নভেম্বর 2017

আগন্তুক
- এম এস বাশার

অদৃশ্যের ভূমিতে হাঁটে প্রাণ
সিঁড়িপথে ছুটে যায় আগন্তুক
ঝোলায় লুকানো আত্মা সমূহ নড়ে ওঠে ঝোলার আঁধারে
এখানে সায়াহ্ন এনেছে মৃতদার
বাতাসে গোলাপজলের সুবাস উড়ে যায়
আর একটা আত্মা যোগহয় গোপন গাঁঠরিতে
অদৃশ্য পথ মাড়িয়ে যায় আগন্তুক
একটা একটা সিঁড়ি
আসমান হতে আসমানের পথধরে
সীমানা পেড়িয়ে মিলিয়ে যায় অসীমের দুরন্ত পথে!
এখনে কান্নারা অতিথি হয় কিছুক্ষণ
সুটকেস হীন আবেগের চা পান
চোখে জল আছে- অথবা নেই
বিস্ময়ে থমকে দাঁড়ায় কিছু প্রাণ।
সিঁড়িপথ পড়ে থাকে অদৃশ্যে!

স্বাধীনতা দেখো
- এম এস বাশার

স্বাধীনতা দেখো
পালকের গায়,
দেখো রাজহংসে
জলে ছুটে, অথবা মাঠে, সবুজ ঘাসের গায়
জলের পরে যখন খুশি উড়ে যায়
পাতিহাঁস
জলে ডুবে খেলে, ধরে মাছ
পাতালের গায়।
সন্ধ্যা নামে যবে, ডেকে নেয় ঘরে, বালিকা
আয় চৈ চৈ
স্বাধীনের পাছে ছুটে চলে পরাধীন
ঘরে আয়, চৈ চৈ!

স্বাধীনতা দেখো, নলখাগড়ায়
সারাদিন বাতাসে দোলে, সারিবাঁধা দল
ফড়িং এসে চুমে যায় গাল
টুনটুনি বাঁধে বাস, মিতালি উড়ায়!
স্বাধীনতা দেখো, উড়ন্ত পাখির গায়
দূর আকাশের প্রশস্ত নীলিমায়
উড়িয়ে দিয়ে মন, ডানার পালক
লাল সবুজ- বাংলায়
পরবশ,
বাংলায়!

স্বাধীনতার মুক্তি
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

স্বাধীনতার পায়ে আজ শেকল
মানবতাও দেখি হয়েছে বিকল ,
মানুষগুলো দেখতে কিন্তু সরল
আর অন্তরে বোঝাই শুধু গরল ৷

মানুষগুলো আজ হয়েছে দূর্বল
আর অমানুষগুলো শক্ত সবল ,
ওদের জন্য আছে বড় বড় দল
মুখোশের ভীরে মানুষই বিরল ৷

স্বাধীনতা সে পরাধীনতায় বন্দী
ক্ষমতাভোগী আর লোভীর সন্ধি ,
ওরা স্বাধীনতার শিকলেই বন্দী
কবে হবে এই বন্দীদশার মুক্তি ?

সহায় সম্বল গিয়ে রক্তটুকুই পুঁজি
তাই আবারো সে সবলকেই খুঁজি ,
যে দূর্বলকে দিবে সে শক্তির পূঁজি
আবার হবে এই স্বাধীনতার মুক্তি ৷

অমানুষেরা ভোগ করে স্বাধীনতা
আর মানুষগুলো এখানে পরগাছা ,
আর্তনাদ শুনি বাঁচাও আর বাঁচা
জানিনা কি করে ভাংবো এ খাঁচা?

ভাগ্যকে মানতেই হয়
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

(1)
পাঁচ ব্যাটারীর টর্চের আলোতে পুলিশ ইন্সপেক্টর বাইরের গেট , ঘরের বাইরে কোলাপ্সীবেল গেট ও সর্বশেষে ঘরে ঢোকার দরজার তালা একের পর এক ভাঙ্গার পরে চারজন পুলিশ কর্মীকে নিয়ে দোতলার বিশাল ড্রয়িংরুমের ভিতর এসে দাঁড়ালেন ।  অন্ধকার ঘরের লাইটের সুইচ পেতে তাদের বিশেষ বেগ পেতে হলোনা কারন পাঁচ ব্যাটারীর দু'দুটি টর্চ তাদের সাথে ছিলো । সন্ধ্যা তখন প্রায় হয় হয় । পাড়ার জনৈক ব্যক্তির ফোনে তাদের এখানে আসা ।  জনৈক ব্যক্তি পুলিসকে জানান,  বাংলোসম বিশাল দোতলা বাড়ি থেকে  কয়েকদিন ধরেই পঁচা দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে যা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে ! ঘরের ভিতর ঢুকেই প্রত্যেকেই নাকে রুমাল চাপা দেন । অগ্রহায়ণের শীতের সন্ধ্যা ;বেশ জাঁকিয়ে ঠান্ডাও পড়েছে ।  সকাল থেকেই কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়েছে প্রকৃতি । এই ঠান্ডার মাঝেও ওই বাড়ির বাইরে পুরুষ ও মহিলা গিজগিজ করছে ।  সকলের ভিতরই একটি চাপা ফিসফিসানি !  এখানে তো পারমান্যান্টলি কেউ থাকেনা ;মাঝে মাঝে রাতের দিকে লাইট জ্বলতে দেখা যায় !  কিণ্তু সেভাবে কাউকে কোনদিনও দেখা যায়নি ।  চারিদিকে উঁচু প্রাচীরে ঘেরা ।  সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে ফুলের বাগান ।  মাঝে মাঝে এক বৃদ্ধকে ওই বাড়িতে দেখা যায় বটে কিণ্তু সে নিজেকে ওই ফুল বাগানের মালি বলেই পরিচয় দেয় । বাড়ির বাইরেও বিশাল পুলিশ বাহিনী দাঁড়িয়ে ;যাতে করে কোন পাড়ার লোক ভিতরে ঢুকতে সাহস না পায় ।

ইন্সপেক্টর উত্তম মজুমদার ও তার সহকর্মীরা ঘরে ঢুকে আলো জ্বালিয়ে বিভৎস দৃশ্য দেখে কয়েক সেকেন্ড কেউই কথা বলতে পারেননি । সারাঘর রক্তে ভেসে গেছে যদিও সেই রক্ত এখন শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে । মধ্য বয়স্ক দুই ভদ্রলোক -একজন সোফার কাছে আর একজন বাথরুমের দরজার কাছে পরে আছেন । দুজনকেই ছুরিকাঘাত করে মারা হয়েছে । ঘরের মধ্যে ইতস্তত মদের বোতল , গ্লাস , নানান ধরনের খাবার দাবার ছড়ানো ছিটানো । বোঝায় যাচ্ছে মৃত দুই ব্যক্তির সাথে আরও এক বা একাধিক লোক ছিলো । যে বা যারা বচসার জেড়ে এদের দু'জনকে খুন করে সকলের অলক্ষ্যে এই বাড়ি থেকে ধীর স্থির ভাবেই বেরিয়ে গেছে ।  সমস্ত ঘর সার্চ করে সন্ধেহজনক কিছুই চোখে পরেনা কারও । বডি দুটিকে ময়না তদন্তের জন্য পাঠিয়ে বাড়িটা সিল করে ইন্সপেক্টর তার দলবল নিয়ে থানার উদ্দেশ্যে রওনা দেন ।

(2)
ছোটবেলা থেকেই চন্দন পড়াশুনায় খুব ভালো । প্রতি বছরই সে প্রথম হয়ে উপরের ক্লাসে ওঠে । স্কুলের শিক্ষকেরা প্রত্যেকেই চন্দন সম্পর্কে উচ্চ ধারনা পোষণ করেন ও তার উজ্জ্বল ভবিষৎ চোখের সম্মুখে দেখতে পান । মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সে 90% নম্বর নিয়ে পাশ করে বাবার ইচ্ছা অনুযায়ী ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হয় । কিণ্তু উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে সে রেলের চাকরীর পরীক্ষা দিয়ে রেলে চাকরী পেলেও তার বাবা তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং এ ভর্তি হতে বলেন ।  বাধ্য চন্দন বাবার ইচ্ছাকেই প্রাধান্য দেয় । ফলে তার জীবনে স্বইচ্ছায় লক্ষ্মী এসে ধরা দিলেও ভাগ্যের পরিহাসে তাকে তা খোয়াতে হোলো । তিন ভাই বোনের বড় চন্দন ।  বড় ছেলের উজ্জ্বল ভবিষৎ বাবাও কল্পনা করেছিলেন । ছোট ছেলে ও মেজ মেয়েটি পড়াশুনায় ছিলো মোটামুটি । হুগলির প্রত্যন্ত গ্রামে সামান্য যা কিছু জমিজমা ছিলো তিনি সকলের অজান্তেই ছোট ছেলের নামে উইল করে রাখেন ।  তার ধারনা অনুযায়ী চন্দন পাশ করে বেরিয়েই চাকরী পাবে আর তখন সে গ্রামে থাকবেও না ;নিজেরটা নিজে চালিয়ে নিতে পারবে ।  তাই অপেক্ষাকৃত দুর্বল ছোট ছেলেকেই তিনি তার সম্পত্তির পুরোটা লিখে দেন । যেহেতু সরকারী খরচে চন্দন  পড়াশুনা করতো তাই তাকে নিয়ে তার বাবার কোন চিন্তা ছিলোনা । টুকটাক হাত খরচ সে টিউশনি করেই জোগাড় করতো ।  চন্দনের ইঞ্জিনিয়ারিং এ যখন তৃতীয়বর্ষ তখন তার বোন চারুলতার বেশ অবস্থাপন্ন ঘরেই বিবাহ হয়ে যায় ।  চন্দনের স্কুল শিক্ষক বাবা মেয়ের বিয়ের ঠিক এক বছরের মধ্যেই মারা যান । চন্দন ভালভাবে ইঞ্জিনিয়ারিং এ পাশ করে চাকরীর জন্য হন্যে হয়ে ইন্টারভিউ দিয়ে যেতে লাগলো ।  কিণ্তু কোথায় চাকরী ? চাকরীর চাবীতো সব নেতাদের হাতে ! সরকারী থেকে বেসরকারী ! গ্রামের ছেলে চন্দনের তো কিছু ভালো সর্টিফিকেট ছাড়া আর কিছুই নেই । তাই চাকরীও তার মেলেনা । সাথে আলোচনা করে ঠিক করে ভায়ের মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হয়ে গেলেই গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে তারা কলকাতায় ছোটখাটো একটা ভাড়া বাড়িতে এসে উঠবে । ভাইকে কলকাতার কলেজেই ভর্তি করবে ;নিত্য সে প্রাইভেট কোম্পানীগুলিতে চাকরীর চেষ্টা করার সাথে সাথে কিছু টিউশনি করতেও পারবে । মাকে দিয়ে বাড়ির দলিল বের করিয়ে উইল দেখে সে হতভম্ব ! বাবা তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করেছেন !  কিণ্তু কেনো ?  কি তার অপরাধ ছিলো ? বাবা কেনো এটা করলেন ?

ভয়ানক অভিমান থেকে চন্দন পরদিন সকালেই মা , ভাইকে কিচ্ছুটি না জানিয়েই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরে ।  সে কলকাতা শহরে নানান জায়গায় চাকরীর চেষ্টা করতে লাগে । বলা বাহুল্য তার এই মনের ইচ্ছা পূরণ হয়না । একদিন রাতের আঁধারে স্টেশনে নিজের অজান্তেই একটি খুনের স্বাক্ষী থেকে যায় ।  খুনীদের  সেটা নজর এড়ায় না ।  চন্দনকেও তারা মেরে ফেলতে যায় । চন্দনের কাকুতি মিনতিতে দয়াপরোবশ হয়ে তারা চন্দনের চোখ বেঁধে তাদের বসের কাছে নিয়ে যায় । চন্দনের কাছে তাদের পারিবারিক ঘটনা জেনে ও তার কোন পিছুটান নেই শুনে তিনি বস তাদের দলে ওকে ভিড়িয়ে নেন ; নাহলে খুনের ঘটনার স্বাক্ষী থাকার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড !

চন্দন আস্তে আস্তে হয়ে উঠে কুখ্যাত ডাকাত শমশের খান ।

(3)
ক'দিন আগেই বেলেঘাটার জনবহুল এলাকায় ব্যাঙ্ক ডাকাতির সূত্র ধরে প্রশাসন জানতে পারেন সেদিনের বিলাসবহুল ওই বাড়ির দুই ব্যক্তির খুনের সাথে ব্যাঙ্ক ডাকাতির সংযোগ রয়েছে । ব্যাঙ্কের গোপন সি.সি.ভি. টিভির মাধ্যমে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে যে দুই ব্যক্তি খুন হয়েছেন তারা ওই ব্যাঙ্ক ডাকাতির তিন মূল মাথার দুই মাথা । মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা থাকলেও দুঁদে পুলিশ অফিসারদের মৃত দুই  ব্যক্তির মুখের সাথে তাদের মিল খুঁজে পেতে একটুও অসুবিধা হয়না  ! সাথে আর যে তিন চারজন ছিলো তাদের খুঁজতে খুঁজতেই প্রসাশনের কালঘাম ছুটে যায় ।

(4)
কর্তব্যনিষ্ঠ পুলিশ অফিসার তার সমস্ত রকম সোর্স কাজে লাগিয়ে জানতে পারেন ওই ব্যাঙ্ক ডাকাতির সাথে কুখ্যাত সমাজ বিরোধী শমসের খানের যোগসাজোগের কথা ।  সেদিন ব্যাঙ্ক ডাকাতির পর ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে প্রাসাদোপম ওই বাঙ্গলো বাড়িতে যার মালিক আমেরিকায় থাকেন ;বাড়িটি দেখভালের জন্য ওই মৃত এক ব্যক্তির নিকট  বাড়ির চাবী ন্যস্ত থাকে । সমস্ত খবরাখবর নিয়ে বিশেষ সোর্সের মাধ্যমে খবর পেয়ে এস্প্লানেডের নামকরা বার থেকে শমসের খানকে গ্রেপ্তার করতে যেয়ে হতভম্ব হয়ে যান ! এ কাকে দেখছেন তিনি ? শমসের খান নামে পরিচিত কুখ্যাত সমাজ বিরোধী , খুন , রাহাজানি , ব্যাঙ্ক ডাকাতি , প্রশাষনের সন্ত্রাস , ধনীব্যক্তির রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার মূল ব্যক্তি -একদা মেধাবী ছাত্র , সকলের প্রিয় , ইঞ্জিনিয়রিং এ ফাস্ট ক্লাস পাওয়া তার দাদা চন্দন মজুমদার ? সামান্য অভিমান থেকে দাদার আজ এই চরম পরিনতি ? কিণ্তু কেন ?  কি কারনে দাদা এই অন্ধকার পথ বেছে নিলো ?  তবে কি বেকারত্বের জ্বালা ? কিণ্তু কিছুই জিগ্গাসা করতে সে পারলোনা ! পুলিশকে অ্যারেস্ট করার অর্ডার দিয়ে দাদার চোখ ভর্তি জলের দিক থেকে তাড়াতাড়ি চোখ সরিয়ে নিলেন যাতে তার নিজের চোখের জল তার অতি প্রিয় দাদার চোখে ধরা পরে না যায় । তিনি ভালোভাবেই জানেন শমসের খান বা তার দাদার কি চরম শাস্তি হতে পারে । দু'জনের মনেই নানান প্রশ্ন !  কিণ্তু জিগ্গাসা করার অধিকার আজ আর কারও নেই কারন একজন আইনের রক্ষক আর একজন আইনের ভক্ষক !

গাড়ি ছুটলো থানার উদ্দেশ্য ।

- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

মাত্র পঁচিশ দিনের বাচ্চা রেখে মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। বাচ্চাটাকে দেখার মতো পৃথিবীতে তার আপন বলতে আর কেউ ছিলনা। কোথাও বসা মাচার তলে, নইত কোনো গাছতলে কখনো বা পথের ধারে কারও বারান্দায় শুয়ে রাত কাটাত।

তবুও তার এতটুকু শান্তি ছিলনা। চোখে পড়লেই সবাই তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিতো।

সেদিন বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে-দিতে বাড়ি ফিরতে অন্ধকার হয়ে গেছে। বাড়ি ঢুকতেই বাচ্চাটা ছুটতে ছুটতে এসে আমার পা চাঁটতে লাগলো। কোথায় ছিল কে জানে? যতই আলতো পায়ে ঠেলে সরিয়ে দিই, তবুও আমাকে ছাড়তে চাইনা। যেন কতদিনের চেনা।

বারবার এমনভাবে দেখে আমারও মনটা খুব দুর্বল হয়ে গেল।

হেরে গেলাম এই অল্প বয়স্ক বাচ্ছাটার কাছে।

ওর উপর আমার খুব মায়া পড়ে গেল। ওকে বুকে তুলে চুমা দিতে-দিতে বাড়ি ঢুকতেই বাবা বলে, ওটা কি হবে?

আমি বললাম পুষব।

ঠিক আছে, তোর যখন এতই শখ, তো পুষনা। এই বলে বাবা হাসতে হাসতে বারান্দায় উঠে।

তখনই বোতলে দুধ ভরে ওকে খাওয়াইতে লাগলাম। খাওয়া দেখে মনে হল, যেন সাত সাগরের জল একাই খেয়ে ফেলবে। ক্রমে-ক্রমে দু'দিনের মধ্যেই সাভাবিক হয়ে গেল।

গায়ের রং ছিল সম্পূর্ণ সাদা, তাই আদর করে নাম রাখা হল ধবলা।

ধবলা দিনে-দিনে যত বড় হতে থাকে, মায়াও যেন বাড়তে থাকে। কোনো আত্মীয় পরিজনের সাথে কথা বললেও ওর খুব কষ্ট হয়। ও ঘেউঘেউ করে বুঝাতে চায় আমি যেন ওকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি। আমার গায়ে কেউ হাত দিয়ে কথা বলুক, সেটাও কিছুতেই সহ্য করতে পারে না।

ধবলাকে ছেড়ে আমার বাইরে কোথাও যাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়লো। কোথাও গেলে, ওর আড়ালে আমাকে যেতে হয়।

সব সময় ধবলা যেন আমাকেই খুজে বেড়ায়।

একদণ্ড চোখের আড়াল হলেই বাড়িতে ঘেউঘেউ করে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে।

ও যেন ভাবে, পাছে আমার আপদ বিপদ না ঘটে, সঙ্গে থাকলে হয়ত ধবলা উদ্ধার করবে। বাড়ির সবার কাপড় ধরে টানাটানি করে, ওর ইচ্ছা, কেউ যেন ওকে আমার কাছে নিয়ে যায়।

যত দিন যায় ধবলা ও ধীরে-ধীরে আমার খুব প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠলো।

ধবলা এখন বড় হয়েছে। আমাদের সম্পর্কটা এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো, কুকুরের কথা ভুলেই গেছি। ও যেন আমার খুব প্রিয়জন।

এইভাবে চলতে চলতে একদিন হঠাৎ করে ভিন পাড়ার অন্য একটি কুকুর আমার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। ধবলা তাকে কিছুতেই সহ্য করতে না পেরে, ঘেউঘেউ করে ছুটে গিয়ে মারামারি কামড়াকামড়ি আরম্ভ করে দিল। ভিন পাড়ার কুকুরটি পালাতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই ছাড়তে চায়না। আমি অনেক চেষ্টা করেও যখন ছাড়াতে পারছিনা রাগের মাথায় ধবলাকে মেরেছিলাম। তারপর ধবলা শান্ত হয়ে গেল। ভিন পাড়ার কুকুরটি ও চলে গেল।

ধবলাকে আমি কাছে ডাকতে আর কোনো সাড়া দেয়না। চুপ করে বসে রইলো। চক্ষু বেয়ে টসটস করে জল পড়তে লাগল। বুঝতে পেরেছি, যাকে আমি এতদিন শুধু আদর করেই এসেছি, আজ হঠাৎ আমার স্বভাবের এই পরিবর্তন দেখে, ধবলা খুব দুঃখ পেয়েছে।

ধবলা সারা বাড়িটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বাড়ির বাইরে পা ফেলে। আমি তার গলা ধরে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে অনেক চেষ্টা করেও বিফল হলাম। অবশেষে আমি বাড়ি ফিরে বারান্দায় বসে গালে হাত দিয়ে ভাবছি, ওর দুঃখ ভাঙলে বাড়িতে আবার ফিরে আসবে।

বেশ কিছুক্ষণ পর দেখলাম আসছে না, বাইরে বেরিয়ে দেখি, তার জায়গায় সে আর নাই।

অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পেলামনা।

আজ প্রায় তিন মাস কেটে গেল, তবুও বিশ্বাসে পথ চেয়ে বসে আছি ধবলা একদিন না একদিন ফিরে আসবে।

ছেদি ঠকের গল্প
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

ইশানপুর গ্রামের এক বাসিন্দা এই ছেদি ঠক। লোকমুখে শুনেছি, ওর আসল নাম ছিল ছেদি রহমান সেখ। পাশের গ্রামেই শশুরবাড়ি। ছেদি ঠকের কোনো সন্তান ছিলনা, যাকে বলে নিঃসন্তান।
অল্প বয়সেয় বাবা, মা মারা যায়। ছেদি ঠকের বুদ্ধি ছিলো খুব তীক্ষ্ণ, কিন্তু সে তার বুদ্ধি ভাল কাজে না লাগিয়ে, লাগাতো অকাজে। ছেলেবেলা থেকেই খাটাখাটনির অভ্যাস তার ছিলনা। যাকে বলে একেবারে কুড়ে। বাবার অল্প যতটুকু জমি জায়গা ছিল, সেটাও বেচে খেয়েছে। এখন ছেদি নিঃস্ব।
নিরুপায় হয়ে ছেদি তার কু-বুদ্ধি কাজে লাগাতে শুরু করে। আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব কিছু মানতো না। সকলকে ঠকিয়ে, ধাপ্পাবাজী করে সংসার চালাতো। ওর শ্বশুর সেও জামাই বাড়ি আসতে ভয় পেতো। কারণ শ্বশুরের পকেট থেকে একবার টাকা চুরি করে ধরা পড়েছিল এই ছেদি । তখন থেকেই এই ছেদি রহমান সেখের নাম হয় ছেদি ঠক।
এখন ছেদি ঠক বলে এক ডাকে সবাই চিনে। আসল পেশা এখন লোক ঠকানো। ছেদি ঠকের লোক ঠাকানোর বেশ মজার মজার কিছু কাহিনী আছে।
ইশানপুরের প্রতিটা লোকই একবার না, একবার ছেদি ঠকের খপ্পরে পড়েছে। এখন সবাই বুঝে গেছে। ওকে দূর হয়ে আসতে দেখলেই গ্রামের সবাই অন্য রাস্তা ধরে। ওর সঙ্গে কথা বলতেও সবাই ভয় পায়। কারণ কথার মারপেঁচে হইতো ছেদি ঠকের খপ্পরে পড়ে যাবে।
সকলের জানাজানিতে, গ্রামে ছেদি ঠকের লোক ঠকানো ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে গেল। বেচারা কি আর করে, তাই গ্রাম ছেড়ে সে দূর-দূরান্তে লোক ঠকানো শুরু করে।
স্বর্ণকারের কাছ হতে ছেদি ঠক লোহার একটা বড় মুদ্রা বানিয়ে, তার উপরে সোনার রং পালিশ করে স্বর্নমুদ্রা তৈরি করে নিয়েছিলো। সবসময় ছেদি ঠক ওটাকে কাছেই রাখত।
ইশানপুর হতে মাইল দশেক দূরে ভাবানীপুর গ্রাম। ভিখারী বেশে ছেদি ঠক এই গ্রামে ভিক্ষা করতে ঢুকে। ভিক্ষা করতে করতে এমন একটা বাড়িতে উঠলো যে, দেখেই বোঝা যায় বিশাল ধনী লোকের বাড়ি। বাড়ির সামনে একটা পুরোনো নিম গাছ। পূর্বদিকে একটা বড় পুকুর।
ভিক্ষা করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে ছেদি ঠক মনে মনে ফন্দি আঁটে। এই বাড়ীওয়ালাকে ঠকিয়ে বেশ বড় রকমের ধান্দা করা যাবে।
ভবানীপুর গ্রামের ভিতর থেকে বেরিয়ে দেখে, কতকগুলো লোক মাঠের কাজ সেরে বাড়ি ফিরছে। ছেদি ঠক ওদেরকে দেখে ভাবতে থাকে, এই একটা সুযোগ। একটা বিড়ি হাতে ধরে ওদেরকে ডাকতে থাকে, এইযে ভাই একটু আগুন হবে? ডাক শুনে একজন বললো, আমাকে ডাকছো ভায়া? ছেদি ঠক বললো হাঁ ভাই । লোকটি কাছে আসলে, ছেদি ঠক একটা বিড়ি বার করে বললো, তোমার নামটা কি ভাই? লোকটি বললো হাঁদা। ছেদি ঠক বললো বাঃ, খুব ভালো। তোমার কাছে আগুন আছে? তা আছে বৈকি, মাঠে ঘাটে খাটি, একটু আধটু বিড়ি না খেলে কি আর চলে ভায়া? ছেদি ঠক নিজের বিড়ি পকেটে রেখে দিয়ে বললো, কৈ দাওতো একটা তোমার দেশের বিড়ি, খেয়ে দেখি। হাঁদা দুটো বিড়ি বার করে দুজনে ধরিয়ে মৌজ করে গল্প শুরু করে দিল। হাঁদা জোর একটা টান দিয়ে এক রাশ ধোঁয়া ছেড়ে জিজ্ঞেস করে, তা হাঁ ভায়া তুমি কোথায় থেকে আসছো ? ছেদি ঠক অঙুল দেখিয়ে বললো ওই যে গাছগুলো দেখা যাচ্ছে, ওই গ্রামেই ঢুকেছিলাম। এই গ্রামে অনেক বড়লোক আছে। হাঁদা বলে, হাঁ ভায়া, ওটাইতো আমাদের গ্রাম। আমাদের গ্রামের সবচেয়ে যে বড়লোক, তার নাম রহিম মোড়ল। উনার বড় ছেলেটা বিদেশে থাকে। তার নাম হাতিম। যখন বিদেশ থেকে বাড়ি আসে, তখন প্রচুর টাকা-পয়সা নিয়ে আসে। শুনে ছেদি ঠকের লোমগুলো কাঁটা দিয়ে উঠলো, হাত হতে বিড়িটা নিজে থেকে পড়ে গেল। হাঁদা তখনও বলে চলেছে, আর ছোট ছেলেটা বাড়িতে আছে নাম সাকিম। আচ্ছা ভায়া আমি এখন আসি, কথায় কথায় অনেক দেরী হয়ে গেল। ছেদি ঠক অন্যমনস্ক হয়ে কোনরকমে ঘাড় নেড়ে সাঁই দিল।
রহিম মোড়লের নাড়িনক্ষত্রের বর্ণনা পেয়ে ছেদি ঠক নিশ্চিন্ত হল। এবার কাজের অনেক সুবিধা হবে। ছেদি ঠকের মাথায় ঘুর-ঘুর, ঘুর-ঘুর করতে লাগলো, শুধু বড়লোক রহিম মোড়লের কথা। ভাবতে ভাবতে ছেদি ঠক বাড়ি ফিরে এল।
দিন আর ফুরাতে চায়না। কি করবে ভাবতে আরও দুইদিন কেটে গেলো। অবশেষে দুইদিন পরে ওঝার বেশে ভোরের অন্ধকারে ছেদি ঠক বেরিয়ে পড়ল রহিম মোড়লের বাড়ির উদ্দেশ্যে। এমন ওঝার বেশ ধরেছে, ছেদি ঠক বলে চেনাই যায়না। কিছু গাছ-গাছড়া, আরও কিছু হিজি-বিজি ঝোলার মধ্যে পুরে নিয়েছে।
একসময় ভবানীপুরে ছেদি ঠক পৌছে গেল। ছলনা করে গ্রামের বাড়িতে বাড়িতে গাছ গাছড়া, ঔষধ বিক্রি করতে থাকে। সবার মুখে মুখে রটে গেল, গ্রামে একটা বড় ওস্তাদ এসেছে। লোকের ভীড় জমে গেল ওস্তাদ ছেদি ঠককে দেখতে।
ছেদি ঠক ঘুরতে ঘুরতে রহিম মোড়লের বাড়ির সামনে হাজির হল। বাড়ির চারিদিকে দুইবার ঘুরে নিল। সবাই অবাক হয়ে দেখতে থাকে। ছেদি ঠক মাথায় হাত দিয়ে হঠাৎ বসে পড়েই শুধু হায় হায় করে চিৎকার করে। সবাই একেবারে থৌ হয়ে গেল। সর্বনাশ ওস্তাদের এমন হল কেন? পাড়ার লোকে মাথায় জল ঢালবে, এমন সময় হাতের ইশারা দিয়ে জানালো আমি ঠিক আছি। হৈ-চৈ শুনে রহিম মোড়ল বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই কাণ্ড দেখে। ছেদি ঠক আস্তে আস্তে সুস্থতা প্রকাশ করে। উঠে জোর দিয়ে বলে, কোথায় রহিম মোড়ল? রহিম মোড়ল কাঁপা কণ্ঠে বললো এইতো আমি, ওস্তাদজি! তোমার ছোট ছেলে সাকিমকে ডাক। হাতিম তো এখন বিদেশে।
সব ঠিকঠিক বলতে দেখে, সবাই ভীষন অবাক হয়ে গেল। সারা ভবানীপুরে ওস্তাদের নামে একেবারে রৈ-রৈ।
ছেদি ঠক বললো, তোমরা সবাই শুনে রাখো, এই রহিম মোড়লের পূর্ব পুরুষের সই-সম্পত্তি, ধন-দৌলতের কোনো হিসাব ছিলনা। বাড়ির সিমানাতেই রেখে গেছে পরপর সাতটা পিতলের হাঁড়ি ভর্তি স্বর্ণ-মুদ্রা। ঐগুলো আগলে আছে পূর্ব পুরুষের প্রেতাত্মা।
রহিম মোড়ল জিজ্ঞাসা করে, ওস্তাদজি ওই মুদ্রা উদ্ধার করা যাবেনা? ছেদি ঠক বলে, প্রেতাত্মার বুক থেকে মুদ্রা বার করে নিয়ে আসাটা অত সহজ কর্ম নই বাবাজী! তবে যখন বলছ, চেষ্টা করে দেখছি! এই বলে ছেদি ঠক ধ্যানে বসলো। কিছুক্ষণ দম বন্ধ করে থাকার পর উঠে বললো, স্বর্ণমুদ্রা উদ্ধার করা যাবে বাবাজী! তবে- – -! বলে ছেদি ঠক থেমে গেলো। রহিম মোড়ল কাকুতি হয়ে জিজ্ঞেস করে তবে কি বাবাজী? ছেদি ঠক বললো, বাবাজী! অনেক কাঠখড়ি পুড়বে! রহিম মোড়ল বললো যত কিছু করতে হবে, আমি তাই করব। আপনি কোনো চিন্তা করবেননা ওস্তাদজি।
আচ্ছা, আমাকে একটা নির্জন ঘরে জায়গা করে দাও। দরজা জানালা বন্ধ করলে যেন কোনো ছিদ্র দেখতে না পাওয়া যায়। ঘরের মধ্যে চিৎকার চেঁচামেচি শুনলে তোমরা কেউ ভয় পেওনা। ঘরটা খুলতে চেষ্টা কর না, তাহলে আমার মুখ দিয়ে রক্ত উঠে আমি সঙ্গে সঙ্গে মারা যাব। আমার সঙ্গে প্রেতাত্মার অনেক তর্কাতর্কি এমনকি ধ্বস্তাধস্তিও হতে পারে। এতগুলো স্বর্নমুদ্রা এত সহজে ছাড়বে প্রেতাত্মা?
সকলেই বললো, আপনার কথা মতো সবকিছু হবে ওস্তাদজী, কথার একটুও এদিক ওদিক হবেনা। ওস্তাদের কথামতো ঘর দেওয়া হল। ছদি ঠক বেশ ওস্তাদি ভঙ্গিমায় ঘরে প্রবেশ করল। সবার যেন গা শিহরণী ভাব! কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর, ভিতর থেকে কন্ঠস্বর শোনা গেল, বিকট আওয়াজে। বাইরে থেকে পরিস্কার কিছু বুঝা যায়না। তবে একটুখানি শুনতে পাওয়া গেল, তোর বাবার মুদ্রা? তোরা তো এখন এই জগতের বাইরে। তোরা সবাই প্রেতাত্মা। এইটুকু শুনার পর আর কিছু বুঝা গেলনা। কিছুক্ষণ পরে চুপচাপ হয়ে গেল। ওস্তাদজি ক্লান্ত দেহে বাইরে এল। যেন বেঁচে ফিরে এল। ছেদি ঠকের কাছে থাকা নিজের বানিয়ে নেওয়া স্বর্নমুদ্রা সবাইকে দেখিয়ে বললো, এই স্বর্নমুদ্রাটাই সাত হাঁড়ি স্বর্নমুদ্রার আসল শক্তি। এইটা যার কাছে থাকবে সেই হবে সাত হাঁড়ি স্বর্নমুদ্রার মালিক। এই বলে ছেদি ঠক রহিম মোড়লের হাতে দিয়ে বললো, এটা প্রেতাত্মার দেওয়া স্বর্নমুদ্রা। অনেক কৌশল করে ওদের কাছ থেকে হাত করেছি। ওদের সঙ্গে দিন ধার্য হয়েছে, মাঝে একদিন পরে অমাবশ্যার রাত্রি। ঐ রাত্রিতে ওরা সাত হাড়ি স্বর্নমুদ্রা হস্তান্তর করে, আমাদের হাতে তুলে দিবে। আজকের মতো আমি বাড়ি যাচ্ছি, ঐদিন আবার আসবো,এবং ওদের সঙ্গে বুঝা পাড়া করে স্বর্নমুদ্রা হস্তান্তর করে নেব। আর হাঁ রহিম মোড়ল, এই দুইদিন একটু সাবধানে চলতে হবে, তোমার হাতে দেওয়া মুদ্রাটি যেন প্রেতাত্মারা ছিনিয়ে নিতে না পারে। একা কোথাও যেওনা।
এই কথা শুনে রহিম মোড়ল ভীষণ ভয় পেয়ে গেল। এমনিতেই ঘরের মধ্যে তর্কাতর্কি শুনে, তখন থেকেই রহিম মোড়লের ভিতরের কম্পন এখনো থামেনি। তাই রহিম মোড়ল বললো, ওস্তাদজী, এই মুদ্রা আপনি নিজের কাছেই রাখুন। কখন কোন প্রয়োজনে লাগবে সেটা আপনিই ভাল জানেন। ছেদি ঠক বললো, কি আর করবো, বুঝতে পারছি, তুমি ভয় পেয়েছ। বলে ছেদি ঠক নিজের কাছে রেখে দিল, আর বললো, পাঁচ কিলো সোনা, পাঁচ কিলো খাঁটি গাওয়া ঘি, দশ কিলো চন্দন কাঠ এইগুলো জোগাড় করে রেখো। মাঝে একদিন সময় আছে। আজকের মতো চলি। নির্ধারিত দিনে আমি আসব। বলে ছেদি ঠক সেদিনের মতো বাড়ি ফিরলো।
নির্ধারিত দিনে কথা মতো ছেদি ঠক আবার ওঝার বেশে ভোরবেলায় সবার অগোচরে বেরিয়ে পড়লো। যথাসময়ে ভবানীপুরে পৌঁছে দেখে, রহিম মোড়ল সমস্ত কিছু জোগাড় করে ওস্তাদের অপেক্ষায় বসে আছে। ওস্তাদকে আসতে দেখে সবাই ভীষণ খুশি। বিভিন্ন প্রকার তন্ত্র-মন্ত্র আড়ম্বরতায় , সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত্রি হল। এবার হবে ওস্তাদের কেরামতি।
ছেদি ঠক সবাইকে বলে রাখলো, গ্রামের কেউ যেন রাত্রিতে রাস্তায় না বেরোয়। কারণ আজকের রাত্রিটা হবে প্রেতাত্মার রাত্রি। ওরাই ঘোরাঘুরি করবে। যদি কারও চোখে পড়ে, কথা বলনা। বলা যায়না কারও কোনো বড় রকমের ক্ষতি হয়ে যায়। বাকিটা আমি তোমাদেরকে যখন যেটা বলবো, তোমরা সেটাই করবে।
সকলেই সাঁই দিল। সকলের মনে কেমন যেন ভয়ের ছাপ। সকলের লোম খাড়া হয়ে উঠলো। কিছুক্ষণের মধ্যেই রাস্তা ঘাট একেবারে শুন-শান। ভয়ে রাস্তায় রাস্তায় কেউ বেরোতে চাইনা।
এবার জোগাড় করা সবকিছু ওস্তাদের সামনে হাজির করলো। শুরু হল ওস্তাদি কেরামতি। চন্দন কাঠ সাজিয়ে, পাঁচ কেজি ঘি সবটাই সাজানো চন্দন কাঠের উপর ঢেলে দিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে দিল। আগুন দাও দাও করে জ্বলতে থাকে। ওস্তাদ তন্ত্র মন্ত্রের সাথে আগুনের চারিদিকে দুইবার ঘুরে তপে বসে পড়লো । সকলে স্তম্ভিত হয়ে দেখতে থাকে। ওস্তাদ বললো আমি এখন চুপচাপ চক্ষু বন্ধ করে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকবো। তোমরা সকলেই কিছুক্ষণ চক্ষু বন্ধু কর, যতক্ষন না আমি বলবো, ততক্ষণ চক্ষু খুলবে না। কেউ যদি খুলে, তাহলে সে জীবনের মত অন্ধ হয়ে যাবে। সকলেই চক্ষু বন্ধ করে বসে রইলো। এদিকে ছেদি ঠক সোনার পুঁটলি মাথায় তুলে সোজা বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হল। প্রভাতের আলো ফোটার আগেই ছেদি ঠক নিজের বাড়িতে পৌঁছে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে ওঝার বেশ ছেড়ে দিল। কে আর চিনবে ওঝা হিসাবে, এই ছেদি ঠককে?

চানাচুর ওয়ালা
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

এম কে রায়ের চানাভাজা
সবার জানা খেতে মজা।
পাড়া গাঁয়ের অলিগলিতে
বেচি বাসে রেলগাড়িতে।
চাই চানাচুর চাই চানাচুর
সুগন্ধ আর স্বাদে ভরপুর।
লেবেল সাঁটা রায়ের নাম
খাওয়ার পরে তবেই দাম।
টক ঝাল আর লবণ মাখা
মজার খাস্তা টকের চোখা।
ছোট বড়তে হরেক রকম
মোড়ক বোঝাই দামে কম।
যেমন ইচ্ছা চাইলে পাবে
বাচ্চা জোয়ান সবাই খাবে।
পাঁচ মোড়কে একটা ছাড়
বেচবো নগদ নাইকো ধার।
ভালো নইলে মূল্য ফেরত
বেচবোনা ভাই করি শপথ।

আমার মিনতি
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

আমি চাতক হয়ে মেঘের কাছে ,
চাই একটু জল -
আমি চাঁদের কাছে আপন হয়ে ,
হাসতে চাই অনর্গল !
আমি মেঘের কাছে দু'হাত জুড়ে ,
একটু রোদ চাই -
মনের মাঝে জমিয়ে রাখা ,
আঘাত শুকাতে চাই !
কালবৈশাখী ঝড়ের কাছে -
মিনতি করে বলি ,
ফিরিয়ে দে আমার স্বপ্নগুলো ,
নুতন করে গড়ি !

নন্দা   16-11-17

আমি এক বাদামওয়ালা
- ডাঃ ফারহানা মোবিন

রোদ এর তপ্ততায় পুড়ে, বৃষ্টির কাঁদা পানিতে ভিজে, ঝড়ো হাওয়ার ধূলাতে ধূসরিত হয়ে, ডালি ভর্তি বাদাম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, আমি এক কিশোর, আমার নাম বাদামওয়ালা ।
জন্ম হয়েছে কোন বস্তিতে তা জানিনা, বুদ্ধি হবার পর থেকেই দেখছি, দুই বেলা দুই মুঠো ভাতের জন্য ভয়ানক হাহাকার । এই নগরীর লোকে লোকারণ্য রাস্তা গুলোর পাশে আমার ভ্রাম্যমান ব্যবসা । সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকি নগরীর বিভিন্ন রাস্তা গুলোতে ।
কখনো পেটে জ্বলে ক্ষুধার আগুন, কখনো বা চোখে জ্বলে স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার ফাগুন । ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকি রাস্তার ধারে, বাদামের ডালি নিয়ে । কতো রং-বেরং এর মানুষ দেখি এই ঢাকা শহরে । কেউ পকেট মারে, কেউ চুরি করে, কেউ করে ক্ষুধার রাজ্যে বসবাস ।
সকাল বেলা বাদাম বিক্রি করি স্কুলের সামনে । আমার খুব ইচ্ছা করে স্কুলে পড়তে । কি সুন্দর করে ছেলে মেয়েরা স্কুলের ড্রেস পরে, সবার এক সাথে ছুটি হয়, একই রং এর জামা পরে । কি অপরাধ করেছি আমি জীবনের কাছে? আমারও খুব ইচ্ছা করে বাদাম বিক্রি ছেড়ে স্কুলে লেখাপড়া করতে । বাবা মায়ের হাত ধরে খোলা আকাশের নীচে হাটতে । কিন্তু আমিতো জানিই না, কে আমার মা কে আবার বাবা! আমি শুধু জানি, “আমার পেট ভরা ক্ষুধা, আমাকে ঘর ভাড়া দিতে হবে, বুড়ো নানীর জন্য খাবার কিনতে হবে, আমার যে কেউ নেই । বুদ্ধি হবার পর থেকেই দেখছি, এই বুড়ো মানুষটা আমাকে বুকে নিয়ে বড় করেছে ।”
আমাকে নাকি আমার মা পলিথিনে করে (আমার জন্মের পর) রাস্তার ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল । খুব জানতে ইচ্ছে করে, “মা আমার কি অপরাধ ছিল? যদি ড্রেনে ফেলতেই হতো, তবে কেন আমায় জন্ম দিয়েছিলে ? যদি আমাকে ছেড়ে চলে যেতেই হতো, তবে কেন রাস্তায় ফেলে দিয়েছিলে? তোমার জুতা দিয়ে আমাকে পিষে মেরে ফেলোনি কেন?”
বাদামওয়ালা হতে ভালো লাগে না মা, বাদামের ডালি নিয়ে রাস্তায় ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে আসে দুই পা, বিধ্বস্ত হয়ে আসে আমার ভবিষ্যৎ ।

ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠি । স্কুল শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকি, আর দুই চোখ ভরে দেখি, স্কুলের ছেলে মেয়েদের জন্য তাদের মায়েরা রাস্তার ধারে বসে থাকে ঘন্টার পর ঘন্টা আর আমি ঘন্টার পর ঘন্টা রৌদ্রে পুড়তে থাকি, একটা টাকা লাভের আশায় ।
আমিও মানুষ । আমারও বেড়াতে ইচ্ছে করে স্কুলে পড়তে ইচ্ছা করে, আমারও পরিষ্কার জামা পড়তে ইচ্ছা করে, মজার খাবার গুলো খেতে ইচ্ছে করে ।
স্কুলের সামনে বাদাম বিক্রি শেষে, বসতি গড়ি শপিং কমপ্লেক্সের পাশে । দলে দলে মানুষ কিনতে আসে বিভিন্ন রকম জিনিস । আমি এক নীরব বোবা দর্শক । সাবার আনন্দ দেখে নীরবে ফেলি চোখের পানি । বিশ্বাস করো, তোমাদের কারো আনন্দ দেখে, আমি মোটেও ঈর্ষান্বিত নই ।
আমিও মানুষ । আমারও পেতে ইচ্ছা করে ভালো খাবার, সুন্দর পোষাক । মাঝে মাঝে মনে হয়, বাদাম আর বিক্রি করবো না । কিন্তু কি করবো আমি ? কিভাবে চলবে আমার জীবন?
মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে হয়, একটু বসি রাস্তার ধারে । বসে থাকি বাদামের ডালি নিয়ে । কিন্তু বসে বাদাম বিক্রি করলে বেশী টাকা দিতে হয় রাস্তার নেতাদের । রাস্তার নেতা!! অর্থাৎ আমাদের মতো ভিখারীর পেটে লাথি মেরে, যাদের মানিব্যাগ হয় মোটা ।
দাঁড়িয়ে বাদাম বিক্রি করলে দিতে হয় কম টাকার ঘুষ । আর বসে বাদাম বিক্রি করলে গুণতে হয়, অনেক বেশী টাকা । ভ্যান গাড়ি থাকলে, চাঁদার পাল্লা হয় আরো বেশী । তারাতো রাস্তার নেতা নয়, তারা আমার মতো গরীবের কাছে থেকে চাঁদা নেয় । তারা আমার থেকেও বেশী ভিখারী ।
তবু নিজে ভিখারী হয়েও এই ভিখারী গুলোকে ভিক্ষা দিতে হয় । বন্ধ হোক এই ভিক্ষা দেয়া ।
তোমাদের সংসদে আমাদের জন্য নাকি অধিবেশন বসে । নামীদামী নেতারা আইন বানায়, বাহবা পায় । সাংবাদিকরা ছবি তোলে । লেখকেরা লেখে ভারী বানিয়ে ফেলে পান্ডুলিপির ওজন । কিন্তু আমাদের জীবনের হয়না কোন পরিবর্তন ।

রৌদ্র আমাদেরকে পুড়াতেই থাকে, বৃষ্টি আমাদের ভাঙ্গা ঘর টাকে আরো বেশী ভিজিয়ে দেয়, ঝড়ো হাওয়া আমাদের স্বপ্নগুলোকে করে তোলে, আরো বেশী ধূলায় ধূসরিত ।
আমার নাম বাদামওয়ালা । আমিও মানুষ । আমি বাঁচতে চাই, মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই ।

- ডাঃ ফারহানা মোবিন
চিকিৎসক (স্কয়ার হাসপাতাল, ঢাকা)
তারিখঃ ২৫-০৪-২০১৭



কুয়াশা বৃত্তান্ত
- মোঃ এনামুল হক

কুয়াশাগুলো কেন আসে স্মৃতি হয়ে?
অনুভূতিগুলো নিয়ে আসে বয়ে!
হিম তাপমাত্রায় সুখানুভূতিই বা কেন ঘটে?
কেন টিকে থাকে দীর্ঘদিন হৃদয়পটে!
ঘুমালে পরে স্বপ্ন হয়ে দেয় পীড়া,
ঘুমের মাঝেও কেঁপে ওঠে প্রতিটি শিরা।
আমি কি ভুলে যেতে চাই সেই কথা?
ছিড়ে কি ফেলতে চাই সেই স্মৃতির খাতা?
জানি না! জানি না! জানি না!
সত্য মেনে নিতে হয়, তবু -
কেন তা পারি না?
হৃদয় কেন এত স্পর্শকাতর
সবটুকু খেয়ে নিয়ে
পরে কাটে জাবর!
চারিদিকে যতই দেখি কুয়াশা -
ততই যেন বাড়ে হৃদয়ের আশা!
ভাবি, দিন তো আসতেই পারে
বদলে দিতে পারে সবকিছু
কুয়াশা তাই ভালোই লাগে,
হেঁটে চলি তার পিছু!

(০৭/০১/২০১৩)

প্রবন্ধ : গল্পে গাথায় আমার গ্রাম - কালীকোঠার কালীমন্দির
- ইরাবতী মণ্ডল

গ্রামবাংলার চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক মন্দির।আর সেইসব মন্দির ঘিরে অনেক গল্পগাথা লোকের মুখে মুখে ঘুরেফেরে।সেইসব গল্পের সবটা সত্য নাহলেও কিছুটা সত্য তো থেকেই যায়।আর এইসব গল্পগাথার সঙ্গে মিশে যায় মানুষের সংস্কার,ভয় এবং ভক্তি।তাই সেইসব গল্প একদিন লোকের মুখে মুখে সত্যরূপ ধারণ করে।
কালীকোঠার কালীমন্দির, আমাদের গ্রামের, মানে কৈজুড়ী গ্রামের এরকম ই একটি প্রাচীন মন্দির।প্রতিষ্ঠিত আনুমানিক বাংলা সাল ১১৪১ খ্রীষ্টাব্দ।এই মন্দির এবং মন্দিরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী কালীকে নিয়ে অনেক গল্প প্রচলন আছে।

এই মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা কামদেব সর্দার ছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান।তিনিছিলেন কালীসাধক।মায়েরসঙ্গে মুখোমুখি তার কথাহত। কথিত আছে একবার কালীপুজোর সময় মা তাকে নরবলি দেবার আদেশ দেন ।কিন্তু কামদেব সর্দার রাজী হন না।তিনি মাকে বলেন এই বলি তিনি জোগাড় করতে পারবেন না। মা ই নিজের বলি নিজে জোগাড় করে নিক । মা তাই করলেন। কালীপুজোর দিন যখন হাড়িকাঠে ছাগল বলি হচ্ছে,সেই সময় কোত্থেকে একটি ছাগল ছুটতে ছুটতে এসে নিজে থেকেই হাড়িকাঠে মুণ্ডু দেয়। তার মুণ্ডু কাটা হলে দেখা গেল একটি বালক ধড় মুণ্ডু আলাদা অবস্থায় পড়ে আছে। এখনো এই রীতিমেনে কালীকোঠায় নরবলি মানে কুমড়োর গায়ে মানুষের চোখ-মুখ এঁকে বলি দেওয়া হয়।
কামদেব সর্দারের চারটি ছেলে ,কোন মেয়ে ছিল না। মনে তাই ভারি দুঃখ।কথিত আছে একবার খাজনা আদায়ের জন্য অবিভক্ত বাংলাদেশের একটি গ্রামে যান তিনি ।কাজকর্ম মিটিয়ে তিনি যখন ফিরছেন তখন তিনি যে বাড়িতে বসে ছিলেন সেইবাড়ির কয়েকজনের কথা শুনতে পান। তারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছে,'কোদাল দিয়ে তিন কোদাল মাটিকেটে ফেলেদে। ওনার কোন কন্যাসন্তান নেই। উনি যেখানে বসেছিলেন সেই জায়গাটা অপবিত্র হয়ে গেছে।'তখনকার দিনে কন্যাসন্তানহীন পিতাকে যে কতটা অসম্মান ভোগ করতে হত এই ঘটনা তারই প্রমাণ করে।যাইহোক এইঅপমান মনে মনে সহ্য করে কামদেব সর্দার বাড়িফিরে এসে মায়ের মূর্তির সামনে হত্যেদিয়ে পড়ে থাকেন।মা তাকে স্বপ্নে জানান যে তার এবার কন্যাসন্তান জন্ম গ্রহণ করবে।মায়ের আশীর্বাদ সত্য হল।তার চার ছেলের পিঠে জন্ম নিল এক কন্যা।বিবাহযোগ্যা হলে সেই কন্যাকে নিজের গ্রামের এক সুযোগ্য পাত্রের হাতে দান করেন তিনি। সঙ্গেদেন নিষ্কর জমি।বহুদিন অবদি তার কন্যার বংশধরেরা এই নিষ্করজমি ভোগ করে এসেছে।
গ্রামের মানুষের জলের বড়ো অভাব।মেয়েদের অনেক দূরথেকে জল নিয়ে আসতে হয়।তাই কামদেব সর্দার কালীমন্দিরের পাশে এক বিশাল পুষ্করিনী খনন করলেন। পুকুর খনন শেষ হলো।কিন্ত পুকুরে এক ফোঁটাও জল উঠলো না।ভাবলো বর্ষাকালে নিশ্চই জল জমবে।কিন্তু না ,তাও হলো না । কামদেব সর্দার তখন মায়ের কাছে ধর্ণাদিলেন।মা বললেন,পুকুর পাড়ে বাসকরা ধোপাদের একটি ছেলের হাত দিয়ে একটা রূপোর রেকাবিতে করে একথালা সোনার মোহর ঐ পুকুরের মধ্যিখানে রেখে আসতে হবে।তবেই পুকুরে জল উঠবে। কামদেব সর্দার তাই করলেন।ধোপার একটি ছেলেকে ডেকে,তার হাতে রূপোর রেকাবিতে করে একথালা সোনার মোহর দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন পুকুরের মাঝখানে।ছেলেটি রেকাবিটি পুকুরের মাঝখানে রাখতেই ,পুকুর জলে ভরে গেলো।কিন্তু ছেলেটি আর ফিরে এলো না।তার সলিল সমাধি ঘটলো।এই ঘটনার পর ধোপারা ঐ দীঘির পাড় ছেড়ে অন্য কোন গ্রামে চলে যায়।এই শোক তারা সহ্যকরতে পারেনি।তাই হয়তো ঐ জায়গা ছেড়ে তারা চলে গেছিলো।আর আজো ঐ দীঘির টলটলে জলের উপর দিয়ে যখন হাওয়া খেলে যায় ,মনে হয় বুঝি ঐ ছেলেটির দীর্ঘশ্বাস জলের উপর দিয়ে তরঙ্গে তরঙ্গে ভেসে চলেছে।
কামদেব সর্দার আজ নেই।কিন্তু তার বংশধরেরা আজ ও প্রতি কালীপুজোর সময় কালীকোঠার এই জাগ্রত কালীর পুজো করে থাকেন। এই পুজো উপলক্ষে কালীকোঠার আশপাশে জমজমাট মেলাবসে।দূরদূরান্ত থেকে লোকজন এইপুজো বিশেষকরে কালীকোঠার বলি দেখতে আসে।অনেকে নিজেদের ইচ্ছা পূরণের জন্য মায়ের কাছে মানত ও করে। তারপর তাদের মনের ইচ্ছা পূরণ হলে কালীপুজোর সময় এই মায়ের মন্দিরে মা কে পুজো দেয়।কেউ বা ছাগল বলি মানত করে,আবার কেউ পুরো মন্দিরটার চারপাশে ঘুরে দণ্ডী খাটার মানত ও করে ।আর কার্তিক মাসে কালী পুজোর সময় তারা তাদের এই মানত পুরণ করে।
এই কালীমন্দির কামদেব সর্দারের স্মৃতি বহন করে চলেছে।আর তাঁর ব্যবহৃত প্রাসাদোপম রাজবাড়ির অর্ধেকের ও বেশি অংশ মাটির তলায় ঢুকে আছে।আর ভাঙাচোরা বাকি অর্ধেক শতাব্দী কাল ধরে পোড়োবাড়ির রূপনিয়ে পুরনো সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে।

কোলকাতা ।। পশ্চিমবঙ্গ ।। 05.11.2017

আমাদের বাংলা
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

বাংলা দেশের মানুষরে ভাই,
বাংলা কথা বলি।
একটি সুতোই বাধা জীবন,
সোজা পথে চলি।
এমনটি আর পাবেনা খুজে,
ধরাধামের মাঝে।
বিরামহীনে কাজের শেষে,
প্রদীপ জ্বলে সাঁঝে।
গৌরব করে বলতে পারি,
সেদিন আছি ভুলে।
কিসের চিন্তা কিসের দুঃখ,
অধুনা কলি কালে।
যেমন ছিল তেমনি আছে,
নাইকো সেই দুখ্।
কান্না ছেড়ে হাসির পুলক,
বাংলা মায়ের মুখ।
ভোরের শিশির চমক মারে,
প্রাতে সবুজ ঘাসে।
বাংলা মায়ের আরও ভালো,
বসন্ত যখন আসে।
বৃক্ষশাখে লুকিয়ে কোথায়,
কোকিল কুহু ডাকে।
তাইতো সবাই প্রণাম করি,
আমার বাংলা মাকে।
প্রজাপতি উড়ে বেড়াই,
ফুলের রং মেখে
শিমূল ফুলে কেচরমেচর,
শালিক বসে ঝাঁকে।
হাসনাহেনা শিউলি ফুলের,
গন্ধ ছড়াই রাতে।
কৃষ্ণচূড়ায় রঙ জেগেছে,
রাধাচূড়ার সাথে।
চাঁদের আলো শিশুর হাসি,
বাংলা মায়ের আদর।
ফুলে ফুলে পাখির গানে,
তাইতো এতো কদর।
টিয়া ফিঙে দোয়েল বাবুই,
বুনো পখিদের গান।
চোখ ধাঁধানো ফুলের বাহার,
জুড়িয়ে যায় প্রাণ।

পুরানো দিনের কথা
- আব্দুল মান্নান মল্লিক

ইচ্ছা করে লিখতে কিছু,
পুরানো দিনের কথা।
মাটির ঘরে বাঁশের বেড়া,
চাউনি তালের পাতা।।
টোপর বাঁধা গরুর গাড়ি,
রাঙা মাটির পথে।
বউ চলেছে শ্বশুর বাড়ি,
ঘোমটা টেনে মাথে।।
জামাই যেত শশুর বাড়ি,
ধুতির কোঁচা ধরে।
শাশুড়ি লাজে ঘোমটা টানে,
বধূ লুকাই ঘরে।।
চিতল পিঠা তিলের পিঠা,
শালের দানা গুড়।
কলমা ধানের মুড়ি ভাজা,
খাস্তা কুড়মুড়।।
হাতচাপড়া ভাপা পিঠায়,
খাজুর গুড়ের ক্ষীর।
ধুম পড়েছে পাড়ায় পাড়ায়,
কিবা গরীব আমির।।
ঢেঁকীয় কোটা ধুকির আটা,
ভোর বেলাতে ধুম।
ঢেঁকি হাঁকে ধপাস ধপাস,
ভাঙাই পাড়ার ঘুম।।
বলাই দাদুর গল্পের কথা,
মিথ্যা ঝুড়িঝুড়ি।
হাসতে পেটে খিঁচুনি ধরে,
বারান্দায় গড়াগড়ি।।
পেত্নীর বাঁসা তেঁতুল গাছে,
শেওড়া গাছে ভুত।
মিথ্যা কথায় মন ভরেছে,
দাদুর গল্প অদ্ভুত।।
পঞ্চগ্রামীন আচার বিচার,
শাসন ছিল কঠোর।
সাজা পেতো গাঁয়ের যত,
বদমাশ আর চোর।।
নেশাখোর আর জুয়ারি যত,
পড়তো যদি ধরা।
মাথা নেড়িয়ে মাথায় ঘোল,
ঘুরাত সারা পাড়া।।

হৈমন্তিক ছোঁয়া
– ইরাবতী মণ্ডল

হেমন্তের শিশিরভেজা টিনের চালে
লতানো লাউপাতায় মুখঢাকা থুথ্থুড়ে বুড়ি চাঁদ ,গিলেখায় আমার শৈশব।
বর্ষার জলভরাখেতে,শালিধান মাথা নাড়ে।শিউলির পাকাহাতে ভরে যায়
রসের ভাড়।বুড়ি ঠাকুমার রস জ্বালানো নলেন গুঁড়ের ম ম গন্ধে, ভরে ওঠা গ্রামের বাতাস,–আমার তণ্ত্রীতে, তণ্ত্রীতে মাতন লাগায়। দুচোখ বন্ধ করে বুকভরে শ্বাসটানি ,অতীতের বিলুপ্ত স্মৃতির।
এখন রস জ্বালানো কুয়াশা ভোর ,ধূমায়িত সুগন্ধি চায়ের সাথে নিকোটিনের ধোঁয়ায় ভরে গেছে।বুড়িচাঁদের ঊজ্জ্বলতা,ম্লান আজি লাল নীল নিয়নের আলোয়। ধানখেতের আলভাঙা মেঠোপথ ,মিশে গেছে
ঝকঝকে রাজপথে।
এলাবেলা আমাকে সাজিয়েছি আধুনিকতার মোড়কে।আটচালা খড়ের চালের মাটিরঘর ভেঙে ,আমি ঢুকে গেছি ফ্ল্যাট বাড়ির কার্পেট এরিয়ায়।
তবু আমার রক্তেমিশে থাকা হৈমন্তিক কুয়াশাভোর, মাঝে মাঝে
আমায় নাড়া দেয়।আমি চোখ বন্ধ করি ।আর গভীরভাবে বাতাসথেকে শ্বাসটেনে নি।সেই গন্ধ ভেসে আসে,ভেসে আসে ঠাকুমার হাতের নলেন গুঁড় জ্বালানোর গন্ধ।আমি আবার ও চোখ বন্ধ করি।

কোলকাতা ।। পশ্চিমবঙ্গ ।। 06.11.2017

সত্যি বলছি
- মো: তারেক আনোয়ার কিরন সিদ্দিক

সত্যি বলছি ভালবাসার কোন ইচ্ছে ছিল না
চেয়েছিলাম তোমার চোখের গভীরতা জানতে
বুঝতে পারিনি হারিয়ে গেলো মন মনেরই অজান্তে।

সত্যি বলছি রাত জাগার কোন ইচ্ছে ছিল না
চেয়েছিলাম কিছু সুখের স্বপ্ন সাজাতে
বুঝতে পারিনি পড়ে গেলাম শ্যাম বালিকার মায়াতে।

সত্যি বলছি পাগল হওয়ার কোন ইচ্ছে ছিল না
চেয়েছিলাম তোমায় ভেবে কিছু সময় কাটাতে
বুঝতে পারিনি আসলো জোয়ার মনের ভাটাতে।

সত্যি বলছি বাগান করার কোন ইচ্ছে ছিল না
চেয়েছিলাম ঘ্রান নিতে একটি গোলাপের
বুঝতে পারিনি বাগান করে দিলাম অসংখ্য গোলাপের।

সত্যি বলছি আপন করার কোন ইচ্ছে ছিল না
চেয়েছিলাম তোমায় নিয়ে কিছু পথ হাটতে
বুঝতে পারিনি মন চাবে তোমার বুকে মাথা রাখতে।

সত্যি বলছি কবিতা লেখার কোন ইচ্ছে ছিল না
চেয়েছিলাম কিছু শব্দ তোমায় নিয়ে লিখতে
বুঝতে পারিনি সময়ই লাগলো না ভালবাসা শিখতে।

প্রেমের সেঁজুতি
- মোঃ আবুল কালাম আজাদ

নিশির পাখি রাতে ডাকে বিকালে দেয় ফাঁকি
দগ্ধ বুকে যন্ত্রনা দেয় জ্বালিয়ে জোনাক বাতি।
প্রেমের আঁশিবিশ কি নিভান যায় সুর দিয়ে -
সুরের ভুবনে সধবার বিরহ শুধু বাড়তেই থাকে
বাড়তেই থাকে।
জানি তুমি স্বর্গের রাজ্য দেখিনা স্বচক্ষে মনের
দেয়াল পাড়ি দিতে চাই রাখব বলে হৃদকক্ষে।
রাজকুমারী,রাজলক্ষী স্বরাজ্যে্র উত্তরাধিকারিণী
ভাবছি তন্নিবন্ধন;
অরণ্যানীর এই মেঠোপথ তোমার পরশে হোক
যদি হয় পরিবর্তন।
এই সাজানো বসুন্ধরায় চারিদিকে আজি তার
অনুরাগের কুসুমাঞ্জলি আর বিণায় বাঁজে আরতি
কি নামে ডাকি তোমায় প্রত্যুষের শুকতারাসম
প্রেমের সেঁজুতি।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget