জুলাই 2018

ওগো মেঘ তুমি আসো-
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়ো;
ভিজিয়ে দাও এই উষ্ণ দেহখানি।
মেঘে মেঘে হাসাহাসি-
ভালো লাগবে খুব ভালো লাগবে।
চিবুক বেয়ে বৃষ্টির জলবিন্দু
গড়িয়ে পড়ুক বুকে-
বৃষ্টি তুমি আসো ভালো লাগবে!
গুরু গম্ভীর গর্জন
কাঁপিয়ে দিতে আমার হৃদয়,
তুমি আসো বৃষ্টি-ভালো লাগবে।
অন্তরে তরঙ্গীত সাগর-
মেঘ মল্লিকা বনে।
বাদল হাওয়া ঝড়ো ঝড়ো মনে,
তুমি আসো বৃষ্টি ভালো লাগবে।
ঘনঘোর বরিষায় ছেড়া
পাপড়ি পাতা,ভেসে যাবে কোথায়,
জানি না সেটা-
তবু তুমি আসো ভালো লাগবে।

***********
তাং: ‌৩১/০৭/২০১৮ ইং
১৪ শ্রাবণ,১৪২৫ বাংলা
সকাল: ৮.৩৪
নিজ বাসভবন,ধ‍র্মনগর
উত্তর ত্রিপুরা, ভারত

জাতীয় কবি
- সৌরভ দুর্জয়

কারাগার বারবার হয়েছে তোমার আবাসালয়,
সয়োছো যাতনা নিত্য কতো না তবুও করোনি ভয়।

ইংরেজ বেনিয়া নিয়েছে কিনিয়া কতো ধনীর মাথা,
তুমি হে বীর উচু করে শির বলেছো উচিত কথা।

ক্ষুধার জ্বালায় যৌবন বেলায় হয়েছিলে শ্রমিক,
যৌবন কালে সুখ পাছে ফেলে হয়েছো দেশ প্রেমিক।

লিখেছো গজল গেয়ে খোদার ফজল ওহে মরমী,
তোমার গানে সুর বাজে মনে শান্তি দেয় পরম-ই।

কবিতার ভাষা দেখায় আশা নির্যাতিতদের মুখে,
কেমন করিয়া জীবন ভরিয়া থাকবে তারা সুখে।

সূর্যের রোদে চেতনার বোধে দেখি তোমারই মুখ,
তুমি আমাদের জাতীয় কবি গর্বে ভরে ওঠে বুক।

৩১/০৭/২০১৮
ফরিদপুর।
**ছন্দ :

শিক্ষা গুরু জেগে উঠো,
সমাজটাকে আজ তাকিয়ে দ‍্যখো।
জাগো গুরু! জাগো তুমি,
বিদ্যালয় যে তোমার কর্মভূমি।
শিশুর মুখে কচি হাসি-
প্রাণটি ভরে যে ভালোবাসি।
দেশের জাতির চিন্তা গুলো,
সফল করবো জ্বালিয়ে আলো।
পড়তে নারাজ চপল শিশু,
শিক্ষক তাকেই শেখান কিছু।
গল্প গুজব কথা বলা,
খেলার ছলেই শিখিয়ে ফেলা।
জীবন পথের কালো আঁধারে,
ভাসিয়ে দিও জ্ঞান সাগরে।
শেখার জানার রঙিন নেশায়,
জীবন ভরে উচ্চ আশায়।
তোমার আর্দশে চলা শুরু,
ধন‍্য তুমি শিক্ষা গুরু।

*********
নিজ বাসভবন, ধ‍র্মনগর
উত্তর ত্রিপুরা, ভারত
তাং: ১১/১১/২০১৭
সকাল-৫.২৬

আলপিনে জড়ানো জ্যোৎস্না
- উদয় শংকর দুর্জয়

জোস্নার আলপিন বিঁধে আছে অযুত কাল ধরে, রেটিনার চারপাশে;
একফোঁটা কান্নার হ্রদে, ভেসে আছে নিস্তব্ধ পাঁচতলা জাহাজ।
দুপুরের রঙ ছুটে আসে বিভ্রান্তি ফেলে, একপাল নীল ঘোড়া হয়ে;
প্রত্যাহ আকাশ ভাঙে কলতান রুখে, নিশ্চুপ ক্লান্তির ফিনিক্স বেহাগ।

পাল্টাতে এসে মৃদু কলরোল, থেমে গ্যাছে উল্লাসের দল;
ভাব্বার বিষাদ লিখে, ফিরে গ্যাছে সোনালি আলবাট্রাস।
কখন যেন স্টারলিং সুর চুরি করে গায়, স্বর্নচাপার গান,
এক অষ্টাদশী রোজ তাড়িয়ে বেড়ায় নিরুদ্দেশি পেগাসাস।

ত্রিকোণী রোদ্দুরে ভেজাতে আসা অঞ্জলির গৃহদ্বার,
বিববর্ণ বেহালায় পড়ে থাকে বিভ্রমের কলতান।
আর চাইলেও নিকষ ফেরি, উড়ে আসবে না, ছেড়ে পাটাতন।
এক অন্যযানে, সমুদ্র থেকে তুলে নেবো, ধুলো সমেত রুপোলি মনিহার।।

অনেকক্ষেত্রে সমুদ্র কথা শোনেনা
- মোশ্ রাফি মুকুল

অনেকেই দক্ষিণের হাট হতে সমুদ্র কিনতে চায়
চুম্বক দন্ড দিয়ে নামিয়ে আনতে চায় মাথার উপরের আকাশ-
কিংবা মগজের বহুমুখী ছুরিতে
খুন করে ফেলতে চায় সব সুন্দর!
পৃথিবীর সব উৎস;
মখমল ভল্ট খুলে
তন্নতন্ন করতে চায় কিলোপেট্রার গহনা।

অনেকক্ষেত্রে সমুদ্র বিক্রি হতে চায় না
অনেকক্ষেত্রে আকাশ কথা শোনেনা।

আবার-
দিগন্তরেখা রেখা থেকে কিছু কিছু খুনি আবীর নিয়ে নেয় হন্তকগণ
জোৎস্নার কুহুক কণ্ঠে মিশিয়ে দ্যায়
ব্যক্তিগত দায় ও অশ্লীল বিষ।
সুখ,দুঃখ আর সুন্দরকে মিশিয়ে ফ্যালে নিজস্ব অম্লে।

১৯/০৭/২০১৮.

সাদা কালো ক‍্যামেরার ছবিগুলো দেখিনা,
শুধু রঙধনু মেশানো প্রজাতি ডানা!
দূর্বাঘাস মেঠোপথে আমাদের বাড়ি,
খেঁজুরের গাছে বাধা রসের হাঁড়ি।
রবি রশ্মি ভেজা পাকা ধান ক্ষেত,
প্রাইভেট মাষ্টার হাতে দিতো বেত।
কাঠের দরজায় ছিলো বাঁশের সেঁউতি,
জাল নিয়ে বের হতাম হাতে ডেউটি।
কালো কালো ঝোপ গুলো ভূত মনে হতো,
গাছে ঝুলা বাদুরেরা ভয় কতো দিতো!

***********
তাং: ‌২৯/০৭/২০১৮ ইং
১২ শ্রাবণ,১৪২৫ বাংলা
সকাল: ৮.০০
নিজ বাসভবন,ধ‍র্মনগর
উত্তর ত্রিপুরা, ভারত

আর নয়
- সৌরভ দুর্জয়

মানুষ হাসে ফুল হাসে হাসে হায়েনা,
সব হাসি তুলে ধরে মনের আয়না।

কারো হাসি লাগে ভালো কারো মন্দ,
যেমন সমান নয় সব ফুলের গন্ধ।

মৃত্যু দেখে হাসে বলো কোন প্রাণী?
বিবেকহীন হিংস্র পশু সকলে জানি।

এখন দেখি কেউ হাসে হো হো করে,
আত্মাগুলো কষ্ট পায় সড়কে ঝরে।

বিবেক দাও বুদ্ধি দাও ওগো প্রভু,
আর নয় এই মৃত্যু আবার কভু।

৩০/০৭/২০১৮
ফরিদপুর।

**ছন্দ: স্বরবৃত্ত ( ৪+৪+২+২)

ভারতের ত্রিপুরা রাজ‍্যের উত্তর ত্রিপুরা জেলার পূর্ব হুরুয়া গ্ৰামে ৬ এপ্রিল ১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে জন্ম গ্ৰহণ করেন।পিতা শ্রী ফুলমোহন সিংহ, মাতা শ্রীমতী হরিপ্রিয়া সিংহের একমাত্র পুত্র,তিন বোন মনোরমা, মঙ্গলা ও মমতা।কবির শিক্ষাগত যোগ্যতা-বি.এ.সান্মানিক(দর্শন শাস্ত্র),ডি.এল.এড্।এছাড়া তিনি এডুকেশনাল লীডারশীপ সহ চারটি গুরুত্বপূর্ণ কোর্স আই.আই.টি মাদ্রাজ থেকে করেন।কবি পত্নী সীতা সিনহা এবং দুই কন্যা মধুমিতা, মধুশ্রী।বাল‍্যকাল থেকে কবি বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ও বাংলা ভাষায় কবিতা ও গল্প লেখা-লেখি নিয়ে ব‍্যস্ত থাকেন।কবি মধু মঙ্গল সিনহা একজন যুবা কবি, লেখক, সমাজসেবী,চলচ্চিত্র অভিনেতা; পেশায় শিক্ষক। তার লেখা 'বংশীধ্বনী','হজাক','সমুদ্রমন্থন','বিবেকতারা','সন্ধিক্ষণ','উত্তরণ','শব্দনীল' ইত্যাদি ম‍্যগাজিনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়।অন‍্যদিকে কবি 'পহর', 'সঙ্ঘ' এবং 'মঙ্গলদীপ' সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। 'নিঙশিং হপনে'-(বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী ভাষায়) প্রথম কাব্য গ্ৰন্থ,কবির দ্বিতীয় কাব‍্যগ্ৰন্থ 'নিক্কন'।কবির তৃতীয় কাব‍্যগ্ৰন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় আছে।

জানিনা সে ফুলে গন্ধ ছিল কিনা,
ভালবেসেছি সে যখন ছিল অচেনা।
মনের গন্ধেই মোহিত ছিলাম-
অনুরাগে খোঁজে সেটাই পেলাম।
কথা হয় তার সাথে গভীর রাতে,
জাগায় মোরে ভোর-প্রভাতে।


হৃদয় জুড়ানো ফুলের হাসি-
তাতেই তারে ভালোবাসি।
ঠাই দিয়েছে আমায় সে যে,
মন মাতানো পরীর দেশে।
ফুলের ডালে ভ্রমর কত,
চোষতে রেণু ব‍্যস্ত শত।

সুভাষ ভাসে আকাশ পানে,
ফুলের কথা প্রাণের মনে।
পাঁপড়ি গুলো মুদে নিও,
বুঝে শুনে মধু দিও।

***********
তাং: ‌২৮/০৭/২০১৮ ইং
১১ শ্রাবণ,১৪২৫ বাংলা
রাত: ১১.০৯
নিজ বাসভবন,ধ‍র্মনগর
উত্তর ত্রিপুরা, ভারত

শ্রাবণ দিনে
- ইরাবতী মণ্ডল

এমনই শ্রাবণে
ঘোর বরিষণে
সেই সে শিপ্রা কূলে,
ভ্রমিছিনু আমি
সাথে ছিলে তুমি
সে কথা কি গেলে ভুলে ।

জানি না কি মোহে
জড়াইনু দোঁহে
হাতে ছিল হাতখানি,
ঝরঝর ধারা
ঝরে পাগলপারা
বায়ুবহে খরশানি।

নিপবন শাখে
ডাহুকী যে ডাকে
প্রিয় মিলনের আশে,
কালোমেঘ বুকে
বিজরি চমকে
রাই যথা শ্যামপাশে।

আবার ও শ্রাবণ
তেমনি ঘন ঘন
নাই কাছে প্রিয়তম,
বিরহ বাতাস
ঘনবহে শ্বাস
বন্দী যক্ষ সম।

25.07.2018

তুমি বন্ধু তুমি সখা,
তুমি গুরুদেব তুমি দেবতা।
তুমি সূর্য তুমি জোৎস্না,
তুমি আকাশ তুমি ধ্রুবতারা।
আঁধার পথে আলোক জ্বেলে,
করেছ দীপাবলী অমাবস্যা রাতে।

এই সন্ধ্যা কালে তুমি,
বলো বিদায় চাহ কেন?
কম্পিত হৃদয়ে জরিয়েছি তোমারে,
বাধন অটুট -হৃদয়ের বন্ধন।

ক্ষমা করো মোরে গুরু,
ছাড়িবো না তুমায় আর!
যত দিন জীবন রবে,
রহিবে তুমি বন্ধু অন্তরে।

তুমি আর্শীবাদ করো যদি,
শুধু পদধূলি দিও মোরে।
অশ্রু সজল আঁখি দুটি,
চরণেতে যাতে শুধু রাখি।

********

তাং: ‌২১/০৭/২০১৮ ইং
০৪ শ্রাবণ,১৪২৫ বাংলা
রাতঃ ৯.৪২
নিজ বাসভবন,ধ‍র্মনগর
উত্তর ত্রিপুরা, ভারত

আমার বর্ষাকাল

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বেশ কয়েকদিন ধরে অবিরাম বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। কখনো কখনো বেশ জোর, বাকি সময় সর্ষে চালুনে।
বাড়ির সম্মুখেই একটি আম গাছ। এই আম গাছে থাকে আমার খুব পরিচিত এক ঝাঁক শালিক পাখি। আজকেও সারারাত বৃষ্টির জলে ভিজেছে এরা। ভোরের বেলায় ওরা যখন আমার অপেক্ষায় প্রহর গুনছে, আমি তখন শীতেল পরিবেশে ঘুমিয়ে বিভোর।
আমার ঘুম ভাঙতে দেরি হলে এমনিতেই ওদের তর সয় না। ওরা কিচিরমিচির শুরু করে আমার ঘুম ভাঙাই। তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে বারান্দায় মুড়ি ও ভাত ছড়িয়ে দিই। সঙ্গে-সঙ্গে গাছের যত শালিক নেমে আসে আমার বারান্দায়, কেউ-কেউ খোলা দরজা পেয়ে ঘরেও ঢুকে পড়ে। খুঁটে-খুঁটে ওদের যেমন ইচ্ছে খেয়ে আবার গাছে ফিরে যায়। সারাদিন গাছ, আর আমার বারান্দা, এই হচ্ছে এদের কর্মস্থল। যখনই খিদে পায় চেঁচামেচি শুরু করে দেয়। এখন আমরাও সেটা বুঝে গেছি। যতক্ষণ খিদে না মেটে, চেঁচামেচি করতেই থাকে। খিদে মিটে গেলেই শান্ত।
বর্ষার শুরু থেকে প্রতিদিনের এই নির্ধারিত নিয়ম যেন বিক্ষিপ্তে বয়ে চলেছে।
আজ ঘুম ভাঙতেই ততক্ষণে বৃষ্টির সাথে ধোঁয়াটে আবছা আলো পৃথিবীতে পৌঁছে গেছে। অদূরে মেঘের ঘোরাফেরা। গাছের ডালে-ডালে সিক্ত দেহে শালিকগুলো আমার উপর অভিমান করে বসে আছে। সারা রাত্রি ভিজেছে কিনা, তাই শীতের প্রকোপে আজ ওদের মন চাইছে না চেঁচামেচি করে আমার ঘুম ভাঙাতে। পালকের মধ্যে চঞ্চু গুঁজে সব বসে আছে।
প্রতিদিনের মতো আজও বারান্দায় মুড়ি ছড়িয়ে দিলাম, দু-চারটে পাখি বিরাগে খেয়ে ফিরে গেল। বাকিরা সব বসেই রইল।
এ-তো গেল আমার শালিক বন্ধুদের কথা।
প্রিয় পাঠক পাঠিকা, চল যায় এবার আমার বর্ষাকালের পুকুর ও আশপাশের পরিবেশে। বাড়ির চারিপাশে বিভিন্ন প্রকার গাছ-গাছালিই ভরা। এখানে জানা-অজানা নানান জাতি পাখিদের বসবাস।
বাড়ির সামনে আম গাছের নীচেই আমাদের একটি বড় পুকুর। পুকুরটির এক তৃতীয়াংশ পানাই ভরা। বৃষ্টি-বাদলের দিন, জল ভরে গেছে কানাই-কানাই। পুকুরের বড়-বড় পানাগুলি এখন ডাঙা ছাড়িয়ে উপছে উঠেছে।
দু-চার ফোটা বৃষ্টি পড়লেই মাছেদের আনন্দ নৃত্য আর ধরে না।
ঈশাণ কোণের উত্তর পাড়ে কলা, কাঁঠাল, লেবু আতা, বেল, আমলকী সেগুন ছাড়াও আরও কতকি। নীচে জলের উপর জানা-অজানা লতাপাতায় ভরে গেছে । এর মাঝে-মাঝে পানাগুলো ও বেশ বড় হয়ে উঠেছে। এক কথায় বলতে হয় জল-জঙ্গল।
এখানে চেনা অচেনা হরেক রকম জলজ পাখির বসবাস। মাঝে-মাঝে দু-চারটে যাযাবর পাখি ও দেখা যায়। কায়েম নামে একপ্রকার পাখি ও ডাহুক পাখি বর্ষাকালে সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে পানার ফাঁকে-ফাঁকে চরে বেড়াই। মানুষের সাড়া পেলেই লতা-পাতাই লুকিয়ে পড়ে।
জলজ পাখির বাচ্চা সাধারণত বর্ষাকালেই আমরা দেখতে পাই।
ডাহুক পাখিদের মতো কায়েম পাখিদের এখানে বারোমাস দেখা যায়না। কায়েম পাখি একমাত্র বর্ষাকালেই এখানে দেখা যায়। হয়তোবা ডিম ফোটানোর উপযুক্ত পরিবেশ, নইতো বাচ্চা বড় করে তোলার নিরাপদ জায়গা বলে মনে করে , তাই এরা এই সময় এখানেই আসে।
এরা কোথায় থেকে আসে আর বর্ষার শেষে কোথায় যে যায়, আজও কেউ বলতে পারেনা। পাখিটি দেখতে বেশ বড়-সড়। দেহের তুলনায় ঠ্যাঙ দুটো আরও বড়। এদের ডাকের ও বেশ বৈশিষ্ট্য আছে। বর্ষার শুরুতে যখন আসে, তখন মুখে ডুগ-ডুগ শব্দ তোলে। অবিকল মনে হয় কোথাও বাঁদর নাচ এসেছে, তাই ডুগ-ডুগি বাজছে।
এই পুকুরে বর্ষাকালে আরও এক ধরণে পাখি দেখা যায়। এই পাখিটি দেখতে অবিকল হাঁসের মতো। এর নাম না জানাই, আমরা বুনো হাঁস বলেই চিহ্নিত করেছি। বাকি সময় কোথায় থাকে, কে জানে!
এরা মাঝ পুকুরে ফাঁকা জলের উপর খেলে বেড়াই। কেউ কেউ সঙ্গে বাচ্চা নিয়ে চরে বেড়াই। বাচ্চাগুলো দেখতে অবিকল হাঁসের বাচ্চার মতো । একবিন্দু ও চেনার উপায় নাই। এরা মানুষের নাগালের অনেক দূরে থাকে। একটু বিরক্তিকর শব্দ পেলেই উড়ে পালাই , সঙ্গে-সঙ্গে বাচ্চাগুলো ছুটে গিয়ে পানার ভিতরে লুকিয়ে পড়ে।
তাছাড়া বারোমেসে পানকৌড়ি তো আছেই। তবে বর্ষাকালের মতো, এত মনোহর দৃশ্য অন্য সময় দেখা যায়না।
পুকুরের জলে কেউ-কেউ ডুবছে-উঠছে, আবার কেউ-কেউ জল ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে। কেউবা পুকুরের উপর চক্র মারছে। বৃষ্টি বীরামের মাঝে কেউ পুকুর পাড়ে ঢিবির উপর, কেউবা পাড়ের গাছে মগডালে ছাতার মতো ডানা মেলে গা শুকাচ্ছে।
গাছে-গাছে মাছরাঙা পুকুরের উপর দৃষ্টি দিয়ে বসে-বসে বৃষ্টির জলে ভিজছে। সুযোগ বুঝে ঝপাং করে জলে ঝাঁপ দিয়ে মাছ ধরে নিয়ে সোজা গাছে গিয়ে বসছে।
এই মনোহর পরিবেশের সাথে বন্ধুত্ব রেখে নিজেকে ধরা দিতেই আমি ব্যস্ত, তাই লিখালিখি আমার আর ভালো লাগে না।
দেখতে দেখতে সারাদিন-টা কিভাবে পার হয়ে যায়, কিছুই যেন বুঝতে পারিনি।
কবিতা লিখব? ভাবতে পারিনা, গল্প লিখব? মনে আসেনা।
বাড়িতে বসে বর্ষার চিত্তহারী উপভোগ করা ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগেনা।

আমার অনুরাগী যদি কেউ হতো,
আকাশটা মনে হয় রাঙিয়ে দিতো।
দাঁড়িয়েছি আজ প্রথম আকাশের নীচে,
হয়তো তাই আমি গেছি আজ বেঁচে।
কবিদের কথা আর ফোনের বার্তা,
বেঁটে মানুষের নাগাল হয়না সেটা।
ক্ষনিকের সুখ খোঁজে গঙ্গার তীরে,
ভালোবেসে বসে পড়ি বালুকার 'পরে।
জানতো যদি কেউ দুঃখের কথা,
পেতাম না এমন অজুহাতে ব‍্যথা।
উচ্চতায় যারা আজ মহীরুহ সমান,
অকারনে স্নেহ পায় আছে প্রমাণ।
নক্ষত্র যারা রাতে মিটমিট জ্বলে,
তারাও সেজেছে যেন স্বদলে বলে।
সুবর্ণা সুশোভিতা উচ্চ চেতনায় রাসমণি,
আঁধারে প্রফুল্লিতার তরে ডুবিল দিনমণি।

***********
তাং: ‌২৭/০৭/২০১৮ ইং
১০ শ্রাবণ,১৪২৫ বাংলা
রাত: ০৯.১৬
নিজ বাসভবন,ধ‍র্মনগর
উত্তর ত্রিপুরা, ভারত

এই যে ভীরুতা
- মোশ্ রাফি মুকুল

এই যে ভীরুতা,
তোমার সম্মুখে অবনত হওয়া-
হাঁটু গেড়ে তোমাকে চাওয়া।

এই যে চোখে চোখ রাখা,
স্বপ্নের বীজ বুনে দেয়া-
ভাষাহীন উপন্যাসের প্লটে।

এই যে তোমার হতে চাওয়া,
এই যে অগাধ স্পর্ধা-
ছুঁয়ে দেবার লিপ্সা
গহিন অতল জল।

এই যে নৌকায় পাল তোলা,
দিকহীন সমুদ্রে
ভেসে যাবার সংকল্প;
এই যে খুঁজতে থাকা
বেভুল পথের কম্পাস।

প্রেমিক প্রেমিকারা বিনয়ী হলেই
সুখের বন্দর স্পর্শ করে
জীবন ও
ভালোবাসার সারাংশ।

এই যে ভীরুতা
এর নাম দেয়া যায়
সুগভীর প্রেম ও সমর্পণের আখ্যান।

১৮/০৭/২০১৮.

পূঁজারীর পাঁচালী
- সৌরভ দুর্জয়

এখন আর আসো না বুঝি নাট মন্দিরে,
পিরোজপুরের কদমতলা বাজারের পাশে;
রাস্তা ঘেসে গড়ে উঠা যে মন্দির,
যেখানে আমার যাওয়া নিষেধ থাকলেও;
তোমাকে দেখা নিষেধ ছিলো না।

আরতিতে, ভজনে,সংগীতে,নৃত্যে কোথায় ছিলে না তুমি?
হরিনী চোখে, নিষ্পাপ মুখে,মায়াবী বুকে, শুভ্র বসনে,
তুমি মন্দিরের ভক্ত ছিলে এক নিষ্ঠ।

কোনো দিন বোঝো নি তোমার এক পূঁজারী
মন্দিরের বাইরে ফুল নিয়ে করতো অপেক্ষা,
দেয়া হয় নি একটা ফুলও কোনো কালে;
দেবী তোমার গলে, নিরুপয় পূজারী ভাসায় দিতো
সেই ফুল রাতের আঁধারে বলেশ্বরের জলে।

কোনো শিবরাতে বলোনি আমার নাম, চাওনি আমায় পেতে,
তাই একদিন ব্যাঘাত ঘটলো মন্দিরে তোমায় দেখতে,
ডাক্তার বিডি হালদার চোখ মেপে চশমা দিলো এঁটে,
ডাক্তার সুনীল কৃষ্ণ বল ভিটামিন দিলো লিখে
মাসুর মা শুরু করলো কচু শাকা আর মশুর ডাল রান্না,
বাজার থেকে কেনা শুরু করলাম মলা ডলা মাছ,
চোখের জ্যোতি বাড়বে বলে;তোমাকে দেখবো বলে,
তবু তোমার শুভ্র বসন এ চোখে আর দেখা হলো না,
নাকে নেয়া হলো না আরতীর ধূপের ঘ্রাণ,
কানে এলো না ভজনগীতি।

কালে ভাদ্রে ওদিকে গেলে অজয় দা, নরাণ দা,কিংবা
শাহ্ আালম ভাইর কাছে জিজ্ঞাস করি তোমার কথা,
কেউ দেয় না উত্তর; ওরা রাখে না তোমার খবর;
আমার মতো,সবাই ব্যস্ত ব্যবসা নিয়ে,যে যার মতো।

হয়তো তুমিও ব্যস্ত শিব পূজায়;সংসার গোছানো নিয়ে,
সময় কোথায় পূজারীর ফুল নেয়ার,
নাট মন্দিরে আসার।

উদাসীন মনের কাব্য বইতে আছে ।
২৪/০৪/২০১৮

আলোর হাইস্কুল
– মোশ্ রাফি মুকুল


সাদাকালো অন্ধকারে ছড়ানো প্রাচুর্য-
মুক্তা ঝরানো দূর্বাঘাসের মেঠোপথ,
প্রথম আলোর বিনয়ী রশ্মিজুড়ে সাদা ইশারা-
সকালের চৌকাঠে পা রাখে আলোর রথ।


কালোর মাঝেও ভালো দেখি,সূর্যের হাসি-
পথের দুধারে দেখি রঙিনফুল,
শুধুই কি দেখে যাবে অপরিণামদর্শীতা
দেখবেনা আলোর হাইস্কুল?


আঁধার ছেঁকে যদি না আনতে পারো
অলিন্দ ভরা দিশা,
কি করে কাটবে বলো বিদিশারাত
কাটবে কি করে অমানিশা?

ভুল
- মোঃ তারেক আনোয়ার কিরন

ভুল তো ভুলই ছিলো ভুল ছিল কাছে আসা,
জীবনের বড় ভুল ছিলো আমার তোমায় ভালবাসা।

ভুল মানে অপ্রত্যাশিত কিছু জীবনে ঘটে যাওয়া,
এক্ষন কি সম্ভব এতোটা পথ পাড়ি দিয়ে তোমায় ভুলে যাওয়া?

ভুল মানুষের সাথেই কেন দেখা হয় জীবনে?
ছিলো তো আরও কতো মানুষ মায়ার এই ভূবনে ।

ভুলের সাথে নেই আমার বন্ধুত্বের বন্ধন,
করিনা ভুল তবু আছে বিশাল শাস্তির আয়োজন।

সইতে পারি কখনো কখনো হারিয়ে ফেলি বল,
কস্টের তীব্রতায় মাঝে মাঝে ঝড়ে যায় নোনা জল।

ভুলতো ভুলেই হয় তবে কেন অসহ্য যন্ত্রনা পেতে হয়?
এতোটা ভালবেসেও কেন দূরে সরে যেতে হয়?

কি নামে লিখবো বল সুখের যে স্মৃতি পেয়েছি তোমার ভালবাসায়?
ভাললাগে ভাবতে আজোও তবু যেন লিখতে হবে ভুলের খাতায়।

নেই কিছু আজ বলার হারিয়ে গেছে সঙ্গী ছিলো যে পথ চলার,
তুমি সুখি হও ভাল থেকো তোমার সুখেই সুখ যে আমার ।

মনে যদি পড়ে গো আমায় আমার ভুল গুলোই করিও স্মরণ,
ভালবেসেছি,ভালবাসি, ভালবাসবো যতোদিন আসবে না মরণ।

হায়রে কপাল আমার হায়রে বিধির লিখন,
আজ সে পরের চেয়েও পর ছিলো যে আপনের চেয়ে আপন।

নির্লিপ্ত বেদনা
- জুয়েল মিয়াজি

বিবাহ বিষয়ক কথাবার্তা হচ্ছে বর পক্ষ আর কনে পক্ষের মধ্যে।
বরের মা : সোনার অাংটি বাঁকা ভালো।বুঝলেন ভাবী,আমাদের ছেলের আর কি দোষ,কালো! আর বয়স না হয় একটু বেশিই।আর চেহারা! অারে কি যে বলেন না ভাবী ব্যাটা মাইনষের চেহারা দিয়ে কি করবেন।চেহারা ধুয়ে পানি খাবেন না কি।হা হা। আরে কই গো কুলসুমের মা পান দিয়া যায়ও।সাথে মিষ্টিও। শুভ কাজে একটু মিষ্টি মুখ করে নিতে হয়।
কনের মা: (কুলসুমের মায়ের হাত থেকে পান এনে মুখে একখিলি পান নিয়ে অস্পষ্ট স্বরে কনের মা বলতে লাগলেন)তা ঠিক অাছে ভাবী।কিন্তু মাইয়া আমগো উঠতি বয়সের।সুন্দরী মাইয়া, এলাকার কত রাজপুত্রের নজরে পরেছে।ফেসবুক টেসবুক চালায়, সেয়ানা হইয়া গেছে।বুঝেনই তো! স্টাইল করা পোলাই তো এহনকার মাইয়ারা বেশি পচন্দ করে । আপনার ছেলের সাথে বিয়ে হলে যদি মানিয়ে না নিতে পারে?
বরের মা: নাহ! কিসব অাকথা সাকথা বলেন ভাবী। পারবে না কেন।আল্লাহ'র রহমতে ছেলে আমার মাসে পঞাশ ষাটের মত ইনকাম করে।বউয়ের আদর যত্নের কমতি হবে না।কমবয়সী পাত্র সংসার সম্পর্কে কি বুঝবে? সারাদিন মদ জুয়ার জন্য যৌতুক চেয়ে মেয়েকে জ্বালিয়ে ছাড়বে। তাই বলছি আপনার মেয়ের জন্য আমার ছেলেই পারফেক্ট ।সুতরাং রাজি হয়ে যান,ভাবী।
কনের মা রাজি হলেন।বরের মায়ের যুক্তির কাছে কনের মা হার মানতে হলো । তাই বিয়ে হলো পঁয়ত্রিশ বছর বয়সি অামিরের সাথে সতেরো বছরের রাবেয়ার।এরপর বিদায়ের সময় বিয়ে পরবর্তী শুরু হলো কান্নার প্রতিযোগিতা। প্রিয় বিদায়ে বাড়ির সবাই কাঁদতেছিলেন। কনের ষোড়শী রূপসী বোনটিও কাঁদতেছিল। বিদেশি নায়কদের পোস্টার দিয়ে সাজানো ড্রেসিং রুমে বসে মেয়েটি মূলত কাঁদছিল অন্য কারণে।
লেখক
জুয়েল মিয়াজি।

চঞ্চল মন শুনেনা বারণ, জানিনা গো কি কারণ?
প্রথম দেখাতেই মন করেছো যে হরন!
সকাল-সন্ধ্যে নিশীতে খুঁজে বেড়াই, তুমি-ই তার কারণ
অহনা – মনে পরে তোমার, বন্ধুরা মিলে সবাই করেছিল বরণ।

তোমার মায়াবী চোখে হয়েছিলো প্রথম শুভদৃষ্টি
যখন চৌমুহনীতে রিক্সায়-রিক্সায় মোরা সামনা-সামনি!
চুপি-চুপি হেঁটেছিলাম পুুষ্পাঞ্জলির রাস্তায় পিছু-পিছু
ভালোবাসার তরিতে ঢেউ বুঝেছিলাম কিছু-কিছু।

শত প্রতিকূলতা পাড়ি দুজনের-ই মনের জোরে
পাখির কলরবে ঘুম কত-না, হারিয়েছিলো যে ভোরে।
ভালোবাসি অহনা- জানুক, ঐ পৃথিবীর সব হিংসুটে
ভালোবাসা নাকি কিনবে, পয়সাওয়ালারা কাগজের নোটে।

তারা ভরা রাতে, অহনা মনে পড়ে কি?
হাজারো গল্পের ভিড়ে দুজনের কতরকম খুনসুটি!
কখনো মনে হয়নি, আমার আগেই হবে ছুটি তোমার
ভালোবাসায় অভিশপ্ত প্রেমিক, অহনা- আজ তোমার-ই কুমার।

তোমার মৃত্যুর পর অহনা- পুনরায় বিয়ে সময়ের দাবি
কিভাবে তোমায় ভূলে আমি অন্যের কথা ভাবি?
তোমার জায়গায় অন্য -জীবনের নতুন নাকি চাবি!
আজ ভালোবাসি তোমায়, অহনা- তাই তুমি-ই সবচেয়ে দামি।

বি.দ্র: [ সম্পূর্ণ কাল্পনিক চিন্তাধারায় লেখা কবিতাটি। ভালোবাসায় ঘর বাঁধলেন, কিছুদিন পর ভালোবাসার মানুষটি পরপারে পাড়ি জমানোর পরেই
কিছু মানুষ ভালোবাসাকে অস্বীকার করে, নিজের জীবনের সাথে অন্য একজনকে সাথী হিসেবে বেঁছে নেন, কিন্তুু কেন? এটাই কি সত্যিকার, ভালোবাসা?]

আমিও ভূমিষ্ঠ হবো
- মোশ্ রাফি মুকুল

অন্ধকারও সত্য।
যার অস্তিত্ব আছে
যাকে অস্বীকারও করা যায়না।
আলো আর আঁধারের সঙ্গমে যে মথ-
আবারও ভূমিষ্ঠ হবো আমি,
ভূমিষ্ঠ হবে প্রজাপতি,ফুল-
অন্ধকারও জিতে যায়,
মানুষ আঁধারকে পরাজিত হতে দেখেছে।

নিরাশ হয়োনা- নৈরাশ্যবাদী সময়ের দুর্বিপাকে,
এ পৃথিবী শুধু নিষ্পাপীদের আবাসস্থল নয়
এখানে মাঝে মাঝে আসে এলিয়েন
পাপীদের প্রেতাত্মা।

অন্ধকারকে স্বীকার করো-
অন্ধকারকে অস্বীকারও করো।
অন্ধকারকে শিকার করো
এ নশ্বরের প্রান্তে প্রান্তে খোঁজো অবিনশ্বর,ভালো-
একথার সাথে ভিন্নমতপোষণ কোন কারন নেই
শেষ হাসিটা হেসেছে আলো।

আসলে একটা শাশ্বত সুন্দর পৃথিবী ছাড়া
কবিদের কোন ব্যক্তিগত অভিলাষ নেই-
আমিও ভূমিষ্ঠ হবো-
অগ্রজ প্রেমময়ীদের হাত ধরে।

উড়োচিঠি
– দেবযানী গাঙ্গুলী

শ্রাবণ দিনের কাকভেজা মন
আনাচ কানাচ নিঃঝুম
ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম, চোরা ডুব স্নান
চাঁদ দিয়ে যায় চোখে চুম।

তুমি কাছে, তবু তুমি কাছে নেই
উত্তাল মেঘ বর্ষা
বুক জুড়ে কাঁদে অঝোর শ্রাবণ
চোখ সায়রের ভরসা।

অসাবধানেই ছুঁয়েছে আগুন
বন্দী মনের আয়না
ফসলের শেষ কণা নিঃশেষ
উপবাস আর সয় না।

দোলাচল দিন ব‍্যথায় বিলীন
সূর্যসকাল সুনামি
ঠিকানার খোঁজে শেষ চিঠি ফেরে
বন্ধুতা আজ অনামী।

অ্যালবাম জুড়ে জলছবি আঁকা
পলাশ পলাশ রোদ্দুর
পাতাঝরা ডালে ঝাপটা শীতের
সাঁঝবাতি বেলা কদ্দুর!

সলতে ফুরানো তমসার দিন
আত্মজনের উপহাস
মেঘ উড়ে যায় ভিন ঘাট ছুঁয়ে
জীবন ফসিল সহবাস।

তুমি বেঁধে নিও নতুন সেতার
সুরে বেঁধো প্রিয় সঙ্গীত
ঠিকানা হারিয়ে পরিয়ায়ী দিন
হেমন্ত বেলা ইঙ্গিত ।

ঘোর ঘোর রোদ, কাঁপছে পারদ
বিস্মরণের সন্ধান —
তোমায় দিলাম উড়ো চিঠিতেই
ঘর বদলের ফরমান ।

বিষয়– তুমি অন্য কারো সঙ্গে বেঁধো ঘর।

তবুও আজ ভালোবাসবো
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

আজ শহর জুড়ে অঝোর ধারায় বৃষ্টি থাক
ভেজা কাকগুলোও আর বেশি ভিজে যাক
বন্ধ হয়ে যাক আজ গাড়ির সব চাকাগুলো
আজ আমি শুধু তোমাতেই মেতে থাকবো ৷

হলে হয়েই যাক আজ হুলিয়া এ শহর জুড়ে
তল্লাশি চৌকি খুলে বসুক সব পথের মোড়ে
অাজ আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেবনা
আজকে আমার বুকই হবে তোমার ঠিকানা ৷

এই শহর আজ একেবারে অচল হয়ে যাক
দোকানপাট গুলো সব আজ বন্ধ হয়ে যাক
শুধু খোলা থাকুক রাস্তার ধারে টং দোকান
সেখানে বসে না হয় শোনাবো বে-সুরো গান ৷

রিক্সাগুলো সব বন্ধ থাক আজ শহর জুড়ে
ছুটি থাক ব্যাস্ত শহরের ট্রাফিক সিগন্যালে
আমাদের পায়ে আজ পথ হারাবে এই শহর
যৌথ ভালোবাসাতে আঁকবো সুখের আঁচড় ৷

মৌনতার ক্লাব
- মোশ্ রাফি মুকুল

মৌনতার ক্লাবে জমা রেখেছি সব না বলা কথা-
ব্যাবলিয়নের শূন্য উদ্যানে বসে কথা হবে হাওয়ার সাথে,
ইথারের কানে কানে বলে যাবো ঋজু নৈঃশব্দ্য।

এ নৃলোক শুনবেনা শুদ্ধ কবিতা,
এ সময় কখনো শুনবেনা শরবিদ্ধ হৃদয়ের কথাগুলো;
আত্মগত ডামাডোলে বিপন্ন মানব মানস,
কেউ মানছেনা 'মানুষ' এবং শুদ্ধত্বের সংজ্ঞা-
বর্বরতাকে এখানে দেয়া হচ্ছে শিল্পের মর্যাদা,
কিছু অত্যাবশ্যকীয় শব্দ আর ভালোবাসার রসদ নিয়ে
চলো যোগ দেই মৌনতার ক্লাবে।

কাশবন দিগন্তে,সমুদ্র ফেনিলে এবং
কবিতার মঞ্চে রুয়ে দি মৌনতার বৃক্ষ ও
নিখাদ প্রেম।

২৪/০৭/২০১৮.

একদিন তর্জনী উঠবে
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

আমার পক্ষেও একদিন তর্জনী উঠবে
রাস্তার মোড়েও সেদিন পিকেটিং হবে ,
ছাত্র জনতারা রাজপথের দখল নিবে
ঝড়ো স্লোগানে চারিদিক মুখরিত হবে ৷

আমার পক্ষেও একদিন কেউ দাঁড়াবে
কাঁধে কাঁধ রেখে প্রতিবাদী হয়ে উঠবে ,
ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ ভুলে পাশে দাঁড়াবে
ন্যায়ের পক্ষে বুকটা টান করে দাঁড়াবে ৷

আমার পক্ষেও একদিন ওরাই লিখবে
যে কলম আজকে ভয়ে পকেটে আছে ,
সংবাদপত্র সেদিন আবারো সরব হবে
টিভি রিপোর্টাররাও ছুটে চলে আসবে ৷

আমার জন্যও কোন মা সিজদায় রবে
আবার কোন মা ঠাকুর ঘরে পড়ে রবে ,
কেউ রোজা রবে ,কেউবা রাখি বাঁধবে
জয়ীও হবো ওদেরই দোয়া আশির্বাদে ৷

বিদায় বেলা আসিল আজি মোদের অঙ্গনে,

ভাবি নাই কখনো বিদায় চাহিবে  প্রিয়জনে।
অপত‍্য স্নেহে তুমি দেখিয়েছ জীবন পথখানি,
ত্রুটি করেছি কখনো তাতে হয়েছ অভিমানী।
ক্ষমা করে দিও তুমি-ভুল করেছি কতো,
চিনিতে পারিনি মোরা তুমি ছিলে শাশ্বত।
দিয়েছ ফুল ফল-ঝরিয়েছ জ্ঞান বৃষ্টি,
যাকিছু করেছি মোরা -সব‌ই তোমার‌ই সৃষ্টি।
আশীর্বাদ করো মোদের তুমি ফিরিবার পথে,
জীবন ধন‍্য মোদের তোমার অমোঘ পরশে।

ব্যক্তিগত চিলেকোঠা ও নিত্যবর্তমানের ঘুঘুগণ
- মোশ্ রাফি মুকুল

একদিন দেওলিয়া হয়ে গেলে
সামাজিক হাটে-
ব্যক্তিগত শোক প্রস্তাব করি;
মুখচ্ছবিতে বিদেহী কারুকার্য আঁকি।

ততদিন অপেক্ষা করি
যতক্ষণ না পায়ের তলায় শেকড় গজায়-
একা নই-
পেয়ালা ভরাছিলো ভোগ
আর উপভোগের
গিনিপিগ চাতুর্য।

চুরুটের মতো দীর্ঘটান-
আবার মৃতপ্রায় প্রত্যাশাগুলো বেঁচে যায় যদি!
মহাকালের বাইপাস সার্জারিতে নড়েচড়ে বসে
ফুতুর হৃৎপিন্ড-
এবং আমার ভেতরের
যত্তসব সর্বগামী পুরুষ,
সর্বগামিনী ঘুঘুগণ
পাখনার খিল খুলে প্রস্তুতি নেয় উড়ন্ত অশ্বরেসের।

একবার আমার ব্যক্তিগত চিলেকোঠার সাথে
'ম্যান টু বার্ড' সম্পর্ক গড়েছিলো
সমকালীন শঙ্খচিল ও
নিত্যবর্তমানের ঘুঘুগণ!

২০/০৭/২০১৮.

কৈশোর

আল্-মাম্যূণ

উজান নদী সাঁতার কেঁটে যাব ডুবোচরে
পাবেনা টের মা-বাবারাও ভাব্বে আছি ঘরে।
উঠব গিয়ে ভাটির দেশে ফের বাড়াব পা
মাছ না নিয়ে কোন মতেই ঘরে ফিরব না।

পাল উড়িয়ে হাল ঘুরিয়ে যাচ্ছে মাঝি গেয়ে
গভীর জলে নোঙর ফেলে রোদ উঠেছে নেয়ে।
ভাটিয়ালি, পল্লীগীতির ঢেউয়ে ভিজে জল
জালের কোলে রুপালী মাছ করে টলমল।

একে একে জলের তলায় দিচ্ছি ক্রমে ডুব
উঠছি ভেসে স্রোতের তোড়ে রাগ হচ্ছে খুব।
হঠাৎ করে বিঁধলো পায়ে বোয়ালের এক কাঁটা
বন্ধুরা সব ভীষণ ভয়ে করলো শুরু হাটা।

পাড়ি দিলাম হৈহুল্লুরে শান বাঁধানো ঘাটে
যেথা হতে গাঁয়ের বধূ জল ভরে নেয় বাটে।
নাওয়া শেষে আদুল বেশে তা ধিন ধিন নেচে
বাড়ির পানে চলছি ছুটে ভয় পালিয়ে গেছে।

মেঠো পথের দু'পাশ জুড়ে শিশুগাছের সারি
গুনতে গুনতে ফিরে এলাম কাঁচা মাটির বাড়ি।

লেখাকাল: ২২ জুলাই ২০১৮
গাজীপুর।

এ মায়াবী ভূখন্ডটাই আমার স্বদেশ
- মোশ্ রাফি মুকুল

এ বদ্বীপের পথে পথে-
মায়াবী সুন্দরতা,পিছুটান
তবুও সম্মুখে হাঁটছি অবিরাম,
তার আলোয় দেখছি 'মা'কে,
আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি তার বাতাসে,
তার ভালোবাসার ঘেরাটোপে
এগুচ্ছি মানুষে মানুষে।
বনানীঘেরা,দক্ষিণে সমুদ্র
নদীনালা,খালবিল,সমতল-
টিলা আর পাহাড়ের পাদদেশ,
এ মায়াবী ভূখন্ডটাই আমার বাংলা
আমার স্বদেশ।

কিছু অনিবার্য শব্দকে
কিছুতেই ভুলতে পারিনা,
মাটি ও প্রকৃতির
অবিচ্ছেদ্য এ বন্ধন কিছুতেই
খুলতে পারিনা,
আমিতো এ মাটিরই ভূমিপুত্র।

যেমন ভুলতে পারিনা
প্রজাপতি,ফুল,পাখিদের কলবর,
প্রাণে প্রাণে মেলা উৎসব
'মা মাটি মানুষ'
এইসব স্পন্দিত শব্দগুলোকে কি
ভুলে থাকা যায়?
চাইলেও কি পারা যায়
হৃদয়ে আঁকা মানচিত্রটাকে মুছে ফেলতে?
আমি পারবোনা।
আমিও মরনোত্তর অপেক্ষা করে যাব
আমার স্বদেশের আলোকিত মুখ দেখতে
এ আবহমান থেকে আর কিছু নয়
আমার সবুজ স্বদেশের সুঘ্রাণ নেব শুধু।
এইসব নোনাঘাসে
আমার পদছাপ থাকবেনা,
কোন সবুজবৃক্ষের ডালে
দোয়েল পাখি
শিস দিয়ে কাছে ডাকবেনা,
এ হাতের স্পর্শ ছুঁয়ে দেখবেনা দোঁআশ মাটি;
ভাবতে ভীষণ কষ্ট হয় আমার।
এই যে বেঁচে থাকা-
এই যে ক্ষণে ক্ষণে দম নেওয়া
তার সবটুকু দান আমার মাতৃভূমির।

যেদিন মৃত্যুর জৌলুস পাত্রে চুমুক দেবো-
সরগরম এই জলসায় যেদিন
আর খসে পড়বেনা আমার পালক
আমার চলে যাওয়ার দিন-
আমার স্বদেশ থাকবে,
গাছপালা,নদী,সবুজাভ মানচিত্র থাকবে,
এ ভূখন্ডের সার্বভৌমত্ব থাকবে;
অম্লান স্বাধীনতা থাকবে,
প্রিয় পতাকাটা উড়বে যুগে যুগে।

কোন দুঃখ নেই-
কোন না পাওয়া নেই-
কোন হাহাকার নেই-
আমার ভেতর।
এমন মাতৃকাকে পেয়ে সব
পেয়ে গেছি আমি।
হে অরণ্য তুমি আমায় ডেকো,
হে আপ্লুত স্বদেশ তুমি আমায় ডেকো,
তোমার মাটির কণায় কণায় মিশে থাকবো।
হে আমার অমর বাংলাদেশ-
তোমাকে ছাড়া থাকতে হবে
একথা ভাবতে পারিনা।
ভালো থেকো তুমি অনাদিকাল-
প্রিয় বাংলা মা,
ভালো থেকো স্বদেশ তুমি,

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভূখন্ডটাই
আমার স্বদেশ হিসেবে পেয়েছিলাম-
মৃত্যুর পরও স্বপ্রণোদিত হয়ে
একথাই বলব আমি।

২২/০৭/২০১৮.

শোক গাঁথা
– সৌরভ দুর্জয়

একটা রোমান্টিক কবিতাও লিখতে পারি না,
বাঁধা দেয় মশার উৎপাত; চোখের অশ্রুপাত।
কলমের কালিটুকু যেন নাগিনির গরল,
জীবনের পাতা জুড়ে লিখে যায় যন্ত্রণার কবিতা;
কষ্টের গাঁথা,দুঃখের মহা কাব্য।

অন্ত্যমিলের পয়ার কিংবা ত্রিপদী ছন্দ কাছে পাই না,
অমাত্রিক্ষর ছন্দের ভীড় আমার মস্তিস্কের নিউরণ জুড়ে,
একটা বকুল ফুল খুটে পাই না কবিতার মালা গাথার জন্য,
লাশের সারি সরাতে পারি না ছান্দিক পথে হাঁটার জন্য।

শরতের শুভ্র কাশফুল পুড়তে দেখি বর্ষার বজ্র নিদাদে;
হাসনা হেনার ঘ্রাণের শুকি বারুদের ঝাঁজ,
নদীর কলতানে শুনি গুম হওয়া সন্তানের মায়ের কান্না,
তানসেনের গানে ভাসে অধিকার আদায়ের শ্লোগান,
মসনদের উত্তাপ পুড়াে মরে নিরিহ প্রজা,
আকাশ জুড়ে শকুনীর দাপট ;পায়রা গুলো খোঁয়াড়ে বন্দি।

এ সব দেখে বড্ড ভয়ে থাকি, মনে হয় আমি হাজতে আছি,,
আগে জামিন দরকার; বাঁচার দরকার।
আপাতত রোমান্টিক কবিতা কোনো কাজে আসবে না
এবং লেখা লেখাও যাচ্ছে না, লিখতেও দিচ্ছে না
মশার উৎপাত, চোখের অশ্রুপাত,বিবেকের কষাঘাত।

রোমান্টিক কবিতা আজিমপুর, জুরাইন, অথবা মীরপুরে ঘুমায় থাকুক; আমি কিছু শোকগাথা লিখি,
সুখের উত্তাপে পুড়ে মরা প্রজাদের নিয়ে।

২২/০৭/২০১৮
ফরিদপুর

প্রথম প্রেমের কলি
- ইরাবতী মণ্ডল

--দাদা ,একটা ভালো দেখে শাড়ী বার করুন দেখি।সুগত দোকানদার কে বলে।
--এই যে সুগত বাবু, আসুন আসুন।অনেকদিন দেখা নেই আপনার।ভালো আছেন তো?তা কার জন্য শাড়ি চাই?বৌদির জন্য নাকি ?দোকানদার জিজ্ঞাসা করে।
---আরে না না দাদা।তোমার বৌদির জন্য নয়।কাল ভাইফোঁটা না,তাই আমার দিদির জন্য শাড়ি চাই।সুগত বলে।
---আচ্ছা, আচ্ছা।তা দেখুন শাড়ি।এইবলে দোকানদার অনেকগুলো শাড়ি বার করে দেখায়।সুগত তারথেকে একটা মনের মত শাড়ি দিদির জন্য বেছে নেয়।
সুগত কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে বড়ো চাকরি করে।সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে আর স্ত্রী।ছেলে টি সি এস এ কাজ করে।মেয়ে বেথুন কলেজে ফিলোজফি অনার্স নিয়ে পড়াশোনা করে। বেশ সুখের সংসার তার।কোনো ঝক্কি ঝামেলা নেই।বাবা মা দেশের বাড়িতে মেজদার কাছে থাকে।সুগতরা তিন ভাই দুইবোন।সবাই এখন প্রতিষ্ঠিত।বড়দি নীরা স্কুল শিক্ষিকা।ছোটবোন শ্রেয়া গৃহবধূ।সুগত চাকরি সূত্রে শহরেই থাকে। কাজের নানান ব্যস্ততায় আত্মীয় বাড়ি প্রায় যাওয়াই বন্ধ।কিন্তু এবার বড়দি ভাইফোঁটায় বার বার করে যেতে বলে দিয়েছে ।অফিসের কাজের চাপ এসব বলেও কোনো রেহাই পাই নি। দিদি বলেছে
---এবার যদি না আসিস তাহলে তোর সাথে আড়ি।
সব ভায়েদের এমনকি মামাতো দুই ভাইকেও এবার সে ভাই ফোঁটার জন্য ডেকেছে। তাই এবার সে আর দিদির কথায় না করতে পারে নি।অফিসথেকে দুদিনের জন্য ছুটি নিয়েছে সে।তাছাড়া সে বড়দির বিয়ের পর একবার ই গিয়েছিল তার বাড়িতে। সে ও হয়ে গেছে অনেক দিন।তখন তার ও তো বিয়ে হয় নি ।কি মজাতেই না কেটেছিলো তার দিদির বাড়িতে ঐ কটাদিন।আর দিদির ছোট ননদ চন্দ্রিমা। কি মিষ্টি মেয়ে।তার কথা মনে হতেই বুকটা তার ধক করে ওঠে। মনে পড়ে যায় একসাথে অনেক অনেক স্মৃতি।জীবনের ফেলে আসা রোমান্টিক কিছু মুহূর্ত।
সুগতর বড়দি নীরার শ্বশুর বাড়ি খুব বড়োলোক।দোতলা পাকাবাড়ি।আর অনেক জমিজায়গা। নীরার শ্বশুর সজনীবাবুর চারছেলে চারমেয়ে।ছোটোছেলে সনতের সাথে নীরার বিয়ে হয়েছে।বাড়িতে অনেক লোকজন খাটে,যৌথ ফ্যামিলি ওদের।বাড়ি সবসময় গমগম করছে।নীরার চার ননদের মধ্যে তিনজনের বিয়ে হয়ে গেছে।বাকি শুধু চন্দ্রিমা।সে ক্লাশ নাইন এ পড়ে ।গায়ের রঙ টকটকে ফর্সা। যেমন সে দেখতে তেমনি সে গুণবতী।ঐটুকু বয়সেই বৌদিদের কাছথেকে রান্নাবান্না সব শিখে নিয়েছে।তাছাড়া সেলাই-ফোড়াই এর কাজে ও খুব দক্ষ।স্কুলের পড়ার ফাঁকে ফাঁকে চটের আসনে উল দিয়ে সুন্দর সুন্দর ডিজাইন করা,কার্পেটে দেব-দেবীদের ছবি আঁকা, মণীষীদের সুন্দর সুন্দর বাণী সূঁচের আগা দিয়ে ফুঁটিয়ে তুলতে সে ওস্তাদ।আর এইকাজে তার সঙ্গী তার বান্ধবী মালতী।দুজনে একই ক্লাশে পড়ে।তাই দুজনের মধ্যে ভাব ও খুব বেশি।কেউ কাউকে না দেখে থাকতে পারে না একদণ্ড।ছুটির দিনে তো দুজনের দেখা মেলাই ভার।কোথায় কাদের বাগানে পেয়ারা পেকেছে,গরমের সময় খেজুর পেকেছে, জাম পেকেছে সব খবর তাদের নখ দর্পণে।শুধু তাই নয় দুজনে আঁচল ভর্তি জাম খেঁজুর নিয়ে হাজির হয়। মাঝে মাঝে দুই সখীতে পশ্চিম বিলে চলে যায়।বিলের একহাটু জলে নেমে শালুক ফুল তুলে নিয়ে আসে।এইসব দুরন্তপনার জন্য বাড়িতে তাদের বকাও কম খেতে হয় না।তবুও ওদের হুঁশ ফেরে না।মাঝে মাঝে চন্দ্রিমা মাকে জড়িয়ে ধরে বলে,
---মা অত বকো কেন।
--বকবো না তো কি করবো।দিন দিন ধিঙ্গি হচ্ছো।তাও দুরন্তপনা কমতিচে না।বে হলি শ্বশুর বাড়ির লোকজন এসব সহ্যু করবানে।?মা বলে।
---আমি বে করবো না মা।সব সময় তোমার কাছে থাকবো।মাকে জড়িয়ে ধরে চন্দ্রিমা বলে।
---তাকি হয় মা।মেই হই জন্মাইছো যকন, তকন পরের ঘরে তো যেতিই হবে।মেয়ের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে মা বলে।
---না মা,আমি যাবো না।এই বলে সে আরো জোরে মাকে জড়িয়ে ধরে।
---আচ্ছা ঠিক আচে সে পরে দেখা যাবানে। একন ছাড় দিকিনি অনেক কাজ পড়ি আচে।এইবলে তখনকার মত মেয়ের হাতথেকে ছাড়ান পায়।
সুগত সে বছর এগারো ক্লাশ পাশ করে সবে বারো ক্লাশে উঠেছে।পড়াশোনায় তেমন চাপ নেই ।সামনেই হলির ছুটি।তাই সে ঠিক করে বড়দির বাড়িতে বেড়াতে যাবে।যেমন ইচ্ছা তেমন কাজ।হোলির আগেরদিন ই সে দিদির বাড়িতে পৌঁছে যায়।ভাইকে দেখে নীরা তো খুব খুশি।বলে
---এত দিনে দিদিকে মনে পড়লু।বাড়িতে মা বাবা সবাই ভালো আছে তো ভাই।
---হ্যাঁ দিদি সবাই ভালো আছে।আর আমার পড়াশোনার জন্য তো আসতে পারিনি ।তা তোরা সবাই ভালো আছিস তো দিদি?সুগত বলে।
--হ্যাঁ ভাই সবাই ভালো।তা কাল রঙ খেলবি তো।আমাদের বাড়িতে কিন্তু অন্য পাড়ার থেকে সবাই রঙ দিতে আসে।নীরা বলে।
এমন সময় চন্দ্রিমা আর মালতী দুই সখী সেখানে হাজির হয়। চন্দ্রিমা নীরার কথার সুর টেনে বলে,
---রঙ খেলবি মানে?না বললে আমরা শুনবো নাকি?কি বল মালতী তাই না?
---হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক ই তো।না বললে শুনবো কেন।সুগত দাকে আমরা কাল ভালো করে রঙ মাখাবো।
এই বলে দুই সখীতে খিলখিল করে হেসে ওঠে।তাদের কথা শুনে সুগত লজ্জায় লাল হয়ে যায়।
---নে নে এবার থাম দিকিনি বাপু ।আমার ভাইটাকে আর লজ্জা দিস নি।নে বেচারিকে এবার একটু বিশ্রাম করতি দে।নীরা চন্দ্রিমা আর মালতীর উপর কৃত্রিম রাগ দেখায়।
---আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে বৌদি।তোমার ভাইকে ভালো করি খেতি দেতি দাও।আমরা আর জ্বালাবো না।
এই বলে দুই বান্ধবী খিলখিল করে হাসতে হাসতে সেখান থেকে চলে যায়।সুগত তাদের চলার ছন্দের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকে।বিশেষ করে চন্দ্রিমার ঊজ্জ্বল রূপ আর তার কথার চটুলতা তার প্রথম যৌবনের স্রোত এ ঢেউ তুলে দেয়।তাকে এক অজানা রোমান্টিক জগতে নিয়ে যায়। মনের মধ্যে একটা ভালোলাগার রেশ থেকে যায়।
পরেরদিন যথাসময়ে সুগতর ঘরে চন্দ্রিমাএসে হাজির।তার হাতে আবির।চন্দ্রিমা ঘরে ঢুকেই একমুঠো লাল আবির সুগতর গালে লাগিয়ে দেয়। সুগত ও কম যায় না।সেও চন্দ্রিমার হাত থেকে আবির নিয়ে তাকে মাখিয়ে দেয়।চন্দ্রিমাকে আবির মাখাতে গিয়েই যেন একটা বিদ্যুতের শক খায় সুগত।চন্দ্রিমার ছোঁয়ায় তার সমস্ত শরীর আড়ষ্ট হয়ে যায়।শরীরের মধ্যে প্রবলবেগে রক্ত প্রবাহ চলতে থাকে।ধমনীর গতিবেগ যায় বেড়ে।মুহূর্তের জন্য সে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।চন্দ্রিমা ও সেই মুহূর্তে কেমন একটা হতভম্ব হয়ে যায়।তারপর একটু সামলে নিয়ে বলে,
---চলো সুগত দা।আমরা মালতীকে ডেকে নিয়ে একসাথে পাড়ায় একটু রঙ খেলে আসি।
সুগত ও থতমত খেয়ে বলে,
---হ্যাঁ হ্যাঁ চলো।তোমাদের গ্রাম টাও একটু ঘুরে দেখা হবে।
দিদি নীরাকে বলে দুজনে বেরিয়ে পড়ে।প্রথমে যায় মালতীর বাড়িতে ।মালতীকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ায় তারা ঘুরে ঘুরে আবির খেলে।পথে চলতে চলতে মাঝে মাঝেই সুগত চন্দ্রিমার হাত ধরে।চন্দ্রিমা ও সুগতর হাতের মধ্যে নিজের হাত দিয়ে কি এক স্বর্গ সুখ অনুভব করে।মাঝে মাঝে দুজনে দুজনের দিকে গভীরভাবে তাকায় ও।এসব কিন্তু মালতীর নজর এড়ায় না।সে সুগতকে লক্ষ্য করে বলে,
---কি গো সুগতদা।আমার সখীকে বুঝি খুব মনে ধরেছে।
একথা শুনে সুগত লজ্জা পায়।তাড়াতাড়ি করে চন্দ্রিমার হাত ছেড়ে দেয়।
--কি যে বলিস না মুখপুড়ি।এইবলে চন্দ্রিমা মালতীর উপর কৃত্রিম রাগ দেখায়।
---আহা,কি লজ্জা।লজ্জার রঙে আর আবির রঙে দেখছি একেবারে লাল হয়ে উঠেছিস।খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে মালতী।
দূরে কোথায় খোল বাজিয়ে একদল লোক রাধাকৃষ্ণের ডুলি নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় রঙ খেলে বেড়াচ্ছে।বাতাসে ভেসে আসছে কীর্তনের সুর,
" সখী তোরা কুঞ্জ সাজাও গো
আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারে।" রঙের মরশুমে চারিদিকে রঙের ছড়াছড়ি।পলাশ আর শিমূল বনে,লেগেছে রঙের আগুন।দখিনা বাতাসে ভেসে আসছে কোকিলের কুহুতান।প্রেমময় পরিবেশের এই প্রেমের ছোঁয়া দুটি হৃদয়ে তুলেছে মাতন।তারা জানে না কি তার পরিণাম।শুধু এক অব্যক্ত ভালোবাসায় দুটি হৃদয় পরস্পরের কাছে আসতে চায়।নিবিড় হতে চায়।

আরো দুদিন দিদির বাড়িতে থেকে যায় সুগত।এই দুদিন সে চন্দ্রিমা আর মালতীর সাথে গ্রামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখে। কামদেব সর্দারের ভাঙাচোরা রাজবাড়ি,ডাকাতে কালীমন্দির, পশ্চিম বিল, চড়কি পোতা, বাংলাদেশের সীমাঘেঁসা তারকাঁটার বেড়া সব জায়গায় ঘুরেছে।উদ্দাম গল্পে আনন্দে সময় কেটেছে তার। মাঝে মাঝে গাছের আড়ালে চন্দ্রিমাকে নিয়ে গিয়ে টুপকরে তার গালে একটা চুমুও দিয়েছে।আর মালতী তা দেখেও না দেখার ভান করে বলেছে,
---আমি এই চোখ বন্ধ করছি।তোমরা যত খুশি প্রেম করো।আমি কাউকে কিচ্ছু বলবো না।এই বলে হাসতে হাসতে সেখান থেকে সরে গেছে।

তারপর এসেছে ঘরে ফেরার পালা।নীরা এ কদিন ভাইকে কাছে পেয়ে খুব খুশি।ভাইয়ের যাওয়ার সময় সে বলে,
---ভাই,ছুটি হলেই আবার আসিস।এ কদিন তোকে পেয়ে ভীষণ আনন্দে কাটলো।
---হ্যাঁ দিদি আসবো।আর আমার ও তো ভীষন ভালো লেগেছে।বেশ মজায় কেটেছে কটাদিন।সুগত বলে।
কিন্তু যাওয়ার সময় তার দুচোখ এদিক ওদিক একজনকে খুঁজতে থাকে।চন্দ্রিমাকে কোথাও দেখতে পায় না।পাবে কি করে সে তো তখন দোতলার ঘরে বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদছে।এ কদিনে তার অনেক পরিবর্তন ঘটে গেছে।সেই চঞ্চল ছটফটে মেয়েটি আর নেই।এখন সে শান্ত।তার ষোল বছরের যৌবনে প্রথম প্রেমের ছোঁয়া সে পেয়েছে।সেই প্রেম তাকে বৈরাগিণী তপস্বিনী করে তুলেছে।
সুগত চন্দ্রিমাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে দিদির কাছে জিজ্ঞাসা করে,
---চন্দ্রিমা কোথায় দিদি?তাকে তো দেখলাম না।
---দেখ,হয়তো উপরে ওর ঘরে আছে.।দিদি বলে।
সুগত সোজা উপরে গিয়ে চন্দ্রিমার ঘরে কড়া নাড়ে।
---চন্দ্রিমা, দরজাটা খোলো।আমি চলে যাচ্ছি।
দরজা খুলে দেয় চন্দ্রিমা।ঘরে ঢোকে সুগত।চন্দ্রিমা মুখ নীচু করে দাঁড়িয়ে।তার দুচোখে জল।ধীরে ধীরে সে বলে,
---সুগত দা তুমি চলে যাচ্ছ?আমাকে তুমি ভুলে যাবে নাতো?
--তোমাকে ভুললে যে আমার অস্তিত্বকে ভুলে যেতে হবে।আমি আবার আসবো।এই বলে চন্দ্রিমার কপালে একটা চুমু দিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে সুগত।আর তার চলার পথের দিকে অপলকে তাকিয়ে থাকে চন্দ্রিমা।
বাড়ি ফেরার পর কটাদিন স্বপ্নের মত কেটেছে তার।প্রেমের কবিতায় ভরে উঠেছে খাতা।কিন্তু সে মাত্র কয়েকদিন।সে সাইন্সের ছাত্র।পড়ার চাপ খুব।ভালো রেজাল্ট করতে হবে।তাছাড়া দিদির ননদের সাথে প্রেম,বাড়ির কেউ মেনেও নেবেনা। জানতে পারলে হয়তো দিদির সংসারেই অশান্তি হবে।তাই কখন তার মনথেকে সেই প্রেমের স্মৃতি হারিয়ে যায় সে নিজেও বুঝতে পারে না।কিশোর প্রেমের বুঝি এই রকম ই পরণতি হয় । কিন্তু সত্যিই কি প্রেম হারিয়ে যায়?কে জানে।তাহলে কেন এখন তার সেকথা মনে পড়ছে।জীবনে সে তো এখন প্রতিষ্ঠিত।ভালো চাকরি ,স্ত্রী, ছেলে মেয়েকে নিয়ে সুখের সংসার তার।তবু কেন পুরনো ফেলে আসা দিনের কথা তার মনে পড়ছে।চন্দ্রিমার ও কি তার কথা মনে পড়ে?শুনেছিলো ক্লাশ টেন এ ওঠার পর ই ভালো ছেলেদেখে তার বিয়ে দিয়েছিলো।দিদির মুখে শুনেছিলো, বিয়ের দিন সে খুব কেঁদেছিলো।আর তার সখী মালতি তাকে বুঝিয়েছিলো। বেচারি চন্দ্রিমা, কি বা করতে পারে সে।সে নিজে ছেলে হয়েও তো কাউকে কিছু বলতে পারে নি।তাহলে চন্দ্রিমা কি করে পারবে।আমাদের সমাজে, মেয়েদের কথার মূল্য কতটুকুই বা দেওয়া হয় ।একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস তার বুক চিরে বেরিয়ে আসে।
পরেরদিন সকাল সকাল সে বেরিয়ে পড়ে দিদির বাড়ি।দিদি বলেছে বারোটার আগেই ভাইফোঁটা দেবে।বারোটার পরে নাকি আর শুভ লগ্ন নেই।তাই সকাল সকাল বার হওয়া। তাছাড়া অনেকদূর।যেতেও টাইম লাগবে ভালোই। স্ত্রী নীপাই সব গোছগাছ করে দিয়েছে।বলে দিয়েছে রাস্তার কোনো বড়ো দোকানথেকে মিষ্টি কিনে নিতে।সুগত শিয়ালদা থেকে ট্রেনে মছলন্দপুর যায়। ট্রেনথেকে নেমেই ম্যাজিক গাড়িতে করে দিদির বাড়ি।সুগত ম্যাজিকে একটা ভালো সিট নিয়ে বসে পড়ে।ড্রাইভার তখন ও অপেক্ষা করছে ডাউন ট্রেনের প্যাসেঞ্জার এর জন্য। ৯.৩০এর ডাউন বনগাঁ লোকাল এসে দাঁড়ায়। চন্দ্রিমা নাতনির হাত ধরে ট্রেনথেকে নামে।তারপর প্লাটফর্মের নীচে দাঁড়ানো ম্যাজিকে উঠে বসে।সে চলেছে বাপের বাড়ি,দাদাদের ভাইফোঁটা দিতে।ম্যাজিকে বসেই সুগতর দিকে চোখ যায় তার।কতদিন পরে দেখা।তবু চিনতে একটুও অসুবিধা হয় না।
---সুগতদা তুমি!ভালো আছো তো?চন্দ্রিমা বলে।
চন্দ্রিমাকে দেখে সুগত ও চমকে উঠেছে।কোথায় সেই টকটকে ফরসা রঙের কিশোরী চন্দ্রিমা!তার বদলে সামনে বসে আছে শুষ্ক দেহ,রোদেপোড়া তামাটে গায়ের রঙ,কাঁচাপাকা চুলের মাঝবয়সী এক বৃদ্ধা। একে সে চেনে না।তার স্বপ্নের রাজকন্যা, তার প্রথম প্রেমের কলি এই বৃদ্ধা হতে পারে না।মনটা ভেঙে যায় তার।চন্দ্রিমার কথায় চমক ভাঙে,
--কি ভাবছো সুগতদা।আমাকে চিনতে পারছো না।আমি চন্দ্রিমা।
---হ্যাঁ হ্যাঁ চিনতে পারছি।আমি ভালোআছি।তুমি ভালো আছো তো।সুগত বলে।
---হ্যাঁ ভালো আছি ।তুমি তো বৌদির ওখানে যাচ্ছো ভাইফোঁটা নিতে তাই না।বৌদি আমাকে ফোন করে বলেছে সে কথা।চন্দ্রিমা বলে।
---হ্যাঁ তাই যাচ্ছি।তুমিও কি ---?সুগত বলে।
--আমিও তো দাদাদের ফোঁটা দিতেই যাচ্ছি।এই দেখো সাথে কাকে নিয়ে যাচ্ছি।আমার নাতনি চাঁদনি,আমার ছেলের মেয়ে। এবার ক্লাশ নাইনে উঠেছে।চন্দ্রিমা বলে।
এতক্ষণে চন্দ্রিমার পাশের সিটে বসে থাকা মেয়েটির দিকে নজর যায় সুগতর।চমকে ওঠে সে।এ কাকে দেখছে ।এ তো অবিকল ষোলোবছরের চন্দ্রিমা,তার প্রথম প্রেমের কলি।তার হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসা।অপলকে তাকিয়ে থাকে সে মেয়েটির দিকে। চন্দ্রিমা আপন মনে বলে চলেছে নিজের কথা।ব্যাবসায়ী স্বামীর ব্যাবসায় মার খাওয়ার পর থেকে দারিদ্র্যের শুরু।এক ছেলে এক মেয়ে,দুজনেই বিবাহিত।সুগতর এসব কোনো কথাই কানে যাচ্ছে না।সে হারিয়ে ফেলছে নিজেকে, হারিয়ে ফেলছে বর্তমানকে।সে ক্রমশঃ পিছিয়ে যাচ্ছে, পিছিয়ে যাচ্ছে তার অতীতে।কামদেব সরদারের ভাঙা রাজবাড়ির পিছনে,চড়কি পোতার মাঠে,ডাকাতে কালীর মন্দিরে সে এখন ঘুরছে ।ঘুরছে তার প্রথম প্রেমের কলিকে নিয়ে।আর ভেসে আসছে সেই গান,
তোমরা কুঞ্জ সাজাও গো
আজ আমার প্রাণনাথ আসিতে পারেন।

18.06.2018

জীবন তুমি এক নদী
- ডাঃ ফারহানা মোবিন

১)
জীবন তুমি এক নদী,
তোমার বুকে
বয়ে চলি নিরবধি।

২)
জীবন তুমি
ঝিকিমিকি বালুচর,
তোমার বুকে আমার
দুদিনের খেলাঘর ।

৩)
জীবন তুমি এক গোলাপ
সুরভি আর কাটা,
তোমার মাঝে আমার
জোয়ার আর ভাটা।

৪)
জীবন তুমি এক
বন্দী কারাগার,
পরীক্ষা আর কতো
নিবা এই আমার?

৫)
জীবন তুমি এক নৌকা,
আমি তার মাঝি,
আধাঁর ঠেলে
আলো কে খুজি।

৬)
জীবন তুমি বেদনায় নীল,
রক্তে ভেজা লাল,
তবু দুচোখে বুনি
শত সহস্র সপ্নজাল।

৭)
জীবন তুমি এক
জীবন্ত ফেসবুক,
ভেতরে হাহাকার, বাহিরে
চকচকে আউটলুক।

৮)
জীবন তুমি হাজার
পাতার গল্প,
তোমার বুকে আমি
ছোট্ট একটু অল্প।

৯)
জীবন তুমি এক
জীবন্ত নাটক,
তোমার কারাগারে
আমি এক আটক।

১০)
জীবন তুমি যুদ্ধের মাঠ,
আমি তার সৈনিক ,
চোখের পানি মুছে,
আমি হাসি দৈনিক।

- ডাঃ ফারহানা মোবিন,
২১.৭.১৮,
দুপুর বারোটা নয় মিনিট, ঢাকা।

ধুঁধুঁ
- মোশ্ রাফি মুকুল

আধভাঙা হুলস্থুল
মৃত্যুর জৌলুসপূর্ণ পাত্রে;
মরনোত্তর অপেক্ষা করি
অনিবার্য শব্দগুলো ভুলে যেতে।

চেরনোবিলের ধোঁয়া
আবাবিল পাখির ঠোঁটে,
সর্বব্যাপী মাকড়গুলো
গুলনহরে সরীসৃপ জাল পাতে।

আমাকে বিশ্বাস করতে হয়-
নোনাঘাসের আইলে
আমার পদছাপ থাকবেনা।
আর আমরা মৃত্যকে
আলিঙ্গন করার জন্যই
বারবার বেঁচে থাকি শুধু-
অথবা পৃথিবীর পিয়ানো বাজানোর দিনে
সরগরম জলসায়
আমার আসন শূন্য থাকবে,
কোথাও কোন থাকবেনা ধুঁধুঁ।

২১/০৭/২০১৮.

মরিচিকা
---আল্-মাম্যূণ---

হাত বাড়ালেই আগুনের নদী হতে
ভেসে আসে উত্তপ্ত লেলিহান শিখা,
অরণ্যের দু'পায়ে তপ্ত বালুর আচরে
প্রকম্পিত ঋদ্ধিমান জ্যামিতিক লিখা।

ক্ষিপ্রতায় তেড়ে আসে অবরুদ্ধ কথা
অবাধ্য সময়ের দুরন্ত লাগাম টেনে,
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে সাময়িকী
অসামঞ্জস্য অবিচারের তাল মেনে।

বিদীর্ণ করে করে নিজেকে মহাকাশ
ভূতলে ঠেকায় অপরাহ্নের সিঁড়ি,
অযাচিত বর্ষণ ভারী হলে ক্রমেই ডুবে
চির উন্নত শির সম স্বর্গ গিরি।

রাত্রির ঘামে পচে যায় গাঢ় অন্ধকার
ঢাকে নাক সোডিয়াম লাইটগুলো,
কংক্রিটের দেয়াল হাটে শহুরে রাস্তায়
কার্পাস ভেদে বেরোয় পথের ধুলো।

বাহুডোর খুলে উলটো শোয় সতীত্ব
সম্ভ্রম হারিয়ে মাথা ঠুকে মহাকাল,
উদাসী বায়ে ছুটতে থাকে মরিচিকা
মরিবার তরে বাঁচিবার সাধ একগাল।

লেখাকাল: ১১ মে ২০১৮
চট্টগ্রাম।

আমাদের মরা নদী
- মোশ্ রাফি মুকুল

আমাদের মরা নদী-
জীবনের যতো ছোটগল্পের ভীড়,
এখন সেখানে বাঁশের সাঁকোয় পার হয়
জীবনের ধূসর ছেলেবেলা।

মনে আছে?
'মেঘনাদ বধে'র কবির কথা?
ভার্সাই নগরে বসে লেখা স্মৃতি ভাস্বর
কপোতাক্ষ নদীটির কথা?
যে নদীর সমগ্র শরীরে এখন
অস্পষ্ট অন্ধকার-
করুণ কোমল আলো।

আমাদের মরা নদী-
মরা সুখপাখি,ধুঁ ধুঁ বালুচর-
'চোখেরবালি'তে এখন তার
অজলজ হংস শাবকেরা খেলা করে!
সে নদীর ছোটছোট মাছ-
একুরিয়ামের কাঁচঘরে খুব কষ্টে দম নেয়,
তার কপোত চক্ষু জুড়ে
পরিবর্তিত জলবায়ুর সকরুণ ব্যঙ্গচিত্র-

মহামতি মধুসূদন;
একবার অন্তঃজালে দেখে নেবেন
কেমন আছে আপনার প্রিয় নদীটি,
কেমন আছে তার উথাল পাতাল ঢেউ,

নদী মরে গেলে বাঁচেনা কবি,
বাঁচেনা গ্রাম-পললভূমি
ছোটমাছ,জেলেপল্লী,
উচ্ছ্বাস-
নদী মরে গেলে-
বাঁচেনা আমাদের বুকের
ডুবসাঁতারু বালিহাঁস।

২০/০৭/২০১৮.

ক্রমবিবর্তন // আল্-মাম্যূণ

 

গ্যালাক্সির ছায়াপথে ঝরে বিদগ্ধ কান্না
উল্কার বেগে লজ্জা খুলে ফেলে অবশিষ্ট অর্ন্তবাস
তারকাপুঞ্জ মিটিমিটি হেসে লুটোপুটি খায়
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের সীমান্তে।

যমের হাত ধরে গুটিগুটি পায়ে
আয়ুরেখা পেরিয়ে যায় ক্ষীয়মাণ পায়েরছাপ
অনির্দিষ্ট অনশনে ঊর্ধ্বায়নে ধাবিত হয়
কিংকর্তব্যবিমূঢ় মানবতা।

রাতের অন্ধকার গলাটিপে হত্যা করে
ঝিমিয়ে পড়া, নিভুনিভু আলোকমন্ডল
সূর্য তার নিজের গায়ে জড়িয়ে ভোরের কাগজ
দ্বীপ্ত তেজে বিকিরণ করে রক্তাধিক্য বার্তা।

ক্রোধে উন্মাতাল মর্ত্যলোকের অধিপতি
অবশেষে ছুড়ে দেয় একেকটা অশরীরি দৌরাত্ম্য
তাতেই বিলুপ্তি ঘটে জুলুম, অত্যাচার, অবিচারের।

এবং ক্রমবিবর্তনের ধারায় হাজার বছর পর
কেউ কেউ আবিষ্কার করে
ভূপৃষ্ঠতলে বিলুপ্ত সভ্যতার ধ্বংসাবশেষ।

 

লেখাকাল: ০৫ জুলাই ২০১৮
সাভার।

আলোর হাইস্কুল
- মোশ্ রাফি মুকুল

সাদাকালো অন্ধকারে ছড়ানো প্রাচুর্য-
মুক্তা ঝরানো দূর্বাঘাসের মেঠোপথ,
প্রথম আলোর বিনয়ী রশ্মিজুড়ে সাদা ইশারা-
সকালের চৌকাঠে পা রাখে আলোর রথ।

কালোর মাঝেও ভালো দেখি,সূর্যের হাসি-
পথের দুধারে দেখি রঙিনফুল,
শুধুই কি দেখে যাবে অপরিণামদর্শীতা
দেখবেনা আলোর হাইস্কুল?

আঁধার ছেঁকে যদি না আনতে পারো
অলিন্দ ভরা দিশা,
কি করে কাটবে বলো বিদিশারাত
কাটবে কি করে অমানিশা?

দেখা দেখি
- সৌরভ দুর্জয়

অপলক দৃষ্টিতে যখন অনেক কিছু দেখি
আসলে তখন কিছুই দেখি না
দেখি শুধু নিজের স্বার্থ
তাই জীবনে কিছুই দেখা হলো না
শুধু তাকায় তাকায় চোখ ব্যাথা হলো
হলো সময়ের অপচয় মাত্র।
,
দেখতাম যদি সবার স্বার্থ
পলক দিয়ে চোখে
ওই দেখাতে অনেক দেখতাম সত্য
অল্প কিছু দেখেও।
,
যুদ্ধ ক্ষেত্রে রক্ত দেখি না
দেখি তখতে তাউস
মানুষের মৃত্যু চোখে দেখি না
দেখি স্বার্থের দৈত্য -দানব।
,
এই যে এতো দেখাদেখি
তবুও চোখ বন্ধ
দেখার মত দেখি না বলেই
চোখ দুটি আজ অন্ধ।
,
০৯।০৭।২০১৭
ফরিদপুর।

ইচ্ছে হলে মানুষ উড়তে পারে
- মোশ্ রাফি মুকুল

এবং খুব সহজেই-
ডানাহীন স্বপ্নগুলো ওড়ে।
তীক্ষ্ণ বর্ষার ফলায় গেঁথে যায় অপেক্ষমাণ চোখ,
অবলীলায় দেখে যায়
অপেক্ষাকৃত সবুজ জল্পনা।
অনামিকায় উঠে আসে হীরের প্রোজ্জ্বল
আঙ্গুল ডগায় জমায় হয় পাওয়া না পাওয়ার হিসেব,
ডানা নেই বলে ভেবোনা মানুষ উড়তে পারেনা
উড়াতে পারেনা মাংসল হৃৎপিন্ড,মন;

ইচ্ছে মানুষ উড়তে পারে।

উজ্জল থেকে উজ্জলতর হয়
না দেখা দৃশ্যগুলো-
শুধু অদেখা থেকে যায় শ্রাবনের ধুলো,
মেঘবৃষ্টির মেলা থেকে কিনতে হবে কিছু ষড়ভুজ বাইনোকুলার-
অবশেষে হাতে থাকে
ধুলোপড়া সময়ের গভীরের প্রচণ্ড খাদ,আর-
নিঁখোজ শব্দ ও অঙ্গীকার।

দূরত্বের গজফিতা মেপে মেপে শেষ হবেনা নক্ষত্রপথ
কাছে ডাকার মন্ত্র জানলেই
আকাশ আর চাঁদ নুইয়ে পড়বে সাবলীল বিছানায়।

১৮/০৭/২০১৮.


হঠাৎ যদি
- সাগর আল হেলাল
=============

হঠাৎ যদি খবর আসে
ইথার গেছে দূর আকাশে,
চলছে না ফোন, ইন্টারনেটও-
যাচ্ছে না টাকা বিকাশে।


ফেসবুকের সব আইডিগুলো
হয়ে গেছে ল্যাঙড়া নুলো,
গুগল সেও আছে নিখোঁজ-
চ্যাটিং বক্সে পড়ছে ধূলো।

খবর আসে হঠাৎ যদি
স্যাটেলাইট ছাড়ছে গদি,
মেইলে ছাড়া চিঠি পত্র-
শূন্যে করছে রক্তারক্তি !

সত্যি এমন হতে পারে ?
রক্তকণায় সুগার বাড়ে !
#
১৮.০৭.২০১৮

বনের সুখ
- সৌরভ দুর্জয়

চলো যাই গান গাই
ওই দূর বনে,
হেঁটে চলি কথা বলি
হাসি খুশি মনে।
শুনি গান দিয়ে মন
বসে গাছ তলে,
খাই আম সাথে জাম
মিষ্টি কথা বলে।
গিয়ে বনে প্রতিক্ষণে
দেখি মা'র মুখ,
তাই বনে বন্ধুগণে
ঘুরে পাই সুখ।

১৭/০৭/২০১৮
মাগুরা

দিকভ্রান্ত পথিক
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

বেগানা পথের ভীরে দিকভ্রান্ত পথিক আমি
সতিনের মতো দু'পায়ে জেঁকে বসেছে ক্লান্তি ,
তবু আমি খুঁজে চলেছি এক লোকমা শান্তি ৷

স্মৃতির খাতার পুরোনো হিসেব মেলাতে বসি
শূন্যতা সেও আজ এ হৃদয়ে যেনো বানভাসী ,
ওগো প্রেয়সী তবুও তোমাকেই খুঁজে চলেছি ৷

বিষাদ ভর করেছে জীবনের প্রতিটি পাতায়
স্বপ্নগুলো পথ হারিয়ে শূন্যতায় মিলিয়ে যায় ,
আর আমি ফুড়িয়ে যাই জীবনের বাস্তবতায় ৷

মাঝে মাঝে বহুদূরে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে
এই স্বার্থপর সমাজ-সংসারের বন্ধনটা ছিঁড়ে ,
তবুও আঁটকে আছি অক্ষমতাকে পূজি করে ৷

সময়ের ক্ষত হয়েই পরে আছি পথের মোড়ে
সব চাওয়া-পাওয়াগুলোকে ফ্রেমবন্দি করে ,
ফিরে যাবার সেই মরনতরীর অপেক্ষা করে ৷

১৭/০৭/১৮খ্রীঃ

জীবন বন্ধন
- সৌরভ দুর্জয়

শিকল ছাড়া বন্ধন,
কপালে দিয়ে চন্দন।
আগুনের পাকে শুদ্ধ,
ধর্মমতে হয়ে ঋদ্ধ।

সিঁথিতে সিঁদুর নিয়ে,
দুই হাতে শাঁখা দিয়ে।
মালাকে করে বদল
বানায় এক যুগল।

চলে যুগ যুগান্তর,
ধরে কাল কালান্তর।
হয়ে জীবন বন্ধন,
থাকুক তা চিরন্তন।

১৭/০৬/২০১৮
ফরিদপুর

তিনটি অণু কবিতা

টইটুম্বুর মেয়ে,একালের হাতেম তাঈ ও অন্যান্য-
- মোশ্ রাফি মুকুল
এক।
টইটম্বুর মেয়ে-

টগবগে রোদের ভেতর ফুটন্ত ঘোড়া
টুইটম্বুর মেয়েটি নিজ হাতে কাটে দূরত্বের গজফিতা,

কাঁচের আনাচে আমি বানিয়ে ফেললাম এক সাহসী গম্বুজ-
মেয়েটির বাহুতে গজানো পাখনায় তখনও তীব্র অনুশোচনা।

সমুদ্রে মেঘ জমলে যেমন উপরে উঠে আসে পাঁজাকোলা ঢেউ ও অমাংসল ঝিনুক।

দুই।
একালের হাতেম তাঈ-

কাঁচা মরিচের দাম বহুগুণ বেড়ে গেলে
উনুন থেকে সাদা আগুনের গন্ধ বেরোয় ;
ঝাঁঝমাখা প্রেয়সীর কপাল চুম্বন করা হয়ে ওঠেনা একালের হাতেম তাঈয়ের-
ঈশা খাঁর আমলে টাকায় আট মন সরু চাল পাওয়া যেতো
এতো সস্তায় রজনীগন্ধা কিংবা কামিনী ফুল পাওয়া যেতো কিনা কে জানে।

তিন।
মাংসল কয়েন-

প্রেসার কুকারে ভিন্ন স্বাদের মুরগী রান্নার পর আসমানি বিবি চেখে দেখলেন ভীষন সুস্বাদ-

ঘিয়েভাজা আকাশটাকে কিনবেন বলে ওয়ারড্রোবে গুছিয়ে রাখছেন কিছু কিছু মাংসল কয়েন!

১৫/০৭/২০১৮.


ঝিনুক হাসা জলের শরীর
- সাগর আল হেলাল
=====================

ঝিনুক হাসা সমুদ্র তুমি আমার
আমি নোনা জলের আটপৌরে মাঝি,
ঝড় জলের রাতে ঢেউ ভাঙার সৌখিন মন আমার
দুর্যোগেই কেবল নৌকো ভাসায়-
আমি হাল ধরে থাকি নৈঋতে
নৌকোর পাটাতনে বাড়ি খায় জ্যোৎস্নার জল...


ঈশানের মেঘ হাসি দিয়ে যায়
আমি পরিবর্তন করি না আমার নৌকোর গতিপথ,
জোয়ারের ঢেউ আঘাত করে বুকের ত্রিশূলে
জল ভাঙি আমি মুগ্ধকর বৈঠায়-
মেঘের উপরে-নিচে ওঠা-নামা করে চাঁদ
মোহনার অনতিদূরের পাহাড়ে বসে বৈসাবী উৎসব...

দিগন্তের ঠোঁট ছুয়ে যায় বাতাসের উষ্ণতা
নৌকোর শরীরে লাগে এসে কাঁঠালিচাঁপার ঘ্রাণ,
দক্ষিণের লাজুক জলে
অঙ্গ ভেজায় উপোসের মেঘমালা-
তোমার মসৃণ তেজকটালে
নোঙর খোঁজে আমার নিভৃতচারী মনপাখি...

তুমি আমার একলা সময় সমুদ্র পারে
লজ্জায় অবনত সুবোধ নাবিকযুবা আমি এক,
অগ্নিজলের হাঙরেরা
টানাটানি করে নৌকোর গোলুই-
আমি আটপৌরে মাঝি
তুমি সমুদ্র আমার ঝিনুক হাসা জলের শরীর...
-
১৫.০৭.২০১৮

সোনার দেশ
- পাণ্ডে অনিতা

সোনার দেশে সোনার মাটি,
সোনার ফসল ফলে।
সোনার দেশে সোনার কৃষক,
সোনার বীজ বোনে।
এই সুন্দর দেশেই ভাই আমারও ঠিকানা,
এই মাটিতে জন্মে, খুঁজে পেয়েছি সুখের নিশানা।
এই দেশেরই মাটি মানুষ সবই খাঁটি,
আদর মমতায় ভরা !
আলো দিয়ে বায়ু দিয়ে নির্মিত এই সুশীতল ধরা।
সোনার দেশে সোনার মানুষ আছেরে ভাই,
এ কথাটি গর্বকরে বলিতে চাই।
এ আমাদের প্রিয় জন্মভূমি,
প্রিয় বাংলাদেশ।
সোনার বাংলায় সোনার মানুষ সোনার এই দেশ।
ধন্য ধন্য ধন্য আমাদের পুন্যভুমি স্বদেশ।

১৫-০৭-২০১৬/
বরিশাল।

আষাঢ়ে খরা (১৪২৫)

আব্দুল মান্নান মল্লিক

আকাশ তুমি আষাঢ় মাসে কাঁদবে কবে আর,
আশায় আশায় দিন ফুরালো শুকায় জলাধার।
শুকনো পাতায় নূপুর বাজে ডাঙায় চরে বক,
পানকৌড়ি ভাবছে বসে পোহায় দুঃখ-শোক।
ঝিঙে ফুল খালে বিলে কোথাও জন্মে তরু,
রাখাল ছেলে গাছের ছায়ায় গাঙে চরে গরু।
চলত যেথায় নৌকা-ডিঙে গরুর গাড়ি চলে,
থৈ-থৈ থৈ হাঁসের পাল দিঘীর ঘোলা জলে।
লূতার জালে বর্ষার ছাতা সবার ঘরে ঘরে,
আষাঢ় মাসে চাতকেরা জল পিপাসায় মরে।
অগ্নিঝরা রোদ্রতাপে হালফিল আষাঢ় মাস,
বৃষ্টি নাইরে আষাঢ় মাসে পুকুর ভরা ঘাস।

আমার চোখের ভেতরে
- শাহিনা কাজল

বিষাক্ত রাত চোখের কুঠুরি ছুঁয়ে
ঘুমের পাঁজরে লিখে মহাকাল
সময়ের সমরে ভাসায় কিশোরী দেহ
নর্দমার জলে ভাঙে সম্পদের ঢেউ
পিঁপড়ের উঠোনে বন্য হাতি গড়ে মঞ্চ
দিনশেষে আমি দিকভ্রান্ত, হই দিশেহারা
চলে মিছিল, শ্লোগান আর মানববন্ধনে
অযুত নিযুত মৃত্যুর মহড়া।

পৃথিবীর যৌবন চেটেপুটে খায় বলিষ্ঠ হাত
আগ্নেয় লাভা, স্বচ্ছ আকাশে কালো মেঘ
আমি ঈশ্বরের পেছনে লিখে রাখি
বিভৎস চোখের মেকি কান্না, রমনীয় শরীর
যোনির ভেতর দেখি কফিনের ঘ্রাণ
আমার ভেতরে দুঃখ হেঁটে যায়
আর আমি মহামিলনের পথে।

তুমুল বরষার রাতে বজ্রপাত এলে -এবুকে
থরেথরে সাজাই মেঘের আবদার
থোক থোক রক্তের আল্পনায় হেসে ওঠে
সবুজ মাটি, মায়ের উঠোন
উন্মত্ত চোখ তখন গণিকার গগলস গুজে
উদোম হাওয়ায় খেলে মদের খেলা--
রমনী দেহে গুজে দেয় কলংঙ্ক সোপান
তারপর বিষুবরেখায় চলে লেনদেন।

আষাঢ়ের অসাড় জলে ফেরারি মুখ
চিত হয়ে পৃথিবী পান করে জোছনা
চোখ বুজে চাঁদ শুষে নেয় সবটুকু রোদ
তুলতুলে ব্যথায় জাগে ফের গোধুলী
অমাবস্যায় কাঁদে, ফাঁদে পড়া ফিঙে
হয়তোবা পৃথিবী ফিরে পায় নতুন সূর্য।

সবুজ ধানের আইল বেয়ে হেঁটে যায় সোনা
রৌদ্রে ভিজে বৃষ্টিতে শুকিয়ে শরীর
চাষামন সাজায় কলমি লতার বাগান
ফুটাবে নতুন ফুল, হাসবে এ পৃথিবী
আষাঢ় শেষে বন্ধ হলে দেনা'র খাতা
পূণ্যের পূর্ণিমায় দেখি জীবনের পূর্ণচিত্র।

মানুষ নামের জানোয়ার
- সৌরভ দুর্জয়

শোনা যায় না ব্যাঙের ডাক
বর্ষাকাল এলে,
নদী খালে পাওয়া যায় না
শোল পুটি বেলে।

সবুজ বাংলা ধূসর হচ্ছে
নদী যাচ্ছে মরে,
ভারসাম্যের বিঘ্ন ঘটছে
এক এক করে।

তারপরও নদী দখল
করে যাচ্ছে যারা,
মানুষ নামের জানোয়ার
হয় কিন্তু তারা।

১৩/০৭/২০১৮
ফরিদপুর

অভিযোগ নেই
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

হে রাষ্ট্র তুমি কি পারবে আমার দ্বায়ীত্ব নিতে ?
যদি না পারো তবে বলে দাও ,
নিজের দ্বায়ীত্ব না হয় আমি নিজেই কাঁধে নিবো
তবুও তুমি দায় মুক্তই থাকো ৷

হে গণতন্ত্র তুমি কি পারবে সব অধিকার দিতে ?
যদি না পারো তবে বলে দাও ,
নিজের অধিকার না হয় নিজেই আদায় করবো
তবু তুমি অন্তত স্বতন্ত্র থাকো ৷

প্রিয় স্বাধীনতা তুমি কি পারবে স্বাধীনতা দিতে ?
যদি না পারো তবে বলে দাও ,
না হয় আমি মুখ বুঝেই অন্যায় অবিচার সইবো
তবু তুমি স্বাধীনভাবে থেকো ৷

মাননীয় রাষ্ট্র যন্ত্র কি আমার অভিভাবক হবে ?
যদি না হয় কোন আপত্তি নেই ,
আমি না হয় অভিভাবকহীন একাকী থাকবো
তবু সে মুখে কুলুপ এঁটে থাক ৷

১২/০৭/১৮খ্রীঃ

ভুল জোৎস্নার কানাগলি পথ
- মোশ্ রাফি মুকুল

মাছধরা বড়শিতে সৌখিন শিকারি প্রায় গেঁথে ফেলেছিলে সংসার,টানাপড়েন-
একটু আধটু দুঃখ কষ্ট যে থাকবেনা তা কিন্তু নয়,এতো কোন গোলাপ বিছানো পথ নয়,এটা 'জীবন'।
নগরের জলাশয়ে লাল নীল উল্কি আঁকছে জলজ্যান্ত সারস,চোখে তার হাজার বছরের ক্ষুধা।
তুমি কেবল ভুল জোৎস্নায় ভুখানাঙ্গা স্বপ্ন দ্যাখো।জানালায় এগিয়ে আসা কামিনীফুলের গন্ধ থেকে খুঁজে ফেরো গ্রীক মিথ-
কার্নিশের মর্স আর ফার্নদের সাথে নিভৃতে গড়ো জটিল সমীকরণ।
তুমি চড়েছো দ্বৈরথে-
ফোর জি স্পীডে-
হাঁটিতেছো হাঁটিতেছো ভুল জোৎস্নার কানাগলি পথে!

১২/০৭/২০১৮.

এতিম পান্ডুলিপি
- সৌরভ দুর্জয়

তোমরা কেউ অধ্যাপক কেউ শিক্ষক
কেউ ডাক্তার কেউ ইঞ্জিনিয়ার কেউ ব্যবসায়ী কেউ চাকুরীজীবী কেউ বা সংসারী
আমি তোমাদের সবার খোঁজ খবর রাখি
তোমাদের দ্যাখে আমার নির্ঘুম আঁখি
শুধু তোমরা রাখো না আমার খবর
তাকাও না আমার দিকে বন্ধুগণ

কতো যত্নে আগলে রাখো ব্যাংকের চেক বই
ধুয়ে মুছে সিন্ধুকে আটকায় রাখো অলংকার
অথচ আমার পান্ডুলিপি গুলো ভুগছে
পান্ডু রোগে যাদের একটু চিকিৎসা দরকার
আমার নাই টাকা কড়ি
ওদের পাঠাতে পারি না কবিরাজ বাড়ি
ওদের রেখে হয়তো চলে যাবো আমি আসল বাড়ি

বন্ধুগণ তোমরা দেখে রেখো আমার এতিম
পান্ডুলিপিগুলি

০৯/০৭/২০১৮
ভাংগা,ফরিদপুর।

চুম্বন
- অনিতা পান্ডে

অরন্য!
তুমি কি জানো!
তোমাকে দর্শণে সুপ্ত অনুভূতিরা কতটা প্রবল উদ্যমে অঙ্কুরিত হয়!
অর্ধমৃত শাখেও নড়া চড়া অনুভব করে।
সবুজ পাতায় মাতাল হাওয়া বহে।
স্নিগ্ধ প্রেমের নৈকট্যে নেশা লাগে।
তাই-তোমাকে আমার মনের বিশাল পর্দায় অঙ্কিত করে নিলাম,
মহাপ্রমিক বলে!
তুমি হস্তান্তর যোগ্য নহে। আপন আলয়ে আপন সুধা হয়ে বর্ষিবে বলে!
সমস্ত অবয়বে তুমি শুধু আমার থাকবে।
কত জনম পেরিয়ে গেলো,তোমাকে খুঁজে পেতে।
কাছে না থাকো,দূরেতো আছো,
সুতীব্র কল্পনার ক্যনভাসে!
ছলে ছুতায় রাগ আর অভিমানের আরষ্টতা ভেঙে নতুন দিগন্ত করো উন্মোচন।
কতোটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ভালোবাসি তোমায়!
জানো,তোমাকে হৃদসরোবরে পেলে,
মনের গহীনে স্বপ্নরা একত্রিত হয়ে অনুভূতির পেগম মেলে,
আর সেই নরম উমে নীশি জাগি,
সকালকে ডাকি বিনম্র বদনে,
আবেগের ঘনত্বে ওষ্ঠের সাহচার্যে তাই রেখে গেলাম
এক দীর্ঘায়িত--
চুম্বন----!!

বরিশাল।
১১-০৭-১৮।

কারোর মনে দিয়ো না ব্যাথা
- সৌরভ দুর্জয়

সাধের জীবন নষ্ট করে,
একদিন তুমি যাবে ঝরে।
অনেক অনেক কষ্ট করে,
ঘুমায় থাকবে অন্ধ ঘরে।

তবু নষ্ট করছো জীবন,
অন্যের দ্রব্য করে হরণ।
তোমার পিছে আছে মরণ,
তাকে তুমি করো না স্মরণ।

ভাবছো আছো অনেক সুখে,
ঝরায় হাসি নিজের মুখে।
শান্তির বাতাস আছে বুকে,
অনেক হাসি ঝরছে মুখে।

কাউকে হয়তো ব্যাথা দিয়ে,
ক্যানসার নিয়ে আছো শুয়ে।
বুঝবে তুমি ওপার গিয়ে,
এসেছো সাথে কীধন নিয়ে।

সুন্দর জীবন কচি পাতা,
মুখেতে বলো সুন্দর কথা।
কারোর মনে না দিয়ে ব্যাথা,
উপরে রাখো নিজের মাথা।

২৯/১১/২০১৭

তোমাতে আমাতে কতো যোজন যোজন বিয়োজন,
সহস্র শৈশব স্মৃতি বিজড়িত ওহে প্রকৃতি মোর;
তব মেঠোপথে মোর কতো শতো পদচিহ্ন অংকিত,
কতো অাঁধারের ঝোনাকির মেলায় কাটিয়েছি ক্ষণ বিভোর!!

গাঁ ঘেষিয়া ছুটিয়া চলিছো অবিরত প্রিয়া তটিনী সর্তা,
কতো হাঁসি-কান্না সুখ-বেদনার সাক্ষী লয়ে বুকে;
কতো ধাপিয়েছি তব জলে, বলিয়াছি কতো গোপন কথা
কতো উচ্ছ্বাস আর দীর্ঘশ্বাস জমেছে তোর বুকে।।

অাজি ছাড়িয়া কোলাহল ভাঙ্গিয়া শৃঙ্খল আসিয়াছি,
আমি আসিয়াছি শিশুর মতন তব বক্ষে জুড়াতে প্রাণ;
সকল বিরহ অভিমান বেদনা অপমান আজ বলবো বলে,
তব চির অনুরাগ মাখা শীতল পবনে আজি করবো হৃদয় স্নান।।

খিরাম, ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম।

জিজ্ঞাসা
- সৌরভ দুর্জয়

নব দিবাকর কোন আকাশে উদয় হয়ে;এতো রঙ ছড়ায়?
সৌর জগতের সম্পাদক, প্রকাশক,কুশিলবই বা কোন বিজ্ঞজন?
মনের ভালোবাসা থেকে এই জিজ্ঞাসার আয়োজন।

১০/০৭/২০১৮

গভীর রাতে
- শাহিনা কাজল

শুকনো বাতাসে কাঁদে রাতের গভীরতা
হিংস্র শকুনেরা নামে পথে ; ভালবাসবে তুমি ?
অথৈ ভালবাসা নামে--- শরীরে অতি গোপনে ।
গভীর রাতে শাড়ীর অাঁচল কুকড়ে ভীষণ বেদনায়;
ভালবেসো শুধু তুমি ভালবাসাকে।
ভালবাসো মধুর সংলাপে । নির্জনে এরাতে চত্বর।
স্বপ্নরা বোনে স্বপ্নের বীজ ;
স্মৃতির ময়দানে চপলার চপল
ভালবাসেনি কেহ ঝুলন্ত বৃক্ষের প্রতীক্ষায়
যেখানে নামে গভীর রাত।
নির্জন গভীরতায় নামে ভীষণ ভীষণ ---- অাবেগে।

সবুজ সবুজ চিলেকোঠায় ক্লান্ত চাঁদ উঁকি দেয়
রাত হয়ে এসে শেষে
ফলায় ফলজ কথা
অালোহীন রাতের অরন্যে -----
ক্লান্তি মাপি নির্জনে।।

মরণের ইচ্ছে
- সৌরভ দুর্জয়

অকাল মৃত্যুতে আমার ভয় নাই
আপিল করবো না কোনো কালে
অকাল মৃত্যু এড়াতে
তবে প্রভু যদি বাঁচায় রাখে
বেঁচে থাকতে আপত্তি নাই

ভয় হয় বার্ধ্যকের মৃত্যুতে
পরের উপর নির্ভরশীল হয়ে মরতে

ইচ্ছে করে পাখির মতো উড়ে উড়ে
মাছের মতন সাঁতরায় সাঁতরায়
হেমন্তের বাতাস গায়ে মেখে মরতে

১০/০৭/২০১৮

গুনাহের মার্জনা
✍ গোলামে ইয়াসিন রেজা ক্বাদেরী৷
গুনাহের মার্জনা চাহি প্রভু তোমারি দ্বারে,
ক্ষমা করো দয়ালু ক্ষমা করো তব বান্দারে৷

কতইনা গুনাহ করেছি এই দুনিয়াতে এসে,
ক্ষমা করিলে জিজ্ঞাসা করিবার কে আছে?

তোমারি দ্বারে ক্ষমা যাচি করুণার আশে
তুমি যদি ক্ষমা না করো, যাবো কার কাছে?

চেষ্টা করে বিমুখ হতে পারিনা গুনাহ হতে,
শয়তানকে পরাজয় করার বল দাও গো আমাতে।

হে আল্লাহ! গোলামে ইয়াসিন বান্দা তোমার,
ক্ষমা করে দাও মওলা তুমিই তো গফফার৷

মনগড়া নীতি, মাথাধরা রীতি
করে দিতে নিশ্চিহ্ন,
আজি এক হও, সবে ঐক্য পাতাও,
থেকো না-’ক বিচ্ছিন্ন।
আজো বাধ-অপরাধ চলছে অবাধ,
স্বাধীনতাতেও শূন্য,
ওরে এই হালেতেও হাত গুটিয়ে
বসে থাকা যে ঘৃণ্য।
দেখ, অপসংস্কৃতি, অপ-রাজনীতি,
অসঙ্গতিও বাড়ছে,
ওরা আমাদের ভোটে মসনদে চড়ে
আমাদেরকেই মারছে!
আর চুপ থেকো না, সাহস জোগাও,
কথা কও! কথা কও!
ছুটে এসো ভাই বিদ্রোহ তরে,
সবাই এক হও! এক হও!

বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও!
বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও!

আজো দুর্নীতি, গুম, খুন, ধর্ষণ
চলছে দিনেরাতে,
আজ মানুষ মানুষদের ভুলে গিয়ে
দানবপনায় মাতে।
হায়, আইন-প্রশাসন হয়েছে বন্দী,
সরকারি জেলখানায়,
তাই বারবার হয় শোষকের জয়,
দেশদ্রোহীদের হানায়।
সারাদেশ জুড়ে আজ ধুম পড়েছে
‘নোংরামি’ চর্চার,
কোনো বিত্তশালী, মন্ত্রী, নেতার
নাই কোনো বিচার।
এসব কীর্তি দমন করতে আজি
হও আগুয়ান হও!
ছুটে এসো ভাই বিদ্রোহ তরে,
সবাই এক হও! এক হও!

বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও!
বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও!

দেশ ও জাতির কথা ভুলে গেছে
নারীলোভী কবিদল,
তাই সত্য লিখতে পায় জেল ভয়,
বকরি ভেড়ার দল।
জনতাও আজ হয়েছে রোবট,
যেন অদ্ভুত মূর্তি,
তাই এই সুযোগেই ঘৃণ নেতারা
করছে মহাফুর্তি।
ভাস্কর্যের নামে নগ্গ মূর্তি
চৌরাস্তার মোড়ে,
আজ অর্ধনেংটা হয় নারীরা
বৈশাখীর হুল্লোড়ে।
জাগ্রত হও, ঐক্য পাতাও,
লাঠিও হস্তে লও!
ছুটে এসো ভাই বিদ্রোহ তরে,
সবাই এক হও! এক হও!

বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও!
বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও! বিদ্রোহী হও!

কবিতা: বিদ্রোহী হও, ০৯/০৭/২০১৮ ঈসায়ী,
বইয়ের নাম: ‘আরশের আজান’ (প্রকাশিতব্য)

অামপারা শেষ করেছে
পড়বে খুকি পাক কোরঅান,
ফুলের মতো গড়বে জীবন
মনের মাঝে খুশির বান।

মিষ্টি কিনে আনবে আব্বু
বাটতে পাড়ার লোকে,
মক্তবেতে যাবে খুকি
কোরঅান নিয়ে বুকে।

এস্তেগফার পাঠের পরে
পড়বে দরুদ নবীর পর,
ফাতেহাতে ছবক শুরু
সয়ছেনা আর খুকির তর।

রাত পেরিয়ে সকাল হবে
ডাকবে পায়রা বাক বাকুম,
অালেমা হবে খুকুমণি
জগত জুড়ে পড়বে ধুম।

[ফটিকছড়ি, চট্টগ্রাম ]

সেদিন কি করবে
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

তোমার পাপতো পাহাড় ছাড়িয়ে আকাশে
তবু তুমি চলছো দিব্যি বুক ফুলিয়ে সদর্পে
এ দর্প তোমার থাকবেনা ঠিক ভেঙে যাবে
কতো পাপ করলে নিজেকে পাপী ভাববে ?

ইট মারলে পাটকেল খেতে হয় গেছো ভুলে
নির্দিধায় তাই করছো অন্যায় হেসে-খেলে ,
এতোটা অন্যায় করেও দিব্যি যাচ্ছো ভুলে
অনুতপ্ত হবে আর কতোটা অন্যায় করলে ?

যে উঠোনে আজ তোমার অপকর্ম চলছে
সে উঠোনে অনেক পূর্বসূরি ঘুমিয়ে গেছে ,
তোমার পরেও অনেকেই আসবে এখানে
ঠিক একই ভাবে এ উঠোনে হারিয়ে যাবে ৷

অপরাধগুলোও করছো দিব্যি অন্তরালে
আবার মুখোশের অারালে মুখও লুকালে ,
যেদিন তোমার কর্মের মুখোশ খুলে যাবে
সে দিন কোন অন্তরালে নিজেকে লুকাবে ?

তুমিই নাকি সাধু এতো অপরাধের পরেও
আবার মিথ্যে গুণ-কীর্তনেরই কতো যাদুও ,
কোনদিন যদি তর্জনী উঠে আমার পক্ষেও
সেদিনই দেখবো কি করে নিজেকে বাঁচাও ?

মেয়েটি
- সৌরভ দুর্জয়

ক্লান্তময় শরীর নিয়ে ক্লান্তি ঢেকে হেসে যায় মেয়েটি;করো বিরুদ্ধে ধর্ষনের মামলা করে না,
ইভটিজিং এর শিকার হয়েছে বলে নালিশ দেয় না মোটেও,জীবনের ঘানি টেনে যায় নিরবধি
কতো সাবলিল ভাবে;চুপি চুপি।

পূজা পার্বণে ঈদে কিংবা মহরমে থাকে না বাড়তি আয়োজন,হয়তো এসবের নাই তার প্রয়োজন।
একই জীবন কতো জনের কতো কী যে প্রয়োজন,
মেয়টির করে না তার কিছুই আয়োজন।

সূর্য উঠে ডুবে যায়, বৃষ্টি পড়ে থেমে যায়,
শুধু থামে না তার জীবন,
যদিও তার নাই তেমন কিছুর প্রয়োজন।
দু'মুঠো ভাতের লাগি মেয়েটি কী না করে যার তার সাথে; পথ থেকে পথে দিনে এবং রাতে।

হায় জীবন! যতো দিন থাকবে বহমান, মেয়েটি হয়তো এভাবেই মিটাবে দু'মুঠো ভাতের প্রয়োজন।

০৮/১০/২০১৮

রাতের কামনা
- শাহিনা কাজল

রাত যত গভীর হয় অন্তরের
ভীষণ কাতরতায় মিশে জ্যোৎস্না ।
প্রিয়তমর চাওয়া-পাওয়ায়ও নামে অাকুলতা
রাতের গভীরতায় ঝিঝি পোকার কুয়াশা স্নান ।
চৌকাঠ ভরা মায়াবী অাধার
ভাল লাগে জোনাকির অালো।
খোলা জানালায় হাসনাহেনার কামুকতা
অমাবস্যাতিথি ,
কাঁধের চুল বেনী বরাবর
র্স্পশের আলীঙ্গন।
ভালবাসায় ভালবাসার সঙ্গম
এলোমেলো চাওয়ায় ফিরে পাওয়া জীবন
অদ্ভুত অনাকাঙ্ক্ষিত রাতের কামনা ।।

রবিন এখন একা

মো. এনামুল হক

রবিন যখন হাসপাতালে ভর্তি হল ডাক্তার তখন আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। মৃত্যুশয্যায় শুয়ে শুয়ে অল্প এই তরুণ জীবনটা পিছনে ফিরে চিন্তা করতে করতে আর মৃত্যুর প্রহর গুণতে গুণতে রবিনের সকাল বিকাল রাত্রি কোনরকমে চলে যাচ্ছিল। নতুন নার্স যেদিন থেকে ওর সেবার দায়িত্ব পেল সেদিন থেকে রবিন মনের মধ্যে গভীর এক টান অনুভব করা শুরু করল। সকাল বিকাল ওষুধ খাওয়ানোর সময় রবিন শুধুই ভাবতে থাকে, মানুষের চোখে এত মায়াও হয়! নিজের জীবনের চেয়েও ওই চোখের প্রতি তার মায়া বেড়ে যেতে থাকে। মৃত্যু পথযাত্রী রবিন একদিন প্রেমেই পরে যায়। নিশ্চুপ, নির্বাক ভালোবাসা। কিছুই প্রকাশ করে না রবিন। তার সে অবস্থাও নেই। পিছনের ফেলে আসা জীবন আর সামনের নিশ্চিত মৃত্যু – এই রুটিন কোথায় হারিয়ে যায় তার! ভাবে, আর পাঁচজনের মতই যদি স্বাভাবিক একটা জীবন পেত সে! একদিন বিকেলে ওষুধ খাওয়াতে আসে আরেকজন নার্স। রবিন বলেই ফেলে, ও এল না আজ? সিনিয়র নার্স মিতা সংবাদটা রবিনকে দিতে চায় না। মৃত্যু পথযাত্রী মানুষকে আরেকটা মৃত্যু সংবাদ শুনিয়ে তার ভীতি আরো বাড়িয়ে দেয়া! তবুও ভাবে, বললে আর কিই বা হবে? জানায়, আজ সকালের ডিউটি শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে রোড অ্যাক্সিডেন্টে ও পরপারে চলে গেছে। রবিন অস্ফুট স্বরে চিৎকার করে ওঠে, না…! ওষুধ খাইয়ে মিতা বিদায় নেয়। সেদিন রাতে ডাক্তার এসে রবিনকে বলে, আমরা তো আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম আপনার। কিন্তু আপনার আকস্মিক ইমপ্রুভমেন্ট আমাদের মেডিক্যাল সায়েন্সের ব্যাখ্যাতীত ব্যাপার! আর এক সপ্তাহ দেখে আপনাকে ডিসচার্জ করে দেয়া হবে। আপনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন। ডাক্তার স্মিত হেসে রুম থেকে বের হয়ে যায়, রোগীকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই। আসলে এ ধরণের অপ্রত্যাশিত খবরে রোগী অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে কিনা! রবিন নিজেই শূন্য ঘরে বলতে থাকে, আমার তাহলে এখন বেঁচে থেকেই বা কি হবে? আমার তো মরে যাওয়াই ভাল! ডিসচার্জ পেপার নিয়ে বাসায় ফেরে রবিন। প্রতিদিন সন্ধ্যায় চায়ের মগ নিয়ে ছাদে যায়। আকাশের জ্বলজ্বল শুকতারার দিকে চেয়ে থাকে ছলছল চোখ নিয়ে। চা শেষ করতে পারে না, শুরুই করতে পারে না কখনো কখনো! চোখের পানি গাল বেয়ে টুপ করে হাতে ধরা মগের মধ্যে গিয়ে পরে! অসীম আকাশ পানে তাকিয়ে কাকে যেন খোঁজে রবিন! কিন্তু যাকে খোঁজে তার তো আর ফেরার সুযোগ নেই। ছাদের কোণায় দাঁড়িয়ে ভাবে, ডাক্তার ভুলই বলেছিলেন। বেঁচে গেলেও ওই মায়ামুখের মায়া ত্যাগ করা তার পক্ষে সম্ভব না, স্বাভাবিক হওয়াও সম্ভব না। রবিন জানে, সে বাকি জীবনে তাকে ভুলতে পারবে না। ফুরাবে না তার চোখের পানি…

২৫ আষাঢ়, ১৪২৫
ঢাকা

সে আমাদের গাঁয়ের ছেলে, হামজা ওর নাম।
একসাথে বেড়েওঠা।
ওর বাবা গ্রামে ঘুরে চকলেট-চানাচুর ফেরি করে,
ওতেই ওদের সংসার চলে।
একদিন দুপুরবেলা কড়া রোদে ধানের মাঠে দেখা,
শাবল দিয়ে ঈদুরের গর্ত ভাঙ্গে।
ও হামজা, ধান পাইছো কেমন?
এখনো পাইনাই, আছে মনে অইতাছে,
এই, তোদের বাড়ি মুড়ি আছে নাকি?
না, শেষ হইয়া গেছে, আব্বা'র জ্বর,
হাটে যাইতে পারেনাই,
তাইলে বাদাম?
হ, আছে।
আমি ওদের বাড়ির পথে হাঁটা ধরেছি, অমনি ব্যস্ত হয়ে পিছু ডাকে
এই, হোন হোন।
গ্রামে ছেলে ধরা আইছে, সাবধানে যাইস!
আমি বিস্ময় ওর দিকে তাকাই!
কারে ধইরা নেছে?
কাঠিপাড়ায় একটা ছেলে, দুদিন ধইরা নিখোঁজ!
ওরে আল্লা, তাইলে তো খুবি সাঙ্ঘাতিক,
এ হামজা, বসে থাকনের কাম নাই, বাড়ি চল।
মোর সাথে শাবল আছে, আইলে মাথা ফাটাইয়া দিমু!
ও, তাইলে আমি কি করমু?
একটা ডাল ভেঙ্গে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়,
নে, এইডা হাতে রাখ।
কাছে আইলেই সাহস কইরা মারবি এক ঘা!
আমি সায় দিয়ে মাথা নাড়ি।
ভয়ে ভয়ে ওদের বাড়ির দিকে যাই, ছোট হতে খুব ভিতু আমি, এখনো তাই।
ওদের বাড়ি যেতে ঝোপ-জঙ্গল বেশ,
কুয়ার তলানি জলে লাফ দিয়ে ব্যঙ পড়ে, ঝুপ করে ডুব মেরে যায়।
কেয়া ঝাড়ের মাঝ দিয়ে একটা গুইসাপ সজোরে দৌড় দেয়, ঝরঝর ভেঙ্গেচুরে ঝড়ের বেগে,
বুকটা কেঁপে ওঠে আমার,
গ্রামে ছেলেধরা আসছে! বারবার মনে পড়ে কথা টা।
ওদের বাড়ির লতায় জড়ানো বটের আড়াল হতে এই বুঝি ছেলে ধরা বেড়িয়ে এলো, ওরা বুঝি মুখ চেপে বস্তায় পুরে, তাহলে আমি বস্তার মধ্যই মা বলে চিৎকার করবো।
আচ্ছা, ওরা কি মাথা কাইটা বস্তায় ঢুকায়!
আল্লা রে,
ভাবতে ভাবতে হামজাদের উঠানে এসে দাঁড়াই,
ওর মা, দাওয়ার পরে ঝাট দিচ্ছে, চুলায় আগুন জ্বলছে।
আমি পাছে ডাকি-
ও চাচি! তোমাদের বাড়ির বাগানে এতো গুইসাপ কেন বলতো, খুব ভয় পাইছি আমি।
চাচি হাসে।
ও তোরে কামড়াবে না বাপ,
ঘরে আয়, বস,
আমাকে পিড়ি এগিয়ে দেয়।
ও চাচি! গ্রামে নাকি ছেলেধরা আইছে?
হ, হুননাই!
জমুনা গাঙ্গে বিরাট ব্রিজ বানাইতাছে, কিন্তু ব্রিজ তো হয়না, খালি ভাইঙ্গা যায়, তারপর পীরবাবা স্বপ্ন দেখছে, কল্লা দেওন লাগবে, কম হইলেও কুড়ি টা!
আমি অবাক হয়ে তার কথা শুনি,
কি কও চাচি, কুড়ি টা কল্লা!
ও চাচি! কাউরে কি নিছে নাকি?
হ, হুননাই! কাডিপাড়ায় দুইডা পোলা'র কোনো খোঁজ নাই!
ও বাপ, মোর হামজা কোম্মে গেল, দেখছ নাহি?
হ, দেখছি তো? ইন্দুরের গর্ত খোঁচে।
ও চাচি! আমারে একটু বাড়িতে দিয়া আসবা?
ক্যা, বাদাম নিবি না?
না চাচি, আমারে বাড়ি দিয়া আসো,
আমার খুব ডর লাগে।
ঘরে আয়, ডরাইস না, কিচ্ছু অইবেনা।
ধান কতটুক আনছো, এক সের?
হয়,
চুরি করছ?
আরে কি কও চাচি, মা দিছে, কইছে মুড়ি নিতে।
ও বাপ, তোর মা'রে একবার আইতে কইস,
আচ্ছা,
আমারে আগাইয়া দাও চাচি,
আমি খাড়াইয়া আছি, তুই যা, কিচ্ছু হইবেনা।
আচ্ছা, চাইয়া থাইকো, যাইওনা কইলাম।

আমি রাস্তা দিয়ে একদৌড়ে হামজার কাছে এসে দাঁড়াই,
তখনো ও মাটি খুড়ছে,
কিরে হামজা! ঝুড়ি যে খালি, ধান পাওনাই?
না, ইন্দুর মনে অয় গর্ত থুইয়া পলাইছে, বেহুদা খাটলাম!
আমি ভয়ে ভয়ে গুরুত্ব দিয়ে ওর কথা শুনি, ও অনেককিছু জানে, এতো খবর ক্যমনে পায়!
এই, তুই কি ছেলেধরা দেখছ নাহি?
হ, দেখছিই তো, বড় একটা বোস্তা লইয়া একজন আইছিল, আমারে নাম জিগাইছিল,
আমি ডরাইনাই, কইছি নাম কমু ক্যন?
তারপর হাতে শাবল দেইখ্যা পলাইছে!
হের বোস্তার মধ্য মনে অয় দুইডা কল্লা আছে, দেইখা তো হেইডাই মনে অইলো।
ভয়ে আমি কাতর হয়ে যাই
কও কি হামজা, হাচা?
হ, বিদ্যার কিড়া দিয়া কইলাম।
এ হামজা, এহন তাইলে বাড়ি যা, দুই-তিনজন একসাথে আইলে তুই কি হেগো লগে বলে পারবি?
ও মাথা নাড়ে,
হ ঠিক কইছো,
উঠে দাঁড়ায় ও, শাবল কাঁধে নিয়ে ঝুড়ি মাথায় আঁটে,
তারপর গান গাইতে গাইতে বাড়ির দিকে যায়।
আমি ওর চলে যাওয়া দেখছি,
সাহস আছে ওর, ছেলেধরাও ভয় পায়না,
আল্লারে আল্লাহ।

কবে একদিন হামজার বাবা-মা গ্রাম ছেড়ে চলে গিয়েছিল, আর দেখা হয়না ওর সাথে।
মাঝেমধ্যে ওর বাবা এ গাঁয়ে আসতো,
খুব গল্প করে- হামজা লেখাপড়ায় খুব ভালো, বৃত্তি পেয়েছে এ বছর, ক্লাসে ও ফাস্ট বয়! বিস্তার আলোচনা।
হেংলা পাতলা ওর বাবা, ঘিয়ে রঙা কালো চেক পাঞ্জাবি পড়ে,
শুনেছি চোখে একটু কম দেখে।
ওর কথা জিজ্ঞাসা করতে হয়না, অনায়াসে সব খবর বলে দেয়।
আমাদের মেজো চাচার ঘরে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করতো, আমি চুপ করে শুনতাম। ভাবতাম, চাচা এবার অনেক ধনি হয়ে যাবে, কত ভালো ছাত্র হামজা, ভালো চাকরি পাবে, ভালো বেতন হবে, ওদের অনেক সুখ হবে।

অনেকদিন পর হামজার সাথে দেখা,
মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য ঢাকায় এসেছে।
আমাদের কম্পানিতে যব নিলো, নতুন বলে বেতন খুবি কম, বিয়ে করেনি, যা পায় তা দিয়ে মা-বাবা কে পাঠিয়ে নিজে কোনরকম চলে।
একবার অনেকদিন দেখা নাই ওর সাথে।
শুনলাম ও চাকরি ছেড়ে চলে গেছে! ভাবলাম ভালো কোন জব পেয়েছে। কিন্তু ভাবনাটা একদম সত্যি না।
বাজারে যেতে পথে একদিন দেখা, জড়িয়ে ধরলাম ওকে,
একবার বলেও গেলি না ভাই!
হঠাত চাকরি ছাড়ছি, বলার সুযোগ পাইনি,
কি কর এখন?
বিষণ্ণ লাগছে ওকে, একটা নিশ্বাস ফেলে অনিচ্ছার হাসি হাসে-
চাকরি করি!
হুম, বুঝলাম, বেতন কেমন?
এই আছে আর কি, চলে!
আয়, চা খা।
না, আজ ইচ্ছে নেই, অন্যদিন খাবো।
যাই রে, পরে কথা হবে।

অনেকদিনে ওর আর কোন খবর নেই, খুব করে ভাবছিলাম ওকে,
বয়স পেড়িয়ে যায়, বিয়ে সংসার কিছুই হলনা ওর,
আমার সেই ভাবনার সাথে বাস্তবিক কত অমিল!
হামজা ভালো ছাত্র, ভালো জব পাবে।
বাবা অভাবি সংসারে না খেয়ে পড়ার খরচ চালিয়েছেন, পড়ার অধ্যায় শেষ করে চাকরি খুঁজতে বছরের পর বছর পথ মাড়ানো, কি করে চলছে জীবন!

একদিন খুব সকালে আমার বাসায় এসে হাজির হয়,
দ্বার খুলি, ওকে দেখে আশ্চর্য হই!
শুকনা মুখ, কোঠরে ঢোকা চোখ, মুখের কোন শ্রী নেই, মনে হচ্ছে কতদিনের উপবাস।
তোর এমন হাল কেন! ভেতরে আয়,
অনিচ্ছুক হাসে ও-
কেন, কি দেখছ?
মুখের এমন হাল কেন, ঘুমাস না?
মাথা নিচু করে জবাব দেয় ও
হুম, ঘুমাইতো।
কই ছিলি এতদিন?
ছিলাম, ঘোরাফেরারর উপরে,
নাস্তা খাইছ?
না, খেতে ইচ্ছে করেনা।
কি সব আজেবাজে বকিস,
চল দোকানে যাই।

অনেকক্ষণ আলাপ হয় ওর সাথে,
ওর বাবা মারা গেছেন দশদিন হয়, বাড়ি হতে ফিরছে আজ,
একজন ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছে পথে, বলছে একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিবেন।
এবেলা থাকতে বললাম খুবকরে, থাকতে চাচ্ছেনা,
যাবার জন্য খুব জোর করছে, কিন্তু তেমন শক্তি খেয়াল হয়নি,
আমি বললাম- কি ব্যাপার, সমস্যা কোন?
ইতস্ততভাবে চুপ করে থাকে,
টাকা নাই?
ও ব্যস্ত হয়,
না, আছে!
কি লুকাচ্ছিস, আমাকে বল,
ও আমতাআমতা করে বলে-
আসলে হইছে কি, আমার পড়নে যে প্যান্ট টা দেখছিস, এটা বদলানোর কোন লুঙ্গি নাই,
তোর যদি পুরানো কোন লুঙ্গি থাকে...
আমি, মৃদু হাসি,
ওহ, এই কথা!
দাঁড়া, আমি আনছি,

আজ চার মাস হয় ওর সাথে যোগাযোগ নেই, মন টা খুব আনচান করছে, কখন কখনো খুব করে ভাবি- কি পেলো জীবনে,
না নিজে কিছু, না বাবা মা।

খুব জানতে ইচ্ছে করে কেমন আছে ও,
চাকরি টা পেয়েছে কি? যে টাকা বেতন পায় তা দিয়ে ওর নিজের আর মায়ের চলে তো!
একবার যদি খবর দিতিস, বড়জোর হালকা হতাম ভাই।

হিংস্র শকুনের প্রতি
- শাহিনা কাজল

শকুন, চারপাশে শকুন, সোনার বাংলা জুড়ে,
উন্নয়নের ভিজে বারান্দায় অনেক শকুন
চক্র অথবা দণ্ডায়মান শকুন।
সোনালী ভোরে শিশির বিন্দুর মত
পরিপাটি শকুন সুযোগ না ছাড়া বুনো দাঁতাল।
আষাঢ়ে মেঘের বিকেলে কিংবা সন্ধ্যায়
লাল, নীল, সবুজ বাতির চৌকস শকুন-
সহস্র শকুনের চকচকে তীক্ষ্ণ চোখের ভেতর
জাগ্রত আমার বাংলাদেশ।

অনেক হয়েছে এবার বিদেয় হও, আর নয়।
নিয়েছো স্বাদ তরতাজা কাঁচা মাংসের! আর কত?
হিংস্র নখরে দেখেছি তাজা রক্তের আর্তনাদ
ক্ষত-বিক্ষত করেছো মানচিত্রের প্রতিটা অক্ষর।
ঝরায়েছো তরুণ মেধাবীর চোখ,
আধোমৃত বৃদ্ধার ঠোঁট। অকেজো আবেগ,
আর কত? চাই কতো আর পূজা তনুর দেহ?
দিন শেষ। আজ জাগ্রত বাংলা
বাঙালীর হাত বীরের খেতাবে আরো শক্ত
বজ্র কঠিন বাস্তব।

আর কোনো তনু সালামার দেহে পড়লে হিংস্রতার
বিষাক্ত আঁচড়, জ্বলবে দাউ দাউ
জ্বালাবো দাবানল দলবেঁধে সব তনু।
সময় হয়েছে জাগার এবং জাগাবার
আমি আগ্নেয়গিরির পথে দীপ্ত শপথ
আর অগ্ন্যুৎপাতের কথা বলছি।
বায়ান্ন কিংবা একাত্তরের কথাও শুনাই।
আর শুনাই পরিচ্ছন্ন বাংলা মাটির সুর।
আমার দেশ হবে শকুনমুক্ত
নির্মল বাতাসে নীল আকাশের নীচে সোনার বাংলাদেশ।

বৌ কথা কও
- ইরাবতী মণ্ডল

মেয়েটি যখন প্রতিদিন জল আনতে যেত পুকুর ঘাটে,
লাজুক চোখের ছেলেটি দেখতো তাকে আড়ে আড়ে।
ঐ সময় ছেলেটির যাওয়া চাই ঐ পথ দিয়ে।
মেয়েটি ও কলসী ভরতে ভরতে বাঁকা চোখে দেখতো তাকে।
তারপর কদিন ছেলেটি তাকে দেখতে পেলো না।
খোঁজ নিয়ে জানলো,মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে।
চলে গেছে সে শ্বশুর বাড়ি।
মেয়েটি আর জল ভরতে আসে না।
ছেলেটি তবুও যায় ঐ পথে।
মনে মনে কল্পনা করে,টানাটানা দুটি আঁখি বাঁকা চোখে দেখছে তাকে।
সে আকুল হয়ে এদিক ওদিক খোঁজে।
আর ঠিক তখুনি ঝোপের আড়াল থেকে হলুদ পাখিটি ডেকে ওঠে,'বৌ কথা কও'।

শুধু তুমি
- মরিয়ম আক্তার রিমা

মনের মাঝে ঘুরিয়া ফিরিয়া
তোমারে দেখি যে বারেবারে,
আমি ক্লান্ত হইয়া হাতড়িয়া বেড়াই
মিথ্যা নামক মরিচিকারে।
আমি নিজেরে ভুলিয়া তোমারে বুঝি
এমনটাই আমি স্বার্থপর,
হৃদয় প্রাসাদে তোমারে রাখিয়া
খুজে যে বেড়াই কুঁড়ে ঘর।
আলেয়া হইয়া পিছুঁ নেই তোমার
হই যে তোমার সমুদ্র...
আমি জানিনা আমায়; বুঝি না হেথায়
কোথায় আমার সীমান্ত।
আমার বক্ষ মাঝে তোমারে রাখিয়া
সইতে পারি সব অত্যাচার,
শত আঘাতে শত বেদনায়
তোমাকে চেয়েছি বারেবার।
মরিচিকা তুমি নাকি আলেয়া
দেখতে যাইনি ছুয়ে....
ভালোবাসার পরশ লতা
পড়েনি আজও নুয়ে।
আছ তুমি হৃদয় কোনে
মোর সকল কল্পনাতে,
আমি তোমার মাঝে হতে চাই বিলিন
হারাতে তোমার সাথে।
আমি চোঁখ বুজিয়া তোমাকে দেখি
অন্ধকারের মাঝে,,,,
কানের মাঝে শুধুই তোমার
মধুর কথাই বাজে।।
আমি আমার হয়েও তোমার মাঝে
হতে চাই শুধু একাকার,
ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমায়
বলতে চাই তাই বারেবার।।

ভাবি না একবার
- সৌরভ দুর্জয়

একই বৃন্তে ফুটে ফুল
ফোটে বৃন্তে বৃন্তে
পরাগায়ন থেকে পরাগায়ন হয়ে
ফুল নাম নিয়ে।

একই আদম সন্তান জন্ম নেয় ঘরে ঘরে
খৃষ্টান মুসলমান বৌদ্ধ হিন্দু ইত্যাদি সব নামে
শুধু মানুষ নামে নয়।

বনের ফুলে ভেদ বিভেদ নাই
মানুষে মানুষে আছে বিস্তর
ভাবি না কেউ কথাটা একবার
সৃষ্টি করি বিভেদ তাই বার বার।

০৭/০৭/২০১৮
ঢাকা।

শত ক্লান্তি মুহুর্তেই ক্রমশ আমাকে আকড়ে ধরেছিলো,
কিন্তুু এই ভুবনে আজ যার সাথে পরিচয় হয়েছি, সে আমাকে সব কিছু ভুলিয়ে দিলো। নিজের অজান্তেই
এরকম একটি মুহুর্ত, উপহার পেলাম। সত্যি তা ভাষায় প্রকাশ করতে হলে ও কিছুটা সময় আমাকে স্তম্ভিত করে রেখেছিলো। সে আমাদের মোহনা। মোহনা তুমি আমায় এতটুকু আপন করে নিবে, আমি ভাবতে পারিনি?
যতদিন এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবো, টিক ততদিন তোমাকে ভুলা যাবেনা!

ট্রেনে ফিরছিলাম, কুলাউড়া জংশন থেকে শ্রীমঙ্গল রেলস্টেশন। পাশের সিটে একটি ছোট্ট মেয়ে বসে আছে,
বৃদ্ধা মহিলার কোলে। উনার সাথে কথা বলা শুরু,
তিনি এই ছোট্ট মেয়েটিকে পাঁচ বছর লালন করে আসছেন। মেয়েটির নাম মোহনা।

ওর মা নাকি, ওকে জন্ম দেওয়ার পর, পাঁচ দিনের দিন মারা যান দুরারোগ্য রোগে। শুনতে খুব কস্ট হচ্ছিলো, নিজেকে তখন এতিম
মনে হয়েছিলো, আমি স্তম্ভিত গেলাম।
ওর জায়গায় নিজেকে দাঁড় করাতেই, গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গিয়েছিলো।
লিখতে গিয়ে হাত অনেকবার কেঁপে-কেঁপে উঠছিলো,
এ আমি কি লিখছি?
মোহনার কণ্ঠে যা শুনলাম:

আমার মা নেই, গো আংকেল, আমাকে রেখে উনি চলে গেছেন দুরে, কিন্তু মা আসবে।

ওর কথাগুলো কানে যেমন বার বার শুনতে পাচ্ছি,
হায় পৃথিবী তুমি এতো নিষ্টুর কেনো?

চোখগুলো টলটল করতেছিলো, জানি মুখ বুঝে
সহ্য করতে হবে, তারপর মোহনাকে খুশি করার জন্যে,
মোবাইলের টম এন্ড জেরি কার্টুন আর কার গেম
যেনো মোহনাকে সব ভুলিয়ে দিয়েছিলো!
কেনো এমন হয়, শুনতে, বলতে, বুঝতে সবকিছু তেই!

মোহনা তুমি বেঁচে থাকো সকলের মাঝে, সবার মাঝে
বেঁচে থাকার অধিকার হয়তো, তোমারই আছে।

বি.দ্র: [বাস্তবতার সাথেই মিল করে লেখা ছোট্ট গল্প,
হয়তো সবার ভালো নাও, লাগতে পারে। ]


মুচকী হাসে অদক্ষ সময়
- সাগর আল হেলাল
====================

ঝিনুকের ঠোঁটে ঠোঁট ঘসে চাঁদ
জোছনারা গ’লে গ’লে পড়ে মুক্তোর শরীরে,
আকাশেরা শয্যা করেছিলো
আলোকিত নীল সমুদ্রে
লাল কাঁকড়ায় ঘুমোতে দেয় নি নিলীমাদের...


গহীনে ডুবে যাওয়া দূরের নক্ষত্র
নদী ভাঙা জীবনে বুক ভাঙা ভালোবাসায় একাকার,
আজ তার আত্মসমর্পনের সুবর্ণক্ষণ-
পিঙ্গলার ঘাটে সন্ধ্যার ডুবে যাওয়া রোদযুবক
সলিলে ব্যস্ত নীড় রচনায়...

জল ছুঁয়ে উড়ে যায় মন প্রজাপতি
ডুব দিয়ে সাঁতার কাটে সাদা মেঘ দক্ষিণে,
ঈশাণে মুচকী হাসে অদক্ষ সময়
বাতাসে উড়ে বেড়ায় তেজকটাল প্রহর
সব নদী সব সমুদ্র ভীঁড় জমিয়েছে একই মোহনায়...

মুক্তোর কারবারীরা জেগেছে সবাই
জল-স্থল-মরু, চিরহরিৎ মসৃণ অরণ্য সবুজ
জাগরণ সর্বত্র,
সবখানে তড়িঘড়ি সাজসাজ রব
শুধু সময় নিথর চাঁদ আর ঝিনুকের ঠোঁটে...
-
০৬.০৭.২০১৮

হঠাৎ সে বলে
- সোনালী মন্ডল আইচ

জীভছোলার বদলে
লজেন্স চুষলেও ঠিক হয়ে যায়
আর হাঁ করে জিভ দেখায়

দোলনা বাতাসে ঝুলবারান্দায়
অন্ধকারের সাথে খুব গল্প হয়

সে একদিন মরুভূমির জ্বর মেপেছিল
তাপমাত্রা জানতে চাইলে জোরে হেসে ওঠে...

হে প্রভু জগন্নাথ, করি হে নিবেদন
তোমার মাঝেই করি, নিজেকে সমর্পণ!
ভুল-ত্রুটি সকলের করো হে ক্ষমা,
তোমার কাছে আমার, এই কামনা।

হিংসা-নিন্দা করো হে পতন
মনকে শক্ত করো, এই তো ধারন!
জয় জগন্নাথ-জয় জগন্নাথ ধ্বনিতে সবাই
প্রেমময় আনন্দ কেহ বুঝে, কেহ বুঝে নাই।

ছোট-বড় সবাই, ধরেছি রথের রশি
প্রভু হে জগন্নাথ, তাইতো সবাই খুশি!
এই তো আনন্দ, এই-তো চাওয়া,
রথের ই আনন্দ, জীবনের সবচেয়ে পাওয়া।

সর্ব ভক্তকে জানাই প্রণিপাদ
জগন্নাথ তুমি অনাথের নাথ!
চরণে আমায় দি ও গো ঠাঁই
করি এই বাসনা, আমার কেহ নাই।

বি.দ্র: [সবাইকে রথযাত্রার শুভেচ্ছা]

মেয়াদ উত্তীর্ণ হাসি
- সৌরভ দুর্জয়

আমার হাসিগুলো খুব শিঘ্রই মেয়াদ উত্তীর্ণ
হয়ে যাবে, ওদের আর বাঁচাতে পারলাম না।

চারি দিকে অনাচার; বুক ভরা হাহাকার,
আমার সংসারও যার অংশিদার,
জীবনে তাই হাসতে পারলাম না একবার।

কতো দামী হাসিগুলো কষ্টের সাথে কাঁদতে কাঁদতে, বেদামী হয়ে মিশে যাবে মিশে যাবে
অচেনা কোন মাটির সাথে।

কী আর করা! ধরে নিবো;
আমার জীবনে কোন হাসি ছিলো না।

মেয়াদ উত্তীর্ণ হাসিদের দেখে চোখের
নোনা জল মুছতে মুছতে আমার মেয়াদও
উত্তীর্ণ হয়ে যাবে যে কোনে সময়।

০৬/০৭/২০১৮

বাদ বিবাদ
- মীনা দে

কথারা সব রাস্তা দিয়ে হাঁটে,আস্থির
ওই বুঝি ধেয়ে এলো, প্রতিবাদের তীর

ভয়ে ভয়ে থাকে সারাদিন অশান্ত
তবু কত কথা বলা হয়ে যায়, অনন্ত

কথারা থামবে না কোনদিন,চলবেই
নামুক না আঘাত প্রতিঘাত তবু বলবেই

সব কথা থেমে গেলে ভয় হয় ভীষণ
বোবা শত্রুরা গিলে নেবে সব দিনক্ষণ

কথারা চলুক, চলুক না জোর প্রতিবাদ
তর্ক বিতর্ক হোক নিয়ম রীতিতে, নির্বিবাদ ।

ঘুমন্ত পৃথিবী জেগে উঠল
- অনিতা পান্ডে

ঘুমন্ত পৃথিবী জেগে উঠলো,
আমাকে কাছে ডাকলো,
নিবিড় আলিঙ্গনে, কানে কানে শুধালো,
এসো হে মানবী--
সকালের মিষ্টি আমন্ত্রণে !
দেহ নামক যন্ত্রটাকে ,
নাও একটু ঝালিয়ে
এই তো উপযুক্ত সময় !
দ্রূত পা চালাও, প্রাণ খুলে নিশ্বাস নাও,
সবুজ বাতায়নে দৃষ্টি শক্তিকে কর প্রখর।
বিশুদ্ধ বাতাস গায়ে মাখো,
রোগমুক্তি পাবে অকস্মাৎ !
একটু দৌড়াও---
শরীরের জমে থাকা জড়ত্বটা যাবে বহু দূর—
পাবে তুমি নতুন জীবন নিমিশেই,
শরীর, মন সতেজ হবে,
সকল যুদ্ধেই তৈরী তুমি ,
সাহসী, যোদ্ধা, বীর !

বেঁচে আছি মন্দ কী
- সৌরভ দুর্জয়

আমার সারা শরীর জুড়ে ব্যাথা,
দই চোখ ভরা কান্না;বুক ভরা হাহাকার,
মুখ জুড়ে কলঙ্ক রেখা আঁকা।

এতো কিছু সইবার নয়;তবু সইতে হয়,
কতো কিছু বলবার আছে যা নাহি বলা যায়,
এভাবেই আমার দিন রাত পার হয়।

নৌকায় উঠি নৌকা ডুবে যায়,
ধান বুনি পঙ্গপালে খেয়ে যায়,
লাঙ্গল ধরি তার ফলা ভেঙ্গে যায়।

স্বপ্ন দেখি;ঘুম ভেঙ্গে যায়, কতো অনুনয় বিনয়ে
আবেদন করি; খারিজ হয়ে যায়,
তাই বুঝি থামে না অত্যাচার;কমে না অনাচার।

আমার শরীরখানা যখন যে পায়,
কেমন যেন তার হয়ে যায়,
এবং আমাকে ব্যাথা দেয়;ইচ্ছে মতো কাঁদায়।

মুক্তির আবেন করি খারিজ হয়ে যায়,
প্রতিবাদ করি বাতাসে উবে যায়,
নিরন্তর তাই অত্যাচার অনাচার সইতে হয়।

তবুও বেঁচে আছি মন্দ কী!
চারিদিকে কতো গুম খুন কানাকানি করে;
অন্তত তাদের থেকে তো দূরে আছি।

০৬/০৭/২০১৮
ফরিদপুর।

মেঘলা দিনের কাব্যকথা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

মেঘলা আকাশ ছায়াতলে,
গাছের মাথা দোলে।
ঘাসের মাথায় রং ধরেছে,
রঙিন শুভ্র ফুলে।
মাতাল হাওয়া এলোমেলো,
বইছে চতুর্দিকে।
সবুজ বনের মাথায় মাথায়,
আকাশ রঙে ফিকে।
পলাশ কদম শখায় শাখায়,
পুকুর জলে পদ্মবাহার।
চোখ জুড়ানো সবুজ পাতায়,
ছাউনি চমৎকার।
বিহগ বিহগী জোড়া জোড়া,
আমড়া গাছের ডালে।
চঁচু খেলার আলিঙ্গনে,
প্রেমের কথা বলে।
অধরে অধর মাঠের শেষে,
আকাশ ছুঁয়ে ভুমি।
জল-কুয়াশায় সিক্ত হৃদয়,
যে যার অনুগামী।

 

দিগন্তে দেখি মহাকাল
- শাহিনা কাজল

মেঘবতী অথচ গম্ভীর রাতের দেয়ালে
বিপ্রতীপ কোণে আঁকি কিম্ভুত সমকোণ
আচানক জানালায় কাঁদে নিভৃত রজনী
ঝরে পড়া উল্কার বিপরীত পাশে একাকি সুখ
জাত ভুলে গেয়ে যায় সুরেলা পাখি
গ্যালাক্সির দ্বীপে ঝরে ঝরে পড়ে
ধবল মেঘের ঢেউ
অন্তর্বাস খুলে বার বার দেখে নেয়
স্রোতের গতিপথ, সময়ের সান্নিধ্যে
মিহিন কিংবা সুক্ষ্ণ চিৎকারে পার হয়ে যায়
মমিকৃত ব্যকুল নদী।
অস্কারে মনোনীত ভূগোলের পাঠ
বিশ্বাসহীনতায় কাঁদে থলে ভরা রাত
সহযাত্রী ওই চোখ ভাঙা জল।


অণুকবিতা
- সাগর আল হেলাল
==================

তুমি আর আমি একই কোসায়
গাঙ পাড় হই আজকের ঊষায়,

কাল থেকে হবো অচেনা দুজন-
পরিবর্তন কি থাকবে না খোসায় !
-
০২.০৭.২০১৮

স্রষ্টা ও সৃষ্টি
- সাগর আল হেলাল
===================

কুর্নিশ পায় রাজা মহারাজা
ঈশ্বর তারও বড়ো,
তাকে তুমি কি দিতে পারো
একটু চিন্তা করো !


নাম যার স্রষ্টা দয়ার সাগর
বিশ্ব অধিপতি,
নাই অভাব তার কোন কিছুতেই
তুমিতো ক্ষুদ্র অতি !

যেখান থেকে এসেছো তুমি
সেখানেই ফিরে যাবে,
চোখ মেলে তুমি তাকাবে যখন
তাকেই দেখতে পাবে।

দিতে যদি চাও দাও প্রেম দাও
তারই সৃষ্টি মাঝে,
সৃষ্টি ও স্রষ্টা গাঁথা এক সূত্রে
কথাটা ভুলিও না যে !
-
০২,০৭.২০১৮

এবং নীলাঞ্জনা দোর খোলো
- মোশ্ রাফি মুকুল

এবং
নীলাঞ্জনা দোর খোলো-
দোর খোলো নীলাঞ্জনা।
অতঃপর
তোমার আঁচল থেকে ছড়িয়ে দাও মুঠো মুঠো প্রেম।

নীলিমায় নীল নেই-
ভালোবাসার সমুদ্র কুটিকুটি করছে উত্তরাধুনিক আরশোলা,
সাইবেরিয়া থেকে সাহারায় উছলে পড়ছে যোগ-বিয়োগের ঢেউ
'না পাওয়া'র তীব্র তীরে বিদ্ধ হচ্ছে সময়ের কর্নিয়া।

নীলচোখ,নীলাকাশ,নীলসাগর-
কোথাও নীল খুঁজে পাবেনা তুমি,
নীলমোহনায় তবু খোঁজাখুঁজি
নীলকমল-
অরণ্যে অরণ্যে খুঁজে যাই নীলগাই;

কোথাও নীল নেই-
নেই নীলাভ নীলার বিচ্ছুরণ;
চারিদিকে নীলনকশা,নীলিম প্রেমিক- আর নীলকর!

নীলাঞ্জনা বরং তোমাকেই খুলে দাও-
নীল শুভ্রতায় ভরে দাও মেঘাবৃত আকাশ এবং
সব প্রলুব্ধ অন্ধকার।

অব্যক্ত
- শ্রাবনী সোম যশ

তুই ছুঁয়ে দিলেই কথা গুলো সুর হয়ে যায়!
আর ভালোবাসলেই জীবনটা বাগান!
চুপিসাড়ে পাশে বসলে খুশি রোদ্দুর হয়ে যায়!
আর চোখে চোখ রাখলেই দৃষ্টি মাতাল!
আঙুলে আঙুল জড়ালে শরীর বিদ্যুৎ হয়ে যায়!
কোলে মাথা রাখলে চিবুক পাহাড়ি ঝর্ণা!
ঠোঁটে ঠোঁট রাখলেই রক্ত দাবানল হয়ে যায়!
স্বপ্ন ভাঙলে মনটা বাউল!
সব আ-বলা কথাগুলো বললেই আমি ধানক্ষেত হয়ে যাই!!

কালো মেয়ে
-----------------
জুয়েল মিয়াজি।

বাড়ির ছোট ছেলে বিয়ে করবে তাই পাত্রী দেখা হচ্ছে। বিয়ের বয়স তার অনেক অাগেই হয়েছিল।ছেলে প্রতিজ্ঞা করেছিল বোনদের বিয়ে না দিয়ে সে বিয়ে করবে না।এখন আপাতত একটা ছাড়া বাকি বোনদের বিয়ে দেওয়া হয়ে গেছে।ও মর্জিয়া,ক্লাস সেভেনে পড়ে।এখন শুধু ওর বিয়েটাই বাকী। কিন্তু ভাই যদি ছোট বোনের বিয়ের অপেক্ষা করে তবে বয়স তার চল্লিশ ছাড়িয়ে যাবে। তাই তাড়াহুড়ো করে মেয়ে দেখা হচ্ছে।বিদেশ ফেরত পাত্রের জন্য কচি মেয়ে চাই বয়স বিশ বাইশ হলে চলবে, পড়াশোনা থাকতে হবে।অার অবশ্যই অবশ্যই পাত্রীর গায়ের রঙ ফর্সা হতে হবে।অালমাসের মায়ের যুক্তি অামাদের কালো ছেলের জন্য ফর্সা মেয়ে লাগবে। নয়তো দেখা যাবে যে নাতিনাতনিগুলি কালো কালো ভূতের মত হইবে। বংশের মুখ অালোকিত করে একটা সুন্দর শিশু অামার অালমাসের ঘরে জন্মাবে আমার বহু দিনের খায়েস! বুঝলি অামির অালী? ঘটক অামির অালী মাথা নাড়ায়, জ্বি খালাআম্মা বুঝছি।অাপনি কোন টেনশন কইরেন না,অাগে অাল্লাহ! আমগো অালমাস ভাইয়ের কপালে একটা সুন্দর মেয়েই জুটবে।অামার উপর ভরসা রাখুন।কিন্তু ভরসা রাখা গেলো না অামির অালীর উপর।এখন পর্যন্ত সে যতগুলি মেয়ের ফটোগ্রাফ নিয়ে এসেছে তার একটাও সুন্দর না।দেখা যাচ্ছে যে নাক সুন্দর চোখ সুন্দর গায়ের রঙ কুচকুচে কালো।অাবার শরীর ফর্সা হলেও চেহারা দেখে মায়া লাগে না। এদিকে ঘটক অামির অালীর যুক্তি অন্য রকম, তার মতে কালো রঙের কোন মানুষ নেই পৃথিবীতে।মানুষ সাদা সুন্দর, লাল সুন্দর,কফি কালারের সুন্দর হয়ে থাকে।আর যাদের গায়ের রঙ কোন যুক্তিতেই ফর্সা বলা যায় না,অামির অালীর মতে তারা কাঁঠালি রঙের মানুষ।কিন্তু ঘটক অামির অালীর যুক্তি কোন ভাবেই পাত্রপক্ষ যৌক্তিক মনে করতে পারলো না।তাই প্রতিদিন সন্ধ্যায় অালমাস তার মা এবং ঘটক মিলে পাত্রীদের ফটোগ্রাফ নিয়ে চিন্তা গবেষণা করেন আর কালো মেয়েদের গায়ের রঙ নিয়ে ঠাট্টাতামাসা করতে থাকেন।ছি! ছি এটা মাইয়া না কি মাইয়ার নানি ।বুড়াঅাঅা! এ মাইয়ারে বিয়া করবে কোন পোলা।ছি ছি তুই কি চোখের মাথা খাইছস নাকি?আমার পোলার লগে এ মাইয়ার মিলব? অামির অালী পাত্রেরমা কে আবারো অাশার অালো দেখায়, নতুন ফটোগ্রাফ হাতে দিয়ে।কিন্তু না,এটাও মন মতো হয় না।তাই অাবারো শুরু হয় নিন্দার বচন। যেনো ঘরময় কালো মেয়েরা কালো রঙ ছড়িয়ে অালমাসের মায়ের বুকের ব্যথা বাড়িয়ে তোলে।তাই কোনোভাবেই তার ঘ্যানঘ্যানানি থামে না। ঘরে এসময় তাদের সাথে বাড়ির অবিবাহিত মেয়ে মর্জিয়াও থাকে।সে মনোযোগ দিয়ে বড়দের কথা শুনতে থাকে আর কি জানি ভাবতে থাকে ।সেদিন সন্ধ্যায়ও প্রতিদিনের মত এক কালো রঙের পাত্রীর গায়ের রঙ নিয়ে কথা হচ্ছিল।মর্জিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে বড়দের কথা শুনতে শুনতে হঠাৎ ভাইয়ের কাছে আবদার করে বসলো ভাইয়া, তুমি এবার বিদেশ গিয়ে আমার জন্য অনেকগুলি স্নো পাউডার পাঠাইও।

উঠোনের জলে
- শাহিনা কাজল

ফুল দেখলেই বসন্ত জাগে হৃদয়ের ভূ-খন্ডে
ভিজে যায় প্রতিবেশী শব্দ শিকারী
মহাকাল লিখে রাখে নির্জন রাত
সমুদ্রের তুমুল গর্জনে ভরে যায় উঠোন
বাদানুবাদে উঠে আসে শিহরণ
উঠোনের জলে ভিজে যায় সুখ।

বাড়ন্ত বেলায় জোয়ার এসেছে কবিতায়
নিরব দর্শক অতীত খুলে খোঁজে ইতিহাস
বুকের বন্ধ দরজা খোলা পেয়ে
উড়ে যায় সাদা কবুতর
আরশির পাতায় পড়ে বর্নিল ছায়া।

বানভাসি হৃদয়ের খিড়কি খুলে
গভীর সমুদ্র থেকে উঁকি দেয় বৃষ্টিতে ভেজা চোখ
আধ বোজা ঝাপসা নির্জনতার খাদে
ডুবে যায় গ্রাম্য আঁধার
বোবা কষ্টের অভিধান মুছে
অর্বাচীন সময় লেখে হাসিমুখ।

বুকের প্রণয়ে দুরুদুরু হাত
উঁকি দেয় গোধূলি মেয়ে
হেসে ওঠে অন্ধকার
ঢেউ ভাঙা উঠোনের জলে।