মে 2019

"অর্ন্তদৃষ্টি"
#শর্মিষ্ঠা মজুমদার(নূপুর)#
আজও ছেলেটা কালো চশমা পরে হিরো সেজে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে বসে। ঠিক এই সময়ে থাকে রোজ।নয়নার গা পিত্তি জ্বলে যায় ছেলেটাকে দেখে। এমনিতে ভদ্র সভ‍্য চেহারার।কিন্তু ওই চশমাটার আড়ালে যে ছেলেটা নয়নাকেই দেখে।আর বান্ধবীরা এটা নিয়ে ওকে কানা ঘুষো করে সেটা কিছুতেই সহ‍্য হয় না নয়নার।
ছেলে বেলা থেকেই খুব ডানপিটে।রাস্তাঘাটে প্রায়ই ছেলেদের সাথে ঝগড়া বাঁধে।বেশিরভাগ অবশ্য ছেলেগুলোর দোষ থাকে।এই যেমন ছেলেটা।রোজ কেমন চশমার আড়ালে ওকে দেখে।ছেলেটাকে দেখেই চড় মারতে ইচ্ছা করে।
ছেলেটা অবশ‍্য শুধু চশমার আড়ালে দেখে।কোন দিন কোন কু মন্তব্য বা কোন কথা বলে নি।কিন্তু আজ এমনি স্কুলে ঝামেলা হয়েছে তার এক বন্ধুর সঙ্গে। আবার চায়ের দোকানের সামনে আসতেই ছেলেটাকে নিয়ে বন্ধুদের রসিকতা। মাথায় রাগ উঠলে নয়নার আর কিছু খেয়াল থাকে না।
সোজা ছেলেটার সামনে গিয়ে কলার ধরে বলে "লজ্জা লাগে না। রোজ মেয়েদের দিকে এভাবে চেয়ে থাকতে। বাবা মা বুঝি এই শিক্ষা দিয়েছে?
আর একদিন দেখলে পাড়ার লোক জড়ো করে পাটাবো।"
ছেলেটা থতমত খেয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যায়। বেঞ্চের কোনাটা লাগে মাথায়। রক্ত দেখে নয়নার মন খারাপ হয়ে যায়।কিন্তু রাগের মাথায় ছেলেটার চশমা খুলে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
মনটা বড়ো হালকা লাগে। কদিন ওই ছেলেটাকে দেখতে দেখতে বিরক্ত হয়ে গেছিল।আরো বন্ধুদের কথা শুনে বেশী। এখন হালকা লাগে। পরেরদিন আর ওই ছেলেটার মুখ দেখতে হবে না।
পরের দিন যথারীতি স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে চোখ পড়ে যায় চায়ের দোকানে। জানতো থাকবে না। তবু কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগে জায়গাটা।
মনটা খারাপ হয়ে যায়। ছেলেটা তো তাকে কোনদিন খারাপ মন্তব্য করে নি। সে কেন আগ বাড়িয়ে ওসব বলতে গেল?কাল খুব জোর লেগেছে ছেলেটার।রক্ত বেড়িয়ে গেছে। কিন্তু ওই বা ওভাবে তাকিয়ে থাকতো কেন?
হঠাৎ চায়ের দোকানের পল্টুটা দৌড়ে আসে নয়নার কাছে।রাগ চোখে তাকিয়ে বলে "ও দিদি শোনো,কাল তুমি দীপকদাকে মারলে কেন?
এমনি চোখে দেখে না। তার উপর চোখের জন্যে পড়াশোনাটাও মাঝপথে ছেড়ে দিতে হল। জানো পড়াশোনায় ও কতো ভালো ছিল। বই ছাড়া কিছু চিনতো না। পাড়ায় অনেকেই ওর মুখ দেখেনি। ওকে চিনতো না। স্কুল ছুটির এই সময় ছেলে মেয়েরা পড়ার কথা বলতে বলতে যায়।ওগুলো দীপকদার খুব ভালো লাগতো। তাই এখানে এসে বসতো। বাড়িতে একাই বা কি করবে।কাকিমা এসময় থাকেন না।তুমি শুধু শুধু মারলে কেন গো?"
নয়নার এমনি মনটা খারাপ হয়ে ছিল ।একথায় চোখের কোণে জল চলে এল। পল্টুকে বলল "তুই বাড়ি চিনিস ওর। কাল মাথাটা গরম হয়ে গিয়েছিল রে। আমি জানতাম না ও চোখে দেখে না। অন‍্যায় হয়ে গেছে।"
পল্টু বিজ্ঞের মতো মাথা নেড়ে বলল "চিনি তো।কিন্তু এখন বাড়িতে পাবে না।পোড়ো মন্দিরে আছে দেখ গে। আর বোকো না যেন কোনদিন ওকে।"
নয়না আচ্ছা বলেই জোর কদমে হাঁটা লাগালো পোড়ো মন্দির তলায়। এখানে সচরাচর কেউ আসে না। খুব নিঝুম। হঠাৎ দেখলো বড়ো পুকুরের শেষ ধাপে দীপক দাঁড়িয়ে। অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেঁপে উঠল।
বইয়ের ব‍্যাগটা ফেলে দৌড়ে দীপকের কলার ধরে টানতে লাগলো। "আরে করছেনটা কি? পাগল হয়ে গেছেন। না হয় ভুল করে একটা অন‍্যায় করে ফেলেছি ।তাই বলে এতোবড়ো শাস্তি? লোকে যে আমায় দোষ দেবে।" বলেই দীপককে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে।
দীপক হেসে বলে "আরে, আমার জামার কলারটা আপনার খুব প্রিয় না।যখন তখন যেখানে সেখানে ধরে টানাটানি করেন। এ পুকুরের প্রতি ধাপ, এখানকার প্রতি জায়গা আমার মুখস্থ।চিন্তা নেই।আমি অতো সহজে হার মানি না।"
নয়না কান্নার তোড় সামলিয়ে বলে " আমিও।কারো কলার একবার ধরলে সহজে ছাড়িনা।"
দীপক কিছু একটা বলতে যেতেই মাথার ক্ষতস্থানে উষ্ন এক চুম্বনের আবেশে সব ভুলে যায়।শুধু নয়নার গভীর আলিঙ্গনে অন্তদৃষ্টি দিয়ে নয়নাকে খুঁজে পায়।
স্বত্ব সংরক্ষিত#
রচনাকাল✍ ২৪ শে জুন ২০১৮

"হাতে হাত"

# শর্মিষ্ঠা মজুমদার( নূপুর)#

ছোট্ট ফ্ল্যাট বাড়িটায় প্রতিদিন নিজের স্বপ্ন গুলোকে মরতে দেখে শ্রী।ডিভোর্সের পর ক্ষতিপূরণের টাকা দিয়ে সে ফ্ল্যাট কিনেছে।মাঝে মাঝে হাসে নিজের মনে।ক্ষতিপূরণ কী সত্যি হয়েছে কতগুলো কাগজের নোটে।

না, প্রেম করে তো বিয়ে করে নি।বাবা মা দেখে শুনে ঘটা করে বিয়ে দিয়েছিল।বিয়েরটা টিকলো না।বাবা মা জানিয়ে দিয়েছিল খাইয়ে পড়িয়ে মানুষ করেছি, বিয়ে দিয়েছি এবার দায়িত্ব আমাদের না।

শ্রী মুখ বুজে মেনে নিয়েছে। কটা মাস সময় চেয়ে নিয়েছিল শুধু।ভাগ‍্যিস অরুনাভের সাথে দেখা হয়েছিল তার তখন।

অরু আর তনিমা কলেজের বন্ধু শ্রী'র। তনিমা আর অরু বিয়েটা হয়েছিল শ্রী উদ্যোগেই।তনিমার বাড়ি বোঝাতে খুব ঝক্কি সামলাতে হয়েছিল শ্রীকে।অবশ‍্য ওনাদেরও দোষ দেওয়া যায় না। একে সমবয়সী তার উপর বেকার।ভাগ‍্যিস সে সময় ব‍্যাঙ্কে কাজটা পেয়েছিল অরু।কিন্তু ওর ও কপাল। অ্যাকসিডেন্টে মারা গেল তনিমা।

সেই অরু একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে ঢুকিয়ে দিয়েছে শ্রীকে।ওর সাথে গিয়ে ডিভোর্স কেস দায়ের করিয়েছে। একটা বাড়ি ভাড়া ঠিক করে দিয়েছিল।
সেখান থেকে আজ এই ফ্ল্যাট বাড়ি। সাজানো গোছানো সংসার। বাবা মা প্রত‍্যেক মাসে একবার করে আসেন। কিন্তু শ্রীর আর তেমন টান নেই। কেন কে জানে?

অরু অনেকবার ইয়ার্কি মেরে বলেছে চল বিয়েটা করে নি। শ্রী বোঝে ইয়ার্কি মেরে বললেও অরু সত্যিই বিয়ে করতে চায় শ্রীকে। কিন্তু অনুভূতি গুলো মরে গেছে তার।স্মৃতি গুলো কুঁড়ে কুঁড়ে খায়। তাই এসব কথা উঠলেই এড়িয়ে যায়।

আজ বদ্ধ ঘরে জ্বরের ঘোরে এইসব পুরনো স্মৃতি যতো মনে পড়ছে চোখ দিয়ে জলের ধারা নামছে।
কী ক্ষতি হতো আর পাঁচটা মেয়ের মতো তার জীবন হলে।খুব ইচ্ছা করছে অরুকে একটা ফোন করতে।কিন্তু করবে না সে।যদি জ্বরের ঘোরে আবেগের বশে কিছু বলে ফেলে।

হঠাৎ চোখ মেলে সব কিছু অচেনা ঠেকলো শ্রীর। শুধু হাতে হাত রেখে শুকনো মুখে তাকিয়ে থাকা অরুকে ছাড়া। পাশের নার্সটা হেসে বলল "যাক জ্ঞান ফিরেছে আর চিন্তা নেই।তিনদিন জ্বরে বেহুঁশ ছিলেন দিদি।দাদার অবস্থা যদি দেখতেন।"

শ্রী জিজ্ঞাসু নয়নে অরুর দিকে চায়। অরু মাথা নিচু করে বলে "কি করবো? ভাগ‍্যিস ফ্ল্যাটের একটা চাবি দিয়ে রেখেছিলি।ফোন করে করে না পেয়ে গিয়ে দেখি জ্বরে বেহুঁশ।খালি উল্টো পাল্টা বকছিস।শুধু আমার নামটা বুঝেছি।তাই লোভ সামলাতে পারি নি।তোকে আমার স্ত্রী বলে ভর্তি করেছি।এরা আমার খুব পরিচিত।অসুবিধা হবে না।"

নার্স এসে বলে " দাদা, কোন কথা শুনছি না।এবার একটু বিশ্রাম নাও।দিদি ঠিক আছে। আর চিন্তা নেই।"
শ্রী হেসে বলে " ওমা! বিশ্রাম নেবে কি, ওর কত কাজ।বিয়ের ব‍্যবস্থা সব ওকেই তো করতে হব।"

অরু উঠতে গিয়েও আবার বসে পরে শ্রীর হাত ধরে। শ্রী পরম শান্তিতে চোখ বোজে।

নার্সটা বেড়িয়ে যেতে যেতে বলে " জানতাম আগেই।দাদা আমায় নিমন্ত্রণ করতে ভুলো না যেন।আর দশ মিনিট তার বেশী সময় নিও না। দিদি এখনও বড়ো দুর্বল।"

শ্রী অরুর হাতে হাত রেখে বলে " তোর হাতে হাত রাখা,এর চেয়ে সবল বোধহয় আর কখনও অনুভব করি নি।"

স্বত্ব সংরক্ষিত#

রচনাকাল✍ ২৩শে জুন ২০১৮

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget