মে 2018

ও জল ও শীতল পরশ
- মোশ্ রাফি মুকুল

এক-
----------
শীতলায়নের ফেরিওয়ালা এই গ্রীষ্মে গেছে নির্বাসনে-
যেটুকু জল ছিলো সব উজাড় করেছে ফণিমনসার কণ্টক গ্রীবা।তারপও তোমরা পরিখায় লাগাতে চাও বৃষ্টি ও জলের গাছ।

আমার চারিদিকে সবুজ আগুন-
আমি কেমনে করি গ্রীষ্ম বন্দনা!
তোমরা চাইলে অনাগত আষাঢ়ে আমিও গাইবো নীলচোখের তরুণীর ও বিরল বরষার গান।
ও জল ও শীতল পরশ।

দুই-
-------
বুনোফুলে বেগুনি অরণ্য-
এখানে প্রতিটা প্রাণ আছে তোমার অপেক্ষায়,
কবিতার পথ ভুলে কবিও এখন ভীষণ সঙ্গীত প্রেমিক
মাঝরাতে দরাজ গলায় গায় ভরাট জলের গান।

৩১/০৫/২০১৮.

এক.

ঘরের মধ্যে বন্দী
- সাগর আল হেলাল

সড়ক পথে নরক যাওয়া
সেটাও এখন ঝক্কি,
চলা ফেরা করতে হলে
হতে হবে পক্ষী।

পায়ের চাপেই যাচ্ছে উঠে
রাস্তাগুলোর চামড়া,
দাঁত কেলিয়ে হাসে তবু
প্রশাসনিক দামড়া।

আকাশ পথে যাবে তুমি
নেই তো ফ্রিকোয়েন্সী,
সবাই জানে নেটের কথা
ব্যবসা দারুণ ফেন্সী।

সবচে’ ভালো, থাকো যদি
ঘরের মধ্যে বন্দী,
কাজ কি তোমার খুঁজে ফেরা
চোরকে ধরার ফন্দী।
-
৩১.০৫.২০১৮

 

দুই.

লেখক হবে যদি
(লেখা প্রতিযোগিতায় নামছে যারা)
- সাগর আল হেলাল
========================
লিখতে শেখার আগেই হলে
লেখার প্রতিযোগী,
তোমার লেখা পড়ে আমি
হচ্ছি মাথার রোগী।

কি লিখেছো কি বুঝাচ্ছো
ভাবো সবার আগে,
জবাব পেয়ে, তবেই লেখো
ইচ্ছা যদি জাগে।

শেয়াল ডাকে হুক্কা হুয়া
ছাগল ভ্যা ভ্যা করে,
তুমি বলছো অন্য কথা
পড়লে মাথা ধরে।

লেখার আগে লিখতে শেখো
লেখক হবে যদি,
তা না হলে, লজ্জা পাবে
চক্ষু হবে নদী।
-
৩১.০৫.২০১৮

তিন.

আসবে কবে তুমি
- সাগর আল হেলাল
===================
আমার আকাশ শুন্য রেখে
কোন আকাশে গেলে,
সবাই র’লো চাঁদের আলোয়
আমি প্রদীপ জ্বেলে।

কতো আশা ভালোবাসা
ছিলো তোমায় ঘিরে,
বলো কবে বাংলাকাশে
আসবে তুমি ফিরে।

তোমার জন্য কুড়ি কোটি
গোলাপ চেয়ে আছে,
ঘরে ফেরার তাগাদা কি
নেইকো তোমার কাছে ?

আসবে তুমি হাসবে আকাশ
হাসবে স্বদেশ ভুমি,
বরণ ডালার ফুলে ডাকে
আসবে কবে তুমি।
-
৩১.০৫.২০১৮

'ক্যাপ্টেন' তুমি ঠিক আছো তো
- মোশ্ রাফি মুকুল

ক্যাপ্টেন!ক্যাপ্টেন!ক্যাপ্টেন!
এবং-
সমুদ্র পথ থেকে পথে চলাই তোমার অভ্যাস-
তুমি দিশার বাহক
চেনো কি ধবল অন্ধকার?
কেন ডুবে যাও পাপে,
কেন পৃথিবীর দেয়ালে দেয়ালে ভোগ ও ভাগের স্লোগান লেখো,
ক্যাপ্টেন তুমি ঠিক আছো তো?

ধাতব ঢোল বাজাও চতুর্দিকে,
শব্দে শব্দে মুক্তির প্ল্যাকার্ড তুলে ধরো বাতাসে,
তোমার লোভ্যে অহর্নিশ দংশিত হয় এ পৃথিবী ও প্রেম,
অতঃপর আমরা যারা কবিতার মতো শুদ্ধ হতে চাই,
পথ ভুলে যাই
সহাস্যে হাতে তুলে নিই নাগিনীর সাদা বিষ,
অভূতপূর্ব শ্লোক গেয়ে গেয়ে সময়কে নাচাই নিজের মতো,
'ক্যাপ্টেন' তুমি ঠিক আছো তো?

তোমার পায়ে কেন তবে বেশ্যার নূপুর?
বিক্রি হতে চাও বারবার,
পথ ভুলে গেছো ক্যাপ্টেন?
মানচিত্রহীন নাবিকের মতো?
ক্যাপ্টেন তুমি ঠিক আছো তো?

তোমাকে দিতে হবে পাড়ি
সময়ের বীর-
এইসব বৃত্তাকার সমুদ্রঘড়ি,
হলুদ মাস্তুল ভেঙে
তোমাকেই ধরতে হবে হাল,
প্রান্তে প্রান্তে তোমাকেই গড়তে হবে শান্তির শান্ত মিনার-
আকাশে উড়াতে হবে সাদা কবুতর,
ক্যাপ্টেন!ক্যাপ্টেন!ক্যাপ্টেন!
তুমি পারবে তো?
ক্যাপ্টেন তুমি ঠিক আছো তো?
ক্যাপ্টেন!ক্যাপ্টেন!ক্যাপ্টেন!
৩১/০৫/২০১৮.

অবিমিশ্রা শুনে যাও
- মোশ্ রাফি মুকুল

চোখেরজলে যেটুকু ছিলো নুন-
দাহন বুকের চৌকাঠে যতো ঘুণ,
আজ আকাশেও নেই চাঁদ-
তাই পেতেছি তারা ধরার ফাঁদ।

তারা মানে তোমার নামে ফোটা ফুল-
তারা মানে একশত এক ভুল,
ধরা দেবে সে কি
জলনিকুঞ্জের কোমল কমল নিবিড়?

শোনো অবিমিশ্রা-
শুনে যাও
আকাশীর নীল পালক,
এখানে নোনানদী আর তুমি ছাড়া
অন্য কোনো সমীকরণ নেই

বলো তুমি
অবিমিশ্রা রাও বলে যাও,
তোমাকে ছুঁতে আর কতো-
বেয়ে যেতে হবে নক্ষত্র নাও।

তোমার প্রতিবিম্ব থেকে ছাঁয়া কতদূর
ওগো নীলিম কায়াধারী?
বলে যাও-বলে যাও।

৩০/০৫/২০১৮.

হেরে গেলাম
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

আমার চোখের জল,
বলে তোমার কথা,
নীরবে সহি সকল বেদনা,
ভিজে থাকে চোখের পাতা।

কষ্টকে নিয়েছি আপনার করে,
হারিয়ে ফেলেছি জীবনের সুখ,
বসে থাকি,ছবি পানে চেয়ে,
যদি হয়,লাঘব কিছু দুখ!

অমানিশা আজ সকল সময়,
ভাসে চোখে শুধু স্মৃতি,
হেরে গেছি জীবন সংসারে,
গাইবোনা আর সুখ গীতি।

চিরনিদ্রায় যাবো যেদিন,
কাঁদবে সেদিন সবাই,
মরনের ওপার হতে-
দু'হাতে জড়াবে আমায়।

# মানবী ৩০-৫-১৮ রাত ১-৪০

আজ জল কুঠুরিতে মিলবে দু'জন
- মোশ্ রাফি মুকুল

বালুচরে ফেলে আসে নদী রাজহংস ডানা,সদ্য জন্ম নেয়া বাজুয়ার ঘাসফুল চেয়ে দ্যাখে শালিক পাখির শ্লীল উত্থান;
উদাসীন নদী ও রমণীরা জানে আষাঢ়ের বৃষ্টিতে ফোটাতে হয় আশার কদম।

নদী ভীষণ ক্লেশী- ক্লান্ত পথের ঘামে,
নদী আশ্চর্য পথভোলা-পথিক
নিজেকে স্রোতে ভাসায় সাগরের নামে।

আজ জল কুঠুরিতে মিলবে দু'জন-
নদী ও সাগর।

২৯/০৫/২০১৮.

পর্যটক
- মোশ্ রাফি মুকুল

এই ধরো তোমার জড়তাগ্রস্ত চোখ-
ভীষণ উদগ্রীব দৃষ্টিসুখ বিপণনে
রিনিকঝিনিক বাজিয়ে যাচ্ছো পুরুষ পায়েল।

এই ধরো-
আমিও বুকে তুলে নেই সৃষ্টির উদ্ভাস রঙতুলি,
উপাঙ্গে আওয়াজ তুলি-
মাঝেমাঝে মধ্যরাতে আমিও ধরতে চাই আকাশীর ফুল,
নিতে যাই রক্তগোলাপের জবানবন্দি।

উপকূলজুড়ে সমুদ্র বাজাচ্ছে অপরিণামদর্শী হারমোনি,
আর তুমি আমি
প্রণয়ের মুগ্ধ পর্যটক-
বেদুঈন বেলুনে বেলুনে
রহস্যময় জল উড়াচ্ছি শুধু এখানে ওখানে।

২৯/০৫/২০১৮.

বুমেরাং
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

প্রফেসার অনল রায় সারাদিন কলেজে ছাত্র পড়িয়ে,কলেজ ছুটির পরও প্রাইভেট টিউশন করে রাত দশটায় বাড়ি ফিরে রাতে শুতে গিয়ে সদ্য হওয়া পুত্র সন্তানের বাবা, ছেলের কান্নার চিৎকারে উঠে বসে বিরক্তি প্রকাশ করেন।স্ত্রী তখন ছেলেকে সামলাতে সামলাতে বলেন"প্রত্যেক বাবা-মা এভাবেই কষ্ট করে তার সন্তানদের মানুষ করেন এতে এত বিরক্ত হওয়ার কি আছে?"

---তারমানে আমার মাও এই কষ্ট করেই আমায় মানুষ করেছেন আর আমি তার প্রতিদান দিয়েছি মাকে বৃদ্ধাশ্রম পাঠিয়ে!আমি কালই মাকে বাড়িতে নিয়ে আসবো।

শুনেই স্ত্রী খেঁকিয়ে উঠলো।"আনবে আনো আমি কিন্তু তার কিছুই করতে পারবো না।"

--তোমাকে কিছুই করতে হবেনা।আমি মায়ের জন্য লোক রেখে দেবো। সে ক্ষমতাও আমার আছে ।আর হ্যাঁ তোমার ছেলেকে এমন ভাবে মানুষ কোর যেন তার বিয়ের পর তোমার বৌমার অশান্তির ভয়ে তোমাকে বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয় ;যা আমি করতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেও যেন তার মায়ের সর্বক্ষণ দেখাশুনার জন্য একজন আয়া রাখার ক্ষমতা রাখে।

আমার ভুল আমি কালই শুধরে নেবো।

#নন্দা #অনুগল্প

তুমি নিয়ে যাও সবটুকু
- সাগর আল হেলাল

স্পর্শহীন চাঁদ মূর্ছা যায় স্পর্শের অভিযোগে
চোখের আড়ালে রাতের নক্ষত্র,
অধর করে নি অধর ভ্রমণ
একটি গানও গায় নি দৃষ্টিপাখি
রাঙা মেঘে ছেয়ে গেলো সকালের আকাশ...

প্রতিবেশি কষ্টেরা তাবু গাড়ে উঠোনে
দেখ-ভালের কেউ নেই অবেলায়,
নিরংকুশ শূন্যতা ঘিরে রাখে মগজের মাটি
গানদিনে চুপচাপ রাগদুপুর
বসন্তগুলো ভিজে যায় রোদবৃষ্টি কিরণে...

কেউ কি কারো কষ্ট বোঝে
স্বার্থের সড়কে ছুটছে সৃজনশীল ভালোবাসা
শব্দের মারপ্যাঁচে বন্ধ হয় না রক্তক্ষরণ,
তোমার মন ডালে সুখপাখির বাসা
এ দিকে চলছে স্বপ্ন নিধন অভিযান...

বিরহেই সতেজ নির্মল স্বপ্ন বাগান
কান্নার পরিচর্যায় প্রতিদিন ফোটে কষ্টফুল
তুমি নিয়ে যাও সবটুকু সুখ
আমার জন্য থাক পড়ে বিরান জীবন
কিছু কিছু হৃদয়ে ভালোবাসা বড়ো বেশি বে-মানান..
-
২৮.০৫.২০১৮

সুখ
- মোশ্ রাফি মুকুল

এই যে সোনালী হাতগুলো সাদাসুখ মাখে-
নুয়ে পড়া রাতের শরীর থেকে খুঁজে ফেরে আদিম হাওয়া;

মাঝেমাঝে-
পাল তুলে পাটাতনে দু'জনে করে যাই বেনারসি গল্প,
জল ছলাৎ ছলাৎ আমাদের গার্হস্থ্য নৌকো।

সময়ের মেরুদণ্ড ফুঁড়ে বের হয় বুনো আপলের গন্ধ,
হাঁসপাখি দিয়ে যায় গ্রীষ্ম সাঁতার-
তুমি আমি থমকে!

এই যে ঘাসফুল প্রতিজ্ঞা-
কতদূর নিয়ে যাবে বলো আমাদের
উদ্বাহু প্রেমকে?

নিষিদ্ধ অাহ্বান
- শাহিনা কাজল

এখন টাকাই সব, টাকায় বিক্রয় হয় সব
যখন সৌন্দর্যই সব, সুরভিত লাবন্যয় সব জুটে যায়।
সংসারে সব পুরুষের চাহিদা, অাচরন এক নয় ।
সেখানে কামুক থাকে, কাম বিমুখ থাকে,
থাকে দেবদাস----- চিরহরিৎ মন।

কেউ সংসার ভেঙে সাজাতে চায় সংসার
কেউ ভালবেসে চিরকুমার থেকে,
শাশ্বত শান্তির পায়রা ওড়ে না, উড়িয়ে নিতে হয়।

ঘুড্ডির সুতাটা না হয় থেকেই যাক তোমার হাতে।
যে কেউ ধর্ষক হয়ে যায় অতৃপ্তির ক্ষোভে
ভালবাসা বিমুখতায়??

ধর্ষিত হতে হয় পশুত্বে, সুসজ্জিত সমাজেও
কিছু বিকৃত প্রেম আছে
প্রেমিকাকে অামরন ভোগ করতে হয়।
কোন ভালবাসা যদি পরকিয়া শেখায়
তাই-ই করো, শিখে নাও সমাজের নিষ্ঠুরতা থেকে।

কোথাও নেই সে শান্তি!!
উৎকৃষ্ট তাই-ই যেথায় সুখ পাও, সুখী হয়ে নাও।
এখন টাকা অাছে যার, কলঙ্ক না মেখে তার কাছে যাও
দেখাও তারে স্নানের ঘাট
চোখ ধাঁধানো সবুজ দূর্বাঘাস।

ক'দিন স্বপ্ন সে দেখুক, খেলে যাক সাধ্য যত
দগ্ধ মন আর কতইবা পুড়বে!
যে তোমারে চায় তার কাছে যাও,
খেতে দাও অাদরে অনাদরের ফল,
বাসন ধুয়ে চুপিসারে ফিরে এসো নীড়ে।

কলঙ্কিনী হয়ে বেঁচে থাকতে নেই-
জেনে নাও। এ পৃথিবী খেলাঘর।
না হলে তনুর মত লাশ হতে হবে!
বিচারের গায়ে ভীষন জ্বর।
দুঃখের সিঁড়ি জল্লাদের পিচ্ছিল হাত।
তাই বলি কি; সময়মত যাও দরবারে
টাকা অাছে যার তুমি হয়ে যাও তার।
টাকা অাছে যার তুমি হয়ে যাও তার।
সময় তোমার।

মন
- মোশ্ রাফি মুকুল

মন নিয়ে গবেষণারত একজোড়া প্রেমিক প্রেমিকা ভালোবাসার সম্ভাব্য একটা ক্লোন তৈরী করে ফেললো।উদ্ভ্রান্ত গবেষকদ্বয় অভিসন্দর্ভের শেষকথাগুলো বলার আগেই দুয়ারে
এসে গেলো মনখারাপের পালা।রিখটার স্কেলের পাশাপাশি ভূকম্পনের পূর্বাভাস
দেওয়ার জন্যও চলছে যথেষ্ট তোড়জোড়;

এখানে মনাকাশের কালমেঘ আর পরিবর্তনশীল হরমনগুলো শনাক্তকরণে কোন চেষ্টা নেই হৃদয়বিজ্ঞানীদের,
মন এক বিভ্রান্ত যাযাবর-সে হাঁটতে থাকে অন্তর থেকে তেপান্তর।

২৭/০৫/২০১৮.

এক টুকরো লম্বা কাপড় একটি দেশের জাতীয় পোশাক হতে পারে, এটা তাকাহাশি সাইতর চিন্তার মধ্যে নেই। অবশ্য সে নিজেই যেন বিচিত্র পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপ। অন্তর্মুখী মানুষটি স্বল্পভাষী হলেও তার ছোট একজোড়া চোখ যেন ভীষণ কৌতূহলী ও চঞ্চল। ইংরেজি ভাষা অনুশীলনের একটি দলে প্রথম তাকাহাশি সাইতর সঙ্গে লিরিক লিরার পরিচয়। জাপানের এ-দ্বীপটার নাম হক্কাইদো। এই সুন্দর দ্বীপটায় বিদেশিদের জন্য অনেক ধরনের আয়োজন আছে। ভাষা সংস্কৃতি বিনিময় কেন্দ্রে প্রতি সপ্তাহে ইংরেজি ভাষায় একটি অনুষ্ঠান হয়। সেখানে জাপানিসহ অনেক দেশের নাগরিক ইংরেজি ভাষায় তাদের নিজস্ব পরিচয় তুলে ধরে। এইতো ছয় মাস ধরে লিরিক লিরা সেখানে নিয়মিত যাচ্ছে। গত মাসের কথা। হঠাৎ মধ্যম উচ্চতার একজন যুবক লিরিক লিরার পাশে হাসিমুখে বসল। সবাই তখন নিয়মিত আলাপ-আলোচনা করছিল। পাঁচ-ছয় মিনিট হবে, লিরিক লিরা একটা জিনিস লক্ষ করতে লাগল। পাশে বসা জাপানিজ ছেলেটি বারবার তার চোখের দিকে আড়চোখে তাকাচ্ছে। অনেক কৌতূহলে ভরা তার সে-চাহনি। লিরিক লিরা কিছুটা অস্বস্তিবোধ করতে লাগল। সে ব্যাপারটা লক্ষ করলেও না বোঝার ভান করে আলোচনায় মনোযোগ রাখল। অনেকক্ষণ ধরে কথার মাঝপথে তার মনোযোগ লিরিক লিরার চোখের দিকে চলে যাচ্ছে। সে যেন মনে-মনে কী বলে যাচ্ছে! লিরিক লিরার পাশে বসা অনেকেই হয়তো ব্যাপারটা লক্ষ করেছে। সবকিছু বুঝলেও লিরিক লিরা খুব স্বাভাবিকভাবে নিজের মনোযোগ ধরে রাখল। হঠাৎ সেই জাপানিজ যুবক বলে উঠল, ‘আমি খুব দ্বন্দ্বে পড়েছি। পাশে বসা দু-একজন সঙ্গে সঙ্গে উৎসুক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, কেন মিস্টার তাকাহাশি সাইত?’

আচমকাই পাশে বসা লিরিক লিরার দিকে ঝুঁকে সে জিজ্ঞেস করল, তুমি কোন দেশ থেকে এসেছ? তোমার চোখদুটো বড় এবং খুব সুন্দর করে সাজানো। তোমার দেশের সবারই এমন চোখ?

তার প্রশ্ন করার ধরন দেখে অনেকের মুখে হাসি চলে এলো। যদিও সবাই ভদ্রতার প্রয়োজনে পুরো হাসি হাসতে পারল না। অর্ধ-হাসিমাখা মুখ নিয়ে সবাই আরো একটু বেশি মনোযোগী হয়ে বসল। লিরিক লিরা একটু অপ্রস্ত্তত হলেও খুব স্বাভাবিকভাবে বলল, ‘আমার নাম লিরিক লিরা। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি। এখানে আন্তর্জাতিক সংস্কৃতি বিষয়ে গবেষণা করছি।’

বাংলাদেশ! তাকাহাশি সাইত কপাল কুঁচকাল। মনে হচ্ছে এই প্রথম সে বাংলাদেশের নাম শুনেছে। পাশের একজন বৃদ্ধমতো জাপানিজ ভদ্রলোক বললেন, এক সময়ে এ-দেশটা ভারতের অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে ভেঙে পাকিস্তান ও ভারতে ছিল। পাকিস্তানের দুটি অংশ – পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করে হয়েছে বাংলাদেশ।

তাকাহাশি সাইত একটু জোরে নিশ্বাস ছেড়ে বলল, অনেক ভাঙাচোড়া। আসলে পৃথিবীর মানচিত্র সম্পর্কে আমারই ধারণা কম। কিন্তু তোমাকে দেখে দক্ষিণ এশিয়ার কোনো মেয়ে মনে হয়নি। অনেক বেশি সংমিশ্রিত তুমি।

লিরিক লিরা মজা করে বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়!’

পাশের একজন বৃদ্ধা জানতে চাইল, তোমার এমন মনে হওয়ার কারণ কী?

লিরিক লিরা বলল, ‘আমরা সংকর জাতি। শুধু তাই নয়, কঠিন ইতিহাস ভাঙতে ভাঙতে আমাদের কাছে অনেক ভাষা এবং সংস্কৃতির ছোঁয়াও রেখে গেছে। কারো কারো রক্তে অজানা সংমিশ্রিত গোপন ভালোবাসাও বহমান। তাই হয়তো কখনো কখনো জাতি নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে।’

তাকাহাশি সাইত বলল, খুব কঠিন কথা। তবে বিশ্বায়নের এ-যুগে সঠিকভাবে জাতি নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তো তোমার দেশের জাতীয় পোশাক সম্পর্কে কিছু বলো। লিরিক লিরা সামনে রাখা নোটখাতার সাদা পাতায় একটি সাধারণ শাড়ি পরা মেয়ের ছবি এঁকে বোঝানোর চেষ্টা করল।

‘শাড়ি!’ এই পোশাকটার নাম শাড়ি। তাকাহাশি সাইতের বিস্ময়ভরা কণ্ঠে যেন আরো একটু বেশি উচ্ছলতা প্রকাশ পেল। তার জানার আগ্রহ আরো বেড়ে গেল। আশপাশে বসা সবাই তাকাহাশি সাইতর চঞ্চলতা উপভোগ করতে লাগল। আমার বাস্তবে শাড়ি পরা একটি মেয়েকে দেখতে ইচ্ছা হচ্ছে। জানি না, তোমার আঁকা ছবিটা নাকি বাস্তবের মেয়েটা সুন্দর হবে। আমি বুঝতে পারছি না, একটা লম্বা কাপড় কেমন করে ‘শাড়ি’ নামের পোশাকে পরিণত হয়।

লিরিক লিরা বলল, আমি একদিন তোমাকে এ-পোশাকটা পরে দেখাব।

তাকাহাশি সাইত খুব আনন্দ পেল। তার চোখে-মুখে, কথায়-আচরণে নতুন বিস্ময়ের ছোঁয়া দেখা গেল।

‘তুমি এ-পোশাকটা পরে আমার সামনে দাঁড়াবে। আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে। উফ! আমি একদম বিশ্বাস করতে পারছি না – !’

তাকাহাশি সাইতর কথা শেষ না হতেই লিরিক লিরা বলল, সেটা খুব শিগগির তোমার চোখ বাস্তবে দেখবে। তোমাকে শুধু গ্রীষ্মকালের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

গ্রীষ্মকালের জন্য কেন?

লিরিক লিরা উত্তর দিলো, শাড়ি শীতকালের উপযোগী পোশাক নয়!

এটা আমার জন্য খুব কঠিন। কারণ গ্রীষ্মকাল শুরু হবে আরো দুমাস পর। শাড়ির প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে তোমাকে অপেক্ষা করতেই হবে। তাকাহাশি সাইত আবার প্রশ্ন করল, শীতকালে কি শাড়ির প্রকৃত সৌন্দর্য হারিয়ে যায়? লিরিক লিরা বলল, শাড়ির সঙ্গে বাতাসের এবং চারপাশের প্রকৃতির রঙের এক গভীর সম্পর্ক আছে। প্রকৃতির বিচারে শাড়ির অনেক রকমের ব্যবহার আছে। একজন নারী যখন শাড়ি পরে, প্রকৃতি তাকে অনেক রূপ দেয়।

তোমার দেশে কয়টি ঋতু?

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ, প্রতি দুমাস পরপর ছয়বারে প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে সাজে। তাকাহাশি সাইত একটু মজা করে বলল, বুঝলাম তোমার দেশের প্রকৃতি একটু বেশি চঞ্চল। খুব দ্রুত মেজাজ পাল্টায়!

এভাবে প্রতি সপ্তাহে লিরিক লিরা এবং তাকাহাশি সাইতর মধ্যে কথাবার্তা হয়। ভাষা-সংস্কৃতি, জীবনপদ্ধতি এবং মানুষ। অনেক কৌতূহল আর প্রশ্ন!

ষড়ঋতুর দেশ বাংলাদেশ, প্রতি দুমাস পরপর ছয়বারে প্রকৃতি ভিন্ন ভিন্ন রূপ নিয়ে সাজে। তাকাহাশি সাইত একটু মজা করে বলল, ‘বুঝলাম তোমার দেশের প্রকৃতি একটু বেশি চঞ্চল। খুব দ্রুত মেজাজ পালটায়!’

এভাবে প্রতি সপ্তাহে লিরিক লিরা এবং তাকাহাশি সাইতের কথাবার্তা হয়। ভাষা-সংস্কৃতি, জীবনপদ্ধতি এবং মানুষ। অনেক কৌতূহল আর প্রশ্ন! লিরিক লিরা অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে উত্তর উপস্থাপন করে। কয়েক সপ্তাহে খুব বন্ধুত্ব ও আন্তরিকতার জোয়ারে কেটে গেল। তবে বন্ধুত্বের রূপ দেখে কারো বোঝার উপায় নেই খুব অল্প সময়ের এক সম্পর্ক। কোনো সপ্তাহে দুজনের একসঙ্গে কথা বলতে বলতে অনেকদূর হেঁটে যাওয়া। কখনো একসঙ্গে ইয়াকি সোবা নুডুলস কিংবা অরগানিক সবজি রেস্টুরেন্টে সালাদ দিয়ে মধ্যাহ্নভোজ করা। কখনো আবার হিমশীতল তুষারপাতের বিকেলে একসঙ্গে কফি হাউসে গরম কফি পান করা। কোনো কোনো বন্ধের দিনে একসঙ্গে জাপানিজ ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান উপভোগ করা। কখনো বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত সৃষ্টিগুলো ইংরেজিতে তুলে ধরা। বেশ জমজমাটভাবে একটি সাধারণ ছোট্ট সম্পর্ক এক অসাধারণ আন্তরিকতার মধ্য দিয়ে যেতে লাগল।

তুষারঢাকা সফেদ গালিচার মতো পথে তুষার ছুঁয়ে-ছুঁয়ে পাশাপাশি নীরব হেঁটে যাওয়া। গভীর অন্ধকার আকাশ থেকে আসা একটু সন্ধ্যা আর সেই সন্ধ্যার আলো ছুঁয়ে-ছুঁয়ে নামা তুষারকণা। অনেক অনেক নীরবতা! কখনো কখনো সেই নীরবতা একটু গোপন হয়ে ওঠে মনের কোনো এক পরিবেশে। লিরিকের পাশের বোঁচা নাকের সাদা ধবধবে চেহারার এই লাজুক যুবকটি কখনো হয়তো তার মনের কথাটি বলতে পারবে না। চারদিকে শীতের ভয়ংকর উচ্ছ্বাস। সেই উচ্ছ্বাসে তুষারকণাগুলো সাদা পাখির মতো হিমশীতল বাতাসের সঙ্গে অদ্ভুত খেলা খেলছে। তাকাহাশি সাইত ক্রমশ ঘেমে ওঠে। লিরিক মোবাইল ফোনে দেখল শীতের তাপমাত্রা মাইনাস দশ ডিগ্রি। বেশিক্ষণ বাইরে থাকা যাবে না। তুষারঢাকা আকাশে লিরিক বাংলাদেশের গোধূলি খোঁজে। হঠাৎ তাকাহাশি সাইত বলল, লিরিক নামটাও কিন্তু ইংরেজি। লিরিক মাথা নেড়ে বলল, বাংলা অর্থ হলো গীতি বা গান।

তাকাহাশি সাইত একটু স্বাভাবিক ভঙ্গি নিয়ে বলল, তোমাকে আমার সত্যিই লিরিক্যাল মনে হয়। তাই কৌতূহলী হয়ে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকি। তোমার বাংলাদেশি বড় উজ্জ্বল কালো চোখদুটো আমার ভালো লেগেছে। ওর বোকা-বোকা কথায় লিরিক লিরা হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে বলে, আমাদের দেশটা আরো অনেক বেশি লিরিক্যাল। অনেক বিচিত্রতায় ভরপুর।

তোমার নামটা বাংলা না হয়ে ইংরেজি হলো কেন? এবার লিরিক হাসি থামিয়ে একটু নিশ্বাস নিয়ে বলল, আসলে ইংরেজি অনেক শব্দ আমাদের পূর্বপুরুষদের শব্দ-ব্যবহারের ইতিহাস থেকে পাওয়া।

যেমন – এই ভূখন্ডের মানুষদের এক সময়ে ইংরেজরা শাসন করেছে। তাই ইংরেজি অনেক শব্দ আমাদের কথায়, জীবনযাপনে নিজ অধিকারে রয়ে গেছে। মানুষ হয়তো ওই শব্দগুলোর প্রকৃত বাংলাই ভুলে যাচ্ছে। তাকাহাশি সাইত বলল, যদিও ব্যাপারটা একই সঙ্গে দুঃখজনক এবং মজার। তবে সব দেশের মানুষেরই নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা করা উচিত। প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে সবকিছু সম্পর্কে জ্ঞান রাখা আর নিজস্ব সংস্কৃতিতে তা বসবাস করতে দেওয়া এক নয়। লিরিক একটা দীর্ঘশবাস ছেড়ে বলল, ইংরেজরা চলে যাওয়ার পর পাকিস্তান আমাদের শাসন-শোষণ করেছিল। তাই তাদেরও কিছু জিনিস আমাদের সংস্কৃতিতে আছে। শুধু তা নয়, আরবি, ফার্সি, ফরাসি, হিন্দি এবং সংস্কৃত এমন অনেক ভাষার কিছু শব্দ বিদেশি শব্দ হিসেবে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে, কথাবার্তায় ব্যবহৃত হয়। তাকাহাশি সাইত চোখ বড় করে খুব গম্ভীর মুখ করে বলল, যুদ্ধের ভয়াবহতা আমি বুঝি। আমি ইতিহাস থেকে জেনেছি। জাপানের হিরোশিমায় বাতাসে এত বছর পরও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিসাপ ভাসে। তোমাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, তোমরা প্রতিনিয়ত একটা যুদ্ধের মধ্যে আছ।

লিরিক লিরা বলল, একদম ঠিক। বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডটি সৃষ্টি হয়েছে যুদ্ধের মধ্য দিয়ে। তাই যুদ্ধই আমাদের স্বাভাবিক জীবন।

তাকাহাশি সাইত খুব বিনয়ের সঙ্গে বলল, আমি ভেবে অবাক হচ্ছি, এত টিকে থাকার যুদ্ধের মধ্যে এই আত্মবিশ্বাস, সরলতা, জীবনের প্রতি সম্মান আর ভালোবাসা কেমন করে পেলে তুমি?

লিরিক লিরা একটু আন্তরিকতা নিয়ে বলল, আমাদের উর্বর মাটির ঘ্রাণ, অন্ধকার আকাশের জ্যোৎস্না, বৃষ্টির বিলাসিতা আর দুমাস পরপর প্রকৃতির রং বদলই এসব প্রাকৃতিক নিয়মে শিখিয়ে দিয়েছে। তাকাহাশি সাইত একটু মুচকি হাসিমাখা মুখ নিয়ে বলল, দুমাস পর জাপানে বসন্ত আসতে শুরু করবে, বাংলাদেশে কী হবে? লিরিক লিরা অত্যন্ত চঞ্চল হয়ে বলল, বাংলা নববর্ষ। তখন ইংরেজি ১৪ এপ্রিল বাংলাদেশে পহেলা বৈশাখ উৎসব অনুষ্ঠিত হবে। সে-সময় সারাদেশ বৃহৎ আনন্দে মেতে উঠবে। ছেলেমেয়েরা লোকজ সাজসজ্জা আর রঙিন পোশাকে ঘুরে বেড়াবে। বিশেষ করে মেয়েরা লাল শাড়ি পরবে। সবাই প্রিয়জনকে উপহার দেবে।

তাকাহাশি সাইত বলল, লাল শাড়ি কেন?

আসলে লাল-সাদা রঙের এক অদ্ভুত সমাহার! বেশিরভাগ এই রং ব্যবহার করলেও যে-কোনো উজ্জ্বল রঙিন রঙের শাড়িও পরে।… কথাগুলো বলতে-বলতে সামনে অদুরি পার্কের পাশে রাখা চেয়ারে বসল। অনেকক্ষণ দুজনে হেঁটেছে। তাই দুজনে একটু ক্লান্ত। তাকাহাশি সাইত মুখোমুখি চেয়ারটায় খুব আন্তরিকতা নিয়ে বসল। প্রচুর লোক থাকে এই অদুরি পার্কে। লিরিক লিরা নিশ্বাস ছেড়ে আশপাশের লোকজনের দিকে তাকাল। তাকাহাশি সাইতও আশপাশে একবার তাকিয়ে লিরিক লিরার দিকে চোখ সরাল। এই প্রথম লিরিক লিরা দেখল তাকাহাশি সাইত তার দিকে সরাসরি তাকাচ্ছে। জাপানি ছেলেমেয়েরা সাধারণত একটু লাজুক স্বভাবের হয়। সর্বদা কথা বলার সময় সরাসরি তাকিয়ে কথা বলে না। মাথা নিচু রাখা ওদের স্বভাব। লিরিক লিরা বুঝতে পারছে, সে হয়তো কিছু বলতে চাচ্ছে। আচমকা শান্ত কণ্ঠে তাকাহাশি সাইত বলল, তোমার কী রঙের শাড়ি পছন্দ? লিরিক হাসি-হাসি মুখ নিয়ে বলল, শাড়ি! আমার লাল শাড়ি পছন্দ। তবে আমার কাছে এখন কোনো লাল শাড়ি নেই। সামনের পহেলা বৈশাখ, আমাকে অন্য রঙের শাড়ি পরতে হবে।

তাকাহাশি সাইত বলল, এখানে তুমি মাঝে মাঝে শাড়ি পরো?

না। বাংলাদেশিদের কিছু নিজস্ব অনুষ্ঠান হয় সংগঠন থেকে। তখন সবাই শাড়ি পরে।

ও আচ্ছা। তুমি ছাড়াও অনেক বাংলাদেশি আছে?

আছে, তবে বেশিরভাগ গবেষণা, চাকরি, উচ্চশিক্ষার কারণে এখানে এসেছে; স্থায়ী কারো সঙ্গে পরিচয় হয়নি।

তাকাহাশি সাইত একটু মনোযোগসহ লিরিকের চোখের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনল। তার ছোট চোখদুটো যেন এবার ভীষণ স্থির এবং শান্ত। কী যেন খুঁজছে!

ওর তাকানোর ধরন অনেক কিছু বলতে চাইল। অনেক প্রশ্ন আর রহস্যঘেরা চাহনি। লিরিক হয়তো অনেক কিছু মনে-মনে জেনে গেছে, কিন্তু না, সে একবার চাহনি লক্ষ করে চোখ সরিয়ে নিল।

কয়েক সপ্তাহ পর। বরফঢাকা পথপ্রান্তর জেগে উঠতে শুরু করল। তুষার চাদরে ঢাকা আকাশ একটু একটু আলোর ঝলকানি দিতে লাগল। ব্যস্ত শহরের মানুষগুলো শীতের পোশাক ছেড়ে নতুন সাজে পথপ্রান্তর রাঙিয়ে তুলল। প্রকৃতির এ এক ভিন্ন রূপ। পরপর দুই সপ্তাহ তাকাহাশি সাইত ভাষা সংস্কৃতি বিনিময় কেন্দ্রে এলো না। তার মোবাইল নম্বরটা নেওয়া হয়নি। ই-মেইলের কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। লিরিক লিরা যেন তাকে মনে-মনে খুঁজতে লাগল। সে কি ব্যস্ত নাকি অসুস্থ? অন্য কোনো ভুল? খুব সংবেদনশীল মন জাপানিদের। কোনো কারণে কষ্ট পেয়েছে? এমন অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল তার মস্তিষ্কে। এভাবেই আরো কয়েকদিন গেল। সেদিন পহেলা বৈশাখ। বিকেলে বাংলাদেশিদের নিজস্ব সংগঠনের অনুষ্ঠান। লিরিক লিরা কোনো কিছু না ভেবেই বাংলাদেশি সাজে হক্কাইদো ভাষা সংস্কৃতি কেন্দ্রে গেল। সবাই যেন অবাক। সবাইকে পহেলা বৈশাখ অনুষ্ঠান উদ্যাপন সম্পর্কে বর্ণনা করল; কিন্তু যাকে মন এবং চোখ খুঁজছে তাকে দেখা গেল না। কেন জানি লিরিক লিরার ভীষণ মন খারাপ হলো। তারপর ভাষা সংস্কৃতি বিনিময় কেন্দ্র থেকে ফেরার সময় কথা। হঠাৎ একজন মহিলা অফিসকর্মী পেছন থেকে ডেকে তাকে একটি প্যাকেট দিলো। এমন অপ্রত্যাশিত ঘটনায় লিরিক লিরা ভাবনাশূন্য হয়ে গেল। একটি টুকটুকে লাল শাড়ি। সঙ্গে একটি শুভেচ্ছা কার্ড। সেখানে লেখা, পহেলা বৈশাখ-শুভেচ্ছা!!

একটি সবুজ মারুয়ামা পাহাড়, একটি লাল শাড়ি, একটি বাংলাদেশি মেয়ে এবং তার একজোড়া কাজলচোখ। সব মিলে তৈরি হতে পারে একটি ধ্বংসাত্মক ঘটনা। আমি জেনেছি মেয়েটির একটি মানুষকে ঘিরে একটি সুখের রাজ্য আছে। সেই মেয়েটির দেশ-সংস্কৃতি সম্পর্কে আমি জেনেছি। তার সংস্কৃতি এবং দেশের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রইল। জানি, মেয়েটি আমাকে ক্ষমা করবে।

লিরিক লিরা চুপচাপ শাড়ি এবং কার্ড সযতনে হাতে নিয়ে সেই অদুরি পার্কের দিকে হাঁটতে লাগল। গরমে একটু-একটু ঘাম কপাল থেকে নেমে গাল ভেজাল। লিরিক লিরা শুধু মনে মনে ভাবতে লাগল, সত্যিকারের ভালোবাসার অনুভূতিগুলো হয়তো এমনই নীরব আর লুকানো থাকে।
# গল্পঃ সবুজ পাহাড়ে লাল শাড়ি
#নুরুন নাহার লিলিয়ান

বিদ্রুপের প্রজাপতি
- সাগর আল হেলাল

মেঘের চোখ ফেটে ঝরে নাতিশীতোষ্ণ জল
চমকায় বুকের আকাশে বিজলীর কষ্ট,
দীর্ঘশ্বাসের দমকা ঝড়ে
ভেঙে ভেঙে পড়ে স্বপ্নের বাড়ি ঘর
জমা হয় উঠোন মনে আবর্জনার স্তুপ...

অকল্যাণের বৃষ্টি ঝরছেই অবিরাম
বুকে জড়ানো তোমার যন্ত্রণার ভালোবাসা,
ইচ্ছেরা মাছরাঙার পালকের মতো
খসে পড়ে নদী বেদনার নি:শব্দ স্রোতে
আমায় আলিঙ্গন করে দেবদাড়ু সুখ...

তোমার ঠোঁট নড়ার কারুকাজে
দু:খপাখিরা নীড় ছাড়ে না হৃদয়ের ক্ষণকাল,
আমি অন্ধকার চোখে জ্যোৎস্না খুঁজি
চোখে ভীঁড় করে কষ্টমেঘ
তুমি অবলীলায় শেষ করো প্রেম আদ্যান্ত...

ঘরে ফিরে যায় আকাশের মেঘ
নিজভূমে ফিরে যায় নদীর কষ্টজল,
আমার হৃৎপিণ্ডের ভেতর-
ক্রমাগত নেমে আসে অন্ধকার সুখ
তোমার অধরে নাচে বিদ্রুপের প্রজাপতি..
-
২৭.০৫.২০১৮

রাণী মৌমাছি
- সাগর আল হেলাল

হৃৎপিণ্ডের উপর মৌমাছির বাসা
কষ্ট বহুল হুল ফোটায় রাণী মৌমাছি,
রক্ত কণিকারা যখন
সারিবদ্ধভাবে নিম্নগামী হয়-
চিকচিক করে রাণী মৌমাছির ঠোঁট;

লম্বা শূঁড়ের সোনালি মৌ-রাণী
পথ খোঁজে গহীনে,
ঘর বাঁধার স্বপ্ন তার মগজের ভাঁজে
শ্যাওলা জলের সরের উপর;

কার হাতে তুলে দেবো হৃৎপিণ্ড ?
আকাঙ্ক্ষা সতেজ সবুজ
নির্ভেজাল হৃদয় কোমল হাস্নাহেনা-
অপেক্ষার অবসান কতো দিনে কে জানে !

রাণী মৌমাছির গুনগুন গান শুনি
মধুঘরে বয়ে যায় বিবর্তন সময় !
-
২৬.০৫.২০১৮

দুঃখ আগুন
- সাগর আল হেলাল

মস্তিষ্কের কোটরে জমাকৃত স্মৃতিকণা
জ্বলন্ত উনুনের ছাই,
বালিশে সংযুক্ত যন্ত্রণাকাতর মন
দেয় অকাল মৃত্যু;

ও আমার মন পোড়ানো দু:খ আগুন
ঘণিষ্ঠ হও জীবনে, মৃত্যুতে!
-

ধূসর অন্ধকার
- মোশ্ রাফি মুকুল

কে বললো?
শূন্যতা নেই এখানে কোনো
এখানে কোনো শূন্যতা নেই-
তুমিহীন এ শহর সাদাকালো খাঁচা,
ভোরের রোদ্দুর মাখা সময়ের মতো প্রস্থানোদ্যত সুখের মতোই;
কতো অষ্টাদশী অট্টালিকা গলে পড়ে চোখের সামনে তুমি ছাড়া-
তুমি ছাড়া এ নগর মাতে কার্বন হ্রেষায়।

তুমিহীন এ হৃদয়রাষ্ট্র ভৌতিক গল্পের ব্ল্যাকবিম্ব ছাড়া আর কিছু নয়-
যেখানে ক্রান্তীয় বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে এক নস্টালজিক পোড়োবাড়ী!
পরিত্যক্ত মায়ান সভ্যতার চিচেন ইৎজার মতো মনে হয় তুমি ছাড়া এ শহর।

কে বললো-
নেই এখানে কোনো নিকষকালো আঁধিয়ার নেই?
তুমি ছাড়া আমার পৃথিবীর সারাটাদিন ধূসর অন্ধকার।

২৫/০৫/২০১৮.

নদীগুলো যায় তো সাগরেই
- সাগর আল হেলাল

শহরগুলো উড়ে বেড়ায় আকাশে আকাশে
বাতাসে ওড়ে উন্নয়নের কাশফুল,
একটা এক পা ওয়ালা শালিক
খুঁটে খুঁটে খায় গণতন্ত্র-
আমরা মধ্যম আয়ের বিমান থেকে
নেমে আসি উন্নয়নশীল দেশে…

দিল্লী বহুত দূর হ্যায়-
তবুও ছুটছি হাত সোজা রাখার অভ্যেস
কখনো লক্ষ্মী কখনো সরস্বতি
কখনো কৃষ্ণের রণনীতি
বাঁচাতেই হবে ক্ষমতার ধর্ম নির্বিশেষে…

রাজা হন প্রজাদের ভগবান
লেখা হয় বিধিলিপি তাঁরই নির্দেশনায়,
প্রজার ভাগ্য বদলাবে কবে
আগে লেখা হচ্ছে ভগবানের ভাগ্যলিপি-
ভগবান ব্যস্ত নেই ধর্ম নিয়ে
তাই এতো অধর্ম বাসে-ট্রেনে-ঝোপ-ঝাড়ে…

নৈমিত্তিক ভালোবাসায় খুশি নন ভগবান
ভাঙন লেগেছে তার আনুগত্যে
এ কথা জানা হয়ে গেছে তার
নদীগুলো যতোই বাঁক খায়, যায়তো সাগরেই…

“ভাষা আন্দোলন হতে স্বাধীন বাংলাদেশের অভূদ্যয়“
বাংলা ও বাঙ্গালী,এই শব্দটির সাথে শোষন,বঞ্চনা ও নিপীরনের যেন এক সকরুন সম্পর্ক বিদ্যমান। আমরা যদি পেছনের দিকে বাংলার ইতিহাসের সন্ধ্যান করি তাহলে কয়েকটি বিষয় আমাদের নজরে আসবে।আর তা হলো, ১.এই বাংঙ্গালী জাতি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ভাবে নানা জাতি দ্বারা শোষিৎ ও বঞ্চিত হয়েছে। ২.এই জাতিকে বিগত কয়েক শতকে ছাড়া কখনো আন্দোলন বা বিদ্রোহ করতে দেখা যায় নি। ৩.এরা খুব সহজেই অন্ধ্যের মত অন্যকে বিশ্বাস করে।  
আর এরই ধারাবাহিকতায় এই বাংলায় বারবার নেমপ এসেছে দুর্যোগের ঘনঘটা।বিশেষ করে ১৮৫৭, ১৯০০–১৯৪৭, ১৯৫২,১৯৬৬,১৯৭১ এর ঘটনা গুলো উল্লেখ যোগ্য।
প্রেক্ষাপট:
একথা সত্য যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পম্চিমারা নানান অযুহাতে বাঙ্গালীদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার চেষ্ঠায় লিপ্ত হয়। প্রথম আঘাত আসে ভাষার উপর।। ফলে ১৯৪৭ সালের ১৯ শে নভেম্বর বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা করার দাবিতে বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, আইনজীবি, শিল্পী, সাংবাদিক ও সরকারী–বেসরকারী ও ওলামারা মুর্খ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের কাছে একটি স্বারক লিপি পেশ করেন। ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সাবকমিটির উদ্দ্যোগে ধর্মঘট ও ছাত্র বিক্ষোভের আহব্বান করা হয়। এই বিক্ষোভ থেকে তোয়াহা, ওলি আহাদ, শেখ মজিব, বাহাউদ্দিন চৌধূরীসহ ৬৯ জন ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। ১৪ ই মার্চ তারা মুক্তি পেলে ১৫ ই মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ‘সাধারন ছাত্রসভা আহুত হয়।
 ১৯৪৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র/ছাত্রীদের সম্মেলনে ঢাকসুর ভি.পি ফরিদ আহম্মদ ‘বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি ভাষা ও শিক্ষার বাহনের দাবি করেন। তিনি বলেন ‘রাষ্ট্রভাষা, লিঙ্গুয়া, ফ্রান্কা নিয়ে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে তার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পূর্ববাংলার জনগনের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করা। ১৯৪৭ সালের ১লা  সেপ্টমবর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ ও রসায়ন বিভাগের দুই অধ্যাপক জনাব আবুল কাশেম ও নূরুল হক পাকিস্তান  ‘তমদ্দুন মজিলস নামে একিট সংগঠেনর গোড়াপওন করেন ।১৯৪৭ সালে ঢাকায় তমুদ্দিন মজলিসের উদ্দোগে এক সাহিত্য সম্মেলনে  পূববাংলা সরকারের মন্ত্রী ও সাহিত্যিক জনাব হাবিবুল্লাহ বাহারে সভাপতিত্বে বক্তাগন বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রকাশ দাবি করেন। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ডক্টর জিয়া উদ্দিন আহম্মদ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার সপক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। কিন্তু জ্ঞানতাপস ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এর প্রতিবাদ জানান। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা র্শীষক নিবন্ধে তিনি লেখেন ‘পাকিস্তান ডোমিনিয়নের বিভিন্ন অঞ্চলের অধীবাসিদের মাতৃভাষা বিভিন্ন যেমন পশতু, বেলুচি, পাঞ্জাবী, সিন্ধি এবং বাংলা, কিন্তু উর্দু কোন অঞ্চলের মাতৃভাষা রুপে চালু নাই। যদি বিদেশী ভাষা বলিয়া ইংরেজী ভাষাকে অবজ্ঞা করা হয় তবে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষারুপে গ্রহন না করার পক্ষে কোন যুক্তি নাই। এরই প্রেক্ষাপটে করাচিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান শিক্ষা সম্মেলনে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব পাশ হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের ভাষা বাংলা ও উর্দু করার সুপারিশ করা হয়। ফলে ১৫ ই ফ্রেরুয়ারী প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা ‘সংগ্রাম পরিষদের’ সাথে এক চুক্তি স্বাক্ষর করেন। চুক্তিতে বলা হয় ‘এপ্রিল মাসের ব্যবস্থাপনা সভায় এই বিষয়ে একটি প্রস্তাব উপস্তাপন করা এবং পাকিস্তান গনপরিষদও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই ব্যাপারে একটি বিশেষ প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে।১৯৪৮ সালের ২৫শে ফ্রেরুয়ারী কংগ্রেস নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গনপরিষদে সর্বপ্রথম ইংরেজী, উর্দু ভাষার পাশাপাশি বাংলাকেও পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্র ভাষা করা প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। কংগ্রেস সদস্য শ্রীশ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ভূপেন্দ্র কুমার দত্ত, ও হেমহরি বর্মা তার এই প্রস্তাকে সমর্থন করেন।  কিন্তু প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবের তীব্র বিরোধীতা করেন। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারাদেশে সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়। উপায় অন্ত না দেখে খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে চুক্তির একটি চুক্তি হয়। কিন্তু হঠাৎ করেই ১৯৪৯ সালের ২৪শে মার্চ পাকিস্তানের গর্ভনর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ এক ঝটিকা সফরে ঢাকায় এসে রমনার রেস্ কোর্স ময়দানে পাচঁলক্ষ লোকের সমাবেশে ঘোষনা করেন ‘উর্দু, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তাৎক্ষনীক ছাত্রসমাজ এর তীব্র প্রতিবাদ জানায় এবং পরের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র/ছাত্রীদের পক্ষ থেকে শাসছুল হক, তোয়াহা, কামরুদিন, আবুর কাশেম, লিলিখান, অলি আহাদ, নইমুদ্দিন আহমেদ শামসল আলম ও সৈয়দ নজরুল ইসলামের পক্ষ থেকে মোহাম্মদ আলী জিন্নাকে একটি স্বারক লিপি দেওয়া হয়। তা সত্যেও জিন্নাহ সাহেব ঢাকায় তার বিদায়ই ভাষনেও সবায়কে পাকিস্তানী হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন ‘বাঙ্গালী, সিন্ধি ও পাঞ্জাবী বেলুচি পরিচয় পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্য বিপদজ্জনক।
১৯৪৮ সালের ২৭শে ফ্রেরুয়ারী সামছুল আলমকে আহব্বায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। ছাত্রদের প্রচন্ড আন্দোলনের মুখে পরবর্তীকালে জিন্নাহ গোপনে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সাথে দেখা করে ‘বাংলাকে‘ প্রাদেশিক সরকারি ভাষা হিসাবে মেনে নিয়ে পূর্ববাংলার ছাত্রসমাজের সাথে একটি আপোষ রফার ব্যাপারে মধ্যস্থতা করার অনুরোধ জানান। ঢাকসুর ভি.পি ফরিদ উদ্দিন, সাধারন সম্পাদক গোলাম আজম ও আব্দুর রহমান চৌধুরী (মহসীন হলের সহ–সভাপতি) আপোষ প্রস্তাবে রাজী হলেও শেখ মজিবুর রহমান, তোয়াহা, অলি আহাদ, তাজউদ্দিন আহম্মদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম আন্দোলন চলিয়ে যাওয়ার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেন। শেখ মজিবুর রহমানের এইরুপ একক নেতৃত্বের কারনে পরবর্তীতে তাদের সাথে দ্বন্দের সূত্রপাত হয় এবং তারা ভিন্ন শিবিরে স্বাধীনতা বিরোধীতা করেন । ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সারাদেশে সাধারন ধর্মঘট পালিত হয়। ২৭ ডিসেম্বর করাচিতে নিখিল পাকিস্তান শিক্ষক সম্মেলনের উদ্বোধণী ভাষনে কেন্দ্রীয় শিক্ষা সচিব ফজলুর রহমান বাংলাভাষায় আরবি হরফ যুক্ত করার পক্ষে জোরাল চুক্তি প্রর্দশন করেন। ১৯৪৮ সালের ৩১শে ডিসেম্বর কার্জন হলে ‘পূর্বপাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান তা যেমন সত্য, তার চেয়ে সত্য আমরা বাঙ্গালী; এটি কোন আদর্শের কথা নয়, এটি বাস্তবসত্য। ১৯৪৯ সালের ৭ই ফ্রেরুয়ারী পেশোয়ারে পাকিস্তান শিক্ষা উপদেষ্ঠা, বোর্ড সভায় বাংলা বর্ণমালা বিলুপ্ত করে আরবী হরফ প্রবর্তনের পক্ষে ধর্মীলেবাসে নানা যুক্তি প্রদর্শন করেন। ফলে সচতুর রাজরৈতিক নেতৃত্ব ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন পাকিস্তানের প্রথম বিরোধী দল হিসাবে ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ প্রতিষ্ঠাব করেন। এই সংগঠনটি শুরু থেকেই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিভিন্ন প্রকার অন্যায়–অত্যাচার, শোষন ও নীপিড়নের বিরোদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যেতে থাকে। ১৯৪৯ সালের ১২ই মার্চ পাকিস্তান সংবিধান সভার প্রস্তাব অনুসারে শাসনতান্ত্রিক মূলনীতি নির্ধারন কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি ১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর সংবিধান সভায় তোদের অন্তবর্তীকালীন রির্পোটে শাসনতান্তিক বিষয়ে রাষ্টভাষাকে ‘উদ্দু’ করার সুপারিশ করে। ইতিপূর্বে ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ঢাকা আরমানিঢোলা ময়দানে নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের এক জন সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত জনসভায় মওলানা ভাসনী ও শামছুল হক (১ম সাধারন সম্পঁদক আওয়ামীলীগ) এর নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ মিছিল গর্ভমেন্ট হাইজের দিকে রওয়ানা হেল পুলিশ বাধা প্রদান করে । আন্দোরনকারীরা বাধা উপেক্ষ করে সামনের দিকে অগ্রসর হলে– আইন শৃংখলা ভঙ্গের অজুহাতে মওলানা ভাসনী ও শামছুল হককে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৪৮ সালের ১২ অক্টোবর এই সংবিধান কমিটি পাকিস্তান অবর্জাভার অফিসে এক সভার আহব্বান করে এবং তাতে কমরুদীন আহম্মদ আতাউর রহমান খান, মোহাম্মদ তোয়াহা, তাজউদ্দিন আহম্মদ পাকিস্তান অবজাভারের সম্পাদক আব্দুস ছালাম ও মানিক মিয়া অংশ গ্রহন করেন। বৈঠকে আন্দোলনের কর্ম–পরিকল্পনা এবং পরিধি নিয়ে আলোচনা হয়। ১৯৫০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মূলনীতি নির্ধারক কমিটির  রির্পোট প্রকাশের সাথে সাথে ঢাকার রাজৈনিতক মহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয় । পূর্ব বাংলার উপর একটি অগনতান্ত্রিক প্রস্তাব চাপিয়ে দেওয়ার চক্রন্তের বিরোদ্ধে স্বঃফুর্ত প্রতিবাদে পাকিস্তান অবর্জাভার অফিসে একটি  সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাতে ডেমোক্রেটিভ ফেডারেশনের নামে একটি সংগঠেনর জন্ম হয়। এই ডেমোক্রেটিভ ফেডারেশনের সদস্যবৃন্দ বিকল্প শাসনতন্তের খড়সা তৈরির জন্য সংবিধান কমিটি নামে একটি সংগঠন গড়ে তুলেন। ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি খাজা নাজিমুদ্দিনের ভাষণ প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন খাজা নাজিমুদ্দিন ২৫ জানুয়ারি ঢাকায় আসেন এবং ২৭ জানুয়ারি পল্টন ময়দানের এক জনসভায় দীর্ঘ ভাষণ দেন। তিনি মূলত জিন্নাহ্‘র কথারই পুনরুক্তি করে বলেন, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচারিত তাঁর ভাষণে তিনি আরো উল্লেখ করেন যে কোনো জাতি দু‘টি রাষ্ট্রভাষা নিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে পারেনি।নাজিমুদ্দিনের বক্তৃতার প্রতিবাদে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ২৯ জানুয়ারি প্রতিবাদ সভা এবং ৩০ জানুয়ারি ঢাকায় ছাত্র ধর্মঘট পালন করে। সেদিন ছাত্রসহ নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় সমবেত হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি ধর্মঘট ও প্রতিবাদ সভা এবং ২১ ফেব্রুয়ারি প্রদেশব্যাপী হরতাল পালনের সিদ্ধান্ত নেয়।পরে তারা তাদের মিছিল নিয়ে বর্ধমান হাউসের (বর্তমান বাংলা একাডেমী) দিকে অগ্রসর হয়। পরদিন ১৯৫২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বার লাইব্রেরি হলে অনুষ্ঠিত সভায় মাওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে ৪০ সদস্যের সর্বদলীয় কেন্দ্রীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদ গঠিত হয়।সভায় আরবি লিপিতে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করা হয় এবং ৩০ জানুয়ারির সভায় গৃহীত ধর্মঘট পালনের সিদ্ধান্তকে সমর্থন দেয়া হয়। পরিষদ ২১ ফেব্রুয়ারি হরতাল, সমাবেশ ও মিছিলের বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে।

পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে সমবেত হয়। সমাবেশ থেকে আরবি লিপিতে বাংলা লেখার প্রস্তাবের প্রতিবাদ এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের দাবি জানানো হয়। ছাত্ররা তাদের সমাবেশ শেষে এক বিশাল বিক্ষোভ মিছিল বের করে।

২০ ফেব্রুয়ারি সরকার স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে ঢাকায় এক মাসের জন্য সভা, সমাবেশ ও মিছিল নিষিদ্ধ করে ১৪৪ ধারা জারি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিভিন্ন হলে সভা করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ৯৪ নবাবপুর রোডস্থ আওয়ামী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আবুল হাশিমের সভাপতিত্বে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মী পরিষদের সভা অনুষ্ঠিত হয়। পরিষদের কিছু সদস্য নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার পক্ষে থাকলেও, সবশেষে ১১–৩ ভোটে[ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে একই বিষয় নিয়ে পৃথক পৃথক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সন্ধ্যায় সলিমুল্লাহ হলে ফকির শাহাবুদ্দীনের সভাপতিত্বে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ফজলুল হক মুসলিম হলে অনুষ্ঠিত সভায় নেতৃত্ব দেন আবদুল মোমিন। শাহাবুদ্দিন আহমদের প্রস্তাব অনুযায়ী রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদকে এই সিদ্ধান্তটি জানিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নেন আবদুল মোমিন এবং শামসুল আলম।পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী এ দিন সকাল ৯টা থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এসে জড়ো হয়। তারা ১৪৪ ধারা জারির বিপক্ষে স্লোগান দিতে থাকে এবং পূর্ব বঙ্গ আইন পরিষদের সদস্যদের ভাষা সম্পর্কে সাধারণ জনগণের মতামতকে বিবেচনা করার আহ্বান জানাতে থাকে। পুলিশ অস্ত্র হাতে সভাস্থলের চারদিক ঘিরে রাখে। বিভিন্ন অনুষদের ডীন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঐসময় উপস্থিত ছিলেন। বেলা সোয়া এগারটার দিকে ছাত্ররা গেটে জড়ো হয়ে প্রতিবন্ধকতা ভেঙে রাস্তায় নামার প্রস্তুতি নিলে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ছাত্রদের সতর্ক করে দেয়।কিছু ছাত্র ঐসময়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের দিকে দৌঁড়ে চলে গেলেও বাদ–বাকিরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে পুলিশ দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে এবং পুলিশের আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে। উপাচার্য তখন পুলিশকে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ বন্ধ করতে অনুরোধ জানান এবং ছাত্রদের বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ত্যাগের নির্দেশ দেন। কিন্তু ছাত্ররা ক্যাম্পাস ত্যাগ করার সময় কয়েকজনকে ১৪৪ ধারা ভঙ্গের অভিযোগে পুলিশ গ্রেফতার শুরু করলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক ছাত্রকে গ্রেফতার করে তেজগাঁও নিয়ে গিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়। এ ঘটনায় ছাত্ররা আরও ক্ষুব্ধ হয়ে পুনরায় তাদের বিক্ষোভ শুরু করে।
বেলা ২টার দিকে আইন পরিষদের সদস্যরা আইনসভায় যোগ দিতে এলে ছাত্ররা তাদের বাঁধা দেয়। কিন্তু পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে যখন কিছু ছাত্র সিদ্ধান্ত নেয় তারা আইনসভায় গিয়ে তাদের দাবি উত্থাপন করবে। ছাত্ররা ঐ উদ্দেশ্যে আইনসভার দিকে রওনা করলে বেলা ৩টার দিকে পুলিশ দৌঁড়ে এসে ছাত্রাবাসে গুলিবর্ষণ শুরু করে। পুলিশের গুলিবর্ষণে আব্দুল জব্বার এবং রফিক উদ্দিন আহমেদ ঘটনাস্থলেই নিহত হন। এছাড়া আব্দুস সালাম, আবুল বরকতসহ আরও অনেকে সেসময় নিহত হন।
ছাত্র হত্যার সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে জনগণ ঘটনাস্থলে আসার উদ্যোগ নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই সমস্ত অফিস, দোকানপাট ও পরিবহন বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রদের শুরু করা আন্দোলন সাথে সাথে জনমানুষের আন্দোলনে রূপ নেয়।রেডিও শিল্পীরা তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে শিল্পী ধর্মঘট আহ্বান করে এবং রেডিও স্টেশন পূর্বে ধারণকৃত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতে থাকে।

ঐসময় গণপরিষদে অধিবেশন শুরুর প্রস্তুতি চলছিল। পুলিশের গুলির খবর জানতে পেরে মাওলানা তর্কবাগিশসহ বিরোধী দলীয় বেশ কয়েকজন অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করে বিক্ষুদ্ধ ছাত্রদের পাশে এসে দাঁড়ান। গণপরিষদে মনোরঞ্জন ধর, বসন্তকুমার দাস, শামসুদ্দিন আহমেদ এবং ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত–সহ ছোট ছয়জন সদস্য মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিনকে হাসপাতালে আহত ছাত্রদের দেখতে যাবার জন্যে অনুরোধ করেন এবং শোক প্রদর্শনের লক্ষ্যে অধিবেশন স্থগিত করার কথা বলেন।কোষাগার বিভাগের মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশ, শরফুদ্দিন আহমেদ, সামশুদ্দিন আহমেদ খন্দকার এবং মসলেউদ্দিন আহমেদ এই কার্যক্রমে সমর্থন দিয়েছিলেন। যদিও নুরুল আমিন অন্যান্য নেতাদের অনুরোধ রাখেননি এবং অধিবেশনে বাংলা ভাষার বিরোধিতা করে বক্তব্য দেন।


ভাষা আন্দোলনের পরবর্তী:
১৯৫১ সালে লাহোরে কায়েদে মিল্লাত লিয়াকত আলী খান আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। ফলে সারাদেশ ব্যাপি রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়। ১৯৫৪ সালের প্রাদেশীক পরিষদ নির্বাচন ঘোষিত হলে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে অন্যান্য দল মিলে ‘যুক্তফ্রন্ট’ নামীয় একটি সমন্বিত বিরোধী ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ গঠন করার উদ্যোগ নেয়া হয় এবং আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর তারিখে কৃষক শ্রমিক পার্টি, পাকিস্তান গণতন্ত্রী দল ও পাকিস্তান খেলাফত পার্টির সঙ্গে মিলে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে ।যুক্তফ্রন্টের প্রধার তিন নেতা ছিলেন মওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা এ.কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। এই যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার একটি নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করে। যথা–

১.বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হবে।
২. বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি ও সমস্ত খাজনা আদায়কারী স্বত্ব উচ্ছেদ ও রহিত করে উদ্বৃত্ত জমি ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে বিতরণ এবং খাজনা হ্রাস ও সার্টিফিকেট মারফত খাজনা আদায় রহিত করা হবে।
৩. পাট ব্যবসা জাতীয়করণ এবং তা পূর্ববঙ্গ সরকারের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় আনা এবং মুসলিম লীগ শাসনামলের পাট কেলেঙ্কারির তদন্ত ও অপরাধীর শাস্তি বিধান করা।
৪. কৃষিতে সমবায় প্রথা প্রবর্তন এবং সরকারি সাহায্যে কুটির শিল্পের উন্নয়ন।
৫. পূর্ববঙ্গকে লবণ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ করা।
৬. কারিগর শ্রেনীর গরীব মোহাজেরদের কর্মসংস্থানের আশু ব্যবস্থা।
৭. খাল খনন ও সেচ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশে বন্যা ও দূর্ভিক্ষ রোধ ।
৮. পূর্ববঙ্গে কৃষি ও শিল্প খাতের আধুনিকায়নের মাধ্যমে দেশকে স্বাবলম্বী করা এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) মূলনীতি মাফিক শ্রমিক অধিকার প্রতিষ্ঠা।
৯. দেশের সর্বত্র অবৈতনিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার প্রবর্তন এবং শিক্ষকদের ন্যায্য বেতন ও ভাতার ব্যবস্থা।
 ১0. শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার, মাতৃভাষায় শিক্ষাদান, সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের ভেদাভেদ বিলোপ করে সকল বিদ্যালয়কে সরকারি সাহায্যপুষ্ট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা।
১১. ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রভৃতি প্রতিক্রিয়াশীল আইন বাতিল এবং উচ্চশিক্ষা সহজলভ্য করা।
১২. শাসনব্যয় হ্রাস, যুক্তফ্রন্টের কোনো মন্ত্রীর এক হাজার টাকার বেশি বেতন গ্রহণ না করা।
১৪. দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও ঘুষ–রিশ্ওয়াত বন্ধের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহন।14. জননিরাপত্তা আইন, অর্ডিন্যান্স ও অনুরূপ কালাকানুন বাতিল, বিনাবিচারে আটক বন্দির মুক্তি, রাষ্ট্রদ্রোহিতায় অভিযুক্তদের প্রকাশ্য আদালতে বিচার এবং সংবাদপত্র ও সভাসমিতি করার অবাধ অধিকার নিশ্চিত করা।
১৫. বিচারবিভাগকে শাসনবিভাগ থেকে পৃথক করা।
১৬. বর্ধমান হাউসের পরিবর্তে কম বিলাসের বাড়িতে যুক্তফ্রন্টের প্রধান মন্ত্রীর অবস্থান করা এবং বর্ধমান হাউসকে প্রথমে ছাত্রাবাস ও পরে বাংলা ভাষার গবেষনাগারে পরিণত করা।
১৭. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিচিহ্নস্বরূপ ঘটনাস্থলে শহীদ মিনার নির্মাণ করা এবং শহীদদের পরিবারবর্গকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া।
১৮. একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহীদ দিবস এবং সরকারি ছুটির দিন হিসেবে ঘোষনা করা।
১৯. লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ববঙ্গের পূর্ণ স্বায়ত্তসাশন এবং দেশরক্ষা, পররাষ্ট্র ও মূদ্রা ব্যতীত সকল বিষয় পূর্ববঙ্গ সরকারের অধীনে আনয়ন, দেশরক্ষা ক্ষেত্রে স্থলবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পশ্চিম পাকিস্তানে এবং নৌবাহিনীর হেডকোয়ার্টার পূর্ব পাকিস্তানে স্থাপন এবং পূর্ব পাকিস্তানে অস্ত্রনির্মাণ কারখানা স্থাপন ও আনসার বাহিনীকে সশস্ত্র বাহিনীতে পরিণত করা।
২০. কোনো অজুহাতে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা কর্তৃক আইন পরিষদের আয়ু না বাড়ানো এবং আয়ু শেষ হওয়ার ছয়মাস পূর্বে মন্ত্রিসভার পদত্যাগপূর্বক নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করা।
২১. যুক্তফ্রন্টের আমলে সৃষ্ট শূন্য আসন তিন মাসের মধ্যে উপনির্বাচনের ব্যবস্থা করা এবং পরপর তিনটি উপনির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট প্রার্থী পরাজিত হলে মন্ত্রিসভার পদত্যাগ করা।

১৯৫৪ সালের মার্চের৮থেকে ১২ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান পরিষদের নির্বাচনে ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩ টি আসন অর্জ্জন করে।  তন্মধ্যে ১৪৩ টি পেয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ, ৪৮ টি পেয়েছিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামী ইসলাম পার্টি লাভ করেছিল ২২, গণতন্ত্রী দল লাভ করেছিল ১৩ টি এবং খেলাফত–ই–রাব্বানী নামক দলটি ১ টি আসন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল মুসলিম লীগ সম্পূর্ণরূপে এ নির্বাচনে পরাভূত হয় ; তারা কেবল ৯ টি আসন লাভ করতে সমর্থ হয়।

এ নির্বাচনে সংখ্যালঘু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের জন্য ৭২টি আসন সংরক্ষিত ছিল। এগুলোর মধ্যে কংগ্রেস লাভ করেছিল ২৪টি আসন, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি, শিডিউল্ড কাস্ট ফাউন্ডেশন ২৭ টি, গণতন্ত্রী দল ৩ টি এবং ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ পার্টি ১৩ টি আসন লাভ করেছিল। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী একটি আসনে জয়ী হয়েছিলেন।১৯৫৪ সালের ৩ রা এপ্রিল শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুক হক চার সদস্য বিশিষ্ট যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভা গঠন করেন। পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী পরিষদ গঠন করা হয় ১৫ মে তারিখে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুর হক। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় এসে বাংলা একাডেমী গঠন করে। এ প্রতিষ্ঠান বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্যের সংরক্ষণ, গবেষণা এবং মান উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করবে বলে গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়। যুক্তফ্রন্ট ক্ষমতায় আসার কিছুদিনের মধ্যেই পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মাল গোলাম মাহমুদ ১৯৫৪ সালের ৩০ মে তারিখে কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক সরকার বাতিল ঘোষণা করে এবং ১৯৫৪ সালের ৩১ মে ‘ব্লাসফেমি’ আইন জারি করে পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রী পরিষদ বাতিল করে দিয়ে শাসনতন্ত্রের ৯২ (ক) ধারা জারীর মাধ্যমে প্রদেশে গভর্ণরের শাসন প্রবর্তন করেন। ১৯৫৫ সালের ৬ জুন তারিখে যুক্তফ্রন্ট পুণর্গঠন করা হয়; যদিও আওয়ামী লীগ মন্ত্রী পরিষদে যোগদেয়নি।১৯৫৫ সালের ২৭ জুন ঢাকার পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় সভাপতির ভাষনে মওলানা ভাসানী বলেন ‘শোষন–শাসনের মনভিত্তি ত্যাগ না করতে পারলে পূর্ব পাকিস্তান পম্চিম পাকিস্তাকে আসসালামু আলাইকুম বলতে বাধ্য হবে।

একথা সত্য যে, ১৯৫৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর হোসেন শহীদ সোহ্ওয়ার্দীর প্রধানমন্ত্রিত্বে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ ও রিপাবলীকান পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হলে সোহ্ওয়ার্দী সাহেব মার্কিনমূখী পররাষ্ট্রণীতি গ্রহন করে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সিয়াটো, সেন্টো প্রভুতি সামরিক চুক্তির পক্ষ অবলম্বন করে।  সাথে আরো ছিল মৌলানা আতাহার আলীর নেজামে ইসলাম পার্টি।  গনতন্ত্রী দলের নেতা ছিলেন হাজী মোহাম্মদ দানিশ এবং মাহমুদ আলি সিলেটি।ফলে কেন্দ্রীয় সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এইরুপ আমেরিকাপন্থী মতাদর্শের কারনে আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রাদেশীক সভাপতি মওলানা ভাসানীর সাথে মতানৈক্য দেখা দেয়। ১৯৫৫ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগ নামেয় দলটি থেকে সম্প্রদায়িক ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে দলটিকে অসম্প্রদায়ীক ও সর্বজনীন করে নির্বানে অংশ গ্রহনের তুরজুর চলে। কেন্দ্রীয় সভাপতি ও প্রাদেশীক সভাপতির পরস্পর ভিন্ন মতার্দশের কারনে আওয়ামী লীগ ভেঙ্গে যায় এবং মওলানা ভাষানির নেতৃত্বে ‘ন্যাশনার আওয়ামী লীগ’ নামে একটি নতুন দলের সৃষ্টি হয়।
বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি :
কেন্দ্রীয় সরকারে সংবিধান প্রনয়ন নিয়ে অচল অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে গর্ভনর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গনপরিষদ ভেঙ্গে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে খাজা নাজিমুদ্দিনকে অপসারন করে। এই সময়টিতে সারা পাকিস্তান ব্যাপি দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে মওলানা ভাষানী পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসন দাবি করেন।  অনেক ঘটনা–অঘটনার মধ্যদিয়ে ১৯৫৬ সালে ৪ মার্চ জেনারেল ইস্কান্দার র্মীজা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। ২৩ শে মার্চ রাতে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদে পশ্চিমা তাবেদারী ভিত্তিক একটি নতুন সংবিধান প্রনীত হয়।

কিন্তু পূর্বপাকিস্তানের নয় জননেতা এই সংবিধান ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক অনৈতিক বিবৃতি প্রদান করেন। আওয়ামী লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গন–পরিষদে সংবিধান সস্পর্কীত এক বক্তৃতায় বলেন ‘আমি এমন সংবিধান চাই না, যা দেশের একাংশের স্বার্থের উদগ্র তাগিদে অপরাংশের স্বার্থের পরিপন্থি হয়। এতদ্ব সত্যেও পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী এই সংবিধানকেই পূর্বপাকিস্তানের জনগনের উপর চাপিয়ে দেয়। কিন্তু ১৯৫৭ সালের ২৭ জুলাই প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে প্রেসিডেন্ট আইজেন হাওয়ারের সাথে এক যুক্ত বিবৃতিতে কমিউনিজমকে ‘স্বাধীন বিশ্বের জন্য হুমকি হিসাবে উল্লেখ করেন এবং প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি পরিত্যাগ করেন। এদিকে বিখ্যাত কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাষানী প্রথম প্রকাশ্যে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের’ কথা উল্লেখ করেন। কেন্দ্রীয় সরকার বাঙ্গালীদের প্রতিবাদী কন্ঠরোধ করতে ও ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত করতে আইয়ুব খান নেতৃত্বে ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারি করে। পূর্বপাকিস্তানের বিভিন্ন পত্র–পত্রিকায় জোর দিয়ে পম্চিম পাকিস্তানীদের পাহাড়সম ‘অর্থনৈতি’ বৈষম্য প্রকাশ পেতে থাকে। পশ্চিমাদের শোষন–নিপীড়নের হাত থেকে বাঙ্গালীদের মুক্তির লক্ষ্যে ১৯৬২ সালে শেখ মজিবুর রহমান আত্মগোপনকারী কমিউনিষ্ট নেতা মনি সিংহ ও খোকা রায়ের সঙ্গে গোপন বৈঠকে শেখ মজিবুর রহমান বলেন ‘দাদা একটি কথা আমি খোলা মনে বলতে চাই; আমার বিশ্বাস গণতন্ত্র ও শ্বায়িত্তশাসনে কিন্তু পাকিস্তানীরা তা মানবে না, কাজেই স্বাধীনতা ছাড়া বাঙ্গালীদের মুক্তির উপায় নাই। ইতিমধ্যে কাস্মীর সংক্রান্ত গোলযোগের কারনে ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান–ভারতের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে পড়ে। পাকিস্তান শাসকচক্র যুদ্ধে পূর্বপাকিস্তানের যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা না করে অধিকহারে বাঙ্গালিদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে আত্মহুতির দিকে ঠেলে দেয়। অসীম সাহস ও দক্ষতা নিয়ে তারা প্রানপণ যুদ্ধ করলে জাতিসংঘের মধ্যস্তায় ‘তাসকন্দ চুক্তির’ মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। ইতিমধ্যে দেশের সাধারন জনগন স্বাধীনতার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ফলে মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর নেতৃত্বে ‘ইনার সার্কেল নামে স্বাধীনতাকামী গ্রুপের’ আহব্বানে শেখ মজিবুর রহমান আগরতলায় যান। সেখানে স্বাধীনতাকামী সামরিক ও বেসামরিক কর্মকতাদের সাথে কয়েক দফা বৈঠক করেন এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে ভারতের সহযোগিতা চান। আগরতলা থেকে ফিরে এসেই তিনি ১৯৬৬ সালের ফ্রেরুয়ারী মাসে বাঙ্গালীর ‘মুক্তির সনদ’ হিসাবে ঐতিহাসিক ছয় দফা দাবি প্রেস করেন। এই ছয় দফা প্রস্তাবে বলা হয়–
১৯৬৬ এর ছয় দফা:
১. লাহোর প্রস্তাব এর ওপর ভিত্তি করে সংবিধান একটি ফেডারেল ও সংসদীয় সরকারের অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে, যে সংসদের সদস্যরা জনসংখ্যার ভিত্তিতে গঠিত নির্বাচনী এলাকা থেকে প্রতিনিধি হিসেবে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ভোটে নির্বাচিত হবেন। আইন প্রণয়নকারী পরিষদ প্রশাসনের চেয়ে উচ্চতর বলে বিবেচিত হবে।
২. ফেডারেল সরকার শুধুমাত্র প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ে নীতি নির্ধারণ করবে, অবশিষ্ট বিষয় পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকারের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
৩. উভয় ভাগে নিজস্ব মুদ্রা ও তহবিল থাকবে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে সম্পদ পশ্চিম পাকিস্তানে যাওয়া রোধ করা গেলে অভিন্ন মুদ্রা চালু থাকতে পারে।
৪. কর ও রাজস্ব আদায় প্রাদেশিক সরকারের এখতিয়ারভুক্ত হবে, এবং ফেডারেল সরকার সংবিধানে স্বীকৃত পদ্ধতিতে প্রাদেশিক সরকারের কাছ থেকে অর্থের যোগান পাবে।
৫. প্রাদেশিক সরকার তার অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে, স্বাধীণভাবে বিদেশে বাণিজ্য প্রতিনিধি প্রেরণ করতে পারবে এবং অন্য দেশের সাথে বাণিজ্য চুক্তিতে আবদ্ধ হতে পারবে। ফেডারেল সরকারের প্রয়োজনীয় বৈদেশিক অর্থ প্রাদেশিক সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হবে।
৬ . প্রাদেশিক সরকার তার নিজস্ব মিলিশিয়া বা আধাসামরিক বাহিনী গঠন করতে পারবে।

ছয় দফার স–পক্ষে ব্যাপক জনপ্রিয়তা গড়ে উঠে। বাঙ্গালীরা এটিকে তাদের ‘মুক্তিরসনদ’ হিসাবে বিবেচনা করে। ১৯৬৬ সালে ৭ মার্চ ছয়দফা ঘোষনাটি সারা পাকিস্তানের পত্র–পত্রিকায় ফলাও করে ছাপা হয়। শেখ মজিবুর রহমান ১১  মার্চ ঢাকা বিমান বন্দরে সাংবাদিক সম্মেলনে ছয়দফা ব্যাখ্যা করেন।১৯৬৬সালের ১২ ই মার্চ ‘রমনাগ্রিনে বেসিক ডেমোক্রেসিস সম্মেলনে আইয়ুর খান ছয়দফা দাবি অবজ্ঞা করে অস্রের ভাষায় কথা বলতে থাকেন। মুসলিম লীগ, জামায়তে ইসলামী, পিডিপিসহ ডানপন্থিরা ছয়দফা দাবিকে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির জন্য বিপদজনক বলে উল্লেখ করেন।
সাত
১৯৬৬সালের ১৮ মার্চ মতিঝিলের হোটেল ইডেন গার্ডেনে আওয়ামী লীগ কাউন্সিলে ছয়দফা অনুমোদিত হলে পাকিস্তান সরকার শেখ মজিবুর রহমানসহ ৩৫ জন ব্যক্তির বিরুদ্ধে আগরতলা ষড়যন্ত্র নামে একটি রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করেন। ১৯৬৮ সালের প্রথম ভাগে দায়ের করা এই মামলায় অভিযোগ করা হয় যে, শেখ মুজিব ও অন্যান্যরা ভারতের সাথে মিলে পাকিস্তানের অখন্ডতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। এই মামলাটির পূর্ণ নাম ছিল রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিবর রহমান গং মামলা। তবে এটি আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসাবেই বেশি পরিচিত, কারণ মামলার অভিযোগে বলা হয়েছিল যে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় কথিত ষড়যন্ত্রটি শুরু হয়েছিল। মামলা নিষ্পত্তির চার যুগ পর মামলার আসামী ক্যাপ্টেন এ. শওকত আলী ২০১১ সালে প্রকাশিত একটি ‘স্বরচিত গ্রন্থে’ এ মামলাকে সত্য মামলা‘ বলে দাবী করেন।এই মামলার ফলেশ্রুতিতে পূর্ববাংলার জনমনে স্বঃ্স্ফুর্ত ভাবে পশ্চিম পাকিস্তান বিরোধী এক গন–আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। এই গনঅভূস্থানের পটভূমি এবং ফলাফল ছিল সুদূর প্রসারী।১৯৬৯ সালের ৫ জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে ‘ঢাকসুর’ কার্যালয়ে তৎকালীন ছাত্রলীগের নেতা ঢাকসুর ভি.পি তোফায়েল আহম্মদের সভাপতিত্বে চার ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সম্মেলনে ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে ‘কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। এই কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ দফা দাবি ঘোষনা করা হয়। ৪ ই জানুয়ারী সম্মিলিত বিরোধী দল সন্ধ্যায় শেখ মুজিবের বাসভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘আটদফা’ ভিত্তিক একটি ঘোষনাপত্র প্রকাশ করে।৯ ই জানুয়ারী এই ঐক্যফ্রন্টের ঐক্যের ভিত্তিতে ‘Democratic Action Committee’ সংক্ষেপে ‘ডাক’ গঠন করে। ১২ ই জানুয়ারী ‘ডাকের পক্ষ্যে ‘প্রাদেশিক সমুন্বয় কমিটির’ সভা অনুষ্ঠিত হয়। আট দফা দাবির ভিত্তিতে 17জানুয়ারী ‘দাবি দিবস’ পালনের সিন্ধান্ত গৃহিত হয়। কিন্তু আইয়ুব সরকার এই দিন ১৪৪ দ্বারা জারি করেন। ছাত্র জনতা ১৪৪ দ্বারা ভঙ্গ করে ‘ডাকের পক্ষ থেকে বায়তুল মোকারমে, এবং ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় সমাবেশের আহব্বান করা হয়। সমাবেশে পুলিশ ব্যাপক লাঠিচার্জ করলে ১৮ ই জানুয়ারী শনিবার ঢাকা শহরের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত করা হয়। সেই দিন ভোরে বটতলায় এক সমাবেশ থেকে স্লোগান আসে ‘শেখ মজিবের মুক্তি চাই, আইয়ুব খানের পতন চাই। সন্ধ্যায় (জিন্নাহ হল) বর্তমান সূর্যসেন হলে ইপিআর কতৃর্ক ছাত্রদের উপর লাঠিচার্জ করা হলে ১৯ জানুয়ারী প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছাত্রদের একটি মিছিল বের হয়। পুলিশ তাতে ব্যাপক লাঠিচার্জ এবং গুলাবর্ষন করে। ২০ জানুয়ারী কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ১১ দফার দাবিতে ঢাকাসহ প্রদেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। এই সময় ছাত্র মিছিলে গুলি চালানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ‘আসাদের’ মুত্যৃ হয়। শহীদ মিনারে শোকসমাবেশে ছাত্ররা ‘আসাদের রক্ত ছুয়ে শপথ গ্রহন করে এবং ২১ শে জানুয়ারী পল্টন ময়দানে শহীদ ‘আসাদের’ গায়েবানা জানাজা শেষে ২২ জানুয়ারী শোক মিছিল, কালো ব্যাজ ধারন, কালো পতাকা উত্তোলন কর্মসূচী ঘোষনা করা হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ২৪ জানুয়ারী সন্ধ্যায় মশাল মিছিল এবং হরতালের আহব্বান করা হয়। এই হরতাল ও গন মিছিলে গুলি চালালে ঢাকার নবকুমার ইনষ্টিটিউটের নবম শ্রেনীর ছাত্র ‘মতিউর রহমান’ শহীদ হয়।এই সময় ক্ষিপ্তজনতা দৈনিক পাকিস্তান, মনিং নিউজ এবং পয়গাম পত্রিকা অফিসে আগুন লাগিয়ে দেয়। ফলে ২৫,২৬ ও ২৭ জানুয়ারী আইয়ুব সরকার ‘সন্ধ্যা আইন’ জারি করে।২৭ জানুয়ারী ঢাকায় গুলাবর্ষনের প্রতিবাদে পশ্চিম পাকিস্তানেও গন বিক্ষোভ শুরু হয়। ১লা ফ্রেরুয়ারী আইয়ুব খান বেতারে জাতির উদেশ্যে ‘ভাষন’ প্রদান করে। কিন্তু বিরোধীদল ও ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ এই ভাষন প্রত্যাখান করে। ৯ জানুয়ারী সর্বদলীয় ‘ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ’ পল্টল ময়দানে ‘শপথ’ দিবস পালন করে।উক্ত শপথ দিবসে ১০ জন সর্বদলীয় ছাত্রনেতা জীবনের বিনিময়ে হলেও ১১ দফা দাবি প্রতিষ্ঠার ঘোষনা করে এবং শেখ মজিবসহ সকল রাজবন্দীর মুক্তির লক্ষ্যে দেশবসীর প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাবার আহব্বান জানান। ১১ ই ফ্রেরুয়ারী পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনে ধৃত রাজবন্দীদের মুক্তি দেয়া হলে ১২ ফ্রেরুয়ারী তাজউদ্দিন আহম্মেদ মুক্তি লাভ করেন। ১৪ ফ্রেরুয়ারী ‘ডাকের’ পক্ষ থেকে হরতালের আহব্বান করা হয় এবং অবাঞ্চিত বক্তব্যের কারনে নূরুল আমীন এবং ফরিদ উদ্দিন আহম্মদকে লাঞ্চিত করা হয়।১৫ ফ্রেরুয়ারী আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম আসামী সার্জেন্ট ‘জহুরুল হককে’ ক্যান্ট্রোনমেন্টের অভ্যন্তরে নিমর্ম ভাবে গুলি হত্যা করা হয়। আইয়ুব খান সরকার ২৫ ও ২৬ ফ্রেরুয়ারী ‘সন্ধ্যাআইন’ জারি করে আগরতলার মামলা প্রত্যাহার ও শেখ মজিবসহ সকল বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের প্যারেলে মুক্তি দিয়ে এক গোলটেবিল বৈঠকের আহব্বান জানালে ছাত্র জনতা তা প্রত্যাখান করে।১৬ ফ্রেরুয়ারী ছাত্র জনতার বিক্ষোভে ঢাকা শহর দাউ দাউ করে জ্বলে উঠে এবং ১৭ ফ্রেরুয়ারী সারা দেশে হরতাল পালিত হয়। ১৮ই ফ্রেরুয়ারী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও রসায়ন বিভাগের রিডার শামসুজ্জোহাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে পাকিস্তানী সেনারা বেয়োনেট চার্জে নিমর্ম ভাবে হত্যা করে। ফলে সারা দেশব্যাপী এক উত্তাল আন্দোলনের সৃষ্টি হয়। ২০ ফ্রেরুয়ারী ‘সন্ধ্যা আইন’ প্রত্যাহার করা হয় এবং ২১ ফ্রেরুয়ারী পল্টনে মহাসমুদ্রে ছাত্রসমাজের অগ্রণায়কদের শপথ এবং শেখ মজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সকল রাজবন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে ২৪ ঘন্টার আল্ট্রিমেটাম দেওয়া হয়। ২২ শে ফ্রেরুয়ারী নিরুপায় আইয়ুব খান শেখ মজিবসহ সকল রাজবন্দীদের নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান করেন। ২৩ শে ফ্রেরুয়ারী ‘সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম’ পরিষদ বিকেল ৩ টায় সোহরাওয়ার্দী উদ্দ্যানে এক জনসমাবেশের আহব্বান করলে ১০ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে  গনঅভূস্থানের অন্যমত ছাত্রনেতা তোফায়েল আহম্মদ শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভুষিত করেন। এখানে উল্লেখ থাকে যে, বঙ্গবন্ধু উপাধীর জন্য তিন জনের নাম নির্বাচিত করা হলেও (সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী এবং শেখ মজিবর রহমান) শেষ পর্যন্ত ছাত্রলীগের সিন্ধান্তেই শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু উপাধীতে ভূষিত করা হয়। ফলে অপমান–লাঞ্চনা নিয়ে আইয়ুব খান পদত্যাগ করেন।
 
১৯৭০ সালে নির্বাচনের একটি পোস্টারে অর্থনৈতিক বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়।





বৈষম্যের বিষয়


বাংলাদেশ (কোটি)


পশ্চিম পাকিস্তান (কোটি)




রাজস্ব খাতে


১৫০০


৫০০০




উন্নয়ন খাতে


৩০০০


৬০০০




বৈদেশিক সাহায্য


শতকরা ২০


শতকরা ৮০




বৈদেশিক দ্রব্য আমদানী


শতকরা ২৫


শতকরা ৭৫




কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরি


শতকরা ১৫ জন


শতকরা ৮৫




সমরিক বিভাগে চাকরি


শতকরা ১০ জন


শতকরা ৯০




চাউল (মন প্রতি)


৩০ টাকা


১৫ টাকা




সরিষা তৈল (সের প্রতি)


৫ টাকা


২.৫০ টাকা




স্বর্ন প্রতি ভরি


১৭০ টাকা


১৩৫ টাকা




বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি অনুসন্ধান করে দেখা যায় ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণমূলক আচরণ। কেবল অর্থনৈতিক শোষণ নয়, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপরও নিপীড়ন শুরু হয় এবং এর প্রথম দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয় যখন পাকিস্তানের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ঢাকায় এসে ঘোষণা দেন “উর্দু এবং কেবলমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা”। সাথে সাথে পূর্ব পাকিস্তানের বাঙ্গালীরা এই ঘোষণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্যে এই আন্দোলন তীব্রতম রূপ ধারণ করে। এদিন পুলিশের গুলিতে প্রাণ দেন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার সহ আরো অনেকে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীকে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ সালে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে হয়। আজ পৃথিবীব্যাপী ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়।
 সামরিক অসমতাঃ
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে বাঙ্গালীরা অবহেলিত ছিল। সশস্ত্র বাহিনীর বিভিন্ন অংশে সমগ্র বাহিনীর মাত্র ৫ শতাংশ ছিল বাঙ্গালী অফিসার এবং এদের মধ্যে অধিকাংশই প্রযুক্তিগত বা ব্যবস্থাপনার পদে ছিলেন। খুব অল্প সংখ্যক বাঙ্গালী অফিসার আদেশদানকারী পদ লাভের সুযোগ পেতেন। পশ্চিম পাকিস্তানীরা বিশ্বাস করত বাঙ্গালীরা পশতুন বা পাঞ্জাবীদের মত “সাহসী” নয়। পাকিস্তানের বাজেটের একটি বিশাল অংশ সামরিক খাতে বরাদ্দ থাকলেও পূর্ব পাকিস্তান এর সুফল সামান্যই পেত। ১৯৬৫ সালে কাশ্মির নিয়ে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বাঙ্গালীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি আরও বাড়িয়ে দেয়।
রাজনৈতিক অসমতাঃ
জনসংখ্যার দিক দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তানের বৃহত্তর অংশ হওয়া সত্ত্বেও দেশের রাজনৈতিক ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করে রাখে। জনসংখ্যার ভিত্তিতে ক্ষমতার বণ্টন পূর্ব পাকিস্তানের অনুকূল হওয়ায় পশ্চিম পাকিস্তান “(এক ইউনিট তত্ত্ব” নামে এক অভিনব ধারণার সূত্রপাত করে, যেখানে সমগ্র পশ্চিম পাকিস্তান একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচিত হয়। এর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানের পূর্ব ও পশ্চিম অংশের ভোটের ভারসাম্য আনা। মজার ব্যাপার হল বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর পাঞ্জাব প্রদেশ প্রস্তাব করে পাকিস্তানে সরাসরি জনসংখ্যার বন্টনের ভিত্তিতে ভোট অনুষ্ঠিত হোক, কারণ পাঞ্জাবিরা ছিল সিন্ধি, পশতুন, বালুচ বা পাকিস্তানের অন্য যেকোন গোত্রের তুলনায় সংখ্যাগরিষ্ঠ।
একেবারে শুরু থেকেই পাকিস্তানে শাসনের নামে ষড়যন্ত্র শুরু হয়, আর এই ষড়যন্ত্রে মূল ভূমিকা পালন করে সামরিক বাহিনী। যখনই পূর্ব পাকিস্তানের কোন নেতা, যেমন খাজা নাজিমুদ্দিন, মোহাম্মদ আলী বগুড়া, অথবা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতেন, তখনই পশ্চিম পাকিস্তানীরা কোন না কোন অজুহাতে তাদের পদচ্যুত করত। নানারকম টালবাহানা করে জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের শাসন ক্ষমতা দখল করে নেন এবং দীর্ঘ ১১ বছর ধরে পাকিস্তানে তার স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালু থাকে। পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের এই অনৈতিক ক্ষমতা দখল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দূরত্ব বাড়িয়েই চলে।
পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি চূড়ান্ত নাটকীয়তার মুখোমুখি হয় যখন ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় দল পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দলটি পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯ টি আসন হতে ১৬৭ টি আসনে জয়লাভ করে এবং ৩১৩ আসনবিশিষ্ট জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, যা আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনের অধিকার প্রদান করে। কিন্তু নির্বাচনে দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাপ্রাপ্ত দল পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো শেখ মুজিবের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার বিরোধিতা করেন। তিনি প্রস্তাব করেন পাকিস্তানের দুই প্রদেশের জন্যে থাকবে দু’জন প্রধানমন্ত্রী। “এক ইউনিট কাঠামো” নিয়ে ক্ষুব্ধ পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে এরূপ অভিনব প্রস্তাব নতুন করে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ভুট্টো এমনকি মুজিবের ৬-দফা দাবি মেনে নিতেও অস্বীকৃতি প্রকাশ করেন। মার্চের ৩ তারিখ পূর্ব ও পশ্চিম অংশের এই দুই নেতা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টকে সঙ্গে নিয়ে দেশের ভাগ্য নির্ধারণে ঢাকায় বৈঠকে মিলিত হন। তবে বৈঠক ফলপ্রসূ হয় না। মুজিব সারা দেশে ধর্মঘটের ডাক দেন।
 
 
১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। এই ভাষণে তিনি ২৫শে মার্চ জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে চার দফা দাবি পেশ করেন:
১/অবিলম্বে মার্শাল ল’ প্রত্যাহার করতে হবে।
২/সামরিক বাহিনীকে ব্যারাকে ফিরে যেতে হবে।
৩/নিহত ব্যক্তিদের সঠিক সংখ্যা অনুসন্ধান করতে হবে।
৪/২৫শে মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশনের আগে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে।
১৯৭০-এর ঘূর্নিঝড়ঃ
১৯৭০ সালের ১২ই নভেম্বর ভোলার ঘূর্নিঝড় পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রবল জলোচ্ছ্বাসের সৃষ্টি করে, সেই সাথে জোয়ারের কারণে প্রায় ৩,০০,০০০ থেকে ৫,০০,০০০ মানুষ প্রাণ হারায়। প্রাণহানির সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও এটিকে ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ হারিকেন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক সরকার এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরও জরুরি ত্রাণকার্য পরিচালনায় গড়িমসি করে। ঘূর্ণিঝড়ের পরও যারা বেঁচে ছিল তারা মারা যায় খাবার আর পানির অভাবে। ঘূর্ণিঝড়ের এক সপ্তাহ পরে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান স্বীকার করে সরকার দুর্যোগের ভয়াবহতা বুঝতে না পারার কারণেই ত্রাণকার্য সঠিকভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। ঘূর্ণিঝড়ে বিপর্যস্ত মানুষগুলোর প্রতি পাকিস্তান সরকারের এমন নিষ্ঠুরতা দেখে পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। ২৪শে নভেম্বর এক সভায় মাওলানা ভাসানী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অদক্ষতার অভিযোগ তোলেন এবং অবিলম্বে তার পদত্যাগ দাবি করেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা একটি দেশে গৃহযুদ্ধের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
 
 
বাংলাদেশের অভ্যূদয়ঃ
১৯৭০ সালের ১১ই নভেম্বর এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে পূর্ব পাকিস্তানের উপকূলীয় অঞ্চলে প্রায় ৫ লাখ লোকের মৃত্যু ঘটে। এ সময় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার অসহযোগিতা ও ঔদাসীন্য প্রকট হযে ওঠে। ১৯৭০ সালের সংসদীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করতে থাকে। মুজিবের সাথে গোলটেবিল বৈঠক সফল না-হওয়ার পর পাকিস্তানের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল ইয়াহিয়া খান ২৫শে মার্চ গভীর রাতে মুজিবকে গ্রেপ্তার করেন এবং পাকিস্তানী সেনাবাহিনী অপারেশন সার্চলাইটের অংশ হিসাবে বাঙালিদের উপর নির্বিচারে আক্রমণ শুরু করে। পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর এই নারকীয় হামলাযজ্ঞে রাতারাতি বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। সেনাবাহিনী ও তার স্থানীয় দালালদের অন্যতম লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিজীবী ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী। গণহত্যা থেকে নিস্তার পেতে প্রায় ১ কোটি মানুষ দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোট জীবনহানির সংখ্যার হিসাব কয়েক লাখ হতে শুরু করে ৩০ লাখ পর্যন্ত অনুমান করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। তাঁরা ১৭ই এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে অস্থায়ী সরকার গঠন করেন। এর প্রধানমন্ত্রী হন তাজউদ্দিন আহমদ। বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধারা প্রায় ৯ মাস পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরূদ্ধে লড়াই করে। মুক্তি বাহিনী ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ভারতের সহায়তায় ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীকে পরাভূত করে। মিত্রবাহিনী প্রধান জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার কাছে পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পাকিস্তান বাহিনীর প্রধান জেনারেল নিয়াজী ১৯৭১-এর ১৬ই ডিসেম্বর আত্মসমর্পন করেন। প্রায় ৯০,০০০ পাকিস্তানী সেনা যুদ্ধবন্দী হিসাবে আটক হয়; যাদেরকে ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বাধীন গণপ্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠন করে।
 

লিখেছেনঃ

মোঃ আলমগীর হোসেন

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়

অনার্ষ ২য় বর্ষ

 

একটুকরো স্বপ্ন
– মিন্টু উপাধ্যায়

জানতাম তুমি আসবে ফিরে
রইবে আমার হৃদয় ঘিরে,
হাজার তারার আলোয় তোমায়
বরণ করে নেবো নতুন করে ।

স্নিগ্ধ কুয়াশার সকালে যখন
শিউলি ফুল ফোটে,
সেই ফুলেরই পরিয়ে মালা,
দেখব হাঁসি তোমার ঠোঁটে ।

তোমার এক চিলতে হাঁসির ছটায়,
হয়েছিলাম আমি পাগল,
জ্যোৎস্নার আলোয় ভরিয়ে দেবো
তোমার আঁখি জুগল ।

নিছিদ্র অন্ধকার রাতে
আলোর প্রদীপ শিখা তুমি
তোমার ভালবাসার ছোঁয়ায়
হয়েছি মুক্ত আমি…।

ট্রান্সফার
- অমৃতা কোনার

প্রায় দশ বছর ধরে একটি সরকারি হাইস্কুলের শিক্ষক অম্লানবাবু। অনেক দিন ধরেই ট্রান্সফারের চেষ্টায় ছিলেন। আসলে স্কুলটা তার বাড়ি থেকে এতটাই দূরে! পুরো ঘড়ি ধরে সারে তিন ঘন্টা লাগে! ট্রেনে,বাসে,অটোয় চরে তবে তিনি স্কুলে পৌঁছতে পারেন।

এইবার ট্রান্সফারটা পেয়েছেন। বাড়ির একদম কাছে। সেই আনন্দে আজ সকাল থেকেই মগ্ন তিনি। পুরনো স্কুলে আজ তার শেষদিন। তাই স্কুলের বাকি সহকর্মীরা আর কচিকাঁচাদের দল সকলে মিলে একটা ফেয়ারওয়েলের আয়োজন করেছে অম্লানবাবুর জন্য। তারই তোরজোড় চলছে সারাদিন।

হঠাৎ ক্লাস সেভেনের একটি ছেলে অম্লানবাবুর সামনে এসে দাঁড়ালো। হাতে একটা গোলাপ দিয়ে বলল "স্যার আপনার সাথে নাকি আর কোনোদিন দেখা হবেনা? সবাই বলছে। আপনি যে পড়াটা দিয়েছিলেন ওটাও নেবেননা আর? আমি কিন্তু পড়ে এসেছিলাম।" হঠাৎ চোখে জল আসে অম্লানবাবুর। মনে মনে ভাবতে থাকেন "সত্যিই তো আজই এখানে আমার শেষদিন! আজ থেকে তবে সব স্মৃতি হয়ে যাবে!"

কাঙাল
- মরিয়ম আক্তার

ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি
ছুটি তোমার পিছু,
মানি নাতো কোন জাত পাত
উঁচু কিংবা নিচু।
খুজি তোমায় প্রান ভ্রমরা
ঊর্দ্ধ গগন তীরে
তোমায় আমি যাই স্মরে যাই
হাজার লোকের ভিরে।
তোমায় আমি যপি সদাই
আপন চিত্ত মাঝে...
তোমায় ভালোবেসে আমি
জাগাতে চাই মোর কাজে।
সপ্ত আকাশ মাঝে তাইতো আমি
তোমায় খুজে মরি,
তোমায় ভালোবেসে তাই হতে চাই
পাগল, কাঙ্গাল, আনাড়ি।।

ধূসর অন্ধকার
- মোশ্ রাফি মুকুল

কে বললো?
শূন্যতা নেই এখানে কোনো
এখানে কোনো শূন্যতা নেই-
তুমিহীন এ শহর সাদাকালো খাঁচা,
ভোরের রোদ্দুর মাখা সময়ের মতো প্রস্থানোদ্যত সুখ;
কতো অষ্টাদশী অট্টালিকা গলে পড়ে চোখের সামনে তুমি ছাড়া-
তুমি ছাড়া এ নগর মাতে কার্বন হ্রেষায়।

তুমিহীন এ হৃদয়রাষ্ট্র ভৌতিক গল্পের ব্ল্যাকবিম্ব ছাড়া আর কিছু নয়-
যেখানে ক্রান্তীয় বিন্দুতে দাঁড়িয়ে আছে এক নস্টালজিক পোড়োবাড়ী!
পরিত্যক্ত মায়ান সভ্যতার চিচেন ইৎজা মনে হয় তুমি ছাড়া এ শহর।

কে বললো-
নেই এখানে কোনো নিকষকালো আঁধিয়ার নেই?
তুমি ছাড়া আমার পৃথিবীর সারাটাদিন ধূসর অন্ধকার।

২৫/০৫/২০১৮.

অন্ধকার মানেই রাত্রি নয়
- আলী আজমেরিয়া

পারদের কাঁচে আমাকে দেখি না
খুঁজি আমিত্বকে,
চোখেরা দেখে পুতুলের নড়াচড়া
রোদের বিপরীতে যেন ছায়া মানুষ;
পায়ের নিচে মাটি কাঁপে
হয় বুঝি ভূমিধ্বস,
পুতুলের থাকে কি মেরুদণ্ড ?
অথবা কিছু চিন্তা করার ক্ষমতা !
অন্ধকার মানেই রাত্রি নয়
রাত্রি মানেই নয় অন্ধকার নিকষ
নক্ষত্রগুলো স্বত্ত্বায় এলে
অন্ধকার আর রাত্রির পার্থক্য বুঝা যায়;
আমি যেন এক অন্ধকার মানুষ
রাত্রি দেখি না, দেখি অন্ধকার
দিনে অথবা রাতে
খুঁজে বেড়াই শুধু নক্ষত্র অহর্নিশ !
-
২৪.০৫.২০১৮



ডাক বাক্স
- অনিতা পান্ডে

ঘরের সাথে ডাক বক্সটিতে চিঠির কমতি নাই।
নামী বেনামী হরেক রকম চিঠি আসে তাই।
কোনটা লাল নীল সাদা খামে,
নানা হাতের কারুকার্যে বোনা কত ছাপ,
কল্পকাহিনী ও থাকে কিছু, কিছু থাকে জরুরী সংলাপ!
বক্সের কাছে যেতে যেতে বুক ঢিপ ঢিপ করে,
প্রত্যাশায় অবিচল মন,
কাঁচা হাতের প্রেমের চিঠি, আসুক জোরে সোরে!
লাভ স্টিকার,গোলাপ গুচ্ছের পার্সেল সারি সারি,
আঁকা বাঁকা অনুভূতির পরশ হরেক রকমারী।
মিটি মিটি হাসির দোলনায়,
দুলে দুলে আসে গভীর প্রেম।
মিষ্টি অনুভূতিরা পরাগ মেলে সুবাস ছড়ায়,থাকেনা মনে জ্যাম।
জীবন্ত ক্যানভাসে নিত্য তাড়া,নানা ব্যস্ততায়।
প্রহর গুলি খুঁজে ফেরে
বন্ধুদের রিপ্লাইয়ের অপেক্ষায়।
কি আসছে আজ? কি লিখছে সে?
মনে মনে নানা হিসাব কষে,
মনবিচারে মনকে খুঁজে জীবন নদে ভেসে।
বিনিদ্র রজনী কাটে যখন দেওয়ানা হয়ে যায়।
ব্যস্ততার ভীতরেও হিসাব মিলে নানান রোমান্টিকতায়!!

বরিশাল।
১১-০৫-১৮।

আমি কে
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

বিধাতার রেখে যাচ্ছি একটা প্রশ্ন ,
বলে দাও আমি কে ?
কেবা আমার জন্য ?

ঘুণেধরা সমাজের কাছে একি প্রশ্ন ,
বলে দাও আমি কে ?
কি আমার পরিচয় ?

কখনো পাইনি আমি মায়ের আদর ,
দেখিনি বাবা কেমন !
তবে এ কেমন জীবন ?

হিন্দু মুসলিম বুঝিনা-বুঝিনাকো ধর্ম ,
ওসবতো মানুষের কর্ম ,
কিছু নয় আমার জন্য ৷

ফুটপাতে ফুটপাতে ঘুম কুড়াই অামি ,
দেয়ালের ছবিতে স্বপ্ন ,
তবু ভাগাড়ে পাই অন্ন ৷

পৃথিবী তুমি বলতে পারো আমি কে ?
বিধাতা হাসে মিটমিটিয়ে ,
সমাজও থাকে চুপ করে ৷

মানুষ
- আবু নাঈম
--------------------
হায়রে মানুষ আজব প্রাণী
বুঝা বড় দায়
স্বার্থ শেষে পর হয়ে যায়
যেন অসহায়
প্রয়োজনে পাশে টেনে
দেখায় মানবতা
শেষ হলে অচেনা ভাবে
যেন সে অভিনেতা
পরউপকার ভূলে যায়
সবি যখন তখন
নিজউপকার মনে রেখে
বলে যে  সারাক্ষন
মিষ্টি মধুর কথা বলে
সবি মুখে মুখে
সুখের সময় পাশে থাকে
দূর হয়ে যায় দুঃখে

শর্মা কি ভেবেছিলো কিছু

- সাগর আল হেলাল

বাইশ বছরের এক তরুণ টগবগে হেঁটে যায় হাতির ঝিলের মুক্ত বিহঙ্গ সড়কে। পাশ কেটে যায় ষোড়শী এক অপরূপা। বাতাসের গন্ধ বদলায়, বদলায় পথচারীর পথ চলার গতি। একটা প্রজাপতি পাখনা দোলায় ঝিলের পাড়ে লাগানো ফুল গাছের ডালে। প্রজাপতি কি বুঝতে পারে বসন্ত? যুবক ও তরুণী বিপরীত দিকে একে অপরকে ক্রস করার সময় চলার গতি যেন খানিকটা শ্লথ হয়ে যায়। কিছুদূর গিয়ে পরস্পর ফিরে তাকায় নিশ্চুপ। কেউ কাউকে ডাকেও নি। কিসে হলো যোগাযোগ? কেন এই দৃষ্টির টানাটানি? কেউ কি জানে না? জানে হয়তো দুজনার লাগাম ছোটা অবুঝ ঐ দু’টি মনের অবস্থা।

আমি যাচ্ছিলাম আমার কর্মস্থল মগবাজার চৌরাস্তার পথে। হাতির ঝিলে দেখা তরুণ-তরুণীর কথাই ভাবছিলাম। রেলক্রসিং এসে দেখি ট্রেন যাবে। সড়ক পথের যাতায়াত বন্ধ করা হলো। ছুটন্ত গাড়িগুলো রেল ক্রসিংয়ে জমছে। বেশ জ্যাম পড়ে গেলো। আমার পাশাপাশি হেঁটে যাচ্ছিলো একটি আট-দশ বছরের কিশোর। যেন জোর করে পথ হাঁটছিলো সে। মুখটটা বেশ শুকনা আর মলিন। তাকে খুব ক্ষুধার্ত দেখাচ্ছিলো। গাড়ির জ্যাম এবং ট্রেন ক্রসিং এর জন্য অনেক পথচারীসহ আমাকেও থামতে হলো ফুটপাতে। কিশোর ছেলেটি দাঁড়ালো একটু সামনে। ও যেইখানটায়, সেইখানটায় একটা ফলের দোকান। কতো রকমের ফল সাজিয়ে রেখেছে দোকানী ক্রেতা আকর্ষণের জন্য। লালচে রঙের আপেলের দিকে নজর যায় ছেলেটির। ওর মুখে চেয়ে আমার মনে হলো, সে যেন ভাবছে-  ইশ্! ফলটা যদি খেতে পারতাম, ক্ষুধা যেতো! ওদিকে ফলটা যেন কিশোরকে বিদ্রুপ করে বলছে- পকেটে পয়সা নেই, আবার আমায় খাবে ?

জ্যামে পড়া অনেক গাড়ি। ফলের দোকানের সামনে রাখা মার্সিডিজের জানালার কাঁচ নামতে থাকে। কাঁচের ওপাশে দেখা যায় এক ষোড়শী অপ্সরা। কী তার রূপ! এ যেন জীবনানন্দের বনলতা সেন, হিন্দী চলচ্চিত্রের মাধুরী দিক্ষীত। ফলের দোকানের দিকে দৃষ্টি যায় মেয়েটির। ফলের দোকান দেখে মেয়েটির মুখের চেহারার কোন পরিবর্তন লক্ষ করলাম না আমি। কিন্তু আশ্চর্য্যরে বিষয়, আপেল যেন ফিক করে হেসে দিয়ে ভাবলো- ইশ্, ঐ ষোড়শী অপ্সরা তার লাল অধওে যদি তাকে চিবিয়ে খেতো, তার লাল ঠোঁটে মিশে একাকার হয়ে যেতে পারতাম। আহার্য্য বস্তুরা এমন ভাবে নাকি! তাই কি মুরুব্বীরা বলে থাকেন যে, খাবার বস্তু সামনে নিয়ে বসে থাকতে নেই! মার্সিডিজ চলে গেলেও লাল রঙ অপ্সরা অধর আর লালচে আপেল আমাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেতে লাগলো।

ট্রেন গেলে রাস্তা ফাঁকা হলো। কর্মস্থলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ থাকায় দ্রুত পা চালাতে হলো। বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন, গাছেরা হাসে, কাঁদে, মনের দু:খও প্রকাশ করে। শুনেছি উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বৃক্ষের ¯œায়ুবিক শক্তির পরিচয়ও ধরতে পেরেছেন। তাহলে কি গাছের ফলেরও অনুভূতি শক্তি আছে? তারাও স্বপ্নও দেখতে পারে? পিতার স্বপ্ন বয়ে যায় সন্তান। এমন হলে বৃক্ষের স্বপ্নও ফলেরা বয়ে নিতেই পারে। ভোগ্যপণ্য ভোক্তাকে প্রলুব্ধ করে থাকে, আমরা সে কথা জানি। হাতির ঝিলের তরুণ-তরুণী, পথিমধ্যের কিশোর- লালচে রঙা ফল ও ষোড়শী মেয়ে নিয়ে সৃষ্ট অনুভূতিগুলো মাথার মধ্যে প্রচ-ভাবে ঘুরপাক খেতে লাগলো। আমি সামনে পা বাড়ালাম।

আমার কর্মস্থল একটি বে-সরকারী গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ। আগামীকাল ২১ ফেব্রুয়ারি, আন্তর্জাতিক মার্তভাষা দিবস। অনুষ্ঠান হবে। প্রতিষ্ঠানের সবাই প্রচ- ব্যস্ত। শিক্ষার্থীরাও এসেছে। ওরা দেয়ালিকা করবে। আমার একটি লেখাও যাবে দেয়ালিকায়। প্রতিষ্ঠানের আর সব কাজের ফাঁকে দেখতে হবে আমার লেখায় কোন বানান ভুল যায় কি না। হন্তদন্ত হয়ে প্রতিষ্ঠানে ঢুকলাম। অনুষ্ঠান আরম্ভ থেকে সমাপ্ত করার যাবতীয় উপায়-উপকরণের কাজ সম্পন্ন করেই তবে বাসায় ফিরতে হবে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা কাজ করছে। তাদেরকে গাইড করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষকম-লী। কম্পিউটারে কিছু কাজ অবশিষ্ট আছে, সেগুলো শেষ করতে হবে আমাকে। বাচ্চাদের টিফিনের ব্যবস্থা করে দিয়ে আমি কম্পিউটারে বসলাম আমার কাজে। কাজে আমাকে সাহায্য করছেন একজন দিদি। তিনিও শিক্ষক।

বিকেল গড়াতে যাচ্ছে। প্রিন্সিপাল ম্যাম হুকুম দিলেন শিক্ষকবৃন্দকেও নাস্তা খাওয়াতে হবে। একজন শিক্ষক জানালেন ১০ জনের জন্য আনলেই চলবে। যথারীতি ১০ জনের নাস্তা আনা হলো। কিন্তু বিতরণের সময় দেখা গেলা ১টি কম। কারণ কি? আসলে যিনি লোক সংখ্যা গুনেছিলেন তিনি নিজেকে গণনায় ধরেন নি। এ নিয়ে বেশ হাসাহাসি। আমি খাবো না বলে, দিদির সাথে কাজে মন দিলাম। দিদি আমাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করছিলেন। প্রতিষ্ঠানের আয়া আমাদের দুজনের সামনে কম্পিউটার টেবিলে একটা নাস্তার প্লেট রেখে চলে গেলো। সে দিকে চোখ যেতেই আমার লালচে আপেলের কথা মনে পড়লো। আমি নাস্তার প্লেট থেকে চোখ সরিয়ে নিলাম। ভাবলাম ওটা হয়তো ভাবছে, দিদি তাকে নরম-কোমল হাতে তুলে লাল ঠোঁটে চেপে মুক্তোর মতো ঝকঝকে দাঁতে কুচ কুচ করে কেটে খাবে। মনে হলো, শর্মা বুঝি খুশিতে গলে পড়তে লেগেছে। দিদিও কিছু ভাবছে। আমাকে রেখে তিনি একা কি করেই বা খাবেন!

অনেকক্ষণ পর দিদি প্লেটের দিকে হাত বাড়ালেন, আমার দৃষ্টি কম্পিউটারের মনিটরে। দিদি অর্ধেকটা নিয়ে অবশিষ্টটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন- নিন ওটুকু আপনার। আমি প্রথমে না না করলাম। অবশেষে বিসমিল্লাহ বলে দুই কামড়ে সাবড়ে দিলাম। সেইসাথে দিদিকে বললাম- নাস্তার ভাগ্যটা কেমন দেখেছেন? দিদি হাসতে হাসতে বললেন- কি রকম ? বললাম- আমি খেয়েছি বিসমিল্লাহ বলে, আপনি বলেছেন অন্যকিছু, আর। দিদি শুধোলেন, আর? বললাম- আচ্ছা, শর্মা কি অন্য কিছু ভেবেছিলো? দিদি বললেন- আপনার যা কথা!

 

সনাতনী গান
- আলী আজমেরিয়া

শিবের পুজা করো রে মন
শিবের পুজা করো
তা না হলে গঙ্গা জলে
প্রাণ ত্যাজিয়া মরো.....

ঝাঁপ দিয়েছো অথৈ জলে- ক্যাম্নে হবে পাড়
তুফান জলে শম্ভু বিনে কে করবে উদ্ধার-

বলো- শিব শম্ভু, বলো- শিব শম্ভু !!
-

ভালো লাগলে শেষ করবো-
(ক্রমশ:)

পথকলি যোদ্ধা
- সাগর আল হেলাল

তোমরা যারা কাগজ কুড়াও
ভাঙরি বেচে কষ্ট জুড়াও-
যোদ্ধা তুমি,
জীবন তোমার হীরে জহরত,

আমরা বাপু শুয়োপোকা
দিয়ে থাকি শুধুই ধোকা
উপরি গুনে
গল্প করি- বেড়েছে বরকত !
-
২৩.০৫.২০১৮

ফিরে এসো বাবা
- ইরাবতী মণ্ডল

মাগো,বাবা কেন ফিরলো না ,আজও ঘরে,
যাবার সময় বলেছিলো ,ফিরবে কাজের পরে।
এমন কাজে যায় কেন গো ,এত দেরি হয়,
বোঝে নাকি খোকা তাহার ,পথেই বসে রয়।
যাবার সময় বলেছিলো , লজেন্স দিয়ে হাতে,
শান্ত হয়ে থেকো সোনা ,মা-দিদিরই সাথে।
আনবো এবার চকলেট ,খেলনা ভুরি ভুরি।
দুপুর রোদে বাইরে যেন ,কোরোনা ঘোরাঘুরি।
আমি তো মা শান্ত আছি, বাবার কথা শুনে,
তবু কেন আসে না বাবা, পড়ে না তার মনে?
কদিন ধরেই কাঁদছে দিদি ,তুমিও দেখি কাঁদো,
বাবার কথা বললে পরে গল্প শুধুই ফাঁদো।
কাঁদছে দিদি কাঁদছো তুমি ,জড়িয়ে আমায় বুকে,
কাঁদছো কেন ?এর জবাবে নেইকো কথা মুখে।
বলছে দিদি ভোটে গিয়ে ,খুন হয়েছে বাবা,
ভোট কি মা?খায় না পরে ?আমি বড়ই হাবা।
বাবা কেন খুন হবে গো, দুষ্টু ছেলে নাকি,
বাবা আমার সুপার ম্যান ,সবাইকে দেবে ফাঁকি।
মাগো তুমি কেঁদো না আর ,চোখের জলটি মোছো,
বাবা ঠিকই আসবে ফিরে ,একটুখানি রোসো।
আসলে পরে বাবাকে আর, দেব না কোথাও যেতে,
চকলেট ও আর চাইবো না , থাকবো সাথে সাথে ।
তোমার জন্য বাবা আমার, চোখ ভেসে যায় জলে ,
ফিরে এসো বাবা তুমি ,ডাকছে তোমার ছেলে।

মৃত রাজকুমার রায়ের উদ্দেশ্যে নিবেদিত।

22.5.2018

বাংলা তুমি
- আবু নাঈম
--------------
বাংলা তুমি আছ মিশে
হৃদয়ের স্পন্দনে
বাংলা তুমি আছ মিশে
অঙ্গ শিহরণে
বাংলা তুমি আছ মিশে
প্রতিটি বাঙ্গালির মনে
বাংলা তুমি আছ মিশে
বিজয়ের স্বরনে
বাংলা তুমি আছ মিশে
বাটিয়ালি গানে
বাংলা তুমি আছ মিশে
নির্ভীক যোদ্ধানে
বাংলা তুমি আছ মিশে
বিশ্বের অবধানে
বাংলা তুমি আছ মিশে
স্নিগ্ধ বাতায়নে
বাংলা তুমি আছ মিশে
আমার মনে প্রানে
বাংলা তুমি আছ মিশে
মায়ের আঁচল পানে

প্রভাতের হেমন্ত
- আলী আজমেরিয়া

গঙ্গা বাস করে শিবের মস্তকে
আমি গঙ্গা খুঁজি,
ঐ খানে চাঁদ- ডমরুও সেই খানে
ফণা তুলে গর্জে কালীদহের শীষনাগ;

পালকী সাজাও, সাজাও ময়ূরপঙ্খী-
ঘুম ভাঙিয়ে দাও প্রভাতের হেমন্ত !
-
২১ মে, ২০১৮

জলের আরাধনা
- সাগর আল হেলাল

তোমাদের নদীগুলো সাঁতরে আসি আমি
বালুচর জমে আমার নদীতে,
শরতে আসো তোমরা-
দেখে যাও কাশবন গাঙশালিকের বাসা;

শুকনো বালুচরে জলের আরাধনায় আমি
তোমরা পাল ওড়াও সাম্পানের মাস্তুলে,
বালিতে কবর খুঁড়ি অতীতের খোঁজে
এই খানে অনেক সুগন্ধ ছিলো জলে;

মাছরাঙা পানকৌড়ি যুবতিরা
ঘর বাঁধে নদীর ঝাউবনে,
হাসবে আবার এখানে জলে চাঁদ
বলে যায় মাছরাঙার নতুন প্রজন্ম;

নতুনকে ভালোবাসি রক্ত ঝরা বুকে
আমার রক্তে বেগবান তোমাদের নদী-
তোমাদের নদীগুলো সাঁতরে আসি আমি
বালুচর জমে আমার নদীতে।
-
২২.০৫.২০১৮

দাস-দাসীর ভালোবাসা
- সাগর আল হেলাল

ভালোবাসা মানুষকে দাসে পরিণত করে
তোমাকে ভালোবেসে
আমি তোমার বিশ্বস্ত দাস,
অথচ দেখো-
আমায় যে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে
সে তুমি নও
কারণ দাসী হতে তোমার অনেক আপত্তি...

সূর্যকে অনুসরণ করে পৃথিবী
আর পৃথিবীকে চাঁদ
ওরা বাঁধা পড়ে আছে আজন্মকাল ভালোবাসায়,
তুমি বাঁধা পড়তেও সম্মত নও-
তুমি মানবতা বোঝ
রয়েছে তোমার মানবিকতার সংবিধান
নারী-পুরুষ সমতার অঙ্গীকার...

ভালোবাসা নিয়ে গেছে তোমায়
অনেক উচ্চ আসনে,
আমার ছেড়ে দেওয়া সুখ
আগলে রাখা দুঃখ
ভাঙেনি তাদের প্রতিজ্ঞা একরত্তি আজও-

দাস আমি তোমাকে ভালোবেসে,
তুমি দাসী নও
তবুও তোমারই দাবী বেশি ভালোবাসার...
-
০১.০৩.২০১৮

প্রতিবেশী স্বপ্নের বারান্দায়
-.শাহিনা কাজল

ঘুমহীন চোখের সিলিং এ ঘুরছে প্রতিবেশী রাত
আমার পৃথিবী, অভিনয়ের রঙ্গমঞ্চ
পাশের মসৃণ ভাবনার চাঁদোয়ায়
অসমাপ্ত ঘুমের বৃথা আয়োজন ........

জানালাটা মুচকি হাসে
রাতের আধারে খুজি স্বপ্নের গলি
বারোটি বছর এভাবেই গেছে
সে অাজ শিয়রের শিরোনাম ----
ছুয়ে অাছে ঘুমন্ত চুলের বেনী
নিষ্প্রাণ আবেগের প্রথম দেয়ালিকায়
ও খেলে বেণীর খেলা
আমি সৌভাগ্যবান দর্শক।

পরম সোহাগে
সে অাঁচড়ে ছিল অঢেল স্বপ্নের বিস্তীর্ণ মাঠ
বেপরোয়া সব ইতিহাস
রাতের অাঁধার খোঁজে স্বপ্ন
আর স্বপ্নরা আমাকে
আমি নিয়তির স্বপ্নে ঘুরে বেড়াই
প্রতিবেশী স্বপ্নের বারান্দায়।

সম্পর্ক
- মোশ্ রাফি মুকুল

সম্পর্কের ওম হতে পাই যেটুকু উত্তাপ-
হৃদয়চিহ্ন থেকে আসে যেটুকু রক্তিম রশ্মি,
তার মুখোমুখি আজ ভ্রম-ভুল সূর্য।

যে তাপে পুড়ে যায় দিন
যে পাপে লক্ষ্যচ্যুত গ্রহ- কক্ষপথেই বিলীন,
তবু সম্পর্কের চমৎকার চুম্বক ছুঁয়ে থাকে নিন্দিত নন্দিত পিপাসা যত।

সম্পর্কহীন কেউ বিশ্বাস করতে চাইবেনা হাতে হাত ধরে আকাশ ছোঁয়া যায়;

বুনোনীলে আকাশ ছড়িয়ে দিলে ঘরে ফিরে আসে উষ্ণতার স্বপ্নবীজ,
আর এতোসব স্পর্শকাতর শব্দার্থগুলো
আমলে নিতে চাইবেনা ভালোবাসাহীন কোন আত্মপক্ষ।

২১/০৫/২০১৮.

এদেশ হয়েছে দোষন
- সজল আহমেদ অভি

ওরে এদেশ হয়েছে দোষন
শব্দ পতনের ছন,
বৃত্ত ভরিয়েছে অমোঘ বাণী
হিংসের চরম উর্ধ্ধগামী
নয়তো ঠিক শাসন-
ওরে এদেশ হয়েছে দোষন।

সতত মনন ক্ষরনে ধারা চলেছি অবিরত
একত্ববাদ নেইকো কোথাও,
জুলুম অত্যাচার আজ নিবিরত।

কালো ধোয়াই আকাশ বাতাস
নদীর জল শূকে,
মানবীয় প্রাণ পতনের মত
আজে গেছে ভরে।

ফিকে হয়েছে রক্তেরর বরণ
মানুষই প্রাণের কাল,
কত প্রাণ নিপাত গেছে
আর কত প্রাণ নিঃশ্চল।

কত জীবন আঁধারে ডুবে
নিকোশ কালো হাতে,
কত প্রাণ বিকালঙ্গ
শোষনের মুখে পড়ে।

চলেছে অবিরাম শব্দের দোষন
মুক্তির কথা বলে,
মুক্তি নয়তো ঊষার আকাশ অগ্নিরফুল কুড়ি।

যুক্তে হয়েছে আকাশে বাতাসে
শত হাহাকারের প্রাণ
গণতন্ত্র না একনায়কতন্ত্র বুঝি না কিছুই এখন।

মুক্তির কথা ভুলে গেছি
বুকে বেঁধেছি পাথর
কবে পেয়েছি অসম স্বাধীন
শৈরাচারি বাহন-

সূর্য্য লাল প্রভাতের কাল হবে কখনো সজাগ
সবে ভুলে দেশটি হবে সবুজের সেই পাহাড়।

শত শত প্রাণ চাই না কখনো বৃহত সম্রাজ্য
যুগে যুগে চায় অধিকার টুকু-
কাঁধে কাধ মিলে একবুক ভালবাসার রাজ্য।

তবু মনে রেখো
- অন্তরা বিশ্বাস

এখন সন্ধ্যা সবে নেমেছে । দক্ষিণ কলকাতার সবচেয়ে ব্যস্ত তম রাস্তা গড়িয়া হাট মোড়। শুভমিতা কনকের হাত ধরে রাস্তা পার হয়ে বালিগজ্ঞের দিকে যাচ্ছিলো । হঠাৎই এক জনের ডাকে চলার গতিটা আটকে গেলো, থমকে দাঁড়িয়ে পড়লো। পিছন ঘুরে অবাক হয়ে একজনকে দেখলো আর মনে মনে ভাবলো, " সেই এক চেহারা!!" লম্বা সুঠাম দেহ, সৌম্যদর্শন ব্যক্তিত্ব। চোখের কোণে এক বিষন্নতার ছাপ। অদূরে দাঁড়িয়ে রুদ্রনীল। কনক শুভমিতার হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে " বাবা" বলে ছুটে যাবে। কিন্তু নিজেই দাঁড়িয়ে পড়লো। শুভমিতার চশমার লেন্স চোখের জলে ঝাঁপসা হয়ে গেছিলো। কনকের "মা" ডাকে সম্বিৎ ফিরলো। শুভমিতার বহু পুরোনো কথা মনে পড়ে গেলো। পিছন ঘুরে নিজের গলায় গাওয়া গানটা মনে মনে বার বার ভেসে এলো,
"তবু মনে রেখো
যদি দূরে যাই চলে।
যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।যদি থাকি কাছাকাছি,
দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি--
তবু মনে রেখো।
যদি জল আসে আঁখিপাতে, এক দিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে,
তবু মনে রেখো। এক দিন যদি বাধা পড়ে কাজে শারদ প্রাতে-- মনে রেখো।
যদি পড়িয়া মনে
ছলোছলো জল নাই দেখা দেয় নয়নকোণে--
তবু মনে রেখো।"

**************************
আজ থেকে প্রায় সতেরো আঠেরো বছর আগে শুভমিতার জীবনে এসেছিলো বিচ্ছেদের কালো দাগ, যা সারা জীবন নিজে বয়ে বেরাবার দায় কাঁধে নিয়েছিলো। আজ'ও তা বয়ে চলেছে।

শুভমিতা আর রুদ্রনীল কলকাতার বিখ্যাত একই স্কুলে পড়াশুনা করেছে। যদিও শুভমিতা রদ্রনীলের চেয়ে বছর দেড়েকের ছোট ছিলো। কিন্তু একই পথে বাড়ি ফেরার সময় আলাপ, বন্ধুত্ব। শুভমিতার বাড়ী ছিলো দক্ষিণ কলকাতায় বনেদী এক পাড়ায়। বাবা মা, শুভমিতা আর তার ভাই নিয়েই ছোট্ট পরিবার। বাবা মা দুজনেই ডাক্তার।
শুভমিতা স্কুলের অনুষ্ঠানে দারুণ গান গাইতো। সেই থেকে একটা দারুণ বন্ধুত্ব হয়েছিলো রুদ্রনীলের। রুদ্রনীল ছিলো দারুণ দেখতে, পড়াশুনায় ভালো। তাই স্কুলে বেশ জন প্রিয় ছিলো। রুদ্রনীল থাকতো দক্ষিণ কলকাতার আরেক প্রান্তে । রুদ্রনীলের বাবা শৈশবে মারা যাওয়ায় তার মা' ই তাকে মানুষ করে। তার মা ছিলো ,সরকারী সংস্থায় কর্মরত। রুদ্রনীল আর শুভমিতার স্কুলের অনুষ্ঠানে পরিচিত হওয়া বন্ধুত্বটা অনেক দূর এগোয়। বাড়ি ফেরার পথে, টিফিন বেলায় কৈশোরের উন্মত্ততা , হাসি ঠাট্টা কবে যে প্রেমে পর্যবসিত হয়েছিলো, ওরা নিজেরাও বোঝে নি। রুদ্রনীলের বান্ধবীও যথেষ্ট ছিলো। তবু কৈশোরের বন্ধুত্ব স্কুলের গন্ডি পেড়িয়ে অনেক দূর যায়। শুভমিতা কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে অঙ্কে স্নাতোকত্তোর পাশ করে একটা স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করে ছিলো। তবে গানের জগতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ পাওয়ায় প্রায়ই রেকডিং এবং অনুষ্ঠান থাকতো। আর রুদ্রনীল নামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইজ্ঞিনিয়ারিং পাশ করে উচ্চ বেতনে এক কোম্পানিতে নিযুক্ত হয়। তবু বন্ধুত্ব থেকে ভালবাসায় পৌছে যাওয়া সম্পর্কে ওরা শুভ পরিণয়ে নিয়ে যায়। শুরু হয় এক সাথে পথ চলার অঙ্গীকার।
বছর দুই পর সম্পর্কের বাধনটা যেনো আলগা হতে থাকে। শুভমিতার গানের অনুষ্ঠানে এদিক ওদিক যাওয়া এটা ওর শ্বাশুড়ি মা মেনে নিতে পারেন নি। বলেন," সংসার করতে গেলে, গান নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে?!!" অনুষ্ঠান শেষে দেরী করে ফেরা নিয়ে শুভমিতার সাথে রুদ্রনীলের একদিন তর্ক বেঁধে যায়, রুদ্রনীল বলে ওঠে, " এতো গান প্রীতি! তো কোনো গাইয়ে মানুষকেই বিয়ে করতে!! আমাকে বিয়ে করতে গেলে কেনো?!!কার জন্য এতো দেরী করে ফেরা?!!" শুভমিতা সেই দিনের পর থেকে নিজেকে গানের জগৎ থেকে আস্তে আস্তে দূরে সরিয়ে নেয়। আসলে সম্পর্ককে যত্ন করার ইচ্ছেটা শুভমিতার বড্ড বেশী ছিলো। কারণ ততদিনে ও'র কোল আলো করে এসেছিল ওদের মেয়ে কনক। তাকেও ভালো করে মানুষ করার দায়িত্ব ছিলো।
কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই শুভমিতা দেখে, রুদ্রনীল খুবই দেরী করে বাড়ি ফেরে, বাড়িতে থেকেও ওকে এড়িয়ে চলে, কনকের প্রতি রুদ্রনীল উদাসীন। এরপর হঠাৎই একদিন বিষয়টা শুভমিতার কাছে পরিষ্কার হয় যে রুদ্রনীলের জীবনে অন্য কোনো নারী উপস্থিত।
এই নিয়ে শুভমিতার সঙ্গে বাকবিতন্ডার সময়ে এক প্রকার রুদ্রনীল স্বীকার করে নেয় যে," হ্যাঁ আমার জীবনে স্বাগতা আছে। যে আমার জীবনের ভাবনাকে অনেক পরিণত আর আমার স্বপ্ন দেখাকে উৎসাহিত করে। যেটা কোনো দিনই তুমি পারো নি। স্বাগতা আমাকে ভালোবাসে। ওকে আমি আমার জীবনে অস্বীকার করতে পারি না।"এই কথা শোনার পর শুভমিতা আর একটাও কথা বাড়ায় নি। রুদ্রনীলের বাড়ি থেকে কনককে নিয়ে মায়ের কাছে চলে আসে আর ফেরে নি। এরপর কাগজে কলমে বিবাহ বিচ্ছেদ।

*********************
রুদ্রনীল জীবনে এগিয়ে গেছিলো স্বাগতার সাথে। স্বাগতাকে বিয়ে করে সঙ্গে নিয়ে বিদেশে চলে যায়। কিন্তু শুভমিতা আর জীবনে এগোতে পারে নি।
ওর মনে হয়েছিলো," জীবনে মানুষ সম্পর্কে একবারই জড়ায়। কনক আমার দায়িত্ব। ওকেই বড় করবো। সমাজ পাশে থাকুক আর না থাকুক, কনকের মা'ও আমি। বাবা'ও আমি।"
প্রথম প্রথম বাবা মাকে পাশে পেয়ে ছিলো শুভমিতা। নিজের স্কুল করে মেয়ে মানুষ করা।
পরে ওর মা'ও খুব চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন, বলতে লাগলেন," একা কি করে এই সমাজে মেয়েকে মানুষ করবি!! সম্পর্কটাকে ধরেও রাখতে পারলি না। আমাদের তো বয়স বাড়ছে। আমার আর তোর বাবার মৃত্যুর পর কে দায়িত্ব নেবে?? ভেবেছিস!!!" শুভমিতা দৃঢ় ভাবে বলেছিলো, "কারুর সাহায্য চাই না। তোমাদের'ও না। পৃথিবীতে একা লড়াই করে বাঁচতে শিখে গেছি। আর কোনো সম্পর্কে নিজেকে জড়াতে চাই না।"
শুভমিতার মানসিক দৃঢ়তার কারণে ওর বাবা মা নীরব থাকেন। প্রথম প্রথম কনক শুভমিতাকে জড়িয়ে খুব কেঁদে ছিলো, বলতো, "বাবা কোথায় ?"

পাড়া প্রতিবেশী, আত্মীয় স্বজন আড়ালে কথা বলতে ছাড়ে নি, ' কেমন মেয়ে! নিজের সন্তানকে বাবার পরিচয় থেকে দূরে করে দিলো!! দেখো মেয়ের নিজের'ও কিছু আছে!! বড় দেমাক মেয়ের তাই বরের সাথে মানিয়ে নিলো না!! বাবা মায়ের ঘাড়ে পড়ে আছে!!' ইত্যাদি ইত্যাদি। শুভমিতা দূর্বল হয়ে পড়ে নি। নিজের মনকে বুঝিয়েছে," এটাই ভাগ্য। একাই লড়াই করে বাঁচতে হবে।"
কনকের স্কুলে প্যারেন্টস্ মিটিং এ শুভমিতা হেডমিস্ট্রেসকে বলে," আমি মা হয়ে কনকে সত্যিকারের মানুষ হিসাবে বড় করতে চাই। সেখানে বাবা না থাকার শূণ্যতা আমিই পূরণ করবো। হেডমিস্ট্রেস শুনে বলেছিলেন," আমি তোমার পাশে থাকবো।"
কনক প্রায়ই সন্ধ্যা বেলা স্কুল ফেরার পর শুভমিতার গলা জড়িয়ে অবুঝ মনে জিজ্ঞাসা করতো," ও মা, বাবা কি আমাদের কাছে আর আসবে না?? বাবা কি আমাকে ভালোবাসে না!! বল না মা!! "
এই প্রশ্নের উত্তর শুভমিতার জানা ছিলো না। শুধু কনককে জড়িয়ে ধরে নীরবে কেঁদেছে।

****************
এই ভাবেই সময় কেটে যায় ধীরে ধীরে। অনেক বছর প্রায় পারও হয়ে যায়। কনক এখন সবই বুঝতে পারে । স্কুল পাশ করে কলেজে প্রবেশ করেছে। বাবার কথা আস্তে আস্তে মনের কোণে অস্পষ্ট হয়েছে শুধু চেহারাই মনে আছে।শুধু জানে , "বন্ধুদের সবার বাবা আছে। ও'র বাবা ওকে ফেলে চলে গেছে ।মা শুধু কষ্ট পেয়েছে।" শুভমিতা এখন অনেক শান্ত । সমাজকে নিয়ে ভাবনা নেই।চোখের পাওয়ারের কিছু সমস্যা আছে। চশমা নিয়েছে। এখন নিজের স্কুলের অনুষ্ঠানে আবারও গান গায় । কয়েক দিন আগে ফেসবুকে রুদ্রনীল চট্টোপাধ্যায় বলে খোঁজাতে একটা প্রোফাইল দেখতে পায়। অনেকদিন পর রুদ্রনীলের ছবিটা দেখে মনে মনে শুভমিতা ভাবে, 'হয়তো ভালোই আছে।'

***************
আজ বিকেলে পূজোর শপিং করতে কনককে নিয়ে গেছিলো গড়িয়াহাটে। কেনাকাটার পর কনকের হাত ধরে নিজের বাড়ি ফেরার পথে রাস্তা পার হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো। ট্রাফিক সিগনালে আটকে ছিলো। কিন্তু পিছন থেকে হঠাৎ বহু আগে শোনা পরিচিত গলায় ডাক শুনে শুভমিতার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। কেউ এক জন ভরাট গলায় বলোল," শুভমিতা কেমন আছো? " শুভমিতা শুধু পিছন ফিরে তাকিয়ে অবাক হয়ে চুপ করে থাকে। মনে মনে বলে, " রুদ্রনীল !! এখানে!!?" রুদ্রনীল কিছুটা দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলে," আমি কলকাতায় এসেছি। কনক মা কেমন আছিস? আয় ! একটু কাছে আয়। কত দিন বাদে দেখছি !! আমি তোর বাবা "। কনক উচ্ছ্বাসে "বাবা" বলে দৌড়ে এগিয়েও থেমে যায়। অভিমানে দ্রুত পিছন ফিরে রাস্তা পার হয়ে যায়।
রাস্তার অপর প্রান্তে শুভমিতা আর রুদ্রনীল মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। রুদ্রনীল শুধু বলে চললো, " শুভমিতা আমায় ক্ষমা করো। তোমাকে অনেক ব্যাথা দিয়েছি। যন্ত্রণা দিয়েছি। হয়তো আর ফেরা যায় না। তবু আমাকে অপরাধ বোধ তাড়া করে বেড়ায়। কনককে একবার কাছে আসতে বলো! তুমি চুপ করে আছো,কিছু বলবে না!! " শুভমিতা এক ঘোরের মধ্যে নীরব হয়ে রুদ্রনীলের কথা শুনে যাচ্ছিলো। রাস্তার ওপার থেকে কনকের " মা " ডাকে সম্বিৎ ফিরলো। শুভমিতার চোখ জলে ঝাপসা্ হয়ে গেছে। শুভমিতার মন অনেক কিছু বলতে চাইলেও কিছু মুখ ফুটে বলতে পারলো না। রুদ্রনীলকে শুধু বলল, "ভালো থেকো।" রুদ্রনীল শুধু দুই চোখের কোণে জল নিয়ে এক দৃষ্টিতে দূরে কনক আর শুভমিতাকে দেখতে লাগলো। শুধু বলোল," শুভমিতা আর কিছু বলার নেই তোমার?!!"
শুভমিতা পিছন ঘুরে বার দুয়েক রুদ্রনীলকে দেখলো , তারপর রাস্তা পার হয়ে কনককে নিয়ে বাড়ির দিকে চলোল। ততক্ষণে সন্ধ্যা অনেক গাঢ় হয়েছে। শুভমিতার গলার কাছে যেন অসহ্য চাপা ব্যাথা দলা পাকিয়ে উঠে আসছে । আর একটা গান খুব মনের কোণে উঠে আসছে,
"তবু মনে রেখো
যদি দূরে যাই চলে।
যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।যদি থাকি কাছাকাছি,
দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি--
তবু মনে রেখো।
যদি জল আসে আঁখিপাতে, এক দিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে,
তবু মনে রেখো। এক দিন যদি বাধা পড়ে কাজে শারদ প্রাতে-- মনে রেখো।
যদি পড়িয়া মনে ,ছলোছলো জল নাই দেখা দেয় নয়নকোণে--
তবু মনে রেখো।"
*** সমাপ্ত ***
*** এটা গল্প। বাস্তবের সঙ্গে তুলনা করবেন না। ***
*** সব ঘটনা আর চরিত্র কাল্পনিক। ***
*** অন্য কোন লেখক, লেখিকার গল্পের থিমের সঙ্গে মিল পেলে তা কাকতালীয়। ***

তোমার নীল চোখ ডাগর
- সাগর আল হেলাল

আকাশ হয় না কাছের অথবা দূরের
ঠিক তোমারই মতো যেন,
সারাবেলা, সকাল-দুপুর সূর্যের গ্রহণ প্রহরে
অপলক খোলামেলা প্রাণ ভরপুর আনন্দ দাতা...

তোমার ঠোঁটের বাঁশি চোখের সুর
লজ্জা পাওয়া লজ্জার মতোই সুখদায়ক,
আকাশ বয়ে আনে চাঁদের জোছনা
তুমি আনো নিখাদ সাঁঝের তন্দ্রা...

আকাশের নিচেই তেজ কটাল
ঝিনুকেরা মুখ খোলে না ওড়েনা কুসুমের গুঁড়ো
ঠা ঠা কড়া রোদে গলে পড়ে হরিণের শিং
জিব বের করে শ্বাস টানে জঙ্গলের বাঘ...

কিশোরী জলের স্রোতে তোমার অবাধ বিচরণ
আমি পড়ে থাকি বুড়ো বটতলায়,
আগুনের খোঁজে ঘর ছেড়েছে শান্ত পাখিরা-
সামনে দাঁড়ায় তোমার নীল চোখ ডাগর...
-
২১.০৫.২০১৮

আগন্তুক ও গচ্ছিত শব্দনদী
- মোশ্ রাফি মুকুল

সে প্রতিবার ভূমিষ্ঠ হবে সুখের জাতিকা চিহ্ন নিয়ে,
সে বারবার জন্ম দেবে কুয়াশা সুখের স্বস্তিকা-
সে শূন্যে ছুড়ে দেবে মিহিন তীর;
তার বিলুপ্ত শহরেই ভীড়বে আশার ড্রাকুলার।

আদিম কাব্যের ভাজে ধোঁয়াটে সানাই-
জন্ম হিংসায় মেতে ওঠে পৃথুলার পাপ,
আগন্তুকের হাত ধরে উঠে আসে গচ্ছিত শব্দনদী।

তার তামাটে ধূসর ঝালরে বিপাশা স্বপ্নঘোর-
তার ঘোলাটে চোখে খেলা করে চকমকে দাহন,
তার মখমল মায়া কালের কুশনে;

দৃষ্টির তীব্র জানালায় তালুবন্দি কবি ও কবিতা-
সেইসব সুখব্রতীরা জানে
সুখাদ সোনা বিক্রি হয়না মাংসের দোকানে।
পদব্রজী আগন্তুক এবার মেরুন পাণ্ডুলিপিতে
লিখে দেবে কিছু কিছু কোমল মন্ত্র।

২০/০৫/২০১৮.

জাগতিক-৩
- মোশ্ রাফি মুকুল

শাখাহীন বৃক্ষ; মুমূর্ষু প্রশাখায় দুলছে যৌবন ফুল,
রোদের উঠোনে বারুদের চরকা!
ডানাভাঙা নদী-আর
মৃতপ্রায় গল্পের মাঝি প্রায়সই একসাথে স্বল্পদৈর্ঘ্য হেসেলে উঠে আসে।

জীবনের ছন্দপতন
জাহান্নামের আগুন ক্ষারক পারদ!
মহামান্য বিবেকের পাঠশালায় সুদর্শন আরশোলা বাসা বাঁধে

যাপিত জীবনের জলজ অভিযান চলতে থাকবে কলম্বাসের দুঃসাহসিক গল্পের প্যারাগ্রাফ ধরেই।
জীবন এক পরিচিত উপন্যাসের বেদনামধুর সারমর্মই- বলা চলে,
তা-থৈ তা-থৈ মুদ্রার সার্থক নর্তক নর্তকী আমরা।
নাচো জীবন নাচো জাগতিক হুল্লোড়ে-
নাচো জীবন নাচো-বাঁচো জীবন বাঁচো!

২০/০৫/২০১৮.

জীবন আমার চোরাবালি
- কাজী হাফিজ মাহমুদ

অপলোক চোখে চেয়ে
থাকি দুরের প্রান্ত তটে!
ব্যথিত হৃদয় নিরুপম হয়ে
শুধু তোমার ছবি-ই আঁকে!!
শত ব্যস্ততার ক্লান্ত হয়েও
তোমায় খুঁজেছি শ্রান্ত মনে!
নির্ঘুম চোখের চাতক হয়ে
তোমায় খুঁজে ফেরি স্মৃতির কনে!!
দৃষ্টি আমার প্রান্ত জুড়ে দেখি
শুধু অথৈই ধূ-ধূ বালুর চর!
অজানা ভুলের জন্য তুমি
কেন করেছিলে আমায় পর!!
আশার স্বপ্ন বুনে ছিলাম প্রিয়া
তোমার অনিন্দ্য ভালোবাসার লাগি!
ভেঙে চুড়ে তুমি করলে শেষ
দিপ্ত স্বপ্নের রঙিন আবেশী!!
দুরের প্রান্তে করছে খেলা ওগো
রোদ্রুের নিদারুন নাচানাচি!
কষ্ট আমার দিয়েছে ওগো
নির্ঘুম চাতকের কাছাকাছি!!
রঙিল স্বপ্নের তুলিতে আর
আঁকি না স্মৃতির ডায়েরী জুড়ে!
ফেলে আসা স্মৃতির স্বপ্ন
এখনো নিথর করে হৃদয় তটে!!
কতনা স্মৃতির কথন গুলি
লেখেছে নিরব কলমের কালি!
জীবন আমার হয়ে গেছে
প্রিয়া আজ বড্ড চোরাবালি!!

((প্রকাশকালঃ ১৯/০৫/১৮/ সন্ধ্যা ৭-৮ঃ২০মিঃ))

একটি মেয়ে
– প্রদীপ ঘড়া

রোজ স্বপ্নে ধরা দাও তুমি
দিবসের প্রস্ফুটিত আলো ছায়ার মাঝে
নাহি তোমার রেখা
নেই তোমার কোন কল্পনা
তোমার নয়নের গভীরে-আরো গভীরে
আমার ছবি
তুমি কে ?
কোন রূপোলি দেশের রূম্পা
কি তোমার জাদু
মাটি শেকড়ের বন্ধুত্ব
তোমার আমার ভালোবাসার স্বপ্ন
নয় সত্য
তোমাকে নিয়ে আমি চলি
বসি গাছের ছায়াতে
হাতের রেখাঙ্ক গুনতে থাকি
ভাহি ভাসি আকশে
লুকিয়ে মুখ আমার
তোমার আঁচলে
সবই মন ভোলানো একটি স্বপ্ন
এসেছিলে মায়াবী পথে
গেলে চলে স্বপ্ন রেখে
তুমি…..
একটি মেয়ে ।

নাটের গুরু
- সাগর আল হেলাল

নাটের গুরু নাটের গুরু
আমায় শিষ্য করো,
তা না হলে- জায়গা ছাড়ো
সামনে থেকে সরো।

রসদ দিলাম দিলাম রশি
সবই গ্রাসে নিলে,
এখন দেখি ছয়টা পাখি
মারতে চাও এক ঢিলে।

আমায় যদি নাই বা রাখো
ভক্তি কেনো দেবো,
অমৃতটা তোমার- আমি
গরল শুধু নেবো !

উল্টে দিলাম গণেশ তোমার
নতুন নিয়ম শুরু
আজকে থেকে তুমি শিষ্য
আমি নাটের গুরু।
-
১৯.০৫.২০১৮

ভালো লাগে
- সাগর আল হেলাল

ভালো লাগে ভালো লাগে-

উদাস দুপুর খাটে বসে
পা ঝুলাতে ভালো লাগে,
রাঙা ঠোঁটের বাতাস পেয়ে
গাল ফুলাতে ভালো লাগে।

ভালো লাগে ভালো লাগে-

খালের পাড়ের কোমল ঘাসে
হাত বুলাতে ভালো লাগে,
দীঘির জলের ডুব সাঁতারে
দুখ ভুলাতে ভালো লাগে।

ভালো লাগে ভালো লাগে....
-
১৯.০৫.২০১৮

ডুবুরীর ডায়েরী
- সাগর আল হেলাল

মিষ্টি জলের নদীতে নেমে
ডুব দিয়ে ধরি সামুদ্রিক মাছের পোনা,
মুখে ছড়াই ঝিনুকের ঠোঁট
চেখে দেখি লাল-নীল-বেগুনী হীরে জহরত
নদীর ভালোবাসায়
বেছে নিয়েছি আমি ডুবুরীর জীবন...

আমার আক্ষেপগুলো উপবাস ছাড়ে
হাত-পা ছড়াই নরোম বালুচরে,
নদী পাড়ের কাশফুল উড়ে এসে পড়ে চিবুক গণ্ডদেশে
শরীরের ওঠা-নামা চেয়ে দেখে
ইচ্ছে পাখি
আমি তার সুরে গান ধরি আবেগ ঘনিষ্ঠতায়...

আমি নিজের হাতে সামলে রাখি তরঙ্গ
ঝিলমিল জলের শব্দ সাধি,
নদীটা শিখিয়েছে আমায় ব্যালেনৃত্য
জলনৃত্যে এ কথা ভুলে যাই
এ পৃথিবী একদিনের জন্যও ভালোবাসেনি আমায়
আমার যতো সমর্পন এই নদীর কাছে...

আমি নদীর বুক থেকেই আকাশ দেখি
দেখি নক্ষত্র অগণিত চাঁদ,
আমাকে প্রদক্ষিণ করে সমগ্র নিহারিকা-
আমি জলে ডুব দিয়ে ধরি সামুদ্রিক মাছের পোনা
চেখে দেখি লাল-নীল-বেগুনী হীরে জহরত...
-
১৯.০৫.২০১৮

স্বপ্নগুলো হারাতে দিই নি
(উৎসর্গ- সকল কবিকে)
- সাগর আল হেলাল

তোমার শব্দগুলো- আমার সাথে যখন কথা বলে
আমি তোমার নি:শ্বাসের গন্ধ পাই,
অনুভবের পেয়ালায় টগবগ করে ভালোবাসার উষ্ণতা
জানতে ইচ্ছে করে না- তুমি কেমন ছিলে ?
ইচ্ছে করে, সুন্দর করে দিতে তোমার বর্তমান...

চারটি অক্ষরকে তুমি যেভাবে যুক্ত করো তোমার শব্দমালায়
আমার মন চায় যুক্ত করি দুটি খণ্ডিত আত্মা,
মাছরাঙা নদী চিড়ে মৎস্য কুড়ায়
আমার ইচ্ছে করে ঝিনুক কুড়াতে
বানের জলে ভেসে যাওয়া আমার প্রিয় নদীজলে...

তোমার লেখা দেখে দেখতে পাই তোমার হাতের আঙ্গুল,
আমার আঙ্গুলে ঘুমিয়ে থাকা
তোমার আঙ্গুল স্পর্শ জেগে ওঠে তীব্র আকাঙ্ক্ষায়
লোনা জলে পা রেখে মিষ্টি গোধূলী দেখা
মনে পড়ে যায়, মনে পড়ে যায় স্বপ্ন ভাঙার দ্বন্দ্বঝড়...

কতো মেঘ উড়ে যায় বৃষ্টিহীন
আমার স্বপ্নগুলো হারাতে দিই নি এখনো কষ্টজলে,
তোমার কথা ভেবে- ভাবি আমার কথা
আমি কথা বলি আমার নিজের সাথে মধ্যরাতে
সব কিছু ঠিক থাকে, চোখের জলেরা শুধু বিমর্ষ অস্থির...
-
১৯.০৫.২০১৮

“ভালোবাসা”
- সাগর আল হেলাল

- এক তরফা হলেও তোমাকেই ভালোবাসবো।
- আমি তো ভালোবাসি অন্য কাউকে।
- বেশতো, আমি কি কিছু বলেছি !
- মানে ?
- মানেটা সহজ, যার যার চড়কা- তার তার তেল।
- পাগল হয়েছিস নাকি ?
- পাগলামিই যদি না থাকে, তাকে কি আর ভালোবাসা বলে ?
- তুই তো আমার চেয়ে বয়সে ছোট !
- তো ?
- তো....

মোবাইলটা পড়ে যায় মেঝেতে। ঠাস শব্দের চড় রফিকের গালে।

- বেয়াদব, স্কুলে পড়ে কলেজের মেয়ের সাথে প্রেম !

ওপাশ থেকে সব কথা শুনতে পায় তনু। রফিকের কান্নার আওয়াজ আসে কানে। ওর মা বকেই চলেছে ওকে। আর বকা শুনতে ভালো লাগে না তার। লাইন কেটে দেয়।

ফোনের লাইন কাটতেই রিং বেজে ওঠে। মোবাইল স্ক্রিনে নাচতে থাকে সেভ করা নম্বর। জানু। তনু ফোনটা কেটে দিয়ে নম্বরটি ব্লক করে দেয়।
-
১৮.০৫.২০১৮

আমরা দেখি কেবল ছায়াটুকু
- সাগর আল হেলাল

আকাশে ধরেছে নোনা
চোখে পড়ে না নক্ষত্রের নৈমিত্তিক চকমকি,
অজস্র মানুষ কঙ্কাল সাঁতরায়
সময়ের স্রোতে দিগ্বিদিক
বহুব্রীহি সমাসের সূত্র ঠোঁটে কাছের মানুষ...

অসংখ্য ছায়া উড়ে যায় মাটির বুকে
স্পষ্ট দেখা যায় ধারালো নখর,
প্রতিদিন যোগ হচ্ছে অবাক নতুনেরা-
ছায়াগুলো উড়ে যায় খুব দ্রুত
দর্শক সারিতে আমরা পড়ে থাকি অনেক পেছনে...

একটি রাজহংসীর ছায়াকেও উড়ে যেতে দেখা যায়
আমরা দেখি কেবল ছায়াটুকু
সম্পূর্ণ চিত্র দেখা বারণ সর্বসাধারণের;
উড়ে যাও উড়ন্ত বলাকা তুমিও
আমাদের চক্ষুগুলোর পারদে ময়লা জমেছে খুব...

নোনা ধরেছে মেঘের অগ্রভাগেও
পূর্ণিমারা প্রায়শ ঢাকা পড়ে যায় মেঘের চাদরে,
আকাশ ঠিক হয়ে গেলে
ঠিক হয়ে যাবেই রাজহংসী ও ছায়ার শরীর
শুদ্ধ হয়ে যেতেও কি পারে না ভাষার ব্যাকরণ...
-
১৮.০৫.২০১৮

হতভাগা সভ্যতা
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

সভ্যতা নামক খোলসে বন্দী করে নিজেকে
প্রতিক্ষণেই সামনে আসি মুখোশটাকে খুলে ,
কখনো আশার বাণী শোনাই দরদীয়া কণ্ঠে
কখনো আবার ক্রোধটা দেখাই বিশ্রি ভাবে ৷

সভ্যতা এ যেনো আজ আজব রকম খেলা
মনুষ্যত্ব দিয়ে বিসর্জন ভাসাই মেকির ভেলা ,
মানুষ নামের মুখোশ পড়ে সভ্য সারাবেলা
আসল রুপে ফিরি আবার হলে সন্ধ্যাবেলা ৷

মনুষ্যত্ব বিকিয়ে আবার কিসের তুমি সভ্য
ভাতৃত্ববোধ ভুলে আজ সম্পর্ক শুধুই তিক্ত ,
সভ্যতার মুখোশ পড়ে দিব্যি আছে অসভ্য
মিথ্যার কাছে প্রতিপদে পরাজিত হয় সত্য ৷

বিবেকটাকে বন্দী করে মনের জেলখানাতে
তেল মারতে ব্যস্ত সবাই সকাল থেকে রাতে ,
অন্য কারো ক্ষতি হলে কি আসে যায় তাতে
আপন স্বার্থ হাসিল করেই ক্ষ্যাত দেয় তাতে ৷

অসভ্যদের সমাজে আজকে দূর্বল সু-সভ্যতা
অযোগ্যরা চেয়ারে বসে প্রমাণ করে যোগ্যতা ,
অথচ সেখানে যোগ্য ব্যক্তি ধরে রাখছে ছাতা
হায়রে আমরা সভ্য সমাজের সু-সভ্য জনতা ৷

পড়ুয়া
- সাগর আল হেলাল

পড়ন্ত বিকেল। মনের মধ্যে একটা আনন্দ পাখি উড়ে বেড়াচ্ছিল শাহেদের। ভালো বই পেলেই এমন অবস্থা হয় তার। তারুণ্যে ভরপুর, চনমনা মচমচে বই পাঠ করতে খুব ভালো লাগে তার। খোলা বই বুকের উপর রেখে গাছের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে নীল আকাশের ফাঁকে মেহগণির পাতা দ্যাখে শাহেদ। মাঝে মাঝে হালকা শাদা মেঘ যেন ভেদ করে যায় সবুজ পাতা। বুকে রাখা বইয়ের মসৃণ মলাটে হাত রাখে সে। কী মোলায়েম ! বড়ো আদরের হয়ে ওঠে আজকের বই। ওর শোবার ঘরের বুক সেলফের প্রথম বই হতে পারে এটি। চন্দ্রিমা উদ্যান শাহেদের কাছে মনে হয় স্বর্গের বাগান।

শাহেদ সিদ্ধেশ্বরী কলেজে পড়ে। সুযোগ পেলেই চলে যায় শাহাবাগ। টিএসসি। পাবলিক লাইব্রেরী। বই মেলায় ও খুঁজে পায় প্রাণের উৎসবের ঘ্রাণ। বই পাঠ মানেই আনন্দপাঠ এ কথা জেনে গেছে সে। ভালো বইয়ের সন্ধানে সে দূর-দূরান্তের বন্ধুর কাছে যেতেও পিছপা হয় না। বইয়ের প্রতি আগ্রহ দেখে ওর বাবা ওর জন্য পৃথক স্টাডি রুম করে দিয়েছেন। নিজেও পছন্দ করে অনেক বই এনে দেন শাহেদকে।

বই শাহেদের নিত্য সঙ্গী। বইয়ের জন্য সে দেওয়ানা। নতুন নতুন বইয়ের শখ তার বেড়েই চলেছে। বইয়ের মলাট নাড়তে নাড়তে বুকের সাথে চেপে ধরে শাহেদ আজকের বই। দুই হাতে খোলা বইখানা মেলে ধরে চোখের সামনে। পরম যত্নে চুমু খায়। অন্যেরা পবিত্র গন্থে চুমু খায় যেভাবে, ঠিক সেইভাবে। চোখের সাথে ঠেকায়। মুখ ঘসে খোলা বইয়ের বুকে। ঘ্রাণ নেয়। নতুন বইয়ের নতুন ঘ্রাণ। খুব ভালো লাগে শাহেদের। আজ এই বইয়ের কাহিনী শেষ করেই উদ্যান ছাড়বে সে। বই পাঠে মনোযোগী হয় শাহেদ। বই এবং সে, অন্য আর কিছু তার চোখে পড়ে না।

প্রথম পাপের অধিকার
- সাগর আল হেলাল

পাতালের সিংহদ্বারে লালবাতি
ঘুরে বেড়াই ডানে-বাঁয়,
দূরে সুরৌম্য পাহাড় সূর্য কিরণে বাদামী
আমি খুঁজি নরোম ঘাস
পাহাড়ের শরীর ছুঁয়ে ইচ্ছেরা প্রাণ পায়
বাতাবিলেবুর গন্ধ চারিদিকে...

সিংহদ্বারের সামনে মসৃণ ঘাসবাগান
শিশির মুক্তো জ্বলজ্বল করে,
পাহাড়ের গায়ে উঁকি দেয় তুলতুলে
চাঁদের ডগা
কোমল গোলাপী চাদর ওড়ে দ্বারের কপাটে...

কাছেই গেয়ে ওঠে গান সোনাপাখি
সামিয়ানার নিচে দ্বার খোলার প্রতিক্ষায় আমি
কাটাই ব্যস্ত সময়,
আকাশের ছায়া পড়ে মেঘের শরীরে
মেঘেরা আশ্রয় চায় পাতাল রাজ্যে...

নদীর পাড়েই রাজপ্রাসাদ
ঢেউয়েরা অভিমান রাখে প্রাসাদের কপাটে,
অবশেষে বড়ো ঢেউ আসার আগেই জ্বলে ওঠে সবুজ বাতি
আসে আমার অনুপ্রবেশের সুযোগ
আমি পেয়ে যাই আমার প্রথম পাপের অধিকার...
-
১৭.০৫.২০১৮

যতো ভয় ভালোবাসায়
- সাগর আল হেলাল

ভয় নেই আমার কোনো কিছুতেই
জীবনের সর্বস্তরে ভয় শুধু ভালোবাসায়,
শিউলির ঝরা ফুলে
কে না চায় একটা মালা গাঁথতে !
ফুলতো শুকিয়ে যাবেই-
শুকিয়ে যায় গ্লাসের জল কেবলই ভালোবাসায়...

বিষণ্ণতা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়
তাকে কোনো ভয় নেই আমার
আকাশের বিষণ্ণতায় মাটিতে আসে সজিবতা
হাসে ঘাসের সবুজ
আনন্দ হেঁটে যায় শিশিরের ঘাসে...

সুখগুলো খোঁড়া পায় হাঁটলেও ভয় নেই
ঠিক পেয়ে যায় তারা মনের কিনার,
অলক্ষ্মী পেঁচায় আসে যেভাবে স্বয়ং লক্ষ্মী
আমার দু:খগুলোও নিয়ে আসে
মাথাভর্তি স্বপ্নসুখ...

কোনো কিছুতে ভয় নেই আমার
ভয় শুধু ভালোবাসায়
তোমার আস্তিনে লুকানো সাপের জিহ্বায়
দংশন করে আমার প্রতিদিনের ভালোবাসা...
-
১৬.০৫.২০১৮

মিথ্যে গোলপাতার বাসর
- সালামিন ইসলাম সালমান

আমার তেষ্টা পাওয়া মন, তোমার সুখের বৃন্দাবন।
আমার রংচটা সব সুখ, তোমার স্বেচ্ছাচারী বুক !!
.
নিশিকন্যা !-- মনে রেখেছো?
সেই কবেই কালমেঘ বুকে ধরে নীলাকাশ তোমায় চমকে দিয়েছিলো,
কেশের ডগায় বৃষ্টির ছোঁয়া লাগতেই তুমি ছুঁয়েছিলে আমার উর্দিপোড়া বুক !
ঊষালগ্নে অপ্রাপ্তির আ’লে বসে চুমুর দিব্যি দিয়ে বলেছিলে--
প্রিয়তম আমার !--
ছেলেমানুষীর এই ধারাপাতে প্রণয়ের চুক্তিপত্রে সীল দিলাম,
অবিশ্বাসের জারিত ডিঙ্গায় পারাপারের সাধ জাগলে শ্বাস বন্ধ হবে সেদিন
হুমড়ি খাওয়া পিরিতে টোল খাওয়া স্বপ্নে গোলপাতার বাসর হবে আমাদের !
বলেছিলে--
আলতার শরীরে আর বেণীর লাল ফিতায় ভক্তি ভরা আহ্লাদ মেশাবো,
তোমার কোমরের কাঁচা ঢেউয়ে বিছা হওয়ার প্রতিশ্রুতি সেদিন পেয়েছিলাম !!
.
হেমাঙ্গিনী !--
সহস্র স্মৃতির বারান্দায় বসে অতীতের চৌকাঠে গড়াগড়ি খাই আজও-
তোমার মুখে কেটে খাওয়া আমড়া শুকিয়ে গেলেও বাহিরে ছুড়িনি !
খুনসুটির ধারে ছুলে যাওয়া ঘায়ের যত্ন নেইনা স্মৃতি মুছে যাবার ভয়ে,
বিরতিহীন বেদনার পুঁজে এখনও খুঁজে বেড়ায় তোমার অবিশ্বাসী মায়া মুখ !!
.
অনিন্দিতা !--
আমি থরথর জবানে আজন্মকাল বিবেকের ক্যাম্পাসে বলে বেড়ায়-
কোথায় ভিড়িয়েছো তোমার মিথ্যে প্রবোধের ভগ্নদশা নাও?
কোথায় সাজালে তোমার গোলপাতার বাসর?

কর্কশ মনুষ্যত্ব নিহত হবে
- সালামিন ইসলাম সালমান

বিস্তীর্ণ আকাশের বুকে হাটছি আহত বাতাসের বাতায়ন ধরে
কাঁকিয়ে ওঠা সায়াহ্নের দু’পায়ে ভর করে মাড়িয়েছি মর্ত্যের দূর্বাঘাস,
আমার লাপাত্তা অধিকার ফ্যাকাশে মায়ার বসন পরে নিঃশেষ হয় !!
.
গনগনে পিরিতের পিঁড়িতে বসে চুরি করা আনন্দের সাতকাহন লিখি
হিমাঙ্কের তলায় জমে থাকা ব্যঞ্জনা দগ্ধ শীৎকারের অতীত দেখায়,
মুক্তির মিছিলে জেগে ওঠা পশমের গা বেয়ে নেমে আসে ধোয়াসা !!
.
স্বাধীনতা ! আমায় সৎকার করো-----
তনুশ্রীর সতীত্বের পর্দা ছেড়া আর্তনাদে পুড়িয়ে ভস্ম করো আমার ব্যর্থতা
আমার বীরত্বের বীর্যে তপ্ত লাভা ঢেলে দাও---
চক্ষুর দু’কিনারে ঠুকে দাও পৌরুষত্বহীন ঘৃণার পেরেক।
তৃষিত বোধগম্যতার অনলে পুড়ে কুঁকড়ে যাক বিদকুটে আক্কেল !!
.
লাঞ্চিতার বগলের চাপা উত্তাপে লাল করো আমার দেমাকের রসদ
আমার দু’গাল ভাতের শিরায় শিরায় মিশিয়ে দাও নির্যাতিতার কান্না,
মগজের ভাঁজে ভাঁজে ভেসে উঠুক বিভৎস আর্তনাদী মুখগুলো।
তবেই কর্কশ আত্মার রেষারেষি ভেদে উদিত হবে অনুকম্পার বৈঠা !
.
মনুষ্যত্বের বেদিতে সম্মানিত শয়ন হোক সোহানাদের,
মননের রেখায় এঁকে রাখি আজ---
নারী কেবলি ভোগের সামগ্রী নয়, ভাগের দাবীদারও !!

কথা ছিল
- শাহিনা কাজল

কথা ছিল
ঝরা জোছনার ইপ্সিত খুশি রাতে
সন্ধ্যার জানালা খুলে অাকাশের ঐ চাঁদ
হবে দিশেহারা, মেখে মুগ্ধতার সন্ধ্যাতারা,

সেদিনের গোধুলী বেলা
হলো না অাজও একসাথে পথচলা।

কথা ছিল
দখিনা বাতাস মনের ডাকবাক্সে
পাতা ঝরার দিনে মুঠো ভরা ছন্দে
লিখে যাবে ভাগ্য চিঠি,
সে চিঠি অাজ ও হলো না পূর্ণ
এখন দেখি স্বপ্নেরা অাজ চূর্ণ।

কথা ছিল
সুউচ্চ মিনার সুমধুর সুরে
শোনাবে শিল্পিত গান
ঝরা শিশিরের ছন্দে-অানন্দে
বন্দি অাকাশের বুক চিরে,
ও অাকাশ দিলো না শুনতে পৃথিবীর অজান্তে।

কথা ছিল
খেয়ালি ছাদের নীচে অবাধ্য অাবদার
মনের পাসওয়ার্ড খুলে অ-লেখা চিঠি
বাতাসের ছবি অাঁকবে,
সে ছবি এখনো হলো না অাঁকা,
যদিও পেলাম সত্যের দেখা।

কথা ছিল
তুলতুলে রোদের দরজায় দাঁড়িয়ে
গাইবো মুক্তির গান।
দিন চলে গেছে সুদূরে
ইতিহাস দাঁড়িয়ে অদূরে।

হারিয়ে চাঁদ, সন্ধ্যাতারা
গোধূলীর চিঠি,
দিকভ্রান্ত অাকাশ অমাবস্যার গান শোনায়
ভরা এ পূর্ণিমায়।

বিষাক্ত প্রেমিক
- শাহিনা কাজল

একই সূর্যের অালো ভোগ করে
যারা রাষ্ট্রকে ভাগ করে
সীমানা অাঁকে মেঘের গায়ে
প্রাচীর তোলে রাজপথে
তারা ই প্রকৃত ভোগবাদী।

পশুপাখির অন্তরে কষ্ট দিয়ে
যারা সভা সেমিনারে জীব প্রেমের
জয়গান করে
তারাই এ যুগের দেশপ্রেমিক।

প্রকাশ্য দিবালোকে যারা মানুষ খুন করে
লাশ নিয়ে মিছিল করে,
নৃত্য করে - গীত গায়
রামদা কুড়াল নিয়ে রাজপথে
বুক ফোলায়
তারাই দ্বাবিংশ শতাব্দীর বিষাক্ত প্রেমিক।

ঘরের নারী কে কষ্ট দিয়ে -
নির্যাতন করে যারা
দামী যৌতুকের গাড়ী নিয়ে
ফুটপথের ফুলপরীদের সাথে
সময় পার করে - ভোগ বিলাসে
জৌলুস দেখায় তারাই
এ যুগের বিষাক্তপুরুষ- কাপুরুষ।

==============একবছর আগের রিপোস্ট

শেঁকড়
- সাগর আল হেলাল

বাথরুমের পারদ মাখা স্বচ্ছ কাঁচের দিকে তাকের অশ্রুনদীর তাণ্ডব দেখছিল ইউসুফ। কিছুক্ষণ আগেই মুখের ভেতর আঙ্গুল দিয়ে বমি করে বেসিন ভরে ফেলেছিলো সে। বেসিনের মুখ বন্ধ হয়ে যাওয়াও আটকে গেছে পানি। কলের পানি ছিটে পড়ছে গায়। উপচে পড়া পানিতে ভেসে যাচ্ছে পায়ের তলার পরিষ্কার টাইলস্ এর মেঝে। কোন ভ্রুক্ষেপ নেই ইউসুফের। সে গভীর মেনাগে যেন কেবলই নিজেকে দেখছে। এভাবে নিজেকে ভাবে নি সে কোনদিন। যমুনার বাঁধ ভাঙা অবস্থা আজ ইউসুফের চোখে। চোখ দিয়ে পানি এসে সারতে পারছে না বলে নাক দিয়েও অশ্রু এসে যাচ্ছে। নাকের ও চোখের পানি একাকার হয়ে ঠোঁট স্পর্শ করে পড়ছে ঐ মেঝেতেই। ইউসুফ এ সবে কিছুই মনে করছে না আজে।

হিথ্রো এয়ারপোর্টে সে যেদিন প্রথম পা রাখে মনে পড়ে সেদিনের কথা। ভিন্ন চ্যানেলে তার লাগেজ এবং তাকেও স্বাগত জানিয়েছিলো লন্ডন এর মাটি। নিজের প্রতি সেদিন প্রচণ্ড রাগ হয়েছিলো। আত্ম পরিচয়ের গ্লানি তাকে খুন করেছিলো নিষ্ঠুরভাবে। থাকার জায়গা ঠিক হওয়ার পর ঢাকা থেকে আনা সমস্ত কাপড়চোপড় কুচি কুচি করে কেটেছিলো কাঁচি দিয়ে। চুলের রং পরিবর্তন করে বাদামী করেছে। মুখের ভাষা ইরেজার দিয়ে যেন ঘসে মেজে তুলে ফেলে। আদব কায়দা, চাল-চলনে, বলনে কেতাদুরস্ত বিলেতি হয়ে যায় ইউসুফ। নামের উচ্চারণও সে ইউসেফ করে ফেলে। এরই মধ্যে কেটে গেছে প্রায় ১২ বছর। সবাই তাকে এখন একজন ইউরোপীয়ান হিসাবেই চেনে, জানে। গভীর রাতে নিজের কালো চুল বাদামী করার কাজ চালু রেখেছে সে। কিন্তু আজ তার কি হয়েছে ? কেন তার এই মানসিক অবস্থা ! বাসায় ঢোকার আগে সে মাথার চুল সেভ করে এসেছে। মুখে নিজের নাম ইউসুফ উচ্চারণ করার প্রাণান্ত চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় বমি করেছে।

অফিসের বস আজ সবাইকে নিয়ে একসাথে ২০১৫ বিশ্বকাপের ইংল্যান্ড বনাম বাংলাদেশ ক্রিকেট খেলা দেখেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি ভালো পারফরমেন্সে ইংল্যান্ডের মানুষ বাহবা দিচ্ছিলো। তারা বাংলাদেশের খুব প্রশংসা করছিলো। খেলা শেষে ইউসুফ বসকে খুশি করার জন্যই হয়তোবা ইংল্যান্ডের সাপোর্টে কিছু একটা বলতে চেয়েছিলো। বস একটা বকা দিয়েছে। বলেছে- বাংলাদেশ ইজ এ নাইচ কান্ট্রি। দি পিপল অব বাংলাদেশ ইজ ভেরী গুড। দে আর এ্যাকচুয়াল টাইগার। বন্ধ বাথরুমে ইউসুফ এবার চেচিঁয়ে কেঁদে ওঠে। দু’হাত উপরে তুলে বলে- আমি বাঙালি ! এয়ার টাইট বাথরুমের সেই আওয়াজ বাইরের কেউ শুনতে পায় না।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget