মার্চ 2020

প্রকৃতি
- সম্পা মাজী

আজ মানুষ গুলোকে খুব মিস করছে এই প্রকৃতি,
অন্যান্য বছরের মতো এইবছর ও এসেছে বসন্ত।
হাওয়া বিলাসী মন মাতানো দক্ষিণা বাতাসে সাথি করে,
ক্লান্ত কোকিল ডেকে চলেছে অবিরত মধুর সুরে।
নতুন পাতায় ভরে উঠেছে শীতে ঝরে যাওয়া ডালে,
পলাশ, শিমুল, কৃষ্ণচূড়া সেজে উঠেছে ফুলে ফুলে।
কিন্তু যাদের ছাড়া এই সৌন্দর্য এই সৌরভ সব বৃথা,
সেই প্রকৃতি প্রেমী মানুষ গুলোকে এখন যায় না দেখা।
আসেনি কেউ দেখতে এই বসন্তের সুন্দর রূপ কে,
উপভোগ করেনি কেউ এই প্রকৃতির সৌন্দর্য কে।
তবে পাখি আর ভোমরা এসেছে খবর নিতে,
শুনিয়েছে তাদের গুনঞ্জন, কিচিরমিচির কোলাহল।
মানুষের খবর জানতে চাইতে , বললে তারা , জানি না,
আমাদের আসা যাওয়ার পথে কিছু দিন কাউকে দেখছি না।
হঠাৎ যেন সমস্ত প্রকৃতি চেঁচিয়ে উঠল এক সাথে,
সত্যিই তো কেউ আসেছে না আমাদের বিরক্ত করতে।
ওরা ছাড়া এই পৃথিবীতে মূল্য নেই আমাদের,
আচ্ছা তেমন কোনো বিপদে হয়নিতো ওদের।
চলো এখন আমরা সবাই মিলে এই প্রার্থনা করি,
ওরা যেন সব বিপদ থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে তাড়াতাড়ি।
আবার এই পৃথিবীতে মানুষ আর প্রকৃতি একসাথে,
থাকবো মিলে মিশে একে অপরের পাসে।।

হিমেলা প্রভাত
কলমে - পায়েল সেন

প্রত্যুষের আলো মেখে পুবে উদীয়মান রবি
কুয়াশার চাদরে ঢাকা আড়মোড়া ভাঙছে প্রকৃতি
রজনীর আঁধার কেটে নতুন প্রত্যাশার ভোর,
হিমের সোহাগ মাখা পরশে বনানীর সমাহার।

পাহাড়ের ঢালে মেঘ-রৌদ্রের লুকোচুরি,
চা-বাগিচারা শীত ঘুমের দেশে দিয়েছে পাড়ি।
মনকেমন করা উঁচু-নিচু পথ একাকী
সারাদিন মিঠে রোদের ওম মাখে দেখি,
জানালার কাঁচে শেষ রাতের অবশিষ্ট ভালোবাসা
আলসেমি ভেঙে উষ্ণতার খোঁজে উত্তরের বারান্দা,
দূরে ডেকে ওঠা নাম না জানা পাখির কলতান
এক কাপ ধূমায়িত চায়ে দিন শুরুর আহ্বান।

তারিখ -২৮/১২/১৯

অভিপ্রায় ছিলো মনে মনে তোমাকে দেখা
গল্পের রানী ও গো প্রিয়াংকা, স্বভাবে যার কপটতা ।
তোমায় ভালোবাসি বলে, সতত তন্দ্রা যায় চলে
দিনগুলো কেটে গেছে মোর দুটি অক্ষির জলে।

নিজের শত কষ্টে কামিনী যায় যে হেঁসে
বাঁধ সাধে মন নেই কেন তুমি পাশে?
বাহুর জোরে অবিচার ভেঙ্গে চুরমার নির্লিপ্ত মন
সার্থক প্রেমের গল্প বিক্রিত আজ ধনীর হে ধন।

তোমার সব খবর এখনো শুনি অজান্তেই
আহা, টের পায়নি কেউ তোমার সেই ব্যবহার!
এমন কোন দিন নেই যে তোমায় নিয়ে ভাবিনি?
ঐতিহাসিক বাস্তবতা ও গো অস্তিত্বহীন এই তটিনী।

মৃত্যুর ক্রান্তিলগ্নে ও গো তোমায় ভালোবাসি
মনের জোরে বিছানায় শুয়ে তোমায় নিয়ে হাসি !
নিস্তব্ধ ভালোবাসায় যাচ্ছে মরে নেই কারো ক্ষতি
নরা অধম হয়ে রওনা, ও গো যাবো অমরাবতী।

বি.দ্রঃ [কাল্পনিক চরিত্রে ভালোবাসার কবিতা। ]

খুশির ছোঁয়া
- মৌ চক্রবর্তী

-'অ্যাই,ছুটকি তাড়াতাড়ি ঘরগুলো ঝাড়ু দে।তোর মেজোকাকা বেরুবে।'
মেজোকাকিমার কথায় লেপ ছেড়ে উঠতেই শুনল বড়কাকিমার গলা,'ছুটকি,রান্নাঘরে আয় জলদি,চা বানিয়ে ফেল,আমি একাহাতে আর পারিনে...'
'ছুটকিদিদি,বাসনগুলো বেসিনে রাখো' ঝি মালতি বলল।
ছুটকি সবার কথা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালায় দিনভর।শীতের এই কুয়াশামাখা সকালগুলো ওকে ভারী কষ্ট দেয়।ভাবে,মা বেঁচে থাকলে বিশু,সুমন,মতো লেপ মুড়ি দিয়ে সে পড়ত।আহা!পড়তে যে তার ভারী ভালো লাগে।
********************
একবছর গড়িয়ে আজও মাঘের কুয়াশাচ্ছন্ন সকাল।ছোটকার নতুন বউ এসেছে বাড়িতে।
'ছুটকি,ওঠ, লাইট জ্বালিয়ে পড়তে বস।চা
নে,একটুপরে আমি পিঠেপুলি দেব।বই ছেড়ে উঠবি না।'

ঘোরের মতো লাগে ছুটকির।জানালা খুলে বইয়ের পাতা মেলে। দূরে ঝাপসা খেজুরগাছ দেখতে গিয়ে তার চোখও ঝাপসা হয়।তবুও মনে খুশির ছোঁয়া লাগে।

28.12.2019

তোর হাতছানিতেই
- মোহন দাস
তোর হাত ছানিতেই বসন্ত বিকেলে
প্রেম মেখে সন্ধ্যা নেমে এলো
তোর হাতছানিতেই রাস্তার মোড়ের
নিয়নের বাতি উষ্ণতা পেলো ।
তোর হাতছানিতেই একাকী বালক
প্রেম লিখে দিলো এ চিরকুটে
তোর হাতছানিতেই ক্লান্ত কোকিল
ডেকে ডেকে ঘরে এলো ছুটে ।
তোর হাতছানিতেই ফুঁচকা চপে - র
দোকানে লাগলো দারুন ভিড়
তোর হাতছানিতেই ওই নদীর ধারে
থমকে গেলো নৌকা মাঝির ।
তোর হাতছানিতেই কবি বাসস্টপে
বসন্ত আসার গেয়ে ওঠে গান
তোর হাতছানিতেই প্রেমিক লোকে
ফাগুন নামে আগুন করছে দান ।।
22.02.2020  5:56 PM

সংসর্গ
- মোহন দাস
যখন হাইড্রার মত কর্ষিকা দিয়ে তোমার জেলিফিসের মতন শরীর
ঠিক চৌম্বকের মত কাপটে ধরে
রক্ত চুষা ভ্যাম্পায়ার হয়ে, তোমার শুভ্র পিঠ ও বুকের সবটুকু ঘ্রাণ
শুষে নিই একেবারে,
তখন আমার প্রাণ আগুন হয়ে যায়
তোমাকে নিঃশেষ করে দিতে ------
কখনো জ্বলতে জ্বলতে মাঝ রাতে আমিও প্রদীপ শিখার মতন
ধপ করে নিভে যায় ।
রক্তের উষ্ণতা কমতে থাকে,
হৃদস্পন্দনের আলোরন স্তব্ধ হ'তে হ'তে
স্রোতহীন নদীর মত হয়ে যায় ------
চোখের আকাশ জুড়ে রক্তিম গোধূলি কেটে গিয়ে, আঁধার নেমে আসে ।
তোমার স্পঞ্জের মতন দেহটি ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়
ঘরেতে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া বস্তু গুলো, স্পষ্ট হয়ে আসে আবার
পাশাপাশি দুটি নীরব নিথর মানুষ,
পড়ে থাকে কেবল ।।
27.03.2020  1:52 AM

শূন্য পথ
- মোহন দাস
বেলা শেষ,
ক্লান্ত পাখিদের প্রত্তুত্তরহীন
কাতর ডাকে ---
স্তব্ধ আকাশের ওই মেয়ে
কভূ ভালবাসেনি আমাকে ।
কেবল সন্ধ্যা ছুঁড়ে দিয়ে আজও
সুদূরের পথে হারায়
জানি দেখা পাবো, সে মেয়ের যদি
ওই রাস্তার মোড়ে দাঁড়ায় ।
আজ তাই আমি পথ হাঁটি
তাকে পাবো বলে ।।
27.03.2020  6:08 PM

কুয়াশা যখন
- লিপিকা ব্যানার্জী

কুয়াশায় মোড়া একটা স্টেশনে এসে ট্রেনটা থামল।জানলা দিয়ে দেখল নীতা -- জংশন।মানে নেমে চট্ করে এক ভাঁড় চা খেয়ে আসা যেতেই পারে।অনেকেই নামছে।

চায়ে চুমুক দিতে দিতেই কানে এল খুব চেনা একটা গলা।চোখ তুলে সামনের জনকে দেখে একটুখানির জন্য যেন তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেল।ধূসর অতীত কুয়াশাঘেরা সকালে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।দুজনেই বাক্যহারা।সুদীপই প্রথম কথা বলল " কি রে ,কেমন আছিস?" জবাব দেবার আগেই ট্রেনের হুইসল কানে এল।ভেতরের অভিমান,যন্ত্রনা কান্না হয়ে দলা পাকাচ্ছিল গলার কাছে নীতার।ছুট্টে উঠে পড়ল ট্রেনে।

কুয়াশাঘেরা প্ল্যাটফর্মে পড়ে রইল একটুকরো অতীত।চোখ বেয়ে জল নেমে এল নীতার।শীতের হিমেল হাওয়া চোখেমুখে আছড়ে পড়তে লাগল।মনে এল সেই চেনা কবিতাটা - "দেখা হল বছর কুড়ি পর,তুই এখন বড্ড ভীষন পর।"

তারিখ - 26.12.2019

অ্যাসিড
- সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী

দাঁড়ি পাল্লায় মাপা আইনে-
হয়তো কিছু টা সুবিচার পেল নির্ভয়া ।
স্বচ্ছ- সমাজ গঠনের স্বপ্ন টা ,
কিন্তু আজও রয়ে গেল অধরা ।
দৃষ্টান্ত মূলক শাসন - শান্তির জলে ,
যদি গোটা সমাজ টা শুদ্ধ হয় ।
তবে দিল্লীর থেকে কামুদিনী জুড়ে,
এখনও কীসের ভয় ?
অ্যাসিডে ধোয়া কত বিবর্ণ মুখ ,
আজও প্রতিবাদী মিছিলের অপেক্ষায় ।
সব ধর্ষণ ,পণ ,পরকীয়া কী
সংবাদের পাতা খুঁজে পায় ?
যখন অনুদানের চরণামৃত পাচ্ছে জনগণ,
আমলা বাড়াচ্ছে সঞ্চয় ।
তখন আইন কে দেখিয়ে বুড়ো-আঙুল টা,
অ্যাসিড তো পাওয়া যাবেই সস্তায় ।

২৬/0৩/২0২0

একুশ দিনের লড়াই
- কিরণময় নন্দী

একুশ দিনের কঠিন লড়াই
থাকতে হবে আপন ঘরে
একুশ দিনের নতুন জগৎ
নতুন করে চেনো পরিবারে।

ফিরে যাও সেই ছেলেবেলায়
নানান বই পড়তে থাকো
পরিবারের সবাই মিলে
টেলিভিশনে চোখ রাখো।

স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলো
সদাই থাকো পরিচ্ছন্ন
ত্রাণ তহবিলে দান করো
সবার মুখেই উঠুক অন্ন।

গল্প করো একসাথে
দেখতে থাকো এলবাম
একুশ দিনের কঠিন লড়াই
নিজের ঘরেই দিন কাটান।

শিশুর সাথে শিশু সেজে
কাটিয়ে চলো কয়েক প্রহর
একুশ দিনের লড়াই শেষে
আসবে এক সোনালী ভোর।

অপরূপা
- সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী

নীলাম্বরী নীল যমুনা নীলকান্তের জামদানি,
প্রকৃতির এই অপরূপ শোভা-
শুধু একা বসে দেখি আমি ।।

কোমল শ্যামল দূর্বা-দল সে তো পান্নার জামদানি,
দু-চোখ জুড়ানো সবুজের শোভা -
শুধু একা বসে দেখি আমি ।।

প্রজাপতির রঙিন -পাখা, রামধনু আঁকা জামদানি,
ধরণী-আকাশের মিলনের শোভা-
শুধু একা বসে দেখি আমি ।।

লক্ষ হিরে-মানিকে সাজানো প্রকৃতির সব জামদানি,
ডুব দিতে পার সে রূপের সাগরে-
যদি চোখ দু টি খোলা রাখ তুমি ।।

মাঝি সাঁতার জানো ?
- মোশ্ রাফি মুকুল

অবলীলায় বলে যাচ্ছি-
সাদাসোনা,চুন্নি,পান্নার মিথ।
এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলছি-
শ্বাসরুদ্ধকর কথার লোকগাঁথা,
কখনো পোখরাজ আনন্দে প্রজাপতির মথ হই,
জাগে উড়াবার নরম সাধ।
জলের ভেতর নুড়িপাথরের মতো-
গড়িয়ে গড়িয়ে চলা,
কোথায় সমুদ্রগামী ময়ূরপঙ্খী?
কোথায় হেরেমের দ্বিভুজ নদী?
দ্বিভাষী ঝিনুকের শরীরে
হীরক খোঁজো,মুক্তা খোঁজো?
নাজুক মাংসের আদিম পথে পথে-
যা আজোও লুকোনো;
কেনো এ কোলাহল বোঝোনা?
ডাঙার কৈলাশে অসম দাঁড় টানো-
মাঝি সাঁতার জানো?

হঠাৎ দেখা
- পিয়ালী মুখার্জী

জগিংএ যাওয়ার জন্য তৈরী হল পায়েল রায় । দরজা খুলতেই দেখে শীতের সকাল ,চারিদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা । দরজা বন্ধ করে পার্কের উদ্দেশ্যে রওনা হল সে । ঘড়ি দেখে আজ দশ মিনিট লেট। পার্কে ঢুকে জগিং শুরু করে দেখল পার্কে লোক কম বোধহয় ঘন কুয়াশার জন্যে ।
হঠাৎ দেখে পার্কের এককোণের বেঞ্চে বসে আছেন এক ব‍্যক্তি ,টুপি পড়া মাথাটা বুকের কাছে ঝুঁকে পড়েছে ।
পায়েল আরো কয়েক রাউন্ড ঘুরে এসে দেখল ভদ্রলোক সেইভাবেই বসে আছেন।
কৌতূহলবশতঃ ওই ব‍্যক্তির কাছে এগিয়ে গেল সে কুশলবিনিময়ের জন্য ।
ভদ্রলোক মুখ তুলে চাইতেই পায়েল দেখল একবছর আগে যাকে সে তার প্রেমিকের সাথে জোট বেঁধে খুন করেছিল সেই আবার ফিরে এসেছে তার পালাবার পথ রুদ্ধ ।
পথচলতি মানুষ দেখল একটি প্রাণহীন মেয়ে রাস্তায় পড়ে আছে বিস্ফারিত নয়নে । (১২০ শব্দ)

© পিয়ালী মুখার্জী ( তারিখ ২৪/১২/২০১৯ )

আমার কবি হতে মন চাই নি
- কিরণময় নন্দী

আমার কবিতায় ঘুম ভাঙেনি ওদের
আমার কবিতায় ভয় পায়নি মানুষখেকো হায়নাগুলো
আমার কবিতায় পারিনি প্রেম সৃষ্টি করতে
আমার কবিতায় "চোখের বালি" নগন্য ধূলো।

আমার কবিতায় পারিনি পৃথিবীর কষ্ট দেখাতে
পারিনি আমি ক্ষুদার্তদের কথা বলতে
আমার কবিতায় আসেনি আগামীর তিক্ত কথা
পারিনি আমি সত্যের দিশা দেখাতে।

কলম চালিয়েছি নষ্ট কাগজের বুকে
মন বলে,কবিতা লেখা হয়নি
ভয়ঙ্কর বাস্তব দাঁড়িয়ে অনতিদূরে
আমার কবি হতে মন চাই নি।

অসহ দৃশ্য ঝরে যায়
- অসীম দাস

মোলায়েম প্রীতি উপচে বহতা বান
পাওয়ার পক্ষে উড়ছি পায়রা ঘুড়ি ,
বীজের কোঁচড়ে ছায়ার অমৃত টান
বাস্তু স্মৃতিতে চাঁদের চড়কা বুড়ি !

কতটুকু খাই দরকারি প্রশ্বাসে ?
তমসুক শোধে রবিঠাকুরের গান ,
জলপটি ডাকে পড়শী কলসি পাশে
প্রতি প্রাতে ফোটে নিদ্রা-বৃন্তে প্রাণ !

ভোরের খুশিতে ছাপানো পান্তাভাত
অপত্য ছায়া বপনের খরতাপে ,
বিউলির ডালে উদরে শিশিরপাত
অসহ দৃশ্য ঝরে যায় সন্তাপে !

উটের গ্রীবাতে তবু জাগে সংশয়
ফেরাতে পেরেছি যতটা পেয়েছি দান ?
শেষ শ্বাস নিতে কতটা অকুতোভয় ?
তৃপ্তির ধ্যানে অভিলাষী অভিযান ।

#অগ্নিপরীক্ষা
#কৃদন্তী_ঘটক

বিশাল অডিটোরিয়াম কানায় কানায় ভর্তি । অসংখ্য মানুষ আজ নৃত্য শিল্পী দ্বী পানিতা রায় চৌধুরীর পুরস্কার বিতরন অনুষ্ঠানে এসেছেন । প্রখ্যাত নৃত্য শিল্পী দ্বীপানিতাকে সবাই একবার চোখের দেখা দেখতে এসেছেন । অসামান্য শিল্পী । অপূর্ব নৃত্য কলায় এই দেশের প্রতিটি মানুষ মুগ্ধ । যেমন দেখতে সুন্দরী তেমনি তার কলাকুশলতা । অসম্ভব ভদ্র নম্র দ্বীপানিতা ।
দ্বিপান্বিতা থাকেন এই শহরের প্রান্তে স্বামী শ্বশুর শাশুড়ি নিয়ে । এক পুত্র এবং কন্যা সন্তানের জননী । অথচ তাকে দেখলে জননী বলে মনেই হয় না । ছিপছিপে ত্বন্বী , মুসুর ডালের গায়ের রং , টানা টানা চোখ ছোটবেলা থেকেই নাচ করতে ভালোবাসত । দীপার প্রেম , দীপার প্যাশন বলতে নাচ । তাই মা বাবা খুব ছোট থাকতেই তাকে প্রখ্যাত নৃত্য বিশারদের কাছে তালিম নিতে পাঠান । সেই থেকে শুরু । স্কুল , কলেজ সব জায়গায় ই সে পরিচিতি এবং সমাদর পেয়েছে তার নাচের জন্য । তাল ,লয় যুক্ত গান হলেই তার পা স্টেপ মেলানোর জন্য উন্মুখ হয়ে পড়তো । দিন এভাবেই কেটেছে । বহু অনুষ্ঠানে সে অংশ গ্রহন করেছে । জেলার , অন্য শহর যেখানেই নাচের প্রোগ্রাম হয়েছে সে তার গুরুমার সঙ্গে নাচ করতে চলে যেত । সম্পূর্ণ সমর্থন করে তার পাশে থাকতেন তার মা আর বাবা । বাবা , মা চেয়েছিলেন দীপা যেন নাচ করেই নিজে স্বাবলম্বী হয় আর সে যেন একটা প্ল্যাটফর্ম খুঁজে পায় ।
মানুষ ভাবে এক আর হয় আর এক । এরকম ই এক নাচের প্রোগ্রামে দীপার মা বাবার সঙ্গে পরিচয় হয় অসীতাভ রায় চৌধুরীর সঙ্গে । অসীতাভ বাবু প্রস্তাব দেন তাদের কে যে তারা দীপা কে ছেলের বউ করে নিজের ঘরে নিয়ে যেতে চান । অসীতাভ বাবুর একমাত্র পুত্র অমিতাভ একটা নামি কোম্পানির উচ্চ পদে কর্মরত । দীপার বাবা মায়ের কোনো আপত্তি ই ছিল না । এত বড় ঘর আপত্তি থাকার ও কথা নয় । আর সবচেয়ে বড়ো কথা তারা সবাই দীপার নাচের কথা জানেন এবং এতে তাদের কোনো আপত্তি নেই ।
যথাসময়ে দীপা রায় চৌধুরী বাড়ির বৌমা হয়ে আসে । এই বাড়িতে এসে প্রথমে কিছুদিন তো কিভাবে কেটে যায় সে নিজেই বুঝতে পারে না ।অমিতাভ দীপা কে চোখে হারাতো। আদরে , মমতায় অমিতাভ তাকে ভরিয়ে রেখেছিল । নতুন বিয়ের উন্মাদনায় একবছর চলে গেল । এরপর তার কোলে এলো অর্ণব । অর্ণব কে বড় করার চিন্তায় দীপার সময় কাটে । পায়ে ঘুঙঘুর পরার সময় বা ইচ্ছে কিছুই থাকতো না । অর্ণব এর দুস্টুমি আর শৈশব নিয়ে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লো দীপা যে নিজের প্যাসন ই ভুলে গেল । অর্ণব একটু বড়ো হতেই কোলে এলো অমৃতা । সন্তান মানুষ করা এই কর্তব্য তার কাছে প্রাধান্য পেলো । শুধু কোনো সন্ধ্যায় , বা গভীর নির্ঘুম রাতে মাঝেমাঝেই তার মনে হয় এটাই কি জীবন । একমাত্র সংসার করা ই আমার কাজ ? মনটা কুরে কুরে খায় কিন্তু সংসার এর হাল ধরে রাখার দায়িত্ব ও যে তার তাই সে নতুন ভাবনা কে মনে স্থান দিতে পারে না । শ্বশুর শাশুড়ি এরাও বৃদ্ধ হচ্ছেন । তাই সংসারের হাল ধরে রাখার চেষ্টা করতে থাকে আর সংসারের গড্ডালিকায় তার প্যাশন কখন যেন হারিয়ে যায় সে নিজেও বুঝতে পারে না । সকলকে ভালো রাখার দায়িত্ব সামলাতে সামলাতে নিজেকে ভালো রাখার কথা তার আর মনেই পড়ে না । হাতের কাছে সবার সবকিছু গুছিয়ে রাখা , মুখের কাছে খাবার তুলে ধরা এই নিত্য কর্মের একঘেয়েমির মধ্যেই নাচের তালের স্টেপ কবে কোথায় হারিয়ে গেছে দীপা জানেই না ।
ছেলে অর্ণব এখন কলেজে উঠে গেছে আর মেয়ে অমৃতা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী । তাদের জামা কাপড় গুছিয়ে রাখতে গিয়ে আলমারির কোনায় অবহেলায় থাকা ঘুঙঘুর খুঁজে পায় । দীপা পায়ে পরে দেখতে চায় যে সে আজ ও কি নাচতে পারে ? পায়ে ঘুঙঘুর পরা মাত্র পুরোনো হারিয়ে যাওয়া প্যাশন তাকে আবার ওই জগতের দিকে টানতে থাকে । ঘরের কাজ ছেলে মেয়ের দায়িত্ব পালন সব কিছুর মধ্যেও সময় খুঁজে বের করে সে আবার নাচ প্র্যাকটিস শুরু করে । প্রথম কদিন অসুবিধা হয়েছিল এর পর থেকে আবার আগের মতোই সাবলীলভাবেই করতে পারছিল । ধীরে ধীরে দীপা আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করে ।তাই সন্ধ্যেবেলা ই দীপার অনুশীলনের সময় হয়ে দাঁড়ায় । কিন্তু দীপা যত সহজ ভেবেছিল বাস্তবে ততই কঠিন হয়ে দাঁড়ায় অনুশীলন । এতদিন ধরে সংসারে সময় দিয়ে সে এমন অভ্যাস করে দিয়েছে যে দীপার সারাদিন সকলের জন্য । তার নিজের জন্য সময় কাটানো যে খুব স্বাভাবিক তা তার শ্বশুরবাড়ির কেউ বুঝতেও চায় নি আর আজ ও কেউ বুঝতে চায় না । তাই দীপার অনুশীলন শুরু হলেই শ্বশুর মশাইয়ের চা তেষ্টা পায় , শাশুড়ি মায়ের কোনোদিন পায়ের ব্যাথা তো কোনোদিন ওই সময় ই কোনো রান্নার কথা মনে পড়ে । সবচেয়ে অসন্তুষ্ট হয় অমিতাভ । অফিস থেকে ফিরে বউয়ের নাচ প্র্যাকটিস তার কাছে ন্যাকামি ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না । একমাত্র অমৃতা কিছুটা মায়ের স্বপক্ষে থাকতো কিন্তু ছোট মেয়ের কথা কে শোনে । তাই বাড়িতে প্রতিদিন ই অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পেতো বিভিন্ন ব্যবহার আর কিছু কথায় । দীপা কারুর কথায় কান না দিয়ে সবাইকে সন্তুষ্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা করতো , কখনো অমিতাভ কে বোঝানোর ও চেষ্টা করেছে কিন্তু কোনো ফল পায় নি । এদিকে দীপা গোপনে একটি নৃত্য গোষ্ঠীর সাথে যোগাযোগ করে এবং সেখানে যোগ দেয় । সপ্তাহে সপ্তাহে সেখানে বিকেল হলেই চলে যেত এবং জোর কদমে নাচ প্র্যাকটিস করতো । ধীরে ধীরে কিছু কিছু অনুষ্ঠানে ও নাচ প্রদর্শন করতে থাকে যদিও বাড়িতে সে বিরূপ পরিস্থিতির ই শিকার হয় । এই ভাবেই দীপা আবার নাচের জগতে পা রেখে সংসার নিয়ে কোনরকমে চলতে থাকে ।
আজ কয়েক বছরের পরিশ্রমের ফসল হিসাবে সাফল্য ধরা দেয় দীপার জীবনে । সর্বভারতীয় সংগীত একাডেমী দীপার নৃত্য কে সম্মান জানানোর জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে । আজ দীপার জন্যই এই অনুষ্ঠান । ঢাকাই শাড়িতে নিজেকে সাজিয়ে দীপা পরিবার সমেত অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছে । যথা সময়ে দীপার নাম মাইকে ঘোষিত হয় । দীপা দৃপ্ত ভঙ্গিমায় সোজা হেটে স্টেজ এ এসে দাঁড়ায় । গোষ্ঠীর প্রধান দীপা কে পুষ্পস্তবক , মেমেন্টো , আর শংসাপত্র দিয়ে সম্মানিত করেন এবং তাকে কিছু কথা বলার জন্য অনুরোধ করেন । দীপা মাইক হাতে নিয়ে অত্যন্ত সহজ এবং দৃঢ় ভঙ্গিতে শুরু করে " মাননীয় সভাপতি ও অনুষ্ঠানে আগত দর্শক ,প্রথমে আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা গ্রহণ করুন । আজ আমি এই সম্মান পেলাম তার জন্য সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই । আজ আমি ভীষণ খুশি । কিন্তু এই দিন এসেছে আমার অনেক পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের ফলে । একটা মেয়ের লড়াই অনেক কঠিন কিন্তু আমি আর বুঝলাম একটি বিবাহিতা মেয়ের লড়াই আরো কঠিন । যে লড়াই এ বহু বিবাহিতা মেয়েরা জয়ী হতে পারে না । প্রত্যেকটি মানুষের জীবনে অনেক স্বপ্ন থাকে আর স্বপ্ন থাকা উচিত । কিন্তু স্বপ্নকে বাস্তবে রূপায়ণ করা যায় কঠোর পরিশ্রম , অধ্যবসায় আর লেগে থাকার চেষ্টায় । বিবাহিতা মেয়ের জীবনে থাকে সংসার তা সামলে রাখার দায় তার । কিন্তু সংসার সামলে ও নিজের প্যাশন বাঁচিয়ে রাখা যায় কিন্তু সেটা তখন ই সম্ভব যখন পরিবার তাকে সমর্থন করে , পাশে থাকে । একজন পুরুষের জীবনে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য মা বাবা , স্ত্রী পরিবারের সবার অকুন্ঠ সমর্থন থাকে যাতে একাগ্র চিত্তে সে সাধনা করতে পারে । একজন পুরুষ যদি বলে আমি নিজের কাজে ব্যস্ত তাকে তার কাজ করতে সবাই সমর্থন করে । তার কাজ কে ভীষণ গুরুত্ত দেওয়া হয় । তখন সে যদি সংসার কে অবহেলা করে তাতেও তাকে কোনো বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হয় না । একজন পুরুষের নিজের জন্য সময় থাকে এবং সে নিজের সময়কে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করতে পারে ।কিন্তু একটি মেয়ে আর সে যদি বিবাহিতা হয় তার নিজের স্বপ্ন বলতে কিছুই থাকতে পারে না , তার নিজের সময় বলতে ও কিছু থাকে না । তার শুধু সবাইকে নিয়ে সবার কথা ভেবে চলা ই জীবন হয়ে দাঁড়ায় । এর বাইরে তার সবকিছুই অস্তিত্বহীন । তাই একজন নারী তার স্বপ্ন , প্যাশন কে বজায় রাখার জন্য বারেবারে অগ্নিপরীক্ষা দেয় । যদি উত্তীর্ণ হয় মাথায় শিরোপা পায় আর উত্তীর্ণ না হলে হারিয়ে যায় তার স্বপ্ন , তার প্যাশন । কিন্তু পরিবারের কথাভেবে যে মেয়েটি সারা জীবন কাটিয়ে দেয় তার মুখের হাসি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য পরিবার কি একটু পাশে দাঁড়াতে পারে না ? সবাই একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেই মেয়েটি স্বপ্নের চূড়ো ছুঁতে পারে অনায়াসে । তাই আমি সকল মা বাবার কাছে এবং শ্বশুর শাশুড়ির কাছে আবেদন রাখছি সবাই বাড়ির , মেয়ে , বউয়ের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন । একটি মেয়ের স্বপ্ন পূরণ হোক অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে নয় । পৃথিবী পাল্টাক সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চিন্তা আর চেতনার পরিবর্তন ঘটুক । বাসযোগ্য হোক মেয়েদের জন্য এই পৃথিবী । অনেক ধন্যবাদ । নমস্কার " বলে দীপা স্টেজ থেকে নেমে আসে ।
দীপা পরিবারের সবার সঙ্গে অনুষ্ঠান শেষে গাড়িতে উঠে বসে । হটাৎ ড্রাইভার এর ডাকে সম্বিৎ ফেরে " ম্যাডাম বাড়ি চলে এসেছি " । তাড়াতাড়ি নিচে নেমে ঘরে ঢুকে যায় ।মন টা আজ বড় হালকা । কি এক ভালোলাগায় মন ভরে উঠেছে । দীপা পেরেছে । শাড়ি কাপড় ছেড়ে কিচেনে গিয়ে দেখে শাশুড়ি মা চা করছেন । শাশুড়ি মা দীপা কে বলেন মা আজ আমার হাতে চা খাও । সত্যি আমরা মেয়েরাও মেয়েদের কথা ভাবি না । এবার থেকে ভাববো । চ্যারিটি বিগিন্স এট হোম কি বলো বৌমা ? সবাই একসাথে হেসে ওঠে ।

পরিপাত্র
- মোশ্ রাফি মুকুল

সীসাগালা করে দূরে রাখি সন্দেহ-ভালোবাসার সমস্ত আপদ,
তবুও সরীসৃপ হয়ে গৃহে আসে শিষনাগ।
প্রেমের পরিপাত্রে উঠে আসে কালের পণ্য ও বিষম বিষ।

কতো জখমের চিহ্ন বয়ে যাই,
বয়ে যাবো আরোও আগুন ও এ প্রলুব্ধকাল।

প্রারম্ভের কবিতার মতো ভাষা ও ভাবনা এখানে বিপন্ন বা দূর্বল।
এখানে একই দিকে কিম্বা দু'দিকেই খোলা আকাশ ও আমিষের দোকান।
সে দিক থেকে তোমার আর আমার মাঝখানে তৃতীয় এবং একমাত্র সত্যটিই হলো শরীর!

'ভালোবাসা' নামের দৈত্যেটাই একদিন এখন ভয় দেখাবে সঙ্গীহীন মানুষদের।প্রেমের বিপ্লবও মেনে নেবেনা ক্ষত-বিক্ষত ও ভালোবাসায় ক্ষতিগ্রস্ত প্যান্ডেমিক জনসাধারণ।

২৩/০৩/২০২০.

জাহানকোষা বেলাইন
কলমে :- রুবি রায়

শীতে কাঁথা নিতে হলে
নেব নকশিকাঁথা |

বর্ষায় মাথায় দেব দুর্দান্ত
প্যাথেইন ছাতা |

সেনসু-র হাওয়া খেতে খেতে
খেলব আমি কেনডামা |

কোনো মোবাইল ক্যামেরায়
আমি তাকাই না |

ডিক ভ্যান ডাইন আমার
পিছন পিছন ঘোরে |

দেখব গ্লোয়িং মাশরুম
নিকোবর মেগাপড |

রূপ তো " সভ্য " রা দেখে
আর মন !

ও তো কোন জন্মেই " ছন্দা গায়েন "
তিথি পঞ্জিকাতেও খুঁজে পাইনা |

আমি জাহানকোষা-আ-আ
বেলাইনে চলব |

আমায় নিয়ে তখন --
হেড লাইন তৈরী হবে |

তারিখ:- ১১|১০|২০১৯
©রুবি রায়

বলৎকার
- লাজ্বাতুল কাওনাইন

ঢাকা থেকে নরসিংদী এর দূরত্ব আসলে ট্রেনে তেমন কিছুই না। ইচ্ছে করলেই পৌঁছে যাওয়া চলে প্রায় ঘণ্টা খানেকের ভিতরেই। তবে আমার বাসা থেকে রেলস্টেশন  পৌঁছানোর জ্যাম ঠেলা রাস্তা এরপর টিকেট এর ভ্যাজাল এরপর ট্রেনের দেড় থেকে দু'ঘণ্টা লেট সব মিলিয়ে এই এক ঘণ্টা হয়ে যাবে প্রায় পাঁচ ঘণ্টার ভ্রমণ। তবু কিছু করার নেই। অফিসের কাজে হঠাৎই যেতে হল আমাকে নরসিংদী। অবশ্য দিনটি ছুটিরই ছিল। প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে নিজের নির্দিষ্ট সিটে বসতে আমার প্রায় বিশ মিনিট লেগে গেলো। আমি অস্বস্তি বোধ করছিলাম। একজন বয়স্ক লোক বুঝতে পারলেন। খানিক হেসে বললেন,

-আপা আজ প্রায় ইদ ইদ ভাব।

-কেন ভাই?

-আরে বোন, আজ তো কোনো ভিড়ই না।

আমার পুরাই য়্যা মার্কা অবস্থা আর কি! ভিড়ই নাই। জানালার পাশে সিট পেয়েছি, মনে হচ্ছিল আহা মরুভূমিতে এটা যেন লোনা পানি হলে কিছুটা খেয়ে বাঁচতে পারবো। ভুল ছুটল খানিক বাদেই। যখন স্টেশন গুলোতে থামছিল ট্রেন। হুড়মুড় করে লোকজন জানালা গলে চলে উঠছিল ছাদে। লাথি গুঁতো লাগছিলো আমার গায়ে। আমি সরবোটা কই। হা করে দেখছিলাম। সেই ভদ্রলোক বললেন,

-আপা ব্যাগটা সাবধানে রাখুন। এক টানে দৌড় দিবে।

হঠাৎ কেমন অস্থির অসহায় লাগছিলো। এই বয়সে এসে বলতে মোটামুটি লজ্জাই লাগছে যে জ্ঞান হবার পর এটাই আমার প্রথম ট্রেন জার্নি। খুব ছোটবেলাতে বাবার সাথে পাকশি গিয়েছি ট্রেনে। সেটা কি মনে আছে না গল্প শুনে কল্পনা করি ঠিক বুঝি না, কেমন আঁধার আঁধার স্মৃতি। বাবা আমাকে কোলে নিয়ে দৌড়ে ট্রেন ধরতে যাচ্ছেন। আমি আহ্লাদী বাবার কাঁধ জোরে করে ধরে রেখেছি। আম্মা সাথে আছেন কিন্তু মনে করতে পারি না। এইটুকুই! আর দরকার হয়নি আসলে ট্রেনে উঠবার। আসলে আমার অদ্ভুত ব্যস্ত নিরস জীবনে শখের ভ্রমণ বলে কিছু নেই। প্রয়োজনের খাতিরে যতোটা যেভাবে চলতে হয় তাতেই হাঁপিয়ে উঠি। বাকিটা সময় আর নিজের বলে কিছু নেই। হঠাৎ অফিসের কাজ পড়াতে আর একা যাবার কারণে, একটু অকারণ আনন্দ লাগছিলো। মনে হচ্ছিল পথটুকুর সময় হবে একান্ত নিজের। আহা আজকাল আর একান্ত সময় তো পাইই না। কিন্তু এই মানব পেষণ আমাকে একান্তই বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা দিলো।

পৌঁছতে প্রায় দুপুর হল। সরাসরি অফিসেই গেলাম। ছুটির দিন হলেও অফিস খোলা। যা যা দরকারি কাজ সারতে প্রায় চারটা হল। পরিচিত একজন সহকর্মীকেও পেয়ে গেলাম। তার নিজের গ্রাম বটেশ্বর। বললেন,

-চলুন না হয় ঘুরে আসি। দারুণ শান্ত গ্রাম আমাদের।

-আজ আর হবে না। ছয়টার ট্রেন ধরতে হবে ঢাকার।

-চলুন আমরা ঘুরে এসে আপনাকে সাতটার ট্রেন ধরে দিবো।

-সাতটায় ট্রেন আছে নাকি?

-কি যে বলেন? আছে আছে....চলুন তো। আর তো আসা হবে কবে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনেক ব্যাপার স্যাপার আছে আমাদের প্রাচীন গ্রামটায়। হাজার বছর আগের...দেখে যান। আপনি তো হালকা পাতলা লিখেন, উপকরণ পেয়ে যেতে পারেন!

এই এক লোভ সামলানো আমার জন্য দায়। পুরাতন জায়গা জিনিস আমাকে আজব আকর্ষণ করে। চলে গেলাম সেই প্রাচীন গ্রামে। এতো নিরিবিলি এতো অদ্ভুত সুন্দর গ্রাম আমি কমই দেখেছি। সারাটা মেঠো পথের দুই ধারে শুধুই লেবু বাগান। বাতাসে কেমন প্রাচীন অজানা ঘ্রাণ। মনে হচ্ছিল শত বছর আগের এই গ্রামের যে ঘ্রাণ সেটা আটকে আছে এখনো। কেমন আবেশ তৈরি করে রেখেছে। ফাঁকে গ্রামের একটা হোটেলেই ভাত মাছে পেট পুরে নিলাম। নরসিংদী শহর থেকে বেশ দ‚রেই বটেশ্বর। ফিরবার সময় একটা বন মাড়িয়ে আসছিলাম। চারিদিকে কেউ কোথাও নেই। ঝিরঝির বাতাস।বিপুল গাছ ঘেঁষাঘেঁষি করে বাতাসে কি দারুণ সুর তুলছে। শুকনো পাতার চাদরে সারাটা পথ মুড়ানো। আমি হাঁটছিলাম আর মড়মড় করে পাতাগুলো ভাঙ্গার শব্দ আসছিলো। আরও খানিকটা সময় আমার থাকবার ইচ্ছে হচ্ছিলো। কিন্তু সহকর্মী আপার তাগিদে তাড়া করেই ফিরলাম। সাতটার আগেই ইস্টিশন থাকা দরকার। হঠাৎ একটু চমকে গেলাম। বড় একটা জাম গাছের আড়ালে একটা বাচ্চা ছেলে সাদা ছাগল বাচ্চাকে কোলে নিয়ে যে বসে আছে চোখেই পড়েনি। ঘাড় ঘুরিয়ে আমায় দেখল। আমি হেসে দিলাম। সেও ঠিক হাসল কিনা বুঝলাম না। তবে আবার বাচ্চাটিকে আদর করাতে ব্যস্ত হয়ে গেলো।

সাতটার দশ মিনিট আগে এসেই স্টেশনে ঢুকলাম। সাথে আপাটাও ছিলেন। তিনি বললেন আমাকে ট্রেনে তুলে তবেই যাবেন। কিন্তু হঠাৎই বাসা থেকে কল এলো তার ছোট মেয়েটা পড়ে দারুণ ব্যথা পেয়েছে। অগত্যা আমি তাকে চলে যেতে বাধ্য করলাম। এবার ট্রেনের পালা। কি হল ঢাকার ট্রেন আজ তো আর আসেই না। কেন তা কেউ বলতে পারছে না। তবে রাত দশটায় শেষ একটা ট্রেন তো আসবেই। এটা জানতে পারলাম। কেমন আজব লাগছিলো। বাসা থেকে উদ্বিগ্ন সব। আপাও বললেন থাক আজ চলে আসেন, কাল ভোরে যাবেন। আমার না একদম কারো কথাই শুনতে মন চাইলো না। মনে হল না আমি যাবো যতো রাতই হোক। এই ট্রেনেই ফিরবো। মোবাইল অফ করে দিয়ে স্টেশনের ওভার ব্রিজে বসে রইলাম। ব্রিজ ঘেঁষে একটা বিশাল নিম গাছ। বাতাসে ঝিরঝির করে শব্দ করে নুয়ে আমাকে ছুঁয়ে যাচ্ছিলো। কি যে ভাল লাগছিলো। মার্চ মাসের ভ্যাপসা গরমটা আরামদায়ক মনে হল। নিচে নারকেল চেরি খেজুর মোরব্বা হাবিজাবি দিয়ে ভাপা পিঠা বিক্রি হচ্ছে। কিনে খাওয়া শুরু করলাম। রাত প্রায় দশ। চা খেতে চাইছিলাম। স্টেশনের চা এর দোকানটা প্রায় বন্ধ হবার পথে। তবু বললাম,

-একটা পান দিন..

-আফা দুকান অপ দিসি!

-তো কি ভাই। ঢাকা যাবো। চা নাই ভাল পান ও যদি না খাইতে পারি আপনাদের দেশে এসে। আফসোস নিয়ে ফিরবো!

ছেলেটা হেসে দিলো,

-আফা এক কুটি টাকা দিলেও আবার পসরা বার করি না একবার গুছায় ফেললে। যান তাও দিলাম আপনারে।

খুব যতœ নিয়ে ছেলেটা পান বানিয়ে দিয়ে শুধু একটা কথাই বলল,

-আফা ফিরা যান। রাইতের এই ট্রেনটা ভালা না। খুন খারাবি থেকে নিয়্যা এরাম কুনুই খ্রাপ কাজ নাই যে এইটাতে হয় না। ভদ্রলোকের জন্য এই ট্রেন না। কাল খুব ভোরে ট্রেন আছে, যাইবেন গা। আইজকা কারো বাড়িত পরিচিত থাকলে চলে যান!

-হুম! আচ্ছা!

একটু ভয় ভয় পেলাম  স্বাভাবিক। কিন্তু কারো বাসাতে রাত কাটাবার মতো পরিচিত আমার কেউ এখানে নেই। আর নিজের বাসায় যে কাউকে বলবো, লাভ কি। দুর্ভাবনা বাড়িয়ে। আমাকে ঢাকা নিজেরই যেতে হবে। তবে রাত প্রায় সাড়ে দশ। চুপচাপ বসে আছি পা ঝুলিয়ে স্টেশনের বারান্দায় ! দূরে বাতির অপেক্ষায়। ট্রেন আসছে তবে সবই অন্য রুটের। ঢাকার ট্রেনের খবর নেই। রাত প্রায় পৌনে এগারো! হঠাৎ স্টেশনে কারেন্ট চলে গেলো। কেমন আলো আঁধার একটা পরিবেশ। স্টেশনে কি হঠাৎই মানুষ কমে গিয়েছে। কই খেয়াল করিনি তো। অবাক লাগছে। ঠিক ভয় না অস্বস্তি হচ্ছে। অস্থির হয়ে ঘড়ি দেখছি। মোবাইল চালু করতে চাইলাম কিন্তু চালু হয়েই বন্ধ হয়ে গেলো মানে চার্জ শেষ হয়তো। মোবাইলটা নষ্ট হল কিনা। অফ করার সময় কিন্তু অনেকখানি চার্জই ছিল। দ‚রে ট্রেনের আলো দেখা যাচ্ছে, সৃষ্টিকর্তাকে ডাকছি এবার যেন হতাশ না করেন। টুপ করে কারেন্ট এসে পড়লো আর হ্যা এইতো ঢাকার ট্রেন। অমা! হুড়মুড় করে দৌড়ে এতো লোক জমে গেলো কোথা থেকে ট্রেনে উঠবার জন্য। কেমন যেন অজানা একটা প্রশান্তি বোধ করলাম।

ট্রেনে উঠেই বুঝলাম চা এর দোকানের ছেলেটা খুব একটা ভুল বলে নি! কেমন একটু উড়া ধুরা টাইপ সব যাত্রী। একটা বোরকা পড়া গ্রাম্য নারী পুরোটা সিট জুড়ে ঘুমুচ্ছিলো। অপর পাশের সিটটা মনে হয় খালি পুরোটাই। মনে হয় বলছি কারণ মহা ঝামেলা! ট্রেনের বগিটার ভিতরে কোনোই আলো নেই। এই সময়ের লাস্ট ট্রেনটাতে কোনোই আলো নাকি জ্বলানো হয় না। গা ছমছমে অবস্থা। অঘটন যে ঘটে এটা নিশ্চিত হলাম। কিছু করার নেই, যেতে তো হবেই। ট্রেনও ছেড়ে দিয়েছে। মোবাইলের আলো জ্বালানোরও উপায় নেই, তবে পাশের সীটে ভাল হৈ চৈ! মাদ্রাসার কিছু কিশোর উঠেছে। সব সাদা ধবধবে আচকান আর টুপি। দারুণ দুষ্টুমি করছে। গল্প করছে। একজনের কাছে বোধহয় লুকানো মোবাইল ছিল। মাঝে মাঝে আলো  দেখা যাচ্ছে। বিদঘুটে ট্রেনের ভিতরটা তাতেই উজ্জ্বল হয়ে যাচ্ছে। আমার ভাল লাগছিলো, সাহস ও পাচ্ছিলাম বাচ্চাগুলোকে দেখে। আর ট্রেনে ভিড়ও নেই একদম। সবাই মনে হয় সীটে বসে যাচ্ছে কাউকে দাঁড়ানো দেখছি না।

সারাদিনের ক্লান্তিতে একটু তন্দ্রা মতো এলো কিনা! কোনো স্টেশনে থেমেছে। জানালা গলে বাইরের আঁধার ঘুমন্ত গ্রাম পথ দেখতে দারুণ লাগছিলো। আবছায়া সব তবু কেমন অদ্ভুত মায়াময় অনুভব হচ্ছে। বাতাসটা এতো দারুণ। হুট করেই খেয়াল করলাম আমার পাশের সীটে কেউ বসেছে। দেখে চমকে গেলাম। একটা বাচ্চা ছেলে হাতে একটা ছাগল শাবক! আঁধারে আমি বাচ্চাটিকে দেখতে পাচ্ছি না। তবে বুঝতে পারছি। সাদা আচকান আর টুপি পড়া ছেলেটা। মাথা নিচু করে ছাগল শাবককে আদর করছে আর চুপ করে বসে আছে। ও পাশে খেয়াল করলাম, কিশোর গুলো চুপচাপ। বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। ট্রেনটা খুব বেশী ধীর গতিতে যাচ্ছে। বাচ্চাটার সাথে কথা বলতে মন চাইছে। কেমন অদ্ভুতুড়ে পরিবেশে একটু কথা বলতে চাওয়াটা বোধহয় অ¯^স্তি কাটানোর জন্য অজানা মনের ছটফটানি।

-তোমার সাথে কে আছেন বাবু?

বাবু ডাক দেওয়া বাচ্চাটা আমার দিকে তাকালো না। বা কথাও বলল না! বিরক্ত হলাম খানিকটা। আজকাল বাচ্চাগুলো জানি কেমন। কথা বলে না, উত্তর দেয় না। আদরের মানে বুঝে না। নিজ মতো থাকে। হঠাৎ দুপুর কালের সেই বাচ্চাটার কথা মনে এলো। ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখছিল অদ্ভুত ভঙ্গিতে। এবার আরও উৎসাহে বললাম,

-তুমি একা?

-না!

এতো মিষ্টি কোনো বাচ্চার গলার স্বর হতে পারে ধারণা ছিল না। আরও কথা শুনতে ইচ্ছে করলো,

-তাহলে কে আছেন?

-ছাগল

-হুম! কোথায় যাবে তুমি?

-কোথাও না।

-তাহলে ট্রেনে যে...

-জানি না!

আজব তো! কথার মাথামুন্ডু বুঝতেই পারছি না। বাচ্চাটা বোধহয় কথা কম বলে নাকি হারিয়ে গিয়েছে নাকি জিদ্দি ধরনের কিছু বোঝার উপায় নেই। একটু হালকা করতে বললাম,

-যাবে আমার সাথে?

-না।

-কোথায় থাকো তুমি?

-জানি না!

-কিসে পড়ো?

-পড়ি না!

-হুম।

বুঝলাম কথা চালিয়ে যাওয়া আর চলবে না। সে বিরক্ত। আমিও চুপচাপ আবার জানালা গলে বাইরে তাকিয়ে রইলাম। কিন্তু কেন জানি বাচ্চাটার দিকেই মন পড়ে রইলো। হঠাৎ রিনরিনে মিষ্টি গলায় বাচ্চাটার গান শুনতে পাচ্ছি...

হায় রে! আমার একটা ময়না আছিল

ও সখী, আমার একটা ময়না আছিলো...

খাঁচাত তারে বাইন্দ্যা ছিলাম গো ওওঅঅ

অনেক কইর্যান আদর দিলাম গোওও..

শ্যাষের কালে, ও সখী! শ্যাষের কালে,

খাঁচা ভাইঙ্গা, ছুটেএএ চলে অচিনপুরে

এতো কাইন্দ্যা পাইলাম না আর তারে

সখী! আইন্যা দিবা কি তারে!

আমার জানের ময়নাটারে, গো সখী......

মায়ামোহ সুরে গান গাইছিল বাচ্চাটা। আমি তাকাচ্ছি না, ওর দিকে পাছে লজ্জা পেয়ে না থেমে যায়। চুপ করে শুনছিলাম। প্রায় ঢাকা এসে গিয়েছি বোধহয়। গান বন্ধ হয়ে গিয়েছি। তাকিয়ে দেখি বাচ্চা ছেলেটা পাশে নেই। আজব তো উঠে চলে গেলো নাকি। নামার তো কথা না। ট্রেন কোথাও থামেনি। বাচ্চা মানুষ চলন্ত ট্রেন থেকে লাফিয়ে নামার কথা না। অন্য কোনো সীটে গেলো কিনা। মনটা খারাপ লাগছিলো। কেন জানি না। আসলে অজানা আমরা। বিদায় নেবারও কথা না। আমিও আর বিরক্ত করিনি ওকে। তবু কি বিরক্ত হয়ে অন্য সীটে চলে গেলো। আঁধারে খুঁজে বের করাও যাবে না! যাক, পথের ক্ষণিকের ভাল লাগা কত কি তো আমরা হারিয়ে ফেলি অহরহ। যখন হারাই অস্থির হই। এরপর মানব চির স্বভাবগত কারণে সেটা ভুলে, নতুন পথে চলি। মাঝে সাঝে স্মৃতি হাতরাই। উদাস হই এই তো!

অনেক মাস পর, পত্রিকা অফিসে বসে পুরাতন পত্রিকা কিছু ঘাঁটাঘাঁটি করছিলাম। একটা নিউজ তৈরির জন্য খুব দরকার। দেশের খবর অংশে চোখ আটকে গেলো। একটা বাচ্চা ছেলে খুন হয়েছিলো...বছর চারেক আগে। ঢাকা নরসিংদী ট্রেনে ছেলেটা খুন হয়। খবরটা এমন যে, তার শিক্ষক তাকে বলৎকার করে, খুন করে চলন্ত ট্রেন থেকে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সবুজ ক্ষেতে একটা বাচ্চার লাশের ছবি দিয়ে খবর কভার করা হয়েছে। ইনসেটে বাচ্চাটার ছবি দেওয়া আছে। সেটাও খুব স্পষ্ট না। তবে বুকের ভিতর কেমন ধক করে উঠলো। সেই দুপুরের ঘাড় ঘুরিয়ে তাকানো বাচ্চাটার সাথে কি মিল আছে ছেলেটা। এটা একদম অসম্ভব। তবু মন মানছে না। আবার ভাল করে তাকিয়ে দেখলাম পুরো ছবিটা! আজব তো বাচ্চাটার লাশের চারিদিকে প্রচুর মানুষের ভিড়। এক কোণা দিয়ে একটুখানি একটা ছাগলের বাচ্চা দেখা যাচ্ছে ছবিতে। অস্থির লাগছে খুব অস্থির! সেদিন আর অফিসে থাকতে ইচ্ছে হল না আমার।

গল্প – শিউলি
- নাজির হোসেন বিশ্বাস

অনুপ, আমি নিজে মেয়ে দেখেছি! তোর ভাবনার কিচ্ছু নেই! তুই শুধু একবার যা, মেয়েটিকে দেখে আয়!
আমি কেন মা? তুমি তো দেখেছো, নিজে পছন্দ করেছো, যেতে হলে তুমি আর একবার যাও! আমার ইচ্ছে নেই!
তবুও মেয়ের তো একটা ইচ্ছে থাকতে পারে, উচ্চ শিক্ষিতা মেয়ে, সে ছেলে না দেখে, ছেলের সঙ্গে কথা না বলে বিয়েতে রাজি হবে এটা হয়না!
ঠিক আছে যাবো, তবে তুমিও চলো! আমি একা যাবো না!
সে কিরে? তুই শিক্ষিত চাকুরি করা একটা ছেলে, দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছিস, আর একা যেতে পারবি না?
মা, এটা পারা না পারা নয়! আমি আর কতক্ষন বাড়ি থাকি? তুমি তোমার বৌমার সঙ্গে বাড়িতে থাকবে! সেখানে তোমরা দুজনে বোঝাপড়া করে নেবে এটাই আমার ইচ্ছে!
মা, অনুপমা দেবী বলে উঠলেন - তা বেশ! তবে চল, কাল রবিবার বিকেলে!
তাই চলো মা, ওদের ফোন করে জানিয়ে দাও!
******************
এই যে আমার ছেলে অনুপ! তোমরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলে নাও ঐশি!
যূথিকা দেবী ঐশির মা বলে উঠলেন, যা ঐশি ওদিক থেকে ঘুরে আয় দুজনে!
চলুন ঐশি আমরা ওই গার্ডেনে যাই!
আসুন!
বাহ্‌ খুব সুন্দর বাগান তো! কত রকমের ফুল ফুটে রয়েছে বাগানে!
হ্যাঁ, বাবার খুব শখ! ফুল বাগান বাবার নিজের হাতে তৈরী! এই গোলাপ গাছটা বাবা জয়পুর থেকে এনে লাগিয়েছেন!
খুব সুন্দর!
কি সুন্দর?
ফুলের বাগান, আবার কি!
আচ্ছা, আর আমি?
সবটাই বলে দিয়েছি!
তাই বুঝি!
অনুপ বলে উঠল - হ্যাঁ, আসল কথায় আসি! আমাকে আপনার কেমন লাগছে, বলুন?
এমনিতে খারাপ না!
মানে? কিছুটা ভালো?
না মশাই, কিছুটা নয়, পুরোটাই খারাপ!
তাহলে তো হয়েই গেলে –
এই মা, কি হয়ে গেল? ঠাট্টাও বঝেন না?
বুঝি বলেই তো, হাঁসছি ম্যাডাম!
আচ্ছা আপনি যৌথ নাকি একান্নবর্তী পরিবার পছন্দ করেন?
যৌথ পরিবার ভালো লাগে!
কেন ভালো বলে মনে হয়?
সেখানে সবার সঙ্গে হেসে খেলে আনন্দে কাটানো যায়! বাড়িতে রোজ পিকনিক পিকনিক পরিবেশ, খাওয়া দাওয়া, বেড়ানো, খুব মজা হয়!
আমার পরিবারে কিন্তু মা ছাড়া কেউ নেই! বাবা ছোট বেলায় আমাদের রেখে কার এক্সিডেন্টে চলে গেছেন! আমি বাড়িতে খুব কম থাকি! পারবেন তো মাকে মানিয়ে নিয়ে থাকতে? একাকিত্ব মনে হবে না?
সে অভ্যাস হয়ে যাবে! মানুষ অভ্যাসের দাস!
মা কিন্তু খুব স্বাধীনচেতা মানুষ! খুব কষ্ট করে আমাকে মানুষ করেছেন! তাই আমি মা অন্ত প্রাণ! কোন আপত্তি আছে?
আমিও তাই, স্বাধীনচেতা! তবে মানিয়ে চলার মতো সহবত শিক্ষা আছে!
বেশ, তবে আসি আমরা?
আচ্ছা চলুন!
মা চলো যাওয়া যাক!
তাহলে দাদা আমরা উঠছি আজ, বাকী কথা ফোনে সেরে নেব কেমন?
আচ্ছা দিদি আসুন!
*****************
আজ তিন মাস হোল, অনুপ বিদেশে! এই ভাবে একা একা বড্ড বোরিং লাগে, একটা কিছু করলে তো সময়টাও কাটে, একটু ব্যস্ততার মধ্যে মনটাও ভালো থাকে! মাকে প্রস্তাব দিয়ে দেখি কি হয়!
নে পায়েসটা খেয়ে নে!
কেন মা? তুমি পায়েস করতে গেলে কেন?
আজ তোর জন্মদিন না?
হ্যাঁ মা কিন্তু, তুমি জানলে কি করে?
কেন ফেসবুক শিখলাম না? ওখানেই তো নোটিফিকেশন দেখলাম! এটা আমার সারপ্রাইজ!
তুমি সত্যিই আমার মা, তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ! ঐশি মনে মনে ভেবে নিলো তার প্ল্যানটা এখনি শাশুড়ির সঙ্গে শেয়ার করে নিতে, একটা কথা বলবো মা?
না! এখন কোন কথা নয়! পায়েসটা খাও, যা কথা আছে রাতে হবে! বলে অনুপমা দেবী গটগট করে তাঁর ঘরে চলে গেলেন!
*****************
বিকেল বেলা ঐশি রেকর্ড প্লেয়ারে রবীন্দ্র সঙ্গীত শুনছেন নিবিষ্ট মনে! “কতবারও ভেবেছিনু আপনা ভুলিয়া, তোমারও চরণে দেব হৃদয়ও খুলিয়া….”
এমন সময় শাশুড়ি অনুপমা দেবী ডেকে উঠলেন, ঐশি চলো একটু বাইরে যাবো আমরা!
এখন কোথায় যাবো মা? কেন?
আমি নিচে বসছি, তুমি পাঁচ মিনিটে তৈরী হয়ে এসো!
বলা নেই, কওয়া নেই, কোথায় যেতে হবে এখন আবার! মা, কি পরবো শাড়ি? নাকি চুড়িদার?
তোমার যা খুশি, তবে একটু সেজে নিও ভালো করে, আমি অপেক্ষা করছি!
ঐশির চেহারাটা বেশ সুন্দর, স্মার্ট! একটা আভিজাত্যের মোড়কে আবৃত! দেখলে সমীহ জাগে!
****************
এই যে উনারা এসে গেছেন, আসুন আমরা ফিতে কেটে উদ্বোধনিটা সেরে নিই আগে! তারপর ভেতরে যাবো! আসুন!
অনুপমা দেবী বলে উঠলেন, ঐশি এদিকে এসো, তুমি ফিতে কাটো! ঐশি ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না, এটা তো সাজানো গোছানো একটি কাপড়ের নতুন দোকান!
গ্লো সাইন বোর্ডে লেখা “ঐশি ব্লাউজ মিউজিয়াম!” ফুল দিয়ে সাজানো, লাইটিং জ্বলছে! গুনগুন করে রবীন্দ্র সঙ্গীত চলছে! কাচের শো কেস, ক্যাশ টেবিল, কাঠের পলিস করা আসবাবপত্রে সাজানো দোকান, নয়নাভিরাম পরিবেশ! ঐশির মনে ধরেছে ব্যপারটা!

এসো ঐশি!
হ্যাঁ মা আসি!
বাহ্ খুব সুন্দর হয়েছে!
আসুন আসুন ম্যাডাম!
এই যে কাঁচিটা দিয়ে ফিতেটা কেটে দিন!
ফিতে কাটার সঙ্গে সঙ্গে ফুলের পাপড়ি ঝরে ঝরে মাথায় গায়ে পড়লোঐশির! এই ব্যবস্থাপনায় বিমোহিত ঐশি! কিন্তু তার বিস্ময় কাটছে না!

অনুপমা দেবী বলে উঠলেন- ঐশি, তুমি ক্যাশে বসো!
মা, এত সুন্দর সাজানো দোকান, নতুন ঝকঝক করছে! কার এ দোকান?
কেন? সাইন বোর্ড দেখোনি? এটা তোমার দোকান! বাড়িতে একা একা বোর ফিল করছো, তাই এটা তোমার জন্য, তোমার জন্মদিনে অনুপের দেওয়া সারপ্রাইজ! পছন্দ হয়েছে?
ভীষন পছন্দ কিন্তু অনুপ এই সব করেছে?
হ্যাঁ, অনুপ করেছে ম্যাডাম, বলে মিটমিট করে অনুপ অদূরে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে হাঁসছে!
এ কি অনুপ তুমি? কখন এসেছো?
আমি সেই সকালে ল্যান্ড করেছি ম্যাডাম! সরাসরি দোকানে এসে, দোকান সাজিয়েছি মনের মত করে! সবটা তোমার জন্য! টাকা আয় মুখ্য নয়, তোমার সময়টা সুন্দর কাটবে, পাঁচজন ছেলেকে নিয়োগ করেছি এই কাজে! তুমি শুধু ইচ্ছে হলে, বিকেলটা এসে একটু দেখবে, ব্যাস! সব কম্পিউটারাইজ সিস্টেম! কোন ঝামেলা নেই! হিসাব রাখার মাথা ব্যথা নেই! ভেরি সিম্পল!
বাহ্ দারুণ ব্যাপার! আমি এই ধরনেরই একটা কিছু ভাবছিলাম, এ যে মেঘ না চাইতেই জল! আমি ভীষন খুশি অনুপ! অনেক ধন্যবাদ! তোমাকে পাওয়াটাও আমার কাছে অহংকারের!

অনুপ বলে উঠলো, মা, এবার আমরা উঠবো! চলো বাড়ি যাই! খুব টায়ার্ড লাগছে! চলো ঐশি! তিনজনে একসঙ্গে বাড়ি ফিরলো!
******************
অনুপ জানতে চাই, একা থাকতে খুব কষ্ট হয় ঐশি? আমারও তোমার জন্য, মায়ের জন্য খুব মন খারাপ করে! থেকে থেকে মনে হয় চাকরী ছেড়ে চলে আসি! দীর্ঘদিন ধরে বাইরে পড়ে থাকা ভালো লাগে না!
ঐশি বলে, মন খারাপ তো করেই, কিন্তু চাকরি ছেড়ে বাড়ি বসে থাকলে হবে? মায়ের সঙ্গে গল্প আড্ডা দিয়ে আমার আনন্দেই কেটে যায়, শুধু রাতের বেলা তোমাকে খুব মিস করি! এই শোন না, তোমরা মা-ছেলে মিলে আমাকে সারপ্রাইজ দিলে, মনটা ভরিয়ে দিলে; আমারও তো একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার আছে, নেবে না?
সে কি! বলো কি ব্যাপার? কি দেবে দাও বলে- ঐশীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসে হাত পাতলো অনুপ!
আরে সব জিনিস কি হাতে দেওয়া যায়? উঠে বস! তারপর বলছি!
হ্যাঁ, এই বসলাম এবার বলো!
এখানে কান পেতে শোন দেখি, তোমার সন্তানের স্পন্দন টের পাচ্ছো কিনা?
আরে কি আনন্দ! আমি বাবা হতে চলেছি? বলে ঐশিকে কোলে তুলে এক পাক ঘুরিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে , মা মা শুনছো? তাড়াতাড়ি এই ঘরে এসো, তাড়াতাড়ি মা!
হ্যাঁ, কি হোল এত ডাকাডাকি কেন?
মা তুমি ঠাম্মা হতে চলেছো, ঠাম্মা!
সে কিরে আমাকে তো বলিস নি?
এটা আমার দেওয়া সারপ্রাইজ মা!
অনুপমা দেবী বললেন, তোরটা বেস্ট! আই লাভ ইউ ঐশী! বলে মাথায় স্নেহ চুম্বন এঁকে দিলেন! আজ থেকে তুমি আমার হেপাজতে থাকবে, তোমার চব্বিশ ঘণ্টা যত্ন নেবার জন্য আমি আছি, ঐশি!
অনুপ বলে, মা তুমি সব পারবে? বরং একজন আয়া রেখে দাও! আমি থাকবো না, তুমি কি করে সবদিক সামলাবে?
তোর মা, সব পারবে, তুই ভাবিস না! ঐশি অনুপ চল খাবার টেবিলে, আর দেরি নয়! খেয়ে নিয়ে শুয়ে পড় সব তাড়াতাড়ি! আজ তোর খুব পরিশ্রম গেছে!
চলো মা খিদেই পেট চোঁ চোঁ করছে!
******************
দশটা মাস ঐশির সেবা যত্নে অনুপমা দেবী কোন ত্রুটি রাখেন নি! তার খাওয়া দাওয়া, রুটিন মাফিক চেক আপ সবটা নির্ভুল ভাবে সম্পন্ন করেছেন! অপারেশন থিয়েটারের বাইরে তবুও উদ্বিগ্ন চিত্তে অনুপমা দেবী পায়চারী করছেন! অনুপও অল্প সময়ের মধ্যে চলে আসবে! ঐশির মা বাবা বারবার অনুপমা দেবীকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, সব ঠিক হয়ে যাবে দিদি, আপনি ব্যস্ত হবেন না, টেনশেন নিবেন না, তবুও অনুপমা দেবীকে বড্ড অস্থির লাগছে!
১২ নং বেডের রুগীর বাড়ির লোক কে আছেন?
ঐশির বাবা এগিয়ে গিয়ে জানতে চাইলেন, হ্যাঁ, সিস্টার আমরা আছি, কেন বলুন তো? রুগী কেমন আছে সিস্টার?
এই মেডিসিনটা এক্ষুনি এনে দিন! আর ব্লাড লাগবে বি (+), রেডি রাখুন!
ব্লাড? দেখি ব্লাড ব্যাঙ্কে পাই কিনা?
না স্যার, ব্লাড ব্যাঙ্কে নেই! আপনারা অন্য কোথাও দেখুন!
আচ্ছা আমি যদি দিই হবে না, সিস্টার? আমার বি(+)!
নিশ্চয়ই হবে! কোথাও যাবেন না, প্রয়োজন হলেই ডাকবো!
অনুপমা দেবী জানতে চাইলেন, ওর রক্ত লাগবে কেন? ঐশি কি ভালো নেই? সিস্টার? প্লিজ বলুন?
আপনারা শান্ত হোন, ডাক্তার বাবু দেখছেন তো, কোন ভয় নেই!
ডাক্তার বাবু, সিস্টার সবাই এক সঙ্গে ও.টি থেকে বেরিয়ে এলেন, এবং সিস্টার ডাক দিলেন, ঐশির আত্মীয় স্বজন কে আছেন?
অনুপমা দেবী, যূথিকা দেবী এক সঙ্গে বলে উঠলেন আমরা আছি সিস্টার, কি খবর বলুন প্লিজ!
আরে মিষ্টি আনুন, আপনাদের মেয়ের মেয়ে সন্তান হয়েছে, দুজনে ভালো আছেন, একটু পরেই বেডে দেবে, আপনারা যেতে পারেন!
অনুপমা দেবী হাসি মুখে বলে উঠলেন, মিষ্টি অবশ্যই খাওয়াবো, সিস্টার, আগে আমাদের দিদি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে দিন, ওর মিষ্টি মুখটা আগে দেখি আমরা!
অবশ্যই অবশ্যই এবারে যান ৩ নং রুমের ১২নং বেডে!
মা, মা ঐশী কেমন আছে মা? আমি এসে গেছি মা, আর ভয় নেই তোমাদের!
অনুপমা দেবী বলে উঠলো, অনুপ এসেছিস, আয় আয় তোর মেয়ে হয়েছে, তুই আজ থেকে মেয়ের বাবা! ওরা সবাই মিষ্টি খেতে চেয়েছে, মুখটা দেখে যা মিষ্টি নিয়ে আয়!
হ্যাঁ যাবো মা, আগে ঐশিকে একবার দেখে যায়, কেমন আছো ঐশি? ঐশীর হাতটা অনুপ হাতের মধ্যে নিয়ে জানতে চাইলো! আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছো? তোমার মেয়ে ঠিক ওর টাম্মার মত হয়েছে দেখতে! না অনুপ?
অনুপমা দেবী বলে উঠলো, কেন রে আমার দিদি ভাই আমার মত হবে নাতো কার মতো হবে শুনি? ওটাতো আমার আত্মজা আমিই ওকে আমার মতো করে গড়ে নেব, দেখিস তোরা!
অনুপ বলে উঠলো, সে তুমিই তো ওকে বড় করবে, মানুষ করবে; কিন্তু মা মেয়ের একটা নাম দাও!
নাম আমি দেব বলছিস? মেয়ের দিদা, দাদু আছেন উনারাই নামকরণ করুন! আমি সেই নামেই ডাকবো!
না, দিদি তা হয় না, আপনি নামকরণ করুন! যূথিকা দেবী অনুপমা দেবীর মুখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে কথাটা বললেন!
বেশ তবে তাই হোক, ওর নাম এখন আমি ঠিক করছি, তবে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নামকরণ হবে! ওর নাম হোক শিউলি! শরৎ এলে শিউলি ফুল, আর মা দূর্গার আগমন দুইয়ের মেলবন্ধন করবে আমার দিদিভাই!
বাহ্ খুব সুন্দর নাম দিলে মা, আমার খুব পছন্দ হয়েছে নামটা!
দিদি সত্যিই খুব সুন্দর নাম বাছলেন, আমাদের দিদি ভাইয়ের নাম সার্থক হোক!
আর বকবক করিস না যা অনুপ, মিষ্টি এনে সিস্টারকে দিয়ে দে আগে, তারপর আমরা সবাই বাড়ি যাবো, দিদি ভাইয়ের জন্য ঘর সাজাতে হবে, এখন আমার অনেক কাজ, বুঝলে বাবা?
*********************
অনুপ গাড়ি একেবারে গেটের কাছে লাগাতে বল, ঐশির পক্ষে বেশি হাটাহাটি করা ঠিক হবে না!
তাই আছে মা, বড় গাড়ি এনেছি আমরা সবাই একই গাড়িতে যেতে পারবো মা!
মা, আমার একটি কথা বলার আছে, তোমরা সবাই আছো তাই আমি এখানেই বলছি, আমি আর বিদেশে যাচ্ছি না, এখানেই থাকবো শিউলিকে ছেড়ে আমি থাকতে পারবো না! আমার যা যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা তাতে এখানেই একটি ভালো চাকরি পেয়ে যাবো, কোন অসুবিধা হবে না!
ঐশি বলে উঠলো মেয়ের জন্য তোমার সত্যিই আর বাইরে যাওয়া হবে না, তাছাড়া ব্যবসাটাও তো দেখতে হবে, খুব ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছো অনুপ, কি বলো মা?

বেশ তাই হবে তুই যা ভালো বুঝবি করবি, আমরা এবার যাবো সব গুছিয়ে গাড়িতে তুলে নাও! দিদি ভাইকে আমাকে দাও, কি হোল দিদি ভাই? কিরে অনুপ তোর মেয়েতো আমার হাতের মধ্যে আছে তো মনে হচ্ছে আঁজল ভরা শিউলি ফুল!
জানিস ঐশি, মেয়ে জন্মালে অনেকে মুখভার করে, আমার মনে হয় মেয়েরা পৃথিবীর সৃষ্টিকে অবিনশ্বর করে, অমর করে, উজ্জ্বল করে! তাই কন্যা সন্তান আমার অন্ধকার ঘরে আলোর রোশনাই হবে!
সকলে রওনা দিলেন বাড়ির উদ্দেশ্যে খুশির বার্তা ছড়াতে ছড়াতে ………!

অন্তর্দৃষ্টি
কলমে - তনিমা রায়

"আরে !!আরে , আরে
চেইন টানছ কেন।?সবাই এবার পেটাবে। কোথায় চললে--একি ব্যাগ ট্যাগ ফেলে রেখে --সোনার সোয়েটারটা নিয়ে চললে কোথায়?দ্যাখো কান্ডখানা দ্যাখো একবার--"
মৌসুমী অনিকের কথার জবাব না দিয়ে ট্রেন থেকে নেমেই দে দৌড় ।
অনিক বিস্ফারিত দৃষ্টিতে দেখল মৌসুমী এই কনকনে ঠান্ডায় নিজের গায়ের মোটা ভারী শালটা এক বৃদ্ধের গায়ে জড়িয়ে দিল।আর সোয়েটারটা ওনারই পাশে শুয়ে থাকা শীতে প্রায় কুন্ডলি পাকানো বাচ্চাটির গায়ে জড়িয়ে দিল। ট্রেনের প্যাসেঞ্জারের চিল্লামেল্লি পেছনে ফেলে অনিকের বুকের মধ্যে এসে তীরের মত বিঁধল মৌসুমীর এই কাজ।
অনিক এবার মুখ খুলল -"এভাবে তুমি কতজনের উপকার করবে ।?পৃথিবীতে লোক কত আছে জান ?
"কি করব বলো !!চেষ্টা করেও মনটাকে যে মানাতে পারি না।"
মৌসুমীর কানের কাছে মুখ এনে অনিক বলল "দ্বিতীয়বার নতুন করে আবার ভালবেসে ফেললাম তোমাকেই" ।

তারিখ-24/12/2019

রাজযোটক চিরন্তন
- শম্পা বিশ্বাস

সব সম্পর্কে লেখা থাকে না যোটকচিহ্ন ;
সব সম্পর্ক গড়ে ওঠে না পক্ষ গুনে গুনে
এবং সব সম্পর্ক অটুট প্রতিজ্ঞাটাই করে।

তারপর জীবনের রামধনু বিশ্লেষণ করতে চাইলে
সম্পর্ক চলে যায় ঘুণের হেপাজতে।
নিশ্চয়তা-অনিশ্চয়তায় দোল খাওয়াতে থাকে তাদের,
যারা অাঁকতে ভালোবাসে বলেই করে থাকে রঙের কদর।

একমাত্র রাজযোটকই চিরন্তন।
ঘুণের মুখ থেকে হাত ধরে বেরিয়ে আসে।

শিক্ষিত ?
- সোমেন ঘোষ

আমরা কি এতটাই অবহেলিত?
সমাজ কেন প্রশ্ন তোলে-
বারে বারে?
কতই না বাহবা পেয়েছি
ছাত্র সমাজে।
তবে কী,সে সবই মিথ‍্যে?
আমাদের কী অধীকার নেই?
ভালোবাসবার।
নাকি পারবোনা
-দায়িত্ব নিতে।
আমরাও তো রক্তে মাংসে গড়া,
আমাদেরও মন আছে।
স্বপ্ন তো অনেকই থাকে,
সবই কি সফল হয়?
নাকি স্বপ্ন দেখা অন‍্যায়
আজ--
কী আমরা অসহায়?
কিছু কী করবার নেয়?
নাকি মেনে নেব সব মুখ বুজে,
আজকের এই শিক্ষিত সমাজে।
নাইবা হল সরকারি চাকরি,
তাই বলে কী পাবনা মান?
স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরী
দেবেনা,শিক্ষিত বেকারের দাম?

কেন ?
- সঞ্জয় চক্রবর্ত্তী

"মা"কে নিয়ে বলা মনের যত কথা,
"মা " কে নিয়ে লেখা সমস্ত জয়গাঁথা ।
কতকে রয়েছে সুপ্ত স্নেহানুভূতি ,
কতকে রয়েছে ব্যথা ।
"মা " তো রয়েছে চেতন-অচেতনে ,
তোমার স্বত্ত্বা জুড়ে, তোমার মননে ।
তোমার কাব্যে, তোমার কৃষ্টিতে ,
পরমা প্রকৃতি রূপে জীবের সৃষ্টিতে ।
পাষাণ- প্রতিমায় তুমি মা জগৎ জননী ,
আবার দশভুজা রূপে তুমি মোক্ষদায়িনী ।
তোমার কোল জুড়ে আমার শৈশব ,
মায়ের প্রতিবাদের ধ্বনিতে বিপ্লবের গৌরব ।
মায়ের চরণ-তল বিধাতার সাধন-আশ্রম ,
কেন তোমার ঠিকানা তবে নিঃসঙ্গ বৃদ্ধা শ্রম ।

১৯/০৩/২০২০

কেমন আছো
- অসীম দাস

কেমন আছো এই আমিটা ?
খানিক চেনা মনের ভিতর
কিংবা কোনও নদীর উপর
বৈঁচি প্রেমের ঝর্ণা তলায়
বন্ধু তোমার বিদায় বেলায় ।

কেমন আছো যম দ্বিতীয়ায় ?
গোধূলতলায় ফুলবাগিচায়
সন্ততি তোর দুধে ভাতে
অধিক রাতে শিশিরপাতে ।

কেমন আছো পিতৃকাঁধে ?
বানভাসি তোড় বন্যা বাঁধে
বসুধা-ভূক মাতৃশোকে
পথ ভোলানো পড়শি চোখে ।

কেমন আছো ঘোর বিষাদে ?
শুকনো শাড়ির বিকেল ছাদে
সোনার হরিণ পাওয়ার আশায়
স্যাঁতসেঁতে সুখ ছোট্ট বাসায় ।

কেমন আছো হাসপাতালে ?
কাজ হারানো অন্তরালে
মঞ্চে উঠে পদ্যপাঠে
আলেয়া ডাক ধূ ধূ মাঠে !

কেমন আছো এই আমিটা ?
রাত্রি জাগা ভোর আঁচলে
শ্মশান ঘাটে হরির বোলে
টিপ কপালে মায়ের কোলে
জমাট জীবন জলদি গলে'
কেমন আছো ?
কেমন আছো ?

ভাঙা বাড়ি
- সিক্তা পাল

এই পোড়ো ভাঙা বাড়ির বাসিন্দা আমি এখন, না পৈতৃক সূত্রে নয় পতির সূত্রেই। ‌ পতি দেবতা অনেকদিন আগেই নিজের অর্জিত সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে সুখের সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি দিয়েছেন। সন্তানদের এই অপবিত্র ভিটা থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছি যাতে ওরা সুখী হয়। আমি পড়ে আছি এই অভিশপ্ত ভিটা আগলে। 20 ইঞ্চি প্লাস্টার খসে পড়া দেয়াল গুলো দেখে প্রাগৈতিহাসিক যুগের সাক্ষরতা বহন করছে যেন! দোতলার ঘরে কেউ একজন গলায় শাড়ি পেঁচিয়ে পরলোকে গমন করেছিলেন। এখনো তার পদচারণা, চুড়ির রিনরিন্ শব্দ পাওয়া যায়। আধার রাতে উঁকি মেরে দেখে যান, ইচ্ছে হলে পাশে শুয়ে পড়েন। অস্পষ্ট তার নিঃশ্বাসের শব্দ পাই ! এই ভাঙা বাড়ির বাসিন্দা একা হলেও আধার নামলে আমি আর একা থাকি না। এই বেশ ভাল আছি।

মিষ্টি স্রোতে,
- অনিতা পান্ডে

সেই মিষ্টি স্রোতে ভেসে যাওয়ার দিন।
আনন্দে মন নাচে তা-ধিন তা- ধিন।

ভালোবাসা বোঝেনা শীতগ্রীষ্ম কাল।
দূরত্বে থাকা আপন মানুষ ধরে থাকে জীবন নদীর হাল।

তুমি কাছে থাকলে বহে অভিমানের ঝড়!
ঠোকাঠুকি কথার মাঝেও থাকে ভালোবাসার কদর।

দূরে গেলে ছটফট মন বুঝতে চায়না কিছু,
মায়র বন্ধন অবিরাম হেটে চলে তোমার পিছু পিছু।

বরিশাল
১৩-০৩-২০।

একজন চাই
- কিরণময় নন্দী

আমি একজন প্রোকৌশলী চাই,শুধু সেতুবন্ধন নয় মানববন্ধন তাঁর নৈতিকতা হবে....
আমি একজন চিকিৎসক চাই, হৃদযন্ত্র শুধু শরীরী পাম্পসেট নয়,মনের গোপন অলিন্দ যেন হয়.....
আমি একজন শিক্ষক চাই, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষায় শংসাপত্র শুধু নয়,বাস্তব জীবনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায়....
আমি একজন নাট্যকার চাই, মিথ্যে প্রগাঢ় অনুভূতির বুনিয়াদ নয়, সমাজ সৃষ্টির দর্পন হয়...
আমি একজন জওয়ান চাই, যেকোনো মুহূর্তের জন্য দেশ সবার আগে হয়....
আমি একজন নেতা চাই, গরীবের জন্য আন্দোলন করাই যার ব্রত হবে....
আমি একজন আধিকারিক চাই, লাল সুতোর ফাঁসে ফাইল আটকে থাকবে না...
আমি একজন "একজন" চাই, সে সইবে না মানুষের কান্না।

বসন্ত আজ দ্বারে
- প্রতুল রীত

তপ্ত যখন চর্তুদিক,
শীতের বেলার শেষে,
জানিয়ে দেয় এসেছে আজ
বসন্ত যে দ্বারে।
ঝরা পাতা,ঝড়ের খেয়াল
নতুন কুড়ি ফুলে,
নতুন হাওয়া জানিয়ে দেয়
বসন্ত আজ দ্বারে।
কোকিল যখন নিজের তালে
গেয়ে নিজের গান,
গানের তোরণজানিয়ে দেয়,
বসন্ত আজ দ্বারে।
সি্নগ্ধ কোনো রোদের পাটি
ছড়িয়ে আমার বারান্দায়,
উষ্‌নতা আজ জানান দেয়,
বসন্ত আজ দ্বারে।
যখন আমি দুচোখ বুজে,
ভেবে চলি তার কথা,
মিঠে তার মুখখানা জানিয়ে দেয়,
বসন্ত আজ দ্বারে।

পরিণীতা
কলমে - রিম্পা মোমো রায়

মেহুলরা যতই ভালোবাসুক না কেনো, বাবাইদা দের মন চিরকাল তথা কথিত মেয়ে বলতে যা বোঝায় মানে সায়ন্তিকাতেই আটকায় ....
ফ্যাকাসে কালি পড়া চোখে রিমলেস চশমা ,দড়ি পাকানো উস্কো খুস্কো এক রাশ চুল ,শুকনো নিষ্প্রাণ লিপস্টিক বিহীন ঠোঁট , নখ বিহীন লোম যুক্ত হাত হিলের বদলে ক্যাজুয়াল জুতো খানিকটা ছেলেলি হাবভাব এসব দেখে সৌখিন মনে সাময়িক ভালোলাগা এলেও চিরকাল সেটা থাকেনা...
সেটা বুঝেই,,
সেই মেহুলরা নিজেকে পাল্টায় খানিকটা মেয়ে হওয়ার চেষ্টা করে তবুও তাদের মন গলে না হাজার যন্ত্রণা অপমান সত্বেও সবটা মেনে নেয় .. কারন তারা যে সত্যিই ভালোবাসে....
কিন্তু যতই যাই করুক না কেনো ওই যে বললাম বাবাইদারা চিরকাল সায়ন্তিকাদেরই ভালোবাসে ,, সে যতই মেহুলরা প্রাণ দিতে চাক মন দিতে চাক জীবনের সবচে মূল্যবান সময় টা যতই তার জন্যে উজাড় করে দিক তবুও........
মেহুলরা নীরবে সবার অলক্ষে পরিণীতা হয়ে থেকে যায় ,কেউ জানতে পারে না এমনকি বাবাই দাও নয়....

-নিরুপমা😊

ঝাড়ছে কেবল জ্ঞানের বাণী
কাজের বেলায় করছে না।
গিলছে কুটছে সব ই করছে
মানুষ কথা ভাবছে না।
নিজে আছে অকাজ কাজে
সবার কথা ভাবছে না।
ভাবতে বল্লে সবার কথা
ভয় এ মাঠে নামছে না।
ভরছে শুধু পকেট নিজের
উপকার টি করছে না।
যে জনা চাই মানুষ হতে
তাকেও হাত টি দিচ্ছে না।
অন্যের বেলায় সবই খারাপ
নিজের বেলায় ঠিক।
যে চাচ্ছে একটু ভালো
তারেই দিলে ধিক।
আমার আছে মাথার ব্যামো
অস্বীকার তো করছি না,
তাই বলে তুই এমন করিস
এটিও তো ভাই ঠিক যে না।
আমি যে ভাই কাজ করিনা
করতে বারণ আছে।
তাই বলে তুই গাঁজা টানিস
এটা কি তোর সাজে?

বুঝবি কবে মানব বেদন
শুনবি খুলে মন?
দীন দুঃখী সব ডাকছে রে ভাই
কান টি পেতে শোন।

নিজের ভিতর মুখ ঢুকিয়ে
থাকবি রে আর ক'দিন?
নিজে মাঠে না নামিলে
আসবে ভাবিস সুদিন?

আসলে তোর পেট টি ভরা
তাই তো বুঝিস না।
খিদের জ্বালা কাকে বলে
তুই তো জানিস না।
আগে নিজের কাজটিকে কর
তারপরে দিস জ্ঞান।
এত দিলাম তারপরেও
হাত টা পাতিস ক্যান?

ভাই রে আমার সাথে তো আয়
মানুষ সাথে বাঁচ।
অনেক হলো মুখের বাণী
এবার কর্ম স্থানে নাচ।
আগে নিজের কাজ খানি কর
তারপরে দিস জ্ঞান।
মানুষ মানুষ মানুষ বলে
কর রে এবার ধ্যান।
কবীর বলে, বলে লালন
শুনতে নাহি পাস?
মানুষ সেবা করলে পরে
তবেই বাঁচার আশ।

কবিতা - মা
কলমে - মায়া সাহা

আচ্ছা তোমরা কি কেউ বলতে পারো
'মা' মানে কি?
' মা 'কোথায় থাকে?
আমি একটু যেতাম মায়ের কাছে!

আচ্ছা বলতো মা কি আমার ওপর
খুব রাগ করে আছে?
যদি আমি মায়ের কাছে গিয়ে
একটিবার জড়িয়ে ধরি মা'কে,
মা কি আর পারবে তখন
মুখ ফিরিয়ে থাকতে?

তোমরা জানো
যেদিন আমি জন্ম নিয়েছি,
সেদিন থেকে 'মা ' কেনো
একটিবারও এলোনা আমায় দেখতে?

ক্লাসে যখন সবাই
মায়ের বানানো টিফিন খায়,
তখন আমি মা'কে খুব মিস করি!
তখন আমার খুব ইচ্ছে করে
মায়ের বানানো টিফিন খেতে!
আচ্ছা তোমরা কি কেউ বলতে পারো
মায়ের বানানো টিফিন টা কি
খুব মিষ্টি হয় স্বাদে?

আমি যখন স্কুলে পরীক্ষা দিতে যাই
তখন মায়ের আশীর্বাদ নিতে চাইলে
দিদুন বলে মায়ের ছবিতে প্রণাম করতে।
তখন আমার খুব কষ্ট হয়!
আচ্ছা তোমারা কি কেউ বলতে পারো,
আমার মা কোথায় আছে?

আমার খুব ইচ্ছে করে
প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর সময়
আদর দিয়ে,ঘুমপাড়ানি গান শুনিয়ে
মা আমায় ঘুম পাড়াবে।
আমার যখন জ্বর হয়
তখন আমার খুব ইচ্ছে হয়,
মায়ের কোলে মাথা রাখি।
মা আমায় জলপট্টি দিয়ে
আমার সব অসুখ সারিয়ে দেবে!
বলতে পারো তোমারা
তবুও কেনো মা'কে আমি পাইনা আমার পাশে?

ব্যর্থ ভালোবাসা
- কিরণময় নন্দী

--আমি তোমায় ভালোবাসি

-- কতো দিনের অভিনয়?
---সত্যি আমি তোমায়
ভালোবাসি।

---এই কথা একুশ বসন্তে কুড়ি-বাইশ না আরও কয়েকবার শুনেছি।
প্রথমে বিশ্বাস করেছি, স্বপ্ন জাল বুনেছি বাস্তবের রাজকুমারের জন্য----
তা ছাড়ো , সে কথা শুনে কিছু লাভ নেই। বলো হঠাৎ করে আমায় ভালোবাসার কথা মনে জাগলো কেন?

---তোমায় লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে,তোমার হালকা সাজে অনবদ্য স্মার্টনেস, তোমার কথা বলা, তোমার কবিতা-----

---আমার কবিতা! হাসালে তুমি ,সে তো শেষের কবিতা-ব্যর্থ প্রেম-অভিনেতার মুখোশ খোলার লড়াই।
---সেই জন্যই তো তোমায় ---

--থাক আমার কষ্টে করুণা বর্ষণ। এইবেশে এসেছিলো দ্বিতীয় জন। প্রাক্তনের বন্ধু । আমার পাশে থাকার বার্তা লয়ে। আমার সাথে বন্ধুত্বের জন্য। প্রথম ভালোবাসার চরম ধাক্কাটা সহ্য করতে বেশ সময় লেগেছিল। তাই কৌশল বুঝে উঠতে পারিনি। অসম্ভব কেয়ারিং ছিলো। নতুন জগৎ তৈরি করেছিল আমার জন্য। কোনো কিছু ভাবার অবকাশ দিত না। বিশ্বাস শব্দটা আবার আমার অভিধানে জায়গা পেলো। মা -বাবার ভালোবাসা পেলাম ।বন্ধুদের কাছে পেলাম। সবকিছু সেই আগের মতো।

----তাহলে কি হলো আবার?

----ধোঁকা, পুরুষ মানেই ধোঁকা। ঝড়-বৃষ্টির সন্ধ্যেই টিউশন থেকে ফেরার সময় পরিচিত মানুষটা এভাবে সাহায্যের নামে হাত চেপে ধরবে আমি ভাবতেই পারিনি।বৃষ্টির স্নিগ্ধতা পুরুষকে পশুর অধম করে জানি না। নিজের ক্ষমতায় নিজের সম্ভ্রম রক্ষা করলাম ।

---আমি কিন্তু আলাদা। আমি কোনো দুর্বলতার সুযোগ নেব না।আমায় বিশ্বাস করো। আমি তোমায় ভালোবাসি।

---চুপ করো । আমার অভিধানে ওটা শুধু শরীর পাবার নেশা। আবিষ্কারের নেশায় মাতোয়ারা পুরুষদল। আমি মন চেয়েছি । ওরা শরীর চেয়েছে। বারবনিতার সাথে রাত কাটানো পুরুষ গুলো সকালে স্নান সেরে বউকেও বলে- আমি তোমায় ভালোবাসি, ভীড় ট্রেনে সুযোগে হাত চালানো স্বামী দিনের শেষে বাড়ি ফিরে রাতের অন্ধকারে বউকে জড়িয়ে বলে-আমি তোমায় ভালোবাসি।
ভালোবাসা যুক্তাক্ষর নয় বলে সহজে বলা যায়--- এর মান রাখা বড়োই কঠিন।
তাই আমার কবিতা শুধু ব্যর্থ শুধু ঘৃণা।

এবারও পালালো
- সায়মা টুনি

শীত কালের মজাই আলাদা মজার সব পিঠা পুলির সমারহ কি দারুন অনুভূতি মনে করলেই আনন্দে মেতে ওঠে চোখ মুখ।

স্কুল,কলেজ সবারই ছুটি থাকে বলে ঘুরতে চলে যাই দাদুর বাড়ীতে।কি কান্ড না হল এবার,আমার ছোট বোনকে দেখতে এল ছেলে পক্ষের লোক।বোন তো রেগে বলে শান্তি নেই বেড়াতে এসেও রক্ষা পেলাম না।

ছেলে পক্ষের একজন জিগেস্য করে বসলো,মা তুমি কয় পদের পিঠা করতে জানো ? বোন তো আমার জেনো আকাশ থেকে পড়লো,এই যুগে কেউ এই প্রশ্ন করে ভেবে,সেও তো কম কিসে ।

জবাবে বলে বসলো,কেন আছে না অন লাইন সার্ভিস।কল করলেই সব ধরণের পিঠা বাসায় দিয়ে যাবে।কষ্ট করে করতে যাবো কেন !

ওমনি আমার মা মাথায় হাত দিয়ে বলে বসলেন,”গেল বুঝি এবারের পাএটিও হাত ছাড়া হয়ে!”

তারিখ - ২৪/১২/২০১৯

কথা দিলাম
- সুপর্ণা ব্রহ্ম চক্রবর্তী

কথা দিলাম
-----------------

যত্নে আমার অসুখ বাড়ে,
যত্নে আমি ভেঙে যাই...!!

অযত্নে বরং আমার ডাল পালা ছড়িয়ে পড়ে বিষবৃক্ষের মত,
কেউ খোঁজ রাখেনা বলে, দায়ও থাকেনা....!

নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় যান্ত্রিক চলা ফেরা,
বেশ লাগে -----

যত্নে বরং একরাশ আশঙ্কা নিয়ে,
রাতের তারা খসা মুহূর্তের স্বপ্ন আসে.....

শোক, তাপ যত কমে যায়,
ততো নিজেকে ভারহীন মনে হয় !

যত্নে আমার ঋণ বাড়তে থাকে,
চুমুর বদলে দীর্ঘায়ু কামনা করা ছেড়ে দিয়েছি.....

আমার ওসব শরীরী ব্যাকরণ জানা আছে,
তুমি বরং একটা অযত্নের চিহ্ন এঁকে দিও বাম অলিন্দে.....

আমি যত্ন করে আগলে রাখবো
কথা দিলাম..........

#সুপর্ণা ব্রহ্ম চক্রবর্তী ( 11/10/2019 )

একুশের বই মেলায় প্রকাশিত "প্রবাসে মেঘ-জ্যোৎস্না"
- নিজস্ব প্রতিবেদক

ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধার মাস অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। এবারের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়েছে প্রবাসী সাংবাদিক ও লেখক জমির হোসেনের গ্রন্থ "প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্না"। এক যুগেরও বেশি সময় অতিক্রম করার পর তিনি পাঠকদের মাঝে কোন বই নিয়ে হাজীর হলেন। 'প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্না"গ্রন্থে প্রবাস জীবনের গভীর বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন লেখক। কখনও হাসি কখনও কান্না এবং প্রবাসীদের নানাবিধ সমস্যা তার লেখার মাঝে ফুটে উঠেছে। ইতালির নিয়ম ব্যবস্থাও তুলে ধরা হয়েছে বইটিতে। তাই সব ধরনের পাঠকদের জন্য সময় উপযোগী একটি গ্রন্থ " প্রবাসে মেঘ জ্যোৎস্না"।

বইটির প্রচ্ছদ করেছেন রাজিব দত্ত। প্রকাশ করেছেন চৈতন্য প্রকাশনী। ৯৬ পৃষ্ঠার বইটির
মূল্য রাখা হয়েছে ২০০ টাকা।

জমির হোসেনের বইটিতে প্রবাসের সমসাময়িক বাস্তবে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সমস্যা,ইউরোপের আইনের প্রতি বাংলাদেশিদের সন্মান ছাড়াও কয়েকটি ভ্রমণ কাহিনী রয়েছে। চৈতন্য প্রকাশনাীর স্টল নং ২৫০/২৫১ বইটি এ পাওয়া যাবে।

বইটি প্রসঙ্গে জমির হোসেন বলেন, জীবনের কঠিন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে এই বইয়ের প্রতিটি লেখার জন্ম। জীবনের মধ্যকার যে অনুভূতি তা এই লেখায় পাঠকদের জন্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। আশা করি বইটি পাঠকের ভালোবাসায় মুগ্ধ হবে। উল্লেখ্য তিনি ইতালি থেকে প্রবাসীদের নিয়ে নিয়মিত লিখছেন।

ডাঃ ফারহানা মোবিন এর লেখা ছোটদের বই " উড়ে যায় মুনিয়া পাখি" এবং " গোলাপি রঙ পেন্সিল "
- নিজস্ব প্রতিবেদক

২০২০ এর অমর একুশে গ্রন্থমেলা।

লেখক , পাঠক আর  বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয় সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এর এই গ্রন্থমেলা।

এইবারের বই মেলায় লেখক ও চিকিৎসক ফারহানা মোবিন এর লেখা  শিশুতোষ গল্পের বই

" গোলাপি রঙ পেন্সিল " এবং

২০১৪ সালে প্রকাশিত

" উড়ে যায় মুনিয়া পাখি ", পাওয়া যাবে ছোটদের বই প্রকাশনীতে ।‌

স্টল নং --- ৭৩৯।

ডাঃ ফারহানা মোবিন সাত বছর  ঢাকার পান্থপথের স্কয়ার হাসপাতালে স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগের  মেডিকেল অফিসার  হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পেশায় চিকিৎসক হলেও  সামাজিক কাজ  কর্ম, লেখালেখি  করেন নিয়মিত। চতুর্থ  শ্রেণী থেকে লেখা শুরু করেন।

পঞ্চম শ্রেণী থেকে উনার লেখা ছাপা শুরু হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ।তিনি শৈশব  থেকেই শিল্প  সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত।

একটানা সাত বছর তিনি ছিলেন দৈনিক প্রথম আলো‌ নিউজ পেপার এর প্রদায়ক লেখক।

নারী ও শিশু উন্নয়ন, সামাজিক  সমস্যা, স্বাস্থ্য সচেতনতা,জীবনযাপন,  সাহিত্য বিষয়ক লেখেন।

দেশ বিদেশের অগণিত  সংবাদপত্র,  ম্যাগাজিন  এ তিনি নিয়মিত লেখেন

( অনলাইন, হার্ড কপি)।

উনার লেখা স্বাস্থ্য বিষয়ক বই গুলো পাওয়া যাবে, বিদ্যা প্রকাশনী থেকে।

বই গুলো হলো ---

১) শরীর স্বাস্থ ও পুষ্টি ( ২০১২),
২) সবার আগে স্বাস্থ্য  ( ২০১৩)
৩) আসুন সুস্থ থাকি’ ( ২০১৮) ।

২০২০ সালে বিদ্যা প্রকাশনা থেকে সামাজিক সমস্যা ও তার প্রতিকার বিষয়ক বই   আমিও " মানুষ " প্রকাশিত হয়েছে।

বিদ্যা প্রকাশনার স্টল নং - ২৬৬, ২৬৭, ২৬৮, ২৬৯।

উনার লেখা ছোটদের বই গুলো

সব বয়সের পাঠকের  পড়ার উপযোগী।

শিশুতোষ দুইটি বই এর প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন চিএ শিল্পী বায়েজীদ সোহাগ ।

প্রকাশক সালমা রেহানা।

বই মেলা শেষ হলেও বইটি পাওয়া যাবে রকমারি ডট কম থেকে । শিশু উন্নয়ন মূলক এই বই দুইটি সহজ সরল ভাষায় লেখা ।

ডাঃ ফারহানা মোবিন বিভিন্ন সময়ে টিভি চ্যানেলে সাস্থ সচেতনতা বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করেন।

তিনি মরণোত্তর তাঁর  দুই চোখ,

হার্ট, লিভার, ফুসফুস,  কিডনী ও প্যানক্রিয়াস দান করেছেন।

নানাবিধ সামাজিক কাজকর্মের সাথে সংযুক্ত তিনি।

ফারহানা মোবিনের জন্ম ২৭ জুন  রাজশাহী শহরে। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। সরকারি পিএন গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে  এইচএসসি পাশ করেন।

ঢাকার শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল থেকে এমবিবিএস পাশ করেন।

তিনি উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে এখনো লেখাপড়া  করছেন। পাবলিক হেলথ  এ গবেষণারত।

বারডেম হাসপাতাল থেকে ডায়াবেটিস  এবং হার্ট  ফাউন্ডেশন হসপিটাল থেকে হৃদ রোগের উপর  certificate course সম্পন্ন  করেছেন।

উনার মা ফেরদৌসী বেগম এবং পিতা মরহুম আবদুল মোবিন।

অসহায় মানুষের ফ্রী চিকিৎসা, সমাজ সচেতনতা মূলক লেখা, টিভি চ্যানেলে অনুষ্ঠান এবং বহুবিধ সামাজিক কাজের জন্য তিনি অর্জন করেন,

" বিজেম সম্মাননা এওয়ার্ড  ২০১৯",

" উইবিডি সম্মাননা এওয়ার্ড ২০১৮ ",

" স্বাধীনতা সংসদ আলোকিত নারী

সম্মাননা এওয়ার্ড ২০১৯ "।

অসম
- মৌসুমী রায়

তখনও প্রকৃতি ঝাপসা কুয়াশার চাদরে আচ্ছন্ন।গায়ে সোয়েটার জড়িয়ে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো অনিমেষ।অনেকদিন পর সে নিজের গাঁয়ের ভিটেতে ফিরেছে।উঠানে এসেই দেখলো তার মা মৃন্ময়ী কড়িম চাচাকে দিয়ে খেজুর গাছ থেকে হাঁড়ি নামাচ্ছে।গাছের নীচে,কনকনে ঠান্ডায় ছেঁড়া জামা পড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে তার ছেলে।মনটা খারাপ হয়ে গেলো অনিমেষের,ভাবলো তার ছেলের বয়সই হবে।অনিমেষকে দেখে মৃন্ময়ী বললো 'খোকা কাক ভোরে উঠে পড়লি যে?'...'ঘুম ভেঙে গেলো।'...'তাহলে গ্লাস এনে দিই,রসটা খেয়েনে।বৌমা আর দাদুভাই পরে উঠে খাবেক্ষন।'...পিছন থেকে অনিমেষের স্ত্রী বললো আমরাও এসে পড়েছি।আপনার দাদুভাই ঘুমাতে দিলেতো।সে এখন গ্রাম দেখতে যাবে দাদুর সাথে।'...গুবলু কড়িমের ছেলেকে দেখে বললো 'ঠান্ডায় তুমি সোয়েটার পড়োনি কেনো?নেই বুঝি।'...গুবলুর কথায় মুহূর্তকাল চুপ হয়ে গেলো সবাই।শীতের হাওয়া শনশন করে চাবুক লাগালো দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মনে।খানিক ভেবে গুবলু বললো 'আমারতো অনেক আছে,তোমাকে একটা এনে দিচ্ছি।'

তারিখ_২৯_১২_২০১৯

তুমি খুলে বসে আছো কবিতার স্কুল
- মোশ্ রাফি মুকুল

চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কবিতার ভ্রূণ,তুমি খুলে বসে আছো কবিতার স্কুল,এইসব সবুজ পাতারা এইসব শূন্যস্থানে কবিতা আনে।

পথেপথে নিমফুল,উজ্জীবিত কঁচি পাতায় সাজানো কৃষ্ণচূড়া গাছের শরীর,বৃক্ষের ধ্যানে নিবিষ্ট এখন পাতা ও কুঁড়ি।দখিনের বাতাসে,ভেসে ভেসে,এ রূদ্ধবাক প্রতিবাসে সজীব কবিতারা আসে।

তুমি ও প্রকৃতি,কবিকে হাত ধরে লেখাও,তুমি ও প্রকৃতি কবিকে প্রণয়ের স্বাক্ষর শেখাও;তোমার দীপালী সংশ্রব আর সবুজবীথিদের নির্জন প্রশ্রয় পেলে সঙ্গীবিহীন প্রতিটা মানুষ সংঘজীবী হয়ে যায়।কবি হয়ে যায় বর্তমানের দুঃখপোড়া মানুষ থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে স্বজন,হালের অসুখী মানুষ থেকে বিকীর্ণ শব্দের মানুষ,তখন,এখানে শূন্যস্থানে,কোনোও শূন্যতা বলে কিছু থাকেনা;শুধুই থাকে সবুজ পাতাদের ঝিরিঝিরি গান ও প্রেমের বিস্তীর্ণ শস্যক্ষেত।

১৫/০৩/২০২০.

আমি মঞ্জু, আমি কুলি
- কিরণময় নন্দী

স্বামী ছেড়েছে দুনিয়া
বছর পাঁচেক আগে
তিন ছেলেমেয়ে আর শাশুড়ি
আজও শুধুই কাঁদে।

আমিও কাঁদি গভীর রাতে
ওরা তখন গভীর নিদে
সারাদিনে ফুরসত কই
ব্যস্ত আমি মেটাতে খিদে।

ভোরের আলো ফুটলো যেই
সংসারের নানা কাজ
প্রথম দুটো স্কুলে যাবে
আমার দেহে কুলির সাজ।

কোলের টা ঠাম্মার কোলে
মা-ছাড়া সারাদিনটা
সাঁজের বেলা পাবে দেখা
যতই কাঁদুক মনটা।

সোয়া-সাতটার মেলট্রেন
এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে
লাল সালোয়ারে আমার দৌড়
নতুন উদ্যম কাজকর্মে।

চওড়া কাঁধে সমান লড়াই
পুরুষ দলের সাথে
চারটে পেট অপেক্ষায়
লড়াই দুধে-ভাতে।

"ওনার" ইচ্ছে মানুষ করার
প্রাণের প্রিয় সন্তানে
ওনার ইচ্ছেই ইচ্ছে ভেবে
ছুটে যায় জয়পুর স্টেশনে।

গোলাপি শহর জয়পুর
দেশবিদেশে নাম
রঙিন তলে অন্ধকারে
ঝরছে আমার ঘাম।

আমি মঞ্জু, আমি কুলি
ছুটছি হুইসেলের ডাকে
লক্ষ্য,"ওনার" ইচ্ছে পূরণ
ভারী বোঝা মাথায়-পিঠে।

অনেক অভ্যাস এখন মনে নেই
- মোশ্ রাফি মুকুল

পদ্ধতিগত 'না' পাওয়া
সম্পর্কে গোলাপি ধুলির যে স্বীকারোক্তি-
এমনতো নয় যে সবকিছু অর্থহীন
খুব দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া হাওয়া মিঠাই

আঙুলে নতুন করে ঘরে তুলি
সেখানে এখন সুতরাং ও পালঙ্ক আঁকি;

অনেক অভ্যাস এখন মনে নেই,
মনে নেই ক্ষুধার সংকেত,
ভুলে গেছি জলের সংকট অথবা
খৈয়ামি পিপাসা।

০১/০৩/২০২০.

মুখোশ
- কিরণময় নন্দী

সেদিন উঠে দেখি প্রাতে
বেজায় ভীড় মোর গাঁয়ে
ভীড় ঠেলে গিয়ে দেখি
এক জোকার আছে দাঁড়িয়ে।

পাড়ার ছেলে বেজায় খুশি
মারছে তালি একসাথে
মজার চোটে নাচছে সবে
জোকার নাচে মুখোশ মুখে।

হাসির কথায় শরীর নাচায়
নাচায় হাত-পা-মাথা
ধুলোয় শুয়ে ডিগবাজি খায়
লাগুক যতই গায়ে ব্যথা।

খেলা শেষে বাজায় তালি
টাকা-পয়সা দেয়
শরীরী খেলার উপহারে
জোকার,ক্ষুদ্র মূল্য পায়।

ভীড়টুকু যেই পাতলা হলো
এগিয়ে গেলাম কাছে
প্রশ্ন করি, "জোকার ভাই
তোমার মুখে মুখোশ কেন আছে"?

মৃদু হেসে বললো জোকার,
"দাদা, মুখোশ সবারই আছে,
আমার মুখোশ দেখে সবাই
বাকিদের মুখ লুকিয়ে মুখোশেতে"।

আমি টোটোচালিকা
- কিরণময় নন্দী

সেবার আমার দশম শ্রেণী
প্রথম বড় পরীক্ষা
বাবা-মায়ের ঘুম নেই
দিন গোনা আর অপেক্ষা।

বাবা কাজে ব্যস্ত ভীষণ
তবুও খোঁজ বারেবারে
মা ব্যস্ত নানা কাজে
তবুও খোঁজ পড়ার খবরে।

আমি তখন শুধুই পড়ি
লক্ষ্য ভালো ফল
হঠাৎ করে বাবার অসুখ
একমাস হসপিটাল।

কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা খরচ
অনেক অনেক ওষুধ
বাবা আমার শয্যাশায়ী
স্থির আঁখি- শান্ত বুঁদ।

মা ব্যস্ত সারাদিন
বাবার সেবা যত্ন
কষ্টে বুক যাচ্ছে ফেটে
আমি পড়ায় মগ্ন।

পরীক্ষা শেষ ভালো ভাবেই
আমি আশাবাদী
বাবার শরীর একই রকম
আমরা এখন অভাবী।

রেজাল্ট হলো মনের মতো
সবাই ভীষণ খুশি
বাবার চোখে দুফোঁটা জল
আমি বড়োই উদাসী।

বাবার অসুখ-এতো খরচ
কোথায় পাবো টাকা
টাকা ছাড়া চলবে কিসে
আগামী ভয়ঙ্কর-ফাঁকা।

প্রতিবেশী বিধেন দিলো
পাত্র দেখে দাও বিয়ে
মেয়েছেলে পড়ে কি হবে
সেই তো রান্না করবে গিয়ে।

মনের ভিতর ভীষণ রাগ
ভীষণ লজ্জা ঘৃণা
মেয়ে বলে নেই অধিকার
আপন জীবন জিনা।

শুরু হলো নতুন লড়াই
এগারো ক্লাস সঙ্গে হকারি
বাঁকা চোখে সভ্য সমাজ
আমি পড়ি আর ফেরি করি।

বারো ক্লাসেও ভালো ফল
চোখ ধাঁধানো নয়
কলেজ গেলেই অনেক টাকা
আবার নতুন ভয়।

রোগের খরচ পড়ার খরচ
এগিয়ে যাওয়াই কঠিন
হকারি করে কতই বা টাকা
নতুন ভাবনা এগোনো সঙ্গীন।

জেদ আমার বাড়ল ভীষণ
পড়তে হবেই কলেজে
ভোলা কাকা দেখালো পথ
আমি টোটোচালক সেজে।

গতিরুদ্ধ সংসার আজ
নতুন গতির দিশা
তিন চাকায় স্বপ্ন দেখা
আমি টোটোচালিকা।

বিছানায় শুয়ে কাটছে দিন
বাবা অবশ অসাড়
সেবাযত্নে রুগ্ন মা
তিনচাকায় ঘুরছে আমার সংসার।

নীল রং ছিল ভীষণ প্রিয়
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

তোর এই গানটা কেমন লাগে?
তুই বললি , বেশ!
আমি বললাম, গানটা তো আমারও বেশ লাগে....
কিন্তু আর ও বেশ কি লাগে জানিস?
তুই বললি, উম্ হুঁ!
উত্তরে আমি হেসে বললাম,
"তোকে নীল রঙে"!!
জানিস? নীল রঙ আমার ভীষণ রকম প্রিয়!
তুই হেসে উত্তর করলি......
তাই???
আচ্ছা নীল রঙ নিয়ে অনেক কথা বললাম....
এবার এই ময়দান ছেড়ে উঠবি?
তোর কেন-এর উত্তরে বললাম....
চল না ওই মোড়ের মাথায় একটু ভাঁড়ে চা খাই!
আমার খুব ভালো লাগে এটা ।
হাঁটতে হাঁটতে ভাবছিলাম, তোর -আমার দেখা করার বয়স টা.....প্রায় একবছর পর হবে! তাও অনেক টানা পোড়েনের পর । আমি হঠাৎ তোকে আস্তে ক'রে বলে উঠলাম, "আরও একবার হাত টা ছুঁয়ে দেখ, আজও আমাদের ইচ্ছে গুলো এক"! মনে মনে হয়তো এটাও বলেছিলাম ........আমি জানি তুই, আবারও হারাবি নিজেকে!!!!
তুই কিছুই জবাব দিসনি, শুধু পুরোনো ভাবে নতুন ক'রে আমার হাতটা শক্ত ক'রে ধরেছিলি!

চায়ের দোকানে চা খেয়ে পয়াসা মিটিয়ে বেরোতে যাব ,তখন হঠাৎ বৃষ্টি । আমি তো আবার বৃষ্টি ভিজতে বরাবরই ভালোবাসি । তোর ভালো লাগা গুলো আজও জেনে উঠতে পারিনি! তুই সব ওই তোর বোকা বাক্স তে বন্দি করে রেখেছিস ! যাই হোক কোথাও একটা গিয়ে বসতে হবে । এই ভেবে মেট্রো তে করে চলে এলাম এসপ্লেনেড । এখানে খুব সুন্দর একটা জায়গা আছে । একটা ট্রাম । সাজানো গোছানো । উঠলাম তাতে । এরপর কত গল্প চলল আমাদের ! কত পুরোনো কথা! সেই পুরোনো দেখা হওয়া । কলেজে পড়ার দিন । তোর সাথে যদি একই স্কুল টা ও হত! তোকে শুধোলাম , তোর মনে আছে আমাদের প্রথম আলাপ? তুই মিষ্টি হাসি হেসে বলেছিলি , দিব্যি মনে আছে॥ আবার শুধোলাম , তারপর? আমিই আবার বললাম , সেই দিনের ছবিটা আজও ভাসে আমার চোখে । একটা অনবদ্য রূপে তোকে দেখেছিলাম ।
এ কথা সে কথার পর বললাম , চল এবার একটু হারিয়ে যাই আমরা । শুধোলি , কোথায়?

একটা ট্রামে চড়ে বৃষ্টি ভেজা শহর দারুন লাগে , দেখবি চল । আমি উত্তর করলাম । কথামত ট্রামে চড়লাম আমি আর তুই । জানলার ধারের সিট টা আমার খুব প্রিয় । ট্রাম চলতে শুরু করল.....আমি তোকে বললাম , এই বন্ধুত্বের বন্ধন টা আর আলগা করিস না ! গড়গড়িয়ে না চলুক , এই ট্রাম টার মতন ধীর গতি তেই চলুক তোর আমার বন্ধুত্ব টা ....কিন্তু গতি যেন থেমে না যায় । আর লাইনচ্যুত না হয় যেন । ভাগ্য আমাদের কখন কোথায় নিয়ে যাবে জানি না । আবেগে ভর করে কথা গুলো বললাম । জানি না তুই কতটুকু বুঝলি । আমি কতটা বোঝাতে পারলাম ! তারপর তোর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম , আস্ত এই দিনটা ভুলব না ! তুই আবার একটা মনখোলা হাসি হাসলি ।

এবার ফেরার পালা আমাদের । আমি চাইছিলাম আর একটু সময় কাটাতে । কিন্তু তোকে অনেকটা পথ যেতে হবে তাই আটাকালাম না । কিন্তু তুই দেখেছিলি কি আমার চোখের কোন টা চিক চিক করেছিল ? গলাটাও কেঁপেছিল, বুঝেছিলি ? তাও তোকে -আমাকে যেতেই হবে । তুই আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছিস.....নীল রং টা মিলিয়ে যাচ্ছে......আমি কি একটা বলবার জন্য দৌড়ে যাচ্ছি তোর দিকে......একি? তোর নাগাল পাচ্ছি না কেন?.......তুই মিলিয়ে গেলি মুহুর্তে.......মুহুর্তে মিলিয়ে গেল আমার ভীষণ প্রিয় নীল রং.......তোকে তো বলাই হল না যে , নীল রঙের শাড়িতে তোকে Just ফাটাফাটি লাগছিল.....বলাই হল না , নীল রঙের মত তুই ও আমার ভীষণ প্রিয়........বলাই হল না , আবার তুই নিজে হারাস না আমার থেকে । আমি ঘামছি দরদর ক'রে । তোর দিকে হাতটা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি......তুই আসবি বলে । না আর পারছি না আর একটু দৌড়ে এগিয়ে গেলাম.......তোকে আবছা দেখতে পাচ্ছি কিন্তু তোর নাগাল পাচ্ছি না...........ধড়মড়িয়ে উঠে বসলাম .......একটা আস্ত স্বপ্ন ছিল ।। ভাবলাম বসে কিছুক্ষন.... গল্প হলেও সত্যি যদি হয় তাহলে স্বপ্ন হলেও
সত্যি নয় কেন????????

সমীক্ষা
- মোশ্ রাফি মুকুল

অন্ধকারের
নিকট দূরত্বে সারারাত সমীক্ষার পর
বুঝতে পারা যায়
পার্থিব কতোকিছুই ঘটে চলে এখানে,
'ঘটনার ঘনঘটা''অন্তরে অতৃপ্তি'তো থাকবেই।

তবু এ আনন্দদান-
মৃদুমন্দ কোলাহল,
আলোর খণ্ডাংশের সাথে সাক্ষাতের
পরিপূর্ণ অপেক্ষা।

এমনতো নয় যে ঘটে যাওয়া সব ঘটনাই পরিশালিত হতে হবে,
এবং এমনও নয়
প্রমাণ করতে হবে যে
আবেগ ও হাওয়ার গতিবেগ ঠিকঠাক একই দিকে এগিয়ে চলে।

০৭/০৩/২০২০.

নববর্ষ সবার জীবনেই আসে
- সায়মা টুনি

তোকে চিঠি লিখতে হবে এই ডিজিটাল যুগে ভাবিনি তেমন করে তবুও ডাক পিয়নের সেই ডাকটি মনে ধরলো আমার সাথে সেই পুরোনো অপেক্ষার মিষ্টি অনুভূতি স্মরণ করেই চিঠি লিখতে বসলাম বহু বছর পর ...

নতুন বছরের আগমনে সবাই ব্যস্ত উৎসব মুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে চারি দিকে আলো জ্বল জ্বল করে জ্বলে উঠবে রাতে সবার ঘরের আঙিনায় তাই না কেবল আমাদের বাড়ির উঠোনটা এখনও অন্ধকারই রয়ে যাবো,আজও হয়ত একটা আলোও জ্বালানোর কেউ নেই শুধু খাঁ খাঁ ভরা একটা নিশ্চুপ বাড়িটি ! মানুষজন এতোদিনে বাড়ির নাম দিয়ে বসেছে “ভুতের বাড়ি” নয়ত “অভিশপ্ত ভিলা” !

বিকেল হলে সেই তারিখটা আসলেই মনটা কামড়ে ধরতো জানিস।কেন যে সেদিন তোর ভিসাটা হাতে এলো আর তোর মাথায় চড়ে বসলো বিদেশ যাওয়াটা বেশ বাড়িতে রেখে গেলি আমাকে ... ইস্ কেন সেদিন তোর কথাটি রাখতে হল আমাকে দেখ তুই রেখে চলে গেলি আর আমার জায়গা হল এই অনাথ আশ্রমে এসব অনাথ বাচ্চাদের মাঝে।বাড়িটি এতদিনে দখলে গেলেও কোন কিছুই হল না আর পুরোনো পরিত্যক্ত বাড়ি হিসেবে পড়ে থাকল ।

দেশের যে মায়া,ভালবাসা আর বন্ধন কবে বুঝবে এই যুগের ছেলে মেয়েরা ... একদিন তো ফিরতে হবে এই মায়ের আঁচলের নীচে মুখটা মুঁছতে তোকে !

জানি না কবে হাতে পাবি আমার এই চিঠি তবুও ডাক বাক্সে ফেলে আসতে বলেছিলাম শেষ চোখ দুটো বুঁজবার আগেই ।।

দিলাম বাড়িয়ে হাত
- নূপুর আঢ‍্য

দিলাম বাড়িয়ে হাত,
সুখে দুঃখে থাকবো একসাথ।
ভুলবুঝে থেকোনা দূরে,
দিওনা হৃদয়ে শাণিত আঘাত।
অনেক রঙিন স্বপ্ন,
তোমায় ঘিরে ওগো প্রিয়নাথ।
থেকোনা দূরে দূরে,
বন্ধনে বেঁধে করো মাত।
রেখেছি সাজিয়ে নৈবেদ্য,
তব মন মাধুরী মাখিয়ে,
ধন‍্য করো আমায়,
দিওনা ফিরায়ে অবহেলায়।
আমিযে কে তোমার,
জেনেও কেন করো অবিচার।
সহিতে পারবো না,
হও একান্ত আপন এবার।
দুটিমন হউক পূর্ণ,
সুখের আবেশে কানায় কানায়।

১২/০৩/২০২০

একসাথে আছি
- মোশ্ রাফি মুকুল

এইতো বেশি,একসাথে আছি,
একসাথে পা পা-হাতধরে হাঁটি।
একসাথে খাই,ঘুমাই
একসাথে রাত্রিযাপন।

এইতো বেশি,একসাথে আছি।
একসাথে তারা গুনি,মাখি
জোৎস্নার রোশনাই,
ক্ষুধা পেলে খেতে দাও,
পিপাসার তীব্রতায়
হাতে তুলে দাও জলের সমুদ্র
করো তৃষ্ণা নিবারণ।

এইতো বেশি,একসাথে আছি
একসাথে আছি বলে
তুমি ছাড়া আর আমার
পার্থিব বলে কিছু নাই,
তুমি সমুদ্র বলেই আমি
নদীর মতোই মিশে যাই তোমার মোহনায়।

এইতো বেশি,একসাথে আছি
কি চাই আর এর বেশি?
ঘাতে,আঘাতে,আদিতে,অন্ততে
চলো একসাথে বাঁচি।

তুমি কবিতার বনলতা
- কিরণময় নন্দী

জানালা ধারে বসে একা
ভাবছি কত কথা
পাশের বাড়ির সুমির আজ
বিয়ের পাকা দেখা।

সুমি...সে বছর তিনেক ছোটো
তবুও ফুটলো বিয়ের ফুল
সাতাশ বসন্ত ঘুরে গেলো
আমার ঝরা পলাশ ফুল।

কতো মানুষ বাড়ির ভিতর
হাসিখুশি আর হইচই
আমার জীবন গহীন রাত
মনের মানুষ কই?

মনের মানুষ--সেতো তিক্ত অতীত
ভীষণ করাল ভয়ঙ্কর
ছদ্মবেশী নরপিশাচ
আমার প্রেমিক শুভঙ্কর।

বছর সাতেক আগের কথা
সেকি প্রগাঢ় ভালোবাসা
আমায় ছাড়া চলে না তার
আমায় নিয়েই স্বপ্ন দেখা।

মাসে মাসে গোপনে দেখা
গোপনে শরীর ছোঁয়া
চোখে চোখে হাজারো কথা
শরীর দেওয়া নেওয়া।

ভালোবেসে দিলাম তারে
আমার শরীর হৃদয়
শুভঙ্কর নরপিশাচ
ভালোবাসা নয় শুধু অভিনয়।

বছর ঘুরে নতুন বছর
আমার দেহে বাড়ছে শিশু
বিয়ের কথা উঠলো যেই
রণমূর্তিতে আদিম পশু।

চোখের জলে গাল ভেসে যায়
কত কান্নাকাটি
জড়িয়ে তারে ভিক্ষে চাই
সব ব্যর্থ সব মাটি।

চোখের জল মুছলাম আমি
হলাম বিদ্রোহিনী
গর্ভে শিশুর চাই পরিচয়
স্বীকৃতি দাও তুমি।

গভীর রাতে আধো ঘুমে
জানালা ধারে আমি
চোখের জলে বালিশ ভেজে
ওর কাছে আমি নই দামি।

হঠাৎ মুখে গাঢ় তরল
জ্বলে গেল মুখ
এসিড দিয়ে ভিজিয়ে দিলো
কেড়ে নিলো সুখ।

বেহুঁশ আমি জ্বালায় জ্বালায়
কষ্টে সারা শরীর
'অগ্নিপরীক্ষা' অন্য রূপে
আজকের অসতী নারীর।

আমার ছেলে স্কুলে পড়ে
পিতৃ পরিচয় হীন
আধপোড়া মুখ ঢাকা আমার
শরীর বড়োই ক্ষীণ।

সামনে মাঘের বাইশ তারিখ
পাশের বাড়ির সুমির বিয়ে
ভালোবাসায় কাল হলো
কাপুরুষকে হৃদয় দিয়ে।

জানালা ধারে বসে বসে
মনে পড়ে সেই কথা
তুমি আমার মনের মানুষ
তুমি কবিতার বনলতা....

বসন্ত সমাগত
- রোজী নাথ

বসন্ত আজ সমাগত প্রকৃতির বৈভবী বুকে.......
আকাশে বাতাসে লাগলো ছোঁয়া , গাছে গাছে ডালে ডালে।

পলাশ শিমুল বাতাবি লেবুর ফুলের সৌরভে
আকুলি বিকুলি মনে রঙের কী যে ছোঁয়া লাগে।

এ বসন্তে হৃদয় কোথাও হারিয়ে যেতেই চায়......
এক দুর্বার প্রেমের টানে.......
কোনো এক অনাগত অতিথির সন্ধানে।

এই দেখো না ঋতুরাজের আগমনে প্রকৃতি সেজেছে রূপের ডালি উজাড় করে .......
নব পুস্প পল্লবে কোকিলের কুহু কুহু তানে।

কৃষ্ণচূড়ায়‌ও লেগেছে রঙ হোলির আগমনে
মধুর সমীরণে মিলনের বার্তা নিয়ে।

প্রকৃতির সাথে তরুন হৃদয়ে লেগেছে দোলা
মন মানে না কোনো বাঁধন ফাগুনে সে আজ উতলা।

বাঁধতে না হয়
- প্রতাপ মণ্ডল

কি আর বাঁধন দিলে !
খুলতে পারি যখন-তখন,
আষ্টেপৃষ্টে বাঁধতে না হয়
সপতে আমায় প্রাণ-মন।

ইচ্ছে হলেই ডাকছি তোমায়
আমার ডাকে দিচ্ছো সাড়া
কাছে আসতে পাচ্ছো ভয়
হয় কি বলো ভালোবাসা-
হৃদয়ছাড়া ?

কি আর এমন বাঁধন দিলে !
বাঁধন না হয় দিতে মনে
আমার কাছেই থাকতে না হয়
থেকে যেতে এই জীবনে....।

তুমি এলেই বদলে যেতাম
বেড়ে যেতো চলার গতি,
আমার পায়ে পা মেলাতে
এমন কি আর হতো ক্ষতি !

তোমায় নিয়েই সকাল-দুপুর
কাটতো আমার রাত্রি সারা,
জোৎস্না হয়ে ভিজিয়ে দিতে
মনটা হতো পাগল-পারা।

গল্প কিছু তোমায় নিয়ে
কিছু গল্প লেখার খাতায়,
কাটতে আঁচড় আমার মনে
রেখে দিতাম মনের পাতায়।

কি আর এমন বাঁধন দিলে !
তুমি ছাড়াও ভাবনা আসে
বাঁধতে না হয় হৃদয়খানা
একটুখানি ভালোবেসে....!

খামখেয়ালি মন
ডানা মেলে বিচরন।
জীবন গভীর ধাঁধা,
কাব্যে খবর রাঁধা।
তুমি আছো তো বন্ধু সাথে?
রং মেলা দুধে ভাতে!
অচেনা অজানা পথ,
গহীন অরণ্য রথ।
বিহান বেলার মাধুরী কূহকি
ছুটে হেঁটে চলা একাকী জানকি।
তুমি ভালো থেকো
বন্ধু নিজেকে ভালো তো রেখো।
তুমি ক্রন্দনরত শ্যাম এর বাঁশরী
চোখ মেলে দেখা প্রভাত মাধুরী,
তুমি শ্রান্ত চিত্তে হৃষ্টে পুষ্টে বয়ে চলা নিশ্বাস,
অযাচিত তুমি মরম বেদনা,
ঘুম ভাঙা বিশ্বাস।
তোমরাই সখা পথের পথিক।
ছেয়ে যাও সখী দিক থেকে দিক।
বিলিয়ে দাও,তোমরা নিজেকে ছড়িয়ে দাও।
তোমরা পারবে বন্ধু পারবে।
লক্ষ্যে পৌঁছে থামবে।
তোমরাই হলে মানুষ
তাই মানুষের গান গাইবে।
আছে যত যেথা নকল চেতনা
তারা কোনোকালে জাগতে পেতোনা
যদি তোমরা সুযোগ পেতে,
প্রসাদের রেকাবিতে।
পূজার বেদীতে তোমরাই ফুল
এসে নেচে যাওয়া জীবন আকুল..
তোমরা জীবনের গান গাইবে
তোমরা সব টুকু দাম চাইবে।
প্রেমিক তোমরা,তোমরা আসল
প্রেমিকার চোখে সুরমা কাজল।
তোমরা বন্ধন বেড়ী ভাঙবে।
তোমাদের নিয়ে বাঁচবে,
তোমরাই তো আজ বাঁচবে
জেনো তোমরাই বেঁচে থাকবে।

স্বয়ং সিদ্ধা
- স্বর্ণালী লাহা

আমরা নারী রঙিন সদা
সারাবছর অঙ্গে যে রং;
কালশিটে দাগ, কলঙ্কভাগ
বয়ে বেড়াই পুরুষ অহং।

তবুও ব্রতী সরল মনে
সবার মনে রং ছোঁয়াতে;
জিততে হবে স্বামীর হৃদয়
খেলনা সেজে দিনে রাতে।

ঘোমটা টেনে অশ্রু ঢাকি
ক্ষতের উপর সিঁদুর আঁকা;
হাসির মুখোশ যত্নে এঁটে
দিনগুলোকে রাঙিয়ে রাখা।

লুপ্ত কেন হয়না এসব ?
স্বাধীনচেতা বাহুল্যতা !
নারীবাদ আর নারীদিবস
উদযাপনের গল্পকথা !

পুড়ছে আজও ধিকি ধিকি
লক্ষ নারী অন্ধকারে;
নারী তুমিই দেখাও আলো
আপন মনের গহিন ঘরে।

চিত্তে আগে জাগাও চেতন
অনল ঝরুক নয়ন ভরে,
নারী এবার বাঁচুক শুধুই
নিজের জীবন বাঁচার তরে।

ব্ল্যাক বিউটি
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

------- অনেক আগের প্রথার কথা বলছি। আগেকার দিনে কোন বাড়িতে কালো মেয়ে হলেই সাত পাঁচ না ভেবেই তার নাম নির্ধারিত হত কালী বলেই। আর নাম যদিও বা হয়তো ভালো কিছু নির্ধারণ করা হত সেটা বেমালুম ভুলে গিয়ে সবাই কালো মেয়েটিকে কালী নামেই বেশি ডাকতে স্বাচ্ছন্দ বোধ করত। এবার প্রশ্ন হল আমি আবার এসব নিয়ে কেন ঘ্যানঘ্যান করছি? আসল গল্পে না এসে আপনাদের জানা তথ্যের মার প্যাঁচে কেন সময় নষ্ট করাচ্ছি। তাহলে মূল গল্পে আসা যাক। কি বলেন?

------ গ্রামের একটি সাদামাঠা পরিবার। একদম গরিব সেই অর্থে নয়। আবার হাভাতে ঘর ও নয় কিন্তু। সেই পরিবারের তিন সন্তান। দুটি ছেলে একটি মেয়ে। সমর আর চম্পা এর দুই ছেলের কোলে তাদের মেয়ে জন্মায় একটি। মেয়েরা দাদাদের বা মা-বাবার খুব আদুরে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে বিধাতা অন্য কিছু লিখেছিলেন। মেয়ে জন্মালো অনেক রূপ নিয়ে কিন্তু রং টা ছিল কালো। মেয়ে জন্মানোর মুহুর্তে, কালো মেয়ের মুখ সমর দেখেনি। বলা ভালো দেখতে চায়নি। খুশিও হয়নি। কিন্তু চম্পা! সে তো মা। কি করে মেয়ের থেকে মুখ ঘোরায়? মেয়ে কালো হোক বা দুধে আলতা সেই মেয়ের সাথে মায়ের টান থেকেই যায়। নাড়ির টান।

------- আস্তে আস্তে তিন ভাইবোনেরা বড় হতে থাকল। এই দেখুন ওদের নাম গুলোই বলা হয়নি। অনেক সাধ ছিল চম্পার। মেয়ের নাম রাখবে পুতুল। তার পুতুল পুতুল মেয়ে। কিন্তু সমর ওসব পাত্তা না দিয়ে বলেছে, "কালো মেয়ের নাম আবার পুতুল! যত্তসব। কালো মেয়ের নাম কালীই ঠিক আছে"। সমরের কথাই শেষ কথা। আর কথা বাড়ায়নি চম্পা। ছেলেদের নাম খুব সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছে। বড়োটির নাম রুদ্র আর ছোটোটির নাম নীল। আপনারা আবার রুদ্রনীল ঘোষের কথা ভাববেন না যেন!

------ তা এই তিন ভাইবোন একটু একটু বড়ো হতে লাগল। স্কুলের গন্ডিতে পা পড়েছে তিনজনেরই। কালীর পড়াশোনা হতই না যদি তার মা জেদ না করত। চম্পা এদিক থেকে সমর কে হারিয়ে দিয়েছে। অনেকটা পরিমাণ ঘি পোড়ানোর পর তবে গিয়ে রাধা নেচেছে। মানে অনেক সাধ্য সাধনার পর, জোরাজুরির পর চম্পা তার মেয়ের পড়ার ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছে। ছেলেদের জন্য যেটা তাকে করতেই হয়নি।

------ বর্তমানে তিন ছেলে মেয়ে অনেকটা পরিনত। ছেলে দুটি রুদ্র আর নীল যাবে কোলকাতা। চাকরি সংক্রান্ত প্রস্তুতির জন্য। আর কালী? তার পড়াশোনা চলছিল মায়ের জেদেই। একটা রাত তার জীবনটাকে আমূল পাল্টে দিয়েছে।

----- সেদিন রাতটা ভয়ংকর ছিল। বিকেল থেকেই মেঘের মুখ ভার ছিল। অল্প অল্প হাওয়া বইছিল। কিন্তু সন্ধ্যায় আকাশ তার ভয়াবহ রূপ ধারন করল। বজ্রপাতের সাথে ভারী বৃষ্টি। চলতেই থাকল। সমর আর সেদিন বাড়ি ফেরে না। অনেক রাতে কোথা থেকে একপেট নেশা করে বাড়ি ফিরেছিল। ফিরেই কালীর উপর ক্রোধে জ্বলে ওঠে। যা নয় তাই বলে কালীকে। কালো রঙের মেয়ে বলে তাকে যা নয় তাই শুনতে হয়। আরও কষ্ট পায় তার নিজের বাবার এহেন ব্যবহারে। সমর আরও জানায় সে, কালীকে কোলকাতা পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। পাড়ার ছেলে রতন, কালীকে কোলকাতা নিয়ে গিয়ে একটা ভালো চাকরিতে যুক্ত করিয়ে দেবে। চম্পার 'না' সেদিন আর টেকেনি। সমরের জেদের কাছে সে পরাস্ত হয়েছিল।

------ কথামত পরদিন সকালে রতন হাজির হয় কালীর বাড়িতে। কোলকাতা নিয়ে আসার জন্য। কালীর চোখ গুলো জবা ফুলের মত লাল টকটক করছে। সাক্ষাৎ মা কালী লাগছে। তবে সেই চোখে তেজ নেই। আছে একরাশ কষ্ট। একরাশ কষ্ট। আর অপ্রকাশিত কিছু অভিমান। ওদিকে চম্পার অজান্তেই তার মেয়ের কত বড়ো ক্ষতি হয়ে গেল, চম্পা সে বিষয়ে অজ্ঞাত থেকে গেল।

------ চলে গেল কালী। মা কে ছেড়ে। পরিবার কে ছেড়ে। অনেক দূর। আর হয়তো তার ফেরা হবে না।

------- কোলকাতার এক ঘিঞ্জি গলি দিয়ে রতন কালীকে নিয়ে এগিয়ে চলেছে। কালী জানেও না কোথায় তাকে নিয়ে যাচ্ছে তার জীবন। শুধু রতনকে প্রশ্ন করেছিল,

---আমরা কোথায় যাচ্ছি?
---আর আমার কাজ?

---রতন উত্তর করেছিল অবিশ্যি।
--- "তোকে নিয়ে যাচ্ছি একটা অন্য দুনিয়ায়। যেখানে অনেকরকম লাইট আছে। অনেকরকম অভিনেত্রী আছে। তুই আপাতত প্রশিক্ষণ পর্যায়ে থাকবি। তারপর আস্তে আস্তে স্থায়ী হয়ে যাবি। তোর কাজ পছন্দ হলে তোকে আর আটকায় কে"!

--আরও যোগ করেছিল রতন, "এখানে তোকে অভিনয় করতে হবে। ভাবিস না তুই কালো বলে। বিপাশা বসু কে চিনিস তো? ও যদে সিনেমা করতে পারে তুই নয় কেন? বিপাশাও আহামরি ফর্সা নয়"।

-----রতনের কথায় কালী যেন কোথায় আশার আলো একটু দেখতে পাচ্ছিল। অনেক অলিগলি পেরিয়ে তারা একটা বিশাল বাড়ির সামনে এলো। বলা ভালো অট্টালিকা। রতন, কালীকে বাইরে দাঁড় করিয়ে ভিতরে গেল।

------কিছুক্ষন পর কালীকে নিয়ে রতন ভিতরে গেল।ভিতরে ঢুকে কালীর চক্ষু চড়কগাছ। এলাহি ব্যাপার পুরো। দূরে নজর যেতেই দেখল, একটা বড়ো দোলনায় একজন অতি সুন্দরী মহিলা দোল খাচ্ছে আর পান চিবুচ্ছে। গোটা বাড়িতে পালোয়ান এর মতো অনেক লোকজন ঘোরাঘুরি করছে। এইসব দেখতে যখন কালী একেবারেই মগ্ন....

--"এই মেয়ে এদিকে আয়"।
---" কালো হলেও মুখশ্রী তো বেশ ভালোই তো তোর"।

---চামালীর কথায় কালীর হুঁশ ফিরল। সামনে গেল কালী।

----রতন,কালীকে অতিসুন্দরী মহিলা চামেলীর হাতে তুলে দিয়ে বিদায় নিল।

----চামালী বলল, "কালী তুই গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নে। আমি পরে তোর সাথে কথা বলব"।

-----এখানে আসা ইস্তক কালী ভীষণ নারকীয় যন্ত্রণা ভোগ করেছে। তাকে যে স্বপ্ন দেখিয়ে রতন এখানে কালীকে এনেছিল। তার কিছু তো দূর ঘটা উল্টে রতন একদিন কালীকে জানিয়ে দিয়েছে যে সমর মানে কালীর বাবা কালীকে পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করে দিয়েছে। সেই টাকা নিয়ে তার দাদারা তাদের ভবিষ্যৎ গোচ্ছাতে ব্যস্ত। তারপর থেকে রতনকে আসতে দেখেনি সেরকম। আর আসলেও প্রতিবার একটা নূতন মেয়েকে নিয়ে আসতে দেখেছে। এটাই রতনের কাজ। কাজের টোপ দিয়ে মেয়েদের লালবাতির জগতে নামানো। আর চামেলি হল এখানে সব দন্ড মূর্তের কর্ত্রী। তার নির্দেশে কালীর ঘরে কত অজানা পুরুষ এসেছে। অনিচ্ছা সত্বেও তাকে ছুঁয়ে তাকে কালীমালিপ্ত করেছে। কোনো হিসাবের ইয়ত্বা নেই। এই হল কালীর স্বপ্নে দেখা "লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশান" এ মেশানো জীবন।

------ আজ অনেক গুলো বছর পেরিয়ে গেছে। কালীর নূতন নাম হয়েছে একটা। কলি। ফুলের কলি। এই নামটা সৌম্য এর দেওয়া। আজ কলি বা কালী অনেক যন্ত্রণা ভুলে একদম অন্যরকম একটা মানুষ। আগের থেকে আরও অনেক পরিনত। সব ভুলে সৌম্য কে আঁকড়ে সে আবার বাঁচার মন্ত্রে দিক্ষীত হয়েছে। তার নারকীয় জীবন সে আর ভুলেও কল্পনা করতে চায় না।

------সৌম্য সেদিন এসেছিল। লালবাতির এরিয়ায় থাকা চামেলীর অট্টালিকায় থাকা কালীর ঘরে। না! সৌম্য তাকে ছোঁয়নি সেদিন। কালী একটু অবাক হয়েছিল বৈকি। এরপর কালীর টানে সৌম্য এর যাতায়াত বাড়তে থাকে। কালী তাকে তার জীবনের সব কথা জানায়। কাছাকাছি আসতে থাকে সৌম্য আর কালী। এরপর থেকে সৌম্য একদম স্থায়ী করে নিয়েছিল কালীকে। শুধুমাত্র তার জন্য। সৌম্য ছাড়া কেউ কালীর ঘরে যেত না। কালক্রমে সৌম্য আর কালী ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়। সেই ভালোবাসার অধিকার থেকেই সৌম্য অনেক টাকার লোভ দেখিয়ে চামেলীর কাছ থেকে কালীকে সেদিন উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।

------- আজ আট-ই মার্চ। নারীদের জন্য নাকি স্পেশাল দিন। সেকথায় যাচ্ছি না। আজ সৌম্য এর কলি স্পটলাইটকে সঙ্গী করে বিখ্যাত ডিজাইনার সৌম্য সেন এর ডিজাইন করা সুন্দর ড্রেস পরে র‍্যাম্প ওয়াক করবে। এর থেকে ভালো নারীদিবস কি ই বা হতে পারে কালী ওরফে কলির জন্য। সৌম্য প্রমিস করেছিল কলিকে, "একটা স্পেশাল দিনে তোমাকে এমন সারপ্রাইজ দেবো। তুমি ভুলতেও পারবে না"।

------সৌম্য তার কথা রেখেছে। কলি ওরফে কালীকে এনেছে লাইম লাইটে। আজ তার জীবনের প্রথম র‍্যাম্প ওয়াকে সে সফল। জীবনের লড়াইয়ে ও সে সফল। সৌম্যর মতো মানুষকে সে আজ পাশে পেয়েছে। নারকীয় যন্ত্রণা ভুলে গেছে সৌম্যের অফুরান ভালোবাসায়। সৌম্যর কাছে সে কৃতজ্ঞ। রতনের দেখানো মিথ্যে স্বপ্ন আজ সত্যিই সত্যি হয়েছে। সৌম্য তার কারন অবশ্যই।

----- মিস কলি বর্তমান সিনেমা জগতের একটি বিখ্যাত নাম। একডাকে সবাই চেনে মিস কলি কে। সারাদিন "লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশান" এই গন্ডির মধ্যে জীবন যাপন তার এখন। রেডলাইটে থাকা একটি মেয়ে আজ এসে পৌঁছেছে লাইমলাইটে। এখন সে কেড়ে নিয়েছে সমস্ত স্পটলাইট, তার উপর।

-----সৌম্য আর কলি খুব শীঘ্রই বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে। গ্রাম থেকে শুধুমাত্র কলি ওরফে কালীর মা চম্পার আসার অপেক্ষা।

আমিই সেই নারী যার প্রতি কু-দৃষ্টি পুরুষ লোকের
আমিই সেই নারী যার প্রতি পীড়িত পুরুষ চোখের ।
আমিই সেই নারী যার মুখ চেপেও করা হয় অন্যায়
আমিই সেই নারী যার সম্মান টাকা দিয়ে কেনা যায় ।
আমিই সেই নারী যার গর্ভে সৃষ্টি পৃথিবীর অধিবাসী
আমিই সেই নারী যার অঙ্গ ছিঁড়ে দেওয়া হয় ফাঁসি ।
আমিই সেই নারী যার স্তন প্রতি শিশুর প্রথম খাদ্য
আমিই সেই নারী যার স্থান বৃদ্ধাশ্রম কিবা পরিপাদ্য ।
আমিই সেই নারী যার স্বাধীনতা কেড়ে করা হয় দাস
আমিই সেই নারী যার ব্যাথা বেদনা সওয়া অভ্যাস ।।
08.03.2020 10:50 AM

নারী, তুমি ছিলে বলেই
আজ আকাশ নীল,
সবুজ ঘাস, উজ্জ্বল নদী জল
তোমার প্রভায় সূর্য্য রাঙা, বাতাস ঝিলমিল ।
নারী, তুমি ছিলে বলেই
জ্যোৎস্না মাখি, আঁধার রাতে হাসি খিলখিল
নারী, তুমি ছিলে বলেই
শুদ্ধ হৃদয় ভালোবাসা পেলাম অনাবিল ।।
08.03.2020  6:20 PM

চিতা-ভস্ম
- কিরণময় নন্দী

তোমার হাতে পিতল-কলস
লাল শালু দিয়ে ঢাকা
অশ্রু ভেজা দুটি নয়ন
হৃদ-পাঁজরে সহস্র ব্যথা।

কাঁদছো তুমি হারিয়ে আমায়
চিতা-ভস্ম বুকে লয়ে
তোমার খোকা দিলো ফাঁকি
বিদেশ বিভুঁই-সাত সমুদ্রপাড়ে।

ইচ্ছে আমার ছিল অনেক
রঙিন রঙিন স্বপ্ন আঁকা
গরীব বিধবা মায়ের মুখে
এক চিলতে হাসি দেখা।

বিদেশ বিভুঁই দিলাম পাড়ি
নীল সাগরে জাহাজ বুকে
কয়েক মাস কাটলে তবে
মাটিতে পা যখন জাহাজ ডকে।

কষ্ট মাগো কষ্ট নয়
যতই শ্রম হোক না দিতে
মাসের শেষে মোটা বেতন
খাওয়াদাওয়া সব ফ্রীতে।

হাজার হাজার মাইল দূরে
অপেক্ষাতে আমার মা
খোকা তোমার ফিরবে গাঁয়ে
অভাব কিছুই থাকবে না।

ফিরবে খোকা সিন্ধু জয়ে
সঙ্গে লয়ে অনেক টাকা
ইচ্ছে মাগো ছিলই এটা
বিদেশি রোগেই সব বৃথা।

নৈঋতে তখন কম্পাসের কাঁটা
অতল জলে জাহাজ ভাসে
মারণ রোগে কাহিল আমি
অন্তর্যামী বাঁকা হাসে।

কখন ডকে ভিড়বে জাহাজ
অপেক্ষাতেই শেষ শ্বাস
তোমার মুখে একটু খুশি
মিটলো না মা আমার আশ।

তারার দেশে পৌঁছে গেছি
ঈশান কোণে জ্বলছি আমি
ইচ্ছে করে যাই ছুটে
মুছিয়ে দিই চোখের পানি।

তোমার হাতে পিতল-কলস
লাল শালু দিয়ে ঢাকা
অশ্রু ভেজা দুটি নয়ন
হৃদ-পাঁজরে সহস্র ব্যথা।

গত (২৯/০২/২০২০) দৈনিক সমকাল পত্রিকায় ছাপা, আমার রম্যছড়া বিশিষ্ট কন্ঠশিল্পী মশা ভাইকে নিয়ে।

মশার গান
- জুলফিকার আলী

ফাগুন এলে গায় না কোকিল
তার গানও না শুনি,
কানের কাছে ঘ্যানর ঘ্যানর
মশা গায় গুনগুনি।

মশারী দিই তবু ঢুকলে
তার ভিতরে একটি,
অমনি গায়ে হুল ফুটিয়ে
কামড় দিতো দেখতি!

ঘুম আসে না রাতে
আমার
বাড়ায় মশা জ্বালা,
তার বেসুরও গলা শুনে
দু'কান ঝালপালা|

তবু মশা থামায় না গান
নিজকে ভাবে শিল্পী,
সে ফেবুতে আইডি খুলে
আপডেট দিক সেলফি

তখন সবাই ইচ্ছে মত
শুনতো মশার গান,
শুনে সেটা লাইক না দিলে
করত গরম কান|

কমেন্টটা চাই বেশি বেশি
প্রশংসা চাই মশার,
ভাবছি কি দুর্ভাগ্য
হবে
দুনিয়ার সব ঠসার|

তার গান বা কে শোনে নাই
আছে এমন লোক?
ধনী-গরীব তার কাছে
সব
এসেই সমান হোক|

ভেদাভেদ নেই তার কাছে
যে
কে পাষন্ড-পামড়,
সুযোগ পেলে গান শুনিয়ে
বসায় গায়ে কামড়|

তোমাকে ছাড়া আমার কবিতাই হয়না
- মোশ্ রাফি মুকুল

প্রিয় গ্রন্থের অনীল প্রচ্ছদ নয়
এই অসীম বিলবোর্ডে
শুধু তোমার হাসির স্থিরচিত্রটাই থাকবে,
এই লোকারণ্যে-
একদিন পাইনের,জলপাইয়ের বন হবে,
তার ভেতরে জোড়ানদী,
জোড়াসাঁকো,
তার ফাঁকে ফাঁকে বুনোহাঁস- ম্যাগপাই পাখিদের
নীড়ে ফেরার প্রসস্থ আকাশপথ।
সুকৌশল মনের কাঠামোয় ঘুরে দাঁড়াবে তুমি,
অজানা শূন্যের বাড়িঘরজুড়ে উঠবে
অচেনা কাঠের ভাস্কর্য,
আর
তার বারান্দায় রাজহাঁস বনসাই।

নগরের লোগোহীন সবুজপাতারা কিছুটা হলেও তোমার অবুঝ সুগন্ধ ছড়াবেই,
সামাজিক কৌতূহলে প্রায়শই দেখি
কবিতায় 'তুমি' 'আমি' উচ্চারিত পাপ,
কবিতায় নিষিদ্ধ নারী,
নিষিদ্ধ দৈহিক আলাপ;
অথচ আমি 'তোমাকে' নিয়ে লিখে যাই,
কখনো হাত,কখনো চোখমুখ,
কখনো তোমার নুপুরের
রিনিঝিনির
অবিকল বিবরণ,
তোমার ঊদ্ধৃত শব্দমালা ছাড়া
কোথাওতো আর এতোটা প্রশ্রয় পাইনা,
সত্যি কথা বলতে কি-
'তোমাকে' ছাড়া আমার
কোন কবিতাই হয়না।

তোমাকে ছাড়া আমার কবিতারা ভুল,ভুল বানান,ভুল দাড়ি কমা,
শব্দ আর বাক্যের বহুল
ভুল বোঝাবুঝি,
স্যোসাল মিডিয়ায় ট্রল-তা নিয়ে অট্ট হাসাহাসি।
মিথ্যে মিথ্যে মিথ্যে
তিন মিথ্যে মনে হয় এইসব প্রেম,গসিপ, ভালোবাসাবাসি।

সত্যি কথা বলতে কি
তোমাকে নিয়েই লেখালেখি শুরু,
তোমাকে দিয়েই তা হয় হোক শেষ,
তোমাকে ছাড়া আমি কবিতা-টবিতা
কাউকেই চাইনা-
সত্যি কথা বলতে কি
তোমাকে ছাড়া আমার
একটাও কবিতাই হয়না।

বাংলা একাডেমি,সমগ্র সংস্থা,
ঋদ্ধ সমালোচক,আপ্লূত পাঠক,স্বনামধন্য
প্রকাশক,
নন্দিত প্রকাশনী
আমাকে কাক কিম্বা অকবি-টকবি যে
যা-ই বলুক
তোমাকে নিয়েই
আমার প্রতিটা কবিতা চলুক,
তোমার জন্যই আমি কবি,
তোমার জন্যই আমি কবি'না-
সত্যি কথা বলতে কি
তোমাকে ছাড়া আমার
কবিতাই হয়না,কবিতাই হয়না!

০৬/০৩/২০২০.

এখন লিখবো মনের কথা। আমার নিজের মনের মধ্যে ঝড় উঠলে যাদের লেখা পড়ে বা গান শুনে নিজেকে শান্ত করতে পারি তাদের কথা লিখবো।
লালন, কবির, রবীন্দ্রনাথ ইত্যাদির মতন মনীষীরা বলে বলে মরে গেলো যে মানুষের সাথে মেশো, মানুষের কথা বলো। শুনছে কই? শুনলেই বা মানছে কই?
এই মানুষগুলি না ছিলেন দাম্ভিক, না ছিলেন অহংকারী। কি সরল, কি সাধারণ ভাষায় বলে দিলেন মুক্তির পথ। মানুষ ভজতে কইলেন লালন। কবীর ও তাই। কবিগুরু ও তাই।
শুনলো‌ সবাই। শিখতে চাইলোনা।
ওনাদের রচনা গুলি দেখুন। কি মিল ভেবে অবাক হতে হবে।আবার যেই মগজ কে জোর না দিয়ে মনের চোখে দেখবেন, সেই বুঝে যাবেন যে এগুলো আসলে সব খাঁটি সত্য কথন। সত্যের রূপ সব সময় এক। প্রকাশের ভাষা আলাদা হতে পারে, অন্তর্নিহিত অর্থ চিরকাল সমান। সময় আর সত্যের রূপ যে এক ই। তাই তো এনাদের কথা মিলে যাই।
লালন এর গান “মানুষ ছাড়া ক্ষেপা রে তুই মূল হারাবি” গানটি কত সহজ এ মানুষ হবার উপায় বাতলে দেয়। কত সহজে “মাথা মুড়ে” জাতে ওঠার আসারতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। দেয় দেখিয়ে সহজ পথ। কেও কেনো চাইনা সেই পথে চলতে?!
কবির তার দুই পংক্তি রচনায় সেই একই তো কথা বলেন। হাতের মালার মুক্ত ছেড়ে মনের ভিতর যে মুক্ত আছে তার দিকে নজর ফেরাতে বলেন।
দুজনের লেখায় সেই এক ভাব। আবার দুজনেই আগে কর্ম করে তবে উপদেশ দেন। দুজনেই সারা জীবন রইলেন মানুষের সাথে, মানুষের মধ্যে।
রবীন্দ্রনাথ তো সারাজীবন মানুষের কথাই বলে গেলেন। কি সহজে লিখে গেলেন “মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই।” এর পরেও কি র কিছু বোঝার বাকি থাকে? সব তো একই কথা শুধু শব্দ ভিন্ন। ভাব এক, কথা আলাদা।
ওনারা নিজে যা বলেন, করেন ও তাই। যদি প্রেমিক হতে হয় তবে কি এনাদের মতন হওয়া কি বাঞ্ছনীয় নয়। তিনজনেই তো মানুষকে ভালোবেসে অমর হয়ে গেলেন? তাদের কথাই তো মন্ত্র। জীবন্ত মন্ত্র। নকল মন্ত্রের কী প্রয়োজন বলো বন্ধু!
“মানুষ ভজ, মানুষ ভজ মন
ছেড়ে মন্ত্র তন্ত্র যন্ত্র তন্ত্র
মানুষকে করো আপন।
মানুষ ভজ, মানুষ ভজ মন”

দাহ
- ঝিলিক মুখার্জী গোস্বামী

-- গণেশ চন্দ্র পাইন। তাঁর তিন কন্যা সন্তান এবং স্ত্রী দূর্বা দেবী কে নিয়ে একটুকরো সংসার। ছেলের আশায় বুক বেঁধে ছিলেন পাইন দম্পতি। বোধহয় ভগবান তাঁদের দিকে মুখ তুলে চান নি। বছর ঘুরে চেষ্টা করেও পুত্র সন্তান লাভ হয়নি পাইন দম্পতির। শখ ছিল একটি পুত্র সন্তানের। পরপর তিনটি কন্যা সন্তানের পর কার্যত পাইন দম্পতি পুত্র লাভের আশা ত্যাগ করেন। যাই হোক। গ্রামের এক চিলতে কুঁড়ে ঘরে দম্পতি পরিবারের বাস। সেই অর্থে ধনী পরিবার নয়। নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। তাও বেঁচে থাকে পাইন পরিবার। বাঁচতে হয় বলেই বেঁচে থাকে।

-- আমি আজ আপনাদের সামনে এই পাইন পরিবারের গল্প ফেঁদেছি।

-- তিন বোন। বড় বোন অর্না। মেজ বোন পর্না। আর ছোট বোন ঝর্না। সবাই পিঠোপিঠি। সেরকম বয়সের ফারাক নেই। তাই তিনটি বোনের খুব ভাব।

--গরিব বাড়ির মেয়ে তিনজন। বাবা গণেশ বাবু আর মা দূর্বা দেবী গ্রামের ই লোকের জমিতে ভাগ চাষ করে জীবনযাত্রা নির্বাহ করেন। নিজেদের সম্পত্তি বলতে কিছুই নেই। ওই এক চিলতে কুঁড়েঘর ছাড়া। তিনটি মেয়েকেই এক সাথে গ্রামের ই সরকারি স্কুলে ভর্তির ব্যবস্থা করেন পাইন দম্পতি। কিছু না হোক, স্কুলে একবেলা মিড ডে মিল তো জুটবে ওদের।

-- বছর গড়ায়। তিন জনেই বড়ো হয়ে ওঠে একসাথে। পড়াশোনা সেরকম চালাতে যথেষ্ট অক্ষম ছিলেন, পাইন দম্পতি। বড় মেয়ে অর্নার বয়স এখন বছর চোদ্দ। তাই তাঁরা ঠিক করেন এখনই মেয়ের বিয়ে দেবেন। যেমন করে পারেন। পুরো গ্রাম থেকে সাহায্য চেয়ে বিয়ে দেবেন। মেয়ে দিন দিন ডাগর হয়ে উঠছে। কেউ বলবে না বছর চোদ্দ এর মেয়ে। কথা মত গ্রামের ই এক ঘটকের দৌলতে একটি ছেলে জুটে যায়। সোনার কর্মকার। থাকে মুম্বাই তে। দেখাশোনা হয়ে গিয়ে বিয়ে হয়ে যায় বড় মেয়ে অর্নার। একটু যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচেন পাইন দম্পতি। একটা "সমস্যা" তো ঘাড় থেকে নামল। গরিবের বাড়ি মেয়ে জন্মানো, সমস্যাই বৈকি।

-- বড়ো জামাই এর দৌলতে পাইন পরিবারে একটু স্বচ্ছলতা ফেরে। এখন খাবার বা পরার জন্য চিন্তিত হন না পাইন দম্পতি। বড়ো মেয়ে অর্না, মায়ের কাছে এলেই মা'র হাতে টাকা দিয়ে যায়। বোনেদের জন্য জামা, বাবার জন্য জামা; মা'র জন্য শাড়ি নিয়ে আসে। এখন সবাই খুশি। বড়ো জামাই তাঁদের সবাই কে নিজের পরিবারের মত খেয়াল রাখে। বড়ো মেয়ে খুবই ভালো আছে। সময়ের চাকা ঘুরিয়ে বড়ো মেয়ের "মা" হবার খবর আসে।

--আরও কিছু সময় অতিক্রান্ত হয়। অনেকটা সময়। সেবছর হঠাৎই দম্পতি পরিবারে প্রথম ঝটকা টা লাগে। খবর আসে বড়ো মেয়ে অর্না আর নেই। জলে ডুবে মারা গেছে। মৃগী রুগী ছিল। পুকুরে স্নান করতে গিয়ে রোগটা শরীরে জাঁকিয়ে বসে। সামলাতে পারেনি। তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে অর্না। গণেশ বাবু- দূর্বা দেবী যান মেয়ের দাহ কার্যের হেতু। ইচ্ছে না থাকলেও যেতে হয়েছিল। শ্মশানে গিয়েছিলেন গণেশ বাবু, বড়ো মেয়ে অর্না কে দাহ করতে।

--বড়ো মেয়ে মারা যাবার পর বেশ কিছুদিন পাইন দম্পতি একদম শিথিল হয়ে গিয়েছিল। অনেকদিন মুখে কিছু তুলতে পারেনি। তখন মেজ মেয়ে পর্না দায়িত্ব নিয়ে বাবা-মা কে সাধারণ জীবনে ফিরিয়ে আনে।
-মেয়েটা যে মো'ল গো।
-এখন মোদের কি হবে?
কেঁদে ওঠেন দূর্বা দেবী।
--মেয়ে মরার শোক ভোলা কী এতো সহজ ! দশ মাস দশ দিন পেটে যাকে ধরলেন, তাকেই দাহ করে ফিরলেন।

-- সময়ের জাঁতাকল পেরিয়ে আরও কয়েকটি বছর অতিক্রান্ত হল। পর্না আরও একটু বড়ো এখন। পড়াশোনা আর এগোয় নি তার। ছোট বোন এখনো ইতি টানেনি পড়াশোনার। অর্না মারা যাবার পর পর্না মা-বাবার সাথে সংসারের হাল ধরেছে। নিয়ম করে জমিতে যায়। মা-বাবা কে সাহায্য করে।

--পাইন দম্পতি আবারও ঠিক করেন এবার পর্নার বিয়ে দেবেন। সে এখন অষ্টাদশী। গ্রামের বুকে এটাই নাকি অনেক বয়স। বলা ভালো বিবাহযোগ্যা। আবারও সেই একই পন্থা।গ্রামের সবার সাহায্য আর গ্রামের ঘটকের সৌজন্যে পর্নার বিয়ে ঠিক হয়। এবারের পাত্রও পেশায় স্বর্ণকার। তবে এবার ঠিক হয় বিয়ের পর পর্না মা-বাবার কাছেই থাকবে। কারন কার্য সূত্রে পর্নার হবু স্বামী চেন্নাই নিবাসী। দিনক্ষন ঠিক করে একদিন শুভ মুহূর্তে চার হাত এক হয়ে যায়।

--পর্না এখন মা-বাবার কাছেই থাকে। তার স্বামীর ভালো রোজগার। সেখান থেকেই মা-বাবা কে সাহায্য করে। ছোট বোন ঝর্নার পড়াশোনা আর বন্ধ হয়নি। এখন আর তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা নয়। কিছুদিন হল পর্না নিজেদের কুঁড়েঘরকে বাড়ির রূপ দিয়েছে। ঘরে টিভি নিয়েছে। স্কুটি কিনেছে। স্বর্ণকারের বৌ বলে কথা। গা ভর্তি সোনার গয়না। পাইন দম্পতি ও খুশি।

-- বছর পেরিয়ে পর্না এখন দুটি কন্যা সন্তান এর জননী। একটি আড়াই বছরের। আর একটি সাড়ে তিন বছরের। মামার বাড়িতেই তাদের বসবাস। সব দিব্যি চলছিল। পুরোনো ক্ষতচিহ্ন টা সবে ভরাট হচ্ছিল। পর্নার একদিন হঠাৎ রক্ত বমি হল। শরীর শীর্নকায় হতে থাকল। গ্রামের ডাক্তার কিছুই ধরতে পারলে না। শহরে নিয়ে আসা হল। সব কিছু পরীক্ষা করার পর জানা গেল ব্লাড ক্যান্সার। আবার মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ল পাইন পরিবারের।

--ট্রিটমেন্ট শুরু হল পর্নার। চলতে থাকল বছরের পর বছর ধরে। তার স্বামী কোন খামতি রাখেনি ট্রিটমেন্টের। লাখ লাখ টাকা জলের মত খরচ হতে লাগল। তাও ট্রিটমেন্ট বন্ধ হল না। সোনার মেয়ের সব সোনার গহনা বিক্রি হল টাকার জন্য। পি জি হসপিটাল থেকে ঠাকুরপুকুর। সেখান থেকে চেন্নাই। না! কোথাও কিছু হয়নি। একদিন পর্নার শীর্নকায় শরীর জবাব দিল। জানান দিল তার যুদ্ধ করার শক্তি শেষ। মারাত্মক মারণ রোগের কাছে সে হেরে গেছে। ভেঙে গেছে তার সব স্বপ্ন। তার ছোট বোনের ধুমধাম করে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন, নিজের কন্যা সন্তানদের নিয়ে তিল তিল করে গড়ে ওঠা স্বপ্ন সব সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়েছে এই মারণ রোগ।

-- মেজ মেয়ে পর্নার মৃত দেহের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে বসে আছেন গণেশ বাবু। দূর্বা দেবী মূর্চ্ছা যাচ্ছেন বারবার।পাড়ার সবাই বলল, "আর দেরী করা যাবে না। বডি পচে যাবে এরপর। তোলো সবাই বডি কে"।

--আজ আবার একটা মেয়েকে দাহ করতে যেতে হবে শ্মশানে। বাবা হয়ে সন্তানকে দাহ করতে যাবেন আবারও।

-- বলো হরি, হরি বোল.... ধ্বনি দিতে দিতে পাড়ার সবাই পর্নার মৃত শরীরটাকে খাটিয়া তে করে নিয়ে চলল শ্মশানের দিকে। বাবা হয়ে আবার একটা মেয়েকে দাহ করতে চললেন গণেশ পাইন।

-- পর্নার আত্মা আজ ইহলোক ছেড়ে পরলোকের পথে যাত্রী। সদ্য দাহ করা মেয়ের শোক মা-বাবা কেউই ভুলতে পারেননি। পর্নার মা এখনও দুটি মেয়ের শোকে বিহ্বল। ভাবতেই পারছেন না কেউ যে পর্না আর নেই। পাইন পরিবারের মাথায় এবার যে আকাশ ভেঙে পড়েছে তা ভরাটের আশা আর নেই। সন্তান দাহ করার কষ্ট একমাত্র সেই বুঝবে যে তার সন্তান কে ছোট থেকে বড় হতে দেখে তার মৃতদেহ কাঁধে বহন করে শ্মশানে গেছে দাহ করতে। পাইন দম্পতির অবস্থা বর্ননা করা যায় না। পরপর দুটি মেয়ে হারানোর অসহনীয় যন্ত্রণা পাইন দম্পতি সহ্য করতে পারেননি। দু'জনেই শোকে বিহ্বল। ছোট মেয়ে ঝর্না সব বুঝতে পারছে, দিদি আর নেই। কিন্তু তার সে ক্ষমতা নেই পর্নার মত, মা-বাবা কে সামলে সংসার সামলানোর।

-- পর্নার মৃত্যুর সাথে সাথে তার ছোট্ট মেয়েটিকে তার একমাত্র পিসি নিয়ে গিয়েছে তাঁর কাছে। আর বড়ো মেয়েটি আপাতত তার বাবার কাছেই। সন্তানদ্বয় বুঝতে পারছে না তারা কী হারিয়েছে। তাদের বোধশক্তি নেই সেরকম। মায়ের আঁচল ছাড়া তারা কিভাবে থাকবে একমাত্র ভগবান ই জানেন।

-- মা হারা সন্তান আর সন্তান হারা মা-বাবা এখন কী যন্ত্রনাদায়ক অবস্থায় থাকতে পারে ও পারেন সেই নিদারুন যন্ত্রনার প্রতিচ্ছবি আপনারা নিশ্চয়ই কল্পনা করতে পারছেন।

--পাইন দম্পতির ঘাড়ে এখন দুই মেয়েকে দাহ করার অসহ্য যন্ত্রণা ভীষণরকম ভাবে চেপে বসেছে। তাদের মেয়ের শেষ চিহ্ন স্বরূপ পর্নার সন্তানদ্বয়কে কাছে রাখার মতো যথেষ্ট ক্ষমতা ভগবান কেড়ে নিয়েছে তাদের থেকে। দুই মেয়েকে দাহ করার অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে পাইন দম্পতি আজও বেঁচে আছে। তাদের অসহনীয় যন্ত্রণার একমাত্র সাক্ষী তাদের ছোট মেয়ে ঝর্না।

একটি বার বুকে জড়াবো বলে
- কিরণ মাহমুদ মান্না

আমি সেদিন দেখেছিলাম তোমায় বৃষ্টি ভেজায়,
মুগ্ধ নয়নে দেখে ছুঁয়েছিলাম দু'হাতে সেই জল,
স্পর্শে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলি নিমেষেই।
তুমি বেঁধেছিলে আমায় সে কোন মায়া শিকলে?

আমি সেদিন দেখেছিলাম তোমায় ভোরের কুয়াশায়,
নগ্ন দুটি রাঙা চরণে হেটেছিলে ঘাসের গালিচায়,
আমি হয়েছিলাম সেদিন পাগল পারা প্রায়; দেখে-
তোমার যুগল চরণও খানি, তুমি কি পাওনি টের?

আমি অনুভবে ছুঁয়ে দিয়েছিলাম দুটি গাল তোমার,
সেদিন মিষ্টি সকালে সূর্য্যের রশ্মি হয়ে তুমি,
জানালার পর্দার ওপাশে এসে দাঁড়িয়ে ছিলে।
আমি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলাম তোমাতে।

আমি দেখেছিলাম তোমায় গোধূলির এক সন্ধ্যায়,
পশ্চিম দিগন্তের লালিমায় ঐ দূর আকাশ পানে,
তুমি রং বেরঙয়ের মেঘেদের দলে মিশে ছিলে।
পরন্ত সূর্য্যের প্রেমে পড়ে লুকোচুরি খেলেছিলে।

আমি দেখেছিলাম তোমায় তারার মেলায়,
নিঝুম রাতে পূর্ণিমার আকাশের বক্ষ হতে,
চান্দের জোছনা জলে ভিজে লুটোপটিয়ে হাসতে।
আমি দু'হাত পেতে দাঁড়িয়ে ছিলাম তোমার অপেক্ষায়
ভালোবেসে একটি বার বুকে জড়াবো বলে।

০৩/০৩/২০২০ ইং

ফাটল ও কল্পিত সকল চেনামুখ
- মোশ্ রাফি মুকুল

তারপরও
তার শেকলের ঘ্রাণ নিতে কারা যায়?
কারা যায় তার কাছে?
এবং এমনি এমনি তারা কিনে নেয় উর্বরা দিন অজস্র ফাটল,
উপঢৌকন দেয় রাষ্ট্রায়ত্ত সুখ,প্রেমের তালবাহানা,শিউরে ওঠা বাহু,
টেলিটাকা-সোনার কয়েন।

তুমিও হাত বাড়ালে পেতে পারো মাংসের চাঈ,গ্রীক মিথষ্ক্রিয়া,
ভালোবাসার অঢেল ভর্তুকিঃ
তথাগত নরম স্তন;
শুধু সেখানে নেই নদী,লেবুফুল,
সুরভী কার্পাস কুশন।

অতঃপর কল্পিত সকল চেনামুখ
ঘুরে আসে সে
দ্রব্যরাজ্য,দ্রবীভূত নাভিদেশ;
বারবার
হাতে নিতে চায় সেইসব অভিসারী প্লেট,
নাসিকা ভরায় তার
মাতোয়ারা-
যমজ শেকলের ঘ্রাণে।

০১/০৩/২০২০.

শান্তি নজির
- কিরণময় নন্দী

গুলি বারুদের আতঙ্কে সব
লাশের ভিড়ে স্বজন খোঁজা
নিজেই নিজের কান্না চেপে
হালকা করে কষ্ট বোঝা।

ফিরতে চায় ছন্দে ওরা
নতুন করে স্বপ্ন বুকে
হায়না গুলো ধূর্ত সব
অন্তরালে আড়িপাতে।

খেলা মানুষ বুঝে গেছে
পরিচয়ে ওরা অভিন্ন
যেই বা মরুক রোষানলে
সে শুধুই #মানুষ; নয় অন্য।

চাহিদা গুলো বুঝবে যখন
নামবে মানুষ প্রতিবাদে
সত্য চাপার একটি পথ
বীজ বুনে দাও বিভেদে।

শক্ত হও জোট বাঁধো
তৈরি করো মানব প্রাচীর
সব বিভেদের মুক্তি চাই
শান্তি চাই গড়ো নজির।

স্টেশন মাস্টার
- অর্পিতা ঠাকুর চ্ট্টরাজ

শীততা এবার বেশ পড়েছে,ঘরে টিকতে পারছিনা,স্টেশনে আরো ঠাণ্ডা।এই গরম চাদর রাখো ব্যাগে।
---আমাদের ডিউটিতে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে বসে থাকা যায় কি?ওসব লাগবেনা।
---100কি,মি স্পিডে এক্সপ্রেসগুলো যায় ,ওটা গায়ে দিয়ে অলরাইট দিতে বেরোবে।
অনুর জেদে চাদরটা নিয়ে যেতে বাধ্য হয় সুমিত।আগেরটা একটা পাগলীকে দিয়েদিয়েছিল,এটাও কারো কপালে আছে ভেবে মৃদু হাসে।
সারারাত জেগে থাকা,চা বানিয়ে চেয়ারে পা তুলে বসে চাদরটা জড়িয়ে নেয়।কুয়াশার জন্য লেট চলছে ট্রেনগুলো।রিলিভারের উল্টো দিকের ট্রেন পরে এলে ওর এদিকের ট্রেন মিস হবে।
----বড়বাবু চা আছে,এক বুড়িমা কখন ট্রেন থেকে নেমেছে,বসে বসে কাঁপছে।
----আছে,দে গরম করে।
বাইরে দেখে ঘন কুয়াশার মধ্যে ময়লা শাড়ি পরা এক বুড়ি বসে কাঁপছে।

---ওনাকে ভেতরে এনে বসা।
নিজের শতরঞ্জিটা বিছিয়ে গরম চাদরটা গায়ে দিয়ে দেয় ভালো করে ।বুড়িমা অবাক হয়ে দেখে ওকে।খাবারের দাম দিয়ে ব্যাগ ওঠায় ও,রিলিভার আর ট্রেন দুই-ই এসে গেছে যে ।

আস্থা রেখো
ভাই যেন আস্থা রেখো।
থামলে হবেনা ভাই ভাঙলে হবেনা।
মাথা নত কভু করলে হবেনা।
তুমি আস্থা রেখো।
আস্থা রেখো সত্যে,
আস্থা রেখো কর্মে।
বলে যাও তুমি মানুষের কথা,
কাছে টেনে নাও সকলের ব্যাথা,
আস্থা রেখো ধর্মে।
যখন আসবে ছুটে নিয়ে তলোয়ার,
দেখিয়ে দিও গো কলমের ধার,
মনুষ্যত্ব আছে যে তোমার রন্ধ্রে রন্ধ্রে চর্মে।
বন্ধু আস্থা রেখো মেঘ কেটে যাবে,
লুকানো সূর্য ঠিক দেখা যাবে,
তুমি সত্যের হাত ছেড়োনা,
আস্থাকে তুমি মেরোনা।
তুমি গান গাও,
গেয়ে সকলে শোনাও,
হিংসার বনে তুমি শান্তি সিংহ হয়ে যাও।
সখা, আস্থা পাখিরে প্রাণ দাও।
নম্র, ভদ্র, ধীর তুমি
প্রলয় বিষাণ বীর তুমি।
তুমি সারিপুত্র,
তুমি মানুষ।
আস্থা রাখো,
হ্যাঁ,আস্থা রাখো,
একদিন ফিরবেই ওদের হুঁশ।

মাথার মধ্যে কিলি বিলি ভাবনা

কোনটা ঠিক
কোনটা ভুল
নিজেই ভাই জানিনা।
জানি শুধু লিখতে হবে।
যেমন করে হোক,
যে পরিস্থিতি তে হোক লিখতে হবে।
প্রকাশ করতে হবে মনের কথা।
না না।
মন নয়।
মগজের কথা।
যা করে সব মগজ করে।
এই মগজটাই যত নষ্টের গোড়া।
একে উপড়ে ফেলে দিলে বাঁচা যায়না,
যায়না এর সব কথা শুনে বাঁচা।
কি করি কি না করি দ্বন্দ্ব সব এর মধ্যে।
কখনো শান্ত থাকে,
কখনো উদ্দাম দৌড়।
বলি তুই আমার ভালো চাস?
নাকি খাওয়াতে চাস ঘোল?
শেষে ধুর বলে ছেড়ে দি হাল।

যেই না ছাড়া, অমনি কামাল।
ইড়িং ফটাস তুর্কী দামাল।
দমাদম সব আসে ভাই,
টুকটাক টুক লিখে যায়।
থাকেনা চিন্তা কিছু।
ভাবনা ছাড়ল পিছু।
আনন্দে মূর্খ আমি
কাব্বির ছন্দে নামি।
ছন্দে দ্বন্দ্ব যে নাই।
পাই পাই খুব মজা ভাই।
পেয়ে মজা সবারে দিলাম
বিষ টুকু নিজেই পেলাম।
বিষ ওটা নয় অমৃত ভাই
চক্ষু খুলে খুব দেখা চাই।
লিখছি দেখো হিজী বিজী
মণ্ডা মিঠাই লেউল বীজী।
চাঁদ মামা ওই ডাকছে গো নাক।
সুমিতাংশু দাঁত ভাঙ্গা কাক।

আয় দেখ আমি এসে গেছি
আমি পাগল!
আমি রুদ্র সেজেছি।
আয় আমার যা আছে সব নিয়ে নে
সব কেড়ে নে।
কেড়ে আগে নিজের টা বুঝে নে।
আমি দুহাত মেলে দাঁড়িয়ে আছি
যেভাবে পারিস যখন পারিস
আমার কাছ থেকে নিয়ে নে।
কেড়ে নে আমার যা কিছু আছে
আমার মান অপমান সুখ-দুঃখ সব কেড়ে নে।
কিরে নিজের আখের গুছিয়ে নে।
গুছিয়ে নিয়ে চলে যা।
ফিরেও তাকাবিনা।
আমাকে ক্ষ্যাপা মাথামোটা যা ইচ্ছা বলে নে।
শুধু আমি যেটুকু দিতে পারি সেটুকু তো নিঙড়ে নে।
এত করে বলছি তাও বুঝতে পারছিস না?
ওরে স্বার্থপর হ স্বার্থপর হ স্বার্থপর হ!
আমি মানুষকে ভালোবেসে ফেলেছি
আমি চেয়ে চেয়ে কাছে টানতে শিখে গেছি।
তুই না নিলে আমি জোর করে দেব।
ক্ষুদ্র সামর্থে যা আছে তাই বিলিয়ে দেব।
তাতে তুই অপমান করলে,লাথি-ঝাটা দিলে কষ্ট হবে।
সে কষ্ট তোকে বুঝতে দেব না।
নিজে মানুষ হতে পেরেছি কি পারি নাই জানিনা।
তবে তোকে আর তোদেরকে মানুষ করে ছাড়বো।
হিংসা-বিদ্বেষ আছে সে আমি জানি।
তবু আমি বৈরাগী প্রেমিক হয়ে মানুষের জয়গান গাইব।

আমি একটি কবিতা লিখেছিলাম। নাম ছিল ‘হতেই হবে’। আমরা যা বিশ্বাস করি তাই তো লিখি। আমি বিশ্বাস করি সৎ আর সত্য পথে থাকলে হবেই হবে।

আমার লক্ষ্য বিনে পয়সায় শেখানো। পড়ানো বা মুখস্ত করানো নই। শেখানো।
শেখাব কাকে? যাদের শেখানোর কেও নেই তাকেই শেখাব। যার টাকা দিয়ে পড়ার ক্ষমতা নেই তাকেই শেখাব। যে মনে করে তার দ্বারা হবেনা তাকে শেখাব। করছি ও তাই।
কেমন করে করছি তবে শুনুন। গল্প টল্প নয়। বাস্তব কথা বটে।
আমি লেখা শুরু করেছি সবে এক দেড় মাস মতন। লিখতে গিয়ে গান ও লিখে ফেলেছি। তার সুর ও করেছি নিজে। শতাব্দী বলেছে রেকর্ড করে ছাড়তে। ওর কথাই শেষ কথা।
তবে রেকর্ড করার জন্য তো জিনিস লাগে।
গেলাম স্টেশন। স্টেশন বাজার এ যেতে খুব ভালো লাগে। ওদের অহংকার নেই। ওরা ভালোবেসে পাগল বলে ডাকে। আমার ও খুব ভালো লাগে।
এই রকম স্টেশন এর গায়েই আছে শোনুর দোকান। আজ জেনে নিলাম ওর ভালো নাম।
আবির!
কি দারুন ছেলে। কি প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর। সবসময় হাসছে। নিজের পেটের ভাত নিজেই জোগাড় করছে। চোখে মুখে লেগে আছে করতেই হবে,পারবোই আমি, এমন একটা দৃঢ় বিশ্বাস।
আমি না। যিনি সত্য তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন ওই দোকানে। গিয়ে জিনিস কেনার সময়,গল্প করার সময় বেরিয়ে এলো।
গল্প করতে গিয়ে বললো ও ইংরেজি জানে না। বাস আবার কি। বললাম ‘শিখবি’?
এককথায় রাজি। কিন্তু নিজের উপর বিশ্বাস এর বড় অভাব। ভয় নেই!
আমার বিশ্বাস আমি তোর মধ্যে ছড়াবো।তুই পারবি!কেউ না পারুক তুই পারবি!তোকে পারতেই হবে!তোকে পাড়িয়ে ছাড়বো।
ওকে কথা দিয়েছি রোজ পাঁচটা মিনিট দিনে দিস তাহলে শিখিয়ে দেবো ।রাজি আছে ।
নেমেছি পথে ।এগিয়ে গেছি ।আমার ভাই ,শোনু ভাই সাথে আসতে রাজি হয়েছে। ওকে শেখাব! শিখতে গিয়ে নিজে শিখবো।দুজনে মানুষ হবো।
এরকম ছেলেই তো খুজছিলাম ।
যে ছেলে নিজের পেটের ভাত নিজে জোগাড় করবে। নিজের সমস্যা নিজেই মেটাবে।মানুষকে ভালবাসবে।আমাদের মতো পাগলকে আপন করে নেবে, আর যাদের মধ্যে থাকবে শেখার অদম্য ইচ্ছা। পেয়েছি শানুর মধ্যে। তুই আবির!তোর প্রাণের আবিরে রাঙিয়ে দিবি তুই পৃথিবীকে।
ঘৃণা বিদ্বেষ হিংসা নয় ভাই।
আবির বন্ধু!! ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে দিবি তুই পৃথিবী কে।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget