নভেম্বর 2019

কবিতা - বৃষ্টি
- বিদিশা কর্মকার

প্রথম দেখা বৃষ্টিতে
বাসস্ট্যান্ডের কাছটাতে ,
চোখে চোখে কথা হলো
প্রথম দেখার ক্ষণেতেই |
ছোট্ট ছিলো স্বপ্ন মোদের
মনের নিবীড় বন্ধনে,
বৃষ্টিতেই লেখা ছিলো
মোদের প্রেমের গল্প যে ||
***
চল না ভিজি একসাথে
রিনিঝিনি বর্ষাতে |
এক ছাতাতে দুজনে
হাতের উপর হাত রেখে |
যদি বা হয় ইলশেগুঁড়ি
বসবো দুজন গুটিসুটি ,
হাতের উপর হাত রেখে
বাঁধবো প্রেমের সুরটাকে |

এটুকুইতো স্বপ্ন ছিলো,
তোর চোখের ভাষাতে ||
***
বৃষ্টি মোদের প্রেম ছিলো
বৃষ্টি ছিলো ভালোবাসা ,
বৃষ্টিই একদিন কাল হলো
নষ্ট হলো তোর রূপকথা |
পথের কিছু পশু তোকে
ফেলে গেলো পথের ধারে,
সেদিন ওতো বৃষ্টি ছিলো
আকাশ ভেঙে ঝমঝমিয়ে ||
***
চুপটি করে দাঁড়িয়েছিলাম
শববাহী গাড়ির পাশে,
চোখে আমার শ্রাবণ ধারা
বাঁধ মানে না কিছুতেই |
হঠাৎ ঝেপে বৃষ্টি এলো
যখন শশ্মান ঘাটেতে,
বৃষ্টিতে শুরু ছিলো
শেষ ও হলো বৃষ্টিতে ||
#বিদিশা #
#স্বত্ব সংরক্ষিত

সাদা কালো

- শীতল আচার্য

আলো আঁধারিতে মেশা আকাশের রং
বিবর্ণ পৃথিবীর শ্যাওলা ধরা ছাদে -
মাটি আর পাথরের ধূসর কঙ্কালে
অন্ধকার মিশেছে জীবনের অবসাদে |

উচ্ছ্বাসও মন থেকে বাষ্পীভূত হয়ে
কালো আকাশে বিন্দু হয়ে মেশে -
রত্ন সিন্দুকের হারানো চাবির খোঁজেও
সিন্দবাদ নাবিক সাত সমুদ্র চষে |

কেবলই হৃদয় ভাঙে, গ্রাম ভাঙে,
ভাঙে শব্দের প্রাচীর কোলাহলও -
শূণ্যতায় সময় থেমে আজও প্রতীক্ষায়
ইতিহাস কথা কয়, বিস্মৃত হাওয়াও !

কবিতার নাম :- ঘুম নেই
কলমে :- সুভদ্রা রায়

ঘুম নেই - রাতভর
বন্ধ হলে চোখের পাতা

ভেসে ওঠা - বর্বরতা নগ্নতার
অসহায় মেয়ের শরীর নিংড়ে!
কোমল পেলবতা কুরে কুরে জিঘাংষার -

উজ্জ্বল মহানগরী হয়েছে ভীত সংত্রস্ত
কারা ওরা - ওরা কারা!!!

পশুরা তো করে না ধর্ষণ
জানে না কি তার মানে -
ওরা পশুদের ও করে হত্যা- নির্দ্বিধায়!

নরখাদকের লোলুপ দৃষ্টি
বাদ যায় না গোটা শরীর
নগ্নতা ছিঁড়ে - ওরা উদ্দাম.!!

রক্ষা পেল না এবার ও
জানতে পারলো না কেউ আগে থেকে
কি নিদারুণ দুঃসহ নিপীড়নে
নিষ্পেষিত হলো দেহ মন -

রাত্রির গভীর বৃন্ত ছিঁড়ে গিলে ফেলে
- ওরা হয়েছে দানব!

আসে না ঘুম
হৃদপিন্ড মুচড়ে - দলা দলা যন্ত্রণা
পাক খাচ্ছে অবিরাম -

নিদারুণ ব্যথাভরা ব্যর্থ দুটি হাত
ত্রিশূলের ফলায় পারলো না চিঁড়ে দিতে -
ঐ নর পিশাচের বিষাক্ত দেহসব-

নিষ্পাপ প্রকৃতির উদারতায়
দাউ দাউ জ্বললো - মানবী
স্তব্ধ রাত - ঘুম নেই....
হৃদপিন্ড পুড়ে হলো খাক-

করা গেল না ধ্বংস নর পিশাচের
কবে আসবে দিন - সেই ক্ষন???
জ্বলে যাচ্ছে- কাগজের কবিতা মালা....
ঘুম নেই সারা রাত- ঘুম নেই -

৩০/১১/২০১৯

জন্মান্তর
- রাজু চক্রবর্তী

উন্মুক্ত উপত্যকার প্রাণবন্ত ঘাসে, পৃথিবীর প্রথম আলো দেখেছিল, ছোট্ট এক অবুঝ-সবুজ কলি,
উত্তরের বাতাস এলো, আগত শৈত্যের আবেশ নিয়ে,
গতি সঞ্চারিল প্রাণে, অদ্ভুত আবেশে গুঞ্জরিল অলি।

ক্ষুদ্র তনু, বিহ্বল, চঞ্চল, সূর্যালোকে উৎসারিত,
লভিল অরূপ জীবনধারা, বর্ষণ সুখ নামিল পাদপে,
আস্বাদিল মৃত্তিকা রস, উজ্জীবিত শ্যামল মহিমা,
পাংশু-হরিৎ বরণ, ঘনাইল শ্যামলিমা, আপন আদবে।

গ্রীষ্ম নাহি প্রকটিল, লতা-গুল্ম মাঝে, অনায়াসে আচ্ছাদিত, ঘেরাটোপে ক্রমশ উন্মেষিল দারুণ বেগে,
ললাটে চুম্বন মাখি, ভালবাসা মাখামাখি, অপত্য-স্নেহ
পাইল অনাবিল, উৎসব উৎফুল্ল হাসি, পরাণেতে লেগে।

আনন্দে হারিয়ে ফেলা, কঠিন জীবন, ফাঁকি রয়ে গেল শেখা, নিরাপদ শৈশব, কৈশোরের দায়, যায় অবহেলে,
স্নেহের আগল খুলি, আসে যৌবন ভার, পড়িল ভূমিতে,
মস্তকে বিষম ভার,তনু-মন জীর্ণ ক্লীষ্ট, বাঁচে অবলম্বিলে।

অবশেষে দৃঢ় মস্তক, করিয়া প্রয়াস শতকষ্ট সহিয়া দাঁড়াইল অবশেষে, সংঘর্ষ রপ্ত করি, হয় অনুভূতি,
সময় যে নাই অবশিষ্ট, কার্যকাল হইতেছে নিঃশেষ,
পুনঃলভি নবজন্ম, সাধিব অসাধ্য, অদ্য এজন্মে ইতি।
-১৯/১০/১৭

অজানা উজান
- রাজু চক্রবর্তী

সস্তা রঙ হাত ময় ,মনের ভেতর জমাট অন্ধকার,
মুখে-মুঠোয় ঘোরে মিছে সামাজিক স্তুতি,
অবনমনের ভয় দিনভর,
ঠেলা খেয়ে চলা জীবন যাপন,
সভ্যতা নয়া, কাজহীন তবু, ভাবনা অবিচ্যুতি........।
কাল কে দেখেছে? কতোটুকু জানা? লাফায় সর্ব্বগ্রাসী,
ধরবে যে হাল, নিজেই বেহাল, আধপেটা ক্ষুধাতুর,
সম্ভাবনার প্রশ্রয় পেয়ে........
ঘরের খবর না রেখে চলেছে.......
সবকটা হাঁড়ি চড়াবে দুহাতে, ক্ষওয়া চাহনিতে রওনা অচিনপুর...............।
শক্তি বাড়ায় দুর্বৃত্তের দল, রুদ্ধ বিদেশে বাড়তে থাকা,
কালো চাপ চাপ, খেটে খাওয়াদের লাল পুঁজি,
মসনদে বসে গুলছে জহর,
ফিরে পেতে অবিরত কালঘাম,
গণতন্ত্রের প্রহসনে খোঁজে, ক্ষমতার গলি-ঘুঁজি।
প্রাণ হাতে করে, খাটা নির্বাচক, নিজেকেই ভাবে ব্রাত্য,
সহ্য শক্তি বাড়ায় দিনে-রাতে, প্রতিক্ষণে,
না মিটিয়ে পার, বহু আবদার,
বাইরে ঘোরায়, লুকিয়ে স্ব-মুখ,
ভাবে একমনে.... সুদিন আসবে, খোঁজে জীবনের মানে।
১৬/১১/২০১৯

লক্ষ্মীর পদচিহ্ন
- ইরাবতী মণ্ডল

সকাল বেলা ঘুমথেকে উঠে সৌদামিনী দেবী জানালার ধারে গিয়ে বসেন।সৌদামিনী দেবীর বয়স প্রায় আশির কাছাকাছি।এই বয়সে বাইরে বেশি চলাফেরা করতে পারেন না।তাই সারাদিন জানালার ধারে বসেই তার সময় কাটে।সৌদামিনী দেবীর চার ছেলে সবাই আলাদা। সৌদামিনী দেবীর স্বামী বীরেন বাবু সরকারি অফিসে কেরানির চাকরি করতেন।সারাজীবন চাকরি করে ছেলেদের লেখাপড়া শেখানো আর সংসার চালানো ছাড়া বেশি কিছু করতে পারেন নি তিনি।তবে রিটায়ার করার পরে যে টাকা পেয়েছিলেন সেইটাকা দিয়ে ছেলেদের জন্য একটা দোতলা বাড়ি বানিয়ে দিয়ে গেছেন।স্বামী মারা যাওয়ার পরে নীচের তলায় রাস্তার ধারের ছোট ঘরটিতেই তার ঠাঁই হয়েছে।ছোটছেলে ভবেশ আর তার বৌ মীনাই তাকে দেখাশোনা করে এখন।তবে অন্য তিন ছেলে যোগেশ, রমেশ আর অশেস প্রত্যেকে এক মাস করে ভাগে মায়ের দুপুরের খাবারের দায়িত্ব নিয়েছে।বৌমারাই প্রতিদিন দুপুরে শ্বাশুড়ীর ভাত নীচে এসে দিয়ে যান।ছোটবৌমা মীনা সকালে চা বিস্কুট ,কোনো কোনো দিন দুখানা রুটি আর একটু সব্জি দিয়ে যায়।রাতে তিনি কিছু খান না।মাঝে মাঝে ছোটছেলে জোর করে মাকে কিছু খাওয়ায়।
সৌদামিনী দেবীর অন্য তিন ছেলে চাকরি করলেও ছোটছেলে ভবেশের অবস্থা একটু খারাপ।সে চাকরি করে না।বাজারে ছোট একটা মুদিখানার দোকান চালায়।তাতে কোনোরকমে তার সংসার চলে যায়। সৌদামিনী দেবী যা পেনশন পান তার থেকে নিজের ওষুধ কেনা,বা অন্যান্য খরচ চালিয়ে ও হাতে কিছু টাকা বেঁচে যায়।তার থেকে মাঝে মাঝে ছোট ছেলেকে কিছু কিছু টাকা দেন। এই নিয়ে তার অন্য ছেলেরা কিছু বলে না,তবে বৌমারা মাঝে মাঝে কথা শোনাতে ছাড়ে না।এই তো সেদিন দুপুরবেলা বড়োবৌমা শম্পা তাকে ভাত দিতে এসেছিলো।পাতে শুধু ডাল আর সব্জি দেখে তিনি শুধু বলেছিলেন ,"শুধু ডাল আর সব্জি?একটু মাছ নেই?" শুনে তো বৌমা মুখের উপর বলে দিলো,
---কি করবো মা,আপনার ছেলের একার রোজগার।মাসের শেষে যা পায় ,তাতে ছেলেমেয়ের পড়াশোনার খরচ চালিয়ে খাওয়া দাওয়ায় এর চেয়ে বেশি কিছু আর জোটেনা।আর আপনার ছোটছেলের মত তো আর আমাদের ভাগ্য নয়,যে না চেয়েই আপনার পেনশনের টাকা পেয়ে যাব।যা দিয়েছি এই ঢের।এর চেয়ে বেশি কিছু আশা করবেন না।
এইসব কথা শুনে চুপ করে থাকেন তিনি।মুখ বুজেই খেয়ে নেন ঐ ভাত।অথছ সন্ধ্যা বেলা নাতি শুভময়ের কাছ থেকে জানতে পারেন যে তাদের সেদিন বড়ো বড়ো পোনা মাছ রান্না হয়েছিল।
সারাদিনটা জানালার ধারে একা একা বসেই তার সময় কেটে যায়।বাইরে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন লোকজনের চলাচল।মাঝে মাঝে একে ওকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেন এটা ওটা।অনেকে উত্তর দেয়,কেউবা কিছু না বলেই চলে যায়।কে বা বুড়ো মানুষের কথায় অত গুরুত্ব দেবে।মাঝে মাঝে ছোট ছেলে তাকে বিকাল বেলা বাইরে কাছাকাছি একটা পার্কে ঘুরতে নিয়ে যায়।সেখানে একটু তিনি হাটাহাটি ও করেন।কখনো বা বেঞ্চে বসে যে সব বাচ্চারা ওখানে খেলতে আসে,তিনি তাদের খেলা দেখেন।সন্ধ্যার আগে আবার ছেলে তাকে ধরে ধরে বাড়িতে নিয়ে যান। বেশ সময় কেটে যায় তার।কিন্তু সেটা তো সবদিন হয় না।
তিনি যখন ঘরে বসে থাকেন একা একা তখনও ছোটছেলে বা বৌমা কাছে এসে বসে।একটা দুটো কথা বলে।অন্য ছেলেরাও মাঝে মাঝে মায়ের খোঁজ নেয়।তবে সব সময় মাকে সঙ্গ দেওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।একা একভাবে একজায়গায় বসে থাকতে তার ভালো লাগে না।অথচ বছর কয়েক আগেও তিনি যখন চলাফেরা করতে পারতেন তখন বিকাল হলেই গিয়ে বসতেন বাপিদের ঝুল বারান্দায়। সেখানে একে একে এসে হাজির হত পদ্ম বুড়ি,বাপির মা,বিন্দি বুড়ি আরো অনেকে। নানা রকম গল্প হত তাদের মধ্যে।বেশিরভাগই পারিবারিক সুখ-দুঃখের গল্প।পদ্মবুড়ির ছেলে তাকে মারধর করে বার করে দিয়েছিলো।বৌমাই তাকে যত্ন করে ঘরে ডেকে নিয়ে যায়,সেই গল্প।আবার বিন্দি বুড়ির ছেলে বৌমা কেউই তাকে দেখে না।মেয়ের বাড়িতেই তার ঠাঁই হয়েছে।এইভাবে একে অপরের সুখ-দুঃখের কথা শুনতে শুনতে কখন যে তারা একাত্ম হয়ে গেছিলো কেউ জানে না।প্রতিদিন একে অপরকে তারা না দেখতে পেলে খুব কষ্ট হত।অথচ এখন আর কারো সাথে কারো দেখা নেই।পদ্মবুড়ি মারা গেছে কয়েক বছর হলো ।বিন্দি বুড়িও আর বেঁচে নেই।বাপির মা বিছানায় শয্যাশায়ী ।যখন তখন তার ডাক আসতে পারে।আর সৌদামিনী নিজে!সেও তো সেই পরপারের ডাকের অপেক্ষাতেই বসে আছে,জানালার ধারে,পথের পাশে।
কোজাগরী পূর্ণিমা।আকাশে গোলথালার মতন চাঁদ উঠেছে।ঘরে ঘরে চলছে লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন।প্রত্যেকে ঘরের দুয়ারে লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকছে।ঠাকুরের সামনে দিচ্ছে আলপনা।সৌদামিনীর বাড়িতেও চলছে লক্ষ্মীর আরাধনার আয়োজন।ছোটবৌমা মীনা বাড়ির একতলার সিঁড়ি থেকে একেবারে ছাদ অবদি চালের গুঁড়োর সাথে আলতা মিশিয়ে লক্ষ্মীর পদচিহ্ন এঁকেছে।প্রতি বছরই সে এই কাজটা করে।ভাবে মা লক্ষ্মী এই পদচিহ্ন ধরে ধরে তার ঘরে আসবে।তার ঘর আলোয় ভরে যাবে।কোনো অভাব থাকবে না তাদের আর।দোকানে ভালো বিক্রি বাট্টা হবে।স্বামী বেঁচে থাকতে সৌদামিনীই এই আলপনা দিত।তারপর রাত্রি বেলা পুজো শেষে দুজনে ছাদে গিয়ে বসতো। আকাশের গোল চাঁদের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকতো দুজনে।তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতো মা লক্ষ্মী পেঁচার পিঠে বসে কেমন পৃথিবী ঘুরে ঘুরে দেখছে।যার ঘরে আলো জ্বলছে মা সেখানে পেঁচা থেকে নেমে তার আশীর্বাদ ছড়িয়ে দিচ্ছেন।মায়ের আশীর্বাদে মাঠে মাঠে সোনার ধান,পুকুর ভর্তি মাছ জন্মাতো।কোজাগরীর দিন ছাদে বসে গোলথালার মতন চাঁদের দিকে তাকিয়ে তারা এসব দেখতে পেত।স্বামী মারা যাওয়ার পর ছাদে উঠে সৌদামিনীর আর এসব দেখা হয় নি।তার বৌমারাও আর কেউ সিঁড়ি থেকে ছাদ অবদি এই পদচিহ্ন আঁকতো না।তবে ছোটবৌমা মীনা তার কাছথেকে শুনে প্রতিবছর কোজাগরীর দিন সিঁড়ির উপর লক্ষ্মীর পদচিহ্ন আঁকতে থাকে।এবছরও তার ব্যতিক্রম হয় নি।
বাড়িতে সবাই পুজোর গোছানোয় ব্যস্ত।অন্যদিন এইসময় ছোটবৌমা তার কাছে এসে বসে।নাতিরাও দু একজন আসে ।আজ সবাই পুজোয় ব্যস্ত।সৌদামিনীর একা বিছানায় শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে না।বিছানায় উঠে বসেন তিনি।ধীরে ধীরে লাঠিতে ভর দিয়ে সিঁড়ির দিকে চলতে শুরু করেন।বেশকিছুদিন হলো ভবেশ লাঠিটা এনে দিয়েছে বাথরুমে যাওয়ার বা ঘরের মধ্যে একটু আধটু পায়চারি করার জন্য।সেই লাঠি ভর দিয়েই আর দেওয়াল ধরে ধরে তিনি ক্রমশঃ উপরে উঠছেন।বুকে হাফ ধরে গেছে।সিঁড়িতে বসে একটু জিরিয়ে নেন।আবার ওঠা শুরু।এবারে একবারে ছাদে এসে থামেন ।ঐ তো মাথার উপরে গোল চাঁদ।আলোয় ভরে গেছে চারিদিক।তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ির ঘরের দেওয়াল ঘেঁষে বসে পড়েন।এক নজরে তাকিয়ে আছেন চাঁদের দিকে।ঐ তো মা পেঁচার পিঠে চড়ে পৃথিবীর বুকে নামছেন।এবার ধনধান্যে ভরে যাবে পৃথিবী।গোলাভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ।কারো অভাব থাকবে না।
পুজোর ব্যাস্ততায় ভবেশ বা মীনা কারোরই মায়ের কথা মনে ছিলো না।অন্য দিন ভবেশ মাঝে মাঝেই মায়ের খোঁজ নেয়।তাছাড়া মায়ের ঘরের পাশেই তাদের থাকার ঘর ।তাই রাতেও মাঝে মাঝে উঠে সে মায়ের খোঁজ নিয়ে যায়।পুজো শেষ হতেই সে মায়ের জন্য প্রসাদ নিয়ে ঘরে এসে মাকে দেখতে না পেয়ে চীৎকার শুরু করে দেয়।তার চীৎকার শুনে প্রথমে মীনা পরে একে একে সকলে এসে জড়ো হয়।এদিকে ওদিকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে দেয় মায়ের।বাইরের সদর গেট বন্ধ।তাই সকলে সিঁড়ি বেয়ে ছাদে চলে আসে।সিঁড়ির ছাদের দেওয়াল ঘেঁষে ঐ তো বসে আছে মা।দৌড়ে যায় ভবেশ মায়ের কাছে।গায়ে হাত দিতেই মা মাটিতে ঢলে পড়ে।কার্তিক মাসের হিমে ঠান্ডা হয়ে আছে মায়ের দেহ।চোখদুটো বিস্ফারিত চাঁদের দিকে চেয়ে।ভবেশ মায়ের নাকের কাছে হাত নিয়ে যায়।নিশ্বাস বন্ধ। লক্ষ্মীর পদচিহ্ন ধরে ধরে সৌদামিনী অনেক আগেই ঐ আলোর দেশে চলে গেছে ।

গল্প হলেও সত্যি
- ববি ব্যানার্জি

বিপিন বেশ ধনী পরিবারের সন্তান।বেশ ভালোই কাটছিলো দিনগুলো। কলেজে পড়ে বিপিন।কোনো মেয়েকে তার মনে ধরে না।একদিন এক মন্দিরে পূজা দিতে গেলো। সেখানে একটি মেয়ের দর্শনে সে মুগ্ধ।বাড়ি ফিরে এলো বিপিন।একটি প্রেম পত্র লিখে ফেললো বিপিন।অথচ মেয়েটির নাম ঠিকানা কিছুই জানা নেই।সেই প্রেম পত্রটি নিজের মানিব্যাগে রেখে দেয়।দিন যায় মাস যায়।এমতাবস্থায় একদিন তার দেখা মেলে এক বাস স্ট্যান্ডে।বিপিন সাহস করে এগিয়ে যায়, মেয়েটির দিকে।বিপিন তাকে বললে যে তাকে সে একদিন কোনো এক মন্দিরে দেখেছেন।এই বলে তার প্রেম পত্রটি তার হাতে সঁপে দেয়।সেখান থেকে ফিরে আসে বাড়িতে।বিপিন রা তিন ভাইবোন। বিপিন ছোটো সবার। বেশ আদুরে সন্তান সবার।সেদিন সন্ধেবেলায় মেয়েটির ফোন আসে।হ্যালো!! কে বলছেন? আমি মিতা বলছি।যাকে আপনি আজ সকালে একটি চিরকুট ধরিয়ে দিলেন, সে বলছি।ও হ্যাঁ বলো! কাল কে ভিক্টোরিয়া তে বিকেল চারটে আমি থাকবো আপনি আসবেন সেখানে।বিপিন তো বেজায় খুশি। সে একেবারে সেজেগুজে বেড়িয়ে পড়লো ভিক্টোরিয়া র উদ্দেশ্যে। মিতা খুব সাধারন একটি মেয়ে।খুব একটা সাজগোজ করেনা বললেই চলে।তবে আজ বেশ অন্য রকম লাগছে মিতা কে।বিকেল টা মোহোময়ী করে তুলেছে মিতা।আলাপ হলো, কথা হলো। এমন করে ধীরে ধীরে প্রেম পর্ব শুরু হলো। বিপিন একটা চাকুরী তে জয়েন করেছে।
মিতার বাবা হার্ট অ্যাটাকে হসপিটালে ভর্তির সময় বিপিনও সংগে থাকতো। সেখানে মিতার অসুস্থতা লক্ষ্য করে বিপিন।তার পর সেখানে পরীক্ষা নিরিক্ষা করে জানতে পারেন হার্ট ডিসিস।এবং সেটা মারাত্মক ভয়ানক রকমের কিছু অসুখ।সব জেনেও বিপিন মিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল।

মিতাকে বাড়িতে নিয়ে আসলো একদিন, মা বাবা সবার বেশ পছন্দ হলো। মিতা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে।
মিতার বাড়িতেও গেলো বিপিন, পিতা মাতা সহ।
বিয়ের প্রস্তাব, এক কথায় সকলে রাজী হয়ে গেলেন।বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলো বিপিন আর মিতা।
বছর দুয়েক পর একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়।

হঠাৎ মিতার শরীর টা দিন কে দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।খুব খারাপ যাচ্ছে বেশ কিছুদিন ধরেই।তার পর তাকে হসপিটালে এডমিট করতেই হলো
ডক্টর বললেন এই রোগের চিকিৎসা ব্যায়সাপেক্ষ।

বিপিন চিকিৎসার ত্রুটি করলো না।মিতা চলে গেলেন পৃথিবী ছেড়ে।মেয়ের বয়স তখন সাত বছর।
বিপিনের লড়াই শুরু হলো এখন থেকে একলা।
চলছিলো জীবন বেশ, বাপ বেটির ভালোমন্দ মিলিয়ে।

দিদির একটি রেস্টুরেন্ট দেখা শোনার দায়িত্ব পড়লো বিপিনের। এদিকে চাকুরী। তাতে তিন তিনটা ব্যাবসা আবার এই রেস্টুরেন্ট সামলে সে যখন বাড়ি ফিরে কন্যা বিনীতার মুখ টা দেখা মাত্রই তাঁর সারাদিনের ক্লান্তি দূর হয়ে যেত।

সকালে বিপিন ব্যাবসা গুলো সামলিয়ে রেস্টুরেন্টে একটু চক্কর দিয়ে আসতো।সেদিনও ঠিক তেমন করেই যাচ্ছিলো বাইক চালিয়ে রেস্টুরেন্টের দিকে।

হঠাৎ এক টাটা সুমো এসে ধাক্কা মারে ডানকুনি মেইন মোরে। বিপিন চিৎকার করে উঠলো। তার পর বিপিন আর কিছুই জানেনা।

হসপিটালের বেডে শুয়ে। চিৎকার আর্তনাদ।তার ডান পায়ের হাড়গুলো টুকরো টুকরো হয়ে গেছে।
বড় অপারেশন। বিদেশ থেকে ডক্টর এলেন।সেই পা জোড়া লাগানো হলো।তিন বছর বিপিন পা ফেলতে পারলো না।
তার বাবা চলে গেলেন।চাকুরী গেলো। ব্যাবসা বন্ধ হয়ে গেলো।
বিপিনের জীবনে এক ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেলো। বিপিন ক্রাচার নিয়ে হাটাচলা শুরু করলো।
আজ সে সুস্থ ঠিকই। কিন্তু পায়ে একটা সমস্যা রয়ে গেছে।ওটা থাকবে, কিছু করার নেই।
আজ সেই বিপিন বাবু অসহায় একজন ব্যাক্তি।আজ তিনি প্রায় পঞ্চাশ উর্ধ্বে। আজ তিনি একটি চাকুরী খুঁজছেন।যে মানুটির অধীনে কত মানুষ চাকরি করতেন আজ তিনিই চাকুরী খুঁজে চলেছেন।।মেয়ে আজ তাঁর বেশ বড়ো। সেও বেসরকারি অফিসে জব করে।মা বিপিনবাবু আর তার কন্যা এই তাদের পরিবার।
আজও বিপিন মনের জোর হারায়নি।
একেই বলে ভাগ্যের পরিহাস।।

24.11.19

বিমলা
- বিশ্বজিত সেনগুপ্ত

ডাউন নৈহাটি লোকাল । অফিস ফেরত এই ট্রেনে করেই আমি বাড়ি ফিরি। ট্রেনে উঠে
রোজকারমত আজও বসার জন্য সিট পেয়ে গেলাম। ট্রেন ছাড়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। হঠাৎ করে এক ফেরিওয়ালার বিকট চিৎকারে আমার
সাধের ঘুমটা ভেঙে গেল।ঘুম ভাঙার কারণে প্রথমে একটু রাগ হলেও,পরে ভাবলাম,
এতে ওর দোষ কোথায়। রুটিরুজির জন্য এটা তো ওকে করতেই হবে।অতঃপর আড়মোড়া ভেঙে সোজা হয়ে বসে ওর ঝুড়ির দিকে তাকালাম। ইতিমধ্যে বেশ কিছু যাত্রী ওর ঝুড়িতে থাকা লেবু থেকে সেরা লেবুগুলো বাড়ি নিয়ে যেতে বাছাবাছি শুরু করেছে। শেষমেষ খানিক বাদে আমিও এগিয়ে গেলাম ঝুড়ির কাছে।আর একটা মাত্র লেবু পড়ে আছে ঝুড়িতে। কুৎসিত,কদাকার একটা লেবু। লেবুর উদ্দেশে বাড়ানো আমার হাতটা আপনা থেকেই উঠে এল ঝুড়ি থেকে। পরক্ষণেই আমার মনে হল বিমলার কথা।হ্যাঁ,বিমলা আমার বোন।একান্ত আপনার বোন। আজও ওর বিয়ে হয়নি। পাত্রপক্ষ থেকে এযাবৎ যে বা যারা ওকে দেখেছে,অবাহাই লেবুটির মত ওকে প্রত্যাখ্যান করেছে।একটা কালো, কুৎসিত মেয়েকে কজন আর পছন্দ করে।এ কথা মনে হতেই, ঐ কদাকার লেবুটাকে ঝুড়ি থেকে তুলে নিল আমার হাত।চটপট খোসা ছাড়িয়ে লেবু খেয়ে দেখি--আঃ,কি মিষ্টি সেই কমলা!!এদিকে যারা বাছাই করে লেবু কিনেছিল,তাদের মধ্যে দু-একজন টক বলে চেঁচিয়ে উঠেছে। আমার মনে তখন প্রশান্তির হাসি।সুন্দরি না হলেও,মনের দিক থেকে আমার বোনটিও কিন্তু কুশ্রি ঐ লেবুটির মত অতীব মিষ্টি মনের একটি মেয়ে--উপর থেকে দেখে যেটা বোঝার উপায় নেই।

অনেকদিন বাদে আজ সন্ধ্যেতেই পাত্রপক্ষ থেকে ওকে দেখতে আসার কথা
আছে।আজকের ঘটনায় আমার মনে হল--ওর রূপটা না দেখে ওরা যদি ওর মনটা বোঝার চেষ্টা করে...

যথা সময়ে ট্রেন থেকে নেমে,বেশ একটা খুশিখুশি মনে বাড়ির উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করলাম। সন্ধ্যের আগেই আজ বাড়ি ফিরতে হবে।
##
@বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত৪০এ

বিয়াস কথা
- সোনালী দাস

বিয়াস অনেক শুনেছিলো ব্রহ্মপুত্রের কথা--
হিমালয় তাকে শুনিয়েছিল
তার বিশালতার কথা,
কত কত পথ ঘুরে কত দেশ ঘুরে
কত উপনদী নদীকে সঙ্গে নিয়ে
বয়ে চলেছে ঐ ব্রহ্মপুত্র---
শুনতে শুনতে কল্পনার ক্যানভাসে
তুলির আঁচড় কেটেছে যত্রতত্র,
নিজের মতো করে গতি পথ এঁকে
নিজেকে মিশিয়ে দিয়েছে উপনদী হয়ে।
সেদিন অঝোর বাদল ধারায়
উৎফুল্ল হয় বিয়াস---
আজ সে বয়ে যাবে নিজের মতো করে--
গঙ্গার মতো মোহনাতে মিশবে
ব্রহ্মপুত্রের সাথে---
কিন্তু ক্যানভাসের তুলির টানে তো
বাস্তব আঁকা যায় না---
দুর্ভেদ্য পাহাড় পর্বত মালভূমি
পেরিয়ে সুদূর উত্তর পশ্চিম থেকে
পূবের সূর্যোদয় দেখতে চাওয়া
তার ক্ষমতার উপহাস মাত্র---
তাই আরব সাগরে মিশে
সূর্যাস্তের অপেক্ষাই একমাত্র কাম্য।

@সোনালী

কবিতা :- সমুদ্র

- ববি ব্যানার্জি

তুমি বিশাল জলরাশির মধ্যে জীবন কাটালে,
সমুদ্রের মধ্যেই তোমার সংসার
সেইখানেতেই তোমার রাতভোর হয়।
তোমাদের জীবন টা চলে সমুদ্রের গতীতে,
তোমাদের মনটাও নাকি সমুদ্রের মতন বিশাল।

জলের মতন সহজ সরল কি হয় তোমাদেরও জীবন!
নাকি মাঝে মাঝে ঢেউগুলো আছড়ে পরে বুকের ভিতর।
আচ্ছা! সমুদ্রের কথা শুনেছ কখনো!
নিশুতি রাতে কান পেতে শুনো তার গুমরে ওঠা কান্নাগুলো,
কত কথাই না বলে তারা।
ভোরের বেলা সূর্য কে মাথায় নিয়ে বসে
কি অপরুপ তার সৌন্দর্য
দুজনেতে এতো সখ্যতা
না দেখলে কল্পনা করা যায়না।

দুজনে দুজনার চিরসাথী,
সারাটা দিন হেসে খেলে দিন কাটায়..
সূর্যাস্তের সময় দেখেছ! ম্লান মুখে কিছু বলতে চায়,
গোধুলির ছায়া মাখা সমুদ্র ভীষণ ক্লান্ত তখন
সূর্য তখন বিদায় চায় সমুদ্রের কাছে
আবার আসিবো ফিরে ভোরের বেলা তোমার কোলে।

পূর্নিমার রাত্রে চাঁদ ওঠে সমস্ত আকাশ জুড়ে
সমুদ্রের উপর তার ডানা মেলে ধরে
ঢেউগুলো গর্জন তোলে
আছড়ে পরে তীরে বারেবার।
রাতের নীরবতা.. চাঁদ আর সমুদ্র বুঝতে পারে
তখন নিজেদের চুপি চুপি প্রেম হয়,
কানে কানে বলে আমিও তোমায় খুব ভালবাসি।।

29.11.19

ছবি

- কৃষ্ণা অধিকারী

মেঠো আলপথ ধরে হেঁটে যায়
কোন এক বাউল ফকির,
গুন গুন সুর ভাঁজে একতারায়
অথবা দরাজ কোন প্রভাত সংগীত।
আরো একটু দুরে,
ঐযে নদীপথে,
মাঝি মাল্লারা তরী বেয়ে ফেরে খেয়া ঘাটে,
ভাটিয়ালি সুরে বোনে বিরহের কথা, সাঁঝবেলায়।
কুয়াশার ঘোমটায় ঢাকা
গাঁয়ের সেই ছবি--
আমার স্বপ্নে আসে বার বার
সেই গ্রাম গ্রাম নেই আজ।
রঙীন চশমা চোখে
পরতে যে সাধ তার
শহুরে পিড়ান।

প্রকৃতি

- সুস্মিতা কুন্ডু ভৌমিক

কৃষ্ণচূঁড়া তুমি দোলা দিচ্ছও মনে আপন চ্ছন্দেই।
ওগো বাতাস তুমি দোল দিয়ে যাচ্ছ নব রূপে।
ওগো বসন্ত তুমি রাঙিয়ে দিয়ে যাও নতুন রঙে।
ওগো বৃষ্টি তুমি ঝরে পড়ো তোমার নিজের চ্ছন্দ চ্ছন্দ্যেই।
সবাই নিজের ছন্দেই মুগ্ধ।
বৃষ্টি তুমি ঝরে পড়ো।
অন্তরের আবেশকে সঙ্গী করে।
এস অন্তরকে রাঙিয়ে দিয়ে যাও।
ওগো হাওয়া দোলা দিয়ে যাও এ মনে।
এসো ঝর্ণাধারা এসো এসো।
ঝরে পড়ো।
তপ্ত মৃত্তিকাকে শান্ত করো।
তার বুক যে কষ্টে ফেটে যাচ্ছে।
ঝরে পড়ো বৃষ্টি ধারা হয়ে পৃথিবীর বুকে।
শান্ত করো স্নিগ্ধ করো।
এ মৃত্তিকা শান্ত হোক।
আকাশে কালো মেঘের দৃষ্টি।
ঝরছে ঝোড়ো হাওয়া।
এসো হাওয়া এসো হাওয়া।
এসো বৃষ্টি এসো বৃষ্টি।
এসো বরিষণ করো বারিধারা।
আর যে সয়না কষ্ট।
বৃষ্টি যখন মাটির বুকে বর্ষিত হবে তখন ..
মাটি বৃষ্টিকে আলিঙ্গন করবে।
বলিবে এস ?
বৃষ্টি এস ?
অপেক্ষা ?
শুধু অপেক্ষা..
তীব্র অপেক্ষা..

আমাদের স্বপ্ন
- মান্তু দেব রায়

আমাদের স্বপ্ন গুলো তে ধুলো জমে আছে,
হারিয়ে গেছো তুমি হারিয়ে গেছি আমি
হাজার হাজার স্বপ্নে মরিচা ধরেছে,
সেই স্বপ্ন নিয়ে কবিতা লিখে যাই
নিদ্রাবিহীন চোখে!

তুমি হয়ত নতুন করে স্বপ্ন সাজাও
নতুন মানুষের হাতে হাত রেখে!
আমি সেই পুরাতনেই আঁটকে আছি
রোজ ভালোবাসি আজও তোমাকেই!

দুচোখে অপেক্ষা গুণি
তুমি ফিরে আসবে আলোকবর্ষ পরে
আবার আমরা স্বপ্ন বুনবো
রাতের তারার ভীড়ে!

...✍মান্তু

কবিতার নাম :- অচেনা
- সুভদ্রা রায়

জন্মলগ্ন থেকে চেনা তোর নাম-
অচেনা এ জগৎ দিয়েছে আশ্রয় আমায়
শিখেছি প্রতিক্ষন অচেনা সংগ্রাম
অচেনা জীবন পাতা ভরে যায়- তোর নাম দিয়ে
ভালোবাসা চেনা তুই সবার।

চেনা জীবন যাপন বয়ে যায়
শিশু থেকে যৌবন হাত ধরে অচেনার
হয় উত্তরন প্রতিদিন প্রতিরাত -
চেনা দিন আসে অচেনার হাত ধরে বারবার
ভুল করে হয়নি তো স্তব্ধ বিচরন!

আজ ও চেনা তুই অচেনা আলোয়
পথচলা এক ই চেনা পথে- হাতে রাখি হাত
কখনও বা দুঃসহ জীবনের অচেনা বাঁকে,
চেনা আয়নায় দেখি অচেনা দিনের মুখ
পার হয় চেনা ঋতু চেনা মাস সারাবছর।

প্রতিদিন চেনা যুদ্ধ ঘটে অচেনা আপোষ
চেনা রাত বসি একা- ভাসে অচেনা জগতময়
চেনা চাঁদ আলোকিত - অচেনা কল্পনার
চেনা কাগজ কলম চেনা আঁকি বুকি
চেনা শব্দের অচেনা খেলাধুলা!

চেনা ভালোবাসা কখনও মনের অজান্তে
চেনা হাসিতে দেখি অচেনা অভিব্যক্তি
চেনা মন চেনা প্রাণ কাঁদে - অচেনা দূর্গম
অচেনা আতঙ্ক হানে- হয় চেনা সুখ চুরমার!
শান্ত হৃদয়ে দোলে অচেনা ঢেউ -....

ছোট শিশু চেনা চেনা মুখখানি সরলতা
অল্প অল্প কিছু মুছে ফেলা - বাড়ন্তবেলা
চেনা চেনা লাগে মনে আসে যৌবনের
চেনা আকাশে ভাসে অচেনা সিন্দুরমেঘ
চেনা দিন চেনা রাত বয়ে যায়- আসে অচেনা প্রভাত!

২৮/১১/২০১৯

নিজেকে নিজে
- রাজু চক্রবর্তী

পিচে ঢাকা পাকা পথ ছেড়ে, নেমে যদি পড়ি,
হলুদের রঙে ঢাকা; সরষে ক্ষেতের কোন আলে.......
ক্ষণিকের পথভোলা, উদাসীনতায় পথ পেরিয়ে,
বসে থাকি আনমনে, হলুদ ফুলের দিকে তাকিয়ে........
কিংবা ঘাসের ফুল-বৃন্ত, দুই আঙুলের মাঝে ধরে,
চশমাটা খুলে ফেলে, অবহেলে রাখি দূরে সরিয়ে.......
ক্লান্ত নই বুঝে নিও; নিরলস ছায়াপথে, ঘুরে ঘুরে-
খুঁজতে নিজেকে নিজে; সচেতনভাবে গেছি হারিয়ে।।

রোদ মাখা দুপুরে, নির্জন পুকুরের ধারে যদি বসে,
জল ফড়িং-এর ওড়া বা মাছেদের ডুব দেওয়া দেখি...
শালুকের রঙে ভিজে, জলেতে ডুবিয়ে পা, গুনগুন
গেয়ে চলি, ফেলে আসা জীবনের কোন এক কলি......
হতে পারে বলাকার আনাগোনা দেখি, শান্ত পুকুর জলে,
এক মনে, রঙ-তুলি ছাড়া, তুলছি সেইরূপ ফুটিয়ে.......
ভেবে নিও; যাইনি পালিয়ে! শব্দের মায়াজাল ছিঁড়ে-
খুঁজতে নিজেকে নিজে; সচেতনভাবে গেছি হারিয়ে।।
-রা. চ. -২৭/১১/১৯

বঁধুয়া

- ববি ব্যানার্জি

আজ আর অপমানিত হইনা।হৃদয় টাকে পাহাড় তৈরী করে নিয়েছি।যতই অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করো না কেনো! বাইরের চেনা অচেনা পুরুষদের সামনে, ক্ষনিকের জন্য ভেঙে চুরে খান খান হয়ে যাই,আবার মুছে ফেলি যন্ত্রনার অশ্রু দিয়ে। কারন তুমি ছাড়া গতি নেই আমার,এইটুকু জানি।।

আজ আর মানুষের চামড়া নেই আমার শরীরে, গন্ডারের চামড়া আমার সারা শরীর জুড়ে। যেদিন থেকে তোমার সাথে পথ চলা শুরু করেছিলাম সেদিন থেকে, ধীরে ধীরে কখন যে মাটির প্রলেপ পড়ে গেছে আমার মন জুড়ে, নিজেও টের পাইনি।আজ আর আঘাত লাগেনা, কারন আমি জানি তুমি ছাড়া গতি নেই আমার।।

আজ আর কিছুই নেই আমার।না আছে মন না আছে শরীর। না আছে বুকভরা ঘৃণা, না আছে এক বুক ভালবাসা।শুধুই অভ্যেসে পরিনত হয়েছি,কারন তুমি ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই।।

দুবেলা দুমুঠো খেতে দাও, মাথার ওপর এক টা আশ্রয় দিয়েছ,এটা কি কম কথা!! নাই বা দিলে আর কিছু! নাইবা নিলে আর কোনো কিছুর দায় দায়িত্ব ওটুকু আমাকেই জোগাড় করে নিতে হবে, সেটাও প্রথম দিন থেকে বুঝিয়ে দিয়েছ।আমিও বুঝতে বাধ্য হয়েছি, কারন তুমি ছাড়া আমার আর কোনো গতি নেই।।

এতো অভ্যেস কবে যে সৃষ্টি হলো আমার চেতনা জুড়ে তাও জানিনা। কারন আজ সব.. সবটাই অভ্যেসে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কারন তুমি ছাড়া আমার আর কোনো গতিই নেই।।

আজ আমার কলম চিৎকার করে কিছু বলতে চায়,তোমার পশুত্ব রুচিবোধ, কতটা নীচে তুমি নামতে পারো, তা আমার থেকে ভালো কেউ জানেনা।আমার কলম বলতে চায়,টেনে হিঁচড়ে তোমার মুখোশ টা খুলে দিই।।কিন্তু কলম বোবা হয়ে বসে থাকে,কারন তুমি ছাড়া আমার গতি নেই।।

28.11.19

ডানা ছাঁটা স্বপ্ন

- নিলয় দে

নন্দিনীকে আজকে খুব সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে যেমনটি করে এর আগেও একবার সাজানো হয়েছিল । বেনারসি শাড়ি , মাথায় সিঁদুর , কপালে চন্দনের ফোঁটা । শুধু সেদিন আজকের মত পেট থেকে রক্তের দাগটা দেখা যাচ্ছিল না ।

নন্দিনী নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে । অভাবের সংসারে খুব বেশি পড়াশোনা করে উঠতে পারেনি । স্বাভাবিকভাবেই যেমন হয় খুব অল্প বয়স থেকেই তার জন্য যোগ্য পাত্র খোঁজা হচ্ছিল । যোগ্য পাত্র পাওয়াও গিয়েছিল । নিখিল বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো । বাড়িতে লোক বলতে শুধু সে আর তার মা । সংসারে আরেকজন মানুষের ভালোমতো চালিয়ে নিতে পারবে সে । তাই তার মার দেখাশোনা করতে আর ঘর সংসার সামলাতে নিখিলের প্রয়োজন হয়েছিল নন্দিতার মতো একজন মেয়ের ।

কিন্তু নিখিলের স্বপ্নের মত চোখে হারিয়ে গিয়েছিল নন্দিতা । ভালোবেসে ফেলেছিল তাকে । স্বপ্নের সংসার গড়ার স্বপ্ন দেখেছিল নন্দিতা । বিয়ের পর মাস ছয়েক কিছুটা ডানা মেলে উড়েছিল সেই স্বপ্ন । তারপর এলো রিসেশনের যুগ । নিখিলের চাকরি চলে গিয়েছিল । আর নন্দিনীর স্বপ্ন ডানা কাটা অবস্থায় ছটফট করছিল ।

ধাক্কাটা নিখিল সামলাতে পারেনি । চাকরি যাওয়ার দুঃখ ভুলতে সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছিল মদের নেশা , সাথে দোসর হিসাবে ছিল জুয়া খেলা । যেকটা জমানো টাকা ছিল , শেষ হতে এক মাসও সময় লাগলো না । যত দিন যেতে লাগলো , নন্দিতার শরীরে কালসিটে দাগের সংখ্যা বাড়তে লাগলো । মদ খেয়ে এসে নন্দিতাকে শারীরিক অত্যাচার , এক অদ্ভুত সুখ দিতো নিখিলকে ।

মানুষ ভাবে এক , হয় এক । না হলে নন্দিতা কখনো কি ভেবেছিল সংসার টানতে তাকে বাইরে কাজ করতে বেরোতে হবে । তার তো বাড়িতে বসে সাজিয়ে সংসার করার কথা ছিল । তবু বাইরে বেরিয়ে কাজ করাটা সহজভাবে আসেনি । বেশিরভাগ পুরুষ এক্ষেত্রে ভাঙে তবু মচকায় না । তবে নিখিলকে অবশেষে মচকাতে হয়েছিল । নিজের নেশার টাকা না হলে আসবে কোথা থেকে ।

নন্দিতার শিক্ষাগত যোগ্যতা তো তেমন বেশি ছিল না , তাই চাকরিও যে সঙ্গে সঙ্গে জুটি গিয়েছিল তেমনটা নয় । কিন্তু দেখতে ভালো নন্দিতা বরাবরই , চরম অভাবেও তার রূপের চমক খুব বেশি ম্লান হয়ে যায়নি । অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাড়ার রুপা বৌদি তাকে একটা চাকরি দেখে দিয়েছিল । পাড়াতে রুপা বৌদিকে সবাই বাজে মেয়েছেলে বলেই ডাকে আর সেই বাজে মেয়েছেলের হাত ধরেই চাকরিটা নন্দিতার কাছে এসেছিল ।
নন্দিতা যখন রুপা বৌদিকে জিজ্ঞাসা করেছিল কি কাজ করতে হবে , রুপা বৌদি হেসে বলেছিল তেমন কিছুই করতে হবে না । শুধু বসে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে অনেকক্ষণ ।
- “ শুধু বসে বা দাঁড়িয়ে থাকা ! সে আবার কি রকম কাজ ? “
- “ মুখপুড়ি তোকে অত কিছু জানতে হবে না কাজের জায়গায় গেলেই বুঝতে পারবি । “
কাজের জায়গায় গিয়ে নন্দিতা যে নিজের কাজ বুঝতে পেরেছিল তা কিন্তু নয় , তার সেখানে কি কাজ সেটা বুঝতে তার কিঞ্চিৎ সময় লেগেছিল ।
অভিমন্যু রায় । নামটা একটা মিঠে রোদ্দুর এর মত এসেছিল নন্দিতার স্যাঁতস্যাঁতে জীবনে ।
- “ তুমি এর আগে কোনদিন মডেলিং করেছো ? “
“ মডেলিং ! “ যেন আকাশ থেকে পড়েছিল নন্দিতা কথাটা শুনে । বিয়ের আগে বার কয়েকবার লুকিয়ে-চুরিয়ে পাশের বাড়ির দিদির কাছে সে দেখেছিল মডেলিং এর রঙিন ছবি । আরষ্ঠ ভাবে নড়েচড়ে নন্দিতা বলেছিল, “ না । “
- “ সে আমি বুঝিয়ে দেবো ক্ষণ। তোমাকে আমার মডেল হতে হবে এই তোমার কাজ । আমার ঘরের চারপাশে জিনিসপত্র দেখে নিশ্চয়ই বুঝেছ আমি ছবি আঁকি । আমার আঁকার সাবজেক্ট হলো মেয়ে ; মানে মেয়েরা । বিভিন্ন শ্রেণীর , বিভিন্ন বয়সের , বিভিন্ন মুহূর্তের । আর আমার ছবিগুলো দেখে নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ আমি কি ধরনের ছবি আঁকি । কি ধরনের মডেল তোমাকে হতে হবে । “
নন্দিতা আঁকা ছবিগুলোর উপর আর একবার চোখ বুলিয়ে নিল । প্রত্যেকটা ক্যানভাসে হয় খুবই স্বল্প বসনা মেয়ে অথবা নগ্ন মেয়েদের বিভিন্ন ভঙ্গিমায় ছবি । লজ্জায় নন্দিতার গাল লাল হয়ে যায় ,কান গরম হয়ে আসে ।
- “ কি পারবে তো কাজটা করতে ? এখনই পরিষ্কার বলে দাও পরে কিন্তু কোন ন্যাকামি আমি সহ্য করবো না । “
যতই লজ্জা লাগুক কাজটা তাকে পারতেই হবে । খালি পেটে লজ্জা মানায় না । লজ্জা তখন বিলাসিতা হয়ে দাঁড়ায় । শুধুমাত্র নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে বা বসে থেকে যদি তার সংসার চলে তাহলে প্রতিদিন রাতে বিবেকের কাছে নগ্ন হওয়ার থেকে সেটা অনেক ভালো ।
- “ হ্যাঁ পারব । “
- “ ভালো তবে কাল সকাল থেকেই চলে এসো । ঠিক দশটা । “

পরেরদিন ঠিক দশটায় নন্দিতা পৌঁছে গিয়েছিল অভিমুন্যর স্টুডিওতে । প্রথম প্রথম অস্বস্তি হতো নগ্ন হয়ে বিভিন্ন অঙ্গ ভঙ্গিতে বসে থাকতে । এর আগে কোনোদিন নিজেকেই সে নিজে নগ্ন দেখেনি আর আজ তার সেই নগ্নতাকেই উদযাপন করা হচ্ছে ক্যানভাসে । অভিমন্যুর হাতের আঙুল যত না ঘোরাফেরা করতো ক্যানভাসে তার থেকে অনেক বেশি ঘোরাফেরা করতো নন্দিতার শরীরে । অভিমন্যুকে প্রথম দিকে যতটা কড়া মেজাজের মানুষ মনে হয়েছিল আস্তে আস্তে সে অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল নন্দিতার সাথে । নন্দিতার বুকে যে ঝর্ণা কথা লুকিয়ে ছিল , অভিমন্যু প্রেমিক হয়ে তার বুকে মাথা রেখে সে কথা শুনতো ।

নন্দিতার যে স্বপ্ন ডানা কাটা হয়ে ছটফট করছিল তাতে যেন ধীরে ধীরে নতুন ডানা গজাচ্ছিল ।দুটো মানুষকে কি একই সঙ্গে ভালোবাসা যায় ? হয়তো বা যায় । নিখিল ঘৃণার মধ্যে দিয়েও যেন ভালোবাসা হয়ে মনের কোনো একটা কোনা আঁকড়ে পড়েছিল তখনো আর অভিমন্যু নতুন এক ভালোবাসার বীজ ছড়াচ্ছিল তার মনে , প্রতিদিন ।

বউ এর টাকায় বসে বসে খাচ্ছে এই ব্যাপারটা নিখিলের মনে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল , সেই যন্ত্রণা ভোলাতে আরো নেশায় ডুবে গেল সে । নন্দিতার সাথে শারীরিক সম্পর্ক কবেই চুকেবুকে গিয়েছিল । সেই শরীরে ক্রমশঃ ভাগ বসাচ্ছিল অভিমন্যুর শরীর ।

বাড়ির চিঁড় ধরা আয়নাতে সেদিন নিজেকে কয়েকশ বার খানখান হয়ে যেতে দেখল নন্দিতা , যেদিন প্রথম বুঝতে পারলো তার শরীরে আর একটা প্রাণ বেড়ে উঠছে । অভিমন্যু খবরটা কেমন ভাবে নেবে ভেবে ভেবেই নিজের মধ্যেই কুঁকড়ে যাচ্ছিল সে । কিন্তু তাকে অবাক করে অভিমন্যু বলে ছিল , “ আমাদের ভালোবাসার চিহ্ন এটা , নষ্ট করো না । খুব শিগগিরি নতুন সংসার পাতবো আমরা । “

সেদিন বাড়ি ফিরে প্রথমবার নিখিলের উদ্ধত হাত রুখে দিয়ে পাল্টা একটা চড় কষিয়ে ছিল তাকে । কষ্টের থেকেও বেশি বিস্ময় নিয়ে নিখিল তাকিয়ে ছিল নন্দিতার দিকে , তারপর মাথা নিচু করে বেরিয়ে গিয়েছিল বাইরে । সেদিন হয়তো নন্দিতার মন থেকেও পুরোপুরি বেরিয়ে গিয়েছিল সে ।

কলকাতার বাইরে একটা প্রদর্শনী থেকে দিন পনেরো পরে ফিরে অভিমন্যু যে আরো বেশি যত্নবান হয়ে উঠবে সেটা নন্দিতা আশাই করে নি । নিজের হাতে কেসর দেওয়া দুধ খাইয়ে ছিল সে । এতে নাকি সন্তান আরো সুন্দর হয়ে জন্মায় । সেদিনের পর থেকে নিখিল আর ঘরে ফেরেনি , সে তার জীবন থেকে ,সমস্ত রকম ভাবে পুরোপুরি মুছে গেছে , নতুন সংসার কেমন করে নিজের হাতে সাজাবে সে সব গল্প করতে করতে কখন যে নন্দিতা ঘুমিয়ে পড়েছিল , ঘুম ভাঙলো একটা আওয়াজে । শীৎকারের আওয়াজে । খুব কষ্টে চোখ খুলে দেখলো তার প্রতি সমস্ত ভালোবাসা অভিমন্যু মিশিয়ে দিচ্ছে অন্য একটা নারী শরীরে ।

ধরপড়িয়ে উঠতে গিয়ে পা পিছলে গেল তার । মেঝেতে তাকিয়ে দেখলো রক্তে ভেসে যাচ্ছে । পুরো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো তার কাছে । গর্ভপাত করানোর কি সুন্দর পরিকল্পনা ! সামনে তাকিয়ে দেখলো অভিমন্যু তার দিকেই তাকিয়ে আছে । তার চোখে , মুখে কুটিল হাসি । তারপর চোখ ফিরিয়ে নিয়ে সামনে ধরা শরীরটাকে চেপে ধরলো নিজের শরীরের মধ্যে ।

কামাগ্নি ঝরিয়ে অভিমন্যু ঝিমিয়ে পড়ে আছে সোফায় । নন্দিতা পা ছেঁচড়ে ছেঁচড়ে এগিয়ে আসছে সেই দিকে । মেয়েটি জামা কাপড় পরে বেরিয়ে গেছে । পিঠে আলতু একটা টোকা পেয়ে ঘুরে তাকালো অভিমন্যু । পলক ফেলার আগেই গলায় একটা তীব্র যন্ত্রণা , ফিনকি দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে সেখান থেকে।

সেদিনও এমনি এক হেমন্তের সন্ধ্যা ছিল যেদিন নববধূ হয়ে নন্দিতা এসেছিল এই বাড়িতে । আজও ঠিক সেরকম সেজে শুয়ে আছে সে । পাশে কান্না হারিয়ে , উদাস চাউনিতে নিখিল তাকিয়ে আছে শুয়ে থাকা নন্দিতার দিকে । আজ নিজের হাতেই সাজিয়েছে সে নন্দিতাকে । ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর রাস্তায় রাস্তায় রাত কাটিয়েছে সে । এত সহজে সে ছেড়ে দেবে নিন্দিতাকে ! পিছু নিয়েছিল সে তার । লুকিয়ে বন্ধ জানলার ফাঁক থেকে সেদিন সব দেখেছিল সে । কেন জানে না সে প্রতিশোধ নেবার বদলে নন্দিতাকে নতুন জীবনের জন্য অভিমন্যুর হাতে সঁপে দেবে ভেবে নিয়েছিল । ফিরেই আসছিল হটাৎ একটি মেয়েকে ঢুকতে দেখে সে । আবার জানালার ফাঁক দিয়ে দেখেছিল সব । নন্দিতার গর্ভপাত , নন্দিতার সামনে অন্য মেয়েটির সাথে সম্ভোগ , সব কিছু । তখনই ঘরে ঢুকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল অভিমন্যুকে ।

মেয়েটা বেরিয়ে যাবার পর দরজা খোলা পেয়েছিল নিখিল । ততক্ষণে নন্দিতা উঠে দাঁড়িয়েছে । এই তো সুযোগ । ঘরে ঢুকে টেবিলে রাখা পেন্সিল ছোলার ছুরিটা নিয়ে সোফায় শুয়ে থাকা অভিমন্যুর পিঠে আলতু টোকা মারলো । অভিমন্যু মুখ তুলে ফিরে তাকাতেই ছুরিটা চালিয়ে দিলো তার গলা বরাবর ।

ভয়ে চিৎকার করে উঠলো নন্দিতা । তারপর নিজেকে সামলে হাসি হাসি মুখ নিয়ে তাকিয়েছিল সামনে ছটফট করতে থাকা অভিমন্যুর দিকে । নিখিলের হাত থেকে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে ধাক্কা মেরে ঘর থেকে বের করে দিয়ে ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল ।

আজ সকালে পুলিশ নিখিলের হাতে নন্দিতার মৃতদেহ হ্যান্ড ওভার করেছে । লাশ দেবার আগে জানিয়েছে নন্দিতা প্রথমে অভিমন্যুকে খুন করে তারপর আত্মহত্যা করে । আর এই পুরো কথাটাই নাকি সে স্বীকারোক্তি করে লিখে গেছে একটা ক্যানভাসে ।

ভালোবাসা কি সত্যি হারিয়ে যায় ! হয়তো যায় না , না হলে নন্দিতা কি নিখিলের জন্য ভালোবাসার প্রমাণ রেখে যেতে পারতো এইভাবে ?
( সমাপ্ত )

সেই দিন - ওই দিন
কবি - মন্টু হালদার

সেই দিন সকাল ৭:০৫ ।
মাটির আঁতুড় ঘরে জন্ম নিলাম আমি । পৃথিবীর জনসংখ্যা ,অকারণে একজন গেল বেড়ে ।

ওই দিন , ঠাকুরদার সব চেয়ে প্রিয় গরুটা চুরি হয়ে গেলো তাই ঠাকুরদা তাঁর প্রিয় গরুর নামে আমার নাম রাখলেন মন্টু । ঠিকই করেছিলেন , আজীবন তো গরুই থেকে গেলাম ....!
*****
সেই দিন সকাল ১০:০০টা ।
বাবার কোলে চড়ে পৌছালাম শিক্ষাবীথি আদর্শ প্রাথমিক স্কুলে ।

ওই দিন বিকাল ৫:০০টা।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার ঘোষনা করলেন "প্রাথমিকে ইংরাজী পড়ান নিষিদ্ধ "

তার পর , হঠাৎ একদিন ....
*****

সেই দিন ভোর ৩:০০ টে ।
বাবা অসুস্থ হলেন ।প্রচন্ড কাশির সাথে, মুখ দিয়ে থোকা থোকা রক্ত পরতে লাগলো । ডাক্তার জানিয়ে দিলেন টিবি হয়েছে ।

ওই দিন সকাল ১১:০০টা ।
যাদবপুর টিবি হাসপাতালে, শীর্ণ বাবাকে রেখে আসা হলো । তাঁর অসহায় সেই করুন দৃষ্টি , আজও ভুলতে পারি নি ...
*****

সেই দিন দুপুর ১:৩০টা ।
বাঘাযতীন বয়েস স্কুলের দুতলার , অষ্টম শ্রেণীর
কক্ষের বাইরে হঠাৎ মামা উপস্থিত । মাস্টার মশাই ছেড়ে দিলেন আমায় ।

ওই দিন দুপুর ২:১৫।
বাড়িতে এসে দেখি বাবাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে
বাঁশের খাটিয়ার উপর । বাবার বন্ধ দুটো চোখে দুটো তুলসী পাতা রাখা , সাড়া শরীর সাদা থানে ঢাকা ।

তার পর ,নিঃস্ব রিক্ত আমাদের বেঁচে থাকাটা
একটা আস্ত প্রহসন ....!
*****

সেই দিন বেলা ১২:০০ টা ।
হাতে রেজাল্ট পেলাম । ফার্স্ট ডিভিশন পেয়েছি মাধ্যমিকে ।

ওই দিন সন্ধ্যে ৮:০০ টা ।
ধার করে পড়া পুরোনো বই ফেরত দিয়ে এলাম যাদবপুর ব্যবসায়ী সমিতিকে ।

তার পর , কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় । ডিগ্রি অর্জন..
*****

সেই দিন রবিবার,
বারাসাত হাইস্কুলের বেঞ্চে আমি পরীক্ষা দিচ্ছি প্রাইমারী টেটের

ওই দিন রবিবার সন্ধ্যে ৭:০০ টা ।
স্টার আনন্দের খবর "ভিড় ট্রেন থেকে পরে মৃত্যু হয়েছে দুজন টেট পরীক্ষার্থীর । "
*****

সেই দিন সোমবার ।
টেট উত্তীর্ণ আমি, ইন্টারভিউ শেষে হেস্টিংস হাউস থেকে ফিরলাম হাসতে হাসতে

ওই দিন দুপুর ২:৩০ টা।
ধর্মতলা জুড়ে কোনো এক রাজনীতি দলের জমায়েত থেকে মুহুর্মুহু স্লোগান উঠছে "টেট নিয়ে দুর্নীতি করতে দিচ্ছি না, দেবো না "

জমায়েতকে বাঁ পাশে রেখে আমি
ডান দিক ধরে চলে এলাম
*****

সেই দিন মঙ্গলবার ।
সর্বশেষ রেজাল্ট বেরোবার দিন । আগের গুলিতে এম্প্যনেল হই নি কিন্তু এটায় হবো আমি নিশ্চিত ।

ওই দিন রাত ১১:০০ টা ।
নাম ওঠেনি .....।
*****

তার পর , , , ,

টিভির পর্দায় ২৪ ঘণ্টা চ্যানেলে দেখতে পেলাম মন্ত্রীর মেয়ে পরীক্ষা না দিয়েও চাকরি পেলো আবার এও জানলাম কেউ কেউ নাকি মাটি দিয়ে চাকরি ছিনিয়ে নিয়েছে ।

থাক । সবার কপালে সব কিছু সয় না । কুকুরের পেটে আবার ঘি ভাত ! !
*****

শুধু আনন্দ বাজারের হেডলাইন দেখে
এবার কেঁদে ফেললাম --

"চাকরি না পেয়ে হতাশ ও অবসাদে (গলায় দড়ি দিয়ে অথবা বিষ খেয়ে) আত্মহত্যা করেছেন বাঁকুড়ার ...মণ্ডল , বীরভূমের ....রায় ,
উত্তর ২৪ পরগনার ....মাইতী ..পুরুলিয়ার
.... ....মাহাত , দক্ষিণ দিনাজ পুরের .... বেগম , হাওড়ার ........, , , ........, , ...., , ......., , , ........
................., , .........(.চলছে ).......

***সমাপ্ত ***

স্মৃতি ধরে থেকো প্রথম পাওয়ার ছোঁয়া

অসীম দাস

বেড়েছে ছায়ার দীর্ঘতা বহুখানি
তর্কে উড়ছে কফিহাউসের ধোঁয়া ,
যে ছিল অচেনা কিছুটা জেনেছি মানি
স্মৃতি ধরে থেকো প্রথম পাওয়ার ছোঁয়া ।

বোশেখ -বিলাসী আম্রমুকুলে রেণু
আষাঢ় আঁধারে পাউশে উজানো কই ,
রাখালিয়া সুরে গোধূলি মাতানো বেনু
কামিনী গন্ধে পুতুলবেলার সই ।

শাওনের ডাকে ঝরোঝরো কামধেনু
কোজাগরী রাতে লুকোচুরি ধরা চাঁদ ,
লম্বা ফালিতে ভাজা বেগুনের মেনু
প্রজাপতি- ছুট্ মুঠিতে পাতানো ফাঁদ ।

জড়ানো অশথে শত সাথীদের হাত
অঞ্জলি -পাতা অলির মানতে আমি ,
আমার কলমে প্রথম কবিতাপাত
থরোথরো অলি উল্লোলে প্রেমগামী ।

ছেড়ে গেছে দৃঢ় পাওনা যা ছিল কিছু
না - চাওয়া কুঁড়িতে ফুটেছে কদমফুল ,
খরা বন্যায় হেঁটেছি তো আগু পিছু
পিছু ডাকে পথে - পড়ে আছি কিছু ভুল ।

এই কবিতাই লিখে যাব আজীবন
শুধু নাটকের দৃশ্য বদলে যাবে ,
অজানা দৃশ্যে মানানোই মহারণ
হার জিত ফের উত্তরসূরি পাবে ।

পাউশের উজানো কই - আষাঢ়ের প্রথম অবিরাম বৃষ্টিপাতে ডাঙায় উঠে আসা কইমাছ ।

দেবদূত

নিশীথ রঞ্জন ঘোষ

14/11/2019
লেখার বাসনা আসল বুক ঠেলে;
খাতা-কলম-মন - -এক যোগী হয়ে,
চঞ্চলিত হৃদয় নৃত্য করে।
প্রকৃতি মেতে ওঠে ;
ভুবন উঁকি দেয় আড়াল থেকে ।
মা সাহসের পুঞ্জীভূত স্তূপ সৃষ্টি করে ।
লিখিব কী !ভাবিতে বসি!
প্রকৃতির শোভাকে ছন্দের মাধুর্যে সাজিয়ে
এক স্বর্গীয় প্রেম রচনা করলাম ।
দেব-দেবী আশিস জানায় ।
মন পুলকিত হয়ে নেচে ওঠে ।

মেয়েটির কাহিনী লিখতে বসি;
যাকে সমাজ নগ্নতার চিহ্ন এঁকেছে!
শুরু করলাম সমাজের বর্বরতা এক অসুখ;
একদিন ঝড়ের অসুখ থেমে নতুন সমাজ আসবে;
মেয়েটি সম্মান পাবে;
দেবীর মর্যাদা দিবে নতুন সমাজ;
ধ্বনিত হয় আমার হৃদয়ে।

লিখতে বসি ;জন্মদাত্রী মা'য়ের করুন
ক্রন্দন রত অবস্থা;
যা নির্যাস সত্য ঘটনার কাহিনী
মা'কে কিভাবে মিথ্যাবাদী সাজিয়েছে,--
স্বার্থপর ছেলেরা; মা স্তম্ভিত হয়ে দেখে,
বলে না কিছু, আশিস করে ছেলেদের;
ছেলেদের মঙ্গল কামনা করে ভগবানের নিকটে।
আমি অবাক হয়ে দেখি,
আশ্চর্য হয়ে উপলব্ধি করি।
সমাজের স্বার্থান্বেষীরা টাকার বিনিময়ে ;-
মা'কে করে ঘর ছাড়া।
আমার অন্তর কেঁদে ওঠে;
অধিষ্ঠাত্রী মা'কে মর্যাদা দিয়ে;
বসায় দেবীর আসনে ।
গর্জে ওঠি, প্রতিবাদে মুখরিত হয়ে ওঠি।
ছেলেরা টাকা ছড়ায় চতুর্দিকে ।
সমাজ নগ্নতার চিহ্ন এঁকেছে ।
মা ডুকরে ডুকরে কেঁদে ।
আমি সান্ত্বনা দিয়ে বলি ;
একদিন তোর মর্যাদা ফিরবে;
ঝড় থামবে, সমাজ শান্ত হবে।

রাজনীতিকে নিয়ে ব্যঙ্গচিত্র!--
ধর্মকে নিয়ে বদমাইশদের আখড়া খানা,
শব্দ চয়ন করে বিন্যাস করলাম ,--
এক ছোটো কাব্য ,--
নাম দিলাম নব দিগন্ত ।

হিজিবিজি কাহিনী মাথায় আসে,-
গুছিয়ে শেষ করলাম ।
ছোট ছোট কবিতা লিখে ।
নব দিগন্ত'র সাথে সংযুক্ত করলাম ।

কামরাঙা-রৌদ্রে রামধনু আঁকা
ওড়না পড়েছিল আমার শরীরের ওপরে
হৃদয় মাঝে এক অস্থিরতার ছাপ পড়েছিল ।
খুঁজি তাকে এখনও বিশ্বভুবনে।
মনে আশা জাগে, সাধিব পরম সাধ।
আবেগের উন্মাদনায় শব্দ চয়ন করে,--
একটি গীতি কবিতার ধ্বনির ঝংকার বেজে ওঠে -
হৃদয় মাঝে ।শেষ করলাম লয়ের তানে ।
নব দিগন্ত কাব্যে যোগ করলাম ।

বাসনা জাগে মনে,-সাধিতে হবে মনের সাধ।
লেখা শেষ করলাম, ঘুম আসল না ।
সারারাত জেগে তৈরি করিলাম ছোট্ট পৃথিবী।
কাব্যের নাম দিলাম নব দিগন্ত;
দু'কয়েকটা পাখিও জেগেছিল ।
নিম পেঁচা হিজলের ডালে বসে লেখা দেখেছিল ।
মেঠো ইঁদুর কেঁদেছিল,-
চিল উড়েছিল আকাশে ।
কাক ভোরে দেখি --
আমার কাব্যের ওপর বসিয়েছে থাবা।
আমার নব দিগন্ত কী চলবে না!
আমার ছোট্ট পৃথিবীর কী বিস্ফোরণ ঘটবে না!-
আমার লেখায় মিরাকেল ঘটবে না!-
প্রকৃতি চিন্তায় মুহ্যমান!আলোচিত হয়,
ময়ূর নৃত্য বন্ধ করিবে,
কোকিল ডাকিবে না ।
মনে মনে বলি সকলেই আমাকে নিয়ে ভাবে
চোখ ছাপসা হয়ে ওঠে ।
নিম পেঁচা সারারাত করেছিল অনশন;
তারও চোখে জল !
পরিপুষ্ট শরীরে ,দেখে আমার লেখা !--
জ্বলজ্বলে নয়নে,বিস্ফারিত চাহনি ।
মৃদু হাসির চিহ্ন,-
উচ্ছ্বসিত ভাব তার মাঝে ধরা পড়ে ।
আমি শিহরিত!আনন্দে মন পুলকিত!
পেখম মেলে ময়ূর নৃত্য করে ।
কোকিল ডাকে কুহু কুহু তানে।
নিম পেঁচা মৃদু ভাবে হাসে।
পাখিরা ডাকিল মনের সুখে ।
প্রকৃতি ভরে উঠল নানা রঙে।
ভেসে বেড়ায় মেঘের ভেলায় ওড়না খানি।
আনন্দ উঠিল বুকে।
মিরাকেল ঘটাল আমার ছোট্ট পৃথিবী।
আমার ছোট্ট পৃথিবী প্রস্ফুটিত ।
ছড়িয়ে পড়ল চতুর্দিকে।

কবিতা :- অসমাপ্তি
@ ------ দিবাকর মণ্ডল ------ @
তাং :- 12/11/2019

এখন গভীর রাত !
অনিয়ন্ত্রিত খণ্ডযুদ্ধে লিপ্ত আমার এ মন ।
সিগারেটের তামাটে ধোঁয়া জ্বালিয়ে ছারখার করে দিচ্ছে -
নিরন্তর যুদ্ধে নিরস্ত্র পরাজিত আমার স্বত্বাকে ।
শুধু ভালোই-বেসে গেলাম !
ভালোবাসা পেলাম - এ দাবি করলাম কোথায় ?
খুঁজতে গিয়ে হারিয়ে ফেলেছি নিজেকে ।
যা পেলাম - জীবন্ত এক লাশ হয়ে বেঁচে থাকার যন্ত্রণা ।

আজ শিউলীর অজ্ঞাতবাস জীবন -
ভীষন আপনার বলে মনে হয় ।
শুধুই দিয়ে গেলাম প্রেম - নীরবে তোমার আঁচলে ,
রেখে গেলাম - মুঠো মুঠো অনুভূতির উপস্থিতি ।
নিয়ে গেলাম কয়েক মুহূর্তের গ্লানি - তাই ভাবি প্রেম ।
যারে তুমি একদিন হয়তো আহ্বান জানাবে -
একান্তে , অন্তিম বিচারালয়ের জ্বলন্ত চিতায় !

রচনা কাল :- ২৮শে আশ্বিন , ১৪২৬

:::::- সমাপ্ত -:::::

বিষয়:-কবিতা।
শিরোনাম:- হৃদয়ের ব্যথা।
কলমে-- নরেন্দ্র নাথ রায়।
তা-(১১--১১--১৯)

সাজিয়ে বাণী,লিখে লেখনী--
ভরে দিলে হৃদয়ের পাতা।
দিয়ে মমতা,ব্যথার কথা-------
ভরেছো বিরহের খাতা।।

বিদ্যার জননী,নাম বীণা পানি--
কল্প জগতের পথিক।
ভাবের ভাবনা,রসের রসনা-----
হলে বোঝে রসের রসিক।।

দর্শন বিরোহি,প্রেমের আরোহী,--
প্রেমিক ছাড়া বোঝেনা কেহ।
এ,মানব তরী,দিবা বিভাবরী-----
বিরহের 🔥তাপে জ্বারে দেহ।।

বিরহের ফাঁদে,পড়িয়ে কাঁদে-------
ভাল বাসার দুটি প্রাণ।
কাঁদে দিবা নিশি,রূপাইয়ের বাঁশি-
সাঁজুর প্রেমে হারিয়ে জ্ঞান।।

ভাবের কাননে,বিরহের অঙ্গনে,----
ফুঁটে ওঠে দুটি 💐ফুল।
করে পিরিতি,রাখিতে স্মৃতি------
ভোলে জাতি ধর্ম কুল।।

জ্ঞানের আলোক,কাব্যের শ্লোক----
সদা চলে আদান প্রদান।
কবির আরাধনা,কাব্যের সাধনা---
সাহিত্যের ফুল🌺🌻🌹বাগান।।

#ওরা_ভালো_আছে

৮০-র দশক। বর্ষণমুখর সন্ধ‍্যাবেলা। ঝাপসা শহরের কোনো এক আধো অন্ধকার এঁদো গলি দিয়ে এগিয়ে চলেছে এক সদ্য বিশ পেরোনো তরুণী। ভরা যৌবনে পরিপূর্ণ তার শরীর, দেখলেই বোঝা যায় কোনো বড়লোকের আদুরী কন‍্যা। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচার জন্য মাথায় ছাতা ধরা থাকলেও তা পুরো শরীরকে রক্ষা করতে পারছে না। ভিজে শাড়িটা যেন আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে তাকে। রাস্তাঘাট প্রায় শুনশান। পাশ দিয়ে একটা হাতে টানা রিকশা চলে গেল। একজন মাঝ বয়সী মহিলা শাড়ির আঁচলটা মাথায় জড়িয়ে এক ছুটে রাস্তা পেরোল। রাস্তার পাশে এক দোতলা বাড়ির ব‍্যালকনি থেকে এক কিশোরী অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তরুণীর অবশ্য সে দিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। নির্বিকার চিত্তে সে এগিয়ে চলেছে গলির শেষ প্রান্তে অবস্থিত দোতলা ভাড়া বাড়িটার উদ্দেশ্যে। নীচের তলার কোনের দিকের আঠারো নাম্বার ঘরটাই তার গন্তব্য।এক সময় বাড়িটার সামনে এসে দাঁড়াল সে। বর্ষায় পাশের নর্দমাটা উপচে পড়েছে। তার ময়লা জলে ঢেকে গেছে রাস্তা। কলেরা, ম‍্যালেরিয়ার আদর্শ পরিবেশ। আঠারো নম্বর ঘরটা থেকে ভেসে আসছে টেপ রেকর্ডারের শব্দ। তার ভগ্নপ্রায় আওয়াজ মালিকের করুন অবস্থার কথা কিঞ্চিৎ জানান দিচ্ছে। সেই দিকে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তরুণী। কবির সুর যেন আজকের পরিবেশটাকে এক অন‍্যরকম বিষন্নতায় কিংবা মায়ায় আছন্ন করেছে।
"এসো এসো আমার ঘরে এসো
আমার ঘরে
বাহির হয়ে এসো
বাহির হয়ে এসো তুমি যে আছো অন্তরে
এসো আমার ঘরে।"
দরজার সামনে এসে দাঁড়াল তরুণী। আলকাতরায় রাঙানো পাল্লায় ঘুনপোকাদের আস্তানা জানান দিচ্ছে, দীর্ঘদিন এ ঘরে কোন রকম সংস্কার হয়নি। কড়া নাড়লো তরুণী। একবার, দুবার; তিনবারের মাথায় থেমে গেল টেপ রেকর্ডারের শব্দ। মৃদু কাশির আওয়াজ। কয়েক সেকেন্ড পরে খুলে গেল দরজাটা। সামনে এসে দাঁড়াল লম্বাটে গড়ন, ক্ষয়িষ্ণু একহারা চেহারার এক যুবক। গালে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। মেয়েটিকে দেখে কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়লো সে। কয়েক মূহুর্ত পর নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, "তুমি!"
-"হ‍্যাঁ আমি।" শান্ত স্বরে জবাব দিলো মেয়েটি। তারপর ছেলেটির পাশ কাটিয়ে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করলো। "চলে এলাম, সব ছেড়ে।"
এক কামরার ঘর। দেওয়াল হতে পলেস্তারা খসে পড়েছে। দক্ষিণ দিকে একটা জানালা। সেটা ছিটিকিনি দিয়ে আটকানো। ঘরের মধ্যে একটা চারপেয়ে চৌকি পাতা। তার পাশে একটা সাইড
টেবিল। টেবিলের উপর মাটির কুঁজো আর একটা গ্লাস রাখা। ছেলেটা দরজা বন্ধ করে গ্লাস হাতে কুঁজো থেকে জল ঢালতে উদ‍্যত হয়েছিল। মেয়েটির কথা শুনে থমকে গেল।
-"চলে এলাম মানে? এসব তুমি কি বলছো অনু?!"
-"কেন? স্পষ্ট বাংলাতেই তো বললাম। তোমার তো বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়!"
-"তুমি জানো, তুমি কি বলছো?"
-"জানি অমরেশ।"
-"তা হলে এটা তুমি করতে পারো না।"
-"কি পারি না?"
-"এভাবে রাজপথ থেকে গলিতে নেমে আসতে।"
-"অমরেশ তুমি জানো যে আমি বিংশ শতাব্দীর এক শিক্ষিত শহুরে নারী। আমাকে এভাবে ক্ষুদ্র গন্ডি চেনানোর মতো হাস‍্যকর চেষ্টা তুমি কোরো না। তোমার মতো একজন উদারপন্থী মানুষের থেকে সে আশা করি না।"
-"তোমার বাড়ি থেকে আমাকে কখনোই মেনে নেবে না অনু। শহরের অন‍্যতম ধনী প্রভাবশালী ব‍্যবসায়ীর একমাত্র মেয়ের সাথে এক অনাথ চালচুলো হীন বেকার যুবকের সম্পর্ক কোনদিনই পূর্ণতা পেতে পারে না।"
-"অমরেশ তোমার মনে আছে, আর্ট কলেজের সেই দিনগুলোর কথা? যখন কলেজের সবচেয়ে মেধাবী ইন্ট্রোভার্ট ছেলেটার দৃঢ় ব‍্যক্তিত্বের কাছে সমস্ত দর্প চূর্ণ হয়েছিল এক সদ‍্য যৌবনা রমনীর। মনে পড়ে, আমার জন্মদিনে তোমায় দেওয়া প্রতিশ্রুতি, সারা জীবন সাথে চলবার অঙ্গীকার? অমরেশ তোমাকে দেওয়া কথাগুলো কোনো বড়লোকের আদুরী মেয়ের খামখেয়ালিপনা নয়। তা তোমায় ঘিরে অনুরাধা সান‍্যাল‍্যের অনুভূতি।"
-"কিন্তু অভাব, দুঃখ, দারিদ্র্য ছাড়া আমি তো তোমায় আর কিছুই দিতে পারবো না।"
-"স্ত্রীয়ের মর্যাদা ছাড়া আমাকে নতুন করে দেবার মতো কিছু নেই। তোমার সবকিছুই আমার।"
-"যেদিন থেকে মারণ ব‍্যাধি টিউবারকিউলোসিস গ্ৰাস করেছে, মৃত্যুর দিকে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছি। ক্ষয় রোগের কবলে পড়ে টিউশনিগুলোও অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। আমার গন্তব্য সংক্ষিপ্ত। প্রতি পদক্ষেপ অনিশ্চয়তায় ভরা।"
কথা বলতে বলতে হঠাৎ তুমুল কাশি শুরু হয় অমরেশের‍। সে মেঝেতে পড়ে যায়। ছুটে গিয়ে তার মাথাটা কোলে তুলে নেয় অনুরাধা। বিছানায় নিয়ে শোওয়ায়‍।
-"আমি তোমার কাছে গন্তব্যের সন্ধানে আসিনি। তোমার প্রতি পদক্ষেপের দোসর হওয়াতেই সার্থক আমার নারীত্ব। আমরা সবকিছু ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাবো অমরেশ। যেখানে কেউ আমাদের চিনবে না। যেখানে গলি ও রাজপথের বিবাদটা চিরকালের জন্য অর্থহীন হয়ে যাবে। আমি জানি, আমার বাড়ি থেকে আমাদের সম্পর্কটা কখনোই মেনে নেবে না। কিন্তু তাতে আমার কিছু যায় আসে না। তাদের অনুমতি নিয়ে আমি তোমার সথে সম্পর্কে আবদ্ধ হইনি। অতএব প্রতিশ্রুতি রক্ষার সময়ে তাদের মতামত নিস্প্রয়োজন। ভালোবেসে সবকিছু ছাড়া যায়। কিন্তু কোনোকিছুর বিনিময়েই ভালোবাসাকে ছাড়া যায় না। আমি শুধু তোমার যৌবনের প্রেমিকা হয়ে থেকে যেতে চাই না। অর্ধাঙ্গিনী হতে চাই।"

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত গভীর হতে থাকে। গভীরতর হয় বৃষ্টির দাপট। অমরেশের কাশির শব্দকে ছাপিয়ে যায় আষাঢ়ে মেঘের গুরু গম্ভীর নাদ। মাঝেমাঝে বজ্রপাতের আওয়াজ কাঁপিয়ে দেয় ব্রম্ভান্ডকে।

পরদিন সকালে শহরের এক এঁদো গলির শেষের দোতলা বাড়িটার ১৮ নং ঘরের দরজায় একটা জংধরা তালা ঝুলতে দেখা যায়। ঘরের বাসিন্দা এক মৃত‍্যু পথযাত্রী তার সঙ্গিনীর হাত ধরে পাড়ি দিয়েছে, দূরে কোথাও, কোনো নাম না জানা দেশে। গন্তব্য সংক্ষিপ্ত, চরম অনিশ্চয়তায় ভরা। হোক না! প্রিয় মানুষ সাথে থাকলে এই পথ চলাতেই জন্মান্তরের সুখ আছে যে।

(সমাপ্ত)

©অনির্বাণ চক্রবর্ত্তী

#গল্প
#গুপ্তধন
#অমিতাভ_রায়

-

" দাদু অ্যাডভেঞ্চার করতে যাবে না? এখনো ঘুমোচ্ছো? তুমিই তো বললে, দুপুর দুপুর না গেলে অন্ধকার হয়ে যাবে। " রীতিমতো নাক ডাকিয়ে ঘুমোচ্ছিলো ইন্দ্রনারায়ণ। নাতির ডাকাডাকিতে উঠে পড়লো। " ভালো সময়ে ঘুম ভাঙিয়েছিস। পাশের ঘরে উঁকি মেরে দেখে আয় তোর মা কি করছে?" রিকু একটু পরেই ফিরে আসে। ফিসফিস করে বলে, " দাদু, মা ঘুমোচ্ছে- চলো। " চুপিচুপি বেরিয়ে পড়ে দুজনে। রিকু পুজোর ছুটিতে মামাবাড়িতে এসেছে। মামাবাড়িতে দুর্গাপুজো হয়। পুজোবাড়ির পিছনে পুরনো ভেঙে যাওয়া বাড়ি। এককালের জমিদার বাড়ি। সেখানে এখন কেউ থাকে না। সেই বাড়ি দেখেই রিকুর খুব ইচ্ছে সেখানে যাওয়ার। নাতিকে দাদু বলেছিলো, " এই বুড়ো বয়সে কি এতো অ্যাডভেঞ্চার পোষায়? " নাতি শুনতে চায় নি। অবশেষে দাদু রাজি হয়েছে পূর্বপুরুষের ঐ বাড়িতে যেতে। আজ সেই অ্যাডভেঞ্চারের দিন।

পুজোবাড়ির বারান্দায় ঠাকুর বানানো চলছিলো। কাল শেষ হয়ে গেছে কাজ। কি সুন্দর দেখতে লাগছে ঠাকুরকে! রিকু হাঁ করে তাকিয়ে থাকে। " চ- চ, দেরী করিস না। পরে ঠাকুরকে সাজাবার সময় ভালো করে দেখবি। " ইন্দ্রনারায়ণের কথায় সম্বিত ফেরে রিকুর। ভাঙা দরজা দিয়ে ঢোকে দুজনে। ইন্দ্রনারায়ণ রিকুকে পূর্বপুরুষের গল্প শোনায়৷ কোথায় কাছারিবাড়ি, কোথায় নাচঘর, কোথায় হাতি বাঁধা থাকতো। ডাকাতকে দূর থেকে দেখার জন্য কেমন দেওয়ালের মধ্যে ফুটো ছিলো। কিভাবে পাহারা দেওয়া হতো। রিকু নীরবে শোনে। ইঁটের স্তুপের তলা ফিয়ে কি যেন বের হয়ে আসছে। ইন্দ্রনারায়ণ হাত ধরে নাতিকে একধারে সরিয়ে আনে। একটা বিশাল সাপ ওদের পাশ দিয়ে চলে যায়। কোনরকমে দোতলায় ওঠে ওরা। " না-রে, এখানে বেশীক্ষণ থাকা যাবে না। ভেঙে পড়ে যদি।" ইন্দ্রনারায়ণ বলে উঠেই চুপ করে যায়। ইন্দ্রনারায়ণের দৃষ্টি অনুসরণ করে রিকু দেখে ভাঙা জানলার ঠিক নীচে দেওয়ালে একটা গর্তের মধ্যে কি যেন চিকচিক করছে। " দাদু ওটা কি?" ইন্দ্রনারায়ণ গর্তের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কি যেন বের করে। তারপর রিকুকে হাতের তালুর উপর জিনিসটা দেখায়। " কি সুন্দর আংটি দাদু!" ইন্দ্রনারায়ণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, " দাদুভাই, এটা আমার একমাত্র অপরাধের চিহ্ন। "

রিকু বিস্ময়ে দাদুর দিকে তাকিয়ে থাকে। ধীরে ধীরে দুপুরের আলো মরে আসছে। " জানিস দাদু- তোর দিদা আমার সঙ্গে খেলতো। আমি একটা যাত্রাপালায় দেখেছিলাম শাহজাদা তার এক শাহজাদীর হাতের আঙুলে একটা আংটি পরিয়ে দিচ্ছে। আমার তোর দিদাকে খুব ভালো লাগতো। একবার মার আংটি হারিয়ে গিয়েছিলো। সেই আংটিটা খুঁজে পেয়ে আমি এখানে লুকিয়ে রেখেছিলাম। ইচ্ছে ছিলো তোর দিদার আঙুলে পরিয়ে দেবো। তখন গ্রামে কলেরা হচ্ছিলো। বাবা আমাদের নিয়ে কিছুদিনের জন্য কলকাতায় চলে এলো। তখন আর তোর দিদার আঙুলে আংটি পরানো হলো না। পরে গ্রামে ফিরে এলেও ভুলেই গেলাম আংটির কথা।" ইন্দ্রনারায়ণের চোখের সামনে যেন সুদূর অতীতের সব ঘটনা ছবির মতো চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

ইন্দ্রনারায়ণ নীচে নেমে পুজোর দালানে বসে। ধীরে ধীরে পশ্চিমের আকাশ রাঙিয়ে উঠছে। সে দিকে তাকিয়ে ইন্দ্রনারায়ণ বলে," তোর দিদার সাথেই আমার বিয়ে হলো। কিন্তু, আংটিটা মাকেও ফিরিয়ে দিই নি- আর তোর দিদাকেও দিতে পারি নি।" রিকুর মনে হলো দাদুর চোখ চিকচিক করছে। পুজোর দালানে আলো জ্বলে উঠলো। পাল দাদু বললো," বাবু, এবার মায়ের মুখ কেমন হয়েছে?" ইন্দ্রনারায়ণ প্রতিমার দিকে তাকায়। ভাবে,মা-তো সবই জানে। তাই মায়ের মুখে মৃদু হাসি যেন ফুটে উঠেছে। " বাবু, কাল দুপুরের মধ্যেই তো ঠাকুরকে সাজাতে হবে?" ইন্দ্রনারায়ণ মাথা নেড়ে সায় দেয়। অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে চারদিক। আকাশে মেঘ জমেছে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে। রিকু ভাবছিলো, এককালে ঐ ভাঙা বাড়িটা কিরকম ছিলো কে জানে? আলোকোজ্জ্বল জমিদার বাড়ির ছবি ও কল্পনায় দেখে। ঘোর ভেঙে যায় দাদুর কথায়," চ- দাদু, আজকের মতো অ্যাডভেঞ্চার শেষ। বাকি ঘরগুলো পরে একদিন দেখবো। " রিকু আর একবার ভাঙা বাড়িটার দিকে তাকায়। দুটো চোখ জ্বলছে না! ভয়ে ও দাদুকে জড়িয়ে ধরে। ইন্দ্রনারায়ণ বলে," ভয় পাস না। ওটা প্যাঁচা। মা লক্ষ্মীর বাহন। হয়তো আমার এই গুপ্তধন পাহারা দিচ্ছিলো।" কর্কশ কণ্ঠে ডেকে উঠে প্যাঁচাটা উড়ে গেলো। চমকে যায় রিকু। ইন্দ্রনারায়ণ নাতির হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলে, " দাদু- তোর জন্যই ফিরে পেলাম এই আংটি। " তারপর অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে," হ্যাঁগো, তোমার জিনিস তোমার নাতির জন্য ফিরে পেলাম। নাত বৌকে দেওয়ার জন্য ওর মার হাতে দিয়ে দেবো। কি খুশী তো?" শেষ কথাটা বলার সময় দাদুর গলাটা কেমন ভেঙে গেলো। নাতির হাত শক্ত করে চেপে ধরে ইন্দ্রনারায়ণ। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। মেঘের আড়াল দিয়ে চাঁদও উঁকি দিচ্ছে।

----ফ্রেস অক্সিজেন বার---
----কিরণময় নন্দী-----

আমাজনের লেলিহান শিখা দেখেছিলো সারা বিশ্ব,
শিউরে উঠেছিলো আমজনতা---
পৃথিবীর ফুসফুসে কেন ধ্বংসলীলা নাকি নিছকই দাবানলের লেলিহান গ্রাস?
প্রশ্ন হাজার উত্তর অজানা।
নেট দুনিয়া তোলপাড় করা সংবাদে তুমি আমি শিহরিত হয়েছিলাম....মাটির নিচের খনিজের লোভে মানুষ ঘটিয়ে চলেছে এই ধ্বংসাত্বক মারণখেলা।
সবুজপ্রেমীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এই ন্যাক্কারজনক কাজের প্রতিবাদে।
তুমি আমি স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে ভরিয়ে দিয়েছিলাম নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
তারপর আর খোঁজ নেয়নি বর্ষাবন আমাজনের।
তিলোত্তমার বুকে ঘটে চলেছে সবুজ নিধনের মারণ খেলা।
কেউ কি খোঁজ রেখেছো?
রাতের অন্ধকারে কপার সালফেটের নীল বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন মহীরুহ সম শাখীরাজীর অন্তঃকরণে।
উন্নয়নের চাকচিক্যে গোপনে হত্যালীলা সংগঠিত করছে সভ্যতা ধ্বংসের কারবারিরা।
কখন জাগ্রত হবে তোমার বিবেক? কখন প্রতিবাদে মুখরিত হবে তিলোত্তমা।
দেরি হয়ে যাবে না তো?
সময় হয়েছে আগামী পৃথিবীকে আগামীর কাছে বাসযোগ্য হিসেবে ফিরিয়ে দেবার।
নইলে "ফ্রেস অক্সিজেন বার" হবে আগামীর ডেস্টিনেশন।

#গল্প
#রোশনি
#স্বর্ণালী

মা মরা মেয়ে নীলিমা। মায়ের মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই সংসারে আসেন সৎ মা। তার পরেই বাবা নীলিমাকে ভর্তি করে দেন এক চ্যারিটেবল মিশনারি বোর্ডিং স্কুলে। বড় ছুটি পড়লে বাবা এসে বাড়ি নিয়ে যেতেন তাকে। নতুন মায়ের কোল জুড়ে এলো এক ছেলে। মায়ের অভাব কুরে কুরে খেত নীলিমাকে।

কলেজ শেষ করে ছোট্ট এক বেসরকারী অফিসে স্বল্প মাইনের চাকরি পেল নীলিমা।লোকাল ট্রেনেই পরিচয় হয় নিত্যযাত্রী নিলয় চক্রবর্তীর সাথে। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম, তারপর বিয়েতে পরিণতি পেল ওদের সম্পর্ক।

দরিদ্র পরিবারের মেয়ে হওয়া সত্বেও নিলয়ের পরিবার সাদরে গ্রহণ করে নিল নীলিমাকে। মা হারা মেয়েকে বুকে টেনে নেন নিলয়ের মা। নীলিমাও যেন ফিরে পায় তার মাকে। সাত বছরের বিবাহিত জীবনে পাঁচ বছরের ছেলে রোশনকে নিয়ে সুখের সংসার ওদের।

নিলয়ের বোন নীলাশা , বৌমণি তার প্রাণ। বছর তিনেক আগে ধুমধাম করে তার বিয়ে হয় সহকর্মী প্রবালের সাথে। খুব খুশিতে দিন কাটছিল ওদেরও।

হঠাৎ ঘনিয়ে এলো এক বিপর্যয় ; সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে গুরুতর আঘাত পেল নীলাশা । গর্ভধারণের ক্ষমতা হারাল সে চিরতরে। শোকের কালো মেঘ ছেয়ে গেল দুই পরিবারে। ক্রমশঃ অবসাদে ঘিরে ধরছিল নীলাশাকে । নীলাশার দশায় ভেঙে পড়ল তার প্রিয় বৌমণিও । উৎসবের সব আলো ম্লান হয়ে গেল ওদের পরিবারে।

অনেক ভেবে নীলিমা ড্রয়িংরুমে সবার সামনে প্রস্তাবটা রাখল। ইতিমধ্যে সে যোগাযোগ করেছে বেশ কয়েকটা অনাথ আশ্রমে। নীলিমার কথায় সকলেই সম্মতি দিলেন। রাজি হলেন প্রবালের মা মিনতিদেবীও ।

পরদিন সকলে মিলে পৌঁছলেন রিষড়ায় , এক আশ্রমে। প্রথম দর্শনেই নীলাশার মনে ধরল বছর সাতেকের মিষ্টি মেয়ে ফুলকিকে । দত্তক নিল ওরা ফুলকিকে । নীলিমার দেওয়া নামেই ফুলকির নতুন নামকরণ হল ' রোশনি '। ওদের ভুবন আলো করে ঘরে এল রোশনি। একে একে জ্বলে উঠল উৎসবের সব আলো।
ফুলকির জীবনের আঁধারও কেটে গেল। বাবা মা সহ গোটা একটা পরিবার পেয়ে সেও বেজায় খুশি। রোশনও এই প্রথম ভাইফোঁটা পেল রোশনির হাতে। ভাইবোনের বন্ধনে আবদ্ধ হল ওরা।

"স্বীকৃতি "

- ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য

জলের দাগেই আঁকছি ছবি
দিনের পর দিন ,
রাতের পর রাত |
আঁকছি সুখের স্বপ্ন হাজার
আঁকছি আদর ,আঁকছি আঘাত |

ফাঁকা ক্যানভাসে রঙের অভাব
মিলিয়ে যাচ্ছে নক্সার দল ,
মুহূর্তেরাও যায় মিলিয়ে
এভাবেই আঁকে জীবনের রঙ |

সময় ঝড়ের শৈত্য প্রবাহে
সব রঙই শেষে ফিকে হয়ে যায় !
সৃষ্টি সুখের উল্লাস বুঝি
ধ্বংস স্তুপেই স্বীকৃতি পায় ---

সৃষ্টি সুখের উল্লাস বুঝি
ধ্বংস স্তুপেই স্বীকৃতি পায় |

কলমে ইন্দু (27.11.2019)

ঠিকানা আজ চাইল্ড হোম
- কিরণময় নন্দী

বছর পনেরোর সুরঞ্জনা আনমনা উচাটন
বাড়ি ছেড়ে ঠিকানা আজ চাইল্ড হোম।

পড়াশোনায় মন্দ নয়,গানের গলা বেশ মিঠে
সুযোগ পেলে নানান খুনসুঁটি, দুস্টুমি বিদঘুটে।
হাসি-খুশিই কাটতো দিন, নানান কাজের ভীড়ে
প্রথম প্রেমের টুকরো ছোঁয়ায় আঘাত হানে অন্তরে।
কোনো কিছুই ভালো লাগে না, উদাস উদাস মন
সুরঞ্জনা লুকিয়ে ছোটে প্রেমিক ডাকে যখন।
মায়ের কথা তেতো লাগে, মন লাগে না পড়ায়
আবেগি মন স্বপ্নে বিভোর, শুধুই উড়ে বেড়ায়।
কোথায় থাকে সুজয়, বাড়িতে ওর কে কে আছে?
সুরঞ্জনার জানে না কিছুই, জানে সুজয় ওকে ভালোবাসে।
মাস তিনেকের মেলামেশা, সঙ্গী আবেগভরা হৃদয়
পনেরোর সুরঞ্জনা অজানার খোঁজে, সাথে প্রেমিক সুজয়।

দিন তিনেকেই বুঝলো ও, ভালোবাসা নয় শুধু ধোঁকা
সুরঞ্জনা পণ্যদ্রব্য, কমবয়সী বারবনিতা।
কোথায় গেলো পেন-পেন্সিল, কোথায় স্কুল-পড়াশোনা?
সন্ধ্যে হলে চড়া মেকআপ, আর খদ্দেরের আনাগোনা।
সুজয় শুধু শরীরলোভী নয়, ভয়ঙ্কর শয়তান
সুরঞ্জনা নীড়-হারা পাখি,ভুলে গেছে গাইতে গান।
তাকিয়ে থাকে জানালা দিয়ে, দূর রাস্তার দিকে
নিজের কাছে অচেনা ও, জীবনটাই ফিকে।
স্বপ্নগুলো উবে গেছে বাস্তবের বাষ্পায়নে
বাঁচার ইচ্ছে মরে গেছে আবেগ দহনে।
কাগজে খোঁজ থানায় নালিশ, বিস্তর ঝামেলা
ফিরলো বাড়ি সুরঞ্জনা, সমাজ মানলো না।

বছর পনেরোর সুরঞ্জনা আনমনা উচাটন
বাড়ি ছেড়ে ঠিকানা আজ চাইল্ড হোম।

"এই টুকু থাক আমার "

- ইন্দ্রানী ভট্টাচার্য

যে টুকু প্রেম দিয়েছ এই অবেলায়
মনে মনে ,
সে টুকু নিয়েই বসন্ত সাজাবো
একান্ত নিভৃতে |

যে টুকু অধ্যায় এসেছে এই অবেলায়
মনে মনে ,
সে টুকু নিয়েই মেতেছি আমি
সংগোপনে |

যে টুকু ছোঁয়া মিলেছে এই অবেলায়
মনে মনে ,
সে স্পর্শ টুকুই থাক মিলেমিশে
আমার হয়ে |

যে টুকু ভালোবাসা মিলেছে এই অবেলায়
মনে মনে ,
সেই টুকুই থাক গহীনে আমার
অলিন্দে বাসা বেঁধে |

যে টুকু সন্মান দিয়েছে তুমি
মনে মনে ,
সেটাই হোক আমার সম্পদ
শেষ নিঃশ্বাস পরার আগে |

কলমে ইন্দু (28.11.2019)

#কথা _দিলাম
#সুপর্ণা _ব্রহ্ম _চক্রবর্তী

যত্নে আমার অসুখ বাড়ে,
যত্নে আমি ভেঙে যাই...!!

অযত্নে বরং আমার ডাল পালা ছড়িয়ে পড়ে বিষবৃক্ষের মত,
কেউ খোঁজ রাখেনা বলে, দায়ও থাকেনা....!

নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় যান্ত্রিক চলা ফেরা,
বেশ লাগে -----

যত্নে বরং একরাশ আশঙ্কা নিয়ে,
রাতের তারা খসা মুহূর্তের স্বপ্ন আসে.....

শোক, তাপ যত কমে যায়,
ততো নিজেকে ভারহীন মনে হয় !

যত্নে আমার ঋণ বাড়তে থাকে,
চুমুর বদলে দীর্ঘায়ু কামনা করা ছেড়ে দিয়েছি.....

আমার ওসব শরীরী ব্যাকরণ জানা আছে,
তুমি বরং একটা অযত্নের চিহ্ন এঁকে দিও বাম অলিন্দে.....

আমি যত্ন করে আগলে রাখবো
কথা দিলাম..........

কাঠবেড়ালী
- জুলফিকার আলী

গাছের ডালে কাঁঠবেড়ালী
খায় যে মজার ফল
ফল মৌসুমে কাঁঠবেড়ালীর
মনে খুশির ঢল ।

আম খাবে সে, জাম খাবে সে
ঘুরে ডালে ডালে
মিষ্টি ফলের মিষ্টি রসে
নাচবে তালে তালে ।

দুষ্টু ওই কাঁঠবেড়ালীটা
বড্ড বেশি পাজি
পরের গাছে ফল চুরিতে
ধরতে পারে বাজি ।

ফ্রেস অক্সিজেন বার
- কিরণময় নন্দী

আমাজনের লেলিহান শিখা দেখেছিলো সারা বিশ্ব,
শিউরে উঠেছিলো আমজনতা---
পৃথিবীর ফুসফুসে কেন ধ্বংসলীলা নাকি নিছকই দাবানলের লেলিহান গ্রাস?
প্রশ্ন হাজার উত্তর অজানা।
নেট দুনিয়া তোলপাড় করা সংবাদে তুমি আমি শিহরিত হয়েছিলাম....মাটির নিচের খনিজের লোভে মানুষ ঘটিয়ে চলেছে এই ধ্বংসাত্বক মারণখেলা।
সবুজপ্রেমীরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো এই ন্যাক্কারজনক কাজের প্রতিবাদে।
তুমি আমি স্ট্যাটাসে স্ট্যাটাসে ভরিয়ে দিয়েছিলাম নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
তারপর আর খোঁজ নেয়নি বর্ষাবন আমাজনের।
তিলোত্তমার বুকে ঘটে চলেছে সবুজ নিধনের মারণ খেলা।
কেউ কি খোঁজ রেখেছো?
রাতের অন্ধকারে কপার সালফেটের নীল বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে শতাব্দীপ্রাচীন মহীরুহ সম শাখীরাজীর অন্তঃকরণে।
উন্নয়নের চাকচিক্যে গোপনে হত্যালীলা সংগঠিত করছে সভ্যতা ধ্বংসের কারবারিরা।
কখন জাগ্রত হবে তোমার বিবেক? কখন প্রতিবাদে মুখরিত হবে তিলোত্তমা।
দেরি হয়ে যাবে না তো?
সময় হয়েছে আগামী পৃথিবীকে আগামীর কাছে বাসযোগ্য হিসেবে ফিরিয়ে দেবার।
নইলে "ফ্রেস অক্সিজেন বার" হবে আগামীর ডেস্টিনেশন।

#মৃত্যু ঘন্টা

#শীতল_আচার্য

পাটকু তার নতুন ফ্ল্যাটের বৈঠকখানাটা অ্যান্টিক আসবাবপত্র দিয়ে সাজিয়েছে | চিনা এবং জাপানী জলরংএর প্রাকৃতিক নিঃসর্গের ছবি, বেলজিয়াম কাঁচের ওয়াল মিরর, চাইনিজ ওয়াটার পট এবং ডিনার সেট, পার্শিয়ান গালিচা, অর্ধ উলঙ্গ ইটালিয়ান মার্বেলের নারীমূর্তি, জার্মান ব্রোন্চের আবক্ষমূর্তি | এছাড়া সেই ঘরের কাঠের সব ফার্নিচারও পুরোণ এবং কিউরিও শপ থেকে কেনা | কিছু আফ্রিকান দুঃষ্প্রাপ্য মুখোশও তার সংগ্রহে আছে | এসব সে কিনেছে সংসারের সব খরচের পরও একটু একটু করে পয়সা জমিয়ে | আর এগুলো পার্ক স্ট্রীটের দু তিনটে কিউরিও শপ থেকে কেনা | তার স্ত্রী রুমু বারম্বার বলেছিল পুরোণ জিনিসপত্র দিয়ে নতুন ফ্ল্যাটের ড্রইং রুম না সাজাতে | রুমুর মতে পুরোণ জিনিস ঘরে রাখলে গৃহস্থর অমঙ্গল হয় | কিন্তু পাটকু এ ব্যাপারে একদমই নন কম্প্রোমাইজিনিং অ্যাটিচুডের | তাই বউয়ের এই একটা অনুরোধই সে মানতে পারে নি | রুমুও স্বভাবতই অভিমানবশতঃ ঐ ড্রইং রুমে ঢুকত না |

সেবার মিঃ দাশগুপ্তের শপ থেকে একটা চমৎকার দেওয়াল ঘড়ি পেয়ে গেল সে | অপূর্ব সুইস ঘড়ি| ব্ল্যাক উডের বডি, ঘড়ির মাথায় হরিণসহ কিছু জন্তু জানোয়ারের কাঠের মূর্তি, পেন্ডুলামটা রূপোর | ঘন্টা বাজে না | কিন্তু ঘড়িটা সচল | ঘড়িটা যেন পাটকুর ড্রইং রুমকে সম্পূর্ণ করল | অবশ্য এর জন্য তাকে নগদ আশী হাজার টাকাও খসাতে হল |

যখনই সময় পেত, পাটকু হাঁ করে দেওয়াল ঘড়িটার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকত | হ্যাঁ, একেই ঘড়ি বলে বটে !

পাটকু তার কিউরিও কালেকশন দেখানোর জন্য মাঝে মধ্যেই তার বন্ধু বান্ধবদের ড্রইংরুমে ডেকে নিত | পানাহার সহযোগে আড্ডা চলত | বন্ধুরা তার রুচি আর কালেকশনের তারিফ করত আর পাটকু সে সব তারিয়ে তারিয়ে নীরবে উপভোগ করত | কিন্তু নতুন ঘড়িটা দেখে, সাগর নামে তার এক অ্যাসেট্রোলজার বন্ধু বলল, " ঘড়িটা খুব একটা শুভ নয় | গন্ডগোলের বস্তু ঠেকছে | পারলে ওটিকে বিদায় কর |" পাটকু এ সব মানে না | তাই সে ভাবল সাগর হয়ত আউট অফ জেলাসিতে এসব বলছে | ফলে এর পরের আড্ডাগুলোতে সে সাগরকে ডাকা বন্ধ করে দিল |

তাদের বেডরুমের পাশেই ড্রইংরুমটা | একদিন রাত চারটের সময় ঘড়ির ঢং ঢং শব্দে পাটকুর ঘুম ভেঙে গেল | দৌড়ে বেরিয়ে এসে পাটকু দেখল দেওয়াল ঘড়ির পেন্ডুলামটা দুলছে আর ঢং ঢং করে শব্দ হচ্ছে | যুগপৎ আনন্দিত এবং হতচকিত হয়ে পড়ল সে | স্বয়ং দোকানদার বলেছিল যে ঘড়ির ঘন্টা বাজবে না | আর এত মিষ্টি, গম্ভীর শব্দ সে আওয়াজের | পাটকু সোফার ওপর বসে অপেক্ষা করতে লাগল | দেখতে দেখতে পাঁচটা বাজল | কিন্তু পেন্ডুলামের ঘন্টা আর এবার বাজল না | পাটকু খুব অবাক হয়ে আরও এক ঘন্টা অপেক্ষা করল | কিন্তু ছটার সময়ও কোন ঘন্টা বাজল না | তখন পাটকু খুব চিন্তিত মনে শুতে গেল |

পরদিন দেরি করে ঘুম থেকে উঠে পাটকু শুনল তাদের প্রতিবেশী শর্মাজী ভোর চারটের সময় ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন | শুনে চমকে উঠল পাটকু | তার ঘড়িতেও তো চারটের সময় ঘন্টা বেজেছিল | অবশ্য যুক্তিবাদী পাটকু প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে ব্যাপারটাকে কাকতলীয় ভেবে মন থেকে উড়িয়ে দিল | কিন্তু তার মনে একটা প্রশ্ন রয়েই গেল - ঘড়ির অচল ঘন্টা চারটের সময় বাজল কিভাবে ? অবশ্য এসব নিয়ে সে কাউকে কিছু বললও না |

এর পরের ঘটনা ঘটল একমাস পরে | রুমু মেয়েকে নিয়ে আগের দিন বাপের বাড়ী গেছে | পাশের পাড়াতেই তার বাপের বাড়ী | রুমুর কাকা খুব অসুস্থ - হসপিটালাইজড্ | বেলা এগারোটার সময় ঘড়িটা ঢং ঢং করে বাজতে লাগল | আর তার দশমিনিট বাদে রুমুর কান্নাভেজা গলায় তার কাছে ফোন এল - কাকা আর নেই | এগারোটার সময় ডাক্তারদের সব প্রচেষ্টাকে ফেল করিয়ে উনি জীবনের পরপারে চলে গেছেন | এবার কিন্তু ভীষণ ঘাবড়ে গেল পাটকু !

পাটকু নিজেই সাগরের সঙ্গে দেখা করে তাকে সব কিছু জানাল | সাগর ভাল বন্ধু বলতেই হবে | এত অপমানের পরও সে পাটকুকে সদোপদেশ দিল- " আমি ঘড়িটা দেখেই বুঝেছিলাম ওটা অত্যন্ত অশুভ | যত তাড়াতাড়ি পারিস, ঘড়িটা বিদায় কর | " পাটকু সেদিনই বিকেলে মিঃ দাশগুপ্তর দোকানে গিয়ে তাকে বলল যে সে ঘড়িটা ফেরত দিতে চায় | প্রথমে মিঃ দাশগুপ্ত খুব অবাক হলেন | পাটকু তাকে ঘড়ি বিক্রী করার কোন কারণ বলে নি | কিন্তু যখন তিনি দেখলেন যে পাটকু বাড়ীতে ঘড়ি আর রাখবেই না বলেই মনস্থির করেছে, তখন তিনি বললেন, " আমাকে একটু সময় দিন মিঃ সেনগুপ্ত | এত দামী ঘড়ি, খদ্দের পেতেও তো সময় লাগবে |" এই বলে তিনি মোবাইলে ঘড়িটার একটা ছবি তুলে নিলেন | আর পাটকুকে জানালেন খদ্দের এবং উপযুক্ত দাম পেলেই তিনি পাটকুকে ফোন করবেন | অগত্যা বিরসমনে পাটকু সেখান থেকে চলে এল |

ইতিমধ্যে প্রায় একমাস কেটে গেছে | মিঃ দাশগুপ্তর কাছ থেকে কোন ফোন আসে নি | ঘড়িটা মোট তিনবার বেজেছে | একদিন বিকেল পাঁচটার সময়, একদিন রাত আটটার সময় আর একদিন দুপুর দুটোর সময় | পাটকু খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছে ঐ সময়গুলোতে একদিন পাড়ার একজন যুবক ডেঙ্গুতে আর বাড়ীর সামনের বড় রাস্তায় প্রতিবেশী একজন বাস অ্যাক্সিডেন্টে মারা যায় এবং পাড়ার একজন টিনেজার কিশোরী ব্যর্থ প্রেমের কারণে সুইসাইড করে | আর একটা জিনিস পাটকু লক্ষ্য করেছে - রুমু যখন ঘরে থাকে না, সেই রকম মুহুর্তেই ঘড়ির ঘন্টা বেজেছে |

পাটকু অস্থির হয়ে ওঠে | তার ঘড়ি মূর্তিমান শয়তানের ঘড়ি ! যখন সে বাজে, তখনই প্রতিবেশী কারও না কারও মৃত্যু হয় | পাটকুর কাছে ওই ঘন্টিধ্বনি ভয়াবহ ও ভীতিপ্রদ | সে ঠিক করল ঘড়িটা মিঃ দাশগুপ্তর দোকানে দিয়ে আসবে | কেউ কেনে ভাল, যদি দাম নাও পায়, তবু ভাল | কিন্তু মৃত্যু ঘোষণার এই যন্ত্রদূতকে সে আর ঘরে রাখবে না !

সিদ্ধান্তমত পাটকু পরদিনই ঘড়িটা বগলদাবা করে মিঃ দাশগুপ্তর দোকানে বিকাল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ হাজির হল | তাকে দেখে মিঃ দাশগুপ্ত একগাল হেসে বললেন, " আসুন মিঃ সেনগুপ্ত | আপনাকে আমি এখুনি ফোন করতে যাচ্ছিলাম | একজন খদ্দের পাওয়া গেছে | অ্যামেরিকান টুরিস্ট | দুদিন কলকাতায় আছেন | ছবি দেখে পছন্দ হয়েছে | দাম দিয়েছেন একলাখ দশ | আমি কিন্তু টোয়েন্টি পার্সেন্ট নেব আগেই বলে দিচ্ছি |"

অ্যামেরিকান ভদ্রোলোককে ফোন করা হল | উনি আধঘন্টার মধ্যে হাজির হলেন | ঘড়ির ছবি আগেই দেখেছিলেন, এবার চাক্ষুস জিনিসটা দেখে তিনি আনন্দে নেচে উঠলেন | পাটকুকে একলাখ দশ হাজার টাকা নগদ দিয়ে তিনি ঘড়িখানি কিনে বগলদাবা করে বিদায় নিলেন | পাটকুকে অবশ্য বাইশ হাজার টাকা মিঃ দাশগুপ্তকে গুনে দিতে হল | তাতে তার কোন দুঃখ নেই | আপদ বিদায় হয়েছে এবং তার কোন আর্থিক ক্ষতি হয় নি, এতেই সে মহাখুশী |

পরদিন সকালেই খবরের কাগজ খুলে একটা খবর পড়ে থ হয়ে গেল পাটকু | গতকাল সন্ধ্যা সাতটায় পিটিএসের সামনে এক অ্যামেরিকান পর্যটকের পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে | ভদ্রলোক একখানা অ্যান্টিক সুইস ঘড়ি বগলে করে তাজবেঙ্গল হোটোলের দিকে যাচ্ছিলেন, যেখানে তিনি গত দুদিন ধরে উঠেছিলেন | দ্বিতীয় হুগলী ব্রীজগামী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তাকে ধাক্কা মারে | দুর্ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় আর ঘড়িটাও চিঁড়ে চ্যাপটা হয়ে ভেঙে যায় | প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ অনুযায়ী দুর্ঘটনার আগের মুহুর্তে ঘড়িটা সাতবার বেজেছিল |

প্রতিশোধ

- মিঠু চক্রবর্তী আচার্য্য

শুভ্রজিৎ ছিল গ্রামের গর্ব। শুধু লেখা পড়ায় না, সব ধরণের খেলাধুলাতেও ও ছিল চৌখস। তাছাড়া, ওর মনটা ছিল খুব সুন্দর- সকলের বিপদে আপদে ঝাঁপিয়ে পড়তো। সবাই তাকে শুভ্র বলে ডাকতো। শুভ্রর বাবা, অলোক চক্রবর্তী ছিলেন গ্রামের পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। উনিও খুব ভালো মানুষ ছিলেন, তবে একটু রাশভারি প্রকৃতির। গ্রামের যে কোন ব্যাপারে শলাপরামর্শে, সবাই ওনার সাহায্য নিত।

শুভ্র ক্লাস থ্রি থেকে আমাদের স্কুলে পড়ছে। তখন থেকেই ও আমার খুব ভাল বন্ধু। ও খুব মিশুকে বলে, ক্লাশের সব ছেলের সঙ্গেই ওর বেজায় ভাব। আর পড়াশোনায় ও খুব ভালো বলে মাস্টারমশাইরা ওকে খুব ভালবাসতেন। আমাদের স্কুল ছিল কো এড।

একদিনের একটা ঘটনা বলি। ক্লাশ চলাকালীন কেয়া বলে একটা মেয়ে হঠাৎ ই মাথা ঘুরে পড়ে গেল আর তাতে ক্লাশে একটা হুলুস্থুলু কান্ড বেঁধে গেল। সকলে তাকে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। মেয়েটির চোখে মুখে জল দিয়ে ওকে কিছুটা সুস্থ করে তোলা গেল। তখন ক্লাসটিচার ওকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি এখন ঠিক আছো তো?" কেয়া বলল, " স্যার, আমার শরীরটা একদমই ভালো লাগছে না। আমি কি বাড়ি যেতে পারি?" তখন স্যার আমাকে আর শুভ্রকে বললেন কেয়াকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসতে। শুভ্র কেয়াকে শুধাল," কিরে কেয়া, তুই সাইকেলে বসতে পারবি তো?" কেয়া ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। কেয়া শুভ্রর সাইকেলের পিছনের কেরিয়ারে বসল আর আমি আমার সাইকেলে চেপে ওদের আগে আগে চললাম কেয়াদের বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমি কেয়ার বাড়ি চিনতাম। আমাদের স্কুলের একটু আগেই বিস্তীর্ন চাষের জমি পড়ে। সেইসব জমির মাঝখান দিয়ে রাঙা মাটির উঁচু রাস্তা। রাস্তার দুধারে বাবলা, কৃষ্ণচূড়া গাছের সারি। কৃষ্ণচূড়া গাছগুলো লাল ফুলে ছেয়ে গেছে - সে এক অতি মনোরম চোখ জুড়ানো দৃশ্য। চলতে চলতে হঠাৎই আমার চোখ চলে গেল পিছনে শুভ্রজিতের সাইকেলের দিকে আর আমি থ হয়ে গেলাম। দেখলাম, কেয়া সাইকেল থেকে রানিংএ লাফিয়ে নেমে মাঠের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে। শুভ্র বোধহয় কিছু বুঝতে পারেনি, আমি চিৎকার করে ওকে থামতে বলে কেয়ার দিকে ওর দৃকপাত করালাম। আমরা দুজনেই অবাক হয়ে দেখলাম কেয়া একা একা ক্ষেতের আলের ওপর দিয়ে সাঁই সাঁই করে দৌড়াচ্ছে।

আমরা দুজনেই চিৎকার করে ওকে ডাকলাম - "এই কেয়া, দাঁড়া, দাঁড়া বলছি।" কিন্তু কেয়া যেন আমাদের কথা শুনতেই পেল না। আমরা দুজনেই অবাক হয়ে ভাবছিলাম, যে মেয়েটা একটু আগে এতটাই অসুস্থ ছিল যে তাকে আমরা বাড়ি পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলাম। আর সে এখন কেমন করে হরিণীর মত হাল্কা পায়ে আলের ওপর দিয়ে ছুটে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন এই আলের পথ ওর খুব চেনা, ও যেন রোজ এই পথ দিয়ে যাতায়াত করে। ও আমাদের কথা শুনছিল না, তাই আমরা বাধ্য হয়ে সাইকেলদুটো রেখে ওর পিছন পিছন দৌড়াতে লাগলাম। আর চিৎকার করে ওকে থামতে বলছিলাম। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ ছোটার পর হঠাৎ কেয়া কিছুতে হোঁচট খেয়ে যেন গড়িয়ে মাঠের মধ্যে একটা নিম গাছের তলায় পড়ে গেল। ওকে উদ্ধার করতে ওর কাছে যেতেই ও আমাদের চিৎকার করে বলল, " কে তোমরা? তোমাদের তো আমি চিনি না । ও বাবা, বাবা, এরা কে, এরা এখানে কি করছে?" আমরা অবাক হয়ে দেখলাম কেয়ার চোখদুটো জবা ফুলের মতো টকটকে লাল হয়ে উঠেছে আর চোখের মণিদুটো থেকে যেন আগুন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। প্রচন্ড রাগে তার সমস্ত শরীরটা কাঁপছিল আর সে চিৎকার করে বারবার বলছিল," আমি তোমাকে ছাড়ব না নিশিকান্ত, কিছুতেই না।"শুভ্র আমায় জিজ্ঞাসা করল," নিশিকান্ত কে?" আমি বললাম," কেয়ার কাকা।" এইভাবে কিছুক্ষণ চিৎকার করার পর কেয়া নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ।

কেয়ার ব্যাগে জল ছিল। সেখান থেকে খানিকটা জল কেয়ার চোখে মুখে ছিটিয়ে দিলাম আর ওকে একটু জলও খাওয়ালাম। কিছুক্ষণ পর একটু সুস্থ হলো কেয়া। আমরা দুজনেই ওকে জিজ্ঞাসা করলাম,"কিরে, এখন কেমন লাগছে?" ও বলল,"ভালো।" তারপর লজ্জা পেয়ে বলল,"আমি এখানে কি করে এলাম? এটা তো আমাদের বাড়ির পথ নয়। আর আমি এখানে শুয়ে আছি কেন?" আমরা তখন ওকে বললাম," চল, আগে রাস্তায় উঠি। তারপর সব বলবো।"

আমরা তিনজন রাস্তায় উঠলাম। শুভ্র কেয়াকে বলল ,"সাইকেলে ওঠ।" ও বলল,"না রে, আমার খুব ক্লান্ত লাগছে। যদি একটু হাঁটি, তোদের কি খুব অসুবিধা হবে?" আমরা বললাম,"না, ঠিক আছে, তাই চল।" কেয়াকে সত্যিই খুব ক্লান্ত দেখাচ্ছিল, ওর ফর্সা মুখটা কেমন যেন সাদাটে ফ্যাকাসে দেখাচ্ছিল। চুলগুলো এলোমেলো লাগছিল, জামায় ধুলো লেগেছিল। এমনিতে কেয়া খুব পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন স্বভাবের এবং পরিপাটি থাকতে ভালবাসে। শুভ্র কেয়াকে জিজ্ঞাসা করল সে হঠাৎই মাঠে নেমে গেছিল কেন। সে বলল," আমি নিজেও জানি না রে। আমার শুধু মনে আছে আমি তোর সাইকেলের পিছনে বসে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আমার মাথাটা ঝিমঝিম করতে আরম্ভ করল। সারা গায়ে একটা অদ্ভুত ঠান্ডা বাতাসের শিরশিরানি অনুভব করলাম, চোখদুটো যেন বুজে আসছিল। তারপর কিছু মনে নেই। যখন চোখ খুললাম, দেখলাম মাঠে শুয়ে আছি আর তোরা আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছিস। বছরখানেক হল আমার কি যেন একটা রোগ হয়েছে। হঠাৎ হঠাৎ কখন যে কি করে ফেলি, কোথায় যাই, কিচ্ছু মনে থাকে না। এখন আর আমি আগের মত প্রাণ খুলে হাসতে পারিনা, খেলতে পারিনা, বন্ধুরা বলে আমি যেন কিরকম হয়ে যাচ্ছি। ওদের কোন কথার উত্তর আমি দিতে পারি না। বাবা আমাকে ডাক্তার দেখিয়েছে, ডাক্তার অনেক পরীক্ষা করিয়েছে, অনেক ওষুধ দিয়েছে, কিন্তু কিছুতেই ভাল হচ্ছি না। আমি আড়াল থেকে বাবা মার কথা শুনেছি, ওরা খুবই চিন্তিত আমাকে নিয়ে। মা তো প্রায়ই কান্নাকাটি করে। মা সেদিন বাবাকে বলছিল,"আমাদের ফুলের মত প্রাণবন্ত মেয়েটা দিন দিন কেমন শুকিয়ে যাচ্ছে। " ইতিমধ্যে আমরা কেয়াদের বাড়ির সামনে এসে পড়লাম। কেয়া বলল,"ঐ যে আমাদের বাড়ি।" আমি এর আগেও কেয়াদের বাড়িতে এসেছিলাম। কিন্তু শুভ্র এই প্রথম এল। কেয়াদের বাড়ির ভিতর ঠিক গেটের পাশেই একটা মস্ত বড় কৃষ্ণচূড়া ফুল গাছ আছে। কিন্তু কি অদ্ভুত, এবার গাছটিতে একটাও ফুল দেখলাম না, কেমন যেন ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে গাছটাকে। আশেপাশে আরো কয়েকটি কৃষ্ণচূড়া গাছ লাল ফুলে ভরে আছে। ওদের বাড়িতে গাছের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সর্বক্ষণের একজন মালি রয়েছে। তাহলে ঐ গাছটির এমন দশা কেন? আমি অবশ্য কেয়াকে এসব কিছু বললাম না।

বাড়িতে ঢুকে কেয়া কলিং বেল বাজাল। কিছুক্ষণ পর, ওর মা এসে দরজা খুললেন আর কেয়া সহ আমাদের দেখে খুব ঘাবড়ে গেলেন। তারপর কেয়াকে বললেন "কিরে, তোর কিছু হয়েছে নাকি? তোকে এমন দেখাচ্ছে কেন ? তোর কি আবার শরীর খারাপ হয়েছে যে স্কুল থেকে চলে এলি?" কেয়া বলল," হ্যাঁ মা, স্কুলে আমার শরীরটা হঠাৎই খুব খারাপ হয়ে গেছিল। তাই মাস্টারমশাই ওদের দিয়ে আমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। মা, তুমি তো অর্ককে চেনোই, আর ও হচ্ছে শুভ্রজিৎ। আমরা একই ক্লাসে পড়ি।" কেয়ার মা বললেন," এসো বাবা, তোমরা ভেতরে এস।"

দিন দিন কেয়ার শরীর খারাপ হতে লাগল। প্রায়ই ঐরকম অসুস্থ হয়। অর্থাৎ হঠাৎ হঠাৎ মাথা ঘুরে পড়ে যায়। তারপর তার কাকার উদ্দেশ্যে প্রতিশোধমূলক হুমকি দেয়। তার খাওয়া দাওয়া একদম কমে গেল, কারো সাথে বিশেষ কথা বলতো না। ক্রমে ক্রমে সে স্কুলে আসাও বন্ধ করে দিল। সব সময় শুধু ওদের গেটের কাছে মৃতপ্রায় কৃষ্ণচূড়া গাছটার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতো। ঐ গাছটা ওর খুব প্রিয় ছিল, কেননা ঐ গাছটি ও নিজের হাতে লাগিয়েছিল, নিয়মিত ঐ গাছের গোড়ায় জল দিত। আর একটা জিনিস সবাই লক্ষ্য করল, যে কেয়ার সব থেকে আবদার ও আদরের মানুষ ছিল তার কাকা, ও সেই কাকাকেই দেখলেই কেমন যেন বিরক্ত হতো | কাকা তাকে কতো অনুনয় করতো ," মামণি তোর কি হয়েছে, তুই আর আগের মত আমার সঙ্গে কথা বলিস না কেন ? আমার কাছে কোন বায়না করিস না কেন ?" কিন্তু কেয়া কোন উত্তর দিত না, আরো বিরক্ত হতো আর চুপ করে থাকতো |

সব দেখেশুনে কেয়ার মা কেয়ার বাবাকে বললেন," এইভাবে চলতে থাকলে মেয়েটা শেষ হয়ে যাবে গো |" কেয়ার বাবা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে গুরুপদকে ডাকলন এবং তাকে বললেন ,"তুই কালকেই তোর গ্রামে গিয়ে সাধুবাবাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আয় |" উত্তরে গুরুপদ বললো," ঠিক আছে কর্তা, তাই হবে | দিদিমণিরে আর চোখে দেখা যাচ্ছে না | মাঠাকুরণও সব সময়ই কেঁদেই চলেছে |" গুরুপদ পরেরদিনই ভোরভোর তার গ্রামের উদ্দেশ্য বেরিয়ে পড়ল এবং বিকেলের মধ্যে সেখানে পৌঁছে গেল | পরদিন সকালবেলায় সে সাধুবাবার সঙ্গে দেখা করে তাকে সবিস্তারে সব ঘটনা বলল এবং ঐদিনই বাবাকে সঙ্গে করে কেয়াদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল | যখন তারা কেয়াদের বাড়ীর কাছাকাছি এসে পৌঁছালো, তখন সূর্য পশ্চিম আকাশে প্রায় অস্তমিত, আকাশের একদিক সিঁদুরে লাল রঙে রঞ্জিত, আর একদিক কালো ধূসর বর্ণ ধারণ করেছে | তারা কেয়াদের গেটের কাছে আসতেই সাধুবাবা মৃতপ্রায় কৃষ্ণচূড়া গাছটিকে দেখে যেন চমকে উঠে থমকে দাঁড়ালেন | তারপর গুরুপদকে জিজ্ঞাসা করলেন, " এই গাছটার কবে থেকে এই রকম অবস্থা হয়েছে ?" গুরুপদ বললো," সাধুবাবা, প্রায় এক বছর ধরে এরকম অবস্থায় আছে | আগে এই গাছটায় অনেক ফুল ফুটতো | কিন্তু কেন জানিনা, গাছটা দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছে | " শুনে সাধুবাবা গম্ভীর হয়ে গেলেন, গুরুপদকে বললেন," চলো, বাড়ির ভেতরে যাওয়া যাক |"

সাধুবাবাকে কেয়ার মা সাদরে অভ্যর্থনা করে বাড়ির ভেতরে নিয়ে গেলেন | সাধুবাবা ঘরে ঢুকেই কেয়ার মাকে জিগ্গাসা করলেন," মা তোমার মেয়ে কোথায় ?" উত্তরে কাকিমা বললেন,
" বাবা, ও নিজের ঘরে শুয়ে আছে |" উনি বললেন, " আচ্ছা আমাকে নিয়ে চল সেখানে |" " চলুন বাবা |" কেয়া ওর বিছানায় শুয়ে ঘুমাচ্ছিল | সাধুবাবা সবাইকে ইশারায় ঘরের বাইরে থাকতে বলে নিজে ঘরে প্রবেশ করলেন | তারপর ঘুমন্ত কেয়ার মাথায় আলতো করে হাত রেখে বললেন," বেটি, বেটি.." কেয়া হঠাৎই ধড়মড় করে সোজা হয়ে বিছানায় উঠে বসলো | তারপর সাধুবাবার দিকে কটমট করে তাকিয়ে রইলো | তার চোখ দিয়ে তখন যেন আগুন ঠিকরে বেরাচ্ছে | সাধুবাবা আবার সস্নেহে কেয়ার মাথায় হাত রেখে স্মিতস্বরে বললেন, "বেটি" | কেয়া এক ঝটকায় সাধুবাবার হাত তার মাথা থেকে সরিয়ে দিল | সাধুবাবা এরপর আর কিছু বললেন না, ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন |

সেই রাতে সাধুবাবা কেয়া বাদে সবাইকে ডেকে আলোচনায় বসলেন | সাধুবাবা বললেন, " দেখ আমি যা বুঝেছি, তা হলো কেয়া বেটির ওপর এক অশুভ আত্মা ভর করে আছে | আর বেশী দেরি করা যাবে না | পরশুদিন অমাবস্যার আগেই আমাদের যা করার করতে হবে | না হলে ওকে আর বাঁচানো যাবে না |" এ কথা শুনে কেয়ার মা হাঁউমাউ করে কেঁদে উঠলেন | উপস্থিত বাকিদের চোখও ছলছল করে উঠলো | সাধুবাবা সে সব লক্ষ্য করে বললেন, " ঘাবড়াবেন না | কালই আমি এর প্রতিকারের ব্যবস্থা করব | কতগুলো জিনিস বলে দিচ্ছি, সেগুলো সকালেই নিয়ে আসবেন | আর কেয়ার বয়সী কোন সদ্ ব্রাহ্মণ পুত্রকে ঐ অনুষ্ঠানে থাকতে হবে | আপনারা এগুলোর আয়োজন করুন | আমি আগামীকাল সূর্যাস্থের পর যজ্ঞে বসবো |"

কেয়ার মা সাধুবাবাকে জিগ্গাসা করলেন," সদ্ ব্রাহ্মণ বালককে দিয়ে কি হবে বাবা, আর তাকে চিনবোই বা কেমন করে ?" সাধুবাবা বললেন," এই যজ্ঞে সদ্ ব্রাহ্মণ বালকের প্রয়োজন এই কারণে যে তার শুদ্ধ এবং পুণ্যাত্মার উপস্থিতি,অশুভ আত্মাকে, তোমার মেয়ের ক্ষতি করা থেকে বিরত রাখবে | সেই সদ্ ব্রাহ্মণ বালককে দেখতে হবে শান্ত, সৌম্য, স্নিগ্ধ; সে স্বভাবে হবে সহজ, সরল |" একথা শুনে কেয়ার মার প্রথমেই শুভ্রর কথা মনে পড়ে গেল | কিন্তু তার বাবা মা রাজি হবে কি ? পরেরদিন কেয়ার বাবা মা সাত সকালেই শুভ্রদের বাড়ি গেলেন এবং শুভ্রর বাবা মাকে সমস্ত ঘটনাটা বলে সনির্বন্ধ অনুরোধ করলেন যে যজ্ঞের সময় যেন তাঁরা শুভ্রকে ওখানে থাকার অনুমতি দেন | শুভ্রর মা প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না, কিন্তু পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে শুভ্রর বাবা রাজি হলেন | ওদের বললেন, বিকেলের মধ্যে উনি শুভ্রকে নিয়ে কেয়াদের বাড়িতে উপস্থিত হবেন |

সন্ধ্যার সময় কেয়াদের বড় হলঘরটাতে যজ্ঞ শুরু হল | তখন সেখানে উপস্থিত কেয়ার বাবা, মা , কাকা, কেয়া, গুরুপদ, শুভ্র, শুভ্রর বাবা, সাধুবাবা আর আমি | একটা ডিম লাইট বাদ দিয়ে ঘরের সব লাইট নিভিয়ে দেওয়া হলো | যজ্ঞের বেদির পাশে নানারকম উপাচর সাজানো | সাধুবাবার নির্দেশ মত কাকিমা কেয়াকে কোলে নিয়ে বসলেন | আমরা সবাই মাটিতে আসন গ্রহণ করলাম | কেয়ার মুখোমুখি উল্টোদিকে শুভ্র বসলো | চারদিকে একটা থমথমে পরিবেশ, একটা অনিশ্চয়তা সবার মনেই উঁকি দিচ্ছে | প্রাথমিক উপাচার সেরে সাধুবাবা কেয়ার দিকে ফিরলেন | তারপর, কেয়ার কপালে হোমের ভস্মের একটা টিকা এঁকে দিলেন | তারপর তার মাথায় হাল্কা ভাবে ডান হাতটা রাখলেন | এতক্ষণ কেয়া লক্ষ্মী মেয়ের মত মায়ের কোলে বসেছিল, আর শুভ্রর দিকে চেয়ে পিটপিট করে হাসছিল | সহসা তার ভাবের পরিবর্তন ঘটল আর সে অস্থিরভাবে মায়ের কোলে কেমন যেন ছটপট করতে লাগল | সাধুবাবা কেয়ার মাথায় হাত রেখে অনেক্ষণ কি সব মন্ত্রোচ্চারণ করতে লাগলেন আর তারপর কেয়ার দিকে স্থিরভাবে চেয়ে বললেন, " বল মা তুই কে? কেন বাচ্চা মেয়েটার ওপর তুই ভর করেছিস ? কেন ওকে আর ওর বাড়ির লোকজনদের এত কষ্ট দিচ্ছিস? আমি কথা দিচ্ছি, তোর ওপর কোন অন্যায় হয়ে থাকলে তার প্রতিকার আমি করব | বল মা বল, চুপ করে থাকিস না |"

কেয়ার মধ্যে বিশাল একটা পরিবর্তন দেখা দিল | সে মুহুর্তের মধ্যে তার মায়ের কোল ছেড়ে উঠে দাঁড়াল | তার চোখগুলো যেন ভাটার মত জ্বলছে | মুখে একটা হিংস্রভাব যা তার বালিকাসুলভ চেহারার সঙ্গে একেবারেই বেমানান | সে সটান কটমট করে নিশিকান্তের দিকে তাকিয়ে বলল," আমি ঐ শয়তানটাকে ছাড়ব না, ওকে আমি মারতে এসেছি " শুভ্র এতক্ষণ উসখুশ করছিল, এবার সে ও উঠে এসে কেয়ার মুখোমুখি দাঁড়াল আর তাকে এক ধমক দিল," এই কেয়া, তোর মাথার ঠিক আছে তো ? কাকে কি বলছিস খেয়াল রাখ |" শুভ্রর ধমকে কেয়া হঠাৎ থতমত খেয়ে গেল, তারপর টলতে লাগল, এবং হঠাৎই টলতে টলতে মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে গেল | সবাই ছুটে এল তাকে তুলতে | কিন্তু সাধুবাবা সবাইকে নিষেধ করলেন | তারপর নিজে গিয়ে কেয়াকে মাটি থেকে তুলে ওর চোখেমুখে ক্রমাগত মন্ত্রপূতঃ জল ছেটাতে লাগলেন | তাতে কেয়ার জ্ঞান ফিরে এল | কিন্তু তার চোখের হিংস্রভাবের কোন পরিবর্তন হলো না | সাধুবাবা আবার তার মাথায় স্নেহভরে হাত রেখে বললেন," বল মা, তোর দুঃখের কথা আমরা শুনবো | কিন্তু কেয়ার কোন ক্ষতি করিস না |"

ইতিমধ্যে লক্ষ্য করলাম কেয়ার গলার স্বর ভেঙে গেছে, একটা ঘড়ঘড়ে কন্ঠস্বরে সে বলতে লাগল, " আমার নাম পার্বতী | বাবার নাম হারাণ দলুই | বাবা মা বড় সখ করে আমার নাম পার্বতী রেখেছিল কারণ তারা ভাবতো আমি দেবী দূর্গা, তাদের বাড়িতে মেয়ে হয়ে এসেছি | আমরা চাষী পরিবার, সংসারে অভাব অনটন ছিল, কিন্তু আমরা সুখী ছিলাম | আমার মা হঠাৎই এক কঠিন অসুখে পড়ে | তখন মায়ের চিকিৎসা চালানোর জন্য বাবা এই নিশিকান্তের থেকে অনেক টাকা সুদে ধার করে | কিন্তু মাকে শেষ পর্যন্ত বাঁচানো যায় নি | মার মৃত্যুর পর আমি বাবার কাছেই মানুষ হতে লাগলাম | তাও কষ্টে দুঃখে আমাদের দিন চলে যাচ্ছিল | হঠাৎই আমারও শরীর খারাপ হতে শুরু করলো | সব সময় কাশি, একটু পরিশ্রম করলে হাঁপিয়ে উঠি | শরীর ভীষণ দুর্বল | বাবা ডাক্তার দেখালো | জানা গেল আমার হার্টে ফুটো আছে আর একটা ভালভ ও খারাপ | ডাক্তার বলল খুব তাড়াতাড়ি অপারেশন করাতে হবে, নইলে আমি বাঁচব না | প্রায় দু লাখ টাকা খরচ | বাবা নিশিকান্তের কাছে গেল ঐ টাকাটা ধার চাইতে | আগের সব টাকা বাবা তখনও শোধ দিতে পারে নি | নিশিকান্ত তাই অজুহাত দেখিয়ে বলল যে তার কাছে অত টাকা নেই | বাবা নিশিকান্তের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগল, বলল এই টাকাটা না পেলে তার মেয়েকে বাঁচানো যাবে না | কিন্তু কোনমতেই চিঁড়ে ভিজলো না | বাবা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরে এল | ইতিমধ্যে আমি গুরুতর অসুস্হ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলাম | সাতদিন প্রচন্ড ভুগে হাসপাতালেই মারা গেলাম | আমার মৃত্যুতে বাবা ভীষণ ভেঙে পড়ল | মা অনেকদিন নেই, আমি মরলাম, বাবার খালি মনে হত তার পার্বতীমাকে সে রক্ষা করতে পারে নি | অবসাদে ভুগতে ভুগতে একদিন সে ফলিডল খেয়ে আত্মহত্যা করলো |"

কেয়া হাঁপাচ্ছিল | একটু দম নিয়ে সে আবার তার কাকার দিকে ফিরে বলতে লাগল," ঐ লোকটার জন্য আমি আর আমার বাবা মরলাম | ও যদি আমার বাবাকে সে সময় কিছু টাকা ধার দিত, তাহলে ঐ টাকায় আমার অপারেশন হয়ে যেত | আমাকে মরতে হতো না, আর তাহলে আমার বাবাও মরতো না | ও অতি নিষ্ঠুর মানুষ | তাই ঠিক করলাম আমাদের মৃত্যুর বদলা নেব | ওর ভাইঝি একদিন আমাদের গ্রামের মধ্যে দিয়ে আসছিল | সুযোগ বুঝে ওর ওপর ভর করলাম | তারপর থেকেই বাচ্চাটাকে তিলে তিলে শেষ করে দিচ্ছি | কোন ডাক্তারই ওকে বাঁচাতে পারবে না | নিশিকান্ত ভাইঝিকে ভালবাসে | এবার সে বুঝুক কন্যা হারানোর যন্ত্রণা | ওর ভাইঝিকে তো শেষ করবোই, ওরও ঘাড় মটকাবো | আর এতেই আমার বাবার আত্মা শান্তি পাবে |"

চারিদিকে পিনড্রপ সাইলেন্স | শুধু কেয়ার খুনী দৃষ্টি তার কাকার ওপর নিবদ্ধ | এর মধ্যে কেয়ার কাকা হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন, তারপর বললেন," মেয়েটি যা বলছে তা পুরোটাই সত্যি | পার্বতীর মার চিকিৎসার জন্য হারাণ অনেক টাকাই ধার নিয়েছিল, যার বেশীরভাগটাই সে ফেরত দিতে পারে নি | তাই এবার যখন পার্বতীর চিকিৎসার জন্য হারাণ টাকা ধার চাইল, তখন দিতে রাজি হই নি | এতগুলো টাকা হারাণ শোধ করবে কি করে ? তাছাড়া আমার মনে হচ্ছিল অজুহাত দেখিয়ে ধার করা হারাণের একটা স্বভাব | তখন তো বুঝতে পারি নি যে হারাণ সত্যি কথাই বলেছে | এক বছর আগে আমি পার্বতী আর হারাণের মৃত্যুর খবর পেয়েছিলাম | তারপর থেকে আমি যে কি বিবেক যন্ত্রণায় জ্বলে মরেছি সে শুধু ভগবান আর আমি জানি !" তারপর নিশিকান্ত কেয়ার দিকে ফিরে হঠাৎ করে বলতে লাগলো," আমার ওপর প্রতিশোধ নেবার জন্যই তো তুই আমার ভাইঝির ওপর ভর করেছিস, তাই না ? তুই ওকে ছেড়ে দে, আমাকে মেরে ফ্যাল | তোদের মৃত্যুর জন্য আমি দোষী, আমার ভাইঝি নয় | ওকে আমি আমার মেয়ের চেয়ে ও বেশী ভালবাসি | আমার যা কিছু আছে, ভবিষ্যতে সব ওর হবে | কিন্ত ওর কিছু হয়ে গেলে আমরা বাঁচব না | হাতজোড় করে বলছি, ওকে তুই ছেড়ে দে, যা ক্ষতি করার আমার তুই কর |"

নিশিকান্তের এই আকুতি শুনে কেয়া পাগলের মত অট্টহাস্য করে উঠলো | কি নিষ্ঠুর, অমানবিক সেই হাসি - " কক্ষণো না | আমার বাবা যে ভাবে তিলেতিলে কষ্ট পেয়ে মরেছে, তোর ভাইঝির মৃত্যুর পর তোরাও সেই কষ্ট অনুভব করবি | এটাই আমার প্রতিশোধ | আর সবশেষে আমার হাতে মরবি তুই | তার আগে, তোদের যা কিছু ভাল, পছন্দের, সব আমি ছারখার করে দেব | যেমন, তোর আদরের ভাইঝির শখের কৃষ্ণচূড়া গাছটা আমি পুড়িয়ে ছারখার করে দিয়েছি, তেমনি সব কিছু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভস্ম করে দেব |"

এই প্রথম সাধুবাবাকে ক্রুদ্ধ হতে দেখলাম," আমাকে তুই রাগাস না পার্বতী | নিশিকান্ত তো বলেইছে যে সে জেনে বুঝে কিছু করে নি | তবু তুই তাকে ক্ষমা করতে পারছিস না কেন ? আসলে তোদের বাপ বেটির কপালে বিধি অকাল মৃত্যু লিখেছিলেন | কেয়া, কেয়ার বাবা মা তো কোন দোষ করেনি | তবে সবাইকে তুই এত কষ্ট দিচ্ছিস কেন ? আমি বলছি, তুই কেয়াকে ছেড়ে চলে যা | কথা দিচ্ছি তোদের বাপ বেটির আত্মার শান্তির জন্য গয়ায় পিন্ডদান করবো আমরা |" শুভ্র দেখলাম ইতিমধ্যে উঠে দাঁড়িয়ে কেয়ার সামনে এসে তার চোখের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল," তুমি যেই হও, আমাদের বন্ধুকে ছেড়ে চলে যাও | ইতিমধ্যেই ও আর ওর পরিবারকে অনেক কষ্ট দিয়েছ তুমি |"

শুভ্রর মুখোমুখি হয়ে আর তার কথা শুনে কেমন যেন হকচকিয়ে গেল কেয়া | তার সেই রুদ্র দৃষ্টি আনত হলো, সে কেমন যেন ঝিমিয়ে পড়ল | তারপর আস্তে আস্তে বলল, " ঠিক আছে, আমি চলে যাচ্ছি |" তারপর নিশিকান্তের দিকে ফিরে বলল,
" তোমাকেও আমি ক্ষমা করলাম | কিন্তু আর কোন গরীব মানুষের সঙ্গে এরকম কোরো না |" তারপর সে হঠাৎই উদ্বেলিত কন্ঠে সামনের অদৃশ্য কোন বস্তুকে লক্ষ্য করে বলতে লাগল," দাঁড়াও বাবা, আমি আসছি | " আমরা বুঝতে পারলাম, মরার পরেও হারাণের আত্মা তার মৃত মেয়েকে সর্বদাই আগলে আগলে রাখছে |

পার্বতীর প্রেতাত্মা কেয়ার দেহ ছেড়ে চলে গেল | যাবার সময় কৃষ্ণচূড়া গাছের একটা মোটা ডাল ভেঙে সে জানান দিয়ে গেল যে সে যাচ্ছে | পার্বতীর আত্মামুক্ত কেয়ার জ্ঞানহীন দেহটা কাটা তরুর মত মাটিতে পড়ে যাবার আগেই সাধুবাবা আর নিশিকান্ত তাকে ধরে ফেলল | প্রাথমিক শুশ্রুষার পর কেয়ার জ্ঞান ফিরে এল | তখন সে একেবারেই অন্য মানুষ | শুধু সাধুবাবার নির্দেশে তাকে এই সময়টায় কি ঘটেছিল সেসব বলা হল না | সবাই পুরোনো কেয়াকে ফিরে পেয়ে খুব খুশী | যাইহোক, অনেক রাত হয়ে যাওয়ায় সেদিন আমরা সবাই কেয়াদের বাড়িতে থেকে গেলাম।
পরদিন ভোরবেলায় সাধুবাবা সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন | তার খানিকক্ষণ পরে আমরাও বিদায় নিলাম |

গেট দিয়ে বেরানোর সময় দেখলাম মরা কৃষ্ণচূড়া গাছটায় দুটো লাল ফুল ফুটেছে |

(সমাপ্ত)

বনলতার দেশে

- শীতল আচার্য

বন্ধু কিছু বলতে চাই তোমাকে
বন্ধু, কিছু গল্প হোক সাঁঝ বেলাতে |
বন্ধু, তুমি তো থাকো ভিন দেশে
বন্ধু, তোমাকেই মনে পড়ে কেন বেলা শেষে ?

ইচ্ছা তো করে, ছুটে চলে যাই এক নিমেষে -
যেতে চাই হারিয়ে এক লহমায় সেই দেশে |
যেখানে নদীতীরে বসে তুমি জলছবি আঁকো
যেখানে নাটোরে তুমি বনলতা হয়ে থাকো |

বন্ধু, তোমাকে কোনদিন দেখি নি চোখে -
তবু মনে মনে কত ছবি চলেছি এঁকে |
জেনো, চলে যাব একদিন খুঁজতে তোমাকে,
নাটোরের বিলে আর গাঙ্গুড়ের নদীটির বাঁকে |

স্মৃতির ছেলেবেলা
- সুস্মিতা কুন্ডু ভৌমিক

জীবন পথের পথিক আমরা।
ছেলে বেলা ফেলে এসেছি..
মধুর স্মৃতি..
প্রথম সারিতে বসার স্মৃতি।
প্রথম পড়া বলা।
আর স্কুল ছুটির পর তোমাকে দেখা।
বিদ্যার দেবীর আরাধনার দিন হলুদ শাড়িতে বেণী দুলিয়ে তোমার হাতটি ধরা..
অনুভূতি আনে।
তোমার অনুষ্ঠানের সময় মন্ত্র মুগ্ধের মতো তোমার কথা শোনা..
আজও মনে পড়ে।
তুমি আমার স্মৃতির ছেলেবেলার দুরন্ত প্রেম।

ইচ্ছে কথা
- বিশ্বজিৎ সেনগুপ্ত

অনুপ যখন ছোট ছিল
বলত-
কবে আমি বড় হব কাকু
তোমার মত চাকরী করব?

অনুপ এখন অনেক বড় হয়েছে
চাকরী করছে
ঘরও বেঁধেছে...

অনেকদিন পরে ওদের আড্ডাস্থলের পাশ দিয়ে
যেতে যেতে শুনলাম, কে যেন ওকে জিজ্ঞেস করল-
অনুপ তোমার বয়স এখন কত?
অনুপের উত্তর-
চল্লিশ।

বয়েসটা একটু কমিয়ে বলায় অবাক হলেও
বুঝলাম-
বয়সটা এখন আর ও বাড়তে দিতে চায় না।

আসলে ও এখন পরমায়ুর কথা ভাবে।
@শ্রীসেন

ঘুম হীন রাত
- তাপস দাস

রাত প্রতি রাত জেগে জেগে রই,
একাই নিঝুম রাতের সাথী হই,
যদি এসে ফিরে যাও ঘুমিয়ে পড়েছি দেখে,
যদি ঘুমন্ত দেখে পালিয়ে যাও
আমায় একলা রেখে,
না গো না, প্রিয় সাথী মোর
দু চোখ ঘুমোতে চায়না।
প্রেমেরও লগনে প্রেমিকের ঘুম
শোভা কখনও পায়না।
সে রাখুক না রাখুক কথা,
কিংবা নিজের প্রতিশ্রুতি,
তবুও ঘুমোবোনা,জেগে রবে মোর
ভালোবাসা অনুভুতি।
ঘুমবোনা আজ তুমি না এলে,
তুমিও ঘুমিয়ে যেওনা।
আজ দুজনের ঘুমের হরতাল,
ঘুমবোনা,
তুমি আমি আজ কেওনা।
ঘুম কিসে আসে,কেনো ঘুম আসে
যখন প্রেমের মরশুম।
দুজনের আজ শুধু জেগে থাকা,
আজ চার চোখে নয় ঘুম।

২৮/১১/১৯

আর একবার প্রয়োজন ছিল
- কিরণ মাহমুদ মান্না

তুমি জানো না বঙ্গবন্ধু, তুমি জানো না!
ওরা তোমার স্বপ্নে গড়া সোনার বাংলাকে
কোন জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।
তুমি জানো না বঙ্গবন্ধু, তুমি জানো না।

যেই স্বপ্ন নিয়ে তুমি তোমার
বুকের ভিতর একটা মানচিত্র এঁকেছিলে,
সেই মানচিত্রে ওরা তুলে ধরেছে,
হত্যা, রাহাজানি, দুর্নীতি, কত শত
মা বোন শিশু ধর্ষণের চিত্র।
এদেশ এখন ওদের দখলে,ওদের কবলে।

তুমি জানো না বঙ্গবন্ধু, তুমি জানো না।
যে কৃষককের চোখে মুখে তুমি দেখেছিলে
একদিন আনন্দের উল্লাসের হাসি।
সেই কৃষকের চোখে মুখে
এখন নেমে এসেছে ঘুর অন্ধকার।
কঠোর পরিশ্রমে,রোদে পুড়ে,মাথার ঘাম পায়ে ফেলে,
তোমার এনে দেওয়া এই সোনার বাংলায়
ফসল ফলায়ে পায় তারা তাদের ন্যায্য অধিকার।

তুমি জানো না বঙ্গবন্ধু, তুমি জানো না।
তোমার এনে দেওয়া এই সোনার বাংলার
সোনার ছেলেরা শিক্ষিত হয়েও
পায় না তারা শিক্ষার কোন দাম,
চারট্টে ডাল ভাত খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকার জন্য
পায় না তারা যোগ্যতা অনুযায়ী একটা চাকরি।
কি করে পাবে, ওদের যে মামা খালু নেই!
ফলে,বেকারত্বের ভার বইতে না পেয়ে
জড়িয়ে যাচ্ছে নেশার জগতে,পা বাড়াচ্ছে
অবৈধ যত সব কৃতকর্মে।
আজ, ওরা যদি একটা ভাল চাকরি পেতো,
হয়তো আট দশজন ভাল মানুষের মত,
হতে পারতো মানুষের মত একজন মানুষ।
হতে পারতো একজন বঙ্গবন্ধু।

তুমি জানো না বঙ্গবন্ধু, তুমি জানো না।
ঐ পাকিস্তানি স্বৈরাচারদের হাত থেকে তুমি,
তুমি যেই বঙ্গকে বিশ্বের দরবারে চিনিয়েছো,
সেটা এই আমাদের সোনার বাংলাদেশ।
এখানে সেই বঙ্গ আছে কিন্তু তোমার মত বন্ধু নেই।
আর একবার তোমাকে প্রয়োজন ছিল এই বঙ্গে।

১৫/০৮/২০১৯ ইং
সিঙ্গাপুর থেকে।

#রাঙিয়ে দিয়ে যাও

#দিয়া ঘোষ

"আমার ২৩তম জন্মদিনে আমি মা বাবার কাছে চেয়েছিলাম ওরা যেন কোন দিন আমার বিয়ে দেয়ার চেষ্টা না করে। কারণ আমি মন থেকে বিয়ে জিনিসটার জন্য একেবারে প্রস্তুত ছিলাম না, যদিও আমি আজও মন থেকে তৈরী ন‌ই।"
-"তাহলে আজ এই সাক্ষাৎ কেন তানিয়া?"কফি কাপে চুমুক দিয়ে ঠোঁট থেকে কাপটা নামিয়ে রেখে সোজা সুজি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল আদিত্য।কথার মাঝে এরকম আচমকা প্রশ্ন করায় বিরক্তবোধ করলেও প্রশ্নের আসল ইঙ্গিতটা বুঝতে পারল তানিয়া। চোখ নামিয়ে কফি কাপের হাতলটা আঙ্গুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে লাগল তানিয়া। তার পর তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,"বলতে পারেন নিঃসঙ্গতা কাটাতে বিয়েটা করতে বাধ্য হচ্ছি।"
-"মানে?"
-"মানে বিয়ে করতে আমি আজও চাই না। নিজের জন্য জীবনের যে পথ আমি বেছে নিয়েছিলাম সেখানে বিয়ের কোনো জায়গা নেই। ভেবেছিলাম চাকরি করে সারা জীবন মা বাবার দেখা শোনা করব। কিন্তু চাকরির পর মা নানাভাবে আমাকে জোর করে বিয়ে করতে। চিন্তা করে করে মায়ের শরীর খারাপ হয়ে যায়। আর সত্যি বলতে আমারও একা লাগত। তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম দত্তক নেওয়ার।"
-"খুব ভালো তো। তবে নিলেন না কেন?"
-"আমি অনেক গুলো হোমে গেছি, কিন্তু সব জায়গায় আমি অবিবাহিত বলে প্রত‍্যাখ‍্যান করে।তাতে নাকি শিশুর সংস্কার ঠিক মত হবে না। আমাদের সমাজে এখনও তো single mother সেভাবে গ্ৰহনযোগ‍্য নয়।
তখন আমি বাড়িতে বলি সব জেনে যদি কেউ রাজী হয় তবে আমি বিয়ে করবো।but as usual,কে রাজি হবে বলুন। আমার কথা আশা করি আপনাকে বোঝাতে পেরেছি, সিদ্ধান্ত আপনার।"
কফি শপ থেকে বেরিয়ে গেল দুজনে দুই ভিন্ন পথে।এর আগেও এখানে এসেছে তনু,অনির সাথে। সারা জীবনের অবলম্বন হতে চেয়েছিল। কিন্তু উত্তর এসেছিল,"তুমি একটা খুব সুন্দর ফুল তনু,যার যত্ন আমি ঠিক করতে পারব না।"বছর দুয়েক পরে অনির বিয়ে থেকে ফিরে এসে দরজায় খিল দিয়েছিল তনু। চোখের সামনে ভেসে উঠছিল অনির সাথে কাটানো মূহূর্ত গুলো। আর পাশাপাশি মনে পড়ছিল অনি আর ওর স্ত্রীর পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বৌভাতের অনুষ্ঠান। ফুলসজ্জায় যখন লজ্জায় আরক্ত হচ্ছিল নতুন বৌ, তখনই অন্যদিকে দরজায় খিল দিয়ে চোখের জলের বন‍্যায় ভেসে যাচ্ছিল একজোড়া চোখ,তিলে তিলে গড়ে তোলা স্বপ্নের সংসার। সেই রাতেই তনু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল নিজেকে, ফুল নয়, কাঁটা হয়ে নিজেকে গড়ে তোলার। কারণ তাজা ফুল তো সবাই ভালোবাসে, কিন্তু বাসি ফুল কেউ কাছে রাখে না।
এতগুলো বছর পর আবার সেই একই কফি শপ, একই টেবিলে এক‌ই টপিক, বিয়ে। যেখানে জীবনের সব রং মিশিয়ে সাদা হয়ে গিয়েছিল, আবার সেখান থেকে নতুন জীবন শুরু করতে চায়নি তনু। কিন্তু নিয়তি খন্ডাবে কে!

ট্রেনে প্রচুর ভিড়। মানুষ গুঁতো গুঁতি করছে ট্রেনে। সবেমাত্র কলকাতার কলেজে ভর্তি হয়েছে তনু।ঐ ভীষণ ভিড়ে যদি ট্রেন থেকে নামতে না পারে, সেই জন্য দরজার কাছে দাঁড়িয়েছে।চলন্ত ট্রেনে একবার পিছন দিকে ধাক্কা খেয়ে ওর মাথা গিয়ে লাগলো পিছনে ছেলেটার বুকে।ঐ গিজগিজে ভিড়ে এরকম স্বাভাবিক ঘটনায় গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করল তনু। যথারীতি ট্রেন এসে গেছে প্ল‍্যাটফর্মে। তনু নামতে যাবে সেই সময় চুলে একটা জোর টান পরল। ধাক্কা ধাক্কিতে পিছনে ছেলেটার বুকের বোতামের সাথে আটকে গেছে ওর চুল। জনতার স্রোত মূহুর্তে ওদের দরজা থেকে ঢুকিয়ে দিল ভিতরে। তনু তো ভয়ে নার্ভাস হয়ে গিয়েছে। পিছনের ছেলেটা বলল,"আপনি নামবেন কি করে, আপনার চুল তো আটকে গেছে।"
তনুর চোখ ছলছল করছে। কাঁপা কাঁপা হাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে ফাঁস ছাড়ানোর। ইলেকট্রিক ট্রেন চলতে শুরু করেছে। তনু ভয়ে সাদা হয়ে গিয়েছে। কলকাতার কিছুই তো সে চেনে না। ছেলেটা কিছু আন্দাজ করে বলল,"don't worry, আপনি next স্টেশনে আমার সাথে নামবেন। তার পর আপনি যেখানে যাবেন, আমি নিজে আপনাকে পৌঁছে দিয়ে আসব।"তনু হ্যাঁ না কিছুই বলল না।মা বলেছে,"অচেনা কাউকে বিশ্বাস করবিনা।"কিন্তু এখন তো কোন উপায় নেই। অগত্যা একটা ধন্যবাদ দিয়ে নামল ওর সাথে। ছেলেটা দায়িত্ব সহকারে পৌঁছে দিল তনুকে কলেজে। রাস্তায় জানতে পারল ছেলেটার নাম অনন্য,অনি নামেই পরিচিত। সেই ওদের প্রথম আলাপ। ধীরে ধীরে বন্ধুত্ত্ব, তার পর ভালোবাসা। নিজের অনূভূতির কথা জানাতে, জীবনের প্রথম প্রেমকে স্বীকৃতি দিতে অনিকে ডাকল কফি শপে। কিন্তু অনি বলল,"আমি তো কোন দিন বলিনি যে আমি তোমাকে ভালবাসি।"কাঁপা কাঁপা গলায় তনু বলেছিল,"তাহলে কি সবটাই মিথ্যে?"
-"তুমি ভুল বুঝেছ তনু। প্লিজ আমাকে জোর কোরোনা।"
-"আমি কোনো দিন তোমাকে জোর করতে চাইনা, আজও করবনা।"
বছর দুয়েক পর অনির বিয়ের রিসেপশনে নবদম্পতিকে অভিনন্দন জানিয়ে অনিকে বলে এসেছিল,"কেউ এমনি এমনি ভুল বোঝেনা যদি না তাকে delebarately ভুল বোঝানো হয়।wish u a very happy married life."

আদিত্যর বাড়ি থেকে এই বিয়েতে মত দিয়েছে।শুভ দিনে চারহাত এক হল পবিত্র অগ্নিকে সাক্ষী রেখে। বিয়ের আগেই বাপ মা মরা আদিত্যর সাথে তেমন যোগাযোগ হয়নি তনুর। ফুল শয্যার রাতে আদিত্য বলল,"আমরা এখনো অচেনা একে অপরের কাছে। মনের মিলন সবচেয়ে বড়। তার অপেক্ষায় রইলাম। শুয়ে পড়ুন, good night."
না, আলাদা নয়,এক খাটেই ওরা শুয়েছিল। তবে যথেষ্ট দূরে।অতবড় খাটে দুজন শুলে কারোর শালীনতা ক্ষুন্ন হবার কথা নয়। সেদিন রাতে আদিত্যের প্রতি শ্রদ্ধায় মন ভরে উঠেছিল তনুর।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখ আদিত্য পাশে নেই।"good morning"বলে চা নিয়ে ঘরে ঢুকলো আদিত্য।"তুমি তো অনেক বেলা অব্দি ঘুমাও দেখছি।যাও, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে নাও, স্কুল আছে তো।"

ধীরে ধীরে একটা স্বাভাবিক বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ওদের মধ্যে। সকালে স্নানে যাওয়া নিয়ে খুনসুটি থেকে শুরু করে রিমোট নিয়ে কাড়াকাড়ি, আবার বিকেলে ফুচকা খাওয়া, সিনেমা হলে যাওয়া সবে মিলিয়ে একটা মিষ্টি মধুর সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল ওদের মধ্যে। যেটা বন্ধুত্বের থেকে বেশি, কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্ক ঠিক বলা সম্ভব না।
বিয়ের কয়েক মাস পর তনুর মা ওকে জিজ্ঞাসা করেছিল, "এখনো কি দত্তক নিতে চাস?"তনু ছদ্ম অভিমান দেখিয়ে বলেছিলো,"জোর করে বিয়ে যখন দিলেই, তখন সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দিয়েই দেখি।"
ধীরে ধীরে আদিত্যর স্বভাবে গুণে ওর প্রতি একটা টান তৈরি হয়েছে তনুর। আদিত্যেকে স্বামী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে নিজেকে পরিপূর্ণ নারীরুপে গড়ে তোলার ইচ্ছে হত। কিন্তু চাপা স্বভাবের তনু মুখ ফুটে বলতে পারতনা। আর আদিত্য সব বুঝেও না বোঝার অভিনয় করত,হয়ত তনুর স্বগতোক্তির অপেক্ষায়।

শরৎকালের শিউলি ফুলের সৌরভ আর কাশফুল জানান দিল পুজো এসে গেছে। বাতাসে বেজে উঠল আগমনীর সুর।মা দুর্গতিনাশিনী পা রাখলেন মর্তে। এবছর তনুর বিয়ের পর প্রথম দুর্গা পূজা। অষ্টমীর দিন লাল সাদা ঢাকাই শাড়িতে তনুকে লাগছিল মায়ের চিন্ময়ী রূপ। তনুর থেকে চোখ সরাতে পারছিল না আদিত্য। দশমীতে মা কে বরণের পর যখন সবাই সিঁদুর খেলায় মেতে উঠেছে, তখন তনু থালা ভর্তি সিঁদুর নিয়ে আদিত্যর কাছে এসে বলল, "সেদিন আমাদের বিয়ে হয়েছিলো জোর করে।আজ মায়ের পায়ের সিঁদুর দিয়ে রাঙিয়ে দাও আমার জীবন।"কাজল পড়া জল ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আদিত্য রাঙিয়ে দিল তনুর সিঁথি। দুই চিরপিপাসু আত্মার মিলনে আনন্দ অশ্রুতে ধুয়ে গেল মায়ের রাঙা পা, মায়ের বিদায় সম্ভাষণ।

# বৃষ্টির দিন
#সেঁওতি গুপ্ত
"আমার সারাটা দিন, মেঘলা
আকাশ বৃষ্টি, তোমাকে দিলাম"
গানটা গুনগুন করতে করতে সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছিল রিত, রিতব্রত রায়। শহরের এক নাম্বার বিজনেসম্যান।
মি. রায় এমনিতে রাশভারি গোছের। কিন্তু আজ তার মুড খুবই হাল্কা। আর তার কারন একজন নারী।
মিতু র কথা মনে পরল আবার। মনে পরতেই ছটফটানি। যা রিত এর একদমই স্বভাববিরুদ্ধ। কখন দেখা হবে মিতুর সাথে। কেমন দেখতে লাগবে আজ মিতুকে? মিতু সবটা ম্যানেজ করতে পারবে তো? এরকম নানা প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। গানটা গাইতে গাইতেই রিত দুধসাদা হন্ডাটায় স্টার্ট দিল।
মিতু ওরফে মিতাশ্রী র আজ একটা অন্যরকম দিন। আজ আসছে রিত। দীর্ঘ ১৫ বছর পর ।
দিন সাত আগে সকালের ব্যস্ত সময়ে একটা ফোন এসেছিল আননোন নাম্বার দেখে সেদিন মিতু আর আগ্রহ দেখায়নি। তখন মিতু বরের টিফিন, মেয়ের স্কুল ব্যাগ নিয়ে মহা ব্যস্ত। পরে ফ্রি হয়ে কল করল। কানে এসে লাগল একটা হারানো সুর," মিতু কেমন আছ?"রিতের গলাটা মিতুর কানে যেন ধাক্কা দিল।
" একবার কি দেখা হবে?"
মিতু শুধু সেদিন বলেছিল ৪ঠা আগস্ট এস"। সংক্ষেপে ঠিকানা বলে সেদিন ফোন রেখে দেয় মিতু।
আজ সেই দিন। সকালে ই মিতুর বর সোম আজ ট্যুরে যাবে, দুদিনের জন্য।
" সাবধানে যেও, পৌঁছে জানিও, বলল মিতু।
" তুমিও সাবধানে থেকো, যেকোন দরকারে ফোন করবে", পিউ আর তোমার জন্য চিন্তা থাকল"।
পিউ বাপির গলা জড়িয়ে একটা চুমু খেল।
সেদিন ছিল তুমুল বৃষ্টি। পিউ কে স্কুলে পাঠাল না মিতু। সন্ধেবেলা ওদের একটা বার্থডে পার্টি ছিল। বৃষ্টি কমতে পিউ কে তৈরি করিয়ে মিসেস ঘোষের ফ্ল্যাট এ পাঠিয়ে দিল মিতু। মিসেস ঘোষ আর তার ছেলের সাথেই যাবে পিউ। পিউ বায়না করছিল। কিন্তু মিতু আজ অন্য কারো জন্য।
পিউ বেড়িয়ে যেতে মিতু ফ্রিজ খুলল। মেথি চিকেন রান্না করল। রিতের ফেবারিট। আরও কিছু করল মিতু। যা যা ভালবাসে রিত।
রান্না করে মিতু স্নানে গেল। আজ অনেকখন ধরে স্নান করল মিতু। বেরিয়ে দেখে সোমের মিসডকল। ফোন করল রিতু।
সোম" কোথায় ছিলে, শোন আর কল করতে পারব না, মিটিংএ বসব, একেবারে কাল কথা হবে"।
মিতু বলে ঠিক আছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যে মিতুকে দেখল মিতু সে ১৫ বছর আগেই হারিয়ে গেছে।
তাও নিজেকে যত্নে সাজাল। হলুদরঙা পৈঠানি সিল্কে আর খোলাচুলে তাকে ভালোই লাগল। সারাগায়ে সুগন্ধি আর চোখে কাজল।
তারপর অন্তহীন প্রতীক্ষা। সেদিনের পর আর কথা হয়নি। আসবে তো?
হঠাৎ বেল। মিতু চমকিয়ে উঠল। দরজা খুলে মিসেস রায় কে দেখে শান্ত হল।
" মিসেস চৌধুরী, আপনার মেয়ে ভালমত পৌঁছে গেছে। আপনি আর আমি যাইনি দেখে মিসেস দাস একটু অফেনডেন্ট। কি করব বলুন আজই মা আসবে। আর কুহেলী র বাবার আজ লেট নাইট পার্টি। কিন্তু আপনি গেলেন না কেন?
কি বলবে ভেবে পেল না মিতু। মাথাটা খুব ধরেছে, তাই...
মিসেস রায় চলে গেলেন। ঘরে আসতেই ফোন।
" কিরে আসলি না কেন, বর নেই, একা একা কি করছিস? এখানে এলে তো তাও মনটা ভাল লাগত"।
একনাগাড়ে কথাগুলো বলল মিসেস দাস।
" আসলে শরীর টা ভাল না তাই..."।
" ঠিক আছে শোন, বৃষ্টি বেশি হলে আমার কাছে থাকবে পিউ। চিন্তা করিস না"।
ফোনটা রেখে আবার প্রতীক্ষা।
আবার বেল। এবার দরজা খুলে রিত। হাতে একগোছা গোলাপ।
" এস, বস"।
সোফায় গা এলিয়ে দিল রিত।
"চা না কফি"?
কফি দাও।
কফি করতে করতে আনমনা হয়ে পরল মিতু। নানা কথা আজ ভীড় করে আসছে।
কফি নিয়ে বসল মিতু। " চল বারান্দায় যাই"।
হাতে ধূমায়িত কাপ নিয়ে মুখোমুখি ওরা দুজন। রিতের মুগ্ধ দৃষ্টি নজড় এড়ালো না।
" মাসীমার কি খবর? নীরবতা ভেঙে মিতু জানতে চাইল।
" মা আর নেই, দুবছর হল"।
" মায়ের মৃত্যু ই আমায় ফিরিয়ে আনল মিতু"।
নিজের ভেতর একটা রিয়েলাইজেশন হল। ক্ষমা চাইতে হবে।
সেই চলে এলাম আমেরিকা থেকে, মায়ের কাজ মিটিয়ে এখানেই ব্যবসা শুরু করলাম।
আজ আমি সুপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু একটা ফাঁক থেকে গেছে। তোমার নাম্বার যোগাড় করতে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েছি।
মিতু বুঝল না কার কাছে ক্ষমা, কিন্তু একটা আন্দাজ করল। আর কথা বাড়াল না। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। ছাট এসে ওদের ভিজিয়ে দিল। তাড়াতাড়ি ভেতরে এসে দরজা দিল মিতু।
" তুমি তো বৃষ্টি ভালবাসতে মিতু"।
চমকে তাকাল মিতু।
"এই ১৫ বছরে অনেক চেঞ্জ হয়েছে"।
চল খাবে চল।
খাবার টেবিলে নিজের পছন্দসই সব পদ দেখে রিত খুশি হল।
" সব মনে আছে দেখছি"।
"কিছু জিনিস ভোলা যায় না"।
রিতকে খাবার বেড়ে দিয়ে নিজেও বসল মিতু। খেতে খেতে টুকটাক কথা।
সোম আর পিউয়ের ছবি দেখে " সুখেই আছ "।
খাওয়া শেষে সোফায় গা এলিয়ে দিল রিত। মাঝে গ্যাপ রেখে মিতু বসল। খানিকক্ষণ নীরবতা।
হঠাৎ হাঁটুগেড়ে বসে মিতুর দুটোহাত নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে বলে ওঠে ক্ষমা কর। মিতু চমকে ওঠে। হাত ছাড়িয়ে নেয়। ওর চোখের সামনে সিনেমার মত ১৫ বছর আগের একটা ঘটনা ভেসে ওঠে।
দীর্ঘ চারবছর প্রেম চলার পর ওরা যখন ঠিক করে এবার একসাথে থাকবে। মিতু বাড়িতে সব জানায়। যেদিন মিতুর বাবা ঠিক করেন রিতের মার কাছে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে যাবেন। সেদিন সন্ধ্যেবেলায় গিয়ে তিনি শোনেন রিত সেদিনই ভোরে আমেরিকা চলে গেছে নিজের মাকে ফেলে রেখেই। মিতুর কথা তিনি কিছুই জানতেন না। মিতুর বাবার কাছে সবটা শুনে তিনি চুপ করে যান।
আর এদিকে মিতুও ভেঙে পরে। তার ও অনেক পরে মিতু মা বাবার কথা শোনে। সোমের সাথে বিয়ে করে।
কিন্তু আজো অনেক প্রশ্ন তার মাথায় ঘোরে।
কেন সেদিন রিত কিছু না জানিয়েই চলে যায়?
তাদের চারবছরের ভালবাসা কে গুড়িয়ে দিয়ে রিত কি পেল?
রিত বলে সেদিন সে কেরিয়ার কেই প্রাধান্য দেয়। একটা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছেলের আমেরিকার চাকরি সহজ নয়। সে তখনই বিয়ে করতে রাজি ছিল না। আর এর প্রস্তুতি সে একমাস ধরে নিয়েছে সবার অজান্তেই। সে অন্যায় করেছে।
মিতু অপেক্ষা করতে পারত, রিত
সবটা বলে দেখত।
রিত আর কিছু বলল না।
কিছুপর বলল মিতু ফিরে এস। আমায় প্রায়শ্চিত্ত এর একটা সুযোগ দাও।

"সরি, আমি বিবাহিত, আর হয় না।
সোমের মত একটা ভালমানুষ কে আমি ঠকাতে পারবনা।
তুমি ফিরে যাও"।
আমায় আমার মত বাঁচতে দাও"।
" ঠিক আছে, আমি চললাম।
হঠাৎই দরজা খুলে বেড়িয়ে গেল রিত। মিতু স্থানু বসে রইল।

অনেকখন কেটে গেছে, এর মাঝে পিউ কে আর পাঠাবে না বলে জানিয়েছে মিসেস দাস। বাইরে বৃষ্টি র তুমুল আওয়াজ।
মিতু শাড়ি ছেড়ে একটা গাউন পরে বারান্দায় গিয়ে বসল। আজ রাতে আর ঘুম হবে না।
হঠাৎই ডুকরে কেঁদে উঠল মিতু। বৃষ্টির শব্দের সাথে সেটা মিশে গেল।

#হৃদয়ের_কাছাকাছি

#তাপসী_দত্ত

‘কি হল ডাক্তারবাবু এত চুপচাপ হয়ে গেলে? ভয় পেয়ে গেলে নাকি? আরে এত শাড়ি, গয়না কিনেছি; ভয় নেই পূজোর আগে মরছি না’। কথাগুলো বলে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে কল্যাণী। কল্যাণীর হাসির মধ্যে কোথাও কি চাপা কান্না লুকানো আছে? একটু খোঁজার চেষ্টা করেন ডাঃ দেবাশীষ কর।

বুকের মধ্যে দলা পাকানো কান্নাগুলো চোখ দিয়ে ঠেলে বেরিয়ে আসতে চায় ডাঃ করের। কোনোরকমে দমচাপা কষ্টটাকে নিজের মধ্যে বেঁধে রেখে বলেন-‘ না কল্যাণী আমি চিন্তা করব কেন? আমি ডাক্তার, যমের দুয়ার থেকে ফিরিয়ে তোমায় আনবই। এখন তোমার স্পেশাল এলাচী চা খাওয়াবে ডিয়ার’।

কথাগুলো বললেন বটে ডাঃ কর কিন্তু তিনি ভালো করে জানেন এইমাত্র তিনি তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে মিথ্যে সান্ত্বনা দিলেন। এছাড়া কি তার আর কিছু করণীয় ছিল? কি করে কল্যানীকে তিনি বলতেন আর মাত্র কয়েকদিনের অতিথি সে? আর ক দিন বাদে পৃথিবীর আর কোথাও কোনো অস্তিত্ব থাকবে না কল্যাণীর। শুধুই স্মৃতি হয়ে থেকে যাবে সে।

--‘এই নাও ডাক্তারবাবু তোমার এলাচী চা’। এখনো মুখে মিষ্টি হাসি লেগে আছে কল্যাণীর। শরীরে এত কষ্ট বহন করেও কি করে যে কল্যাণী সবসময়ে এত হাসিখুশী থাকতে পারে...... নাঃ আর ভাবতে পারছেন না ডাঃ কর। চোখের জলে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে সব কিছু। মনটাকে শক্ত বাঁধনে বেঁধে গরম চায়ে চুমুক দেন ডাক্তারবাবু। আঃ কি যে আরাম কল্যাণীর হাতের এলাচী চায়ে, এক মুহূর্তে সমস্ত ক্লান্তি উধাও হয়ে যায়। কিন্তু ক দিন? সাতদিন, দশদিন, পনেরোদিন ;ক দিন তিনি কল্যাণীর হাতের এলাচী চায়ের স্বাদ নিতে পারবেন?

কল্যাণীর রিপোর্টটা হাতে পাওয়ার পর থেকে ডাক্তারবাবুর সামনের জগতটা অন্ধকার হয়ে গেছে। যেন কোনো কিছুরই তল তিনি পাচ্ছেন না। জগতের সবকিছু তার ধরা ছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে যেন। রাত এখন গভীর,সবাই যখন ঘুমের দেশে মিষ্টি স্বপ্ন দেখতে ব্যস্ত, রাতজাগা পাখির মত জেগে আছে শুধু ডাঃ কর। কয়েক ঘণ্টায় তার বয়স যেন পনেরো বছর বেড়ে গেছে, চোখদুটো যেন নিদ্রাদেবীকে জবাব দিয়ে দিয়েছে। চিন্তার মহাসমুদ্র ,নাকি কাছের মানুষটাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে গড়ে ওঠা যন্ত্রণার পাহাড় ,কোনটা বেশী অপ্রতিরোধ্য তার কাছে?

কল্যাণীর ঘুমন্ত মুখটার দিকে চেয়ে বড় মায়া হয় ডাক্তারবাবুর।গত একবছরে তিনি কি একটিবারের জন্যও ভালোভাবে তাকিয়ে ছিলেন তার প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে? তাকালে হয়ত বুঝতে পারতেন একটু একটু করে মারণরোগ বাসা বাঁধছে কল্যাণীর শরীরে। তিনি ডাক্তার ,তার চোখে কি ধরা পড়ত না কল্যাণীর শারীরিক পরিবর্তন?

কোথাও ঢাক বাজছে , বোধহয় মণ্ডপে ঠাকুর যাচ্ছে। এখন তো আবার মহালয়ার আগেই মণ্ডপে প্রতিমা শোভা পায়। কাল রাত পেরলেই মহালয়া। তারপর দিনগোনা পঞ্চমী, ষষ্ঠী.........

সতেরো বছরের আগের স্মৃতি ভেসে ওঠে ডাঃ করের স্মৃতিপটে।ষষ্ঠীর দিন, আদর্শপল্লী ক্লাবে জোরদার পূজোর প্রস্তুতি চলছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিধায়ক এসে পড়বেন পূজোর উদ্বোধন করতে। পাড়ার অল্পবয়সী মেয়েরা লালপাড় সাদা শাড়ি পরে শঙ্খ হাতে বিধায়ককে অভ্যর্থনা জানাতে তৈরি।প্রায় পনেরোজন মেয়ের মধ্যে সেদিন তরুণ দেবাশীষের নজর কেড়েছিল কিশোরী কল্যাণী। পূজোর কয়েকদিন আগে কল্যাণীরা পাড়ায় নতুন বাড়ি করে আসে। ছটফটে মিষ্টি স্বভাবের কল্যাণী সহজেই হৃদয় চুরি করে নিয়েছিল দেবাশীষের । এরপর ওদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠতে বেশী সময় লাগে নি। দীর্ঘ সাতবছর প্রেমের পর বিয়ে। সুখী দম্পতি বলতে যা বোঝায় ওরা ছিল তাই।

---‘ কি হল ডাক্তারবাবু , তুমি ঘুমোয়নি এখনো’?

কল্যাণীর আওয়াজে ঘোর ভাঙ্গে ডাক্তারবাবুর। -‘না, ঢাকের আওয়াজে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল ডিয়ার। তুমি উঠে পড়লে যে’?

---‘একটু বাথরুমে যাবো ডাক্তারবাবু’।

---‘ সাবধানে যাও, আমি যাবো তোমার সাথে’?

---‘ ডাক্তারবাবু, আমি এতটাও কাহিল হয়ে পড়িনি , তুমি ঘুমোও । আমি একাই পারব যেতে’।

ঘুম! আর কি কখনো নিশ্চিন্ত ঘুম আসবে তার জীবনে। যে একটু একটু করে তার প্রিয়তমাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যেতে দেখছে তার কি কখনো ঘুম আসতে পারে?

দশবছরের বিবাহিত জীবনে কেউ কারো সাথ ছাড়ে নি কখনও । তবুও মানুষতো ভুল করেই। সন্তান না হওয়ার যে কি যন্ত্রণা!! কিন্তু যন্ত্রণাটা কি শুধুই তার একার? কল্যাণীর যন্ত্রণা কি তার চেয়ে কিছু কম ছিল? কই কল্যাণীতো কোনো ভুল করে নি? তাহলে সে কেন ভুল করল?

প্রীতিলতার সাথে মিথ্যে সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়ে কল্যাণীর বিশ্বাস নিয়ে একবছর ধরে যে ছিনিমিনি খেলেছিল, এটা কি তারই ফল? মোহ, সবই মোহ। এই পৃথিবীই মোহময়। সেই মোহোর ফাঁদে সবাইকেই একদিন না সবাইকেই পা দিতে হয়।

ষষ্ঠীর সকাল, চারিদিকে বোধনের বাজনা বাজছে। নিস্তব্ধ শুধু ডাঃ করের বাড়ি। প্রিয়তমা স্ত্রী কল্যাণী চিরঘুমে শায়িত । চোখের জল শুকিয়ে ডাক্তারবাবুর দৃষ্টি শুকনো কাঠের মত। পাড়ার ছেলেরা তৈরি শ্মশানযাত্রী হয়ে। চারিদিকে বোল উঠেছে ‘ বল হরি হরি বোল’। না, তোমরা ওকে নিয়ে যেও না বলছি। রাখ রাখ। এতবড় সাহস তোমাদের? কল্যাণীকে আমার থেকে আলাদা করছ? নামাও বলছি নামাও ওর খাটখানা। প্রাণপণ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছেন ডাঃ কর। কে শোনে কার কথা? মহা হাড়বজ্জাততো ছেলেগুলো!! ওনার বাড়িতে দাঁড়িয়ে ওনাকেই অমান্য করছে। দাড়া দেখাচ্ছি তোদের মজা!!

একি ছেলেগুলোর কাঁধে দুটো খাট কেন? তবে কি.........

হ্যাঁ, তাই তো কল্যানীতো ওনার চোখের সামনেই শেষ নিঃশ্বাসটুকু ছাড়ল। তারপর!! উফ!!! কি অসহ্য বুকে ব্যথা। কেউ যেন দশমণ পাথর চাপিয়ে দিয়েছে বুকের ভেতর। উঃ কি কষ্ট !! দমটা যেন এক্ষুনি বন্ধ হয়ে যাবে। চারিদিকে এত অন্ধকার কেন?............

‘আরে কল্যাণী তুমি?বাঃ ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে আজ তোমায়। তুমি কি ভেবেছিলে বলতো আমায় একা ফেলে নিজে পূজোয় ড্যাংড্যাং করে ঘুরে বেড়াবে? কি দিলাম তো তোমায় চমকে? প্রতিবারের মত এবারও পূজোয় আমরা একসাথেই কাটাবো। তোমার হাতটা আমার বুকের বাঁ পাশটায় রাখতো দেখি । তোমায় বলতাম না তোমার ,আমার হৃদয় এক। এবার প্রমাণ পেলে তো’?

(সমাপ্ত)

ঘুমের ঘোরে
- মান্তু দেব রায়

ঘুমের ঘোরে কবিতা লিখছিলাম,
শব্দ গুলো পরপর সাজালাম,
অনুভূতি লিখলাম
আবেগ দিয়ে ছন্দে ছন্দে মেলবন্ধন ঘটালাম!
বাক্যগুলো নিজের মতো দাঁড়িয়ে ছিলো
সৌন্দর্য বিন্যাসের ভাবনায়!

সাদা পৃষ্ঠা'য় শিরোনাম দিতে পারিনি!
ঘুমের ঘোরের কবিতা কে নীল কলমের কালী তে
প্রতিষ্ঠিত করে সফল হতে পারিনি !

ঘুম ভেঙে গিয়ে শব্দ গুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো
বাক্য গুলো এলোমেলো!
অনুভুতি–আবেগ হারিয়ে গেলো,
আমি কলম হাতে নির্জনতায়
মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে ঘুরপাক খাচ্ছি
খুঁজে যাচ্ছি নিদ্রাবিহীন গগনতলে
শিরোনাম বিহীন কবিতা'র শব্দ!

তোমার সাথে কিছু না বলা কথা
- ব্রততী দাস

উৎসবের শহরে
আমার একলা বিষণ্ণ আকাশ
বিষাদের নীল খাম

"ও শহরে কেমন বিকেল!?
লোকজন, কোলাহল আর জল হাওয়া?
ভালো আছো তুমি!?"
অনুচ্চারিত কথোপকথন নিরন্তর
তোমার আমার

দূরে আছো তুমি
তবুও তো প্রতিক্ষণ
তোমারই নীরব অস্তিত্বের রেশ
ছুঁয়ে থাকে প্রতি অনুভবে
স্পর্শের সুখের শিহরণে

তবু কেন বলো
শুধু শূন্যতা জেগে থাকে চরাচর জুড়ে
পৃথিবীর সব রঙ আর আলো
বিবর্ণ ধূসর
খসে পড়ে মৃত তারাদের মতো

সারাদিন সব কাজে অকাজে
অথবা ধূসর রাতের আকাশে
তোমার না থাকা জুড়ে
প্রতীক্ষার নীল নির্যাস ঝরে
আমার চেতনার গভীর অতলে

ছন্দ পতন
- উর্মি পান্ডা

তুমি বলতে, রাত নিঝুম, চোখে নেই ঘুম,
ঘুমের অসুখ, তোমার ছিল, আমার ছিল না।।

তুমি বলতে, রিমঝিম বৃষ্টি, ভালোবাসা সৃষ্টি,
বৃষ্টিতে তুমি ভিজতে, আমি ভিজতাম না।।

তুমি বলতে, অন্ধকারে ভয় করে, যদি না কেউ হাত ধরে,
ভয় তুমি পেতে, আমি পেতাম না।।

তুমি বলতে, দোল খেলে ক্লান্ত, পূর্ণিমা রাত অশান্ত,
অশান্ত তুমি হতে, আমি হতাম না।।

তুমি বলতে, ফাগুন হাওয়ায় মন মাতে, অপেক্ষাতে দিনে রাতে,
অপেক্ষা তুমি করতে, আমি করতাম না।।

তুমি বলতে, আমি একজন বাউন্ডুলে, সব কথা যে যাই ভুলে,
ভুলে তুমি যেতে, আমি যেতাম না।।

এখন আমার রাতে ঘুম নেই, বৃষ্টিতে ভিজি, অপেক্ষা করি, ভয় পাই, অশান্ত, এলোমেলো হই, শুধু
সেদিন ও ভুলতাম না, আজ ও ভুলিনি।।

ভুলা যায়না
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী
না,অঙ্কুশকে আজও ভুলেনি সুমনা।কি করে ভুলবে?এতো স্মৃতি কি ভুলে থাকা যায়।স্মৃতির খাতায় ময়লা জমলেও অক্ষরগুলো আজও বড্ড স্পষ্ট।মনেহয় এই তো সেদিনের কথা।
সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিলো।সুমনা ওরফে সুমি গীতবিতান হাতে করে দোকানের একটা শেডের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলো।পুরো ভিজেই গেছিলো।বইটাকে ভেজার হাত থেকে বাঁচাতে দোকানের দিকেই মুখ করে দাঁড়িয়েছিল।কলেজস্ট্রীটের ছোট্ট ছোট্ট বই এর দোকানে দাঁড়ানোর কোন জায়গাও থাকেনা।হঠাৎ মনেহল কেউ পিছনে ছাতা খুলে এসে দাঁড়ালো।কিন্তু সামনের দিকে ফেরার কোন উপায়ও নেই।আস্তে আস্তে বৃষ্টিটা কিছুটা কমে গেলে সুমনা পিছন ফিরে অঙ্কুশকে দেখেই বলে, ---আরে তুই এখানে? ---ওমা তুই?পিছন দিক থেকে দেখে তোকে চিনতেই পারিনি।বাব্বা কি মোটা হয়েছিস তুই!ছিলি তো একটা কঞ্চির মত। ---এখনও ভুলিসনি ওই কঞ্চি ডাকটা? ---আরে কি করে ভুলবো তোকে?তুই তো আমাকে কোনদিন পাত্তায় দিলিনা। --উফ্ফ্ফ সেই একই রকম থেকে গেছিস।ইয়ার্কি আর ইয়ার্কি!কেমন আছিস বল আর এখন তুই কি করছিস? --- মা, বাবার কপাল জোরে ব্যাংকে একটা কেরানির চাকরী পেয়ে গেছি।দু'বছর ধরে কেরানিগিরি করছি।---মাসিমা,মেশোমশাই এর কপাল গুনে পেয়েছিস?কেন নিজের কপাল গুনে নয় কেন? ---আমার কপাল?ও তো ভাঙ্গা কপাল।যেমন ধর, কলেজলাইফ থেকে একটা মেয়েকে ভালোবাসি।তাকে যখনই বলি সেকথা আর সে কিনা ভাবে আমি ইয়ার্কি করছি! ---আর পারিনা তোকে নিয়ে।আমি কিছুতেই তোকে বুঝাতে পারলামনা বিয়ে আমার কপালে নেই। কথা বলতে বলতে ওরা অনেকটাই এগিয়ে এসেছে।অঙ্কুশের অনুরোধে কফি হাউজে ঢোকে ওরা দু'জনে কফি খেতে।অঙ্কুশই শুরু করে আবার, ---হ্যাঁ কি যেন বলছিলি? বিয়ে তোর কপালে নেই? আরে ছেলে রেডিবিয়ে করতে আর মেয়ে বলে, 'বিয়ে কপালে নেই?'এর মানেটা কি? ---অঙ্কুশ অনেক কথা আছে যা মুখে বলা যায়না।আমার সম্মন্ধে যদি পুরোটা জানিস তাহলে তোর মাথা থেকে আমাকে বিয়ে করার ভূতটা নেমে যাবে। ---হ্যাঁ সেটাই তো আমি জানতে চাই। ---নিজের মুখে নিজের জীবনের কলঙ্কিত অধ্যায়ের কথা কি করে বলি বলতো?
এর মধ্যে কফি এসে যায়।কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে অঙ্কুশ বলে,---ভনিতা না করে বলতো সব।বিশ্বাস কর তোকে ভালোবাসি বলেই আজও আমি বিয়ে করতে পারিনি।কিছুতেই তোকে ভুলতে পারিনা।তোর সাথে দেখা না হলে কি হবে?প্রতিটা ক্ষণ প্রতিটা মুহূর্ত আমি তোকে মিস করি।---আমার সব কথা জানলে তুই আমায় ঘৃণা করবি। ---আর কিন্তু আমি ধর্য্য ধরতে পারছিনা।হয় বল নাহলে আমার প্রস্তাবে রাজি হয়ে যা। সুমনা কিছুক্ষণ গুম মেরে বসে থেকে শুরু করে।আগে এখানে আমাদের বাড়ি ছিলোনা।আমাদের বাড়ি ছিলো আসামে। বিশেষ কারনবশত ওই বাড়ি বিক্রি করে এই কলকাতায় আমরা চলে আসি। আর সেই কারনটা হল যখন আমার বয়স বারো বছর একদিন স্কুল থেকে আসার পথে আমি রেপড হই।বলতে গেলে মরেই গেছিলাম।বাবা সেই সময় আসামের ডাক্তারের পরামর্শমত আমার ভালোভাবে চিকিৎসা করার জন্য কলকাতা নিয়ে আসেন।তখন ওই ঘটনা নিয়ে ওখানে তোলপাড়।আমি সেই যে আসি আর কখনোই আসামে ফিরিনা।আমি হাসপাতাল ভর্তি থাকার সময়েই বাবা একটা ঘর ভাড়া করে মাকে সেখানে রেখে আসাম ফিরে যান এবং সাত দিনের মধ্যে বাড়ি ঘর বিক্রি করে কলকাতায় পাকাপাকিভাবে চলে আসেন।সেই থেকে আমরা এখানেই আছি।আমি কি করে এই অপবিত্র জীবনের সাথে তোর মত একটা মানুষের জীবন জড়াবো? ---অঙ্কুশ হো হো করে হেসে উঠে বলে, ---যে ঘটনার জন্য তুই দায়ী না তারজন্য নিজেকে অপরাধী বানিয়ে আমার জীবনটাকেও নষ্ট করতে চাচ্ছিলি? ---মানে ? ---দূর বোকা!আমি তোকে ভালোবাসি তোর অতীতকে নয়।ভাগ্যিস তোকে জোর করলাম।তাই তো সব জানতে পারলাম।এখন বল তুই আমায় ভালোবাসিস তো ? ---তুই বুঝিসনা? লাফ দিয়ে অঙ্কুশ উঠে দাঁড়িয়ে বললো, ---চল। ---কোথায়? ---তোদের বাড়িতে।মাসিমা,মেসোমশাই এর কাছে।বিয়ের প্রস্তাব দেবো। ---আরে এতো তাড়া কিসের? ---অনেকগুলো বছর নষ্ট হয়ে গেছে।আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করবোনা।তুই এখানে দাঁড়া আমি রাস্তা ক্রস করে একটু মিষ্টি কিনে নিয়ে আসি।
ছুটতে ছুটতে অঙ্কুশ রাস্তা পার হয়ে বড় এক প্যাকেট মিষ্টি কিনে ----না,ফিরে আর সুমনার কাছে আসতে পারেনা।ট্রাফিক সিগনালের জন্য তার আর তর সয়না।সে ছুটেই রাস্তা পার হতে যেয়ে দুরন্ত গতিতে ছুটে আসা একটি বাসের তলায় পিষ্ট হয়ে যায়।সুমনা দেখতে পায় তার ভালোবাসা রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে। মুহূর্তের মাঝে জীবনের সমস্ত রং মুছে গিয়ে সাদা আবরণে তাকে ঢেকে দিলো।

|| শেষ ||

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget