অক্টোবর 2017

প্রবাস জীবন
- মো তারেক আনোয়ার কিরন সিদ্দিক

মা আমি বড় যন্ত্রনায় আছি
মরে গেছি একা হয়ে নিশ্বাস বলে বেচে আছি
প্রবাস জীবন মা হয়তো অর্থ প্রাচুযে ভরা; তবু
আছে সুখের অভাব আর তোর স্নেহের খরা।

রোজ সকালে মা তোর ডাকে ঘুম ভাংগে না
ভাংবে কি মা? তোকে ভেবে ঘুমই আসে না
মনে পড়ে শুধু তোর কোলে মাথা রাখার কথা
কে আপন হয় তোর মতো বলবো মনের ব্যথা।

তোর কথা মনে হলে আমার নয়ন ভিজে যায়
ভাত দে মা বলি কারে যখন খিদে পায়?
নিজেই রান্না করতে শিখে গেছি প্রায়; হয়তো
কখনো লবন কখনো মরিচ বেশি হয়ে যায়।

মুখটা দেখে কেউ বলেনা চেহারা দেখেছিস
না খেয়ে না দেয়ে কেমন শুকিয়ে গেছিস
ওই মন মরা হয়ে বসে আছিস কেনো?
হঠাত মনে হয় পেছন থেকে বললে যেন!

পেছন ফিরে দেখি একা আমি রয়ে যাই
না পেয়ে তোকে মা শুধু কেঁদে যাই
কাদিস না বলে কেউ চোখেরজল মুছেনা
এখানে মা কেউ কাউ কে বুঝেনা

নিজের হাতেই চোখেরজল মুছতে থাকে
একবিন্দু সুখের জন্য মা সবাই ছুটতে থাকে
বড় অভাগা জীবন তাদের যারা প্রবাসে থাকে
তোর আচলে যারা তারাই স্বর্গ সুখে থাকে।

মা আমি আবার তোর আচলে আসতে চাই
যতোদিন বাচি বাচার মতো বাচতে চাই
দিয়েছেন খোদা শ্রেঠতা প্রতিটি মায়ের হাতে
দোয়া করিস মা প্রবাসি সবাই যেন থাকতে পারে
তাদের মায়ের সাথে..............

চুড়িওয়ালা
- ইরাবতী মণ্ডল

চুড়ি চাই,চুড়ি চাই,চাই গো কাঁচের চুড়ি,
চুড়িওয়ালা হেঁকে যায় মাথায় নিয়ে ঝুড়ি।

লাল,নীল, হলুদ,সবুজ হরেক রকম আছে,
নেবে যদি চুড়ি কেউ গো ,এসো আমার কাছে।

চুড়িওয়ালার ডাক শুনে যে মেয়ে বউরা ছোটে,
ঝুড়ি নামিয়ে চুড়িওয়ালার সামনে সবাই জোটে।

হরেক রকম চুড়ির বাহার দেখেযে মন কাড়ে,
দরাদরি করছে যে কেউ চুড়ির ঝাঁকা ধরে।

মল্লিক বাড়ির ছোটবৌটি জানলার ধারে বসে,
আপন মনে দেখছে এসব কাজের ফাঁকে এসে।

হাতে নেই তার শাঁখা-পলা,আর সিঁথিতে নেই সিঁদুর,
দুখের সাগরে ভেসে গেছে সুখ ,হয়েছে বেদনাবিধুর।

মাত্র ছ-মাস স্বামীর আদরে ভরে ছিল তার বুক,
স্বামীবিহীন জীবন এখন চির অমানিশা দুখ।

স্বামী ছিল সীমান্তরক্ষী দেশের সেবায় যুক্ত,
বিয়ের পরেই চলে গেছিলো করিয়া তাকে রিক্ত।

যাবার সময় বলে গেছিলো, আনবে রঙীন শাড়ি,
টাকা-পয়সা, গয়না-গাটি,আর যে কাঁচের চুড়ি।

ফিরলো স্বামী ছ-মাস বাদে কফিন বন্দী হয়ে,
সোহাগ সিঁদুর মুছলো তাহার জঙ্গীর গুলি খেয়ে।

পরনের শাড়ি সাদা হয়েছে,নেইকো কাঁচের চুড়ি,
তবু ফেরিওয়ালা হাঁক পেড়ে যায় মাথায় নিয়ে ঝুড়ি।

কোলকাতা ।। পশ্চিমবঙ্গ ।। 27.10.2017

তোমার দখলে
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

ঠিক যেনো আলোক লতার মতো করে
আষ্টেপৃষ্ঠে তুমি জড়িয়ে নিলে আমাকে ,
আলোক লতার মতো দখল নিয়ে নিলে ,
আমি পরাভূত হয়ে যাচ্ছি তোমার কাছে
তুমি জয়ের আনন্দে হাসছো চুপিসারে ৷

আজ কিছুই নেই আমার আমি বলতে
শুধু অবয়বটাই দাঁড়িয়ে আছে নীরবে ,
আমার শিরা উপশিরা তোমার দখলে ,
তুমি বিরাজ করছো এ আমার উপরে
আর আমি নীরবে দেখছি চেয়ে চেয়ে ৷

নিমিষেই আমার অহংকার চুরমার করে
বসে পড়লে তুমি এই অহংকারীর হৃদয়ে ,
এখানে আজ এখন তোমারই হুকুম চলে ,
তুমিই ইচ্ছা মতো চালাচ্ছো এই আমাকে
আমি যেনো বুদ হয়ে আছি সে তোমাতে ৷

ধীরে-ধীরে আমাকে গ্রাস করেছো তুমি
এখন আর আমার নেই কোনই অনুভূতি ,
শয়নে স্বপনেও যে শুধু তোমাকেই দেখি ,
আর তোমার প্রেমেরই যে তরজমা করি
দিবানিশি তোমার নামে প্রেমমালা জপি ৷

কষ্ট মনের ব্যর্থ কথা
- শ্যামল সোম

এ বাঁশি আজ আর মনে বাজে না সুমধুর
আমি চলে যাই এই পৃথিবী ছেড়ে বহুদূর।
নিঃসঙ্গি নদী বহমান স্রোতে মনের কোনে
জমা ব্যথা অনুভবে কষ্টে মৃত্যুর প্রতীক্ষায়।
আজ আমার শেষ প্রণতী গ্রহণ করো পৃথিবী
বিদায়ের আসন্ন মূহুর্তে, হিংসাত্মক, কতিপয়
লোকেরা উন্মত্ত, নিষ্ঠুর উন্মূখ ধর্ষণে উদ্যম
উৎশৃঙখল অমানবিক আচরণে উন্মাদ।
আমার নিরবে অশ্রুপাত, তোমাদের জন্য
কাঁদছে মন এত ভালোবাসা সহানুভূতি, কৃপা
জনক, জননী তোমাদের কাছে ফিরবো এ
আমার নিশ্চিত অঙ্গীকার, ভালো থেকো সবাই।

জনৈকা আমার পরম প্রিয় কবির শৈল্পিক এ পাথেয়
হবে আমার পারাপারে পরম প্রাপ্তি তাঁর কল্যাণ হোক।

আপনি নিজেকে ৭৪ বছরের বৃদ্ধ মনে করবেন না প্লিজ।
যৌবন লুকিয়ে থাকে বয়সে নয়,....
প্রকৃত যৌবন, প্রকৃত তারুণ্য থাকে মনে।
আপনি বয়সে প্রবীণ হলেও....
মন আপনার চীর তারুণ্য ভরা..
এক উড়ন্ত বলাকার পাখা মেলে দেয়া
কোন এক দূর তেপান্তর পারি দেবার মতো মনোবল রয়েছে আপনার।

ধন্যবাদ আপনাকে!!! চীরজীবি হয়ে থাকুন আমাদের মাঝে।
ভাষাজ্ঞান আমার ক্ষীন।দয়া করে মার্জনা করবেন।!!!!!!

* * *

তুমি হে
পদ্মা পারের কন্যা দিলেম শাপলা ফুল,
ভেঙে মোর গানের তরী ভাসিয়ে দিলেম নয়ন জলে
( মন্তব্যে ) বাঁশিওয়ালার প্রাণ জানাগানীয়া সুর
সুরে সুরে সুর মেলাতে আমার বেলা যে যায়।
মনের বলতে য় বাদে, সখী মরি-যে-- লাজে
তব নুপুর ধ্বনি হৃদয়ের গহীন অরণ্যে সাঁঝে।

* * *

পদ্মাবতী----

ও গো বাঁশি ওয়ালা,
বাজাও তোমার বাঁশি.....
শুনি আমার নতুন নাম......!!!!

আপনি বটবৃক্ষ।দীর্ঘজীবি হোন আপনি।আপনি আমাদের অনুপ্রেরণা।
ধন্যবাদ আপনাকে!!!! আপনার মতো জ্ঞানী গুণীর লেখার শেষাংশে আমার মতো ক্ষুদ্র তুচ্ছ মানুষের কিছু লেখা ঠাঁই দেবার জন্য!!!
সত্যিই আমি ধন্য,আমি ধন্য....
যদিও আমি অতি সামান্য,অতি নগন্য.......!!!

মনে কথা মায়াবন্ধন
- শ্যামল সোম

আমার দূখের ঘরে
তোমার রইল আমন্ত্রণ,
তুমি এলেই জ্বলে উঠবে
সন্ধ্যা দ্বীপের শিখা
ও গো পত্রলেখা
দুজনের ভরে যাবে মন
ভালোবাসায় ভাসবো
সারাক্ষণ, প্রতীক্ষায়
আছি, তুমি আমার প্রিয়জন।

আমার কীর্তন খোলা নদী
- শ্যামল সোম

আজও জরাগ্রস্ত দেহে,
জরাজীর্ণ মনে জাগে সাধ
আর একবারও ফেরা যায়
ঐ নদীর কীর্তন খোলায়,
আশা তোমাকে ভালোবেসেই
চলে যাওয়ার আগে একবার
এই শেষবারের মতন ফেরাও।
নারী তুমি আমার নদী অবগাহনে
নদী তুমি আশা ফেরাও মোরে
কীর্তন খোলা নদীর ভোরের,
আকাশে ভেসে মেঘ হয়ে ফিরিবার
আকাঙ্খা ঐ আকাশে নিমন্ত্রণ।
মগ্ন মন তোমাকেই পাশে নিয়ে
কীর্তন খোলা নদীর বহমান উজান
স্রোতে ও আকাশে রামধনু মাঝে
আমার ফেলে আসা প্রেমের সাঁঝে
আশা আর একবার ফেরাও হে
কাব্যের দেবী আশা ঐ জমিনে দিও
আমার হৃদয়ের প্রেমের সমাধি।

ফেরার সময় এলো
- শ্যামল সোম

মাফ করবেন সব
আর জ্ঞান দেওয়ার
কোন অভিপ্রায় নেই।
সে এক স্বপ্নের নারী
বৃদ্ধ বলে পদ্মাবতী,
ফিরিয়ে নিলেন মুখ
সুখ পালালো দুখের
তাপে দগ্ধে এ অসুখ
তার প্রেমের প্রত্যাখানে
কেন কেন বারবার
পিছু ফিরে চায় মন ?
পাগলি ফিরে আয় রে
পাগলি তুই এলো যে,
তোকে দেখেই ফিরবো
এলো জীবনের অন্তিম ক্ষণ।

তুমি জীবন্ত কবিতা
- শ্যামল সোম

আমি অপেক্ষায় থাকি
আমার মনের যত জমা
কথা হৃদয়ের গোপন ব্যথা
কাকে বলি ?
কে শোনে?
আপন সুখ দুখের সাথে
মিলে মিশে আপনাতে
আনমনে আপনি আছি।
তবু মাঝে মাঝে কেন
মনে হয় এক জন
অনন্ত বন্ধু মনের মতো
পাশে থাকলে বেশ হতো
মনের কথা মনে কোনে
না রেখে সে বন্ধুকে
খুলে বলা যেতো
মনের চাপ কমতো ।
বলবার জন্যে হন্যে
তন্ন তন্ন করে খুঁজে
ফিরি শেষে কাউকে
না পেয়ে একা তন্দ্রাহারা।
তন্ময় হয়ে নিজের লেখা
নিজেই পড়ি, শব্দ
গুলো উলটে পালটে
মনের ইচ্ছে সাজাই।
আমার কবিতা!
তুমি মাঝ মাঝে রাতে
চুপিচুপি এসে, দাঁড়াও
আমার শিয়রে অভিসারে।
যূঁই ফুলের মালা জড়িয়ে
খোঁপায়, পায়ে জলনূপুরের
সুর তুলে, তোমার ঐ সুর্মা
আঁকা চোখ ছল ছল দৃষ্টিতে,
তাকিয়ে থাকা এইটুকুই প্রেম
একাকীত্ব যাতনা প্রশমিত
স্বপ্না তুই কবিতা পাশে ঘনিষ্ঠ
বন্ধু মতো এসে বসা
কবিতা নরম হাতের ছোঁয়া
কবিতা তোমার কাঁধে রেখে
মাথা কাঁদা, কখন তোমার
হেসে ওঠায় আমার মুখে হাসি
কবিতা তুমি তো জানো
কতটা তোমাকে ভালোবাসি
শব্দের অলংকরণে
চিত্রকল্পে ছন্দে ছন্দে
স্বপ্না তোর আনন্দে ভাসি।

( স্বপ্না-তোমার জন্যই আমার এ লেখা । তোমার একান্ত প্রিয় )

নিহত আমার গোলাপ
- শ্যামল সোম

আমি হারিয়ে
ফেলেছি তোমায়
আমার মনের
নীল কষ্ট মনেই
রেখেছি জমা।
তবু স্মৃতি আমাকে
ফেরায় আজও
ওগো প্রিয়তমা কবি,
পঞ্চাশ বছর আগে
গোলাপ রানীর প্রেমে
উত্তাল ঢেউ আছড়ে
গোলাপ কমল বুকে
সে আঘাতে কষ্ট পেয়ে
ছিলে, সে মাসুল গুনছি
আজও ও পারো ক্ষমা
করো, গোলাপ রানী
কোলে তুলে ব্যাকুল
চুম্বনে চুম্বনে রক্তাক্ত
ঠোঁটের দংশনে ফুল
আহত অভিমানে
ফিরে গেছে আপন
কাননে, কাঁকনে
নূপুরের ধ্বনিতে
ফেরে আমার দগ্ধ মন
ফুলের রানী রাঙা
গোলাপ তোমাকেই
খুঁজি সারাক্ষণ এ
ভাবেই যায় বেলা।

মিলন হবে কত দিনে
- শ্যামল সোম

সুস্বাগতম শুভ সূর্যোদ্বয়ের ভোরে
তোমাদের জন্য মন কেমন করে,
বন্ধু এসো ধর হাত আমার চল যাই
অন্যায়ের প্রতিরোধে আমরা সবাই,
গাই, পথে এবার নাম সাথী এ পথেই
হবে পথ চেনা, আজ সেই পথ চলারই
আনন্দে," মনের কথা কহিবো কি সই
কইতে মানা, দরদী নিলে প্রাণ বাঁচে না
মনের মানুষ হয় যে জনা,
নয়নে তার যায় গো চেনা,
সে দু এক জনা ;
সে যে রসে ভাসে প্রেমে ডোবে,
করছে মানুষ রসের বেচা কেনা।
ভাবের মানুষ মিলবে কোথা ?"
আমি কোথায় পাবো তারে?

ভালোবাসার গল্পঃ একজন নিশিউকির স্বপ্ন
- নুরুন নাহার লিলিয়ান

সেদিন প্রচণ্ড তুষারপাত হচ্ছিল । তখন ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ । চারিদিকে বরফের উৎসব । হোক্কাইডো দ্বীপটা যেন সাদা বরফ চাঁদরে ঢেকে আছে ।কিছুক্ষণ পর পর ঘূর্ণি বাতাস । দরজা খুলে বাইরে তাকানোর উপায়
নেই । দিন টা ছিল শনিবার । ছুটির দিন । একটু অলস মন আর এক কাপ ব্লাক কফি নিয়ে আমি অনলাইনে পত্রিকা পড়ছিলাম । পৃথিবীর সব মানবিক বিপর্যয়ের খবর গুলো আমাকে একটু উদাস করে রেখে ছিল । আমি মনটা কাজে বসাতে পারছিলাম না । কেমন একটা অস্থিরতা মনের কোথাও দুমরে মুচরে দিচ্ছিল । মনের এই অস্থিরতা কে ভুলে থাকতে এবং সময় টাকে সুন্দর করে উপভোগ করার জন্য চিন্তা টা কে অন্য দিকে নেওয়ার চেষ্টা করলাম । তাই ভালো কোন বই কিংবা পত্রিকার বিষয় খুঁজছিলাম । প্রতিটা পত্রিকা জুড়ে শুধু ভাঙা চূড়ার বিষয় গুলোকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে । উৎসাহ পাওয়ার মতো কিছুই যেন পাচ্ছিলাম না । কিন্তু আমি হাল ছাড়লাম না । বেশ মনোযোগ সহকারে এমন কিছু বিষয় খুঁজছিলাম যা আমাকে উৎসাহ দিবে । আমি যেন নিজেকে আত্মবিশ্বাসী ভাবতে পারি । আমার ভিতরের মানবিক বোধ গুলোকে আরও বেশি সচেতন এবং সাহসী করে তুলবে । সময়টা সকাল ফুরিয়ে মধ্যাহ্ন ছুঁই ছুঁই করছে । হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো । আমি একটু অবাক হলাম । কারন বাইরে তখন তুষারপাত । এই সময়ে কেউ প্রয়োজন ছাড়া বাসা থেকে বের হয় না । আমি একটু অলস ভঙ্গিতে কফি হাতে নিয়েই দরজা খুললাম ।বাইরে থেকে প্রচণ্ড বাতাসের ধাক্কা ।খুব তুষারপাতের কারনে কিছুই দেখা যাচ্ছিলোনা । ঘূর্ণি বাতাসে তুষার গুলো এলো মেলো ভাবে এক অদ্ভুত ধোঁয়াটে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে । আমি ভাল ভাবে তাকাতে পারছিলাম না । দুজন জাপানি মহিলা । কয়েক সেকেন্ড এর মধ্যে একটু যেন বাতাস থামল ।আমি তখন জাপানিজ ভাষা জানি না । আমি এটা ও নিশ্চিত না যে তারা ইংরেজি পারে কিনা । একটু সামান্য দ্বন্দ্ব মনের মধ্যে কাজ করছিল। তাই আমি তাদের ইশারা ইঙ্গিত করে বাসা দেখিয়ে বুঝালাম ভিতরে আসতে । আমার ইশারা ইঙ্গিত ভাষা দেখে মজা পেয়ে হেঁসে দিল ।ওরা আমার বাসার ভিতরে ঢুকল খুব লাজুক ভঙ্গিতে । ওদের চোখে খুব কৌতূহল । আমি স্বাভাবিক করার জন্য কফি মগ দেখিয়ে বুঝালাম কফি খাবে কি না । ওরা হাসল । আমি দুই কাপ কফি তৈরি করলাম ।খুব অল্প সময়ের মধ্যে কফি আন্তরিক ভাবে তাদের হাতে তুলে দিলাম । ওরা যেন ভীষণ লজ্জা পাচ্ছে তা ওদের হাঁসি দেখে বুঝা যাচ্ছিল । এখানে অনেক শিক্ষিত জাপানি ইংরেজি জানে না কিংবা জানলেও ওরা অন্য ভাষায় কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না । কিছুটা সময় এমন করেই গেলো । আমরা পাশা পাশি বসে চুপ চাপ কফি খাচ্ছিলাম । হঠাৎ একজন ইংরেজিতে জানতে চাইলো তুমি নিশ্চয়ই এশিয়ার দেশ বাংলাদেশ থেকে এসেছ?
আমি তো হতবাক । তার বুদ্ধি মত্তা আমাকে আকর্ষণ করলো । খুব স্বাভাবিক ভাবে আমাকে দেখে অনেকে বুঝতে পারে না । কেউ ভাবে আমি ইন্ডিয়ান,কেউ পাকিস্তানি ,কেউ বা ভাবে নেপালি অথবা অন্য কোন
দেশের ।আমি যেন একটু চমকে গেলাম । মনের মধ্যে প্রচণ্ড আনন্দ অনুভব করলাম । আমি ও ইংরেজিতে প্রশ্ন করে জানতে চাইলাম তুমি কেমন করে বুঝলে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি ?
সে খুব আন্তরিকতা নিয়ে বলল ,তোমার আতিথেয়তা দেখে।
আমি ও লজ্জা পেলাম এবং বললাম ,এটা বেশি কিছু নয় !আমাদের দেশের সংস্কৃতি ই এমন অতিথি দেখলে সব মানুষ খুশি হয়।
তারপর তারা দুজনেই দুজনের পরিচিতি দিল। এক জনের নাম নাতালি নিশিউকি অন্য জনের নাম এমিলি সাইতো ।তারা দুজনেই খণ্ডকালীন খ্রিস্টান ধর্মের প্রচারক। কাছের কিংডম হল থেকে এসেছে।সপ্তাহের দুই দিন তারা মানুষের বাসায় বাসায় ধর্ম প্রচারনার কাজে যায় । একটি ম্যাগাজিন আমার হাতে দিয়ে বলল ,তুমিও আসতে পারো ।পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং মানবিকতা নিয়ে অনেক বিষয় আছে তুমি পড়ে দেখতে পারো ।
আমি বললাম ,আমি মুসলিম । তবে আমি তোমার ম্যাগাজিন পড়বো ।
নিশিঁউকি বলল আমি আগেই বুঝতে পেরেছি তুমি উদার মুসলিম । ভাল মুসলিম ।
আমি একটু অবাক হলাম । ওকে জিজ্ঞেস করলাম ,তুমি কিভাবে বুঝলে আমি মুসলিম ?
নিশিউকি আমার রুমে রাখা জায়নামাজ দেখিয়ে বলল, আমি অনেক বছর আগে এই হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বাংলাদেশি মুসলিম পরিবার কে চিনতাম। তাদের সংস্কৃতি আমি দেখেছিলাম। শুধু তাই নয় আমি বাংলাদেশ নিয়ে নিজে নিজে ইন্টারনেট এ পড়াশুনা করে বাংলাদেশের যুদ্ধ ,ইতিহাস, সংস্কৃতি সম্পর্কে জেনেছি।
আমার যেন নিশিউঁকি কে নিয়ে এক অদ্ভুত আগ্রহ তৈরি হল মনের মধ্যে ।জাপান একটি ধর্ম হীন দেশ । এখানে কাজের প্রতি শ্রদ্ধা এবং নিয়ম নীতি মেনে চলাই ধর্ম । এখানে আগে অনেকে বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী ছিল । কিন্তু কেউ কেউ খ্রিস্টান ,ইসলাম ,কিংবা অন্য যে কোন ধর্মে ও ধর্মান্তরিত হয়েছে । তবে বেশিরভাগ মানুষ ধর্মহীন এবং স্বাধীন ।

এমন করেই শুরু হয় নিশিউঁকির সাথে আমার পরিচয় । প্রায় ছুটির দিন গুলোতে নিশিউঁকি আমার বাসায় আসে । কথা হয় দেশ ,জীবন সংস্কৃতি নিয়ে । প্রকৃত পক্ষে সে একজন কলেজ শিক্ষক । আমি তাকে বাংলাদেশি খিচুড়ি ,ইলিশ মাছ আর আলু ভর্তার সাথে পরিচিত করি । তবে সে সময় থেকে অনেক জাপানিদের সাথে মিশে বুঝতে পেরে ছিলাম ওরা খাবার খুব আয়োজন করে খায় ।খুব উপভোগ করে । যে কয়দিন আমার বাসায় এসেছে সেই কয়দিন দেখেছি খাবার খাওয়ার আগে খুব সুন্দর করে প্রার্থনা করতে । এখন পৃথিবীতে অনেক ধর্মের অনেক ধার্মিক দেখা যায় । কিন্তু ধর্মের সৌন্দর্য শান্তি, বিশ্বাস ,ভালোবাসা যেন ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে । সারা পৃথিবীতে ধর্ম কে কেন্দ্র করে যুদ্ধ সংস্কৃতি যেন বেড়েই চলছে । মানব পৃথিবীতে মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা ,শ্রদ্ধা মানবিকতা সত্যিই অসহায় । আমি নিজে মানুষের সঙ্গ পছন্দ করলেও কখনও কখনও কিছু কিছু
সময় মিশ্র চিন্তার মানুষ কে এড়িয়ে থাকি । একজন ভয়ংকর মানুষের চেয়ে গভির নিরবতা এবং একাকীত্ব ও অনেক সুন্দর । যদিও এখনকার অস্থির সময়ের পৃথিবীতে ভাল এবং মন্দ বুঝাও অনেক কঠিন । নতুন যে কোন কিছু আমাকে আকর্ষণ করে । নতুন মানুষ ,নতুন সংস্কৃতি ,নতুন চিন্তা ভাবনা আমাকে আন্দোলিত করে । কয়েক মাস নিশিউঁকির সাথে আমার দেশ, সংস্কৃত ,ইতিহাস, ধর্ম এবং বিচ্ছিন্নতাবোধ নিয়ে অনেক কিছু অনেক বিষয় নিয়ে কথা হয় ।একটা নির্ভেজাল সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠলো নিশিউঁকির সাথে আমার । কখনও আমাকে বাসায় না পেলে দরজায় হানি চকোলেট আর ধর্মীয় শান্তির বানী সম্বলিত ম্যাগাজিন ঝুলিয়ে দিয়ে
যায় । সেই সাথে কখনও কখনও ছোট ছোট চিরকুট ।সেখানে লেখা থাকে ভালোবাসা ,বন্ধুত্ব ,মানবিকতা নিয়ে দুই চার লাইন কবিতা ।আমি দিনে দিনে একটা শ্রদ্ধাবোধ অনুভব করি ।সে আমাকে তার ইমেইল ঠিকানা দেয়। আমি তাকে ফেসবুকের কথা এবং বন্ধুত্তের কথা বললাম ।সে প্রকাশিত পৃথিবীর একজন হতে নারাজ । নিভৃত পাহাড়ি জীবনই যেন তাদের বৈশিষ্ট্য। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম তার বাড়ি তেইনে পাহাড়ের মাঝে । সে পাহাড়ে আছে আরেক বসতি । আরেক জীবন সংস্কৃতি । আছে বিদ্যালয় ,হাসপাতাল ,বৃদ্ধাশ্রম ,পার্ক, বিনোদনের অনেক কিছু । আমি ওর মুখে শুনে অভিভূত হই । সেই তেইনে পাহাড়ে যাওয়ার জন্য আমার মন আনচান করতে লাগলো । আমি তাকে বুঝতে দিলাম না । তাকে বুঝানোর আগেই সে আমাকে দাওয়াত করলো তার সেই তেইনে পাহাড়ে ।কিন্তু তেইনে পাহাড়ে যেতে বাঁধা হল শীতকালীন তুষারপাত । আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে নতুন কিছু জানতে মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিতে হয় । আমি তার কাছে জানতে চাইলাম গাড়ি চালনায় তার দক্ষতা কেমন?
সে হাসল । সে লাজুক হাসির সাথে আত্মবিশ্বাস নিয়ে জানালো ,জাপানিরা গাড়ি ভাল চালায় ।তুমি চাইলে তোমাকে নিয়ে যেতে পারি পরের কোন ছুটির দিনে ।আমি তার কাছ থেকে জেনে নিলাম বাসায় কে কে আছে । সে জানালো মা,বাবা,সে আর তার ছোট বোন । একটি ভাই আছে কিন্তু সে টোকিও তে থাকে পরিবার নিয়ে । নিশিউঁকির বয়স অনুমান করার চেষ্টা করে বুঝলাম হয়তো সে একা ।হোক্কাইডোতে অনেক অনেক একা মানুষ আছে । যারা বিয়ে করেনি।কিংবা বিয়ে হয়েছিল ।হয়ত মন ভাঙ্গা নিঃসঙ্গ মানুষ ।আমরা আমাদের সংস্কৃতিতে জীবন বলতে যা বুঝি ওদের কাছে জীবনের ছবি আরেক রঙে আঁকা । ওরা জীবন কে গভীর ভাবে উপলব্ধি করে ।তবে কাজের মধ্য দিয়ে । হেয়ালিপনা শব্দটা হয়তো জাপানিজ অভিধানে নেই । জাতিগত ভাবে সবাই সিরিয়াস ।
তারপর এক শনিবার । আমি বাংলাদেশি প্রস্তুতি নিলাম । নিজের হাতে মিষ্টি ,পায়েস ,মুরগির রোস্ট আর বাদাম পোলাও রান্না করলাম । সেদিন তুষারপাত ছিলনা তবে হালকা শৈত্য প্রবাহ । চারিদিকে বরফে ঢাকা পথ। এই সময় গাড়ি চালনা অনেক বিপদ জনক ।জানিনা নিশিউঁকি কেন এত বেশি আন্তরিক হয়ে গেল আমার সাথে!আমার মনের মধ্যে আনন্দের সাথে একটু একটু ভয় ও কাজ করছিল । সে কথা মত সকাল নয়টায় চলে
এলো । জাপান এ সকাল নয়টা কেমন সকাল না । কারন এখানে ভোর হয় অনেক আগে ।গাড়ি চলছে । কিতাকু ওয়ার্ড ছেড়ে হাচিকেন ,তারপর হাসসামু নামের একটা জায়গা। সেখান থেকেই দেখা যায় পাহাড় তেইনে ।
আমি একটু স্বাভাবিক থাকার জন্য কথা শুরু করলাম ।
তোমার নিশিউঁকি নামের অর্থ কি ?
জাপানিজ নিশি অর্থ পশ্চিম আর উঁকি হল তুষার ।পুরো অর্থ পশ্চিমের তুষার ।
আমি মুগ্ধ হয়ে বললাম ,বাহ! খুব কাব্যিক অর্থ ।
সে আমাকে জিজ্ঞেস করলো ,তোমার নামের অর্থ কি?
আমি বললাম ,নুরুন নাহার আরবি শব্দ নুরুন অর্থ হলি এবং নাহার অর্থ লাইট অফ দ্যা ডে ।
সে হেঁসে উঠল্।তারপর গাড়িটা সামনের ডান দিকে সামান্য বেঁকে একটু জোরে চালাতে চালাতে বলল,তুমি পাশে বসে আছো বলেই আজকের দিনটা বেশি উজ্জ্বল ।
আমি ও হেসে দিলাম । সে আমাকে বলল ,তোমার পরিচিত হয়ে আমার মন আরও অনেক বছর আগে ফিরে গেছে । কিন্তু আমি সত্যি ভীষণ খুশি । আমি কিছুই বললাম না । সে ই শুরু করল ।
ইউসুফ ছিল হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ । ক্যান্সার জীবাণু নিয়ে গবেষণা করতেই সে এখানে এসেছিল পাঁচ বছরের জন্য । আমি তখন ওর প্রফেসর এর অফিস সহকারী হিসাবে দুই বছরের জন্য নতুন চাকুরিতে ঢুকি । প্রতিদিন সে মধ্যাহ্ন ভোজ করার আগে একটি পুরনো জায়নামাজ বিছিয়ে যহুর নামাজ পড়ত । আমি তার নিয়ম করে নামাজ পরতে দেখে অভিভুত হই । আমি খুব মুগ্ধ হয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে তার নামাজ পড়া দেখতাম ।জানি না কখন ইউসুফ এর জন্য আমার মন হারিয়ে গিয়ে ছিল । প্রায়ই বিষয়টা ইউসুফ বুঝে ফেলত এবং সামান্য হাসত । আমি একদিন টার্কিশ দোকান থেকে একটি জায়নামাজ কিনে আনি। ওর পুরনো জায়নামাজ সরিয়ে নতুন জায়নামাজ রাখি । আমি অপেক্ষা করতে থাকি একটি ধন্যবাদ পাওয়ার জন্য ।কিন্তু দুই সপ্তাহ চলে গেল । ইউসুফ কোন ধন্যবাদ দিল না । সে নির্বিকার ভাবে ওই জায়নামাজে নামাজ পড়ে
যাচ্ছে । আমার মন অস্থির হল এবং ওর অনুভূতিতে ছুইয়ে দিতে একটা চিরকুটে লিখে দিলাম ,এই ম্যাট টা সুন্দর ।এটা কি বাংলাদেশি ?
তারপর দুই দিন পর । হঠাৎ একজন আন্ডার গ্রাজুয়েট ছাত্র এসে বলল, ওই ম্যাট টা টার্কিশ ।ইউসুফ সান তোমাকে বলতে বলেছে । আমি বোকা হয়ে গেলাম । কিন্তু ইউসুফ এর সাথে আমার কেমন করে বন্ধুত্ব করব এই ভাবনা নিয়ে মাথায় সব সময় ঘুরপাক খেত ।একদিন প্রফেসর আরও একজন প্রফেসর কে ইউসুফ সম্পর্কে বলছিল যে তার মা ক্যান্সার এ আক্রান্ত । আমি বিষয় টা শুনি । আমার মন দুঃখিত হয় । আমি আর আগের মতো আচরন করিনা । নিজেকে সংযত করলাম । এভাবে প্রায় ছয় মাস । হঠাৎ একদিন আমি ভীষণ মনোযোগ দিয়ে একটি অফিসিয়াল চিঠি টাইপ করছিলাম । বুঝলাম কেউ আমার সামনে ।
ইউসুফ আমার সামনে । হাসোজ্জল মুখে সে বলল ,আমি বিশ্ব বিদ্যালয়ের বাসা পেয়েছি । আগামি সপ্তাহে ল্যাব এর সবাইকে নৈশ ভোজ এর দাওয়াত করেছি । তুমি ও আসলে খুশি হবো ।
ইউসুফের দাওয়াত আমাকে আনন্দে ভাসিয়ে দিল । এই কয়দিন আমি যে কষ্ট পাচ্ছিলাম সব ভুলে গেলাম ।

খুব মনোযোগ সহকারে নিশিউঁকি অতিত বর্ণনা করছিল । আর গাড়ি চালাচ্ছিল । আমি শুনে যাচ্ছিলাম । সে আমার নিরবতা দেখে জিজ্ঞেস করল,তুমি অবাক হচ্ছো ?
আমি বললাম ,কিছুটা ! তবে এটা আমার চিন্তার মধ্যে ছিলনা । কারন আমি এখানে তেমন বাংলাদেশি দেখিনি ।
ততক্ষণে আমরা তেইনে পাহাড়ের মাঝে চলে আসছি । সে এক বিশাল আয়োজন । মাত্র তিন জন মানুষের জন্য এতো কিছু । জাপানিজ আতিথেয়তা নিয়ে অনেক বদনাম আছে । ওরা সময়ের অভাবে কাউকে বাসায় দাওয়াত করে না । রেস্টুরেন্ট এ খাওয়ার পর যার যার বিল সে সে দেয় । কিন্তু ওদের আতিথেয়তা দেখে আমার ভিতরে প্রচলিত ধারনা ভেঙ্গে গেল । তেইনে পাহাড়ের মাঝে তিন তলা বাড়ি । দুতলায় ওর মা বাবার সাথে দেখা করলাম । নিচ তলায় এমিলি ,আমি আর নিশিউঁকি বিশাল অতিথি রুমে পুরনো ঐতিহ্যবাহী টেবিলে নিচে বসে মধ্যাহ্ন ভোজ করলাম । সামুদ্রিক খাবার হিজিকি,কিসুই, গবো নামের এক খাবারের সাথে চিকেন ফ্রাই ,অনেক রকমের ফলের ডেসার্ট ,আর সাকুরা সুপ টা আমাকে বেশি মুগ্ধ করল । আমার খাবার গুলো ওর মা টেবিলে রেখে ছবি তুলল কারন টোকিও তে তাঁর ছেলে কে দেখাবে ।
যথারীতি নিশিউঁকির পরিবারের সবাইকে এবং এমিলি কে বিদায় জানিয়ে আমি গাড়িতে উঠলাম বাসায় ফিরব বলে । তেইনে পাহাড় এর বরফ কেটে গাড়ি নিচে নামছিল । আমি আমার ভিতরের কৌতূহল দমিয়ে রাখতে পারছিলাম না । অনেকটা পথ নিচে নামার পর আমি প্রশ্ন করলাম ,তারপর কি হয়েছিল ?
সে আমার দিকে তাকাল না । সামনে চোখ রেখেই স্বাভাবিক ভাবে বলল ,পরের দুই তিন বছর একটা সুন্দর বন্ধুত্ব পূর্ণ সম্পর্ক ছিল আমাদের মধ্যে । যেখানে গভীর ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধা বোধ ও ছিল । কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় ধর্ম বাধা হয়ে দাঁড়ালো । আমার তরফ থেকে না থাকলেও ইউসুফ এর মা মানতে পারছিল না আমাকে ।
অনেকক্ষণ সে কোন কথা বলল না । ও হয়তো আবেগ প্রবন হয়ে গেছে ।আমিও চুপচাপ রইলাম । বাইরে সূর্যের ম্লান হাসি । একটু শৈত্য প্রবাহের ছোঁয়া অনুভব করলাম । বাইরে তাকালে চারিদিকে বরফে ঢাকা সাদা পৃথিবী । আমার দুচোখ পৃথিবীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে লাগলো ।গাড়ি নতুন বাঁক নিল পুরনো পথে কিতাকু ওয়ার্ডের দিকে ।
সে আবার নিজ থেকেই বলল ,মৃত্যু নিশ্চিত ক্যান্সারে আক্রান্ত মায়ের কথা চিন্তা করে ইউসুফ ধর্ম কে সামনে রেখে তার সব ভালোবাসা আর অনুভুতি পৃথিবীর কোন গোপন যায়গায় লুকিয়ে রাখলো ।কোন অভিযোগ
নেই । মানুষের মধ্যে যিনি এই ভালোবাসা নামক অনুভুতি তৈরি করেছেন এবং মানুষের জীবন সুশৃঙ্খলপূর্ণ রাখতে ধর্ম নামক যে বিধান দিয়েছেন তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ।আমি সেই অনুভুতিকে সম্মান জানিয়ে আমৃত্যু মানুষ কে ভালোবেসে এবং ঈশ্বরের সেবা করে যেতে চাই। পৃথিবীর সকল মানুষের জীবন শান্তিময় হোক ।
আমি মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনছিলাম । এর মধ্যেই গাড়ি আমার বাসার সামনে এসে ধামলো ।বাইরে বের হয়ে তাকে ধন্যবাদ দিলাম । সে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল এবং ইশারা করে বিদায় জানাল ।
নিশিউঁকি ওর গাড়ি নিয়ে চলে গেল ।কিন্তু ওর নিরব দুটো চোখ আমাকে বেঁচে থাকার আরেক নিঃশব্দ জীবনবোধের গল্প বলে গেল ।

সত্য বলা শেখো
- কাজী জুবেরী মোস্তাক

বাঁচার মতো বাঁচতে শেখো
মরবে একদিন এটাই সত্য
তবে কেনো মাথা নত নিত্য
বুক ফুলিয়ে বলো সব সত্য ৷
করোনা'কো কোনই আপস
অন্যায়ে দেখাও সেই সাহস
যা দেখাও নিজ ঘরে রোজ
পরিবারের নিতে সব খোঁজ ৷
শিক্ষা দিতে হয় সত্য বলতে
কিন্তু মিথ্যাকে হয়নি শেখাতে
তবে কেনো সত্য হয় শেখাতে
সদা সত্য বলো নয়কো মিথ্যে ৷
মিথ্যেতো বুক ফুলিয়েই বলো
সত্য বলতে তবে কাঁপ কেনো
মরবে'তো একদিন এটা সত্য
তবে মৃত্যুর ভয় করো কেনো ৷
সদা সত্য কথা বলতে শেখো
দেখবে মিথ্যে হবেই পরাজিত
মিথ্যের কাছে ঝুঁকিওনা শির
দেখো সবাই বলবে তুমি বীর ৷

অদ্ভুত সুগন্ধি
- নুরুন নাহার লিলিয়ান

হোক্কাইডো প্রথম এসেই মায়ার মনে হল জন বিচ্ছিন্ন আরেক পৃথিবী । এখানকার গভীর নীরবতা আর শক্তিশালী শীতল বাতাস যেন নিঃশ্বাস এর সাথে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায় । মায়া বড় হয়েছে জনসংখ্যায় ভরপূর বাংলাদেশে । যেখানে মানুষ ছাড়া কিছুই চিন্তা করা যায় না ।আর এখানে মানুষের যেন অভাব । এখানকার নিঃশব্দ বাড়ি ঘর গুলোর দিকে তাকালে মনে হয় ছবিতে আঁকা কোন দৃশ্য । প্রকৃতির বুকে জেগে উঠা নিঃশব্দ প্রান । প্রশান্ত মহাসাগর এবং জাপান সাগরের তীর ঘেঁষে জেগে উঠা বসতি হল হোক্কাইডো দ্বীপ ।হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় কে কেন্দ্র করে অনেক বিদেশি গবেষক এবং ছাত্র ছাত্রীরা আসে পড়তে । বিয়ের পর তরুন বিজ্ঞানী স্বামীর গবেষণার জন্য তাঁর সাথে মায়া এখানে নতুন জীবন শুরু করল । হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে একটু দূরে গেলে পাহাড় আর নদী । মানুষ এর শব্দ পাওয়া খুব কঠিন । দিনে দুপুরেও গা ছম ছম করে । এখানে ভাষা এবং খাবার সমস্যার কারনে বিদেশিদের জীবন একটু কঠিন মনে হয় । কিন্তু এই দুইটি সমস্যা মানিয়ে নিতে পারলে শান্তির স্বর্গ হল হোক্কাইডো ।তাই মায়ার স্বামী জাপানিজ ভাষা শেখার শিক্ষক খুঁজতে লাগলেন । একদিন দুপুরে হঠাৎমায়ার স্বামী ল্যাব থেকে ফোন করে জানালো ,
মিসেস ইয়ামাদা রাজি হয়েছেন তোমাকে জাপানিজ ভাষা শিখাতে । তবে তোমাকে ওর স্কুলে যেতে হবে । এবং ওর স্কুলটা একটু দূরে পাহাড়ের কাছা কাছি ।
মায়া বলল ,ঠিক আছে । কিন্তু আমি কিভাবে যাওয়া আসা করবো ?
সে বলল , প্রথম দিন আমি তোমাকে দিয়ে আসবো । তারপর তুমি নিজে নিজে যাবে। তোমাকে সহজ পথ দেখিয়ে দিবো ।
মাটির নিচের ট্রেন দিয়ে গেলে আধা ঘণ্টা আর হেঁটে গেলে এক ঘণ্টা পনেরো মিনিট এর মতো । ট্রেন দিয়ে গেলে দুইটা ট্রেন পাল্টাতে হবে । তবে হেঁটে গেলে সময় বেশি লাগলেও সহজ পথ । প্রতি বুধ বার মায়া মিসেস ইয়ামাদার জাপানিজ ভাষা স্কুলে যায় । মায়ার সাথে আরও কয়েক জন বিদেশি ছাত্রী আছে । আমেরিকান ,রাশিয়ান ,তাইওয়ান ,কম্বোডিয়া থেকে আসা মায়ার মতোই গবেষকদের সহধর্মিণীরা । খুব সকালে ঘুম থেকে উঠতে হয় । কারন ক্লাস শুরু হয় সকাল আট টা থেকে মায়াকে তো আরও আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয় । জাপানিজরা সময়ের ব্যপারে খুব সচেতন এবং দায়িত্বশীল ।মিসেস ইয়ামাদা ক্লাসে সকালের হাল্কা নাস্তার ব্যবস্থা
রাখেন । চা,কফি ,দুধ আর নানা রকমের কেক ,বিস্কুট আর জাপানিজ চকোলেট । দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে আরও একটি আমেরিকান মায়ার সমবয়সী মেয়ে এলো । সে গরম কফি হাতে নিয়ে এসে মায়াকে দিয়ে নিজের পরিচয় দিল। খুব আন্তরিক এবং চঞ্চল । মায়ার ও মনে মনে ভাল লাগলো । ওর নাম জিমি । ওর চোখ দুটো আমেরিকানদের মতো ঘোলা নয় আবার দক্ষিন এশিয়ানদের মতো গভীর কালো চোখ নয় । দেখতে সুন্দর কিন্তু চোখের দিকে তাকালে রহস্য তৈরি হয় । মনে প্রশ্ন জাগে । নানা কৌতূহল ঝাপটে ধরে । তবে ওর একটা বিষয় মায়ার ভাল লাগেনি । প্রথম পরিচয়ে মায়াকে একটু বেশি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো ,
তুমি কোন সুগন্ধি ব্যবহার করো ?
মায়া বলল ,আমি আসলে জানি না ?
কেন তুমি নাম জানো না ?
মায়া বললা ,আমার স্বামী কেমিক্যাল বিজ্ঞানী এই সুগন্ধিটা বাংলাদেশের নিজের ল্যাব থেকে তৈরি করে এনেছে ।
সে একটু কেমন অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে মায়ার কাছ থেকে ঘ্রাণ নিলো । আর কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করতে লাগলো । তারপর একটা উচ্চ হাসি দিলো ।
মায়াকে বলল , তোমার অনেক মজা । তোমার সাঁজ গোঁজের কিছু কিনতে হবে না ।
মায়া বলল ,একদম ঠিক । জাপান এসে এই জিনিসটাই আমার মজা লেগেছে । কারন আমি সাঁজতে ভালোবাসি ।
জিমি আমাকে বলল ,বেশি সেজো না ।আর এই মায়াময় অদ্ভুত সুগন্ধি ব্যবহার করোনা । তোমাকে ভূতে ধরতে পারে । নীরব জায়গায় ভূত থাকে । আর বিজ্ঞানীরাও কিন্তু ভুতের মতো ! রহস্য আর আবিষ্কার নিয়ে ওদের জীবন ।আমি জানি কারন আমার স্বামী ও কেমিক্যাল নিয়ে কাজ করছে ।কথাটা বলেই কেমন যেন করে হাসল । মায়া ঠিক বুঝতে পারলো না ।
মায়া ভাবল ও মজা করেছে । দুই একটা বিষয় ছাড়া জিমি কে মায়ার কিছুটা ভালো লাগলো । একটা মজার সম্পর্ক ও তৈরি হল । ও আমেরিকান গল্প বলে মায়া বলে বাংলাদেশের ।
বাসায় এসে মায়া ওর স্বামীকে কে বলল ,জানো এই সুগন্ধিটার সুঘ্রাণ এক আমেরিকান মেয়ের ও খুব ভালো লেগেছে ?ও দেখতে চেয়েছে ?
মায়ার স্বামী স্বল্প ভাষী ,ভদ্র আর বিচক্ষণ । সে কোন উত্তর দিল না । কিছুটা সময় যাওয়ার পর বলল, তুমি এই সুগন্ধি স্কুলে যাওয়ার সময় ব্যবহার করোনা আর জিমি কে এড়িয়ে যেয়ো ।
কথা গুলো বলেই সে ল্যাব এ চলে গেল । মায়া কিছুই বুঝল না । এই সামান্য একটা সুগন্ধি আর ওই আমেরিকান মেয়ের সাথে কি সম্পর্ক । মায়া যেন আরেক রহস্য খুঁজতে লাগলো । ঠিক সেদিন থেকেই সে অনুভব করলো তার চারপাশের অনেক কিছু কেমন যেন অন্য রকম । একটু যেন কোথাও আলাদা । হোক্কাইডোর ভয়ংকর নিরবতা আর স্বামীর ব্যস্ততা মায়ার বুকের ভিতর দুর্বিষহ হাহাকার তৈরি করলো । মানুষের সঙ্গ ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না । তারপরের প্রতি ক্লাসে জিমি যেন মায়ার জন্যই অপেক্ষা করে । কয়েক মাস জিমির সাথে অনেক জায়গা ঘুরে দেখা হল । তারপর এক দিন ক্লাস শেষে জিমি বলল ,মায়া চল এই মারুয়ামা পাহাড় টা
দেখি ।উপরে যাবে ?
মায়া বলল ,উপরে যেতে কতক্ষণ লাগবে ? বাসায় ফিরতে হবে ।
জিমি বলল ,বাসায় একা কি করবে ? পাহাড়টা অনেক সুন্দর । আসো যাই ।
অনেকটা পথ দুজনে গল্প করতে করতে উপরে উঠে গেল । মায়া ক্লান্ত হয়ে গেল । জিমি আন্তরিক ভাবে মায়ার ব্যাগ টা নিজের কাছে নিল । যেন মায়া সহজে হাঁটতে পারে । তেমন কোন বাড়ি ঘর নেই । সুনসান নিরবতা । তবে কোথাও থেকে একটা অচেনা সুর ভেসে আসছে । কেউ কোন বাদ্য যন্ত্র বাজাচ্ছে । আরও কয়েক ধাপ যাওয়ার পর বুঝা গেল কাছেই কোন এক বাড়িতে লোকজন আছে । কাছে যেতেই একজন খুব বয়স্ক মহিলা বের হয়ে এলো । তার মুখে এতো গুলো চামড়ার ভাজ দেখলেই বুঝা যায় বয়স নিজেই ক্লান্ত। একশ বছর ছুয়ে গেছে হয়তো অনেক আগে । বাড়ির ভিতর উঁকি দিয়ে দেখা গেলো । আরও দুই তিন বৃদ্ধা জাপানিজ ঐতিহ্যবাহী সামিসেন বাজাচ্ছে ।তাদের সামনে অসুস্থ কেউ একজন চেয়ারে আধ শোয়া অবস্থায় আছে । সেই অসুস্থ লোকটা তাকাতেই মায়া আঁতকে উঠলো । আগুনে ঝলসে যাওয়ার পর যেমন বীভৎস হয়ে উঠে মানুষ । তার চেহারায় ভয়ংকর চোখ দুটো ছাড়া আর কিছুই বুঝা গেল না । লোকটার চাহনিতে মায়া প্রচণ্ড ভয় পেল ।মনে হচ্ছে এখনি অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে । মাথার ভিতরটায় ওই আওয়াজে কেমন যেন করতে লাগলো । অদ্ভুত মায়াচ্ছন্ন ! রহস্য ! আর আতংক ! হঠাৎ মায়া দেখে জিমি ওর সাথে নেই । জিমির কাছে ওর ব্যাগ । একটা ভয়ংকর শিহরণ মায়ার উপর দিয়ে গেল । জিমি হয়তো সুগন্ধি টা চুরি করার জন্য ব্যাগ টা কৌশলে নিয়ে গেছে । মায়া কিছুই বুঝল না ।হঠাৎ পিছনের ঘর টা তে তাকাতেই মায়া আঁতকে উঠলো । জিমি আরও কয়েকজন বুড়ির সাথে মৃত মানুষের মাথার ভিতর থেকে দুই আঙ্গুলে কাঠি ঢুকিয়ে দিয়ে মগজ খাচ্ছে। মায়ার পেট পাকিয়ে বমি আসতে লাগলো । নিজের উপর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেলল । নিজের ব্যাগ নিয়ে খুব দ্রুত মায়া বেড়িয়ে এলো । অনেক টা পথ চলে আসার পর হঠাৎ জিমি মায়াকে পিছন থেকে ডাকল । মায়া থামল না । সেদিন থেকে মায়ার ভীষণ জ্বর । বাসায় ফিরেই ঘুম । হঠাৎ চোখ খুলে দেখে জিমি ছুড়ি নিয়ে ওর বুকের উপর ঝুকে আছে ।
আমাকে ওই সুগন্ধিটা দাও । আমি চারশো বছর পর ফিরে এসেছি । ওইটা আমার । আমার বাগানের অচেনা ফুল দিয়ে তৈরি হয়েছে ওই সুগন্ধি । কোথায় আছে বল?জিমি কয়েকটা কোপ বসিয়ে দেয় । কিন্তু মায়া সরে
যায় ।ওদের মধ্যে মারামারি শুরু হয় । মায়া কিচেন থেকে একটা সবজি কাটার ছুরি দিয়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দেয় জিমির বুকে । মায়া এক চিৎকারে লাফ দিয়ে উঠে ।নিজের হাতে ছুরি । আরেক হাত কেটে রক্ত বের হচ্ছে । কিন্তু বুঝতে পারে স্বপ্ন । কিচেনে গিয়ে দেখে লকারে রাখা সব গুলো ছুরি সুন্দর করে উপরে সাজানো আছে । বাসার সব আসবাব পত্র গুলো একটু অন্য রকম । মায়ার ভিতর ভীষণ ভয় আর দ্বন্দ্ব কাজ করতে লাগলো । হঠাৎ কলিং বেল বাজল । স্বামী কে জড়িয়ে ধরে কান্না করতে লাগল। কিছুই বলল না । দুই দিন পর । মায়া তার স্বামীকে জিজ্ঞেস করল , জিমি কে তুমি সুগন্ধি সম্পর্কে বলতে না করেছ কেন ?
মায়ার স্বামী একটু সময় নিয়ে বলল , রহস্য আর আবিস্কার সমান্তরাল ভাবে চলে ।একটি নতুন আবিস্কারের পিছনে অনেক গল্প আর গোপনীয়তা থাকে ।কারন অনুন্নত দেশের কেউ নতুন কিছু আবিস্কার করলে উন্নত দেশের বিজ্ঞানিরা তথ্য চুরি করে স্বীকৃতিটা নিজেদের নামে নিয়ে নেয় । শুধু তাই নয় আরও অনেক অসৎ উদ্দেশ্য থাকে । একটা সুগন্ধি দিয়ে মানুষকে অজ্ঞান করা যায় , মতি ভ্রম করা যায় , মেরে ও ফেলা যায় । কেমিক্যালের অনেক শক্তি । বিজ্ঞান মানব কল্যাণের জন্য। তাই আবিস্কারের তথ্য গোপনীয়তা রক্ষা সম্পদের রক্ষার মতো । সব সময় আগলে রাখতে হয় ।বিজ্ঞানের রহস্য যাপিত রহস্য থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী যা কখনও কখনও মানুষের চেনা বিশ্বাস কে ও দ্বন্দ্ব মুখর করে তুলে ।
তারপরের ঘটনা আরও ভয়াবহ । মায়া মোবাইল ,ইমেল, আর ফেসবুক ঢুকে দেখে জিমি নামের কেউ নেই । এই কয় মাস যে ইমেল,মোবাইলের এবং ফেসবুকের কথা হয়েছে তার কোন চিহ্ন পাওয়া গেল না । পরের সপ্তাহে ক্লাসে গিয়ে দেখে জিমি নেই । মিসেস ইয়ামাদাকে জিজ্ঞেস করাতে বলল , কে জিমি ?এই নামে যে কেউ ছিল সে শুনে অবাক হল ।মায়া আরও ভয় পেয়ে গেল । কিন্তু নিজেকে বুঝাল রহস্যময় পৃথিবীর সব রহস্য নিয়ে ভাবতে নেই । কিছু রহস্য কেবল রহস্য হয়েই থাক ।

নবীর-রাওজা
- মো:তারেক আনোয়ার কিরন সিদ্দিক

আমি দেখতে চাই গো খোদা
তোমার নবীর পবিত্র রাওজা
জীবন আমার ধন্য হয়ে যাবে
নবীর উম্মতে নাম আমার গণ্য হয়ে যাবে।

স্বর্ণ জরীতো সেই মাদিনাতে
যাব আমি ভাবি দিনে রাতে
পড়ে রবো আমি নবীর চরণে
ধন্য হবো সেথায় হলে মরণে।

নবীর রাওজার ওই মাটির ঘ্রানে
মুগ্ধতা ছুয়ে যাবে আমার প্রানে
দারুদ ও সালাম পড়ে তাকে শুনাবো
মনের দু:খ যতো হাবীব কে জানাবো।

আমার নবী আমার ব্যথা বুঝবে
জানি সেখানেই আমার সকল ব্যথা ঘুচবে
আমার ভালবাসার কথা নবীকে জানাবো
যদি থাকেন নারাজ খোদা তাকে মানাবো।

যে নবীর সে আমার খোদাই তো বলেছেন
মাক্কার মাক্কা তিনি মাদিনা কে করেছেন
মাদিনার মাটিতে দাঁড়িয়ে হাত দুটো
বাড়িয়ে,
রাসুল্লুল্লাহ (সা:) বলে ডাকবো।

আমার আছে যতো পাপ করবেন
মাফ অনুসুচনায় কাঁদবো,
দাঁড়িয়ে নবীর রাওজার কাছে চাইবো
আমি আল্লাহর কাছে।

হাশরের দিন যেন স্বাক্ষি থাকেন
সম্পর্ক আছে আমার নবীর সাথে।

জীবন সন্ধ্যা
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

ঘন আবীরে নেমেছে সন্ধ্যা ,
জীবন ভরেছে আঁধারে ,
দৃষ্টি বুঝি হারিয়েছে আমার ,
আঁধার ঢেকেছে চারিধারে ।

সীমাহীন যন্ত্রনা বুকের মাঝারে ,
হৃদয়ের স্পন্দন গতিহীন ,
পাপড়ির মত ঝরলো আশা ,
বাঁচার ইচ্ছা ক্ষীন !

উচ্ছল জীবনে হঠাৎ ঝড় ,
সাধের জীবন করলো অচল ,
ভেঙ্গেচুরে সব তচনচ হোলো ,
জীবন হবেনা আর সচল !

@ নন্দা      20-10-17

বীণামিকা
- নুরুন নাহার লিলিয়ান

বীণামিকা কে আমি ভুলতে পারব না ! জানি এটা কোন দিন সম্ভব নয় ! একটা অদ্ভুত অপরাধ বোধ আমাকে প্রতিনিয়ত তাড়িয়ে বেড়ায় । কথা গুলো বলেই মাহাবুব চেয়ারটা সোজা করে সিটি হল থেকে সোজা পাহাড়ের দিকে তাকাল ।অদিতি প্রায়ই  সাপ্পোরো সিটি হলে যায় ইতালিয়ান পেস্তা খেতে ।জাপানিজ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান  জাইকাতে চাকুরির কারনে অদিতি সাপ্পোরোতে আছে প্রায় দুই বছর হল । একা একা ঘুরে বেড়ানো আর নিজেকে কিছু সময় দেওয়ার মধ্যে একটা আলাদা সুখ আছে । এখানে কিছু ইন্ডিয়ান এবং নেপালি দেখা গেলে ও বাংলাদেশিদের  খুব কম দেখা যায় । আর সেখানেই সে মাহাবুব কে দেখে ।

প্রথমে কয়দিন ভেবেছে হয়তো অন্য কোন দেশের হবে । তারপর পরিচয় । মাহাবুব কিউশু বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষক ।এখানে এসেছে ছয় মাসের একটি প্রোজেক্ট এর কাজ নিয়ে।খুব অল্প পরিচয় । কিন্তু দুই সপ্তাহে বেশ আন্তরিক বোঝাপড়া হয়ে গেছে দুজনের মধ্যে। ব্যক্তিগত বিষয় আর সম্পর্ক এর এক প্রশ্নেই সে নিজের গল্পটা  শুরু করল ।তারপর সে আবার চেয়ারের সামনে এসে বসল । নিজ থেকেই বলা শুরু করল ।

বুঝতে পারিনা । সৃষ্টিকর্তার অদ্ভুত খেয়াল । সে ছিল একটা  সঙ্গীতের মতো  প্রানবন্ত আর উচ্ছল । একটা দুর্দান্ত সুরের মূর্ছনা হয়ে আমার  ভিতরের কান্নার শব্দ গুলোকে নিরব করে রেখে ছিল । আমার স্বপ্নের আকাশে জমা মেঘ গুলোকে  সরিয়ে দিয়ে জোস্না রাতের চাঁদ নামিয়ে এনে ছিল । আমার জীবনের থেমে থাকা দুঃসময় গুলোকে দুর্দান্ত সমুদ্রের মতো করে তুলেছিল । আমি যেন আবার নতুন জীবন নিয়ে পৃথিবী দেখা শুরু করলাম । আমি তখন মাত্র ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা শেষ করে পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিচ্ছি । এর মধ্যেই বাবা আমার জন্য মেয়ে দেখা শুরু করেছে ।  ট্রেনিং শেষ করে প্রথম চাকুরি এএসপি হিসেবে গাজিপুর থানা । সেখানেই আমার বিয়ে  হল অরু নামের একটি মেয়ের সাথে । মেয়েটি অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্রী । দেখতে ভাল । আমার মতো ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে আগ্রহ । মনে মনে ভাবলাম ভালই হবে । কবিতা আর সাহিত্য আলোচনা করে সংসারটা সুন্দর ভাবেই কেটে যাবে । কিন্তু বিয়ের দ্বিতীয় দিন অরু আমাকে জানিয়ে দিল সে আমাকে কোন দিন ভালবাসতে পারবে না । কারন স্কুল জীবন থেকে সে তার চাচাতো ভাইকে ভালবাসে । সে আমাকে ঠকাতে চায়না । তার মা তাকে জোর করে আমার সাথে বিয়ে দিয়েছে ।

অদিতি খুব চুপচাপ তার কথা গুলো শুনছিল । তারপর বলল আপনি কি করলেন ?
জানিনা হঠাৎ শরীরের রক্ত প্রবাহ কোথায় যেন থেমে গেল । স্বপ্নের আকাশে উড়া বুনো পাখি গুলো পাখা ঝাপটে এক এক করে নিচে পড়ে যেতে লাগল । গভীর স্বপ্নে নদীতে পাল তোলা নৌকা নিয়ে হারিয়ে যাওয়ার পথ অন্য দিকে বাঁক নিল । এ কেমন নিয়তি ! নিজের স্বপ্নের জীবনটা বিষাদে ভরে উঠলো । আমি আর এই বিষাদের ভার বইতে পারছিলাম না । যাকে ভালবাসব বলে জীবনে জায়গা দিলাম সে আমাকে ভালবাসে না । যে ভালবাসে না কিংবা ভালবাসা চায়না তাকে নিয়ে ভাবা যে খুব কঠিন । বিবেক আমাকে থামিয়ে দিল । আমি একদিন অরুকে মুক্তি দিয়ে দিলাম । কিন্তু অরু খুশি হলেও অরুর  মা কিছুতেই মানতে চাইল না । একটা ভাল পাত্র ,একটা চাকুরি একটা সামাজিক অবস্থান এই সব কিছুই হয়তো একটা সম্পর্ক তৈরি করেছিল । কিন্তু সেখানে মন নিয়ে ভাবনার  কোন অবকাশ ছিল না । তাই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম । অরু ফিরে গেল তার ভালবাসার মানুষের কাছে । আমি অনেক দিন অনেক বেশি কাজে মনোযোগী হয়ে গেলাম ।
অদিতি বলল ,কেন আপনি কাউকে খুঁজে নিতে পারতেন ।জীবন ছোট মনে হয় কিন্তু আসলে অনেক বড় ।
মাহাবুব মাথা ঝাঁকাল । কেউ একজন তো এসেছিল আমার জীবনে !

তারপর কোন একদিন । বীণামিকার গল্পটা শুরু হল ।সে ছিল ডাক্তার । মনের মতো পাত্র পাচ্ছিল না । ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে এক আসামী কে দেখতে গিয়ে পরিচয় । তারপর জানা শোনা । জীবনের অভিজ্ঞতা বিনিময় । তারপর সবটুকু দুঃখকে আপন করে নিয়ে বীণামিকা আমার জীবনে এল । তথাকথিত সমাজ এবং সামাজিক নিয়মের দৃষ্টি অনেকটা যেন বাঁকা চোখে তাকাল । কারন টা হল বীণামিকার জীবনে পূর্বে স্বীকৃত কেউ ছিল না । ঠিক অরু যেমন ছিল আমার জীবনে । সে হয়তো ভালবাসত কাউকে তা কেবল মনে মনে । শিক্ষা এবং পেশাগত জীবনেই সে সময় উপভোগ করেছে । অনেক ব্যস্ততা কে সঙ্গী করে । দুঃখ কে অতীত করে আমরা একটি নতুন জীবন রচনা করলাম । ওই যে সমাজ বলে একটা শব্দ আছে আমাদের জীবনে । অনেক গুলো সামাজিক সম্পর্ক দিয়ে একটা সমাজ । আর ওই সম্পর্ক গুলোর মধ্যে কিছু মানুষ আমার আর বীণামিকার সম্পর্কটা কে বিষিয়ে তুলল । আমরা বড় হিংসাত্মক আর হীন মানসিকতায় ভরপুর পৃথিবীতে  জন্মেছি । সেখানে বেঁচে থাকাটা সত্যি কষ্টের ।

যে দুর্ঘটনার গল্প আমরা নিজেরা ভুলে যাই । যে দুঃস্বপ্নের ছায়া আমরা নিজেরা স্বীকার করিনা । তখন কিছু কুৎসিত মনের মানুষ খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মনে করিয়ে দিয়ে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পায় । আমার আর বীণামিকার সুন্দর নতুন জীবনটা অনেক হিংসুট চোখ যেন সহ্য করতে পার ছিল না । কখনও এই জটিল সমাজ আমার গল্প টেনে এনে বীণামিকার মনটা ছোট করে দিতো । আবার কখন ও বীণামিকার সাহস আর  উদারতা কে সন্দেহের জালে আঁটকে দিত । এই যেন হীন সমাজ ব্যবস্থার অদ্ভুত আর নিভৃত  কুৎসিত আনন্দ । ধীরে ধীরে বীণামিকা মানুষ আর সমাজ এড়িয়ে থাকতে ভালবাসত । একা থাকাতেই শান্তি পেত । আমি আমার কাজ নিয়ে অনেক বেশি ব্যস্ত থাকাতে ঠিক যেন ওর স্পর্শ কাতর আর সংবেদশীল মন টা কে বুঝে উঠতে পারিনি । একদিন বুঝলাম বীণামিকা কেমন যেন শুকিয়ে যাচ্ছে । চোখের নিচে গভীর দুঃখের ছায়া । ওর আগের চেহারাখানি আর নেই । ও ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পেত । নিয়তি আর জীবন ওর কাছে ভীষণ দুর্বোধ্য হয়ে উঠেছিল ।

সেখানে মানুষের প্রতি মানুষের ভালবাসা ,স্নেহ ,সহানুভূতি ছিল না । মানুষের মন আর জীবন  হৃদয় দিয়ে বুঝবার মানুষ নাই পৃথিবীতে । এই সব শূন্যতা ওকে অসহায় করে তুলে ছিল । ওর গভীর দুঃখবোধ অচেনা এক  কঠিন রোগ ডেকে নিয়ে এল । আমি হারালাম আমার বেঁচে থাকা । আমার জীবন । আমি পুলিশের চাকুরিটা ছেড়ে দিয়ে উচ্চ শিক্ষা নিতে জাপান চলে এলাম । আর ফিরে যাওয়া হয়নি । অনেকদিন পর কোন বাংলাদেশির সাথে কথা বলছি ।খুব ভাল লাগছে । অদিতি একদম স্তব্ধ হয়ে গেল । সেদিনের পেস্তাটা আর খাওয়া হল না । কিছু গল্প যেন কোথাও কারও  না কারও কাছে প্রকাশ করতে হয় । আবার কিছু গল্প থাকে কখনও প্রকাশ করা হয় না । ঠিক প্রকাশ করা যায়না । অদিতির একান্ত গল্পটা হয়তো সেই রকম কিছু । তাই আর সেদিন সে কোন কিছু ভেবে পাচ্ছিলনা । মাহাবুব এর দুঃখে পোড়া চেহারার দিকে আর তাকাতে ইচ্ছে করল না ।  কিছু বলতে ও ইচ্ছে করল না । শুধু জিজ্ঞেস করল ,কবে সাপ্পোরো ছেড়ে  যাচ্ছেন ?

মাহাবুব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে বলল ,সামনের সপ্তাহে । আপনি ?

অদিতি উত্তর দিল , সামনের বছর । কথাটা বলেই সে একটু আগে আগে বের হয়ে গেল । আর পিছনে তাকাল না । কারন দুঃখ হয়তো মায়া বাড়াতে পারে । মায়া মমতা খুব বেশি কঠিন আর ব্যাখ্যাতিত ।

কলমেই চলুক চিৎকার
–  শীবু শীল শুভ্র

সহসা-ই স্বপ্নগুলো ভেঙ্গে চুরমার
তার কি নেই কোন প্রতিকার?
এই বাংলায় অলক্ষ্য সহস্র কর্ম
শিশুশ্রম নিষিদ্ধ, এ যেন রুপকথার গপ্প।

হে নবীন জন্ম-ই কি তোমার অভিশাপ?
আহারে বিজ্ঞ মশাই মুখেই সব অনুতাপ!
আর চাই না শিশুশ্রম
ধিক্কার দিয়ে লাভ নেই, কলমেই চলুক চিৎকার!

তিরিশ দিনের শ্রম রণদার কাছে পণ্য
ক্ষণিকের টাকায় পেঁটে-ভাতে, বাবু আমি ধন্য!
কত যে শিশুর শ্রমে বাবুমশাইরা অনন্য
ধিক্কার দিয়ে লাভ নেই, কলমেই চলুক চিৎকার।

বাল্যকাল কর্মে বিসর্জন
বাবা মায়ের সুখে আমি আজ তপ্ত!
নিয়তির পরিহাস কে দেখবে?
ধিক্কার দিয়ে লাভ নেই, কলমেই চলুক চিৎকার।

বি.দ্র:- [ পথশিশুদের উৎসর্গ, এই কবিতা।  ]

চুপকথা
- নীলকণ্ঠ পদাতিক

কে কোথায় একা সময় সমুদ্রে ভাসে, কে জানে!
মধ্যবর্তী রাতের চাঁদের সাথে তারাদের দূরত্ব মেপে তবু
বলে দেওয়া যায়- ভালোবাসা এখনো ঠিকঠাক।
আর প্রেম! অনুর্বর হৃদয় প্রান্তরে, যা বুনেছি তাই গেছে মরে।
এখন ভাসানের দিন।
রূপকথার শরীরে ঘুন, ডালিম কুমার নিরুদ্দেশ অনেক অনেক দিন;
কান পেতে শুনি শুধু চুপকথা- চুপ, চুপ, চুপ...
পৃথিবীর ঠোট জ্বলে গেছে।

একদিন একবেলা আজীবন
- নীলকণ্ঠ পদাতিক

বলতে বলতে সব গল্পই ফুরিয়ে যাবে একদিন।
চলতে চলতে পথের রেখাও যেমন করে মুছে যায়,
একদিন তুমি, আর একদিন আমিও মুছে যাবো।
তারপর আমি-তুমি আমরা হয়ে লেপ্টে থাকবো পৃথিবীর গা'য়-
চিরহরিৎ, অথবা চিরমলিন, যতক্ষন ভালোবাসা ধুয়ে না যায়...
তাহলে, আপাতত এখন বিদায়।

একদিন বৃষ্টি হলে খুব করে ভেজা যাবে।
একদিন সারাদিন শীতঘুমে স্বপ্ন হবে।
একদিন, একদিন তৃতীয়ায়, একদিন কৃষ্ণপক্ষে....
একবেলা আজীবন প্রেম হবে তোমাতে-আমাতে।
সেই দিন, সেই বেলা আমরা 'আমরা' হবো আরেকবার-
সশরীরে, অথবা আত্নায়।
প্রিয়তমা, খুব খুব ভালো থেকো- যতোটা পারা যায়।
সুখের চৌকাঠ দ্রুতই ক্ষয়ে যায়।
আপাতত এখন বিদায়।

কল্পনা
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

শোবার ঘরের জানলার ফাঁকে ,
দেখতে আমি পাইযে তাকে ,
যখন থাকি একলা ঘরে ,
সে থাকে জানলার ওপারে ।
তাঁকিয়ে থাকে মুখের দিকে ,
বাস্তবের অনেক দূর থেকে -
আমার সব কল্পনার আলোকে ।
আছে সে অজানা দেশে ,
ভালবাসবে না আর কাছে এসে !
জানি সবই বুঝিও আমি ,
তবুও হৃদয় কাঁপে বারবার ,
নারী মন যে আমার !

13-10-17

অব্যক্ত যন্ত্রণা
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

অফিস থেকে বেরিয়ে বাস থেকে নেমেই বৃষ্টির সম্মুখীন ! ছাতাটা আজ আনতে ভুলে গেছে রেখা ।গতকাল বৃষ্টিতে ভেজা ছাতাটা ব্যালকনিতে শুকাতে দিয়েছিলো আজ আর আসবার সময় ব্যাগে পুড়তে মনে নেই । এতো তাড়া থাকে অফিসে বেরোনোর সময় ! ছেলে স্কুলে বেরোবে তার খাবার ,টিফিন ,নীলয়ের টিফিন ,দুপুরের খাবার ,ওষুধ সব গুছিয়ে অচলাকে বুঝিয়ে দেওয়া । তারপর নাকে মুখে দু'টি গুঁজেই অফিস ছোটা ।

আজ প্রায় একবছর হোল নিলয়ের বাম অঙ্গটা পুরো অসার ।প্রথমে সামান্য জ্বর ,গায়ে ব্যথা । কিছুতেই জ্বর কমেনা ;আস্তে আস্তে শরীরের বাম অঙ্গে অসারতা ।আর কিছুই করার নেই ।ফিজিওথেরাপিষ্ট নিয়মিত এসে এক্সারসাইজ করিয়ে যাচেছন । কিনতু উন্নতির কিছুই দেখা যাচেছনা ।শ্বাশুড়ী মাস ছ'য়েক আগে মারা গেছেন । আর শ্বশুরমশাই তো বিয়ের আগেই চলে গেছেন । এখন বাড়িতে মানুষ বলতে সে নিজে ,পঙ্গু স্বামী ,দশ বছরের ছেলে নীলাদ্রী আর সর্বক্ষনের কাজের মেয়ে অচলা । অচলা ভীষণ ভালো মেয়ে ।রেখা যখন বাড়িতে থাকেনা তখন ছেলে স্কুল থেকে ফিরলে বড় রাস্তার মোড় থেকে তাকে বাড়িতে নিয়ে এসে যত্ন সহকারে খাওয়ানো ,তাকে দেখে রাখা ,বড়বাবুর সমস্ত দায়িত্ব পালন করা ,ঘড়ি ধরে তাকে সময়মত ওষুধ খাওয়ানো -সব সবকিছুই  সে করে । রেখা বাড়িতে ফেরার সাথে সাথে তার চা ,জল খাবার এমনকি রাতের রান্না পর্যন্ত সব রেডি থাকে । শুধু সকালের দিকটাই রেখার একটু তাড়া থাকে । দুপুরের রান্নাটা সে নিজের হাতেই করে বাটিতে বাটিতে ঢেলে রেখে যায় ।

বাসটা এসে এমন জায়গায় দাঁড়ালো সামনে জল আর কাদায় পরিপূর্ণ । পড়ে যাচ্ছিলো । হঠাৎ এক ভদ্রলোক ধরে ফেলেন । মুখের দিকে না তাকিয়েই রেখা তাকে "থ্যাংক্স" বলে । বৃষ্টিটা বেশ জোরেই পড়ছে ।শেডের নীচে ছাতাবিহীন অবস্থায় যারা দাঁড়ানো তারা প্রত্যেকেই ভিজে যাচ্ছেন । আর যাদের কাছে ছাতা আছে তারা সকলেই ছাতা খুলে বৃষ্টির হাত থেকে নিজেদের পোশাক বাঁচাতে সামনের দিকে ছাতা খুলে ধরে আছেন ।রেখা আস্তে আস্তে পিছনদিকটাতে চলে যায় । অন্যমনস্ক ভাবেই চোখ পরে যে ভদ্রলোক তাকে পড়ে যাওয়ার থেকে বাঁচিয়েছিলেন তার দিকে ।
---সৌগত তুমি ?
সৌগতও এতোক্ষন পরে রেখাকে খেয়াল করে ।
----অনেকদিন পর তোমার সাথে দেখা হোল !
----বার বছর , একযুগ পর ।
----কেমন আছ ? সেই আগের মতই দেখতে আছ , কোন পরিবর্তন হয়নি । বয়স একটুও বাড়েনি ,,,,
----ওসব কথা ছাড়ো । আছি ,ভালোই আছি । তুমি কেমন আছ ? মাসিমা ,মেশোমশাই ,তোমার বৌ ,বাচ্চা আর দেবী ? দেবী কেমন আছে ? নিশ্চয় ওর বিয়ে হয়ে গেছে ? কেমন আছে ও এখন ? ওর শ্বশুরবাড়ি কোথায় ?
----আরে দাঁড়াও ,দাঁড়াও ;এতো প্রশ্নের একবারে উত্তর দেবো কি করে ? এক একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে পরের প্রশ্নটাতো ভুলে যাবো । মা ভালো আছেন ,বাবা আজ দু'বছর হোল আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ।" তারপর হাসতে হাসতে বললো ,"বিয়ে করলে তো বৌ,বাচ্চা ? বিয়ের ফুলই তো ফুটলো না । আর দেবী ?"
কথা বলতে বলতে বৃষ্টিটা কমে আসলো । এক এক করে সকলে শেডের নীচ থেকে বাস ধরার জন্য বাইরে এসে দাঁড়ালো । সৌগত রেখাকে বলে , "চল ,সামনেই একটা কফিবার আছে ,ওখানে কফি খেতে খেতে কথা হবে ।"

বিস্ময়ভরা দৃষ্টিতে রেখা সৌগতর মুখের দিকে তাকালো !
----সে সময় আজ আর আমার হাতে নেই ।বাড়িতে দু'টি প্রাণী হা করে ঘড়ির কাটার দিকে তাকিয়ে বসে আছে কখন আমি বাড়ি ফিরবো ।একদিন তোমাকে দেওয়ার জন্য আমার হাতে প্রচুর সময় ছিলো ।সেদিন তোমাকে কফিহাউসে আসতে বলে সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও তিনঘন্টা অপেক্ষা করেছিলাম তোমার জন্য ।আমার সাথে দেখা করবার তোমার সময় সেদিন হয়নি । ভীষণ ভেঙ্গে পড়েছিলাম । সেই সময় জীবনটাকে মূল্যহীন মনে হত ! ভেসেই যাচ্ছিলাম । বাবা ,মা জোর করে বিয়ে দিয়ে দিলেন । নিলয় জীবনে না আসলে বুঝতেই পারতামনা ভালবাসার প্রকৃত মর্ম ।কেনো ,কিসের জন্য তুমি আমার জীবন থেকে হারিয়ে গেছিলে জানিনা, আজ আর জানারও কোন ইচ্ছা নেই ।শুধু এটুকুই জানি নিলয় ছাড়া আর কাউকে একান্তে সময় দেওয়ার মত সময় আমার হাতে নেই । আমি আজ সুখী ,খুব সুখী । ওই যে আমার বাস এসে গেছে ।আমি আসি । ভালো থেকো তুমি ।"
রেখা দৌড়ে যেয়ে বাসে উঠলো ।সৌগত সেদিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের মনেই বললো ,"সেদিন কেনো আসতে পারিনি তা যদি জানতে নিজেই কেঁদে আকুল হতে । তারথেকে এই ভালো হোল -আমার নামটা চিরদিনের মত তোমার মন থেকে মুছে ফেলতে পেরেছো ।আমায় ঠক ,জোচ্চর ,প্রতারক ভাবতে পেরেছো । তুমিও খুব খুব ভালো থেকো ।"

সৌগত একাই যেয়ে কফিবারে বসে কফি খেতে খেতে ফিরে যায় বার বছর আগের দিনগুলিতে  --
সেদিন সৌগত কফিহাউজে যাবে বলে তৈরী হচ্ছে ;হঠাৎ লান্ডলাইনে একটা ফোনে জীবনের সব স্বপ্ন হঠাৎ আসা কালবৈশাখীর মত সবকিছু ভেঙ্গে চুরে তচনচ করে দিলো ।একমাত্র আদরের ছোট বোন দেবীকা কলেজ থেকে ফেরার পথে কিছু সমাজ বিরোধী তাকে তুলে নিয়ে যায় ।সমবয়সী অনেক বন্ধুদের সাথে সেও ফিরছিলো ।বন্ধুরা বাঁধা দিতে গেলে সমাজ বিরোধীরা ভোজালী বের করে তাদের দিকে তেড়ে আসে ।সকলেই ভয়ে জড়সড় হয়ে যায় । সমাজ বিরোধীরা দেবীকে নিয়ে চলে যাওয়ার পর ফোন করে তারা দেবীর বাড়িতে খবর দেয় ।সঙ্গে সঙ্গেই সৌগত দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় ।থানা ,পুলিশ সারারাত ছুটাছুটি দেবীর সন্ধান সেদিন আর পাওয়া যায়না ।রেখার কথা ভাববার সময় তখন সৌগতর নেই । কাক ডাকা ভোরে যখন সৌগত বাড়ির অভিমুখে রওনা দিয়েছে ঠিক তখনই পুলিশের একটা ভ্যান ঘ্যাচ করে সৌগতর সামনে এসে দাঁড়ায় ।পুলিশ অফিসার গাড়ি থেকে নেমে সৌগতকে বলেন ,"এখান থেকে কিছুটা দূরে রেললাইনের উপরে আঠার ,উনিশ বছরের একটি মেয়ের লাশ পাওয়া গেছে ।মর্গে যেয়ে আপনাকে বডি শনাক্ত করতে হবে ।" সৌগত নিজের মাথাটা ধরে রাস্তাতেই বসে পড়ে হাউ ,হাউ করে কাঁদতে লাগে ।বয়স্ক এক পুলিশ অফিসার তার হাত ধরে উঠিয়ে গাড়িতে বসিয়ে দেন ।

লাশ শনাক্তকরণ ,দাহ ,শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান সব মিটে যাওয়ার পর চিরশান্ত সৌগত অন্য মূর্তি ধারণ করে ।যে ভাবেই হোক বোনের প্রতি এই নারকীয় হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ নিতেই হবে ।থানা ,পুলিশের দরজায় ,দরজায় ঘুরে এক বছরের মধ্যেও কোন সুরাহা সে করতে পারেনা ।সব অপরাধী অধরাই থেকে যায় ।কিনতু এই একবছরে সে এটুকু বুঝতে পারে ধর্ষণকারী বা খুনীরা রাজনৈতিক নেতাদের আত্মীয় আবার কেউ তাদের ছত্রছায়ায় পালিত গুন্ডা । সোজা আঙ্গুলে ঘি কিছুতেই উঠবেনা । কিনতু আইনের ছাত্র সৌগত আইনের বিরুদ্ধচারণও করতে চায়না ।

সৌগতর সাথে রেখার যখন প্রেম চলছে সৌগতর তখন উকালতির ফাইনাল ইয়ার ।এই এক বছরে তার পড়াশুনার খুব ক্ষতি হয় । শুরু করে সে দিনরাত এককরে পড়াশুনা করতে । উকালতি পাশ করে সে নামজাদা উকিল অমরেশ রায় চৌধুরীর জুনিয়র হিসাবে কাজ শুরু করে । কথায় কথায় সে অমরেশবাবুকে তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য তার বোনের ধর্ষণকারী ও খুনিদের শাস্তি দেওয়ার কথা জানায় । অমরেশবাবু সৌগতকে খুব স্নেহ করতেন । তিনি তাকে কথা দেন এরজন্য  সর্বরকম সাহায্য করতে তিনি প্রস্তুত ।

নূতন করে আবার কেস ফাইল করা হয় । ফোনে হুমকি দেওয়া ,ভয় দেখানো -অমরেশবাবু ও সৌগতর উপর চলতে থাকে ।কিনতু জাদরেল উকিল অমরেশবাবু কিছুতেই দমে যাওয়ার পাত্র নন ।তার সাথও প্রশাসনিক উপর মহলের উঠাবসা ।স্বাক্ষ্য,সাবুদ প্রমাণসহ তিনজন ধরা পরে । বাকী একজন ওই ঘটনার দু'বছরের  মাথায় মদ্যপ অবস্থায় বাইক এ্যাকসিডেন্টে মারা যায় । এই তিনজনের যাব্বজীবন কারাদণ্ড হয় ।

সৌগত তার বোনের মৃত্যুর দশ বছরের মাথায় যেয়ে সুবিচার পায় ।এরমধ্যে তার যে রেখার কথা মনে পড়েনি তা  নয় ।  কিনতু ইচ্ছা করেই কোন যোগাযোগ রাখেনি । প্রাণপ্রিয় ছোট্ট বোনটির মৃত্যুর প্রতিশোধ নেয়াটাই তার জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়ে দাঁড়ায় ।তাই নিজের হাতেই সে তার ভালবাসাকে গলাটিপে হত্যা করে ।কারণ ভালবাসায় আবদ্ধ হতে গেলে পিছুটান থাকবে আর এই পিছুটানই তাকে লক্ষ্যভ্রষ্ট করবে ।

বারবছর ধরে সে রেখার কোন খোঁজ করেনি । কারণ সে বুঝতে পেরেছিল বছর একটি মেয়ের পক্ষে কারও অপেক্ষায় বসে থাকা কিছুতেই সম্ভব নয় ।রেখা যে তাকে ভুল বুঝেছে এবং তাকে যে কোনদিন ক্ষমা করতে পারবেনা এই ব্যপারেও সে নিশ্চিত ছিলো ।

আজ যখন তার রেখার সাথে দেখা হোল ,সৌগত ভেবেছিলো সব শোনার পর রেখা তার অসহায়তা বুঝতে পারবে -পারবে তাকে ক্ষমা করে দিতে । কিনতু রেখা তো তাকে কোন সুযোগই দিলোনা !

@নন্দা    22-7-17

তোমারো ভিখারি
- মোহাম্মদ রাইয়ান

চাহিয়া দেখিয়ো তোমারো দুয়ারে
কেহ আছে দেখো দাঁড়িয়া,
তাকিয়া দেখিয়ো তোমার নয়ন ভরিয়া
তোমারো সে প্রেম ভিখারিকে ।

অন্তরাল করিয়ো না তোমারো
ভিখারির আবছাময় কাঁদোকাঁদো আঁখিখানা,
তোমারো ছোঁয়ায় অমর করিয়া দিয়ো
তোমারো প্রেম ভিখারীর সুখ ।

চাহি নাকো ভরি ভরি ধনদৌলত
চাহি নাকো অভিনব বিরহের সুর
ওহে প্রিয়সী আলিঙ্গন করিয়ো মোরে
তোমারো চরণও ধুলোয় ।

অরণিকা
- আবির সাহানা

বুক জুড়ে মেঘ জমেছে অরণিকার ।
আজ দু-তিনটে মাস অরণ্যকে দূরে রেখে
দহন জ্বালায় পুড়েছে সবার অলক্ষ্যে ।
সেই যেদিন লুকিয়ে বাড়ি ফেরার পথে
একসাথে ভেজার ইচ্ছেটা সত্যি হয়েছিল,
ভেজা বুকেও কিসের আগুন নেভাতে
অঝোর ধারায় বৃষ্টিতে নয়,
অরণ্যের বুকেই সঁপেছিল নিজেকে ;
প্রশান্তির নিবিড়তায় মনের যত মেঘ
ঝরেছিল সেদিন ভালোবাসার ধারায় ।
এতো গুলো মুহূর্ত অরণ্যকে আড়াল রেখে
আজও সঘন মেঘ জমেছে
অরণিকার মন-আকাশে--
বাদল ঘন সাঁঝবেলাতে ।
অনেক কথা বলতে গিয়েও হয়নি বলা,
ইচ্ছে-খুশির মুহূর্তকে চাইতে গিয়েও চুপ থেকেছে ।
বাইরে হঠাৎ বৃষ্টি নামে ;
অরণিকার বুকের জমে থাকা মেঘ
ঝরে পড়ে বৃষ্টি সাথে কান্না হয়ে ।
অস্থিরতায় রুদ্ধ শ্বাসে অরণ্যের শরীর জুড়ে
শোণিত-স্রোতের উথাল পাথাল ;
ভিজতে চেয়ে বাইরে যাওয়া নিষেধ ভেঙে ।
অরণিকার প্রতিটা কষ্টের সাক্ষী
তার অশ্রুতে অরণ্যের ভেজা বুক ।
আজও তাই দৃশ্যমান দূরত্বেও দু'হাত মেলে
দু'চোখ বুজে অরণ্যের ভিজে যাওয়া--
বেদন ভরা অরণিকার কান্না অনুভবে ।।

সেই মেয়েটি
- মো: তারেক আনোয়ার কিরন সিদ্দিক

সেই মেয়েটি প্রথম মনে দিয়েছিলো দোলা
হাজারও চেস্টা হয়েছিলো বৃথা যায়নি তারে ভোলা
সেই মেয়েটি ছিলনা চঞ্চল তবু তার দৃষ্টির ডাকে সারা দিলো মন
ইচ্ছে করে তার মুগ্ধতায় হারিয়ে ফেলি নিজের এই জীবন।

সেই মেয়েটির ভালবাসার পরশে মাখা স্বপ্নে থাকি আজীবন
মনের ঘরে রং তুলি দিয়ে তারই ছবি আকি সারাক্ষন
সেই মেয়েটি ঘন কুয়াশায় স্বর্ণ সজ্জিত উদয়ীত সূর্যের মতো
কি করে বলি তারে আমি ভালবাসি কতো?

সেই মেয়েটি মেঘলা দিনে শুনা রুপকথার পরীর মতন
তার তুলনায় তুচ্ছ আছে যতো হীরে মুক্তা মানিক রতন
সেই মেয়েটি যেন বাগানে ফুটে থাকা লাল গোলাপ
আমার জীবনে সে যেন আধার কাটা সুপ্রভাত।

সেই মেয়েটি গাছের সাথে জোড়ীয়ে থাকা লতার মতো
ভালবাসত সে আমায় যদি আমারই মতো
সেই মেয়েটি নিজেরই অজান্তে মন কে আমার রাঙিয়েছে
সে থাক যতো চুপ মন তার প্রেমের আমন্ত্রন
জানিয়েছে

মাশুল
- মো: তারেক আনোয়ার কিরন সিদ্দিক

আমি নিজের চোখের জলে ভিজে গেছি
অনেক কেঁদেছি তাই একা থাকতে শিখে গেছি
রাতের একাকিত্তকে নিজের স্বাধিনতা মনে করি
ছুটবই কেন পাবনা যখন অপারের তরী
ছুটেছি অনেক মরিচিকার পেছনে পেয়ে যাব বলে
এসেছে অনেক শিশির আমি তোমার বলে
খেলেছে সবাই মনের সাথে ভিন্ন ভিন্ন ছলে
বদলে দিয়ে বাদ্ধ করেছে থাকতে অমানুসের দলে
আমিতো চেয়েছিলাম ভালবাসার রঙ এ জীবন রাংতে
জানা ছিলনা সুখ পায় সবাই গরিবের মন ভাংতে
ভাঙা মনকে বলি দেখিস না তুই সপ্ন আর
জড়া দেই যত ভাঙে মন ততো যে আমার
চাইনা আমি দিতে মনকে জড়া আর
কারণ তো জানিনা অকারনে মন ভাংগার
কি কারণে হলাম আমি সবারি খেলার পুতুল
কি ভুলে দিচ্ছি আমি এতো যন্ত্রণা ভরা মাশুল

রান ওভার
- অভিষেক ঘোষ

চকোলেট চুমুর ভিতর পুড়ছিল
অাঠালো লালা
নৈঋত কোণে হাল্কাভাবে প্রকটিত হওয়া সন্দেহের ফেনায় পুড়ছি অামি।
বৃষ্টির ক্রিস্টাল ফোঁটায় ভিজছিল
সিংহদুয়ারে ঝুলানো বয়স্ক তালা
বেতাল চাকার মাতাল সংঘর্ষে রান ওভার হয়ে গেল
পথের শেষ প্রান্তে বাটি হাতে বসে থাকা
বিকলাঙ্গ কিশোরের শরীরটা।।

কালো নারীর পণ
– শীবু শীল শুভ্র
কাননে সারি সারি পাখির মেলা
সবাই করছে কতো কলরব!
তোমার মাঝেই কিছুটা স্বস্তি
নিলীমা এ যে নিয়তির খেলা।

কালো তুমি ছিলে ভালো
আমার-ই নয়নের মণি!
দেহের কালোতে তুমি মৃণ্ময়ী
জ্বালিয়ে দিয়েছিলে নিজ সংসারের আলো।

কালো নারীর শোভা বুঝে কয় জনা
কালো বলে নর করিও না অবহেলা!
নিলীমাকে দেখিয়া পাত্র বাড়ায় পণের টাকা
পণ ছাড়া কালো নারীকে, কে করিবে বিয়া?

পাত্র মশাই করিবে ঠিক বিয়া
যদি না বাড়ে পণের টাকা!
পাত্রের বাবা পাত্রীর বাবাকে আড়ালে ডাকিয়া
৫ভরি স্বর্নে নগদ টাকায় চলে রফাদফা।

নিলীমার বাবা নত স্বরে
বেয়াই মশাই – ৩ভরি স্বর্ন দিবো অকাতরে।
পাত্রের বাবা ছেলেকে করাবে, সুন্দরী নারীর সাথে বিয়া
কালো নারীর পণ, যদি না দিতে পারো দিয়া?

কণ্যার পিতা না পায় ভাবিয়া
অবশেষে বলে, বেয়াই মশাই সব দিব বুঝাইয়া!
পাত্রের বাবার অট্টহাসি কে দেখিবে
কালো মেয়ে দায় নাকি সকল পরিবারের।

বি.দ্র:- [ কালো মেয়ে বর্তমান সমাজে কণ্যার বাবার দায়,, এই রকম চিন্তা আমাদের পরিবর্তন করতে হবে। ]

পত্রমোচন
- অভিষেক ঘোষ

পুরানো পোশাকের গন্ধ নিয়ে,
স্মৃতি অাঁটা বোতাম বন্দী জীবন
একলা হেঁটে বেড়ায় সন্দেহের অলিগলি।

সন্ধ্যের কুয়াশা-মাখা চোখ দেখে
মুমূর্ষু বৃক্ষের পত্রমোচন...
ধূলিধূসরিত ট্রাংকে নামে ভাদুরে অমাবস্যা।

বিষপাতা পোড়ার গন্ধে ম ম করে
কামরাঙা রঙের অাকাশের ক্রোড়।।

কৃষক আমি
- মো:তারেক আনোয়ার কিরন সিদ্দিক

আমি গরীব বলে নেই কোন লাজ,
কৃষি কাজ করি বলে সকলে ভাত পায় আজ।
রোদ বৃষ্টি ঝড় নিয়ে আমি ভাবি না,
আমারও ঘর আছে হয়তো বেশী দামী না।
সুখ পাই ফসল ফলায় সবারি জন্য
কৃষক বিহনে বল কে ফলাইতো অন্ন?
দামী গাড়িতে ঘুরো তোমরা আমাদের কর হীন
পাইবা কেমনে বাচতে বল ? আমাদের পরিশ্রম বিহীন।
আমাদের মতো পরিশ্রম তোমরাও কর না
আমিও মানুষ তুমিও মানুষ কেউতো বড় না।
অযথাই কর তোমরা প্রাসাদের বড়াই,
প্রাসাদ কি, আমরা খরাতেও ফসল ফলাই।
আমরাও পারি অনেক দামী প্রাসাদ বানাতে
তোমরা কি জানো কতো কষ্ট হয় বীজ কে চাল বানাতে?
আমাদের স্বপ্ন সফল হয় বীজ যখন ভোরে যায় ধানে,
গরীব চাষা বলে ডাক দেয় সকলে প্রতিদানে।
সামান্য টুকু জ্ঞান যদি থাকতো তোমাদের
মাথার মুকুট বলে ডাকতে গো আমাদের।
তোমাদের সাথে বড় হওয়ার লড়াই করতে,
চাইনা আমরা কোন প্রকার বড়াই করতে।
এসো না মিলে মিশে থাকি পরস্পর ভাই,
তোমাদের মুখে অন্ন দিয়েই আমরা যে সুখ পাই।

ডুব
- মোশ্ রাফি মুকুল

তুমি ডুবতে বললে আমি ডুববোনা তাতো নয়-

তোমার গ্রহন শেষে সে রাতে ঠিক কতোটুকু ডুবেছিলাম বলতে পারবোনা।

তুমি ডুবতে বললে অতলে ভূতলে ডুবে যায় সমুদ্ররাও-
হাত ফসকে পড়ে যায় হন্তারকের তরবারি,
স্বেচ্ছায় ধরা দেয় শতবর্ষী ফেরারি।

তুমি ডুবতে বলবে আর আমি ডুববোনা তা কি হয়?

প্রিয়দর্শিনী তোমার ইশারায়
নদী ডোবে চাঁদ ডোবে-ডোবে ভূল,
তোমার বেগুনী রশ্মিতে পোড়ে সব সুপুরুষ কুপুরুষ গোটা পৌরুষকুল।

তুমি ডুবতে বলবে আর আমি ডুববোনা সে কি হয়!

কাতর শীতনিদ্রায় সৌখিন ডাকটিকিট
- মোশ্ রাফি মুকুল

ঔৎসুক্য থাকাটা বেশ ভালো,
যুদ্ধে যাবার আগে সেনাপতির অনুগত থাকতে হয়।
যেমন অজানা ঔৎসুক্যে গোঁধুলীর ঠোঁটে অরেঞ্জ অন্ধকার নেমে আসে প্রতিটা সন্ধ্যাকালে-
তারপর আবহমানকাল-
তার বক্ষদেশ খুলে দিলে ঋতু পরিক্রমায় তুমি আমি চলে যাবো কাতর শীতনিদ্রায়।
এরপর মিরিঞ্জার সিড়ি ভেঙে ভূলম্বভাবে আমরা উঠে যাবো সুদীর্ঘকালের ওয়াচ টাওয়ারে।দেখবো তারে -সমুদ্ররে কতোটা প্রেম হয়েছিলো উদগরিত মন্থনকালে।
প্রীতিভাজনীয়াসু,
মোড়ের দোকান থেকে কিনে আনো আরো একটি সল্পবসনা ইচ্ছে ঘুড়ি,তাকে উড়িয়ে দাও-
স্থান কাল পাত্রভেদে যথাযথ প্রাপকের কাছে,
লক্ষ্যভেদের তীর ঠিক থাকলে তাতে বিধে যাবো আমি!
এরপর এসো আমরা সমবেত প্রার্থনা করি-
আমি পুরুষোত্তম হবো- নাকি হবো তোমার সৌখিন ডাকটিকিট?

একটি গোলাপ বাগান
- নীলোৎপল সিকদার

ভ্রমর গুন গুন গানে
গেয়ে যায় তার নিজের গান
গোলাপ কেন ঠোট লালে
পাঁপড়ি সাজায় ভ্রমের গানে
একটু আদর ছোয়া ভ্রমর যদি
রেখেই যায়
তবে গোলাপ কি অনুরাগের
সোহাগ দেবে না বুকে করে!!

ভ্রমর গোলাপের আবেগি মিলনে
বেলোয়ারী বাতাস দোলায় যদি দোদুলদুল
নান্দনিক ছবি কি আঁকবে না
প্রকৃতি মনের মাধুরী মিশিয়ে!
মুগ্ধ কি হবে না তুমি সে ছবির
জ্যোতির ঝলকে!!

তবে কেন তুমি হলে
একটি সম্পুর্ন গোলাপ বাগান
ফুটে থাকো দল মেলে
সুন্দর পাঁপড়ির হাসি হেসে
বুক মেলে ভ্রমের অপেক্ষায়!!
তোমার সুবাসে মিলনের আমন্ত্রন পেয়ে
প্রেম পাগল ভ্রমর তো বারবার
ছুটে আসবেই মধুপানে
ভ্রমরের আর দোষ কি বলো
ভালোবাসাই যার স্বভাব।

নীরব অভিমান
- শ্রীমন্ত সেন

অনিবার রক্ত ঝরে বুকের গভীরে
টুপ টাপ টুপ টাপ নিঃশব্দে,
কিন্তু সবার অজান্তে---
এই রক্তক্ষরণ একান্তই আমার।
এক সাথে শুরু পথ চলা,
হাতে হাত, বুকে প্রত্যয়,
ব্যত্যয় হবে না বিশ্বাসের।
পায়ে পায়ে পেরোই সব বাধা,
সব এক সাথে।
কিন্তু সে দিন ভাবতেও পারিনি
কাছেই ছিল মৈত্রীর চাবুক,
যা বিশ্বাসের উপরেরই
নেমে আসবে অতর্কিতে,
বাজ পাখির মত,
ছোঁ মেরে নিয়ে যাবে
আমার বিস্ফারিত দৃষ্টির সামনেই,
আমার যা কিছু পারস্পরিক বিশ্বাস,
আমার অর্জন---
আমার আমিকে দিয়ে যাবে
বিশ্বাসঘাতী আঘাত আচম্বিতে।
এটাই বোধ হয় পাওনা ছিল,
এটাই বোধ হয় স্বাভাবিক,
আজ আমি একান্তই একা,
একা করে দেওয়া একা,
নিতান্তই একা।
সময়ের সাথেই খেলি একা দোকা,
কারণ আমি জানি
সময়ই একদিন সময়কে চেনাবে,
তার ভিতরে থাকা মানুষকেও,
সেদিন আর একা থাকব না।
সব পাওনা বুঝে নেব সেদিন।
সেদিন সবাইকে ডেকে হেঁকে বলতে পারব,
‘আমি ছিলাম, আমি আছি,
আমি থাকব,
অবাঞ্ছিত নই,
অগ্রাহ্য করার মত কেউ নই,
আমি যে তাঁরই আত্মার আত্মীয়,
অমৃতসন্তান।
মনে রেখো---
আমাকে আঘাত মানে তাঁকেই আঘাত,
আর আমিও মনে রাখব—
তোমাদেরকে আঘাত মানে
তাঁর চোখে জল,
কারণ আমরা সবাই তাঁরই সন্তান,
একই আত্মার আত্মীয়।

আমি আবার এসেছি ফিরে
- নন্দ দুলাল রায়

আমি আবার এসেছি ফিরে
সুন্দর মনোরম পৃথিবীর নীড়ে,
আমি এসেছি নির্মল হাসির ডালি
গল্প, গান, কবিতার ঝুঁড়ি নিয়ে।
আমি আবার এসেছি নিরভিমান
ফুলডোর প্রণয় বাঁধনে বাঁধতে,
আমি এসেছি তোমার দুয়ারে-
পূর্বের যতেক ভুল ক্ষমা চাইতে।
আমি আবার এসেছি চাইতে
পাই-বা, না পাই, তা দুঃখ নাই
তোমার গুণ গান মাধুর্য প্রশংসা
একান্ত গোপনে প্রেম বিলাই।
জানি, ভালোবাসবে না তুমি
আমার মর্মবেদনা সব নিষ্ফল,
অশ্রুসিক্ত নয়ন পানে চাইবে না
তবু স্মৃতিচিহ্ন বুকে এঁকে দিয়ে
তোমায় রাঙাবো নতুন বিশ্বাাসে।
আমি আবার এসেছি কাঁদতে
আমি চলে যাবো নীল আকাশে,
প্রজাপতির পাখায় ভর দিয়ে
স্বপ্ন বিলাবো তোমার সকাশে।
আমি আবার এসেছি ফিরে
তোমার সকল কান্না হরিতে,
নিভৃতে একা কষ্ট সইবো আমি
কাঁশফুল ভাঙন ধরা নদী তীরে।

দূর্গা
- স্বপন কুমার রায়

তোমার আসা আর যাওয়া
একটি বছর অপেক্ষা,
গিয়ে কিন্তু ভুলে যাবে না
এই মর্ত্যবাসীর খেলা |
পরেরবার আসবে যখন তুমি
হাভাতে অন্নপূর্ণা হয়ে,
বঙ্গবাসী রাখবে তোমায় বেঁধে
মা জননী রূপে |

আসবে না ,বেকারের বেশে
কোচবিহারে রিস্কা চালাতে,
দেখবো না ,বাসন মাজতে এসে
তোমায় আধপেটা ভাতে
টোটো পাড়ার চা শ্রমিকে, কিংবা
আসানসোলের কয়লা খাদানে,
আসবে তুমি ,আসবে ;
আমায় পেটপুড়ে খেতে দিতে |

থাকবে তুমি সিঁদুর খেলার
সিঁথির সিঁদুর হয়ে.
জব্বার মিঞার আমন ধানে
গোলা ভর্তি লক্ষ্মীতে,
সদ্যজাত মাতৃহারা শিশু তুমি
.. অপর মায়ের দুগ্ধটানে,
জাতধর্ম ভুলে গেলে, থাকবে
বাঙালীর হৃদয়ের আসনে;
আসবে তুমি ---------- !
থাকবে তুমি ---------- !
আমার মা যে তুমি !!!

আকুতি
- রণজিৎ কুমার মুখোপাধ্যায়

তোমাকে আর তুমি বলবো না ,
আপনি আজ্ঞে করে কথা বলবো এখন
ভেবেছিলাম তুমি আমার হৃদয় জুড়ে আছো ,
এখন দেখছি তাও নয় , এটা আমার মনের ভ্রম।
নইলে রাত নেই দিন নেই আমার বুকের
ভালোবাসাকে নিঙড়ে দিতে যাই কখনো?
তুমি একবার ভাবলে না আমার কথা , তুমি
একবার চিন্তা করলে না তোমা' ছাড়া আমি কত
একাকীত্ব বোধ করি ; আর কতবার বলবো
তুমি আমার জীবনে মরণে জড়িয়ে আছো।
আচ্ছা বলতো? কী এমন সুখে আছো সেখানে?
তোমার স্বামীকে তো আমি চিনি ,সেই রাতদিন
গাঁজা ভাঙ সিদ্ধি খেয়ে বুঁদ হয়ে ঝিমোয় বেল তলায় ; কত সাধ্য সাধনা করে তুমি তা'র সঙ্গ
লাভ কর ,সকল সময় সে তোমাকে সঙ্গ করে না দান, অথচ আমি তোমাকে পাবার জন্য ব্যাকুল ।
কেন ছলনা কর ছলনাময়ী ?একবারও কী
কাছে এসে বুকে টেনে নিয়েআমার মনেরপিপাসা
মেটাবে না?আর যে বেলা নেই আমার ।

।।রচনাকাল।।
১৪ আশ্বিন ১৪২৪
ইং:-১ অক্টোবর ২০১৭
রবিবার।

আমার সময় শ্রীদুর্গাময় , তোমার ?
- স্বপন সমাদ্দার
.
আমার সময় শ্রীদুর্গাময় , তোমার শ্রীহীন , বর্ণহীন ;
আমার কাটছে পরমানন্দে , তোমার কাটছে কাজবিহীন !
আমার বাড়িতে মহাভোজ , আর তোমার হাঁড়িতে চালের টান ;
আমার মা পরে দামি বালুচরী , তোমার মা শত-ছিন্ন থান !
আমার মা দেবে পুষ্পাঞ্জলি , তোমার মা ফেলে চোখের জল ;
আমার মা মহা - পুণ্যবতী কি ? তোমার মা 'র কী পাপের ফল ?
.
পাপ - পুণ্যের গেরোয় দুর্গা সবাইকে বেঁধে রেখেছে আজ ,
মহোৎসবের আলোয় কি ঢাকা যায় -- কে নিঃস্ব , কে মহারাজ ?
আমি মহারাজ অন্তরে আজ ; " ভাঁড়ে মা ভবানী !" -- এই খবর
জানে মা দুর্গা ? কী আছে আমার -- স্থাবর কত , কী অস্থাবর ?
তবু তুমি এলে , সব কিছু ভুলে -- ঝাঁপাই খুশির সমুদ্রে মা --
এ যদি আমার অপরাধ , তবে নিজগুণে করে দিও ক্ষমা !
.
আর যে আমার পড়শী , নিঃস্ব ; সে পাবে তোমার মার্জনা কি ?
যার ঘরে আজ-ও গভীর আঁধার , আলো দেয় গুটিকয় জোনাকি !
মজুতদার কে -- তা যদি জানতে , বিলিয়ে কি দিতে নিঃস্বদের ?
আসল মা নও , মাতৃ - রূপিণী ; -- তোমাকে আমরা চিনেছি ঢের !
আলো - তমসার এই তামাশা মা নীরবে দেখছি অনেকদিন ,
আমার সময় শ্রীদুর্গাময় , পড়শী - কে ফিরে দাও সুদিন !

অভ্রংলিহ
- শ্রীমন্ত সেন

বড় আর হলাম কই!
শুধু বয়সে বাড়া, আকারে বাড়া,
প্রকারে বাড়াই যদি বড় হওয়া হত,
তবে কত কিছুই তো কত বড়—
অকারণে, অযথা, বিরক্তিকরভাবে।
কথাতেই আছে গাছ পাথরের বয়সের
ইয়ত্তা নেই। অমন বড় হওয়াই কি
কাম্য ছিল!
অথচ চারিদিকে কত ছোটমি, নীচতা,
হীনতা, দীনতার মাঝে বড় বড় আকার
অবয়বের কদর্য প্রতিযোগিতা, সেই যে
কবে পড়া সেই অমোঘ বাণী—
‘বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে’।
কী অর্থে সেটা ছিল আর কী অর্থে
সেটা পরিণত। মানুষের এই পরিণতি
দেখে মানবতাই হীনমন্যতায় ভোগে।
কবে যে প্রকৃত বড় হব! অতিমানবীয়
প্রকৃতিকে আর ভয় পাব না,
মননে ঋদ্ধ হব, শুদ্ধ হব,
অকারণ অসূয়ায় আর ভুগব না,
আমার গর্ব পড়শির ঈর্ষা বা
পড়শির গর্ব আমার ঈর্ষা হবে না,
আমার গর্ব পড়শির ঈর্ষা হলেও
পড়শির গর্ব আমারও গর্ব হবে,
পড়শির সুখ আমার সুখ, পড়শির দুঃখ
আমার দুঃখ হবে। অসহায় হাতে
হাত রাখতে শরীর ও মন কোনটাই
ঘিনঘিন করবে না, অসহায় ক্ষতে
সমব্যথার প্রলেপ দিতে এতটুকু
কার্পণ্য বোধ হবে না।
প্রকৃতিকে আত্মপ্রকৃতি বলে ভাবতে
গর্ব হবে, নিজেকে সব কিছু নীচতা হীনতার
ঊর্ধ্বে মানুষ বলে মনে করতে আত্মতৃপ্তি
হবে, ‘সবার উপরে মানুষ সত্য’কে চিরসত্য
আর নিজেকে ও সবাকে অমৃতের অংশভাক্‌ বলে
ভাবতে আনন্দে বুকটা টনটন করে উঠবে,
তবেই না প্রকৃত বড় হয়ে উঠব,
গাছ পাথরকে ছাড়িয়ে, তুচ্ছতা হীনতাকে ছাপিয়ে
আমার তথা সবার মাথা অভ্রংলিহ হয়ে উঠবে মহিমায়--
সে দিনের অপেক্ষাতে আছি
বামন উঞ্ছবৃত্তির প্রেক্ষাপটে।

স্বপ্নে তারে দেখি
- মঞ্জুর এলাহী

নিজের মতন করে
আমি খুঁজে ফিরি তাকে,
যে একটু আধটু বেশি
ভালবাসবে আমাকে।
বলব মনের কথা
সে শুনবে মন দিয়ে,
সে হবে খুব মায়াবী
তাকে রাখব এ হৃদয়ে।
চাওয়া থাকবে অল্প
কিন্তু অনেক দামী,
সে দুষ্টমিতেও সেরা
হবে একটু অভিমানি।
তার সাদামাটা চলা
সে একটু অগোছালো,
আমি তাকে শুধু খুঁজি
তাকেই বাসবো ভালো।
এই বুকে মাথা রেখে
তার কেটে যাবে রাত,
আমার চোখের আলো
তাকে দেখাবে প্রভাত।
মনের আঙ্গিনায় আমি
তারই ছবি আঁকি,
সে হবে শুধু আমার
আমি স্বপ্নে তারে দেখি।

অপরাধবোধ
- বিকাশ দাস

তুমি বলো
শরীর বয়সের বশে থাকলে
অপরাধ ।
অশুচির গন্ধ গায়ে মাখলে
অপরাধ ।
মাথার উপর ভগবান পায়ের নীচে শয়তান
মুখের আদল বদলে খুঁজতে হবে অবসান ।
তুমি বলো
ফিরে যাও ঘরে দুহাতে রেখো ধরে
দুঃখের দিন সুখের দিন ঘরের কোটর
খোলামেলা চাতাল ।
সূর্যের ভোর আকাশের রোদের চাদর
ফুলতোলা সকাল ।
তুমি বলো
দেনার ভার দুহাতে থাকলে
অপরাধ ।
কর্তব্য দায় সারা রাখলে
অপরাধ ।
তুমি বলো
ফিরে যাও ঘরে দুহাতে রেখো ধরে
বারোমাস তেরো পার্বণ আদর আপ্যায়ন
সম্প্রীতির দরবার ।
দুই প্রান্তের ঘর উঠোন পৃথিবীর নিকেতন
একান্নবর্তী সংসার ।

তুমি আমার প্রাণ
- নন্দ দুলাল রায়

তুমি ফুলের চেয়ে পবিত্র
তুমি থাকো তবু যত্রতত্র।
তুমি নদীর চেয়ে খরস্রোতা,
তুমি উত্তম সর্বশ্রোতা।
তুমি চাঁদের চেয়ে জোছনা,
তুমি আয়নার চেয়ে স্বচ্ছ।
তুমি তটিনীর চেয়ে প্রবাহমান,
তুমি ঝর্নার চেয়ে বেগবান।
তুমি সৌদামিনীর চেয়ে আগুয়ান,
তুমি কালের চেয়ে ধাবমান।
তুমি প্রীতির চেয়ে নীতি
তুমি বাতাসের চেয়ে গতি।
তুমি বরফের চেয়ে হিম
তুমি অনলের চেয়ে উষ্ণ।
তুমি সাগরের চেয়ে উত্তাল
তুমি ঝড়ের চেয়ে ভয়াল।
তুমি হীরার চেয়ে দামী,
তুমি সুনামের চেয়ে নামী।
তুমি অক্ষয় তুলনাহীন।
তুমি হৃদয়ে বাজাও বীণ।
তুমি সর্বত্র সর্বশ্রেষ্ঠ,
তুমি সর্বত্র অধিষ্ঠিত।
তুমি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গোপন,
তুমি বেঁচে থাকা স্বপন।
তুমি সর্বত্রই বিরাজমান,
তুমি আমার পরমাত্মা প্রাণ।
তোমার তুলনা শুধুই যে তুমি,
অজ্ঞানী আমি কতটুকু তা জানি।

০২/১০/১৭

সেই সব নতজানু সম্পর্কগুলি
- শ্রীমন্ত সেন

ঘরের মধ্যে যেমন ঘর থাকে আর
মনের মধ্যে মন, তেমনই
সম্পর্কের মধ্যেও থাকে সম্পর্ক,
সম্পর্কের মধ্যে আলো-আঁধারী।

যতই কেউ হাত বাড়িয়ে দেয়
সময়ের কাছে, কিছু কিছু গুপ্ত কথা থাকেই।
আর থাকে কিছু কিছু কৃপণতা যা
বরাদ্দ উষ্ণতা ও বিশ্বাসের কিছুটা
কাটছাঁট করবেই—অন্তত বেশ কিছু ক্ষেত্রে
করেই থাকে।

ফলত দৃশ্যত যা দেখায় ও বোঝায়
তা ধ্রুবসত্যে পরিণতি পায় না,
অন্দর মহলে থাকে কুয়াশার দীর্ঘশ্বাস,
যা মানুষকে আবছা করে,
কখনও কখনও প্রায় লুপ্তই করে ফেলে।

তাই প্রতারিত সম্পর্কগুলি বিস্ফারিত বিস্ময়ে
তাকিয়ে থাকে অপলকে,
যেন বিশ্বাসই হতে চায় না--
এত কাছেই ছিল হাওয়ার চাবুক যা
বুক পেতে নিতে হল!
এত কাছে ছিল ঘাতকের দিনলিপি
যা ভাগ্যের কড়চায় সামিল করতে হল!

মুখে কেমন নির্লিপ্তি মেখেও অনায়াসে
বাড়িয়ে দেওয়া হাতে ছোঁওয়া যায় রক্তের ঘ্রাণ,
চাঁদে শোভা লাগা সত্ত্বেও
পেলবতা পাশবিকতা মেলে পাশাপাশি অনায়াসে,
আর থাকে আত্মতৃপ্তির গুপ্ত হাসি
যা ছুরিরই নামান্তর, ফালা ফালা করে
সরল জলের বুদ্বুদ।

শুধু নীল নীল কিছু সম্পর্ক নতজানু হয়
সময়ের কাছে—মরা মাছের মত চোখে
চেয়ে থাকে অনিবার সম্ভাবনার কিছু
সদয় প্রত্যাশায়,
যদি কাকতালীয় অন্য কিছু ঘটে
তো ঘটুক—এই তো সময়ের
ফসল তোলার সময়—
যদি এদিক ওদিক কিছু একটা সত্যিই হয়--
সেই প্রত্যাশায়।

কিন্তু সে আর হয় কই?
যা স্বাভাবিক মানে তথাকথিত স্বাভাবিক,
তাই হয়,
প্রত্যাশিত তথাকথিত অস্বাভাবাবিক মানে
প্রকৃত স্বাভাবিক কিছু মোটেই ঘটে না।
তাই মানুষ ছোট থেকে আরও ছোট হয়,
এত ছোট যে সত্যের আতচকাচে
প্রায় নজরেই আসে না, অথচ
মহার্ঘ মহান জীবন চলেই যায়,
বুকে অপূর্ণতার হাহাকার নিয়ে
সম্পর্কের অবিশ্বাস ও তঞ্চকতার
মধ্য দিয়ে।
“এই তো জীবন কালীদা’”।

তাং--০৩-১০-২০১৭

আবার এসো ফিরে
- নন্দ দুলাল রায়

যেদিন প্রথম হলো দেখা-পরিচয়,
হৃদয় কোণে দুরুদুরু নতুন শিহরণ,
সেদিন আকাশটাও ছিলো নির্মল,
মৃদুমন্দ বহে সেদিন স্নিগ্ধ সমীরণ।
সেদিন দু'জনার দু'জোড়া নয়নে
অজান্তে ব্যাকুল হলো মহামিলন,
আমি অগ্রসর হলাম মুগ্ধ শিহরনে,
লাটে উঠলো তোমার ফুল চয়ন।
তুমি মনের বাগিচায় ধরা দিলে
অপলক চাহনি বুক করে ধড়ফড়,
নিয়ে গেলে যা নেবার চেয়ে ছিলে
মাঝখানে তোমার সঙে বাঁধি ঘর।
হাসি আনন্দ খুশির কমতি নেই,
বুঝতে পারিনি সেদিন তুমি হবে পর
ফুল-ফল চাঁদের জোছনায় ঝলমল
যেদিকে দেখি সবখানে হাসি রাশি।
ভালোবাসার বন্ধন নিরবচ্ছিন্ন যত্ন-
ছিলো সুখপাখি সংসারে যুগল বন্দি,
এভাবে কেটে গেলো ত্রিশটি বসন্ত,
হঠাৎ উঠলো মাঝ দরিয়ায় ঝড়।
তবু বুকের ভেতর নিষ্ফল আর্তনাদ
তুমি আসবে আবার আমার ঘরে,
প্রথম নয়ন মিলন সন্ধিক্ষণ সম-
হবে আনন্দ সাড়া জাগানো শিহরণ।
রোজ তাই প্রতিক্ষায় আঁখির পাতা
তোমার আসা পথে খোলে রাখি,
এখনও আগের মতই ভালোবাসি,
যদি চাও তো ফিরে এসো প্রিয়তমা।
ফিরাবো না আজও স্মৃতি মনে পড়ে
হাজার, লক্ষ, কোটি বছর এ বুকে-
অবলীলায় গুপ্ত প্রণয় রাখবো ধরে,
যদি মন কাঁদে আবার এসো ফিরে।

০৩/১০/১৭

অহংকার
- দেবযানী গাঙ্গুলী

গনগনে আঁচে ভাত ফুটছে....
সুবাসিত বাষ্পে পেটের ক্ষিদের অনুভূতিটা
টানটান হয়ে ওঠে মালতির ।
"চালটার কী গন্ধ গো বৌদি!"--ঘর মুছতে মুছতে
চকচকে চোখে বলে ওঠে মেয়েটা ।
দ্বিগুণ চকচকে চোখে বাসবীর উত্তর -
"কত দাম জানিস? আটাত্তর টাকা কেজি ..."
পাশ দিয়ে মটমট করে ঘুরতে ঘুরতে
বৌদি আরো ক-ত কী বলে যায় --
কানে ঢোকে না অনাথ মেয়েটার ।
বুক ভরে টেনে নেয় ভাতের আঘ্রাণ,
চুঁইয়ে পড়া ঘামের সাথে মনে মনে মেখে নেয় ভাতসুখ ।
বাড়ি যাওয়ার আগে একটা তোবড়ানো বাটিতে
বৌদি খানিকটা ফ্যান এনে বলে -
"খেয়ে নে, নুন দিয়ে দিয়েছি ।"
শান্ত মেয়ে শান্ত গলায় বলে -
"পাড়ায় পুজো প্যান্ডেলে আজ খাওয়া দাওয়া ,
ভরপেট খেয়েই তো কাজে এলাম ।"

৩/১০/১৭

স্মৃতিহীনা
- মোঃ কামরুজ্জামান

বলতে পারো তুমি! বলতে পারো কি?
কেন সুুখ চাইলে দুঃখ-দুঃখ চাইলে সুখ!
বিস্মিত জীবন কেন অসহায় একাকী,
আশা-নিরাশায় ভরে বুক।।
ভাল চাইলে খারাপ, খারাপ হলেই ভাল-
কেন বারংবার প্রাণে-বিরহের সুর ঢাল-
কখন রোদ-কখনো বৃষ্টি, কেন বল-
আলো-ছায়ার মত উৎসুখ।।
জীবনে যত স্নেহ-প্রেম অজস্র-অযথা-
সবি মিছে-অপার্থিব প্রস্রবণ।
হাসির আকুলতায়-ব্যথার ব্যাকুলতা-
নিরন্তর ঝরে অশ্রু বরিষন।।
দিবা-নিশি বাঁশের বাঁশি-উন্মত্ততায়-
নিবিষ্ট যত ভয় সবি জয়-পরাজয়-
জীবনের সমস্ত প্রত্যাশা অসহায়-
বিস্তীর্ণ স্বপ্নের অতৃপ্ত মুখ।।
তবুও প্রাণে কেন আজ এত ভাবনা-
পাওয়া-না পাওয়ার সম্ভাষণ।
বলতে পারো কি তুমি! জানি পারবে না-
বাসনা সবি তৃষিত আলিঙ্গন।।
তুমি কখনো প্রকাশ্যে দেখবে না-
নিরেট অন্ধকারে বৃষ্টির দুরন্ত কান্না-
নির্মম সীমাহীন সে সুখ যে অজানা-
বিবর্ণ শুষ্ক মলিণ মুখ।।
যা আমি চাই, তুমিও যা চাও সর্বক্ষণ-
চাওয়া-পাওয়ারর এই মিথ্যা অাঁধারে।
না পাওয়ার বেদনায় ভরে মন-
অতৃপ্ত হাহাকারে।।
প্রমত্ত চিত্ত মুগ্ধ লালসায় স্তম্ভিত-
কুয়াশা মাখা যৌবন অন্তিম সুপ্ত-
স্নিগ্ধ "স্মৃতিহীনা" আজ দ্বিধান্বিত-
সম্পূর্ণ অতন্ত্র উন্মুখ।।

বৃষ্টিভেজা শরৎ
- পবিত্র দাস

অঝোর ধারায় ঝরছে বৃষ্টি
শরৎ গেছে ভিজে,
উমা বিনে মেনকা আজ
অশ্রু ঝরায় নিজে।
সিক্ত শিউলি বিষন্ন হায়
লুটায় ধুলোর 'পরে,
কাশের বনে বিমর্ষতা
কান্না উমার তরে।
ঘাসের ডগায় শিশির কোথা?
বৃষ্টি জলে ভরা!
কালো মেঘে চাঁদ ঢেকেছে
আঁধার ক'রে ধরা।
শরৎ হাওয়া থমকে গেছে
নেই তো হিমের পরশ,
যুগের চাকা উল্টো ঘোরে
তাই কি উল্টো বরষ!
সমাজটা গো এমন ভেজা
শুস্ক নয় সে মোটে,
দুরাচারে ঘর ভরেছে
কলঙ্ক যে জোটে।
আকাশ 'পরে সাদা মেঘের
ভাসবে কি গো ভেলা,
চাঁদের হাট আর পাবো কি গো
বসবে রঙের মেলা?
দুরাশা আর আশংকাতে
গুনছি যে দিন নিজে,
অনাচারের মেঘ জমেছে
শরৎ গেছে ভিজে।

মা ,তুমি তো আসছ !
- চিত্তরঞ্জন গিরি

মা -তুমি কি আসছ !শুধুকি বিষন্নতার সাথে ?
টুকরো টুকরো ঘামের কনা জেগে থাকে
বেদনার অশ্রুতে
সংগ্রামী চেতনা -ধিকি ধিকি দাউ দাউ ,সাঁতরে বেড়ায়
পল্লীতে পল্লীতে
কত উন্মুখ কত মুখ -পদস্খলন, ব্যার্থতার অসুখে
জানি না -এ কোন জন্মের অভিসম্পাতে !

শ্রাবণের ঘন মেঘ ,মুক্তি খোঁজে -কাশফুলে, টগর যূথিকায়
নীল দিগন্তে শুভ্র মেঘমালায়
সিংহের পিঠ চড়ে -আলোর উৎসব শুরু করে
মা তুমি-তো ,আসছ !
চিতার আগুনে অশ্রুমতির আঁচড়
দিগন্ত বিস্তৃত বালুকাবেলায়
তাদের কথাকি ভাবছ, মা ?

নিশ্চিন্ন ধানের জমি -উত্তাল অস্থির
ভোঁতা যত হাতিয়ার -খুঁজে ফেরে হরমোন
যা ছিল না অভিপ্রেত
নাবিক হওয়ার মন্ত্র- ভোলেনি সে এখনো
প্রতিক্ষায় প্রহর গোনে ,মৃতপ্রায় তারই
শস্যের ক্ষেত!

খবর তো , পেয়েছ মা
বানের জলে ভেসে গেছে -ভানু ডোমের ছেলে
ভোরের আশায়- কাল রাত্রির ঘূর্ণাবতে
নিভন্ত প্রদীপ শিখা ,আটকে গেছে
ভাঙা ঘরেরই চালে

শীতের দোলায় রাত্রি নাচে -ফাগুন অসহায়
দিগন্ত খোলা বিস্তৃতিময়- পথ ,পথকে খায়
বিভীষিকার অগ্নিগ্রাসী ক্ষুধায় ।

তুমি তো আসছ ,মা -তা ,জেনেই নদী উত্তাল হয় !
ইট ভাটাতে কালছোপ আর রক্তল্পতার রেশ
বীণার তার ছিঁড়ে যাওয়া -টুকু মিনু টিনার
হংসপাখায় -আছড়ে পড়ে ,আবেশ ।

তোমার ছোঁয়ায়, মা- পথ কি পাবেনা ,পথের মুক্তি ?
মজুরের ঘামে, কি- মেরুপ্রভা জাগবে না !
না-কি,ছেঁড়া কাঁথা ,শুকনো রুটি ,চিরকালই
বাজিয়ে যাবে -দশমী বিসর্জনের বাজনা !

2 -10- -2017

তারপর,তারপর ??
- রণজিৎ মাইতি

এতো ঘটা,এতো আয়োজন,সাজোসাজো রব,----
কত আশা,স্বপ্ন এই অবুঝ বুকে।
হয়তো নতুন কিছু হবে ,
কিছু না হলেও অশ্বডিম্ব কে আটকাতে পারে ?
মাতৃপক্ষে চোখ আটকে বাজির রোশনাইয়ে
উপরি সুবাস বেশবাসে,ঘেমো গন্ধ গেছে।
শেষে তর্জনীর কালি উবে যায় একদিন ।
স্মৃতি আর কতো দিন !
একদিন বিস্মরণের পথে----- ,
যেটুকু জেগে থাকে মহাকাল সজাগ সক্রিয়।
যদি বলি,কেন ইতিহাস ?
কে না জানে,কখনও দক্ষ কারিগরের হাতে সেও বিকৃত ।
শুধু ইনাম একটু ভারী,
পর্দার আড়ালে চলে অশ্বথামা হত,ইতি গজ নির্মাণ।
সবে চারটে দিনের খেলা ,আলোকচ্ছটা।
দশমী বিজয়া,প্রতিমা ভাসানের পর------
তারপর, তারপর ??--------

(30-09-2017)

জোছনা ঝলমল রাত
- নীলোৎপল সিকদার

তুমি চাঁদের বুক থেকে
নাক্ষত্রিক চোখে তাকালে
গৃহত্যাগী জোছনায়
ভেসে যায় আমার ভেজা মনের
সব জানালা
খুলে যায় রুপকথার কৌটায়
জমা থাকা সবগুলো আবেগি দরজা।

একবার তাকিয়ে দেখ
কেমন ঝিলিমিলি খেলে
তোমার জোছনা আলোয়
আমার হৃদয়ের সবুজ পাতা
কেমন গেয়ে ওঠে পরান পাখি
অবিরল ধারার মত বৃষ্টিগান।

আমি বুকের দুয়ার খুলে রেখেছি
যদি তুমি একবার অনুরাগের মুগ্ধ চোখে
ভুল করে হলেও তাকাও
তবে এ খোলা বুক ভরে যাবে
পরীর নুপুর ছন্দে তোমার জোছনা মেখে
আর সেই বাঁশি বাজিয়ে যাবে
যে বাঁশি বাঁজিয়েছিল প্রেমিক রুপাই
নকশী কাঁথার মাঠে মাঠে।

4/10/17

স্রোতস্বিনী
- দ্বীপ চরন বর্মন

মেঘলা শ্রাবণে পাগলা প্লাবনে
পাহাড়িনী মেয়ে এলো স্রোতস্বিনী,
পাগলিনী ক্ষেপেছে সবে ভেঙ্গেছে
রেগেছে যেন কাল সাপিনী।
বাংলার প্রান স্রোতস্বিনীর দান
মাছ গাছ পাকা ধান,
পাগলিনীর দান পেল বাঙ্গালিনী।
ঐ মেয়ে গতিশীলা চঞ্চলা
দুধে ভাতে ভরাইলো বাংলা,
ঢেউয়ে চলে সাগর পানে।

ফুটুক মনের কলি
- মঞ্জুর ই এলাহী

মেঘের ভাঁজে স্বপ্নগুলো
ছড়িয়ে দিলাম আজি
বৃষ্টি হয়ে ছড়ুক সবি
ফুটুক মনের কলি।।
দুঃখ যত ছিল মনে
পালিয়ে গেল বনে
মনটা এবার পাখি হলো
উড়ছে সে ডালে ডালে।।
হঠাৎ করে গান ধরেছে
ভাঙ্গা গলার কণ্ঠ
মনটা আজ ভাবছে সদা
পেয়েছে অনেক ছন্দ।।
ইচ্ছেরা আজ মেলল ডানা
সবুজ পাতার ভাঁজে
যা দেখি তা ভাল লাগে
অবুঝ দুটি চোখে।।

মায়াবতী
- বিজয় ম্রো

কিসের তরে এ ধরায়
ছলছল আঁখিপাণে,
অনন্ত তবু না হারায়
আশার দ্বীপ জ্বলে প্রাণে ।

দূরের ঐ বাঁশ বনে
কে বাজায় বাঁশি হায়!
মন টানে তব সনে
চাঁদের কিরণ লাগে গায়।

নিজ দুঃখ নিজে সয়
বুক ফাটে তবু রয়,
ইচ্ছের দ্বীপ জানে
যৌবন কি যে কয়।

নিশিতে রজনী সুধায়
কলঙ্কে কি আসে যায়!
ঘর ছাড়ি তর লাগি
প্রিয়তম বাঁশি বাজায়।

নিয়তি কারে কয়
শেখাইলা নাকো!
জাত পাত স্থান কাল
কিছুই মানে না গো।

কোকিলে গায় কুহু কুহু
ফাগুনে ফুলের লীলা,
মৌমাছির ছলনা জানি
মধু বিনে শুধুই হেলা।

প্রাণ মানে না তবু
কিসের টানে হায়!
বাইরের চরণ বাঁধা
ভেতর চরণ ছুটে যায়।

০৪/১০/২০১৭

সন্ধি-বিচ্ছেদ
- মোশ্ রাফি মুকুল

কি অদ্ভুত বৈরিতা!জলের পাটাতনে মাঝে মাঝে জ্বলে ওঠে প্রাগৈতিহাসিক আগুন।বিপরীত দিক হতে হেঁটে আসে প্রিয়বাদী রাত ও কোজাগরী চাঁদ।
ভৌগোলিক সংজ্ঞার সাথে ভালোবাসা শব্দটা শুধু বেমানান নয়-কিছুটা রূপকথার মতোই বানোয়াট।
দারুচিনির নিষিদ্ধ দ্বীপে এবার পরিযায়ী হবে পৃথিবীর সব মুকুট বিলাসী রাজহাঁস।আর আমাদের যৌবন চেয়ে চেয়ে দেখবে বিকল্প সন্ধি বিচ্ছেদ!আমাদের হাতের মুঠোয় অস্থির হবে কিছু অয়োময় অক্ষর।
নীলকন্যা সবুজ মেঘ হারানো তানপুরা-
কর্তা ও ক্রিয়ার সাথে দর কষে করে যায় গোলাপি নয়ত'বা ফিরোজা বিভেদ।
স্বর আর স্বরে, ব্যঞ্জনে ব্যঞ্জনে ঠিকই ডেকে আনে মধুর প্রলোভন,
অথচ বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কখনোই উৎসাহ দেখায়নি ক্ষমতা ও সিংহাসন!

০৪অক্টোবর, ২০১৭.

বিজয়ার শুভেচ্ছা
- স্বপন সমাদ্দার

মন আর ভালবাসা ছাড়া
কিছুইতো আমাদের নেই!
সেটুকুও যেন বেঁচে থাকে,
ছোটাছুটি তারই জন্যেই!!
মুছে ফেলে অতীতের দ্বিধা,
মনোক্লেদ, ভুল বোঝাবুঝি --
আসুন, একত্রে মিলেমিশে
সুন্দর ও ভালবাসা খুঁজি!!

সমাপন
- দেবযানী গাঙ্গুলী

উৎসব শেষ হলে প্রতিমাহীন মণ্ডপের মতো
ধূসর গোধূলি ....মনের কানাচে জমা
শরৎ শিশির ,অকারণ কথামেঘে মিশে যায় -
একাদশী চাঁদ ফেরে আলো মুছে দিয়ে ...
জমা খরচের লিপি খুলে বসি কেজো মন নিয়ে ।

উৎসব শেষ হলে মনে পড়ে
তোমার হাতে পাওয়া প্রথম ঝিনুক,
যত্ন করে মনে রাখা চালতে ফুলের শোভা --
কামিনীর গন্ধ মাখা ভোর ...হলুদ খামের
মাঝে লাজরঙা একমুঠো কথাডোর...

উৎসব মিশে গেলে প্রাত্যহিক জীবনকণায়---
আমি তার আলো খুঁজে আকাশপ্রদীপ জ্বালি
মনের সদরে,স্মৃতির সাগর সেঁচে
মুক্তোটা তুলে আনি পরম আদরে ।

আমাদের পত্রিকার লিংক পরিবর্তন করা হয়ছে, তাই সমস্ত কবি বন্ধুদের জানানো হচ্ছে যে আপনারা অনুগ্রহ করে আপনার “পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার” করুন !!!

“পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার” না করলে “লগইন” করতে সমস্যা হবে ।

আপনি “পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার” করতে পারেননি ? আমাদের ই-মেইল করে জানান, আপনার "রেজিস্টার" করা ইমেইল থেকে । আপনার নতুন "পাসওয়ার্ড" আপনার ইমেইলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে ।

আপনারা আমাদের "ই-মেইল আইডি"তেও লেখা পাঠাতে পারেন । Email : nabadibakar@gmail.com

যোগাযোগ : ৯০০৪৬২৫৫৩৪

[toggle title="এক নজরে...।" state="open"]

১ ) নবদিবাকর পত্রিকায় নতুন ইউজার হিসাবে "রেজিস্টার" করুন !!!
২ ) নবদিবাকর পত্রিকায় "লগইন" করুন !!!
৩ ) আপনার পাসওয়ার্ড ভুলে গেছেন ? অনুগ্রহ করে আপনার "পাসওয়ার্ড পুনরুদ্ধার" করুন !!!
৪ ) আপনার লেখা কবিতা, গল্প পত্রিকায় "জমা-দিন" !!!
৫ ) নবদিবাকর পত্রিকায় নতুন ইউজার হিসাবে "রেজিস্টার" করতে সমস্যা ? [lightbox full="https://youtu.be/h0WbM5D2p_E" title="রেজিস্টার -এর ভিডিও দেখুন"]ভিডিও দেখুন[/lightbox] !!!
৬ ) আপনি এখানে ফেসবুক, গুগল, ট্যুইটার অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেও নবদিবাকর পত্রিকায় "রেজিস্টার" করতে পারেন !!! [lightbox full="https://youtu.be/T8h7ftved78" title="ফেসবুক ব্যবহার করে "রেজিস্টার" করুন !"]ভিডিও দেখুন[/lightbox] !!!
৭ ) নবদিবাকর পত্রিকায় লেখা দেওয়ার "নিয়মাবলী" দেখুন !!![/toggle]
[one_half]

 

 

যদি আমায় কবি বলো
- রণজিৎ মাইতি

যদি আমায় কবি বলো,বলো আমায় কবি
রাজকবি নয় সভাকবি নয়,সাধারণ এক কবি

সাদাকে সাদা কালোকে কালো,যথার্থই বলি
বামকবি নয় ডানকবি নয়,শুধুই আমি কবি

এমনতরো কবি হয়না?কবি শুধুই কবি
নপুংশক দিক গালি দিক,লিঙ্গবিহীন কবি

পূব আকাশে রবির উদয়,পশ্চিমেতে অস্ত
রাজা যেমন সভাকবিও বলল ঠিক উল্টো

এমন কবি হতে চাইনা,বুদ্ধি-বিবেক বন্ধকি
হতে চাই তেমন কবি লালন যেমন কবি

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget