ডিসেম্বর 2017

আজ বড়দিন
- দেবযানী গাঙ্গুলী

সারা দুপুর পছন্দের পিঙ্ক গাউনটা পরে ঐশী আয়নার সামনে একা একা নেচেছে --

"Jingle bells, jingle bells,
Jingle all the way ...."

আজ বড়দিন, শুধু তাই নয় আজ রাতের ট্রেনে ওরা মুম্বই যাবে, সেখান থেকে গোয়া ।তাই সকাল থেকেই প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে । বিকেলে বাড়ি ফেরার সময়ে বাবা কত্তো বড় কেক আনবে! মা বলেছে স্যান্টা এবার গিফটটা নিশ্চয়ই ট্রেনেই দিয়ে যাবে ---ওফ! একসাথে এত আনন্দ আর ওর ছোট্ট বুকে ধরছে না ।কবে থেকে অপেক্ষা ছিল এই দিনটার ....

মিতুল আর সৌমীর সাথে উড়তে উড়তে চারটের সময় প্রতিদিনের রুটিন মেনে ঐশী পৌঁছে গেল "সব পেয়েছির দেশে "। বাড়ি থেকে পাঁচ মিনিটের পথ --যাবার সময় ওরা তিনজন চলে যায় নিজেরাই, ফেরার সময়ে শীতের সন্ধ্যা বলে যে কোনো একজনের অভিভাবক ওদের আনতে যান । একই ফ্ল্যাটের বাসিন্দা ওরা । আজ ক্লাবটাকেও সাজানো হয়েছে, ছোটোদের জন্য পূর্ণেন্দু জেঠু কেক এনেছেন ...আনন্দ যেদিন আসে সেদিন যেন ঝাঁক বেঁধে আসে!! পাড়ার প্রাণপুরুষ পঞ্চাশোর্ধ পূর্ণেন্দু বাবু ক্যারাটেতে জাতীয় স্তরে ব্ল্যাকবেল্ট প্রাপ্ত ।পাড়ার যে কোনো সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার সঞ্চালক, নাট্য জগতের উজ্জ্বল প্রতিভা এই পূর্ণেন্দু জেঠু পাড়ার বাবা -কাকাদের অনুরোধে গত দু’মাস যাবত সকাল -বিকাল ক্যারাটে শেখান পাড়ার ক্লাবে । সকালে ছেলেদের, বিকেলে মেয়েদের। আজ ক্লাসের শেষে সবাই যখন বেরিয়ে যাচ্ছে জেঠু ঐশীকে ডাকলেন ক্লাবের বাগানে অপূর্ব ডালিয়া ফুটেছে নানা রঙের, তা দেখার জন্য ।আজ সৌমীর মা ওদের নিতে এসেছেন। পনেরো - কুড়ি মিনিট হয়ে গেল ঐশী এখনো ক্লাব থেকে বেরোচ্ছে না ....কী যে করে ছটফটে মেয়েটা! বিরক্ত মানসী দেবী ক্লাবের ভেতরে ঢুকতে যাবেন, পূর্ণেন্দু বাবুর উত্তেজিত কন্ঠে কান খাড়া করে এগিয়ে গেলেন । "সব পেয়েছির দেশে"র গেটের সামনে ঐশী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আর পূর্ণেন্দু বাবু রাগে গর্জন করছেন ...."আর নয় --আর কোনোদিন যেন তোকে ক্লাবে না দেখি, তোর বাবার মেম্বারশিপও ক্যানসেল করে দেব ....ছি! ছি! ছি! কী দিন এল! এখনো দুধের দাঁত পড়েনি এরমধ্যে এত পাকা! ছি! ছি! এই তোর বাড়ির শিক্ষা!!আর এদেরই বলব কি? স্কুলগুলোতেও তো এখন বাচ্চাদের এসব শেখাচ্ছে ....কি যেন বলে! গুড টাচ --ব্যাড টাচ!!উচ্ছন্নে গেল সমাজটা -- এরা বাচ্চা? গিঁটে গিঁটে এত পাপ তোর? অনেক গার্জেনই ভিতরে এসেছেন এসব অজস্র কথার মাঝে -- উৎসাহী পথচারীও কয়েকজন মশলাদার গন্ধ পেয়ে ক্লাবের ভেতরে ঢুকে স্বনামধন্য পূর্ণেন্দু রায়কে বোঝাবার চেষ্টা করছেন "দিনকাল খুব খারাপ দাদা! নিজের সম্মান রক্ষা করে বাঁচাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে..... "

এক হ্যাঁচকা টানে সম্বিত ফিরল ঐশীর --"বাড়ি চল্ ...ছি ছি! দেবতার মতো মানুষ! তাকে এমন অপমান করলি? খুব টিভি দেখিস তাই না? এজন্যই বলে চাকরি করা মায়েদের বাচ্চা মানুষ হয় না --দশ বছর বয়স না হতে পেকে আঁটি ! না না, তোর সাথে আর সৌমী - মিতুলকে মিশতে দেওয়া যাবে না ..."

ঘরময় অন্ধকারের স্রোতে মিশে যাচ্ছে চোখের জল।বুকের ভেতর জমাট কষ্টটা গলা বেয়ে উঠছে ....বাবা মা-ও কি ওকে খারাপ ভাববে! ওর কথা বিশ্বাস করবে না! কী করে সব বুঝিয়ে বলবে ঐশী ওদের! পূর্ণেন্দু জেঠু, মানসী কাকিমা যে ওর নামে নালিশ করবে, আরো কত লোক জমেছিল! ! দুই হাতে মাথার চুল ধরে ঝাঁকাতে থাকে ঐশী .... বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে ঘরে ফেরা ঐশীর ইন্জিনিয়ার মা তখন সমানে ডেকে চলেছেন "দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছিস তুতুন? ওঠ্ রে, আজকের সন্ধ্যায় এমন করে ঘুমাতে হয়! আজ বড়দিন ...কবে থেকে আমরা প্ল্যান করছি এবারের বড়দিনটা আমরা স্মরণীয় করে রাখব! বাবা পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঢুকবে, ন'টার মধ্যে রওনা হতে হবে যে! ওঠ্ মা! আয় গান চালাই ---তুই Jingle bells চালিয়ে নাচটা দেখাবি তো আমাকে ...ও তুতুন আয়...."। সারা বাড়িতে তখন ভেসে চলেছে আনন্দসুর --

"Dashing through the snow
In a one - horse open sleigh
O'er the fields we go
Laughing all the way ..."

লিমেরিক
- দেবযানী গাঙ্গুলী

মন খুঁজে ফেরে মননের গভীরতা
বিস্মৃত স্মৃতি ভাবনার নীরবতা --
খুঁজেছে আবেগ ভরা ঠোঁটে নিঃসীম,
রাত ফিরে যায় শিশিরের বুকে হিম
আক্ষেপে ম্লান পরিচিত পেলবতা ।


অথৈ আকাশ তোমার দু'চোখে লীন
দূরত্ব ঘিরে চৈত্র দহন দিন --
সেতু গড়ে দেয় ভাবনার মেঘদূত
অচেনা আবেগ ছুঁয়ে যায় অদ্ভুত
ফেরারী ঠিকানা সঙ্কেতে উদাসীন ।


মেঘবন্দর ছুঁয়েছে মায়াবী চাঁদ
রূপোর কাঠিতে নিদচোরা আহ্লাদ --
হরষিত প্রেম অকারণ উচ্ছ্বাস
মন খুঁজে ফেরে দু'চোখের বিশ্বাস
কানায় কানায় জীবনের আস্বাদ ।

মনকথা
- দেবযানী গাঙ্গুলী

রিংটোন জুড়ে অপেক্ষাদের ভীড়
চিলতে সুখের মুহূর্ত আয়োজন --
শিশির ধুয়েছে শেষ রাত্রির ঘাম
অযাচিত কথা আনমনে আলাপন ।

স্মৃতির শপথে অবাধ ঘোড়সওয়ার
এখন সময়ে বারুদের আঘ্রাণ --
শীতের কাঁপন উষ্ণ আবেগ জুড়ে
একা ব্যথা বোনে নিভৃত অভিমান ।

অরুন্ধতী - ধ্রুবতারাদের ভীড়ে
এখনো সাজাই আকাশপ্রদীপ খানি --
শিশির ধুয়েছে শেষ রাত্রির সুখ
রিংটোন জুড়ে অপেক্ষা অভিমানী ।

"বিদায়-২০১৭ খ্রিঃ"


*** রহমান মাসুদ***


সময় চ‌ক্রের নিষ্ঠুরতায়
বিগত-আগ‌তের খেলা,
চলমান ব‌র্ষের শেষ সূর্যাস্তে
নতুন খ্রিষ্টের সূর্যদ‌ো‌য়ের পালা।


২০১৭ খ্রিষ্টা‌ব্দের বিদায়ল‌গ্নে
বি‌শ্লেষন বছ‌রের হিসাব খাত‌া,
এত পে‌য়েও,‌লোভী ম‌নে হাহাকার
শুধুই না পাওয়ার অতৃপ্ততা।


বছ‌রের শুরু‌তে ছিল যারা
আজ অনে‌কেই অতীত কথা,
আ‌মি‌তো বেঁচে আছি
ভা‌বিনা এটা সর্ব‌সেরা প্রাপ্যতা।


পাওয়া না পাওয়ার হিসাব ছে‌ড়ে
ভা‌বিনা নিজ কৃত কার্যকলাপ,
সারা বছর সুস্হ ম‌স্তি‌স্ক‌ে হওয়া
ছোট বড় কত মারাত্নক পাপ।


বিশ্ব মান‌চি‌ত্রের পাতা জু‌ড়ে
শি‌রোনাম মানবতার লুন্ঠন,
খব‌র জে‌নেও ঘ‌টে‌নি মর্মপীড়া,
পাষান হৃদ‌য়ে নীরব ক্রন্দন।


ত্যা‌গের অধ্যায় শুণ্য রে‌খে
বছ‌রের হিসাব হয়‌ কি রচনা?
বিদায়ল‌গ্নে শেষ সূর্যাস্ত ব‌লে
হে প্রবন্ঞ্চক, কেন মেকী কান্না?





নতুন বছরের শুভেচ্ছা ২০১৮ – Happy New Year 2018


দেখতে দেখতে একটি বছর চলে গেলো । শুরু হলো নতুন আরেকটি ইংরেজী বছরের যাত্রা । নবদিবাকর পত্রিকার প্রত্যেক পাঠক, পাঠিকা, লেখক, লেখিকা, কবি, ও শুভাকাঙ্খীদের প্রতি রইল নতুন বছরের শুভেচ্ছা । সবাইকে ইংরেজী নববর্ষ ২০১৮ এর শুভেচ্ছা । নতুন বছর আপনি কেমন করে কাটাতে চান ? নতুন বছরে আপনার লক্ষ কী ? আপনি আপনার জীবনে নতুন কী পেতে চান ? আপনার প্রিয়জনকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান । আসুন সবাই মিলে নতুন বছরকে বরণ করে নিই, আর মেতে উঠি আনন্দে । সবাইকে নতুন বছরের অনেক অনেক শুভেচ্ছা, ভালোবাসা, ও প্রানঢালা অভিনন্দন ।

"‌পৌষ সমাচার"
***রহমান মাসুদ***

পৌষ তু‌মি উষ্ণ কেন?
দেখা নেই শীতলতার,
শী‌তের বু‌ড়ি আজ,
গ‌ল্প হ‌লো রূপকথার।

কো‌কিল ডা‌কে ফাগুন ভে‌বে
মি‌ষ্টি শী‌তের আড় ভে‌ঙ্গে,
উওর‌ী পব‌নের নেই ধার
ঋতুর বিলু‌প্তি ধরাধা‌মে।

শী‌তের জী‌বিকা ব্যবসায়ী
চো‌খে দে‌খে শুধু সর্ষেফুল,
গরম কাপড় মজুদ ক‌রে
ক‌রে‌ছে যেন  মস্তভুল।

পৌষ ব‌লে মাঘ‌কে ডে‌কে
শিক্ষা নাও আমার থে‌কে,
মা‌ঘের শী‌তে বা‌ঘে কাঁ‌পে
কথাটা মিথ্যা,ব‌লো মু‌খে।

এই য‌দি হয় শীতকাল
ষড়ঋতুর করুন হালচাল,
যত দূর্য‌োগ, রোগ,বলাই
সফলতায়  মালামাল।

শীতকা‌লে তাই ,শীত চাই
পৌষ তু‌মি,পেখম তোল,
মন্ডা,পিঠা,পা‌য়েস দ‌ক্ষিনা
আর কি চাও ল‌ক্ষী‌টি বল !!

প্রণয়ী মন
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

কিচিরমিচির পাখির ডাকে
ঘুম ভাঙতে দেখি।
সূয্যি মামা পূব আকাশে
মারছে উঁকিঝুঁকি।।
শর্ষে ফুলের মাথায় মাথায়
রোদ উঠেছে ওই।
পুষ্প জৌলুস রোদের হাসি
মন হল তন্ময়।।
স্বর্ণ থালায় পূবের আকাশ
মাঠে হলুদ আলো।
ইচ্ছে করে মাখতে গায়ে
ঘর লাগেনা ভালো।।
শর্ষে ক্ষেতের মাঝে মাঝে
মাথা তুলেছে বক।
অশথ গাছের পাতায় পাতায়
রঙিন রোদের ঝলক।।
শিশিরে ভিজে লুটোপুটি
মৌ-হামিঙের স্নান।
কেউবা দোলে শর্ষে ফুলে
গাইছে মধুর গান।।
আলতো শিশির শীর্ষঘাসে
স্বর্ণ বিন্দু ঝরে।
মনটা কোথায় হারিয়ে গেছে
আসেনা কাছে ফিরে।।

রূপান্তর
- বুদ্ধদেব বসু

দিন মোর কর্মের প্রহারে পাংশু,
রাত্রি মোর জ্বলন্ত জাগ্রত স্বপ্নে।
ধাতুর সংঘর্ষে জাগো, হে সুন্দর, শুভ্র অগ্নিশিখা,
বস্তুপুঞ্জ বায়ু হোক, চাঁদ হোক নারী,
মৃত্তিকার ফুল হোক আকাশের তারা।
জাগো, হে পবিত্র পদ্ম, জাগো তুমি প্রাণের মৃণালে,
চিরন্তনে মুক্তি দাও ক্ষণিকার অম্লান ক্ষমায়,
ক্ষণিকেরে কর চিরন্তন।
দেহ হোক মন, মন হোক প্রাণ, প্রাণে হোক মৃত্যুর সঙ্গম,
মৃত্যু হোক দেহ প্রাণ, মন।

'আহ্বানধ্বনি'
- ইমাম হোসেন মুবিন

অবোধ্য বোধের ধ্যান ভাঙা রোদে
খুব গহীনে
শ্বাস ফেলেছে অন্ধকার;

চিলতে আলোর তিয়াসে
আমি
তোমায় আঁকছি বুকের ভেতর-
শব্দ গেঁথে,
সাড়া দাও! সাড়া দাও!
এক সুরে মিশে যাও অস্তিত্বে।

তুমি কবিতা হয়ে এসো,
তুমি গল্প হয়ে এসো,
তুমি গান হয়ে এসো,
তুমি স্বপ্ন হয়ে এসো।

এসো তুমি প্রাণের মন্দিরে-
তব অঞ্চিতারূপী চরণে
রক্তাঞ্জলী দেবো আজ,
শাণিত সরোবরে।

আব্দার
- মৌমিতা গিরি

"ধিতাং ধিতাং বোলে কে মাদলে তান তোলে... কার আনন্দ উছ্বলে আকাশ ভরে জোছনায়... আয় ছুটে সকলে...এই মাটির ধরাতলে...আজ হাসির কলরলে নতুন জীবন গড়ি আয়....."
...........গানের তালে তালে পা মেলাচ্ছে ৭ বছরের মলি । অনেকের অনুরোধে এর আগেও দু-তিনটে গানে নেচে ফেলেছে, যতই হোক পাড়ার অনুষ্ঠান বলে কথা...ভালোবাসা পাওয়ার জন্য ওকে এটুকু আব্দার তো রাখতেই হবে । সঙ্গীতা দর্শকদের মধ্যে একদম প্রথম সারিতে বসে । মা হিসেবে ওর তো আজকে খুশি হওয়ার কথা, কিন্তু চোখের জল যে অবাধ্য হয়ে গেছে ।
মনে পড়ে গেল সঙ্গীতার .......চন্দনা বৌদির বলা কথা গুলো....কিছুটা ব্যাঙ্গের সুরেই সুদুর চিন্তা নিয়ে বলেছিল......'হ্যাঁ গো সঙ্গীতা মলিদের স্কুলটা কি কোয়েট? '.....হ্যাঁ..কেন? ..' না ওই বলছিলাম দেখ যতই হোক মেয়ে বড় হলে চিন্তা তো তোমাকে করতেই হবে, তারপর আবার এরম মেয়ে হলে তো আরো বেশি.....তাই বলছিলাম এখন থেকেই ওদের স্কুলের কয়েকজন ছেলের মায়েদের সঙ্গে ভালো আলাপ জমিয়ে রেখে দাও । নাহলে পরে অনেক হেপা পোয়াতে হবে তোমাদের বুঝলে....আর এখন তো এমন....কানাতে-কানাতে, বোবাতে-বোবাতে, খোঁড়াতে-খোঁড়াতে বিয়ে হচ্ছেই । যতই হোক আমরা ওর 'মা' না হলেও মায়ের মত তো....তাই ভাবি.. আহ্ রে ।'
সেদিন সঙ্গীতা অনেকটা শ্বাস নিজের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছিল ..মনের অনেকটা দৃঢ়তা নিয়ে । আজ যখন স্টেজে পাড়া থেকে আয়োজিত আনুষ্ঠানে ওদের কাউন্সিলর মলির হাতে পুরষ্কার টা তুলে দিয়ে বলছিল...' মলি আমাদের গর্ব '....তখন যেন সেদিনের
না বের করতে পারা কষ্টের দীর্ঘনিশ্বাস টা আজ বেরিয়ে গেল| সঙ্গীতা ভাবছে...আমার মলি কিছু না বলেও পাশের সিটে বসে থাকা চন্দনা বৌদির যোগ্য জবাবটা দিয়ে দিল ।
মলি আজ স্কুলে যাওয়ার সময় ওর মাকে বুঝিয়ে দিল..ও কালকের পাওয়া ফুলের বুকেটা ওদের স্কুলের সুমনা মিস এর জন্য নিয়ে যেতে চায় । সঙ্গীতা ভাবছে..... সত্যি তো ওরই গিয়ে সুমনা মিস কে একটা ধন্যবাদ জানানো উচিত ।
এই "deaf & dumb " স্কুলটাতে সঙ্গীতা মলিকে ৩+ এ ভরতি করিয়েছিল । যখন ওর বয়স ৪-৫ হল তখন একদিন এই সুমনা মিস ই সঙ্গীতাকে বলেছিল....দেখুন ওকে একটা ভালো নাচের স্কুলে ভরতি করান....চাইলে আমি নৃত্যশিল্পী জয়িতা দির সাথে কথা বলিয়ে দিতে পারি ...আমার মনে হয় ও নিজেকে নাচের মধ্য দিয়েই প্রতষ্ঠিত করতে পারবে.... নিজের পরিচয় নিজেই তৈরি করে নেবে । ব্যস...তারপর থেকেই শুরু হয়ে গেল মলির নিজের পরিচয় তৈরি করার চেষ্টা.....লড়াই..।
অনেকেই বলাবলি করছিল দেখো দেখো..মেয়েটা বোবা হলেও.. গানের প্রত্যেকটি ভাষা কি সুন্দর ফুটিয়ে তুলছে এই বয়সে....কি প্রতিভা..!!!
সবার সব কথাই সঙ্গীতার কানে এসেছিল । আনন্দের জলের অবশেষটুকু মুছে নিয়ে ভাবছিল..
....আমার মলি এবার ডিসট্রিক্ট লেভেল ডান্স কম্পিটিশন এ ফার্স্ট হয়েছে... আর এক মাস পর ওর স্টেট লেভেল কম্পিটিশন ও রয়েছে.....তাই ওকে পারতেই হবে... আর এভাবেই মলি ওর ভেতরের সব কথা ফুটিয়ে তুলবে..।



আজ ২৫ ডিসেম্বর, আজ শুভ বড়দিন । জেরুজালেমের কাছাকাছি বেথলেহেম নগরীর এক গোয়ালঘরে জন্মেছিলেন খ্রিস্টধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিস্ট । গোটা বিশ্বের খৃস্টান সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শুভ বড়দিন । তিনি মানুষকে শুনিয়েছেন শান্তির বাণী, ভালোবাসার কথা । পৃথিবী থেকে দূর হোক হিংসা ও অশান্তি । শুভ বড়দিন । সবাইকে বড়দিনের শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই ।

বৃক্ষবন্দনা
- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

অন্ধ ভূমিগর্ভ হতে শুনেছিলে সূর্যের আহ্বান
প্রাণের প্রথম জাগরণে , তুমি বৃক্ষ , আদিপ্রাণ ;
ঊর্ধ্বশীর্ষে উচ্চারিলে আলোকের প্রথম বন্দনা
ছন্দোহীন পাষাণের বক্ষ- ‘ পরে ; আনিলে বেদনা
নিঃসাড় নিষ্ঠুর মরুস্থলে ।
সেদিন অম্বর-মাঝে
শ্যামে নীলে মিশ্রমন্ত্রে স্বর্গলোকে জ্যোতিষ্কসমাজে
মর্তের মাহাত্ম্যগান করিলে ঘোষণা । যে জীবন
মরণতোরণদ্বার বারংবার করি উত্তরণ
যাত্রা করে যুগে যুগে অনন্তকালের তীর্থপথে
নব নব পান্থশালে বিচিত্র নূতন দেহরথে,
তাহারি বিজয়ধ্বজা উড়াইলে নিঃশঙ্ক গৌরবে
অজ্ঞাতের সম্মুখে দাঁড়ায়ে । তোমার নিঃশব্দ রবে
প্রথম ভেঙেছে স্বপ্ন ধরিত্রীর , চমকি উল্লসি
নিজেরে পড়েছে তার মনে — দেবকন্যা দুঃসাহসী
কবে যাত্রা করেছিল জ্যোতিঃস্বর্গ ছাড়ি দীনবেশে
পাংশুম্লান গৈরিকবসন-পরা , খণ্ড কালে দেশে
অমরার আনন্দেরে খণ্ড খণ্ড ভোগ করিবারে ,
দুঃখের সংঘাতে তারে বিদীর্ণ করিয়া বারে বারে
নিবিড় করিয়া পেতে ।
মৃত্তিকার হে বীর সন্তান ,
সংগ্রাম ঘোষিলে তুমি মৃত্তিকারে দিতেমুক্তিদান
মরুর দারুণ দুর্গ হতে ; যুদ্ধ চলে ফিরে ফিরে ;
সন্তরি সমুদ্র-ঊর্মি দুর্গম দ্বীপের শূন্য তীরে
শ্যামলের সিংহাসন প্রতিষ্ঠিলে অদম্য নিষ্ঠায় ,
দুস্তর শৈলের বক্ষে প্রস্তরের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায়
বিজয়-আখ্যানলিপি লিখি দিলে পল্লব-অক্ষরে
ধূলিরে করিয়া মুগ্ধ , চিহ্নহীন প্রান্তরে প্রান্তরে
ব্যাপিলে আপন পন্থা ।
বাণীশূন্য ছিল একদিন
জলস্থল শূন্যতল , ঋতুর উৎসবমন্ত্রহীন —
শাখায় রচিলে তব সংগীতের আদিম আশ্রয়,
যে গানে চঞ্চল বায়ু নিজের লভিল পরিচয় ,
সুরের বিচিত্র বর্ণে আপনার দৃশ্যহীন তনু
রঞ্জিত করিয়া নিল , অঙ্কিল গানের ইন্দ্রধনু
উত্তরীর প্রান্তে প্রান্তে । সুন্দরের প্রাণমূর্তিখানি
মৃত্তিকার মর্তপটে দিলে তুমি প্রথম বাখানি
টানিয়া আপন প্রাণে রূপশক্তি সূর্যলোক হতে ,
আলোকের গুপ্তধন বর্ণে বর্ণে বর্ণিলে আলোতে ।
ইন্দ্রের অপ্সরী আসি মেঘে হানিয়া কঙ্কণ
বাষ্পপাত্র চূর্ণ করি লীলানৃত্যে করেছে বর্ষণ
যৌবন – অমৃতরস , তুমি তাই নিলে ভরি ভরি
আপনার পুত্রপুষ্পপুটে , অনন্তযৌবনা করি
সাজাইলে বসুন্ধরা ।
হে নিস্তব্ধ , হে মহাগম্ভীর ,
বীর্যেরে বাঁধিয়া ধৈর্যে শান্তিরূপ দেখালে শক্তির ;
তাই আসি তোমার আশ্রয়ে শান্তিদীক্ষা লভিবারে ,
শুনিতে মৌনের মহাবানী ; দুশ্চিন্তার গুরুভারে
নতশীর্ষ বিলুণ্ঠিতে শ্যামসৌম্যচ্ছায়াতলে তব —
প্রাণের উদার রূপ , রসরূপ নিত্য নব নব,
বিশ্বজয়ী বীররূপ ধরণীর , বাণীরূপ তার
লভিতে আপন প্রাণে । ধ্যানবলে তোমার মাঝার
গেছি আমি , জেনেছি , সূর্যের বক্ষে জ্বলে বহ্নিরূপে
সৃষ্টিযজ্ঞে যেই হোম , তোমার সত্তায় চুপে চুপে
ধরে তাই শ্যাম স্নিগ্ধরূপ ; ওগো সূর্যরশ্মিপায়ী ,
শত শত শতাব্দীর দিনধেনু দুহিয়া সদাই
যে তেজে ভরিলে মজ্জা , মানবেরে তাই করি দান
করেছ জগৎজয়ী ; দিলে তারে পরম সম্মান ;
হয়েছে সে দেবতার প্রতিস্পর্ধী — সেঅগ্নিচ্ছটায়
প্রদীপ্ত তাহার শক্তি বিশ্বতলে বিস্ময় ঘটায়
ভেদিয়া দুঃসাধ্য বিঘ্নবাধা । তব প্রাণে প্রাণবান ,
তব স্নেহচ্ছায়ায় শীতল , তব তেজে তেজীয়ান ,
সজ্জিত তোমার মাল্যে যে মানব , তারি দূত হয়ে
ওগো মানবের বন্ধু , আজি এই কাব্য-অর্ঘ্য ল’য়ে
শ্যামের বাঁশির তানে মুগ্ধ কবি আমি
অর্পিলাম তোমায় প্রণামী ।

যদি ফিরে চাও
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

যদি আবার কখনো আমার স্পর্শটা চাও ,
বলবো আমি আবার সেই পাটি'টা বিছাও ,
যেখানে শুয়ে শুয়ে চাঁদকে হারাতে দেখেছি মেঘের স্রোতে ৷
যদি আবার কখনো আমায় ফিরে পেতে চাও ,
বলবো আমি সেই সাগরের কাছে ফিরে যাও ,
ঢেউ হয়ে হয়ে আমি ঠিক আছড়ে পড়বো তোমার উলঙ্গ পায় ৷
যদি আবার কখনো আমার ভালোবাসা চাও ,
বলবো আমি সেই ফুলেদের কাছে ফিরে যাও ,
যে ফুলের বিছানাতে বাসর সাজিয়েছিলাম তোমাকে নিয়ে ৷
যদি আবার কখনো আমার কন্ঠ শুনতে চাও ,
তবে বলবো আমি সেই ব্যালকনিতে দাড়াও ,
সেখানে বাতাস হয়ে ফিসফিস করে গান শোনাবো
তোমাকে ৷
যদি আবার কখনো আমার বুকে হারাতে চাও ,
তবে বলবো আমি সেই মাঠে অাবার দাড়াও ,
অবারিত হাতে আকাশ পানে চাও দেখবে হারাবে আমার বুকে ৷

সাবধান
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

ধুলোবালিয় পড়ে আছিস ধনির পদতলে,
ধনশালী ধনের ভাণ্ডারী জ্ঞাতিত্ব যায় ভুলে।
বিকলাঙ্গ পীড়িত কেউ, কেউ অন্ধ ভিখারী,
ক্ষুধিত নিপীড়িত কেউ লাঠিতে পথচারী।
দেখেনা বাবুরা তাদের দৃষ্টি দিয়ে নীচে,
দুখীরা বাঁচতে আশায় ধনির মুখ চেয়ে।
তুলে নিতে চাইনা ওদের দুহাত বাড়িয়ে,
ফেলে যায় পরিচয়হীনে দুপায়ে মাড়িয়ে।
বলে যায় একটি কথা থাকিসনা পদতলে,
ছোটলোকের দল ওরে এলে অবহেলে।
ধনিদের সুখ দেখতে বেঁচে কেন তোরা,
শক্তি ধরে উঠে দাঁড়াস হসনে মনমরা।
ভাবিস কেন সুখী তোরা ধনির সুখ দেখে,
মরে যাস্ থাকিসনা আর ধুলোবালি মেখে।
শুভাকাঙ্ক্ষী হসনা আর ধনশালীর তরে,
স্বত্ব ধরে উঠরে এবার ধুলোবালি ঝেড়ে।
মনে রেখো একটি কথা ধনশালীর দল,
ধনের পাষাণ চাপায় হবে জীবন বিফল।
সম্পদের বাঁধ একদিন দাঁড়াবে পাহাড়,
উপরে পড়বে সেদিন পাবেনা নিস্তার।
সময় থাকতে ধনকুবের সাবধান হও,
দুহাত বাড়িয়ে ডাকলে আসবেনা কেউ।

'আত্মপরিচয়'
- ইমাম হোসেন মুবিন

'আমায় চেনো?
অমুক বাবার তমুক ছেলের ভাগ্নে হলাম আমি,
দিন দুপুরে চড়ি নতুন গাড়ি, সব ক'টা বেশ দামী!'

বুক ফুলিয়ে, কাঁধ ঝুলিয়ে
ধনিক মশায়ের ভাগ্নে তখন,
বলছিলো বেশ হেসে!
ভিড় জমেছে ও তল্লাটে;
দেখতে তাকে একটি নজর
সবাই দাঁড়িয়েছে এসে!

ভিড়ের মাঝে হঠাৎ করেই,
নোংরা মতোন পোষাক গায়ে
একটি ছেলে উঠলো বেজায় কেশে!

চার-দু কদম এগিয়ে গিয়ে
'ধনিক' বাবুর চোখেতে চেয়ে,
বললো, 'বাবু মশাই,
আমি হলাম লাল্লু মিয়া, পেশায় কসাই!
আমি কভু আপনার মতো গাড়ি হাকাইনা রোজ,
করিও না আপনার মতো বাহারি-দামী ভোজ!
তবু ভাই, আপনার মতো হতভাগা নই;
আছে আপন পরিচয়।

আপনি যদি আপনার নাম
কহেন লোক সুমুখে,
বলতে পারেন ক'জন লোকে
চিনবে তখন নিমেষ পরখে?"

মুখ কালো করে নতশির হয়ে
ঠাই দাঁড়িয়ে ধনিক মশাই!
তখন সেখানে মাথা উঁচিয়ে
বুক চিতিয়ে সুমুখে আছেন লাল্লু কসাই।

বলতে পারো কেন?
সব পরিচয়ের বড় হলো- 'আত্মপরিচয়'।
হোক যত ক্ষুদ্রই বা সে,
চিত্তে সদা নির্ভয় তাকে জেনো।
নিজের সত্তা বলি দিয়ে যেজন
গর্ব করে অন্যের পরিচয়ে,
তার চেয়ে নরাধম আর কেহ নেই
এই ধরাতে, সে বাঁচে সদা অন্যের ভার সয়ে!

কলি কথন
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

অতীতের সেই কথাগুলো ক'জন রাখে মনে?
রঙ মেখে আজ সঙ সেজেছে ভুলে গেছে ধনে।
ধনসম্পদের নেশায় মানুষ ভাবে তাসের ঘরে,
গোলকধাঁধায় পড়ে কেউবা হোঁচট খেয়ে মরে।
সত্য ত্রেতা দ্বাপর যুগের ইতিহাস নাই ঘরে,
সংস্রব হারায় সম্ভ্রম হারায় কলির হাত ধরে।
ফেলে আসা পথগুলো সব ইতিহাসের পাতায়,
কেউনা কেউ তুমি আমার আজ আর মনে নাই।
কলিকালের জগতরে ভাই ছল চাতুরী প্রবঞ্চনা,
যে যার মত চলছে মানুষ কেউ করেনা মানা।

সুর্যস্নাত চিঠি
- নীলকণ্ঠ পদাতিক

১.

এক মুহূর্তে আপন তুমি
এক মুহূর্তে পর,
খানিক আগের মিঠে কথা
হঠাৎ রুদ্ধস্বর;
বদলে যাওয়াই নিয়ম যখন
ভুলতে পারা বর,
জীবন যেমন গঙ্গাফড়িং
সময় সার্থপর।

২.

ফিরে আসা সুর্যস্নাত চিঠি
কখনো আনেনি ভোর,
জীবনের গহীন অতলে লেখা
অন্ধকার পড়ে শুনিয়েছে শুধু
তার দাবী। এক মুঠো কবিতা
পেয়েছে কবি ছেড়ে আর্যাবর্তের
একচ্ছত্র অধিকার।

৩.

অভিমানী বর্ষার মতো আমি একা
কতকাল চোখ মেলে থেকেছি!
জীবনের চোরাবালি স্রোতে আঁকা ছবি
শেষকালে মেঘ হয়ে উড়ে গেছে
এক আজ্লা নীলের সজ্জায়,
কেউ ভিজতে আসেনি।

৪.

জাহাজের ভাঙ্গা আয়নায় আকাশ-
ছোঁয়া জলের আবেগ দেখেছি আমি,
দেখেছি একলা চিল উড়ে যায় তার
অধরা স্বপ্নটার খোঁজে তীর থেকে
তীরে, সমুদ্রে সমুদ্রে। রবিবারের
ভোর দেখেছি বিলেতি উপন্যাসের
পাতায়, দেখেছি পাহাড়ে শঙ্খচূড়..
সত্যি বলছি, আমার মতোন আমি
দেখিনি কোথাও আর।
কি যাতনা পুষেছি হৃদয়ে!

ভূত গড়ির ভূত
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

বড় একটি মাঠ পেরিয়ে ওপারে কাজি পাড়া, বৈরি পোতা , লকেশগঞ্জ, হাতিমারা, এমনি দশ-বারটা গ্রাম নিয়ে একটি এলাকা।
কালুর বাড়ি এপারেই, লখিমপুর গ্রামে।
অভাবের সংসার। ওপারে গ্রামে গ্রামে বার ভাজা বিক্রি করে সে কোনোরকমে দিনপাত করত।
দিনটা ছিল পোষ মাসের শেষ শনিবার। কালু প্রতিদিনের ন্যায় আজও গেছে ওপারের গ্রামগুলিতে বার ভাজা বিক্রি করতে।
আজ কিভাবে যে কালুর সময় বয়ে গেল, কালু কিছুই বুঝতে পারল না।
প্রতিদিন মাথার উপর সূর্য উঠতে না উঠতেই কালুর বার ভাজা সব বিক্রি হয়ে যায়।
আজ সূর্য মাথা ছাড়িয়ে অনেকটা গড়ে গেছে, তবুও বার ভাজা অনেকটা রয়ে গেছে।
কালু ভীষণ চিন্তায় পড়লো। এত বড় মাঠ পেরিয়ে যেতে হবে তাকে। তাছাড়া যেখানে ভূতের আপাদানি তার পাশের রাস্তা ধরেই যেতে হবে আমাদের গ্রাম।
মাঠটিকে সবাই খাড়ির মাঠ বলেই ডাকে।
মাঠের চারিপাশের গ্রামগুলি ও দূরে-দূরে। এখানে কেউ বিপদে পড়ে চিৎকার চেঁচামিচি করলেও, আশপাশ গ্রামের কেউ শুনতে পাবেনা , যে ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে।
মাঠের মাঝে রাস্তার কাছাকাছি পানাতে ভরা একটি ডোবা আছে। ডোবাটির চার পাড়ে শেওড়া, কোথাও কোথাও দু-একটা কেওড়া গাছ, আর মাটি ছুঁয়ে আগাছায় ভরা। পাড়ের উপর ঈশান কোণে, ছোটো-বড় মিলে পাশা-পাশি দু-চারটে বেশ বড়-বড় তেঁতুল গাছ । দেখলেই বুঝা যায় জায়গাটি সুবিধা না, ভূতুড়ে। ভূতের ভয়ে ওখানে কোনো মানুষই যেতে চাইনা । অগত্যে বিশেষ প্রয়োজনে হয়ত কেউ যায়। তাও আবার দু-চার জন সঙ্গে করে। তাই বুঝি আশ-পাশ গ্রামের লোকেরা ডোবাটির নাম দিয়েছে ভূতগড়ি।
এমনিতে কালু ছিল প্রচণ্ড সাহসী। হলে হবে কি? ভূতের নাম শুনলে কে না ভয় পাই?
যতই সাতপাঁচ ভাবতে থাকে , ততই ভয় বেড়ে যায় কালুর।
অগত্যে কি আর করবে, বাড়ি তো ফিরতেই হবে।
না আর কাল বিলম্ব করে লাভ নাই, এখনো হাতে সময় আছে, সন্ধের আগে বাড়ি পোঁছাতেই হবে। এই বলে কালু টানা টানা পা ফেলে পথ হাঁটতে শুরু করে, আবার মাঝে-মাঝে দৌড়ে চলে।
এত দৌড়েও পথ যেন ফুরাতে চায়না। পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্যটা ও যেন কালুর সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে।
ঠিক তাই, কথাই বলেনা যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। এত চেষ্টার পরেও, কালুর ঠিক তাই ঘটলো। ভূতগড়ির সোজাসুজি রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই সূর্য তার নিজের আসনে বসে পড়েছে।
নেমে আসলো আবছা অন্ধকার।
ভয়ে কালুর পথ চলা স্তব্ধ প্রায়। ভাবছে এই হয়তো ভূতেরা এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে ওদের আকড়াতে,তারপর সবাই মিলে আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে |
এই কথা ভাবতে ভাবতে কালুর হাত পা ভয়ে অসাড় হয়ে আসছে ।
একি! কালু দেখল, বিশাল আকারের ছায়ার মতো কি যেন একটা ভেসে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই অস্পষ্টে দেখা যায় একটি ছায়া ছায়া তেঁতুল গাছ । আর গাছের ডালে-ডালে জনা বিশেক ছায়ামূর্তি। তেঁতুল গাছটি কালুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেতেই, কালু ভীষণ ভয় পেয়ে পিছন ফিরে সোজা দৌড় দিল। চেনা-চেনা গলায় কে যেন পাশ থেকে বললো, এই কালু, অমন করে ডৌড়াচ্ছিস কেনরে? কালু ভয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাছে আসতেই দেখে, কালুরই বন্ধু নন্দ। কালু দম চেড়ে জিজ্ঞেস করে তুই এখানে কি করছিস? আগে তুই বল, অমন করে দৌড়াচ্ছিলি কেন।
কালু হাঁপ ছেড়ে বলে, ভাইরে! সেকথা আর বলিস না ( বলে কালু তার সমস্ত ঘটনা নন্দকে বললো।) সবকিছু শুনার পর নন্দ বলে, তাহলে তোর আমার একই হাল? আমি বিশেষ একটা প্রয়োজনে বৈরি পোতা গেছিলাম। ফিরে আসতেই এখানে সন্ধ্যা হয়ে গেল, অমনি ভিতরে ঢুকে গেল ভূতের ভয়। শুনেছি ভূতগড়িতে নাকি ভূত থাকে, তাই না পারছি এগিয়ে যেতে, না পারছি পিছিয়ে আসতে। যাক্, তোকে যখন সঙ্গে পেয়েছি, আর ভয় কিসের।
আয় ত দেখি আমার সঙ্গে । তুই পিছন পিছন আয়, আর আমি আগে আগে যায়। দেখি কোথায় শালার ভুত।
এইভাবে দুজনে চলতে লাগলো।
কেমন যেন একটা ধুঁ-ধুঁ গন্ধে কালুর শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।
নন্দ জিজ্ঞেস করে, তোর খুব ভয় পাচ্ছে, না রে?
অগত্যে ভয়কে আড়াল করে কালু বললো কৈ-কৈ না--তো!
কালুর খটকা বাঁধে, আমার মনের কথা নন্দ জানলো কি করে ? তাছাড়া ওর গায়ে এমন ধুঁ-ধুঁ গন্ধ এল কোত্থেকে? চলতে চলতে কালু মনে-মনে এই-ই ভাবতে থাকে।
হঠাৎ করে কালু দেখে চমকে উঠে, একি! নন্দর গায়ের জামাটা কোথায় গেল? গায়ে বড় বড় লোম! তবে কি এ নন্দ না? নিশ্চয় ওই দলেরই কেউ হবে। সর্বনাশ, আমি কি তাহলে ভূতের জালে জড়িয়ে পড়েছি? এখন উপায়! যেই ভাবা, অমনি ভুতটা বলে খবরদার, পালাতে চেষ্টা করিস না। পালাতে চেষ্টা করলে এখনি তোকে চিবিয়ে খাব, বলে কালুর দিকে মুখ ফিরাতেই কালু দেখতে পেল, কি বীভৎস চেহারা, সর্বাঙ্গে বড় বড় লোম, আর বেরিয়ে এল তার ঠোটের দুই কোণ থেকে দুটি বাঁকা বড় বড় ধারালো দাঁত। এই দেখে কালু জ্ঞান হারা হয়ে গেল।
কতক্ষণ যে সে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল কিছুই বুঝতে পারলো না। জ্ঞান ফিরতেই কালু দেখতে পেল, একটা আবদ্ধ ঘরে একাই শুয়ে আছে। একেবারে নিস্তব্ধ। ভালো করে নজর দিয়ে দেখতে থাকে আর ভাবে, আমি কোথায় এসেছি? হাঁ, মনে হয় সেই, নন্দর রূপ ধরেছিল সেই বদমাইশ শয়তানটা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ঘরটা ত দেখে মনে হয় অনেকদিনের পুরানো, ভূতুড়ে বাড়ি ।
কালু আস্তে আস্তে উঠে বসে, আর ভাবতে থাকে, না ভয় পেলে চলবে না। যেভাবেই হোক ভূতের খপ্পর থেকে নিজেকে বাঁচাতেই হবে।
কালু ঘর থেকে বেরোতে অনেক চেষ্টা করেও কোনো লাভ হল না। দরজা ধরে টানাটানি করেও কাজ হল না। সেটাও বাইরে থেকে বন্ধ করা। কালু পিছন দিকে একটি জানালা দেখতে পেল। তাতে সূক্ষ্ম একটি ছিদ্র আছে। কালু চক্ষু মেলে ছিদ্র দিয়ে দেখে একেবারে থ! অন্ধকার হলেও কষ্ট করে বুঝা যায়, সাট-সাট হয়ে দশ-বারটা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে ঘুমন্ত অবস্থায় এবড়োখেবড়ো হয়ে পাশের ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে।
এই দৃশ্য দেখার পর কালু ভাবতে লাগলো, ওই শালারা হয়ত গ্রাম গঞ্জ থেকে উদর পূরণের জন্য ধরে এনেছে।
যেভাবেই হোক, নিজেকেও বাঁচাতে হবে, বাচ্ছেদেরকেও বাঁচাতে হবে। আমি ত ওদের হাতে ধরা পড়েই গেছি। তাছাড়া মরতে ত একদিন হবেই, আজ নইতো কাল। ওই শালার ভূতেরাও বুঝতে পারবে, কালুর গায়ে হাত দেওয়ার জ্বালাটা। একবার খপ্পর থেকে বেরোতে পারলে হয়।
ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে ঢুকে পড়লো, সেই শয়তান ভূতটা, সঙ্গে আরও দুটো।
সর্বনাশ, শয়তানটা আবার আমার মনের কথা বুঝতে পারেনি তো? কালুর মনে বার বার একই প্রশ্ন জাগে। আবার ভাবতে থাকে না না, ভূতেরা একইসঙ্গে চতুর্দিক ভাবতে পারেনা। ওরা ত ওদেরকে নিয়েই ব্যস্ত।
এমন সময় আর একটি ভূত এসে বললো, এই পেঙু, তোদেরকে সর্দার ডাকছে, আর সঙ্গে যে মানুষ এনেছিস ওটাকেও নিয়ে আয়, এই বলে চলে গেল।
সর্দারের কথা মত কালুকে নিয়ে গেল সেই ঘরে, যেখানে বাচ্চাগুলো ঘুমিয়ে ছিল।
কালু দেখে, এবড়োখেবড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকা বাচ্চাগুলো সবাই এখন জেগে রয়েছে।
কালুকে দেখামাত্র একটি বাচ্চা চিনতে পেরে কাছে আসতে চেষ্টা করলে, কালু ইশারা দিতেই বাচ্চাটা চুপ হয়ে গেল।
আসলে বাচ্ছাটা ওদের পাশের বাড়ির। এই নিয়ে কত থানাপুলিশ হয়ে গেছে। আজও কোনো সার-উদ্ধার হয়নি তার।
লখিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে ছেলে হারানোর খবর প্রায় মাঝে-মধ্যে শুনতে পাওয়া যায়। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও, আজ পর্যন্ত একটির ও সন্ধান মিলেনি।
এলাকার সবার ধারণা, কেউ হয়তো পাচার করছে। এর পিছনে বড় রকমের হাত আছে। তাই অচেনা পথচলতি বহু লোক সন্দেহের জালে পড়ে, এই এলাকার লোকের হাতে বেদম মারও খেয়েছে। আবার অচেনা কাউকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে । তারাও কেউ আজ অবধি ছাড় পাইনি, জেলেই পচছে।
এবার বুঝি ওদের উদর পূরণ করতে কালু এসেছে।
ওদের নাঁকি সুরের কথাগুলো কালু সবটা না বুঝলেও আকার ইঙ্গিতে কিছুকিছু বুঝতে পারছে। সর্দারের ভাগে পড়লো আমার মাথা, কেউ বলছে আমার পা, আর একজন বলছে বাকি একটা পা আমার। আর একজন ছুটতে ছুটতে এসে বলে আমি মানুষের হাত খেতে খুব ভালোবাসি। একটি বৃদ্ধা ভূত বলে কি না,তোরা যে যা খাবি খাস, আমার জন্য কলিজাটা রাখিস যেন,হাঁ।
কালু জেন্ত থাকতেই তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ভাগাভাগি চলছে।
এমন সময় ভূতের সর্দার বললো, তোরা শুধু বক্-বক্ করবি, না কিছু খাবি? খিদে পাইনি তোদের?
বাকি ভূতেরা বললো হাঁ-হাঁ, আমাদেরও খুব খিদে পেয়েছে।
পেঙু বলে, তাহলে আর দেরি কেন? মানুষটাকেই এবার খেয়ে ফেলি?
সর্দার বললো, নারে না, ওকে এখন খাব না। এখন ছোটোখাটো কিছু খেলেই সবার টিফিন মতো হয়ে যাবে। ভালো করে স্নান-টান করে তারপর তৃপ্তির সাথে মানুষটাকে খাব।
সর্দারের কথায় ভূতেরা সবাই সাঁই দিল।
সর্দারের কথামত পেঙু সবচেয়ে ছোটো বাচ্চাকে ধরে আনতেই, বাচ্চাটা কান্না করে আর বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মায়ের কাছে যাব, মা বাড়িতে আমার জন্য খুব কান্নাকাটি করছে।
নিষ্ঠুর প্রাণ ভুতের। কারও কান্নায় ওদের মন গলে না, বরং কানে ব্যথা লাগে। তাই বাচ্চাটার কান্না পেঙু সহ্য করতে না পেরে, ঘাড় মুটকে দিয়ে চিরদিনের মত চুপ করিয়ে দিল।
তারপর বীভৎস চেহারা ধারণ করে ভূতেরা সব বাচ্চাটার শরীরে বিষাক্ত দাঁত ফুটিয়ে বাচ্চাটার সমস্ত রক্ত শোষণ করে নিল।
কালুর সম্মুখে এই দৃশ্য দেখে কালু খুব কষ্ট পেল। রাগে কালুর ইচ্ছা হচ্ছিল ওদের সঙ্গে মারপিট আরম্ভ করে দিই। পরক্ষণেই ভাবলো না, তাতে কোনো লাভ হবে না, উলটে নিজেকেও বাঁচাতে পারব না, বাকি বাচ্চাদেরকে ও না।
অনেক কষ্টে অশ্রু সংবরণ করে চুপচাপ বসে রয়েছে কালু।
শয়তান ভূতেরা বাচ্চাটার রক্ত শোষণের পরে এবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদের নোংরামি ব্যাপার-স্যাপার দেখে কালুর রাগ একেবারে চরমে উঠে গেছে।
কালুর বুঝতে আর বাকি রইলো না। যত বাচ্চাদের অনিষ্টের কারণ এখানকার ভূতেরাই।
কালু মনে মনে বিভিন্ন রকম ফন্দি আঁটতে থাকে, সবই কেটে যাচ্ছে, কোনোটাই যেন কাজে আসছে না।
হঠাৎ করে কালুর মনে পড়ে গেল বড়দের কথা।
ভূতেরা নাকি আগুন দেখে খুব ভয় পায়।
কালু এবার অনেকটা আশ্বাস পেয়ে ভাবতে থাকে, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।
কালুর মনে পড়ে গেল, তার ঝাঁপির মধ্যে বিড়ি আর দিয়াশলাই আছে।
কালু মনে মনে ফন্দি বেঁধে ভূতের সর্দারকে বললো তোমরা মাংস খাওয়ার কৌশল কি, সেটা ও জান না?
ভূতের সর্দার বললো, কেন? মাংস আবার কিভাবে খেতে হয়। আমরা ত গোটা মানুষ ধারালো দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খায়।
কালু বললো, তাইতো বলি, ভূত না অদ্ভুত।
আমরা মাংস খাই বার ভাজা দিয়ে।
সর্দার বললো, এখন আমরা বার ভাজা কোথায় পাবো?
কালু বললো এইতো আমার ঝাঁপিতেই আছে।
ভূতেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে লাগলো, বা-বা-- কি মজা, আজ আমরা বার ভাজা দিয়ে মানুষের মাংস খাবো।
সবাই কালুকে ছেঁকে ধরেছে, দাওনা গো তোমার বার ভাজা, ওই ছেলেটাকে এখনি আমরা খাবো তোমার বার ভাজা দিয়ে।
কালু বললো তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, আমার ঝাঁপি থেকে বার ভাজা বার করে সবার হাতে হাতে দিবো।
কালুর কথামত সবাই কালুকে ঘিরে বসলো।
কালু কাপড়ে বাঁধা মোড়ক খুলে ঝাঁপির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কি যেন খুজতে লাগলো।
কালু দিয়াশলাইটা হাতে পাওয়া মাত্র ঝাঁপির ভিতর ফড়াম করে আগুন জ্বালিয়ে দিল।
আগুন দেখামাত্র ভুতেরা ভয়ে দূরে সরে গেল, দাউদাউ করে ঝাঁপি সহ মোড়ক পুড়তে থাকে।
কালু বাচ্চাদেরকে কাছে ডাকতে বাচ্চারা ভিড়ে গেল।
কালু ঠাট্টা করে আর ভূতদেরকে বলে, আয় বার ভাজা খাবি না?
ভূতেরা রাগের চোটে দূর থেকে দাঁত খিটিমিটি করে আর বলে বেইমান, তোর ঘাড় মুটকে রক্ত খাবো।
কালু ভূতের কথায় কর্ণপাত না করে শুধু ভাবতে থাকে, বদমাইশ ভূতেরা এইভাবে কতশত বাচ্চাদের জীবন নষ্ট করেছে, তার কোনো হিসাব নাই।
সেই সব বাচ্চাদের জামা কাপড়ের একটা গাদা ছিল। কালুর কথামত যে যতটা পারলো, ওই গাদা থেকে জামা কাপড় নিয়ে, একটা একটা আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে সবাই ভূতের বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। যেসব ভূতেরা বাইরে কালুদের ধরার অপেক্ষায় ছিল, প্রত্যেকের হাতে মশালের মতো আগুন দেখে তারা একটা একটা করে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
পিছন ফিরে কালু দেখে ঘণ পাতাই ঢাকা শেওড়া গাছের গোড়ায় সুড়ঙ্গ পথে আগুন ছিটকিয়ে বেরিয়ে আসছে।
আগুন দেখে কালু মনে-মনে ভাবতে থাকে, এবার ভূতুড়ে বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
এইভাবে কালু সকলকে উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে আসে। কালুকে গ্রামের লোকেরা খুব বাহবা দিল।
আশপাশ গ্রামেও কালুর এই দক্ষতার ঘটনা প্রচার হয়ে গেল।
কালুকে বাহবা দিয়ে যে যার ছেলে নিজ নিজ বাড়ি নিয়ে গেল।
কালুর এই দক্ষতার জন্য নিজের গ্রাম ছাড়াও আশপাশ গ্রাম থেকেও বকশিশ হিসাবে প্রচুর আর্থিক সাহায্য পেয়ে কালু দাঁড়িয়ে গেল।
হারানো ছেলে খুজে বার করতে থানার পুলিশ পর্যন্ত নাকাল হয়েছে। বহু চেষ্টা করেও পুলিশ কোনো সার উদ্ধার করতে পারেনি। কালু একাই সেটা করে সবাইকে দেখিয়ে দিল।
আজও কালুর চোখের সামনে ভেসে বেড়াই সেই বাচ্চাটার দৃশ্য, আর কানে বাজে কান্না, আমাকে ছেড়ে দাও, মায়ের কাছে যাবো!

সৎকার
- শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়

আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে মিশে ছিল
তোমার কিছু চাওয়া আর পাওয়ার হিসাব।
আজ তোমার সব চাহিদা হয়েছে পূরণ,
সব পাওয়া গেছে মিটে-
তবে, বন্ধুত্বের লাশ মিছে না বয়ে
এস করি ফেলি সৎকার,
নিই বন্ধন মুক্ত করে।

ভাষার স্বাধীনতা
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

ভাষার স্বাধীনতার জন্য শুরু গুনগুন
সাল'টা বাংলা ১৩৫৮ - এর ৮ ফাল্গুন ,
সালাম,বরকত,রফিক,জব্বারের খুন
আন্দোলনের গতি বাড়ালো তিনগুণ ৷

বাংলার আকাশ-বাতাসে রাষ্ট্র হয়েছে
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই একটি স্লোগানে ,
আবাল ,বৃদ্ধ বনিতারা গুনগুন করছে
আর রাষ্ট্রভাষা বাংলারই স্বপ্ন দেখছে ৷

ওদিকে নিথর দেহগুলোও পরে আছে
রক্তগুলোও ধীরে ধীরে জমাট বেঁধেছে ,
তবুও রক্ত আগুনের মতো ফুঁসে উঠছে
একটা মিনারের জন্ম হলো রাজপথে ৷

আজও সে মিনার ঠায় দাঁড়িয়ে রয়েছে
সালাম , বরকত , রফিকদের রক্ত গায়ে ,
নিঃস্বার্থভাবে ওরাতো শুধু দিয়েই গেছে
বিনিময়ে বছর ঘুরে ক'টা ফুল পেয়েছে ৷

ওদের ভালোবাসা , শ্রদ্ধা দাও দৃঢ়চিত্তে
দিওনা মেকি ভালোবাসা , যা সব মিথ্যে ,
ভাষার স্বাধীনতা দিয়ে গেছে ওরা রক্তে
তাই ভালোবাসা শ্রদ্ধা দাও অন্তর থেকে ৷

অপেক্ষায়
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

এ কেমন অপেক্ষায় রাখলে আমায় ,
এখন যে বেঁচে থাকাটাই হয়েছে দায়
শয়নে,স্বপনে,জাগরণে দেখি তোমায় ৷

এ কেমন ভালো তুমি বাসলে আমায় ,
যে ভালোবাসায় একা থাকাটা'ই দায়
তোমার ছাড়া আমি যে বড্ড অসহায় ৷

এ কেমন তরো কাছে ডাকলে আমায় ,
তোমার স্পর্শ ছাড়া সব শূন্য মনে হয়
তোমার স্পর্শেই শরীরের তৃষ্ণা হারায় ৷

এ কেমন স্বপ্ন তুমি দেখালে এ আমায়
যে স্বপ্ন আজকে দুঃস্বপ্ন হয়েই কাঁদায়
আর স্মৃতিগুলো সুনামী হয়ে বয়ে যায় ৷

ফিরে এসো বেলা আজ এই অবেলায়
তোমাকে ছাড়া আমি একলা অসহায়
আর কতো অপেক্ষায় রাখবে আমায় ?

সামান্য মানুষ
- নীলকণ্ঠ পদাতিক

আমার অজুহাত, পিছিয়ে আসার সমগ্র গল্পগুলোকে
অহংকার ভেবোনা।
দেবতারও দুর্বলতা থাকে; আমিতো সামান্য মানুষ!

পৃথিবীর নিদারুণ দুর্বিপাকে, শোকাতুর শীতের একদিন,
(যেন ঠিক প্রাগৈতিক আপেলতত্ত্বের মতো-
আমদের ভালোবাসা-ভালোবাসা'র বিচ্ছেদের দিনে) নির্বাসনের গোপন দলীল জুড়ে থাকলো প্রেম:
এবং আমরা- 'আমি' 'তুমি'র আবার আমন্ত্রণে
ফিরিয়ে দিলাম অনন্তকাল, কিছুকালের পণে।

জীবন এখন অনেক সরল, লাগাম হাতের মুঠে;
জীবন এখন অনেক সহজ, সুখের নিয়ন ঘরে;
জীবন এখন অনেক অনেক অনেক..

জীবন এখন অনেক সুখের, অন্ত্যমিলের,
রাশি রাশি হাসি-খুশি-গানের;- শুধু-
জীবন কেমন, জীবন গেছে ভুলে;

এই নিদারুণ অশুদ্ধ মন ক্ষয়ে গেছে।
এই অকারণ অসহ্য সুখ ধুয়ে গেছে।
বিকারগ্রস্ত অথৈ জীবন- তার জলে সব বয়ে গেছে।

এখন আমার
পিছিয়ে যাওয়া-এগিয়ে যাওয়া সমান কথা।
এখন আমার
জয়-পরাজয় নিরতিশয় অস্তাচলের শব্দে গাঁথা।
এখন আমার নিত্যদিনের পূজোর থালায় শোকের মালা,
এখন আমার খণ্ড মনের অনেক অনেক অনেক জ্বালা..

এখন আমার এগিয়ে যাওয়া মূর্খামি, আর
যোজন যোজন পিছিয়ে আসার একাগ্রতাই
চাওয়া-পাওয়ার সর্বৈব সীমারেখা।

ঘরপোড়া গরুর চোখে
সিঁদূড় মেঘও সর্বনাশের বিষম ছবি!
ক্ষমা করো।
রক্তে আমার মিশে গেছে দুর্বলতা।

জীবন ও সন্ধ্যালোক
- এম এস বাশার

আমার আজ একটা কথা খুব মনে পড়ছে। মিনা বাড়ীর দুই ঘরে একইসময় দুটি মেয়ে বিবাহযোগ্য হয়ে উঠেছিল, সম্পর্কে তারা জ্যাঠাতো বোন। একটি গৃহস্থ অর্থকড়িতে বেশ সচ্ছল ছিল, আর অন্যটি ছিল অভাবী।

ধরে নিলাম স্বাবলম্বী ঘরের মেয়েটির নাম মারিয়ম, আর অভাবি মেয়েটি আমিনা।

স্বাবলম্বী পরিবারটি সর্বদা আমিনাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতো, গল্পে আমি সে বিষয়ের বিষদ বিবরণ দিয়ে বড় করতে চাইনা।

আমিনার পরিবারের হতে তার কোন জবাব দেয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি কখনো। সেজন্য তাদের দুই পরিবারের মধ্য একটি শক্ত বন্ধন না থাকলেও কোন দ্বন্দ্ব ছিলনা তা স্পষ্ট করে বলা যায়।

মায়ের সুশাসন আর বিচক্ষণতা ধীরেধীরে আমিনার স্বভাবে বেশ লক্ষণীয় হয়ে উঠেছিলো। অভাব অনাটন তাদের কখনো দমাতে পারেনি, পিতার অক্ষমতা মা-মেয়ের ধৈর্য ও অবিচলতায় কখনো তার প্রভাব ফেলতে পারেনি পরিবারের মাঝে।

একটা পরিবার এমনি চাই যেখানে অভাব আর ধৈর্য একই সুতায় প্রদক্ষিণ করে। বিকালবেলা মায়ের চুল বিলি করতে গিয়ে অথবা নিস্তব্ধ রাতের শুরুতে নিদ্রার অপেক্ষায় বালিশে মাথা এলিয়ে দিয়ে মায়ের কাছে এমন শিক্ষাই পেয়েছে আমিনা।

মা বলে জগতে যা কিছু মনের সাথে বিবাদ সৃষ্টি করে এসব মনের মাঝে পুষে রাখতে নেই। পৃথিবীতে মানুষের জীবনের পরিবর্তন হয়নি এমন কভু দেখিনি। তুমি মনে রেখ, সুখেদুঃখে মানুষের দিন চলে যায় ঠিক কিন্ত কর্মফল অবশিষ্ট রয়, নিজের সম্মান নষ্ট করনা, এটা অর্জন করা বড়ই কঠিন।

বিদ্যাবুদ্ধি আর বিচক্ষণতায় আমিনার প্রশংসায় গাঁয়ের লোক পঞ্চমুখ হয়ে থাকতো, আমিনার গায়ের বর্ণ ছিল শ্যাম, বেশ উজ্জ্বলও নয় আর অধিক কালোও নয়। মায়ের পরশে ছোট হতেই ধর্মকর্মে বেশ মনযোগী মেয়েটি।

কুটিরশিল্পে মেয়েটির ছিল নিপুণ হাত, ছাই ধরে সোনা করে দিতে পারতো, সেলাইয়ের কাজে গাঁয়ে তার জুড়ি মেলা ভার। কাগজ কেটে ফুল বানানো, কনে সাজানো, রান্নাবান্না  আঁকাজোকায় অতুলনীয়া আমিনা।

একদিন দুপুরবেলা ভিন গাঁয়ের অচেনা একটি লোক তাদের গৃহদ্বারে হাজির হয়ে পরিবারের কর্তার খোঁজ করছিল, আমিনা তাকে ঘরে এসে বসার আবেদন করল।

বাবা বাড়িতে নেই, কিছু বলার থাকলে আমাকে বলুন, বাবা আসলে আমি বলে দেবো।

লোকটা কিছু না বলে চলে গেলো, আমিনার পিতার সাথে পরে এই লোকটির কি কথা হয়েছিল তা স্পষ্ট নয়, তবে কিছুদিনের মধ্য ভাল একটি প্রস্তাব এসেছিল। বড় ঘরের ছেলে, অর্থকড়ি জমাজমির অভাব নেই, জানা যায় বরপক্ষের পূর্বপুরুষ ছিল জমিদারের নায়েব,

গাঁয়ের মানুষ এখনো তাদের সমান ভয় করে।

বিষয়সম্পত্তি আর প্রভাবপ্রতিপত্তিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে ঘরের সাথে বসবাসকারী আপন কাকী নিজ কন্যা মরিয়ম কে এই ছেলের সাথে বিয়ে দিতে গোপনে খুব বিষিয়ে উঠেছিল।

আমিনার গায়ের বর্ন কালো, সম্পদহারা। মরিয়ম সুন্দরী ও সম্পদশালী। বরপক্ষ নিশ্চয়ই ঘর সনাক্ত করতে ভুল করেছে!

তারপর একটা সুযোগ মতো নিজ কন্যাকে সাজিয়ে এমন কোথাও দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল যে যাতে বরপক্ষ সহজেই মরিয়মকে দেখে আমিনার বিয়ের আয়োজন স্থগিত করতে পারে।

কনে দেখার সময় নির্ধারণ হল, একদিন বিকালবেলা বর আর তার সাথে চার-পাঁচজন অতিথি আমিনাদের ঘরে উপস্থিত হল। বিস্তার কথাবার্তা হল, গল্প হল, হঠাৎ জানালা হতে বরের এক আত্মীয়র চোখ পড়লো বাড়ীর উঠানে দাঁড়ানো একটি মেয়ের দিকে। সবার অগোচরে বরের সাথে থাকা সকলের দৃষ্টি কাড়ল মেয়েটি, অনাকাঙ্ক্ষিত বরপক্ষের সকলের সেই মেয়েটি পছন্দ করলো।

বরপক্ষ চলে যাবার পর তাদের সাথে আর যোগাযোগ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেনি।

কিছুদিন এভাবে চলে যায়, একদিন কনে দেখার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াই উক্ত বরের সাথে মরিয়মের বিয়ে সম্পন্ন হয়।

তারপর বেশকিছু দিন আমার আর এই পরিবারের সাথে যোগাযোগ করা হয়না।

চাকরির সুবাদে চলে গেলাম অনেকদূরে। এর মধ্য অনেক কাহিনীর জন্ম দিলো। গ্রামে যখন ফিরে আসি তখন অনেককিছু বদলে গেছে। চেনা পথঘাট অচেনা মনে হচ্ছে, যেসব ছেলেমেয়েদের মক্তবে পড়তে দেখেছি তারা এখন বড় হয়ে কলেজে পড়ছে। আমাকে দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে।

এরমধ্য কয়েকজনের বিদায় হয়েছে, নতুন কবরে ঠাঁই নিয়েছে প্রবীণ কিছু মানুষ, যাদের খুব মনে পড়ছে!

যেতে যেতে দেখা হয় আমিনার বাবার সাথে, আগের সেই চিন্তাযুক্ত রোগা চেহারা বদলে গেছে, মনে হচ্ছে দিনের পরিবর্তনে বদলে গেছে জীবনের পথচলা।

একপ্রকার জড়িয়ে ধরল আমায়, এতদিন পর মনে পড়লো, কেমন আছো বাপ?

ভাল আছি কাকা

তুমি কেমন আছো?

তোদের দোয়ায় খুব ভাল আছি।

আমিনা, কাকি মা তারা কেমন আছে?

খুব ভাল আছে,

আমিনার বিয়ে হয়েছে মোড়লগঞ্জে,আল্লহ'র রহমতে খুব সুখে আছে ও।

এমনি আরও কিছু কথা হল তার সাথে, তারপর বিদায় নিয়ে চলে এলাম বাড়িতে।

অনেকদিন পর বাড়ি এসেছি, স্মৃতিময় গ্রামের পথঘাটে বেড়িয়ে পড়তে মন কেবল বিচলিত করে তুলছে। নদীর পারে ঘুরতে বেড়িয়েছিলাম, এখানের মুদিখানায় আগের মতোই ভিড় লেগে আছে, মুখে আঁচল চেপে দুএক জন প্রবীণ মহিলা দাঁড়িয়ে আছে দোকানের কোণে। আড্ডা ঘরে চায়ে চুমুক দিয়ে গল্প জুড়ছে কিছু লোক।

নদীর ওপারে তখনো কিছু চাষি ধান কাটা শেষ করে আঁটি বেঁধে নায়ে তুলছিল। সূর্য তখন হলদে হয়ে বিদায়ের পথ ধরছে।

দুজন যাত্রী ওপারে যেতে হারুন মাঝির নামধরে হাঁক ছাড়ছে।

এপারে প্রশস্ত চরে কিছু ছেলে গায়ে কাদামেখে কাবাডি খেলছে, দুটি ছেলে ঘুড়ি উড়িয়ে নিজেদের আনন্দ বিলিয়ে দিয়ছে সুদূর আকাশে।

ঘাটে কেউ একজন জলভরে কলসি তুলে নতমস্তকে বাড়ির পথ ধরে।

দূর থেকে আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়!

আর একটু সম্মুখে এগিয়ে আসে,

দাদা কখন এসেছেন

আজ এলাম, তুই নিশ্চয়ই মরিয়ম!

হ্যা দাদা

একা এসেছিস, নাকি বর সাথে করে নিয়ে এসেছিস?

মেয়েটি ঢোক গিলে-

একটু অপেক্ষা করে বলে- বিয়েটা ভেঙে গেছে দাদা!

বর টা ভাল না, নেশাখোর, মারপিট করে, মাঝেমধ্যে মেরে বেহুশ করে রাখতো আমাকে।

এক লাখ টাকা যৌতুক চেয়েছিল বাবার কাছে, বাবা টাকা দিতে পারেনি, মাঝেমধ্যে আমাদের বাড়ি এসে খুব জ্বালাতন করতো, বাবা বাধ্য হয়ে বিয়ে ভেঙে দিয়েছেন।

সময়করে একবার বাড়িতে আসুন, বাবা কে দেখে যাবেন, কদিন ধরে তিনি খুব অসুস্থ। চৌকিতে শুয়ে আছেন। বাবা মাঝেমধ্যে আপনাকে খুব স্মরণ করেন।

সামনে পা ফেলে চলে যায় মরিয়ম, তখন সন্ধ্যা'র আঁধার ঘনিয়ে আসে সারিবাঁধা গাছের আড়ালে।

মসজিদে মাগরিবের আযান হচ্ছে- হাইয়্যা আলাসসলাহ, হাইয়্যা আলাল ফালাহ।

ওরা চীরঞ্জীব
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

ওরা লড়েছিলো , ওরা মরেও ছিলো
ওদের রক্তেই এই বিজয় এসেছিলো ,
ওরাতো বিজয় না দেখেই চলে গেলো
তবুও ওরা স্বাধীনতাটা দিয়ে গেলো ৷

ওরা চলে গেলো,কিন্তু ওরা হারায়নি
ওরা রক্ত দিতেও কুন্ঠিতবোধ করেনি ,
ওরা রক্ত দিয়েই করে গেছে চীরঋনী
সেই রক্ত সেই ক্ষত আজও শুকায়নি ৷

বিজয়ের উল্লাসে হাসতে পারেনি ওরা
প্রিয়জনের শেষ দেখাও পায়নি তারা ,
তবু যুদ্ধ ময়দানে হয়নি মনোবল হারা
ওরা যে এই বাঙলার দামাল ছেলেরা ৷

ওরাইতো ভালোবাসতে শিখিয়েছিলো
বাংলার অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিলো ,
ওরাই প্রথম স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছিলো
ওরা এই বাংলারই পা ফাটারা ছিলো ৷

ওদের শরীর মরে ওরা মরেনা কখনো
ওরা রত্নগর্ভার মায়ের গর্ভে জন্মেছিলো ,
ওরা সম্মুখ মৃত্যুকেও জয় করেছিলো
তাইতো ওরা মৃত্যুতেও চীরঞ্জীব হলো ৷

একটা বাক্সবন্দী প্রথা
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

সমাজের পরতে পরতে মানবতার অবক্ষয়
মানুষের মিছিলে আজ মানুষ পাওয়া দায় ,
ধর্মের লেবাসেও আজ অধর্মরাই জয়ী হয়
আমরা বোকারাও গাই তাদেরই জয় জয় ৷

মানুষ আজ ব্যানার-ফেস্টুনে প্রতিবাদী হয়
কিম্বা ঝড় তুলে ফেসবুক টুইটারের পাতায় ,
বাস্তবতায় অসহায়ের সহায় ক'জনইবা হয়
বাস্তবে মানুষের ভিরে মানুষই পাওয়া দায় ৷

সমাজের শরীর আজ বৈষম্যের ঘামে ভেজা
শহরের শরীরে ঝড়ছে সভ্যতার ভয়াবহতা  ,
রাতের শরীরে বইছে পতিতাদের কাতরতা
তবু চিৎকার করে বলি হায় সভ্যতা সভ্যতা ৷

বুক পকেটের নিচেই চাপা পরেছে মানবতা
পাশ কাটিয়ে যাই যদি দেখি কোন নৃশংসতা
নিজের বেলায় ঠিকইতো খুঁজি সেই মানবতা
এ কেমন মানুষ আমরা কেমনতর মানবতা ?

একবিংশ শতাব্দীতেও চালু আদিম হিংস্রতা
নাম পাল্টে সে প্রথা আজকে হয়েছে সভ্যতা
মানবতা আজ শুধুই একটা বাক্সবন্দী প্রথা
সভ্যতায় বিলিন আজ মানুষ আর মানবতা ৷

চাই মানচিত্রের স্বাধীনতা
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্ত দিয়ে কেনা
প্রিয় পতাকা আর প্রিয় স্বাধীনতা ,
চার লক্ষ মা,বোন হলো সম্ভ্রমহারা
তবুও ছিনিয়ে নিয়েছি মানচিত্রটা ৷
আফসোস আজ সতের কোটি জনতা
তবু রক্ষা করতে পারিনা স্বাধীনতা ,
মানুষরুপী কিছু শেয়াল শকুনেরা
খামচে ধরছে এ জাতির অগ্রযাত্রা ৷
আজও আমরা সতের কোটি জনতা
অনবরত খেয়ে যাচ্ছি ভ্যাবাচ্যাকা ,
প্রশ্নবিদ্ধ আজ ইতিহাসের সত্যতা
কে ঘোষক ? শেখ মুজিব না জিয়া ?
লাল সবুজের নিশান প্রিয় পতাকা
আদৌও কি সে পেয়েছে স্বাধীনতা ?
আজও এ মানচিত্রে শকুনের ছায়া
জাগো বাঙালী মুক্ত করো মানচিত্র ৷
জাগো বাঙ্গালী আজ দেখাও ক্ষমতা
রক্ষা করো প্রিয় পতাকার স্বাধীনতা ,
ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তও দেবেই সাথ
সতের কোটি জনতা রাখলে হাতে হাত ৷

অঘোষিত কারাগার
- এম এস বাশার

এখন যেন মিথ্যে বলায় পাপ নেই,
কথা দিয়ে কথা না রাখা!
শান্তি' র কথা বলে অসান্ত কাজ করা মানুষের স্বভাবসুলভ নিয়ম হয়েছে!
এখন আর আমি ব্যথিত হইনা,
অনুগ্রহকারী প্রাপকের কাছে ঋণী হয়ে যাচ্ছে
গ্রাহকের অবিবেচক দাবীর খসড়া বাড়িয়ে নির্মম ভাবে আদায় করছে।
রাবার যেমন প্রশস্ত হয়
নীতি বহির্ভূত!

রিজিকের জন্য ভয়ঙ্কর হচ্ছে মানুষ
মাসজিদে যাওয়া বাড়িয়েছে
ঋণ কে ঋণ হতে আড়াল করে,
অনুগ্রহ পাওনা দাবি বলে নায়েব পেয়াদা পাহারা দেয়
অবৈধ আদায়কারীর অবৈধ আমলনামা।

এখানে কোমলতা ব্যধিতে পরিণত হয়
লাজুক মানুষ টি গোপনে কাঁদে শৌচাগারে!
ধ্বনি হীন তালাবন্ধ জীবন চলে দৈন্য মানুষ,
লাজুক আর আত্মসম্মানবোধের মামলা
বোবাকালা অন্ধ বিচারক
অঘোষিত কারাগার!

প্রিয় সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি
- নীলকণ্ঠ পদাতিক

প্রিয় সুতো ছেঁড়া ঘুড়ি,
যেখানেই থাকোনা কেন, ভালো থেকো।
সুখের সংজ্ঞাটা বড় আপেক্ষিক ;
যতোটা দেখানো হয়, তার বেশি
দেখা যায়না কিছুতেই।

তাই তুমি ভালো থেকো খুব।
স্মৃতির সাথে স্বপ্নের যুদ্ধ নিয়ে
ভেবোনা। ব্যস্ত থাকা ভুলে থাকার
মাধ্যম- এই ভেবে তারা মাতোয়ারা,
কারো প্রতি কারো কোন ক্ষোভ নেই।

ফসিল
- শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়

বাসে- ট্রামে- পথে- ঘাটে – সর্বত্র
দেখা যায় ওদের,
তবে, ওরা ঠিক মানুষ নয়- মানুষের অনুকৃতি মাত্র।
ওদের কানে গোঁজা তার,
মাথা দোলে অসংলগ্ন ভঙ্গিতে।
যখন ওরা রেগে যায়,
মুখের ভাষা জানান দেয়,
ওরা আর মানুষ নেই- শুধুই ফসিল।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget