ছেড়ে একটু বেঁচেছি। মেসের বন্ধুদের সাথেও বাক্যালাম কমই হত। ছুটির দিন আজ। সবাই একসাথে হয়েছি অনেকদিন পর। মেসের, রান্নার মাসির হাতের 'সুস্বাদু' চিকেন খেয়ে দুপুরে আড্ডায় বসেছি সবাই। বিকেলের প্ল্যান চলছে। শম্পা বলে উঠল,

-- "চল সিনেমা যাই"।

__ ওই অন্ধকারময় হলঘরে বসে পফ কর্ন চিবিয়ে, চুকচুক করে কোল্ড ড্রিংকস খেতে খেতে আড়াই ঘন্টা নষ্ট করার পক্ষপাতী কদাপি নই। তাই বিরোধীতা করলাম। এর চেয়ে গঙ্গার পাড়ে বসে, স্টীমারের আওয়াজ শুনতে শুনতে মাটির ভাঁড়ে ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে বেশী পছন্দ আমার। তাই মতামত দিয়ে বসলাম, গঙ্গার পাড়ে বসে ফুরফুরে হাওয়া খাওয়ার। অবিশ্বাস্য ভাবে সবাই রাজীও হয়ে গেল।

___ বিকেলের দিকে বাগবাজার ঘাটের কাছে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছি, ভাঁড়ের পর ভাঁড় চায়ে চুমুক পড়ছে সবার। রাজনৈতিক থেকে সিনেমা সবই ছিল আলোচনার বিষয় বস্তু। বেশ জমে উঠেছে সে আলোচনা। হঠাৎই আমার মুঠোফোনে টুং করে একটা শব্দ হল। জিন্সের পকেট থেকে বের করে দেখলাম, স্ক্রিনে লেখা

-- "রিসিভ ওয়ান নিউ মেসেজ"।

__ দিনে এরকম হাজারো মেসেজ আসে। দুনিয়া সুদ্ধু সবাই ভুলে গেলেও একজনই আমায় মনে রাখে। হাচ। যার দৌলতে আমার, সবার সাথে যোগাযোগ প্রতিস্থাপিত হয়েছে। সারাদিনে হাজারো কলস সমেত মেসেজস। এই ভেবে মুঠোফোন পুনরায় জিন্সের পকেটে সাঁটিয়ে দিলাম।

__ আকাশ তখন গোধূলির রঙ মেখেছে। জেটির কাছে আসছে একে একে স্টীমার। ভট ভট শব্দ তুলে। যাত্রীদের ওঠা নামা কখনও বাড়ছে বা কমছে। সেই সব পর্যবেক্ষণ করছি বুঁদ হয়ে। রুমাদির ডাকে হুঁশ ফিরল,

-- "ওরে আমার প্রকৃতি প্রেমিকা, ওঠ"।
-- "মেসে ফেরার সময় যে হল"।

__ চোখ টিপে মুচকি হেসে উঠে পড়লাম। গঙ্গার ঘাট ছেড়ে মেসের দিকে পা বাড়ালাম।

__ একটু ফ্রেশ হয়ে বই নিয়ে বসলাম। সন্ধ্যায় বইপত্রে একটু ধূপ ধূনো না দিলে মা সরস্বতী আবার রাগ করবেন। মা সরস্বতীর থেকেও যিনি বেশী রাগ করবেন, তিনি হলেন আমার পরম পিতৃদেব। পড়তে পড়তে হঠাৎই মুঠোফোনের লক টা খুলে মেসেজ বক্সের দোরগোড়ায় গেলাম। একের পর এক না পড়া মেসেজ গুলো ডিলিট করছি। একটা জায়গায় গিয়ে আঙ্গুল থেমে গেল।

__ ফোন টা নিয়ে বসেই আছি। আর পড়ার দিকে মন নেই। কখন যে রাতের খাবারের সময় হয়ে গিয়েছে! ভ্রুক্ষেপ ও নেই। মেসের এক বন্ধু,মনামীর ডাকে ইহজগতে ফিরে এলাম। রাতের খাওয়া সেরে বেশ পরিপাটি করে শুয়েছি। ঘুম না হলে আমার আবার মেজাজ খানা খিটখিটে হয়ে যায়। অনেকক্ষণ থেকে চেষ্টা করছি ঘুমোনোর। এদিক ওদিক করে, বার পাঁচেক জল খাওয়ার জন্য উঠে এবং বার কয়েক সেই জল ত্যাগ করেও ঘুম আর আসে না। অগত্যা মেসের বারান্দায় পায়চারি করলাম কিছুক্ষণ।

__পায়চারি করছি আর ভাবছি। কী করা যায়। এতদিন পর রক্তিম কেন মেসেজ করল? আর এরকমই একটা মেসেজ কেন? কি এমন হল? হাজারো প্রশ্নের ভিড় মাথার মধ্যে। সব প্রশ্নের উত্তর পেতে গেলে আমাকে আবারও মেদিনীপুর যেতে হবে। ওখানেই লুকিয়ে আছে সব উত্তর। ঠিক করলাম পরদিন ই রওনা দেব।

__ গতরাত্রে ঘুমোতে যখন এসেছিলাম, তখন প্রায় ভোররাত। একঘুমে সকাল হল ঠিক সওয়া ন'টায়। উঠে ব্রেকফাস্ট সেরে পেপারের পাতা উল্টেপাল্টে বেলায় যখন বাথরুম দখলে পেলাম। তখন প্রায় একটা। সব কাজকর্ম সেরে দুপুরের খাবার খেয়ে একটু বিশ্রাম নিয়েই বেরিয়ে পড়লাম মেদিনীপুরের উদ্দেশ্যে।

__ রাজবল্লভ পাড়ার মোড় থেকে হাওড়া গামী বাসে চড়ে যখন হাওড়া পৌঁছলাম তখন প্রায় বিকেল। টিকট কাউন্টারে টিকিট কেটে স্টেশানে অপেক্ষা করছি। অ্যানাউন্সমেন্ট আসছে একের পর এক মেদিনীপুর গামী ট্রেন ক্যান্সেল এর। বিকেল গড়িয়ে একটু সন্ধ্যার আভাস দেখা দিয়েছে। যাওয়া স্থগিত রেখে মেসে ফিরে আসার প্ল্যান করছি। এমন সময় বার্তা এল মেদিনীপুর গামী ট্রেনের। প্ল্যাটফর্ম নম্বর পনেরো। দৌড় লাগালাম প্ল্যাটফর্মের দিকে।

__ হাঁফিয়ে উঠেছি রীতিমতো। লেডিস কম্পার্টমেন্টে উঠে জানালার ধারে একটা সীট দখল নিয়ে বসেছি। এক এক করে মহিলা সহযাত্রীরা উঠছেন। ভর্তি হচ্ছে কামরা। আমারও ধড়ে যেন একটু প্রাণ ফিরল। ভাবছিলাম, এই সন্ধ্যায় এতটা পথ একলা যাব কিভাবে!

__ লোকাল ট্রেন গ্যালোপিন হয়ে ছুটছে ঝমঝমিয়ে। একের পর এক স্টেশান অতিক্রম করে চলেছে নিমেষে। ভাবলাম একবার, রক্তিমকে ফোন করি। থেমে গেলাম, ওকে সারপ্রাইজ দেবার জন্য। ইয়ারফোন লাগিয়ে গানে মননিবেশ করলাম।

__ পাঁশকুড়া আসার আগে আগেই অনেক যাত্রী নেমে গেলেন। আমি সহ আর বাকি চার জন কামরা দখল করে আছি। ঘড়ির কাঁটা তখন সাতের ঘর ছুঁয়ি ছুঁয়ি।

__ আরও মিনিট পনেরো পর পাঁশকুড়া স্টেশানে ট্রেন পৌঁছালো। বাকি মহিলা যাত্রীরা সব নেমে গেছেন কখন। যা একজন ছিলেন, উনিও আমাকে হতাশ করে দিয়ে নেমে গেলেন। দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলাম ট্রেন ছাড়ার পূর্ব মুহুর্ত অবধি। যদি কোনো সঙ্গী পাই। ট্রেন যখন হুইশেল দিয়ে স্টেশান ত্যাগ করল, আশাহত হয়ে জানলার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে রইলাম। অন্ধকারময় রাস্তায় যেটুকু চোখে পড়ে ফাঁকা একটা রাস্তা ছুটছে। ছুটছে তীব্র গতিতে, অজানা গন্তব্যস্থলে।

-- "এখানে একটু বসতে পারি"?

__ চেনা গলা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে তাকালাম।

-- "কাকিমা"!
--"আপনি কখন উঠলেন"?

__ কাকিমা উত্তর দিলেন,

-- "তুমি যখন অন্যমনা হয়ে জানালায় তাকিয়ে ছিলে তখন উঠেছি"।

__ আমি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম নিঃশব্দে। কাকিমার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়লাম,

-- "এখানে কোনো দরকারে এসেছিলেন"?

--"হুম... হ্যাঁ " বলে কাকিমা অন্য প্রসঙ্গ টানলেন।

--"জানো তিথি, রক্তিমের তোমাকে খুব দরকার এই মুহুর্তে। একমাত্র তোমার কাছেই ওসব কথা মন খুলে বলে। দেখলে না কলসেন্টারের ঘটনাটা"।

__ আমি অবাক হয়ে কাকিমাকে জিজ্ঞেস করলাম,

--"কেন কাকিমা? কি এমন হল আবার? সবই তো ঠিক ছিল"।

__কাকিমা আবার শুরু করলেন,

-- "সব ঠিকঠাক চলছিল। মেদিনীপুর শহরে ও একটা সফ্টওয়ারের দোকানও শুরু করেছিল। বেশ রমরমিয়ে চলছিল। হঠাৎই একদিন হাঁফাতে হাঁফাতে ঘরে ঢুকল। জিজ্ঞেস করাতে উত্তর দিল, কোথায় কোন সাইটে রঞ্জনাকে দেখেছে"।

-- "কি যা তা বলছে"!

__ আমার বলা কথায় কাকিমাও সমর্থন জানিয়ে বললেন,
-- "আমরাও প্রথমত তাই ভেবেছিলাম। ওকে অনেক বোঝালাম, রঞ্জনার আত্মা মুক্তি পেয়েছে। ও আমাদের কথা গ্রাহ্য না করে নিজেকে সব কিছু থেকে দূরে করে ঘর বন্দি করে নিল"।

-- "এটা ওর মনের ভুল বা হতে পারে ওর মনের অন্দরে কোথাও রঞ্জনার জন্য জায়গা তৈরী হয়েছিল। তার জন্য ও এইসব ভাবছে"।

__ আমার বলা কথাগুলো, কাকিমা আগের মতোই সমর্থন জানিয়ে বললেন,

-- "এর জন্য ওকে এস.এস.কে.এম এ সাইকোলজিস্ট দেখাতে নিয়ে যেতাম। ডাক্তারের ওপিনিয়ন ও এরকমই ছিল"।

__ একটু থেমে কাকিমা আবারও শুরু করলেন,

-- "ছেলেটা আমার পাগল হতে বসেছে, তিথি"।
-- "তুমি ওর সবথেকে কাছের বন্ধু "।

__কাকিমার জল ভরা চোখ দেখে আমারও চোখে জল এল। কি বলব বুঝতে পারলাম না। কাকিমাকে জানালাম, রক্তিমের মেসেজের কথা। এটাও জানালাম মেসেজের কারণেই আমি মেদিনীপুর এসেছি।

___ কাকিমা সব দেখে চোখ মুছে বললেন,

-- "কি দরকার ছিল ওই ভুতুড়ে কলসেন্টারে চাকরি করার"?
-- "তাহলে আজ এই দিনটা আর দেখতে হত না"!

__ আমি সম্মতিসূচক ঘাড় নেড়ে বললাম,

--"এত কিছু হয়ে গেল, আমাকে একবার জানালেন না"?
--"আমি কত চেষ্টা করেছি, রক্তিমের সাথে যোগাযোগ করার"।
--"ফোন করলেই একটা কি বিশ্রী ঘড়ঘড় শব্দ হত। তারপর তো একদিন সে আওয়াজও বন্ধ হয়ে গেল। যোগাযোগ ও বিচ্ছিন্ন হল"।

-- "রাগ কোরো না, তিথি"।
--"ছেলেটার ওই অবস্থায় মাথার ঠিক ছিল না"।
--" ওকে নিয়ে এই এত দূর থেকে এস.এস.কে.এম এ যেতাম"।
--"শুধু ওকে আগের মতো অবস্থায় ফেরানোর জন্য"।

__ কাকিমার বলা কথা গুলোর কোনো উত্তর ছিল না আমার কাছে। পরিস্থিতির অবস্থা বুঝে চুপ করে রইলাম। গল্প করতে করতে কখন মেদিনীপুর স্টেশানে ট্রেন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। ভাগ্য ক্রমে এটাই শেষ স্টপ ছিল। ট্রেন থেকে আমি আর কাকিমা নেমে, রিক্সা স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা দিলাম। আজ আর রক্তিম নিতে আসেনি আমাকে। ও তো জানেই না আমি আসছি।

___ রিক্সা স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। কোথাও কিছু নেই আকাশ কালো করে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। সাথে মেঘের গর্জন। বিদ্যুতের ঝিলিক। ওদিকে ঘড়ির কাঁটা ন'টার ঘর ছুঁয়েছে। আমি আর কাকিমা দাঁড়িয়ে রইলাম।

_"কি করে এবার যাব, কাকিমা"?
-- "এ তো বিনা মেঘে বজ্রপাত "।

__ এই পরিস্থিতিতে কাকিমা পরিশ্রান্ত না হয়ে একদম শান্ত এবং নির্লিপ্ত কন্ঠে বলে উঠলেন,

--"ঠিক পৌঁছে যাবে"।
--"পৌঁছতে তোমাকে যে হবেই, তিথি"।
--"রক্তিমের যে বড্ড দরকার, তোমাকে "।

__ কাকিমার সব কথার মানে বুঝতে পারিনি তখনও। তখন একটাই চিন্তা রক্তিমের বাড়ি যাব কি করে। রাত ও বাড়ছে। সাথে পেটের মধ্যে ছুঁচো গুলোও ডন দেওয়া শুরু করেছে।

__ ভাবনায় ছেদ পড়ল। একটা রিক্সা আসতে দেখে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ছোট্ট শিশুর মতো লাফিয়ে উঠলাম। আমার কান্ড দেখে কাকিমা শুধু মুচকি হাসলেন।

-- "যাবেন দাদা"?
--"কালেক্টর রোড"।
--"দু'জন আছি"।

__ রিক্সার মালিক এমনভাবে আমার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল! যেন ভূত দেখেছে। আমরা রিক্সায় চড়ে বসলাম। এবার আমি একলাই বকবক করতে করতে যাচ্ছি। কাকিমার কোনো উত্তর নেই। বুঝলাম কাকিমার মন ভালো নেই, রক্তিমের জন্য। বিদ্যুতের ঝলকে দেখলাম, রিক্সার মালিক মাঝে মাঝে পেছন ফিরে দেখছে।

__ মিনিট পনেরো পর কালেক্টর রোডে পৌঁছালাম। রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে রক্তের বাড়ির দিকে এগোলাম। কাকিমার কথা মতো আমিই আগে ছিলাম। রক্তমকে চমকে দেব বলে। ওর বাড়ির সামনে এসে কড়া নাড়া দিলাম। অনেকবার আওয়াজ করাতে রক্তিমের বোন, রাকিয়া এসে দরজা খুলল। আমাকে দেখে অবাক হয়ে,

-- "তিথি দি তুমি"?

__আমি সেসব পাত্তা না দিয়ে, পেছনে থাকা কাকিমার কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে সোজা রক্তিমের ঘরে হানা দিলাম।

__ চমকটা আমাকে ভালোই দিয়েছিল রক্তিম সহ ওর বাড়ির সবাই। রক্তিমকে চমক দিতে গিয়ে আমি নিজেই তার শিকার হই।

__রক্তিমের ঘরে যখন প্রবেশ করলাম, ওর অবস্থা দেখে আমিই চমকে উঠি। তরতাজা একটা ছেলে বসে আছে হইল চেয়ারে। চুলগুলো উস্কো খুস্কো। মুখে সেই চার্মিং ভাব হারিয়ে গেছে। একরাশ হতাশা গ্রাস করেছে রক্তিমকে।

__ রক্তিমের ওই অবস্থা দেখে আমি থ বনে গিয়েছিলাম কয়েক মুহুর্তের জন্য। হঠাৎই মনে পড়ল কাকিমার কথা। উচ্চস্বরে ডাকা শুরু করলাম,

--"কাকিমা। কাকিমা।"
--"এ ঘরে......"

__আমাকে থামিয়ে দিয়ে রক্তিম ই বলে ওঠে,

--"তুই কাকে ডাকছিস"?

-- "কেন কাকিমা কে"
--"আমার সঙ্গে তো এলেন একসাথে "।
--"পাঁশকুড়া থেকে ট্রেনে উঠলেন"।
--"তোর কথা বললেন"।

__ একপ্রকার বিরক্ত হয়েই রক্তিম বলে উঠল,

-- "তোর ইয়ার্কি করার অভ্যাস আজও যায়নি, তিথি"!

-- "মানে"?
-- "ইয়ার্কি করব কেন"?
__ পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ি।

__রক্তিমের বোন রাকিয়া ঘরে ঢুকল। সাথে কাকু। রাকিয়াই উত্তর দিল,

--- "তুমি এলে বলে, দাদা তাও কথা বলল"।
--"এতদিন হাতে গুনে কয়েকটি কথা বলেছে মাত্র"।
--"মা তো..."

__ আমি রাকিয়াকে থামিয়ে বলি,

-- "কাকিমার কি হয়েছে"?

--"তোমার কাকিমা গত হয়েছেন কয়েক মাস হল"।

__ কাকুর উত্তরে আমি অবাক হই বৈকি। উত্তেজিত ভাবেই বলি,

--"মানে? কি সব..."
--"এতটা রাস্তা কার সাথে এলাম আমি"?

__রক্তিমের দিকে তাকিয়ে নিজের মুঠোফোন থেকে ওর মেসেজ বের করে দেখালাম,

--"দেখ তোর মেসেজ"।
--"তুই আমাকে মেসেজ করেছিলি তাই এসেছি"।

__ নির্লিপ্ত কন্ঠে রক্তিম বলে ওঠে,

--"আমি তোকে মেসেজ করেছি"?
--"আমার ফোন কবেই ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে গেছে"।
-- "অ্যাক্সিডেন্টের পর"

__রক্তিম সমেত বাকিদের কথা আমাকে আরও অবাক করে তুলছিল।

-- অ্যাক্সিডেন্ট! কি অ্যাক্সিডেন্ট"?

__ আমার প্রশ্নে রক্তিম বলে ওঠে,

--"আমি বেশ কিছুদিন ধরে হতাশায় ভুগছিলাম। মনে হচ্ছিল রঞ্জনা আবার ফিরে এসেছে। আমাকে কিছু বলতে চায়। ওর বোধহয় অনেক কথা বলা বাকি ছিল। তাই আবারও ফিরে এসেছে। এসবের জন্য নিজেকেই নিজে বন্দি করে নিই। পাগল হবার উপক্রম প্রায় উপস্থিত। মা'র জন্য সেই অবস্থার হাত থেকে ফিরে এসেছি"।

__ এগুলো কাকিমার থেকে শুনেছি। বাকিটা বল। মেজাজ তখন সপ্তমে রীতিমতো। কিছুটা বিরক্তির সুর চড়িয়েই বললাম।

__ রক্তিম আবার বলা শুরু করল,

--"সাঁতরাগাছি অবধি বাসে এসে ওখান থেকে ট্রেন ধরতাম। এরকমই এক দিনে ট্রেনের ট্র্যাক পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মের উদ্দেশ্যে আসছি চোখের নিমেষে কিছু যাত্রীকে একটা এক্সপ্রেস ট্রেন পিষে দিয়ে চলে যায়। তার মধ্যে আমার মা ও ছিল। আমিই দায়ি মা'র মৃত্যুর জন্য"।

__ আরও বিরক্তি যেন গ্রাস করছে আমাকে।
আগের তুলনায় একটু বেশীই বিরক্তি সুরে বলতেই যাচ্ছিলাম, রক্তিম বলে উঠল,

-- "আমি জানি তুই কি ভাবছিস"!

--"কি শুনি"?

--"আমি এসব বুঝলাম কিভাবে। তখন তো আমার ই পাগল পাগল অবস্থা "।

--"ঠিক তাই"।

--"মা'র কারণে আমি তখন একটু সেরে উঠেছি। তাই জানি"।

-- "মা কে নিয়ে মজা করব"!
--"তাও আবার মৃত্যু "।

__রক্তিম আবার শুরু করে,

--"মা কে বাঁচানোর অহেতুক চেষ্টা করেছিলাম। সেই চেষ্টায় সফল হইনি। পা দুটো খুইয়েছি"।

__ তবু মনটা খচখচ করছিল এসব শোনার পরও। বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। মনে তখনও প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ট্রেনে আমার সহযাত্রী কে ছিল? মেসেজ ই বা কে করেছিল আমাকে?

__ প্রথমটার উত্তর পেয়েছিলাম তৎক্ষণাৎ। রক্তিমের কথা শুনেও পাগলের মতো দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম ওদের বাড়ির বাইরে।

__ গল্পকথার মতো অনেকেই বিশ্বাস করতে নাও পারেন। বাড়ির বাইরে এসে আমি যা দেখেছিলাম তা নিজের চোখেই বিশ্বাস হচ্ছিল না।

__ কাকিমার প্রতিচ্ছবি বলব না কি প্রতিরূপ না কি প্রতিকৃতি। সেইরকম দেখতে একটা ছায়ামূর্তি আমার আসার অপেক্ষাতেই ছিল বোধহয়। আমাকে দেখে একইরকম মুচকি হাসি হেসে বলল,

-- "বলেছিলাম না রক্তিমের তোমাকে দরকার"।
--"ওর পাশে থেকো, তিথি"।
--"ওকে বোলো, ওটা ছিল অকস্মাৎ মৃত্যু "।
-- "নিজেকে দায়ি না করে, বোঝা যেন না বাড়ায়"।

__ আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে সেই ছায়াময় অবয়ব টা। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরও আমাকে দিয়ে গেছে, আমার সহযাত্রী।

__ ফিরে আসি রক্তিমের কাছে।
__ বন্ধুর অসময়ে পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিই।

__ এরপর থেকে সপ্তাহান্তে রক্তিমের বাড়ি আসতাম। ও ক্রমে নর্মাল জগতে ফিরে যাচ্ছে। ও যাতে আবারও দু'পা এ ভর করে হাঁটতে পারে কাকু তার জন্য কৃত্রিম পা এর ব্যবস্থা করেছেন। চাকুরির প্রস্তুতি চলছে আমাদের জোরকদমে।

___ রাতের ট্রেনে এলে আমার সহযাত্রীটির সাথে সাক্ষাৎ হয় প্রায়ই । ইহজাগতিক খবরাখবর ওনাকে প্রদান করি। বিশেষত রক্তিমের।

__ সেদিন বৃষ্টির রাতের একমাত্র সাক্ষী রিক্সা ওয়ালার সাথে বেশ সখ্যতা হয়েছে আমার। হঠাৎই একদিন কি মনে করে প্রশ্ন করে ফেলি,

-- "দাদা, তুমি সেই ঝড় বৃষ্টির রাতে কাউকে দেখেছিলে আমার সাথে"?

___ রিক্সাওয়ালার উত্তরে বিশেষ চমকের কিছুই ছিল না। সব কিছুই কাঁচের মতো স্বচ্ছ ছিল আমার কাছে। তবুও জানতে ইচ্ছে করায় প্রশ্ন করি। উত্তর টা স্বাভাবিক ভাবেই 'না' আসে। আজ বুঝলাম, ওঁর বারবার পেছন ফিরে তাকানোর কথা।

জীবনের খাতায় পুরো অধ্যায় বদলে যাচ্ছে
অদৃশ্য অস্ত্রে রক্তপাতহীন ভাবে যুদ্ধ চলছে ;
প্রতিনিয়তই এখানে মানুষকে খুন হতে হচ্ছে ।

সংঘর্ষ ছাড়াই সম্মুখ থেকে খুন হয়ে যাচ্ছে
আর লাশগুলো পৃথিবীর মর্গে পড়ে থাকছে ;
আবার স্বজন সৎকার ছাড়া সমাধিস্ত হচ্ছে ।

এখানে জীবিকার সাথে স্বপ্ন হারিয়ে যাচ্ছে
আর প্রতিনিয়ত জীবিত মানুষেরা খুন হচ্ছে ;
আকাশ জুড়েও চিল শকুনের উল্লাস চলছে ।

মসজিদ মন্দির গীর্জা সবই আজকে ফাঁকা
সর্বশক্তিমানও উপসানালয়ে আজকে একা ;
ধর্ম আর অধর্মের যুদ্ধে মানুষই হচ্ছে বোকা ।

এ যুদ্ধে কোন আহত সৈনিক বা যোদ্ধা নেই
আমিও হয়তো খুন হয়ে যাবো একটু পরেই ;
তবুও এ হত্যাকান্ডগুলো ধামাচাপা পড়বেই ।

উনিশে মে
- ঝুমা মল্লিক

অক্ষর জানে এই আন্দোলন ক্ষত।
বীরের রক্তে লেখা আছে নাম যত।
তোরা যতবার আঘাত করিস।
যতবার মারিস,
পারিস?
বেঁচে থাকে আমার বাংলা ভাষা।

আমার ভাষায় আমার মুক্তি।
বেঁচে থাকার সকল যুক্তি।
আমার ভাষায় হোক জয়গান।
আরো কতো দেবে প্রাণ।
লিখে রেখো নাম।

মাতৃভাষার করো জয়গান।
বাঁচাবো ভাষা,দেবো প্রাণ।
কানাই,সুনীল,হিতেশ আবার জন্ম নেবে
বাঁচবে আমাদের মাতৃভাষা।

যে আকাশটা তোমাকে দিতে চাই
- রোজী নাথ

আমন্ত্রণের আলপনা আঁকা একটা সঘন আকাশ তোমাকে উপহার দিতে চাই।

রোজ বেলা রোদ্দুরে পাখিদের সাথে বন্ধুত্ব হবে সাজহীন খোলা গোলার্ধেই।

ভীষন মন খারাপের বেলায় মেঘের সীমানা ছুঁয়ে যৌথ আলিঙ্গনে যেমন তেমন বৃষ্টি নামবে ষোলোয়ানা ভিজিয়ে দিতে।

পূর্ণিমা রাতের রূপোলী চন্দ্রিমায় সব সুখ গায়ে মেখে
ভর যৌবনের টুকটুকে লজ্জাবতী নদী হয়ে যাবো আমি , আর তুমি হবে সেই ঝড়ের রাজা।

সুদূর নর‌ওয়ে কি‍ংবা সুইডেনেও বিবাগী রাতে সূর্যের আলো ছড়িয়ে পড়বে তোমার প্রবাসী বুকের নিশ্ছিদ্র ভাঁজে ভাঁজে।

প্রচণ্ড ঠাণ্ডা রাতে শিশির ঝরার মৃদু মৃদু শব্দে গরম চা কফি কিংবা হালকা মদিরার নেশার সাথে কোনো এক মন ভালো করা রাগিনী বাজবে সুমধুর সুরে।

মধ্য বেলার রৌদ্রের ক্লান্তিতে ঠান্ডা সরবতে চুমুক দিতে দিতে বটবৃক্ষের শীতল ছায়ায় তুমি এসো ঘনিষ্ঠ মেঘ হয়ে।

তুষার ঝরা বেলায় দুজন উষ্ণতার খোঁজে হারিয়ে যাবো দূর নীলিমার ওপারে।

প্রিয় আকাশটাই হোক আমাদের দুজনার বুকের চিরকালীন বসন্ত ছাদ।

জীবন-যুদ্ধ
- কিরণময় নন্দী

ও একরত্তি শিশু
ও আগামীর ভবিষ্যৎ
ও পারেনি আত্মনির্ভর হতে
ও পারেনি হাঁটতে,বহুদূর পথ।

ও উড়ে যাবার স্বপ্ন দেখেনি
জন্ম থেকেই জানে দুর্দশা
রেলের ছোটো আসন কি প্রাপ্য নয়
এইটুকু চাওয়া কি শুধুই উচ্চাশা?

মায়ের মন সে তো ভীষণ নরম
সে হোক না গরীবের মা
বুঝেছে একরত্তির ব্যথা-কষ্ট
কচিকচি পায়ে হাঁটার যন্ত্রনা।

কালো পিচের উত্তাপে ও
ঘেমে-নেয়ে একাকার
আরও পথ, অনেক বাকি
ও ব্যাগ-ট্রলিয় সওয়ার।

বিষের-জালে বন্দী দেশ
পেটের টানে হাঁটছে ওরা
নিজের গাঁয়ে ফিরতে হবে
মাইলের পর মাইল হেঁটে হেঁটে ওরা।

কষ্ট চেপে পাড়ি কয়েকশো মাইল পথ
ও হতাশায় বাকরুদ্ধ
গরীবের এতো কঠোর শ্রম
গরীবেরই কেন জীবন-যুদ্ধ?

আমার হিয়ার মাঝে
- শৈলেন মন্ডল

তোমার ফাগুন নেশায়
আগুন খেলে আমার হিয়া
তোমার বৈরী প্রেমের আভাস
চোখের পলক ভালোবাসার দিয়া।

তোমার সর্বনাশা প্রেমের খেলায়
আমার দোতারা মন হয় উদাস
তোমার ভালবাসায় স্বপ্নগুলো
ভেসে বেড়ায় শান্ত বাতাস।

তোমার প্রেমের আগুন পাখি
আমার জানালায় অবাধ বসা
তোমার উদাস হাসি নির্জনতায়
সুপ্ত মনের গোপন আশা।

তোমার চোখের ইশারা
গোপন প্রেমের বাঁধ যে ভাঙ্গে
তোমার হৃদয় না হার মানা
সর্বনাশের মরন জাগে।

তোমার এলোচুলে বৈরী বাতাস
দোলা দেয় মনে ভাবনাগুলো
তোমার সপ্তসুরের মূর্ছনারা
পাগল করে এ মন নিলো।

তোমার আদরবাসায় নিলাম হয়ে
ইচ্ছেরা সব ডানা মেলে
তোমারই ভালবাসায় আজীবন
থাকবো আমি তোমায় পেলে।

তোমারই চোখের তারায়
নৈসর্গিকতার সুখ যে আসে,
তোমারই নাম #রাজেন্দ্রানী
থাকবে তুমি আমার পাশে।

১৬.০৫.২০২০

ওয়ান নাইট এট দ্য কলসেন্টার
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

__ কোলকাতায় কেটে গেছে বছর দুয়েক। চাকরিশূন্য তখনও। বাবা বলল, বাড়ি যেতে। আমি নাকচ করে দিয়ে আরও কিছুটা সময় চেয়ে নিয়েছিলাম। একটু ইমোশনাল ব্ল্যাকমেল করতে হয়েছিল বৈকি। তারপর গিয়ে বাবা মত দেন, রাজি হন আরও কিছুটা সময় দেওয়ার। চাকরি কি আর হাতের মোয়া! চাইলাম আর পেয়ে গেলাম।

__ চাকুরী সন্ধানের জন্য গাইড লাইনের প্রয়োজনে সুদূর গড়িয়া স্টেশানে পড়তে যেতাম। প্রাইভেটে পড়তাম। রাইস-মাইসে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ করে পড়ার কোনো রকম প্রবৃত্তি আমার কস্মিন কালেও ছিল না।

__ সেই সূত্র ধরে আমার এক বন্ধু জুটেছিল। রক্তিম। সে ও জুতোর সোল খোয়াচ্ছে অনেকদিন হ'ল। সিকে ছেঁড়েনি ভাগ্যে। একটু আলাপ পরিচয় হবার পর জানলাম, ওর ও নিবিস শ্যামবাজারের কাছেই। আমি থাকতাম রাজবল্লভ পাড়ার একটি মেসে।

__কিছু দিনের মধ্যেই আমরা বেশ বন্ধু হয়ে উঠলাম। পড়তে যাবার সময় একসাথেই যেতাম বেশী। বাগবাজার-গড়িয়া স্টেশান গামী সাদা বাসে, রাজবল্লভ পাড়া থেকে উঠে দু'টো সীটের দখল নিতাম। রক্তিম উঠত শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড় থেকে। সারা রাস্তায় জেনারেল ইন্টেলিজেন্স বা কখোনো ইংলিশ, জি কে এইসব আলোচনা করতে করতে যেতাম। পঁয়তাল্লিশ মিনিটের রাস্তায় চলত, আমাদের গ্রুপ স্টাডিজ।

__এরকম ই একটা সকালে রক্তিমের জন্য বরাদ্দ সীট ও এসে ভরাল না। একরাশ মনখারাপ নিয়ে একাই পড়তে গেলাম স্যারের কাছে। সেখানে পৌঁছে ও দেখলাম, রক্তিম ডুব মেরেছে। পড়া শেষে, বেরিয়েই ওকে ফোনে ধরলাম। অনেকবার বেজে বন্ধ হয়ে গেল। উত্তর পেলাম না।

__মেসে ফিরে ফ্রেশ হয়ে, দুপুরের খাবারের একটা গাল সবে মুখের সামনে ধরেছি। ফোন বেজে উঠল। স্ক্রিনে রক্তিমের নাম ভেসে ওঠা দেখেই ঈগলের মতো ছোঁ মেরে ফোন টা রিসিভ করলাম। আমাকে কিছু বলার সুযোগ মাত্র না দিয়ে...

--"বিকেলে ঘোষের কেবিনে দেখা করিস। কথা আছে"।
বলেই ফোন কেটে দিল।

__যথা সময়ে বেশ পরিপাটি হয়ে আমি পৌঁছে গেলাম, 'ঘোষ কেবিনে'। বসেই আছি। অনেকক্ষণ বসে থেকে, কিছুটা বিরক্ত হয়েই উঠে যাচ্ছিলাম। দেখি দরজার প্রবেশ পথ ধরে রক্তিম আসছে। আমি হাত তুলে ওকে ডাকলাম। কাছে আসতেই...

--"কিরে এত জরুরী তলব করে নিজেই বেপাত্তা"?
--"আজ পড়তেও গেলি না"।

--"রোশো বন্ধু"।
__রক্তিমের কথায়, ফুলস্টপ টানি।

--"বাবা কদিন থেকে খুব প্রেশার দিচ্ছিল। আর টাকা পাঠাতে পারবে না, জানিয়েও দিয়েছিল। নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নিতে বলেছিল"।

__রক্তিমকে থামিয়ে আমি বলে উঠলাম,
--"এসব আবার কবে হল"?

--"চলছিল বেশ কিছু দিন ধরেই। তাই চেষ্টা চালাচ্ছিলাম একটা বেসরকারী চাকরীর। এক বন্ধুর কারণে পেয়ে গেলাম, একটা চাকরি। ভেবেছিলাম সব ঠিকঠাক হলে তোকে জানাব। আজ ঠিক হয়ে গেল সব"।

__হাত তুলে ইশারায় রক্তিমে আবারও থামিয়ে,
--" কোথায় কি চাকরি"?
--"তাহলে স্যারের কাছে আর যাবিনা"!
--"স্যার কে জানিয়েছিস"?
--"তোর মতো একটা ব্রাইট স্টুডেন্ট... স্যার দুঃখ পাবেন.....

__কথা শেষ করতে দেয় না রক্তিম। আমাকে থামিয়ে বলে ওঠে,
--"স্যার কে সব জানিয়েছি। শনি-রবি স্যারের কাছে যাব"।

__আমি আবারও বলে উঠি,
--"কিসের চাকরি বললি না"?

--"কল সেন্টারে"।
--"রাতের দিকে ডিউটি নিয়েছি, বস কে বলে"।
--"বাকি সময় টা সরকারি চাকুরীর জন্য প্রস্তুতি নেব"।
--"মাইনে যা দেবে চলে যাবে আমার"।

__একটানা কথাগুলো বলে থামল রক্তিম।

--"তাহলে তোর সাথে আর দেখা হবে না"। বিমর্ষ হয়েই বললাম।

--"সে ব্যবস্থা করে এসেছি। স্যার কে বলে, শনি-রবি তোকে সঙ্গী করে নিয়েছি। বাকি তিন দিন যেমন যাস যাবি"।

__রক্তিমের কথায় এক চিলতে হাসি ফুটল মুখে।

__এরপর বেশ কিছুদিন সময় পেরিয়ে গেছে। আমাদের জীবন যাত্রার একটু পরিবর্তন ঘটেছে। একটা বিশেষ পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম রক্তিমের কথা বার্তায়। দেখে হলেই একটা বিশেষ ভাষা প্রয়োগ করত ও।

__শনিবারের এক সকালে, পুরোনো প্রথাগতভাবে ওর জন্য সীট রেখে রাজবল্লভ পাড়া থেকে গড়িয়া স্টেশানের বাসে উঠলাম। রক্তিম উঠল শ্যামবাজার থেকে। বাসে উঠেই আমার দিকে তাক করে,
--" bonjour"!

__আমি, ওর কথার মানে না বুঝে ওর দিকে তাকিয়ে আছি।

__ মাথায় গাট্টা মেরে, রক্তিম বলে ওঠে...
--"এটি ফ্রেঞ্চ ভাষায়, Good morning "!

--"তুই আবার ফ্রেঞ্চ কবে থেকে শিখছিস, বলিসনিতো"!
একটু রাগত ভাবেই বললাম।

__আগে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের রাস্তা জি.আই, জি. কে এসব আলোচনায় সাঙ্গ হত। তার জায়গা দখল করেছে রক্তিমের টুকরো টুকরো ফ্রেঞ্চ কথায়।

__এই তো সেদিন। পড়া শেষে মেসে ফিরছি। রীতিমতো ও শ্যামবাজারে নেমে যাবে। নামার আগে আবারও সেই ফ্রেঞ্চ বিদ্যা অ্যাপ্লাই করল...

--"A bientot"

__আমি মানে জিজ্ঞেস করার আগেই ও নেমে গেল। মনে মনে ঠিক করলাম একদিন ওর সাথে এটা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করব।

__না! সেদিনের পর থেকে রক্তিমের সাথে আমার অনেক দিন দেখা হয় নি। ফোনেও পাইনি। স্যারকে জিজ্ঞেস করেও কিছুই জানতে পারিনি। শনি-রবি স্যারের কাছে যাওয়া কার্যৎ বন্ধ।

__এরপর আরও কয়েক মাস কেটে গেছে। রক্তিমের কোনো খোঁজ পাইনি।

__একদিন সন্ধ্যায় মেসের ঘরে বসে পড়াশোনার কাজে ব্যস্ত। সাইলেন্ট মোডে থাকা ফোনে হঠাৎই কাঁপুনি দেখা দিল। উল্টোদিকে ফেলে রাখা ফোন সোজা করতেই ফোনের স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে চমকেই উঠলাম। চমকে উঠলাম এতদিন পর রক্তিমের ফোন পেয়ে।

--"salute"
--"allo"

__ বিরক্ত হয়ে একটু তিক্ত স্বরেই বললাম,
--"ঠিক করে কথা বলতে হলে বল। নইলে রাখ ফোন "।

__রক্তিম একটু শুষ্ক কন্ঠে বলে ওঠে,
--"তোকে আমার বাড়ির ঠিকানা পাঠাচ্ছি"।
--"প্লিজ। কাল আয়"।
--"অনেক কথা আছে"।

__একইরকম ভাবে নিজের বলা কথা শেষ করে ফোন কেটে দেয়, রক্তিম।

__কথামতো পরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম। রক্তিমের বাড়ির উদ্দেশ্যে। হাওড়া স্টেশান থেকে মেদিনীপুর গামী একটি ট্রেনে চড়ে বসলাম। প্রায় দুই কি আড়াই ঘন্টা পর মেদিনীপুর স্টেশান পৌঁছলাম। সেখান থেকে একটি রিক্সায় কালেক্টার রোডের বাড়ি, রক্তিমের বাড়ি পৌঁছালাম।

__ভীষণ ক্লান্তি থাকায় দুপুরে ফ্রেশ হয়ে খেয়ে দেয়ে একটা সুখ নিদ্রা দিলাম। তিন ঘন্টার নিদ্রাভঙ্গ যখন হল তখন আকাশে গোধূলির রঙ লেগেছে।

__রক্তিমের বাড়ির সবার সাথে পরিচয় পর্ব আগেই হয়েছিল অল্প করে। বাকিটুকু চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সেরে ফেললাম। রক্তিমের দিকে তাক করে,

--"কি বলবি বলছিলি"?
--"যার জন্য তলব করলি"!

__রক্তিম শুরু করল যখন তখন ঘরের মধ্যে পিন ড্রপ সাইলেন্ট।

--"তোর সাথে সেদিন পড়ে ফিরে সবে মেসের দরজায় পা দিয়েছি। বসের ফোন। রাতের ডিউটি তে কেউ নেই। আমাকে যেতে হবে। এর জন্য এক্সট্রা টাকা দেবে। লোভ সামলাতে না পেরে গেলাম রাতের ডিউটি করতে"।

__রক্তিমকে থামিয়ে, সেদিনের ফ্রেঞ্চ কথাটার মানে জানতে চাই।

--"A bientot__ see you soon"
--"সেদিন তোকে এটাই বলেছিলাম"।

__রক্তিম থামলে বলে উঠি,
--"তুই ফ্রেঞ্চ কি করে জানলি"?

__একটু চুপ থেকে রক্তিম বলে ওঠে,
--"সে সব জানাব বলেই তোকে ডেকেছি"।

__রক্তিম কি একটু ভেবে শুরু করল,
--" রাতের কল সেন্টার পুরো খাঁ খাঁ করত। প্রথম দিন একটু ভয় ভয় করছিল। ভয়টা কেটে গিয়েছিল একজন সঙ্গী কে দেখে। মনে একটু প্রশান্তি এসেছিল"।

__আমি বলে উঠলাম,
--"তারপর"?

__রক্তিম আবার শুরু করে,
--"প্রথম ক'দিন যে যার মতো কাজ করে ফিরে যেতাম। অফিস থেকে আমিই আগে বেরিয়ে আসতাম। বা আমি অফিস যাওয়ার আগে থেকেই সে উপস্থিত থাকত। মুখ গুঁজে নিজের ডেস্কটপে কাজ করত। ওই একদিন নিজে থেকে আলাপ করতে আসে।"

--"হুম"।
__একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে আমি অপেক্ষায় থাকি রক্তিমের পরবর্তী কথা গুলো শোনার জন্য।

--"একটা রাতে আমিও আমার ডেস্কটপে মন দিয়ে কাজ করছি। সারা অফিসে আমি আর সে ছাড়া কেউ নেই। এমতাবস্থায়....."

--"বঁসোয়া ম্যাদমোজায়েল"

_"একটি মেয়েলি কন্ঠস্বর শুনে ঘাড় উঁচিয়ে অবাক দৃষ্টিতে দেখি, একজন অপূর্ব সুন্দরী দু'হাতে দু'টি কফি কাপ হাতে দাঁড়িয়ে আছে"।

--"আমার অবাক দৃষ্টি দেখে মেয়েটি বলে ওঠে...."

--"salute"

--" আমি তার কথার মাথা মুন্ডু বুঝতে পারছি না দেখে মেয়েটি আবারও বলে ওঠে...."

--"ওহ্। সরি"।
--"আমি রঞ্জনা"।

__অনেকক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর অবস্থাটা একটু হালকা করার উদ্দেশ্যে আমি গুনগুনিয়ে উঠি,

--"রঞ্জনা আমি আর আসব না"।

__রক্তিম সহ পুরো পরিবারের নজর এখন আমার দিকে। কারণ ওই গম্ভীর মুহুর্তে আমি কি করে এতটা হালকা থাকতে পারি। আমার ইয়ার্কি করার স্বভাবে পরিচিত রক্তিম ও অবাক কম বিরক্ত বেশী মনে হল।

__রক্তিম ই কড়া সুরে বলে উঠল,
--"এটা ইয়ার্কির জিনিস নয়, তিথি"।

__বুঝলাম ভুল হয়ে গেছে। রক্তিম তো এত বিরক্ত হওয়ার মতো ছেলে নয়।
--"সরি" বলে পরের কথা গুলো বলার অনুরোধ করলাম।

__রক্তিম শুরু করল,

--" আমি ওর ওই সব শব্দের মাথা মুন্ডু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করাতে রঞ্জনা জানায়..."

--"ওগুলো ফ্রেঞ্চ শব্দ"।

--"রঞ্জনাকে ওই শব্দের মানে জিঞ্জাসা করার সাথে এও জানতে চাই ওর এই বিদ্যার কথা"।

__রঞ্জনা উত্তর করে,
--" বঁসোয়া ম্যাদমোজায়েল। অর্থ ফ্রেঞ্চ অভ্যর্থনা "
--"Salute. এর অর্থ Hi"
--"শেষেরটা ফ্রেঞ্চ সম্ভাষণ"।
--"গোলপার্কের কাছে একটা ইন্সটিটিউশান আছে। যেখানে আমি এই ভাষা রপ্ত করার চেষ্টায় আছি। "

__রক্তিম বলে,
--" তা তুমি এই কল সেন্টারে জব করে নিজের ভবিষ্যৎ নষ্ট করছ যে"!

__রক্তিমের কথার জবাবে রঞ্জনা উত্তর করে ওঠে,
--ধরে নাও পকেট মানি তে টান পড়েছে"।

__আমরা সবাই রক্তিমের কথা শুনছি। ঘরের মধ্যে কেউ কোনো কথা বলছে না। আমরা মানে আমি সহ রক্তিমের মা-বাবা আর এক বোন। মৌনতা ভঙ্গ করে বলে উঠলাম,
--"তারপর কি হল"?

__"রোজকার মতো অফিসে যাতায়াত করার ফলে আমার আর রঞ্জনার মধ্যে বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। ওর বদান্যতায় কিছু ফ্রেঞ্চ শব্দ আমিও রপ্ত করেছিলাম"।

--"যেগুলো তোর কাছে অ্যাপ্লাই করতাম"।

__আমার দিকে তাকিয়ে রক্তিম বলে উঠল।

__রক্তিম আরও বলে চলল,

--"বেশ ভালোই চলছিল রাতের কল সেন্টারের কাজ। সারা অফিস জুড়ে শুধু আমি আর রঞ্জনা। ধোঁয়া ওঠা কফির কাপে ঠোঁট ছুঁয়ে, কাজের সাথে চলত নানারকম আলোচনা"।

__আবার একটু চুপ রক্তিম। আমি একটু বেশী অস্থির হয়ে পড়ছি। বড়ো গল্প না লাগে ধৈর্যের সাথে শুনতে ভালো লাগে না ভালো লাগে পড়তে। মনে মনে বলছি, "ওরে রক্তিম তাড়াতাড়ি শেষ কর। তোর এই এঁদো মার্কা গপ্পো "।

__এসব কথা জোরে বলার সাহস হল না। কারণ রক্তিমের পরিবর্তন আমার চোখে পড়েছিল। হঠাৎ হঠাৎ ওর ভাবুক হয়ে ওঠা আমার একটুও ভালো লাগছিল না। ওর মতো একটা চার্মিং ছেলের এই অকাল পরিবর্তন, কিছুটা অকাল বর্ষনের মতো ঠেকছিল আমার কাছে। আমার অস্থিরতার সাথে মুখ দেখে মনের ভাবের কথা রক্তিম বোধহয় বোধগম্য করতে পেরেছিল। আমার দিকে তাকিয়ে রক্তিম বলে ওঠে...

--"তিথি! আর একটু ধৈর্য্য ধর"।
--"সব প্রশ্নের উত্তর পাবি"।
--"জানি তোর ধৈর্যের বড্ড অভাব"!

__একটু রাগ হচ্ছিল, রক্তিমের ওপর। যাইহোক। রক্তিম আবার শুরু করল,

--"সেই রাতে খুব বৃষ্টি পড়ছিল। বৃষ্টি মাথায় নিয়েই অফিস গেলাম সেদিন। অফিসের গেটে বসে থাকা ওয়াচ ম্যানকে জিজ্ঞেস করলাম, রঞ্জনা ম্যাডাম এসেছে অফিস"?

--"আমার প্রশ্ন শুনে ওয়াচ ম্যান হাঁ হাঁ করে বলে ওঠে"..

---" রঞ্জনা ম্যাডাম কোথা থেকে এল, স্যার? সারা অফিসে আপনি তো একাই"।

__রক্তিম বলে উঠল,

--"ওয়াচম্যানের কথা শুনে তাকে এক ধমক দিয়ে একরাশ তিরস্কার করে সেখান থেকে অফিসে ঢুকলাম। সারা অফিসে কেউ কোথাও নেই। সারা অফিস খাঁ খাঁ করছে। লাইট গুলো দপ দপ করছে। প্রথমটা ভাবলাম, এই বৃষ্টি বাদল মাথায় নিয়ে রঞ্জনা আসবেই বা কি করে। মনকে শান্ত করলাম। নিজের জন্য বরাদ্দ করা জায়গায় চেয়ারে বসে ডেস্কটপ চালিয়ে কাজে মন দিলাম। হঠাৎই...."

_"হঠাৎই কি রক্তিম"? প্রশ্নকারী আমি।

__আমার দিকে তাকিয়ে রক্তিমের একজোড়া বিস্ফারিত চোখ। সেই অবস্থায় রক্তিম বলে উঠল,

--"কম্পিউটারে মুখ গুঁজে কাজ করছিলাম। মনটা রঞ্জনার দিকে পড়েছিল। ওর ফোন নাম্বারটা নেওয়া হয়নি। মনে মনে নিজেকে দুষতে লাগলাম। এইসব চিন্তার মাঝেই কিছু খুট খাট শব্দ কানে আসছিল। ঘাড় ঘুরিয়ে কিছুই দেখতে পেলাম না। কাজে মন দিলাম এই ভেবে আমি আর আমার ছায়া ছাড়া এ অফিসে কেউ নেই। হঠাৎই একটা ডেস্কে কম্পিউটার এর আলো জ্বলে উঠল। তার সাথে একটা গলা। নিশ্চিত করে বলতে পারি এ গলা আমার চেনা। রঞ্জনা কখন এল"!

--"আমাকে খুঁজছিলে, রক্তিম"?
--"তুমনে পুকারা অউর হাম চলে আয়ে"।
রঞ্জনা দূর থেকেই বলে উঠল।

--"আমার মাথায় চিন্তাদের ভিড়। কখন কি করে এল রঞ্জনা"!

__ "রঞ্জনা বোধহয় আমার মনের অবস্থা ধরে ফেলেছিল"। রক্তিম বলে ওঠে।

--"আমি তো সেই কবে থেকেই তোমার সাথে ছিলাম, রক্তিম। তোমাকে ছেড়ে যাইনি তো! আমি সেই কবে থেকেই এই অফিসের তের নাম্বার টেবিলটা দখল করে বসে আছি"।

__ রঞ্জনার কথা গুলো রক্তিম কিছুই বুঝে উঠতে পারল না। কি বলছে রঞ্জনা!

__ আবার রঞ্জনা, রক্তিমের কাছে এসে গা ঘেঁষে কানের সামনে মুখ নিয়ে এসে...

--"ভাবছো তো কি যা তা বলছি"!
--"কোনো দিনও রেজিস্টার খাতায় আমার সই দেখেছো"?

__রক্তিমের সে সব দেখার প্রয়োজন হয়নি কদাপি। তাই দেখেনি। তবে আজ ওয়াচম্যানের বলা কথাটা মনে পড়তেই চমকে উঠল সে। কাঠ হয়ে বসে আছে রক্তিম। মনে অনেক চিন্তা ভিড় করেছে তার। রঞ্জনাকে সে কোনোদিন তার সাথে অফিস থেকে বেরোতে দেখেনি। বা অফিস আসতেও দেখেনি। শুধু তার উপস্থিতি দেখেছে এই অফিসে। তবে কি রক্তিম যা ভাবছে তাই!

__ একটা বিকট আওয়াজ। তের নম্বর টেবিল থেকে কম্পিউটার টা আপনা আপনিই পড়ে যায়। এবার একটু যেন ভয় পায় রক্তিম।

--" আমার অপেক্ষার অবসান হয়েছে আজ"।
--"তুমি আমায় মুক্তি দিতে সাহায্য করবে, রক্তিম"।

__রঞ্জনার কথায় রক্তিম তোতলাতে তোতলাতে জিজ্ঞাসা করে,

--"আআআমি"।
--"কিকিকিভাবে"?
--"আমিই কেন"?

__ রঞ্জনা এবার বলে ওঠে,
--"শেষ ক'মাস এই অফিসে রাতের ডিউটিতে কেউ আসতে চাইত না। যে আসত, তারপর দিন বিদায় নিত। কারণ কেউ জানত না বা জানার চেষ্টাও করেনি। একমাত্র তুমিই এ কদিনে আমার বন্ধু হয়ে উঠেছ। তোমাকে সব বলা যায়"!

__ রঞ্জনার কথা শুনে রক্তিমের শরীরে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। মনে একরাশ প্রশ্ন ও জমে উঠল, কি এমন কথা যা তাকে বলা যায়!

-- "জানো রক্তিম আমিও তোমার মতো পার্ট টাইম জব হিসেবে কল সেন্টারে জব করতাম। পকেট মানির সাথে নিজের পড়াশোনা আর ফ্রেঞ্চ বিদ্যা রপ্তে ব্যস্ত ছিলাম। অনেক স্বপ্ন নিয়ে কোলকাতা এসেছিলাম"।

__ রঞ্জনা থামলে রক্তিম একটু সাহসে ভর করে বলে ওঠে,
-- "তারপর"?

__ রঞ্জনা আবারও বলা শুরু করে,

--" সব ঠিক ঠিক চলছিল। ছুটিতে ছিলাম সেদিন। বেসিক্যালি সবার ছুটি। এমারজেন্সি কাজের অজুহাতে বস আমায় অফিসে তলব করে। কিছুই বুঝিনি প্রথমটা। ভেবেছিলাম সবার তলব পড়েছে। অফিস এসে দেখি সারা অফিসে কেউ কোথাও নেই। আমি একা দাঁড়িয়ে আছি। এমন সময় বস কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে আমাকে কেবিনের দিকে যেতে ইশারা করেন। আমিও যাই। কাজের অছিলায় আমাকে ছোঁয়ার চেষ্টা করতে থাকে। সেই পরিস্থিতি চরম সীমায় পৌঁছায়। আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে রাক্ষস টা। তারপর সারা শরীর....."

_ "প্লিজ। চুপ করো"।
-- "আর শুনতে চাই না"!
--"পারছি না আর....."

__ রক্তিমের চিৎকার থামিয়ে রঞ্জনা বলে ওঠে,

--"সেদিন আমিও এর চেয়েও বেশী জোরে চিৎকার করেছিলাম। বাঁচার জন্য। কেউ শুনতে পায়নি। পশুটার অত্যধিক অত্যাচারে একসময় আমি নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ি। ক্ষুধাকাতর হিংস্র পশুটার শরীরের ক্ষুধা মিটলে আমার নিষ্প্রাণ শরীরটাকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। উন্মত্ত পশুর শরীরের জ্বালা ততক্ষণ মেটেনি যতক্ষণ না নিষ্প্রাণ শরীর টা....."

__ রক্তিমের তখন নিষ্প্রভ হবার উপক্রম। এসব কি শুনছে ও। এতক্ষণ রক্তিম, রঞ্জনার দিকে ভুলেও ভুল করে তাকায় নি। হঠাৎ চোখ পড়তেই দেখল, যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে রঞ্জনার দু'চোখ দিয়ে। প্রতিশোধ স্পৃহা।

__ রঞ্জনা আবার বলা শুরু করে,

-- "পশু টা প্রথমে আমার শরীরটাকে পোড়ানোর চেষ্টা করেছিল। সেদিন ও এরকম বৃষ্টি বাদলার জন্য পারেনি। তারপর নিজের এক পরিচিত রাজ মিস্ত্রি ডেকে ওই দেওয়ালে আমাকে পুঁতে দিয়েছে"।

__ রঞ্জনার নির্দেশ করা আঙুলের দিকে তাকাল রক্তিম। একটা ঘোরে তাকিয়ে আছে যেন। কি যেন একটা গ্রাস করেছে ওকে। বাইরে তখন বজ্র বিদ্যুৎ সমেত ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে। রক্তিম তাকিয়েই আছে দেওয়ালটার দিকে।

--"আমাকে মুক্তি দেবে তো রক্তিম"?
--"তুমি আমার বন্ধু "।
--"শাস্তি দেবে তো অপরাধী কে"?

__ রঞ্জনার কথা গুলো আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছে। আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না রক্তিম।

__আমরা এতক্ষণ সবাই চুপচাপ কিন্তু বিস্ফারিত নয়ণে সব শুনছিলাম। এই প্রথমবার আমি ইয়ার্কি না করে ব্যপারটার গুরুত্ব বুঝে বলে উঠলাম,

--"তারপর কি হল, রক্তিম"?

__ রক্তিম বলে উঠল,

-- " নর্মালি আমি অফিস থেকে সকাল আটটার সময় বেরিয়ে যাই। সেদিন সময় অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও বেরোইনি দেখে ওয়াচম্যান ডাকতে এল। এসে দেখে আমি নাকি মেঝেতে পড়ে। মুখে চোখে জল দিয়ে জ্ঞান ফিরিয়ে আনে। জ্ঞান ফিরলে দু'টো জিনিস আমাকে অবাক করে"।

_ "কি কি"?
__ আমাদের সবার প্রশ্নে রক্তিম বলে ওঠে,

--"তের নাম্বার ডেস্ক অক্ষত অবস্থায় আছে"।

-- "আর দ্বিতীয় টা"?
__ আবারও সমবেত কন্ঠে প্রশ্ন করি।

--" ওয়াচম্যান এর কাছের রেজিস্টার খাতা চেক করে কোথাও রঞ্জনার নাম পাইনি"।

__ রক্তিম থামলে আমি বলে উঠি,

-- "তাহলে বডি টা"!

-- "একশ ডায়াল করলে তৎক্ষণাৎ পুলিশ আসে ওই অফিসে। ঘটনার বিবৃতিতে সব জানাই। দেওয়াল খুঁড়ে একটি কঙ্কাল উদ্ধার হয়"।

__ আবার রক্তিম চুপ। আমি আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ি,

-- "বডি টা যে রঞ্জনার সেটা কি প্রমাণিত "?

__ রক্তিমের জবাব,

-- "অফিসের ফাইল পত্র ঘেঁটে রঞ্জনার ডিটেলস উদ্ধার করে পুলিশ। ওর বাড়ি থেকে তলব করা হয়। বডির ড. এন. এ টেস্ট হয়। পজিটিভ রিপোর্ট মেলে"।

__ আবার আমি,
" আর শয়তান বস! তার কি হ'ল"?

--"কঙ্কালের সমস্ত রকম ফরেনসিক টেস্ট করে প্রমাণিত হয় রঞ্জনার উপর হওয়া বারবার অত্যাচারের কথা। সেদিনের উপস্থিত থাকা রাজ মিস্ত্রির সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে শয়তান বসকে গ্রেপ্তার করে শ্রীঘরে পাঠানো হয়। রাজসাক্ষী হওয়ার দরুন রাজ মিস্ত্রির লঘু সাজা হয়"।

__ রক্তিম একটু থেমে আবার যোগ করে,

-- " এই জন্য তোকে না বলে কয়ে বেপাত্তা হয়ে গিয়েছিলাম। সেই ট্রমা কাটিয়ে একটু স্বাভাবিক হতেই তোর সাথে যোগাযোগ করি"

-- "বুঝলাম"।
--"কোলকাতা ফেরত যাবি তো"?
--"চাকরির অনেক প্রস্তুতি বাকি"!

__ আমার ছোঁড়া প্রশ্নে রক্তিম আমাকে কার্যৎ অবাক করেই উত্তর দেয়,

-- "আর ফিরব না, তিথি"।
--"তুই ফিরে যা কোলকাতা"।
--"এখানে যা হোক একটা কিছু করব"।

__ পরদিন সকালে এক ঝুড়ি মন খারাপ নিয়ে হাওড়া ট্রেনে চড়েছিলাম। বন্ধু বিচ্ছেদ এর দুঃখ নিয়ে ফিরছিলাম। স্টেশান অবধি রক্তিম এসেছিল। দু'জনের চোখের জল লুকিয়েছিলাম, দু'জনের কাছ থেকে।

__ একদিন রাতে মেসের বন্ধুদের, রক্তিমের সেই হাড় হিম করা গল্প শোনাচ্ছি। ফোন টা বেজে উঠল। এত রাতে কে আবার ভেবে কলটা রিসিভ করতে গিয়ে ঠোঁটের কোনে হাসির রেখা ফুটে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নামটা দেখে। কলটা রিসিভ করতেই, অন্য প্রান্ত থেকে ঘড় ঘড় শব্দ ছাড়া কিছুই শুনতে পেলাম না।

__ পরদিন সকালে রক্তিমকে অনেকবার ফোনে ধরার চেষ্টা করলাম। যত বারই ফোন করি ততবারই ঘড় ঘড় শব্দটাই কানে ভেসে আসে। তাহলে.....

খেলনা গাড়িতে স্বপ্ন
- কিরণময় নন্দী

পেটে তোর বাচ্চা গো বউ
পারবিনা হাঁটতে মোর সাথে
বছর তিনের পিঙ্কিও পারবে না
একসাথে হেঁটে যেতে।

ছশো মাইল সে অনেক দূর
রেলে যেতে লাগে একদিন
এতদূরে না খেয়ে থাকবো কেমনে
মোদের দশা একেবারে সঙ্গীন।

জানিস বউ ছোটবেলায়
আমি দুষ্টু ছিলুম ভারি
ইস্পাতের ঐ তিনচাকায়
বানিয়ে ছিলুম এক গাড়ি।

সবার সেকি হইচই
আমার তখন পোয়াবারো
তিনচাকাতেই এ গাঁ ও গাঁ
যতই টানতে পারো।

বিষের ভয়ে বন্ধ রেল
পথঘাট শুনশান
দেখ না বউ বানিয়েছি এক গাড়ি
সব মুশকিল আসান।

বসবি তুই সাবধানে
পিঙ্কিকে কোলে নিয়ে সাথে
কষ্ট করেই টানবো গাড়ি
ওই কালো পিচের পথে।

ওরে বউ সহ্য কর
ব্যথা হয় কি তোর পেটে
আমরা তো গরীব মানুষ
কষ্টটা মেনে নে মাথা পেতে।

তেরো রাত কাটলো রে বউ
পথে পথে হেঁটে হেঁটে
ঐ দেখ সেই মাধবীলতা
আমার এককাটা জমির কোণেতে।

পিঙ্কি মা আর নেই ভয়
বেঁচে আছি সবে
আমরা তো গরীব মানুষ
এই দুর্যোগে কি আর হবে?

ভালবাসা
কলমে - শৈলেন মন্ডল

সেদিন দেখা হল তোমার শহরে
কোন এক অজানা পথের বাঁকে,

দৃষ্টি নিক্ষেপ হলো সংগোপনে
এক নিমেষের পলকে।

তারপর গলিপথ বেয়ে
অনেকদূরে দেখা হলো সেদিন,

এতোদিন পর মনে হলো
এলো বুঝি ভালবাসার সুদিন।

সুধামাখা অাভ্যন্তরীন দৃষ্টিতে
যেন মধূর পলক না পড়ে,

কতোকালের অব্যাক্ত যন্ত্রনা বুঝি
মলিনতার ভারে মরে।

মনেতে জাগে নতুন অনুভূতি
আবেশে দিন কাটে হয় আনন্দযাপন,

মরা নদীতে বান ডাকে তাই
শুরু হয় ভালবাসার বীজবপন।

নতুন আলাপচারিতা আর সুখানুভূতির যতো বিনিময়,

জীবনটা তোমায় পেয়ে
ভালবাসায় হলো পূর্ণতাময়।

কতো আশায় বুক বাঁধলাম
শত অনুপম হরষে,

তোমায় পেয়ে ধন্য জীবন
ভেসে যাই সুখ- স্বপ্নের দেশে।

১৭.০৫.২০

ছোট্ট পৃথিবী
- কিরণময় নন্দী

আমি সূর্য হতে চেয়েছিলাম।
প্রখর তাপে সংকীর্ণতাকে ঝলসে দিয়ে উদারতা চেয়েছিলাম সমগ্র হৃদয়ে।
ওরা ভয়াল কালো মেঘ হয়ে ঢেকে দিয়েছে বারেবারে।

আমি বিস্তৃত আকাশ হতে চেয়েছিলাম।
আমার সীমাহীন ব্যাপ্তি নিয়মের বেড়াজাল কেটে সমগ্র স্বত্তা এক করতে চেয়েছিলাম।
ওরা সুউচ্চ অট্টালিকা আর বিভাজনের কাঁটাতারে আমাকে বিভক্ত করেছে বারেবারে।

আমি পাহাড়ী খরস্রোতা নদী হতে চেয়েছিলাম।
তীব্রবেগে জঞ্জালময় মলিনতা দূর করে স্বচ্ছতা চেয়েছিলাম সমাজের।
ওরা মোহনার চর হয়ে আটকে দিয়েছে আমার গতি বারেবারে।

আমি চেয়েছিলাম উত্তাল সমুদ্র হতে
তরঙ্গ তরঙ্গ হয়ে আছড়ে পড়তে চেয়েছি বালুকাময় পুলিনে--গর্ভ থেকে আনতে চেয়েছি রাশি রাশি প্রবাল।
ওরা আধুনিক প্রাসাদপ্রম তরী ভাসিয়ে আমার বুক ছিঁড়ে আনছে তরল-সোনা।

আমি চেয়েছিলাম স্নিগ্ধ সমীরণ হয়ে উড়ে বেড়াবো এক উপত্যকা থেকে অন্য উপত্যকায়। ঘুরে বেড়াবো নানান কুসুম-কাননে।ছুঁয়ে যাবো সব সুন্দরী ফুলের তাজা শরীর।
ওরা দূষণের করাল গ্রাসে বিষিয়ে দিয়েছে আমার দেহ।ধূলিকনায় ভারী করেছে আমার শরীর।

আমি সবার পৃথিবী হতে চেয়েছিলাম
ওরা আমার-আমার নেশায় টুকরো করে তৈরী করেছে সংকীর্ণ একটুকরো পৃথিবী।

মেসবাড়ি
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

__সময়টা ঠিক প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে শুরু হয়, মেসবাড়ি কালচার। কাজের জন্য কোলকাতায় আগত হয় বহু মানুষ, দূর দূরান্ত থেকে। তাদের তখন মাথা গোঁজার ঠাঁই হিসাবে ছিল, মেসবাড়ি। মেসবাড়ি অতীতে যা অর্থবহন করত তা এইরূপ, ইট এর তৈরী বিশাল দোতালা বা তেতলা বাড়ি। কোনোটার বারান্দা আছে বা নেই। সেই অর্থে বিশেষ চাকচিক্য ছিল না। ঘর জুড়ে পাতা থাকত, তক্তপোশ। এক একটি ঘর দখল করে থাকত প্রায় দশ থেকে বারো জন।

__মেসবাড়ির প্রধান ঠিকানা ছিল উত্তর কোলকাতা। চল্লিশ -পঞ্চাশ দশকের দিকে প্রধাণত আমহার্স্ট স্ট্রিট, মুক্তারাম বাবু স্ট্রিট; কলুটা স্ট্রিট; কলেজ স্ট্রিট; মানিকতলা; শিয়ালদহ চত্বরে ছিল মেসবাড়ির রমরমা। কারন ছিল একটাই। মেসবাড়ির দূরত্ব থেকে স্কুল-কলেজ-অফিস-আদালত এসবের দূরত্ব ছিল পায়ে হাঁটা।

__ট্রাম, কফি হাউস; বইপাড়া এসবের মতোই পুরোনো কোলকাতার একচেটিয়া ঐতিহ্য দখল করেছিল, মেসবাড়ি। মেসবাড়ি গুলির বৈশিষ্ট্য ছিল অন্যরকম। ব্যক্তি বিশেষে চারিত্রিক বৈষম্য, পছন্দ -অপছন্দের মিল না হলেও একছাদের নীচে মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কাটিয়ে দিতেন মেসবাড়িতে থাকা বাসিন্দারা।এক সুরে বাঁধা পড়তেন সক্কলে।

___ কতরকমের বিশিষ্ট তথা জ্ঞানী মানুষের সাথে আমাদের পরিচয় ঘটে, মেসবাড়িতে। শরদিন্দুর ব্যোমকেশ এর সাথে আমাদের সবার সাক্ষাৎ ঘটে হ্যারিসন স্ট্রিট, যার বর্তমান নাম মহাত্মা গান্ধী রোড এর মেস বাড়িতে। শুধু আমাদের সাথে কেন! ব্যোমকেশ-অজিতের আমরণের বন্ধুত্বের সাক্ষী ও ছিল এই মেসবাড়ি। দুঁদে গোয়েন্দার ছদ্মবেশে আত্মগোপনের জায়গা ছিল এই মেসবাড়ি।

__আবার জীবনানন্দ দাশের কথাই ধরুন। তাঁর নেশা ছিল 'প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং' এর জানালা দিয়ে ট্রাম দেখা। তিনি তো এই মেসবাড়িতেই তাঁর 'বনলতা সেন' কে খুঁজে পান।

__যাঁর কথা না বললেই নয়। মেসবাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা সেই ভদ্রলোক। তিনি তো মেসবাড়িকে আরামের জায়গা বানিয়ে দিয়েছিলেন। মেসবাড়ি সম্পর্কে তাঁর উক্তি,
--" মুক্তারামে থেকে, তক্তারামে শুয়ে; শুক্তারাম খেয়েই তিনি শিবরাম চক্রবর্তী হয়েছেন"।

__এরকমও শোনা যায় তিনি নাকি মেসবাড়ির দেওয়াল রঙ করতে দিতেন না। তাঁর আস্তানা ছিল ঠনঠনিয়া কালী বাড়ির একটি মেসবাড়ি।

__'সাড়ে চুয়াত্তর' থেকে 'বসন্ত বিলাপ' বাংলা সিনেমার বিশেষ জায়গা দখল করেছিল, মেসবাড়ি। খেলাধূলা, রাজনৈতিক তরজা এমনকি বিপ্লবীদের লুকিয়ে থাকার ঘাঁটিও ছিল এই মেসবাড়ি।

__কালচক্রে বয়সের ভারে এবং সঠিক তত্ত্বাবধানের অভাবে মেসবাড়ির অস্তিত্ব আজ বিলুপ্ত প্রায়। মেসবাড়ির জায়গা দখল করেছে, 'পি জি'। হারিয়ে যাচ্ছে সেই নস্টালজিয়া। হয়তো কিছু জায়গায় ধুঁকছে এই মেসবাড়ি।

__আজ বিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় এসে পড়েছি আমরা। সৌভাগ্যক্রমে আমার এই মেসবাড়িতে থাকার একটা অভিজ্ঞতা হয়েছিল বটে। অতীতে মেসবাড়ি দখলে থাকত শুধুমাত্র পুরুষের। কিন্তু না। এই বিংশ শতকে অনেক পাল্টেছে পুরোনো কোলকাতা। মহিলা মেসবাড়ির অস্তিত্বের দেখা মিলবে উত্তর কোলকাতায়।

__উচ্চ শিক্ষার গন্ডি টপকে একরাশ ভবিষ্যৎ স্বপ্ন চোখে নিয়ে কোলকাতায় পাড়ি দিলাম। চাকুরীর সন্ধানে। তার আগে অবশ্য মাথা গোঁজার ঠাঁই ঠিক করে গেছি। আজ পাকাপাকি ভাবে বাক্স -প্যাঁটরা, তলপিতল্লা নিয়ে হাজির হয়েছি মেসবাড়িতে।

__দ্বিতলে উঠে বারান্দা টপকে একটি ঘরে জায়গা দখল করলাম। জানালার পাশে, কোনের দিকে। তিনটি চৌকি, এ ঘরে। অপর ঘরে রয়েছে ছয়টি। দুটি ঘর এবং বারান্দা জুড়ে আমাদের মেসবাড়ি। শ্যামবাজার থেকে এগিয়ে বাগবাজার বাটার ঠিক অপরদিকে অবস্থান করছে আমাদের মেসবাড়ি।

__সন্ধ্যায় মেসের বাকি সদস্যাদের সাথে অভিবাদন ও প্রত্যভিবাদন হল। সর্বমোট আমরা আটজন। আমি ছাড়া বাকি সাতজন ছিল আমার সিনিয়র এবং কর্মরতা। আমিই ছিলাম একমাত্র বেকার।

__আস্তে আস্তে মেসের সবার সাথে বেশ সখ্যতা হয়ে গেছে। আমিও এখন চাকুরীর প্রস্তুতির সাথে কয়েকটি টিউশন করি। হাত খরচ উঠে যায়।

__মেসের অনেক নিয়মকানুন ছিল। মেস মালকিন ছিলেন বেশ শক্ত মহিলা। তাঁর নিয়মের বাইরে কেউ চলতে পারত না। খাবার পছন্দ না হলেও নষ্ট করা যেত না।

__আমরাও ছিলাম সেরকমই বদমাইস। প্রথম প্রথম আমার ঘরের জানলার কার্নিশে খাবারের স্তূপ করে রাখতাম। বিড়াল বা কাক এসে সেই খাবারে ভাগ বসাত। সেই রাস্তা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মেসের রাঁধুনি, মেস মালকিন কাকিমার চামচা, শিখা দির কারণে। কাকিমার কানে সে খবর যেতেই, আমাদের সবার তলব পড়েছিল। সেটির উদ্ধৃতি নিষ্প্রয়োজন এখানে।

___একদিন সন্ধ্যায় সবাই বারান্দায় বসে আড্ডা দিচ্ছি। সবথেকে সিনিয়র, রমাদি বলে উঠল...
--"শিখাদিকে একটু জব্দ না করলে হবে না।"
--"খুব চামচাগিরি করে, কাকিমার "।

___আমরা সবাই একসাথে বলে উঠলাম,
--"কিভাবে"?

___শোভনা দি হঠাৎই বলে উঠল,
--"শিখাদির ভুতের ভয় আছে"।

___আবারও একসাথে,
--"তুমি কি করে জানলে"?

___শোভনা দি জানাল,
--"রাতে ও সচরাচর বাথরুমে ওঠে না। বারন্দায় মাঝে মাঝে.... সাথে রাম নাম জপে"।
--"আমি একদিন বারান্দায় পায়চারি করতে গিয়ে ব্যপারটা লক্ষ্য করেছি"।

___আমি তোতলে গিয়ে ঢোঁক গিলে বললাম,
--"ভুউউউউউত"।

___ওটিতে আমার বেশ ভয়।

___রুমাদি বলে উঠল। পেশায় ডাক্তার।
--"তুই ভয় পাস বা ভয় পাচ্ছিস। মনে হচ্ছে"।

___লজ্জায় পড়ে গিয়ে বললাম,
--"না মানে ইয়ে। মানে বলছিলাম কি......"

__কথা আমার শেষ হল না। শম্পা দি এবার বলে উঠল,
--"কি তোতলামি করছিস তখন থেকে"!
--"আমাদের সাথে থাকবি তো নাকি"!
--"একটা কাউন্টার টেনে নিস। ঠিক হয়ে যাবি"।

___কাউন্টার কথাটা শুনেছিলাম, কলেজে ছিলাম যখন। তাই মানে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। আমি বলে উঠলাম,
--"আমি ওসব খাই টাই না"।

__মেসের সবথেকে ডেসপারেট দিদি। পেশার আই.টি সেক্টরে কর্মরতা। রশ্মি দি,
--"ওরে আমার চাঁদ"।
--"মেসবাড়ির জীবন টা এখন উপভোগ না করলে, পরে যে পস্তাতে হবে"।

__মনে মনে ভাবছি কোথায় এসে পড়লাম। বুঝলাম এখান থেকে নিস্তার নেই।

___বাকি দুই দিদি, মনামী আর সৌমী। এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। বলে উঠল,
--"প্ল্যানটা কি তাহলে"?

__ শোভনা দি বলল,
--"আজ রাতেই মিশন শিখা দি"।

__সবাই ঘুমিয়ে পড়লে, প্ল্যান মাফিক আমি আর সৌমী দি আমাদের ঘর থেকে বেরিয়ে যাই। কারন এই ঘরের একটি চৌকি তার জন্য বরাদ্দ ছিল।

__মাঝরাতে আমাদের পরিকল্পিত পরিকল্পনার পরিসমাপ্তি ঘোষনা করা হয়। শিখা দিকে সেই রাতে মারাত্মক ভাবে ভুতের ভয় দেখানো হয়েছিল। মনামী দিকে ভুতের ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দেখা গিয়েছিল। তার অবিশ্বাস্য অভিনয় শিখাদির সাথে আমাকেও ভয় পাইয়ে দিয়েছিল।

__পরদিন সকালে। কাকিমার কাছে সব ব্যক্ত করলে কাকিমা, শিখাদি কে এক ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে দেয়। শিখাদি কি একটা বলতে যাচ্ছিল, আমরা খাবার আনতে যাওয়ায় চুপ করে গেল।

__এরপর থেকে শিখাদি একটু চুপচাপ হয়ে যায়। আপন মনে কি যেন চিন্তা করে। আমরাও ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে যার কাজে। এরমাঝে আমিও কয়েকটি চাকুরীর পরীক্ষা দিয়ে ফেলেছি।

___সেই রাতের পর বেশ কিছু দিন কেটে গেছে। আড্ডাও অনেকটা স্তিমিত হয়ে গেছে। তবে খুব বেশী দিন সেই আড্ডা স্তিমিত থাকল না।

__এক শনিবারের দিকে সন্ধ্যায় আবার আড্ডার আয়োজন হল। তার উপর আজ আবার ডাক্তার রুমাদি র জন্মদিন। আড্ডায় ঠিক হল রাতে পার্টি হবে। শিখাদিকেও সাথে নেব। রুমাদি এও বলল,
--"তোদের জন্য আজ একটা সারপ্রাইজ আছে"।
--"রাতে"।

__রাতে কাকিমার দেওয়া অখাদ্য রুটির সাথে দেওয়া ঢেড়শ আলুর তরকারির বিদায় জানালাম সেই জানলার কার্নিশে রেখে। তার আগে রাতের জন্য আমাদের খাবার মজুত করা হয়েছিল পরিকল্পনা মতো। কাকিমা ঘুমিয়ে পড়লেই শুরু হবে আমাদের তান্ডব।

__যথাসময়ে কাকিমা ঘুমিয়ে পড়লে, মেসবাড়ির দু'টি ঘরের সবচেয়ে বড় ঘরে পার্টির আয়োজন হল। কে. এফ.সি থেকে আনা খাবার আর ঠান্ডা পানিয় সহযোগে উদর পূর্ণ করল সবাই।

__শিখাদি কে হঠাৎই রশ্মি দি চেপে ধরল,
--"যেদিন ভুতে তোমাকে ভয় দেখিয়েছিল। পরদিন সকালে কাকিমাকে কি বলছিলে তুমি"?
--"আমাদের দেখে চেপে গিয়েছিলে যে বড়ো "।

___আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম সে কথা। রশ্মিদি'র কথায় সবাই নড়ে চড়ে বসল। সবাই একসঙ্গে চেপে ধরলাম। একা শিখাদি'র পক্ষে আমাদের আটজনকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হ'ল না। যা শুনেছিলাম! আট জোড়া চক্ষু বিস্ফারিত হয়েছিল বৈকি। সেটি ছিল এরকম....

__এই মেসবাড়ির একটি ঘরেই একজন সিলিং ফ্যানে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। সে অনেকদিন আগের কথা। মেসেই ভাড়া থাকত। কারণ আজও অজানা। তবে সেই মৃত্যুর কারণ যে যার নিজের মতো করে ধারণা করে নিয়েছিল। তার অতৃপ্ত আত্মা এই মেসে নাকি এখনও ঘোরে।

__কাকিমাকে শিখা দি এটাই বলতে চেয়েছিল,
--"অনেকবছর পর সে এসেছিল'।

__রুমা আর রশ্মি দি অবস্থাটা হাল্কা করে বলল,
--"ওটা আমরা তোমাকে ভয় দেখিয়েছিলাম'

__বলেই হো হো করে হেসে ওঠে।

__শিখাদি তখনও চুপ। শুধু বলল,
--"সে আছে এই মেসবাড়িতেই"।

__রুমা দি বলল,
--"আছে যদি, প্রমাণ হোক"।

__আমি একটু ভয় খেয়েই বললাম,
--"প্রমাণ"!
--"কি কি করে"?

__"প্ল্যানচেট"
রুমাদি বলল,
--"প্ল্যানচেট করে তার আত্মাকে ডাকাব আমরা। যদি সে থাকে তো আসবে। জবাব দেবে আমাদের প্রশ্নের"।

__আমি না পারছি সেই জায়গা ছেড়ে উঠতে। না পারছি ভয়ে ঘরে যেতে।

___ যেই না বলা অপনি শুরু। সবাই গোল করে বসলাম। এখানে বলে রাখি শিখাদি অনেক আগেই চলে গেছে। এখন আমরা আটজন একটা বৃত্ত বানিয়ে বসেছি। মাঝে একটা বড়ো মোমবাতি। সবাই আত্মসংযম করছি। অন্যমনা হলে আত্মা আসবে না। ভয়ে আমি শোভনাদি'র হাত খুব জোরে চেপে বসে আছি। স্নেহের কারনে শোভনা দি সেটি মেনে নিয়েছে।

__অনেকক্ষণ সময় অতিক্রম করল। আত্মার দেখা নেই। আমারও আশাহত হয়ে বৃত্ত ভেঙে উঠে পড়লাম। রাত ভোর হতে চলল। ক্লান্তি গ্রাস করেছে সকলকেই। বিছানায় পড়লেই ঘুম। সবাইকে শুভরাত্রী জানিয়ে বিছানায় এসেই শরীরটা এলিয়ে দিলাম।

__শিখাদি নাসিকা গর্জনে ব্যস্ত। বিষম আওয়াজে ঘুম আসতে দেরী করছিল। এদিক ওদিক ছটফট করতে করতে চোখের পাতা এক হয়েছে....

___মেসবাড়ির নীচ থেকে রজনী গন্ধার মিষ্টি সুবাস ভেসে আসছে। আধঘুমে মনে পড়ল, মেসের নীচে অনেকগুলো দোকান আছে। সারি বেঁধে। যেখানে সারিবদ্ধ ভাবে সাজানো আছে মড়ার খাট। প্রতিটি দোকানে রয়েছে মড়া সাজানোর বিস্তর সরঞ্জাম। সেখান থেকেই আসছে রজনী গন্ধার গন্ধ। দোকান গুলির সাথে দোকানিদের ও ছুটি নেই। 'কার কখন ডাক আসে' !

____গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন পুরো মেসবাড়ি। এমনসময়....

___আমি যে চৌকিটি দখল করেছিলাম। তার মাথার ওপর ছিল একটি সিলিং ফ্যান। সবার চৌকির জন্য একই ব্যবস্থা। সিলিং ফ্যানের ওপর থেকে কি একটা নেমে এসে আমাকে বারবার বিরক্ত করছে। বারবার হাত দিয়ে সরানোর চেষ্টা করছি। বিরক্ত হয়ে চোখ জোড়া হালকা ভাবে খুলেছি.....

__একটি নারী মূর্তি। সিলিং এর ওপর থেকে আমার দিক বরাবর ঝুলে আছে। তার চুলগুলো আমাকে বারবার বিরক্ত করছে। আমি উঠতে চেয়েও পারছি না। অদৃশ্য শক্তি আমাকে চেপে ধরে রেখেছে।

___ অনেক কষ্টের মধ্যেই বলে উঠলাম,

--"কে তুমি"?
--"কি চাও"?

___নারী মূর্তি টি খিলখিলিয়ে হেসে উঠল। যত হাসছে তত তার গা থেকে মাংস - চামড়া খসে গিয়ে একটা কঙ্কাল মূর্তি ধারণ করছে সে। এলো চুল উড়ে চলেছে অনবরত। এবার একটা অট্টহাসি হেসে উঠল। মুখের ভিতরে চোখ যেতেই, জিহ্বা বিহীন মূলোর মতো দাঁত ওয়ালা একটা মুখমন্ডল দর্শন করলাম। যা ছিল অর্জুনের বিশ্বরূপ দর্শনের থেকেও বীভৎস।

___আমাকে আরও জোরে চেপে ধরেছে যেন। চাইলেও সে বন্ধন মুক্ত করা আমার সাধ্যি নেই। হঠাৎই কর্কশকণ্ঠ বলে উঠল,

--"তোরা আমাকে প্ল্যানচেট করে ডেকেছিলি।"
--"আমি এসেছি"।

__আমি কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে চেষ্টা করলাম,

--"আমি তোমায় ডাকিনি, রুমা দি......"

__কর্কশ গলা বলে উঠল,

--"তুই সাথে ছিলি"।

---"নরম মনের মানুষকে আমার বেশী পছন্দ "।

___বলেই আমাকে যেন আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরল।

___আমি প্রাণপণে চেষ্টা করছি তার বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করতে। বিফল হচ্ছি। নারী মূর্তি আর এখন আগের সেই নারী মূর্তি নেই। একটা আস্ত কঙ্কালের রূপ ধারন করেছে। সিলিং ফ্যান থেকে ঝুলছে তার সেই কঙ্কাল মূর্তি।

___আমি সেই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছি না। এদিকে আমার শরীরের সাথে পুরো বিছানা ঘামের কারণে ভিজে জবজব করছে। মনে হচ্ছে সদ্য স্নান করেছি। বিছানা ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা আমার হচ্ছে না। সেই কঙ্কাল সিলিং থেকে ঝুলে আমার বুকের ওপর এসে সংযোগ স্থাপন করেছে, মাংস বিহীন লম্বা আঙ্গুলের দ্বারা। আজ আমার 'রাম নাম সত্য হ্যায়'। এমন সময়.....

___কাকিমা সমেত আটটি মুখমন্ডল আমার দিকে ঝুঁকে পড়েছে। জল ঝাপটান চলেছে আমার উপর। চোখ মেলেই এইসব দেখি এবং শুনি প্রায় এক ঘন্টা টাক আমি অজ্ঞান।

___জ্ঞান ফিরতে একটু ধাতস্থ হয়ে ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ননা করি। সাথে এও জানাই,

--"এই ভুতুড়ে মেসে আমি আর থাকব না"।

___হঠাৎ শিখাদি সবাই কে অবাক করে দিয়ে বলে,

__আমার জায়গাটি আগে দখলে ছিল ওই অতৃপ্ত আত্মার। এই জায়গা কেউ বেশীদিন দখল করে থাকতে পারে না। যেই আসে, সে বেশীদিন টিকতে পারে না।

___শিখাদি'র কথা শোনার পর আর থাকার কোন কারণ খুঁজে পাইনি আমি। সেইদিন ই ভুতুড়ে মেসবাড়ি ত্যাগ করি। পরে শুনেছিলাম, আস্তে আস্তে সেই মেসবাড়ি সবাই ত্যাগ করেছে। শিখাদি ও বাড়ি চলে গেছে। মেসবাড়ির বারান্দা ভেঙে পড়েছে। সেটি এখন ভুতুড়ে মেসবাড়িতে পরিণত হয়েছে। রাতের দিকে অনেকরকম আওয়াজ কানে আসে মেসের নীচের দোকানিদের।

__মেসবাড়ি ভগ্নপ্রায় হলেও, মেসবাড়ির নীচে মড়া সাজানোর দোকানগুলি আজও বতর্মান। 'কখন কার ডাক আসে'!

দুই মুখোশ কাহিনী
- কিরণময় নন্দী

বাগমুন্ডির কোল ঘেঁষে ছোট্ট গ্রাম চরিদা।একদিকে ঝাড়খন্ড সীমানা অন্যদিকে মুরগুমা জলাধারের মৃদুমন্দ সমীরণ।
মুরগুমা নেচার ক্যাম্পে ঘুরতে আসা পর্যটকদের অযোধ্যা পাহাড় টপকে বামনি ফলস পেরিয়ে বাগমুন্ডি ছুঁয়ে নেমে আসতে হয় এই গ্রামে।
দেশবিদেশের কতোমানুষ ছুটে আসে বাংলার ঐতিহ্য-সংস্কৃতির নিজস্ব ঘরানা ছৌ মুখোশের টানে।
শিল্পীদের নিপুনহাতে তৈরি মাদুর্গা, গণেশ, কার্তিক, অসুর আরও কতো পৌরাণিক চরিত্রের মুখোশ।
গর্জনতেলে চকচক করছে প্রতিটি 'মাস্ক'।
চরিদার সেই নিখুঁত 'মাস্ক' শিল্পী ক্ষুদ্র আণুবীক্ষণিক ভাইরাসকে মোকাবিলার জন্য 'মাস্ক' পড়েছে নিজের নাকেমুখে।
টানা চল্লিশদিনের থমকে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে প্রকৃতির কোলে এই ছোট্ট হস্তশিল্প গ্রামে।
পৃথিবীর মঞ্চ কাঁপানো ছৌ মুখোশে ধূলো পড়ছে।
চরিদার অদূরে স্বয়ম্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা সেলাইমেসিনে তৈরী করছে কাপড়ের দ্বিস্তরীয় মাস্ক।
মুখোশ বানানো মানুষগুলো জীবন-সংগ্রামে মুখোশ পড়ে কাটাচ্ছে রাত্রি-দিন।
দীনু বাউড়ির দোকানে আদিবাসী সাজে দুই মুখোশ খুব কাছাকাছি ঝুলছে। চুপিসাড়ে ভালোবাসার কথা কইছে ওরা। চল্লিশদিন ওদের কাছে কম তো নয়। নইলে এতদিনে ভিন্ন মানুষের হাত ধরে ওদের আলাদা ঠিকানা হয়ে যেতো....

প্রেমময়
কলমে - শৈলেন মন্ডল

তুমি এক সুরের মোহময়ী মোর্চ্ছনা
হেমলীনের বাঁশির টানে মন হয় আনমনা,

উদাসী বাঁশির টানে যাও ভেসে
মনেতে সুখের পরশ যেখানে মিশে।

তুমি এক দুরন্ত বল্গা হরিণ
প্রেমের জোয়ারে ভাসো সারাদিন,

খুঁজে বেড়াও মনের মতো মন
যে করবে শুধু তোমার যতন।

তুমি এক দিকভ্রান্ত রাতের উল্কা
হাজার তারার মাঝে বেহিসেবি ঝল্কা,

কেউ নেয় না তোমার খোঁজ
তবুও রয়ে গেলে আজও অবুঝ।

তুমি এক অমূল্য রত্ন সমাহার
ভালবাসার জন্য করো হাহাকার,

কদর চেনে না যে মানুষ বন্য
পিষে মরো শুধু তার জন্য।

তুমি এক ভরা জোয়ারের চিরযৌবনা নদী
ছাপাও দুকূল প্রেম আকুলতা পাও যদি,

মোহনায় যাও যদি সাগরে মিশে যেতে,
যদি ভালোবাসা পাও মনের অজান্তে।

তুমি এক ঝড়ের আগুন পাখি
কলতানে শুধু কর ডাকাডাকি,

সকালের নীলাকাশে তুমি হাসো
প্রেমের পূর্ণতার আশায় মহাশুন্যে ভাসো।

তুমি এক ফাগুনের রাঙা পলাশ
প্রেমে ভাসবে বলে কর উল্লাস,

বসন্তের কোকিল তাই আজও জানে
প্রেমময় জীবনে শুধুই বাঁচার মানে।

১২.০৫.২০২০

হ্যাপি মাদার্স ডে
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

-- "গাছ টা কাটছো কেন, কাকু"?
--"বছর ঘুরে কত্ত আম হয়"!
--"অমন করে কি দেখছো"?

__স্কুলের মাইকে অ্যানাউন্সমেন্ট চলছে। পর পর ইভেন্টের।

__ইভেন্ট শেষে চলছে, প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় স্থানাধিকারীর নাম ঘোষনা। একে একে গলায় পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে সোনা-রূপো-ব্রোঞ্জ এর মেডেল। সার্টিফিকেট সমেত সুকুমার রায় বা উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর কিশোর সাহিত্য।

__ মাঠের এক কোনে বসে বালিতে আঁচড় কাটছে পিকলু। তার সংখ্যা এখনো আসেনি। ততক্ষণে মা নিশ্চয়ই....

__অপেক্ষারত পিকলুর নাম ঘোষিত হল। সায়ন্তন মুখার্জী। নির্দিষ্ট জায়গায় গিয়ে দাঁড়ল।

__ অন ইয়োর মার্ক!
__রেডি। স্টেডি।
__গো....

__আজ তাকে প্রাইজ জিততেই হবে। নিজের জন্য না হলেও মা'র জন্য। বিশেষ দিন আজ।

__লাল ফিতে ভেদ করে সবার আগে ফিনিশিং লাইন ছুঁয়ে ফেলল পিকলু। জ্বলজ্বল করছে চোখ দুটো। পেরেছে সে।

__গলায় সোনার মেডেল, সার্টিফিকেট; সুকুমার সমগ্র সমেত দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ি ফিরল।

--"মা! ও মা!"
--"পেরেছি আমি"।
--"গেলে না যে বড়"!

__সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে, দালানে পা দিতেই!

__সবাই ওকে দেখছে। ভিড় একটু ফাঁকা হতেই! ও কি!

__আর একটু এগোলো।

--"তুমি তো কথা দিয়েছিলে মা"!

__দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।

__অনেকক্ষণ থেকে পুকুরের পাড়ে মেডেল টা হাতে চেপে নিয়ে বসে আছে। একটা ঠান্ডা হাওয়া তার মুখে এসে লাগল।

__ একটা শরীর পাশে এসে বসল। ভাঙা ভাঙা গলায়,

-- "কেন পিকলু"?
--"কেন তোর মা..."?

এসো উমা
- প্রসেনজিৎ ঘোষ

(মাতৃ দিবসে মা কে শ্রদ্ধা জানিয়ে )

ওমা উমা !
এলে কখন
স্বর্গ থেকে
ছেলের কাছে?
রাঙা চরণ
রাখো মাগো
মোর বুকের মাঝে
অশ্রু জলে
তোমার চরণ
দেবো ধুয়ে!
ওমা উমা
এলে কবে
স্বর্গ থেকে?
বসো মাগো
চৈকী'পরে
মাটির পাত্রে
ছাগের দুধ
দেবো খেতে
গরীব মতে,
সাঁঝের প্রদীপ
জ্বালবো মাগো
চরণতলে,
সাঁঝের প্রদীপ
নিভেগেলে
আধাঁর ঘর
আলো করো,
মুছো মাগো
অশ্রু জল ,
ওমা উমা
এলে কখন
ছেলের কাছে!

জগতের মা
- শৈলেন মন্ডল

আজ আন্তর্জাতিক মাতৃ দিবসে পৃথিবীর সব মায়েদের জয়গান গাই।

মা তো মা ই হয়,মায়ের তুলনা মা নিজেই। মাতৃ জঠরে আমাদের প্রথম নিরাপদ আশ্রয়।

তারপরেই তো পৃথিবীতে আগমন। মা চেনায় আমাদের পৃথিবীর রূপ রস সত্তা ও সামাজিক মানষিক পরিমন্ডলীর পরিসীমানা।

মাতৃ জঠরে থাকাকালীন তিলে তিলে গড়ে তোলে আমাদের নিয়ে সহস্র অনুভূতিময় ভাবনা।

আমাদের জন্মের পর থেকে সবকিছুতেই পরতে পরতে শেখায় ও প্রতি মুহূর্তগুলোকে অসীম ভাবনায় আমাদের বিবেকের মধ্যে চেতনা ও মানবিকতার ছোঁয়া শেখায়।

আমাদের পৃথিবীর পাঠশালায় একজন আদর্শ ও মহীয়সী শিক্ষক বলতে মাকেই বুঝি। হতে পারে মা মুর্খ। পৃথিবীতে আমাদের বাসযোগ্য করে পূর্ণ রূপদান করে আমাদের মা।

সেই মাকেই আমরা পূর্ণ মর্যাদায় রাখি " বিকেলের ফুল" নামক বৃদ্ধাশ্রমের আঙিনায়। তারপরেও মা জানায় তোরা ভালো থাকিস্। আমরা কোনোদিনই মায়ের ঋণ শোধ করতে পারবো না।

তবুও সব সন্তানদের প্রতি মায়ের শুভ চিন্তা ও মাথায় হাত থাকে সব কাজে ও সবখানে।

একমাত্র সব মা ই সব দুঃখ ও বেদনা ভুলে অকপটে বলতে পারে হাসতে হাসতে - না,আমার কাছে তোর কোন ঋণ নেই, তোকে শোধ দিতে হবে না আর।

মা তোমায় শতকোটি প্রনাম। #তোমায়_বড্ড_ভালবাসি_মা।

১০.০৫.২০২০

স্বপ্ন দেখি
- সোনালী সাহা চৌধুরি

একদিন ঘুম ভাঙ্গবে মহামারী হীন ভোরে,
নিকোটিনের ধোঁয়ার মত উড়ে যাবে মৃত্যু ভয়।
স্যানিটাইজড হাতের মতো খুঁজে পাব ক্লেদহীন মন।
আস্ফালন , অহংকার জাত্যাভিমান--হোক বিসর্জন।
দূর থেকে দল বেঁধে থেকে, বিচ্ছিন্ন দ্বীপ গুলো জুড়ে যাবে ম্যাপে।
ভিসুভিয়াস থেকে কন্যাকুমারী মিলে যাবে এক ক্যানভাসে।
কোয়ারান্টাইন হৃদয় খুঁজে পাবে বসন্তের রং,
ক্যাফিনের গন্ধ মুছে যাবে হলুদ মাঠে নবান্ন ভোরে।
কোনো এক রূপকথা ভোরে পাশাপাশি হাত ধরুক ভ্যাকসিন আর ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধ।
পৃথিবীর সব অসুখ সেরে যাক , মুছে গিয়ে সব অন্ধকার , চলো স্বপ্ন দেখি এক মহামারী হীন রূপকথা ভোর।

২৫শে বৈশাখ ১৪২৭
- মোহন দাস

অচেনা বৈশাখে আজ এ ব্যাথার শহর নিস্তব্ধ
হে কবি, তব জন্মদিন আজ হৃদয়ের অলিন্দেই করিলাম
আসিয়া আসন লও ।
বিশ্ব জুড়ি আজ নাহিকো আয়োজন,
নাহি কোনো উপহার, নাহি কোনো ফুলপ্রাঙ্গন
যদিও এক খানি গোলাপ ফুলের মালা
গাঁথিছিলাম লুকায়ে ---
তব চরণে দিবো বলি;
তবুও বিষাক্ত পৃথিবী তারে নষ্ট করিয়াছে হায় ! একেবারে ।

হায় কবি ! আজ বিষাক্ত হাতে তব চরণ ছোঁয়ার
বাসনা নাহি আর;
প্রণাম জানাবার ইচ্ছেতেও মোর ভাইরাস ধরিয়াছে ।
হে কবি, আজ পৃথিবী বিষাক্ত ভীষণ
তাই কেহ সাহস করিনিকো তোমায় ডাকিয়া মিনতি করিতে আর,
দেখেওনিকো তোমার দিকে চাহি ।

হে বিশ্বকবি তবু আমি তোমারে আসিতে দেখিয়াছি
এ পৃথিবীর ব্যাথায় সাঙ্গ দিতে,
কালও নিস্তব্ধ নিস্পলক আঁখিতে দেখিয়াছিলাম জাগি
সূর্য ওঠার কিছু আগে
এই পৃথিবীর শোকে --- কাঁপছে তোমার হৃদয় ।।

বিশ্বাসঘাতকতা
- সুমিতা সরকার ঘোষ

বিরহ যন্ত্রণায় তিন যুগ পার,
কখনো তো বলো একবার? ভালবাসি?

প্রতি জন্মে অসহ্য অন্তর্দহন,
রাধার যন্ত্রণা নিয়েই কি
বারে বারে ফিরে আসি?

ময়না তদন্তের শীলমোহর
বলে অন্য কথা,
প্রতিশ্রুতির আড়ালে
বিশ্বাস-ঘাতকতার
মৃদু চোরা খুনের হাসি........

রবীন্দ্রনাথের প্রতি
- মোহন দাস

তোমার চোখে জ্বলন্ত দেখেছি
নির্বাক শব্দের প্রাণ
হে মহামানব ওরা মুক্তি চেয়ে
আজো করে কলতান ।

সে কথাকলির বাসনা বড়ই
শোনো নিরব ইশারায়
আমিও শুনি ডাকছে তোমায়
নিঃশব্দে নিরালায় ।

দীর্ঘদিন সে শব্দ সাজাতে গিয়ে
শুনেছি কেবল হাসি
হায় ! দু'এক কথা কানে কানে
বলে যাও আসি ।

তোমার কথায় রচিবো বিশ্ব ভুবন
দাও লিখিবার ভার
প্রভু তোমার তরে নিবেদন করি
এসো খোলা সিংহদ্বার ।।

আর একজনও নয়
- কিরণময় নন্দী

আবার পাঁচজন সৈনিকের শহীদের মৃত্যুবরণ।
হে মানবজাতি আমরা সংখ্যাগোনার জন্য আমাদের দেশরক্ষার কাজে পাঠিয়েছি বীর যোদ্ধাদের?
উত্তর: না, দৃপ্তকণ্ঠে বলি না।
বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে ওরা পাহারা দিচ্ছে আমাদের দেশমাতৃকা।সুখের রাত কাটিয়ে দিচ্ছি নরম বিছানায়।প্রয়োজনে স্বপ্নে দেখছি কাশ্মীরের ডাল-লেক সহ হিমানী শৈলগিরি।
সেই কাশ্মীরের কোনো না কোনো প্রান্তে আক্রান্ত হচ্ছে পড়শি শত্রুদের দ্বারা কিংবা ভয়ানক প্রকৃতির কাছে।
তেরেঙ্গা পতাকা শরীরে মুড়ে গান স্যালুটে বিদায় নিচ্ছে আমার আপনার ঘরের সন্তান।
ওদেরও স্বপ্ন ছিলো পৃথিবীটাকে চেনার-স্বপ্ন ছিলো পরিবার নিয়ে আগামী দেখার-স্বপ্ন ছিলো দেশের জন্য আরও কাজ করার।
সব স্বপ্নকে এক লক্ষ্যে উন্নীত করে নিজের জীবন দিয়ে দেশকে রক্ষা করছে প্রতিনিয়ত।
হে মানবজাতি বন্ধ করো যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা-বন্ধ করো কাঁটাতারের আধিপত্য-বন্ধ করো হত্যামিছিল।
আর একবিন্দু রক্তের দাগ দেখতে চায় না সিয়াচেন থেকে অনন্তনাগ কিংবা কুলওয়ামা থেকে দান্তেওয়ারার বুকে।

বিনিদ্র সৈনিকের বিনিদ্র মা আগামীদিনে সুখের নিদ্রাযাপন করুক আপন গৃহে। শান্তি আসুক সমগ্র বিশ্ব মাঝে।

মা
- সুমিতা সরকার ঘোষ

শিশুর মুখে প্রথম বানী মা,
সৃষ্টির সৃষ্টিই প্রথম মা।
প্রথম কোলে বড় হয়ে ওঠার নাম মা,
জীবনের প্রথম চাহিদার নাম মা।

সমস্ত রকম বাধা বিপত্তির শেষ কথা মা,
ভয় পেলে ব্যথা পেলে মুখে আসে মা।
প্রতি জন্মেই চাই মমতাময়ী মা।

বাড়ি ফিরে প্রথম শব্দ মা,
রাস্তায় চলতে ফিরতে তখনও স্মরনে মা
সারাদিনে অজস্রবার মা,
খেতে, বসতে, উঠতে, শুতে, মা।

চোখে জল এলে মনের অলক্ষ্যে মা,
হাজার ঝগড়ার পরেও শেষ অক্ষর মা।
হৃদয়ের ব্যথার শেষ কথা মা,
চমক লাগা স্তম্ভিত হওয়ার শেষ কথা মা

নতুন সংসার জীবনে প্রবেশের পূর্বে মা,
সংসারের হাজার বাধা বিপত্তি
অশান্তির মধ্যেও স্মরন।
হাজার দুঃখ, কষ্ট, বিপদ থেকে
আগলে রাখার নাম মা।

সন্তানের জীবনে প্রতি মূহুর্তে প্রতি, সময়ে অবশ্য প্রয়োজনীয় মা।
প্রয়োজনের অপর নাম মা।
নিজে না খেয়েও সন্তানের মুখে অন্ন
যোগানোর একটি ব্যক্তি মা।

শ্মশানের অগ্নিতে দেহ পুড়ে যাবার আগের মূহুর্তেও বোধ হয় কোথাও কোনো শব্দ নীরবে লুকিয়ে থাকে,
সেটা হোল মা।

স্বর্গের শেষ সুন্দর শব্দ মা,
অজস্রতায় অজস্রবার মা।
পৃথিবীর সবচেয়ে সত্য আর সুন্দর,
ঈশ্বর আর তার সৃষ্টি ফুল।

মা ও সেই রকমই সৃষ্টি একটি শব্দ
যার কোনো তুলনা,ব্যখা,
বিশ্লেষন চলে না।

সব কিছুই জীবনে অর্থ আর চেষ্টার বিনিময়ে কেনা যায়, মিলেও যায়,
কিন্তু মা বোধ হয় পাওয়া যায় না।

যেখানেই হোক তার অবস্থান,
পৃথিবীতে বা স্বর্গে সেখানেই,
অনন্যসুন্দর মা।

মা-তেই জগৎ সৃষ্টি আর তার
পায়ের নীচেই স্বর্গ।
এমন একটি শব্দ যার বিকল্প নেই,
অভাবনীয়, প্রয়োজনীয়,
অনিন্দ্যসুন্দর মা।

সৃষ্টির আদি অন্ত সহজের সহজতায়,
সহজলভ্য সহস্রবার ধ্বনিত হোক মা।
পরিশেষে আবারও বলি মায়ের সমার্থক
শব্দ হিসেবে যদি আরও কিছু থাকে,
তো সেটাও হোক "মা" ..........!

১০.০৫.২০২০

সারা পৃথিবী আজ বাঁচার জন্য লড়ছে
ঈশ্বরের সামনে নতজানুই বসে থাকছে ;
সকলে থাকতে চায় মহাবিশ্বের উপরে
মুখোশের উপরে আরেক মুখোশ পড়ে ।

ক্ষমতার দম্ভ নেই আজ পৃথিবীর বুকে
অহিংসা পরম ধর্ম বাণী সকলের বুকে ;
কাঁধে কাঁধ রেখে বাঁচার স্বপ্নটা দেখছে
ব্রহ্মাণ্ডের এমন দৃশ্য কে কবে দেখেছে ?

পৃথিবী জুড়ে আজ শুধুই মানুষ মরছে
হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ভেদাভেদ ভুলেছে ;
আলোর অপেক্ষায় পৃথিবীটাও বহমান
জ্বালো আলো ঈশ্বর ;আল্লাহ ;ভগবান ।

যুদ্ধ দাঙ্গা ভুলে মানবতা এক কাতারে
মহানুভবতা থমকে যায়নি কাঁটাতারে ;
মানুষ আজকে মানবতা ফেরি করছে
সব ভুলে ভালোবাসাটাও বিলি করছে ।

ভেঙে চুরে গেছে আজ সব অহংকার
ভাগাভাগি করে করছে সবাই আহার ;
কিসের এতো দম্ভ জীবনটাইতো ছোট
মানুষ তুমি আবারও মানুষ হয়ে ওঠো।

আমি সেবিকা
- কিরণময় নন্দী

আমি 'নাটোরের বনলতা সেন' হতে চাইনি...
হতে চাইনি 'সুরঞ্জনা', 'সবিতা' ,সুচেতনা'
আমি স্বপ্নজালের মায়াবী রাজকন্যা হতে চাইনি
চেয়েছি রোগীর সেবায় সেবিকা হতে.....

অমাবস্যার কালোচুলের ইচ্ছে ছিলো
পড়ন্ত বিকেলের বিদায়ী সোনা আভায় চিকচিক করবে আমার চুল
দখিনা সমীরণে রাশি-রাশি অলক উড়ে বেড়াবে আমার চিবুক-মুখমন্ডল বেয়ে...
আর আমি দিগন্তের দিকে চেয়ে 'জীবনানন্দ' গেয়ে যাবো.......

কর্তব্যের ঘেরাটোপে আজ বাড়ির ব্যালকনি-ছাদ নীরবতায় ভরা
আমার ঠিকানা হাসপাতালের রুদ্ধ কক্ষে
রাতদিন পোশাকের ঘেরাটোপে অসহনীয় পরিবেশে।

তবুও আমার লড়াই থামেনি হাজারো সেবিকার মতো
শত আশঙ্কায় চলছে রণসংগ্রাম....
অজানা শত্রুর বিরুদ্ধে বীরের মতো।

কৃষ্ণবর্ণ চিকুরের মায়া ত্যাগ করেছি অনায়াসে
কালো কুন্তল আজ ইতিহাস
সেবিকার মন্ত্রে দীক্ষিত আমি
আমার স্বপ্ন সুস্থ-পৃথিবী তাই আমি যুদ্ধক্ষেত্রে দিবারাত....

ব্যাস্তানুপাত
কলমে - শৈলেন মন্ডল

প্রেম চেয়েছিলে
ভালোবাসা দিলাম
মন চেয়েছিলে
সারা হৃদয়টা দিলাম।

মেঘ চেয়েছিলে
বৃষ্টিধারা দিলাম
আবেগ চেয়েছিলে
অনুরাগটুকু দিলাম।

বিশ্বাস চেয়েছিলে
আজীবন আবদ্ধতা দিলাম
সুখস্বপ্ন চেয়েছিলে
নৈসর্গিক আনন্দ দিলাম।

সংগোপন চেয়েছিলে
আলিঙ্গনটুকু দিলাম
প্রেমে ভাসতে চেয়েছিলে
আমিও বানভাসি হলাম।

সঙ্গীতের সুর চেয়েছিলে
অপরূপ মোর্চ্ছনা দিলাম
কবিতা চেয়েছিলে
কল্পনার রাজ্য দিলাম।

পছন্দের মানুষ চেয়েছিলে
ব্যার্থতায় ঢেকে দিলাম
প্রাক্তনের অপেক্ষা চেয়েছিলে
অবাধ স্বাধীনতা দিলাম।

অনাবিল হাসি চেয়েছিলে
মুক্তোমালা দিলাম
মুক্তি চেয়েছিলে
আগল ভাঙ্গা শেকল দিলাম।

বাঁচতে চেয়েছিলে
অনিঃশেষ প্রানটুকু দিলাম
ছুঁতে চেয়েছিলে
মনের রাজ্যটাই দিলাম।

পাগল করা আদর চেয়েছিলে
উজাড় করা উষ্ণতা দিলাম
মূর্ত্ত প্রতীকি চেয়েছিলে
#রাজেন্দ্রানী তোমাকে দিলাম।

১৪.০৩.২০২০

আঁধার মুছে
- মৌমিতা ঘোষ

আবেগ গুলো তুলে রেখো
বুকের সিন্দুকে
যত্নে রেখো স্বপ্ন গুলো
প্রত্যয়ী লাল চোখে
সূর্য ছোঁয়ায় তপ্ত কোরো
শীতল বিষাদ ভার
জ্বালিয়ে নিও হৃদয় আগুন
শত্রুরা ছারখার
ভালোবাসায় ভিজবে যেদিন
সমস্ত মন জুড়ে
আবেগ দিও তখন তাকেই
হৃদয় উজাড় করে
জীবন পথে আসবে কতো
চড়াই উতরাই
ডিঙিয়ে সব ব্যাথার পাহাড়
লক্ষ্য ছোঁয়া চাই !
প্ৰতিজ্ঞা হোক স্বপ্ন ধরার
পেরিয়ে সকল বাধা
জীবন পটের চালচিত্রে
লাগুক রঙের ছোঁয়া |

প্রতিফলন
- সুভদ্রা রায়

নদীর জলে ভেসে ওঠা আবছায়াতে
প্রকৃতি আজ দেখি অন্ধকার
বাঁদর যেমন নাচ দেখিয়ে ফেরে - যা দেখে বারবার
আয়না সে যে নিজের কথাই বলে- যেমনটি চাই তেমনিই দেখায় সে
প্রকৃতি তার হাতছানি দিয়ে ডাকছে বারবার
সময় এসেছে শোধ হবে কি - যা ছিল ঋণ সবার
যতটুকু জানি নিয়েছি কেড়ে কারোর
ফেরাতে হবেই কোনও না কোনও দিন
নরম মুঠি আলগা যদি হয় - আজলা ভরা জল তো শেষ হবেই
মনের ভেতর লুকিয়ে রাখা বিষে অবাক বিবেক জ্বলে পুড়েই মরে
প্রকৃতির যত সম্ভার গাছপালা - হিংসা প্রানী হত্যা
জঙ্গলে কিছু উঠেছে আগাছা- দাবানল জ্বলবেই
হাত বাড়ালে হাতের নাগাল ঠিক যায় যদি পাওয়া
বিনিময়ে লাভ আর ভালোবাসা দিয়ে ঘোঁচে যদি বিদ্বেষ
সময় এসেছে শোধ করার আজ
একমুঠো চাল কিনে দিতে পারে- ভালোবাসা একমুঠ
দুকৌটো গম দেই বিনিময়ে পেলে দুকৌটো প্রেম
একবুক আশ্বাসে যদি মেলে - -গভীর বিশ্বাস
একটি প্রানের মূল্যে ফেরাই তবে একফোটা তাজা প্রাণ
জ্বালিয়ে রাখলে প্রেম - হাসবো আলোয় নিশ্চয়ই..!

পাশাপাশি থাইকো জল ও স্নানঘর
- মোশ্ রাফি মুকুল

পাশাপাশি থাইকো জল ও স্নানঘর,ট্যাপ ঘুরাইয়া ঘুরাইয়া ঝর্ণার দিকে চাও।ধাতব ফোঁকর ঘেঁইষে চুঁইয়া চুঁইয়া পড়ুক জলের প্রণোদনা!

পাশাপাশি থাইকো জল ও জাল,শিকার কইরা আইনো মৎস্য কইন্নারে।তার সাথে জলরঙা কথা কও।
জলের চিহ্ন ধুইয়া ফ্যালাও,ধুইয়া ফ্যালাও স্নানঘর,স্নানোৎসব;
কার্যত এখানে জল ও যতো স্নানার্থী-
তারা সব একেকজোড়া অদ্বিতীয় যুগল।

এইসব সমুদ্রে ওৎপেতে থাকে একলা রাত,পানির ঊর্ধ্ব শ্বাসমূল,রাত্রির ভীম দেহ;শনশন অন্ধকারে এইখানে চলে জল ও স্নানেরশিল্প!

অভিসার
কলমে - শৈলেন মন্ডল

দীর্ঘ জীবনের ধূসর মরুপ্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা তপ্ত বালিয়াড়িতে কে গো তুমি #রাজেন্দ্রানী?

সারা কবিতার দেশ জুড়ে নীরব নিসঙ্গতাময় সংগোপনে দেখো আমার অনুচ্চারিত শব্দমালা। একবার বিশ্বাস স্নাত হয়ে মুখ ঢেকে দেখো আমার অনাবৃত বুক জুড়ে।

সেখানে দেখতে পাবে কতশত নীরবতাময় অনুযোগ অভিযোগ আর চরম আকুতি ভরা ভালোবাসাময় প্রেমের অমোঘ টানের সংগ্রামী অভিযান। ছুঁয়ে থাকো আমার নদীবুক জুড়ে,

খুঁজে পাবে কান্না ভেজা নোনতা জলে উপচে পড়া বিশ্বাসী ঢেউ আর গহীন মনের বিরহ কাতরতায় গড়েছে, এক রূপভেদ করা মানবতাময় সুদীর্ঘ মায়াজালের বেষ্টনী।

তোমার উষ্ণতার পরশে ভেঙ্গেছে আমার আদিম পিপাসার নিরবতাময় তুষার।

তুমি আমায় তৈরী করেছ তীব্র চঞ্চলতাময় নদীর দুকূল ছাপানো আছড়ে পড়া তরঙ্গায়িত ঢেউ।

আমি খুঁজে ফিরি নৈসর্গীক ভালোবাসার সুখের কিনারা।

প্রেমের ফাগুনে পলাশরাঙা আগুনের মতো যতবার তোমার সান্নিধ্যে এসেছি,

ঠিক ততবারই উষ্ণ আলিঙ্গনে সহমরনের শেষপ্রান্তে পৌঁছে দিয়েছো অবলীলায়।

আজও তুমি আমায় ছুঁয়ে থাকো গহীন মনের প্রশান্ত নীরবতায়।

নির্জন নিকষ কালো নীশিথে তোমায় কাছে না পেয়ে আজও সংগোপনে পালন করি সম্মোহিত আনন্দঘন প্রেমময় ভালোবাসা যাপন।

আমায় বারংবার উপেক্ষা করা সত্ত্বেও প্রতি মুহূর্তে উপলব্ধি করি উপস্থিতির অবাধ বিচরন ও প্রতিধ্বনিত হয় অনুরাগ ভরা অভিসারের সুমধূর নিক্কন।

২৬.০২.২০

স্থিরতা
- মোশ্ রাফি মুকুল

অজস্র ডানাপিনায় তাতানো চোখ মেখে সমুদ্রমুখো জানালায় রেখে আসি।গ্রীষ্মের গ্রীবায় গলাগলি লকডাউনিক স্থিরতা।উড়িউড়ি খেলি জ্যৈষ্ঠভিত্তিক রসালো মধুকোষে।

এখন কবিতাপাঠরত ইলেকট্রন চিঠিচাপাটি হাতে পেলে
খুলে পড়বো কাঁচাআম ও 'আচার'।
প্রিয়তমার রুদ্ধদ্বার দরজা।

০২/০৫/২০২০.

প্রকৃতির আনন্দ উৎসব
- সম্পা মাজী

পৃথিবীর জন্ম লগ্ন থেকে যে প্রকৃতির সৃষ্টি হয়েছিল,সেই প্রকৃতি ও তার আশ্রয়ে থাকা সমস্ত জীব কুল , মানুষ নামক উৎকৃষ্ট জীবের চরম অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠে ছিল। এই মানুষ নিজেদের অত্যাধুনিক জীবন উপভোগ করতে প্রকৃতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিল । কিন্তু হঠাৎ সব কিছু ওলট পালট হয়ে হিত কে বিপরীত হয়ে দাঁড়িয়েছে , মানুষ আজ বন্দী হয়ে প্রকৃতি আজ মুক্তি পেয়েছে।

প্রকৃতি ও তার আশ্রিত জীব কুল মানুষের অত্যাচার থেকে কিছুটা মুক্তি পেয়েছে ,ফিরে পেয়েছে নিজেদের অস্তিত্ব তাই তারা আজ খুব খুশি,
সেই আনন্দ সবার মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য তারা এক আনন্দ সভার আয়োজন করেছে । সভায় প্রথম বক্তব্য রাখেন গিরি রাজ পর্বত ।
পর্বত : মানুষদের বন্দী থাকার ফলে আমাদের অনেক পরিবর্তন হয়েছে, এই গ্রীষ্মে আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও অনেক বেশি পরিমাণে বরফ গলে যেত , তাতে আমার অনেক ক্ষতি হতো কিন্তু এখন সেটা হচ্ছে না তাই আমি খুশি ।
পাহাড়: এখন আমাকে কেউ বিরক্ত করতে আসছে না ,তাই নিজের সাথে নিজে কথা বলতে পারছি , খুব ভালো লাগলো।
নদী: এতোদিন মানুষের দেওয়া নোংরা বইতে বইতে নিজেকে অপবিত্র মনে হচ্ছিল, কিন্তু এখন সচ্ছ পরিষ্কার জল বহন করে নিয়ে যেতে নিজেকে পবিত্র মনে হচ্ছে ।যে মাছেরা এই দূষিত জলে বেঁচে থাকতে পারতো না ,তারা আজ আমার সাথে খেলা করছে , আমার নিজেকে প্রানবন্ত লাগছে, আমার জল খেয়ে সবাই এখন তৃপ্তি পাচ্ছে।

পাখি : এতো দিন ডানা মেলে উড়ে বেড়াতাম কিন্তু নিজেদের মুক্ত ভাবতে পারতাম না, সব সময় ভয় লেগে থাকতো এই বুঝি শিকারীর চোখে পরে গেলাম কিংম্বা খাওয়া খেতে গেলে অপেক্ষা করতে হতো মালিক কখনো ফিরে যাবে কিন্তু এখন শিকারীর ভয় নেই , খাবারের ও অভাব নেই কাছাকাছি খাবার পেয়ে যাচ্ছি তাই মনের আনন্দে ঘুরছি উড়ছি আর গলা ছেড়ে গান গাইছি।
পশু : আমরা নিজেদের মতো করে থাকছি চারিদিকের আওয়াজ নেই তাই নিঃশব্দে ঘুমতে পারছি খুব ভালো ‌লাগছে।
গাছ- পালা: এতোদিন আমাদের বিশুদ্ধ অক্সিজেন দিয়ে বিনিময়ে বিষাক্ত কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহন করতে হতো কিন্তু কিছু দিন বিশুদ্ধ কার্বনডাই অক্সাইড গ্রহন করে ভালো লাগছে । আর বৃষ্টি সময় মতো হওয়ায় আমরা চারিদিক সবুজে ভরিয়ে তুলেছি।
বাতাস: দূষণ বাতাস বইতে বইতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম কিন্তু এখন বিশুদ্ধ বাতাস বইতে খুব ভালো লাগছে, ধিরে ধিরে আমার ভারসাম্য ফিরে আসছে , নিজের দূষণ মুক্ত মনে হচ্ছে।

এই আনন্দ উৎসবে এইভাবে একে একে প্রকৃতি ও প্রকৃতিকে আশ্রয় করে বেড়ে ওঠা জীব কুল সবাই নিজ নিজ আনন্দ ব্যক্ত করে , সব শেষে গিরি রাজ পর্বত বলেন, আমাদের মানুষের ছাড়া চলে যাবে কিন্তু মানুষের আমাদের ছাড়া চলবে না তাই আমাদের এই আনন্দ কতো দিনের জানি না , তবুও এসো আমরা সবাই মিলে সৃষ্টি কর্তা ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি , মানুষ যেন আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসুক আর ফিরে এসেই মানুষ যেন প্রকৃতির ওপর নির্মম অত্যাচার না করে , সৃষ্টি কর্তা মানুষকে ভালো হওয়ার পথ দেখাক তারা যেন নিজের সাথে সাথে আমাদের ও খেয়াল রাখে এবং এই পৃথিবীকে আরও সুন্দর করে তুলে।

মা
- প্রসেনজিৎ ঘোষ
(আমার মা মৌমিতা ঘোষ কে উৎর্সগ করে লেখা)

আঁধার রাতে মরুপথে
হারিয়ে ছিলাম আমি
বালুঝড়ে উড়িয়ে ছিল মোরে !
দিক হারিয়ে মরুপথে
জীবন যে যায় শূন্য রথে
মৃত্যু যখন চোখের'পরে
তুমি এলে স্নেহের পরশ দিলে মাথার'পরে,
রৌদ‍্য দিনে তোমার ঐ শীতল ছায়া
বাঁচার যে মোর মন্ত্রনা দেয়
ফুল যে ফোটায় শাখায় শাখায়!
আধাঁর রাতে মরুপথে হারিয়েছিলাম আমি
হাতটি ধরে আলোয়েতে আনলে মাগো তুমি!
যেন জনম জনম পাইগো মাগো তোমার চরণ খানি
মা যে আমার অপার স্নেহময়ী !

বিশ্বাসঘাতক
- সঙ্গীতা সিনহা্

কাগজটা পড়তে পড়তে হঠাৎ সমরেশ বাবু চিৎকার দিয়ে উঠল।নিজেই গজগজ করে বলতে শুরু করলো এমন বেহায়া মেয়েরা সব রাতবিরেতে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে বাঁদরামি করে। তার চিৎকারে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসতে আসতে ইতি বলছে কি হল পড়ছো তো খবরের কাগজ তা কি এমন পড়লে যে চিৎকার করতে হচ্ছে। সমরেশ বলছে দেখো দেখো কি কান্ডটাই করেছে একটা মেয়ে। বয়ফেন্ডের সঙ্গে কি অশ্লীল পোশাক পরে ঘুরতে বেরিয়েছে আর তাকে দেখে যা হয় আর কি কিছু ছেলে টোনটিটকারি করছে মাঝখান থেকে কি হল সাজেন্ট এসে ছেলেগুলোকে সামলাতে গিয়ে মারপিট শুরু হয়ে গেল।সব কটা গলায় ঢেলে ছিল জ্ঞান ছিল না কাকে মারছে,আর মেয়েটা কি করলো লোকজন জড়ো না করে ছেলে বন্ধুকে নিয়ে পালিয়ে গেল। এটা কি ঠিক করলো।ইতি এটুকু শুনে বললো কি করবে মেয়েটা ঠিকই করেছে ওখান থেকে চলে গিয়ে ও সব ঝামেলায় না থাকাই তো ভালো। সমরেশ ক্ষেপে ওঠে বলে পুরো কথা না শুনেই কথা বলাটা অভ্যাসে দাড়িয়েছে। ওই মেয়ের জন্যই তো সাজেন্ট অভ্র রায়কে অকালে মরতে হল। গলায় ঢেলে তো ছেলেগুলোর হুস নেই বেদম পিটিয়েছে। ইতি চমকে উঠল সেকি শেষে কিনা মরে গেল পুলিশটা। সমরেশ বলে উঠল তুমি কি জানো থানায় কোন ডায়েরি হবে না সাক্ষীর অভাবে। একমাত্র মেয়েটা আর ছেলেটাই দিতে পারতো খুনী ছেলেগুলোর সঠিক বর্ননা। তা আর হল কই মেয়েটা তো মনে হয় না সামনে আসবে। ইতি তখন বলে না আসাই ভালো কি দরকার এসব ঝামেলায় জড়িয়ে কোথা থেকে কি আবার হয়ে যাবে আর যে মরে গেল সে তো আর ফিরে আসবে না।শুনে তো সমরেশ বলে ওঠে কি বলছো এ সব।ওদের কথার মাঝখানে মেয়ে ঝিমলি চলে এসে সমরেশের হাত থেকে পেপারটা ছিনিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল। সমরেশ কিছু বলতে গিয়ে চুপ হয়ে গেল। সমরেশের একমাত্র মেয়ে ঝিমলি আদর করেই এই ডাক। ভালো নাম ঝিনুকলতা।মেয়ের দিকে খুব খেয়াল সমরেশবাবুর।লেখাপড়া গানবাজনা এছাড়াও সামাজিক আদবকায়দা সব কিছুই নিজের তত্ত্বাবধানে মেয়েকে শিখিয়েছে।ধীরে ধীরে চোখের সামনে মেয়েকে বড় হতে দেখেছে কখনও মেয়ের কোন আচরণে নিজেকে লজ্জিত মনে হয় নি। তাই আজ সমরেশ এটা ভেবে নিশ্চিন্ত তার ঝিমলি এই ধরনের মেয়েদের মতো নয়।
আজ সকাল সকাল ঝিমলি কলেজ যাবে।ইতির রান্নাঘরে তাই ব্যস্ততা।ফিরতে নাকি রাত হবে কলেজ শেষে দুটো পড়া পড়ে বাড়ি ফিরবে তাই ইতি দুধরনের টিফিন বানাচ্ছে মেয়েকে দেবে।সমরেশ টেবিলে বসে চা খাচ্ছে ঝিমলি আসছি বলে বিরিয়ে যাচ্ছে ইতি তো ছুটে এসে বলে হ্যারে টিফিন নিবি তো আমি বানালাম ঝিমলি বলে ওঠে কে তোমাকে টিফিন বানাতে বলেছে কেমন যেন মাকে খেকিয়ে উঠল এটা দেখে তো সমরেশ বলে উঠল মাকে ওভাবে বলছিস কেন মা ভুলটা কি করলো আর তোর ব্যাগে কি আছে এত,দেখে ব্যাগ ভর্তি মনে হচ্ছে।ঝিমলি একটু থতমতই খেয়ে গেল বলে উঠল দুটো পড়া আছে তো তাই। মায়ের থেকে টিফিনবক্স দুটো নিয়ে আসছি বলে বেরিয়ে গেল। মেয়ের চলে যাওয়াটা দেখতে থাকে কখনও এমন মনে হয়নি সমরেশের আজ কেন মনে হল মেয়ে মিথ্যে বলছে।
রাত 8টা বেজে গেল এখনও মেয়ে বাড়ি ফেরেনি সেই কোন সকালে বেরিয়েছে খুব চিন্তা হচ্ছে ইতির। বার বার সমরেশকে বলছে যাও না একটু এগিয়ে দেখো না রাস্তার মোড়ের দিকে।সমরেশও বার বার ফোন করছে কিন্তু ফোন সুউচ অফ বলছে।কারুর নাম্বারও তো নেই যে কাউকে ফোন করে জানবে।সমরেশ বলে চলতো ওর আলমারিটা খুলে দেখি কোন নাম্বার পাওয়া যায় নাকি বলে মেয়ের আলমারি খুললো এই প্রথম মেয়ের আলমারিতে হাত পড়ল সমরেশের ইতিও কখনও খোলে নি।আলমারি খুলে সবকিছু উল্টে পাল্টে দেখতে লাগল -এ সব কি এ কেমন জামা কাপড় ওর আলমারিতে কেন বলে প্রশ্ন করলো সমরেশ ছোট ছোট অর্ধেক কাটা সব জামা যা কখনই ওদের মেয়ে পড়ে না। হঠাৎ কিছু ছবি হাতে এল ইতি অবাক হয়ে বলে উঠল দেখো তো এই মেয়েটা কে আমাদের ঝিমলির মতো লাগছে না;সমরেশ তাড়াতাড়ি ছবিগুলো হাতে নিলো আর বুঝতে বাকি রইল না এটা তাদেরই মেয়ে।ছবিগুলো হাতে নিয়ে কেমন যেন চেয়ারে গিয়ে বসে পড়ল হঠাৎ করেই মনে হচ্ছে সাজেন্ট খুনের পেছনে যে তরুনীর অবদান আছে তাহলে কি আমাদের ঝিমলিই সেই মেয়ে।বুকের ভিতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে গেল কেমন যেন কান্না বেরিয়ে আসতে চাইছে।এদিকে ইতি তো অঝোর নয়নে কেঁদেই চলেছে বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে এমন অশ্লীল ছবি এ যে মানতেই পারছে না ইতি। কখন যে রাত হয়ে গেল ওদের খেয়ালই নেই। সমরেশের ফোনটা বেজে উঠতেই যেন ওরা ঘোর থেকে বেরিয়ে এল। মোবাইলে চোখ যেতে দেখল একটা আননোন নাম্বার সময়টা দেখলো প্রায় দুটো বেজে গেছে। অপ্রত্যশিত কিছু শুনবে ভেবেই ফোনটা ধরলো।লোকাল থানা থেকে ফোনটা এসেছে থানায় একবার যেতে হবে,ইতিকে জানালো। কেমন যেন দুজনেই চুপ করে বসে কোন কথাi মুখ থেকে সরছেই না। শুধু সমরেশ বলে উঠল মানুষ করতে পারি নি আমাদের শিক্ষায় কোথাও ভুল ছিল সন্তানকে অন্ধ বিশ্বাসের মূল্য দিতে হবে আজ। থানায় যাবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে।

ফাঁদ
- সুমিতা সরকার ঘোষ

পায়ের নীচে চোরাবালি
আস্ত ভুলের আস্তানা,
যে নিশানা সত্যি ভাবা আসলে
গোলকধাঁধার ঠিকানা।
শরীর জুড়ে দহন,
অন্তরে নিঃশব্দ সহন।
চেপে রাখলেই বেশ,
প্রকাশ করলেই শেষ........

চোখের সামনের অদৃশ্য ফাঁদ.......

অনুভূতির আলো
- শৈলেন মন্ডল

সহস্র যোজন পথ একা খালি পায়ে হেঁটেছি স্মৃতির সরনী বেয়ে।

তোমার আঙ্গিনায় ভালোবাসার ডালি নিয়ে অনুভূতির ফুল মালা নৈবেদ্য সমারোহে।

কেন যে মনে হয় কয়েক যোজন এসেছি মাত্র পদাতিক হয়ে ভালবাসার রাজভিখারীর বেশে প্রিয়তমার সঙ্গীন হতে।

তোমার অপলক চাহনিটা বড়োই অদ্ভুত লাগে আচম্বিতে।

তোমার গগনভেদী ঐ চাহনিটা কেন জানি না মনকে দুর্ভেদ্য বিগলিত করে তোলে বারে বারে।

মনের জানালার ধারে বসে তোমার স্মৃতির সরনী বেয়ে নয়নে নয়ন চুমি বার বার পুনঃবার মহানাগরিকের বেশে।

তোমায় ভালবেসে অতলান্তিক মনের নিয়েছি যত্ন অযাচিত আদরে আবদারে।

তোমার মনের অতল অবয়বে খুঁজতে গিয়েছি নিজের অস্তিত্ব ও মেলাতে চেয়েছি প্রতিমুহূর্তে অনুভূতিময় সারমেয় ভালবাসা।

ভালবাসাময় ভালবাসা দিয়ে নিজের অশ্রুজল দিয়ে ধুইয়ে দিই আমার প্রিয়তমার পবিত্রতায় ভরা হৃদ-কমল।

০১.০৫.২০২০

অব্যক্ত
- হৈমন্তী ব্যানার্জী পাঁজা

পেয়েছি অনেক, কুড়িয়েছি মন ভরে,আজ দুহাতে আমার অঢেল ধনরাশি।তবুও মনে হয় বড় ফাঁকা এই প্রাপ্তির ঝুলি কি যেনো নেই! কোনো এক জায়গা শূন্য আজও। মনের কোন জুড়ে বসে থাকা তুমি টাকে মুছতে পারিনি কোনোদিন শুধু অস্বীকার করে গেছি বারেবারে! ভালো থাকবো বলে।
এই বিশাল বাড়ীর সর্বত্র সাজিয়েছি অমূল্য আসবাব, অমূল্য সব সম্পদ দিয়ে। ঘরের প্রতিটা কোন পূর্ণ থাকবে বলে। কিন্তু ভুলেই গেছিলাম এই প্রাণবিহীন বাড়িকে প্রাণ দেয় তার মধ্যে বসবাসকারি মানুষগুলো। আর সেই মানুষদের এক এক করে সযত্নে নিজ হাতে শেষ করে দিয়েছি। দিন রাত জ্বলে পুড়ে মরেছি ব্যার্থতার আগুনে।
অহংকারে পরিপূর্ণ আমি তখন তোমার ভালোবাসা বুঝিনি। তাই তোমার দেওয়া ভালোবাসার গোলাপটা পায়ের তলায় পিষতে একটুও দ্বিধা করিনি। অপমান করেছিলাম সকলের সামনে, সুন্দর চেহারা আর পৈতৃক সম্পত্তির অহং আমাকে অন্ধ করে দিয়েছিল অনুপমা।
কিন্তু আজ এই শেষ জীবনের দোরগোড়ায় এসে, ভীষণ ভাবে মনে হয় তুমি থাকলে যেন পূর্ণতা আসতো জীবনে। আবার ফিরে আসতে পারোনা আমার জীবনে? কিছুদিন আগেই গেছিলাম জানো আমাদের আগের পুরোনো পাড়ায় তোমাকে একবার দেখবো বলে জীবনের এই শেষ বাকি কটা দিনে নিজের বিবেকের দংশন সইতে পারছিনা তাই ক্ষমা চাইবো বলে। কিন্তু শুনলাম তুমি আর সেখানে থাকো না। অপরাধীর মতো লাগছিল নিজেকে, অবশ্য মতো আর কেনো বলছি আমি তো অপরাধীই। আমি জানতাম তুমি সেই ছোট্ট থেকে আমাকে ভালোবেসে এসেছ তবুও তোমাকে সবার সামনে ছোটো করেছি আমার নিজস্বী বড় করবো বলে।
আমার এই রুক্ষ স্বভাব আর অহং এর জন্য আমার সংসারটাও বাঁচতে পারিনি জানো। শুধু ছুটে বেড়িয়েছি টাকার নেশায় এক দেশ থেকে আরও এক দেশে। তাই আমার স্ত্রীও ছেড়ে চলে গেছে। আর সন্তান তাদের তো তৈরি করতেই পারিনি। আসলে এটাই বোধহ়য় প্রাপ্য ছিল।
এই বাড়িতে কাল আমার শেষ দিন। কোনোদিন তো তোমার সঙ্গে দেখাও হবে না আর। তাই তোমার সন্মুখে না হোক অন্তত আমার এই ডাইরির পাতায় গচ্ছিত থাক আমার এই "স্বীকারোক্তি"। নিজের বিবেকের কাছে একটু হলেও ভারমুক্ত হই।

আসুন আসুন মিস্টার সান্যাল দক্ষিণের এই ঘরটা আজ থেকে আপনার জন্য বরাদ্দ হল।
এই যে,ইনি হলেন আমাদের আশ্রমের মালিক অনুপমা দেবী আমরা সকলে ভালোবেসে ওনাকে বড় দিদি বলি। এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে গেলো আশ্রমের দায়িত্বে থাকা রমেশবাবু।
কাঁচের আড়ালে থাকা নির্বাক দুজনার আঁখিযুগল তখন ঝাপসা........

বল্মীক স্বরলিপি
- অসীম দাস

শুধু এনে দেব কবিতা কাঠামো তুমি কোরো কারুকাজ
শুষে নিও নীল তড়িতের বিষ তারপরে কোরো সাজ ।

তোমার ডাকেই শব্দেরা আসে কবিতা মুকুলে স্বাদ
পঙক্তির ফাঁকে আগাছা গজালে তুলে দিও পরমাদ ।

যোজন যোজন ইচ্ছেরা বলে -- লেখো দেখি স্বরলিপি
আমি বলি কবি--বের করো ত্বরা ছাড়ি বল্মীক ঢিপি !

তুমি খুশি হলে কল্পনা ভূমি হয়ে যায় উর্বর
তুমিই তো কবি বকলমে আমি তর্জমা-তৎপর !

রূপকল্পের জোগানের ভার নিয়ত তোমারই হাতে
নিরন্ন সাধু ভরপেট ঘুমে তোমারই পাঠানো রাতে ।

বিষাদের ফণা তুমিই পুষেছো মানব ঝাঁপিতে সাপ
তোমার ইশারা পেয়েই রামের সরজুর জলে ঝাঁপ !

তোমার প্রসাদে একটি পঙক্তি পেয়ে যেতে পারে সুধা
উদাসীন হলে চির অভুক্ত মেটে না বর্ণ ক্ষুধা ।

তাই তো তোমার শরণাপন্ন আজীবন থেকে যাব
কুয়ো থেকে চাঁদ তুলেছি ঘড়াতে, এমতো পঙক্তি পাব ?

ওদের ফাঁসি চাই
- কিরণময় নন্দী

মাগো কেমন আছো তুমি
কেমন আছে বাবা....ভাই
কেমন আছে আমার গাঁ
ইচ্ছে মন যেন ছুটে যাই!

কেমন আছে দুষ্টু ভলু
কেমন আছে রতন কাকা
ভীষণ ভাবি সবার কথা
আট বছরে নয় সব ঝাপসা!

সেই ছোটো ভলু চোখ না ফোটা
খড়ের গাদায় ছিলো পরে
অনেক কষ্টে বাঁচিয়ে ছিলাম
অনেক যত্ন-আদরে।

আজ আর কি আসে ভলু
রাতে খাবার শেষে
নাকি হারিয়ে গেছে ভীরের মাঝে
অনাদরে অবশেষে।

মাগো বছর দুয়ের মিষ্টি সনু
বেশ বড়ো হয়েছে তাই না?
ইচ্ছে মন যাই ছুটে
ইচ্ছে হলেই কি সব পাই মা?

বাবার কথা খুব ভাবি মা
কেমন আছে আমায় ছেড়ে
গরীব বাবার মিষ্টি রাজকন্যা
আমায় কি ভুলতে পারে?

তুমি তো মা কেঁদেই হালকা
বাবা নিশ্চুপ-পাথর
গাল বেয়ে বয়ে অশ্রু ধারা
চোখ দুটো স্তব্ধ--নিথর।

স্বর্গরথে শুয়ে আমার নিথর লাশ
ইচ্ছে করে জড়িয়ে ধরি বাবাকে
বলি "এই আমি তোমার সুমি
এই তো আমি তোমার পাশে'।

মুখ ঘুরিয়ে আমার মুখে
ঠেকিয়ে দিলো জ্বলন্ত কাঠ
মাথা ঘুরে পড়লো বাবা
মাগো সবকিছুর যবনিকাপাত।

লাশঘরেও পাইনি কষ্ট ওতো
যেমন ছিলো ভয়ের রাত
মুখ চেপে ওরা হিংস্র পশু
ওরা মানুষরূপে নেকড়ে বাঘ।

একের পর অন্য জন
কেঁদেও মাগো দেয়নি ছাড়
মাংসগুলো খুবলে খেলো
থেমে গেলো আমার চিৎকার।

চুল্লিতে চলে গেলো আমার দেহ
সাদা কাপড়ে মোড়া নিথর লাশ
চিৎকার করে যেন বলি মাগো
বারো বছরে কেন আমার সর্বনাশ!!

মাগো কেমন আছো তুমি
কেমন আছে বাবা...ভাই
ইচ্ছে করে আবার যাই ফিরে
চেঁচিয়ে বলি,"ওদের ফাঁসি চাই"।

সুদুর নিহারীকা
কলমে -শৈলেন মন্ডল

সুদূর নিহারিকায় ভেসে বেড়ায় আনমনা মন কতশত কামনায়,

জানি জানি প্রিয়া মন কাঁদে শুধু তোমারই জন্য।

বলাকার পাখায় ভর করে ছুটে যাই
আঁকাবাঁকা পাহাড় সমুদ্র পথ পেরিয়ে,

আজ মন হারিয়ে যাই দিগন্তরেখার কাছে ছুঁতে চাই পরম ভালবাসায়।

কতশত আদরের ছলে দিয়েছো পরম তৃপ্তির ভালবাসার ছোঁয়া,

আজীবন সযতনে রাখবো ধরে আদমের অপরূপ সুবেশে।

তুমি ও থাকবে বুকে সুগভীর অতলে,
ভালবাসাময় নিবিড় আদর দেব।

লক্ষহীরায় সাজানো অমূল্য রত্ন তুমি,
সাজাব যতনে দিয়ে মরমী প্রেম আছে যত।

নয়নে নয়ন চুমি শত অছিলায়,
দিয়ে যত প্রেম হৃদয়গাথায়।

শত কষ্টের ঝরে যাক্ বারিধারা
নতুন সুখের পরশ যত পায়,

ধন্য পরম প্রাপ্তি শুধু তোমায় পেয়ে
আজীবন শুধু দাও ভালবাসাময় সংগোপন হৃদয় ভরে।

২৫/০৪/২০২০

নতুনের জন্ম
- প্রতুল রীত

ভেবেছিলাম,এমন একটা ফুলের চারা লাগাবো
যার গন্ধ সমস্ত দুর্গন্ধ কাটিয়ে দেবে,
কিন্তু ,কিছু নতুন করতে পারলাম না।
আশা ছিল ধনী, গরিব -
সব মানুষই সমান,সম্মান এর কথা বলব;
হঠাৎ সদর দরজায় টোকা,
"এই যে মশাই হাত গুটিয়ে বসে থাকুন"
কিছু নতুন করতে পারলাম না।
বেকার দের মিছিল,
পা বাড়িয়েছিলাম আমিও-
এমন সময় দেখি,বড়বাবুর লাঠি,
পিছিয়ে আসি--
না,কিছু নতুন করতে পারলাম কই।
দিকে দিকে জায়গায়,
নারীদের ওপর অত্যাচার,
মনে করেছিলাম,কলমেই এর তুলব
অত্যাচারীদের মুখোশ
টেনে ছিঁড়ে দেব,
প্রতিবাদে মুখর হব,
কিন্তু ,হায়,কিছু নতুন করতে পারলাম না।।।

আজ শ্রমিক দিবস, আমার এই ছোট্ট প্রচেষ্টা সেই সব গরীব শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে, যাদের দুবেলা অন্ন জোটেনা,
এলেখা আজ তাদের উৎসর্গ করলাম......

ভাত
- সুমিতা সরকার ঘোষ

দ্বীপ আর তার মা সীমা এই নিয়েই তাদের সংসার, পাঁচ বছরের দ্বীপ ছোটবেলা থেকেই জানে তার বাবা নেই, মাকে ছেড়ে চলে গেছে অন্য জায়গায়, মা ভিক্ষে করে, চেয়ে চিন্তে এ বাড়ি ও বাড়ি একটু আধটু কাজ করে কোনোভাবে সংসার চালায়। মাঝে মধ্যেই না খেয়ে থাকে ওরা,

কিন্তু এবারে যেন একটু বেশিদিনই না খেয়ে রয়েছে, টানা তিনদিন না খাওয়া, চারদিকে শুধু অভাব, অভাব আর অভাব, যার বাড়ি খাবার চাইতে যাচ্ছে, সেই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিচ্ছে, খাবার নেই বলে।

মা মনে মনে শুধু বলছে হে ঈশ্বর, কেন জন্ম দিলে এই ছোট্ট শিশুটার?? এমন অভাগী মা আমি, যে দুবেলা ছোট বাচ্চাটার মুখে ভাত তুলে দিতে পারিনা।
এর চেয়ে আর কষ্টের কি আছে।

রোজই দ্বীপ বলে তাদের বাড়ি ছাড়িয়ে চার/ পাঁচটা বাড়ি পর একজন নতুন লোক এসেছে। আজ মনে সাহস করে সীমা সে বাড়ির দিকে পা বাড়ায়, যদি কিছু খাবার পাওয়া যায় এই ভেবে।

বাড়ির সামনে এসে কেউ আছেন বলতেই দরজা খুলে মাঝ বয়সী একজন লোক বেরিয়ে এলো, বললো কি চাই?? সীমা কাঁদতে কাঁদতে বললো, বাবু আমার এই বাচ্চাটা আজ তিনদিন কিছু খায়নি, যদি কিছু খাবার দেন, বড় উপকার হয়। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লোকটি ভাবল, সকালে একটা বিরিয়ানির প্যাকেট আনা হয়েছে কিন্তু সবটা খাওয়া হয়নি, প্যাকেটে খানিকটা এখনো আছে, দাঁড়াও বলে সে ঘরে ঢুকে গেল, কিছুক্ষণ পর বিরিয়ানির প্যাকেটটা এনে দীপের হাতে দিল।

ভদ্রলোক তার একজোড়া বুট জুতো এনে সীমার হাতে দিয়ে বললো, একটু ভাল করে পরিষ্কার করে দাও দেখি? পারবে? সীমা তার মনের মত যথাসাধ্য পরিষ্কার করে দিল।পরিবর্তে সীমাকে ভদ্রলোক কিছু চাল ডাল আর সবজি দিয়ে বলল, আজকের মতো এগুলো দিয়ে চালিয়ে দাও।

সেগুলো হাতে নিয়ে দ্বীপের সাথে ঘুরতেই লোকটা বললো দাঁড়াও মা, আমি এ বাড়িতে একাই থাকি, তিনটে ঘর আছে, তুমি তোমার ছোট্ট সন্তানটিকে নিয়ে কাল থেকে এবাড়িতেই থাকতে পারো। আমার রান্নার কোন লোক নেই, আমায় দুবেলা রান্না করে দেবে, আর দ্বীপকে আমি লেখা পড়া শেখাব। সীমা বাকরুদ্ধ।

বাড়ি ফেরার পথে ভাবল ঈশ্বরের এ কেমন পরীক্ষা?? কিছুক্ষণ আগেই তো সে তাকে অভিযোগ জানাচ্ছিল। আজ তিনদিন পর মা আর ছেলে দুটো গরম ভাত খেতে পাবে। আনন্দে দুচোখ জলে ভরে গেল।

দ্বীপ খেলে বেড়াবার সময় বিভিন্ন বাড়ির জানলা থেকে গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের গন্ধ পেত, কিন্তু চাইলে কেউ দিতো না, আজ অনেক দিন পর তারা গরম বকুল ফুলের মত সাদা ভাত খাবে।

শুধু আজ নয় এবার থেকে প্রতিদিন ওরা গরম ভাত খাবে, কারন মা যে নতুন বাবুর বাড়ি কাজ পেয়েছে। আনন্দে সীমা দ্বীপকে কাঁদতে কাঁদতে বুকে জড়িয়ে ধরল, আর মনে মনে বললো কে বলেছে ঈশ্বর নেই, মন দিয়ে ডাকলে সত্যি তাকে পাওয়া যায়।
বাড়ির দিকে পা বাড়াল সীমা।

০১.০৫.২০২০

লহ প্রণাম
– রোজী নাথ

কোনো এক সুগন্ধি বেলায় জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি আলো করে তুমি এসেছিলে।

তোমার জ্যোতির্ময় স্পর্শে এ ভূখন্ডের সাহিত্য সংস্কৃতি বিশ্ব দরবারে নতুন সূর্যোদয়ের বার্তায় আলোকিত হয়েছিল।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঔরষের আর সারদা দেবীর গর্ভের রত্নপ্রভ রবি চিরকালের বিশ্বকবি ।

প্রভাতবেলা থেকেই কাব্যবিলাসী মনের ভাঁজে ভাঁজে সুললিত জোছনার ছটায় বাংলা সাহিত্যে নবদিগন্তের উঁকিঝুঁকি।

পাঁচিল ঘেরা শৈশব মাভৈ মাভৈ করে সব বেরিকেড পেরিয়ে হয়ে গেল কী মহান ঋষিককাল।

তুমি শুধু তুমিই , অনাদি ছোঁয়া মহাসমুদ্র-মহাদিগন্ত।

অবরুদ্ধ বিদ্যেভ্যাস তোমার এই আলোকিত মনকে চিরন্তন স্রোত থেকে কখনো বিপথগামী করেনি বলেই তো তুমি শুধুই বিশ্বকবি ন‌ও , তুমি সনাতন গুরু।

কবিগুরু ,
পরাধীনতার গ্লানি থেকে মানবতাকে মুক্ত করতে তোমার এই প্রতিবাদী লেখনীর কাছে আমার যৎসামান্য হৃদয় চির অবনত।

কী নেই তোমার এই ট‌ইটুম্বুর মহাসমুদ্রে ?

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির বহতা নদী তোমারই অতুল স্পর্শে মহীয়সী গরীয়সী জলধি হয়ে গেছে।

আমার এই কিরাত দেশ‌ও তোমার চরণধূলিতে হয়ে উঠেছে পূণ্য দেবভূমি।

মাণিক্য রাজার উপাধিতে তুমি হয়ে উঠলে ‘ভারত ভাষ্কর ‘।

কোন অঞ্জলিতে আজ তোমার পূজার আয়োজন করি বলো?

জন্মদিনে আমার বিনম্র হৃদয় তোমার চরণে নতজানু।

লহ প্রণাম , লহ প্রণাম , লহ প্রণাম এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শৈবাল নদীর।

আবেগী
কলমে - সোমেন ঘোষ

আবেগের ছলে পা দিয়েছিলে
ঘুরেছো কত শত বার।
খুঁটি-নাটি সব জানতে চেয়ে
ভেঙেছো সীমা অধিকার।

তবুও পারনি ব‍্যক্ত করতে
নিজ মন সংকোচে,
অচেনা-অজানা কোন এক ভয়
বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেখনা হেথাই,বহুদিন প্রায়
সময় গেছে বয়ে।
দূরত্ব বুঝি শ্রাবণের ন‍্যায়
আবেগকে দেয় ধুয়ে।

অন্ন ও ধানকাটার দৃশ্য
- মোশ্ রাফি মুকুল

তারপর এ দৃশ্য অন্নের যোগান দেবে,পেট ভরবে মাথালহীন শহরের।ধানকাটার দৃশ্য তাই বেশ চলে।

উপস্থাপক অতিউৎসাহে টিভিরগন্ধমাখা মাইক্রোফোন এগিয়ে ধরেন কাঁচির ডগায়,চ্যানেলের জন্য পকেটভরে নিয়ে যান আপ্লুত কৃষকের,গ্রাম্যরমণীর ও কতোক কচিঘাসের ভিডিও।

তারপর সে হাইরেজুলেশান খবর আর বাসমতী চালের ভাত খেয়ে বাঁচেন মিডিয়া মালিক,কৃষিমন্ত্রী,চৌকস আমলা।ক্রমবর্ধমান সংবাদমাধ্যম এবং
হাইব্রীড নগরে এখন ধানকাটার দৃশ্য ও কৃষিসংবাদের তাই যথেষ্ট কদর।

৩০/০৪/২০২০.

মিছিল
- প্রসেনজিৎ ঘোষ

স্থির হয়েগিয়ছিল আমার দৃষ্টি
বিস্ফারিত হয়ে দেখেছিলাম তাকে
কেমন করে নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে তার মুষ্টিবদ্ধ হাত হাতুড়ির মতো বারংবার আকাশের দিকে নিক্ষিপ্ত হয় !
আর মনে হছিলো নৈরাজ্যের কালোআকাশ
এই বুঝি অবসান হলো!
মিছিলের হাজার হাতের ভিড়ে
তার হাত সকলের চেয়ে ছাপিয়ে গিয়েছিল,
কেমন করে কালো হরিণী চোখ সিংহীর ন‍্যায় জ্বলে উঠেছিল!
আমি বিস্ফারিত হয়ে দেখেছিলাম
ক্লান্তিহীন ভাবে তার পদ চলা
যা আমাকে রোমাঞ্চিত করেছিল !
বৈশাখীর পরন্তু সূর্যের আভা
তার মুখের'পরে পরে ছিল
মনে হয়েছিল সেই একটি সূর্য
যা একটি নতুন বিপ্লবের জন্মদেবে !
যার কন্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল বারংবার দেশ গড়ার ডাক,
যা আকাশ কে বির্দীন করেছিল!
স্থির হয়েগিয়ছিল আমার দৃষ্টি
বিস্ফারিত হয়ে দেখেছিলাম তাকে!
তার পর হারিয়ে গিয়েছিল হাজার হাতের ভিড়ে তার শোণিত দৃষ্টি!
আজও খুঁজি আমি তাকে
রাজপথে মিছিলের মাঝে!

শেষের কবিতা
কলমে - শৈলেন মন্ডল

রাতের নিস্তব্ধতায় পৃথিবীর বুকে একলা হেঁটে চলেছি তোমার ভালোবাসার অমোঘ আশায় ভর করে আমার কবিতার দেশে।

কবিতার বুকে এঁকেছি তোমায় অন্তর বিদারী রক্তক্ষরনের কত শত অার্তনাদের চুম্বন।

সহস্র অনুতাপ, সহস্র নেশাতুর চোখের কাতর আহ্বান আর সহস্র মর্মান্তিক যন্ত্রনাময় আত্মাভিমান।

আজ সবকিছু বিলীন হয়েছে তোমার অস্তিত্ত্বের মধ্যে। আজও সমানভাবে তোমার ওপর #বিশ্বাস, #আস্হা ও #ভালোবাসা সমান ভাবে বিরাজমান।

প্রতিদিন তোমার প্রতিমুখে মুখ ফেরাই আর ভালোবাসার রক্তিম গোলাপ দিই নিয়মিত তোমার হৃদয় আঙিনায়।

আমি তো একা দাঁড়িয়ে বেশ ছিলাম,তুমি ছদ্মবেশে ভালোবাসার ফুল মালা নিয়ে ডাকলে কেন আমায়?
বেশ তো ছিলাম বাতাসের মুঠোভরা ঘ্রান নিয়ে মৃত্যু আর মৃত্যুযন্ত্রনা উপেক্ষা করে।

এবার আমিও কবিতার দেশ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাই
না ফেরার দেশে।
তোমার কবিতার দেশের বেলাভূমিতে শেষ চুম্বন এঁকে দিতে চাই।

আমার শবদেহে থাকবে রজনীগন্ধা,চোখে থাকবে তুলসীপাতার আবরনী আর কিছু সুগন্ধী ও প্রজ্জ্বলিত ধূপ এবং নাক বন্ধ থাকবে তুলোর আস্তরনে। চিতার লেলিহান শিখায় ভরে উঠবে পরম উল্লাস।

#মেঘবালিকা!পরের জন্মে আমিও তোমার অপেক্ষায় অপেক্ষমান থাকবো।
আমি তোমায় দেখবো সুদূর নীল আকাশের
তারা হয়ে সুদূর হতে।

২৪.০৪.২০২০

কপাল খুঁড়ো
- সুমন মন্ডল

হায়রে আমার কপাল খুঁড়ো
করো কেন ক্ষতি।
ঘরে - বাইরে পথে ঘাটে
সর্বতরে অতি।

সেদিন কলেজ যাওয়ার পথে
সুন্দরী কে দেখি।
অনেক কষ্টে নম্বর মেলে
নিয়ে ছিলাম ঝুঁকি।।

ফোনের কথায় মহিত সে
হল সামনে দেখা।
কপাল খুঁড়ো বেকরা দিল
না বললো শিখা।।

আরো কত না শুনলাম
যখন যেথায় বলি।
পাড়ার হাদি না বললো
খেললোনা সে হোলি।।

প্রেম তো আর হলনা মোর
কপাল খুঁড়োর দোসে।
যৌবন টা কাটিয়ে দিলাম
ঘর অফিসে বোসে।।

শ' খানেক মেয়ে দেখলাম
সবার একটি কথা।
ছেলে দেখতে সুন্দর অতি
তবে টাক মাথা!

কপাল খুঁড়ো বাড়ে যদি
কিবা আমার দোস।
অকালে মোর চুল ঝড়েছে
কপাল খুঁড়োর রোষ।।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget