ফেব্রুয়ারী 2019

চোখ
- অঞ্জলী দাশ গুপ্ত

চোখ দিয়ে তো আমরা কত কিছু দেখি ।কত ভালো লাগা ও মন্দ লাগা ।কিছু ভালোবাসার কথা আবার কখনো এমন কিছু না বলার কথা।কিছু অপরিস্ফুট ভাবনা যা ...তাও ওই চোখের কোনে স্থান পায়।
কিন্তু চোখ কখনই চায় না তার সব ভাবনা কেউ এক পলকে বুঝে নিক।আর ভাবনার সাথে তার যে বন্ধন সেটা ছিন্ন হয়ে যাক।
তাই সে যেন সমস্ত কিছুর আড়ালে সেই ছোটো ছোটো ভালোলাগা ,ভালোবাসা ও কিছু না বলা কথা সব যেন সে লুকিয়ে রেখে দেয় তার মনির মধ্যে।
কিন্তু সেই সব অনুভূতি গুলো বড্ড বেহিসাবি আর বদ্ধ হয়ে থাকতেই চায় না।শুধু বেড়িয়ে আস্তে চায়।তাই চোখ আর তাকে ধরে বেঁধে রাখতে পারে না ।তাই সেই ভাবনা গুলো অশ্রু রূপে বেড়িয়ে আসে আর তাকে ভাসিয়ে দেয় এক নিমিষের মধ্যে।

অসমাপ্ত ভালোবাসা
- শর্মিষ্ঠা মজুমদার (নূপুর)

খেজুর গাছটার গা বেয়ে বৃষ্টির ফোঁটা ভিজিয়ে দিচ্ছে দুজনকেই। কিন্তু কারোর ভ্রক্ষেপ নেই। পড়ার ব‍্যাচ থেকে এসেছে ওরা দলবেঁধে ঘুরতে।হঠাৎ বৃষ্টি আসায় সবাই দু একজন করে দলছুট এদিকে ওদিকে। অনুপ আর দিয়া আশ্রয় নিয়েছে খেজুর গাছটার নিচে ইচ্ছা করে। দিয়া বৃষ্টিতে ভিজতে ভালোবাসে।

অনেকক্ষণ দুজনেই চুপচাপ।দিয়া একটু ছটফটে, ডানপিটে, বড় চঞ্চল।চুপ করে থাকতে পারে না কিছুতেই।তাই দিয়ার চুপচাপ থাকাটা ক্রমেই অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠছে অনুপের কাছে।

বড় ভালো বন্ধু দিয়া আর অনুপ দুজনে।অনুপ বড় শান্ত অথচ দিয়া কেমন যেন একটু উগ্র স্বভাবে।যত ছেলেদের সাথে বন্ধুত্ব, মারামারি।আর ছেলেগুলোও তেমন, দিয়া ছাড়া চলে না এক মূহুর্তে।

আজ ইচ্ছা করে বৃষ্টি আসতে অনুপ দিয়াকে ডাক দেয় "ওই শোন,কথা আছে।"
এমন অনেকেই বলে।যেকোনো সমস‍্যায় দিয়াকে আগে সবার দরকার পড়ে।তাই অনুপ ডাকতেই সবাইকে ভাগিয়ে দিয়েছে।এমনিও অনুপকে খুব ভালো লাগে দিয়ার।খুব শান্ত শিষ্ট ছেলে।

সবার থেকে আলাদা হয়ে বৃষ্টির আলতো ছোঁয়া দুজনকে ছুঁতেই অনুপ দিয়ার হাতটা ধরে অনেক কষ্টে বলে "তোকে খুব ভালোবাসি রে।"
আর কিছু বলার সাহস তার নেই।অনেক সাহস সঞ্চয় করে কথাটা বলেছে সে।এখনও হাঁটু কাঁপছে,পেটের মধ্যে কেমন যেন করছে। দিয়া হয়তো রাগে চড় মেরে দেবে।কিন্তু অনুপের উপায় নেই।বড্ড ভালোবাসে ও দিয়াকে।যদি অন্য কেউ বলে দেয় ওর আগে,যদি দিয়া রাজি হয়ে যায় তার প্রস্তাবে।

কখন থেকে দিয়া চুপ করে।অনুপ মৃদু স্বরে বলে "কিরে কিছু বলবি না"
দিয়া অপলক দৃষ্টে ওর দিকে তাকিয়ে।কি করে সে বলবে সেও বড় ভালোবাসে অনুপকে।কি করে বলবে সে বেশি দিন নেই পৃথিবীতে।দূরারোগ্য ক‍্যান্সার ভেতর থেকে তাকে খেয়ে ফেলছে।জানতে দেয় নি সে কাউকে।বাড়ির লোক ছাড়া তার মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের সাক্ষী সে রাখতে চায়না কাউকে।

হঠাৎ দৃষ্টি কঠিন হয়ে আসে দিয়ার।একটা চড় তুলে নামিয়ে নেয়।কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে বলে "কাল থেকে যেন তোর মুখ আমি না দেখি রে। বন্ধুত্বটা তোর সাথে আর সম্ভব নয় রে।"

অনুপ কি বলবে ভেবে পায় না।ধপ করে বসে পড়ে মাটিতে।দিয়ার উপর কথা বলার সাহস তার নেই।তবু আলগোছে ডাকে দিয়ার নাম ধরে।

দিয়া চলে যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে হেসে বলে " কিছু গল্প চিরদিন অসমাপ্তই থেকে যায় রে"

*** স্বত্ব সংরক্ষিত ***

ভুল
- মরিয়ম আক্তার

আকাশ ভেবে ভুল করে বসি
দেখে পানিতে ছায়া,
ভালোবাসা ভাবিয়া ডুব দেই মিছে
বাড়িয়ে হাজার মায়া।
মিথ্যেকে কখনো ভাবি মোরা সঠিক
সত্যকে মানি ভুল....
নিজেকে কখনো করা যাবেনা ছোট
কোন মতে এক চুল।
বিশ্বাস সেতো চূর্ণ হয় আজ
লেগে সামান্য টোকা...
বিশ্বাস করে ধুকে মরেছে যে
আছে হাজারো বোকা।
মরিচিকার পেছনে ছুটে
মানুষ চিনেছে ভুলটাকে,
হিংসাপূর্ন দুনিয়াটা আজ
বদলেছে ভালো রূপটাকে।
শুন্যতা তাই বাসা বেধেঁছে মনে
জন্মেছে বুকে বিশাক্ত কীট.....
আমি নরম মাটি পুড়ে পুড়ে আজ
হয়েছি একখানা শক্ত ইট।
আমি নইতো আকাশ বিশাল হৃদয়
কারো কাছে শুধুই ছায়া,
আমি মরে গেছি হারিয়ে বিশ্বাস
কাটিয়ে সকল মায়া।
আমি ভুলে গেছি সব সত্তি যত
হয়েছি মিথ্যে কাদামাটি,
আমি ইটের মত হয়েছি পোড়া
নিয়ে অবিশ্বাসের পাটি।

শিক্ষা
- শর্মিষ্ঠা মজুমদার (নূপুর)

"আজও খিচুড়ি। ডিমটা বোধহয় খেয়ে এসেছিস। কেন দিদিমণি তো বলল রোজ ডিম সেদ্ধ দেবে। আবাগীর মেয়ে অপয়া, অপয়া। মা, বাবাকে খেয়ে হয়নি। এতো গেলোন কোথা থেকে আসে?মর মর। মরেও না।"

পাড়া মাত করে চেঁচিয়ে উঠল মিলির মামী শিবানী।
মিলি মৃদু স্বরে বলে উঠলো
"দেয়নি যে মামী। খিচুড়িও বাড়িতে দিতে চায় না বলে খেয়ে যাবি। আমি খেয়ে এসছি,পেট ভরা বলে নিয়ে আসি বাড়িতে। তাও দিদিমণিরা রোজ বকে।"

"উদ্ধার করেছো। তোমার ঐ শ্রাদ্ধের খিচুড়ি তুমিই গেল। আজ আর ভাত পাবে না। আর দিদিমণিদেরও বলিহারী। নিজেরা গান্ডে পিন্ডে গিলবে। তারপরেও বাড়িতে নিয়ে যাবে। আর বলতে গেলেই বলবে অনুমতি নেই বাড়িতে দেওয়ার। যত্তসব।"

মিলি চুপ করে বাসন মাজে।ছোটবেলা থেকে ভাগ্য খুব খারাপ। অ্যাক্সিডেন্টে বাবা, মা দুজনকেই হারিয়ে মামার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।। মামা একটু ভালো হলেও মামী চরম দজ্জাল। আগে তাও পাড়া প্রতিবেশীদের ভয়ে একটু সংযত ছিল। এখন বাড়িতে কাক, চিল বসতে দেয়না। দিন রাত প্রায় চব্বিশ ঘন্টাই মিলিকে খাটায়। পাড়ার ক্লাবে খিচুড়ি স্কুলে ভর্তি করেছে ঠিক। কিন্তু স্কুলের বরাদ্দ খাবারটা বাড়িতে নিয়ে আসতে হয় মিলিকে।

ভালো খাবার হলে তার মামার ছেলে শুভর জন্যে বাঁধা। খিচুড়ি দিলে যদিও মিলির ভাগ‍্যে জোটে কিন্তু অন্য খাবার দিলেই ভাইয়ের জন্যে নিয়ে আসতে হয় বাড়িতে। কদিন অবশ্য লোভের আর ক্ষিধের বশবর্তী হয়ে মিলি ডিমটা খেয়ে ফেলেছিল। তার বদলে তাকে এমন মার খেতে হয়েছিল যে তিনদিন ধরে গায়ে ব‍্যাথা ছিল। এখন আর লোভ নেই মিলির।

স্কুলের দিদিমনিরাও খাবার কিছুতেই বাড়ি আনতে দিতে চায় না। এদিকে ওটুকু খাবারই মিলির সম্বল। অর্ধেক দিন দুপুরে মামী মিলির জন্য ভাত রাঁধে না। রাতে খেতে দেয় ঠিক কিন্তু সে না খেতে দেবারি সমান। উল্টে এমন খাটিয়ে নেয় যে পেটের ক্ষিদে পেটেই রয়ে যায়। কিন্তু তবু মিলি স্কুলে যাবেই স্কুলটা তার মনের মতো জায়গা এখানে আসলেই হ়াঁফ ছেড়ে বাঁচার সুযোগ পায়। এখানে কেউ তাকে কাজের জন্য বকাবকি করে না মা,বাবা নেই বলে দোষারোপ করে না।

কদিন ধরেই মামীর চিৎকার যেমন বেড়ে চলেছে তেমনি ধমকিও
" এই খিচুড়ির জন্য তোকে আর কাজ ফেলে স্কুলে যেতে হবে না। তাছাড়া পড়াশুনা শিখে হবে টাই বা কি। এসব শিক্ষা দীক্ষা আমাদের জন্য নয়।" মিলি চুপচাপ মুখ বুজে শোনে।

মিলির মা মিলিকে বলে গিয়েছিল শিক্ষা টা বড় জরুরি। লেখাপড়া না জানলে মানুষের মতো মানুষ হওয়া যায় না। মিলি তখন খুবই ছোট। কথাগুলোর মানে বুঝত না কিন্তু এটা বুঝত মা যখন বলেছে তখন সেটা নিশ্চিই জরুরী হবে তাই মিলি হাজার লাঞ্ছনা গঞ্জনা শুনে স্কুলে যাওয়াটা বন্ধ করেনি।

কিন্তু মামী এবার স্পষ্ট জানিয়ে দিল ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়াশোনা করে ক্ষান্ত দিতে। আর পড়াবে না। হাই স্কুলে অনেকটা সময় ধরে চলে। এতোটা সময় পড়াশোনার জন্যে দিলে বাড়ির কাজ করবে কখন। দরকার নেই আর যা হয়েছে অনেক। নিজের ছোট বাচ্চাকে সামলাবে না সংসারের কাজ।

মিলি বোঝে মামীকে এবার বোঝানো মুশকিল। এক তো হাই স্কুলটা অনেকটা দূর। তার উপর। বই, খাতা, ড্রেস অনেক রকম খরচ। আর সবচেয়ে বড়ো কথা সে স্কুলে গেলে কাজ করবে কে? না, মামী কিছুতেই রাজী হবে না। মনে মনে হতাশ হয় মিলি।আজই স্কুলে তাদের শেষ দিন। এরপর বার্ষিক পরীক্ষা শুরু হয়ে যাবে। তারপর হয়তো আর পড়াই হবে না মিলির।

স্কুল থেকে বাড়িতে ফিরতে হুলুস্থুল কান্ড। ঘর ভর্তি লোক। মিলির মামার নাকি এখন তখন অবস্থা। মামী তো তারস্বরে কান্না জুড়েছে। মিলিকে দেখে আরো চিৎকার জুড়লো
"ঐ অপয়া মেয়ে আসা থেকে আমার ক্ষতি। মা, বাবাকে খেয়েছে। এবার মামাকে খাবে। দূর হ চোখের সামনে থেকে। তোকে আর রাখবো না আমার সংসারে।

মামার শরীর খারাপের সাথে মিলির কি যোগ বুঝলো না মিলি? শুধু বুঝলো মামী পাগলের প্রলাপ বকছে ভয় পেয়ে।মিলি তাড়াতাড়ি ব‍্যাগ ছুঁড়ে ফেলে বলল
"আহ মামী করছো কি? আমাকে পরে গাল দিও। আগে সবাইকে ঘর থেকে বের কর। আর জানলা খুলে দাও।"

মামী প্রথমে ঐটুকু মেয়ের ধমকে হকচকিয়ে যায়। তারপর বলে
"হ‍্যাঁ, এই ঠান্ডায় জানলা খুলে তোর মামাকে মারবার ফন্দি আটছিস নাকি?"
মিলি রেগে বলে দেখ মামার বুকের ব‍্যথা উঠেছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। আজ স্কুলে শেষ দিন বলে কতগুলো দাদা দিদি এসছিল কোথা থেকে। তারাই বলেছে বুকে ব‍্যথা হলে কি করতে হয়। এসময় নিঃশ্বাস নিতে পারে না। বাতাসের প্রয়োজন। নয় তো..."

আর শেষ করে না কথা। মামীও আর কথা না বাড়িয়ে জানলাটা খুলে দেয়। ঘর থেকে সবাই নিজেই বেরিয়ে যায়। মিলি তাড়াতাড়ি পাশের বাড়ির নিমাই কাকাকে ডাক্তার ডাকতে বলে।

ঐ টুকু মেয়ে মামাকে বলে
"একটু আরাম করে উঠে বস মামা। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বিছানায় বসায়। ঘাড়, মাথা কাঁধ হেলান দিয়ে হাঁটু মুড়ে মামাকে বসতে বলে এতে নাকি রক্তচাপ কমবে।

মিলি বলে অ্যাসপিরিন না কি যেন বলল আছে মামী না থাকলে রতনকে বল পাশের ওষুধের দোকান থেকে ছুটে নিয়ে আসবে।এই অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খেতে পারলে ধাক্কা অনেকটাই সামলে নেবে। তুমি ক্রমাগত শ্বাস নিচ্ছে কিনা দেখ। কেমন সাড়া দিচ্ছে তা দেখতে থাকে।আমি আর রতন ছুটে নিয়ে আসছি। দোকানদারকে বলতেই দোকানদার দিল বটে। কিন্তু ডাক্তার ডাকতে বলল।

অ্যাসপিরিন দেওয়াতে কিছুটা সামলায় মিলির মামা। দ্রুত ডাক্তার আসে। তিনি সব দেখে শুনে বলেন
"মাইনর অ্যাটাক হয়েছিল। চিন্তার কিছু নেই। তবে আপনার মেয়ে দারুণ কাজ করেছে। বড়বড় লোকে ঘাবড়ে যায় আর আপনার মেয়ে এসব করলো কি করে?"

মিলির মামী এখন অনেকটাই সামলে নিয়েছে। নরম গলায় বলল
"কি জানি। আজ নাকি ওদের স্কুলে এসব বলেছে। আমি ডাকি ওকে দাঁড়ান।"

মিলিকে ডেকে ডাক্তার বলল
"তুমি এতো সব জানলে কি করে মামণি?"
মিলি বলল
"আজ স্কুলে বিনা পয়সার স্বাস্থ্য দান শিবির না কি সব ছিল গো ডাক্তার বাবু। আমাদের কত কিছু দেখলো। কত কিছু বলল।"

একটু দম নিয়ে বলল
"হঠাৎ বুকে ব‍্যথা হলে কি কি দেখলে বুঝবে বুকে ব‍্যথা। কি কি করতে হয় বলল তো।"
বলেই পড়া মুখস্থের মতো বলে গেল

১। বুকে ক্রমাগত ব্যথা, ছড়িয়ে পড়তে পারে চোয়াল, কাঁধ, দাঁত, গলা, হাতে।

২। হঠাতৎ পালস রেট খুব বেড়ে যাওয়া বা একেবারে কমে যাওয়া।

৩। অতিরিক্ত ঘাম

৪। বুকে মাঝখানে অস্বস্তিকর চাপ অনুভব করা, ভারী ভারী ভাব।

৫। শ্বাস ছোট হয়ে আসা।

৬। মাথা ঘোরা, জ্ঞান হারানো।

৭। বমি বমি ভাব।

এগুলো হলে

১। প্রথমেই রোগীকে শান্ত অবস্থায় নিয়ে আসুন। দেওয়ালে হেলান দিয়ে মাটিতে বসান। ঘাড়, মাথা কাঁধ হেলান দিয়ে হাঁটু মুড়ে রোগীকে বসালে রক্তচাপ কমবে।

২। রোগীর যদি অ্যাসপিরিনে অ্যালার্জি না থাকে তবে অ্যাসপিরিন দিন। এই সময় ৩০০ গ্রাম অ্যাসপিরিন চিবিয়ে খেতে পারলে ধাক্কা অনেকটাই সামলানো যাবে।

৩। এই সময় রোগী শক পেতে পারেন। জীবনের ঝুঁকি রয়েছে বুঝতে পারলে শক পাওয়া খুব স্বাভাবিক।

৪। ক্রমাগত শ্বাস, পালস রেট ও রোগী কেমন সাড়া দিচ্ছেন তা চেক করতে থাকুন।

৫। রোগী যদি অজ্ঞান হয়ে যায় তবে সিপিআর-এর সাহায্য নিন।

এসব বলে মিলি একটা কাগজ বার করে দিল। দেখো গো ডাক্তারবাবু এতে সব লেখা যে।

ডাক্তার অবাক হয়ে বলল
"তুমি তো রত্নগর্ভা মা। তোমার মেয়ে তো দারুণ বুদ্ধিমতী। একে ভালো করে পড়াও। এ যেমন আজ তোমার স্বামীর প্রাণ বাঁচালো, তেমনি একদিন অনেকের প্রাণ বাঁচাবে।'

মিলির মামী বলল
"আমাদের এতো সাধ‍্য কোথায় ডাক্তারবাবু।"
ডাক্তারবাবু হেসে বললেন
"ভালো কাজ কখনও আটকে থাকে না মা, ও যদি মন দিয়ে পড়ে দেখবে ভালো রেজাল্ট করে নিজেরটা নিজেই করে নিচ্ছে। আর তেমন অসুবিধা হলে আমি তো রইলাম। আসি তবে।"
ফিস দিতে গেলে হেসে বলল
"মেয়েটাকে পড়িও। এটাই আমার ফিস।"

ডাক্তার যেতেই মামী মিলিকে বুকে জড়িয়ে বলল
"সত্যিই তুই আজ থেকে আমার মেয়ে। চিন্তা করিস না। আমরা তোকে পড়াবো। তুই যতদূর পড়বি আমরা আছি।"

মিলির আজ মায়ের কথাটা আবার মনে পড়লো
"শিক্ষার বিকল্প নেই, শেষও নেই। জীবনের প্রতিটা মুহুর্ত আমাদের কিছু না কিছু শিক্ষা দিয়ে যায়।"

*** সমাপ্ত ***
*** স্বত্ব সংরক্ষিত ***

বিচার
- শর্মিষ্ঠা মজুমদার (নূপুর)

"কিন্তু কেন প্রত‍্যেকবার আমি কেন? ভগবান তুমি আমাকেই কেন এতো দুঃখ দাও। জ্ঞানতঃ তো কোন অপরাধ করি নি তবে এ কেমন বিচার?" বন্ধঘরে ফিসফিসানিটাও চরম আর্তনাদের মতো শোনালো। এখনও নগ্ন দেহে শুয়ে সাবিত্রী। নিজেকে ঢাকার বা পোশাক পড়ার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। যেটুকু লজ্জা ছিল আজ তাও শেষ।

ঠোঁটের কোণ বেয়ে রক্ত ঝরছে। সারাদেহ ক্ষতবিক্ষত। নারী শরীর শুধু চর্ম, পণ‍্য। মনে চিনচিনে ব‍্যথা ছাড়া আর কিছু অনুভব করছে না সে। এমনকি এতো অত‍্যাচারেও কই ব‍্যথা অনুভব করছে না সে। কাকা ঘরে ঢুকে একবার দেখে নিয়ে মুখ ঘুরিয়ে বলল

"নে নে আর এতো ঢং মারতে হবে না। কোথায় কি কি করে এসেছিস তা তো জানতে আর আমাদের বাঁধা নেই। এখন আমরা একটু রোজগারের কথা বলতেই ঢং দেখ। গতর কুঁড়ে মাগী কি আমাদের ঘাড়ে বসে বসে খাবি আর পাড়া নাচিয়ে বেড়াবি। জলদি ওঠ। রাতে আবার লোক আসবে। যা খেয়ে ঘুমিয়ে নে। শরীরটা ঠিক রাখতে হবে তো।

নিজের পোশাকটা পড়ে কোনমতে টলতে টলতে উঠে দাঁড়ায় সাবিত্রী‌। কাল পাশের ঘরে মা আর কাকার প্রচণ্ড ঝগড়া হয়েছে। অনেক বাঁচানোর চেষ্টা করেছে মা তাকে। বহুদিন প্রায় বাকরুদ্ধ থাকার পর কাল কথা বলেছিলেন। কিন্ত শেষ পর্যন্ত সরলাকে চুপ করতে হয়েছে একটা কথায়

"তোর মেয়ের আছে টা কি? সেই তো সবার সাথে রাসলীলা মেরে এসেছে। কোর্ট, কাছারি করে আজও কত টাকার ধ্বংস করছিস। উলঙ্গ তো সব জায়গায়। এখানে হলেই দোষের? বসে খাওয়াতে পারবো না। আর বেশী নাটক করলে লাশ পড়বে তোর আর তোর মেয়ের!"

কাকার ঘরের পাশেই সাবিত্রীর ঘর। ঘরে মা আর মেয়ে থাকে। কিন্তু একী ধাক্কা দিয়েও দরজা খোলা যাচ্ছে না! ঐ দুর্বল শরীরেও যতটা পারলো দরজা ধাক্কা দিল। চেঁচামেচিতে কাকা ছুটে এল

"এতো চিৎকার করার কি আছে সাবি? কাল দু চারটে কথা বলেছি তাই তোর মায়ের গোসা হয়েছে। সর আমি দেখছি। মা মেয়ে জ্বালিয়ে খেল।"

কিন্তু দরজা ধাক্কা দিয়েও যখন খুলল না একটু ভয় পেল সাধন। সত্যি কিছু করে বসে নি তো। পাশের বাড়ির সান্টুকে ডেকে আনলো। সান্টু একটু অবাক হয়ে সাবিত্রীর দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুঝতে অসুবিধা হল না। কোথাও কোন গন্ডগোল হয়েছে।

"হাঁ করে দেখছিস কি? লাগে তো মাল দিবি, পেয়ে যাবি। এখন দরজাটা ভাঙ দেখি?"

"ছি!"

চমকে উঠে মুখ বিকৃত করে সান্টু সাধনের সাথে কাঁধ মিলিয়ে দরজাটা ভেঙে ফেলল। আর ভিতরের দৃশ‍্য দেখেই চমকে কয়েক পা পিছিয়ে এল। সাবিত্রীর মা সরলা সিলিংয়ের ফ‍্যান থেকে নিজের কাপড় গলায় পেঁচিয়ে ঝুলছে।

সাবিত্রী প্রথমে বুঝতে পারিনি মা, মা বলে এগিয়ে গেছে কিন্তু ঐ দৃশ্য দেখে মাথা ঘুরে গেছে তার। সান্টু ব‍্যপারটা বুঝতে পেরেই ধরে নেয় সাবিত্রীকে।

কখন যে কি করে মায়ের ক্রিয়া কর্ম হয়ে গেল সাবিত্রী কিছুই বুঝতে পারলো না। সব যেন ঘোরের মধ্যে কেটে গেল। সব মিটে যাবার পর ফাঁকা ঘরে বালিশে মুখ গুঁজে এতোদিন পর হাউহাউ করে কেঁদে উঠলো সাবিত্রী।এবার সে কি করবে? সব ঘটনা আয়নার মতো ভেসে উঠলো চোখের সামনে।ছাড়বে না সে কিছুতেই।

ছোট বেলা থেকেই কপাল পোড়া সাবিত্রীর। দশ বছরেই একটা অ্যাকসিডেন্টে বাবাকে হারায়। তারপর শুরু হয় জীবন যুদ্ধ। সাবিত্রীর বাবা এমনিতেই ছিল রঙের মিস্ত্রী। বেশী রোজগার ছিল না। তারমধ‍্যে জুয়ার নেশা। সব উড়িয়ে ছোট ভাইয়ের থেকেই জমি বন্দক রেখে টাকা ধার করে। ফলে মারা যাওয়ার পর সাবিত্রীর আর তার মায়ের অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। ঐ কাকা সাধনের উপরেই নির্ভর করে চলতে হল। আর তাতেই সর্বনাশ চরম।

(২)

আসলে সাবিত্রীর মা সরলা সত্যিই সরল, সাধাসিধে। তাও স্বামীর মৃত্যুর পর লোকের বাড়ির কাজ করে চলছিল মা মেয়ে। নিজের ভিটেমাটির আশা ত‍্যাগ করেছিল সরলা। বরং স্বামীর দেনার দায়ে কাকার সংসারেই ঝি বৃত্তি করতে হতো সাবিত্রীকে। তবুও সরলা গ্রামের ক্লাবের রাত্রিকালীন স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল সাবিত্রীকে জোর করেই। সাধন অনেকবার না করেছিল।

সারাদিন সরলা অন‍্যের বাড়ি কাজ করতো। বাড়িতে একা সাবিত্রী আর সাধন থাকতো। সেই ছোট থেকেই সাবিত্রী বুঝতো কাকার স্পর্শ গুলো মোটে ভালো নয়‌ যখন যেখানে খুশি শরীর ছুঁয়ে যায় কাকার হাত। সুদের কারবারী বলে এমনিতেও সুনাম নেই খুব একটা সাধনের।তারপর যেসব লোক আসে তারাও বড় নোংরা ধরনের। খারাপ খারাপ ইঙ্গিত করতো ছোট থেকেই।
বারবার মাকে বলতো সাবিত্রী। সরলা বলতেন,

"কি করবি বল মাথার উপর তো কেউ নেই। তাও তো ছাদটা আছে। আর যতই হোক তোর কাকা এমন কিছু করবে না।।"

তবু সাবিত্রী ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতো।

সারাদিনের পরিশ্রমে সরলা ক্লান্ত হয়ে যেতো। এসে মা মেয়ের রান্না করেই ঘুমাতো। সাবিত্রী স্কুল থেকে ফিরতে রাত হতো ততক্ষণে সরলা ঘুমে কাদা। ঢেকে রাখা খাবার খেয়ে নিজের মতো পড়তে বসতো সাবিত্রী।

এইভাবেই চলছিল বেশ। নোংরা দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে সাবিত্রী গতবছর মাধ‍্যমিক দিতো। তাই বাড়ি ফিরতে বেশ রাত হতো পড়ার চাপে। অনেকটা দূরেই ক্লাব। মাঝে শ্মশান পড়ে। তাই সাবিত্রী অপেক্ষা করতো রাস্তায়। ঐ জনবিরল জায়গাটা পেরিয়ে আসতো কোন চেনা লোকের দেখা পেলে তার পিছু পিছু।

কিন্তু বিপত্তি ঘটলো ওই শীতকালটায়।সেদিন যেমন ঠান্ডা তেমনি অন্ধকার। বোধহয় অমাবস্যা। অঙ্ক করতে অনেক রাত হয়ে যায়। কিছুতেই মাথায় ঢুকছিল না অঙ্কগুলো যখন শেষ হল রাত দশটা। শীতের রাতে ওটাই মধ‍্যরাত। এদিকে সবাই যাবে উল্টোদিকে। সে একা শ্মশানের দিকে। কপাল জোরে কতগুলো লোক হঠাৎ চাদর মুড়ি দিয়ে পাওয়া গেল ঐ রাস্তায়। দূরত্ব বজায় রেখে তাদের পিছু পিছু চলতে লাগলো সাবিত্রী। অনেকটা দূরেই লোকগুলো। তবুও কথায় বুঝলো তার কাকা সাধনের কাছেই যাচ্ছে। নিশ্চিন্ত হল সাবিত্রী। বাড়ি পর্যন্ত যাওয়া যাবে। সুদের সাথে কাকার হরেক রকম ব‍্যবসা। এই শীতের রাতে তাই ঐ লোকগুলোর আনাগোনা।

পথ চলতি সাবিত্রী বুঝতে পারলো লোকগুলো মদের নেশায় বেসামাল। ফিসফিস করে কথা বলছে। এতটা পথ এসে সে ফিরেও যেতে পারবে না। আবার এদের পিছু পিছু যেতেও ভয় লাগতে লাগলো। ঠিক শ্মশানের সামনেই বড়ো নির্জন। আর ওখানেই হঠাৎ লোকগুলো ঘুরে দাঁড়ালো। সত্যিই ভয় পেলো সাবিত্রী।

আতর্কিত আক্রমণে দিশাহারা সাবিত্রী। কোন কিছুই খাটেনি সাবিত্রীর। চিৎকার, ধস্তাধস্তি, মারামারি এমনকি সাধনের ভাইঝি বলেও ছাড় পায়নি সে।
লোক তিনটে তার উপর চড়াও হয়ে তাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে খেয়েছে। ঐ শীতের রাতেই সারারাত নগ্ন অবস্থায় পড়েছিল শ্মশানের ধারের ঝোঁপে। কতবার যে অবচেতনে "মা", "মা" বলে ডেকেছে। কিন্তু কোথায় সরলা?

পরিশ্রান্ত সরলা তখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

সকালে কতগুলো লোক হাটে যাবার জন্যে ভোরে ট্রেন ধরে। তারাই যাবার পথে গোঙানি শুনে দেখে স্তম্ভিত হয়ে যায়। চেয়েটার কপালে গভীর ক্ষত। এক চোখ রক্তে বোজা। সারা দেহ ক্ষতবিক্ষত। নগ্ন। একজন তাড়াতাড়ি নিজের গায়ের চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়।

পুলিশ আসে। খবর পেয়ে সরলাও। মেয়ের অবস্থা দেখে সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায় কাঁদার শক্তিটুকু হারিয়ে ফেলে।হাসপাতালে জমে মানুষের টানাটানি চলে মাসখানেক।পুলিশ বারবার এসে খোঁজ নিয়ে যায়।কিন্তু সাবিত্রীর তখন প্রাণ সংকটাপন্ন অনুসন্ধান দূরের কথা।

প্রায় মাস দুই পর যখন সাবিত্রী সুস্থ হল তখন শুধু এটুকু জানা গেল যে লোকগুলো সাধনের পরিচিত। আর ওদের মধ‍্যে একজন সাবিত্রীকে মারা গেছে ভেবে বলেছিল

"বিষ্টু, এ তো টপকে গেছে। চল, সাধনের বাড়ি গিয়ে আর কাজ নেই। কেস খেয়ে যাবো।"

কিন্তু সাবিত্রীর কথায় আর সাধনকে চাপ দিয়েও কিছু পাওয়া গেল না। সাধন বলে দিলো ওই নামে সে কাউকে চেনে না। হয়তো সাথে যারা ছিল তাদের কেউ ওর চেনা। কিন্তু বিষ্টুকে চেনে না।"

এমনিতেই তো গ্রামে ঢি ঢি পড়ে গেছিল। কোর্টে কেস উঠতে সাবিত্রীর শুধু শুধু কষ্টের পরিধিটা বাড়লো আর কোন লাভ হল না। তবুও পুলিশের আশ্বাসে সরলা কেস চালিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু সনাক্তকরণ করতে না পারলে পুলিশ কি করবে। আর যেখানে সাধনই হয়তো ওর বন্ধুদের মদত জোগাচ্ছে।

শেষে সব আশা জলাঞ্জলী দিয়ে যখন সাবিত্রী আর সরলা কেস তুলে নিল তখন সাধন মা আর মেয়েকে পিষে মারতে লাগলো। সরলা প্রায় চুপচাপ বোবাই হয়ে গিয়েছিল মেয়ের এই সর্বনাশে কিন্তু সাবিত্রী লড়ে যাচ্ছিল। যখন দেখলো আইনের চোখেও কাপড় বাঁধা তখন সেও দুর্বল হয়ে পড়লো মায়ের মতোই।

(৩)

পাড়ার লোকে দেখলেই সাবিত্রীকে খারাপ খারাপ মন্তব্য করে, কুপ্রস্তাব দেয়। বিশেষ করে সাবিত্রীকে দেখতে বেশ ভালোই। তার মধ্যে সে এখন ধর্ষিতা।একদিন তো গ্রামের কয়েকটা ছেলে হাত ধরেই রাস্তার উপর টানাটানি শুরু করলো। ভাগ‍্যিস সান্টু এসে পড়েছিল। ছেলেগুলোকে মেরে ভাগিয়েছিল। সাধন ঐ পথেই যাচ্ছিল। সে এসব দেখে রাস্তাতেই উল্টে সাবিত্রীকে অপমান করতে লাগলো
"এখন দিনে দুপূরেও শুরু করেছিস। তোর জন্যে কি গ্রামে টেকা যাবে না। পুলিশ, কোর্ট, কাছারি তো লোক দেখানো। নিজে নষ্ট আর অন‍্যদের দোষ দেওয়া।"

সান্টু সেই ছোট্ট থেকে ভালোবাসে সাবিত্রীকে। কোনদিন বলতে পারিনি। তাই তার এই দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশী সে আহত হয়।ঐ ঘটনার পর সবসময় সাবিত্রীকে আগলে রাখে। সাবিত্রীকে ছায়ার মতো অনুসরণ করে। সাবিত্রী সব বোঝে। তবুও নিজের মনকে শাসন করে

"না এ হবার নয়।"

সেদিন সাবিত্রী হতম্বম্ভের মতো তাকিয়ে ছিল। কাকা যে এসব করে তার সর্বনাশের পথ প্রস্তুত করছে ভাবতেই পারেনি। বাড়ি ফিরতেই সাবিত্রীর উপর চড়াও হয়ে বলল

"বসে বসে আমি খাওয়াতে পারবো না মা মেয়েকে। বাপে তো টাকা ধার নিয়ে অকালে মরে আমায় পথে বসিয়ে গেছে। টাকা শোধরাবে কে? আমার টাকা চাই ব‍্যাস।"

সেদিন রাতেই জোর করে সাবিত্রীকে টেনে নিয়ে ফেলেছিল ক্ষুধার্ত পিশাচের সামনে। সাবিত্রী, সরলার প্রতিবাদ খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিল। কেই বা শুনবে একটা ধর্ষিত মেয়ের চিৎকার, কেই বি করবে বিশ্বাস। বরং যে আসবে তাকেই হতে হবে বদনামের ভাগীদার।

সাবিত্রীর মায়ের মৃত্যুর পর সাধন অবশ‍্য কিছুটা সংযত হয়েছিল। পুলিশ ঘোরাঘুরি করছে। নিজের গা বাঁচিয়ে চলতে হবে তো। এমনিতেই তার অনেক রকম কারবার। সাবিত্রী অবশ‍্য ঠিক করেই রেখেছিল ছাড়বে না সে সাধনকে।আর আজ তো অযাচিত অনেক বড়ো সুযোগ এসে গেল। শুধু সান্টুর সাহায্য লাগবে একটু।

"মেশানো আছে তো পরিমাণ মতো?"

ফিসফিসিয়ে জিঞ্জাসা করে সাবিত্রী।

"লোহার চূর্ণ, কাঁচের চূর্ণ কিন্তু এতো অল্পমাত্রায় যে ধরাই পড়বে না। আর তাছাড়া এটা বাংলা মদ। এ খেয়ে মরলে কেউ তদন্ত করে না। সোজা রিপোর্ট মেরে শ্মশান। কিন্তু তুই ঠিক জানিস সাবি ঐ তিনটেই আজ আসবে?"

ফিসফিসিয়ে জিঞ্জাসা করে সান্টু। পোড়ো মন্দিরের পিছনে কথা হচ্ছে সান্টু আর সাবিত্রীর।

সাবিত্রী ঘাড় নেড়ে বলল

"ঠিক জানি গো। আমার আর কাকার ঘর পাশাপাশি। সব কথা শোনা যায়। ঐ খোনা খোনা গলা লোকটাঐ ভুলবো কি করে?

তাছাড়া বাকি দুজনের গলাও চেনা চেনা। আর বলল তো, সেদিন ঠিক জূত হয়নি রে সাধন। তুই ব‍্যবস্থা কর। যত টাকা লাগে আমরা দেবো। তোর টাকায় সাট্টা খেলে প্রচুর রোজগার করে ফেলেছি। একটু ফূর্তি না মারলে চলে। আর ঐ মেয়েটা আমাদের নেশা ধরিয়ে দিয়েছে।"

"কিন্ত তুই যদি ধরা পড়িস আমার কি হবে?"

সান্টু ভয় পেয়ে বলল।

"আরে কাকা আগেই মদ কিনে এনে রেখেছে। আমি শুধু কাকার মদ ফেলে তোমারটা ভরে দেবো। কিছু হলেও সবাই কাকাকে ধরবে। কাকা মদ কিনেছে। কাকার ঘরে লোকগুলো আসবে। তুমি চিন্তা কোরো না। আমার কিছু হবে না।"

গ্রামে হৈ হৈ ব‍্যপার। চোলাই মদ খেয়ে একই রাতে চার চারজন মারা গেছে। সাধন ও তার তিনবন্ধু। সাবিত্রীকে পুলিশ জিঞ্জাসাবাদ করছে।

না, সে কিছু জানে না। কাকাই মদ কিনে এনেছিল আর কাকাই বন্ধুদের ডেকে এনে জুয়া খেলতো।"

ইন্সপেক্টর সাবিত্রীকে একধারে ডেকে নিয়ে বললেন,

"দেখ,যদি ঐ তিনজন তোমার অপরাধী হয় তবে আমি দেখবো কেসটা কিভাবে সহজে মেটানো যায়। বিশেষ করে সাধন সুদে কারবারী করতো। জুয়া খেলার সময় জোরচুরি করে সবাইকে ঠকাতো। তাই যে কেউ প্রতিহিংসার বশে খুন করতে পারে।আইনের চোখে হয়তো আমি অপরাধী হয়ে থাকবো কিন্তু বিবেকের চোখে আমি মুক্তি পাবো মা।"

সাবিত্রী ছলছল চোখে ইনস্পেক্টরের দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করল। মাথায় রেখে বলল

"সুখী হ মা। আমি দেখছি। কি ব‍্যবস্থা করা যায়। আর হ‍্যাঁ, তোর কাকা তো নিঃসন্তান ছিল। তবে তো সবই তোর। আচ্ছা, দাঁড়া আমার চেনাজানা উকিল আছে। আমি সব ব‍্যবস্থা করে দিচ্ছি তোকে।"

সান্টু এসে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। ইন্সপেক্টর চলে যেতেই বলল

"কি বলল তোকে?"

সাবিত্রী বলল

"আজীবন কারাবাস।"

তারপর সান্টুর ভীতসন্ত্রস্ত মুখের দিকে চেয়ে বলল

"তোমার প্রেমে।"

*** সমাপ্ত ***
*** স্বত্ব সংরক্ষিত ***

লাস্ট বেঞ্চ
- অন্তরা রায়

-- হ্যালো ?
-- হ্যাঁ মা ..., বলো ..|
-- কিছু না বাবু , পরশু কথা বলতে বলতে ফোন টা কেটে গেলো ভাবলাম কাল হয়তো ফোন করবি | তাই ... ...
-- কাল আর সময় করে উঠতে পারিনি | এই দেখো না মিস্টার সেনগুপ্তর মেয়ের আবার বার্থডে পার্টি আজকেই | এখুনি বেড়োতে হবে | নিতু আর সিমি ওদিকে তাড়া দিয়েই যাচ্ছে | শোনো না , আমি কাল ফোন করবো রাতের দিকে | কেমন ?

আচ্ছা বলতেনা বলতেই পিপ পিপ আওয়াজ টা যেন একটু জোরেই কানে বাজে রুমেলার | কালো ফোনটার দিকে তাকিয়ে থাকেন বেশ কিছুক্ষন | রুমেলা জানে কালটা বাবুর খুব সহজে আর আসে না |

সবগুলো কৌটো নাড়িয়ে নাড়িয়ে দেখেন | নাহ...., মুড়ি , বিস্কুট , চিড়ে , বাজার এমনকি চাল ও বাড়ন্ত | যা বৃষ্টি , কাজের মেয়েটাও তিনদিন ধরে আসছে না | ওদিকে আজ রাতটায় যদি বৃষ্টি হয় কাল নিঘ্ঘাৎ ঘরেও জল উঠে আসবে | পেল্লায় বড়ো খাটটার এক প্রান্তে বসে থাকেন রুমেলা | চোখটা বন্ধ হয়ে আসে |

........ গমগম করছে সারা বাড়ি | আত্মীয় স্বজন , সাজগোজ , চিৎকার ,হৈ হৈ তে মেতে উঠেছে চৌধুরীবাড়ি | নবীন চৌধুরী এক্কেবারে ঢাকার বনেদি পরিবারের মানুষ | ওদের ওই দিকটায় আবার বাজনার প্রচলন | রুমেলার আবার তা পছন্দ নয় | কি ভোর থেকে ভ্যাপোর ভ্যাপোর | বড্ডো লাউড লাগে ওর | ভোর থেকে সানাই বাজছে এবাড়িতে | আজ যে বাবুর অন্নপ্রাশন | সারা বাড়ি জুড়ে শাঁখ উলুর ধ্বনিতে মেখে | নবীনও কোনো প্রকার খুঁত রাখেননি | রুমেলার হাজারো বায়নাক্কা | বাবুর জন্য পেট অবধি মোটা সোনার চেন চাই , কোমর বিছে চাই , এটা ওটা এমন অনেক | কোনোটাতেই ভদ্রলোক না করেন নি | খিলখিল করে হাসছে ছোট্ট বাবু |

নাঃ , রাত হয়েছে বেশ | কিছু খেতে তো হবে | সারাটা রাত উপোষ দিলে শরীরটা আরো যাবে | এই সত্তর বছর বয়েসে শরীর যে সব অত্যাচার নেওয়ার ক্ষমতা একেবারেই হারিয়েছে | ফ্রিজের কোণে সাবুর প্যাকেটটায় হাফ মতো রয়ে গেছে | ওটাই টেনে বার করেন রুমেলা | কৌটোয় খানিক মুগডাল পরে আছে |
ধুর , ওই ফুটিয়ে একটু খিচুড়ি মতো বানিয়ে নিলে আজকের রাত টা চলে যাবে | বাকি টুকু কাল দেখা যাবে কি করা যায় ...

-- বাবু সিলেবাস ক বার রিভিশন হলো ?
-- সেকেন্ড টাইম মা | সময় আছে আরো বার দুয়েক পারবো | তুমি যাওয়ার সময় দরজাটা বন্ধ করে দিও ..

বাইরের ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায় বাবুর মা | শীতের পরে যাওয়া শেষ ফিকে রোদে নিশ্চিন্তের আরাম সুখ পিঠে পেতে নিতে |

-- কাকিমা শোভন আছে ?
শোভন বাবুর ভালো নাম বলতে যা বোঝায় আর কি |

-- আছে , পড়ছে | তুই এখন এখানে কি করছিস রে ? তুই পড়াশোনা করিস না ? সামনে না বোর্ড ফাইনাল এক্সাম |

বাবুর ক্লাসেই পড়ে আশীষ | বাবুর ভালো বন্ধু | কিন্তু পড়াশোনায় বাবুর থেকে অনেক পিছিয়ে | খেলার জন্য ডাকতে এসেছে | নিচে আরো অনেকেই মনে হলো | সবার সামনে এমন বলাতে আশীষ একটু লজ্জায় পরে |

-- করি কাকিমা | সন্ধ্যেবেলায় বসবো |
-- খেলে গিয়ে কতটুকু পড়িস ? ঘুম পায় না ? যা বাড়ি যা |বাবু খেলতে যাবে না এখন | এমনিতেই নাইন্টি টু পার্সেন্ট পেয়েছে | ওটা না বাড়ালে আর দেখতে হবে না | ভালো কোথাও চান্স আর পেতে হবে না |
এই তোর কত পার্সেন্ট হয়েছিলো রে ?

-- সেভেন্টি টু |
মাথা নিচু করে অপরাধীর মতো বলে আশীষ |
-- এবাবা ......অনেকটা কম তো | যা বাড়ি যা | কদিন খেটে নম্বরটা বাড়ে কিনা দেখ |

সুলেখার মেয়েটা ভীষণ মিষ্টি | গানের গলাটা দারুন মন ছোঁয়া |এক মাথা চুল আর হাসিটা সারাক্ষন মুখে লেগে যেন | চোখ মুখ কাটাকাটা সুন্দরী একেবারেই নয় গায়ের রংটাও চাপা কিন্তু সবটুকু মিলিয়ে এমন মিষ্টি মেয়ে নবীন খুব কম দেখেছেন | চৌধুরী মশাই এক প্রকার কথা দিয়েই আসেন মেয়েটিকে দেখে | কেমন যেন মায়াময় চোখটা মেয়েটার | এমন একটা মেয়ে আসুক বাবুর বৌ হয়ে | রাতে বাবুকে কথাটা পারতেই সে খেপে ওঠে | ওকে না জানিয়ে কেন কথা দিয়েছে ওরা ? এও জানায় অনেক আগেই বাবুর পছন্দ করা একজন রয়েছে | রুমেলা নবীনকে বোঝান | যারা একসাথে সারাটা জীবন থাকবে তারা নিজেরাই তো ঠিক করেছে | ভুল তো নয় | রুমেলা নিজে যান স্বামীর সাথে সুলেখার কাছে | হাত জোড় করে একপ্রকার ক্ষমা চেয়ে আসেন |
সময় যেন হোঁচট খেয়ে হাঁটু ভেঙে হুড়মুড় করে সামনে এসে পরে | ওদের বিয়ে ঠিক হওয়ার মাস দুয়েকের মধ্যেই নবীনবাবু মারা যান | নিতুর বাড়ির লোকজন জানায় তাদের প্রস্তুতি পর্ব প্রায় শেষ এমুহুর্তে , এমন অবস্থায় বিয়ে পিছোনো অনেকটা অসুবিধের |

রুমেলা কিছু বলার অবস্থায় ছিলোনা সেদিন | ঠিকই , ওরা সুখে থাকলে আর কি চাওয়ার |

বিয়ের কিছুদিন পর বাবু আর নীতু ব্যাঙ্গালোরে শিফ্ট হয় | ব্যাস. তারপর থেকে এইরকম | পুজোর চারদিন ওরা অবশ্য এখানে আসে | কিন্তু এবাড়িতে একদিন সর্বসাকুল্যে | বাকিদিনগুলো বাবু নিতুদের ওবাড়িতে | নিতুও তো এই কদিনের জন্যই কলকাতায় আসে | তার ইচ্ছে তো থাকবেই নিজের মা বাবার কাছে থাকার | এনিয়ে কিছু বলেন ও না বাবুর মা | এখন সিমি আছে | খুব ইচ্ছে হয় আবার আগের মতো ঘর ভরে উঠুক কিন্তু ইচ্ছে আর বাস্তবের ব্যবধান বেড়েছে অনেককাল |

কড়াটা ধুয়ে গ্যাসে সবে বসাতে যাবেন | দরজায় বেলটা বেজে ওঠে | রাত প্রায় দশটা | সারা রাস্তা ঘাট ভেসে গেছে | পোস্টের আলোগুলো আজ আর জ্বলেনি |

-- কে ?
-- কাকিমা আমি আশীষ |
-- কিছু বলবি ? দাঁড়া আসছি |
বাতের ব্যাথাটা আজকাল একটু বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছে | একটু সময় গা হাত পা ছেড়ে পরে থাকার জো নেই | শরীর সচল হতে সময় লেগে যায় | খাট , চেয়ার , দেওয়াল ধরে দরজাটা কোনোমতে খোলে |
এককোমর জলে দাঁড়িয়ে আশীষ |

-- বাড়ি ফিরছিলাম কাকিমা | আপনার ঘরে আলো জ্বলতে দেখে ভাবলাম একটা খবর নিয়ে যাই | গতকালই ভেবেছিলাম আসবো | অফিস থেকে ফিরতে দেরি হওয়াতে আর এসে উঠতে পারিনি | দুদিন বৃষ্টিতে যা অবস্থা , বলছি ঘরে সব কিছু আছে তো ?

সন্ধ্যেবেলায় শুধু লিকার চা খেয়েছেন | দুধ বিস্কুট কিছুই নেই | রুমেলার দুচোখ কেমন ভিজে ভিজে লাগে |

-- নারে , ঘরে কিচ্ছুটা নেই |
আশীষ আর কিছু বলে না | মাথা নিচু করে বলে..
-- কি কি লাগবে আমায় বলুন | আমি এখুনি এনে দিচ্ছি | মোড়ের দোকান এখনো খোলা আছে |

-- ভেতরে আয় আগে |
আশীষ ভেতরে আসে | দু কাপ জল বসিয়ে দেয় রুমেলা |টাওয়েলটা এগিয়ে দেয় |
-- কাকিমা আগে জিনিসপত্র গুলো এনে দি | বৃষ্টির দিন দোকান বন্ধ হয়ে গেলে মুশকিল | এসে বরং চা খাবো |

মিনিট পনেরোর মধ্যে আশীষ ফিরে আসে | কাকিমা চা বানিয়েছে দু কাপ | সঙ্গে দুটো থালায় সাবুর খিচুড়িও | ঘি আর আদর ভালোবাসায় অসাধারণ গন্ধ সারা ঘর জুড়ে |

-- এই বুড়ো বয়েসে আর পেরে উঠিনা রে বাবা | আজ তুই কেমন ঈশ্বরের মতো এলি |
-- ধুর কি যে বলেন | আপনি আমার মায়ের মতো | ছোটবেলা থেকে মা তো ছিলেননা | বাবা মানুষটাও মা চলে যাওয়ার পর ভীষণরকম ভোলাভালা যেন হয়ে গেলেন | আমি আমার মতোই বেড়ে উঠেছি | তবে সেই সময় আপনার বকাঝকা আমার কাছে আশীর্বাদের মতোই ছিল |
-- তুই অনেক বড়ো হয়েছিস রে বাবা | অনেক | আকাশের মতো বড়ো হ এই আশীর্বাদ করি |

আসলে কোনো কোনো সম্পর্কের কোনো দায় থাকে না | কোথা থেকে তারা কিন্তু দায়িত্ব নিয়ে ফেলার অসীম ক্ষমতা রাখেন | পাশাপাশি হাঁটতে পারেন বহুদূর বিনা প্রতিশ্রুতিতে | তাতে কোনো ডিগ্রি কিন্তু লাগে না | এমন কেউ কেউ আছেন বলেই পৃথিবীটা এতো সুন্দর , আজও |

কাকিমা আর আশীষ ওদিকে খিচুড়ি খেতে বসেছে ঠ্যাং ছড়িয়ে | রুমেলা হো হো করে হাসছেন আর নিজের ছেলেবেলায় কতটা ডানপিটে ছিলেন সেই গল্প বলে চলেছেন | রুমেলাকে একঝাঁক সবুজ বাতাসে ভাসিয়ে দিলো আজ লাস্টবেঞ্চ ||

ভালোবাসা
- অঞ্জলী দাশ গুপ্ত

ভালোবাসা" হলো আবেগ মেশানো ফুলের মাঝে মিশে যাওয়া..
"ভালোবাসা" হলো দিল দরিয়ার মাঝে পাল তুলে দিয়ে, নদীর ঢেউয়ে ছুটে যাওয়া...
"ভালোবাসা" হলো মিষ্টি মধুর বৃষ্টি ভেজা রাত..
"ভালোবাসা" হলো ভোরের সূর্য রাতের অন্ধকার...
"ভালোবাসা" হলো উষ্ণ ছোঁয়া শিউরে ওঠা মন...
"ভালোবাসা" হলো চোখের কাজলে হারিয়ে ফেলা মন...
"ভালোবাসা" মানে না কোনো শর্ত ,শুধু আবেগে বয়ে চলে...
নির্বোধেরা তার মধ্যেও শুধু স্বার্থ খুঁজে চলে..

গ্রহণের পর
- সোনালী মন্ডল আইচ

জাদুবাস্তববাদ খুঁজতে গেলে
সংরক্ষিত তারামন্ডল হেসে ওঠে
ক্যালেন্ডারে আহত দীর্ঘশ্বাস কিছু

বাঁশ গাছের ফুল
অণুজীবী ধারণার কাছে ঋণী
কাঁসর ঘন্টা শঙ্খ এক্কাদোক্কা

খেলাটা দম ধরে রাখার
সজাগ তিমিরে সবুজ চোখ
অষ্টপ্রহর দোলে ফ্যান্টাসি পেন্ডুলাম

আমাদের বিষয় আন্তর্জাতিক
মেমোরানডাম অফ আন্ডরস্টান্ডিং
মুদ্রাস্ফীতি কৃত্রিম উপগ্রহ বিটকয়েন

প্রাচীন সংস্কারবিহীন এই মর্ত্য
নিঃসঙ্কোচ বিলম্বিত লয়ে
পশ্চিম থেকে পূব অতিক্রম করে যায়

©Sonali Mandal Aich

চুড়িহাট্টার অগ্নিনিক্বণ
- মোশ্ রাফি মুকুল

একুশ দুই দুই হাজার উনিশ।
চুড়িহাট্টার কাছে যা শিখলাম-
আগুনের কাছে শিখলাম 'মা' কি,
মা কাকে বলে,
দেখলাম সেই চিরন্তন মাতৃরূপ-
সন্তানকে বুকে আঁকড়ে
নীল আগুনে কয়লা হয়ে যেতে পারে
মমতাময়ী মা,
পুত্রও মায়ের ঔষুধ কিনতে গিয়ে
মৃত্যকে আলিঙ্গন করতে পারে।

মৃত্যুর যৌথখামারে
প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে কিভাবে
গলাগলি করে মরে যেতে হয়,
চকবাজারের রাতের অগ্নিস্রোত
শিখিয়ে গেলো
আইন না মানা সংস্কৃতিতে কিভাবে
বাতাসে ছড়িয়ে যায় লোভের পারফিউম
শ্রমজীবী আর নিরীহ মানুষের
পোড়া গন্ধে ভারী হয় বাতাস,
কতো কিছু-শেখালো সে আগুন
বন্ধুত্বের বন্ধন কতো দৃঢ় হতে পারে,
ডাঃ রাজন আর ডাঃ রাসুর
বুনিয়াদি স্বপ্নগুলোর মতো
আমাদের স্বপ্নগুলো হুহু করে
পুড়ে যেতে পারে সময়ের ক্যানোস্তরায়
এ বিনাশী আগুনের দৈত্য
আরো শিখিয়ে গেলো
জীবন কতো ঠুনকো-
কতো বিবর্ণ ও হলুদ হতে পারে,
মৃত্যুর মতো চরম সত্য
দ্বিতীয়টি যে আর নেই।

ঘড়ির কাটায় তখন রাত দশটা দশ পুরানো ঢাকা।
চুড়িহাট্টা শিখিয়ে গেলো
পুরাতনকে সর্বদা আঁকড়ে থাকতে নেই
শহরকেও জ্যামিতিক সূত্র মানতে হয়
এবং চুড়িহাট্টা অগ্নিনিক্বণ
বাজিয়ে
জানিয়ে গেলো
মানুষ কতো অসহায়
আমরা মৃত্যুর কতো কাছাকাছি থাকি
চকবাজারের কেমিকেল দাবানলে
আবার
পুনরুত্থিত হলো
অনেক অনিবার্য সত্য
করুণ করুণ তরুণ মৃত্য।

২৩/০২/২০১৯.

ভালোবাসি
- মোশ্ রাফি মুকুল

আমি অজ্ঞাতবাস থেকে বলছিনা-
প্রাপ্তবয়স্ক এক মস্তিষ্ক থেকে,
জ্ঞাতস্বরে বলছি-
ভালোবাসি,ভালবাসি তোমায়-
আদম হাওয়ার পরে অগ্নিযুগের
প্রেমের তপ্ত নিঃশ্বাস
রোমিও জুলিয়েট থেকে
আরব্যোপন্যাস,
লাইলি মজনু থেকে শিরি ফরহাদ
কিংবা সমকালের
চটুল
প্রেমোপাখ্যানের মতোও নয়,
আমার মতো করে,
ঠিক আমার মতো-
অথবা-
ভালোবাসি প্রেমেশ্বরেরই মতোই
যেভাবে যতটুকু ভালোবাসা যায়।

আমি মিথ্যা কিছু বলছিনা
একজন প্রেমিক কতোটুকু ভালোবাসলে
কানায় কানায় ভরে যায়
প্রেমিকার বুকের কলস।
ঠিক ততোটা,ততোটা।

আমি-
হৃদয়চিহ্নের লালগল্প
বানিয়ে বানিয়ে বলছিনা-
আড়ে আবডালে থেকেও নয়
প্রকাশ্য,দিবালোকে এই সামাজিক হাটে-
'হাটে হাড়ি ভেঙে'বলছি-
ভালোবাসি,
তোমায় ভালোবাসি নারী,
আফ্রিদিতির মতো-
যে ভালোবাসা কাউকে কখনো
বাসেনি কেউ।

এবার তবে অজ্ঞাতবাস ভোলো
খুলে ফ্যালো দ্বিধার মনস্তাত্ত্বিক মুখোশ,
সব চাপ ঝেড়ে ফ্যালো,
ছিড়ে ফ্যালো লোকচক্ষুর ভ্রুকুটি
বাড়িয়ে দাও শুদ্ধ সাদাদিল,
এবং তোমার ইচ্ছার দলিল,
দশ আঙ্গুল,সহজ হাতদুটি,
এ সমাজ সংসারে এসো একসাথে,
সমস্বরে,বলে উঠি
ভালোবাসি।
আর বলি
আমরা আমাদেরকে ভালোবাসি,
ভালোবাসি বিপরীত হৃৎপিণ্ডটাকে,
ভালোবাসি তাকে-
তার জন্মমৃত্যু ক্ষুধা-কাম,
তার ঘাম,
ভালোবাসি প্রেমপুষ্ট
সে স্বোপার্জিত মানুষটাকে
এবং
তার আকাঙ্ক্ষাহীন নরম
সরল ফুসফুস।

চোখ
- মোশ্ রাফি মুকুল

স্থির চোখে কি কোন ভাষা থাকেনা?
থাকেনা কি কোন
যুদ্ধ কিংবা সন্ধির আহবান?

কুমেরুর মতো জমাট হলে
সেটাও হতে পারে ইগলু-
প্রেমের আস্তাবল
যমজ পাখির রাত্রিযাপনের মতো ঘন ঘ্রাণাধার
জলকিশোরীর চিরায়ত ডেরা

বুনো আপেলের খোঁজে
যে কিশোর অতিক্রম করেছে এতোটা পথ
পাইনের বন,চেরীর গন্ধ
শুধু সেই বোঝে
স্থির চোখের জমাট মর্মকথা

♥ ২১ মানে মাথা নত না করা♥
নাদেরা ফারনাছ শিমুল
<><><><><><><><><><><><>
একুশ মানে গর্জে উঠা একটি দিন
ভাষা শহীদের ইতিহাস অমলিন,
একুশ  মানে আমার মায়ের ভাষা
মোদের গরব, মোদের আশা,
একুশ মানে ভাষা, সাহিত্য আর নিজেস্ব অভিমত
শ্লোগানে মুখরিত রাজপথ,
একুশ মানে লৌহ কপাট ভাঙা
আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙা,
একুশ মানে ছেলে হারানোর জ্বালা
রক্ত দিয়ে সাজানো বর্ণমালা,
একুশ মানে শত্রুরা নির্বাক
মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের ডাক,
একুশ মানে একটি জাতীয় চেতনা
আমাদের স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা,
একুশ মানে মাথা নত না করা
শৃঙ্খলিত গণতন্ত্রকে মুক্ত করা…।

বাসন্তী চিরকুট
- মোশ্ রাফি মুকুল

আমার ধানক্ষেত বিকেলের
অনুগত উপমায়-হলুদ ফাল্গুন
কালোপাখির বিসৃত মুখচ্ছবি,
দিগন্তরেখা ছুঁয়ে যায় তোমার নির্ভার
চিবুক,
সহস্রবার বললেও নিজেকে ফেরাতে পারিনা
আরো নিবিড় হই ঘনিষ্ঠ মনোসংযোগে।
আমার প্রবল বিকেলগুলো গাঢ়োলাল হয় তোমার
মুখমণ্ডলে ভেসে থাকা আশ্চর্য রক্তপ্রবালে।

এইসব ফিরোজা বসন্তধ্যান-
কৃষ্ণপক্ষীর নিভৃতভাঙা ডাক
পড়ন্ত দিনের কাছে খোলাচিঠি লেখে,
কখনো কখনো প্রেমজ খুদেবার্তায়
বেজে ওঠে মনের মুঠোফোন।

আমরা যারা বসন্তচারী-
ভরে নি বুকের কলস,
সন্ধ্যার সেগুফতা কৌতুহল শেষে
ফিরে যাই নদী নারী রাত্রির কাছে,
লেনদেন করি রোদের মুগ্ধতা
ধানক্ষেত বিকেলের রূপোলী দোলা
তোমার সবুজ ছায়া,বাসন্তী চিরকুট।

২০/০২/২০১৯.

একুশের আত্মগত কম্পন থেকে
- মোশ্ রাফি মুকুল

এই যে শব্দের পরে শব্দপ্রয়োগ,
শব্দের অনুরণনে শ্রবণসুখ
এইসব নতুন পংক্তি,
এই যে
আকাশে আপেলরঙা ঘুড়ি উড়ানো
চাঁদের দেশ থেকে পেঁজাতুলো মেঘ
নামিয়ে আনা,

এই যে সবাই গালভরে 'মা'-ডাকছে মায়ের ভাষায় কবিতা লিখছে
এই যে স্বপ্নবুনছে রোদচশমায়,
এই যে
ভালো থাকছি ব্যক্তিগত উপমায়,
ডুব দিচ্ছি কবিতায়,প্রাণন বর্ণ
অ আ ক খ- সাথে মিশে যাচ্ছি অহরহ-

এই যে ভাস্বর স্বাধীনতা
তা এক বাগ্মীর স্বর থেকে উঠে আসা
'স্বাধীনতা' নামের এক
বিস্ময়ের কবিতা,
যা মঞ্চে দাঁড়িয়েই লিখলেন কবিদের কবি শেখ মুজিব-
তাও একুশের আত্মগত কম্পন থেকে পাওয়া।
এক ভাষাশিল্পীর মাটি ও মানুষের প্রতি
নির্মোহ সম্মোহন।

এই যে 'জয়বাংলা'
এই যে তুমুল জনপ্রিয় স্লোগান,
এই যে ক্রমাগত বায়ান্ন,উনসত্তর-
একাত্তর
ত্রিশলক্ষ রক্তের সিঁড়ি,
ভাষার মহাসড়ক ধরে
মুক্তির মিছিলে এগিয়ে যাওয়া।

ভাষারূপের এই যে সুষমা,
এতো মুগ্ধতা,
এই যে 'হাজার বছর ধরে'
এই যে সুদীর্ঘকাল,
এই যে ভাষার প্রবাহমান ইতিহাস
এই যে গ্রাম্য মানুষ
সহজ কথা বলার ঢং,
শব্দের সৃজনশীলতা
যুগ বন্ধনে কবির সৃষ্টি,
এ এক আশ্চর্য রক্তোধ্যায়
'সময়ের প্রয়োজনে'
এসব'ই প্রার্থিত ছিলো।

জীবনের প্রয়োজনে এ ভাষা-
মুক্তির প্রণোদনায় এ স্বাধীনতা-
এ 'বাংলা'র বিন্যাস
বাংলার চারুপাঠ,কবিতা,উপন্যাস।

২০/০২/২০১৯.

তৃষ্ণার শহর
- মোশ্ রাফি মুকুল

তৃষ্ণার শহর।
তুমুল ধর্ষক।
জলবতীর পদছায়া ধরে হাঁটে
সীমাহীন কাপুরুষ।
সমকালের নদী ভেসে যাচ্ছে
প্রাগৈতিহাসিক তৃষ্ণায়।

বর্বর ব্রিফকেস খুলে যাচ্ছে প্রতিদিন।
কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া
আমরা মানুষ ছিলাম কবে?
সিন্দুক ভরে রেখেছি যতো
গোপন তৃষ্ণার বারুদ-
সরল আদিমতা।

১৯/০২/২০১৯.

আনুগত্য
- মোশ্ রাফি মুকুল

আমার অনির্বাচিত
কল্পদৃশ্য গুলোয়-
দ্বিখণ্ডিত শব্দের ছায়া,
মধ্যদুপুরের সচকিত ছায়াকর্মীর মতো
সে পথে হাঁটাহাঁটি,
যেটুকু পথের পাড়ি-
এখানে উল্লাসিত হবার কিছু নেই,
বরেণ্য কবিদের সৃষ্টিকৌশলে
তা উল্লেখযোগ্য কিছু নয়।

ভাষার কারুকাজে চোখ ফেরাতে পারিনা-
মনোভূমিজুড়ে শব্দের সুনামি আসে,
আমার পূর্বসূরিদের শব্দশৈলীতে
যে আগুন ঝরে
তাতে দগ্ধ হতে হতে আমি হয়ে যাই
তাদেরই নিতান্ত এক কাব্যমিতা।

ভাষার যে দান তাতে প্রাণ ভরি,
অস্ফুট শব্দগুলো মুখে বলতে পারি-
এ গর্বটুকু আছে।
শৃঙ্খলিত আর্তস্বরগুলো মুক্তপাখির
মতো উড়াতে যাই মাঝে মাঝে
ভাষাশিল্পের এক অদক্ষ শব্দশ্রমিকের মতো,
পারিনা-অমর কবিতাপুরুষদের মতো,
আমি তাদের অনুগত একজন হয়ে থাকি,
খণ্ড খণ্ড শব্দের ছায়া ধরে তাদের পদাঙ্কনুসরণ করে যাই
ভাষার প্রতি,পূর্বসূরিদের প্রতি
এ আমার নিঃশর্ত আনুগত্য।

২০/০২/২০১৯.

ফাগুনী নিশান
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

হৈ-হৈ-হৈ হৈ ফাগুন এলো ঐ,
ফুল কুঁড়িতে জগত আলো পাখিদের হৈ-চৈ।
ফাগুন হাওয়া মাতোয়ারা বুনো ফুলের গন্ধে,
ভ্রমর ভ্রমরি সুর তুলেছে মৌ পাখিদের ছন্দে।
পলাশ বনের শাখায় শাখায় রঙ ধরেছে ওই,
ফাগুন মাসের ফুলের হাসি সৌরভ মধুময়।
ঘুর্ণি বাতাস পথের পরে শুষ্ক পাতার গুঞ্জরন,
মাধুরী কাঞ্চন শিমুল ফুলে জগত অলঙ্করন।
চোখ গেল চোখ ডাকছে পাখি কুঞ্জবনে বনে,
ফটিক জল বলছে কথা লুকিয়ে সংগোপন।
গাছের ডালে কে ডাকে ওই বউ কথা কও,
ছন্দে ছন্দে গাহে পাখি বাঁকা চোখে সোনাবউ।
গাছের বাহু জড়িয়ে ধরে হরেক রঙের ফুলে,
ভূবন যেন ফুলের সাজি ফাগুন দোলায় দুলে।
মৃদু গুঞ্জরি আমের বনে উড়ে যায় মৌমাছি,
প্রকৃতির এই অনুরাগী আজ কত কাছাকাছি।

চল যায় বসন্তের দেশে
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

আমাদের এ-ই বৈচিত্র্যময় বাংলা, সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম। ছয় ঋতুর ষড়ঋতু, অর্থাৎ শেষ ঋতু বসন্ত। ছয় ঋতুর পাঁচ ঋতুকে বিভিন্ন রূপ-জৌলুষে দেখলেও বসন্তের রূপ-জৌলুষ অন্যতম।
তবে একেবারে না বললেই নই। বসন্তকাল আসতে না আসতেই মনে পড়ে যায় কোকিলের কুহু-কুহু মধুর বোল। বসন্তের দূত বলতে কোকিলের সাথেই আমরা বেশী পরিচিত। বসন্তকাল ছাড়াও কম-বেশি এদের-কে বছরের অধিকাংশ সময়ই ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে দেখা যায়। এমনও কিছু পাখি আছে যে, একমাত্র বসন্তকালেই দেখতে পাই। সুন্দর এ-ই পাখিটির নাম বৌরি পাখি। আমাদের বাংলার মানুষ কেউ-কেউ বসন্ত বৌরি নামেও সম্বোধন করে। বসন্তকালে আমাদের বাংলায় বড় পাখির তুলনায় বিভিন্ন ধরনের রঙবেরঙের ছোটো ছোটো পাখিদের ভীড় জমে বেশী।
এবার আসি বসন্তকালীন রংচঙে ফুলের কথায়। বসন্তকালে গাছে-গাছে বিভিন্ন রংচঙে ফুলের মাঝে মনে পড়ে যায় শিমুল ফুলের কথা। বসন্তকালের এই ফুলটির সাথেই বাংলার মানুষ বেশী পরিচিত।
আবহমান বসন্ত তার রূপ জৌলুশ নিয়ে দশ মাস পর পর প্রতি বছর দুই মাসের অতিথি হয়ে এসে আমাদের বাংলাকে নব যৌবন রূপে পুনর্জীবন করে তোলে। রঙে রঙে ভরে ওঠে সারা বাংলা।
আজ বসন্ত।
পাখি গাইবেই, ফুল ফুটবেই।
তরঙ্গে তরঙ্গে সুরভিত গুঞ্জরিত।
রঙ্গশালা বঙ্গ আমার এলোরে এলো বসন্ত।।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ভেঙে উন্মুক্ত করে দিল বাংলা তার বদ্ধ দুয়ার দখিনা বাতাসের সম্মুখে।
এক গুচ্ছ রঙবেরঙের ফুলের সাজি আর ছোটো ছোটো রঙবেরঙের পাখিদের নাচ-গান নিয়ে বসন্তের পদার্পণ। গাছের বাহু জড়িয়ে ধরে নানান রঙে ফুলেদের হাসি আর পাখিদের গানে-গানে বাংলা আজ উল্লাসিত। বুড়িয়ে যাওয়া বড়-বড় গাছগুলো, যেমন কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, পলাশ, নাগেশ্বর, নাগকেশর, মহুয়া আরও কতকিছু এরা সবাই আজ বসন্তের ছোঁয়া পেয়ে পুরাতন শুকনো পাতার পরিধান ছেড়ে আজ ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে নতুন সাজে। এখানে সেখানে, আদাড়ে বাদাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকা নাম না জানা ছোটো ছোটো জংলী গাছগুলো দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর আজ তারা ও ফুলে ফুলে নতুন সাজে সেজে উঠেছে। গজিয়ে উঠেছে ঘাসফুল শুকানো খালবিলে। গাছে গাছে পাখিদের কলকাকলি, ফুলের রেণু গায়ে মেখে প্রজাপতিদের বক্র-পথে বিচরণ , আম বনের মৌগন্ধে মৌমাছিদের গুঞ্জরন, সোনা বউ পাখির টেরা চোখের চাহনিতে বুলি আওড়ানো বউ কথা কও, বউ কথা কও। সব মিলিয়ে সারা বাংলা আজ বসন্তের তালে তাল মিলিয়ে ঝলমলে হয়ে উঠেছে।
আহারে, আর কি চায় আমরা!
কিসের প্রয়োজন সাজানো ফুলের বাগান,
কি প্রয়োজন পোষ মানানো পখির গান।।
চাইনা গো আর বোতল বন্দী ঘরের সুঘ্রাণ।
সবার সেরা সব পেয়েছি স্রস্টার শ্রেষ্ঠ দান।।

ডাঃ ফারহানা মোবিন এর লেখা
ছোটদের বই " উড়ে যায় মুনিয়া পাখি"

নিজস্ব প্রতিবেদক

শুরু হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ।
লেখক , পাঠক আর বই মেলায় বেড়াতে আসা মানুষের ভীড় বেড়েই চলেছে । বিভিন্ন বয়সের মানুষের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৯ ।

এইবারের বই মেলায় লেখক ও চিকিৎসক ফারহানা মোবিন এর লেখা ছোটদের বই
" উড়ে যায় মুনিয়া পাখি ", পাওয়া যাচ্ছে ছোটদের বই প্রকাশনীতে ।‌
স্টল নং --- ৬৮৪ ।

ডাক্তার ফারহানা মোবিন। বর্তমানে ঢাকার পান্থপথে স্কয়ার হাসপাতালে স্ত্রী ও প্রসূতি বিভাগের রেসিডেনট( Resident) মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন।

পেশায় চিকিৎসক কিন্তু সামাজিক কাজ কর্ম, লেখালেখি করেন নিয়মিত। চতুর্থ শ্রেণী থেকে লেখা শুরু করেন।

পঞ্চম শ্রেণী থেকে উনার লেখা ছাপা শুরু হয় বিভিন্ন গণমাধ্যমে ।তিনি শৈশব থেকেই শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাথে জড়িত।

একটানা সাত বছর তিনি ছিলেন দৈনিক প্রথম আলো‌ নিউজ পেপার এর প্রদায়ক লেখক।

নারী ও শিশু উন্নয়ন, সামাজিক সমস্যা, স্বাস্থ্য সচেতনতা,জীবনযাপন, সাহিত্য বিষয়ক লেখেন।

দেশ বিদেশের অগণিত সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন এ তিনি নিয়মিত লেখেন
( অনলাইন, হার্ড কপি)।

উনার লেখা স্বাস্থ্য বিষয়ক বই :

‘সবার আগে স্বাস্থ্য(২০১৩),
শরীর স্বাস্থ ও পুষ্টি ( ২০১২),
আসুন সুস্থ থাকি’ ( ২০১৮) ।

ছোটদের নিয়ে প্রকাশিত গল্পের বইয়ের নাম ‘উড়ে যায় মুনিয়া পাখি’ । ২০১৪ সালে ছোটদের বই প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ।

বই টি ছোটদের জন্য লেখা হলেও সব বয়সের মানুষের পড়ার উপযোগী ।

বইটির প্রচ্ছদ ও অলংকরণ করেছেন চিএ শিল্পী বায়েজীদ সোহাগ ।
প্রকাশক হাশেম মিলন ।

বই মেলা শেষ হলেও বইটি পাওয়া যাবে রকমারি ডট কম থেকে । শিশু উন্নয়ন মূলক এই বইটি সহজ সরল ভাষায় লেখা ।

ডাঃ ফারহানা মোবিন অনলাইন টিভির সহযোগিতায় স্বাস্থ্য সচেতনতা বিষয়ে কাজ করছেন। Satellite টিভি চ্যানেল বাংলা টিভি তে সঞ্চালনা করছেন ‘প্রবাসীর ডাক্তার’ নামের একটি অনুষ্ঠান।

প্রবাসীর ডাক্তার অনুষ্ঠান টি প্রবাসীদের জন্য স্বাস্থ্য সচেতনতা মূলক অনুষ্ঠান।

মরণোত্তর চক্ষু দান করেছেন ঢাকার বাংলাদেশ আই হসপিটালে।
হার্ট, লিভার, ফুসফুস, কিডনী ও প্যানক্রিয়াস দান করেছেন ঢাকা মেডিকলে কলেজ হাসপাতালে। তিনি একজন নিয়মিত রক্তদাতা।

রাজশাহী, ঢাকা, মৌলভী বাজার এ ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প করেছেন প্রায় ২৬ টি। একটি সংগঠনের পক্ষে ২০১৭ সালে সারা দেশে সেচ্ছাসেবীদের নিয়ে প্রায় ৭১ হাজার বৃক্ষ রোপন করা হয়। তিনি ছিলেন প্রধান পরিকল্পনাকারী।

তিনি নানাবিধ সামাজিক কাজকর্মের সাথে সংযুক্ত ।

ফারহানা মোবিনের জন্ম ২৭ জুন রাজশাহী শহরে। তিন ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। সরকারি পিএন গার্লস হাইস্কুল থেকে এসএসসি ও রাজশাহীর নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করেন।

ঢাকার শিকদার উইমেন্স মেডিকেল কলেজ এন্ড হসপিটাল থেকে এমবিবিএস পাশ করেন।

স্ত্রী ও প্রসূতি বিদ্যায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনে এখনো লেখাপড়া করছেন। পাবলিক হেলথ এ গবেষণারত।

বারডেম হাসপাতাল থেকে ডায়াবেটিস এবং হার্ট ফাউন্ডেশন হসপিটাল থেকে হৃদ রোগের উপর certificate course সম্পন্ন করেছেন।

জীবন সম্পর্কে ডা. ফারাহানা মোবিন বলেন, "৪৪ বছর বয়সে আমার বাবা আব্দুল মোবিন মারা যান। পরিবার ও আমার স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হওয়ার।

আমার মা ফেরদৌসি বেগম আমাদের জন্য সীমাহীন বিসর্জন দিয়েছেন। আমি আমার পিতা মাতার আশা পূরণ করতে চাই।

আমি এমন একটা বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, যে দেশের অভিধান থেকে মুছে যাবে টোকাই, ভিখারী নামের শব্দ গুলো। মানুষ মরবেনা গাড়ীর চাপায়।

রাস্তায় হিজড়া নামের অসহায় মানুষ গুলো ভিক্ষা করবেনা, বৃদ্ধাশ্রম থাকবেনা, দেশ ভরে উঠবে সবুজে।
জীবিকার পাশাপাশি আমি যতোটুকু পারি, মানুষের জন্য কাজ করতে চাই। "

তিনি সবার উদ্দেশ্যে বলেন , " আমাদের কে ভালো মানের বই পড়তে হবে নিজেদের কে আলোকিত করার জন্য । শিশু কিশোরদেরকও ভালো মানের বই পড়তে অনুপ্রেরণা দিতে হবে , একটি সুন্দর ও স্বশিক্ষিত জাতি গড়ে তোলার জন্য । "

একুশের চেতনায় ফেব্রুয়ারী
- শীবু শীল শুভ্র

গৌরবের মাহেন্দ্রক্ষণ ২১ শে ফেব্রুয়ারী
তোমার চেতনায় বাঙ্গালী দিক্ষিত!
ও হে নবীন জাগো দেশ মাতৃকার জন্যে
বাঙ্গালি হয়ে জীবনটা- ই আজ ধন্য।

১৯৫২-র এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা
১৪৪ ধারা ভেঙ্গে উড়িয়েছিলো পদধুলি!
স্বৈরচারী শাসকের নির্দেশে আমার ভাইয়ের আন্দোলনে
পুলিশ নির্বিচারে করে গুলি।

তবু ও তো মাথা নোয়াইনি
ইতিহাসে আমরাই সর্বসেরা বাঙ্গালি
তোমাদের কীর্তি আবহমান বাংলা জুড়ে
বাংলার প্রতিটি মানুষ শ্রদ্ধাভরে- আজ ও স্মরণ করে।

ভাষার জন্য শহিদ বরকত জব্বার সালাম
আরো নাম না জানা কত যে প্রাণ
মাতৃভাষা শেষ নি:শ্বাস পর্যন্ত করিবো লালন
২১ শের চেতনায় সারা বিশ্ব করিতেছে পালন।

আমি বাঙ্গালি আমি গর্বিত
আমি এই বাংলা মায়ের সন্তান?
সারা বিশ্বের শত বাঙ্গালি, শির ঊঁচ্চ করে বলে
আমি গর্বিত বাংলা মায়ের সন্তান।

২১ শের চেতনায় ফেব্রুয়ারি তুমি চির অমর
অশুভ শক্তি আজ ও ভেঙ্গে দিতে চায় কোমর!
বুলেটের শব্দে বারুদের গন্ধময় ছিলো বাতাস
ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালী জাতির রক্তমাখা ইতিহাস?

বাংলার প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে থাকবে চিরকাল
ভাষার জন্য বিলিয়ে দেয়নি, আজ ও কোন জাতি প্রাণ ?
মাতৃভাষার জন্য তোমাদের ত্যাগের জলাঞ্জলি
দেহের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে রইলো বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

বি.দ্র:- [ ভাষা আন্দোলন বাঙ্গালী জাতির রক্তমাখা ইতিহাস- ভাষা শহিদদের উৎসর্গ করলাম আমার এই কবিতা । ]

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget