অক্টোবর 2018

তারপর হাতঘড়ি
- মোশ্ রাফি মুকুল

তারপর ব্যস্ত হাতঘড়ি পড়ে ফ্যালে কব্জির শোকগাথা
সবজির ক্ষেতে বসে আকাশ মাপেন গ্যালিলিও
আপাদমস্তক কথাগুলো কবিতা হতে পারে?
কৈশোরের বয়ঃসন্ধিকাল উঠে আসে সপ্তাশ্চর্যের মতো

চোখগুলো পুষে যায় নিজস্ব গুপ্তচর
শব্দগুলো রূপান্তরিত পাখি
উড়ে যাবে ঈশ্বরডানায়-
আমার অবধারিত কবিতার ক ক কা কা
শুনবেনা কেউ ।

নির্বাচিত অমরতা ও আমাদের অদ্বৈত গদ্য
- মোশ্ রাফি মুকুল

এবং
এ অমরালয়ে হেঁটে হেঁটে-
আমরা যেটুকু স্বপ্ন দেখছি
তার ছায়া ধরে
এবার আমরা বাতাসে উড়াবো শ্যামল মায়া,
ভাতশালিকের ডানায় লিখে যাবো হিমকালের ইশতেহার।

ভালোবাসতে বাসতে আমরা হিম হবো,
আমাদের সুখে আমরাই অট্টহাসি হেসে উঠবো
আমাদের দুঃখগুলো কখনো দ্বৈত হবেনা,
হবেনা কোন ভিন্ন রঙের-
বরফগলা নদীর মতো আমরা ভেসে যাবো আমাদের মোহনায়;
আমরা এভাবে এগিয়ে যাবো ভালোবাসার সমুদ্রের দিকে-
নিঃশব্দে,
মাছরাঙা পদব্রজগুলো গুণতে গুণতে
আমরা এক হবো,
যেখানে ভালোবাসার সুনামিতে দুকূল ছাপিয়ে যাবে
হেসে উঠবে আফ্রোদিতি

আমরা শুনেছি এখানে প্রেম এক মৃত ঘোড়া
দুর্বোধ্য ঘোলাচোখ,
আদিম শিল্পীর কোন এক অবোধ্য চিত্রশালা
ভাষাতীত এক হায়ারোগ্লিফিকস!
তাতে কি!
তবুও এইসব সমাগত হিমকালে
আমরা পৃথিবীকে দিয়ে যাবো এক সরল স্বপ্ন দেখার আশ্বাস,রেখে যাবো সবটুকু বিশ্বাস;
নির্দ্বিধায় আমরা বলে যাবো এ প্রান্তদেশে আমরা
শুধু ভালোবাসতে এসেছিলাম,
এসেছিলাম
তোমাদের মাঝে আমাদের স্বনির্বাচিত অমরতা নিতে;যা তোমরা দিয়েছো ইউসুফ-জুলেখায়
লাইলি-মজনুতে
শিরি-ফরহাদে-

আমরা
এখানে হাঁটবো আরো কিছুকাল
সুদীর্ঘকাল নির্ঘুম কাটিয়ে দেবো
অক্লেশে,ফিরে যাবো অমরতা নিয়ে-
এসব আমাদের প্রেমার্দ্র
দু'টি হৃদয়ের একান্ত
অভীপ্সা-
এক ও অদ্বৈত অভিলাষ।

২১/১০/২০১৮.

আমার ভুবন জন্মভূমি

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বাংলা আমার জন্মভূমি আমার ছোট্ট ভুবন,
তোমার কোলে জন্ম নিয়ে গর্বে ভরে মন।
যেথায় রাতে চাঁদের আলো দূর আকাশের তারা,
সেথায় আমার জন্মভূমি কালের স্রোতধারা।
গাছে গাছে জোনাকি বাতি পাখির গানে ভোর,
দিনের আলোয় বাংলা শোভন পুষ্পে মধু চোর।
এদিক ওদিক যেদিকে চায় ছোট্ট ভুবন আমার,
রংবেরঙের পাখপাখালি ফুলের চমৎকার।
মাথায় মাথায় সারিতে হাঁটে মিটিমিটি হাসি,
তারায় তারায় যাচ্ছে ওরা চাঁদের মাসি পিসি।
জলপাখিরা সাঁতার কাটে শাপলা ফোটা জলে,
মেঘলা হাওয়া ঢেউ বয়ে যায় পারের কাশফুলে।
খাল বিল আর পুষ্করিণী কোথাও জলাভূমি,
সবুজ ঘেরা মনোরম সেতো আমার জন্মভূমি।
শিউলি ঝরা উঠান আমার কোথায় পাবো আর,
ঘর ছেড়ে যায় পথের ধারে বুনোফুলের বাহার।
রূপ জৌলুশ সুরভি বাতাস সারা বাংলা জুড়ে,
চাইনা আমার দালানকোঠা হোকনা ঘর কুঁড়ে!
এইতো আমার জন্মভূমি এইতো আমার ভুবন,
এইতো আমার সপ্তস্ব্গ এইতো আমার জীবন।

“পায়ের গোড়ালি হোক নরম মসৃণ” ( শীতকালিন লেখা )
- ডাঃ ফারহানা মোবিন

ডানা মেলতে শুরু করেছে শীতের পাখি। প্রকৃতিতে এসে গেছে শীতকাল। বাড়তে শুরু করেছে ধূলা আর রুক্ষতার প্রভাব। শীতকালে প্রকৃতিতে আদ্রতার প্রভাব কমে আসে। তখন শুষ্ক হয়ে ওঠে ত্বক, চুল, হাত পায়ের তলা, পায়ের গোড়ালি, পায়ের আঙ্গুল পর্যন্ত। আর অতিরিক্ত শুষ্ক হবার জন্য ফেটে যায় পায়ের গোড়ালির শক্ত চামড়া পর্যন্ত।
চামড়া শক্ত ও অতিরিক্ত মোটা হওয়ার জন্য অনেকের পায়ের গোড়ালি ফেটে রক্ত বের হয়। যাদের অ্যালার্জির সমস্যা রয়েছে, তাদের এই চামড়া গুলোতে চুলকানোর ‘সমস্যাও দেখা যায়।
নখের ধাক্কা লেগে পায়ের গোড়ালির ত্বক হয়ে ওঠে রুক্ষ ও কালো। শীতকালের সমস্যাগুলোর মধ্যে পায়ের গোড়ালি ফেটে যাওয়াটা খুব পরিচিত একটি সমস্যা।
যে কারণগুলোতে পায়ের গোড়ালি ফেটে যায়, তা হলো
১. শুষ্ক আবহাওয়া। অর্থাৎ যে সময়ে প্রকৃতিতে আদ্রতার ভাব কমে আসে আর ধূলা উড়ে বেশি। তখন পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার অভাবে পায়ের গোড়ালি ফেটে যায়।
২. সারা বছর অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল, নোংরা, অপরিচ্ছন্ন পানি ব্যবহার করা, দিনের কাজ শেষে পা না ধুয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া, ফেটে যাওয়া পায়ের চামড়া টেনে উঠিয়ে ফেলা, প্রচুর পরিমাণে পানি শূন্যতা, দেহে রক্তের অভাব, এই সমস্যাগুলোতে পায়ের গোড়ালি ফেটে যায়।
৩. অনেকেই বারবার পা ধুয়ে ফেলেন, কিন্তু ঠিকভাবে মোছেন না, পায়ের আঙ্গুলের ফাঁকে পানি জমেই থাকে। এইভাবে পানি জমে থেকে গোড়ালিসহ আঙ্গুলের কোনাও ফেটে যায়।
৪. যারা অতিরিক্ত কাদা, পানি, লবণাক্ত স্থান (ট্যানারী) সমুদ্রের নিচে বা পানিতে সব সময় কাজ করেন, তাদের ফেটে যায়।
৫. অতিরিক্ত ওজন সম্পন্ন ব্যক্তিদেরও ফাটতে পারে। দীর্ঘ বছর যাবত অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দুর্বল হযে যায়। তখন ত্বক ফাটতে পারে।
৬. সারাবছর অতিরিক্ত গরম পানিতে গোসল করলেও পা ফেটে যায়। আবার পারিবারিক বা বংশগত কারণেও অনেকের পা ফাটে। রক্তের সম্পর্কিত কারো পায়ের গোড়ালি অতিরিক্ত ফেটে যাবার ইতিহাস থাকলে, তখন আপনারও পা ফাটতে পারে।
৭. মাদক দ্রব্য সেবনকারী, গর্ভাবস্থা, মাতৃদুগ্ধ দানকালিন সময়, বড় কোনো অপারেশনের পরে মানুষের দেহে নানা রকম পুষ্টির অভাব হয়। তখনও পা ফাটে।

এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া প্রসঙ্গে ‘রেড বিউটি সেলুনের’ সত্ত্বাধিকারী আফরোজা পারভীন বলেন,
‘অধিকাংশ মানুষের পায়ের গোড়ালি ফেটে যায় শীতকালে। আবার অনেকের সারা বছরই ফাটে। এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাবার জন্য বাহির থেকে এসেই সাবান দিয়ে হাত পা ধুয়ে ফেলতে হবে। তারপরে মায়শ্চারাইজিং করার জন্য পেট্রোলিয়াম জেলি, লোশান বা কোনো ক্রিম লাগান। মরা কোষগুলো পেট্রোলিয়াম জেলীতে নরম হয়ে, উঠে যায় বেশী।
অনেকের আবার পায়ের গোড়ালীর চামড়া উঠে রক্তপাত হয়। গোড়ালি বেশী ফেটে গেলে পুরু করে প্রেটোলিয়াম জেলি লাগিয়ে মোজা পরতে পারেন। এতে জেলি মোজাতে লেগে গেলেও ফাটা স্থানগুলোতে লেগে থাকবে।

এছাড়া কাঁচা হলুদের প্যাকও লাগাতে পারেন। কাঁচা হলুদের সঙ্গে তেলটা ত্বকের জন্য ভালো কাজ করে। মুলতানি মাটি, অ্যালমন্ড অয়েল, এই তিনটার প্যাক পায়ে লাগিয়ে, ২০ মিনিট পরে ধুয়ে ফেলবেন। এতে ফাটা কমবে। তারপরে নরম ব্রাশ দিয়ে পায়ের মরা চামড়াগুলো ঘষে আলতো করে তুলে ফেলেন। বাসায় বানানো এই প্যাকটা ফ্রিজে রাখতে পারেন।
২. পানিশূন্যতা, অপুষ্টি, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, ত্বকের কোনো সমস্যা থাকলে তা দূর করা উচিত।
৩. প্রচুর পরিমাণে মৌসুমী ফল, শাকসব্জি, পানির পরিমাণ বেশী এমন খাবার খান।
৪. পায়ের চামড়া টেনে তুলবেন না।
৫. দেহের গঠন ও আবহাওয়া বুঝে জুতা, মোজা ব্যবহার করবেন। তারিখ পার হয়ে যাওয়া প্রসাধনী, মাদক দ্রব্য বর্জনীয়।
৬. বয়স ও উচ্চতা অনুযায়ী ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখাটা ভীষণ জরুরি।

সামান্য সচেতনতা আপনাকে আরোও অনেক বেশি সুন্দর জীবন। আর শীতকালিন অসুখ গুলোও কমে যাবে।

৩০.১০.১৮

আমার প্রার্থনা
- মোঃ তারেক আনোয়ার কিরন সিদ্দিক

নিজেই করছি স্বীকার খোদা মন আমার,
ভীষন অন্ধকারের স্তুপ যেন এক কালো পাহাড়।
হামেশাই করছি পাপের প্রতিযোগিতা ভুলে পরকাল,
গড়েছি নিজেই আরাম আয়েশ আর ফরমায়েশের মায়াজাল।
জানি আমি থাকবো না অনন্তকাল এ ধরার মাঝে,
তবু করছি হেয়ালী রঙ্গ তামাশা পৃথিবীতে যতো আছে।
নিজের হাতেই করছি ধবংস নিজের বিবেক আর ব্যাক্তিত্ব,
মরণ এসে করবে বরন জানি মুছে দেবে অহংকারের অস্তিত্ব।
জানি যখন পরিনাম ও পরকালে পাওয়া শাস্তির কথা,
তবে কেন পারি না  ফিরতে? পাপের পথে হাটছি অযথা।
দাও না হেদায়াত করে মাফ অতিতের সকল ভুল,
তোমারই দয়ায় হয়েছে আছে যতো অলি,আউলিয়া,নবী, রাসুল।
তোমার তরে করছি দোয়া আমি পাপি দু'হাত তুলে,
করে দাও মাফ আছে যতো পাপ জানা অজানা ভুলে।
তুমি না বলেছো করবে মাফ আদম যদি চায় মন থেকে,
চাচ্ছি গো খোদা,মুছে দাও পাপ সকল আমার জীবন থেকে।
তোমারই পথের পথিক করে নাও আমায় কবুল করে,
আর না হই পথভ্রষ্ট যেন আমি কোন দিনও ভুল করে।
পিতা-মাতা,আত্মীয়-স্বজন, আর যাদেরই হোক আছে,
পারি যেন করতে পূরণ দ্বায়িত্ব সকল যা আমার আছে।
মনে যেন না বাধে বাসা অহংকারের বীজ কোনও,
আজীবন তোমার পথে তোমার নবীর পথে থাকি যেনও।
আমাকে ধৈর্য দিও রোগ-বালাই আর কঠিন সকল সময়ে,
সকলের দেয়া কষ্ট আঘাত যন্ত্রনায়ও ভালবাসা দেই যেন বিনিময়ে।
আমার জীবনের শেষ কথা তুমি কালিমা করে দিও,,
আমি আদম গো খোদা যদি ভুল করি ক্ষমা করে দিও।

জানেন দাদা, বড়লোকে কবিতাটা ভালোবাসে না !
অডিও ভিডিও লাইভ চ্যাটিং,
লং ড্রাইভ আউট গোয়িং,
রেস্টুরেন্টে ট্রিট, মিটিং
বইপড়ার সময়? ওটা তাদের মেলে না !
জানেন দাদা, বড়লোকে কবিতাটা ভালোবাসে না !

 

স‌্যোশাল মিডিয়া সেলফি ঢঙ
মনে বড় পশ্চিমা রঙ
আপলোডিং আর ডাউনলোডিং,
সাহিত্য সংস্কৃতিতে সময় বোরিং!
কবিতা? ওটা এ যুগে চলে না !
জানেন দাদা, বড়লোকে কবিতাটা ভালোবাসে না !

 

প্লেবয়, ভোগ, ফোর্বস এসবই বেশ
কতো মর্ডান, আপডেটেড !
সাহিত্য কাগজে আছে কি রেশ ?
ওসব বড় ব্যাক ডেটেড !
সাহিত্যপাতা? ওটাতে মন মাতে না !
জানেন দাদা, বড়লোকে কবিতাটা ভালোবাসে না !

 

তবে আমি যা মেনে চলি-
প্রশস্ত হৃদয়কে বড়লোক বলি ।
সংস্কৃতিমনা যারা- তারাই ভালো,
জগতে আনে- তারাই আলো ।
জানেন দাদা, এসব লোকে-
কবিতা ভালো নাবেসে পারে না !

কোজাগরী
- দেবস্মিতা দাশ

লক্ষ্মীশ্রীর বালাই ছিল না জন্ম থেকেই। নেহাত কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন জন্ম,তাই বাপ বড় সোহাগ করে নাম রেখেছিল কোজাগরী। কোথায় যেন শুনেছিল ঠাকুর দেবতার নামে নাম রাখলে ছেলে মেয়ের ওপর তেনাদের আশীর্বাদ পড়ে।তা আশীর্বাদের কথা জানা নেই, মা তো জন্ম দিতে গিয়ে সেই যে চোখ বুজলো,আর খুললো না। অবশ‍্য কয়েক সেকেন্ডের চোখের দেখা দেখতে পেয়েছিল মেয়েকে। তা তার আর কি দোষ, বাচ্চা পেটে আসার পর একটুও দুধটা,মাছটা,কলাটা ও তো জোটেনি, অভাবের সংসারে তাতেও অবশ্য কাউকে দোষ দেওয়া যায়না। তাও হয়তো শাশুড়ির একটু কৃপা থাকলে পান্তার পাশে নুন আর তেঁতুলগোলা ছাড়া মাঝে মাঝে একটু আলুভাতে ,শাকভাজা,কুচোমাছ জুটতে পারত! কিন্তু বাড়ির বড় বৌ একদম ঝিম কালো হবে,ছেলে আবার সেরকম মেয়েকে ই সোহাগ করে বিয়ে করবে এ আবার কোন শাশুড়ি সহ‍্য করে !

তা সে সব অভিযোগ তো মরার সাথে শেষ হয়ে গেল , মাঝখান থেকে কোজাগরীর গায়ে জন্ম থেকেই একটা ছাপ পড়ে গেল, অপয়া। অভিযোগ আসলে শেষ হলনা, পাত্রবদল হোল মাত্র।

আমাদের কোজাগরী পূর্ণিমা নয়,বরং অমাবস্যার সাথেই তার ভালো মিল। যেই দেখে সেই বলে রতন মিস্ত্রি টা সোহাগ করে বৌ এনে বংশটাই ডুবিয়ে দিলে গো!রূপ রংএর আর ছিরিছাঁদ থাকলো নাকো!বাইরের লোকের ই বা দোষ দি কেন,কোজাগরীর ঠাকুমা,জেঠু,জেঠি,পিসি কেউ কি কম যায় বলাতে? ঠাকুমা তো ছেলের আর একটা বিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে, দুটো বাড়ি পরেই হরেগোয়ালার মেয়ে। পড়ে শোনে নি কিছুই, আছেও একটু হাবা মতন। কিন্ত্ত রংটা যেন দুধে ধোওয়া,মুখটাও পানপাতার মত কাটা। বাপের আয়পয় ও ভালোই। এমনিতেই ঐ হাবা মেয়ের বিয়ে দিতে কালঘাম ছুটছে, নিজেরাই গিয়ে বিয়ের কথা পাড়লে কি আর খালি হাতে ছাড়বে! মেয়েকে তো ভরে দেবেই,তার সাথে নমস্কারিতে ভালো কাপড়,কয়খান ভালো আসবাব ও কি আর আসবে না? আর হাবা মেয়েই তো চাই,আগের কালো চ‍্যালাকাঠ টাকে কোনো কথাই বলা যেত না,খালি চ‍্যাটাং চ‍্যাটাং কথা! ভিখারি বাড়ির মেয়ে,বিনা পয়সায় ছেলেটাকে বশ করে এসেছিলি তোর অত কথা,অত তেজ কিসের রে! ভাবলেই গা টা জ্বলতে থাকে। কিন্তু এই ভেড়া ছেলেটাকে দেখো, এমন বশ করেছে যে মরার পরেও অন্য মেয়েমানুষ দের কাছে যাওয়া দূরে থাক দিনরাত ঐ কোজু কোজু করতে থাকে। ঢং দেখে আর পারা যায় না,ঐ কালো পেত্মীকে পার করতে কত টাকার যে শ্রাদ্ধ হবে!

* * *

সময় এগিয়ে চলে নিজের খেয়ালে। কোজাগরী ও দেখতে দেখতে নয় বছরে পড়লো। এই বয়সেই ও বুঝতে পারে বাবা ছাড়া আর কেউ ওকে ভালোবাসেনা,বাকি সবার কাছে ও শুধু বিরক্তি আর উপহাসের পাত্রী। খুব অভিমান হয় ওর অনেক সময়,চোখের জল বাধ মানেনা। কিন্তু ওকে ওর বাবা এই বয়সেই বুঝিয়েছে যে ভালো করে পড়াশোনা করতে হবে,নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। তবেই সবাইকে উচিত জবাব দিতে পারবে সে। কিন্তু ছোট্ট কোজুর মাঝেমাঝে মনে হয়,তার দোষটা কোথায় যাতে করে সে তার মাকে পায়নি,ঠাকুমা তাকে দেখলেই অপয়া,অলক্ষ্মী বলে,জেঠু জেঠি তাকে নিজেদের ঘরেই ঢুকতে দেয়না,এমন কি জেঠুর ছেলেটা ও ওর সাথে খেলে না।বাড়িতে কেউ এলেও ওর জন‍্য কেউ কিছু আনেনা, উলটে ওকে আর ওর মাকে নিয়ে কিসব বলে ।ওর একদম ভালো লাগেনা সেসব শুনতে।বাবা অনেকবার ওদের বকেছে, কিন্তু ওরা কিছুতে ই এগুলো কম করেনা।

বরং স্কুলে গেলে ও ভালো থাকে। যদিও ওখানে বেশিরভাগ ছেলেমেয়েই বেশ বড়লোক,ওদের মত নয় ও বেশ বোঝে ওটা।কিন্তু তাও ওর স্কুলে কিছু বন্ধু হয়েছে, ওরা ওকে ভালো ও বাসে। ও ছোট থেকেই মন দিয়ে পড়ে,পড়ার আগ্ৰহ দেখে স্কুলের কয়েকজন টিচার ওকে পড়া দেখিয়েও দেন । প্রায় বছরই মোটামুটি প্রথম চার,পাঁচ এর মধ্যে থাকে ও। বাবা ওকে খুব কষ্ট করেই বড় স্কুলে পড়াচ্ছে, ও বুঝতে পারে। তার জন্য বাবাকে বাড়িতে কম কথাও।শুনতে হয়না।বাবা আর নিজের জন্যে জামা কেনেনা,আরো বেশী করে করে কাজ করে,বেশী রাত করে বাড়ি আসে। শরীরটাও যেন রোগা লাগে। আগে রাতে খাবার পর সব গল্প করতো বাবা মেয়ে তে,বেশিরভাগ ই অবশ্য স্কুলের সারাদিনের গল্প। বাবাকে সব না বললে খাবার ই হজম হোত না তার। এখন কিন্তু বাবা কোনভাবে দুটো খেয়ে এসেই অচেতনের মত ঘুমিয়ে পড়ে।আগে আগে কোজাগরীর খুব অভিমান হোত,কিন্তু এখন ও বুঝতে শিখেছে।ও বাবার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে পভাবে রোজ,যখন ও বড় হয়ে অনেক টাকা আয় করবে,তখন বাবাকে আর কোন কাজ করতে দেবেনা। একটা ভালো বাড়িতে সে বাবাকে রাখবে,বাবার সব যত্ম করবে নিজের হাতে,আর সন্ধেবেলা কাজ থেকে ফিরে চা খেতে খেতে সারাদিনের গল্প করবে।

* * *

বড় হওয়ার সাথে সাথে বুঝছিল কোজাগরী, তার দিকে কেউ সেভাবে তাকায় না। এমনকি পাড়ার ছেলে ছোকরাগুলো ও না।এখন ওর ক্লাস ইলেভেন,তাই শাড়ি সামলাতে হয়।অবশ্য শাড়ির আঁচল টা ভুল করে একটু সরে গেলে অনেকগুলো মুখ তাকায় ওইদিকে,তবে ঐ তাকানোর মানে এখন বোঝে ও। মাঝে মাঝে কোথাও একটা কষ্ট হয় ভেতরে,ভগবান তাকে একটু ও সুন্দর করে পাঠাতে পারতেন না? সে নাকি নক্ষ্মীপূজোর দিন জন্মেছিল!লক্ষ্মীঠাকুরের মুখ কত শান্ত,স্নিগ্ধ, কমনীয়,সুন্দর। আর তার মুখ! ঠাকুমা তো এখনো বলে লক্ষ্মী তো আর এল না ঘরে,পাঠিয়ে দিল তার প‍্যাঁচাটাকে! তাও মরণ,লক্ষ্মীপ‍্যাঁচাও এর চেয়ে ঢেরগুণ ভালো হয়গো!

কাকলি র নতুন বয়ফ্রেন্ডের গল্প শুনতে শুনতে এইসবই ভাবছিল সে,হঠাৎ মনে হোল কালীও তো এই লক্ষ্মীর ই আর এক রূপ মাত্র।তিনিও তো আপন বলে বলীয়ান ,কত শক্তি তাঁর। নিজের হাত মুঠো করে প্রতিজ্ঞা করলো সেদিন কোজাগরী, কাজে বড় কিছু করে নিজের পরিচয় তৈরী করতে হবে। এখন ই বেশ কিছু টিউশনি করে ও,ওদের পাড়ার অনেক বাচ্চাই ওর কাছে পড়ে। রূপের জন‍্য অনেক হ‍্যাটা পেতে হলেও ভালো ছাত্রী হওয়ার সুবাদে অনেক মা বাবা জোর জবরদস্তিও বাচ্চাদের ওর কাছে পাঠায় পড়তে। মাঝে মাঝে হাসি পায় ওর এগুলো দেখে। বাড়িতেও ওর মুখঝামটা খাওয়া কমেছে একটু। এটা ওটা কিনে দেয় যে মাঝে মাঝে এখন! তবে সব থেকে বেশী খেয়াল রাখে বাবার,এবছর ঠিক করেছে বাবাকে দুটো নতুন জামা কিনে দেবেই পূজোয়।কতদিন যে কিছু কেনেনা বাবা নিজের জন্যে, সেই প্রায় ছিঁড়ে যাওয়া কটা জামা পরেই কাজে যায় রোজ। চোখটা হঠাৎ জ্বালা করে ওঠে কোজাগরীর, পরক্ষণেই শক্ত হয়ে যায় সে, লড়াই তো এই সবে শুরু।

* * *

সেদিন কলেজে গিয়ে কিছুতেই ক্লাসে মন দিতে পারছিল না কোজাগরী।এমনিতেই নতুন জায়গায় এসে বন্ধু এখনো সেভাবে হয়নি,তার ওপর এখানে সবাই ওর চেহারা টা নিয়ে যেন বড্ড ঠাট্টা ইয়ার্কি করে। ছেলেমহলে তো ওর নাম ই হয়ে গেছে পেটানো বাঁশ।কালো,পুরুষালি গড়নের জন্যে।আর ওদের ইংলিশ অনার্সের পুরো ব‍্যাচের কাছেই ও আলোচনার বিষয় যেন। না ঠিক দয়া বা অনুকম্পা নয়,একটু যেন অক্ষম রাগ সবার ওর ওপর। ঐ তো দেহাতি মজুর মার্কা চেহারা, না আছে বাপের পয়সা! ঐ‌ দুপয়সার রেজাল্ট নিয়ে এত ফুটানি কিসের!

নাহ্ আর ভালো লাগছেনা আজ, নেট টাও ধরছেনা ফোনে।এদের কাউকে বলা মানে আর একবার হাসির পাত্র হওয়া। একবার সাইবার ক‍্যাফে গিয়ে চেক করবে কি?নাহ মাঝ থেকে কুড়ি টাকা নিয়ে নেবে শুধু শুধু,হবেনা তো কিছুই তাও মন মানতে চাইছেনা।
ধুত্তোর আজ না হয় টিফিন টা খাবেনা,অফ পিরিয়ড চলছে দেখেই আসা যাক গিয়ে।
হনহন করে গিয়ে সাইকেল টা বের করলো কোজাগরী,বুকের মধ‍্যে হাজার টা হাতুড়ি পিটছে কেউ।

* * *

পা টিপে টিপে বাড়ি ঢুকলো সন্ধেবেলা, ঠিক চোরের মত।নাহ বাবা এখনো ফেরেনি। বাবার বালিশের ওপর রাখলো জিনিসগুলো, কি ভেবে মায়ের পুরানো ফোটোটায় প্রণাম করে খুব কাঁদলো খানিকক্ষণ।
একটু পর নিজেকে সামলে গেল গুমটি রান্নাঘরে।এখন তার মুখঝামটা খাওয়া অনেক কমেছে এবাড়িতে,যেহেতু ওর টাকা এবাড়িতে অনেকের অনেক কাজে আসে। ও হাসিমুখে ই করে সবার জন্য, শুধু দাদার নেশার খরচে ও শক্তভাবে বারণ করে এসেছে সবসময়।কষ্টের টাকা ও কোনো মূল্যে ই বাজে কাজে লাগতে দেবেনা।

রান্না করতে করতে টের পেল ও বাবা ফিরেছে। হৃদপিণ্ড টা মুখ দিয়ে বেরিয়ে যাবে যেন ,ও অজান্তেই নিজের মুখটা চেপে ধরলো।

তারপরেই বাবা র চিৎকার,"কোজু, কোজু!"
কোজাগরী রান্নায় প্রায় তিনগুণ বেশী নুন ঢেলে ফেলল,তারপর ঘুরে তাকিয়েই বাবাকে দেখে হঠাৎ কেঁদে ফেললো।
বাকি লোক ও তখন রান্নাঘরের সামনে ভীড় করেছে।
প্রথমে ঠাকুমা র গলা শোনা গেল,"রতনা কি সর্বনাশ করে এল রে তোর মেয়ে?দুটো পয়সার দেমাকে তো মাটিতে পা দেয়না,তখনই জানি কিছু একটা হবে!"
জেঠি বললো,"তাই না তাই?কোথাকার পাপ এনেছে কিনা তাই দেখো! কেউ তো এমনি এমনি ঘরে নেবেনা, দেখো গে এইসব করে যদি ঠাঁই হয়!"

চেঁচাতে গিয়েও খুব ঠান্ডা ভাবে বললো কোজাগরী," কারুর নেওয়ার দরকার ও নেই গো জেঠিমা। আর তোমাদের মুখ আমি পোড়াইনি। বাবা,ওটা আমার জয়েনিং লেটার। আমি তোমাকেও বলিনি, একটা পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পোস্টাল এ্যসিসটান্টের, তাতে হয়ে গেছে। সেই চিঠি আর তোমার জন্যে একটু মিষ্টি রেখেছিলাম ।তুমিও আমায় এরকম ভাবো বাবা?" কেঁদে ফেললো কোজাগরী।
রতন মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো এসে,"বাপকে এত ই মুর্খ আর অবুঝ মনে করলি তুই? ভালো কিছু ছিল জানি, কিন্তু এতটা ভালো যে আমার কপালে ছিল তা তো ভাবিনি মা। আজ তোর মা থাকলে কত খুশী হোত বল! তুই যে সত্যিই আমার লক্ষ্মী।"
বাবাকে নিয়ে মায়ের ফোটোটার কাছে চললো কোজাগরী। জানলার দিকে চোখ পড়লো হঠাৎ, চাঁদের আলোয় ভাসছে চারদিক। আজ ও কি কোনো পূর্ণিমা?

অসহায় এই মফস্বলের ক্রান্তিকালে
শাপে বর হয়েই তুমি ধরা দিয়েছিলে
মাতৃত্বের ছায়ায় আগলে রেখেছিলে ;
পিছিয়ে পরা এই মফস্বল শহরটাকে ৷

স্বপ্ন দেখিয়েছিলে দুঃস্বপ্নের শহরকে
বাঁচতে শিখিয়েছিলে মাথা উঁচু করে ,
শুধু তুমি চলে যাবে এ শোকটা বুকে
অশ্রু ভারাক্রান্ত আজ শহরের হৃদয়ে ৷

সাদা কে সাদা বলতে শিখিয়েছিলে ;
শিখিয়েছো কালোকে কালো বলতে ,
উদ্যমী হতে শিখিয়েছিলে এ শহরকে
শিখিয়েছিলে প্রতিবাদী হয়ে দাঁড়াতে ৷

এ মফস্বল আজ ঋণী তোমার কাছে ;
তোমার রাখা পদচিহ্নে এশহর হাঁটবে ,
পায়ে পা মিলিয়েই বহুদুরে চলে যাবে
শুধুমাত্র তোমার তুমিকে ভালোবেসে ৷

একান্তে আলাপচারিতায়
- সুজাতা মিথিলা

আমাকে সমুদ্র অতটা টানে না ---
সমুদ্রে এত আলোড়ন ,এত ঢেউ
এত আগ্রাসন , যেন থৈ হীন
আমার অস্তিত্বকে বড্ড তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে ।
বিশালত্বের দম্ভে যেন
ভালোবাসা কে সম্পত্তি ভাবে।
সবাই যেন তার অধীন।
কারো স্বাধীনতা স্বকীয়তা মৌলিকত্ব
মানতে পারো না।
আমার কাছে সমুদ্র বিশাল পুরুষ ।

কিন্তু
আমি উর্বশী রম্ভা বা মেনকা নই ।
আমি রূপের টানে
ছলা কলায় তার মন ভোলাতে চাই না ।

আমি এক ক্ষীণকায় নদী ।
আমার মনকাড়া রূপ নেই ঠিকই ,
কিন্তু তবুও আমি মৌলিক ।
আমার কাছে যা আছে ---
তা হচ্ছে এক খন্ড বৈদুর্য্য মনি
যা অতি দুর্লভ --
যা লুঠ করা যায় না ।
যাকে পরম স্নেহে,
নির্ভেজাল প্রেমে
জয় করতে জানতে হয়।

তাই বলি কি ,
আমি চিরকালের প্রেয়সী
সেই সামান্য কবিতা পুরুষটির।
যার বিশালত্ব নেই
কিন্তু যে ভালোবাসার আকর।
যে শুকনো শিশির বিন্দুতেও
মুক্তো খুঁজে পেতে জানে।
যার কাছে আমি সম্পত্তি নই
বরং তার হৃদয়ের সম্পদ ।।

@সুজাতা মিথিলা
22.10.18

মৃত্যু ও প্রেমের যৌথ খামার
- মোশ্ রাফি মুকুল

রুদ্ধঃশ্বাসে পড়ে ফেলি ছায়াপথ
চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যৌবন,মৃত্যু, ড্রাগ

আরশোলার গোপন কুঠুরিতে-
হামাগুড়ি খ্যালে বিড়াল বিকাল,
চকচকে সভ্যতা অন্ধকারে বুঁদ-
এখানে ওখানে সন্ধ্যার দু'একটি বেদনার্ত শব্দ;
আবার কিছু কিছু হাস্যকর মাইক্রোফোন
পলিতারিয়েত প্রেমের আওয়াজ তোলে-

মৃত্যু আর প্রেমের যৌথ খামারে বড় হচ্ছে রাত-
ভালোবাসার শুভ্র খরগোশ,
এতোদিন মনে করে এসেছি
ভালোবাসার মতো নমনীয়,কোমল শব্দ আর দ্বিতীয়টি নেই-

রুদ্ধঃশ্বাসে খেয়ে ফেলি অতি সংবেদনশীল প্রেম
শর্তভঙ্গ সভ্যতার ফুলকি-
অগণিত মৃত্যুমেঘ-
কালজয়ী কবিতার শব্দ
নরম আকাশ,ভোরের যৌবন
হংসমিথুনরত দিনের কার্নিশ।

১৯/১০/২০১৮.

শুধু আমরা চারজন

আব্দুল মান্নান মল্লিক

আমাদের গ্রামের নাম মরাদিঘি। ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের পশ্চিম দিকে পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা পেরিয়ে বিশাল গঙ্গার বাঁধ। বাঁধের ওপারের ঢালে কাশবনে ভরা। কাশবন ভেঙে বালুচর, তারপর ছাড় গঙ্গা। এই ছাড় গঙ্গা আমাদের এখানে বাঁওড় নামে পরিচিত। এই বাঁওড় ও গঙ্গার মাঝখানে একটি দ্বীপ। এই দ্বীপটির নাম শাঁখদহ। শাল, সেগুন, শিশু, মেহগানি আরও বিভিন্ন প্রকার বড়বড় গাছে ভর্তি এই দ্বীপটি। গাছগুলো পাকা রাস্তার ধার থেকে ভালভাবে দেখা যায়। সন্ধ্যার সময় বড়বড় গাছগুলো ঢেকে যায় বিভিন্ন রকম বড়বড় পাখিদের ছাউনিতে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, ঈশ্বরের কি অপূর্ব বৈচিত্রপূর্ণ দান। ঈশ্বরের কাছে পাখিরা হয়তো চেয়ে নিয়েছে তাদের নিজের অধিকার। তাই ওরা স্বাধীন ভাবে নিজের এলাকা ভাগ করে নিয়েছে।
দূর থেকে দেখতাম আর ভাবতাম, এতো সুন্দর জায়গা, কোনোদিন যদি কাছ থেকে দেখতে পেতাম কতো না ভালো হতো!
ইং - ১৯৭৮ সাল, মার্চ মাসের শেষের দিকে
মাধ্যমিক পরিক্ষার পর সামনে লম্বা অবসর সময়। কাগজ কলমে না হলেও গরমকাল বলা যায়।
অনেকদিনের অপেক্ষায় থাকা এই লম্বা সময়টা। নাই কোনো পড়াশুনার চাপ, নাই কোনো বাবা মায়ের বকুনি। নিজেকে মনে হল, আমি যেন এক মেঘবিহীন মুক্ত আকাশের মুক্ত পাখি।
একদিন আমরা চার বন্ধু মিলে মনস্থির করলাম, তিনদিনের মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো শাঁখদহ দ্বীপ দেখতে। একদিন একদিন দুদিন যাওয়া আসা, আর মাঝে একদিন থেকে যাবো, এই নিয়ে তিনদিনের কর্মসূচি। তাহলে ঘুরেঘুরে ভালভাবে সবটা দেখতে পাবো।
বাড়িতে বলতেই প্রথমে অমত করলেও পরে রাজি হয়ে যায়।
ইমাম , দীপু ও জুব্বার, এই তিন জন ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আমাদের চার বন্ধুর মধ্যে, ইমাম ছিল অত্যন্ত সাহসী। গায়ে শক্তিও ছিল প্রচন্ড। বেশ সাফাই-এর সাথে বিষধর সাপও ধরতে দেখছি এই ইমামকে।
ইমামের মতো সাহসী বন্ধুকে সঙ্গী পেয়ে মনের জোর অনেক বেড়ে গেল।
দিনটা ছিল বুধবার। দুপুরের পরে চার বন্ধু মিলে চারটে ব্যাগ ভর্তি তিনদিনের মতো থাকা খাওয়ার সরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে, ভাড়ার গাড়ি এম্বাসেডর-এ উঠে বসলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দিলো। গ্রাম সোজাসুজি বাঁধ পেরিয়ে কাশবন ভেঙে যাওয়া বেশ কষ্টকর, কিছুটা দূর হলেও ড্রাইভার ঘুরপাক রাস্তা ধরে আমাদেরকে দাদপুর ঘাটে নামিয়ে দিলো।
এখানে পারাপারের কোনো নৌকো থাকে না। জেলেরা ছোটোখাটো নৌকো নিয়ে ফাঁসি জাল পেতে মাছ ধরে। ওদেরকে বলে কেউ কেউ দু-চার টাকা দিয়ে সময়ে যাওয়া আসা করে।
আমাদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক জেলে, ছোটো নৌকো নিয়ে এগিয়ে এসে জানতে চাইলো আমরা ওপারে যাব কি না। আমাদের বলার আগেই জেলে বললো, চারজনে পাঁচ টাকা লাগবে। আমরা এক কথাই রাজি হয়ে গেলাম। অবশ্য তখনকার দিনে পাঁচ টাকার মূল্য নিহাত কম ছিলনা।
চারজন চারটে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নৌকোতে চেপে বসলাম। নৌকো ছেড়ে চলতে শুরু করেছে। জুব্বার মুখে খুব বড়বড় কথা বললে কি হবে, আসলে ছিল প্রচন্ড ভীতু। স্রোত বিহীন বাঁওড়ের গম্ভীর জল, ছোটো নৌকোটিও করছে টলমল। এইভাবে কিছুটা যেতে না যেতেই জুব্বার ভয়ে লাফালাফি আরম্ভ করে দিয়েছে। এই বুঝি জলে ঝাঁপ দিবে। আমরা সবাই ওর ব্যাপারস্যাপার দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভাগ্য ভালো, সঙ্গে ইমাম ছিল। ইমাম জুব্বারকে জোর করে ধরে নিয়ে নৌকোর মাঝে বসলো। যাক এবার অনেকটা সস্তি! তবুও জুব্বার মাঝেমাঝে ঝুঁকি মারে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। তখনো জুব্বার ভয়ে কাঁপছে। নিরুপায় হয়ে বেচারা আল্লাহ আল্লাহ করে চিৎকার করতে লাগলো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেল দীপুও। এ-ও ভগবান ভগবান শুরু করে দিল। তবে জুব্বারের মতো দীপু লাফালাফি করেনি। যায় হোক এই সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে এক সময় দ্বীপের কিনারায় নৌকো ভীড়ে গেল। যে যার মতো দ্বীপে নেমে পড়লাম। এই সেই শাঁখদহ দ্বীপ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, চারটে বেজে গেছে।
সামনে একটা প্রকাণ্ড শিশু গাছ। গাছে নতুন সবুজ পাতা, শিকড় গুলো সব মাটি ছাড়া উঁচু-উঁচু হয়ে জেগে আছে। মাটিতে পা রেখে শিকড়ের উপর বেশ আরামের সাথে বসা যায়। গাছের ছায়ায় শিকড়ের উপর বসে বিশ্রাম নিতেই দীপু মনের আনন্দে গান ধরেছে। হঠাৎ করে দীপু গানের সুর ছেড়ে দিয়ে, ব্যা-ব্যা করতে করতে দূরে পালিয়ে যায়। ওখান থেকে গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে সা-সা-সা, প-প-প করে আমাদেরকে কি বোঝাতে চাচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা। গাছের উপর তাকিয়ে দেখি, দীপুর বসে থাকা মাথার উপরে কাছাকাছি একটি সরু ডালে সবুজ রঙের একটি লম্বা সাপ লেজটা পেঁচিয়ে ধরে ঝুলছে। পাতার রঙে রঙ, তাই ভালো বোঝা যাচ্ছেনা।
জুব্বার বললো, ও" ওর মতো থাক, চল আমরা ওদিকে এগিয়ে যায়।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম, আঃ, চারিদিকে তাকাতেই চক্ষু জুড়িয়ে গেলো। বিশাল বড় বড় গাছ গুলো আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে যেন আমাদের শুভাগমন জানাচ্ছে। বাঁওড়ের জলাধারের কিছুটা দূরে, তাঁবু খাটিয়ে ভিতরে বড় চাদর বিছিয়ে বেশ বসবাসের উপযোগী জায়গা করে নিয়েছি। সূর্য মামা ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে। ক্রমে ক্রমে অন্ধকার নেমে আসে। ততক্ষণে দীপু কেরোসিন বাতি জ্বালানোর কাজটা সেরে রেখেছে।
অন্ধকারে বাতির কাছ ছাড়া আর কিছু দেখা যায়না।
বাতিটা তাঁবুর সামনে রেখে আমরা ভিতরে গল্প শুরু করেছি। জুব্বারকে নিয়ে বেশ হাসিঠাট্টা শুরু করে দিয়েছি।
এইভাবে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক কেটে যাওয়ার পর, ইমাম বাইরে বেরিয়ে গেল। আমি ভিতর থেকেই ইমামকে তাঁবুর ভিতরে আসতে বললাম।
ইমাম আসছি বলে কিছুক্ষণ পরে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে বললো।
আমরা সবাই ভয় পেয়ে আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করি কেন কি হলোরে?
ইমাম বললো, কতো সুন্দর দৃশ্য, বাইরে বেরিয়ে এসে একবার দেখে যা।
সবাই বাইরে বেরিয়ে দেখি চাঁদের প্রথম আলো কেবলে ফুটছে। পশুপাখিদের মাঝে শুধু আমরা চারজন। শুবিধা মতো গাছের ফাঁকে দাঁড়িয়ে চাঁদ ওঠা দেখছি আর মনে মনে ভাবছি!
হে প্রভু, তুমি চলো তোমার পথে,
কেউ দেখুক বা নাইবা দেখুক
তোমার কি আসে যায় তাতে।
সদ্যজন্মিত চাঁদের সৌন্দর্য ভাবতে ভাবতে একসময় চোখ দিয়ে জল গড়ে পড়লো, সবই তোমার মহিমা প্রভু! এই নির্জন দ্বীপকেও তুমি শোভিত করে রেখেছ?
ধীরেধীরে রূপশ্রী স্বর্ণবিন্দু উপরে উঠে গেল। গাছের ফাঁক দিয়ে স্বর্ণ জ্যোতি প্রবেশ করছে। রাতের বেলায় কষ্ট হলেও অস্পষ্টে জমিনের সবকিছু দেখা যাচ্ছে। আমরা তাঁবুর কাছে আবার ফিরে আসি।
আমি সবাইকে ডেকে নিয়ে ভিতরে বসলাম।
একদিনের মতো বাড়ি থেকে নিয়ে আসা শুকনো খাবার, যে যা এনেছিলাম সব একইসঙ্গে মিশিয়ে রাতের খাওয়াটা ওতেই মিটিয়ে ফেললাম।
গল্পগুজব, এদিক সেদিক করতে করতে যখন রাত্রি সাড়ে বারোটা বাজে, সবাইকে শুয়ে পড়তে বললাম। কে কার কথা শুনে।
দীপু বললো দুদিনের মত ঘুরতে এসে ঘুমিয়ে কাটাবো নাকি?
জুব্বার বললো ঘমন্ত অবস্থায় যদি তাঁবুর মধ্যে সাপ বেঙ কিছু একটা ঢুকে পড়ে? তার চেয়ে জেগে থাকায় ভালো।
ওদের দুজনের কারও কথাই ফেলতে পাড়লাম না। কি আর করি, অবশেষে বললাম, তোরা যেটা ভালো বুঝিস, বলে তাঁবুর এক কোণে আমি শুয়ে পড়লাম।
অনেক সময় অপেক্ষার পরে, চোখটা একটু এঁটে আসতেই জুব্বারের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ধড়পড় করে উঠে পড়ি। তখনও জুব্বার চিৎকারে বলে চলেছে, ধরেছে ধরেছে, বাঁচাও বাঁচাও! ইমাম চিৎকার করছে, ভয় নাই, জুব্বার ভয় নাই, আমি এসে গেছি। তখনও জুব্বার চিৎকার করেই চলেছে। ততক্ষণে আমরা সবাই জুব্বারের কাছে হাজির। আমি বললাম কই কিসে ধরেছে? কিছুই তো দেখতে পাচ্ছিনা। দীপু জুব্বারের পিছনে গিয়ে দেখে, শিমুল গাছে জড়িয়ে ওঠা একটা কাঁটা গাছের লতায় জুব্বারের জামা আটকে আছে।
কি আর বলবো এই জুব্বারকে। ভাবলাম দুই চড় লাগিয়ে দিই, কিন্তু মারবো কি করে, হাসি আর থামতে চাইনা।
যায় হোক, রাত্রিটা এইভাবে কেটে গেল প্রায়। আনুমানিক চারটে বাজে। তখনো অন্ধকার সম্পূর্ণ কাটেনি।
আমরা চলে গেলাম বাঁওড়ের জলে হাত মুখ ধুতে ও বোতলে জল ভরে আনতে।  ফিরে এসে দীপুকে চটপট চা বানাতে বললাম, দীপু কাঠখড়ি পুড়িয়ে তাড়াতাড়ি চা বানিয়ে হাতে দিতেই, ইমাম মশলা মুড়ি মাখিয়ে হাজির। আমরা চা-মুড়ি খেতে শুরু  করেছি। ঠিক এমন সময় গাছে গাছে পাখিদের হৈ-চৈ শুরু হয়ে গেল। গাছ ছেড়ে যে যার মতো উড়ে কোথায় চলে যাচ্ছে। সকাল হতে আর অল্প কিছু সময় বাকী আছে, আকাশ একটু পরিষ্কার হতেই সূর্য ওঠার আগে গাছগুলো পরিষ্কার হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে দেখতে পেলাম গাছের মাথায় মাথায় ঝিকিমিকি রোদ। অপূর্ব দৃশ্য, দু-একটা এড়ানো পাখি তখনো উড়ে যাচ্ছে গাছ ছেড়ে।
আমরা তাঁবু গুটিয়ে নিয়ে ঠিক হাঘরে বেশে চলে গেলাম বাঁওড়ের ধার, সকালের দৃশ্য দেখতে।
কি মনোরম দৃশ্য। বুনোহাঁসের ঝাঁক জলের উপর দিয়ে সাঁতার কাটছে। কখনো একে অপরকে ডানার ঝপটায় তাড়া করছে। ধারে ধারে চরে বেড়াচ্ছে শামুকখোল আর বড় আকৃতির সারস পাখি। মাথার উপর দিয়ে কত পাখির আনাগোনা। তীক্ষ্ণ থেকে শুরু করে কর্কশ কণ্ঠস্বর বিভিন্ন পাখির বিভিন্ন ডাক। দেখে মনে হচ্ছে আজ হয়ত পাখিদের কোনো বড় ধরণের সমাবেশ আছে।
বাঁওড়ের ধার বরাবর গল্প করতে করতে হাটতে থাকি। চরের উপরে বুনোহাঁসের টাটকা ডিম ও পড়ে আছে। হয়ত ডিম পাড়ার উপযুক্ত সময়ে বাসা  বাঁধতে না পারা বুনো হাঁস ওখানেই ডিম পেড়ে আবার জলে নেমেছে। দীপু ও জুব্বার মনের আনন্দে অনেকগুলো ডিম কুড়িয়ে ব্যাগে পুরে নিয়েছে।
উপরে গহন কাশবন। কাশবনের গা ঘেঁষে কোথাও কোথাও বুনো হাঁস বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছে। আবার কেউ সাথে করে সদ্যজাত বাচ্চা নিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতির সাজানো এই মনোহর দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে!
তাইতো ভাবি!
সর্বত্রই তুমি মহান প্রভু,
সচরাচর বিদ্যমান।
যতকিছু আছে যেথায়,
তাদের ও দিয়েছ প্রাণ।
শুকনো ছোলার ছাতু আর আঁখের গুড় ভর্তি একটা টিফিন বাক্স, ইমাম তার ব্যাগ থেকে বার করে বাঁওড়ের জলে ভালো করে ভিজিয়ে নিল। বেশ খিদে পেয়েছিল আমাদের। চারজনে বেশ তৃপ্তি করে খেলাম।
তারপর আমরা কাশবন ভেঙে আবার দ্বীপের উপর উঠে আসি।
গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার চলতে শুরু করি।
দ্বীপের ভিতর দিকে যেতেই দেখি, আরও অনেক চেনা ওচেনা বড়বড় গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় পাখিগুলো গাছ ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ ভিজা পালকে উড়ে এসে ডানা ছড়িয়ে গাছে বসে, রোদে শুকিয়ে নিচ্ছে।
এই সব দৃশ্য দেখতে দেখতে আর গল্প করতে করতে আমরা এগিয়ে চলেছি। কথায় কথায় ইমাম বললো, সত্যিই বেড়াবার মতো একটা জায়গা বটে। তবে বিষধর সাপ-টাপ থেকে আমাদেরকে একটু সাবধানে থাকতে হবে। মাঝে মাঝে ধেড়ে ইঁদুর দেখা যাচ্ছে। আরও আছে বনবিড়াল আর শিয়াল। তবে আমরা নিশ্চিত এখানে কোনো হিংস্র বাঘ ভাল্লুক নাই। ইমামের কথা শেষ হতে না হতেই বাঘ ভাল্লুকের কথা শুনে জুব্বার আবার ভয় পেয়ে চিৎকার চেঁচামিচি করতে লাগলো। ইমামকে জড়িয়ে ধরে আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না।
যা হয় করে আমরা ওকে অনেক বঝিয়ে সুঝিয়ে স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনি। সূর্য তখন বেশ কিছুটা উপরে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও ফাঁকা জায়গায় সবুজ কচি ঘাসের উপর রোদ পড়েছে। আমরা গাছের ছায়া ধরে চলতে থাকি। আগাছার অনাদরে ফুলগুলো সুন্দর হয়ে ফুটে আছে। প্রজাপতিরা আঁকাবাঁকা পথ ধরে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। কি মনোহর দৃশ্য! বাঁওড়ের উপর দিয়ে বয়ে আসা শীতেল মৃদু বাতাস আমাদের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায়। আঃ! প্রাণটা একেবারে জুড়িয়ে যায়!
প্রভু হে সদয় মহান,
লালনে পালনে করেছ শোভিত
জনবহুল বা নির্জন স্থান।
এইভাবে যতই এগিয়ে যায় ততই অত্যাশ্চর্য বাড়তেই থাকে। এক সময় আমরা শাঁখদহ দ্বীপের সব চেয়ে উঁচু জায়গাটিতে উপস্থিত হলাম।
গাছে গাছে প্রচুর পাখির বাসা। কেউ বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছে, আবার কেউ উড়ে এসে বাচ্চাদের খাবার খাইয়ে আবার উড়ে যাচ্ছে। নিচ থেকে বেশ ভালোভাবে শুনা যাচ্ছে কেঁ-কেঁ, চিঁ-চিঁ বাচ্চা পাখির ডাক। গাছতলার ঘাস ও আগাছা-গুলো পাখির বিষ্ঠার উপর বিষ্ঠা পড়ে এমনভাবে ঢাকা পড়েছে চেনার কোনো উপায় নাই। পাখি-পাখি একরকম ভস্কা বিষ্ঠার গন্ধ নাকে প্রবেশ করছে। আমরা ভাল করে নাকে গামছা জড়িয়ে নিলাম। জায়গাটা খুব একটা সুবিধা বলে মনে হয় না। কেমন যেন একটা গা শিহরণী ভয়-ভয় মনে হয়। মাঝেমাঝে শিয়াল ও বনবিড়াল আমাদের সাড়া পেয়ে ছুটে পালাচ্ছে। জুব্বার সব সময় সারিতে মাঝে থাকতে চায়।
অনেক ক্লান্তির পর একটু বিশ্রাম নিতে দাড়িয়েছি।
ইমাম গাছের একটি ডাল ভেঙে লাঠির মতো হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চমকে উঠে পিছিয়ে আসে। জিজ্ঞেস করি, কিরে ইমাম অমন করে চমকে উঠলি কেন? ইমাম মুখে কোনো কথা না বলে, হাতের ইশারা দিয়ে কাছে যেতে বলছে।
আমরা ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই ইমাম আঙুল দেখিয়ে বললো ওই দেখ! তাকাতেই ভয়ঙ্কর কাণ্ড। বিষধর গোখরো সাপ, আর বেজির লড়াই। কেউ হার মানতে চাইনা। উভয়ের রাগ বেড়েই চলেছে। সাপ ফোঁস করে ছোবল মারছে আর বেজি দ্রুত সরে যাচ্ছে। সাপের ছোবল সব বিফলে যাচ্ছে।
সাপ বেজির লড়াই আজ জীবনের প্রথম দেখা। তাই বেশ মজাই লাগছে। জুব্বার তো ভয়ে দীপুর গায়ে একেবারে সেঁটে লেগেছে।
ইমাম বললো মান্নান, একবার হুকুম দে-না, সাপটাকে ধরে--- ইমামের কথা শেষ হতে না হতে আমি একটা জোরসে ধমক দিয়ে বললাম, তুই একটা পাগল। বেশী বেশী ওস্তাদগিরি ভালো নয়। শুনে ইমাম চুপ করে গেল।
কোথা হতে এক ওত পেতে থাকা ঈগল ঝপাং করে সাপটির উপর পড়ে সাপটিকে তুলে নিয়ে চলে গেল। বেজিটা তখন আগাছা ঝড়ের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নির্বাকে থাকার পর জুব্বার বললো আর বেশিদূর যেতে হবে না। আবার আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই বাঁওড়ের ধার। দীপু বললো ফিরতে এমন কিছু বেশি সময় লাগবেনা। আমরা চারিদিক দেখতে দেখতে এসেছি তাই সময় অনেক বেশি লেগেছে। আর কিছুটা এগোলেই গঙ্গাটাও একবার দেখে আসতে পারবো।
আমি বললাম ফিরে যাওয়াটায় ভালো, আবার পরে কোনো সময় আর একবার এসে সবটা ভালো করে দেখবো। ইমাম আমার কথায় সাঁই দিয়ে বললো, সেই ভালো।
ওখান থেকে আমরা ঘুরে হাঁটতে শুরু করি। একটানা হেঁটে আসায় তাড়াতাড়ি পৌছে গেলাম একেবারে বাঁওড়ের ধার। বাঁওড়ের জলে চারজনে ভালোমতো স্নান করে, চারটে বড় বোতলে খাওয়ার জলও ভরে নিয়েছি।
ক্লান্ত শরীর শীতেল জলে স্নান করে উঠতেই শরীর ও মন আবার নতুন সতেজ হয়ে উঠলো।  এবার আমরা দ্বীপের আরও একটু ভিতর দিকে কিছুটা ফাঁকা জায়গা বুঝে সবুজ ঘাসের উপর তাঁবু খাটিয়ে ফেলেছি, যাতে আগের দিনের মতো তাঁবুর উপরে পাখির বিষ্ঠা না পড়ে। তাড়াতাড়ি করে রান্নার কাজটাও সেরে ফেললাম।
দীপু আর জুব্বার চারটে আসন নিয়ে তাঁবুর বাইরে পেতে দিয়ে বললো, আর থাকা যায়না।
কখন ছোলার ছাতু খেয়ে বেরিয়েছি, বেলা দুটো গড়িয়ে গেল।
চারজনে একসঙ্গে খেতে বসে গেলাম। কুড়িয়ে পাওয়া বুনোহাঁসের ডিম দিয়ে আলুর ঝল, ওঃ, দারুণ লাগলো! বাড়িতে রকমারি খাবার হলেও এখানকার খাবারের স্বাদই আলাদা।
খাওয়ার পরে তাঁবুর মধ্যে সবাই একটু সময় গা গড়া দিয়ে আবার উঠে বসি। সাড়ে তিনটে বেজে গেল, চরতে যাওয়া পাখিদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আমরা সবাই ব্যাকুলিত হয়ে বসে পড়ি। কারণ আগের দিন ঠিক সময়মত পৌছাতে পারিনি।
সময় বয়ে যায়। অল্প কিছুক্ষণ পরেই চরতে যাওয়া পাখিগুলো যে যার মতো ফিরে আসতে শুরু করেছে নিজের এলাকায়। ছোটো থেকে বড়, রংবেরঙের বিভিন্ন প্রকার পাখিদের ভীড় জমে গেল গাছের মাথায় মাথায়। কে কার উপরে বসছে তার ঠিকঠিকানা নাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার সাইজ হয়ে ঠিক জায়গা মত বসে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির বড়বড় পাখিদের বিভিন্ন রকম ডাক। দেখে মনে হচ্ছে পাখিদের মেলা বসেছে। বিরামহীন একটানা কলরব। পাখিদের সাথে মজা উপভোগ করতে করতে অনেক রাত্রি হয়ে গেল। সময় বুঝে দীপু ও জুব্বার রান্নার কাজটা সেরে ফেলেছে। আমি সবাইকে বললাম চল অনেক হয়ে গেছে, খেয়েদেয়ে এবার শুয়ে পড়ি।
সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে সবাই ক্লান্ত, তাই কেউ আর দ্বিধাবোধ করল না। সবাই খেয়েদেয়ে তাঁবুর ভিতরে শুয়ে পড়লাম।
পরেরদিন ঘুম ভাঙতেই দেখি সূর্য বেশ উপরে উঠে এসেছে। তাড়াতাড়ি চা-মুড়ি খেয়ে এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। হাটতে হাঁটতে আমরা পৌছে গেলাম বাঁওড়ের ধার। আসার সময় যেখানে নেমেছিলাম ঠিক সেখানেই পৌছে গেছি। এক জেলে নোকো নিয়ে ফাঁস জাল পাততে পাততে এদিকেই এগিয়ে আসছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম এই যে জেলে ভাই, আমাদেরকে পার করে দিবে? জেলে বললো হাঁ ভাই, আর একটা জাল আছে এটা পাতা হলেই তোমাদের পার করে দিব। ডাঙার কাছাকাছি আসতেই জেলে হঠাৎ চিৎকার কার করে উঠলো। আমরা দেখতে পাচ্ছি জলের তলায় কেউ যেন জেলেকে ধরে টানাটানি করেছে, জেলেও প্রাণপণ ডাঙায় উঠতে চেষ্টা করছে, শক্তিতে পেরে উঠছে না। ধীরেধীরে কে যেন জলের মাঝে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় ইমাম আর চুপ থাকতে পারলনা। ব্যাগ হতে একটা ধারালো ছুরি বার করে ইমাম জলে ঝাঁপ দিলো। আমরা অনেক চেষ্টা করেও ইমামকে আটকাতে পারলাম না। জলের তলা হতে কে যেন দুজনের সঙ্গে চরম ধ্বস্তাধস্তি করছে। কিছুক্ষণ পর ইমাম জলে ডুবে গেল। আমরা ডাঙাতে চিৎকার চেঁচামেচি করি। নির্জন এই দ্বীপে আমাদের চিকারের আওয়াজ কারও কানে পৌছাল না। আমাদের চোখের সামনে কিসে যেন ইমামকে তলিয়ে নিয়ে চলে গেল। ইমাম আর হয়তো বেঁচে নাই। ভাবতে ভাবতে ইমাম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জলের উপর ভেসে উঠে সাঁতার কাটতে থাকে। ক্লান্ত হয়ে দুজনেই কাছে আসলে আমরা হাত ধরে ডাঙায় তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর সবাই নৌকোতে উঠে বসলাম। জেলে ঝোঁক সামলিয়ে নৌকো ছেড়ে দিল। জুব্বার ভয় পেয়ে নৌকোর মাঝখানে চুপচাপ বসে রইলো। নৌকো চলতে চলতে যখন ইমামকে জিজ্ঞেস করি, ইমাম বললো রবারের দড়ির মতো কি যেন জেলের একটা পা পেঁচিয়ে ধরে টানাটানি করছিল। আমার ধারালো ছুরি দিয়ে ওটাকে কেটে দিতেই জেলেকে ছেড়ে দিয়েছে। জেলে বললো এইতো মাত্র তিনদিন আগে, একজনকে জলের তলে কিসে টেনে নিয়ে গেছে। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
প্রতি বছরই এমন দু-চারটে ঘটতেই থাকে। ভাগ্যক্রমে তোমরা এসেছিলে তাই আমি বেঁচে গেছি। কথা বলতে বলতে নৌকো দাদপুর ঘাটে ভিড়ে গেল। নৌকো থেকে নেমে জেলেকে ভাড়া দিতে চাইলে কিছুতেই নিল না।
এম্বাসেডরের ড্রাইভার কথামতো আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। এম্বাসেডরে চেপে আমরা বাড়িতে পৌছে গেলাম।
পরের দিন সকালবেলায় মানুষের মুখেমুখে শুনতে পাই, বাঁওড়ের ঘাটে, এক কুইন্টাল ওজনের একটি মরা শামুক ভেসে উঠেছে। শামুকটির দুটো শুঁড়ের একটি শুঁড় কাটা।
সমাপ্ত

কাকাতুয়া পাখি
- মেশ্ রাফি মুকুল

দূরের সাম্পানে ভেসে যাচ্ছে কাকাতুয়া
সমুদ্রের কন্ঠে গগনের গান
একটা ঝাপটা এসে উড়িয়ে নিয়ে গ্যালো
ভূমধ্যসাগর

পৃথিবী আর একবার কেঁপে উঠবে মোহনবাঁশিতে
নগরমহিষ বাসা বাঁধবে জলের ট্যাংকিতে
ভূমণ্ডলে গড়িয়ে পড়বে মৃত্যুর সাদাগন্ধ

কাকাতুয়া পাখি
বন্দরে বন্দরে রেখে যেও কষ্টের জলজ নূপুরধ্বনি,রক্তচঞ্চু ও
কিছু কিছু প্রেমের ডিম্বাশয়।

১৩/১০/২০১৮.

হে হৃদয় ভালোবাসাযুক্ত হও
- মোশ্ রাফি মুকুল

নিজেকে গুটিয়ে রেখোনা অনাঙ্কুরিত বীজের মতো,
না গুটিয়ে রেখোনা
ভাগ্যের কলাকৌশলে লুকিয়োনা আত্মজ বিষাদ
হে হৃদয় ভালোবাসাযুক্ত হও।

ইচ্ছাকৃতভাবে বাতাসে উড়িয়োনা দুমড়ানো মুচড়ানো ভবিষ্যতের ঘুড়ি
জীবন যাপনের সহজ শর্তগুলো প্রশ্নবিদ্ধ করোনা কখনোও।

আকাশ কিংবা উন্মুক্ত দিগন্তে নির্বিচারে
এবার শুরু করে দাও বেদনা,ক্রন্দন
আনন্দ আর সুখের চর্চা-
সৌরমণ্ডলের পরিপার্শ্বিকে ফুটিয়ে তোলো তোমার নিরবচ্ছিন্ন অস্তিত্ব-
শোঁ শোঁ শব্দ
যেন তোমাকে কেন্দ্র করে'ই ঘুরছে সময়
প্রেমোময় নক্ষত্ররা
গুটিয়ে রেখোনা তোমায়,কক্ষনো না।
হে হৃদয় ভালোবাসাযুক্ত হও।

১৩/১০/২০১৮.

অ-প্রেমের উড়ো চিঠি
- গাজী হাবিব

তোর, নদী ভেঙে গড়বো সাগর
ঢেউয়ের শিরায় ফুল ফুটেছে
করতে দাপা-দাপি,
তোর, পুকুর পাড়ে সান বাঁধাবো
চাঁদনী রাতে জলের নাচন
করতে ঝাঁপা-ঝাঁপি।

তোর, মাঠের ক্ষেতে মেঘ ছড়াবো
শুকনো মাটির দখিন দুয়ার
করতে চাপা-চাপি,
তোর, মনের রঙে রঙ মেশাবো
জোছনা ঝরা রংতুলি রাত
করতে কাঁপা-কাঁপি।

তোর, পাহাড় চূড়োয় গাঁথবো মালা
ঝরণা নদীর শীতল নহর
করতে ছাপা-ছাপি,
তোর, ভাঁটির দেশে গড়বো শহর
শূণ্য তিথির পূর্ণ গানে
করতে লাফা-লাফি।

জাহান্নমের পথিক হতে
- এস. কে. এম মিজানুর রহমান

আমি...
বসে আছি,এক হাতে জ্বর
আর হাতে জন্ডিস নিয়ে
তুমি বড্ড ভালোই আছো
এ অপয়া কে অমর ভেবে।

মৃত্যুর স্বাদ আমিও চাখবো
তুমি ভেবেছ কী
এ নবীন বৃথায় বেঁচে যাবে

তিতিক্ষা তিতাস হয়ে
হৃৎপিণ্ডের অবরোদ হবে যেদিন
তুমি ফিরবে আমার কবরে
লাশের লালশায়,
তুমি হবে ডাইনি
আর আমি ডাইনেসর হয়ে
তোমার তিতিক্ষাকে খুবলে খুবলে খেয়ে
আমার সনে তোমাকেও কবরস্থ করতে
এগবো জাহান্নমের গতিপথে...........................

ছোট্ট দিঘী
- সিরাজুম মনিরা

ছোট্ট দিঘীর শান্ত-স্নিগ্ধ জল,
বয় যেন ঢেউয়ের মতো ধারা অবিরল।

সেই জলেতে পদ্ম পাতা ভাসে,
আরো কতক রঙিন শাপলা হাসে।
দিঘীর ঘাটে পাখ-পাখালির মেলা,
ফিরে তারা নীড়ে সন্ধ্যা বেলা।
তখন জাগে জোনাক পোকার দল।

সকাল হতেই গায়ের বধূ আসে ঝাঁকে ঝাঁকে
দিঘী হতে জল নিয়ে যায় কলসি কাঁখে,
সেথায় তাহার শীতল পরশ মিশে থাকে।
দিঘীর ঘাটে বসে কিছুক্ষণ,
কত ভাবুক জুড়ায় তাদের মন।
আরো সেথায় নামে নিশির ঢল।

দিঘীর পাশেই কত বাঁশের ঝাড়
ভরিয়ে রাখে ছোট্ট দিঘীর পাড়
সন্ধ্যা নামে সেথা, রাতের আঁধার ছেয়ে
জলে ঝরে বৃষ্টি ধারা ঝরে রয়ে রয়ে
সেই দৃশ্য মন যে কাড়ে জাগে এ কোন মায়া,
নিঝুম রাতে দিঘীর জলে পড়ে জ্যোৎস্না ছায়া।
আর বয় যেন ঢেউয়ের মত ধারা অবিরল,
ছোট্ট দিঘীর শান্ত স্নিগ্ধ জল।

উৎসবের কোলাজ
- দেবযানী গাঙ্গুলী

উৎসব -১
সাতটা আটত্রিশের মেন লাইন লোকাল ছুটে চলেছে বর্ধমান থেকে ব্যান্ডেলের দিকে -- ব্যান্ডেল নেমে ধরতে হবে কাটোয়া লোকাল । আধ মিনিটের কম সময়ে এক নম্বর থেকে চার নম্বর প্লাটফর্মে ছুটে গিয়ে এক একদিন চলন্ত ট্রেনে ওঠা,ট্রেন গতি নিলে কোনোদিন গার্ডকে মিনতি "একটু থামান না প্লিজ , একটা সি এল চলে যাবে "-- যদি ট্রেন থামে, ভালো...নয়ত অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে স্কুলে পৌঁছে একপ্রস্থ জবাবদিহি সামলে অপরাধীর মতো ক্লাসে পৌঁছে সকালের প্রথম হাঁফ ছাড়া ।অন্তসত্ত্বা অবস্থাতেও দৌড়ঝাঁপে বিন্দুমাত্র ইতি টানেনি আপাতশান্ত, ভেতরে লড়াকু মেয়েটা ।শরীরে নতুন প্রাণের সম্ভাবনার উৎসব -- সকালে গোগ্রাসে গিলে আসা মুঠোখানেক ভাত যখন আপনিই উগরে আসত, তখন লেডিস কামরায় বসা মেমারীর লেদ কারখানার তিনজন শ্রমিক প্রতিদিন ওর মুখের উপর বিড়ির ধোঁয়া ছুঁড়ে দিয়ে সকালের ফাঁকা কামরায় নিঃশব্দে নারীনিগ্রহের আনন্দে মেতে উঠত ।একদিন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেলে প্রতিবাদ করায় শুনতে হলো-
"রাতে ফেরার সময়ে অ্যাসিড ছুঁড়ে দেব - মা লক্ষ্মীর মতো মুখটা চিনতে পারবি না রে শালি ..."
আতঙ্কে ঘুম আসত না রাতে ।ফিরতে তো রাত ন'টা বেজে যায়, লোকগুলো আশেপাশে কুৎসিত কীসব ইঙ্গিত করে ...না তাকালেও স্পষ্ট বোঝে ও । যদি সত্যি অ্যাসিড ছোঁড়ে ...তবু লড়াই থামে না ।প্রতিদিন ভোরে সংসার সামলে চব্বিশ বছরের মেয়েটা ব্যাগ তুলে নেয় কাঁধে --ওকে যে জীবনের আনন্দযজ্ঞে উৎসবের রোশনাই আনতেই হবে!

**********

উৎসব -২
সোহিনীর সাথে মেট্রোতে আলাপ পলাশের । সোহিনী রবীন্দ্রভারতীতে সঙ্গীতে স্নাতকোত্তর করছে ।পলাশের অফিস সল্টলেক আই টি সেক্টরে । মনে মনে পথের সাথীকে জীবনসাথী করার স্বপ্ন দেখত পলাশ । সুন্দরী না হলেও কী যেন ছিল সোহিনীর কন্ঠে -- কথা যেন কলধ্বনি ।তেমনই মিষ্টি ঘরোয়া স্বভাব ।দরদী মন, আধুনিকতার আতিশয্য এতটুকু স্পর্শ করেনি মেয়েটাকে ।মাকে ওর কথা বলতে মা বললেন,
"এমন একটা মেয়েকেই তো বৌমা করার স্বপ্ন দেখি মনে মনে ।"
সেদিন ছিল দীপাবলি । উৎসবের আলোয় প্রকৃতি প্রজ্বলিত । বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটি, বেশ ক'দিন পলাশ সোহিনীকে দেখেনি । মনটাকে কিছুতেই মানানো গেল না । ঠিকানা জানা ছিল,তবু মনে দোলাচলতা -- হঠাত যদি পলাশ বাড়ি গিয়ে উপস্থিত হয়, সোহিনী কিছু মনে করবে না তো! মনে মনে পলাশ যে এতদূর এগিয়ে গেছে, সে তো তার বিন্দুবিসর্গ জানে না । কলিংবেল টিপতে হাসি মুখে যে পৃথুলা মহিলা এলেন তিনি যে সোহিনীর মা, মুখের গড়ন তা নিরুচ্চারে জানিয়ে দিল । ঘরে ঢুকতেই একটা উৎসবের আবহ টের পেল পলাশ। ধীরে জানল, সামনে ডিসেম্বরের দশ তারিখ সোহিনীর বিয়ে...আজ ভাবী শ্বশুরবাড়ির লোকজন এসেছেন উৎসবের দিনটা দুই পরিবার একসাথে কাটাবেন বলে । খাওয়া দাওয়ার বিপুল আয়োজন ।এমন আনন্দের দিনে সোহিনী কিছুতেই তার বন্ধুকে ডিনার না খাইয়ে ছাড়ল না। চারদিকে আলোর মালা, আতশবাজির বর্ণময় উচ্ছ্বাস ...বাড়িতে ফিরে বালিশ ভেজাচ্ছিল পলাশ। ফোন এল ক্লাব থেকে -- তখন রাত একটা । পাড়ার কবরস্থানের গেটের কাছে কেউ এক সদ্যোজাতকে ফেলে গেছে কাপড় জড়িয়ে ।
কালীপুজোর ঢাক বাজছে, মাইকে মন্ত্রপাঠ কানে আসছে, মা গেছেন অঞ্জলি দিতে । ঘরে ফিরল পলাশ দুধের শিশুকে বুকে নিয়ে। লালচে গালে ধুলো মেখেছে অনাদরের । গাল ঠেকালো পলাশ --
"সোহিনী! " ....
জ্বালা ধরা বুকে পেলবতার প্রশান্তি ।
"ওহে সুন্দর, মম গৃহে আজি পরমোৎসব রাতি " -- শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের সাথে কীর্তনাঙ্গের মিশ্রণে অপূর্ব সৃষ্টি গুরুদেবের ...পলাশের গলায় ঝরল সেই সুরতরঙ্গ।

**********

উৎসব -৩
চৌধুরী বাড়ির দুর্গোৎসবে এবার রজতজয়ন্তী । বেনারসী আর পঞ্চাশ ভরি সোনায় দীপেন্দ্রনারায়ণ মুড়ে দিয়েছেন মায়ের গা ।শহরের গণ্যমান্য লোকেরা আজ নিমন্ত্রিত । প্রচুর দানসামগ্রী গুছিয়ে রাখছেন নায়েব চাঁদমোহন ।আজ অষ্টমীর দিন আটটি ছাগবলি দেওয়া পারিবারিক রীতি । রূপোর থালায় থরে থরে সাজানো ফল, রকমারি মিষ্টি ।চৌধুরী মশাই সমস্ত আয়োজন খুঁটিয়ে দেখছেন পুজো বসার আগে, এমন সময়ে হৈ চৈ ...তাকিয়ে দেখেন এক উস্কোখুস্কো ভিখারিনী কোথা থেকে এসে একেবারে ঠাকুর দালানে হাজির ।তবু একা নয়, সঙ্গে চার চারটি বাচ্চা। গর্জে উঠলেন চাঁদমোহন --

'এখানে ঢুকেছিস কোন্ সাহসে? '

'তিনদিন খেতে পাইনি বাবু, একটু খাবার দিবেন? ছেলেমেয়েগুলাও খায় নাই ।এখানে শুনছি পুজো, একটু পেসাদ দিবেন? '

চৌধুরী মশাই এগিয়ে এলেন।
'কোন্ সাহসে এখানে ঢুকেছিস ? খেতে দিতে পারিস না তো বাচ্চা পয়দা করিস কেন? দূর হ' ।'

মিনতি করতে থাকে ভিখারিনী, এরই ফাঁকে ছেলেদুটো গিয়ে নৈবেদ্য আর প্রসাদের থালা থেকে ফল সন্দেশ খেতে থাকে । বোনেদের মুখেও তুলে দেয় ।
কর্তা হাঁকেন--' নকড়ি, আমার চাবুকটা নিয়ে আয় শিগগির ..'
নাদুসনুদুস ছেলেটা তখন এক এক গ্রাসে চারটে করে সন্দেশ গিলছে, ছোটছেলে ছুটে এসে মায়ের মুখে গুঁজে দিচ্ছে মিষ্টি ... সপাসপ চাবুক পড়ল মায়ের সারা গায়ে ।বাচ্চারাও বাদ গেল না ।

'পুজোটাই পন্ড করে দিতে চাস ?'
ভিখারিনী হাত জোড় করে মিনতি করছে, চাবুকের ঘায়ে শাড়ি গেছে ছিঁড়ে, নাদুসনুদুস ছেলেটার ঠোঁট ফেটে রক্ত ঝরছে ....অঝোরে কাঁদছে বোনদুটি ।

তিক্ত মেজাজে চৌধুরী একটা সিগারেট ধরালেন ।
'চাঁদমোহন --সমস্ত জোগাড় ফেলে দিয়ে আবার নতুন করে এখনি ব্যবস্থা করতে বলো, পুজো শুরু হতে দেরী হয়ে যাচ্ছে ।
হঠাৎই চোখ পড়ল, পুরোহিত শক্তিপদ ঠকঠক করে কাঁপছেন।
'তোমার আবার কাঁপুনি রোগ ধরল নাকি? ' বিরক্ত দীপেন্দ্রনারায়ণ দাঁত ঘষে বললেন ।পুরোহিত শুধু চোখের ইশারায় প্রতিমার দিকে নির্দেশ করে বসে পড়লেন ধপ্ করে ।
চৌধুরী মশাই তাকিয়ে দেখেন, দুর্গা প্রতিমার পরণের কাপড় ছেঁড়া, মা ও সন্তানদের সারা গায়ে লাল লাল চাবুকের দাগ -- গণেশের ঠোঁট বেয়ে তাজা রক্ত ঝরছে । মুখ থেকে টপ্ করে খসে পড়ল সিগারেট । চৌধুরী বসে পড়লেন শক্তিপদর পাশে ।

ব্রততী গল্প বলা শেষ করে দেখল, দশ বছরের জিসানের সারা গায়ে কাঁটা দিয়েছে । মণ্ডপে তখন সন্ধিপুজোর আয়োজন চলছে, উৎসবের আর দুটো দিন বাকি । কপালে হাত ঠেকিয়ে ব্রততী বলল,
'সকলের মঙ্গল করো মা! অন্তরের ষড়রিপু বলিপ্রদত্ত হোক তোমার চরণে ।'

**********

উৎসব -৪
আজ দুর্গাষষ্ঠী ।পৃথা বলেছে, "মা, তুমি এখানে এসেই খাবে ।ঘরে একা একা ষষ্ঠীর ব্রত পালন করতে যেও না । সকাল সকাল বারাসত থেকে রওনা হয়েছেন মুখার্জী দম্পতি ।মেয়ের বাড়ি ফুলবাগান ।খুব ঘটা করে দুর্গাপুজো হয় সেখানে। প্রতিবছর ষষ্ঠী থেকে দশমী ওখানেই কাটে মহানন্দে। পৃথার দুই ছেলে তো সকাল থেকে ব্যস্ত - কখন দাদাই -দিদুন আসবে! সকলের জন্য পুজোর জামাকাপড় আর কুটুম বাড়ির উপযুক্ত প্রচুর মিষ্টি সাথে নিলেও শেখরবাবু দুই নাতির জন্য চকলেট নিতে এক্কেবারে ভুলে গেছেন ।গিন্নী বকাবকি করছেন --কাকুড়গাছি মোড় পেরিয়ে রাস্তার বাঁদিকে গাড়িটা দাঁড় করিয়ে চকলেট কিনতে নামলেন কাঠগোলা স্টপেজের কাছে একটা বড় দোকান দেখে । যখন ফিরলেন গায়ত্রী দেবী গজগজ করছেন ।

'কলকাতা নাকি লন্ডন হবে! ডিভাইডারের ওপাশে দ্যাখো, এখনো মানুষ ফুটপাতে শোয়! ফুটপাতে রাঁধে! এই কলকাতা শহর! '

মুচকি হাসেন শেখরবাবু। নিম্নচাপটা কেটে গেছে আজ ।বেশ রোদ উঠেছে ষষ্ঠীর সকালে । গাড়িতে এফ এম রেডিওটা চালিয়ে দেন ।রেডিও জকি একটা ছোট্ট মেয়েকে পুজোর কী প্ল্যান জিজ্ঞাসা করছে। তিতাস নামের মেয়েটা বলছে, আজ সন্ধ্যায় ওদের কমপ্লেক্সে অনুষ্ঠান নিয়ে এই মুহূর্তে ও খুব এক্সাইটেড ।মা ওকে একটা কবিতা শিখিয়েছেন, তা ছাড়া আছে গ্রুপ ডান্স ।
জকি বলল, 'তবে আমরাও শুনি তোমার কবিতাটা।'
তিতাস কচি গলায় শুরু করল --

আমার দুর্গা ফুটপাতে

মাছ মাংস দূরের কথা, জোটেনি ভাত পেঁয়াজও
ফুটপাতেতে গণশার মা ভাবছে, খাবে কি আজ ও!
ও জানে না রাজনীতি কি! কিংবা কোথায় গদি কার --
ও শুধু চায় একমুঠো ভাত এবং রুটির অধিকার ।
গাড়ি বাড়ি চায় না কিছুই স্বচ্ছলতা আর্থিকের
ও শুধু চায় - দিন কেটে যাক গণেশ এবং কার্তিকের।
ছুঁচোয় পেটে কেত্তন গায় ঢাক ঢোল খোল করতালে,
এমনি করেই কাটবে জীবন নিত্য হাঁড়ির হরতালে?
বুকের দুধও শুকিয়ে গেছে ঘুম ভেঙে যায় মাঝরাতে,
গণশা কেতো মাথা খোঁড়ে হাড় জিরজিরে পাঁজরাতে ।
খুশির খেলায় আলোর মালায় মাইক্রোফোনের উৎপাতে,
দশভুজা দুর্গা হাসে --- দুগ্গা কাঁদে ফুটপাতে ।

'শ্যামল ! গাড়ি ঘোরাও! সজল চোখে কাঁপা গলায় বললেন গায়ত্রী। গাড়ি এসে থামল ফুটপাতের সংসারে। দু'হাত ভরে জামাকাপড় আর মিষ্টির বাক্স তুলে দিলেন মুখার্জী দম্পতি ফুটপাতের দুর্গার হাতে। অর্ধনগ্ন বাচ্চাগুলো অবাক হয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে দামী চকলেটের বাক্স ...দুগ্গার চোখে জল।

অপার্থিব তৃপ্তির হাসি মুখে নিয়ে গাড়িতে উঠলেন গায়ত্রী ।
"ওদের মনের আলোয় উৎসবের দিনগুলো আলোকিত করো মা!

আদম সুরাত
- মোশ্ রাফি মুকুল

মূলত আমিও এক অতিবাহিত নদী
বিচ্ছিন্ন মেঘ থেকে খসে পড়া খণ্ড খণ্ড দাগ
ছায়াঘেরা রক্তকোষে জমাট বিভ্রাট

আদম সুরাত ঘেঁষে ছুটে চলা উল্কা-
হয়তো আলতামাস বৃক্ষের পাতার মতো
ধ্বসে পড়বো মান্ডুর উপত্যকায়
তবুও পূর্বপুরুষের প্যাপিরাসে
দিনরাত এঁকে যাই স্বীয় গ্রাফিক্স।

১৩/১০/২০১৮.

এই শরতেরর মেঘলা চিঠি
- গাজী হাবিব

নীল আকাশে ভরে আছে
সাদা মেঘের দল,
শরৎ বেলায় দেখতে খেলা
নদীর পাড়ে চল।

নদীর জলে কাশের ছোঁয়া
ঢেউয়ের পরে ঢেউ,
শিশির ভেজা ভোর বেলাতে
শিউলী কুড়ায় কেউ।

নরম রোদে বিকেল হাসে
চমকে ওঠে মন,
দূর আকাশে বকের সারি
দেখি সারা-ক্ষণ।

চোখের ভাঁজে লাজুক হাসি
পল্লীর বধূ যায়,
রাখাল ছেলের বাশের বাঁশি
ডাকে আমার গাঁয়।

শাপলা ফোটা বিলের জলে
বৃষ্টি যখন পড়ে,
রিমঝিম ঝিম বৃষ্টির তালে
রুই কাতলা নড়ে।

ভোর বেলাতে সবুজ পাতায়
শিশির কণা ভাসে,
সোনা রোদের ছোঁয়া পেয়ে
হাসে দূর্বা ঘাসে।

শরৎ চিঠি পড়ে আমার
ঘুম ভেঙেছে ভোরে,
শিউলী তলায় শিরশিরে পায়
খুঁজি কেবল তোরে।

এই শরতের মেঘলা চিঠি
পড়তে যদি চাও,
বিকেল হলে বিলের জলে
নাইতে তবে যাও।

গাজী হাবিব, সাতক্ষীরা

আশ্বিনি বাদল

আব্দুল মান্নান মল্লিক

মেঘলা দিনের শীতেল হাওয়া বইছে বৈঁ-বৈঁ,
সূয্যিমামা মুখ ঢেকেছে নীল আকাশটা কৈ?
শীত এলোরে শীত এলো মেঘের আঁচল ধরে,
মলিন আকাশ মেঘের ঘটা বৃষ্টি ফোটা ঝরে।
মাধবীলতার ঢলাঢলি কে কার উপর পড়ে,
বৃষ্টিভেজা কলা পাতা কে কাকে রয় ধরে।
সিক্ত হয়ে কাশফুল সব জড়িয়ে গেছে গাছে,
ঝাঁটার কাঠি দাঁড়িয়ে শুধু ডাকেনা কেউ কাছে।
অসময়ে হাঁকছে কারা বান ডেকেছে ওই,
বুড়ো বুড়ি হায়-হায় কাঁদে পাড়াতে হৈ-চৈ।
গহুর পাড়ে শিয়াল কাঁদে জমির আলে ইঁদুর,
হাঁসেরা জলে সাঁতার কাটে পদ্ম পাতায় দাদুর।
ঝিমরে গাছে বাদুড় ঝুলে হুনুমান গাছের ডালে,
ছুমাই দাদু মাছ ধরতে কোমর বেঁধেছে খালে।



বড্ড ইচ্ছে করে, ভালোবাসি
- গাজী হাবিব

.
পরীক্ষার পড়া নিয়ে তুমি ব্যস্ত হলে
আমার বড্ড ইচ্ছে করে,
গাঙশালিক হতে।

ইচ্ছে করে
চেয়ার সমেত তোমাকে জাপটে ধরি
ঘুম ঘুম চোখে।

কেননা আমি খুব ভালোবাসি তোমাকে।
খুব ইচ্ছেও করে- ভালোবাসি তোমাকে।

কলেজ থেকে ফিরে আসার পর
তোমার ক্লান্ত শরীর আমাকে আদর করতে ডাকে
ক্লান্ত চোখে তুমি কি স্বপ্ন দেখো ভালোবাসার?
ঘর্মাক্ত শরীরে
তোমার ভালোবাসাকেও ভালোবাসি।

পুকুরের জলে স্নান করতে নেমে
আমার বড্ড ইচ্ছে করে-
ভেজা শরীর, লাল পদ্ম
সিল্কের শাড়ী,
ইচ্ছে করে ভালোবাসি অনেক।

খুব শক্ত রোদে যখন কোন পথিক
ছায়ায় বসে ঝিমোয়
তখন আমারও বড্ড ইচ্ছে করে
তোমাকে ভালোবেসে
ঢিবি হয়ে নুয়ে পড়ি বুকের কিনারে।

খুব জ্বর এলে তোমার
তপ্ত নিঃশ্বাসের উষ্ণতা পেয়েও
আমার বড্ড ইচ্ছে করে।

ভীষণ রেগে গেলে তুমি
তোমার নাক ফুলে ওঠে
ঠোঁট দু'টোও হয়ে ওঠে বেঁলে দোআঁশ
তখন আমার বড্ড ইচ্ছে করে
-------
পার্কে ঘুরতে যাওয়ার আগে
বেণীকরা চুল, গোলাপী ঠোঁট, খুশবুর
ঘ্রাণ ছড়ালে ঘরময়
তখন বড্ড ইচ্ছে করে আমার--

ভারী নিতম্বের পাহাড়ী মাকড়শা হেঁটে গেলে
দুলিয়ে নিটোল দুধের থলি
ওম! ওম! শীতের বিকেলে
সন্ধ্যা নামলে বনের ধারে
বড্ড ইচ্ছে করে আমার
ভালোবাসি খুব তোমাকে।

যখন পাকঘরে একা দেখি
তাজা সবজির মতো
তখন বড্ড ইচ্ছে করে
ভালোবাসি আরো বেশী
লকলকে কলমি লতা---

গভীরে নেমে যাওয়া গিরি পথ
ভাঁজভাঙা চোখের আকুলতায়
নিস্তব্ধ হলে এ পৃথিবী
বড্ড ইচ্ছে করে
তোমাকে দেখাই চাঁদের সমুদ্র।

অপরাজিতা
- বনানী ভট্টাচার্য

আলোর বৃত্তে রোশনাই চেনায় গোপন অন্ধকার
আমার দুর্গা আঁধার ছেনেও আজও তো মানেনি হার!

বাধার পাহাড় একলা পেরিয়ে প্রসাদ নীরবতার
তবুও অটল আমার দুর্গা, ভয়ে সে মানেনি হার

ধুলোময় তার রুক্ষ জীবনে নেই কোনো হাহাকার
দুর্গা আমার শক্তিরূপিনী, কিছুতে মানেনি হার

অক্ষয় ক্ষত নিয়ে পথ চলা এভাবেই বারবার
ব্যথা পরাভূত, কিন্তু আমার দুর্গা মানেনি হার

আস্থার হাত মাথায় পায়নি, শূন্য যে সে ভাঁড়ার!
অভাবী দুর্গা স্বভাবেই দেবী, কখনও মানেনি হার

ধারণকালেও বারণ কন্যা, ভ্রুণের কী অধিকার!
মাতৃরূপেই পূজিতা, আমার দুর্গা মানেনি হার।

©বনানী ভট্টাচার্য

সবুজ জামা
- সাদিয়া আফরিন প্রমা

রহিম কপালের ঘাম মুছে পকেট থেকে একশত টাকার নোটটা বের করে দিলো ফুটপাতের দোকানদারকে। ছেলের জন্য একশত টাকা দিয়ে একটা সবুজ জামা কিনেছে। দিনমজুরীর কাজ করে রহিম । কিছুদিন ধরে ছেলেটি একটা সবুজ জামার নেওয়ার আবদার করেছে।
জামাটা হাতে নিয়ে বাড়ীর পথে রওনা দিলো রহিম । সবুজ জামাটা হাতে পেলে অনেক খুশি হবে ছেলেটি।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে বাড়ীর সামনে চলে এসেছে রহিম ।
কিন্তু উঠোনে মানুষের সমাহার দেখে বেশ অবাক হলো সে।
মানুষের ভিঁড় ঠেলে সামনে যেতেই নির্বাক হয়ে গেলো রহিম ।
ছেলেটির নিথর দেহ পড়ে আছে মাটিতে।
পানিতে বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে থাকায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে সে।
সবুজ জামাটির দিকে তাঁকিয়ে চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়ালো রহিমের......

মনে পড়ে বারে বার তোমার আমার কাছে আশা,
অগাধ প্রেমের হাবু ডুবু আর অসীম ভালবাসা।
মাঝে মাঝে অভিমানে তোমার আমার কথা না বলা,
কখনও পাশাপাশি কখনও হাত ধরে একসাথে চলা।
মনে পড়ে বারে বার অপলক নয়নে নিজেকে হারিয়ে ফেলা,
কাশবনের পাশে বসে তোমার আমার কাটানো বিকেল বেলা।
রাত জেগে বলা কথা আর সহস্র স্বপ্নের বাহার,
তুমি ছাড়া আর তো নেই কেউ বলতে যে বার বার।
মনে পড়ে বারে বার অকৃত্রিম তোমার অই মুখের হাসি,
বলতে আমায় জান তোমাকে অনেক অনেক ভালবাসি।
তোমার গালে হাত বুলিয়ে চোখে চোখে তাকানো,
কখনো তুমি কখনো আমি দু'জন দু'জন কে খাওয়ানো।
মনে পড়ে বারে বার তোমার পর হয়ে চলে যাওয়া,
পুর্নতার স্বপ্ন দেখে হাজারো স্বপ্নের অপুর্ণ থেকে যাওয়া।
অপুর্ণ হলেও আজও পুর্ণতার স্বপ্ন মনের ঘরে রাখি,
কারন, আমি আজও নিজের চেয়েও বেশি শুধু তোমায় ভালবাসি,,,,,,

আগন্তুকের প্রতি
– মন্দিরা পাল

কেনো যে সন্ধ্যে আসে
ম্রিয়মান অভ্যাসে?
তুমি আমি মুখোমুখি
অবেলায় |

রুপোলি স্বপ্ন ধুলো
ফিরে যাবে বলেছিলো |
কেনো যে বাঁধলে বাসা
অছিলায় |

আবেগী প্রভাত বলে
ফিরে চলো কোলাহলে |
দরজা বন্ধ থাক
চিরদিন |

কাগজে না বলা কথা
তুলে রাখা শূন্যতা |
কেনো যে কাটে না রাত
তুমি হীন |

ছায়াগাছ
- মোশ্ রাফি মুকুল

এইখানে এক ছায়াগাছে ঝুলে আছে
মায়াবতী সময়-
রক্তকরবী আঁকা একটা চিহ্ন
প্রেমোস্নেহী সবুজ পাতা,
প্রবল ঘূর্ণিঝড়ে দাঁড়িয়ে থাকা সব
প্রতিশ্রুতি এবং অঙ্গীকার;

ওহে বিটপীনি
রোদসী রশ্মি গুলো শুষে নেয়া উদারমতি,
তুমিও এক পরম বৃক্ষ-
ছায়াগাছ,
ক্লান্তিকালে যেখানে হেঁটে যায় বিশ্রান্তিগুলো,
শ্রান্তিহীন
প্রেমোকালে
সব পরিশ্রমী হৃৎপিণ্ড যেমন চায়
নির্ভার বিশ্রাম।

০৭/১০/২০১৮.

পুতুল পুতুল জীবন
- নাদেরা শিমূল

কি পেয়েছে?  কি পায়নি?
কখনো জানতে চাওনি তুমি,
শুধু  ভালোবাসার সূর্য্যটা
নিভৃতে দান করেছি আমি।
-
এ আমার শূন্য দান
তোমারও শূন্য গ্রহণ,
তবুও চুপিচুপি  বলেছিল এ মন
প্রেম পূর্ণ হোক জীবন।
-
এখন প্রেমপ্রীতির সে ঘরে
নিশিদিন অমানিশা খেলা করে,
সংসার শৃঙ্খলের তরে
ভালবাসা কেঁদে মরে।
-
আজ তুমি চাও না আমায়
আমিও চাই না তোমায়,
মিছে  এই সুখের অভিনয়
সমাজকে যত ভয়?
-
দু'টি মন এক না রয়
ভালবাসা পরাজিত হয়,
লোকে তারে সংসার কয়
এ যাতনা কি প্রাণে সয়?
-
দিনদিন  প্রেমহীন মিলন
গোপনে ডাকে যে মরণ,
এ বন্ধনের জানি না কারণ
এ কেমন পুতুল পুতুল জীবন?

হারিয়ে গেছে
- মিঠু সিং

হারিয়ে গেছে সেই ছেলেবেলা
হারিয়ে গেছে আনন্দ ,
সাধ ছিল সাধ্য ছিলনা
থাকতো নাকো দ্বন্দ্ব ...

শিউলী ঝরা পথে পথে
আলোর ঝর্ন ধারা
শিশির সিক্ত ঘাসে ঘাসে
অনাবিল আনন্দ ভরা....

কোথায় গেল হারিয়ে সেদিন
আসবে নাতো ফিরে ,
বড়বেলায় চাওয়া পাওয়ার হিসাব
দুঃশ্চিন্তা ঘিরে ধরে....

এখন বেড়েছে সাধ্য সামর্থ্য
সুখ নাইকো মোটে ,
আছে চাহিদা শুধু বাড়বাড়ন্ত
শান্তি নাহি জোটে ....

সস্তার নতুন পুজার ফ্রকে
থাকতো খুশির হাওয়া ,
পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে ঘুরে
আগমনী গান গাওয়া...

আলমারী ভর্তি জামদানি সিল্ক
ঘরে আসবাব ঠাসা ,
পাশের বাড়ীর খোঁজ রাখিনা
হারিয়েছি ভালোবাসার ভাষা....

ক্ষমতা টাকার অহংকারে মত্ত
গুছিয়ে নিচ্ছি ঘর ,
পিতা মাতাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে
বাড়াচ্ছি স্ট্যাটাসের কদর ....

আজ লোক দেখানো ভড়ংগুলো
ক্রমশঃ রমরমিয়ে বাড়ে ,
ছোট শিশু আধুনিক কায়দায়
স্বার্থপরতার খোলসে মোড়ে....

যে লোভ ক্ষমতা আপনকে সরিয়ে
ভোলায় শ্রদ্ধা ভালোবাসা ,
চাইনা এমন স্বার্থপর আধুনিকতা
চাই শান্তির ছোটবাসা....।

আসলে বাঁশটায় তেল মাখানো
- সোনালী মন্ডল আইচ

উঠতে না পেরে ছটফট ও কিচকিচ রব
মণ-মণ শব্দ খুঁজে যায় মন সাদা পাতার জন্য
কাপালিক ত্রিশূল ,যেন আকাশমুখো সমীহ চায়
আর ফোনের দেয়ালে বিশ্ব সংসার ঝুলছে

কিচ্ছু বাদ নেই সেসব দীর্ঘতম আকাঙ্খার সেল্ফি
মনের পাতায় কলমের যত আঁচড় সব পাবলিক
বর্ণমালা হয়ে দেয়ালের ভবঘুরে বাঁকে বাঁকে
আমরা নিজেকে খুঁজে পাই ফের হারিয়ে ফেলি!

©Sonali Mandal Aich

আর্জি
- সুজাতা মিথিলা

জানি ,
আমার গালে এখন
ছোপ ছোপ মেচেতার দাগ ,
ত্বকের হ্রাস পাওয়া লাবণ্য কমনীয়তা
চোখ আর টানে না তোমার ।।
কোমরের খাঁজের ও আর সেই কারুকার্য নেই ,
নেই রমনীর কাঙ্খিত রূপ
যা হয়তো কিছু দিন পাইয়ে
দিয়েছিল তোমাকে আমার করে ।।

এখন শরীরে ধস নেমেছে
বাইরের অবয়বে যথেষ্ট কালের ছাপ ।।
আর আমার মধ্যে তটিনীর চঞ্চলতা নেই
এখন আমি ধীর স্থির অনেকটা গভীর ।।
মোহ মুক্ত আবেগ আর অকারণ আবেশের।।

জানো ,
এখন সত্যিই
আমি আমার আরাধ্য
সেই অলীক প্রেমিকের সান্নিধ্য
অন্তত একবারের জন্যও
ভীষণ প্রকট ভাবেই চাইছি । ।

যে আমার তপ্ত কপালে রাখবে তার শীতল হাত
গালের মেচেতার দাগে খুঁজে পাবে
পোড়ো বাড়ির অন্তরে চাপা পড়া অভিমান ।
যে আমার চালসে পড়া আয়তো চোখে
আটকে থাকা অশ্রু নদীতে ডুব দিয়ে
তুলে আনবে সেই মন নামক বিরল মুক্তকণা
যা এতদিন একান্তই ব্রাত্য মনে হয়েছিল তোমার ।।

বিশ্বাস করো ,
বৈতরণী পার হতে
আমি তাকেই চাই পেতে --
আমার বন্ধ দু চোখের পাতায়
তুলসী পাতার প্রলেপ দিতে
আর শেষের হা- মুখে দু ফোঁটা দুধ গঙ্গা জল
দিয়ে চিরতরে ভালোবাসার আশ মেটাতে ।

--- এই আমার শেষ আর্জি তোমার কাছে ।।

@ সুজাতা মিথিলা
4.10. 18

জীবনের পঙ্ক্তিমালা
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

অসহায় জীবনের পরিত্যক্ত দেয়াল জুড়ে
শেওলা কাঁদার মতোই কষ্টেরা পরে আছে ,
স্মৃতির বনসাই সাজানো হৃদয় করিডোরে
আশাগুলো আলোক লতার মতো ঝুলছে ।

যন্ত্রণারা ড্রইং রুমে অগোছালো পড়ে আছে
আর স্বপ্নগুলো আছে সিলিংয়ে বন্দী পড়ে ,
ইচ্ছেশক্তিটা আজ এখনো জীবিতই আছে
কিন্তু ব্যার্থতার চোরাবালিতেই আছি পড়ে ।

অশ্রুজল আজ হুরমুরিয়ে দু'চোখে ঝড়ছে
তবু চশমায় সে জল রেখেছি আড়াল করে ,
কপালে আজ দুঃচিন্তার রেখা ভীর করেছে
তাকে ঠিকই রেখেছি হাসির আড়াল করে ।

জীবনটাই যেন বড় বোঝা জীবনের কাছে
প্রতিনিয়ত বাস্তবতার কষাঘাত সহ্য করে ,
আত্মহত্যা মহাপাপ তাইতো আজও বেঁচে
অথচ নিত্য জীবন চিতায় ছাই হচ্ছি পুড়ে ।

০৪/১০/১৯খ্রীঃ

ভালোবাসা ভালো থাকুক
- গাজী হাবিব

কচি পুঁইয়ের ডগার মত লিকলিকে বউ আমার
লক্ষ্ণী অতি চালাক চতুর পকেট খোঁজে জামার।

সারা দিনের কষ্ট শেষে আসলে ফিরে বাড়ি,
অদূর থেকে শুনি যেন ছিঁড়ছে নতুন শাড়ী।

ভয়ে আমার শরীর থেকে ঝরতে থাকে ঘাম
প্রেম কাননে আছি আমি এই বুঝি তার দাম।

বললাম যাহা এই ক্ষণেতে সত্যি কথা নয়,
সত্যি হলো ভালোবাসা পাড়ার লোকে কয়।

সারা দিনের কর্ম শেষে আসি যখন ফিরে
স্বর্গ যেন বিরাজ করে আমার ছোট্ট নীড়ে।

বউ যে আমার বউয়ের মতো অনেক ভালো বাসি
জলের ঢেউয়ে মুক্তো ছড়ায় তার সে মধুর হাসি।

কন্যা আছে একটা মোদের প্রেম বাগিচার ফুল
তার কথাতে মুগ্ধ হয়ে ই গায় যে বাগের বুলবুল।

গুড় পুকুরের মেলা থেকে কাল কিনেছি দু'টো দুল।
দুল পেয়ে আজ কন্যা আমার টেনেছে মাথার চুল।

সোনা দানা বাড়ীর উঠোন কিংবা ভোরের হাওয়া
মুক্ত আকাশ গান ধরেছে সব কিছুই আজ পাওয়া।

আদর ছাড়া সোহাগ পেয়ে বউটা অনেক খুশি
রাগের কথা বললেও আমি চুপসে পরে ঠুসি।

সমৃদ্ধ তার চোখের ভাষা স্বপ্নে জীবন আঁকে
চাইনা আমি হারাতে তার এই ভূবনের বাঁকে।

তার মনের ভেতর ফুল বাগিচা ফোঁটায় নতুন ফুল
আমি, জুঁই হেনাদের সুবাস নিতে করি' না যে ভুল।

চোখ দু'টো তার তাজা গোলাপ আঁধারে জ্বালায় বাতি
ওই চোখেতে চোখ রেখে তাই পার করে দেই রাতি।

আমার মনের সব কবিতা তার কথাতেই হাসে
সেই হাসিতে ই মুক্তো ঝরে শিশির জমা ঘাসে।

পথ চলাতে ক্লান্তি পেলে কিংবা ঝরলে ঘাম
অশ্রু জলে বুক ভাসিয়ে নেয় সে রবের নাম।

তার সুখেতে সুখ যে আমার গোলাপ-চাপা'র ঘ্রাণ
খোদার সেরা দান পেয়ে আজ যায় জুড়িয়ে প্রাণ।

পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ শেষে খোদার শোকর করে
সত্য সরল সহজ জীবন' চায় সে মোদের ঘরে।

সব সেরাদের সেরা সে যে জুড়ি মেলা ভার
একটু ও নেই অহং গরব এই জীবনে তার।

অনেক সুখে আছি মোরা খুশিতে যায় দিন
যেমন আছি তেমন রবো শুধরে নেবো ঋণ।

ভালোবাসা ভালো থাকুক এই ফরিয়াদ করি
ভালো বাসার সমাধি গড়ে আমরা যেন মরি।

উপান্তে
- সুজাতা মিথিলা

প্রতি টি সূর্য ওঠা ডোবা
যেন কালের ছন্দে মনের আবর্তন ।
বলা যেতেই পারে --
এও এক জীবন দর্শন
যা অনেক টাই
দৃষ্টি সহ দৃষ্টিভঙ্গীর বিবর্তনও ।।

আজ দৃষ্টি পথ অনেক স্বচ্ছ
কুয়াশা এবং ধোঁয়াশা মুক্ত ।
আবেগের অন্ধতা নেই
বরং চেতনের প্রখরতা আরো তীক্ষ্ণ ।।

সাগ্নিক সপ্তপদী দুটো মন কে
কতটা অন্তরে গেঁথে দিতে সফল
সে বিষয়ে প্রচুর বিতর্ক হয়তো আসবে ।।

কিন্তু একটা বাঁধন তো পড়ে গভীর চেতনে -
যা মিশে থাকে মনের পরতে পরতে
প্রথম বধূ বেশে পা রাখা উঠোনে,
হরি মন্দিরে , ঘরের প্রতিটি আনাচে কানাচে ,
প্রথম মধু রাতের স্মৃতি মাখা বিছানা আসবাবে ।।

প্রথম শিকড় ছিঁড়ে প্রোথিত নতুন মাটিতে
মিশে যায় বনস্পতি হতে চাওয়ার ইচ্ছা বীজ ।
গড়ে ওঠে দ্বিতীয় নাড়ির টান
যা অগ্নির মতো পবিত্র ও ধ্রুব ।।

জীবনের উপান্তে এসে আজ
যেন জানান দিচ্ছে বারবার --
চেতনে অবচেতনে লেপ্টে থাকা
এক অনাস্বাদিত প্রেম --
সপ্তপদীর গভীর শেকড় ।।

@সুজাতা মিথিলা
O3.10. 18

অ-সাধারণ
- শৈলেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

আহা একটুতেই জ্বলে যাই !
আবার একটুতেই গলে যাই!
আরে এটাই আমার স্বভাব ,
ভুলি আমার কতই অভাব।

অভাব সুস্থ মনে চলার ,
অক্ষমতা মুখে কিছু বলার।
তাই শত ভাবনার পরে
থাকি একই জায়গায় পড়ে।

আমরা গড়পড়তা সাধারণ,
মোদের মরণ কিংবা বাঁচন
সব একাকার এ পৃথিবীতে।
পারবে এই চল্ কি উতরিতে?

এখন অ-সাধারণ হতে গেলে
দাও থোড়-বড়ি-খাড়া ছুঁড়ে ফেলে।

অভিশপ্ত
- অঙ্কিতা কর

বারানসীর ঘাটে বসে সন্ধারতি দেখার বড়ো ইচ্ছে ছিলো ।সারাজীবন বেশি ঘুরতে পারিনি আমি।বাবা মারা যেতে পড়াশুনা ছাড়তে হয়েছিল বহু আগেই।তারপর বাবার ছোট্ট দোকানটাকে এখন বেশ বড়ো একটা স্টোরে পরিণত করেছি।সারাজীবন দোকানের পিছনে এত মন দিয়ে ছিলাম বাইরে বেরোনোর সময় পাইনি।
আজ ছেলে বউকে আর একমাত্র নাতিকে নিয়ে আমি এসেছি কাশীতে।
নাতি ছুটে ছুটে এদিক ওদিক করছে। ওকে দেখে আমি কেমন যেন হিংসা অনুভব করছি।আমি বয়স ভারে নুব্জ ।প্রায় মৃত্যুর কাছে এসে দাঁড়িয়েছি, কিন্তু মরতে ইচ্ছে করছে না। বাঁচার ইচ্ছে আমার এক্ষণও শেষ হইনি। পুরাণের দেবতাদের মত যদি অমর হতে পারতাম......
" তাহলে অশ্বত্থমার মত দশা হবে।"
আমার ভাবনার স্রোত কেটে গেলো।
চমকে ঘুরে দেখি এক কৌপিন পরা সাধু দাড়িয়ে আছে। কাশীতে সাধু বড়ো বেশি রকম চোখে পড়ে, কিন্তু এযেন একটু অন্য,আমার মনের কথা কি ভাবে যেন পড়ে নিল এক নিমেষে।
সাধু পাশে এসে বসলো,আমি কেমন যেন বোবা হয়ে গেছি।
সাধু নিজের মনেই বলতে শুরু করলো,"মহাভারতে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শেষের দিকে, কুরু ও পাণ্ডব দুই পক্ষতেই কিছুমাত্র মানুষ বাকি।সে সময়ে অশ্বত্থমা রাতের অন্ধকারে পাণ্ডব হত্যার উদ্দেশে গিয়ে ভুল বশত তাদের পাঁচ ছেলেকে হত্যা করে আসে।পাণ্ডবরা তখন শিবিরে ছিল না,ফিরে এসে শুনে অশ্বত্থমার পিছু ধাওয়া করে। সে সময়ই বিচারবুদ্ধি হারিয়ে অশ্বত্থমা নিজের ব্রহ্ম অস্ত্র ছেরে দেয়।তাকে বাধা দানের জন্য অর্জুন নিজের ব্রহ্ম অস্ত্র প্রয়োগ করে।শ্রীকৃষ্ণ দেখেন যদি দুই অস্ত্র সংঘর্ষ হয় তবে পৃথিবী ধ্বংস হবে।তাই তার অনুরোধে অর্জুন অস্ত্র ফিরিয়ে নিলেও অশ্বত্থমা পারেনি। বাধ্য হয়ে সে নিজের অস্ত্র অভিমন্যুর স্ত্রীর গর্ভস্থ সন্তান পরীক্ষিত এর ওপর প্রয়োগ করে।কৃষ্ণ পরে তাকে বাঁচিয়ে তোলে যদিও ।অশ্বত্থমা বাধ্য হয় নিজের মাথার মণি কৃষ্ণকে দিতে।দ্রৌপদী নিজের সন্তান হারানোর রাগ কিছুটা শান্ত করে মনিটা হাতে পেয়ে।কিন্তু কৃষ্ণ অশ্বত্থমাকে অভিশাপ দেয় অমরত্বের। অর্থাৎ তার মৃত্যু হবে না।সাধারণভাবে শুনলে মনে হবে এ অভিশাপ কোথাও না এতো আশির্বাদ।কিন্তু....."
" কিন্তু কি??? আপনি কি করে জানলেন এ অভিশাপ আশির্বাদ নয়"আমি বললাম

" ওরে মূর্খ গত তিন হাজার বছর ধরে আমি যে সেই অভিশাপ মাথায় নিয়ে বাড়াচ্ছি।যে যে মূর্খ মানুষ অমরত্ব চায় তাদের কাছে আমি এভাবেই যাই তাদের দেখা দিতে চেষ্টা করি বোঝাতে চেষ্টা করি, জন্মিলে সবাইকে মরিতে হবে,এই মানব জন্মের একমাত্র পথ।আর যে পথ লঙ্ঘন করবে....
সাধুর কথা গুলো অস্পষ্ট হতে শুরু করেছে ধীরে ধীরে। তারপর আসতে আসতে
সাধু চোখের সামনে থেকে কেমন যেন হওয়ার মিশে গেলো।

সুখটুকু
- অন্তরা রায়

ঠোঁটে গোলাপি লিপস্টিকটা বুলিয়ে নেয় একবার মিতা | পাশের মহিলা যেন হাঁ করে গিলছে ওকে | মিতার তাতে কোনো প্রকার হেলদোল নেই |মুখটুকু এগিয়ে দেয় যথাসম্ভব জানলার দিকে | বৃষ্টির উত্তাপহীন স্পর্শে ভেজাতে চাইলো নিজেকে | বুক জুড়ে শুষে নিচ্ছিলো নরম মাটির মাতাল গন্ধ খানা |কপালের টিপটা ভেসে গেছে যেন কখন | মুছে ফেললো সিঁদুরের দাগটাও | ব্যাগ থেকে বের করলো আবার সোহমের চিঠিটা | গাল রাখে ওতে | চুমু দেয় পরম স্নেহে | ঠোঁট দুটো যেন স্পর্শ পায় সোহমের কপালের | ঘুম ঘুম আসে | কোলের ব্যাগটা শক্ত করে ধরে নেয় মিতা |

-- উফফ , প্রদীপ্ত লাগছে আমার | ছাড়ো | ছাড়ো ও ও ও ...
চুলের মুটি ঝাঁকাতে থাকে লোকটা |
-- বেরো মাগি এটা তোর রঙ্গতামাশা করার জায়গা পেয়েছিস ?
-- বেশ করেছি |
-- সামনের দেওয়ালের ওপর ছুঁড়ে দেয় লোকটা মিতা কে | কপাল জুড়ে নীল রং | আসলে ঈশ্বর বিষ যেন ঢেলে দিয়েছেন ওর কপালে | এ বিষাক্ত রং তারই প্রতীক |

ট্রেনটা অচেনা এক স্টেশনে এসে দাঁড়ায় | ফাঁকা স্টেশন জুড়ে মেঠো লাল বৃষ্টির জল , তাতে চমকে উঠছে পোস্টের ম্যানম্যানে আলোগুলো |

নীহার প্রদীপ্তর অফিস কলিগ | একটু বেশি আলাপী | ঝকঝকে কথা বলতে অভ্যস্ত লোকটা | যেতে হয়েছিলো মিতাকে বাধ্য হয়ে | আলাপ সারতে নিজে থেকেই এগিয়ে এসেছিলো নীহার | মিতার রূপের প্রশংসা করেন সে , এটাই মিতার অপরাধ সেদিনের | মিতা জানতো পরের গল্প | হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসছিলো ওর | তবু অক্ষত রাখতে চাইছিলো হাসিটুকু |
নীহার হট ড্রিংকের গ্লাসটা আনতে যেতেই দাঁত কিড়মিড় করে ওঠে প্রদীপ্ত |
-- শালা সস্তার মেয়েছেলে , পুরুষ দেখে গা ঢলানো খালি ..
সামনে মিসেস স্যান্নাল আসতেই হো হো করে মুহূর্তে হেসে ওঠে প্রদীপ্ত | " ও..., ইউ আর রিয়েলী লুকিং ভেরি হট এন্ড সেক্সি ম্যাম " | প্রদীপ্তর বুকে হাত রেখে মহিলা অট্টহাস্যে ভরে ওঠেন -- " নটি বয় ......" |
শুনছে , দেখছে মিতা | সেদিন আর কিছু খেতে পারেনি | কোণের টেবিলে একা বসেছিল | কি খেলো না খেলো দেখেনি কেউ | জানতো বাড়ি শুধু ফেরার অপেক্ষা |

অপেক্ষা কতগুলো বছরের | হ্যাঁ , যে করে হোক | মুখবুজে দাঁতে দাঁত চেপে কতগুলো বছর | আত্মহত্যাও করতে গেছিলো মেয়েটা | সেখানেও ফেল করেছে | পারেনি |
বাপের বাড়ি থেকে ফিরেছিল বেশ রাতে |
বাবা মাকে সবটাই খুলে বলতে চেয়েছিলো | প্রাইমারি স্কুলের মাস্টারমশাই মিতার বাবা | বলেছিলেন ....

-- কেন বলিসনি মা আমাদের ? এতগুলো বছর কিভাবে সহ্য করলি তুই ? ফিরে আয় | ডাল ভাত জুটে যাবে ঠিক | আর তোর সুখ চাইনা মিতু | ভেবেছিলাম গরিব বাবার ঘরে ছোটো থেকে এতো কষ্ট পেলি ...... কতবড়ো ভুল যে করেছি সেদিন আজ তা বুঝতে পারছি | লোভ আমারই হয়েছিল | টাকা থাকলেই যে মানুষ হবে তা নয় | অথচ দিব্যেন্দুকে সেদিন ফিরিয়ে দিয়েছিলাম | কিছু তো চায়নি ও | শুধু দাঁড়াতে কিছুটা সময় , এটুকুই দিতে চাইনি |
হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন সত্তর বছরের বুড়োটা |

-- কি কূট বুদ্ধি দিচ্ছ মেয়েটাকে ?
রান্না ঘর থেকে ঝাঁঝিয়েওঠেন করুনা |
-- সব মেয়েদেরই সব পরিস্থিতি মানিয়ে নিতে হয় | এখনকার দিনে দুটো মানুষ মুখের কথা ? বাচ্ছাটা বড়ো হচ্ছে | ওর সমস্ত টা | এর পর স্কুল পড়া এগুলো শুরু হলো বলে | পারবে তুমি ছেলেটাকে দাঁড় করাতে ? দুদিনপর খারাপ কিছু হলে সে দায় নিতে পারার ক্ষমতা তোমার আছে ? বাস্তব বুঝে কথা বলো | কেন ,আমি মানিয়ে নিইনি ? জাঁদরেল দুই ননদ সঙ্গে বিধবা শাশুড়ী | আর তোমার পিসিমা ? তিনি তো একবার দেহ ফেললে আর যাওয়ার নাম নেই | টানা বারো পনেরো দিন চললো | হাড় জ্বালিয়ে ছেড়ে দিয়েছে | সেই কচি বয়েসে ঢুকেছিলাম , আজ ঘাটে যাওয়ার সময় হলো তাও ঘানি টেনেই জীবন গেলো আমার | মরলে বাঁচি |
শোন মিতু ঘরে ঘরে সব মেয়ের এক অবস্থা | গিয়ে দেখ | মানিয়ে নাও | আর কিছু করার নেই | তেমন কিছু হলে পাড়া , আত্মীয় স্বজনদের কাছে মুখ দেখাতে পারবো ? ছি ছি পরে যাবে | সবুর করো , সবুরে মেওয়া ফলে |

মেওয়া তো চায়নি মিতু | বেড়োনোর সময় মা বাবাকে নমস্কার সেরে বেরোলো হয়তো মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছিল শিঁকড়টুকুছিঁড়ে ফেলার |
অনেক্ষন বসেরইলো ওভার ব্রিজের সিঁড়িটায় | বেরিয়ে যাচ্ছিলো একটার পর একটা ট্রেন |
বাড়ি ঢুকতেই দেখলো ওর সমস্ত ফাইল , কাগজ পত্তর সমস্ত মেঝে জুড়ে | ডাইরির পৃষ্ঠাগুলো ছেঁড়া মেঝেতে | ব্যাগ টা রেখে এক এক করে তুলতে লাগলো মিতা |
এক সজোড়ে ধাক্কা দেয় ওর কাঁধে প্রদীপ্ত |
-- দিব্যেন্দু কে ? ওর সাথেই প্রেম মাড়াতে গেছিলি , তাই না ? মালটার সাথে কতদিন ছিলি ?
সত্যি একসময়ে দিব্যেন্দুকে ভালোবাসতো মিতা | আজও বাসে | ডাইরিতে ওর নাম , আর ছেঁড়া ছেঁড়া কিছু কথা | এই টুকুই যা | তাই বা কম কি ?
সোজা প্রদীপ্তর চোখে চোখ রাখে মিতা | প্রদীপ্ত চেনে শরীর | না খেয়ে থাকা , শরীর খারাপ কোনোকিছুই ও শোনে না | চরম কামুক পুরুষ সে | আদরের স্পর্শ সে চেনেনি | সিংহের মতো ছিঁড়ে খাওয়া তার স্বভাব |

-- যাদের সঙ্গে তোমার প্রেম ছিল কতদিন করে ছিলে তাদের সাথে ?
হাত মুচকে দেয় প্রদীপ্ত | চরচর করে ফুলে ওঠে কনুইটা | হাতের রিষ্টায় সার ছিলো না অনেকটা সময় |

ঘুম ভেঙে যায় | পাশের কম্পার্টমেন্টের আলোয় দেখে নিলো চারপাশ | পাশের মহিলা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে | দু ঢোক জল খেয়ে মিতাও চোখ বন্ধ করলো |

ফোনটা বেজে ওঠে , অচেনা নাম্বার |
-- মিতা বৌদি ?
-- বলছি , কে বলছেন ?
-- নীহার বৌদি |
-- হ্যাঁ বলুন | নাম্বারটা পেলেন কোথ্থেকে ?
-- জোগাড় করলাম | দরকার ছিল আপনার সাথে |
-- আচ্ছা , বলুন
-- প্রদীপ্ত আমাদের অফিসের এক মহিলার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে | মহিলা ঠিক নয় | কি বলবো বৌদি , আরো অনেকের সাথেই তার ওঠাবসা | কি করছে প্রদীপ্ত নিজেই জানে | আপনার মতো বৌ থাকতে সে কিনা ......|জানি না | মনে হলো আপনাকে জানানো দরকার | আপনি একটু বোঝান , সময় দিন ওকে , কাছে থাকুন , দেখবেন সব ঠিক হয়ে যাবে |
-- আচ্ছা , ভালো থাকবেন |
ফোনটা রেখে চিংড়ি মাছটা ছাড়াতে রান্না ঘরে চলে যায় মিতু | সোহমের চিংড়ি খুবই প্রিয় | ঝাল কমদিয়ে একটু কষিয়ে রান্না টা করে রাখবে ছেলের জন্য |

প্রদীপ্ত আজ বেশ হাসিখুশি | গুনগুন করে গান গাইছে | চা টা টেবিলে রেখে কাজের মাসির টাকাটা চায় ও |
টিভির ওপর ছুঁড়ে মারে গরম চায়ের কাপটা |
-- বাড়িতে থাকলেই খালি টাকা টাকা | আমাকে খেয়ে শান্তি নেই |
আঁক করে ওঠে মেয়েটা | বাইরের জগৎ বলতে শুধু এই টিভিটুকুই | সেটাও ভেঙে দিলো | বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালে পিছন ঘুরেই দেখে প্রদীপ্ত দাঁড়িয়ে |লক্ষ্য করছে ওকে লক্ষ্য করছে চারপাশ |

চায়গরম চায়গরম .......
চোখ খোলে মিতা | এক কাপ চা নেয় | চুমুক দিতে দিতে খুলে ফেলে সোহমের চিঠিটা |

মা ,
চাকরিটা কন্ফার্ম হোলো | কিন্তু খুব কান্না পাচ্ছে | কতদিন তোমায় ছাড়া | তবে আজকাল একটু রান্না শিখেছি | এবার গিয়ে আমি রান্না করে তোমায় খাওয়াবো , বুঝলে .....? আমার এক বন্ধুও আমার সাথে থাকে | ওর নাম আঁখি | ইয়া বড়ো টানাটানা চোখ | না না অমন করে সন্দেহ মূলক দৃষ্টিতে একেবারেই আমার দিকে নয় , প্লিজ মা | শুধু রান্না ঘরটাই শেয়ার করতে হয়, আর টিভি | আঁখি বেশ ভালো মেয়ে | তুমি জানো ? ও রান্না করে রাখে আমার |নিজে ওদিকে ভালো পারে না , বলে রান্না না করে খাওয়ার সুখটুকু এখন বুঝি সেটাই তোকে দিতে চাই | তারপর ওর কম সিদ্ধ , নুন বেশি রান্না খেতে হয় | প্লিজ মা রান্নাটা ওকে একটু শিখিয়ে দিও | না না ... তুমি যদি ফাইনাল করো তবেই |

আমার মা | তোমায় অনেক আদর

বাবুয়া

বাবুয়া ,
ঠিকানা পাল্টেছি | আঁখিকে নিয়ে আসিস | তোদের দেখার বড় সাধ | খুব ভালো থাকিস তোরা |

তোর মা

ছোট্ট তখন সোহম তবু অনেকটা জানতো | দিনের পর দিন দেখেছে চোখের সামনে | শক্ত করে ধরে রেখেছে মায়ের আঙ্গুল |
-- প্লিজ আমায় তাড়াতাড়ি বড়ো করে দাও ঠাকুর |মাকে আর কষ্ট দিও না |

ব্যাস সম্বল বলতে এইটুকুই |
বেরোনোর সময় প্রদীপ্ত হয়তো বুঝেছিলো |দরজার কাছে দাঁড়িয়ে নিজের কাঁচাপাকা চুলগুলো সাজিয়ে নিতে নিতে আড় চোখে দেখছিলো ওকে |
-- যাবে না , একবার যদি বেরোও ফিরে আসার আর সাহস দেখাবে না কোনোদিন |এ দরজা কিন্তু বন্ধ হবে চিরকালের জন্য |
-- ব্যাগ টা এখানে রাখলাম | চেক করে নিও , তোমাদের কোনো জিনিস আমার সাথে চলে গেলো কিনা |

নোওয়াটাও খুলে রাখলো টেবিলের ওপর | প্রদীপ্ত তাকিয়ে মিতার দিকে মিতা তাকিয়ে রাস্তার দিকে |

সিঙ্গেল তক্তপোশের ওপর সাদা চাদরটা বিছিয়ে নিলো টান টান করে | পাশের জানলায় কাঁচের বোতলে রাখা মানিপ্লান্ট গাছটা কি ভীষণ সবুজ |আজ মিতা এসেছে মুক্ত আকাশ বৃদ্ধাশ্রমে | এখানে কেউ ওকে চেনে না | আর ফিরে যাবে না |
জানে ও, মা দোষারোপ করবে বাবাকে | তথাকথিত আত্মীয় স্বজন , প্রতিবেশী , চেনা লোকজন পাবলিক করতে থাকবে কিছু শিরশিরানি গল্প | জন্ম নেবে অন্য এক মিতুর |
তবু আজ মিতা মজুমদার পেরেছে কাউকে ছাড়াই | বাকি দিনগুলোয় আর নয় | শুধু বাঁচবে নিজের মতো | কেউ আর ওকে গালাগাল দেবে না | গায়ে হাত তোলার সাহস দেখাবে না |কেউ মানিয়ে নেওয়ার শাস্তি গায়ে চাপিয়ে দেবে না |

বাইরে বেরোয় মিতা | সকালের ভিজে ভিজে চারদিক আজ খুব রঙিন | সবুজ ঘাসের ওপর ওপর একঝাঁক অনাথ বুড়োবুড়ির প্রাণ খোলা হাসির শব্দে কেমন করে যেন মুছে যাচ্ছে পুরোনো ধূসর রংগুলো | কত জন্ম ও এতো হাসির খোঁজ পায়নি | এগিয়ে চলে মিতা , পৌঁছে যায় ওদের ভিড়ে ||

পথের শেষে

আব্দুল মান্নান মল্লিক

ঘুরছে জগৎ ঘুরছে বাতাস ঘুরছে আসমান,
পথের ধুলি গুনতে গুনতে দিনের অবসান।
স্মৃতিগুলো বেহায়া সব ফিরে চায় বারবার,
সন্ধ্যাপ্রদীপ উঠলো জ্বলে দুচোখে আঁধার।
মিছামিছি সুখের আশায় সুখ মিলেনা কভু,
মিটিমিটি আশার আলো জ্বলিয়ে রাখি তবু।
পথের শেষে কষ্টে এসে হোচট খেয়ে পড়ি,
তবুও খুশির স্বপ্ন আঁকি রাজার আসন গড়ি।
যেদিকে চায় ধু-ধু আকাশ চোরাবালিয় পা,
ভ্রমের পথে পা বাড়িয়ে তবুও খুজি ডাঙা।
হঠাৎ দেখি কখন যেন দাড়িয়ে পথের শেষে,
দিনের আলো মিলিয়ে এল আঁধার চারিপাশে।
স্বপ্ন আঁকা ছিল যত কলাকৌশল আলপনা,
অবহেলায় সময় হারায় বৃথাই চিন্তা কল্পনা।

সাঁতার
- গাজী হাবিব

জল ছিল আমার; জলাশয় ছিলো না
দীর্ঘতর নদীও নেই, খরায় গেছে তাই বারোমাস
চাষাবাদের আবাদী জমিন
শুষ্কতার নিদারুণ হাহাকারে
ঠোঁট ফেটে রক্ত বের হয় বারংবার
আরশীতে দেখি বিধ্বস্ত চোখের সুরম্য প্রাসাদ
শুধু-- গোধূলি কান্নায় ভেসে যায়
আমার আশ্বিনের নদী, উথাল পাতাল ঢেউ।

মাঝে মাঝে নিঃশব্দ কান্নার স্রোতে
ভেসে গেছে রাখালের বাঁশি; কোজাগরী পূর্ণিমা
উদাস অন্ধকার এসে বসেছে আমার বারান্দায়
আমি বানের জলে সর্বস্বান্ত
ভূমিহীন চাষীর ফসলের ক্ষেত
আমার ভেতরে বসত করে সততা, নিষ্ঠা
সবুজের সমারোহ, জ্বলে দাবানল প্রতিরোধ
মিছিল- সমাবেশের; কুরে কুরে খায় আত্মার
ফসিল উদ্ভ্রান্ত মেঘ।
উন্মাদনায় পুড়ে পুড়ে তামা হয় চোখের ক্লান্তি।

একদিন সীমান্ত ডুবিয়ে অবশেষে অকস্মাৎ নামে
রিমঝিম বৃষ্টি। ভীজে যায় প্রান্তর উচ্ছ্বাসে
চোখের লাজুকতা চীনামাটি শরীর ,
চুলের দেশ বিধ্বস্ত নগর
ভীষণ ফেটে যাওয়া মাটির ব্যকুলতা
অবিরাম ঝড়ের দাপটে ভেঙে যায়
ঘুমের পালংক, নেশার সমুদ্দুর।
প্রকাণ্ড বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে সন্ত্রস্ত পাখি
কাঠপোকা, ঘুণপোকার শহর
হিংস্র জলের ঝাপটায় মুছে যায়
ইতিহাস, বিক্রিয়া শুরু হয় রসায়ণে
ভেসে যায় পলের গাদা, জলাশয়-ডোবা
হাবুডুবু খেতে থাকি জলে পাড়ায়।
কোনো কূল নেই পাশের গাঁয়ে
কোনো তীর নেই অবিরাম বর্ষণে।
তবে কি তলিয়েই যাবো দূর্বাতলে?
কতদিন এলো গেলো জীবনের ঘ্রাণ
শিউলী তলায়, তুলশীর ডালে
তবুও সাঁতার শেখা হলোনা আমার।
অবশেষে ডুবে যাই
ডুবে যাই লোভনীয় আলোর গহ্বরে।

অসময়ের কবিতা
- ইন্দ্রাণী রাহা

------- দেখা হয়ে গেল অনেক দিন পরে
চেনা রাস্তায়, গড়িয়াহাটার মোড়ে । শরীরটা দেখি নেইতো রোগা আরতো আগের মত,
চশমার নীচে চোখের দৃষ্টি বদলে গেছে কত।
ঝাঁকড়া মাথার চুল গুলো সব হাল্কা হয়ে গেছে,
কালোর থেকে সাদাই বেশী মিলে মিশে আছে।
সার্ট-প্যান্টেই ছিল চেনা তাও গিয়ছে বদলে,
ঢোলা পাঞ্জাবী বেমানান হোত
মানাতো না ঠিক আসলে।
লম্বা বলে সবার মাঝে পড়ত নজর আগে,
ঝুঁকে গেছে অনেক খানি
কেমন যেন লাগে।
হোহো হাসি গল্প গান থাকতো লেগে মুখেতে,
টান কপালে আঁকিবুকি কষ্ট হল তাকাতে।
কাছে গিয়ে ডেকে বলি--এই যে
বকম বুড়ি বলতে যাকে,
আমিই সেই মেয়ে যে।
থমকে থেমে মুখের দিকে
রইলো খানিক তাকিয়ে,
বন্ধ হাতের মুঠোখানা
দিলে আমায় বাড়িয়ে।
বল্লে আমায়--অনেক খুঁজে
তোমার দেখা পাইনি
আজকে বলি মনের কথা
যা আর বলা হয়নি--
পাইনি সময় দেব বলে
তোমার হাতে তুলে,
তোমায় লেখা কবিতাটা,
খুঁজে তোমায় পেলে।

Copy right@indrani raha.
24.9.18.

তোমার আহ্বানে
- মিঠু সিং

আবারও বহুবার যেতে চাই
নব অরুনের সোহাগ মাখা ,
তোমার অপুর্ব সঙ্গমস্থলে ...
নদীর সাথে ভালোবাসার দৃঢ় আলিঙ্গনে
স্বর্গীয় শোভায় কানাকানি কথা ,
ঢেউয়ে ধুইয়ে দেওয়া মোহময়ী বালুচর ,
মনের আকুলতা ভাসিয়ে দেওয়ার অবসরে ,
অগাধ জলরাশির মিষ্টি দোলায়...
অবগাহনে বাস্তবের কঠিন ভারমুক্তি
অবলুপ্তি হবে তোমার অতল আহ্বানে.....

দৃশ্য-অদৃশ্যের ভালোবাসা
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

আজকে আর দৃশ্যমান ভালোবাসাটা চাইনা
আজ ফিরে পেতে চাই অদৃশ্য ভালোবাসাটা ,
একদিন হেলায় হারিয়েছি যে ভালোবাসাটা
স্মৃতির পাতায় খুঁজি আজও সে ভালোবাসা ৷

জীবনের ক্রান্তিকালে আজ আমি নীড়হারা
ফিরে পেতে মরিয়া সেই অদৃশ্য ভালোবাসা ,
বাস্তবতার চপেটাঘাতের সঞ্চয়ী অভিজ্ঞতা
দৃশ্যমান ভালোবাসা জুড়ে শুধুই স্বার্থপরতা ৷

মোটা মানিব্যাগে দৃশ্যমান ভালোবাসা মেলে
ভার্চুয়াল কার্ডে পায়ের তলাও দেখি চাটতে ,
তাই আজ স্বার্থপরদের অভিনয়ে ক্লান্ত হয়ে
পর্দার পেছনের সেই ভালোবাসা চাই ফিরে ৷

শর্তে;শর্তেই ভরা থাকে দৃশ্যমান ভালোবাসা
আপন স্বার্থে এই ভালোবাসার কাছে আসা ,
নিঃশর্ত ছায়া হয়ে থাকে অদৃশ্য ভালোবাসা
ধরা যায়না ; ছোঁয়া যাইনা সেই ভালোবাসা ৷

ভালোতো সবাই বাসে শুধুই অাপনার স্বার্থে
স্বার্থ শেষে ভালোবাসা বাঁশ হয়ে বসে থাকে ,
নিঃশর্ত ভালোবাসাই শুধু অদৃশ্য হয়ে থাকে
মোটা মানিব্যাগ ভার্চুয়াল কার্ডও চায়না সে ৷

৩০/০৯/১৮খ্রীঃ

বিত্ত বঙ্কিমত্ব
- শৈলেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী

ব্রহ্মাণ্ডের বিপুলতা -- সৃষ্টি, স্থিতি , বিনাশ
স্বতঃসিদ্ধ সত্য।
জীবনের জটিল আবর্ত - ক্রিয়াশীল।
পরিবর্তন - উণ্মোচণ নেই ,
নেই ফুরোবার ফুলেল ফুরসৎ।
আঁকা বাঁকা রেখা ধরে চলে আসা
অবিরাম স্রোত ভাসা জাজ্বল্যমান।
বিকল্পের সন্ধান অদৃশ্যমান আজও।
কাতরতায় মুহ্যমান মর্ত্যের জন।
মিছে- মিছে এ কাতরতা।
অনাবিলতা পছন্দের কারণ কেন হবে?
বলে কেন? সৌন্দর্য্য , মাধুর্য্য
ধরা বন্ধুর বঙ্কিমতায়। তারই পরে ভাসে ছবি
ষ্পষ্টতরো শাশ্বত সুরে
দূর থেকে কাছে কাছ থেকে দূরে।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget