এপ্রিল 2018

আয় খুকু আয়
- অন্তরা বিশ্বাস

রোজি ফ্লাইটের ধারে বসে আছে,বাইরে মেঘের ভেলার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।মেঘ গুলো ফ্লাইটকে যেন ঢেকে ফেলতে চাইছে। চোখে জলের ছোট ছোট বিন্দু চোখকে ঝাপসা করে রেখেছে। বুকের ভিতরটায় চাপা যন্ত্রণা পাথর হয়ে বসে আছে।কলকাতা থেকে ফ্লাইট ছাড়ার আগে বৃষ্টি হচ্ছিলো।
সিট বেল্টটাও ঠিক করে বাঁধা আর হয়ে ওঠেনি। রোজির একটা শোনা বাংলা গান মনের মধ্যে যেন বার বার ফিরে আসছে,
"কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না
জানালার গ্রীলটাতে ঠেকাই মাথা
মনে হয় বাবার মত কেউ বলে না
আয় খুকু আয় খুকু আয়.....
আয়রে আমার সাথে গান গেয়ে যা
নতুন নতুন সুর নে শিখে নে ,
কিছুই যখন ভাল লাগবে না তোর
পিয়ানোয় বসে তুই বাজাবি রে
আয় খুকু আয় খুকু আয়।"

রোজি চেষ্টা করেছিল, নিজের বাবাকে একবারটি কাছে নিয়ে বুঝিয়ে নিজের সাথে লস এনঞ্জেল্স এ নিয়ে যাবে, কিন্তু হলো না।
দীর্ঘ প্রায় তেইশ বছর বাদে কলকাতায় একা সে নিজে এলো। সেই কবে প্রায় ছয় বছর বয়সে মায়ের হাত ধরে ওয়াশিংটনে চলে আসে রোজি। তখন কেন সে সেই সুদূর বিদেশে গেছিলো, নিজেই জানতো না। আজ বহুদিন বাদে নিজের দেশটাকে আবার দেখতে পেলো, বিগত ছয়টা দিন নতুন করে এই কলকাতা টাকে আপন লাগল।রোজি তার নিজের মায়ের কাছে কলকাতার গল্প,ওদের নিজেদের জীবনের কথা শুনেছে, জেনেছে, যার জন্য ওর কলকাতা ছুটে আসা।

*************
রোজি বঙ্গতনয়া কিন্তু বড় হয়েছে ওয়াশিংটন আর লস এনঞ্জেল্সে। বাণিজ্য এ স্নাতোকোত্তর পাশ করে লস এনঞ্জেল্স এ ট্রাভেল এজেন্সির সাথে যুক্ত, ফোটোগ্রাফি তার প্যাশান। স্বাধীনচেতা, আত্মবিশ্বাসী , উদ্যোমী ধরনের মেয়ে। বাংলা ভালোই বোঝে, বাংলা বলতে গেলে তার উচ্চারণগত কিছু সমস্যা হয় বটে। রোজি নিজের মায়ের গলায় বহু বাংলা গান শুনেছে।

রোজির মা নন্দিনী উত্তর কলকাতার বনেদী ডাক্তার পরিবারের মেয়ে। বিত্ততার মাঝে বড়ো হয়েছেন। প্রকৃত অর্থেই সুন্দরী ছিলেন। দুধ আলতা গায়ের রঙ, তেমনি মেধাবী ছিলেন। নন্দিনী দেবীর বাবা কলকাতার বিখ্যাত কার্ডিয়াক র্সাজেন ছিলেন। মা বিখ্যাত স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ। নন্দিনী নিজে ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করেন। নৃত্য ও সঙ্গীত শিল্পে যথেষ্ট পটু ছিলেন তাই নাট্য জগতে বেশ দক্ষতার সাথে অভিনয়ে সুযোগ পান।
সেই সময়ে অরিন্দমের সাথে পরিচয়। অরিন্দম ছিলেন সুপুরুষ, নাটকের সহকারী পরিচালক।কিন্তু খুবই সাধারণ পরিবারের,আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না, তবু নন্দিনী অরিন্দমের ব্যক্তিত্বের আকর্ষণের জন্যই হয়তো বাড়ির অমতে বিয়ে করে। কিন্তু আদরে বড়ো হওয়া মেয়ে নন্দিনী, অরিন্দমের পরিবারের চিন্তাধারার সাথে মানিয়ে নিতে পারেনি। নন্দিনী আর অরিন্দমের বিয়ের এক বছর পর তাদের কন্যা সন্তান রোজির জন্ম হয়। কিন্তু ততদিনে বিয়ে ক্লিশে হয়ে ছয় বছরের পর তা ভেঙে যায়। বিস্তর চেষ্টা সত্ত্বেও ডিভোর্স হয়ে যায়। নন্দিনী নিজের বাপের বাড়ি ফিরে যায়।
নন্দিনীর কেরিয়ারের উন্নতির কথা ভেবে তার বাবা নিজের জুনিয়র ছাত্র জয়ের সাথে অল্প সময়ের মধ্যেই নন্দিনীর আবার বিয়ে দেন। বিয়ের পর নন্দিনী রোজিকে নিয়ে জয়ের সাথে ইউ. এস .এ চলে যায়। অরিন্দম নিজেকে নাটকের সাথে আর পত্রিকায় লেখালেখির সাথে জড়িয়ে রাখে, একাকীত্বতা তাকে গ্রাস করলেও নিজেকে ব্যস্ততায় জড়িয়ে রাখে।
ওদিকে নন্দিনী ঠিক জয়ের জীবন যাত্রার সাথে মানিয়ে উঠতে পারেনি।রোজি ও নতুন বাবাকে ঠিক মতো গ্রহণ করে উঠতে পারেনি। প্রথম প্রথম রোজি কিছুই বুঝতে না, কে এই কাকু মায়ের সাথে রয়েছে! কিছুই ছোট্ট মাথায় ঢুকতো না।জয়ের ছিলো বেপরোয়া জীবন যাত্রা। নিত্য অশান্তি লেগেই থাকতো।
ইউ.এস.এ র সংস্কৃতিতেই রোজি বড়ো হতে লাগলো। কিন্তু বাংলা সংস্কৃতির চর্চা মায়ের কাছে সে পেতো। রোজি ধীরে ধীরে বড়ো হয়,নিজেকে প্রতিষ্টিত করে। হঠাৎ একদিন শুনলো ঘরের মধ্যে মা ও বাবার বাক বিতন্ডা। জয় নন্দিনীকে বলেছে
-" তোমাকে বিয়ে করাটা ভুল, তুমি কলকাতার সেকেলে মানসিকতার মেয়ে, কি জন্য আমায় বিয়ে করে ছিলে? টাকার জন্য!! বেড়িয়ে যাও আমার জীবন থেকে”!!!
রোজি মেনে নিতে পারেনি মায়ের এই অপমান। নিজের মা নন্দিনীকে নিয়ে লস এনঞ্জেল্স এ কর্মসূত্রে চলে আসে।

এরপর নন্দিনীর চোখের জল,হতাশা, অনুশোচনা কোনো কিছুই মেয়ে রোজির দৃষ্টির বাইরে যায়নি।
রোজি মনস্থির করে কলকাতায় আসবে বাবা অরিন্দমের কাছে,বাবাকে মায়ের কাছে,নিজের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে আসবে,হ্যাঁ কিছুটা নিজেদেরই স্বার্থে...
বাবার চেহারাটাই চোখের সামনে যেন আজ অস্পষ্ট হয়ে গেছে,শুধু ফটোই সম্বল।
তবু অন্ধবিশ্বাসে আর আশায় বাবার কাছে ছুটে আসার জন্য বহুদিন পর কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া......

*******
শৈশবের পর রোজি আজ প্রথম কলকাতায় পা রাখলো।সাথে লাগেজ। অচেনা শহরটা নিজের মনে হলো, নন্দিনীর দেওয়া ঠিকানাটা অনুযায়ী অরিন্দমের শোভাবাজারের বাড়িতে হাজির হলো রোজি। পুরোনো বাড়ি। বহু ডাকাডাকির পর একজন বয়ষ্ক মহিলা বেড়িয়ে এলেন, বললেন ,
-"কাকে চাই?" রোজি বলল,
-"আই এম রোজি ফ্রম ইউ. এস. এ, অরিন্দম রায়ের বাড়ি কি এটাই?উনি কি বাড়িতে আছেন,?"
মহিলা অবাক হয়ে রোজিকে ঘরে এনে বসালেন।পুরোনো ঘরের রঙ চটা দেওয়াল, একটা ভ্যাপসা গন্ধ। একজন মাঝ বয়েসি চশমা পড়া ভদ্রলোক ঘরের ভিতরে এলেন, রোজিকে ভালো করে দেখে বললেন,
-"কেন এসেছো? আমি ওনার ছোট ভাই, দাদা এখন একা শ্যামবাজারের মোড়ে একটা ছোট এক কামরার ঘরে নিজের লেখালেখির জগতে আর সমাজ সেবা নিয়েই থাকেন,তোমার মা আমার দাদার জীবনটাকে এভাবে তছনছ করলো কেন?"
রোজি বাকরুদ্ধ, চোখে জল।নন্দিনীর আর তার নিজের জীবনের সমস্ত ঘটনা বলার পর, কাকার কাছে ছোট বেলার ফোটোর বান্ডিল খুলে দেখায়, কাকার চোখেও তখন জল। কাকা বললেন,
-"কেন তোর মা এই ভাবে দাদাকে একা করে দিয়ে চলে গেল!বল তো!"
রোজি নীরব। রোজির কাকা কাকিমার আদর, স্নেহে বেশ কয়েকটা দিন কলকাতায় কেটে গেল।

*********
আজ পঞ্চমদিনে রোজি কাকার বাড়ি থেকে শ্যামবাজারের ঠিকানা নিয়ে সকাল সকাল বেড়িয়েছে।পুরোনো একটা বাড়ির দরজার সামনে ট্যাক্সি এসে দাঁড়ালো। দরজায় কড়া নাড়তেই একজন বয়ষ্ক ভদ্রলোক এসে দাঁড়ালেন, পরনে একটা পুরোনো জামা, চোখে চশমা। উদাসীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন ,
-"কাকে চাই?"
রোজি বলল,
-" আমি রোজি, কেমন আছো বাবা! আমি তোমার সাথে দেখা করতে এসেছি, মাই বাংলা ইস নট গুড,তবু বলি আমি তোমার জন্য এসেছি..”
অরিন্দম হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো, কত পুরোনো স্মৃতি এক ঝটকায় ফিরে এলো মনে। দিনের পর দিন রোজির 'বাবা' ডাকের অপেক্ষায় সে যেন বসেছিল, আজ এতো দিন বাদে রোজিকে দেখলো,প্রিয় "বাবা" ডাক শুনতে পেলো।
ঘরের মধ্যে রোজিকে নিয়ে এসে বসায় অরিন্দম। এঁদো ঘর, দেওয়ালের রঙ চটেছে,একটা ছোট খাট রয়েছে। নাটকের নানা বই আর পোস্টার এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। রোজির নজর পড়লো দেওয়ালে টাঙানো বহু পুরোনো সাদা কালো একটা ছবির উপর ,তাতে রয়েছে ছোট্ট রোজি, তার সুন্দরী মা নন্দিনী, আর বাবা অরিন্দম। ছবির কাছে গিয়ে রোজি দাঁড়ালো,।চোখে জল চলে এলো, বললো,
-"বাবা, মা তোমায় খুব মিস করে, নিজের মিসটেক বুঝেছে, প্লিজ আমার সাথে ইউ.এস.এ চলো, তুমি এভাবে বাবার লাভ,কেয়ার থেকে আমায় বঞ্চিত করতে পারো না, আই নিড ইউ"।

রোজি এক লহমায় অরিন্দমের হাত চেপে ধরে মেঝেতে বসে কেঁদে চলল।অরিন্দম আর স্থির থাকতে পারেনি, পরম পিতৃ স্নেহে মেয়েকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে বসে গেলো। খানিক বাদে সম্বিৎ ফিরলো দুজনের। অরিন্দম বিছানায় রোজিকে বসিয়ে বললো,
-"না রে মা, নন্দিনীর কাছে আমার আর ফেরা হবে না, আমার এই দৈন্যতাই চির সাথী, তোর মা কোনো দিনই এই অবস্থাকে মেনে নেয়নি, তোর মায়ের ইচ্ছাকে সারাজীবন সম্মান দিয়েছি, আজ আর ফেরা যায় না, আমি যা তাই আছি, নন্দিনী নিজের জীবনকে পাল্টাতে চেয়েছিল, আজ আর অনুশোচনার তো কিছু নেই, আমায় ক্ষমা কর..” রোজি বলে উঠলো, -"ডোন্ট ইউ লাভ মি?মাকে ভালোবাসোনি?কেন ওই ফোটো টাঙিয়ে রেখেছো, দেওয়ালে?”
অরিন্দম বলল,
-"শান্ত হো মা,ভালোবাসা মুখে বলে হয় না, বুঝিয়েও হয়না, যেটা অন্তরে থাকে, তা প্রকাশ করা বড়ো কঠিন, সেটা বুঝে নিতে হয়, এতোদিন শুধুই অপেক্ষা করেছি তোর বাবা ডাক শোনার জন্য, এই অপেক্ষা তো ভালোবাসারই জন্য, আমার যাওয়া সম্ভব নয়,মায়ের খেয়াল রাখিস”।

বেলা গড়িয়ে এলো, বিকেল হতে চললো।অরিন্দম নিজে হাতে রান্না করে রোজিকে খাওয়ালো, খাওয়ার পর রোজি বেরোবার জন্য উদ্যোগ নিল।অরিন্দম দরজার বাইরে রাস্তার মুখে রোজিকে পৌঁছে দিল, শেষ মুহুর্তের জন্য রোজি অরিন্দমের হাতটা চেপে ধরলো আর বললো,
-"মিস ইউ, তোমাকে আমাদের চাই বাবা..”

অরিন্দম নীরব রইলো,চোখ জলে ঝাপসা।রোজি বার তিনেক পিছন ফিরে অরিন্দমকে দেখলো।এগিয়ে চললো ফ্লাইট ধরার পথে।
অরিন্দম দাঁড়িয়ে রইলো রাস্তার মাঝে, বৃষ্টি শুরু হয়েছে। দূরে অরিন্দমের কানে যেন একটা গান ভেসে এলো

"কাটেনা সময় যখন আর কিছুতে
বন্ধুর টেলিফোনে মন বসে না
জানালার গ্রীলটাতে ঠেকাই মাথা
মনে হয় বাবার মত কেউ বলে না
আয় খুকু আয় খুকু আয়
আয়রে আমার সাথে গান গেয়ে যা
নতুন নতুন সুর নে শিখে নে
কিছুই যখন ভাল লাগবে না তোর
পিয়ানোয় বসে তুই বাজাবি রে
আয় খুকু আয় খুকু আয়..”

-সমাপ্ত-

"দে‌হের জীর্ণ শীর্ণতা"
***রহমান মাসুদ***

দেহ কেন জীর্ণ শীর্ণ
সে প্র‌শ্নের সন্মুখীন প্র‌তিক্ষ‌ণে,
রিষ্ট-পুষ্ট দেহবল্লভের অধিকারী
তাদের সুস্হ ভা‌বে সর্বজ‌নে।

আত্নার দর্শণ চর্ম‌চো‌খে অধরা
সে নয়‌তো ভাবনার খোরাক,
প্রশ্ন রা‌খেনা তার সুস্হতা নিয়‌ে
ভা‌বে নিস্প্রয়োজন সে জবাব।

দে‌হের মরন অবশ্যম্ভাবী
তবু তারই চ‌লে পু‌ষ্টিবর্ধণ,
অ‌চি‌রেই এত সা‌ধের দেহটা
মা‌টির কী‌টের মহা‌ভোজন।

আত্না চিরস্হায়ী নেই মরন
তারও আছে খা‌দ্যে বিভাজন,
পাপ ও পুণ্য যার উপকরন
সেই অর্জ‌ন ল‌দ্ধেই আগমন।

দে‌হের খাদ্য না আত্নার খাদ্য
কোনটার প্র‌তি হব যত্নবান,
সর্বদা স্মর‌ণে মৃত্যুর কথা
তাই‌তো দে‌হের শীর্ণ অবস্হান।

মা‌টির কীট হয়‌তোবা ব‌ঞ্চিত
আত্নার স্বা‌র্থেই দ‌েহ‌কে প্রবন্ঞ্চনা,
দে‌হের শীর্ণতায় কিবা যায় আসে
সুস্হ আত্নাই জ‌ন্মের সার্থকতা।

পণ্যতায় পূণ্য হয়
- শাহিনা কাজল

উৎস থেকে বিবর্ণ রঙে নগ্ন শিশির খেয়ে
বেঁচে থাকে রোদ্দুর,
সময়, জীবনের মতই দক্ষ কারিগর
গড়ে অার গড়ায় - গোধূলীর শরীরে।
দিব্যি উড়ে যায় শকুন, গন্ধ্যে গন্ধ্যে
খুজে নেয় কাঁচা মাংস।
ভুরি ভুরি কাঁচা মাংস চারধারে
বাজারে কেনাও যায় তাজা তাজা।
সবখানে অাজ কাঁচা মাংসের প্রদর্শনী,
চিত্রকর্ম উলঙ্গতার।
সত্যকে উলঙ্গ করা হচ্ছে
মিথ্যার বরণডালা সাজাতে।
অার কিছুক্ষণের মধ্যে শুরু হবে
নারীত্বের জয়- হয় বক্তৃতায়
নয় তো প্রসাধনীতে।

পণ্য হতে হতে অামাদের সব
পূর্ণতা অাসে, শূণ্যের পূণ্যতায়।

ঠিক কবে যে বিবেকের
বৃষ্টি নামবে! কেউ বলে না
শুধু বাহ্বা দিয়ে ই খুলে নেয়
সব বসন, চরিত্র হরণ থেকেও ভয়ঙ্কর
অামার মৃত্যু! সত্যের কাঠগড়ায়।

সোনার নুপুর পরে লজ্জা নামে পৃথিবীতে
পণ্যতায় পূর্ণ হবে অামাদের সকল পূণ্য।

জুয়েল মিয়াজির স্বগতোক্তি
- জুয়েল মিয়াজী

গত পঁচাত্তর বছর ধরে আমি মেয়েটির সাথে পরিচিত।সব সময় চুলে লাল ফিতা বাধতো সে। এখনো সে আগের মত চুলে লাল ফিতা আর ঠোটগুলি লাল লিপিস্টিকে রাঙা করে রাখে।আজ থেকে প্রায় চল্লিশ বছর আগের কথা,তখন আমার বয়স পচিঁশ আর মালতীর বয়স ষোল । তখন প্রতি বিকালে আমাদের খুনসুটির সময় কাটতো লালবাগ কেল্লা কিংবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকায়।আমার হৃদয় জুরে যে ষোড়শীর বসত ছিল সে দেখতে সুশ্রী ছিলনা।কিন্তু তার কালো চোখের মায়া  আমার বৃদ্ধ বুকে দাগ কেটে যায়।পাখির বাসার ন্যায় কালো চোখ গুলি যখন কাজলে আবৃত করে রাখতো তখন আমি দিন দুনিয়া ভুলে এই মানবীর প্রেমে মশগুল হয়ে যেতাম।তখন কাগজের ফুল ব্যবহারের রেওয়াজ ছিল না। তাই আমি তার চুলে লাল ফিতার সাথে কয়েকটা তাজা মাধবীলতা বেধে দিতাম।এরপর গত চল্লিশ বছর ধরে সেই আমাকে ফুল দিয়ে আসতেছে।প্রতি শুক্রবারে একগুচ্ছ গোলাপ ফুল নিয়ে আসে সে আমার কাছে। মালতী সহজে কাঁদে না।আমাদের এত দিনের প্রনয়ে তাকে আমি একবার মাত্র কাঁদতে দেখেছি।সেবার সে প্রচন্ড কেঁদেছিল,আর সেদিনই আমার সাথে তার শেষ দেখা হয়েছি।এরপর থেকে আমি তাকে আর কোন দিনও কাদঁতে কিংবা হাসতে দেখিনি।গত চল্লিশ বছর ধরে মালতীর সাথে আমার সপ্তাহে একবার দেখা হয়। শুক্রবার এলেই মালতী আমার সাথে দেখা করে। আর রেখে যায় কয়েকটা গোলাপ কবরের উপর।

দেহাবশেষ
– শীবু শীল শুভ্র

জ্বালা মোর প্রতিটি মুহূর্তে অজানাকে ঘিরে
ক্ষণিক ভালোবাসায় মন বাংলায় ফিরে বারে বারে;
শুদ্ধতার গন্ধ পাই হে বাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে
কলমের জোরে জয়ী বাঙ্গালী চিরস্মরণীয় হয়ে রবে।

বাংলায় লিখি মোর মাতৃভূমির ঐ টানে
বাংলার মধ্যে-ই জন্ম তথাপি  সহস্র গুণীজনের!
জয় হোক বাংলার প্রতিটি মানুষের সম্মাণে
শক্ত করো হে মন জাগো বাংলার অপশক্তির অপমানে।

বাংলা ভাষার চেতনা হৃদয়ে নাও ধারণ করে
বাংলার মাটিতেই দেহাবশেষ মোর ঘোষণা উচ্চস্বরে
সহস্র কোটি শ্রদ্ধা মোর এই বাংলার বন্ধু ” বঙ্গবন্ধুকে ”
হে মহান নেতা রয়েছো মোর হৃদয়ের প্রতিটি কোণে।

মা মাটি মানুষের ওপার বাংলার দিদির নবঅধ্যায়
বাংলার গর্বিত নেত্রী প্রণাম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়!
বঙ্গবাসী সকলের জাগরণে হোক বাংলার জয়গান
ভালোবাসে আপামর জনতা এ যে বাঙ্গালীর প্রাণের টান।

কবিগুরু-বিদ্রোহী কবি-পল্লীকবি বাংলা মায়ের সন্তান
বাংলার কবিতায় জুগিয়েছেন হে প্রাণের সঞ্চার।
ছোট্ট আবেগে ভালোবাসায় পূর্ণ সামনেই অন্ধকার
দেহাবশেষ পড়ে রবে ধরণীতে পাড়ি দিতে হবে পরপার।

পৃথিবীর বুকে বাঙ্গালীরা বাংলাকে আঁকড়ে ধরবে
কত তাজা প্রাণের বিনিময়ে, যে বাংলা ইতিহাস পড়বে?
ভাষা আন্দোলন ও হে বাঙ্গালীর অস্তিত্বের পরিচায়ক
মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জননী সবাই মোর “বাংলা ভাষার নায়ক”।

বি.দ্র:- [ বাংলার প্রতিটি মানুষের কাছে উৎসর্গ করলাম, এই কবিতা। ভূল-ত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। ]

সেইতো কবি
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

কবিও একদিন ঠিকই গন্তব্যে চলে যাবে
আবারো মিশে যাবে সোদা মাটির সাথে ,
তার আগেই কবি আবারও জেগে উঠবে
হাসি মুখেই মৃত্যুর জামাও গায়ে জড়াবে ৷

কবি একদিন ঠিক প্রতিবাদী হয়ে উঠবে
কলম হাতে ভঙ্গুর সমাজের চিত্র আঁকবে ,
কবিরা জন্মে ভঙ্গুর সমাজের দর্পন হতে
তাইতো কলমে বিদ্রোহের আগুন জ্বলে ৷

কবির কলম থামাতে ওরা একজোট হবে
হুলিয়া জারী করবে ওরা কলম থামাতে ,
সারা শহরের দেয়ালে কবির ছবি ঝুলবে
তবু ওরা কবির কলম থামাতে ব্যার্থ হবে ৷

মৃত্যুর পরোয়ানা কবির কাঁধে ঝুলে আছে
আর বুক পকেটে অগ্নিঝরা কলম রয়েছে ,
পকেটে কবির কাফনের কাপরও রয়েছে
তবু কবি ব্যারিকেড ভেঙ্গে এগিয়ে চলেছে ৷

বিশাক্ত টিয়ারে চোখ জ্বলেপুড়ে ছারখার
কবির কপাল ঘামে রক্তে মিশে একাকার ,
তবুও কাঁধে কাঁধ প্রাচীর গড়ে সে আবার
সেইতো কবি বুকে সৎ-সাহস আছে যার ৷

ধোঁয়াশা ইস্টিশান
- মোশ্ রাফি মুকুল

আগন্তুক ধোঁয়াশার মতো কিছু শব্দ,
ছেড়া ছেড়া তুলোপেজা মেঘ
মৃত্যুর মতো সত্যের খুব নিকটবর্তী হয়-
পুরনো চলে যাওয়াগুলো মিথ নয় ইতিহাস লেখে।

জীবনের এই যে গাঢ়নীল কৃষ্ণচূড়া
সাদা স্পন্দন,
কাবাব পোড়া গন্ধের মতো লোভনীয় সময়-
উপুড় হয়ে এগুচ্ছো ব্রডগেজ রেলগাড়ি
ধোঁয়াশা ইস্টিশানে।

২৭/০৪/২০১৮.

উষ্ণায়নের কাল
- মোশ্ রাফি মুকুল

গ্রীবা উচু করে তুমি নিজ অস্তিত্বে টেনে নিচ্ছো জলীয়বাষ্প,
আর আমি দৌড়াতে দৌড়াতে ফুরিয়ে ফেলছি কার্বন,
যা কিছু নবায়নযোগ্য,পাতিলে ফুটিয়ে বিশুদ্ধ করে নিচ্ছি দম-
পুড়িয়ে ফেলছি শ্বাস!

জানালার পাশে সরীসৃপের একুরিয়াম
শোবার ঘরের টবে বেড়ে উঠছে অবিশ্বাসের গাছ।

তোমার সূর্যের চারিপাশে ঘুরে আসতে আমার পৃথিবীর কতদিন লাগবে?
বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলে কথা-
হিমাগারে হিমাগারে আগুনের ফেরিওয়ালা।

পর্যবেক্ষণ
- মোশ্ রাফি মুকুল

(এক)

পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেল-
লোকটি এখন আর মানুষ নেই! পোড়ামাটির শিল্প;
চারিদিকে মৃত নদীর গন্ধ।

যে দরাজ তানপুরা একদিন বলেছিলো ভালোবাসি,
গলায় সেঁধেছিলো আবদ্ধ সুর-
সে মানুষ এখন উনুনে স্বপ্ন পোড়ায়।

(দুই)

একবার আমার সাথে দেখা হয়েছিলো কোন এক বৈশাখী কোকিলের-
দুপুরের স্নানের মতো স্নিগ্ধ নরম কিশোরী,
জীবনযাপনের একগুচ্ছ শব্দহীন কাব্য শুনতে চেয়ে
আবহমান বালুচরে উড়াল দিল সে ধূসর কোকিল;
সেই থেকে বুকের কেন্দ্রে আমি হরেক রকম জোৎস্না পুষি।

২৬/০৪/২০১৮.

নির্জন রাত শুধু কবিতায়
- শাহিনা কাজল

ঘুম অাসে না সারারাত অামার
সঙ্গী কয়েকটি জোনাকি,
প্রজাপতি কিছু
কাছ ঘেসে থাকে কবিতা শুনবে
ভরা পূর্নিমা পেলে হারিয়ে যায় তাল, লয়, অার রূপতত্ত্ব
গড়াগড়ি খায় হাসিতে
খটখটে ক' টা শব্দ এনে বলে দাও ক' লাইন কবিতা,
বিড়াল ছানাটা নখ মারে জোনাকীর সনে
রাগে প্রজাপতি।
সুরভিত হাসনাহেনা ডাকে নির্জনতায়
বকুলের অাবেগ ঝরা অাহ্বানে ফিরে যাই
সেই চিরচেনা একাকিত্বে।
ধু ধু প্রান্তর, জোনাকীর অালোয় অামার পথচলা।
সামনে গন্ধহীন নির্মল রাত্রি।
বিবর্ণ একেকটা ক্ষণ
সঙ্গী রাত্রির নিকষ কালো সুষম প্রহর।
কবিতার জন্য কুড়ানো শব্দের ভান্ডার
খুলে যায় নিমেষে।

কবি পরিচিতি : কবি আব্দুল মান্নান মল্লিক ইং ১৯৬২ সনের ১১-ই সেপ্টেম্বর মুর্শিদাবাদ জেলায় জন্ম গ্রহণ করেন। বিভিন্ন সংসার সমস্যার সমাধানে, নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন সংসারের সাথে। সংসারের চাপে উচ্চবাচ্যকে তুচ্ছ করে বিভিন্ন কর্মস্থলে নিজেকে নিয়োগ করেন। কর্মরত এই ব্যস্ততম জীবনের অবসর সময়ে ২০১৪ সনের শেষের দিকে মানব সমাজ ও প্রকৃতির হাত ধরে লিখতে থাকেন গল্প ও কবিতা। কবি আব্দুল মান্নান মল্লিকের যৌথ প্রকাশিত বইগুলির মধ্যে – আনন্দ প্রকাশন থেকে আনন্দধারা কাব্য সংকলন ও গল্প সংকলন। বাংলাদেশ বাংলার কবিতা প্রকাশনী থেকে যৌথ প্রকাশিত কাব্য সংকলন “চেনাগলি চোরাবালি” ও গল্প সংকলন “অকাল সন্ধ্যার কথন”।

বাংলাদেশ আলোক বর্তিকা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত শতকের স্বপ্ন প্রাপ্তি কবিতার বই। এ ছাড়াও বিভিন্ন গল্প ও কবিতা নিয়ে ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে।

তোর পরশে কলুষিত
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

লাঞ্ছনা আর গঞ্জনা শুধু,
পেলাম কি মা তোর কাছে?
ভালোই ছিলাম সেদিন আমি,
ছোট্ট ঘরে পথের মাঝে।।

তোর উঠানে চলতে হয় ভয়!
দেখে-শুনে ডাইনে-বাঁয়ে।
জঞ্জাল ভরা উঠান পথে,
ছাঁদা বাধে পায়ে-পায়ে।।

জনসমুদ্র পথের ভিড়ে,
হৃদয় ধু-ধু কান্না ঘরে।
চলতে চলতে থমকে দাঁড়াই!
পাপ বিজনে পথের ধারে।।

জাদুর রাণী ছলনাময়ী,
বাঁধিস না আর মোহে।
তোর বুকেতে কলুষ আমি,
নোংরা মাখি দেহে।।

অবুঝ মনে ভুলের বসে,
উৎকণ্ঠায় তোরই বক্ষে।
কেমন করে ফিরবো ঘরে
সারা গায়ে নোংরা মেখে?

দু'টি মোমবাতি
- মোশ্ রাফি মুকুল

ধুসর আবছায়ায় দাঁড়িয়ে দু'টি মোমবাতি,
গহিন প্লাবন নামে চোখের কর্ণিয়ায়।
প্রস্তর পথে
বখতিয়ারের ঘোড়া কদম গুনে হাঁটে,
রক্তমজ্জার ভেতরে লোভী দাঁড়কাক খোঁজে কর্তা ও ক্রিয়ার নাকফুল!

আমাদের ভেতরকার যুবরাজ
যুদ্ধে যাবে
খোলা তলোয়ারে শান দিচ্ছে গ্রীষ্মের কোকিল;
সবুজ বরষায় আলাদীন রোবে ভালোবাসা গাছ।

তোমার আমার স্বাতন্ত্র্য গন্ধে জন্মনেবে যমজ পিউম ফুল-
রোদ গলে ঝরে পড়বে দখিনা আকাশ।

২৪/০৪/২০১৮.

না বলা কথা
- জুয়েল মিয়াজি

চ্যাপ্টাকৃতির  নাকের উপর ছোট ছোট দুটি নীল চোখ যে মেয়েটির, সে দেখতে অপরূপা না হলেও কুরূপা  নয়। সে সত্যবাদী, বিনয়ী, সুমিষ্টভাষী  আর তীব্র অভিমানী ।মাতাপিতাহীন মেয়েটি প্রতিনিয়তই চাচার পরিবারের সদস্যদের হাতে নিগৃহীত হতো!তবুও কোনদিন এই শোকে কান্নাতো দুরের কথা মন খারাপও করতো না সে।কিন্তু কিছু মেঘ বৃষ্টি হয়ে ভূপতিত না  হলে  অাকাশটা শ্রান্ত হবে না,অামি তাই নীলিমাকে  বলতাম  নীলিমা কাঁদ, দুঃখ করো।নীলিমা কথা অামলে নিত না,অদ্ভুত হাসির অাড়ালে সব লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করতো!এমনটা কেন হয় আমি বারংবার জানতে চেয়েছি, কিন্তু মুখ ফোটেনি তার।  সে জবাব না দিলেও  জানতাম  তার না বলা কথা!চাচার পরিবার প্রতিনিয়ত তার উপর পৈশাচিক অত্যাচার করতো ঠিকই, কিন্তু চাচার  অযাচিত স্নেহের কাছে পাত্তা পায়নি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের অত্যাচার, অবহেলা আর নির্মমতা।তাই সে স্বাভাবিক থাকতো মাঝেমাঝে অভিনয় করে হাসতো! কিন্তু  সেদিন প্রত্যূষে উল্টো দৃষ্য দেখতে পেলাম।দেখলাম যে মেয়েটি তাদের ঘরের পাশের শিউলী গাছের নিচে মন মরা হয়ে বসে ঝিমাচ্ছে।চাচাতো বোনের  উপর রাগ করে চাচা তাকে মেরেছে, কিল মেরেছে পিঠে। তাই উদ্যত অশ্রুকে আড়াল  করতে করতে মুখ বিকৃত করে সে কান্নার রব তুলল।আমি উদ্ধিগ্ন হয়ে জিঙ্গেস করলাম,পিঠে কি খুব কষ্ট হচ্ছে তোমার?নীলিমা মাথা নাড়িয়ে সায় দেয়। সত্যিই তার কষ্ট হচ্ছে তবে পিঠে নয়, অন্য কোথাও!

আজ আমি কাল তুমি
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

আজকে যেমনটা তুমি ঘুমিয়ে আছো
আগামীকাল আমিও ঘুমিয়ে থাকবো ,
আজকে যেমনটা আমি আছি প্রেসে
আগামীকাল তোমার সংবাদ থাকবে ৷

যেমনটা তুমি জেগে ওঠোনি আজকে
আগামীকাল তুমিও পাবেনা কাউকে ,
আজকে যেমনটা অসহায় এই আমি
আগামীকাল তেমনটাই থাকবে তুমি ৷

আজকে যেমন চলেছো পাশ কাটিয়ে
আগামীকাল তোমাকেও যাবে এড়িয়ে ,
আজকে যেমন আমি চলছি একাএকা
আগামীকাল তুমিও থাকবে একাএকা ৷

আজকে যেমন আমাকে ছিঁড়ে খাচ্ছে
আমার ভাইকে রক্তাক্ত ফেলে রেখেছে ,
আগামীকাল তোমার বোনটাকে খাবে
আর ভাইকে আবিষ্কার করবে ডোবাতে ৷

আমার সাথে অন্যায় তবু তুমি চুপচাপ
আগামীকাল তুমিও পাবেনা কোন মাফ ,
তাই সময় থাকতে প্রতিবাদী হয়ে ওঠো
আঁধার ভেদিয়া আলোক মশাল জ্বালো ৷

বাউল মন
- ইরাবতী মণ্ডল

ওরে অবুঝ মন ওরে বাউল মন, একতারা নাও হাতে
মনোনিকুঞ্জে সাঁইর খো়ঁজে ,নামই না হয় পথে।
যেমন করে উদাস বাউল, ফেরে আপন মনে
একতারাতে সুরের আগুন ,জ্বালায় গোপনে।
তেমনি করে ও মন বাউল, চল রে নিকুঞ্জ বন,
যেথা শ্যামল কিশোর রাধিকা সনে খেলে অনুক্ষণ।
পথের মানুষ হোক আপন তোর ,ভূমি হোক সুখ শয্যা,
সব না ত্যাগিলে কেমনে পাইবি ,সেই সে শ্যাম রাজা।
ওরে অবুঝ মন ,ওরে বাউল মন, নামো এবার পথে,
সকল বাঁধন পিছুটান সব, ছেড়ো নিজের হাতে ।
ওরে অবুঝ মন ,মন রে আমার ,নামো এবার পথে।
কাম ক্রোধ সব দূর করে মন সাঁইকে নাও গো সাথে।
তবেই পাবে পরম ধন,
যে ধন যাচি সারাক্ষণ,
সে যে আমার রাধারমণ,
ওরে মন পাগল মন ,আমার বাউল মন।

21.04.2018

নিষিদ্ধ জীবনের অভিধা
– ওদুদ মণ্ডল

অপয়া আগুনে পোড়ে মলিন জীবন
ঘৃণার তুলিতে আঁকা রমনী ললাট
অপবাদে বুঁজে যায় আলোর মলাট
অভাবী ছায়ায় কাঁপে মনের ভুবন ৷
সহনের বাঁধ ভাঙে ক্ষুধার আঘাত
খেই হারা নাও ভীড়ে আঁধারের বাটে
দর-দাম হাঁকে রোজ নিলামের হাটে
অযথা ফোটায় ফুল ঘাত-প্রতিঘাত ৷

হাজারও প্রশ্নবাণে মনে জাগে ভয়,
"এসেছে যে পৃথিবীতে পাপের এ মাঠে
যদিবা সঙ্গিনী হয় বাপেরও খাটে
জানবে সে কেমন করে নিজ পরিচয় !"
হতাশার মোহনায় বিষাদিত জল
কলুষিত মহাপথ গভীর অতল ৷

আত্মজা
- অনন্যা দেবরায়

দুমদাম করে ঘরের ভিতর ঢুকে,বাঁ হাতে ধরে থাকা গাদা খানেক নতুন কেনাকাটার প্যাকেট গুলি অযত্নে সোফার উপর ছত্রাকার করে ছুঁড়ে ফেলেই,হিরহির করে মেয়েকে টেনে নিজের সামনে দাঁড় করালো রাই।রাগে তখন তার মাথার শিরা গুলো দপদপ করছে,নাক থেকে নির্গত প্রশ্বাসটিও প্রয়োজনের তুলনায় একটু বেশীই উত্তপ্ত যেন।কোনো ভূমিকা ছাড়াই ঠাস করে এক চড় গিয়ে পড়ল পলার গালে....পলা..রাইয়ের বছর সাতেকের মেয়ে।মা'য়ের থেকে চড় খেয়েও পলা নিশ্চল।

কিন্তু রাইয়ের মাথার আগুন তখনো নেভে তো নি'ই,বরং মেয়ের এমন নিশ্চল নির্বিকার মূর্তি, সেই আগুনে আরও ঘি সংযোগ করে যেন।..."অসভ্য অভদ্র ইতর মেয়ে একটা... কিছুতেই বুঝবে না,যতই বারণ করিনা কেন...কে শোনে কার কথা।....দাঁড়াও আজ তোমার উপযুক্ত পানিশমেন্ট দেবো আমি,তুমি শুধু দেখো.."...রাগে হিসহিস করতে করতে কথা গুলো বলে ওঠে রাই,মেয়েকে বকুনির সাথে সাথে সঙ্গত হিসাবে গোলাপি রিবনে বাঁধা পলার দুটি পনিটেলের একটা ধরে বেশ কয়েক বার ঝাঁকুনি ও দিয়ে দিয়েছে রাই।বোধহয় ঝাঁকুনিটা খানিক জোরেই হয়ে গেছে,কারণ পলার টুকটুকে কপালের একপাশের রগের উপর নীল শিরাগুলো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ততক্ষণে।নাকের পাটা গুলো গোলাপি হয়ে উঠেছে পলার,বড়বড় ফালা ফালা চোখ থেকে অঝোরে ঝরে পড়ছে মুক্তর ন্যায় অশ্রু।ঘাড় গোঁজ করে একদৃষ্টে নিজের ছোট্ট ছোট্ট পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে সে...ডানহাতে তখনো ধরা সেই ভলিনি স্প্রে'র ক্যানটা।

ওটার দিকে চোখ পড়তেই আর একবার মাথাটা জ্বলে গেল রাইয়ের।ছি ছিঃ...তার মেয়ে কিনা শেষমেশ একটা চোর তৈরি হল...যাকে বলে ছিঁচকে চোর,না হলে কেউ অন্যর বাড়ি গিয়ে ভলিনি স্প্রে চুরি করে!!!!!...আর এটা শুধু আজকের ব্যাপার না...পলা প্রায়ই করে এই রকম।প্রায়ই..প্রায়শই পলা প্রতিবেশীদের বাড়ি থেকে হয় কফিমগ,না হয় কাঁচের প্লেট,কুশন এমনকি একদিন টমাটো শশের বোতল পর্যন্ত চুরি করে নিজের বাড়ি এনেছে।পরে পলার ওই চুরি করে আনা জিনিশ গুলি ফিরিয়ে দিতে গিয়ে প্রতি বার রাইকে চূড়ান্ত অপদস্থ হতে হয়েছে।কোনো কোনো প্রতিবেশী গম্ভীর মুখ করে নিজ বস্তু ফিরিয়ে নিয়েছে,কোনো কোনো জন আবার মুখে মেকি হাসি আর চোখে ঘৃণা নিয়ে বলেছে.. "থাক ওটা আর ফিরত নিয়ে কি করবো?..নিয়ে যখন একবার গেছেই তখন থাকই না হয় ওটা ওর কাছে";....মরমে মরে যেতে ইচ্ছা করে রাইয়ের সেই সময়।এই তো গতবার,যখন পলা মিসেস ঘোষালের বাড়ি থেকে একটা যথেষ্টই সস্তা দামের শো পিস উঠিয়ে এনেছিল,সেইবার ওটা ফিরিয়ে দেবার সময় কি অপমানটাই না হয়েছিল রাই। দিনভর সিরিয়াল দেখা আর সারা এপার্টমেন্টের মানুষের নামে নিন্দে করে বেড়ানো ওই মহিলা দেঁতো হাসি হেসে বলেছলেন..."হেঁ হেঁ..আসলে সবই হল ওই শিক্ষা দিক্ষার ব্যাপার বুঝলে না...যেমন বাবা মা শেখাবে বাচ্ছা তো ঠিক তেমনটাই তো শিখবে না কি রে বাবা"...রাইয়ের সেদিন মনে হয়েছিল সে ঠিক এই দিনটা দেখার জন্যই কি অমন ক্রিটিকাল প্রেগন্যান্সির সব কষ্টটা মুখ বুঁজে সহ্য করেছিলো,এই দিনটা দেখার জন্যই কি ও এতোদিন এত লড়াই করছে?...আজ কাল তো কোনো ফ্ল্যাটের বাচ্ছারাই পলাকে খেলতে ডাকে না।বেশ কিছু বাচ্ছাদের বার্থডে পার্টিতেও নিমন্ত্রণ পায় নি পলা।এমন কি কোনো প্রতিবেশীর ফ্ল্যাটে রাই মেয়েকে নিয়ে গেলে,রাই খেয়াল করে দেখেছে প্রতিবেশীরা তার সাথে কথা বললেও আড়চোখে নজর রাখে পলার উপর, পাছে পলা কিছু চুরি করে নেয়!!গুণধর মেয়ের দয়ায় আজকাল অন্য কারো ফ্ল্যাটে দু'টো গল্প করতে যেতেও কি ভীষণ লজ্জা করে রাইয়ের।

আজ সকাল থেকেই রাইয়ের মন মেজাজ খুবই খারাপ ছিলো,তনয়ের সাথে আবারো কাল রাতে চূড়ান্ত অশান্তি হয়েছিল,যদিও এই অশান্তিটা তো প্রায় নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের সংসারে।আজকাল আর বিশেষ কষ্ট দেয় না এইসব রাইকে। তবুও সারাদিন ঘরের বন্ধ হাওয়া আর বুক চাপা বেদনার মেলবন্ধনে বিধ্বস্ত রাই একটু মুক্ত বাতাসের উদ্দেশ্যেই বিকালের দিকে একটু বাইরে গেছিলো,মেয়েদের একাকীত্ব আর মনখারাপ কাটানোর বড় অস্ত্র হল শপিং। চৈত্র সেলও চলছে,তাই ভেবেছিল ,আনি কিছু কেনাকাটা করে।পলাকে সাথে নিয়েই যাচ্ছিলো রাই..কিন্তু বাধ সাধলেন প্রফেসর রায়।রাইদের নীচের ফ্লোরের বাসিন্দা, স্ত্রী গত হওয়ার পর থেকে একাই কাটাচ্ছেন রিটায়ার্ড লাইফ।উনি বলেছিলেন -"ওকে নিয়ে এই গরমে আর দোকানে দোকানে ঘুরতে হবে না,আমার কাছে নিশ্চিন্তে রেখে যাও.."...কিন্তু ,পলাকে রেখে যাওয়া'টাই তো নিশ্চিন্তে হয় না রাইয়ের।সর্বদা মন খচখচ করে কি জানি আবার না কিছু করে বসে পলা!!!তাও দোনামোনা করে রায় মশাইয়ের কাছে পলাকে গচ্ছিত রেখেই গেছিল রাই বিকালে,যাবার আগে পই পই করে পলাকে বলে গেছিলো -"দেখো সোনা দাদুর ঘর থেকে কিচ্ছুটি নেবেনা কিন্তু, লক্ষ্মী হয়ে থাকবে...আমি তোমার জন্য একটা পিংক ফ্রক আনব.. কেমন বেবি?"...মিষ্টি হেসে মায়ের কথায় ঘাড় হেলিয়েছিল পলা।

ফিরতে ফিরতে একটু দেরিই হয়ে গেছিল রাইয়ের,বাব্বাঃ যা ভিড় দোকান গুলোতে,ভাগ্যিস আনেনি পলাকে,না হলে এই গরমে খুব কষ্ট হত বেচারির।রায় মশায়ের কাছ থেকে পলা কে নিয়ে লিফটে ওঠার পরেই রাই খেয়াল করে পলা কি যেন লুকাচ্ছে ওর সাদা ফ্রকটার আড়ালে।একটু জোর করতেই পলা, রাইয়ের সামনে উন্মুক্ত করে ওর ছোট্ট ফর্সা হাতটি,যেটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে একটা,ভলিনি স্প্রে ক্যান!!!!...তার পর থেকেই রাইয়ের মাথায় আগ্নেয়গিরির উত্তাপ।পলাকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে গিয়ে আছরে ফেলে বেডরুমের বিছানার উপর..." থাক এখানে,আজ পুরো রাত একা একা,অন্ধকারে।"...দরজা টা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয় রাই।রাগটা কখন যেন বেদনায় পরিণত হয়ে যায় রাইয়ের।খুব অসহায় লাগতে থাকে নিজেকে।জীবনটা তার কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেলো মাত্র কটা বছরে।কি চেয়েছিল জীবনের কাছে আর কি পেল সে??...

রাই নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছিল তনয় কে।আর ওটাই ছিল রাইয়ের জীবনের সব থেকে বড় ভুল।তনয় রাইয়ের থেকে বয়সে বছর তিনেকের ছোটো ছিল,দুই জনেই একই হসপিটালে চাকরি করত।ডাক্তারি পাশ করে তনয় চাকরি নিয়ে আসে ওই হসপিটালটাতেই যেখানে আগে থাকতেই রাই নার্স হিসাবে চাকরিরত ছিলো।স্বপ্নের মত চলেছিল দুই কপোত কপতীর বছর দুইয়ের প্রেম পর্ব।তারপর রাইয়ের মামা রাইয়ের বিয়ের চিন্তা শুরু করতেই দুইজনেই নিজ নিজ বাড়িকে লুকিয়েই সেরে ফেলেছিল বিয়ে টা।প্রেমের আবেগে তনয় একটু কম বয়সেই করে ফেলেছিল বিয়েটা।আর রাইও জীবনের চূড়ান্ত পদক্ষেপটা নিয়ে ফেলেছিল তাড়াহুড়োতেই।

বিয়ের পর প্রথম যেদিন তনয়ের মা'য়ের মুখোমুখি হয়েছিল রাই,সেদিনই বুঝেছিল,খুবই শক্ত মাটি এটা,সহজে আপন হওয়ার না।রাই চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি।কিন্তু কিছুতেই মন পেতে পারেনি শাশুড়ির।-"ধিঙি মেয়ে একটা, ;আমার ছেলেমানুষ ছেলেটার মাথা চিবিয়ে খেয়েছে,না হলে কেউ ওমন বুড়ি মা*কে বিয়ে করে?"...এই কথাটা তনয়ের মা, হেন কোনো আত্মীয় বা পাড়া প্রতিবেশী নেই যাকে বলেন নি!!এমনকি রাইয়ের সামনেও বলতেন নির্বিকার ভাবে।রাইয়ের খারাপ লাগার কোনো দায় যে ওনার নেই তা উনি ওনার আচরণে স্পষ্ট করে দিতেন।শেষমেশ রাই শাশুড়ির মনোরঞ্জনের চেষ্টা বন্ধ রেখে কাজে মন দেয়।কিন্তু তাতেও শান্তি পেল না বেচারি। কারণ রাইয়ের শিফটিং ডিউটি শাশুড়ির চক্ষুশূল।বউয়ের এনে দেওয়া বালুচরি,জামদানি,তসর, গরদ গুলো একমুখ অবজ্ঞা ফুটিয়ে আলমারি বন্দী করতে তারপর সেগুলি অঙ্গ-এ চড়িয়ে কখনো মাসিশাশুড়ি তো কখনো খুড়শাশুড়ির বাড়ি যেতে কোনো আপত্তি না থাকলেও, রোজ রোজ রান্না-বান্না, ঘরের কাজ না করে বউয়ের ডিউটি যাওয়ার মারাত্মক আপত্তি ছিল তনয়ের মায়ের।তার পর রাই যখন কনসিভ করে তখন শুরু হয় নতুন অশান্তি। রাইয়ের প্রেগনেন্সি ছিল ক্রিটিকাল।ব্লিডিং আর এবডমিন পেন ছিল নিত্যসঙ্গী। কমপ্লিট বেড রেস্ট ছিল ম্যাক্সিমাম প্রেগনেন্সি প্রিরিয়ডটায়।আর তাতেই শুরু হয় শাশুড়ির নতুন খোঁটা..-"বুড়ো বয়সে পেট করলে তো এমনটাই হবে,তাতে এত আদিখ্যেতার কি আছে?"...
তার পর পলা জন্মায়,শুরু হয় শাশুড়ির বুক চাপড়ানো কান্না।"কি অলুক্ষুণে বউ, একটা ছেলেও বিয়োতে পারলো না...."..সব কিছুকে মানিয়ে ও এগিয়ে চলেছিল রাই।তার যে আর উপায়ও ছিলো না।ছোটো থেকে মামাদের সংসারে মানুষ যে সে।পিতৃ স্নেহ বঞ্চিত তার জগত জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই।মা নিজেই মামাদের সংসারে অবাঞ্ছিত, নেহাত উইডো পেনসন টুকু আছে তাই মাথা গোঁজার স্থানটা এখনো আছে।তাই রাই নিজের বিয়ের পর শত কঠোর পরিস্থিতিতেও মা'য়ের কাছে ফিরে যাওয়ার চিন্তা টা কিছুতেই করতে পারেনি।আর সব থেকে আশ্চর্যর বিষয়টি ছিল, রাইয়ের সব রকম কঠিন দিন গুলিতে রাইয়ের পাশে আশ্চর্যজনক ভাবে অনুপস্থিত ছিল তনয়!!..বিয়ের কিছু মাস পর থেকেই সে,রাই আর নিজের মাঝে এক অদৃশ্য দেওয়াল খাড়া করে ফেলেছিল..কিন্তু কেন??সেই উত্তর জানত না রাই।জানার চেষ্টা যে করেনি তা নয়,কিন্তু সদুত্তর পায়নি কোনোদিনই তনয়ের কাছ থেকে।হয়ত আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্ততে বেশ পস্তাচ্ছিল তনয়।

যদিওবা সব চলছিল, কিন্তু রাইয়ের জীবনকে আরও নাজেহাল করে তুলল রাইয়ের বাড়ি, তার মাসি শাশুড়ির উপস্থিতি। মাসশ্বশুর মারা যাওয়ার পর রাইদের বালিগঞ্জের বাড়িতেই পাকাপাকি ভাবে থাকতে আসেন নিঃসন্তান মাসি শাশুড়ি।রাইয়ের উপর শুরু হয় দুই শাশুড়ির অহরহ শাসন কারণে অকারণে। শেষের দিকটা আর পারছিল না রাই।ঘরের কাজ,হসপিটালের ডিউটি,পলার দেখভাল সব একাহাতে সামলে উঠতে সে নাজেহাল হয়ে পড়ছিল নিত্যদিন।তার উপর শাশুড়ি দ্বয়ের যুগ্ম উৎপীড়ন তো আছেই। তাই বিনা নোটিশেই যখন তনয় নিজের আসানসোলে বদলির কথা জানায়, তখন আর দুইবার ভাবেনি রাই।একটুও ইতস্তত বোধ করেনি সে নিজের চাকরিটা ছাড়তে।আসলে বালিগঞ্জের বাড়িটা থেকে দূরে যাওয়া খুব খুব দরকার হয়ে পরেছিল রাইয়ের সেই সময়।
আসানসোলে এসে রাই, পলা আর তনয়কে নিয়ে গোছাতে চেয়েছিল নিজের সংসার।কিন্তু হায়রে পোড়া কপাল!!!...যে গাছের শিকড়ই দুর্বল সে গাছে কি আর ফল ধরে??..আসলে তনয় কোনোদিনই চায়নি যে রাই তার সাথে আসুক আসানসোলে।সে একা একা নিজের মত থাকবে বলেই হয়ত ট্রান্সফারটা নিয়েছিল। বউ মেয়ে এগুলি চিরকালই তনয়ের জীবনে ব্রাত্য ছিল।তাই রাই, তনয়ের সাথে আসানসোল চলে আসায়, তনয় মুখে কিছু না বললেও রাইয়ের উপর যারপরনাই বিরক্ত হয়েছিল।তার পর থেকেই বাড়ির সাথে প্রায় সম্পর্ক ছেদ করে দিবারাত্র বাইরে কাটাতে শুরু করে তনয়।আর শুরু হয় প্রায়ই মাঝ রাতে মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরে রাইকে অকথ্য গালিগালাজ,মারধর, অশান্তি।রাই শুনেছে তনয়েরই হসপিটালের গাইনো ডাক্তার সরমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়েছে তনয়।গত সপ্তাহতেও তনয়ের শার্টে লিপস্টিকের দাগ নিজে হাতে ধুয়েছে রাই।এখন আর এই সব কষ্ট দেয় না রাইকে।তনয়ের সাথে আর নিজেদের মুমূর্ষু সম্পর্ক নিয়ে আর কথাও বলে না রাই।বলে লাভ নেই,সে বুঝে গেছে। রাই হয়ত পারত তনয় কে ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে।কিন্তু বাস্তব টাতো ঠিক গল্পের মত সহজ না,একা নিজের সংসার গড়া নিজের মেয়েকে মানুষ করা -এইগুলি করতে যতটা সাহস লাগে তা রাইয়ের মত অনেক মেয়েরই থাকে না।তারা মনে করে সুখের থেকে স্বস্তি ভালো।তাই রাইও মেয়ের মুখ চেয়ে বাঁচতে চেয়েছিল।নিজের সব কষ্ট ভুলে। কিন্তু সেই পথটাও যেন ভগবান রাখেননি রাইয়ের জন্য।
রাইয়ের জীবনে সব কিছুতেই যেন বাঁধা,ছোটো থেকে আজ পর্যন্ত কোনো কিছুই যেন পেল না সে জীবনে,না পিতৃ স্নেহ,না স্বামী সোহাগ আর না মাতৃ গর্ব।জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে রাই ব্যার্থ।সব দিক থেকেই সে হেরে গেছে।শেষ সম্বল মেয়েটাও চোর তৈরী হল!!.কিছুতেই ওর স্বভাব বদলাচ্ছে না।ডাক্তার পর্যন্ত দেখিয়েছে রাই,পলাকে।কিন্তু যে কে সেই।ওর জন্য খালি খালি অপমান হতে হয় রাইকে।জন্ম থেকে জ্বালাছে মেয়েটা রাইকে।আগামীকাল রায়মশায়কে ভলিনিটা ফেরত দিতে গিয়ে আবার অপমান হতে হবে তাকে।

"নাঃ আর না।আর কিছুতেই না...আর লড়তে পাড়ছি না আমি।হেরে গেছি আমি।এইবার একটু শান্তি চাই।জীবনটাই বিষিয়ে গেছে আমার।মরতে চাই আমি,মরতে চাই...আজই এখনই শেষ করে দেব নিজেকে।সবার শান্তি হবে।"..নিজেকে শেষ করার উদ্দেশ্য নিয়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়েও হাঁটুর ব্যাথায় কঁকিয়ে ওঠে রাই।কাল রাত্রে মদ্যপ তনয় ঠেলে ফেলে দিয়েছিল রাইকে।তখনই হাঁটুটা সজোরে ঠুকে গেছিল মেঝেতে।.."উফঃ..কি ব্যাথা,একটু ভলিনি লাগালে হত"..মনে মনে বলেই,মরণ কালে নিজের বিলাসিতা দেখে নিজেই অল্প হেসে ফেলে।কিন্তু আচমকাই এক সন্দেহ এসে হাজির হয় রাইয়ের মনে...পলা আজ রায়মশায়ের বাড়ি থেকে ভলিনি কেন আনল ?..."কাল রাত্রে যখন আমার সাথে তনয়ের অশান্তি হয়েছিল তখন তো পলা ঘুমিয়েছিল,ইনফ্যাক্ট রোজই তো ও তনয় ফেরার অনেক আগেই ঘুমিয়ে যায় পলা...তবে ও কেন আনল ভলিনিটা?তবে তবে কি ও কিছু জানে?.."
মোহাবিষ্টর মত রাই হাজির হয় পলার কাছে।অন্ধকার ঘরে বিছানার উপর গুটিসুটি মেরে বসেছিল পলা,হাতে তখনো ধরা ভলিনির ক্যানটা।মাকে দেখে মুহূর্তেই ভয়ে ফ্যাকাসে সে।
-"তুমি রায় দাদুর বাড়ি থেকে ভলিনিটা কেন এনেছ?"
নিরুত্তর পলা।
-"বলো আমায়,আমি বকব না,বলো"...
-"কাল তোমার তো পায়ে খুব লেগেছিল,তুমি অনেক খুঁজেও একটাও মলম পাওনি তো, তাই..."
-"তুমি আমার জন্য এনেছ?"...
-."হুম"...মাথা নীচু করে মা'য়ের কথায় সম্মতি জনায় পলা।
-"আর বাকি জিনিস গুলোও তুমি আমার জন্যই এনেছ?"..রাইয়ের স্বরে তখনো বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচল।
-"পাপা যেদিন তোমায় খুব জোরে ঠেলে দিয়েছিল, তুমি টেবিলের উপর পড়ে গেলে আর সসের বোতলটা তোমার হাত লেগে পড়ে গেল ,তারপর দিন আমি পাপাই দাদাদের বাড়ি থেকে সসের বোতল এনেছিলাম।আর পাপার উপর রাগ করে তুমি যেদিন কাঁচের পরীটা ভেঙে ফেললে ওর পরদিন আমি ঘোষাল আন্টির বাড়ি থেকে ওই পুতুলের মুর্তিটা আনি।আর যে দিন পাপা যেদিন রান্না খারাপ হয়েছে বলে তোমায় মারল।আর তোমার হাত থেকে প্লেটটা পরে গেল সেইবার আমি..."
-"কিন্তু কেন পলা?"..অবরুদ্ধ কান্নায় রাইয়ের স্বর তখন বন্ধ প্রায়।
-"তুমি ওই গুলো ভেঙে ফেলেছো বলে পাপা যদি তোমায় আবার মারে...তোমার তো খুব লাগবে মাম্মা। তাই আমি ওই গুলো এনে রাখি যাতে পাপা বুঝতে না পারে।"..
-"কিন্তু ওই গুলো আনো বলে আমিও তো তোমায় বকি পলা,মারিও"
-"তুমি তো আমায় আস্তে আস্তে মারো মাম্মা,আমার লাগেই না।..কিন্তু পাপা তো তোমায় খুব জোরে জোরে মারে,তোমার কত্তো লাগে,কেটে যায়,কালো দাগ হয়ে যায়..তখন আমার খুব কষ্ট হয় মাম্মা।"একটু দম।নিয়ে পলা আবার বলতে থাকে..
-" মাম্মা আমার খুব ইচ্ছে করে পাপাকে খুব বকি,কেন মারে তোমায় খালি খালি।খুব খুব রাগ হয় আমার পাপার উপর। আমি বড় হলে পাপাকে মারবো, তোমায় নিয়ে আমি চলে যাব দুরদেশে, যেখানে কেউ তোমায় মারবে না মাম্মা"...
ছোট্ট পলা যে কবে এত বড় হয়ে গেছে রাই তো বুঝতেও পারেনি।পলা যে তার মাম্মা কে এতো ভালোবাসে এটাও রাই বুঝতে পারেনি।ওই ছোট্ট প্রাণটা নিজে মার খাবে জেনেও দিনের পর দিন অন্যর বাড়ি থেকে জিনিস চুরি করে এনেছে যাতে রাইকে আর মার না খেতে হয়।আর সে কি না ওই মেয়েকে ছেড়ে মরতে যাচ্ছিল!!!...নিজেকে নিজেই ধিক্কার দিয়ে ওঠে রাই। কে বলেছে রাই হেরে গেছে জীবনে,তার কাছে এমন অমূল্য রতন থাকতে সে হারতে পারে না কিছুতেই।
না আর নয়,আর এক দিনও রাই,পলাকে নিয়ে এখানে থাকবে না।ছোট্ট পলা যদি ভাবতে পারে মাকে নিয়ে দূরদেশে যাওয়ার কথা তবে রাই কেন যেতে পারবে না!!!সময় এসেছে রাইয়ের নিজের মত করে বাঁঁচবার,পলাকে মানুষ করার।এই পরিবেশে থাকলে পলা কিছুতেই নিজের অমন সুন্দর মনটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে না।অনেক হয়েছে সংসারের নামে অত্যাচারিত হওয়া,এবার রাইকে একাই পথ চলতে হবে,আর তার পাথেয় হিসাবে আছেই তো তার আত্মজা, রাইয়ের, ছোট্ট পলা.....

-সমাপ্ত-

পাঠ প্রতিক্রিয়া : কথারূপেণ সংস্থিতা

সজ্জিত গরল : আমাদের আশেপাশের ঘটে চলা ঘৃণ্য ঘটনাগুলো শুধু আমাদের নীরব দর্শক করে যায়। আমাদের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক একজন অহনা, যে নিজের বুদ্ধি প্রখরতার মশাল জ্বালিয়ে অবসান ঘটায় এক একটি দীর্ঘ যন্ত্রণার রাত্রির। সেরকমই এক রহস্যের সমাধানে ঝাঁপিয়ে পড়ে অহনা। কি সেই রহস্য? সেটা জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে এই গল্পটি। শেষের চমকটি চমকপ্রদ এবং ভয়াবহ, অপরাধের গতানুগতিক ধারণা যে বদলে যাবে এটুকু বলতে পারি।

এক যে ছিল ব্রক্ষ্মদৈত্য : আমরা সবাই কমবেশি ছোটবেলায় নিজেদের ঠাকুমা/দিদার কাছে ব্রক্ষ্মদৈত্যের গল্প শুনতে অভ্যস্ত। হাঁউঁ মাঁউঁ খাঁউঁ হয়ত অনেক বিনিদ্র ভয়াবহ রজনীর সাক্ষী রাখে। কিন্তু এই গল্পটি পড়তে পড়তে একাধারে যেমন টাইম মেশিনে চড়ে ছোটবেলায় ফিরে গেলাম তেমনি দমফাটা হাসিতে ব্রক্ষ্মদৈত্যকে বড় কাছের কেউ মনে হল।লেখিকার অসামান্য কৃতিত্ব হাস্যরস উদ্রেকে।

রহস্যের অপর প্রান্তে : গল্পটি প্রকৃত পক্ষে ভৌতিক।কিন্তু সমান্তরাল ভাবে একটি রহস্যও গল্পটিতে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপস্থিত থাকছে।রহস‍্যে গল্পে কোনো কিছু বলে দিতে নেই।আমরাই রহস‍্য উন্মোচন করব,কারণ আমরাই পাঠক।কি সেই রহস্য..তা জানার জন্য অবশ্যই পড়তে হবে গল্পটি।

অকৃতজ্ঞ : গল্পটি প্রকৃতপক্ষেই এক অকৃতজ্ঞ মানুষের কাহিনী,যিনি সাফল্যের সিঁড়ি উঠতে গিয়ে নিজের শিকড়কেই ভুলে গেছেন।তবে তিনি ও উচিত শিক্ষা পেয়েছেন..কি করে..?..তা জানতে হলে এই গল্পটিও পড়া দরকার।

অনন্ত সুখ : লেখাটি বৈশালী দাশগুপ্ত নন্দীর। লেখিকার এই গল্পটি পড়তে পড়তে পাঠক জাগতিক বিবাদ মোহ মায়া ছেড়ে সেই সব পেয়েছির দেশে পৌঁছে যায়, যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব নয়। অনুপম ও সুদীপার মায়া, থুড়ি ব্যাগও খোয়া যায় কোনো ম্যাজিকবলে।

ত্বমসি মম : লেখিকার এই গল্পের নামকরণ জয়দেবের 'গীতগোবিন্দম্' কাব্যের 'ত্বমসি মম জীবনম্ ত্বমসি মম ভূষণম্ ত্বমসি মম ভবজলধিরত্নম্' শ্লোক থেকে গৃহীত। শ্রীকৃষ্ণ রাধিকার প্রেম যে যেকোনো রূপে যেকোনো সময়ে আজও সমভাবে সত্য, তা এ গল্প আরো একবার প্রমাণ করে।

অদ্ভুত উদ্ভিদ : এটি কল্পবিজ্ঞানের গল্প। একটা গাছ, যার এমন সব আশ্চর্যরকম বৈশিষ্ট্য যা বোধ হয় যে কোনো মানুষেরই কল্পনার বাইরে। ভাবতে বাধ্য করবে সত্যি এমন যদি হয়। গল্পটি শেষ পর্যন্ত পড়ার পর মনে হবে শেষ হয়েও হইল না শেষ। আর এই গল্পের যদি পরের পর্ব হয়। তবে তা পড়ার আগ্রহ অবশ্যই জাগবে। কেন এই গল্পের পরের পর্ব জানতে ইচ্ছা করবে এমন কি কি বৈশিষ্ট্য আছে ওই গাছের? জানতে হলে পড়ে ফেলতেই হবে গল্পটি।

রূপালী পর্দার আড়ালে : একটি এমন রহস্য গল্প যার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে রঙিন জগতের পিছনে লুকিয়ে থাকা এক চরম স্বার্থপরতার ইতিহাস তার সংগে রয়েছে প্রতিশোধ স্পৃহার গল্প। কি সেই রঙিন জগতের লুকিয়ে থাকা কাহিনী,কি সেই প্রতিশোধের কারন এই সব জানার জন্য পড়তে হবে গল্পটি।

মুখোশ মানুষ : আপাদমস্তক রহস্যের চাদরে মোরা এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর কাহিনী, যা শেষ পর্যন্ত পাঠককে টানটান উত্তেজনায় বেঁধে রাখবে।গল্পটি পড়তে পড়তে মানুষের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা বেশ কিছু জটিল মানসিকতার প্রকাশ পাওয়া যাবে।

পুরাতন হোক মলিন : একটি প্রেমের চাদরে মোরা বাস্তবিক কাহিনী। যা অনেকের জীবনেই ঘটতে পারে। কাহিনীটি মানুষের মনের মধ্যে প্রথম প্রেমের শিহরণ এর সাথে সাথে বিয়োগান্তের দুঃখ ও উপলব্ধি করাবে।

একটি নক্ষত্রের গল্প : বর্তমান আর অতীতের মধ্যে শব্দ দিয়ে সেতু তৈরি করেছে। আধুনিক একটি মেয়ে নিজের হৃদয় দিয়ে ,বোধ দিয়ে অতীতের এক মেধাবী রমণীর সঙ্গে স্থাপন করেছে সহজ সম্পর্কের ভিত। গল্প এগিয়ে গেছে সাবলীল ভাষার সোপান ছুঁয়ে।

গল্পের গল্প : আপনাদের নিয়ে যাবে বেনারসের অলি গলি দিয়ে এক অলৌকিক ঘটনার কাছাকাছি । একটি একলা ছেলের হঠাৎ বেরিয়ে পড়া,হারিয়ে যাওয়া মায়ের স্মৃতি,দশাশ্বমেধ ঘাট,বিশ্বেশ্বরের আরতি,কথার টানে হারিয়ে যাওয়ার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা এই গল্পের বিষয়।

আমার পরাণ যাহা চায় : এটি একটি ব্যতিক্রমী প্রেমের গল্প। সমাজের বুকে এক লাঞ্ছিতা নারীর প্রেমের গল্পটি পড়ে সত্যিই মনে প্রেমের শিহরণ জাগতে বাধ্য। তেমনি শেষ অংশটি পড়ার পর পাঠকের চোখে জল আসবেই। এক গভীর মননের সঙ্গে ভাবনার অনুভূতি জাগাবে। যা বাস্তব জীবনেও ভাবাবে।
সাপের দংশন: গল্পটিও অসাধারণ। মূলত সেটি রহস্য গল্প টান টান উত্তেজনার মধ্যে গোগ্রাসে রহস্য গল্পটি শেষ করে ফেলতে হয় এমনই লেখনীর বুনন। লেখিকার ফ্ল্যাশ ব্যাকে গল্প বর্ণনার নিপুণতা খুবই অনবদ্য এবং পরিণত চিন্তাশীল মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।

পরকীয়া প্রেমে : এটি একটি প্রেমের গল্প থেকে ঢেউ তোলার শুরু করে মোহনায় এসে পরিণতি পেয়েছে সামাজিকে।দাম্পত‍্যের মধ‍্যবর্তী বিশ্বাস-অবিশ্বাস, স্বনির্ভরতা-নির্ভরতাকে ভীত রেখে বাস্তবকে এঁকেছে সুনিপুণভাবে।গল্পের পরিশেষে একটা শান্ত তৃপ্তি পাঠকদের ছুঁয়ে যাবে।গল্পের শেষের ট‍্যুয়িস্টটার জন্য গল্পটার পরিধি বিস্তারিত হয়েছে।

প্রাপ্তির হিসেবনিকেশ : গল্পটা কল্পবিজ্ঞানের ভীতে রচিত হলেও পাঠকরা খুব সহজেই একটা জীবনমুখী বার্তা পেয়ে যাবে শেষাংশে।এমন সুন্দর সামাজিক প্রেক্ষাপটে কল্পবিজ্ঞানের গল্প পাঠক সমাজ হয়ত খুব কমই পেয়েছেন। গল্পটি একটি ব্রিলিয়ান্ট ছেলের সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠা জীবনের। তবে কি ছিল তার প্রাপ্তি?? আর কিসের হিসাবনিকেশ তা জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে গল্পটি। শুধু এটুকু বলতে পারি প্রথম থেকে শেষ একটানে পড়ে ফেলতে বাধ্য করেছে এই গল্পটি। আর ভাবতে থাকবেন কিছু কিছু প্রাপ্তি না ঘটাই ভালো।কাহিনীটি একত্রে কল্পবিজ্ঞান, রহস‍্য, সামাজিকের সুস্পষ্ট ছাপ বহন করছে।

সম্পাদিকা প্রেরণা গোস্বামী আর প্রকাশক অঙ্কন মিত্রকে অনেক ধন্যবাদ এমন সুন্দর প্রয়াসের সুচারুরূপের জন্য।পাতার কোয়ালিটি,গল্পের সঙ্গে প্রয়োজনীয় চিত্রণ,প্রত‍্যেকের লেখিকা পরিচিতি এর মান বৃদ্ধি করেছে এতে সন্দেহের অবকাশ নেই।বইটি
Boichoi.com এবং bookiecart.com এ পাওয়া যাচ্ছে।আজকেই সংগ্ৰহ করুন বিশেষ ছাড়ে।
নীচের লিঙ্কে ক্লিক করে অর্ডার করুন।

[button color="red" size="medium" link="https://bookiecart.com/product/kawtharupena-samasthita/" icon="" target="true"]Buy Now ( bookiecart.com ) [/button] [button color="green" size="medium" link="https://www.boichoi.com/index.php?route=product%2Fproduct&product_id=17933" icon="" target="true"]Buy Now ( boichoi.com )[/button]

জেগে ওঠো
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

এই যে বিবেক তুমি আর কতো ঘুমাবে ?
এবার অন্তত ঘুমভেঙ্গে তুমি জেগে ওঠো
চারিদিকে দেখো ধর্ষণের মহোৎসব চলছে
আর তুমি কিনা এখনো ঘুমিয়েই আছো ?

বিবেক তোমাকে বলছি তুমি কি শুনছো ?
এই যে এই এইদিকে একটু তাকিয়ে দেখো ,
আমার কি বেহাল অবস্থা হয়েছে দেখেছো ?
আমার জন্য আজকে অন্তত জেগে ওঠো ৷

তোমার ঐ ঘুমের সুযোগটাই নিয়েছে ওরা
ওরা আজ আমার শরীরটা ছিঁড়ে খেয়েছে ,
আমার সব স্বপ্নগুলোকে করেছে ছন্নছাড়া
আর বিবেক আজও তুমি আছো ঘুমিয়ে ?

এই যে দাদাভাই বাতাসে একটু কান পাতো ,
ধর্ষিতার চিৎকার তুমি কি শুনতে পাচ্ছো না?
শুনবে কি করে ? এটাতো তোমার বোন না
তাইতো এ কণ্ঠ তোমার কানের রন্ধ্রে যায়না ৷

আচ্ছা আমিতো তোমার বোন হতে পারতাম
তখনও কি তুমি কি এভাবেই জেগে ঘুমোতে ?
পারতে এমনটা নিরব নিশ্চল বসে থাকতে ?
আমি জানি , আমি জানি তুমিতা পাড়তে না ৷

বিবেকটাকে আর কতোদিন দমিয়ে রাখবে
আজ আমি ,কাল তোমার খবর প্রেসে যাবে,
আজকে যদি তুমি ঘুম ভেঙে জেগে না ওঠো
আগামীকাল তোমার জন্য কে জাগবে বলো ?

"কাল বৈশা‌খী ঝড়"
***রহমান মাসুদ*

বজ্র ঝলক মুকুট মাথায়
ঘূর্ণী বায়ুর প্রলয় নৃত্য,
কান ফাটা‌নো সুর চয়‌নে
ধ্বংস যজ্ঞ‌ে বেজায় মত্ত।

হিমকা‌লো দে‌হের ভাঁ‌জে
মজুদ পাথর শুভ্র শিলা,
ঢিল ছোড়ার প্র‌মোদ লীলায়
ক্ষয় ক্ষ‌তির আজব খেলা।

ভূমি চুম্বন লালসায়
বজ্রপা‌তের তীব্র শিহরণ,
প‌থের বাঁধা জীব উদ্ভিদ
গাত্র স্প‌র্শে মৃত্যু স্বাদ গ্রহন।

কাল বৈশাখীর পাষান হৃদয়
জন জ‌ীব‌নে বিষাক্ত ছোবল,
প্রাণ-ঘরবাড়ী-ফসলাদির
ভোগ নি‌তে আগ্রহ প্রবল।

চোরাবালি
- ডাঃ ফারহানা মোবিন

আমি পথ চেয়েছিলাম
এক পাতা লাল টিপ এর জন্য,
পথ চেয়েছিলাম একটা
লাল পাড়ের শাড়ির জন্য ।

দুচোখ ভরে স্বপ্ন দেখেছিলাম ,
তুমি বলবা , " আমার নীল, তুমি
হাত ভর্তি করে চুড়ি পরো,
আমি দুচোখ ভরে দেখবো ,

তুমি চুলে খোঁপা বাধো ,
আমি গুজে দিবো , এক গুচ্ছ বেলী ফুল । "

কিন্তু তুমিতো এলেনা ,
পথ চেয়ে চেয়ে হারিয়ে গেল বেলা,
ভেংগে গেল বৈশাখী মেলা ,
চলে গেল রেশমী চুড়িওয়ালা !
তবু তুমিতো এলেনা !

হটাৎ দরজার কড়া নড়ল,
মনে হলো তুমি এসেছো ।
পহেলা বৈশাখে তুমি আসবে না,
এমন তো হতেই পারে না !

ছুটে যেয়ে দরজা খুললাম,
কিন্তু তুমি যে নেয় ,
তন্ন তন্ন করে খুঁজলাম , রাস্তার ধুলোয়
তোমার পদধূলি , তোমার ছায়া ।

কিন্তু তুমি যে নেয় ,
প্রতীক্ষার দরজা খুলে
তোমায় তো পেলাম না ,
পেলাম এক বুক হাহাকার !

তুমি তো নেয় , তুমি কোথাও নেয়,
তুমি মিশে গেছ চোরাবালি তে !!!

সোমবার , ঢাকা, বাংলাদেশ, রাত এগারোটা, ১৬.৪.১৮

চল; মুছে ফেলি...
- শাহিনা কাজল

চল; মুছে ফেলি সমস্ত কান্নার দাগ
কিংবা ধুয়ে নিই রোদের আঁচে।
অনেক দাগ, দগদগি ঘা এর মত শুয়ে আছে
জীবনের স্তরে স্তরে।
হয়তো কুঁজো হয়ে যাবো একদিন।
তাই বলি কি, চলো মুছে ফেলি।

আঁঠার মত লেগে আছে সবখানে
ঠোঁটেও লেগে থাকার কথা, তবে
মনে হয় আমি দেখার আগেই মুছে নিয়েছো?
হয়তো মুছতেই পারোনি সবটা;
তাই বলি কি, চলো; মুছে ফেলি হাতে হাত রেখে।

চুমু'র দাগ গুলো স্পষ্টত বোঝা না গেলেও
চলো সার্জারি করাই কসমেটিকস এ

এই প্রথম ভোরে; শুরু করি ফের
নতুন সূর্যের রাশভারী চোখে।
দু'জনই চলো ধুয়ে নিই,
না পাওয়ার কষ্ট, গ্লানি হতাশা।
জমে থাকা সুখও পাল্টিয়ে নিই চলো;
অথবা মুছে দিই ব্যর্থতার সকল অন্ধকার
মঙ্গল শোভাযাত্রায় হেসে উঠুক আমাদের
আলোর দিন, মুঠো ভরা স্বপ্নে।
চলো-
বৈশাখী রোদে শুকাই
দু'টো মন একত্র করে--
চলো--

তুমি প্রেমিক, তুমি দার্শনিক
- মোশ্ রাফি মুকুল

ইদানীং-
তুমি বেশ দায়িত্ববান হয়ে উঠছো,
খুলে বসেছো ডানার স্বাধীনতা ও আকাশ বিজ্ঞান ইসকুল,
বুঝতে শিখেছো সাবালিকার আকাশযান কোন পথে হাঁটে;
কলম্বাসের হারিয়ে যাওয়া কম্পাসটাও
খোজাখুঁজি করছো ন্যুব্জ দ্রাঘিমায়-

পৃথিবী প্রতিনিয়ত বদল করছে প্রতিশ্রুতি,
সমুদ্র ও শুশুক ভেঙে ফেলছে তাদের দাম্পত্যজীবন,
ঝিনুক গহ্বরে এখন হীরের আদলে
লিথিয়াম বর্জ্যের দোকান,
এবং যৌবন এক আশ্চর্য বায়োলজিক্যাল বিস্ফোরক!

আজকাল-
প্রখ্যাত দার্শনিকদের গ্রন্থেও তুমি
ঘটা করে লিখে দিচ্ছো চমৎকার মুখবন্ধ!
পৌরণিক কার্পেটে তুমি আঁকছো
নিষিদ্ধ পরাগায়নের ছবি,
বুঝছে লোক-
দিনকে দিন তুমি হয়ে উঠছো ভীষণরকম সাবালক!

আর ভালোবাসা নিয়ে তোমার যুক্তিগুলো যথেষ্ট পক্ষপাতিক-
সেখানে তুমিই প্রেমিক,তুমিই দার্শনিক!
সেখানে তুমি কোন এক পরিযায়ী প্রেমিক-
অথবা একবিংশের বহুগামি ঘুঘু!

জৈব রসায়ন ও ইহলৌকিক সাম্পান
- মোশ্ রাফি মুকুল

ওয়ান টু ওয়ান কেমিস্ট্রি জমে উঠার পর-
তার আকাশে উড়েছিলো
আমার ইহলৌকিক সাম্পান।

তার মনের ভেতরে প্রবেশ করার জন্য
আমার ছিলো কিছু গুপ্ত অক্ষরের চাবি-
তার চোখের পদ্য পড়ার জন্য আমার ছিলো নিজস্ব ভাষারীতি,
আর তার ভালোবাসার ডেরায় ঢোকবার জন্য
আমার ছিলো অতি গোপনীয় এক সিনথেটিক কোড।

সে এক জটিল বীজগাণিতিক হিসাব-
ব্ল্যাকহোলীয় রহস্য,
বিজ্ঞান এখানে অপারগ হাস্যবস্তু,
বস্তুর ভর বেগ ত্বরণ এখানে হরর!

এবং আমাদের স্বতন্ত্র একটা আকাশ ও
আশ্চর্যজনক দুটো করে ডানা ছিলো উড়ার।

১৬/০৪/২০১৮.

শুধু তোমারি জন্য
- সাজ্জাদ সাকিব

আমি তো কবিতা লিখি,
শুধু তোমারি জন্য।
আমি তো গান গাই,
শুধু তোমারি জন্য।
আমি তো বাঁশি বাজাই,
শুধু তোমারি জন্য।
আমি তো স্বপ্নে
শুধু তোমাকে দেখি।
আমি তো ফ্যাস্টোনে
শুধু তোমাকে আঁকি।
আমি তো কবিতায়,
শুধু তোমাকে খুজি।
আমার মুখ দিয়ে
শুধু তোমারি কথা বলি।
আমার ওমিতে তুমি
আমার হৃদয়ের অহমিকা।
আমার মনের সকালে,
তুমি পাখিদের কলকাকলিকা।
আমার মনের আফ্রিনে,
তুমি আন্নির ছোয়া।
তুমি আর কেও না আমার ভালোবাসা।
তুমি র্স্বণালি রোদের হাসি,
তুমি আমার সুরের বাঁশি।
তুমি বর্ষার বৃষ্টি,
তুমি আষাঢ়ের শ্রাবণ,
তুমি আমা্র হৃদয়ে ভালোবাসার স্বপন।
তাই তো বারবার বলে যাই,
তুমি আমার কত যে আপন।

বৈশাখ আসছে
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

সাঁঝের আকাশ পিচকালো করে
গুরুগুরু মেঘের গর্জনে ভর করে ,
ঝড়ের তান্ডব সাথে বৈশাখ দুয়ারে ৷

কিশোরী মায়ের আঁচলের তলাতে
দুগ্ধপানরত সন্তানকে ঘুম পাড়িয়ে ,
ভয় বুকে মা জড়োসড়ো হয়ে আছে ৷

বৃক্ষের নবীন ডালপালাগুলো ভেঙ্গে
মজুরের ঘরের চালা উড়িয়ে নিতে ,
মহাব্যাস্ততায় সে আজকে আসছে ৷

মাথা উঁচু করেছে পোয়াতী ফসল
বৈশাখী বাতাস তাতে দিচ্ছে দোল ,
কখন যেনো পাল্টে বৈশাখী ভোল ৷

পুরোনো জঞ্জাল সব চুকিয়ে দিতে
স্থাবর অস্থাবর শতো হিসেব নিয়ে ,
দোকানী বসেছে হালখাতাটা খুলে ৷

বৈশাখ আসছে ঝড়ো তান্ডব নিয়ে
পুরোনো জঞ্জাল সব উড়িয়ে নিয়ে
এক নব সকালের স্বপ্ন সে দেখাতে ৷

চোরাকাটা
- মোশ্ রাফি মুকুল

ছোট ছোট চোরাকাটা-
কোন যুক্তিতে টেকেনা ফিলোসোফি-
দৃশ্যমান গল্পগুচ্ছের ভেতর অদৃশ্যমান ক্ষত,
সেও কি হয় নাকি নিখাদ
দেহের ভেতরে বাইরে বিবর্ণ রক্তপাত!

বুকের হপারে সিঙ্গা হাতে দম নিচ্ছে এক রক্তাক্ত কিশোর।
কল্পতরুর সবুজ মেঘ,লাল রোদ,ঝলসিত দুঃখের নোনানদীও
আছে
এইসব পৃথিবীর মেরুতে মেরুতে
অথচ এসব যৌক্তিক
দৃশ্যরূপ এড়িয়ে যায় কবি ও চোখের রেটিনা
অথবা তোমরা তা দেখতে পাওনা।

যেখানে কোন যুক্তিতে টেকেনা
প্রগলভা বালিকার ব্যাকরণ,
সেখানেও অবিরাম রক্ত ঝরাতে পারে কেউ,
কাঁচিছুরি কিংবা সার্জিকাল কাটাছেড়া ছাড়াও ওঠে
সেসব রক্তনদীতে ঢেউ-
তোমরা দেখতে পাওনা কেউ।

১৫/০৪/২০১৮.

"বিশ্বযু‌দ্ধের অশ‌নি সং‌কেত"
***রহমান মাসুদ***

বসুম‌তি থরথর কম্পমান
ব‌িউগলে চরম ধ্বংসলীলার গান,
রনহুঙ্কা‌রে আগ্রাস‌নি কুচকাওয়াজ
বিশ্ব সে‌জে‌ছে ভয়ংকর যু‌দ্ধ সাজ।

হায়‌রে বিংশ শতা‌ব্দির সভ্য মানুষ
মজুদ অজস্র পারমানবিক ফানুস,
পরাশ‌ক্তির ভ্রাতৃ‌ত্বে যোজন বি‌চ্ছেদ
তৃ‌তীয় বিশ্ব যু‌দ্ধের অশ‌নি সং‌কেত।

আ‌লেকজ্যান্ডার,‌চে‌ঙ্গিস,নেপ‌ো‌লিয়ান
ক‌ফিন ছে‌ড়ে গ্যালা‌রি‌তে অবস্হান,
দেখ‌বে সর্বকা‌লের সর্ব‌শ্রেষ্ঠ রক্তহো‌লি
সাবাস বংশধর দু'হা‌তে তুমুল তা‌লি।

ঘটনা দৃ‌ষ্টে সে দুঃস্ব‌প্ন শয়‌ণে জাগর‌নে
বিদ্যমান দামা‌মে ভয় জা‌গে প্রা‌ণে,
পরাশ‌ক্তি‌দের মা‌ঝে নেই স‌হিষ্ণুতা
ভা‌বেনা শা‌ন্তি প্রিয় মানু‌ষের কথা।

এ‌কে অপ‌রের প্র‌তি বি‌দ্ধে‌ষ বু‌লি
সর্ব‌ক্ষে‌ত্রে মানবতার চরম জলাজ্ঞলী,
বোবা-কানা হ‌য়ে আর নয় নিশ্চুপ
প্রিয় ধরনী‌ হ‌তে দেবনা ধ্বংসস্তুপ।

সা‌রে সাতশত কো‌টি মানু‌ষের আবাস
যুদ্ধ খেলায় ধ্বংস‌যজ্ঞ‌ে বিষাক্ত নিশ্বাস,
তাই হা‌তে হাত রে‌খে এক‌টি স্লোগান
যুদ্ধ নয়,পৃ‌থিবী শা‌ন্তির ফুল বাগান।

আজ আমার 'মন খারাপ'এরও মন ভালো
- মোশ্ রাফি মুকুল

যদি পারিস মাস্তুলে ঢেউ তোল-
বুকের চৌহদ্দিতে দোচালা ঘর তোল,
নিংড়ে নিংড়ে নে উথাল পাথাল,
চিলিকোঠার সেপাই
ভালোবাসার দৈর্ঘ্য প্রস্থ মাপবি আর কতোকাল!

এই আল্পসে আগুন গিরির হাট বসে,
তাজিংডং শৃঙ্গের মতো
সে মায়াডোর উচ্চতার বিস্তার;
গুলনহরে আজ জিপসির দানি ভরা
সুগন্ধি ভেসে যায়,
আয়।

যদি পারিস আয়-
স্বপ্নের চূড় ভেঙে
নিশিতার ফল্গুধারায়-
ছুঁয়ে দ্যাখ সুখ কতো সুন্দর।

আজ উৎসব-
আজ আমার 'মন খারাপ'এরও মন ভালো।

১৪/০৪/২০১৮.

পরস্ত্রী
- শাহিনা কাজল

পাল তুলে নৌকো যতোবার ছুটেছে প্রতিকূলে
ভেবেছি ততোবার আমি- অনুকূল
ভাবিনি, ছদ্মবেশী প্রণয় জ্বলজ্বলে তারা
ভ্রু উপচানো বিস্ময়! চোখের দু'পাড়ে
গেঁথে যায় বুলবুলি মন
ঝিলিমিলি ছন্দের শৈল্পিক উপমা।

ঝরে যায় সব পাতা একদিন-
দেখা স্বপ্নহীন রোদ্দুরে অথবা মেদহীন দুপুরে
নিঃশ্চুপ থাকে শাখা - প্রশাখা, নিশ্চল পাহাড়
যেন বৈশাখী ছেলেবেলা। গুনগুন সুর।

সে আজব কথা- যা বলে ওপাড়ায়
দেখা-অদেখার শ্রাবণ সন্ধ্যায় ইতিউতি মন
আর উত্থিত চারাগাছে ফলের ধরন।

আজগুবি প্রস্বেদন ছুঁয়ে দেয় কথা
জলাভূমি , বালুচর, পলি জমা বিকেল
আঁকে গোধুলীর রঙ সারাক্ষণ
কে বলে অহংকার নয়?

ওপাখি ভিজে যায় তবু ফেরে না ঘরে
ডানা ছিঁড়ে পড়ে থাকে পথে
না না সব ফাঁকিজুঁকি
চোখের ভেতরে পূবপাশে জানালা বরাবর
পৃথবীর সব পরিব্রাজক হেঁটে যায়
ইতিহাসের রঙিণ বারান্দায়।

পরস্ত্রী! কে বলে হাসতে জানে না ?
দেখেছি প্রণয়হীন সন্ধ্যের রঙে
অমাবস্যাতিথির দহলিজে
ফিরে আসে উচ্ছল হাসি,
তাজা জোয়ারে ভাসা গান
সবাই জানে সে পরস্ত্রী।

বৈশাখ এলে
- শাহিনা কাজল

দল বেঁধে যায় মেঘের মেয়ে
গোমড়া মুখে চাঁদ,
লক্ষ তারা অাকাশ পথে
দিচ্ছে অালোর ফাঁদ।

ঝিলিক দিয়ে মুচকি হাসে
জোছনা ভরা রাত,
বৈশাখ মেলায় খাচ্ছে কেহ
পান্তা ইলিশ ভাত।

বিজলী মেয়ে একটু হেসে
বাজায় মেঘের ঢোল,
নতুন বছর নাগর দোলায়
তোল রে ঘরে তোল।

মেঘলা আকাশ গান ধরেছে
ফোটায় ফোটায় বৃষ্টি,
টোপর মাথায় কৃষক চলে
করতে নতুন সৃষ্টি।

লাঙল জোয়াল কাঁধে নিয়ে
ছুটছে কৃষক ভাই,
নতুন ফসল তুলবে ঘরে
খুশির সীমা নাই।

মেঘ জমেছে ঈশান কোণে
দমকা হাওয়া বয়,
দৌড়ে পালায় কৃষাণ বধূ
কাল বৈশাখীর ভয়।

"নব বঙ্গা‌ব্দের সূচনা"
***রহমান মাসুদ***

ধুয়ে মু‌ছে অতীত গ্লানি
মন ময়ূরী তু‌লেছে পেখম,
হৃ‌র্দিকতার আবির মে‌খে
হে বৈশাখ,‌ সু-স্বাগতম।

বাংলার দ্বা‌রে বছর ঘু‌রে
১৪২৫ বঙ্গা‌ব্দের শুভ সূচনা,
চার‌দি‌কে সাজ-সাজ র‌বে
নতুন বর্ষ‌কে সাদর সংবর্ধনা।

নব বঙ্গা‌ব্দের প্রথম সূর্যোদ‌য়ে
ই‌লিশ-পান্তার স্বা‌দে বর্ষবরণ,
প্রভা‌তী সংগী‌তের মূর্ছনায়
চি‌ত্তে প্রবাহ দ‌ক্ষিনা পবণ।

রং-বেরং এর‌ বর্ণিলতায়
নারী পুরু‌ষের বাহা‌রী বেশ,
ঢো‌লের তা‌লে নৃ‌ত্য‌ে পাগল
অসম্প্রদা‌য়িকতার বাংলা‌দেশ।

নাগর দোলার দো‌লে খোঁ‌জে
মা‌য়ের ক‌ো‌লের স্মৃ‌তির দোল,
তাই বয়স ভু‌লে সবাই ব‌লে
চল‌রে চল,‌বৈশাখী মেলায় চল!!

প‌থে-ঘা‌টে-মা‌ঠে কত মেলা
পসরায় মি‌ষ্টি-মুড়ি-মুড়‌কি-খৈ,
প‌রিবার প‌রিজ‌নের পরশে
সারা‌দিন আনন্দ উল্লা‌সে হৈ-‌চৈ।

বৈশাখ মানে
- শাহিনা কাজল

চৈত্র শেষ নতুন বছর নতুন দিনের গান
জ্বীর্ণ-জ্বরা ধুয়ে আবার ফিরে আসা প্রাণ।
ধুলো বালি ঝেড়ে মুছে গোছানো বাসর, ঘর
বাংলার বুকে বাঙালী প্রেম জাগে নতুন চর।
নতুন আহ্বান ভুলে কষ্ট, সৃষ্টি নতুন পথ
ভরা পূর্ণিমা আনন্দ খুশিতে দোলে রথ।
দুধ সাদা লাল-পেড়ে শাড়ী খোঁপা ভরা ফুল
তালে তাল দোলে ঝুমকো দোলে কানের দুল।
রেশমী চুল খোঁপা ভরা বেলী ফুলের মালা
আনন্দ খুশির পরশ যেন চুঁইয়ে পড়ে ডালা।
মন কাড়া বাহারী ফুলের সুবাস, আহা! গন্ধ
খুলে দে আজ খুশিতে যা আছে আজ বন্ধ।
পাখি ওড়ে কালো মেঘের চোখ রাঙানো ধমক
বজ্রপাত থেমে রণ হুঙ্কার জ্বলে বিজলী চমক।
গনগনে রোদ্দুরে সুঠাম শরীর ভেজা ঘামে
ভরা ক্ষেত সোনালী ফসল কেনা রক্ত দামে।
পুরনো খাতায় হালখাতা হালে জল দেওয়া
শত্রুতা ভুলে বুকে বুক আপন করে নেওয়া।
প্রাণে প্রাণ মিলিয়ে হাতে রেখে হাত
ভেসে যায় জঞ্জাল যায় পুরাতন রাত।

********

এখানে এভাবে যায় দিন ধুয়ে পাপ বৈশাখে
রাত শেষে কালো ভেবে পাখি হয়ে রই শাখে।

পরিনতি
- মরিয়ম আক্তার রিমা

যুগ বদলেছে,বদলেছে মানুষ
ক্রমান্বয়ে পরিবর্তিত হচ্ছে
বিবর্তননের ধারা।
কবিতার সাথে একাকার হয়ে মিছে আছে
কবির না বলা হাজারো কথা।
কবি ছাড়া যেমন কবিতা হয়না
তেমন কবিতা ছাড়াও
কবি অচল,নামহীন।
মাঝে মাঝে কবিতার মাঝেও
ছন্দ পতন ঘটে,
কবি আর ভালোবেসে কবিতা গড়তে হয়
বড়ই উদাসীন।
হঠাৎ ই কবি থেকে কবিতা হারিয়ে যায়
সীমাহীন দূরে,
সময়ের ব্যাবধানে কবি ভুলে যায় কবিতার ভাষা
কবিতার ছন্দ তাকে আর
জাগিয়ে তোলেনা একটিবারও
শুধু মাঝখানে রয়ে যায়
কিছু স্মৃতি অগোচরে।
এমন করে কবি নিজের অজান্তে ই
হারিয়ে যায় নিজের মাঝে।
কাল পরিক্রমায় জন্ম হয়
এক নতুন কবির....
হাটিহাটি পা করে শুরু হয়
তার ছন্দের পথ চলা,
গভির যত্নে, পরম ভালোবাসায়
সে গড়ে তোলে
ছন্দময় কবিতা।
কবি কবিতার মিলন মেলায়
কবি পায় পূর্নতা,
কবিতা পায় ছন্দ.....
জীবনে চলার পথে
অনেক কবি আসবে যাবে,
কেউ বা হারিয়ে যাবে
আবার কেউ বা কবিতার মাঝে
খুজে পাবে নতুন নাম।
তবে হারাবেনা কবিতা
হারাবেনা কবিতার ছন্দ,
কোন এক কবির মাঝে
কবিতা বেচেঁ থাকবে অনন্ত কাল।

মাঝরাতের গল্প
- সাজ্জাদ সাকিব

আকাশে জ্বলছে মিটিমিটি তারা
আমি যেন তুমার আশায় দিশেহারা।
গতমাসে লিখেছিলাম তুমার কাছে চিঠি
এখনও পাইনি তার উওর খানি।
আমিতো আছি শুধু তুমার পথ চেয়ে
তুমি কি আসবে কভু আমার কথা ভেবে।
আমিতো বানিয়েছি নতুন নকশি কাথা
যেখানে লিখা আছে শুধু তুমারি কথা।
আমিতো এখনও ভাবি শুধু তুমারি কথা
ভাবতেও কষ্টলাগে আমি এখন একা।
মাঝরাতে ঘুমভাঙ্গে তুমায় স্বপ্ন দেখি
বুক ভরা ব্যথা নিয়ে আমি শুধু কাদি।
যেদিন বুঝবে তুমি আমার এই ব্যথা
তুমি তখন হয়ে যাবে পৃথিবীতে একা।
হাসবে তখন সারা বিশ্ব
কাদবে তুমি একা।

গরমের উপকারী ফল "তরমুজ"
- ডাঃ ফারহানা মোবিন

গ্রীষ্মের তীব্র গরমে তরমুজ এই সময়ের জন্য উপযুক্ত ফল। এতে প্রায় ৯৫ শতাংশ পানি। তাই ডায়রিয়ার পরে, বমি করার পরে,যাঁরা অতিরিক্ত রোদে থাকেন, তাঁদের জন্য তরমুজ জরুরি ফল। এতে নিম্ন মাত্রার ক্যালরি, অতি উচ্চমাত্রার পটাশিয়াম রয়েছে, যা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।

প্রচুর পরিমাণে রসাল ফল হওয়ায় কিডনির জন্য বয়ে আনে সুফল। তরমুজ রক্তে ইউরিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। ফলে কিডনিতে পাথর, ইনফেকশনসহ যাবতীয় অসুখগুলো তুলনামূলক কম হয়। আর কিডনি ভালোভাবে কাজ করার জন্য দেহের বর্জ্যগুলো সঠিকভাবে বের হয়ে যায়।

ভীষণ উপকারী ভিটামিন ‘সি’র বসতি এই ফলে। ভিটামিন ‘সি’ প্রতিরোধ করে অ্যাজমা বা হাঁপানি, ঋতুজনিত সর্দি, টনসিল, গরম-ঠান্ডার জ্বর, নাক দিয়ে পানি পড়া, অসটিওআর্থ্রাইটিস (অর্থাৎ শরীরের প্রতিটি জয়েন্টে ব্যথা)। গরমজনিত ঘা, ফোড়া দূর করে তরমুজ।

অনেকের ধারণা, তরমুজ মিষ্টি, তাই ডায়াবেটিসের রোগীরা খেতে পারবেন না। কিন্তু ধারণাটি পুরোপুরি সত্য নয়। তরমুজের পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম রক্তের ইনসুলিনকে সুষ্ঠুভাবে কাজ করার শক্তি জোগায়। তাই ডায়াবেটিসের রোগীরাও এই ফল খেতে পারবেন। তবে পরিমিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

রসাল ফল হওয়ার জন্য তরমুজ ত্বককে করে উজ্জ্বল, মসৃণ। ত্বকে সঠিকভাবে রক্ত চলাচল বাড়িয়ে ত্বককে করে শক্তিশালী।

ফারহানা মোবিন, ঢাকা।
১০.৪.১৮

ভাইরাল
- মোশ্ রাফি মুকুল

তারপর-

সাদাকালো ঘটনাস্থল নিংড়ে বের করে আনা হলো
প্রকাশিত সময়ের রক্তক ভ্রূণ,
দাহঘ্ন সময়কে করা হলো ব্যবচ্ছেদ-
দেখা গেলো তার উদরে
লকলকে ক্রোধের ফণা তুলে সাপকে দংশন করছে মানুষ!
মিটারগেজ শব্দের ককপিঠে গাদাগাদি করে বসে আছে ব্রডগেজ অক্ষরের রেললাইন-

কোন ক্লু নেই-
কোন পদচিহ্ন নেই,

নেই কোন প্রমাণ যোগ্য হস্তছাপ
আছে পাপ ও অন্ধকার;

ব্রেকিং নিউজ হলো-
একটা দীর্ঘ শিশুর ভেতর
ডুকরে ডুকরে কাঁদছে
একটা সদ্য ভূমিষ্ঠ একটা আতুর ঘর।

রুদ্ধদ্বার টেবিলে চতুর্ভূজ বৈঠক করে
কোন এক অচেনা কন্ঠস্বর!
কোন ক্লু নেই-
সব রিউমার!রিউমার!

ভালোবাসা ভাইরাল হলে
হিংস্র জন্তুরা অরণ্যের কক্ষপথ ত্যাগ করে
মহাকাশে দেবে ভোঁদৌড়।

ছোট গল্প : ব্রেকআপ
- ইরাবতী মণ্ডল

--হ্যালো।
--হ্যাঁ বল।
--তোকে আমি খুব ভালোবাসি রে।শ্যামল রিয়াকে বলে।
--তা আমি ও তো তোকে খুব ভালোবাসি। এ টা তো তুই ও জানিস। এই কথা বলার জন্য কি তুই ফোন করলি এত রাতে? রিয়া বলে।
--না রে অন্য একটা কথা তোকে বলবো বলে ফোন করলাম।
--কি কথা।
--আমাদের দেবু দা আর ওর গার্লফ্রেন্ড সোমাকে চিনিস তো।
---আমাদের হসপিটালে পিজিটি করছে,ঐ দেবুদার কথা বলছিস তো।
---হ্যাঁ, ঐ দেবুদা।
---হ্যাঁ, তাকে তো চিনি আর ওর গার্লফ্রেন্ড সোমাকে ভালোকরেই চিনি। দুজনকে তো সব সময় একসাথে দেখি।ক্যান্টিনে খেতে আসে,এখানে ওখানে ঘুরতে যায়। তা কি হয়েছে ওদের শুনি।
---জানিস,ওদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে।
--কি বলছিস তুই!কি করে হলো!
--হ্যাঁ রে । আমার বন্ধু শুভ সেদিন একথা বলছিলো আমায়।বলছিলো সোমানাকি দেবুদার সাথে ব্রেকআপ করে দেবুদার ই সিনিয়র পিজিটি সুমিতের সাথে নতুন করে প্রেম করছে।
---কি বলছিস রে তুই।এটা কখনো হয়!শুনেছি সেই ফার্স্ট ইয়ার থেকে ওদের প্রেম। এত বছর প্রেম করে এখন ব্রেকআপ!ভাবা যায়! কেন এমন করলো রে,জানিস কিছু ।
----শুনেছি সুমিতের বাবা বড়োলোক।সুমিত বড়ো মার্সিডিজ গাড়ি করে হসপিটালে আসা যাওয়া করে।তাই হয়তো ওর থেকে কম বড়োলোক বাবার ছেলে দেবুকে ছেড়ে দিয়ে সুমিতের প্রেমে পড়েছে সোমা।
---তাই কখনো হয় !!এইভাবে কি প্রেম হয়!
--জানিনা,কিন্তু হয়েছে তো দেখছি।তাছাড়া সঞ্জনা আর সুদীপ দাকে চিনিস তো,আমাদের আগের ব্যাচের।
--হ্যাঁ চিনি তো ।কেন ,ওদের আবার কি হলো। দুজনকে তো একসাথে প্রায়ই দেখা যায় এখানে -ওখানে। খুবভাব তো ওদের।শুনেছি ওদের বিয়েও ঠিক হয়ে গেছে। তা ওদের আবার কি হলো।ওদের ও কি ব্রেকআপ হলো নাকিরে ।
---হ্যাঁ রে ,তাই হয়েছে। সঞ্জনা আমাদের গাইনোকোলোজিস্ট বিভাগের ডাক্তার বিভাস বাবুর সঙ্গে লটঘট পাকাচ্ছে।সেদিন তো এই নিয়ে সুদীপের সঙ্গে সঞ্জনার প্রচণ্ড ঝামেলা বাঁধে।সুদীপ সঞ্জনার গালে টেনে একটা চড় ও কষায়।
----কি বলছিসরে তুই !!এইসব হয়েছে?আমি জানতাম না তো।
---তুই জানবি কি করে ।তোর তো সেদিন ডিউটি ছিলো না।আমার এ্যাড ডে ছিল ঐদিন। নাইট দিচ্ছিলাম।আমাদের সামনেই তো ঐ ঘটনা ঘটেছিলো।আমরাই আবার সুদীপ দাকে বুঝিয়ে টুঝিয়ে ঠাণ্ডা করি।
---কি বলছিস রে তুই !সঞ্জনা এমন কাজ করতে পারলো ?ওদের এতদিনের ভালোবাসা এইভাবে শেষ করে দিলো!
----তাই তো দেখছি রে। আজকাল কোন ভালোবাসার দাম নেই।যেদিকে টাকাবেশি সেদিকেই মেয়েরা ঢলে পড়ছে।আমার খুব ভয় করছে রে রিয়া। তুই আমায় এইভাবে ছেড়ে যাবি না তো?তুই আমাকে ছেড়ে দিলে আমি মরেই যাব।
--কি সব আজেবাজে কথা বলছিস। আমি তোকে কেন ছাড়বো।তোকে আমিও খুব ভালোবাসি রে শ্যামল।তোকে ছেড়ে যে আমি থাকতেই পারবো না।তাই তোকে ছাড়ার প্রশ্ন ও কখনোই নেই।

ফোনরেখে দেয় দুজনে।কোলকাতার এক নামকরা মেডিকেল কলেজে এম.বি.বি.এস পাশ করার পর ঐ কলেজেই হাউসস্টাফশিপ করছে দুজনে।কলেজে পড়াশোনা চলাকালীন সময় ই তাদের প্রেম।দুজনে কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারে না।দুজনের বাড়িতে ও তাদের এই সম্পর্কের কথা জানে। বাড়ির লোকেরাও চায় পড়াশোনা কমপ্লিট হলে দুজনের দু-হাত এক করে দিতে।এইরকম সময় তাদের চোখের সামনে এমন ঘটনা স্বভাবতই দুজনের মনকে খুব নাড়া দিয়ে যায়।অনেকক্ষণ দজনের কারো চোখে ঘুম আসে না।কি এক অনিশ্চয়তায় কি এক দিশাহীনতায় ভোগে দুজনে। সত্যি তাদের জীবনে এমন কিছু ঘটবে না তো। জানে না তারা কিছুই।শুধু জানে তারা দুজন দুজনকে খুবভালোবাসে।কেউ কাউকে ছেড়ে তারা থাকতে পারবে না।যতই বাঁধা আসুক সব দূর করে তারা দুজনে একইসাথে পথ চলবে।এক দৃঢ় প্রতীজ্ঞাবোধে দুজনের হাতের মুঠি শক্ত হয়।কখন দুচোখে ঘুম নেমে আসে।সামনেই নতুন সকাল।

09.04.2018

"হৃদ‌য়ে বৈশাখ"
***রহমান মাসুদ***

প্রা‌ণের দোলায় দো‌লে
বাংলার দ্বা‌রে চ‌লে এলো ব‌ৈশাখ,
আমন্ত্রন শত অভিনন্দন
তু‌মিই বাঙা‌লির হৃদ‌য়ের আল্লাদ।

আবহমান কাল হ‌তেই
বাঙা‌লির ঐতি‌য্যে অবস্হান,
ব‌ৈশাখ এলে চিত্ত খু‌লে
নববর্ষ উৎযাপ‌নের মহা ধুমধাম।

ষড়ঋতুর বাংলা‌দেশ
তোমার অপেক্ষায় অপেক্ষমান,
এ‌সো এ‌সো হে ব‌ৈশাখ
বাঁ‌শির সু‌রে সু‌রে রাখা‌লের গান।

গ্রাম-গন্ঞ্জ-শহ‌রের বু‌কে
নিত্য নতুন রূ‌পে বৈশাখী মেলা,
হ‌রেক রকম দ্র‌ব্যের সমাহার
এখ‌নো প্রিয় আকর্ষন নাগর‌দোলা।

রমনার বটমূ‌লে ৫০তম বর্ষবরণ‌
এবা‌র ছায়ান‌টের সে পূর্তীর আয়োজন,
ভোর হ‌তেই সেথা লো‌কে লোকারন্য
ধ‌র্মের সকল বি‌ভেদ ভু‌লে হ‌য়ে একমন।

চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা
ইউ‌নে‌স্কোর সসম্মা‌নে স্বীকৃ‌তি জ্ঞাপন,
মি‌ছি‌লে নারী পুরু‌ষের ভীড়
সাজ সজ্জায় অপরূপ শোভা বর্ধণ।

ধনী দ‌রিদ্র সবার মা‌ঝে
বৈশাখ মা‌নেই আন‌ন্দের মিলন‌মেলা,
অসম্প্রদা‌য়িকতার বাংলা‌দে‌শে
নি‌র্বি‌ঘ্নে হে‌সে খে‌লে বীরদ‌র্পে পথচলা।

স্বাধীন দে‌শের স্বাধীন নাগ‌রিক
উৎসব পাল‌নে নেই কোন উৎকন্ঠা,
সফল বৈশাখ পাল‌নে
বারবার প্রকা‌শিত হৃদ‌য়ের সে কথা।

বাংলার মানুষ সংস্কৃ‌তিমনা
কথাটা য‌দিও সবারই আছে জানা,
নানা ব্যস্ততায় তা ভু‌লে গেলেও
বৈশাখ‌ে পুনঃজাগরিত সে উদ্দীপনা।

১৪২৩ বিগত বিদায় ব‌লে
রে‌খে গেল কত স্মৃ‌তি হৃদয়প‌টে,
সম‌য়ের ধারার এটাই লিখন
সূর্য্যদ‌য়ে নতু‌নের আগত বার্তা ঘ‌টে।

১৪২৪ হ‌বে তু‌মি মঙ্গলকর
চাইনা দু‌র্যোগ রক্তপাত জ‌ঙ্গী সন্ত্রাস,
দে‌শের মানুষ চায় শা‌ন্তি
সকল অকল্যাণকর পদ‌ক্ষে‌পের বিনাস।

বৈশাখ বৈশাখ বৈশাখ তু‌মি
প্রতি‌টি বাঙা‌লির হৃদ‌য়ের হৃর্দিকতায়,
শুভ হওক তব আগমন
বিধাতার কা‌ছে নত‌শির, সে প্রার্থনায়।

খাঁ খাঁ
- মোশ্ রাফি মুকুল

বুক ভর্তি পকেট,
পকেট ভর্তি খাঁ খাঁ।

অন্ধকার কৌটায় ভরা আকাশ-
কিছু খাঁ খাঁ উড়িয়ে নিয়ে গেছে নীল-
গাঙচিল দু'পায়ের চাকায় মাপে দিগন্তরেখা-
যৌবন ভাগ করে খাঁ খাঁ।

আমার ভেতরেও যে খাঁ খাঁ নেই
এ কথা বলিনি আমি,
আমার ভেতরেও অজস্র খাঁ খাঁ আছে-
আর আছে হাহাকার,

চৈত্রের ওষ্ঠ যেমন দ্যাখে
রূপাশ্রিত রোদ্দুরের খাঁ খাঁ।

আমি তুমি ও প্রকৃতি
আমাদের মাঝে কোন 'না পাওয়া'নেই,
'হাহাকার'নেই,
কোন 'খাঁ খাঁ' নেই-
একথা করবে অস্বীকার?

১১/০৪/২০১৮.

"আত্নার নেই মরন"
***রহমান মাসুদ***

দে‌হের য‌দিও মৃত্যু ঘ‌টে
আত্না অবিনশ্বর নেই মরন,
ইহকাল হ‌তে পরকা‌লে যাত্রা
চির গন্ত‌ব্যের প‌থে পদচারন।

আত্নার ছিল স্ব‌র্গেই বসবাস
পৃ‌থিবী‌তে গ‌ড়ে ক্ষনি‌কের নিবাস,
পরীক্ষাল‌ব্ধেই ধরায় আগমন
উত্তীর্ণ‌তে পূনরায় স্ব‌র্গেই আবাস।

দৃঢ় সংক‌ল্পে অস্হা‌য়ী দেহধারন
পুণ্য অর্জ‌নে হৃদ‌য়ে ক‌ঠিন পণ,
আত্নশুদ্ধি‌তে একা‌লের জীবন
সে শুভ প্র‌তিজ্ঞা‌তেই  জন্মগ্রহন।

দু‌নিয়া মায়াবী চোরাবা‌লির ফাঁদ
শয়তান কুমন্ত্রনার চক্র‌ে উন্মাদ,
দুর্বল আত্নার তাই‌তো পদঙ্খলন
পা‌পের পঙ্কিলতায় কা‌টে দিনরাত।

সবল আত্না প‌বিত্রতায় মহা সং‌যম‌ী
শত প্ররোচনায় হয়না বিপথগামী,
সর্বদা সেই র‌বের প‌থের অনুসারী
যি‌নি সৃ‌ষ্টিকর্তা যি‌নি অন্তর্যামী।

দুর্বল আত্না দোয‌খের খোরাক
অগ্নি লে‌লিহান শিখায় প্রজ্জ্বলিত,
সবল আত্নার বে‌হে‌স্তেই বসবাস
স্বর্গীয় নূ‌রের দ্যুতি‌তে আলো‌কিত।

 

অবারিত দুচোখের খুব গহীনে-
যেখানে
শৃঙ্খল ভাঙা স্বপ্নেরা খেলা করে,
কখনো সেখানে খুব অতলে জাগে
দুঃস্বপ্নের চর,
তবু তাঁর জমিনে চাষ হয়
হাল-লাঙলের শক্ত প্রতিরোধ।

মগজের রক্ত চুষে নেওয়া
কালোসাপ, বুকে নিয়ে কতো-
পার হয় ঘুম-নির্ঘুম রাতগুলো।

অবেলার সন্ধ্যায়
কখনো ঘিরে ধরে বিষাদের স্রোত,
মানুষগুলো ছুটতে থাকে-
অবহেলিত রাস্তার দুধারে বিষণ্ণতা
জমে নিরেট আর্তনাদে।

আধারের চোখ বেয়ে
নেমে আসা কুয়াশার কাপে
অজস্র তারার দল
আবার চোখে তৃষ্ণা জাগায়-
স্বপ্ন দেখার, স্বপ্ন গড়ার।

শান্তির খোঁজে শান্তি
- ওদুদু মণ্ডল

শান্তি নিজে শান্তি খুঁজে শান্তি হরা ভূমে,
শান্ত বুকে শান্ত সুখে ক্লান্ত মায়াঘুমে ৷
ছায়াঘেরা মায়াপুরে মায়াবিনী হাসে,
রিক্ত পাখি সিক্ত আঁখি শূন্যাকাশে ভাসে ৷
তক্তে বসে রক্ত চোষে শক্ত থাবা মেলে,
যুগে যুগে কী হুজুগে খাচ্ছে পায়ে ফেলে !
দ্বন্দ্ব ভরা ছন্দ হরা বন্য জাতি হায়,
পুণ্য ভূমি শূন্য করে ধন্য হতে চায় !
পষ্টমুখে কষ্টছায়া নষ্ট সারা দিন,
দীপ্ত রোদে তৃপ্তবোধে দৃষ্টি উদাসীন ৷
লক্ষ চোটে বক্ষ ফাটে নিত্য হাহাকার,
বিত্ত খোয়া পিত্ত ধোয়া চিত্ত আহা কার?

বৈশাখে
- শাহিনা কাজল

যদি ভেঙে যাই চৈতে হাওয়ায়
বুঝে নিও বৈশাখ আসে না এখানে এই আঙিনায়,
যদি দমকা বাতাসে উড়ে যাই
ভেবে নিও বৃষ্টি বিলাসে
তুমি ছিলে অসম সন্ধ্যায়।
অথবা পুকুর ছাপিয়ে জলের ঢেউ ওঠে আকাশে
জেনে নিও ক্লান্তি এসেছে শ্রাবণে।

আমি পাখিও না কিংবা ঘাসফুল
জোছনা বিলাবো যে রৌদ্রছায়ায়
মেঘের আঙিনা খুলে যাবে তোমার চোখে
তুমি চেয়ে থেকো না
সফেন কষ্টের সমুদ্র পাড়ি দেবো?
আমি নিছক কালো মেঘ
ভাসাতে পারি বৈশাখি বেলা।

একাকীত্বের বিষণ্ন প্রহরে
- ওদুদ মণ্ডল

সুখের নিশান ওড়ে বিভব শাখায়
আঁকুপাঁকু করে মনে ঝলমলে রাত
ঘুম ঘোরে কেটে যায় সোনালী প্রভাত
তৃপ্তির আঁচল ঢাকা ময়ূরি পাখায় ৷

প্রহরে প্রহর কাটে লালসার জলে
সময়ের নদী বহে ঘড়ির কাঁটায়
সহসা চমক ভাঙ্গে খেয়ালি নাটাই
জীবনের দিবাকর হাঁটে অস্তাচলে ৷

জীবনের দোলাচলে একাকী আবাস
দখিনা দুয়ার খোলে নীলিমার নীলে
আঁধারেই খুঁজে ফেরে পতিত দেহের
সরল রেখায় টানা ভুল হিসেবের
বেভুল পথিক ডোবে হতাশার বিলে
বিষণ্ন প্রহর গুণে কাটে অবকাশ ৷

স্যাঁতসেঁতে চোখে প্রিয় সেই মুখ
- ওদুদ মণ্ডল

দুই তীর দোলাচলে রূপমায়াবতী,
ঢেউ তুলে ছুটে চলা অবিরাম গতি ৷
নিজের শরীর ভেঙে করে খান খান,
জোটে শুধু অবহেলা যার প্রতিদান ৷
ক্ষুধা,জ্বরা,হাহাকার প্রতি বাঁকে বাঁকে,
ক্রমাগত খুশি করা সাগরসখাকে ৷
বহুরূপে ভাঙে পাড় খরতর নদী,
ভাঙনের সুরে ঝংকার প্রতিবাদী ৷
পাড় ভাঙা বালু দিয়ে গড়ে ওঠা চর,
দানবের রোষানলে বিবাদের ঘর৷
বুকভরা বেদনায় নামে অমানিশা,
হাঁটুজলে খুঁজে মরে বাঁচবার দিশা ৷
প্রিয় সেই মুখ ভাসে স্যাঁতসেঁতে চোখে,
পাগলার বুক কাঁপে হারাবার শোকে ৷

"ব্যর্থ জন্মগ্রহন"
***রহমান মাসুদ***

ভোগ বিলা‌সে মত্ত জীবন
পা‌পের সাগ‌রে বসবাস,
হারাম হালা‌লের বি‌বেধ নেই
সততা বিসর্জ‌নে অর্থের দাস।

জীবন মা‌নেই টাকার প্র‌য়োজন
সে ম‌রি‌চিকার পেছ‌নে ধাবমান,
টাকা‌তেই মে‌লে সু‌খের হাতছা‌নি
তা রোজগা‌রে বি‌ভোর মন প্রাণ।

দু‌নিয়া‌তে গ‌ড়ে সুরম্য মহল
সুরার পা‌ত্রে তৃ‌প্তির চুমুক,
সকল কামনা বাসনা চিরতা‌র্থের
স‌র্বেসর্বা অহংকা‌রে স্ফীত বুক।

স্রষ্টার আরাধনায় শুধু অবজ্ঞা
মৃত্যু‌কে ভা‌বে সে‌তো বহু দূর,
শয়তা‌নের প্র‌রোচনার মন্ত্রগু‌নে
র‌বের নাফরমা‌নির নেশায় চুর।

বিধাতা বিশাল দয়ার সাগর
পাপীকে দেয় ভো‌গের সু‌যোগ,
তওবার দোয়ার রা‌খে খোলা
নির্বো‌ধের উদয় হয় য‌দি বোধ।

যে দেহ-মন বন্দী পা‌পের ফাঁ‌দে
তা‌তে হয়না স‌ত্যের বীজবপন,
বিনা তওবায় করুন মৃত্যু ঘ‌টে
সেই হতভাগা, ব্যর্থ এ জন্মগ্রহন।

প্রেম
- স্বরজিৎ বালা

ভালোবাসা তোমার
নয়ন তারায় ফুটে উঠেছে ,
সে যে রহেনা অন্তরে
সে যে বাহির পথে ছুটেছে ।
চঞ্চল মনের চঞ্চল আশা ,
তৃণে তৃণে জাগে ভালোবাসা ।
পুলকে পুলকে নয়নে তোমার
সাড়া যে সেই পরিছে ,
ভালোবাসা তোমার
নয়ন তারায় ফুটে উঠেছে

মধুর তোমার মুখের বরণ
মধুর তোমার হাসি ,
কাজল মাখা ঐ দু'নয়নে
যায় গো আমি ভাসি ।
কেবল চেয়ে চেয়ে থাকি ,
কেবল মিলিয়েছি আঁখিতে আঁখি ।
স্বপ্নের বাকে তাই স্বপ্ন দিয়ে
এ মন ঘর বেঁধেছে ,
ভালোবাসা তোমার
নয়ন তারায় ফুটে উঠেছে ।।

® _ স্বরজিৎ বালা

ভালোবাসতে হবেনা
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

আমাকে ভালোবাসতে হবেনা মেয়ে ,
শুধু আমার পায়ে পা মিলিয়ে মেঠোপথে হেঁটো
ওতেই আমি চোরাকাঁটা হয়ে তোমায় ছুঁয়ে দেবো ৷

তোমার পাশের বালিশটা ফাঁকা ,
তাতে কি ? সে বালিশটা নাহয় তুমি ফাঁকাই রেখো
আমাকে শুধু তোমার স্বপ্নগুলো আঁকতে দিও ওতেই হবে ৷

ইচ্ছে হলে তোমার ইচ্ছেগুলোও দিও ,
তোমার ইচ্ছেগুলোয় ভালোবাসার রং মাখিয়ে দেবো
তুমি যত্ন করে ইচ্ছেগুলো মন করিডোর সাজিয়ে রেখো ৷

তোমার চুলগুলোয় বিনি কাটতে দেবে ?
তোমার চুলের মৃদুগন্ধ পরম যত্নে আমি শুষে নেবো
বিনিময়ে যত্ন করে তোমার খোঁপায় গোলাপ গুঁজে দেবো ৷

মেয়ে তোমার ঐ অন্তরটা দেবে ?
আমি একটা মিউজিয়াম বানাবো সেই অন্তরটা দিয়ে
তোমার মাঝে যে কি যাদু আছে দেখাবো তা আজ জনে জনে ৷

পশু পূজারী
- জুয়েল মিয়াজী

বড়ো গিন্নি ছেলেকে বারবার কান্নার কারণ জিঙ্গেস করে। কিন্তু ছেলের কান্না থামিয়ে কথা বলার অবকাশ ছিলো না। শুধু কেদেঁই যাচ্ছে সে। জমিদার পুত্র ফটিকচরণ কান্নার রহস্য না উন্মোচন করলেও মা কিন্তু ঠিকই পুত্রের কান্নার কারণ বুঝে নিয়েছেন। নিশ্চই পাশে দাঁড়ানো বাড়ির চাকরানীর ছোট্ট দুষ্টু মেয়ে ফটিকের গায়ে হাত তুলেছে। তাই গিন্নি রাগে ঘৃণায় ধপাশ ধপাশ করে কয়েকটা কিল বসিয়ে দেয় মিলুর পিঠে। মিলুকে মারতে দেখে জমিদার পুত্র ফটিকচরণ বলে লাগে মা মিলুকে মেরোনা। ও আমাকে মারেনি।পায়ে বিড়ালে কামড় দিয়েছে! সত্যিই তো, মা দেখলেন ছেলের পা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। যে মা ছেলেকে মারার বিনা অপরাধে নিরিহ ছোট্ট মেয়েটির পিঠ গরম করতে পারে। সে মা চাইলেই অপরাধী বিড়ালের পরকালের টিকেট কেটে দিতে পারতেন। কারণ বিড়ালটি পাশেই ছিলো। কিন্তু তা তিনি করলেন না। কারণ এই তল্লাটের জমিদারদের একটা সুখ্যতি আছে তারা নিরীহ পশুর গায়ে হাত তোলেন না।

"জীবন লি‌পিকা"
***রহমান মাসুদ***

কোমলম‌তি শিশু       উৎফুল্ল চন্ঞ্চল
একগাদা বইখাতা,
বোঝার বয়স        হয়‌নি তবুও
জীবন ছ‌কেবাঁধা।

দুষ্ট কি‌শোর       মি‌ষ্টি কি‌শোর‌ী
রাত জাগা,
বড়‌দের শাষন      ভা‌বে জ্বালা‌তন
পে‌য়ে‌ছে অকালপক্কতা।

দুরন্ত যুবক      প্রানবন্ত যুবত‌ী
শিক্ষার সমা‌প্তি,
মধুর স্বপ্ন      হৃদ‌য়ে লালন
প্র‌য়োজন চাক‌রি।

যুবক যুবতী      অপেক্ষার প্রহর
কর্ম‌ক্ষেত্র অধরা,
বেকার জীবন       শূণ্য ‌ভুবন
ভালবাসা হাতছাড়া।

ধ্বংস জীবন      বি‌বে‌কের মৃত্যু
গ্রহন বিকল্পধারা,
পা‌পের সাগ‌র      নি‌জে‌কে বরন
অবৈধতায় দি‌শেহারা।

কালো বাজার      চোরা কারবার
টাকার ছড়াছড়ি,
উপ‌রের মহল     সন্ত্রা‌স‌ী জনবল
সর্বদা দরকা‌রী।

ক্ষমতাস‌ীন দল     বি‌রোধী দল
হা‌তে অনর্গল,
পট প‌রিবর্তন     যতই আন্দোলন
অনুদা‌নে বাহুবল।

লাল ফি‌তে     বাঁধা ফাইল
অনিয়‌মে প‌রিপূর্ন,
উৎকোচ প্রদান      সব সমাধান
অনু‌মোদন গণ্য।

ধর্ম কর্ম      সামা‌জিক অনুষ্ঠান
অতি‌থি প্রধান,
থানা পু‌লিশ      জেল হা‌জত
আদ‌রের মেহমান।

জীবন‌ক উপ‌ভোগ      সহ‌জেই সম্ভব
অগ‌নিত র‌ক্ষিতা,
অবৈধ মেলা‌মেশা     যৌনতার মাদকতা
সমা‌জেও বাহবা,

নেই মান‌বতা      খুনাখু‌নি‌তে সফলতা
প্র‌তিপক্ষ‌কে বিনাশ,
আন্ডার ওয়ার্ল্ড       হা‌তের মুঠ‌োয়
তৃ‌প্তির নিশ্বাস।

কা‌রো ভাই        কা‌রো গুরু
অচি‌রেই ডন,
সময় নিষ্ঠুর        বয়‌সের কার‌নে
মৃত্যুর আগমন।

এভা‌বেই শেষ       পৃ‌থিবীর আবেশ
জন্মা‌নো শিশুটা,
কেন হ‌লো       এভা‌বে লিখন
জীবন লি‌পিকা।।

দেবিদ্বার পৌরসভার কুমিল্লা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের বেহাল অবস্থা। জনদুর্ভোগ চরমে।
- এম,এ,সোহাগ ভূইয়া
দেবিদ্বার পৌরসভার ভেতর দিয়ে চলে যাওয়া কুমিল্লা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়ক চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। তার ওপর পৌর শহরের ওপর দিয়ে যাওয়া প্রায় পাচঁ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার বেহালদশা মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন এই জনপদের লাখ লাখ মানুষ।
অধিকাংশ রাস্তার ইটের ওপর থেকে পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে ছোট-বড় গর্ত। এরমধ্যে ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করায় প্রতিদিন ঘটছে দুর্ঘটনা। আর পিচ উঠে যাওয়া রাস্তায় গাড়ি চলাচলের সময় ধুলাবালি মানবদেহে ঢুকে দানা বাঁধছে শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগ। রাস্তার দুপাশের বাড়িঘর ইট খোয়ার ধুলায় বিবর্ণ হয়ে গেছে। জানা গেছে, পৌরসভার অধিকাংশ পাকা রাস্তা অনেক আগে নষ্ট হয়ে গেছে। আধাপাকা রাস্তাগুলো নষ্ট হওয়ার পথে। নিউমার্কেট থেকে বানিয়াপাড়া হয়ে বারেরা পর্যন্ত বেশি নাজুক অবস্থা।আর এই দের কিলোমিটার রাস্তাটির বেহালদশায় পৌরবাসীর জন্য মহাবিড়ম্বনার। এ রাস্তা দিয়ে প্রতিদিন সদর হাসপাতালের রোগীসহ হাজারো মানুষ যাতায়াত করেন। হাসপাতালের গাইনি বিভাগের এক কর্মচারী জানান, এ রাস্তা দিয়ে গর্ভবতী মহিলারা হাসপাতালে আসার সময় কারও কারও বাচ্চা রাস্তায় প্রসব হয়ে যায়। হাসপাতালে আসার একমাত্র এ রাস্তাটি এখন রোগীদের মরণফাঁদে পরিণত হয়েছে।
দেবিদ্বার থানার ভিংলাবাড়ি থেকে কংশনগর পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক যেন এক দুর্ভোগ আর বিড়ম্বনার নাম। এই এলাকার সড়কগুলো এখন এলাকাবাসীর গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের সব অংশজুড়ে খানাখন্দ, ভাঙাচোরা আর বড় বড় গর্তের কারণে চলাচলে লোকজনদের পোহাতে হয় চরম দুর্ভোগ। যা ধুলোবালি আর যানজটের কারণে বেড়ে যায় কয়েকগুণ অসহনীয় পর্যায়ে। প্রায় অনেক বছর ধরে সড়কের এ বেহাল অবস্থা থাকলেও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নেই কোনো উদ্যোগ। ফলে জনপ্রতিনিধিদের ওপর ক্রমশ ফুঁসে ওঠতে শুরু করেছে স্থানীয় জনতা।
এখন বানিয়া পাড়া থেকে বারেরা পর্যন্ত মহাসড়কে যানবহন চলাচলের অনুপযোগি হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায় রাস্তার দু’পাশে ভাঙ্গা চুরা এবং কয়েক ফিট পর পর বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। বড় যানবাহন তো দূরের কথা সাধারন বাইসাইকেল চালানোও বর্তমানে কঠিন হয়ে পড়েছে। বর্তমানে সড়কটিতে অগনিত খানা-খন্দকে ভরপুর। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক বর্তমানে যানবাহন এবং জনসাধারণের জন্য মরণ সড়ক হিসেবে আর্বিভূত হয়েছে। স্থানীয়রা জানান দ্রুত ব্যস্ততম এই সড়কটি সংস্কার না করলে সড়কটির অবস্থা আরও শোচনীয় হয়ে যাবে,কাজ টেন্ডার হয়ে গেলেও তা এতো বিলম্ব হচ্ছে কেন তা এখন সাধারন জনগনের প্রশ্ন। তাই সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি ও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অতি জরুরী এগিয়ে আসতে হবে।

সুখ সমীকরণ
- জুয়েল মিয়াজি

ত্রিশাল বাসস্টপেজ হয়ে লাল অালোর ল্যাম্পপোস্ট পেরিয়ে   বালিপাড়া রোডে  পাঁচ ছয় মিনিট ক্লান্ত না হয়ে অাবার দম নিয়ে মিনিট পাঁচেক মানুষ ঠেলে হাটার পর যে  দোকানটি দেখতে পাবেন ওটার নাম শাহালম এন্টারপ্রাইজ।পাশে চালের মোকাম, ইট বালু সিমেন্টও পাওয়া যায়। সুতিয়া নদীর ওপাড়ে যারা থাকে তাদের জন্য মানুষ ঠেলে বাসস্টপেজ হয়ে এখান পর্যন্ত অাসতে একটু কষ্টই হয়। তবে সুখবর!  এখানে অাগ পথের মতো ট্রাফিকজ্যামের সমস্যা  নেই , অসাবধানতা বশত বাসের নিচে পরে মরারও ভয় নেই।সুতরাং  খুশি হওয়া চলে, প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া চলে। তবে না  অত বেশি খুশি হওয়াও চলে না। পৃথিবীতে প্রাণভরে শ্বাস নেওয়া এতো সস্তা ব্যাপার নয়।সমস্যা সর্বত্র,  এখানেও ! মানুষ ঠেলে ঠেলে ভিতরে প্রবেশ করার। সে সাথে ঘাম অার ঘামের গন্ধ বিনিময়!  অবশ্য এখানে বিনিময় প্রথাই চলে। ঘাম অার রক্তের বিনিময়ে টাকা।সে কারণে প্রতি বুধ ও বৃহস্পতিবার রাহেল এখানে এসে বাড়তি বিড়ম্বনায় ভোগে।মানুষের হাহাকার, সুখী হওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা দেখে সে বিস্মিত হয়।সার্কাস খেলার মতো।লটারির মতো মহাজন কামলাদের ভাগ্যের চাকাতে দুলাতে থাকেন। গালিগালাজ, হাসি তামাশা, মোবাইলের রিংটোন অার ঠাট্টা মশকরার তাল লয় হীন শব্দ কানে এসে বিড়ম্বনা বাড়ায়।বাজে কথার শব্দ দুষণ, কোলাহল দেখে রাহেল ভাবে অাজ ভুল করে মাছ বাজারেই চলে অাসলাম নাকি?তবে এটা পূর্বকার ভাবনা, অাগে সে এমনটাই ভাবতো!এখন এসব সয়ে গেছে সে। এক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে বিনিময় প্রথা!  দোকানের অন্দরমহলে কালো কাপড়ে মোড়ানো কামরায় পনেরো ষোলো বয়সী মেয়েটি এক অকালপক্ব কিশোরকে নিয়ে তার জন্য অপেক্ষায় থাকে।তাদের সাথে বিনিময় হয়।কথা হয়,হাসি হয়, তামাশা হয় তবে পড়াশোনাটাই মুখ্য এটি নিয়েই মূল  বিনিময়। মহাজনের ছেলেমেয়েকে নিয়ে  প্রাইভেট  টিউশনি।নিরবে, মনোযোগে একঘন্টা পড়াতে হয়।মহাজনের হুকুম পড়াশোনায় গাফিলতি চলবে না।তাই রুমে নিরবতা অানার জন্য সদর দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়।কিন্ত বাহিরের দরজা বন্ধ হলে কি হবে, ভিতরের দরজা অবিরাম খোলা থাকে। এই দরজা বন্ধ করার সাধ্য থাকে না রাহেলের। তাদের কথা মেনে নিতে হয়। যা বলে তাই!  ষোল একে ষোল, ষোল দুগুণে চৌষট্টি!  হা  প্রীতম তুমি ঠিকই বলেছ! তোমার কথাই ঠিক। তোমার সাথে তর্ক করা যাবে না।তবে বোরকা পড়া মেয়েটি তেমন দুষ্ট না।বোকা মেয়েও বলা চলে না।স্যারকে বিড়ম্বনায় পেলানোর জন্য সেও বুদ্ধি বের করে।উদ্ভট সব অংক বের করে এনে স্যারের কাছে জিঙ্গেস করে।স্যার মাইনাসে মাইনাসে প্লাস হয় কেন? রাহেল এসব উদ্ভট প্রশ্নে অবাক হয়,রাগ হয়।মাঝেমাঝে মন চায় দুটার গালে ঠাশঠাশ করে কয়েকটা বসিয়ে দিতে।কিন্তু উপায় নেই,মারলে ওরা নালিশ করবে।পেটবানিয়ে কথা বলবে।বাজে মাষ্টার কিছুই পড়াতে পারে না।এমন বাজে লোকের কাছে না পড়াই ভালো, অামরা ওনার কাছে পড়বো না বাবা।মহাজন ছেলেমেয়ের কথা বিশ্বাস করে হয়তো  বলবে তখন রাহেল তোমার কাল থেকে অাসতে হবে না।তখন কি হবে? তেমন কিছু না, শুধু দুঃখ উপভোগ করার সুযোগটা পাবে না।এই পৃথিবীতে যে লোক দুঃখ উপভোগ করতে পারে না তার জন্য বেঁচে থাকাটা দুঃসহ! রাহেল তাই দুঃখ উপভোগ করে।সেবারও করেছিল স্বপরিবারে।তখন রাহেল গ্রামের বাড়িতে ছিল।ধানের মরশুমে, জমি থেকে একবছরের খোরাক অাসে তাদের ।  চলে কোন রকম এই অার কি! একবেলা পেটভরে আরেকবেলা না  খেয়ে ।কিন্তু সে বছর কোনরকম ভাবেও চলা যায় নি।ধান ভাঙানোর অাগে সূর্যের তাপে ধান গরম করতে হয়,তা না হলে চাল ভেঙে যায়।সেটাই কাল হয়েছিল, হঠাৎ বৃষ্টির পানির সাথে মিশে  ধান স্রোতে পুকুরের পানির সাথে মিশে যায়। তারা অনেক চেষ্টা করেছিল, ধান ঘরে তোলা যায় নি।রাগ করে তারাও পা দিয়ে ঠেলে পুকুরে পেলে দেয়।যাবেই তো যা!কি অভিমান!  না অভিমান নয়,উপভোগ!  সেবার মা বাবা ছেলে মিলে দারুণ দুঃখ উপভোগ করতে হয়েছিল তাদের। কিন্তু সে কথা এখন কেন? রাহেল তাই পূর্বেকার দিনের স্মৃতি ভুলতে জানালার ফাকে তাকিয়ে মহাজন এবং  কামলাদের কথা শোনে।অাশা ভরা চোখ নিয়ে ফ্যালফ্যাল করে কামলারা তাকিয়ে থাকে মহাজনের দিকে।মহাজন ভিজ্ঞের মতো সবার দিকে তাকিয়ে কে কেমন কাজ করলো ঠাওর করে টাকা বিলান।কষ্টের টাকা তাই কাউকে অযথা টাকা দেওয়া যাবে না।তিনি হিশেব করে টাকা দেন। তখন এমন ভাব করেন,  তিনিই যেনো কামলাদের কাছে টাকা পাবেন।এই সময় ওদের একহাতে খালি টিফিনবক্স অারেক হাত খালি রেখে হাত মেলে সামনে রাখে।মহাজন,মাইয়াটার অসুখ করছে।মহাজন না শোনার ভান করে টাকা গুনতে থাকেন।কার ঘরে কি হলো সেটা শোনার সময় মহাজনের থাকবে কেন? মহাজনের নিজেরও তো সংসার অাছে।মহাজন বয়রা, কখনো তিনি কথা বলেন নি যেনো।চুপচাপ টাকা বিলিয়ে অাপদ তাড়ান। মহাজনের কৃপায়  কামলাদের  খালি হাত পূর্ণ হলে ওদের মুখে হাসি ফোটে।মোবাইলের টুংটাং অাওয়াজ, হ্যালো মা ঘুমাস নি।অাব্বা চইলা  অাইতেছি।রাহেল তাদের হাসি দেখে,হাসির পিছনের দুঃখ দেখে।সুখদুঃখের গল্প নিয়ে সে গল্প বানায়।ক্লান্ত হয়ে যায়,ওরাই বেশি ক্লান্ত হয়ে যায়।স্যার ছুটি দিবেন কখন? মায়ের শরীর ভালো নেই।কিন্তু এই অার কি! ওর মায়ের শরীর তো প্রায়শ খারাপ থাকে।মায়ের শরীর ভালো নেই বলে এর অাগে অনেকবার প্রীতম ছুটি নিয়েছিল। রাহেল নিজেও জানেন মহাজনের স্ত্রী ভালো থাকেন না।সম্ভবত সে কারণেই মহাজনের মন ভালো থাকে না। মন ভালো থাকে না বলে তিনি কামলাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করেন।এটা যুক্তি! মানুষই তো! ঘরের মানুষ অসুস্থ থাকলে কার মন ভালো থাকবে? রাহেল মহাজনকে ক্ষমা করে দেয়।প্রীতমকে ছুটি দিয়ে  রাহেল তাদের মা বাবার সেবা করার উপদেশ দেন।রাহেলের হঠাৎ মৃত মায়ের কথা মনে পড়ে মন খারাপ হয় তাই অাজ ফাতেমাকে পড়াতে মন চাচ্ছে না।যাও ফাতেমা তোমারও ছুটি।কিন্তু ফাতেমা ছুটি নিল না।একটা প্রশ্নের উত্তর পড়া হয় নি এখনো।বাংলা বইয়ের পড়া।বাংলা স্যার বাড়ির কাজ দিয়েছেন।দক্ষতামূলক প্রশ্ন ; তোমার দেখা একজন সুখী মানুষ সম্পর্কে প্রবন্ধ লেখ।ছাত্রীর দেওয়া  প্রশ্নের শিরোনামে রাহেল নাজেহাল হয়ে যায়।চোখের সামনে একের পর এক মানুষের মুখচ্ছবি ভেসে আসে। মহাজন থেকে কামলা পর্যন্ত সবাই।এত এত মানুষ পৃথিবীতে!  সবাইকে নিয়ে গবেষণা, তাদের সুখ দুখ নিয়ে প্লাস মাইনাস সমীকরণ করেও রাহেল একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ সুখী মানুষও খুঁজে না পেয়ে  রাহেল হাল ছেড়ে দেয়। নিজেকে নিজে একের পর এক প্রশ্ন করতে থাকে। তবে কি আমরা  কেহই সুখী নই?

ত্রিশাল ,ময়মনসিংহ ,বাংলাদেশ ।

মন
- শাহিনা কাজল

বৃষ্টি আসলেই ধুয়ে নেই সুযোগ বুঝে
আর রোদ হলেই শুকাই আঁচল খুলে
ঝড়ের আঙিনায় বাতাসের গন্ধ শুষে
রাতের অন্ধকার সাজাই
তুলকালাম ঢেউয়ে।

মন; ভোরের মুক্ত হাওয়ার ছন্দে
শিশিরের মত উবে যায় আলোয়
সময়ের উল্টোপিঠে বসতে পারবে না জেনে
প্রগতির রঙ মেখে ঘুমায় কষ্টের পাদপীঠে।
আধুনিকতার রঙিন স্বপ্ন এঁকে
নিশ্চিন্তে চলে উদ্ভট গন্তব্যে।

মন ; আগুনের বহুমাত্রিক রূপের নির্যাস
সমাজের লাল চোখে পিষে যায়,
মৃত্যুর সমকেন্দ্রে সমর্পিত হয়
বারবনিতা কিংবা লাজুক বেশ।

কবিতার কথা
- মরিয়ম আক্তার

ভালোবাসি....
কথাটিতে যে কত আবেগ
মমতা,আর ভরশার বিষয়টি
লুকিয়ে থাকে তা তোমাকে
বলে বোঝাতে পারবো না।
হয়তো ভালোবাসি বলে....
ভালোবাসার রয়েছে কিছুটা
অন্যরকম মানে....
কিছু পাগলামি,অভিমান
আর সবচেয়ে বেশি থাকে যেটা
তাযে দুটি মনের মিলন.....
ভালোবাসা এমনই।
কখন কেমন করে যে হয়ে যায়
বোঝাতে পারবো না তোমায়
হয়তো ভালোবাসি বলে।
কিছুটা নির্ভরতা,কিছু স্মৃতি
আর কিছু প্রেমের নিরব মুহূর্ত
কখন যে দুজনের মনকে
একাকার করে তোলে....
তা তোমাকে বোঝাতে পারবো না
হয়তো ভালোবাসি বলে।
আজ শুধু তোমায় বলতে
খুব ইচ্ছে করছে আমার.....
তোমার বুকে যেন থাকতে পারি
জনম জনম ভর।
তাইতো আজ বলতে কোন
বাধা নেই......
ভালোবাসি,তোমায়।'

দারুন বলেছে কবিতাটা তুমি
ব্যাকুল করেছো মন,
কথা দাও তুমি, আমার পাশে
থাকবে সারাজীবন,
কবিতা হয়ে রবে মোর মাঝে
আমায় করে কবি,
কবিতার জন্য কবি যে আজ
করতে পারে সবই।
বাসবে ভালো আমাকে কি?
রাখবে তোমার মনে,
কবিতা কি রবে না বলো
প্রেমিক কবির সনে।

প্রেম মানে যাতনা
দুঃখ অপরিমান
পারবো না তাই করতে ছলনা
ভালোবাসার অপমান।
ভালোবাসা মানে.. শুধু বেদনা
কষ্ট যে রাশি রাশি
দুঃখ দিয়ে যে পোড়াবে আমাকে
কেড়ে নেবে মোর হাসি।
তাইতো তোমায় দেব না কথা
বলবো না ভালোবাসি,
কখনো তুমি বলো না যেন
তুমি কবিতার কবি।

আকাশটা দেখ কত সুন্দর
বৃষ্টি আমার হবে,
বুকে জড়িয়ে রাখবো তোমায়
ঝড়তে যাবে যবে।
আসতে দেবো না কোন কালো মেঘ
তোমার মনের কোনে,
সারাজীবন আকাশ হয়ে
থাকবো তোমার সনে।
আগলে রাখবো তোমায় আমি
খুব যতন করে....
ভালোবাসার পরশ দিয়ে
আমার বাহু ডোরে।

ভয় যে করে ভীষণ আমার
মেঘ যদি ভীর করে,
আকাশ থেকে বৃষ্টি তবে
যাবে হঠাৎ ঝড়ে।
তাইতো ভালোবাসতে গিয়েও
যায় না ভালোবাসা
কষ্টের কথা পড়লে মনে
হয়না কাছে আশা।
তাইতো আমি বলছি তোমায়
ভালোবেসো না মোরে,
তোমার প্রতি রবে ভালোবাসা
থাকোই যতো দূরে।

নিঝুম রাতের শশী কে দেখ
আলো ছড়ায় যেমন,
আমার বুকে আছো তুমি
রবির বুকে যেমন।
দিনের বেলায় রবি দেখ
ফুটায় কতো আলো
তোমার মাঝে রয়ে আমি
দুর করবো সব কালো।
রবি ছাড়া শশী বলো
ছড়াবে কেমনে আলো,
তোমায় সখী বাসি আমি
অনেক অনেক ভালো।

সত্তি বলছো তুমি আমায়
যাবে নাকে ছেড়ে,
বাধবে কি তুমি সুখেরই ঘর
শান্ত নদীর তীরে।
বাসবে তুমি আমায় ভালো
হয়ে কবিতার কবি,
হবে বলো সারাজীবন
শশীর তুমি রবি।
আকাশ হয়ে বৃষ্টি কে তুমি
রাখবে বলো বেধেঁ
মেঘ হয়ে আসবে নাতো
বৃষ্টি র ঐ চোঁখে।

দুর পাগলি বলছো কি সব
তোমার আমি পাগল,
তোমার চোঁখে দেবো না আসতে
এক বিন্দু জল।
রাখবো তোমায় যতন করে
আমার বুকের মাঝে,
দেবোনা তোমায় কোন আঘাত
যতই ঝড় আসে।
তোমার জীবন রাঙ্গাবো আমি
ভরিয়ে দেবো আলো
একটি কথাই বলবো
তোমায় আমি বাসি ভালো।

কিন্তু এমন কেন হলো
কবিতা আজ কবির প্রেমে
পাগল কেন বলো....
একা একা যায় বলে সে
নীরব প্রেমের কথা....
সব স্মৃতি যে গুমড়ে গুমড়ে
দেয় তাহাকে ব্যাথা.....

কবি বাবু,
কেমন আছ তুমি
নিশ্চই খুব খুব ভালো আমাকে ছেড়ে।
আচ্ছা বলোতো আমি কে?
কি হলো চিনতে পারছো না বুঝি
নিশ্চই দেখতে পারছো না
কিংবা বুঝতে পারছো না
হয়তো পাচ্ছো না আমায় খুজে।
খুব কি আবছা হয়ে গেছি আমি
তোমার ঐ দৃষ্টিপটে,
তবে সত্তি হারিয়ে গেছি আমি
আমার অজান্তে, তোমার বেখেয়ালে
কোন এক ময়লা আবর্জনা ঘেরা
ধুলার স্তুপে........।
ঠিক ধরেছ তুমি
ধুলার স্তুপের নিচে পড়ে থাকা
কবির কবিতা আমি।
কবিতাকে আজ কেউ ভালোবাসে না
কেননা কবি যে আজ দিশেহারা
তার আপন জগতে....
কবি আজ ভালোবেসে কবিতা গড়তে
খুব উদাসীন....
কবি যে আর কবিতাকে ডেকে বলেনা
ভালো আছো তো....
কবি হয়তো ভাবতে ভুলে গেছে
কবি ছাড়া কবিতা কেমন করে পাবে
নতুন রূপ, নতুন কোন ঠিকানা।
তাইতো আজ কবিতা খুজে পেয়েছে
নতুন জগৎ.......
যেখানে তার সাথী হয়ে আছে
ধুলা ময়লাযুক্ত কষ্ট বেদনা।
কবি ছাড়া কবিতার পরিনতি যেমন
আজ আমার অবস্থা ঠিক তেমনই।
এতোক্ষনে হয়তো মনে পড়েছে
কে এই আমি??
হ্যা আমি তোমার------ না না
আমি যে কবির কবিতা।
আমি যদি তোমারই হতাম
তবে এভাবে আমায় ভুলে থাকতে
পারতে না হে কবি বাবু।
পারতে না কবিতাকে ছেড়ে
নতুন কনো গল্প লিখতে
কিংবা কোন গান।
খুব ভালোবেসেছি তোমায়
আজও বাসি....
আর নিশ্বেষ হওয়ার আগ অবধি
ভালোবেসে যাবো।
কেননা ভালোবাসা যে কাকে বলে
তাতো আমি তোমার থেকে শিখেছি
আমি যদি তোমার শিখিয়ে দেওয়া
ভালোবাসাকে ভুলে যাই
তবে যে----------
তোমাকে অবমাননা করা হবে।
জন্জালপূর্ন ধুলার স্তুপে না হয়
কবিতার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে
হোক না তাতে কি?
কবিতার প্রতিটি প্ঙংতি প্রতিটি চরন
প্রতিটি শব্দ শুধু বার বার করে বলবে
কবি খুব খুব ভালোবাসি তোমায়।
আচ্ছা কবি বাবু,
মনে কি আছে তোমার
আমাকে তুমি শশী ঊপমা দিয়েছিলে
তুমি হয়ে রবি
তবে কেমন করে বলো
রবি ছাড়া শশী
কিরন ছড়াবে এ ধরাতে,
কেমন করেই বা দুর করবে
তিমির রাত্রি।
আমাকে তুমি বলেছিলে বৃষ্টি আমি
আর তুমি আমার আকাশ
তবে কেন আজ
আকাশের বুকে বৃষ্টি নেই?
কেন ঝড়ে পড়লাম আমি?
তোমার বুকে কেনই বা আমায়
আকড়ে ধরতে পারলেনা?
কেনই বা আজ
রবি থেকে শশী এতোটা দুরে?
আর কেনইবা কবি ছিড়ে ফেললো
ভালোবাসার কবিতার খাতা???
জানোতো কবি বাবু
তোমার কবিতা খুব কষ্টে আছে
ধুলার স্তুপের নিচে পড়ে থেকে
খুব কাতর আজ সে,
স্তুপের মাঝে সে এখনো
তোমায় ভেবে দিন পার করে
এই ভেবে---- যে তার কবি
পরম যত্নে গভির ভালোবাসায়
জন্জালপূর্ন ধুলার স্তুপ থেকে
কবিতাকে বের করে এনে
বুকে জড়িয়ে ধরে বলবে
এইতো আমি তোমার ভালোবাসা
তোমার কবিতার কবি।।।

এমন কেন ভালোবাসা
কেন এতো কষ্টের, কেনইবা যাতনার
কেওকি আছে বলবে কি একবার।।

প্রগতির জবানবন্দী
- শাহিনা কাজল

আফরিন -গৌটার পথে পথে
ঝুরঝুরে রোদের মত ঝরে পড়া মৃত্যু
বিস্তীর্ণ মাঠে ভেসে বেড়ায়
বারুদের গন্ধ আর ভূবনবিদারী আর্তনাদ
নৃশংসতার ভয়াল চিত্রে ভিজে যায় মনের মানচিত্র
প্রলয়ের মুঠো মুঠো অশ্রু চোখের ভেতর
প্রতিনিয়ত এঁকে দেয় রক্তনদ
প্রযুক্তির ভারে কঁকিয়ে ওঠে বিশ্বমানবতা
হিংস্র হায়েনার থাবা
ক্ষত বিক্ষত করে ইতিহাসের বারান্দা
ধর্ষিতার লাশ পড়ে আছে পাথরের ফাঁকে ফাঁকে,
থোক থোক রক্তের ছোপ রাজপথে
গগণ বিদারী আর্তচিৎকারে নিস্তব্ধ চারপাশ,
বিশ্বস্ত বিবেক তলিয়ে গেছে মিথ্যের গহ্বরে।

মনুষ্যত্বহীন কামনার ডাস্টবিনে ডুবে গেছে চাঁদ
বিকৃত লালসায় ধর্ষণ চিত্র জ্বলে চোখের ভেতর,
আমি ঘুমোতে পারি না।
হিংস্রতার বুনো হাওয়ায় দোলে দিনরাত
নতুন শহর, বেড়ে যায় কফিনের কাপড়
দোলে বনি আদমের শীর্ষদেশ
দাউ দাউ জ্বলে প্রলয় শিখা এ প্রগতির।

জলাভূমিতে নেই জল আছে তাজা রক্তস্রোত।

অগ্নি শিখার মত বাড়ে নিঃষ্পাপ শিশুর
ব্যর্থ চিৎকার, আহাজারি।

আমি পথ চলতে শুনি কোলাহলের ভেতর
সে করুন আর্তি,
দেখি পথে পথে পড়ে থাকা রক্তাক্ত লাশ
সন্তান শোকে শোকার্ত মায়ের অশ্রু।

ওরা বাঁচতে চায়, কাঁদতে দাও ওদের
স্বজন হারানোর বেদনায়
মিছিলে মিছিলে পুনর্জন্ম যদি হয়
কফিনবন্দি মানবতার।।

শেষ অধ্যায়
- দেবারতি গোস্বামী

ছেলেরা এসেছে,সাথে বৌমারাও,রনো মানে মেজছেলেটাকে কত যুগ পর দেখলেন দিবাকর বাবু।জার্মানিতে থাকে,বহুবছর ধরেই গৃহছাড়া!বড় ছোট অবশ্য কলকাতাতেই settled....বেশ ভাল লাগছিল দিবাকর বাবুর,পরিবার একসাথে আবার!হোক না বৃদ্ধাশ্রমে,তাও পরিবার তো পরিবার ই!!
----"বাবা,বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরল নাকি তোমার?এই বুড়ো বয়সে প্রেমিকা জুটিয়েছ?ছিঃ ছিঃ ছিঃ এই খবর যদি জানাজানি হয়,কোথাও মুখ দেখাতে পারব?"
অবাক চোখে রনোর মুখের দিকে তাকিয়ে দিবাকর সেন,বাহ্ কি সুন্দর বাংলা বলে ছেলেটা,কে বলবে এত বছর ধরে বাংলার বাইরে?
"দেখুন বাবা চুপ করে থাকবেন না,কিছু বলুন, is it true?please say something না"

--"ছোটবৌমা বলেছিনা,ঘরের লোকের সাথে যখন কথা বলবে,খুব দরকার ছাড়া বাংলাটাকে ছেড়োনা,সবাই ছেড়ে যাচ্ছে ওকে,বড্ড মন খারাপ করবে ওর!"

--"বাবা,তোমার পাগলামিটা বেড়েছে দেখছি,বৃদ্ধাশ্রম না,পাগলাগারদে পাঠাতে হবে মনে হচ্ছে!একজন প্রাক্তন কলেজের প্রফেসর এর একি রুচি?সত্যি বল,ঘটনাটাকি সত্যি?"

----"হুমম সত্যি,বাকি জীবনটায় একজনকে পাশে চাই!একটা কথা বলার লোক,একটা পাশে থাকার লোক,বুড়ো হয়েছি কিন্তু এখনো তো রক্ত মাংসের সেই আগের মানুষটাই রয়ে গেছি।"

---"মাকে ভুলে গেলে?এই তোমার নৈতিকতা?"

---"তোমার মাকে মৃত্যু মুহুর্ত অব্দি ভুলতে পারবনা।এক একটা স্মৃতি মনে আছে,আঠারো বছর আগে যেদিন তোমার মা মারা যান,আজ অব্দি এক মুহুর্তের জন্য তাকে ভুলিনি"

-----"তবে এসব কেন?আর এখানে থাকা চলবে না,আজই বাড়ি চল"

---"এখানে আমার আসাটা তোমাদের সিদ্ধান্ত ছিল,কিন্তু এখান থেকে যাওয়াটা আমার।বাড়ি ফিরে যাও তোমরা।আজ থেকে এই যোগাযোগটুকুও রেখোনা,ভয় নেই আমার জন্য মাথা নিচু হবেনা"।

বিকেল হয়ে এসেছে সবে,মালতীবালা স্মৃতি বৃদ্ধাশ্রমের সামনের নারকেল গাছটায় রোদদুর লেগে আছে।বাগবাজারে নিজের বাড়িটার সামনেও ঠিক এমন করেই বিকেল হত,গঙ্গার ঘাটের পাশে বন্ধুরা মিলে তখন তাস খেলত,রেণু মানে ওদের মা বিকেলে কেয়া সাবান দিয়ে গা ধুয়ে সারা গায়ে হাতে বোরোলিন লাগাত,ছাদে টাঙানো ভিজে শাড়ি থেকে জল পড়ত টুপটাপ..টুপটাপ!বড় ছেলেটা ছোট থেকেই বড্ড দুরন্ত,রনো আর ছোটটা সে তুলনায় শান্ত,রতনের ডালপুরি নিয়ে আসতেন কলেজ থেকে ফেরার পথে,কলেজstreet অলিতে গলিতে মাঝে মাঝে খুঁজে বেড়াতেন জীবনানন্দ,রবীন্দ্রনাথদের।পুরনো বই এর গন্ধ মেখে যখন বাড়ি ফিরতেন,রেণুর নাকে সিঁদুর লেগে থাকত রোজ সিঁদুর পড়তে গিয়ে,মাসিমা বলতেন,

"দিবাকরের বৌডা বর সুহাগী হইসে,নাগে সিনদুর লাইগগা রয়,আমাগো ব্যাডা বৌরে বড় বালোবাসে"

-----"তোমার ছেলেরা কি বলল?রেগে গেছে খুব?আমায় কি খারাপ ভাবছে!"

হৈমন্তীর কথায় বাগবাজারের বাড়িটা থেকে মালতীবালা বৃদ্ধাশ্রমে ফিরে এলেন দিবাকর সেন।

"ওরা কি ভাবল তাতে কি এসে যায় বলো?বাবা নামক জীবটি এখন ওদের কাছে কেবলমাত্র একটা জীবিত মানুষ,আর কিছুইনা"!

"হুমমমম"

হৈমন্তী তখন আঠারো কি উনিশ,ট্রেনিং করেই প্রাইমারি স্কুলে চাকরিটা হয়ে গেল।বৌদিটা বড্ড রুগ্ন ছিল।খেতনা কিছু!তাছাড়া ভালো খাবার খাওয়ার মত অবস্থাও ছিল না,দাদার একটা ছোট মুদিখানার দোকান।অর্ধেক লোক জিনিস কিনে টাকা না দিয়ে চলে যায়।সেই ছোট্ট বয়সেই সংসারের হালটা নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল হৈমন্তী,তুফানকে জন্ম দিতে গিয়েই বৌদি মারা গেল,দাদা খুব বড় একটা শক্ পেয়েছিল,কেমন যেন হয়ে গেল তার পর থেকে!পুরো সংসারের দায়িত্বটা তখন হৈমন্তীর উপর।তুফান খেতে চাইতনা,সারা বাড়ি ঘুরে গল্প বলে খাওয়াতে হত,পিসিমার কাছে গল্প না শুনলে নাকি তার ঘুমই আসে না,অং বং চং বানিয়ে বুনিয়ে গল্প বলা।টাইফয়েড হল,ডাক্তার বলল অবস্থা খারাপ,সত্যপীড়ের মন্দির থেকে টানা দুমাইল দণ্ডি কেটেছিলেন।তারপর একদিন তুফানের বিয়ে হল, বউ এল!পিসি কেমন যেন পর হতে লাগল,পিসিকে ছাড়াই ঘুমায় এখন,পিসির হাতের নাড়ু খেলে এখন গ্যাস হয়,প্রাইভেসি নষ্ট হয় ওদের,
বোঝা বাড়িয়ে থাকেননি হৈমন্তী দেবী,চলে এসেছিলেন মালতীবালা বৃদ্ধাশ্রমে,এত কিছুর মাঝে নিজের সংসারের স্বপ্নটা দেখা হয়েই উঠলনা।যে দেখাতে এসেছিল তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন!যেতে চায়নি ছেলেটা....সে আজ থেকে কত বছর আগেকার কথা...

--"হৈমন্তী,আমি রেজিস্ট্রি অফিসে খবর দিয়েছি,ওরা কিছু দিনের মধ্যেই ডেট দিয়ে দেবে"

দিবাকর সেন কথাটা বলে তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে,ক্যানসারে রেণু যখন মারা গেল,সব ছেলেরাই মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথে।মানুষের বয়স যত বাড়ে ততই একলা হয়ে যায়।তাসের ঠেকটা ভেঙে গেল,মেজ ছেলে জার্মানিতে চলে গেল,অন্যরা কাজের সুবিধায় যে যার নিজের flatএ।কথা বলার একটা লোক ছিল না,গল্প জমে গিয়েছিল অনেক,বলার কেউ নেই!নাতি নাতনি বাড়িতে এলে আকাশ দেখাতেন,কালপুরুষ অরুন্ধতী সাঁঝতারাদের চেনাতেন।বলতেন "ঐ যে আকাশে যে তারাটা সব থেকে বেশী জ্বলজ্বল করছে,ওটা তোমাদের ঠাম্মি"!মনে মনেই কত কথা বলে যেতেন,একদিন বড় ছেলে এখানে নিয়ে এল,বাগবাজারের বাড়িটা সেই তবে থেকে তালা বন্ধ!

"হৈমন্তী তোমায় আমি বাগবাজারের বাড়িটায় নিয়ে যাব কেমন?জানো রান্নাঘরটার পাশেই সেন বাবুদের কামিনী গাছটা,কি দারুন গন্ধ বেড়োয় কি বলব তোমায়,আর ঠাকুরঘরটা,দখিন খোলা জানালা,রেণু বড় শখ করে জানালাটা বানিয়েছিল,জানো আমার ঘরে একটা গ্রামোফোন আছে,তাতে........."

দিবাকর বাবুর মুখে এ কথা গুলো খুব কম করেও কয়েক লক্ষবার শুনেছেন হৈমন্তীদেবী।তবু শুনতে ভাললাগে,জীবনে হৈমন্তীর বসন্ত আসেনি এর আগে কোন দিন,আসার ফাঁকটাই নিজের হাতে বন্ধ করে দিয়েছিলেন।তুফানকে নইলে মানুষ করবে কে?আজ এত বছর পর জীবনের সায়াহ্নে এসে বসন্ত কেন এল?কেন আবার ঘর বাঁধতে শখ হয়?এক মাথা সিঁদুর পড়ে শাঁখা পলা পড়া হাতে ভাঙা কলাই এর ডাল,আর আলুপোস্ত করে লোকটাকে খাওয়াতে ইচ্ছে হয়?সন্ধ্যেবেলা প্রদীপ জ্বালিয়ে গলায় কাপড় দিয়ে জল ছেটাতে ইচ্ছে হয়,দিবাকর সেনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন একবার।উনি বলেছিলেন
"হৈম,দুটো অসহায় একাকিত্বে ভোগা মানুষ যখন কাছে আসে,হাতদুটো বড্ড চেনা চেনা লাগে জানো?একই দুঃখ,ঘা খাওয়া মানুষদুটো একটা আশ্রয় খোঁজে।ভালবাসা,স্বপ্ন ওখান থেকেই আসে,আবার মানুষ দুটো বাঁচতে চায়,নেভার আগে প্রদীপ আবার জ্বলে উঠেছে হৈম,চলনা একটু ভাল থাকি?"

সল্টলেকে দিবাকর সেনের বড় ছেলে সুদেব সেনের flatএ তখন আসর জমেছে,
"বাবার এমন charecter?oh my god!!can't believe!!!how could he??so embarrassing!!u know..."

"Yea yea right,butt দিদি,উনি এই বুড়ো বয়সে কি আবার family করবেন?how funny!!"

ডায়নিং এ বসে মেজ আর ছোট বৌ তখন রসালো আড্ডাতে মেতে উঠেছে!বাড়ির রান্নার মেয়েটা তখন প্রেমিকের সাথে ফোনে,
"কি বলছ রিয়া!তোমার কাজের বাড়ির ঐ দাদু বিয়ে করবে!আরে শালা!বুড়ো তো ছক্কার পর ছক্কা মারছে!"
নাতিনাতনি ছেলে বৌমা তখন মানুষটাকে যাতা বলে যাচ্ছে,শুধু চুপ করে একপাশে দাঁড়ায়ে বড়বৌমা,পছন্দ করে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন শ্বশুরমশায়,দুধে আলতায় পা দিয়ে যখন বাগবাজারের শ্বশুর বাড়িতে ঢুকছিল,বাবা বলেছিলেন,"তুই আমার বৌমা নোস,আমার মা"!সত্যি মায়ের মতনই দেখতেন,কতবার দেখেছেন শাশুড়ির ফটোর সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে!মানুষটাকে সবাই একলা করে দিল!আজ যখন একাকিত্বে ভোগা মানুষটা একটু সঙ্গ চায়,যাতা বলছে।ওনার বড় ছেলেকে কথাটা বললে উত্তর দিয়েছে
"তা বিয়ে করার কি আছে?থাকে তো একসাথেই।ঐ মহিলার সম্পত্তি হাতানোর তাল,সব বুঝি"

------"কিছুই বোঝনা তুমি,যে কোন সম্পকের একটা নাম দরকার হয়,আর বৃদ্ধার কিসের লোভ?একা তোমরা করে দিয়েছ বাবাকে!আজ যদি মানুষটাকে এতটা একা না করে দিতে এই দিনটা আসতনা,কত ছেলে বৌমা,অথচ দেখো,থেকেও কেউ নেই"

মালতীবালা বৃদ্ধাশ্রমে রাত কেটে তখন ভোর হবে হবে,হৈমন্তী দেবী রোজ এই সময়টায় ফুল তুলতে বেড়ান,বড় ভাল লাগে।দিবাকর বাবুর চোখে ঘুম নেই!পয়লা বৈশাখে সেবার কত বছর পর আবার ভাঙা ভাঙা গলায় গান গেয়েছিলেন,হৈমন্তীর জোরজবরদস্তিতে,জীবন থেকে তো গান চলেই গেছিল!রেণু বড় ভাল গান করত,বনফুল সিনেমা হলটায় "দীপ জ্বেলে যাই" দেখতে গেছিলেন দুজনে,পাগল ফ্যান ছিল উত্তমের !প্রথম প্রথম বিয়ে যখন,ভয় পেলেই সেঁধিয়ে যেত কোলের কাছে!হৈমন্তী আবার বড্ড ডাকাবুকো!কতবার বলা হয়েছে এত ভোরে বেড়িওনা তবু বেড়োবে!পাগলী কোথাকার!"

মালতীবালা বৃদ্ধাশ্রম কৃষ্ণাচতুর্দশী রাতে সেজে উঠছে ফুলের মালায়,এইখানে সবাই আসে যাত্রা শেষ করতে,এই প্রথম কেউ শুরু করবে!
সামনের "অনাথবন্ধু" অনাথাশ্রম এর বাচ্চা গুলো এসেছে,"দাদুরবিয়ে"!ছুটে ছুটে আলো জ্বালিয়ে দিক পায়ের নীচে!ওদের মা বাবা নেই,কারোর থাকে কিন্তু বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দেয়।কেউ চেয়েও পায় না,কেউ পেয়েও হারায়।কেউ টিটকিরি কাটেনা এখানে,বাজে কথা বলে না,আসলে সবাই বড্ড একা এখানে,বোঝে একাকিত্ব কি করে একটা মানুষকে তিলে তিলে শেষ করে দেয়,কেউ যদি কারোর ক্ষতি না করে,একটু ভাল ভাবে বাঁচতে চায় বাঁচুক না!বাড়ি থেকে তো তাড়িয়ে দিয়েছে,নিজের বলতে যদি আজ কিছু হয়,ক্ষতি কি?
সাদা লাল বেনারসি,গলায় রজনীগন্ধার মালা,মাথাভর্তি সিঁদুরে হৈমন্তী যেন পঞ্চাশ বছর আগেকার সেই রেণু!পান পাতা সড়ানো সেই লজ্জা,সেই নাকে এক গাদা সিঁদুর!কনের আবার বয়স হয় নাকি?
বড়বৌ বাগবাজারের বাড়িতে তখন,ছেলেরা থানা পুলিশ অব্দি করেছিল বিয়ে আটকানোর জন্য,কিন্তু কোন লাভ হয়নি।তুলসী গাছটা মরে গেছে সেই কবেই,সাধের ঠাকুর সিংহাসনটা একলা পড়ে,খুব যত্ন করে শাশুড়ির টাঙানো ফটোটা মুছলেন তিনি,বিড়বিড়িয়ে বলে উঠলেন

----"মা আপনার কষ্ট হচ্ছে?আপনার ঘর আপনার সংসার অন্য জনের হয়ে গেল বলে?"

ফটোর ভিতর থেকে কে যেন বলে উঠল
"সংসার তো সেদিনই ভেঙে গেছিল যেদিন আমার ছেলেরা ওঁনাকে বৃদ্ধাশ্রম পাঠিয়ে দিয়েছিল,সংসার তো আবার জুড়লো গো বৌমা!আবার তুলসী তলায় পিদিম জ্বলবে,রান্নাঘরে চচ্চড়ি রান্না হবে,সারা বাড়িতে গোবিন্দভোগ চালের ভাতের গন্ধ বেরোবে,মানুষটা যে কিচ্ছু করতে পারেনা একলা।মনের সবচেয়ে কাছের মানুষটাকে সুখি দেখতে মন চায় বৌমা!আমার সাথে না হয়,অন্য কারোর সাথেই ভালো থাকুক।আর কে বলেছে আমি নেই,আমি তো উনার মনে আছি সবসময়,সব কাজ করার আগে আমাকে জানিয়ে করে!মানুষটা আবার সকালে বেড টি পাবে,হাসবে,গল্প করবে!শাঁখাপলার আওয়াজ হবে ভাঁড়ার ঘরে,এটাই তো আমি চেয়েছিলাম।"

অনাথ বাচ্চা গুলো তখন প্রদীপ জ্বালিয়ে সাজিয়ে দিয়েছে সারাটা বৃদ্ধাশ্রম! বাগানের মালি,কাজের মেয়ে গুলো ছেলে মেয়েকে সঙ্গে করে এনেছে,এখানে কোন ধনী নেই,গরীব নেই,প্রফেসর নেই,রিকশাওয়ালা নেই,অনাথ নেই,বৃদ্ধ নেই!এখানে একটা পরিবার আছে,রক্তের সম্পর্ক যেখানে হেরে যায়,অনাত্মীয়রা সেখানে একটা পরিবার বানায়,এখানে সবার একটাই পরিচয়!সঙ্গী,একাকীত্বে পাশে দাঁড়াবার সঙ্গী!সবাই এখানে অবহেলিত,অনাকাঙিক্ষত!কষ্ট গুলো আজ একসাথে মিলে মিশে বিশাল বড় একটা সুখের সমুদ্র বানিয়েছে!

হৈমন্তী,দিবাকর সেনরা মালির ছেলেদের দিকে তাকিয়ে ভেবে যায় একসাথে,এত পড়াশোনা তুফান রনোরা না শিখলে কি হত?অন্তত একসাথে থাকতে তো পারত,আজ অবধি কোন লোকের ভাষায় "ছোটলোক"এর ছেলে বাবা মা কে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠায়না।ব্যতিক্রম হয়তো আছে!আসলে পাঠায় তো সোফিস্টিকেটেড,educated,elite সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েরা!হাসেন দিবাকর সেন!ছেলে গুলো পড়তে চাইত না,মেরে ধরে পড়াতে হত!মাঝে মাঝে রাগ করে বলতেন "অশিক্ষিতই থেকে যাবে তোমরা সারাটা জীবন"!আজ এসে মনে হচ্ছে এতদিন পর
এমন শিক্ষিত হওয়ার চেয়ে অশিক্ষিত হলে কি খুব অসুবিধা ছিল?

বাসর সাজায় মালতীবালা বৃদ্ধাশ্রম!প্রদীপের আলোয় রাত কেটে গিয়েছে,সবার জোড়াজুড়িতে গান ধরেন দিবাকর সেন!লজ্জায় মাথা নীচু করে বসে সত্তরের কনে হৈমন্তী!মনে মনে বলে চলে "আশীর্বাদ করো দিদি,তোমার সাজানো সংসারটাকে মরে যাওয়ার আগে যেন আবার একটু সাজিয়ে দিতে পারি";
আকাশের সবচেয়ে উজ্বল একটা তারা মুচকি হাসে,পঞ্চাশ বছর আগেকার একটা বাসরের সাথে আজকের দিনটা মিশে যায় মোহনায়!রেণু হৈমন্তীরা দিবারকরদের পাশে থেকেই যায় সারাটা জীবন!কর্তব্যে না,ভালবেসে!
ভাঙা ভাঙা গলায় দিবাকর সেন গান গায়।বাগবাজারের বাড়ির গ্রামাফোনটা অনেক দূরে বসেও সে শব্দ শোনে,
"এই তো হেথায় কুনজ ছায়ায়
স্বপ্ন মধুর মোহে
এই জীবনে যে কটি দিন পাব
তোমায় আমায় হেসে খেলে
কাটিয়ে যাব দোঁহে
স্বপ্ন মধুর মোহে........"

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget