সেপ্টেম্বর 2019

বহ্নি শিখা
নীলাশা

একতলা ভিটের সামনের ছোট্টো এই আটচালায় মাটির মূর্তি গড়ে সংসার চালান হরিপদ। সারাদিন ব্যস্ততায় কাটে মৃণ্ময়ীকে চিন্ময়ী রূপ দেবার বাসনায়। বহুবছর আগেই স্ত্রী গত হয়েছেন একমাত্র মেয়েকে ছোট রেখে, সেই থেকে বাবা আর মেয়ের সংসার সামলে ধীরে ধীরে ওই একরত্তি মেয়েই হয়ে উঠেছে অন্নপূর্ণা।

সেরকম ভাবে বড় প্রতিমা না গড়লেও সারাবছর টুকটাক যা কাজ হয় কোনোরকমে সংসার চলে যায় হরিপদর। পুজোর মরসুমগুলোয় হাতে হাতে বাবাকে সাহায্য করে বহ্নি, মাটির কাজ খুব ভালো না পারলেও রং করতে, জরির পাড়ওয়ালা পোশাক, অলঙ্কার, চুল ইত্যাদি সজ্জায় মূর্তির শৃঙ্গার করতে খুব ভালোবাসে সে। ঘরের কাজ আর পড়াশোনার পাশাপাশি বাবাকে সাহায্য করতে দশভূজা হয়ে ওঠে সে।

বছর সতেরোর বহ্নি, ছোটো থেকেই প্রকৃত অর্থে সুন্দরী সে, যেন স্বর্গের কোনো মৃৎশিল্পীর নিপুন হাতে গড়া জীবন্ত প্রতিমা। টানা টানা দুটো মায়াবী চোখ, একঢাল লম্বা চুল আর দোহারা গড়ন নিয়ে অনেকেরই ঈর্ষার কারণ সে... আলোচনার ও।

বহুদিন ধরেই বহ্নিকে উত্যক্ত করছিল পাড়ারই একটি ছেলে, তার প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার ফলস্বরূপ বহ্নির জীবনে সে নামিয়ে আনতে চাইল মৃত্যুর নীরবতা। হঠাৎ একদিন বিষাক্ত তরল এসে স্পর্শ করে বহ্নির হাতে, মুখে, গলায়। শরীর ও মনের একরাশ জ্বালা ও অব্যক্ত যন্ত্রণায় প্রথমে হাসপাতাল আর পরে বিছানা সঙ্গী হয় তার। প্রাণে বেঁচে গেলেও চিরকালের মত অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে সে। কেন তাকে এই বিপদ থেকে রক্ষা করলো না মাতৃশক্তি, এই নিয়ে তার মনে একরাশ অভিমান, অভিযোগ, ক্ষোভ জমে ওঠে... অঙ্গীকার করে জীবনে কোনোদিন আর প্রতিমার মুখদর্শন করবে না সে।

হঠাৎ মহালয়ার দু'দিন আগে মাঝরাত্রে বুকে প্রচন্ড ব্যথা ওঠে হরিপদর, কিছুতেই সামলাতে না পেরে আশেপাশের পাড়া প্রতিবেশীর সাহায্য নিয়ে বহ্নি তার বাবাকে নিয়ে যায় হাসপাতাল। তারপর থেকে হাসপাতালই ঠিকানা হয় হরিপদর।

সামনে পূজো, রাত পোহালেই মহালয়া। এবছর পাড়ার প্রতিমা গড়ার দায়িত্ব নিয়েছিল হরিপদ, সেইভাবে কাজ ও করছিল সে। বড় ত্রিপল আর প্লাস্টিক টাঙিয়ে কাঠামো তে নিজের হাত আর ভেজা মাটি দিয়ে একে একে গড়ে তুলেছিল মা দুর্গার পরিবার। একনিষ্ঠ ভাবে মন দিয়ে কাজ করতো হরিপদ দিনরাত। বারবার বহ্নিকে বলতো " আমার হাত ধরে উমা আসছেন রে মা, দেখিস এবার সব ভালো হবে।" বহ্নি শুনতো কিন্তু কখনো ওই প্রতিমার মুখের দিকে চেয়ে দেখত না।

হরিপদর অসুস্থতার খবর পেয়ে ক্লাবের ছেলেরা তাগাদা দিতে আসে বাড়ি বয়ে। এইভাবে মাঝপথে ঠাকুর বানানোর কাজ সেরে অসুখ বাঁধানোটা যে তার কোনো মতেই উচিৎ হয়নি নানারকম ভাবে বুঝিয়ে দিতে থাকে।

বাবার অনেক স্বপ্ন, অনেক আবেগ জড়িয়ে ছিল এই প্রতিমা ঘিরে। ধীর পায়ে কেরোসিনের আলো নিয়ে অসমাপ্ত মূর্তির সামনে এসে দাঁড়ায় বহ্নি। আটচালা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে হাজারো জিনিস, যার সবকিছুতেই বহ্নি খুঁজে পায় তার বাবার হাতের ছোঁয়া। বাবার দেওয়া কথা রাখতেই হবে তাকে, বাবার দেখা স্বপ্ন পূরণ করতেই হবে, হাত কাঁপছে বহ্নির, মাথাটা একটু যেন কেমন ঘুরে উঠলো। বহুদিনের অনভ্যস্ত হাত আলতো করে স্পর্শ করলো মায়ের শরীর, বুঝি বা দুফোঁটা জল গাল বেয়ে নেমে এলো অলক্ষ্যে।

মহালয়ার পুণ্যলগ্ন, পূবের আকাশে সবেমাত্র লালিমার ছোঁয়া, দূরে কোথাও শাঁখ বেজে উঠলো, রেডিওতে সেই চিরপরিচিত কন্ঠস্বর গেয়ে উঠলো...

"ওঁ যা দেবী সর্বভূতেষু শক্তিরূপেন সংস্থিতা।
নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমো নমঃ ॥" .

মান অভিমান সরিয়ে রেখে মৃণ্ময়ীকে চিন্ময়ী রূপ দিতে হাতে কাঁপা হাতে রং তুলি তুলে নিলো বহ্নি, আজ তার হাত ধরেই দেবী মূর্তির চক্ষুদান সম্পন্ন হবে।

একমনে কাজ করতে লাগলো বহ্নি, প্রদীপের উজ্জ্বল শিখায় অভিমানী মা-মেয়ের মুখ কোথায় যেন মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল...

আগমনী

পিয়ালী পাল

বাতাসে ভাসে আগমনীর সুর
আর কিছু দিনের অপেক্ষা, মা নেই কো দূর.
আসছে মা বছর পরে, অনেক টা পথ পার করে
তাই মর্তবাসী বেজায় খুশি শারদীয়া আপন করে.
কিন্তু মাগো পথচারী, অন্নহীন ভিখারি
করছে তোমার আগমনের আশা.
না বৃহৎ প্রাসাদপম প্যান্ডেলের মূর্তি দেখার
আশা তারা করছে না.
তাদের আশা এই কটাদিন অনাহারে ভুগবে না.
প্রসাদ পাবে প্যান্ডেলের আর উপরি পাবে পাওনা
এই কটা দিন সবার মনে থাকবে খুশির বাজনা.
ওরা বোঝে না চন্ডীপাঠ. দুর্গা স্তোত্রের মন্ত্র
ওদের কাছে মাগো তুমি আজীবন জীবন্ত.
ওরা বোঝে তোমার কৃপায় ওদের জোটে আহার
তাই তো ওরা প্রতীক্ষায় থাকে এই দিনগুলির প্রতিবার.
যখন অট্টালিকায় ব্যস্ত খুকু পুজোর কাপড় গোনায়,
গৃহহীনের দিন ফুরায় একটু খাবার পাওয়ার প্রত্যাশায়.
দুই প্রান্তের দুই মানুষই তোমার প্রতীক্ষায়
এসো মাগো ধরাধামে প্রান্তদুটির মিলনের আশায়.
আগমনী

গঙ্গা স্নান
অঞ্জলী দাশ গুপ্ত
মহালয় মানে ভোর হতেই "বাজলো তোমার আলোর বেণু " গানটি ভেসে ওঠে।মনে হয় যেন অপেক্ষার অবসান।এবার মা দুর্গা আসবেন অসুর নিধন করবেন।শিল্পীরা অপরূপ শিল্পের পরিচয় দেন।মায়ের চক্ষু দানের সময়।মনে হয় মাটির মূর্তির মধ্যে প্রাণ প্রতিষ্ঠা হলো।
হিমাদ্রি সকাল হতেই চলে যায় গঙ্গার ঘাটে।এই দিন তার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।সে তার পিতৃ পুরুষদের উদ্দেশ্যে জল প্রদান করে ও পিন্ড দান করে।মায়ের আগমনীর সাথে সাথে তার পরিবারে যারা গত হয়েছেন সবাই একসাথে জল পায় তর্পনের সময়।গঙ্গা স্নানের পর তার মনে এক অদ্ভুত শান্তি আসে।অনেক ছোটবেলায় সে তার বাবাকে হারিয়েছে এই মহালয়ের দিনে।তবুও তার মনে আজ ও আশার আলো বেঁচে আছে এই দিন তার বাবা তার হাত থেকে জল পান করেন।এই অনুভূতি তাকে সান্তনা দেয় তিনি তার কাছেই আছেন।সেইদিন সে তার সাধ্যমত বহু অভুক্ত মানুষের কাছে খাদ্য ও বস্ত্র পৌঁছে দেয়।যাতে তাদের এই দিনটি মহালয়ের সুরে বেজে উঠুক প্রতিটি কোন।

কিশোরবেলা

জুলফিকার আলী

মন ছুটে যায় মন ছুটে যায়

সবুজ ফসল মাঠে,

খোকন সোনার মন বসে না

আর যেন ভাই পাঠে|

দিবা-রাতে স্বপ্ন আঁকে

খোকন সোনা নানান,

কাগজ দিয়ে নৌকা ঘুড়ি

খোকার দাদা বানান|

বানিয়ে দেয় যে তাহাকে

সে ঘুড়ি সে উড়ায়,

আর কাগজের নৌকা জলে

ভাসিয়ে পরাণ জুড়ায়|

কেমনে তবে মনটা তাহার

বসবে রে ভাই পাঠে,

মন ছুটে যায় বিকালে তার

ঐ না খেলার মাঠে|

কিশোর বয়স মানে না যে

কোন রকম বাঁধ,

নানান খেয়াল জাগে- মনে

নিত্য নতুন স্বাদ|

স্বাদগুলো সব জানি জানি

পূরণ হবার নয়,

কিশোরবেলা কিশোরবেলা

জীবনটা মধুরময়|

অপেক্ষায়

সূফী নাহিয়ান নাওয়াফ রামি

যেদিন মিলন হবে ঠোঁটের স্নানে তৃষ্ণার্ত হৃদয়ের
মুগ্ধতার তৃপ্তি ছোঁয়া স্নিগ্ধ রক্ত জবার কাননে বাসর।
রজনীর উত্তাল আত্মার তৃপ্তিতে নিঃশ্বাসের শব্দে কাঁপছে দুচোখ সৃষ্টির পরিপূর্ণতায়।
আহ্...
তৃপ্তি সেই এক অদ্ভুত অনুভূতি। দেহের অস্তিত্বের কামনার চাষী করে চলছে ভালবাসার অনাবাদি হৃদয়কে সম্পূর্ণ আবাদ।
ইশ্...
কী আচার্য্য আচরণের সীমাহীন কষ্টেও সুখের তৃষ্ণা ।
স্বপ্নেরও সীমান্তবিহীন বিচরণ ।
এলোমেলো চুলের গন্ধটা শরীরের আবেদনের কাছে দেহের আত্মসমর্পণের চিহ্ন।
সুখের স্পর্শ লেগেছে যেখানেই দৃশ‍্যত ছোঁয়ার সম্মতিতে নিঃশ্বাসের আবেগী আমন্ত্রণ।
দেহের গন্ধে মাতাল উম্মাদনায় প্রাকৃতিক সেই এক পূর্ণতার গ্ৰহণ।
যত্নের লালনে গড়ে উঠা শীর্ষ বিন্দু বহু তপস্যায় যেখানে মিলনের স্রোতে ভাসে আনন্দ অশ্রু ।
সৃষ্টির তরে সৃষ্টি করার ব্যাকুলতা
বিনিদ্র রজনীর কাটানো ছোট্ট ছোট্ট ছোঁয়ায় জাগানো দেহের শিহরণ।
উত্তাপের আগুনে মোমের কাঠি ইস্পাত সম কঠিন তবুও গ্ৰহণের উৎফুল্ল মনের ইশারায় কাতর প্রিয় ।
এসো এসো নোঙ্গর ফেলবে হৃদয়ের অদৃশ্য উঠোনে।
তিলে তিলে গড়ে তোলা কাশফুলের ধবধবে সাদা চাদরে লুকিয়ে পাহাড়ের চূড়ায়,
তোমাকে নিয়ে বসতি স্থাপন করবো বলেই আঠারো বছরের অপেক্ষা অবসান শেষ হতেই আছি তোমার বুকে।

 

সেই চেনা রিং টোন
সায়মা টুনি

জানালার রড ধরে দাঁড়িয়ে তিতলী আজও মনে হয় সেই চেনা রিং টোনের অপেক্ষায় থাকে কখন বেজে উঠবে ...

ভীষণ লজ্জাই পেতো তিতলী বরের সাথে কথা বলতে,সামনে আসতে সে কি কান্ড ছিলো তার,এসবের সামাল দিতেই বাড়ীর লোকজনের বেশ ঝামেলায় পরতে হতো।বিয়ের দু’দিন পর আবির’কে চলে যেতে হলো কুয়েতে চাকুরীর জন্য রেখে গেলো সদ্য বিবাহিত তিতলীকে তার শ্বশুড় বাড়ীতেই ।

তিতলী মাএ ১৪/১৫ বছরের মেয়ে মাধ্যমিক পরীক্ষায়
ফেল করাতে বাবা,মা হারা মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে দেয় ওর চাচা ফুপুরা পাশের গ্রামের হোমিও প্যাথি ডাক্তারের ছেলে আবিরের সাথে,তখন থেকেই শুরু হলো তিতলী’র জীবন কাহিনীর সাথে তার প্রেম কাহিনীও |

ভাগ্য চক্রে তিতলী’র শ্বশুর আব্বা বেশ উদার মনের ছিলেন তিতলীকে আবারও মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবার জন্য পড়াশুনা শুরু করিয়ে দেন বলেন,”একবার না পারিলে দেখো শতবার” বেশ যেমন কথা তেমনি কাজ,কোন ফাঁকি বাজি করতে পারলো না তিতলী বেগমের চললো পড়াশুনা ।

যথাযথ পড়াশুনা করতে গিয়ে দু চারজন বান্ধবী জুটলো তিতলী বেগমের,বেশ চলছে সময়ও পাড় হচ্ছে তার,তিতলী বেগমের এই সময়ে কিন্তু আবিরের সাথে ভালোই টুক টাক কথা চলছে,চলতে চলতে দুজনের ভীষণ চমৎকার একটা প্রেমের সম্পর্ক হয়ে গেলো,এভাবে তিতলী বেগমের জড়তাও কেটে গেলো আবিরের ওপর থেকে ।

তখনকার সময়ে কিন্তু গ্রামে খুব একটা মোবাইল ফোনের চালু ছিলো না,পাশের বাড়ীর হয়ত চাচার নয়ত ফুপুর বাড়ীতেই ফোন ছিলো তাতেই টুক টাক কথা বলতে হতো আর বিকল্প ছিলো চিঠি লিখা লিখি করে কারণ,কম্পিউটার,লেপটবের যুগেও সেদিন ছিলো না ... কত পিয়নের অপেক্ষা আর ফোনের রিং টনই ছিলো যেন ভীষণ আকর্ষনীয়,আহ্ কি কষ্ট’ই না ছিলো তাই না !

হয়তো ২০০২/২০০৩ সালের দিকে হবে মোবাইল ফোনের আবির্ভাব হলো গ্রামে তখন তিতলী বেগমের বান্ধবীরা বুদ্ধি দিলো তোর বরকে বললেই তো পারিস একটা মোবাইল সেট পাঠাতে তাহলে তো আর এতো কষ্ট করে কথা বলতে হয় না এ বাড়ি ও বাড়ি গিয়ে !

তিতলী বেগমও বায়না ধরে বসলেন আবিরের কাছে একটা মোবাইল সেট দিলে কতই না ভালো হতো কতইনা কথা হতো অথচ,এই সেই তিতলী বেগম যার কিনা কথা বলতেও লজ্জা লাগতো কোন এক সময়ে ...

তিতলী’র কথা মতো আবির একটা মোবাইল সেট পাঠালো বন্ধুর হাতে সে দিন তিতলী’র যেন ছিলো ঈদের খুশী পায় কে ওঁকে একদম প্রজাপতির মতো যেন উড়ছিলো পাখা মেলে আর এদিকে আবিরের একদমই বারোটা বাজলো কারণ,তিতলী বেগমের তো সময় অসময়ের ধারণাই ছিলো না হাতে মোবাইল মানেই প্রণয়ীর কন্ঠ স্বর শোনা দিয়েই কথা !

ভাগিস্য এখনকার যুগের মতো ... whatsapp,Viber,Facetime আর Facebook ছিলো না তাহলে কি হতো একবার চিন্তা করে দেখো তো ... হা ! হা ! হা ! তিতলী বেগম হয়ত এবারও মাধ্যমিক পরীক্ষায় ফেল করতো ?

না,না সেটা আর হয়নি শ্বশুর আব্বার মান রেখেছিলো তিতলী তৃতীয় বিভাগে পাশ করে ছিলো আমাদের তিতলী বেগম !

যুগের সাথে কত কতটা বছর পেরিয়ে গেলো তিতলী’র ঘরেও এলো দু’দুটো তিতলী সবাই এখন যার যার সংসারে ভীষণ ব্যস্ত সমাজে নামকরা প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি বিষেশ কিন্তু আমাদের সেই তিতলী ...

আজ প্রযুক্তি বিজ্ঞান কতই না এগিয়ে গেছে হাতের মুঠোয় সব বলা যায় গোটা পৃথিবীকে এক চোখে দেখতে পারছি কাজ করতে পারছি কতটা উন্নত আমরা এখন তাই না ...

আমাদের সেই তিতলী আজও অপেক্ষা করে বসে থাকে চেনা রিং টোনটি শোনার জন্য হয়ত বেজে উঠবে,কিন্তু সেই মানুষটি চলে গেছে বহু দূরে হয়ত ফিরবে না আর কিন্তু তিতলী’র মনে গভীরে যে সব স্মৃতি রেখে গেছে তা আজও ক্ষণে ক্ষণে গড়িয়ে পরে তিতলী’র চোখের পানি হয়ে !!

আমায় মেঘ করে দাও
প্রতাপ মণ্ডল

বড় সাধ ছিল একটুকরো মেঘ হবো
এদেশ থেকে সেদেশ হাওয়ায় যাবো ভেসে
ঠিক তোমার সামনে দিয়ে---
অথচ হাতের নাগালের বাইরে,
মাঝে মাঝে তোমার কবিতায় ধরা দেবো এসে!

বড় সাধ ছিল কল্পনার রঙে রামধনু হয়ে---
নেমে আসবো তোমার কবিতার খাতায়,
তোমার জানলার ধারে সবুজ গাছের পাতায়।
তোমার শতছিন্ন আটচালা দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে--
দুষ্টুমি করে তোমায় ভিজিয়ে দেবো,
কোনোদিনই তো তোমায় কাছে পেলাম না---
তাই জলকণা হয়েই একটিবার ছোঁব।

আজও তোমার সেই আটচালা ঘর আছে,
জানলার ধারে কত প্রজাপতি উড়ে বেড়ায়---
সেই আদ্যিকালের সবুজ গাছের পাতায়।
আজও হৃদয়ের ছোঁয়ায় কবিতা লেখো খাতায়
শুধু আমি হয়তো নেই তোমারই মনের পাতায়,
হয়তো আমি লিপিবদ্ধ হয়েই আছি,
তোমারই লেখা এক জনপ্রিয় কবিতা হয়ে,
না পেতে পেতে আর কিছুই পেতে চাও না তুমি
সব---সব তোমার গেছে সয়ে।

তুমিতো কবিতা লিখতে জানো,
বলতে জানো হৃদয়ের কথা, হৃদয়ের ব্যথা।
কিন্ত জানো না সেই কালবৈশাখীর কথা....
যে কালবৈশাখীতে-----
মেঘের চোখে বৃষ্টি নেমেছিল,
সে বৃষ্টিকণা ঝাঁপ দিয়েছিলো এক অচেনা নদীতে,
নদী থেকে মোহনা পেরিয়ে সাগরে....
আজও সেই লোনা জলে ভেসে বেড়াই
মনে হয় আবার জলকণা হয়ে মেঘ হয়ে যাই।

কিন্তু কি করে আবার হবো বলো?
উত্তাপ চাই, এক আকাশ সূর্য চাই,
তুমি কি আমার জন্য উত্তাপ দিতে পারো না?
হৃদয়ের উত্তাপে সূর্যরশ্মি জ্বালাতে পারো না?
এসো না--- তোমার আশাতেই আজও বসে আছি
আমাকে আবার জলকণা করে দাও....
আমাকে আবার মেঘ করে দাও.....

মায়ের আগমন

সোমা গাঙ্গুলী

উনুনের আঁচ ধরিয়েছে আজ দুর্গা,
ধোঁয়া কুণ্ডলী হয়ে ওঠে স্বর্গের পানে,
আজকে ওদের হাঁড়িতে চড়বে ভাত,
সকাল শুরু হয়েছে যে আগমনীর গানে।

ভোরের বেলা রবি আজ কাজে যায়নি,
বসে আছে শিউলি গাছের তলে,
মাটির প্রতিমা রঙ এখনও শেষ হয়নি,
তাল দিচ্ছে সে দুলে দুলে, আগমনীর গানে।
অন্তরে তার আগমনী যেন আনন্দ হয়ে ফোটে,
ময়লার বালতিটা তাই ছোঁয়েনি আজকে মোটে।

গ্রামের ঢাকিরা ব্যস্ত ভীষণ,
শহরে যেতে সবে,
প্রথম আগমনীর দিনেই,
ওখানে বায়না করতে হবে।
ঢাক বাজিয়েই সারাটা বছর,
দিন গুজরান হয়।
মাটির প্রতিমা, কাঠামোতে গড়া,
পুজোর প্রতীক্ষায়।

নীল আকাশে আজ শারদীয়া মেঘ,
বাতাসে খুশির গান।
চণ্ডী পাঠের উদাত্ত সুরে,
চঞ্চল হল প্রাণ।

চিত্ত ব্যাকুল, ছুটির ঘন্টা,
বেজে চলে সারাক্ষণ,
প্রিয়জনেদের আসার তরে,
সুখস্মৃতি করি রোমন্থন।

প্রতিটি ভোরের শিশিরবিন্দু,
'মা' কে জানায় আহ্বান,
কিন্তু ফুটপাতেতে থাকে যারা,
একটু খাবারও পায় না তারা,
বলো মাগো কেমন করে
ডাকে তোমায়, কেমনে বাঁচায় প্রাণ।

 

শরৎ বেলার গান
- জুলফিকার আলী

শরৎ ঋতুর এমন দেশে
শিউলীরা সব উঠল হেসে
বলল খুকু আয়,
কাশবনে ওই কাশের ফুলে
হাওয়ায় দুলে
আজ খুকিকে সাথে নিতে চায়।

দীঘির জলে শাপলা ফুলে
রঙের বাহার দেখায়,
তাল পেকেছে গাছ থেকে তা
নিচে পড়ে যায়।

সে তাল এবার কুড়িয়ে খুকি
মাকে এনে দেয়,
শরৎ এসে তালের পিঠের
মিষ্টি খবর নেয়।

গাও-গ্রামের যত শোভা
শরৎ ঋতুর দান,
ফুল পাখি গায় খুকির সাথে
শরৎ বেলার গান।

মৈত্রেয়ী_চক্রবর্তী
ঈশ্বরপ্রতিম
যার নামের মধ্যেই রয়েছে,

ঈশ্বর এবং চাঁদ,
তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,
বাঙালির অহংকার, বাঙালির আহ্লাদ ।

তিনি শিক্ষাবিদ, তিনি সমাজ সংস্কারক,
তিনি বিশিষ্ট গদ্যকার,
তিনিই বাংলা লিপির নবজাগরণের দূত,
বাংলা ভাষার তিনি সার্থক রূপকার ।

১৮৩৯ এ ঈশ্বরচন্দ্র পেলেন,
বিদ্যাসাগর উপাধি,
আর একাই নিরাময় করলেন,
একরাশ সামাজিক ব্যাধি।

সে যুগের নারীদের কাছে,
একটিমাত্র নাম..... বিদ্যাসাগর,
যেন তাদের জীবনে ছিল,
সুখের নামান্তর ।

প্রথম নারী শিক্ষায়তন "হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় ",
তাঁরই অবদানে, #মৈত্রেয়ী
ঝাঁপিয়ে পড়েন বিধবা বিবাহ, বাল্য বিবাহের মতো,
সামাজিক অভিশাপ দূরীকরণে।

নিজসন্তান নারায়ণচন্দ্রের সাথে বিধবাবিবাহ দিয়ে,
প্রতিষ্ঠা করেন উদাহরণ,
সাধারণ মানুষের এই দয়ার সাগরই,
বাংলায় নিয়ে আসেন নবজাগরণ।

যার মাধ্যমে আমরা বাঙালিরা,
বর্ণের সাথে পরিচিত হলাম,
তাঁরই মূর্তি ভেঙে শিক্ষায়তনে,
আমরা শিক্ষার পরিচয় দিলাম ।

তাই জন্মদিনে করজোড়ে,
নতমস্তকে চাই ক্ষমা,
হে প্রবাদপ্রতিম, হে মহাপ্রাণ,
আমরা তোমার উপর ছড়িয়েছি কালিমা।

পিতৃসম তুমি আর ক্ষমাপ্রার্থী,
এক ভারতবর্ষ সন্তান,
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর,
জন্মদিনে তোমাকে জানাই প্রণাম ।

ভীষণভাবে
প্রতাপ মণ্ডল

অনেকদিন বাদ, আজ ভোররাতে একলা ছাদে....
তোমার নিজের হাতে লাগানো কয়েকটা গাছ টবের মধ্যে,
একটা গোলাপ গাছও আছে......
সেই গোলাপ গাছটা, যার কাঁটায় তোমার শাড়ি আটকে যেতো বারবার !
আর কি আশ্চর্য, তুমিই বারবার মনে করতে,
পিছন থেকে আমিই তোমার আঁচল টেনে ধরেছি।
কিন্তু পিছন ফিরে তুমি দেখেছো, আমি নয়
গোলাপ কাঁটায় তোমার আঁচল বিঁধে আছে।
যদি সত্যি সত্যি আমি তোমার আঁচল টেনে ধরতাম !
তোমাকে একলা পেয়ে ছাদে জড়িয়ে ধরতাম!
আমি ঠিক জানি, লজ্জায় রাঙা হতো তোমার মুখ
এগুলোই তো জীবনের আনন্দ, টুকরো টুকরো সুখ....!!

টবের মধ্যে তোমারই হাতে লাগানো যে শিউলি গাছটা...
যখন পুজোর গন্ধ আকাশে বাতাসে......
কতো ফুল ফুটে থাকতো শিশিরভেজা ভোরে।
আমি চুপি চুপি গাছটার কাছে এসে দাঁড়াতাম,
জানি, তুমি দেখলেই বলবে, 'এই ভোরে খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে আছো? ঠাণ্ডা লেগে যাবে যে !'
আজ আর কেউ নেই কিছু বলার...
তোমাকে ছাড়াই তো আছি, তুমিও তো আছো!
একটু ভুল বোঝাবুঝি একটু মান-অভিমান থেকে দূরে সরে গেছি আমরা
এতটাই দূরে, যে ফিরে আসতে পারবো কিনা জানিনা..
তবে খুব ইচ্ছে করে, তুমি যদি ফিরে আসতে বড় ভালো হতো।

সারা ঘর জুড়ে তোমার কতই না স্মৃতি......
এখনও আলমারিতে আমার জামা-কাপড়গুলো তেমনি তোলা আছে !
যেমন পরিপাটি করে তুমি রেখে গিয়েছিলে l
জানো, ওগুলোতে কখনও হাত দিই না....
শুধু মাঝে মাঝে হাত বুলিয়ে তোমার স্পর্শ নিই।
জানলার পর্দাগুলো প্রায় ছিঁড়ে গেছে, বড্ড ময়লাও হয়েছে...
তুমিতো আমায় কোনোদিন কিছুই করতে দাওনি,
হয়তো আমার কষ্ট হবে, তাই তুমি চাওনি !
বদলাই না কেনো জানো?
ওগুলোতেও তোমার স্পর্শ পাই......
মাঝে মাঝে ওগুলোকে তুমি ভেবে জড়িয়ে ধরি
বিশ্বাস করো, তোমার গায়ের গন্ধ পাই,
এইতো যাই, এবার আমি ঘরে যাই..
তুমি নেই কিন্তু তোমার অদৃশ্য শাসনগুলো তেমনই আছে !
যেমনভাবে তুমি আমাকে শাসন করতে.......

জানো, আমিও টবে দু'টো গাছ লাগিয়েছি,
একটা গোলাপ আর একটা জুঁই --
ঠিক তোমার লাগানো গোলাপ গাছটার পাশে l
যখনই ওদের কাছে এসে দাঁড়াই,
মনে হয়, তুমি আমি পাশাপাশি....
আর ওই জুঁই গাছ থেকে তোমার গায়ের গন্ধ পাই,
বিশ্বাস করো,
ভীষণভাবে তোমার অস্তিত্ব অনুভব করি.....

হে ঈশ্বর! তোমাকে

দেবাশিস সেনগুপ্ত

★আজ কদিন ধরেই ওনাকে নিয়ে লিখব ভাবছি।কিছুতেই একটা লাইনও লেখা হয় নি। শেষমেষ আজ এল।এ লেখা একান্ত আমার এক অনুতাপগ্রস্থতা থেকে সৃষ্টি। তাই তাঁর শুভজন্মদিনে এই অসাড় কলমকৃত নিবেদন রাখলাম তাঁর পায়ে।প্রণাম।★

ভোরের টুকটুকে সূর্যটা
এখনও সোনালী হয়ে ওঠেনি।
নেনকু পুকুরে চটজলদি স্নান করে
ঝোলাপত্তর গুছিয়ে নিল।
আজ কার্মাটারে খুব ভীড় হবে।
বাবুবিবিরা দমে পূজা চড়াতে আসবেক
বিদ্যেখুড়োর মাজারে।
" আহাঃ! মাজার বলিস কেন্যে!
উঁ ব্যক্তিটঁ কি মোছলমান ছিল্য বট্যে?"-----
ছেলের এই উটকো ছ্যাবলামি
পছন্দ হয় না বাপ বিলকুর।
নেনকু মনেমনে হাসে।
শ্যালো! জাতধম্ম গুলে খাওয়া লোকটা,
জাতটঁকে যে " বর্ণ পরিচয়"- এর "বোধদয়" করাল
তার আবার রাম- রহিম?
তবে, লিজ্জস্ পেন্নাম ঠুকি বাবুসকল,
সংসারের সঙ্ কাকে বলে
তা চোখেআঙুল দিয়া দেখাস বটে বছর- বছর।

আজ কার্মাটারের বাড়ীটাতে লোক হবে বলে
দু' দিন ধরে সরকারী খরচে কী মেহনত!
শহরের সব নির্জন পুতুলগুলো থেকে
পাখির গু আর ধুলো সাফ করে
লোকটাকে মালা পরানো হবে।
এতে বিলকু মুন্ডার ছেলে অবাক হয় না।
সে ঝটপট তাঁর ঝোলা গোছায়,
বাদাম আর ছোলাভাজার
খুব চাহিদা হবে আজ।
বাংলা ( বর্ণমালা নয়,) মালের সাথে
দিব্য জমে যাবে চাট।
আজ সব দেশী
চলবে--সমস্ত।

শহরেও মোচ্ছব।
ফেসবুক, ট্যুইটার,সোস্যাল মিডিয়াতে
এত কুমীরকান্নার স্বঘোষিত ঢেউ, যে,
ভেবে নেনকুর বুকেই
প্রায় ড্যাম্প ধরে।
আসলে, সাঁওতাল পল্লীর
দুন্দুভি, মাদল,ফ্রেসকো আর সরলতার জীবনে
" পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার"
সেথা হতে আনি নানা উপহার
এই ছোটলোকদের সভ্য করতে যে
সরকার সদাই বদ্ধপরিকর।
তাই নেনকুরাও আজ নীলবিষের ওমে অভ্যস্ত।

পান্তাভাতটা কোনোমতে সাবড়ে
পথে নেমে পড়ে নেনকুু,
হালকা হলুদ মিহি রোদের সাথে গত রাতের
বৃষ্টিভেজা জোলো হাওয়া গায়ে স্পর্শ করে তাঁর।
অথচ, নেনকুর চামড়া সাড়া দেয় না।
শ্রদ্ধা, না, শ্রাদ্ধ?
" বীরসিংহের সিংহশিশু"-কে শ্যালোরা
সারাটা জীবন এমন হুড়কো সেঁধালো যে,
শেষ জীবনটায় লোকটা
মুখদর্শনই করতো না সভ্যসমাজের,
বাপ বলে, " বুঝলি রে ব্যাটা, এই যে দেখিস
জনম- পরব পড়লেই
বাবু- বিবিরা উঁয়ার দোরে মানত লাগায়----
কেন জানিস? অনুতাপ! শতাব্দীর অনুতাপ!"
শ্যালো, ঘন্টা অনুতাপ!
আমাদের হলো গন্ডারের চামড়া, শিয়ালের হৃদয়,
গিরগিটির চরিত্তির-------
নিজের পিতৃপুরুষ ভুলে যাই মহালয়ায়,
নিজের গোত্র খুঁজি অন্যের স্মৃতিচারণে,
তাদের আবার অনুতাপ!--------- মনেমনে
বাপকে গাল পাড়ে নেনকু।

বাড়িটার সামনে ভীড় জমেছে বেশ।
গাড়ি, পুলিশ, চকচকে বাবুবিবিতে ছয়লাপ,
গুছিয়ে দোকান পেতে
বসে পড়ে নেনকু।
হুই সেই কোন্ টাঁর আকাশের গা'য়
একটা চিল একাএকা ডাকছে------
নেনকু ভীড়কে হাঁক পাড়ে,
----"বাদাম লিবেন,ভাজা ছোলা আছে!"

সে আসলে মনেমনে জানে
" ঈশ্বর " আসলে এই একদিন বাবুদের,
বাকি দিনগুলো মিশে থাকে
ছোটোলোকদের সঙ্গে।
তাঁকে আবার আলাদা করে মনে করতে হয়?
এই শখ,
এই বিলাসিতা,
এই কুম্ভীরাশ্রুপাত,
বাবু- বিবিদেরই মানায়।
তাদের মত ছোটলোকদের নয়।
তাই ঐ সঙের দলের দিকে নেনকু ছুঁড়ে দেয়
নিস্পৃহ বর্নমালা,-------
"বাদাম নেবেন? ভাজা ছোলা আছে!"

তুমিও সেদিন ছিলে
সুপর্ণা

সিঁড়ি ভাঙার অঙ্কটা কিছুতেই মেলাতে পারিনি,
অনেক চেষ্টা করেও.... !!
দশ পা উপরে উঠে, শৈশব খুঁজতে গিয়ে,
শ্যাওলা ধরা ছাদের কার্নিশে
ভোকাট্টা বিকেলের
আঁশটে গন্ধমাখা যৌবন ফিরে এলো......
নেমে এলাম জংধরা রেলিং ভর করা সিঁড়ি বেয়ে l
মাঝখান থেকে শৈশবটাও কেমন পিছলে গেলো !!

কাকে যেনো ভালোবেসে একবার চাঁদ নামাতে গিয়েছিলাম,
সেই সিঁড়ি ভাঙা পথ ধরে, নামতে গিয়ে দেখি-
পূর্ণ চন্দ্রগ্রহণের অভিশাপ মেখে নরকগুলজার...

তুমিও তো সেদিন ছিলে আমারই সাথে,
তবুও সম্মিলিত প্রয়াসে সরল রেখাটার
সমীকরণ গুলো হারিয়েই গেলো ধাপে ধাপে.....

তারপর আরো একদিন--
নীলচে খামের মধ্যে ভালোবাসার চিঠি
কুচোতে গিয়ে, বুক অবধি জলে
সিঁড়ির ধাপ গুলো ভাসতে ভাসতে
মিলিয়ে যেতে দেখলাম একটু একটু করে......

কাঁচের শরীরে বিন্দু বিন্দু জলকণার বাস এখন !
সিঁড়ি ভাঙার অঙ্কটা মেলাতে পারিনি আজও,
যদিও সূত্র'টা আমার জানাই ছিলো.....

 

আপন সত্তার খোঁজে
আশরাফুল ইসলাম
হারিয়ে যাচ্ছি জীবনের তরে
ক্রমশই আপন সত্তার খোঁজে
আঁধারের জগত ভেদ করে
মহাকাশের জলপ্রপাতের পারে।
ধুয়াশা গগনে নিজেকে ভাসায়ে
আবহমান সময়ের বেড়াজালে
রহস্যের সমুদ্রসৈকতে দাঁড়ায়ে
ডুবে যাচ্ছি অনন্তকালের অভিসারে।
গ্রহ-উপগ্রহের সিঁড়ি পেরিয়ে
বিদীর্ণ করি কল্পনালোকের পথ
ছেড়ে এসেছি সাত স্তবক আসমান
হৃদয় দর্পনে দেখেছি অজানায় হারানো রথ।
অমানিশার ডানায় ভর করে অবশেষে
রাত জাগা পূর্ণিমা ঘুমিয়ে যায়
দিগন্তের ঐ দূর নীলিমার বুকে
জেগে ওঠে আবার কোনক্ষনে
নির্লিপ্ত এই চোখের পাতায়।
জ্যোৎস্নালোকে স্নিগ্ধ রাতে সাজে
জাফরানি ফুলের ডালা
সত্তর হাজার পর্দা সরে যায়
আমার এ হৃদয়ে দোলখায় শুধু
নূরের ফুলকি মালা।

ভূমি দস্যুর দখলে নদী
আনিছুর রহমান

কালের বিবর্তনে
ইতিহাস ঐতিহ্য হারিয়ে__
নদ-নদী এখন যেন মরা খাল
আজ নাকাল বৈচিত্র্যময় বাংলা ||

এক সময়ের উত্তাল নদী
ঢেউয়ের তালে কল কল শব্দে__
বাহারি পাল তুলে নানা নৌকা চলত||

সেই নদী মরেছে হারাচ্ছে গতি
প্রকৃতি আজ কান্দে নিরবধি__
দেখার যেন কেউই নেই
তাই আজ শুধু দূর্গতি ||

সুবর্ণখালি,ঝিনাই নদী সহ বহু নদী
আজ গতিপথ হারাতে বসেছে__
ভূমি দস্যুর দখলে নদীর
বুকে ফসলের মাঠ ||

সকল দেশের সেরা
আজ তারুণ্যের কাছে যেন__
শুধুই রূপকথার কল্পকাহিনি মাত্র ||

প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা
বৈচিত্র্যময় বাংলার ঐতিহ্য নদী__
বাঁচাতে আসুন সবাই সুচ্যার থাকি
এসো স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ি ||

#শিউলি_বৌ
#সুচন্দ্রা_চক্রবর্তী

সকাল থেকেই আকাশ মেঘলা, কিন্তু বৃষ্টির দেখা নেই।বাদলা হাওয়ায় সোঁদা মাটির গন্ধ ভেসে আসছিল।আমি যে জায়গার কথা বলছি সেখানে আজও বর্ষাকালে ব্যাঙ ডাকে,বাদলা হাওয়ায় গায়ের লোম খাড়া হয়,দূরের বাঁশবাগান থেকে ভেসে আসে মচমচ শব্দ। মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙে,পাখিরা বাসা ছেড়ে বেরোয়,কাঠবেড়ালিরা লুকোচুরি খেলে।এদিকের পশ্চিমপাড়ায় বড়ো বড়ো দোতলা-তিনতলা দালান বাড়ি চোখে পড়লেও এপাড়া ছেড়ে কিছুটা বেরিয়ে বড়োদীঘির পাশ দিয়ে লালমাটির রাস্তা বরাবর হাঁটলেই দেখা যায় অনেক খড়ের ছাউনি দেওয়া ঘর।সে ঘরের পুরুষরা ভোরে উঠে কেউ কাঠ কাটতে,কেউ চাষ করতে,কেউ বা জাল দিয়ে মাছ ধরতে বেরোয়।ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা মাটির দাওয়ায় রঙচঙে বইগুলো নিয়ে পড়তে বসে,আর মা যেই চোখের আড়াল হয়,অমনি বই ফেলে ছুট দেয় দক্ষিণের বড়ো মাঠটার দিকে।গ্রামের বারোয়ারি পুজো থেকে শুরু করে গাজন সমস্ত অনুষ্ঠান-পুজো-মেলা ওই মাঠেই হয়।গ্রামের নাম শিউলিতলা। এমন নামের পিছনেও হয়তো কোনো কারণ আছে।গ্রামের মানুষরা মনে করে,নীল আকাশের কোলে যখন পেঁজা তুলোর মতো সাদা মেঘ আঁকিবুঁকি কাটে,তখন লালরাস্তার দুপ্রান্তে বেড়ে ওঠা শিউলিগাছগুলো তাদের ফোটানো ফুলগুলো দিয়ে রাস্তার লাল রংকে একেবারে ঢেকে দেয়,তাই এমন নাম।গাছপালা-পশুপাখি-মানুষের সহাবস্থান এই গ্রামে আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকলেও স্নেহ-ভালোবাসার কোনো অভাব ছিল না।আনন্দেই কাটছিল সকলের জীবন।
হঠাৎ এই নির্বিঘ্ন জীবনযাত্রায় বড়োসড়ো বিঘ্ন ঘটল।একদিন হঠাৎ দেখা গেল,দক্ষিণের ওই বড়ো মাঠটায় বাঁশ-খুঁটি পোঁতা হচ্ছে।প্রথম প্রথম ব্যাপারটায় কেউ তেমন গুরুত্ব দেয়নি।হঠাৎ একদিন কুমুদ যখন তার বন্ধুদের সঙ্গে বিকেলে স্কুল থেকে ফিরছিল, মাঠের আলপথ ধরে,তখন হঠাৎ দেখে একটা বড়ো গাড়ি এসে থামল।গাড়ি থেকে নেমে এলেন কয়েকজন কোট-প্যান্ট পড়া শহুরে বাবু।দেখলেই বোঝা যায়, এঁরা থাকেন রাতকে দিন করা পথবাতির আলোয় সেই আকাশের নীচে,যেখানে গাঢ় অন্ধকারে তারার ঝিকিমিকি চোখে তেমন স্পষ্টভাবে পড়ে না,শুধু হালকা রক্তিম একটা ধোঁয়াশায় নিমজ্জিত আকাশ দেখা যায়।কুমুদরা দেখে,তাঁরা হাতে কিসব কাগজপত্র এনেছেন,আর নিজেদের মধ্যে কিছু আলোচনা করেছেন।ছোটো থেকেই কুমুদের বড়ো বেশি কথা বলা স্বভাব, সে ছুটে গিয়ে তাঁদের জিজ্ঞেস করল, 'তোমরা কারা?এই গ্রামে তো দেখিনি কখনো? কি করছ তোমরা এখানে?'
বাবুদের মধ্যে থেকেই একজন একটু কমবয়সী লোক এগিয়ে এসে বললেন,'খুকুমণি, এই মাঠে নতুন ফ্ল্যাট উঠবে।'কুমুদের মামার বাড়ি শহরে,তাই ফ্ল্যাট সে আগেও দেখেছে।বলল,'ও,সেই যে উঁচু উঁচু বাড়িগুলো, যাতে আকাশ ঢাকা পড়ে যায়?'
-'হ্যাঁ গো খুকু, তাই।'তিনি হেসে বললেন।
কুমুদ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একমনে কি যেন ভাবল,তারপরেই ছুটে চলল বাড়ির দিকে। তার বন্ধুরাও কিছু বুঝতে না পেরে তাকেই অনুসরণ করল।পশ্চিমপাড়ায় ঢুকেই দুটো দোতলা বাড়ি আর কালীমন্দিরটা পেরিয়েই যে তিনতলা দালানবাড়িটা, ওটাই কুমুদের বাড়ি।গ্রামের সকলে চৌধুরী বাড়ি বলে চেনে।ওদের পূর্বপুরুষ জমিদার ছিলেন।এই মন্দিরও ওদেরই প্রতিষ্ঠা।এখন আর জমিদারি নেই বটে,তবে গ্রামটাকে একসূত্রে গেঁথে রাখার পিছনে ওই পরিবারের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।জমিদারি না থাকলেও বড়ো ব্যবসা আছে এখন ওদের।
ব্যাগটা খাটে ছুড়ে ফেলে কুমুদ চিৎকার করে ডাকতে লাগল,'মা!ও মা!'
কঙ্কনা তখন রান্নাঘরে ছিল।বেরিয়ে এসে বলল,'কি হয়েছে?এমন করে ডাকছিস কেন?'
- 'মা জানো,ওই দক্ষিণের বড়ো মাঠটায় উঁচু উঁচু বাড়ি উঠবে।তাহলে আমরা খেলব কোথায় মা?'
- 'সেকি রে!কদিন আগে বাঁশ-খুঁটি পুঁততে দেখে সন্দেহটা হয়েছিল বটে।'
প্রকাশ পাশের ঘরে ছিল।মেয়ের চিৎকারে বেরিয়ে এল।বলল,'দেখলে কঙ্ক,শহরের মানুষগুলোর আসল উদ্দেশ্য? '
- 'হ্যাঁ দেখলাম, কিন্তু এতো হতে দেওয়া যায় না।ওই মাঠকে ঘিরেই তো সব এই গ্রামের।ওটাই থাকবে না?'
- 'ঠিক বলেছ কঙ্ক,কিছু একটা করতেই হবে।'
প্রকাশের মা সান্ত্বনা পুজো দিতে গিয়েছিলেন।ফেরার পথে কুমুদের বন্ধুদের মুখে সব শুনেছেন।বললেন,'সত্যি,এ বড়ো অন্যায়। মাঠটা চলে গেলে গ্রামটাতো মরে বেঁচে থাকবে!'
- 'ঠিক বলেছ মা,আমি যাব ওদের সাথে কথা বলতে।'প্রকাশ বলল।
- 'শুধু তুমি না,আমিও যাব।'কঙ্কনা বলল।
- 'মা আমিও যাব।'আবদার করে বসল বড়ির নয়নের মণি কুমুদ।
- 'না মা,ওখানে ছোটোরা যায় না।'
- 'কেন মা,কি হয়েছে গেলে?'
- 'জেদ কোরো না কুমু।মায়ের কথাটা শোনো।'
মা-বাবার বারণে শেষ পর্যন্ত নিরস্ত হল কুমুদ।কঙ্কনা আর প্রকাশ বেরিয়ে পড়ল।তখন শিউলিতলায় সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশ মেঘলা থাকায় ছাতা নিয়েই বেরিয়েছে।বৃষ্টি না হলেও বাদলা হাওয়ায় বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছিল। প্রকাশ কঙ্কনাকে বলল,'তোমার তো ঠাণ্ডার ধাত,ঠাণ্ডা হাওয়ায় মাথা ধরে।তুমি না এলেই পারতে।'
কঙ্কনা হেসে বলল, 'আমায় নিয়ে ভাবতে হবে না আপনাকে প্রকাশবাবু।কিচ্ছু হবে না আমার।চলুন আপনি।'
- 'আচ্ছা বেশ,চলো।'
মাঠে পৌঁছে ওরা দেখল কোনো শহুরে বাবুটাবু নেই কোথাও।শুধু কয়েকটা লোক এসে জমিটাকে মাপজোক করছে।কঙ্কনা এগিয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল,প্রকাশ ওর হাতটা ধরে বলল, 'না কঙ্ক,এদের বলে কোনো লাভ নেই।এরা অধস্তন কর্মচারী। এরা সবটাই উর্ধ্বতনের আদেশ মেনে করছে।ওদের উর্ধ্বতনকেই ধরতে হবে।'
- 'মানে ওই শহরের লোকগুলো, কুমুদ যাদের গাড়ি থেকে নামতে দেখেছিল?'
- 'হ্যাঁ,ওরা।তুমি একটু দাঁড়াও,আমি আসছি।'
- 'কোথায় যাচ্ছ?'
- 'ওদের সাথে কথা বলে জানতে যাচ্ছি কে ওদের ওপরওয়ালা।'
- 'আমিও যাব,আমায় একা রেখে যাওয়া হবে না তোমার।'
- 'ঠিক আছে বাবা,চলো।'প্রকাশ হেসে কঙ্কনার হাতট ধরে এগিয়ে গেল লোকগুলোর দিকে।
- ' বলছি দাদা,একটু শুনবেন?'প্রকাশ বলল।
লোকগুলোর মধ্যে থেকেই একজন বেরিয়ে এসে বলল,' আমাদের বলছেন?''
- 'হ্যাঁ হ্যাঁ,আপনাদেরই বলছি।'
- 'হ্যাঁ বলুন।'
- 'আচ্ছা এখানে ফ্ল্যাটবাড়ি উঠবে তাই না?'
- ' হ্যাঁ দাদা,তবে আগেই বলে রাখি যদি বুকিং করতে চান তো আমাদের বলে কোনো লাভ নেই।স্যারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।'
- 'কিন্তু আপনাদের স্যার কই?তাঁকে কোথায় পাব?'
- 'একটু দাঁড়ান,'লোকটা বুকপকেট থেকে একটা কার্ড বের করে বলল,'এই নিন স্যারের কার্ড।ওতেই ফোন নাম্বার আছে।'কার্ডটা প্রকাশের হাতে দিল লোকটা।
- 'ও আচ্ছা,অনেক ধন্যবাদ, চলি।'প্রকাশ আর কঙ্কনা চলে এল।
- 'কঙ্ক,আজ সন্ধ্যে হয়ে এসেছে।এই ঠাণ্ডা হাওয়ায় বেশিক্ষণ বাইরে থাকা তোমার জন্য ভালো নয়।আজ ফিরে যাই।কাল সকালে যাবো ওই স্যারের সঙ্গে কথা বলতে।'
- 'আমার কিচ্ছু হবে না প্রকাশ। দেখ এটা গোটা গ্রামের ভালোমন্দের ব্যাপার।একমুহূর্তও দেরি করা ঠিক নয়।আজই যাব আমরা।এখনই।চলো।'
- 'ঠিক তো,কোনো অসুবিধা হবে না তো?'
- 'না,চলো এক্ষুণি।'
- 'আচ্ছা,তবে আমি কার্ডে দেওয়া এই নম্বরটায় ফোন করে দেখি।'
- 'হ্যাঁ।'
মোবাইলটা রেখে দিয়ে প্রকাশ বলল,'বুঝলে কঙ্ক,ওই স্যার ফোন ধরেছিলেন। দক্ষিণের মাঠটা থেকে আধকিলোমিটার হাঁটলে যে বড়ো রাস্তাটা পড়ে,জাতীয় সড়ক,ওই রাস্তার ওপারেই একটা হোটেল রেশমিতে ওঁরা উঠেছেন।'
- 'ও রেশমি? সেই বিয়ের পর আমাকে নিয়ে গিয়েছিলে, সেই হোটেল কাম রেস্তোরাঁটা?'
- 'হ্যাঁ গো,তোমার মনে আছে?সেতো আজ এগারো বছর আগের কথা।'
- 'মনে থাকবে না আবার?সেই দিনগুলোয় ভুল করেছিলাম,তাই.....'
- 'থাক না।সে ভুল তো অনেক আগেই শুধরে নিয়েছ। আর ভুল তো মানুষ মাত্রেই করে থাকে।আর তুমি তখন ছেলেমানুষ ছিলে।'
কঙ্কনা কিছু বলতে পারে না।শুধু নীরবে ভেজামাটির দিকে তাকিয়ে থাকে।প্রকাশ ওর গালে হাত দিয়ে মুখটা তুলতেই অবাক।
- 'কাঁদছ কেন কঙ্ক?সেদিনের কথা মনে করে?সত্যি তুমি এখনো ছেলেমানুষই রয়ে গেলে।'
- 'কত কষ্ট দিয়েছি আমি তোমাদের সবাইকে.....'
প্রকাশ কঙ্ককে বুকে টেনে নিয়ে বলে, 'তাতে কি হয়েছে?তুমি তো ইচ্ছা করে কিছু করোনি,তোমার তো দোষ ছিল না।তোমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে তার জন্য তো তুমি দায়ী নও।আর তুমি যা করেছিলে তোমার জায়গায় যেকোনো মেয়ে থাকলে তাই করত।'
- 'কিন্তু.... '
- 'না,আর নয়।এই ঠাণ্ডা হাওয়ায় কান্নাকাটি করে আবার জ্বর বাধিয়ো না।তাহলে কিন্তু আর নিয়ে যাব না এখন রেশমিতে।'
- 'না না,আর কাঁদব না।চলো চলো। '
ওরা রেশমিতে গেল।শহুরে বাবুদের মধ্যে কমবয়সী যে মানুষটি,তিনিই সকলের মধ্যে উচ্চপদস্থ। তাঁকেই সকলে স্যার বলে সম্বোধন করছিলেন।কঙ্কনারা হোটেলে যেতেই ওঁরা বললেন, 'আপনারাই দেখা করতে চান স্যারের সাথে?'
- 'হ্যাঁ।'
- 'ওকে থ্যাঙ্ক ইউ।চলো কঙ্ক।'
দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল প্রকাশ আর কঙ্ক।মানুষটি তখন একমনে মুখ গুঁজে একটা ফাইল দেখছিলেন।প্রকাশ ডাকল,'মিস্টার সেন!'
মিস্টার সেন মুখ না তুলেই বললেন,'ফ্ল্যাট বুকিং করবেন তো?'
- 'না না,ফ্ল্যাট বুকিং নয়,অন্য দরকারে এসেছি আপনার কাছে।'
এবার মিস্টার সেন মুখ তুললেন।বললেন,'অন্য দরকার?আমার কাছে?কিন্তু আপনি তো ফোনে বললেন....'
আর বলতে পারলেন না মিস্টার সেন।মনে হল তাঁর পায়ের তলা থেকে বুঝি মাটি সরে গেল,আর তিনি তলিয়ে গেলেন ঘনগভীর অন্ধকারে।
কঙ্কনারও একই অবস্থা। একসময়ের অত্যন্ত প্রিয় চেনা মুখ দেখে সে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল।বুকের মধ্যে এক তীব্র জ্বালা তাকে ক্ষতবিক্ষত করে দিল।প্রকাশের প্রেম-যত্নে যে জ্বালা প্রশমিত হয়েছিল,নতুন আঘাতে তা যেন আবার রক্তাক্ত হল।কঙ্কনার মনে হল,হে মাটি,দ্বিধাবিভক্ত হও,আর আমাকে লুকোতে দাও তোমার ওই গভীর কালো কুয়াশাচ্ছন্ন বুকে।
কারোর মুখে কথা সরে না।প্রকাশ বলতে লাগল,'হ্যাঁ ফোনে বলেছিলাম।কারণ তা না হলে আপনার কর্মচারীরা কি আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে দিতেন?'
কঙ্কনা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।তার সংজ্ঞাহীন দেহটা লুটিয়ে পড়ল মাটিতে।প্রকাশ ছুটে এসে কঙ্কনার মাথাটা নিজের কোলে নিয়ে চিৎকার করতে লাগল,'কঙ্ক!কি হল!চোখ খোলো!কে কোথায় আছেন প্লিজ কেউ জল দিন না!'
প্রকাশের চিৎকারে মিস্টার সেনের সম্বিৎ ফিরল।তিনিও ছুটে বাইরে গেলেন জলের ব্যবস্থা করতে।জল আনার পর প্রকাশ কঙ্কর চোখেমুখে জল ছিটিয়ে দিতে লাগল।
মিস্টার সেন বললেন,'খুব ভালোবাসেন আপনার স্ত্রীকে,তাই না?'
- 'দেখুন না,এমনিতেই ঠান্ডা হাওয়া লাগলে ওর শরীর খারাপ হয়।এইজন্যই ওকে আনতে চাইনি।'
মিস্টার সেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,'জানি,ওর মাইগ্রেনের প্রবলেম আছে।'
প্রকাশ অবাক হয়ে বলল,'হ্যাঁ,কিন্তু আপনি কি করে জানলেন? '
মিস্টার সেন বললেন,'আমি অনেকদিন আগে একজনকে চিনতাম,তারও মাইগ্রেন ছিল।তাই ওরোগের লক্ষণ আমার জানা।'
- 'ও আচ্ছা।'
যদিও কঙ্কনার জ্ঞান হারানোর কারণটা মিস্টার সেনের থেকে ভালো কেউ জানে না।
অনেক কষ্টে কঙ্কনা যখন চোখ মেলে তাকালো,প্রকাশের সেই আশঙ্কিত মুখটা চোখে পড়ল।কঙ্কনার জ্ঞান ফেরায় প্রকাশ আশ্বস্ত হল,'কঙ্ক!কেমন লাগছে এখন শরীরটা?'
কঙ্কনার চোখে জল এল।প্রকাশের হাতদুটো চেপে বলল,'আমায় প্লিজ বাড়ি নিয়ে চলো না!'
- 'দেখলে কেমন শরীরটা খারাপ করল?এইজন্যই আনতে চাইনি।চলো,বাড়িতে গিয়ে কিন্তু কমপ্লিটলি রেস্ট নেবে।'
মিস্টার সেনের মুখে তখনো কোনো কথা নেই।ব্যাপারটা সামাল দেওয়ার জন্য কঙ্কনাই মুখ খুলল এবার,'কিন্তু প্রকাশ, ওনার কাছে যে দরকারে এসেছিলাম আমরা,সেটাই তো মিটল না!'
- 'হ্যাঁ,দেখেছ!আমি একদম ভুলে গেছিলাম। শুনুন মিস্টার সেন,এখন তো আর কথা বলা সম্ভব নয়,কিন্তু কথাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আপনি প্লিজ কাল আসবেন আমাদের বাড়ি?'
- 'কাল?কালকের দিনটা যদিও ফাঁকা নেই আমার,তবুও আপনারা বলছেন যখন.... '
- হ্যাঁ প্লিজ।আপনাকে কাল আমাদের বাড়িতে এসে লাঞ্চ করতেই হবে,তারপর যা কথা বলার বলব।'
- 'ওকে,এত করে বলছেন যখন, নিশ্চয়ই যাব।আপনাদের বাড়ির এড্রেসটা দিয়ে যান।'
কঙ্কনার হাঁটবার ক্ষমতা ছিল না,তাই প্রকাশ ওকে পাঁজাকোলা করে বাড়ির পথ ধরল।তাই দেখে মিস্টার সেন হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেললেন,কিন্তু নিঃশ্বাসের শব্দটা শুধু কঙ্কনার কানেই এল।
পরেরদিন লাঞ্চের একটু আগেই হাজির হলেন মিস্টার সেন।লাঞ্চের সময় কঙ্কনাকে ডাইনিং এ আসতে দেখে রেগে গেলেন সান্ত্বনা, 'একি,তোকে না বললাম ঘরেই খাবার দিয়ে আসব,বাইরে এলি কেন?কারোর একটা কথাও কি তুই শুনবি না?'
- 'মা,আমি একদম ঠিক আছি এখন। তুমি এত চিন্তা কোরো না।'
- 'যা ভালো বুঝিস করগে।'সান্ত্বনা চলে গেলেন।
ডাইনিংএ এখন পরম যত্নে অতিথিসেবা চলছে।খাওয়া শেষ হওয়ার পর শুরু হল আলোচনা। বাড়িতে ডাকার আসল উদ্দেশ্যটা শুনে মিস্টার সেন বললেন,'সে কি করে সম্ভব? এখন কাজ বন্ধ করে দিলে কত টাকা লস হবে আমার ভাবতে পারছেন?'
- 'ঠিক আছে,টাকা নিয়ে ভাবতে হবে না আপনাকে।যত টাকা লাগে আমরা দেব।'
- 'তাই বুঝি?বাস করেন তো ধ্যাড়ধেড়ে গোবিন্দপুরে, আবার টাকার গরম দেখাচ্ছেন?'
- 'আমাদের টাকা সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই আপনার,তাই বলছেন।বলেই দেখুন না কত টাকা চাই আপনার?এই গ্রামের ভালোর জন্য যত টাকা দরকার আমরা খরচ করব।'
- 'বেশ, পনেরো কোটি টাকা।দিতে পারবেন?'সকলে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলেন।
- 'কি,টাকার পরিমাণটা শুনে মুখের তালু শুকিয়ে গেল তো?আগেই জানতাম। কি মনে করেন নিজেদের?রাজা-মহারাজা?হুঁ,মুরোদ নেই খালি বড়ো বড়ো কথা!যতসব ভিখিরি পার্টি! '
- 'শাট আপ!'কঙ্কনা চেঁচিয়ে উঠল।নিজের ঘরে গিয়েই আলমারি হাতড়ে বিয়ের সময় এবাড়ি থেকে পাওয়া হীরে বসানো সাতনরি হারটা বের করল ও।ডাইনিং এ এসেই হারটা ছুড়ে দিল মিস্টার সেনের মুখে,'এই নাও কাপুরুষ!এর দাম দেড় কোটি টাকা,এরকম আরো গোটা দশবারো গয়না আছে আমার -- নেবে?শুধু আমার কয়েকটা গয়না দিয়েই তোমার ওই পনেরো কোটি টাকা উঠে যাবে।আর কাউকে এক পয়সাও বের করতে হবে না!'
- 'একি করলি মা!ও হারটা এবাড়ির ঐতিহ্য, বংশানুক্রমে বাড়ির বৌয়েরা পায়।আমার শাশুড়িমা বিয়ের দিন হারটা আমার গলায় পরিয়েছিলেন, আর তোকে আমি,এমন হারটা ওকে দিচ্ছিস মা?'সান্ত্বনা অবাক স্বরে বললেন।
প্রকাশ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,কঙ্কনা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল,' তোমরা এখন যাও।আমি এই লোভী লোকটার সাথে একা কথা বলতে চাই।'
কিন্তু কিন্তু বলেও সবাই চলে গেল ডাইনিং হল থেকে।মিস্টার সেন বললেন, 'কঙ্ক,সারাজীবন কলকাতায় থেকে শেষে এক অজ পাড়াগাঁয়ে বিয়ে করলে?কেন শুনি?টাকার লোভে?'
- 'জাস্ট শাট আপ রাজীব। সবাইকে নিজের মতো কেন ভাবো?অন্যের দোষ না দেখে এবার নিজের দোষ দেখতে শেখো।'
- 'বুঝেছি,অনেক অভিমান জমে আছে না আমার ওপর?সেদিন রাগের মাথায় কি বলেছিলাম,তাই বলে আমায় ছেড়ে ওই প্রকাশকে বিয়ে করলে?কেন কঙ্ক?ওর মধ্যে এমন কি পেলে তুমি যেটা আমার মধ্যে নেই?'
- 'একদম চুপ!ওই মুখে তুমি প্রকাশের নাম নেবে না!ওর মতো হতে হলে তোমায় দশবার জন্মাতে হবে,ওর পায়ের ধুলোর যোগ্যও তুমি নও।আর অভিমান? না রাজীব,অভিমান নয়,ঘৃণা। আই যাস্ট হেট ইউ।রাজীব, সেই ক্লাস নাইন থেকে তুমি আর আমি একসাথে আঁকা শিখতাম,মনে পড়ে?আমরা দুজনেই দুজনকে ভালোবাসতাম,কিন্তু তোমার ছিল অত্যাধিক ইগো প্রবলেম।সেই নিয়ে অশান্তিও কিছু কম হয়নি আমাদের মধ্যে।কোনো প্রতিযোগিতায় আমার নাম তোমার আগে থাকলেই হল,ব্যস।কথা বলা বন্ধ,ফোন না ধরা,তারপর আমি তোমার বাড়ি গিয়ে তোমার অভিমান ভাঙাতাম। অনেক কষ্ট,যন্ত্রণা দিয়েছ তুমি আমায়।তবু কখনো তোমায় ছেড়ে যাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবিনি।নয় বছরের সম্পর্ক ছিল আমাদের,কলেজ-ইউনিভার্সিটিও এক ছিল আমাদের।তারপর ঘটল সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটা।সেদিন আমাদের বিয়ের দিন,সেদিনই সকালে রাজ্যস্তরের অঙ্কন প্রতিযোগিতার ফলাফল প্রকাশিত হল,আমি হলাম তৃতীয় আর তুমি প্রথম দশের মধ্যে ছিলেই না।তোমার অভিমান হয়েছে ভেবে আমি তোমায় ফোন করেছিলাম ফল প্রকাশের পরেই।তুমি ফোন ধরে স্বাভাবিকভাবেই কথা বললে আমার সাথে,আমি ভাবলাম যাক,ছেলেটা ম্যাচিওর হয়েছে তাহলে।তারপরেই শুরু হল গায়ে-হলুদ,স্নান আর বিকেলে কনে সাজানো। এতক্ষণ পর্যন্ত সব ঠিকঠাকই চলছিল, কিন্তু তুমি যে এতটা অমানুষ তাতো আমি স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি,ভালোবাসায় অন্ধ ছিলাম,তাই তোমার আসল রূপটা আমার চোখে পড়েনি।সেদিন সন্ধ্যায় আমি যখন কনের সাজে ক্যামেরার সামনে,আর সমস্ত গেস্টরাও মোটামুটি এসে গেছেন,তখনই এল ফোনটা।তোমার বাবা আমার বাবাকে ফোনে বললেন,'রাজুকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না,তন্নতন্ন করে শুধু বাড়ি নয়,গোটা পাড়া, সমস্ত আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের বাড়িও খোঁজা হয়েছে রমেশবাবু।কিন্তু রাজু কোত্থাও নেই!'সেই শুনে আশঙ্কিত হয়ে আমি ফোন করলাম তোমার মোবাইলে,আর নির্লজ্জের মতো ফোনটা তুললেও তুমি।আমি কাঁদতে কাঁদতে বললাম, 'রাজীব, প্লিজ ফিরে এস,তোমায় ছেড়ে আমি বাঁচব না!'তুমি বললে, 'দেখ কঙ্ক,তুমি মরলে কি বাঁচলে তাতে কিচ্ছু এসে যায় না আমার।বাট তোমাকে বিয়ে করা আমার পক্ষে কিছুতেই সম্ভব নয়।'তুমি ফোন কেটে দিলে।আমি আবার ফোন করলাম,কিন্তু তুমি ততক্ষণে ফোন সুইচ অফ করে দিয়েছ।বাড়িভর্তি লোকজনের সামনে সেদিন যে কতটা মাথানীচু হয়েছিল আমাদের সে শুধু আমরাই জানি।তারপর কয়েকটা মাস জীবনটা আমার নরক হয়ে গিয়েছিল।ঘর ছেড়ে বেরোতাম না,খেতাম না,মা জোর করে খাইয়ে দিত,রাতে ঘুম হত না,কারোর সাথে কথা বলতাম না,এমনকি আঁকা,যেটা ছোটো থেকে আমার ভালবাসা, সেটাকেও বিদায় দিলাম। চোখের তলায় কালি পড়ে গিয়েছিল,নিজেই নিজেকে চিনতে পারতাম না,ঘরের আয়নাটাও হাসত আমার এই করুণ পরিণতি দেখে।শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলিং করাতে বাধ্য হলেন বাবা।ডাক্তার বললেন , 'যদি সত্যিকারের ভালোবাসার কোনো মানুষ আসে আমার জীবনে,আমি সুস্থ হয়ে যাব।বাবা-মা আমার আবার বিয়ের চেষ্টা করতে লাগলেন, শেষে খুঁজে পেলেন এই চৌধুরী বাড়ি। আমি বিয়েতে একদমই মত দিইনি,কিন্তু বাবার চোখ ভুল করেনি প্রকাশকে চিনতে।আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিয়েটা হয়ে গেল।তুমি জানো,তখনও আমার মনে ক্ষীণ আশা ছিল যে তুমি ফিরে আসবে আমার কাছে।শুধু তোমার জন্য এবাড়ির সবাইকে বিয়ের পর কত অপমান করেছি আমি,কত অসম্মান করেছি,ওই রেশমি হোটেলে আমাদের রিসেপশনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল,সকলের সামনে সেদিন আমি প্রকাশকে চড় মারতেও দ্বিধাবোধ করিনি।কিন্তু জানো,প্রকাশ আমার হাত ছেড়ে দেয়নি,ও বলেছিল,'বুঝতে পারছি তোমার মনের কষ্টটা।তুমি একটা রত্ন,সত্যিই সে বড় দুর্ভাগা, যে তোমার এই নিখাদ ভালোবাসার মূল্য দিতে পারেনি।তুমি আমাকে নাই ভালোবাসলে,আমি তো বাসি তোমায়,তোমায় আমি আগলে রাখব সবসময়, কিন্তু কখনো জোর খাটাব না।'প্রকাশের মা-বাবাও আমার সব অন্যায় মুখ বুজে মেনে নিয়েছেন,কারণ আমি তাদের মেয়ে,বৌমা নই।মাত্র কদিনের পরিচয়ে প্রকাশ আমার মনের কষ্টটা বুঝল,অথচ তুমি এতগুলো বছরেও বোঝোনি।তারপর একদিন আমিও সবটা বুঝলাম, প্রকাশকে ভালোবাসতে শুরু করলাম, আর তোমাকে ঘৃণা। তুমি জানো,কুমুদকে আমি জন্ম দিইনি। ডাক্তার যেদিন বললেন আমি কোনোদিনও মা হতে পারব না,আর সমস্যাটাও আমারই, সেদিনও ওই চৌধুরী পরিবার ছিল আমার পাশে,কারণ আমি যে ও বাড়ির সকলের প্রাণ।একদিন যখন প্রকাশ আর আমি শীতের সন্ধ্যায় হাঁটছিলাম মেঠো পথ ধরে,হঠাৎ এক বাচ্চার কান্নার শব্দ পাই ঝোপের মধ্যে,গিয়ে দেখি একটা তিনমাসের দুধের শিশু কাঁদছে।প্রকাশ সেদিন ওকে আমার কোলে দিয়ে বলেছিল, 'এই নাও,আমাদের সন্তান। ওর নাম হোক কুমুদ।'একদিন প্রকাশের মা কে ভুল করে শাশুড়িমা বলে ফেলেছিলাম,সেই শুনে ওঁর কি রাগ!ভগবানকে অশেষ ধন্যবাদ যে সেদিন সন্ধ্যেয় আমার বিয়েটা হয়নি তোমার সাথে।'
- 'বুঝেছি,আমি তোমায় অনেক কষ্ট দিয়েছি,কিন্তু একটিবার কি ক্ষমা করা যায় না?'
- 'ক্ষমা?লজ্জা করে না তোমার?আজ আমার সমস্ত মনটা জুড়ে শুধু প্রকাশ আর প্রকাশ। তোমার জন্য শুধু একবুক ঘৃণা আর ধিক্কার ছাড়া আর কিছুই নেই গো,বিশ্বাস করো।'
- 'না না,তোমাকে যেতে হবে না আমার সাথে,নিজের জায়গা নিজের হাতেই নষ্ট করেছি আমি।কিন্তু তুমি শুধু একবার বলো যে তুমি আমায় ক্ষমা করেছ!না হলে যে মরেও শান্তি পাবোনা আমি।'
- 'বেশ,ক্ষমা করতে পারি,যদি আজই তোমার লোকজনদের নিয়ে শহরে ফিরে যাও,আর ওই মাঠটাকে মুক্তি দাও।'
- 'শুধু তাই নয়,আমার আরও একটা কাজ বাকি আছে।প্রকাশ প্লিজ এসো।'প্রকাশকে ডাকল রাজীব।প্রকাশ এলে কঙ্কনার ছুড়ে দেওয়া সাতনরি হারটা ওর হাতে দিয়ে বলল,'কোনো টাকা চাই না আমার।নিজের ভুল আমি বুঝতে পেরেছি।নাও,এটা পরিয়ে দাও তোমার স্ত্রীকে।তোমার হাতের ছোঁয়ায় পবিত্র হোক গয়নাটা,তবেই তো কঙ্কর গলায় দেবার যোগ্য হবে ওটা।'
পরেরদিন সকালে শোনা গেল,শহরের বাবুরা কোথায় যেন চলে গেছে,আর সমস্ত লোকজনও নিয়ে গেছে।রাজীব যে কঙ্ককে কথা দিয়েছে,এজীবনে কখনো তার চোখের সামনে আসবে না।
আজ কঙ্কর জন্মদিন।ভোরে উঠে ছাদে ঘুরে বেড়াচ্ছিল ও।সাতনরি হার গলায়,খোলা ভিজে চুল পিঠে,বাতাসে ভেসে আসা শিউলিফুলগুলো গায়ে মাথায় পড়ে ঠিক যেন জলপরীটি লাগছিল।প্রকাশ অবাক দৃষ্টিতে দেখতে দেখতে আনমনে বলে উঠল,'শিউলি বৌ।'

কালো মেয়ে
মেহেরুননেসা

আলো একটি কালো মেয়ে। আঁধার কালো বলতে যা বোঝায় এককথায় তাই।তথাকথিত শিক্ষার গন্ডি পেরিয়ে সে এখন প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা।দুই ছেলের পর মেয়ের স্বাদ আস্বাদন করতে গিয়ে এমন গভীর অন্ধকার নেমে আসবে সেটা হয়তো কেউ ভাবতেই পারেনি।সে যাইহোক মধ‍্যবিত্ত সংসারে মেয়ে হওয়া সুখের হলেও কালো মেয়ে হওয়া অভিশাপ । মেয়ে দেখে ঠাম্মি বিদ্রুপ করে নাম রেখেছিল 'আলো'।

কালো বলে আলোর স্কুলে বন্ধু সংখ্যা ছিল হাতে গোনা।অবশ্য তাতে কোনো আপত্তি ছিলনা তার।সাদা বন্ধুর চেয়ে প্রকৃত বন্ধু ঢের ভালো।কলেজে গিয়েও বন্ধু তার বাড়েনি বরং কমেছে।সবার জীবনে যেমন প্রেম আসে তারও এসেছে।বড়দার বন্ধু সুমিত যতবার বাড়িতে এসেছে কোনো না কোনো বাহানায় তার সামনে গিয়েছে বারবার।একটি বার ফিরেও দেখেনি সুমিত।তবু কত স্বপ্ন দেখেছে আলো তাকে নিয়ে, বেঁধেছে তাসের ঘর।

একদিন সুমিতের পিছু পিছু গিয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেলে-তোমায় ভালোবাসি,স্বপ্ন দেখি তোমায় নিয়ে.....
অট্টহাসি হেসেছে সে,হাসি যেন কিছুতেই থামেনা... মনে মনে কুঁকড়ে যায় কালো মেয়েটি।
অনেক চেষ্টায় হাসি থামিয়ে সে বলেছে-আমার জীবন যথেষ্ট আলোময়...এত আলো আমার সহ‍্য হবেনা....
মুখের ওপর চামড়ার অপমান অনেক শুনেছে আলো কিন্তু এইভাবে আত্মবিশ্বাসকে পিষে দিতে কেও পারেনি।

পড়া শেষ না হতেই সমন্ধ এসেছে বারবার।যতবার পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে পেটভরে খাওয়ার পর ঢেকুর তুলে জানিয়েছে ফোনে জানাবে।দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও ফোন আসেনি।

কলেজে ফাইনাল পরীক্ষার দিন বাবা কলেজে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলো, আজ নাকি পাত্র আসবে তাই সারাদিন একটু রূপচর্চা করতে হবে।'যো আজ্ঞা হুজুর' বলে বসে পড়ে আলো।যেই বাবা বেরিয়েছে পিছনের দরজা দিয়ে টুক্ করে পালিয়ে যায় সে।

ফিরে এসে বাবার রণচন্ডী রূপ দেখে ব‍্যাগ রেখেই কলের পাড়ে রাখা সাবানটা খসখস করে মুখে ঘষতে শুরু করে।মায়ের সবচেয়ে দামী হলুদ ঢাকাই জামদানিটা পরে চোখে ,ঠোঁটে মুখে একটু রং লাগায়।সে যতই সাজুক তার চামড়ার রংটাই বেশি প্রস্ফুটিত হচ্ছে।জল খাবার খাওয়ার পর যখন পাত্রীর ডাক এল তখন মায়ের কথা মতো ছোটো ছোটো পা করে লক্ষী হয়ে পাত্রের সামনে এসে বসে মাথাটা কেমন ঘুরে গেল আলোর।পাশে বড়দা থাকায় ধরে ফেললো সে ।চোখেমুখে জল দিতেই মুখের মেকআপ ধুয়ে ফোটা ফোটা হয়ে কাঁচা হলুদ শাড়ি পাকায় পরিণত হলো।পাত্র থতমত খেয়ে পালিয়ে বাঁচলো।

বাবা-মা বিয়ের আশা ছেড়েই দিল।বয়স্ক পাত্রও বুড়ো বয়সে রং চাই। হাতে পায়ে ধরেও কেউ রাজি হয়নি।আলোর বয়সী পাড়ার অন‍্য মেয়েরা টুপ টুপ করে বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়লো।দাদারাও আপন আপন সংসার পাতলো,শুধু আলোরই পাত্র জুটলোনা।মা মাঝে মাঝে রাগ করে বলে-ধিঙ্গি মেয়ে মরতে পারিসনা....
বাবা তো কথাই বলে না।আলো কতবার ভেবেওছে মরার কথা, কিন্তু বিধি বাঁধ সেধেছে।মরার ঠিক আগের মূহুর্তে বাঁচার প্রবল ইচ্ছা জেগেছে মনে।মনে মনে বলেছে-দূর মরবো কেন...কত জন কত কষ্টে বেঁচে আছে আর আমি কালো বলে মরবো....কালো জগতের আলো সেকি তারা বোঝে.....

মাস ছয়েক হলো আলো চাকরি পেয়েছে।এখন বাবাও কথা বলে মাও হাসে।ক'দিন ধরে বাড়ির আনাচে কানাচে সুমিত দার আনাগোনা বেড়ে গিয়েছে।

আজ স্কুল থেকে বাসে করে একটু বাজারে গিয়েছিল আলো বাবা-মায়ের জন্য শপিং করতে।বাড়ি ফিরতে একটু সন্ধ্যা হয়ে যায়।ফাঁকা রাস্তায় আসতে আসতে আমগাছটার পাশে খপ্ করে কেউ হাতটা ধরে আলোর।"ও...বাবা গো..."বলে চিৎকার করতেই মুখ চেপে ধরে সুমিত বলে-আমি গো আমি... তোমার স্বপ্নের রাজকুমার....
আলো যেন ধড়ে প্রাণ পেল,একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলল-তা তুমি এমন অন্ধকারে... কী মতলবে...
-আমার এই আন্ধকার জীবনে প্রদীপ জ্বালাতে আসবে আলো?
-এ বাবা...তোমার আলোময় জীবনে অন্ধকার নামলো কবে...
-তোমায় ভালোবেসে...
-কিন্তু আমি যে প্রদীপ জ্বালাতে পারিনা সুমিতদা....আমি এখন আসি আর প্রদীপের আশায় গাঢ় আঁধারের পিছনে ঘুরোনা তুমি...

সুক্তো

সুজাতা দে।

রাগ দুঃখ ভুলতে রান্না করে অনুরাগ। নানারকম রান্নার এক্সপেরিমেন্ট। সোমা বোঝে সব,কিছু বলে না। ওটাই ওর ধ্যান। মন হাল্কা হওয়ার ওষুধ। পঁচিশ বছরের বিবাহিত জীবনে অনুরাগের হাল হকিকত সবটাই প্রায় চেনা হয়ে গেছে সোমার।
দুরন্ত রাকাকে আর রানাকে পড়াশোনা না করার জন্য মারধর করতে চাইলে অনুরাগের পছন্দের ডিস এর উপকরণগুলো হাতের কাছে মজুত করে দিয়ে অনুরাগ কে কিচেনে পাঠিয়ে দিত সোমা।
আধঘন্টা,পর ফ্রেশ রান্নার সাথে ফ্রেশ অনুরাগ বেরিয়ে আসতো কিচেন থেকে।

বাঙ্গালোরে দুই ছেলেই আজ কেরিয়ার নিয়ে প্রতিষ্ঠিত। খুঁতখুঁতে বাবার চেয়ে মা সোমাই তাদের বেশি বন্ধু। তাই আজকাল ওদের নিয়ে আর বেশি মাথা ঘামায় না অনুরাগ।
কলেজের নতুন নতুন ব্যাচে আসছে ছাত্রীরা। শেষ বয়সে কারো প্রেমে ট্রেমে পড়ল নাকি! মান অভিমান কেস নাকি? আগে সবটাই শেয়ার করতো সোমার সাথে। কলেজ কোচিন সেরে একগাদা বাজার নিয়ে বাড়িতে ঢুকেই সোজা রান্নাঘরে। ডেঙ্গুতে কাবু সোমা বিছানায় শুয়ে চুপচাপ দেখে যাচ্ছে সব।

রাতে খেতে বসে অবাক সোমা পাতে সুক্তো দেখে। রাতে শুকতো খেয়ে নেই তুমি জানো না? বলেই মনে পড়ে যায় প্র‍য়াত রীনার হাসিমুখটা। তোমার এইসব পুরোনো ভাবনা এবার ছাড়ো তো মা। কি হয় রাতে সুক্তো খেলে? আমি খাব,আমার খুউব ভালো লাগে তোমার হাতের সুক্তো রান্নাটা। ওবাড়িতে একেবারে খেতেই পাইনা।

মেয়ে চলে যাবার পর থেকে আর কোনোদিন সুক্তো রাঁধেনি সোমা। রান্নাঘরে স্টোভ ফেটে পুড়ে গেছে তাদের বৌমা। পুলিশের কাছে এমনই বয়ান দিয়ে ছাড় পেয়ে গিয়েছিলল রীনার শ্বশুরভাড়ির ক্ষমতাবান বিত্তশালী লোকজন।

সোমা নিজে মা হয়ে এই কবছরেই কিকরে ভুলে গেল আজ প্র‍য়াত কন্যা রীনার জন্মদিন! কঠিন অনুরাগের চোখেও আজ জল সোমার সপ্রশ্ন দৃষ্টির উত্তরে!

শরৎ_এলো
যুবরাজ_পাল_রাজু
.
হঠাৎ দেখি নীলাকাশে
সাদা তুলো ভাসছে বাতাসে
হৃদয়ে কাশ দোলা দিলো।
বুঝলাম, শরৎ এলো।

শিউলিতে বাতাস মো মো
যেটা নিবি আজ সেটা ছোঁ
সুগন্ধি সবার মন মাতালো।
চেয়ে দেখি, শরৎ এলো।

ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির শেষে
নীল রঙ ছড়ালো আকাশে
হালকা শীত পরশ বুলালো।
বুঝে গেছি, শরৎ এলো।

ঐ বাজলো মায়ের আগমণীর সুর
মাতম ছড়ালো তা দূর বহুদূর
পূজোর ঘন্টা ঐ বেজেই গেলো।
হৈ হৈ রবে ঐ শরৎ এলো।

শীত গাছের বীজ হল বপন
হিম বুড়ি দেখছে স্বপন
কুয়াশার মেঘ ছড়িয়ে দিলো।
এই বুঝি শরৎ এলো।
.
(রচনাকালঃ ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং)

 

দেশ ছেড়ে বিদেশে
নরেন্দ্র নাথ রায়।

ছাড়িয়া পিতা মাতার ঘর,
আসিয়া বিদেশে,
মায়ার সংসার চৌরাস্তায় কাঁদি
জীবন বেলার শেষে।
পূরবের যে জীবন রবি,
পশ্চিমে ঐ গেল ডুবি,
বিগত দিনের কথা ভাবি,
মরণ বেলায় বসে।।

চোরাশি লক্ষ যোনি ভেদ করে,
আসিয়া মানব কুলে।
মোহ মায়ার সংসার খেলায়,
সব ই আছি ভূলে।
সংসারে করে ------অভিনয়,
হাওয়ার ঘরে জীবনের সময়,
যত ই করো অনুনয় বিনয়,
বৃথাই পরামিশে।।

ঐ কালের চিঠি তোমার কাছে,
আসবে যেদিন ছুটে,
স্নেহ প্রীতি ভালবাসা ----------
যাবে সেদিন -----মিটে।
জীবন বেলা কমে প্রতিদিন,
বিদায় নেবার নাই বেশি দিন,
যমরাজ বাজিয়ে শেষের ওবীণ,
আসছে যে পাশে।।

ভাড়াটে বাড়ি থেকে গেলাম,
কিছু দিন বিদেশে,
নরেন বলে কেমনে ------যাই,
পিতা মাতার দেশে,।
এবার চলো নিয়ে ------বিদায়,
আগে তুমি ছিলে -----যেথায়,
দেখোনা আর পিছে তাকায়,
থেকে, মোহ বিলাসে।।

#গল্প
#শক্তি
#অমিতাভ_রায়

-

আজ নবমী। পুজো তো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে৷ পুজোবাড়িতে ঢুকতে ঢুকতে কান্না পেয়ে যাচ্ছিলো নীলাঞ্জনার। বর নিজেও আসে নি- ছেলে- মেয়েকেও আসতে দেয় নি। এতো বছর বিয়ের পরেও গুপ্ত পরিবারে ওর কোনো জায়গাই হয় নি। বর তার পি.এ কাম বান্ধবীকে নিয়েই ব্যস্ত। তার মনে কোনো জায়গাই নেই নীলাঞ্জনার। শাশুড়ি তো ওকে পাত্তাই দেয় না। ছেলে-মেয়েও সেজন্য ওকে বিশেষ মানে না। একমাত্র শ্বশুর ওকে পছন্দ করে। কিন্তু বৌয়ের ভয়ে তেমন কিছু বলতে পারে না। বাপের বাড়ির পুজো সুপ্রাচীন - ঐতিহ্যপূর্ণ। কিন্তু, শাশুড়ি বা বর কেউই ওকে পুজোয় এখানে আসতে দিতে চায় না। বাপের বাড়ির পুজোয় আসতে ওর লজ্জাও লাগে। বর আর ছেলে-মেয়েকে না দেখে সবাই প্রশ্ন করে। এই প্রশ্নের উত্তর ও দেবে কি করে? ওর মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে আত্মহত্যা করে সব ঝামেলা শেষ করে দেয়। কিন্তু,পারে না।

ভাগ্যিস অঞ্জলি দেওয়া এখন চলছে। সে জন্যই পুজো বাড়িতেই সোজা চলে এসেছে নীলাঞ্জনা। অঞ্জলি না দিতে পারলে ওর মন খারাপ হয়ে যেতো। অঞ্জলি দিয়ে লুচি-আলুর তরকারি আর মাখা সন্দেশ খেয়ে পুজো দালানে বসে সবার সঙ্গে গল্প করতে করতে সব ভুলে গেলো নীলাঞ্জনা। সন্ধেবেলায় একশো আটটা প্রদীপ জ্বালাতে বেশ ভালো লাগলো নীলাঞ্জনার। অনেকেই চলে গেলো তারপর। দশমীতে অনেকেই থাকবে না। পুজো দালানে বসে গল্প করছিলো ওরা কয়েকজন। জেঠিমা ওকে খুব স্নেহ করে। নীলাঞ্জনার মাথায় হাত বুলিয়ে বললো," রোজ আদ্যাস্তোত্র পড়িস তো?" এ বাড়িতে আদ্যাস্তোত্র পড়ার একটা রেওয়াজ আছে। জেঠিমা আদ্যাস্তোত্র পড়তে লাগলো। তখন পুজো দালান একেবারে ফাঁকা। খোলা আকাশের তলায় বসে আদ্যাস্তোত্র শুনতে শুনতে কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে হারিয়ে যেতে থাকলো নীলাঞ্জনা।

ঘোরের মধ্যে নীলাঞ্জনার কানে ভেসে আসে," নারায়ণী শীর্ষদেশে সর্বাঙ্গে সিংহবাহিনী। " অদ্ভুত একটা অনুভূতি হয় নীলাঞ্জনার। ও তো একা নয়। স্বয়ং দেবী ওর সঙ্গে রয়েছেন। কানে ভেসে আসে," শিবদূতী উগ্রচন্ডা প্রত্যঙ্গে পরমেশ্বরী"। আদ্যাস্তোত্র উচ্চারণ করতে করতে নীলাঞ্জনা তাকায় প্রতিমার দিকে। সিংহবাহিনীর মুখে যেন মৃদু হাসির রেখা। দেবী যেন ওর দিকেই তাকিয়ে রয়েছেন। আদ্যাস্তোত্র পাঠের পরে জেঠিমা বললো, " মেয়েরাই তো শক্তি রে।" নীলাঞ্জনার মনে হলো ও বোধহয় বদলে যাচ্ছে। এই খোলা আকাশের তলায় নির্জন পুজো দালানে দাঁড়িয়ে ওর মনে হলো," মেয়েরাই তো দুর্গা। ভয় কিসের? " অদ্ভুতভাবেই একটা শক্তি যেন ও নিজের মধ্যে অনুভব করছে। ও কেন আত্মহত্যা করবে? ও বদলে দেবে সব কিছু। ও হারবে না- কিছুতেই হারবে না।

বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় বিসর্জন হয়ে যাওয়ার পরে পুজোবাড়ি ফাঁকা হয়ে যায়। পুজো ছাড়া অন্যসময় এ বাড়ি দেখলে মনে হয় না কেউ থাকে। দুটো ঘরে থাকে তো শুধু জেঠু-জেঠিমা। আর কিছু কাজের লোক। বিশেষ সারানোও হয় না এই বাড়ি। বিশাল এই বাড়ি -সারানোর খরচও যে অনেক! নীলাঞ্জনার বিয়ের পরেই ওর বাবা মারা যায়। মা চলে যায় মামাবাড়িতে। সেখান থেকেই পুজোর সময় এ বাড়ি আসে। এখানে এলে বাবার স্মৃতি খুব মনে পড়ে নীলাঞ্জনার। বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় নতুন কাপড় পড়ে মাকে প্রণাম করে ও। মা ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। মেয়ে যে কতো দুঃখী তা মা ছাড়া আর কে জানবে। জেঠু আর জেঠিমাকে প্রণাম করতে জেঠিমা বলে," জানিস তো, সবার শেষে যাস তুই। আর তুই চলে গেলে বাড়ি একেবারে ধূধূ করে। মেয়ে চলে গেলে কি ভালো লাগে রে? তোর জন্য পান্তুয়া আনিয়ে রেখেছি। খেয়ে নে। " পান্তুয়া খুব পছন্দ করে নীলাঞ্জনা। নিঃসন্তান জেঠিমা ওকেই যে নিজের মেয়ের মতো ভালবাসে। পরের দিন সকালে যাওয়ার আগে সবাইকে প্রণাম করে নীলাঞ্জনা। মা কিছু না বলে শুধু চোখের জল ফেলে। জেঠু ওকে জড়িয়ে ধরে ধরা ধরা গলায় বলে," যতদিন বুড়ো-বুড়ি বেঁচে আছি- ততদিন যেন আসতে ভুলিস না মা। " জেঠিমা ওর গালের উপর একটা চুমু খায়। তারপর বলে," ভুলিস না- তোরা এ বাড়ির মেয়েরা শক্তি। হাল ছাড়বি না। " মাথা নেড়ে এগিয়ে যায় নীলাঞ্জনা। পিছন ফিরে শেষবারের মতো তাকায়। বিশাল জীর্ণ বাড়ি আর তিন বুড়ো-বুড়ি ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। গলায় কি যেন একটা দলা পাকিয়ে আসে। চোখ ঝাপসা হয়ে যায়। চোখ ফিরিয়ে নেয় নীলাঞ্জনা। বিড়বিড় করে বলে, " এ বাড়ির মেয়েরা তো শক্তি। ঠিক বলেছো জেঠিমা। আমি আর আত্মহত্যার কথা ভাববো না-আমি হারতে চাই না। " শরতের সোনালি আকাশের রোদ্দুর গায়ে মেখে এগিয়ে যায় ও।

#খোলা_চিঠি
---#সন্মিতা_দেবনাথ
----------------------------

মা ,

তোমাকে কতদিন চিঠি লেখা হয় না । ওসব পাট এখন গেছে উঠে । মুঠোফোনে সারাদিনে এক কি দুইবার খোঁজ নিই তোমার । তার বেশী ফোন মানে নিতান্তই প্রয়োজনে । তোমার শরীর খারাপ শুনলে সারাদিন ভাবি না জানি কেমন আছ ? কিন্তু সময়ের সাঁড়াশি চাপে কথারা মুখ বোজে । জানি তুমি বলবে মেয়েরা তো বিয়ের পরে পর হয়ে যায় । বুঝি এ তোমার অভিমান । কেনই বা হবে না বলো ? যাকে দশ মাস গর্ভে তিল তিল করে বড়ো করে জন্ম দিলে , দীর্ঘ বছর কত কষ্ট করে , যত্ন করে বড়ো করে তুললে , তাকে কিনা হঠাৎ একদিন সামাজিক রীতির দোহাই দিয়ে একেবারে অন্য ঘরে পাঠিয়ে দিলে ! কার উপর অভিমান করো মা ? আমার নাকি সমাজের উপর ? আমি জানি না সেই ছোট্টবেলায় কত রাত আমাকে কোলে নিয়ে জেগে থেকেছ , আমাকে বক্ষসুধা দিয়ে ঘুম পাড়িয়েছ । যখন শরীর খারাপ হত , কি করতে তখন ? না জানি কত দুঃশ্চিন্তায় , চোখের জলে রাত ভোর হয়েছে তোমার । জানিনা মা এসব আমি । কিচ্ছু জানি না । শুধু তোমার কোলের উষ্ণতায় পরম নিশ্চিন্তে থেকেছি । জেনেছি তুমি আছ - তাহলেই সব ঠিক হয়ে যাবে । কত খুশি হতাম তুমি আছ বলে । তখন সে খুশি অনুভব করিনি । সেই খুশিকে তো জন্ম থেকেই পেয়ে অভ্যস্ত তাই । আজ সেই অভ্যাস লুপ্ত হওয়ার পরে অনুভব করি খুশিটা কত মধুর ছিল । সেই দিনগুলো হারানোর কষ্টটা বুকে আজ বড়ো বাজে । তোমারও কি এমন কষ্ট হয় মা ? কোন কষ্টটা বেশী ছিল ? যেদিন অপরিসীম যন্ত্রণা সয়ে আমাকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছিলে , সেদিন ? নাকি যেদিন আমি তোমাকে ছেড়ে চলে এলাম সেদিন ?

আচ্ছা মা , তোমার মনে আছে যখন তুমি নিজে না খেয়ে আমার মুখে ভাত তুলে দিতে , আর আমি তৃপ্তি করে খেতাম । তখন তোমার কেমন লাগতো ? যখন খুব শীতে আমাকে জড়িয়ে নিয়ে ঘুম পাড়াতে । তখন আমার সেই ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে তোমার বুকের ভিতরটা ঠিক কেমন হত ? যেদিন প্রথম "মা" বলে ডেকেছিলাম সেদিন কি তুমি আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিলে ? যেদিন প্রথম আমার হাত ধরে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে হাঁটা শেখালে ? যেদিন প্রথম হাত ধরে লেখা শেখালে ? মনে আছে মা সেই দিনগুলোর কথা ? বলো না , একটু শুনি তোমার সেই ভালোবাসার ভরা দিনগুলোর কথা । কত শীত - গ্রীষ্ম - বসন্ত - বর্ষার দিনের কথা.....কত - কত দিনের সেসব মধুর স্মৃতিকথা । সব মনে আছে আমার - জ্বর হলে তোমাকে ঠায় বসে থাকতে হত আমার মাথার পাশে । উঠতেই দিতাম না তোমাকে । তোমার হাতের ছোঁয়া মাথায় লাগলেই জ্বর শরীরের জ্বালা যন্ত্রণা কত কমে যেত । কোনো ওষুধে এত সহজে কমত ? এখন জ্বর হলে কেউ অমন করে মাথায় হাত বোলায় না আর । চোখ জ্বালা করে শরীর তাপে পুড়ে যায় , তবু মা তোমার সেই শীতল স্পর্শ এখন আর পাই না । জানো , এখন আমি পছন্দের জিনিস তৃপ্তি করে খেতেই ভুলে গেছি । আমি যে এখন একটা বাড়ির বউ । আগে তো সবার খাওয়া হোক , তারপর আমি । এখন সবাই আমার ভালোবাসাপূর্ণ হাতের স্পর্শ চায় ; কেউ দেয় না । তবু এখন আর দুঃখ হয় না ; কবে যে এত বড় হয়ে গেলাম ! সেই টলমল পায়ে ছোট্ট দুটো দাঁত বের করে হাসিমাখা মুখে এগিয়ে যেতাম তোমার দিকে , সেই ছোট্ট আমি কিভাবে যে এতটা বড় হয়ে গেলাম - যেখানে শুধুই দিয়েই যাওয়া , পাওয়ার নেই কিচ্ছু । সময়ের চৌকাঠে হোঁচট খেতে খেতে কতবার পড়ে গেছি , আবার উঠে দাঁড়িয়েছি পথ চলতে হবে বলে । প্রতিবার পড়ার পরে রক্ত ঝরেছে আর তাতেই কখন যেন ধীরে ধীরে রক্তের রঙ নরম লাল থেকে কালচে হয়ে গেছে টের পাইনি । তুমি যতদিন ছিলে মা , আমাকে পড়ার আগেই ধরে নিতে । তাই সময় জব্দ করতে পারেনি । যেদিন থেকে তোমার পাতা আঁচলে এক মুঠো চাল ছুঁড়ে সব ঋণ শোধ করে দিয়ে চলে এলাম সেদিন থেকে সময় তার সমস্ত শোধ তুলছে । আচ্ছা মা , তোমার একটা ঋণও কি শোধ করতে পারব ? এই জন্মে কেন কোন জন্মেই কি পারব ? মা , অনেক কথা যন্ত্রে বলা যায় না । চিঠিতেই কেবল একান্তে বলা যায় । তোমাকে যে ভীষণ ভালোবাসি মা । ঠিক যতটা ভালোবাসলে নিজের থেকে আলাদা করা যায় না , ঠিক ততটা ।

কবে বলো না মা , আবার সেই ছোট্টবেলার মত আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করবে ? কবে মা জ্বর হলেই মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে ? কবে বলো বন্ধু হয়ে মনের কথা জানতে চাইবে ? জানতে চাইলেও কি বলতে পারব আর ? আজ খুব ফিরে পেতে ইচ্ছে করছে ছেলেবেলার দিনগুলো । ভীষণ ইচ্ছে করছে তোমার আদর খেতে । ছোটবেলায় ভেবেছি কবে তোমার মত বড় হব । এখন ভাবি আবার ছোট হয়ে তোমার কোলে ফিরে যাই । কিন্তু সময়ের স্রোত যে বহমান , সে পিছোয় না , এগোয় । তাই চাই পরের জন্মেও যেন মেয়ে হয়ে আবার তোমার কোলেই ফিরতে পারি মা । তুমি ভালো থেকো । হাসিতে ভরা থাক তোমার ভুবন । যে আত্মত্যাগ তুমি করেছ আমাকে মানুষ করতে , সেই ত্যাগের যথার্থ মর্যাদা ভগবান তোমাকে দিক ।

ইতি -
তোমার বড় হয়ে ওঠা মেয়ে।

#Copyright_protected_by
দক্ষিণের জানলা - কলমে সন্মিতা

সুজয়দা_পুঁচকি_
অনির্বাণ চক্রবর্ত্তী

-"কিরে, কেমন আছিস?"
ভীষণ পরিচিত কন্ঠস্বরটা কানে আসতেই একরাশ অপ্রত্যাশিত আনন্দে ঘুরে তাকায় পুঁচকি।
-"সুজয়দা! তু...তুমি! তোমার না অফিসে খুব চাপ! দাদা যে বললো এবার পুজোয় তুমি আসতে পারবে না!"
-"হুম, চলেই এলাম। কেন তোর পছন্দ হয়নি বুঝি?" স্বভাবসিদ্ধ গাম্ভীর্যে পুঁচকির দিকে প্রশ্নবান ছুঁড়ে দেয় সুজয়।
-"মোটেই না! তবে আমার খুশি হওয়া না হওয়াতে কার কি আসে যায়! গত বছর পুজোর পর চাকরি পেয়ে সেই যে ইউ.এস.এ. চলে গেলে, তারপর থেকে তো কোনো যোগাযোগ করোনি। ভুল করেও কোনোদিন খোঁজই নাওনি আমার।" গাল ফোলায় পুঁচকি।
-"বলিস কি? তোর দাদার সাথে তো স্কাইপে প্রায়শই কথা হতো।"
-"ওহ। হ‍্যাঁ, ভুলেই গেছিলাম। তুমি দাদার বন্ধু। আমি তো আর...."
মুখ ঘুরিয়ে ঠাকুর দালান থেকে একটু দূরে সরে আসে পুঁচকি। একটা থামের গায়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়ায়। বাড়ির সবাই অষ্টমীর সন্ধ‍্যারতির তোড়জোড়ে ব‍্যস্ত হবার দরুন এদিকটা বেশ নিস্তব্ধ। আবছা আলোয় হলুদ জামদানীতে পুঁচকিকে কেমন মোহময়ী লাগছে। পিছন দিক থেকে ধীর পায়ে এগিয়ে আসে সুজয়। এক হাত দূরত্বে চুপটি করে দাঁড়ায়। নির্লিপ্ত ভাবে বলে, "শাড়িতে তোকে সুন্দর লাগে। ওই জিন্স-টপ পরা ডিপিটায় একটুও মানাচ্ছে না।"
-"সুজয়দা!" চমকে ওঠে পুঁচকি, "তুমি আমায় ফেসবুকে ফলো করো?! তাহলে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাওনি কেন? হুম!"
-"বেশ করেছি! কেন পাঠাবো? ওই সৌম‍্যদীপ বলে ছেলেটার সাথে কিসের এতো ভাব তোর, শুনি?! সব পোষ্টে কমেন্ট করে কেন?"
-"উফ্ সুজয়দা! তুমি না!" অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে পুঁচকি, "ও আমার ক্লাসমেট। ওকে তো আমি ভাই বলে ডাকি।"
-"থাক। অতো ভাই বানাতে হবে না। তোমার নিজের দাদা আছে। সেই যথেষ্ট!"
-"তুমি একটুও বদলাওনি সুজয়দা। সেই আগের মতোই আছো। এখনও আমার ওপর রাগ হলে 'তুই' থেকে 'তুমি'তে চলে যাও।"
চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সুজয়। কয়েক মূহুর্ত পর অস্ফুটে বলে ওটে, "ভালো হয়েছে!"
ক্ষণিকের নিস্তব্ধতা চিরে দূর হতে ভেসে আসে আরতির ঘন্টাধ্বনি। হঠাৎ পুঁচকি বলে ওঠে, "অ্যাই সুজয়দা, চলো ঠাকুর দেখে আসি।"
-"কোথা থেকে?"
-"কেন আমাদের প্রিয় উত্তর কলকাতা। সেই শোভাবাজার রাজবাড়ি, বাগবাজার সার্বজনীন, কুমোরটুলি ঘাট, গঙ্গার পাড়...। এবার কিন্তু বাইক নেবে না। পায়ে হেঁটে ঘুরবো।"
-"চল।"
ওরা পা বাড়ায়। ঠিক তখনই দোতলার বারান্দা থেকে ডাক দেয় পুঁচকির দাদা, "এই সুজয়, পুঁচকি! ঠাকুর দেখতে যাবি না?"
ঘুরে তাকায় সুজয়। মুচকি হেসে জবাব দেয়, "তুই থাক। আমরা যাই!"

(সমাপ্ত)

#চিঠি
#সুচন্দ্রা_চক্রবর্তী

প্রিয় অ্যানি,
জানি এ চিঠি তোমার কাছে ঠিকই পৌঁছবে।কেমন আছ তুমি?নিশ্চয়ই ভালোই আছো।আজও বুঝি কলমের শেষ কালিটুকু তোমার প্রতিভা নিংড়ে নেয়,সাদা পাতাগুলোয় মহীরুহর মতো বেড়ে ওঠে কবিতার চারাগাছ?আজও বুঝি বাংলাভাষার প্রতি অবহেলা দেখলে একইভাবে চোখ-কান লাল হয়ে যায়?হয়তো আজও সবই হয়,শুধু সেসব আমার দেখার পরিধি থেকে বহু মাইল দূরে।এ চিঠিও তো লেখা তোমার কাছেই শেখা।তুমি আজও আগেই মতই শাড়ির সাথে কাজল পরে তোমার বাড়ির ব্যালকনিতে বিকেলবেলায় দাঁড়াও আমায় দেখবে বলে?আজও কি সবার অলক্ষ্যে তর্জনীতে এক চিলতে সিঁদুর নিয়ে আয়নার সামনে রাঙামুখে দাঁড়াও?এই দেখলে,বড় ভুল করে ফেললাম।সিঁদুর যে অভিশাপ তোমার জীবনের!আমি কথা দিলাম,আর কোনোদিন সিঁদুরের নাম নেব না।
আচ্ছা অ্যানি,তোমার আমাদের দেখা হওয়ার প্রথম দিনটার কথা মনে পড়ে?সেই যে কলেজে ভর্তি হওয়ার দিনটা?তোমার সেই কাজল পরা চোখদুটো সেদিন আমায় পাগল করে তুলেছিল,কালোমেঘে ঢাকা সেই বৃষ্টিদিনে একরাশ ভিজে কালো চুল পিঠে মেলে যেদিন কলেজের গেট পেরোতে,সেদিন আমি বিশ্বাস করেছিলাম,ছোটবেলায় মম-ড্যাডির বলা ফেয়ারি টেলগুলো মিথ্যা নয়,ফেয়ারি সত্যিই আছে।অনিন্দিতা, তুমিও বুঝেছিলে আমার মনের কথা।তারপর কতদিন-মাস-বছর দেখতে দেখতে কেটে গেল।
আমি তোমায় গির্জায় নিয়ে গেছি,তুমি আমায় নিয়ে গেছ মন্দিরে।আমার ড্যাড ব্রিটেন অধিবাসী হলেও মম ছিলেন ইন্ডিয়ান,তাই তোমায় দেখে বড্ড খুশি হয়েছিলেন।যদিও উনি ছিলেন অবাঙালি।আমাকে বাংলা শেখানোর জন্য সে কি প্রচেষ্টা তোমার!সময় পেলেই চলে আসতে আমাদের পার্ক স্ট্রিটের বাড়ি বাংলা শেখাতে।মাঝে মাঝে পড়াও ধরতে,আর পড়া ভুল হলেই,'জন,ঠিক করে পড়ো না কেন!' বলে একরাশ অভিমান নিয়ে মুখ ফেরাতে।আমি তোমার জন্য ওয়ালনাট ব্রাউনি বানিয়ে আনতাম তখন,আর অমনি সব রাগ তোমার ফানুসের মতই উড়ে যেত।তুমিও কতবার ঘুগনি খাইয়েছ আমায়,মনে পড়ে?কিন্তু আফসোস তোমার বাড়ি আমার কখনো যাওয়া হয়নি, রক্ষণশীল পরিবারে মেয়েদের ছেলেবন্ধুরা অ্যালাওড ছিল না।
কিন্তু এতকিছুতেও শেষরক্ষা হল না।তোমার এক আত্মীয় আমাদের একদিন এসপ্ল্যানেডে হাত ধরে ঘুরতে দেখে ফেললেন।সেদিনই কলেজ আসা বন্ধ হল তোমার।
তারপর তোমারই এক বান্ধবী জানাল,তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে তোমায় অন্য এক বনেদী পরিবারে।একদিন অনেক কষ্টে দেখাও করতে গিয়েছিলাম।তুমিও ছদ্মবেশে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে,বলেছিলে,'কেউ জোর করেনি আমার ওপর।স্ব ইচ্ছায় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি।'
কিন্তু অনিন্দিতা, যতটা বোকা তুমি আমায় ভাবো,ততটা হয়ত আমি নই।তোমার চোখের তলার কালি চোখ এড়ায়নি আমার,এড়ায়নি ওই কালো চোখে কাজলের অনুপস্থিতিও।কিন্তু হাজার অনুরোধেও তুমি স্বীকার করলে না সত্যিটা।আমায় চলে যেতে বললে,বললে আমি গেলেই তুমি সুখি হবে।এটাও বললে,'তেলে জলে মিশ খায় না।'
কতটা প্রেশার তোমার ওপর ক্রিয়েট করা হয়েছিল বুঝতে আমার বাকি ছিল না।তোমার সেই বান্ধবীর মারফতই খবর পাই যে তোমার বাড়ি থেকে বলা হয়েছিল এ বিয়ে তুমি না করলে আমায় খুন করে লাশ গুম করে দেওয়া হবে।আর সেটা যে খুব একটা অসম্ভব নয় ওরকম একটা প্রভাবশালী পরিবারের পক্ষে,তা তুমি জানতে।
তারপর পাঁচছয় মাস কেটে গেল তোমার বিয়ের পর।হঠাৎ এক অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ এল,'জন আমায় বাঁচাও!ওরা আমায় মেরে ফেলবে!'
তোমার একান্তে লেখা ডায়েরিটা হঠাৎ তোমার স্বামীর হাতে পড়ে গেল,ব্যস তারপরেই শুরু হল তোমার ওপর অকথ্য অত্যাচার।বাপেরবাড়িতে কাউকে কিছু জানাওনি তুমি অভিমানে,হয়ত ভরসা পাওনি।
মেসেজের সাথে যে ছবিটা আমায় পাঠিয়েছিলে তাতে তোমার নাক মুখ বেয়ে কালচে রক্ত পড়ছিল, কপালের এক চিলতে সিঁদুর অজান্তেই চাপা পড়ে গেছিল কালসিটের আড়ালে।ওরা ভেবেছিল গোপনে বুঝি আজও যোগাযোগ আছে তোমার আমার সাথে।
পুলিশ নিয়ে তোমার শ্বশুরবাড়ি যেতে আমি এক মুহূর্তও দেরি করিনি,কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।বাড়িতে কেউ নেই,গোটা বাড়ি ফাঁকা,খালি তোমার বাপের বাড়ি থেকে আনা কাকাতুয়াটা রয়েছে,আর তুমি পরম শান্তিতে পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছো,যে ঘুম পৃথিবীর কোনো ডাক্তারও ভাঙাতে পারবে না,আর তোমার সাধের কাকাতুয়াটা সমানে বলে যাচ্ছে,মেরো না!মেরো না!
কিন্তু তুমি আজও আছো,আমি জানি।আমার কাছে সারাজীবন তুমি জীবনঝর্ণার উৎস হয়ে থেকে যাবে,যার জল কখনো ফুরোয় না,ফুরোতে নেই অনিন্দিতা,অ্যানি।
— ইতি তোমার
জন

নবজাগরণ
প্রতিমা দাস

বন্ধন কেবল শাখা-পলা-সিঁদূরে নয়
হৃদয়মূলে গাঁথা থাক।
যে 'ঈশ্বর' নারীর অঙ্গে শৃঙ্খলিত
না হয়ে অন্তর জুড়ে অলঙ্কৃত হয়ে
থাকে সেইই 'আত্মার আত্মীয়', জীবনের পাথেয়।
ছুঁয়ে যেও তুমি মনের আঙিনা......
আমি সীমন্তিনী হব, সালঙ্কারা হব
তোমার প্রাণের স্পর্শে।
সৌন্দর্যে 'দেবীত্ব' খুঁজো না,
স্নেহ, মমত্ব, বিশ্বাসের দৃঢ় বন্ধনে,
বন্ধুত্বের সহমর্মীতায় জড়িয়ে রেখো প্রিয় মানুষটিকে।
অধিকারের ঘেরাটোপে নয় মর্যাদার সহচর্যে গড়ে উঠুক প্রতিটি সম্পর্ক।
নশ্বর প্রতিকীর মায়াজাল সত্যি কী বাঁধতে পারে দুটি হৃদয়ের মেলবন্ধন?
মনের সাতপাকে বাঁধা পড়ুক অবিনশ্বর হৃদ্যতা।
প্রভু হয়ে কৃতদাসী করে রেখ না তাকে,
দুই শরীরে একাত্ম 'অর্ধনারীশ্বর' হয়ে দেখ একবার
সুখ এসে ধরা দেবে ভাঙা কুঁড়ের মাটির দাওয়ায়,
ভাত কাপড়ের দৈন্যতার বেড়া ভেঙে ভাল থাকা ভাল রাখার পবিত্র অঙ্গীকারে
জীবনে চলার পথে হেঁটে দেখ একসাথে
স্বসম্মানে সরে যাবে সকল বাঁধা।
'আগামী' আসুক ওদের হাত ধরে পৃথিবীর নবজাগরনে।

ভোওওও_কাট্টা

নীলাশা

আমার আকাশ জুড়ে ঘুরে বেড়ায় শুধুই তোমার নামের লাল, নীল, হলুদ, সবুজ স্বপ্নগুলো...

আমি তাদের নাম দিয়েছি শতরঞ্চি,পেটকাটি, চাঁদিয়াল, বগ্গার ঝাঁক।

শ্রাবণী পূর্ণিমার রাতে ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে তেতলার ছাদে তোমার চোখে চোখ রেখে যে সবুজ স্বপ্ন এঁকেছিলাম তার নাম দিয়েছি চাঁদিয়াল...

সবার চোখ আড়াল করে তোমার আবীর যখন আমায় রাঙিয়েছিল, সেই আরক্ত লজ্জার নাম রেখেছি পেটকাটি...

জীবনানন্দকে সাক্ষী করে নতজানু হয়ে যেদিন বনলতা উঠে এসেছিল তোমার কন্ঠে, ওই স্বপ্নটা বুনে রেখেছিলাম শতরঞ্চির নামে...

এরকম হাজারো মুহূর্ত, হাজারো স্পর্শরা স্পর্ধা হয়ে রোজ ঘুরে বেড়িয়েছিল আমার তোমার নীলাকাশ জুড়ে;

তারপর...একদিন হটাৎ
সহসা আকাশ কালো হলো,
একটা মনখারাপি গুমোটে অস্থির হলো মনের প্রকৃতি,
জোর করে স্বপ্নগুলো গুছিয়ে রাখতে গিয়ে শক্ত মাঞ্জা সুতো কামড়ে ধরল আমার আঙুল...
আর আমি তখন
প্রানপণে লাটাই নিয়ে স্বপ্ন গোছাতে ব্যস্ত!!

পারলাম না জানো...
পারলাম না আমার পেটকাটি, চাঁদিয়াল, মোমবাতি, বগ্গাদের এক জায়গায় জড়ো করতে,
একটা বেপরোয়া হাওয়া সব কেমন এলোমেলো করে দিলো।

অমাবস্যার রাতে যেমন তারা খসে পড়ে ওই অন্ধকার আকাশের বুক চিরে, ঠিক সেইভাবে একটা একটা করে নক্ষত্রপতন হলো আমার স্বপ্নের।

দূরে কেউ সহসা চিৎকার করে বলে উঠলো "ভো ওওওও...কাট্টা"

একফালি অস্তগামী যাওয়া পশ্চিমের রোদ আরক্ত করলো আমায়,
আকাশের দিকে চেয়ে দেখলাম আমারই মত আবারো কারোর ইচ্ছেঘুড়িরা ডানা মেলেছে, রঙ ভরেছে, আবারো কেউ স্বপ্ন বুনছে ওই আকাশের ক্যানভাসে মুক্তি পাবে বলে....

অগোছালো চুলে, এক বুক ঝড় তুলে ছুট্টে গেলাম চিলেকোঠার ঘরে,
আমার গাল বেয়ে চিবুক ছুঁলো তোমার দেওয়া ঘুড়ি গুলো...

আমিও আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলে উঠলাম "ভো ওওও...কাট্টা"!!!

ইতিহাসের শিক্ষক ভীষণ রেগে আজ

ছেলেগুলো সব বাউন্ডুলে আস্ত ফাঁকিবাজ.
লেখে খালি ফাঁকি ঝুঁকি, পড়ার নেই অবকাশ.
কেটে খাতায় গোল্লা দিলেন চড়েছে যে মেজাজ.
এদের পিছনে জীবন টা করলেন বরবাদ !
ভেবেছিলেন এদের দিয়ে করবেন দেশ উদ্ধার.
সবার মধ্যে যার উপর সব চেয়ে বেশী রাগ
সেই আব্দুল কে পেলেই আজ করবেন কুপোকাত
এই না ভেবে তড়িঘড়ি করলেন স্কুলে প্রবেশ
জানতে পারেন আব্দুল আসে নি দিন কয়েক
বেশ.
খোঁজ নিয়ে দেখেন তার বাবার ভীষণ অসুখ.
যা শুনে হারিয়েছে তার বাড়িতে সুখ.
ফলেশিয়া মারণ ব্যাধিতে ধুকছে তার বুক.
খনিতে কাজ করে বাধিয়েছে এই রোগ.
বাচঁবেনা জেনেও কর্তাদের নেই শোক !
চিকিৎসা করাতে হয়েছে পুঁজি উজাড়
আজ শুধু সঙ্গী নিত্য হাহাকার.
খনির মালিক সব জেনেও হয়েছে অপারগ
দারিদ্র আর হতাশায় তারা করছে ভাগ্যকে অভিযোগ
হায় রে অবোধ জানিস না তোরা
তোদের পিষেই ভরেছে মালিকের ঘড়া.
সব শুনে মাস্টার বুঝলেন নিজের ভুল
এতো দিন জানতেন ইতিহাসের এককূল.
সাম্রাজ্য আর লড়াই ছিলো তার মূলকথা
লেখা নেই তাতে শ্রমজীবী মানুষের ব্যথা.
ফিরে এসে খাতা খুলে দিলেন দশে দশ
যেখানে ছিল প্রতিবাদী চিন্তার আক্রোশ.
লিখেছিল আব্দুল নতুন হিস্ট্রি
তাজমহল তৈরী করেন মার্বেল মিস্ত্রী.

এক পশলা বৃষ্টি
- পিয়ালী পাল

আমার জানলা দিয়ে রোজই আসে ধেয়ে
ছোট্ট একটা আগুন পাখি হয়ে
একটুকরো ঘন কালো মেঘ
যা দেয় আমায় প্রতিনিয়ত শ্লেঘ।
মনে করিয়ে দেয় আমার অপ্রাপ্তি, বেদনা।
আমার জীবনের দুঃসহ যাতনা।
বজ্র বিদ্যুৎ আমার চেতনাকে করে গ্রাস
যেন সে আমার নিরন্তন ত্রাস।
মনকে আমি শক্ত করি,
ভয়কে তখন তুচ্ছ ধরি
এগিয়ে যাই নব সৃষ্টির উন্মোচনে।
তখনই একপশলা বৃষ্টি এসে
আমায় নিয়ে যায় স্বপ্নের দেশে।
যেখানে নেই গ্লানি, সন্তাপ, বেদনা
যেখানে শুধু শান্তি আর পরিতৃপ্তির রসনা।
যেখানে আমি আমার সত্বাকে পাই
এমন একপশলা বৃষ্টি আমি রোজই চাই।

অস্তগামী কবিতা
- আশরাফুল ইসলাম

নীল সেতারার আলো জ্বলে
দু চোখের শান্ত সরোবরে
হৃদয়ের শেওলা পড়া বেলকুনিতে
নৃত্য করে হাজার জোনাকি
বিশাল ঐ মহাকাশে সাইক্লিং করে
লক্ষ লক্ষ কবিতা!
অবচেতন মনের মায়াবিনী রাতে
জোসনায় ভরে ওঠে নীলাম্বরের মাঠ
কাব্যময় জীবনের ইতিবৃত্ত খুঁজে ফিরি এখানেই
কালের গর্ভে নিমজ্জিত হয় স্বপ্নীল স্বরলিপি।
অজানা সেই মহাশূন্যতায় ঘিরে ধরে
অনাদরের কৃষ্ণ প্রহর
দুঃখ বেদনা আর ভীষণ অবহেলায়
ভরে যায় আমার নিয়তি।
আশাহত চোখে তাকিয়ে থাকে চাঁদ
দ্বীপ্ত শিখার জলসা ঘরে বেজে ওঠে
সকরুণ সুর!
শব্দ হীন মৌনতায় লিখে যাই তাই
বেদনাহত হৃদয়ের স্বরলিপি।
কোন এক রুপালী ভোরের আশায়
অনুভূতির নক্ষত্র গুলো নেমে আসে
হাতের তারায়! ঠিক তখনই,,,,
আঁধারের মহাকাশে লুটোপুটি খেলে
আমার অস্তগামী কবিতা!

যদি তুমি পাশে থাকো;আমার জীবনে গতকাল কখনোই আসবেনা ,
বরং থাকবে আগামীর অপরিসীম সুখ ।

যদি তুমি পাশে থাকো;এই জীবনে দুঃস্বপ্নগুলো কখনোই আসবেনা ,
বরং স্বপ্নগুলোও দেখবে আলোর মুখ ।

যদি তুমি পাশেই থাকো;আমার জীবনে কোনই
অতীত থাকবেনা,
বরং ভালোবাসাও পেতে রবো উন্মুখ ।

যদি তুমি পাশে না থেকে দূরে-দূরে থাকো;কিছু করতে পারবোনা,
শুধু প্রেমের জানাজাতে খুঁজবো সুখ ।

পাই না ভয়

শ্রাবনী ব্যানার্জী

এখন তোমার চোখে চোখ রাখতে পাই না ভয়। তখন ছিলাম ষোলোর কিশোরী,লাগত তাকাতে অছিলা। অকারণে বার বার তাকাতে ছিল ভয়,আধো লাজ। মনে ছিল ভয়,ছিল শঙ্কা আর লাজ।লাজের বাধা কাটিয়ে উঠেছি,যখন হয়েছি যুবতী।পাপড়ি মেলেছি, প্রকাশ করেছি নিজেকে। ক্ষীণ বহমান লুকোনো প্রেমের স্রোত,প্রকাশিত আজ চঞ্চল তরঙ্গায়িত রূপে। তবে আর ভয় পাব কেন তাকাতে!

শিউলি ফুলের গন্ধ
- অমিতাভ রায়

" হ্যাঁরে শিউলি, পুজো যে এসে গেলো- তোর বর তো ফিরলো না?" "না, মাসিমা। আমার মনে হয় আর ফিরবে না।" " সে কি রে?" স্তম্ভিত হয়ে যায় মালবিকা। এতো সহজে কি করে বললো শিউলি!" সনাতন খবরের কাগজ পড়ছিলো আর ভোরবেলায় শোনা মহালয়ার গান গুনগুন করে গাইছিলো। অবশ্য গান বলতে দুটো শব্দ, " তব অচিন্ত্য। " আর একটাও বাড়তি শব্দ শোনা যাচ্ছিলো না ওর মুখে। তার উপর সুর বলে কোনো বস্তুই নেই ওর গলায়। হাসি পাচ্ছিলো মালবিকার। শিউলির কথা শুনে গান থেমে গেল। সনাতন কাগজের ফাঁক দিয়ে এ দিকেই উঁকি দিচ্ছে। মালবিকার সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে গেলো। সনাতনের চোখেও উদ্বেগের ছাপ ফুটে উঠেছে। শিউলির বর গিয়েছিলো মুম্বাই। আর ফেরে নি। " তুই কি করে চালাবি? " মালবিকার দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসে শিউলি। বলে," চালিয়ে নেবো দিদি। চালিয়ে নিতে হবে।"

এবারে সামান্য বেশী টাকা দিলো সনাতন শিউলিকে পুজোর জন্য। পেনশানের টাকায় এর থেকে আর বেশী দেবে কি করে? ছেলেও বহুদিন টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে। বোঝাই গেলো শিউলি খুব খুশী। এটা আশা করে নি ও। বললো," এবারে ভেবেছিলাম ছেলে আর মেয়েকে নতুন জামাকাপড় কিনে দিতে পারবো না। কিন্তু, এই টাকা পেয়ে কেনা যাবে।" খুশী হলেও শিউলির চোখে হাসি নয় ছিলো জল। ওর মেয়ে ক্লাস নাইনে পড়ে আর ছেলে ক্লাস ফাইভে। কোনরকমে ওদের পড়াশুনা চালাচ্ছে শিউলি। যদিও এখন কিছু সরকারি সাহায্যও পাওয়া যায়। তাই চালাতে পারছে। দুজনেরই দুপুরের খাওয়াটা হয়ে যায় স্কুলের মিড ডে মিলে।

পুজোর দিনগুলোয় সকাল সকাল কাজ সেরে চলে যায় শিউলি। ছেলে আর মেয়েকে নিয়ে ঠাকুর দেখে সন্ধ্যায়। মালবিকা নতুন শাড়ি দিলেও - ও মালবিকার দেওয়া একটা পুরনো শাড়ি পরেই ঘোরে। ওটাই ওর পছন্দের শাড়ি। বুড়ো বুড়ীর কোনো কাজ নেই। ছেলে আমেরিকায় থাকে। অনেকদিন আসে নি। তাই নিঃসঙ্গ দুটি মানুষ সন্ধের পরে বারান্দায় বসে মানুষের ভীড় দেখে। শিউলি গাছটা ফুলে ফুলে ভরে গেছে। সেই গন্ধ ওদের পুরনো স্মৃতির জগতে নিয়ে যায়। পুরনো দিনের কথা ভেবেই সময় কেটে যায় ওদের।

দশমীর বিকেলে একপশলা বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। আকাশটা সকাল থেকেই মেঘে ঢাকা। সন্ধেবেলায় বৃষ্টি ধরার পরে বিসর্জনের শোভাযাত্রা শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটা পুজোর প্রতিমা বিসর্জনের জন্য চলে গিয়েছে। এমন সময় ফোন বেজে উঠলো। ওদের মোবাইল ফোন নেই- ল্যান্ডলাইন। মালবিকা ফোন ধরে শোনে শিউলির গলা," মাসিমা একটু পুলিশে খবর দেবেন।" আর কোনো কথা না বলে ফোন রেখে দেয় শিউলি। গলাটা কেমন যেন ভালো শোনায় না। কি হলোরে বাবা! মালবিকার কথা শুনে সনাতন খবরের কাগজ থেকে ফোন নম্বর দেখে পুলিশে ফোন করে। কয়েকবারের চেষ্টায় কথা বলতে পারে সনাতন। বুড়ো-বুড়ী কাপড় বদলে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ে। কোনদিন যাওয়া হয় নি। আজ শিউলির বর্ণনামতো চিনে চিনে চলে যায় ওদের বস্তিতে। শিউলির ঘরের সামনে তখন ভীড়। ভীড় ঠেলে ঘরে ঢুকে ওরা দেখে পুলিশ চলে এসেছে। মেঝেতে একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ। আর বিছানায় বসে আছে শিউলি। চোখ স্থির- হাতে একটা কাটারি। ওকে দেখে শিউরে উঠলো মালবিকা। ছেলে আর মেয়ে বিছানার একপ্রান্তে বসে তাকিয়ে রয়েছে মায়ের দিকে।

" আমি নিজের হাতে আমার বরকে মেরে ফেলেছি। " ঠান্ডা গলায় বলে শিউলি
ওর দিকে তাকাতে পারে না মালবিকা। " আপনারাই আমাদের ফোন করেছিলেন?" মালবিকা তাকিয়ে দেখে। বুঝতে পারে এই লোকটাই পুলিশের উচ্চপদস্থ অফিসার। মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলে সনাতন। " আপনাদের এই মেয়েটার বর একটা ক্রিমিনাল - নারীপাচারকারী। নিজের মেয়েকেও ও অনেকদিন ধরেই পাচার করতে চাইছিলো। সে কারণেই লোকটাকে আর ঘরে ঢুকতে দেয় নি শিউলি। আজ মদ খেয়ে এখানে এসে মেয়ের হাত ধরে টানছিলো ঐ শয়তানটা। আপনাদের মেয়েটি তখন কাটারি দিয়ে খুন করে নিজের বরকে।" সনাতন আর মালবিকা হাঁ করে তাকিয়ে থাকে শিউলির দিকে। " মাসিমা, ঘরের লোক যদি অসুর হয় তখন কি করবো?" কান্নায় ভেঙে পড়ে শিউলি। মালবিকা জড়িয়ে ধরে শিউলিকে। তুই তো আমার মা দুর্গা। " পুলিশ শিউলিকে ভ্যানে তুলছে। সনাতন চেঁচিয়ে বলে," তোর হয়ে আমরা মামলা লড়বো। আর তোর মেয়ে আর ছেলে থাকবে আমাদের কাছে।" শিউলি পিছন ফিরে তাকায়। এই প্রথম ওর মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বুড়ো-বুড়ী ছেলে আর মেয়েটাকে নিয়ে যখন ওদের বাড়িতে ঢোকে তখন রাস্তা দিয়ে ওদের পাড়ার প্রতিমার বিসর্জনের শোভাযাত্রা এগিয়ে যাচ্ছে। তখন আকাশে মেঘ কেটে গিয়েছে। ঘরে ঢোকার আগে মালবিকা দেখে চাঁদের আলোয় শিউলি গাছের বৃষ্টিভেজা সাদা ফুলগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গন্ধে ভরে গেছে চারদিক। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলো মালবিকা।

আমার কোনও তাড়া নেই
অসীম দাস

তুমি আছো হেমন্তের নরম হাওয়ার মোড়ে
আমার পৌঁছনো না- পৌঁছনোর অজানা দূরত্বে ।
যাক না যাক ,একটার পর একটা রেলগাড়ি ছেড়ে ,
পথের নির্জন স্বাদ আমি একাকী পেয়েছি
আমার কোনও তাড়া নেই ।

অপেক্ষার দূরতম নক্ষত্রের ছায়া
খুঁজে খুঁজে হয়রান হয় হোক ,
সাংসারিক পাকশালা
আছাঁটা শুঁটকির ধোঁয়ায়
জ্বলে পুড়ে সশব্দে সন্ন্যাস নেয় নিক ,
সুতীক্ষ্ম ব্যথার জ্বরে অবগাহন সেরে
আমি সদ্য প্রাজ্ঞ জীবনের
অপ্রতিম পদধূলির বহুরঙা
নাছোড় সুঘ্রাণ পেয়েছি ।

স্বেদমুক্ত চাওয়া না- পাওয়ার
জংলি জঙ্গলে কখন অজান্তে
এক আরণ্যক জ্যোৎস্না ফলে গেছে !
মহান বিজনের নির্লিপ্ত সোনালী আনন্দের
সম্পৃক্ত নিরুদ্বেগ ধ্যানে
সংবেদী খাদহীন প্রতীক্ষায় আছি ।

আমার কোনও তাড়া নেই ।

একটি ভ্রূণের কান্না
শ্রীসেন

পাতা বাটা, শিকড় বাটার সময় পেরিয়ে
বিজ্ঞানের উন্নতির শিখর ছোঁয়া এই কালে
আমার জন্মের অনেক আগেই
আমার লিঙ্গ নির্দ্ধারিত

তোমার জঠরে দশমাস দশদিন অবস্থানের
অনেক আগেই এক প্রাতে
উথাল-পাতাল আলোড়ন উঁকি মারে
তোমার জঠরের চারপাশে
খানিক পরে আমার অপরিণত মাংসের ডেলাটা
ঝুপ করে যখন পড়ল ডাক্তারের হাতে
তখনও বুঝিনি-
আমার মৃত্যু হলো ;
পৃথিবীর জল,আলো থেকে আমি বঞ্চিত হলাম
পৃথিবীর বাতাস লাগলো না আমার গায়ে।

আমার অভিমানী, অতৃপ্ত আত্মা
তোমাকে প্রশ্ন শুধায় মাগো-
তুমি নয়তো কোনো আনপড় রমনী
প্রখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি
তোনার ঝুলিতে আলোকিত!

তবে কেন মাতা-
আমার অপরিণত মাংসপিণ্ড
তোমার জঠর থেকে ফেলেছিলে ছিঁড়ে
কেন আমার জন্মের অনেক আগেই
আমার মৃত্যু ঘন্টা বেজেছিল
তোমারই মতে???

জানি মাগো,এখনও আমরা ব্রাত্যই রয়ে গেছি
সমাজের চোখে!

আমিও তো তুমি হয়ে উঠতে পারতাম
দিদির বোন হয়ে একসাথে হাসতে পারতাম
গাইতে পারতাম

মাগো,কান পেতে শোনো-
আমার অপরিণত ভ্রূণের বাঁচতে না পারার
প্রতিবাদী কান্না;
চোখ বুজে দেখো-
তোমার নিষ্ঠুরতার ছবি
তোমার মনের আয়নায় প্রতিফলিত হয়ে
তোমাকেই লজ্জা দেবে

বর্তমানের আগেই আমি আজ পাতাহীন ইতিহাস!

ব্যবধান
প্রতাপ মণ্ডল

সম্পর্ক শুধু এক নিঃশ্বাসের ফারাক
শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ--সম্পর্ক সব শেষ l
আর কতদিন হৃৎপিণ্ড সচল থাকবে !
আর কতদিন ঠেলবে উষ্ণ শোণিত শিরায় শিরায় !!
তারও তো ইচ্ছে করে একটু বিশ্রাম নিতে....
তারও তো ইচ্ছে করে ---
মৃত্যুরূপী প্রেয়সীকে আলিঙ্গনে পেতে !
প্রেয়সী, কাছে টানার কি কৌশল তোমার...
যতক্ষণ হৃৎপিণ্ড সচল, তুমি অন্য কারও !
সময়ের ফুলদানিতে কিছু ফুল রেখে গেলাম
প্রেয়সী, তুমি কি ভয়ঙ্কর সুন্দর...
এই নাও---
একটু একটু করে তোমার হাতে নিজেকে সোঁপে দিলাম l
আমিতো যাবোই তোমার সাথে ঘুমপাড়ানির দেশ
ঘুম জড়ানো আদুরে গলায় কেউ ডাকবে না আর
তোমার আমার মাঝে যেটুকু ব্যবধান, সেটুকুই তার,
তারপর --- সম্পর্ক সব শেষ....

দিবা রাত্রির গল্প
যুবরাজ পাল রাজু
.
~এই যে শুনছেন ?
~হ্যাঁ বলুন। কাউকে খুঁজছেন ? আগে তো কখনো এই গাঁয়ে আপনাদের দেখিনি।
~না, আমরা আসলে আপনাদের গ্রামের রতন মাষ্টারের বাড়িটা খুঁজছিলাম
~ও আচ্ছা রতন স্যারের বাড়ি ? আসুন আমিই দেখিয়ে দিচ্ছি।
(হাতের কোদালটা একপাশে রেখে পরনের লুঙ্গিটা ঠিক করে নিয়ে চলতে শুরু করলো দিবাকর। এদিকে কিছুটা আমতা আমতা করে অতিথি ব্যক্তিটি মুখ খুললেন)
~ইয়ে শুনছেন ? বলছিলাম কি আমার একটু উপকার করবেন ?
~হ্যাঁ, নিঃসঙ্কোচেই বলুন।
~আমি আসলে রতন বাবুর মেয়ে দিবা কে আমার ছেলের জন্য দেখতে এসেছি। মেয়েটা সম্পর্কে যদি একটু কিছু বলতেন......
(হঠাৎ রাজ্যের অন্ধকার নেমে এলো দিবাকরের মুখে)
~দিবার মত মেয়ে এই গ্রামে কেন, পুরো জেলাতেও খুঁজে পাবেন না। শিক্ষিতা, শান্ত, হাসি-খুশি, ভদ্র, নম্র সব গুনই আছে তার।
(বেশ খানিকটা খুশি হয়ে)
~যাক আমি তাহলে ভুল তথ্য পাইনি।
.
স্যার, স্যার, আপনাদের বাড়িতে বড় কুটুম এসেছেন। ঘর থেকে বেরিয়েই রতন মাষ্টার তাঁর হবু বেয়াই কে হাত ধরে ভেতরে নিয়ে গেলেন। শুরু হলো কণে দেখার পর্ব। আর দিবাকর মাথা নিচু করে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে !!
.
(বিকালে জাম গাছের তলায় দিবা ও দিবাকর কথা বলছে)
~তোর তো গতি হয়েই গেল। শহুরে ব্যবসায়ী পাত্র। আর কি সুন্দর দেখতে
~আমি বিয়ে করতে চাচ্ছি না। কিন্তু বাবাকেও বলতে পারছি না। দারিদ্রের কষাঘাতে পিস্ট আমাদের মত পরিবারের মেয়েকে বিনা পনেই নাকি বিয়ে করতে রাজি
~তুই রাজি হয়ে যা দিবা।
(বলেই হনহন করে চলে গেল দিবাকর। পেছন থেকে দিবার শতডাকও আর থামাতে পারলো না দিবাকরকে)
.
৪-৫দিন পরে কি একটা কাজে দিবাকর এলো তার রতন স্যারের বাড়িতে। এসেই সবার বিমর্ষ মুখ দেখেই মনে হল সে বুঝি কোনো মরা বাড়িতে এসেছে। দিবা দিবাকরকে দেখেই ভেতরে চলে গেল। স্যারের মুখের অবস্থা দেখে আর কিছু জিজ্ঞাসা করার জন্য দিবাকরের মন সায় দিলো না। সে গেল রান্নাঘরে।
~ও কাকিমা। কি হয়েছে গো ?
~দিবার কপাল পুড়লো রে দিবাকর। সেদিন দিবাকে দেখতে এসে ছেলে আমাদের রাত্রিকে পছন্দ করে ফেলেছে !! তারা বলছে দু'জনেই তো জমজ। হোক না রাত্রি ১মিনিটের ছোট
~সে কি কথা গো কাকি ? এটা কি করে সম্ভব ?
~সেজন্যই তো দুই বোন কেঁদে কেঁদে শেষ। তারা কেউই ঐ শহুরে ছেলেকে বিয়ে করতে রাজি নয়। এদিকে তোর স্যার তো দোটানার মাঝে পড়ে আছেন।
.
(বিকালে যথারীতি দুই দিবা সেই জামতলে অঘোষীত যথা সময়ে উপস্থিত)
~দিবা তোকে একটা কথা বলতে চাই। জানিনা কাকে দিয়ে বা কিভাবে বলাবো কথাটা ? আর আদৌ উচিত হবে কিনা বলাটা তাও জানিনা। তুই একটু শুনবি ?
~আমারও যে তোকে কিছু কথা বলার আছে দিবাকর। আগে আমি বলি তুই শোন।
~না রে দিবা। আগে তুই আমার কথাটা শুন প্লিজ। না বলেও থাকতে পারছি না আর।
~আরে ধুর। রাখ তোর সমস্যা। তুই আগে আমার কথাটা শুন।
~আচ্ছা বল
~তুই গ্র্যাজেয়াশান কমপ্লিট করেও কেন গ্রামে পড়ে থেকে হালচাষ করছিস ? শহরে গিয়ে একটা চাকরি ম্যানেজ কর না প্লিজ।
~না রে দিবা। আমি মা-বাবা আর তোকে ছেড়ে শহরে যাবো না। এই খানেই আমি বড় একটা প্রজেক্ট করবো।
~আমাকে ছেড়ে যাবি না কেন ? আমার তো বিয়ে হয়ে যাবে।
(মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ চুপ থেকে)
~দিবা, আমি যদি স্যারের কাছে তাঁর বড় কণ্যাকে চিরদিনের জন্য চাই তিনি কি আমাকে তা দান করবেন ?
~(কিছুক্ষণ চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে) চাইতে পারবি ?
~তুই সাহস দিলে সব পারবো রে দিবা।
~তাহলে তো আজ থেকেই "তুমি" করে বলার অভ্যাস গড়তে হবে।।
.
(রচনাকালঃ ১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ ইং)

সেই মেয়েটা

মানিক

জঠর জ্বালায় অবয়ব বেঁচি,
আত্মাটা রেখে শুদ্ধ;
চোয়াল চেপে লড়াই করি,
জিততে জীবন যুদ্ধ।

ষড়রিপু এক নিবৃত্তে,
প্রিয় তনু মোর পণ্য;
মুখোশ ধারী স‍ভ্য মানুষ,
তবুও যে কিছু বন্য।।

স্যাঁতসেঁতে গলি নিকোটিন মাখা,
অনিচ্ছাতেও আপন;
প্রতিদিন সাজি নতুন করে,
বাধ্য-এ জীবন যাপন।

এত আঁধারেও বুকবাঁধি রোজ,
একটু আলোর জন্য;
ফিরবে যেদিন সব চাওয়া পাওয়া,
দেহটা হবে না পন্য।।

অবাক পৃথিবী

সোমা গাঙ্গুলী

দিন দিন পৃথিবীটা বড় জটিল হয়ে যাচ্ছে।
বন্ধুর মুখোশ পরে শত্রুরা ঘুরে বেড়াচ্ছে চারিদিকে।
সহজ সরল মানুষরা বিভ্রান্ত।
উচ্চবিদ্যায় শিক্ষিত হলেই যে সে
চারিপাশের জঘন্য খেলাগুলো
বুঝতে পারবে সবসময়, তা কিন্তু নয়।
একমাত্র স্বার্থপর ও সংকীর্ণমনা মানুষ,
হয়ত চলতে পারবে এই দূষিত পথে।
লোভী, অন্তঃসারশূন্য মানুষেরা
বিভিন্ন চরিত্রে যথাযথ অভিনয় করে যাচ্ছে।
তাদের ছুঁতে চাওয়া, আকাশের চাঁদ ধরার মত।
পবিত্র মনস্কামনা নিয়ে অভিষ্ট পথে চলতে গেলে
সম্মুখীন হতে হয়, হাজারটা বাধার।
'যেমন খুশি তেমনি সাজো
বাচ্চারা এমনকি বড়রাও সাজে অনেক কিছু।
তাদের মনে হয় মুখোশধারী,
চেনা মুশকিল।
শত্রুতা করে চায় বন্ধুত্ব, আবার
বন্ধুর ছদ্মবেশে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়ে
হয়ে যায় শত্রু।
প্রিয়তম হয়ে শুধু পেতে চায়
সান্নিধ্য ও অন্তরঙ্গতা।
বন্ধুত্ব, সম্মান বা মন বোঝার
দরকার পড়ে না।
স্তুতি না করতে পারলে সে অচল।
স্বার্থসিদ্ধি না হলে সম্পর্ক শেষ।
'অবাক পৃথিবী, অবাক করলে তুমি'
বিশেষ কিছু প্রিয়জন ছাড়া,
ভয় হয় এগিয়ে চলাতে।
মনে হয় শান্তির বারি সিঞ্চিত না হয়ে
যদি হঠাৎ বেজে ওঠে রণদামামা।

 

আগের আমি
- পিয়ালী পাল

জানিস আজ আর রাগ করি না
আমি আগের মত।
এখন আমি অনেকখানি পরিণত।
কাঁদি না আর যখন তখন
হয় না এখন অবুঝ এ মন।
করি না খাবার ফেলে রাগ
লুকাই মনের যত আঘাত।
ঝগড়া করি না মনের সুখে
উত্তর করি না মুখে মুখে।
প্রাণ খোলা হাসি হারিয়েছে
গভীর ক্ষতর দুখে।
এখন আমি মেপে বলি কথা
হারিয়েছে আমার প্রগলভতা।
এখন আমার বাইরে যাওয়া বারণ
তবু কখনো কখনো উদাস হয় মন।
কখনো কখনো খুলি মনের কপাট
আসলে বইটা তো পাল্টায় নি
যতোই পাল্টে যাক মলাট।

 

আবছায়া
-মোশ্ রাফি মুকুল

জানালার ফাঁক গলে
ঝরে পড়ে চুপকথা,
প্রতিচ্ছায়ায় কবিতার আরশি।
টুকরো টুকরো রোদের জেলাস,
রোদচশমায় ভেসে ওঠে
বেনামী পড়শী।

অবারিত ধানগাছ,
দুল দুল ঢেউ,
ডানেবামে হেঁটে যায়
বুবনের আবছায়া
আগেপিছে নেই কেউ।

এলোকেশী ইচ্ছে
বুক খুলে ডাকছে,
জীবনের হাতে ধরা
একগাঁদা খাম!
চিঠি নেই,ভরা তাতে-
কায়ক্লেশ,পৃথিবীর ঘাম!

 

পৃথিবীর অসুখ
জয়দেব মণ্ডল

বুকের ভেতর

ফুসফুস আমাজন।
দাউ দাউ জ্বলে যাচ্ছে
বেবাক অনুক্ষণ।

আকাশ ঢেকে গেছে
ঘন কালো ধোঁয়ায়।
শ্বাসবায়ু কমে গেছে
ঘুমহীন দুশ্চিন্তায়।

গাছপালা পুড়ে ছাই
প্রকৃতির রোষানলে।
পশুপাখি বাঁচে তবে
কার ভরসায়? কার বলে?

আমাজন জ্বলছে
জ্বলছে পৃথিবীর বুক।
বন্ধু আমাদের পৃথিবীর
আজ ভয়ানক অসুখ।

হয়তো-বা প্রকৃতির
এটাই সতর্কবাণী।
মিশরীয়, চৈনিক, সিন্ধুর
করুণ কাহিনী।

উপত্যকা জুড়ে আজ
ভয়াবহ মৃত্যুর মিছিল।
পায়ের তলার মাটি
হয়ে গেছে বড্ড পিচ্ছিল।

এসোসময় থাকতে বন্ধু

সতর্ক হয়ে যায়।
পৃথিবীর আঙিনায়
শান্তির গাছ লাগাই।

#অনুতাপ

মাধব জানা

ওগো কি অভিমানে অভিমানী তুমি
কোথায় হারালে গো খুঁজে যাই আমি
এসো প্রভাত রবি-কিরণ হয়ে
শত-শত ফুল বিকশিত করো
হাজারো প্রজাপতির ভিরে।

তোমার মনের ওই মণি-কোঠায়
বদ্ধ করে রেখছো মোরে,
চাইলেও পারি না আমি মুক্তো হতে
আরো বেশী বদ্ধ হয় তোমার স্মৃতিতে।

কি করে বুঝাবো,তুমি যে গোপনে
ছুঁয়ে যাও আমাকে শয়নে-স্বপনে,
বিরহ ভরেছো আমার ভালবাসার ঝুলিতে
তবুত্ত সব ভুলে যায় তোমার মিষ্টি বুলিতে।

কতোদিন দেখিনি তোমায় হয়ে সঙ্গীহীন
পেয়েও তোমায় হারিয়েছি মন তাই আলোহীন,
মনের নীড় যে আমার বড়োই আঁধারময়
প্রদীপ জ্বালাতে এসো জোনাকি হয়ে। ।

প্রেমহীন_মিলন
স্বপ্না সোনালী দাশগুপ্ত

তুমি আমার বন্ধু নও,
নও তুমি আমার প্রেম,
তোমার উদ্দাম নেশায়,
আমার হৃদয় উদ্বেল।

তোমার জন‍্যে প্রেম নেই,
মায়া নেই তোমার জন‍্য,
তোমার যে নেশা আছে,
তুমি অনুভবে শুধু বন‍্য।

তুমি ছুঁতে পারোনা মন,
তোমার হৃদয়ে নেই স্থান,
তুমি অবিশ্রান্ত বৃষ্টির ধারায়
আচম্বিতে বিদ‍্যুতের আলোড়ন।

মন নয় অবশ হয় শরীর,
নিঃশ্বাসে তাপ ওঠে অঙ্গে,
উত্তপ্ত ছোঁয়ায় জাগে দেহ,
প্রেমহীন মিলন তোমার সঙ্গে।

কতো দেহ রোজ জ্বলে,
লালসার আগুনে প্রেমের ঘৃতাহুতি,
প্রেম কি লাগেই মিলনে?
বহু জীবনে প্রেম অকালে পায় অব‍্যাহতি।

তার চেয়ে এসো প্রেমহীন থাকি,
যতটুকু রয়েছে জীবনের বাকি,
মায়া ছাড়া কেবল মোহটুকু থাক,
মন নয় শরীরই শরীরকে পাক।।

বানু'র সন্তানেরা (গল্প)
এম এস বাশার
------------------------------
নামমাত্র বিড়ির গোড়াটা দুই আঙ্গুলের মাঝে বসিয়ে উল্টো করে দুটি টান দিয়ে ফেলে দেয় বানু।
মানিক একমনে নাড়া বেঁধে চাল তৈরি করছে। পৌষের এই দিনগুলোতে গ্রামে, ঘরের চালা বাঁধতে ব্যস্ত হয় সকলে। এগুলো এক বছরের মধ্যেই খসে পড়ে অনায়াসে, অবশ্য গোলপাতা হলে অন্য কথা ছিলো।
নিরবতা ভেঙ্গে মানিকের স্ত্রী বানু মুখ খোলে- হাটে যাইবানা?
বেলা শেষ হইয়া আইতাছে, ক্ষেত থেইকা কয়ডা ঝিঙ্গা তুইলা আনছিলাম, বেইচা দুসের চাউল অইবো।
চকিত আসমানের দিকে তাকায় মানিক-
আন্ধার রাইত বড়, সন্ধ্যার আগে ফেরা মুসকিল!
হারিকেনে তেল আছে?
বানু আমতা করে জবাব দেয়, তাওতো নাই দেকদেকি!
তাইলে ফিরবো কেমনে?
কত্তো মানুষ তিন ব্যাটারি লাইট জ্বালাইয়া বাড়িত ফিরবোনে, তেমন কাউর সাথে পিছ লইবা।
নাড়ার উপরের শেষ বাঁধনের অবশিষ্টাংশ কেটে কাস্তে আর বিড়ির প্যাকেট নিয়ে উঠে পড়ে মানিক।
যা, ব্যাগ আর গামছা নিয়া আয়।
ঘরের দিকে ছুটে যায় বানু।
মানিক আরেকবার ওকে ফেরায়- বানু শোন!
আবার কি?
মুরগির ডিম কয়ডা অইছে?
প্রশ্নটা শুনে আড় চোখে তাকায় বানু-
কেন, সাতটা।
লইয়া আয়, বেইচা দেই।
বিস্ফারিত চোখে তাকায় বানু-
ও ডিম বেচুমনা, বাচ্চা ফুটামু।
এ বলে দ্রুত পায়ে ঘরের দিকে ছুটে যায়।
গামছা আর ব্যাগভর্তি ঝিঙ্গা গুলো স্বামীর হাতে তুলে দিয়ে প্রসন্ন চোখে তাকায়, কিছু একটা বলার জন্য উসখুস করছে বানু।
বুঝতে পারে মানিক, বানু এবার বলবে রতনের দোকান থেইক্কা দু'টাকার পান নিয়া আইবা।
কিছুই বললনা বানু।
নীরবে উঠানের শেষে বড় রাস্তার পথ ধরে হাটের দিকে ছুটে চলে মানিক।

মানিকের বাড়ি এ গ্রামের শেষ মাথায়। দুটি ঘর নিয়ে একটা বাড়ি। ঘরের পিছনে যৌথ পুকুর। একসময় একসাথেই ব্যবহৃত হতো পুকুরটা। ইদানীংকালে মাঝখান দিয়ে বাঁধ দেয়া হয়েছে।
মানিক বারমাস মাছ ধরে। বর্ষাকালে নৌকায় করে বিলের ভরা পানিতে জাল ফেলে, অথবা বড়শি বেয়ে। শুকনো মৌসুমে খালের পারে মাচা পেতে।
মানিকের আর একটা কাজ আছে, গাছে চড়া। গ্রামের কারোর গাছে ডাল কাটা অথবা নারিকেল পাড়ার প্রয়োজন পড়লে মানিকের খোঁজ পড়ে।

সেদিন মানিক হাটের পুল পেরুতে ঢালুতে দেখল একটা জটলা পাকিয়ে কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে। মানিক ভিড় ঠেলে দেখল এক মাঝ বয়স নারী একটা হুইলচেয়ার ঠেলে ছোট একটি মেয়েকে বসিয়ে ভিক্ষা করছে। আহা, মেয়েটিকে দেখলে মায়া লাগে। শরীরের কোথাও একটু মাংসের চিহ্ন মাত্র নেই। কাঁদছে, আর সমস্ত শরীর কাপছে।
পিছনে মহিলাটি বাঁশের কঞ্চি নিয়ে দাঁড়িয়ে। আশ্চর্যরকম হাসি তার মুখে!
মানিক জিজ্ঞাসা করে- ও কাঁদছে কেন?
মহিলা হাসে- রাগ করছে, কিছু কিনে দেইনি বলে!
আপনি কঞ্চি দিয়ে কি করেন?
না না আঘাত করিনা অনেক সময় খুব বিরক্ত করে বলে ভয় দেখাই।
মানিক ভিড় ঠেলে বেড়িয়ে আসে। বিড়বিড় করে বলে, এসব মানুষ না, কসাই!
আহা, দুধের গরু হলেও যত্নের কমতি হয়না। বলদ হলেও হালচাষ শেষে গোসল করিয়ে লোকে খাবার দেয়। অথচ হাড় সমষ্টি মেয়েটা দিয়ে দেদার টাকা কামাচ্ছে, একটু আবদার পর্যন্ত গ্রাহ্য করছেনা!
হয়তো চিকিৎসা করালে মেয়েটি ভালো হবে, হয়তো ব্যবসা বন্দ হবার ভয়ে ডাক্তার দেখাচ্ছেনা!
এমন করেই ভাবতে ভাবতে নিজের অসহায়ত্বের দায় নিয়ে ক্ষুব কষ্ট পায় মানিক। ওর টাকা নেই, গরিব। গরীব মানুষের ভাবনার কোন দাম নেই। অর্থ ছাড়া আবেগ অনুভূতি কষ্টের বোঝা ছাড়া আর কিছুনা।
বানুর সাথে তেরো বছরের সংসার মানিকের। একটা সন্তান নেই, সন্তানের আশায় কতরকম চিকিৎসা নিয়েছে, কিছুতেই কিছু হয়নি। একটা বিকলাঙ্গ শিশু হলেও হোক, বানুকে মা বলবে, মানিককে বাবা। ডাক শুনতে হাতপায়ের দরকার কি! একটা মুখ থাকলেই যথেষ্ট। সারাজীবন কাধের উপরেই খেয়েপড়ে বাঁচুক।
কোনোকোনো সময় বানু খুব মুখ গোমরা করে বসে থাকে, নিরবে কাঁদে। কারোর সন্তান দেখলে হাত দিয়ে ছুঁইতে ইচ্ছে হয়, কিন্তু তাতেও বাঁধা। লোকে অপয়া বলে পাছে সম্মোধন করে, ও হাতে বাচ্চাদের ছুঁইলে অমঙ্গল হয়।
ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে বানু।
পুকুরঘাটে ছৈলা গাছের সাথে টুনটুনি পাখি বাসা বেঁধেছে। চারচারটা বাচ্চা ফুটেছে, চিউচিউ করে ডাকে।
যখন মা পাখি খাবারের খোঁজে অনেক দূরে যায়, বানু এসে বাচ্চাদের দিকে চেয়ে থাকে। কী সুন্দর এই জীবন। একটা পাখির ও সংসার হয়, মা-বাবা হয়। বানুর চোখদুটো তখন জলে ভিজে যায়, আঁচল দিয়ে মুখ মুছে।
যখন মা পাখিটা ঠোটে খাবার নিয়ে আসপাশের কোনো গাছে এসে ডাক দেয়, বানু তখন ঘরে ফিরে যায়।
মাঝেমধ্যে ইচ্ছে হয় একমুঠ চাল নিয়ে ছৈলা গাছের তলায় ফেলে আসে, আহা মা পাখিটা কতদূর যায় খাবারের খোঁজে! কিন্তু বানু তা করেনা, পাখিটা দূরে যায় বলেই বানুর কিছুটা সময় ওদের নিয়ে থাকার ভাগ্য হয়।

গ্রামে একবার প্রচন্ড ঝড় হলো। গাছপালা অনেকটা ভেঙ্গে গিয়েছে। যৎসামান্য গাছ অবশিষ্ট থাকলেও পাখিদের বাসা তৈরি করার মতো তেমন গাছের খুবই অভাব পড়ছিল। বানুদের পুকুরপাড়ে সেই ছৈলা গাছটি ভাঙ্গেনি নিশ্চয়ই তবে বাসা বাঁধার ডালপালা আর অবশিষ্ট ছিলনা। বানুর মনে এটা ভিশন ভাবে পিড়া দিতে থাকে। তারপর স্বামীকে দিয়ে গোটা পাঁচেক হাঁড়ি আনিয়ে পাশ ফুড়ে গর্তের মতো করে উপরে ঢেকে গাছে টানিয়ে দিয়েছিল।
সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই তার মধ্য কিছু শালিক এসে বাসা বেঁধে বাচ্চা ফুটিয়ে ছিলো। সে বাচ্চাগুলো পাখির হলেও বানু মনেমনে খুব গর্ব করতো। ও ভাবত, ওরাই তার সন্তান।
পাখিগুলোও বানুকে খুব চিনে নিয়েছিলো। যখন ও রান্না করতো, অথবা খেতে বসত, অনায়াসে একঝাঁক পাখি তার দুয়ারে এসে হাজির হতো। তার মুখে আর ভাত যেতনা, সবকটা পাখিদের ছিটিয়ে দিয়ে অপলক তাকিয়ে থাকতো তার সন্তানদের মুখের দিকে। আর সে আনন্দ যেনো নিজ সন্তানের চেয়ে কিছুতেই কম নয়।
বানু অস্ফুটে বলে তোরাই আমার সন্তান, আমি অপয়া নই। তোরা আমার ঘরের মধ্যে এসে শূন্য ঘরটায় থাক। আমি কিচ্ছুটি বলবনা। আমার পাতের হতে খা, আমার গোঁজা মুরগির ডিমগুলি খেয়ে যা। বুকটা চিড়ে খেলেও কিচ্ছুটি বলবনা!

একবার বানু জ্বরে পড়ে সপ্তাহ খানেক ঘরের বাহির হয়নি। পাখিগুলো দুয়ারে এসে অযথা কতক্ষণ চেচামেচি করে আবার ফিরে গেছে। মানিক কে দেখলে পাখিগুলো পালিয়ে যেতো। বানুকে সে কথা বললে বানুর চোখদুটো জলে ভিজে যেতো।
বানু বলত, পাখিগুলোর জন্য আমার খুব বাঁচতে ইচ্ছে হয় গো, তুমি যাওনা গঞ্জে একবার গাজি সাহেবের কাছে। ওনার লতাপাতায় অনেক গুন। আমার মন বলছে তার ওষুধ খেলেই সেরে উঠবো।

পরেরদিন খুব সকালে বউয়ের দেয়া চালভাজা আর রোশন পুটুলিতে বেঁধে গঞ্জের পথধরে মানিক। পাঁচ ছ মাইলের পথ। গরুর গাড়ির যাতায়াত তখন। কিন্তু মানিকের কাছে অত টাকা নেই। বাধ্য হয়ে হেঁটে যেতে হবে তাকে।
দশটা বাজে গঞ্জে এসে পৌছায়। একটা রুটির দোকানের পাশে তপ্তপোষে বসে বউয়ের দেয়া চালভাজা খেয়ে গাজি সাহেবের দোকানের দিকে চলে যায়।
ওষুধপত্র নিয়ে ফিরতে তখন ভরদুপুর। সামান্য কিছু খেয়ে বাড়ীর পথ ধরে মানিক। অনেকটা পথ হেঁটে আসে। হঠাৎ পেছন থেকে একটা গরুর গাড়ীর শব্দ শুনতে পায়।
সামনে গাড়োয়ান, পেছনে দুজন পুলিশ। মানিকের পাশ দিয়ে যেতেই একটা উঁচু ডিবিতে চাকা আটকে যায়।
পুলিশের একজন মানিককে ইশারা করে ডাকে।
গাড়িটা একবার ঠেলে দাওতো বাপু!
মানিক তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে।
একটু চোট দিতেই গাড়িটা ছেড়ে আবার স্বাভাবিক হয়। হঠাৎ চোখ পড়ে গাড়ির অভ্যন্তরে, তাকিয়ে দেখে হোগলা প্যাচানো দুটি লাশ!
একজন জিজ্ঞাসা করে- কি নাম হে তোমার?
মানিক ভয়ে ভয়ে জবাব দেয়- নাম মানিক
কুড়িয়ানা যাবো।
হুম, আমরাও ও পথ দিয়ে যাবো, যাবে আমাদের সাথে?
মানিক আমতা করে বলে, তা গেলে মন্দ হয়না।
উঠে পড়, মাঝেমধ্যে গাড়ি থেমে গেলে একটু আধটু ঠেলা দিলেই চলবে।
মানিক ঘাড় নাড়ে।

দুজন পুলিশ আর গাড়োয়ানের আলাপচারিতায় বোঝা গেলো লাশ দুটির একটি বিকলাঙ্গ কোনো মেয়ের, অন্যটি এক মহিলা।
সামান্য কঞ্চির আঘাতে এই মহিলার হাতে প্রাণ যায় মেয়েটির। আর তার রেশ ধরে জনতার হাতে গণপিটুনিতে প্রাণ যায় মহিলাটির!
ঘন্টা দুয়েক এর মধ্য নিজ গ্রামে পৌঁছায় মানিক। মাঝে অবশ্য দুবার গাড়ি ঠেলতে হয়েছে তাকে। তাদের সাথে এসে একপ্রকার লাভ ই হয়েছে তার, চার ঘন্টার পথ দু'ঘন্টায়ই আসা গেল।
যাবার বেলা পুলিশের লোকেরা লাশের মাথার দিকটা খুলে মানিক কে দেখায়-
দেখত লাশ দু'টো চিনতে পারছ কি?
লাশের মুখ দেখে আর একবার চমকে ওঠে মানিক!
লাফিয়ে ওঠে মানিক বলে-
চিনছি স্যার, এই মেয়েটিকে দিয়ে এই মহিলা ভিক্ষা করাতো। হাতে কঞ্চি থাকতো, ওটা দিয়ে খুব মারত। আমার খুব মায়া হতো জানেন স্যার।
আমাদের হাটে একদিন এসেছিল। জঘন্য মহিলা একটা!
পুলিশ বলল, সেটা আমরাও জানি। ওদের বড়ি কোথায় বলতে পার?
মাথা চুলকায় মানিক-
তা জানিনা স্যার।
হুম, আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি এবার যাও।

গাজি সাহেবের তেতো বড়ি খেয়ে ধীরেধীরে সুস্থ হলো বানু। কিন্তু এরই মধ্য গ্রামে পানির বন্যা হয়ে মাঠঘাট তলিয়ে গিয়েছে। পানি নেমেছে দুসপ্তাহ পর।
গ্রামে কাজকর্ম নেই, আয় নেই, অনাহার উপবাসে কাটছে মানিকের মতো অনেকের।
একদিন বুদ্ধি করে গভীর রাতে নৌকো করে ধানের জমির দিকে ছুটলো বানু আর মানিক। ধানের মাঠ তখনো পানিতে টইটুম্বুর। দু'একটা বীজের গুছি ছড়া সমস্ত ফাকা মাঠ। স্বচ্ছ জলে বালুকণা পর্যন্ত দেখা যায়।
বানুর হাতে লম্বা লঘি, আর সামনে মশাল হাতে কোঁচ নিয়ে দাঁড়িয়ে মানিক।
বন্যার পানিতে গ্রামের সমস্ত পুকুর তলিয়ে যাওয়ায় মাছগুলো ধানের মাঠের খোলা পানিতে ছুটে এসেছিলো।
প্রচুর মাছ ধরা পড়লো মানিকের কোঁচে।
রাত তখন শেষের দিকে, চাঁদটা হেলে পড়েছে পশ্চিম দিগন্তে। মাঠের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত চাঁদের আলোয় জ্বলজ্বল করছে। হঠাৎ দূরে একটা বট গাছের নিচ দিয়ে আবছা কি যেন ছুটে চলল সামনের দিকে।
মানিক সেদিকে তাকাতেই চোখে বিস্ফোরণ লাগলো, এটা গণপিটুনিতে খুন হওয়া সেই মহিলা। পূবে একটা বিশালাকার অগ্নিকাণ্ডের মধ্য কে যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
মহিলা চিৎকার চেচামেচি করছে, ছেড়ে দে আমাকে, যাবনা।
আবছা মূর্তিটা তা গ্রাহ্য করছেনা, জোরকরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
মানিক ভয়ে ভয়ে মুখ ঘুরায়, মুখ লুকাতে চায়, কিন্তু অন্যপাশে আর একটা দৃশ্যে চোখ আটকে যায় তার।
সেদিনের দেখা সে বিকলাঙ্গ মেয়েটি একা হুইলচেয়ারের চাকা ঘুরিয়ে মানিকের বাড়ির পথে যেতে যেতে মিলিয়ে যায়।
বানু কে ডাক দেয় মানিক, ওর চোখে আগুনের ঝিলিক খেলে যায়-
কিছু দেখছিস বানু?
বানু চোখ বড়বড় করে চারদিকে একবার তাকায়
কই, কিছুই তো নাই! কি কচ্ছ, কি দেখেছ তুমি?
তারপর নিজেকে সামলে নেয় মানিক।
ও কিছুনা, মনেহয় চোখের ভুল।
আচ্ছা চল, আজ আর মাছ ধরে কাজ নেই। অনেক ধরছি, কাল ভালই আয় হইবো আল্লাহ য় দিলে।
আমতা করে বানু বলে, আইচ্ছা তাইলে চল।
পরক্ষণেই বানু বলে, এই শোন!
কী?
ঘরে গিয়া কাম কি, আমগো কি আর পোলা মাইয়া আছে? নৌকাতেই বাকি রাইত ঘুমাইয়া লই, যে সুন্দর চান উঠছে!
তোর ডর করেনা? মানিক প্রশ্ন করে।
না, আইজকা আমার একদম ভয়ডর কিচ্ছু করেনা। মনে খুব আনন্দ লাগতাছে, কী সুন্দর চান্দের আলো, সমস্ত পানি ঝিকমিক করতাছে,
আকাশের তারা গুলোও কেমন যেন হাসতাছে।
আমি ছৈয়ের মধ্য গেলাম, তুমিও আস, চাদরটা ছৈয়ের মুখে টানাইয়া দাও।
মিটমিট করে দুষ্ট হাসি হাসে মানিক, আইজকা তোর কি হইলো বউ, বিয়ার ১৩ বছরেও এমন কইরা তোরে আর খুশি হইতে দেখিনাই।
বানু এ কথার কোনো জবাব দেয়না। একাগ্রভাবে কখনো আকাশের তারার পানে কখনো মাঠের রুপালি জলে লীন হয়ে থাকা আলোয় চেয়ে রইলো।
মানিক মশাল নিভিয়ে কোঁচ রেখে ছৈয়ের মধ্য ঢুকে চাদর টানিয়ে দেয়। তখনো মাথার উপর দিয়ে হালকা চাঁদের আলো বানুর কপালে এসে পড়ে। বানুর মুখের হাসি যেন আকাশের চাঁদের মতো উজ্জ্বল আর নির্মল জলের মতো প্রসন্ন হয়ে ফুটে রইলো রাত্রি শেষের নৌকার ছৈয়ের তলে।
বালিশ বিহীন স্বামীর শরীর কে বালিশ বানিয়ে নায়ের পাটাতনে আঁটোসাটো হয়ে গুঁজে দেয় আপন দেহ।
একটুকরো মেঘ এসে চাঁদের আলোয় বাঁধ এঁটে দেয়, আবছা অন্ধকারে হারিয়ে যায় ওরা দুজন।

তারপর কিছুদিন পরে বানুর কোল জুড়ে একটা কন্যা সন্তান ওদের ঘর উজ্জ্বল করে পৃথিবীতে আগমন করে। সে রাতের চাঁদের আলো নির্মল জলের পরে যেমন জ্বলজ্বল করছিলো, তেমনি তার মুখ চোখ আর গায়ের রঙ মিলেমিশে ফুলের মতো ফুটে রইলো সমস্ত ঘড় জুড়ে।
পুকুর ঘাটের কাছে ছৈলা শাখার পরে আবার বাসা বেঁধেছে টুনটুনি পাখি। পাঁচটি হাঁড়ির কোঠর জুড়ে শালিক পাখি ঝগড়া করছে বাসা বাঁধার দৌড় নিয়ে। সারাদিন বানু'দের বাড়ি পাখির কিচিরমিচির ঝগড়া আর খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি।
সেদিকে একমনে তাকিয়ে থাকে বানু। তার মুখে খুশির হাসি। অসংখ্য সন্তানের জননী সে। সন্তান রা বাসস্থানের অভাবে ঝগড়া করে, খাবার নিয়ে কাড়াকাড়ি করে। আহা, কী শান্তি!
একদিন দুপুরবেলায় মানিক হাটের হতে নৌকা বোঝাই করে অনেকগুলো হাড়ি নিয়ে এসে উঠানে জড়ো করে বানু কে ডাকে-
বানু, এদিকে আয়!
পুকুরপার হতে বানু এসে দাওয়ার কাছে দাঁড়ায়।
একবার স্বামীর মুখের দিকে, একবার হাঁড়ি গুলোর দিকে। বানুর মুখ হাসিতে ভরে উঠে, কিন্তু তার চোখ যে জল ছলছল করে উঠছিল তা কিছুতেই আড়াল করা গেলনা।
মানিক এগিয়ে এসে বানুকে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলে এই পাখিগুলো শুধু তোরই সন্তান নয়, আমারও!
আমার এক সন্তানের বাড়িতেই হাজার সন্তানের বাস হইবো, সংসার হইবো। পৃথিবীতে যদি কখনো পাখিদের খুব অভাব হয়, তখন এই বাড়িতে ছুটে আসবে দেশবিদেশের অসখ্য মানুষ।

মহানায়কের মহাপ্রয়াণে

- পিয়ালী  পাল

 

অগ্নি পরীক্ষা  দিয়েছো  অনেকবার

তাই  তো তোমার জন্য  খোলা

আপামর  বাঙালীর মনের  দ্বার।

জীবন তৃষ্ণা মেটে না  এখনো

দেওয়া  নেওয়ার পালা  জারি।

চৌরঙ্গী লেনের সাড়ে  চুয়াত্তর

আমার  প্রেমিকের  বাড়ি।

সবার  উপরে  মানব সত্য

কথাটা  আজও  দরকারী।

চাওয়া  পাওয়া র হিসাব  মিটিয়ে

তুমি অন্তত লোকে  দিয়েছো পাড়ি।

নায়ক  তুমি  হৃদয়ে  রয়েছো  আজও

তোমায়  কি  ভুলতে  পারি?

তোমার  হাসি, চাউনি নিয়ে

কতশত  যুবক  ভরেছে  প্রেমের ডালি

বাংলা চলচিত্রে মহানায়কের আসন এখনও   খালি।

মহানায়কের মহাপ্রয়াণে

- পিয়ালী  পাল

 

অগ্নি পরীক্ষা  দিয়েছো  অনেকবার

তাই  তো তোমার জন্য  খোলা

আপামর  বাঙালীর মনের  দ্বার।

জীবন তৃষ্ণা মেটে না  এখনো

দেওয়া  নেওয়ার পালা  জারি।

চৌরঙ্গী লেনের সাড়ে  চুয়াত্তর

আমার  প্রেমিকের  বাড়ি।

সবার  উপরে  মানব সত্য

কথাটা  আজও  দরকারী।

চাওয়া  পাওয়া র হিসাব  মিটিয়ে

তুমি অন্তত লোকে  দিয়েছো পাড়ি।

নায়ক  তুমি  হৃদয়ে  রয়েছো  আজও

তোমায়  কি  ভুলতে  পারি?

তোমার  হাসি, চাউনি নিয়ে

কতশত  যুবক  ভরেছে  প্রেমের ডালি

বাংলা চলচিত্রে মহানায়কের আসন এখনও   খালি।

মহানায়কের মহাপ্রয়াণে

- পিয়ালী  পাল

 

অগ্নি পরীক্ষা  দিয়েছো  অনেকবার

তাই  তো তোমার জন্য  খোলা

আপামর  বাঙালীর মনের  দ্বার।

জীবন তৃষ্ণা মেটে না  এখনো

দেওয়া  নেওয়ার পালা  জারি।

চৌরঙ্গী লেনের সাড়ে  চুয়াত্তর

আমার  প্রেমিকের  বাড়ি।

সবার  উপরে  মানব সত্য

কথাটা  আজও  দরকারী।

চাওয়া  পাওয়া র হিসাব  মিটিয়ে

তুমি অন্তত লোকে  দিয়েছো পাড়ি।

নায়ক  তুমি  হৃদয়ে  রয়েছো  আজও

তোমায়  কি  ভুলতে  পারি?

তোমার  হাসি, চাউনি নিয়ে

কতশত  যুবক  ভরেছে  প্রেমের ডালি

বাংলা চলচিত্রে মহানায়কের আসন এখনও   খালি।

মহানায়কের মহাপ্রয়াণে

- পিয়ালী  পাল

 

অগ্নি পরীক্ষা  দিয়েছো  অনেকবার

তাই  তো তোমার জন্য  খোলা

আপামর  বাঙালীর মনের  দ্বার।

জীবন তৃষ্ণা মেটে না  এখনো

দেওয়া  নেওয়ার পালা  জারি।

চৌরঙ্গী লেনের সাড়ে  চুয়াত্তর

আমার  প্রেমিকের  বাড়ি।

সবার  উপরে  মানব সত্য

কথাটা  আজও  দরকারী।

চাওয়া  পাওয়া র হিসাব  মিটিয়ে

তুমি অন্তত লোকে  দিয়েছো পাড়ি।

নায়ক  তুমি  হৃদয়ে  রয়েছো  আজও

তোমায়  কি  ভুলতে  পারি?

তোমার  হাসি, চাউনি নিয়ে

কতশত  যুবক  ভরেছে  প্রেমের ডালি

বাংলা চলচিত্রে মহানায়কের আসন এখনও   খালি।

মহানায়কের মহাপ্রয়াণে

- পিয়ালী  পাল

 

অগ্নি পরীক্ষা  দিয়েছো  অনেকবার

তাই  তো তোমার জন্য  খোলা

আপামর  বাঙালীর মনের  দ্বার।

জীবন তৃষ্ণা মেটে না  এখনো

দেওয়া  নেওয়ার পালা  জারি।

চৌরঙ্গী লেনের সাড়ে  চুয়াত্তর

আমার  প্রেমিকের  বাড়ি।

সবার  উপরে  মানব সত্য

কথাটা  আজও  দরকারী।

চাওয়া  পাওয়া র হিসাব  মিটিয়ে

তুমি অন্তত লোকে  দিয়েছো পাড়ি।

নায়ক  তুমি  হৃদয়ে  রয়েছো  আজও

তোমায়  কি  ভুলতে  পারি?

তোমার  হাসি, চাউনি নিয়ে

কতশত  যুবক  ভরেছে  প্রেমের ডালি

বাংলা চলচিত্রে মহানায়কের আসন এখনও   খালি।

আমার গর্ব আমার দিদি
তুই কবে যেন অনেক বড় হয়ে গেলি ।
এখন তুই দিদি কম, মা বেশি
আমাকে অনেক শাসন করিস ।
একটু ভুল হলে আমার কান মুলে দিস
পরে আবার অনেক আদর করিস ।
দিদি আমার মায়ের মতো
দিদি তোকে অনেক ভালোবাসি ।
দিদি আমার অনেক ভালো
দেয় না সে কখনো আমার মনে কষ্ট ।
ভাইফোঁটা আসলে পরেই
দিদি দেয় উপহার অনেক ।
দিদি আমার মায়ের মতো
আমার চোখে আসতে জল দেয় না কখনো ।
দিদি তোর ভাইয়ের এই কামনা
তুই সারাজীবন থাকিস ভালো ।
দিদি আমার চোখের মনি
দিদি তোর চোখের জল
আসতে দেব না কখনো আমি ।

ভালোবাসা
- পিয়ালী পাল

পরবো না আজ জুঁই ফুলের
মালা এলিয়ে বেণী।
পরবো না কাজল চোখে
তুলি দিয়ে টানি।
পাট ভাঙা কাপড়
রাখবো তুলি
টিপ পড়তেও যদি
যাই ভুলি
তাও কি তুমি বাসবে ভালো?
দেখতে পাবো তোমার চোখে
অনুরাগের আলো?
দেখবো কি তোমার চোখে
মুগ্ধ হওয়া দৃষ্টি?
বলবে কি আর আজ
তোমায় লাগছে ভারী মিষ্টি?
যদি বলো তবে বুঝবো তুমি
আজও আমার প্রেমিক আছো।
নাহলে বুঝবো তুমি আমায় নয়
আমার অবয়ব টাই ভালোবাসো।

 

বিভাগ-অনুগল্প

শিরনাম-ফুটপাথ

কলমে-অঞ্জলী দাশ গুপ্ত

তাতান ফুটপাথের ধারে রাস্তায় শুয়ে থাকত নিজের তার কোনো ঘর নেই।রাত তখন নিঝুম হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ ভেসে আসল তার কানে।ভূতের ভয় রাম রাম করতে করতে চাদর চাপা দিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকে। কান্নার আওয়াজ তার খুব কাছ থেকেই হচ্ছে সে সাহস করে চোখ খুলে দেখে একটু ছোট্ট বাচ্চা কাঁদছে আর আসে পাশে কেউ নেই।সে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নেয় আর ভালো করে চাদর চাপা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়।
সকাল হতেই তাকে আবার বেরোতে হবে বাসে বাসে ঘুরে ধূপ কাঠি বিক্রি করতে।কিন্তু ওই বাচ্চাটিকে সে কোথায় রেখে যাব? বাচ্চাটি ও তাকে দেখে কাঁদতে লাগলো।তাতান ওর নাম দিলো তিতলি।একটা কাপড় দিয়ে কোমরে বেঁধে নেয় তিতলিকে ।আর শুরু হলো তার ধূপকাঠি বিক্রির পথ।সামান্য কিছু যা পয়সা পেল তাই দিয়ে ওর জন্য কিছু খাবার কিনে ওকে খাইয়ে দিল।তাতান পেল ওর পথ চলার সঙ্গী ওর বোন তিতলিকে।

তাল তমালের বনসাই
- মোশ্ রাফি মুকুল

আমার কব্জিভরা দীর্ঘঘড়ি,ভুল খেলনায় চড়ে পড়ি!হ্রস্ব-ই কার তল্লাশি করে
খুঁজে আনি যাপনের দীর্ঘস্বর।

অন্তরালের কবিতানীতি
বারবার পাল্টাই,পাল্টাই কৌশল।মাইলস্টোনে লিখে আসি পথের তীব্র ঝাঁকুনি।

আমার কব্জিতে যে দীর্ঘ ঘড়ি-আমাদের সখ্যতা মাপে,নতুন পথের প্রচ্ছদ আঁকে,
নিতান্তই
আনকোরা বালিকার
বুকের চৌহদ্দিতে
ফোঁটায় করুণার স্কুল।

তারপর এখানে
ফুঁসে উঠে তাল-তমাল বনসাই।

প্রকৃত প্রেমিক
- পিয়ালী পাল

ও নারী তোমার চোখের কাজল
দেখে যে হয় মুগ্ধ, তাকে তুমি প্রেমিক বলো?
না, সে তোমার কেবল রূপের পূজারী।
যে তোমার চোখের তলার কালির কারণ খোঁজে
জানবে প্রেমের আসল মানে সে ই বোঝে।
প্রসাধন ছাড়াও তুমি অপরূপ তার কাছে।
যদিও জীবনে ঝড় ঝঞ্ঝা আসে
জানবে সে সদাই থাকবে তোমার পাশে।
যে শুধু তোমার শরীর চায়, মনের খবর নেয় না,
তাকে আর যাই বলো, প্রেমিক বলা যায় না।
প্রেমিক তো সে, যে বুঝবে তোমার বায়না।
বুঝবে তোমার অভিমান, হবে মনের আয়না।
যতই তুমি তুচ্ছ করো, গৌণ ভাবো তাকে
অসময়ে সে ই এসে আগলাবে তোমাকে।
আঁধার রাতে চলতে পথে যদি
থমকে দাঁড়িয়ে পড়ো,
বলবে এসে, মুচকি হেসে
'শক্ত করে আমার হাত টা ধরো.'
তাকেই তুমি সঙ্গী করো, রেখো তার মান,
যে বুঝবে তোমার ভালোবাসার নীরব অভিমান।

লক্ষীমন্ত
- পিয়ালী পাল

মা আমাকে ক্ষমা কর,
পারবনা হতে লক্ষীমন্ত মেয়ে।
তার চেয়ে থাকবো নাহয়,
সারাজীবন উড়নচন্ডী হয়ে।
পথে ঘাটে অসম্মান ও অমর্যাদা সয়ে,
পারবোনা থাকতে নীরব মূর্তি হয়ে।
প্রতিবাদ আমি করবোই
তাতে যা খুশি ভাবুক লোকে।
ট্রেনে বাসে নিত্য দিনের হয়রানি
আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবো চোখে।
অমানুষের মতো যে মানুষ গুলো
নিত্য দিন সর্বত্র দেখি
খুলে দেবো তাদের ভদ্রতার মুখোশ
যা আসলে মেকি।
তাদের লোলুপ দৃষ্টি সাথে অমার্জিত বচন
আপত্তিকর স্পর্শের মাগো করবো এবার মোচন।
গর্জে উঠবো তারস্বরে
করবো লড়াই একার জোরে।
দেখলেই দুরাচার
রুখে দাঁড়াবো প্রতিবার।
তাই ক্ষমা করো মাগো
পারবোনা হতে লক্ষীমন্ত মেয়ে,
যে সব অন্যায় সহ্য করে
নীরব অশ্রু দিয়ে।

বিভাগঃ কবিতা
শিরোনামঃ রোজনামচা
কলমেঃ দেবাশিস সেনগুপ্ত
*************************
সকালবেলা উঠে আয়নার বদলে
আমি সূর্যের মুখোমুখি দাঁড়াই,
মনেমনে নগ্ন হয়ে
একটা একটা করে খুলে রাখি
আমার দাঁত, নখ, জিভ,ঘাড়, চোয়াল।
তারপর, করোটি হাতে কবন্ধ আমি
করোটিতে ঢেলে অহংকারী লাল মদ
উৎসর্গ করি তাঁকে,
" প্রনতোহস্মি দিবাকরম্ "।
এরপর, সারা সময় টলতে টলতে ভরদুপুর।
এ সময় আমার বিবেককে মনে পড়ে।
সেই কবে জানেন
হারিয়ে গেছে অভিমানে।
তখন আমি হরি ঘোষের গোয়ালের পাশে
জাগ্রত কালীমন্দিরের পেছনে
যে বুড়ো বট গাছটা ঝিমোচ্ছে,
তার কাছে যাই।

বিবেকের কথা জিজ্ঞেস করি।
বুড়োটা ঝিমোয় শুধু,
উত্তর করে না।
সূর্য থামলে থেমে যাবে নাকি জীবন?
কে বলে ভুলভাল কথা?
জীবন বরং এখন অন্ধকারে
তরতরিয়ে বেড়ে ওঠে।
রাত যত গভীর হয়, ততই আছড়ে পরে
জীবনের ফসফরাস- ঢেউ,
আমি বিবেকের খোঁজ শিকেয় তুলে রেখে
ব্যস্ত হই সমুদ্র- স্নানে।
হাবুডুবু খাই,
চশমা হারাই,
চপ্পল হারিয়ে যায়,
ঢেউ, শুধু একের পর এক
নেশা ধরায়।
নগ্ন পায়ে সময়কে ভুলে
আমি সি- বিচে গভীর রাতে
ঢেউ গুনি ঘোর উন্মত্ততায়।
অপেক্ষা করি,
আবার কখন সকাল হবে,
আবার কখন আমি সূর্যমুখী হব।
এবার দেখো,
আমি ঠিক অহংকার ফেলে দিয়ে
হারানো বিবেক খুঁজবো
সারা দিন, সারা রাত।।

নিভৃত অন্তর
- পিয়ালী পাল

জিজ্ঞাসিছো কখন তোমায় মনে পড়ে,
কি করে বলবো তোমায়?
যখন সকাল বেলায় সূর্যের প্রথম রেখা ধরে
তখন তোমায় মনে পড়ে।
যখন বৃষ্টির প্রথম ফোঁটা মাটিতে পড়ে
তখন তোমায় মনে পড়ে
যখন সন্ধ্যা বেলায় পাখির দল ঘরে ফেরে
তখন তোমায় মনে পড়ে।
যখন শিশির বিন্দু ঘাসের উপর মুক্তার মত ঝরে
তখন তোমায় মনে পড়ে।
যখন পড়ন্ত বেলায় ব্যালকনি তে দাঁড়াই
চায়ের কাপটি ধরে,
তখন তোমায় মনে পড়ে।
যখন আনমনে ঘুরে বেড়াই
ছাদের চিলেকোঠার ঘরে,
তখন তোমায় মনে পড়ে
চলতে পথে হঠাৎ যখন ভয় করে
তখন তোমায় মনে পড়ে।
আর কীভাবে বোঝাবো তোমায়
কখন তোমায় মনে পড়ে?
তাকে কি আলাদা করা যায়
যে আছে হৃদয়ের নিভৃত অন্তরে?

শিউলি
- অর্পিতা ঠাকুর চ্ট্টরাজ

সপ্তমীর ভোর,দুমদাম করে পটকা ফাটানো শুরু হয়ে গেছে ।সামনের মন্ডপ থেকে ঢাকের আওয়াজ আসছে।তখনো বিছানা ছাড়েনি শুভ্রা।পিউ উঠে পড়তে বসে গেছে,এবার ও উচ্চ মাধ্যমিক দেবে।টিং টং,টিং টং কলিং বেলের শব্দে শুয়ে শুয়েই মেয়েকে বললো,
-----এত ভোরে কে রে পিউ,দেখতো একবার ।কে জানে নিশ্চয় কাজের মেয়ে আসবে না তাই নাতনিকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছে ।
ঠাকুর প্রণাম করে উঠে বাথরুমে ঢুকে যায় শুভ্রা।
----মা,মা,মা-মাগো,একবার এসো না ।
-----আমি বাথরুমে আছি।কে এসেছে?
-----বাথরুমের দরজার কাছে এসে পিউ বললো,মা এক্জন ঠাকুমা একটা বাচ্চা নিয়ে এসেছে,তোমাকে ডাকছে।
-----আচ্ছা বসতে বল।
বেরিয়ে দেখলো গাবুর মা,প্রতিবেশী রীনাদিদের বাড়িতে কাজ করে।সাথে বছর পাঁচ-ছয়ের একটি মেয়ে।জড়োসরো হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
-----কি বলছো গো?এত সকালে আমার কাছে?চা খাবে?
-----হ্যাঁ,বৌ তুমি ও চা খাও।
------চা আর বিস্কুট দেয় মেয়ে আর ওদের দুজ্নকে।নিজে শুধু চা নেয়,পুজো না করে খাবেনা অন্যকিছু।
-----চা খেতে খেতে বলে আমাকে কি বলছো মাসি?
-----বৌ,একটা পুরোনো জামা আছে দিবে নাতিনটকে।
----আমার মেয়ের জামা?ওমা ওর হবে নাকি?আমার মেয়ে তো অনেক বড় গো।
----পুরোনো,ছুটু জামা।
-----আমি জমিয়ে রাখিনি গো,সব দিয়েদিয়েছি।কতজন আমার মেয়ের কাঁথা-বিছানা,জামাকাপড়ে কতজন যে মানুষ হোলো---
----জানিতো,তাইতো এলুমগো।
-----কিন্তু আমার মেয়ের কোনো জামা ওর হবেনা।ওর মতো তিনটে ঢুকে যাবে।ফ্রক ডিজাইনের একটা কুর্তি দিয়েদিলেও তো হবেনা,ঢাকা হয়ে যাবে ।
----পিউ বলে,মণিমা জন্মদিনে যে কুর্তিটা দিয়েছে ওটা ছোটো তো,ওটা হবে না?
-----শুভ্রা হেসে বলে ওটাও ঢাকেশ্বরী হয়ে যাবে রে।
-----দেখো দেখো বৌ,কাঁনছে মে 'ট ।
----আমি কাউকে ফেরাইনা,না থাকলে কি দেবো বলো? আমার যে কাজের মেয়ে তার মেয়ের জন্য সব দিয়ে দি,মেয়ের সমবয়সী বলে।
-----পুচকিটা তখন কাঁদছে।
এত সকালে খুব বিরক্ত লাগছে পুজোর দিনে এই পরিস্থিতিতে পড়ে ।শুভ্রার দেওয়া থোওয়ার তালিকা অনেক বড় তাই জোর গলায় বলতে পারছেনা যে ওকে একটা নতুন জামা কিনে দেবো।বিজনের কাছে টাকা চাইলে রেগে যাবে ,মাছওয়ালি পিসিকে একটা ছাপাশাড়ি কিনে দিয়েছে চারশোটাকা দিয়ে,বিজন তখন কিছু বলেনি এবার কিন্তু ছাড়বেনা।শ'দুয়েক টাকা দিয়ে কিনে নিতে বলবে?এভাবে কি সবার সমস্যার সমাধান করা যায় ।রাস্তা ঝাঁট দেয় আশু বৌএর জন্য শাড়ি চেয়েছে,পুরোনো হলেও দিতে তো হবে।গরিব মানুষ পুজোতে পড়বেনা? বিজন মাঝেমাঝে ওকে লেডি দাতাকর্ণ বলে মজা করে।আজ তাই ওর খুব খারাপ লাগছে ।
-----বৌ,খুঁজে একটু দেখো।
-----তুমি পুজো বোনাস পাওনি বাবুবাড়ি থেকে?
----দুঘরে পেয়ছি,দুঘর আজ কালে দিবেক।
-----এখনো দিবেক?গরিব মানুষের প্রাপ্য টাকা দিতে এত কষ্ট কিসের? কেনাকাটা তো সবারই আছে।দু ঘরের টাকায় কেনোনি কিছু?
-----ছিল্যাটর অসুখ,কাজে যেতি পারেনাই,সংসারে উঠিগেলো গো,আবার পেলে একট জামা কিনি দিব।কাল থিকে সংসঙতিদের নতুন জামা দেখে কাঁনছে,বেলা হলেই সব বিড়া বেক পড়ে তাই তাই সকাল সকাল এলুম।
----তা তো এলে কিন্তু দেবার যে কিছু নেই----
পিউ কথার মাঝে এসে বলে,
-----ম কিছুই কি নেই? নাচের ড্রেস,ঘাগরা ডিভানখুলে দেখোনা একবার।না হলে একটা কুর্তি দিয়ে দাও।
ওর মন আরো নরম।কারো দু: খ দেখতে পারেনা।
-----চল দেখি,খোল তো এই ঘরেরটা ।
---ঐ ঘরে---
---না,ওতে বিছানা আছে ।পুজোর দিনে এত কাজ,এসব করার সময় আছে,আগে বললে খুঁজে রাখা হয়।
---মা,কাকার বিয়ের গাউনটা পড়ে নাচ করতাম বলে কাউকে দাওনি ।ওটা ছোটো হওয়ার পর দিয়েদিয়েছো?
-----কে জানে,মনে নেই।দেখি।তন্নতন্ন করে খুঁজে পাওয়া যায় একটা আকাশি গাউন,বুকের কাছে সাদা গোলাপ ফুলগুলো দেখে মনে হচ্ছে 'নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা'।ধ্ড়ে প্রাণ এলো মা মেয়ের।দেখো গো এটাও বড় হবে।গুটিয়ে ধরে ধরে হাঁটবি বুঝলি।
----খুশিতে চকচক করে ওঠে মুখটা,এটা রাজকুমারী ডেরেশগো মামী,দিদি পড়েনা?
----না,দিদি বেশি পড়েনি এবার তুই পড়বি।
-----পিউ একটা প্যাকেট ধরিয়ে বলে ,এই নে সাজুগুজু করবি।
----ভেতরে কিকি আছে দেখে বলে লিপিস্টিক গো দিদি,টীপ্পাও আছে?গালে মাখা সব আমার?
---হুম তোর,তোর নাম কি?
----উমা ।
-----বা: ,পড়াশোনা করবি আরো দেবো।
---আসি গো বৌ।তুমার কাজ কামাই গেলো।
ওরা যাওয়ার পর শুভ্রা বাসিকাজ সারতে লাগলো।এই রে মেয়েটার হাতে টাকা,নাড়ু কিছুই দেওয়া হোলোনা যে ।রীনাদির বাড়ি কাজে এলে দিয়ে দেবে ডেকে।সাড়ে নটা নাগাদ বিজন আর পিউকে জলখাবার দিয়ে পুজোর জোগার করতে যাচ্ছে,এমন সময় রিনরিনে গলায় ডাক শোনে,
----মামী,দিদি---
আবার এসেছিস,কি রে?
নতুন জামা সামলাতে না পেরে লোটাতে লোটাতে আসছে।মুখে হাসি ধরছেনা ।
----ওমা!!! এ যে এক্কেবারে রাজকুমারী।খুব সুন্দর লাগছে।বিজনও হাসে ওকে দেখে।পিউ ওকে কয়েকটা নাড়ু আর একশ টাকা দেতো।
-----দিদি নাও।
-----থ্যাংক ইউ,শালুকফুল হাতে নিয়ে দেখিনি আগে।
----মামী হাত দাও।দুহাত পাতো--
শিউলিফুল গুলো ঢেলে দিয়ে বলে,
----সিনাই পরে এনিছি তুমি পূজা করবে গো।
ভালোবাসার এমন প্রতিদানে চোখে জল এসে যায় শুভ্রার ।নাড়ু আর টাকা নিয়ে খুশি হয়ে বিদায় নেয় । ঠাকুর ঘরের জানালা থেকে উঁকি দিয়ে দেখে ওরই বয়সী কয়েকজনের সাথে ভাগ করে খাচ্ছে নাড়ুগুলো।সততা আর সরলতা মাখা শিউলিগুলো থেকে নিষ্পাপ ভালোবাসার মিষ্টি গন্ধ পায় শুভ্রা।পেতলের দুর্গামূর্তির পায়ের নিচে সাজিয়ে দিলে আলো ছড়ায় যেন ঠাকুর ঘরে ।মন্ডপ থেকে তখন ভেসে আসছে সেই বিখ্যাত আগমনী গান,
এবার আমার উমা এলে আর উমা পাঠাবোনা,
বলে বলুক লোকে মন্দ কারো কথা শুনবোনা।----

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget