এপ্রিল 2017

পল্লী নারী

শাহিনা কাজল

 

পৃথিবীর দক্ষিণ বাহুতে পাখি ডাকা

নির্জন গ্রাম ফরিদপুর

প্রেমের শিকড়ে গাঁথা প্রেম

চোখ যায় যতদূর।

ছোট বিশ্বাসের মেঠোপথ বেয়ে

চলে গেছে একটি নদী,

মনের ভুলে ভুল করে কখনো

একেলা তুমি অাসো যদি।

অলস চোখের পাখনা মেলে

সার বাঁধা গাছের সারি,

ষোড়শী মাটির বুকে নির্বাক

দাঁড়িয়ে অাছে এক নারী।

একাকি চাঁদের মত ভরা উচ্ছ্বল

হাসি ভরা মুখে,

অাত্মভোলা পথিকের ভালোবেসে

টেনে নেয় বুকে।

অজানা অচেনা সংসারে ঘুরে

রচে জীবনের সুখ,

পতি ই ঈশ্বর মেনে নীল কষ্টে

ভাসায় বুক।'''

তবুও বলে না কথা পতির উপর

মুখ ভার করে,

হাসি মুখে মেনে নেয় শত যাতনার

বিবর্ণ সংসারে।

কখনো না খেয়ে খাওয়ায় অপরে

অতি ভালোবেসে,

তবু ও ছাড়ে না পিছু কষ্টের রং

জীবনের বেলাশেষে।

বলাকা

- ইরাবতী মণ্ডল

 

বলাকা,তোমার সাদা ডানায় ভর করি

চলো ওই মেঘের সীমানায়।

যেথায় মেঘের আকাশ,মেঘের বাতাস

মেঘের আঙিনায়।

 

জলভরা মেঘ করছে খেলা

আমন মনে তারা,

এদিক,ওদিক ঘুরছে বা কেউ

হয়ে আপন হারা।

 

আমায় দেখে অবাক হয়ে

চাইবে মুখ পানে,

কোথা থেকে এলে কন্যা

শুধাবে অম্লানে।

 

আমায় নিয়ে রাণীর কাছে

যাবে তখন ত্বরা,

যেথায় রানী বসে আছেন

পারিষদে ঘেরা।

 

লালমেঘ, নীলমেঘ,

সাদামেঘের মাঝে,

বসে আছেন রানী তিনি

কাজল মেঘের সাজে।

 

বলবে রাণী আমায় দেখে

কি কারণে হেথা?

এসেছো হে কন্যা তুমি,

বলো আপন কথা।

 

মাথা নুইয়ে রাণীর পায়ে

দুহাত করি জড়ো,

বোলবো আমি আপন কথা

আবেগ ভরো ভরো।

 

এক যে আছে দেশ রাণীমা

শুকনো মরুর প্রায়,

জলের অভাবে খাল ,নদী ,বিল

গাছপালা শুকায়।

 

মানুষ ,পশু না খেয়ে মরে

চারিদিকে হাহাকার,

ফসল শুকায় মাঠের পরে

ফুটিফাঁটা সংসার।

 

তুমি যদি দয়া করো রাণী

পাঠাও মেঘের দল,

বৃষ্টিধারা ঝরিয়ে তারা

বাঁচাবে ফসল ।

 

বাঁচবে মানুষ,বাঁচবে পশু

বাঁচবে ধরাতল।

রক্ষা করবে সৃষ্টি রাণী

তোমার মেঘের দল।

 

আমার কথা শুনে রাণীর

আসবে চোখে জল,

হাক পাড়বে কোথায় আছো?

এসো মেঘের দল।

 

অচিন দেশে যাও গো তোমরা

এই মেয়েটির সনে,

বৃষ্টি ধারায় বাঁচাও সে দেশ,

বাঁচাও পৃথ্বী গণে।

 

রাণীর কথায় সাজ,সাজ রব

পড়বে মেঘের দলে।

তুরি,ভেরি বজ্রনিনাদ

করবে ঘনরোলে।

 

তাদের দয়ায় বৃষ্টি হবে

বাঁচবে আমার দেশ,

নতুন ফসলে উঠবে ভরে

আমার ই স্বদেশ।

 

তাই ,হে বলাকা ,চলো মোরা যাই

ওই সে সুদূর পানে,

মেঘ পরীদের আনবো ডেকে

মন ভুলানো গানে।

রাত--11.40

তোমাকে স্পর্শ করা নাকি আমার জন্য নিষিদ্ধ
কিন্তু তুমি কি জানো?
পথের ধুলো,বাতাস,বৃষ্টি সবই আমি ছূয়ে দিছি
যার স্পর্শ প্রতিনিয়ত অনুভব করছো তুমি ৷
তোমাদের ঐ গোলি নাকি আমার জন্য নিষিদ্ধ
পাছে আমার দৃষ্টি পরে তোমার উপরে তাই নিষিদ্ধ
কিন্তু তুমি কি জানো?
জলের বুকে প্রতিনিয়ত আমি তোমার ছায়া দেখি ,
আমার সে দেখা তুমি নিষিদ্ধ করবে কি করে?
তোমাদের মহল্লা নাকি আমার জন্য নিষিদ্ধ
কিন্তু তুমি কি জানো?
তোমাদের ঐ মহল্লার ইট,কাঠ,পাথর গাছ,গাছালি
অধীর আগ্রহে ওত পেতে আমার আসার অপেক্ষাতে ৷
তোমাকে গান শোনানো নাকি আমার জন্য নিষিদ্ধ
কিন্তু তুমি কি জানো ?
তোমার ঐ পোশা পাখি সারাক্ষণই যে গান গায়
তা আমিই শিখিয়েছিলাম কোন এক নিরালায় ৷
তোমাকে ভালোবাসা নাকি আমার জন্য নিষিদ্ধ
কিন্তু তুমি কি জানো?
তোমার হৃদয়টা প্রতিস্থাপিত রয়েছে আমার বুকে
যাকে ভালোবাসতেই হবে আমার ৷

পাপ চাপা থাকেনা            নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী                                         রাতের শেষ ট্রেনটা ধরে অনল যখন স্টেশনে পৌঁছালো তখন তার শরীরে বিন্দুমাত্র হাঁটার আর ক্ষমতা ছিলোনা । সারাদিনের পরিশ্রম ,অনাহার -কোনোরকমে নিজেকে টেনে নিয়ে যেয়ে একটা  বেঞ্চির উপরে বসে । সেখানে আরও এক ভদ্রলোক আগে থাকতেই বসে ছিলেন । ক্লান্তিতে অনলের চোখ দু'টি তখন ঘুমে জড়িয়ে আসছে । হঠাৎ পাশের ভদ্রলোকের দিকে নজর যেতেই দেখেন ভদ্রলোক ঠকঠক করে কাঁপছেন । সে এগিয়ে যেয়ে ভদ্রলোকের গায়ে হাত দিয়ে বলে ,"আপনি এত কাপছেন কেন ?" কিন্তু গায়ে হাত দিয়েই বুঝতে পারে ভদ্রলোকের প্রচন্ড জ্বর । ভদ্রলোক করকমে তাকে বলেন ,"বাবা একটা ট্যাক্সি ডেকে দেবে ? আমার বাড়ি পলাশপুর গ্রামে । মিটারে ট্যাক্সি যাবেনা এত রাতে ,ভাড়া যা চাইবে তুমি রাজী হয়ে যাবে । পারবে বাবা ডেকে দিতে ?"                                         .                ট্যাক্সি নিয়ে এসে অনল ভদ্রলোককে তুলে দিয়ে নিজেও উঠে বসলো । ভদ্রলোক তার কাছে জানতে চাইলেন এত রাতে বাড়িতে না ফিরলে বাড়ির লোক তো তারজন্য চিন্তা করবে ! অনল জানালো তার বাড়ি বলে কিছু নেই , একটা দোকানের ভিতর সে ঘুমায় - বলা ভালো দোকানদারের দোকানে পাহারাদারের জন্য আলাদা করে কোনো টাকা খরচ করতে হয়না ।        দশ বছর পরের ঘটনা ;- ----------                                        ওই রাতের পর অনলের জীবনটা পাল্টে গেলো । এখন তার বিশাল ব্যবসা ,বড় বাড়ি ,তিনটে গাড়ি । যেন 'আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ' । যে অনল দু'বেলা দু'মুঠো অন্ন জোঠাতে হিমশিম খেত তার এখন বাড়িতে দু'তিনজন কাজের লোক । বিয়েও করেছে নিজে পছন্দ করে একটি গরীবের মেয়েকে । শ্বশুর বাড়ির লোকজনকে নিজের বাড়িতেই তুলে এনেছে ; কারণ তারা এতটাই গরীব এবং তাছাড়া তার একার পক্ষে লোকজন রেখেও ব্যবসার সবদিক সে নজর রাখতে পারছিলোনা । এখন শালা ,শ্বশুর ,শ্বাশুড়ি সকলেই তার ব্যবসা দেখে । কিন্তু ঠাঁই হয়নি তার বৃদ্ধা বিধবা মা ও ভায়ের ।                        দারিদ্রের সাথে লড়াই করতে করতে অনল যখন পর্যুদস্ত ; তখনই সে সীদ্ধান্ত নেয় গ্রাম ছেড়ে শহর কোলকাতায়  আসার । বাড়িতে মাকে ও ভাইকে রেখে কলকাতায় আসে কাজের সন্ধানে । কিন্তু কোথায় কাজ ? কখনো স্টেশনে ছোট ছোট চায়ের দোকানে কাপ ,প্লেট ধুয়ে দেয় আবার কখনোবা কুলি হয়ে অন্যের ভারী জিনিস গাড়িতে তুলে দিয়ে সামান্য পয়সায় কিছু খেয়ে বেঁচে থাকা । বেশ কিছুদিন এইভাবে চলতে চলতে পি ডিভিশনে মাধ্যমিক পাশ করা অনল একটা বেসরকারি স্কুলে দাড়োয়ানের কাজ পায় সামান্য মাইনের বিনিময়ে । কিন্তু অনল ছিলো খুব সৎ ও পরিশ্রমী ।                           সেদিন রাতে ওই ভদ্রলোক অথাৎ রবীন পালকে তার বাড়িতে পৌঁছে দিতে যেয়ে অনল দেখে -তার বাসস্থানকে বাড়ি না বলে গ্রামের ভিতর ওটাকে রাজপ্রাসাদই বলা ভালো । রবীনবাবুর স্ত্রী তাকে সেই রাতে খেতে দিয়ে তার কাছ থেকে সেই রাতের সমস্ত ঘটনা জেনে নেন । রবীনবাবুর বাড়িতেই একটি প্রকান্ড ঘরের মধ্যে সোনার গহনা তৈরী করার একটি কারখানা ছিলো । নেই নেই করেও পাঁচ থেকে সাতজন কর্মচারী কাজ করতেন ঠিকই কিন্তু শেষ তুলির টানটা তিনিই দিতেন । কলকাতার অধিকাংশ বড় বড় সোনার দোকানের অর্ডার তিনি পেতেন তার নিখুঁত কাজের জন্য । যা ছিলো খরিদ্দারদের প্রচন্ড চাহিদা । অনেকবারই ঐসব দোকানের মালিকেরা তাকে মোটা মাইনে দিয়ে রাখতে চেয়েছেন । কিন্তু তিনি কোনোদিনও রাজী হননি ।  সেদিন তিনি অর্ডারের গহনা দিয়ে আসার সময় হঠাৎই অসুস্থ্য হয়ে পড়েন ।                    অনলের কথা ,বার্তা ,ব্যবহার তার খুবই ভালো লাগে । হাতে ধরে তিনি অনলকে সুক্ষ সুক্ষ গহনা তৈরির কাজে পারদর্শী করে তোলেন । বুদ্ধিমান অনল অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বেশ ভালোই কাজ শিখে নেয় । রবীনবাবুর সাথে সে কলকাতার দোকানগুলোতেও যাতায়াত শুরু করে । ওই সব দোকানেও রবীনবাবুর অনলের প্রশংসার কারণে খুব বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে ।  বৃদ্ধ রবীনবাবু ও তার স্ত্রী আশাদেবী অনলকে কাছে পেয়ে ছেলে কাছে না থাকার যন্ত্রনাটা কিছুটা হলেও ভুলে যান । তাদের একমাত্র ছেলে ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার । সেই যে দশ বছর আগে লন্ডন পাড়ি দেয় ; আর কোনো খবর সে মা ,বাবার রাখেনি । প্রথম প্রথম কিছুদিন ফোনে কথা বললেও এখন আর কোনো যোগাযোগ নেই । ফোন নম্বর ও তার পাল্টে গেছে । অসহায়ের মতো বৃদ্ধ ,বৃদ্ধা দু'জনেই এটাকে তাদের দুর্ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছেন ।                          বছর সাতেক আগে রবীনবাবু একদিন অনলকে সাথে নিয়েই কলকাতা আসেন অর্ডার দেওয়া গহনাগুলি তৈরী করে দোকানগুলিতে  দিতে । সেগুলি দিয়ে তার প্রাপ্য টাকা ও নুতন গহনার জন্য বেশ কিছু সোনা যা তাকে ওই দোকানগুলি থেকেই দেওয়া হয়ে থাকে ; এগুলি গুছিয়ে ছোট একটি ব্যাগ ভর্তি করে তিনি পুত্রসম অনলের হাতে দিয়ে বাড়ির উর্দেশ্যে রওনা দেন | নির্দিষ্ট স্টেশনে এসে যখন তিনি নামতে যাবেন অনল উঠে রবীনবাবুর একটা হাত ধরেন । এটা সে প্রথম থেকেই করে যেহেতু তিনি বয়স্ক মানুষ । কিন্তু সেদিন যে কি হয় অনলের যার উত্তর সে আজও পায়নি । তার ভিতরের পশুটা হঠাৎ করেই যেন মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে । এক ঝটকায় সেই পশুটা রবীনবাবুর ধরে থাকা হাতটি অনলের কাছ থেকে ছাড়িয়ে নেয় । অনল একটা ধাক্কা মারে রবীনবাবুর পিছনে । বৃদ্ধ রবীনবাবু উপুড় হয়ে পরে যান । নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সে । জনতার কোলাহলে সম্বিৎ ফিরে পায় অনল । সঙ্গে সঙ্গে তাকে নিয়ে হাসপাতাল ছোটে । কিন্তু রবীনবাবু আর জ্ঞান ফিরে পান না । সকলের অগোচরেই থেকে যায় তার মৃত্যু রহস্য ।এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারেন না আশাদেবী । ছ'মাসের মাথায় তিনিও মারা যান । একচ্ছত্র সাম্রাজ্যের রাজা হয়ে যায় অনল । কিন্তু শুধুমাত্র লোভের কারনে এই খুন হলেও সে নিজেকে নিজে ক্ষমা করতে পারেনা । যদিও কেবলমাত্র নিজেকে দোষী ভাবার অবস্থান তার অন্তরেই ।               রবীনবাবুদের আর কোনো আত্মীয়স্বজন না থাকায় নিজ নামে সম্মত্তি  কোরতে অনলকে কোনোই বেগ পেতে হয়না । মালিকানাস্বর্ত পেয়েই সে গ্রামের ওই রাজপ্রাসাদসম বাড়ি আসবাবপত্র সমেত বিক্রি করে দিয়ে কলকাতার একটু নিরিবিলি এলাকায় প্রচুর জমি সমেত পুরানো আমলের এক বাড়ি কিনে উঠে আসে । আর রবীনবাবুর নিজ হাতে করে শিখিয়ে দেওয়া ব্যবসাটি নিজের ব্যবসা হিসাবে দাঁড় করায় ।              কোনো একদিন গ্রামের পরিচিত এক ব্যক্তির সাথে দেখা হয়ে যায়  হঠাৎ করেই রাস্তাতে । বলাবাহুল্য কলকাতা আসার পরে সে তার মা ,ভায়ের সাথে কোনো যোগাযোগ রাখেনি । ওই ভদ্রলোক গ্রামে ফিরে যখন তার মা, ভায়ের কাছে তার বিশাল গাড়ি চড়ে ঘুরে বেড়ানোর গল্প করেন তখন তারাও অবাক হয়ে যায় । অবাক হয়ে যায় এই ভেবে -অনল যে এত টাকা ,গাড়ি,বাড়ি করেছে তাদেরও বিন্দু বিসর্গ কেনো জানায়নি ? তারা যে অভাবের মধ্যে রয়েছে সেটা তো অনলের অজানা নয় ! মা,ছেলে খোঁজ করতে করতে অনলের বাড়ি এসে উপস্থিত হন । অনল তাদের দেখে ভুত দেখার মত চমকে ওঠে ! কিন্তু মুখে কিছু বলেনা । সেদিন খাওয়া ,থাকার পর পরদিন সকালে মায়ের হাতে বেশ কিছু টাকা গুজে দিয়ে বলতে গেলে একপ্রকার বাড়ি থেকে বেড়-ই করে দেয় । তার ভয় হয় ,পিছে করা কৃতকর্মের কথা যদি সে আবেগতাড়িত হয়ে অতি আপনজনের কাছে বলে ফেলে !                          এই ঘটনার বছর খানেকের মধ্যে তার মা মারা যান । ভাই ধড়া গলায় যখন তার কাছে এসে মায়ের মৃত্যু সংবাদটি দেয় তখন সে প্রথম অবস্থায় কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে । ভাই এর সাথে নিজেও গলায় ধড়া পরে । শ্রাদ্ধের পূর্বপর্যন্ত ভাইকে সমাদরেই রাখে । বেশ ঘটা করে পুরোহিত মশাইকে প্রচুর দান সামগ্রী দিয়ে হাজার লোক নিমন্তন করে মায়ের শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান পালন করে । কিন্তু শ্রাদ্ধের পরদিন ভাইয়ের শত অনুরোধ শর্তেও সে তার ভাইকে আর একটা দিনের জন্যওথাকতে দেয়না । সে আগের মতই বেশ কিছু টাকা ভায়ের হাতে দিয়ে তাকে ফিরে যেতে বলে । অভিমানী ভাই সেই টাকা নেয় না ।দাদাকে একটা প্রনাম করে বলে ,"জীবনে আর কোনোদিন তোর বাড়ি আসবো না । এটাই তোর আর আমার শেষ দেখা । আমার কি মনেহয় জানিস দাদা ?তুই অসৎপথে এই সব করেছিস ! তাই তোর মনে একটা ভয় যদি আমি সবকিছু জেনে যাই ! তুই ভালো থাকিস ।"               মায়ের মৃত্যুর এক বছর  পর সে মাতৃমন্দির নামে বাড়িতেই কালিমায়ের এক বিশাল মন্দির স্থাপন করে যেখানে নিজের মায়ের বড় করে এক ছবি বাধিঁয়ে নিত্যদিন স্নানের পর বেশ মোটা এক সাদা ফুলের মালা মায়ের ছবিতে পড়ায় ।                          এখানেই যদি অনলের কাহিনী শেষ হতো তাহলে হয়তো অনলের বাকি জীবনটা অনেক সুখী ও সুন্দর হতো । কেউই জানতে পারতোনা তার জীবনে করা একটি খুনের কাহিনী । কিন্তু বিধাতা পুরুষ যে তার অলক্ষেই তার কৃতকর্মের সাজা লিখে রেখেছিলেন । পুত্র সন্তানের আশায় পরপর তিনটি মেয়ে হয় অনলের । বড় ও মেজকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে বিয়েও দিয়ে দেন বেশ অবস্থাপন্ন ঘরেই । ছোট মেয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য যখন বাইরে যায় তখন তার সাথে পরিচয় হয় বিশিষ্ঠ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডক্টর রথীন মজুমদারের সঙ্গে । পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা, প্রেম এবং বিয়ে । বারবার বাবা এ বিয়েতে আপত্তি করা শর্তেও মেয়ে ঈশিতা তার কোনো কথায় শোনেনা । অনল মারত্মকভাবে অসুস্থ্য হয়ে পড়েন । ডক্টর বাড়ির লোককে জানিয়ে দেন , অনতিবিলম্বে তার বুকে প্রেসমেকার বসাতে হবে । খবর যায় ঈশানীর কাছে । সে তার স্বামীর কাছে বাবার প্রাণভিক্ষা চায় । রথীন ও ঈশানী কলকাতায় এসে উপস্থিত হয় । নামকরা নার্সিংহোমে ডাক্তার রথীনের তত্ত্বাবধানে অনলের অপারেশান খুব ভালোভাবেই হয়ে যায় । তখনও অনলের ভালোভাবে জ্ঞান আসেনি । ডাক্তার রথীন অনল অথাৎ তার শ্বশুরমশাইকে দেখতে তার শিয়রের কাছে যেয়ে তার চিকিৎসার কাগজপত্রে চোখ বুলাচ্ছিলেন । "বিধাতার লিখন না যায় খণ্ডন"- অনল বেহুস অবস্থায় বলতে থাকে ,"আমায় ক্ষমা করে দাও মেসোমশাই ,আমি তোমাকে মারতে চাইনি । হঠাৎ কেন যে ঐসময় আমি তোমার হাতটা ছেড়ে দিয়েছিলাম ,তা আমি আজও কোনো উত্তর পায়নি । আমার ভিতরের পশুটা তোমার টাকা আর সম্পত্তির লোভে তোমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিলো । তোমার পলাশপুরের বাড়ি আমি বিক্রি করে দিয়েছি । কোনোদিন যদি তোমার ছেলে রমেন ফিরে আসে আমি তাকে সবকিছু দিয়ে দেবো । এই পাপের বোঝা আমি আর টেনে বেড়াতে পারছিনা ।" রথীনের বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়না তার শ্বশুর তার দাদুর খুনি ! ছেলেবেলা থেকেই সে তার বাবার কাছে কলকাতার বাড়ি ,ব্যবসা সম্পর্কে অনেকবার গল্প শুনেছে । রথীন পুরো কথাগুলি সকলের কাছে এমনকি ঈশানীর কাছেও চেপে যায় ।                                              পরদিন খুব ভোরে উঠে সে তার বাবার কাছ থেকে শোনা গল্পের কথা মনে রেখে পলাশপুর গ্রামে যায় । পিতৃ ভিটার কাছে দাঁড়িয়ে বুক ভরে নিঃশ্বাস নেয় । কিছু বয়স্ক মানুষের কাছ থেকে সে অনল সম্পর্কে সবকিছু জানতে পারে । একটা পথের মানুষকে বাড়িতে তুলে এনে কিভাবে তাকে সন্তান স্নেহে রেখে নিজ সন্তানের দুঃখ ভুলতে চেয়েছিলেন । তার খুব রাগ হয় নিজের বাবা ,মায়ের প্রতি । মা কিছুতেই চাইতেন না বাবা তার কলকাতার বাড়ির সাথে কোনো সম্পর্ক রাখুক । প্রচন্ড অশান্তি করতেন এই নিয়ে তার বাবার সাথে তার বিদেশিনী মা । বাবা সংসারে শান্তি বজায় রাখতে মায়ের ইচ্ছাকেই মেনে নিয়েছিলেন । বিনিময়ে কষ্ট দিয়েছিলেন তার নিজের মা ,বাবাকে । আর তার শাস্তি মনেহয় ভগবান আমায় দিলেন আমার কাছ থেকে দু'জনকে গাড়ি এ্যাকসিডেন্ট একসাথে কেড়ে নিয়ে ।
দিন পনের বাদে অনল বাড়িতে আসেন । একদিন রথীনকে ডেকে অনল বলেন ,"তোমার সাথে তো সেভাবে আলাপই হলোনা বাবা । তোমার বাবার নাম কি , এদেশে কোথায় তোমাদের বাড়ি ছিলো ?" রথীন চুপ করে বসে আছে দেখে তিনি আবারও একই প্রশ্ন করেন । এবার রথীন আস্তে আস্তে বলে ," আমার বাবার নাম রমেশ পাল ,ঠাকুরদা রবীন পাল ,এদেশে আমাদের বাড়ি ছিলো হাওড়া জেলার পলাশপুর গ্রামে ।"

অনল এক হাতে বাঁদিকের বুকটা চেঁপে ধরে বলে ওঠেন ,"কি ,কি বললে তুমি ?" "আপনি উত্তেজিত হবেননা । যে  কথা এতদিন কেউ জানেনি সে কথাগুলি হাসপাতালে বেঘোরে আমার সামনেই বলে ফেলেছেন । একেই বলে মনেহয় - পাপ করলে তার  জীবদ্বশায় পাপের প্রকাশ হবেই । এ কথা কেউ কোনোদিন এমনকি ঈশানীও জানবে না । আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন । তবে আমি আর এখানে থাকবোনা । আমাদের টিকিট কাটা হয়ে গেছে ।আমরা কালই চলে যাবো ।" অনল যেভাবে শুয়ে ছিলেন সেই ভাবেই শুয়ে থাকেন । দু'চোখের কোল বেয়ে অবিরাম জল পড়তে লাগে । রথীন ঘর থেকে বেরিয়ে যান ।
পরদিন যাবার সময় রথীন আর সে ঘরে ঢোকেননা । দরজার কাছ থেকেই 'আসছি'- বলে ঈশানীকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন ।
প্লেন থেকে নেমেই ভাইরার ফোন পান ," বাবা শেষ সময় তোমার কাছে ক্ষমা চেয়ে গেছেন । কিন্তু কেন ?"
******নন্দা******  6.04.17   রাত 8.30

দাও বিদায়
নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

সন্ধ্যা আমার ঘনিয়ে এসেছে ,
যেতে দাও আমায় -
তব আঁখি কেন ছলছল ,
এবার জানাও বিদায় !

যদি কোনো অপরাধ ,
করে থাকি আমি -
ক্ষমা কোরো সবাই ,
দোষে ,গুনে মানুষ আমি ,
মনুষ্য আধারের ঊদ্ধে তো নয় !

থাকবোনা তোমাদের সঙ্গে আমি ,
রইবে অনেক স্মৃতি -
স্মৃতিকে আঁকড়ে কেঁদোনা তোমরা ,
দু'দিন আগে আর পরে ,
যাওয়ায় যে রীতি !

হয়তো কিছুদিন আগেই গেলাম ,
ছিলোনা যাওয়ার ইচ্ছা -
পূরণ হোলোনা অনেক সাধ মোর ,
বিধাতার যে এটাই সদিচ্ছা ।

চোখের জলে ভেসোনা তোমরা ,
ভুলবেনা জানি আমায় ,
অশ্রু কাঁদাবে আমার আত্মা -
এবার দাও  বিদায় ।

****#নন্দা#**** 21.4.17 10pm.

কিটকাট চকলেট

মুন্সি দরুদ মহম্মদ ওয়েছ

 

তোমার জন্য কিনেছি কিটকাট

ফিটফাট থাকো পরে জিন্স টপ

পপ গান তুমি গাইবে আমি শুনব

গুনব তোমার হাতের রেশমি চুড়ি

ঝুড়ি ভর্তি চকলেট দেবো তোমাকে

আমাকে দিও একটা গোলাপ লাল

হাল ধরো চুটিয়ে প্রেম করতে হবে

তবে প্রেম কালে মাথা করো না হেঁট

পেট ভরে খাওয়াবো কিটকাট চকলেট ।

 

 

পথ

মুন্সি দরুদ মহম্মদ ওয়েছ

 

বৃষ্টি ভেজা কাদা পথ

এক পা বন্যার জলপথ

সমুদ্র পথ, নৌকা পথ

রথযাত্রা পথ,

আলপথে বসে রাখাল ছেলে

ফেসবুক স্ট্যাটাস দেয়

'পায়ে খড়ম লাগে শরম ।'

রূপসী মনের অগোচরে লুকিয়ে থাকা

নুপুর পায়ে রিনিঝিনি শব্দের পথ

আনন্দ, লাজুক পথ ।

এক পেশাদার খুনি আমি এই শহরে

কখনো স্বপ্ন পুরাই নতুন স্বপ্নের আশাতে

কখনোবা ঘুমোতে ভয় পাই দুঃস্বপনের ভয়ে ৷

কখনো আমি খুন করি বিবেক মনুষত্ব

কখনোবা আবার ভোল পাল্টাতে হই মত্ত

আমি যে মুখোশধারী এটাই যে নির্মম সত্য ৷

এক পেশাদার খুনি আমি এই শহরে

সুখের আশায় খুন করি অসহায় অসুখকে

কখনোবা কাছে ডাকি সেই প্রিয়তমা অসুখকে ৷

গলা টিপে ধরি কখনো স্নেহ মায়া মমতাকে

কখনো আবার খুঁজি সেই স্নেহ মায়া মমতাকে

হত্যা করতে বারংবার উদ্ধৃত হয়েছিলাম যাকে ৷

এক পেশাদার খুনি আমি এই শহরে

দানবীয় ক্ষুধা আছে যার ছোট্ট  উদর জুড়ে

এ ক্ষুধা মিটেনা গরীবের এতো এতো রক্ত চুষে ৷

এক পেশাদার খুনি আমি এই শহরে

স্বার্থের জন্য ব্যবহার করি নিঃস্বার্থ মানুষকে

দেখো ওরাও কেমন বোকা আমাকেই স্যালুট করে ৷

অন্তরে আছো
- নন্দা মুখার্জী রায় চৌধুরী

এখনো সাঁঝের আকাশ ,
আবীরে হয় লাল -
এখনো প্রভাতে পাখি গায় গান ;
এখনো আমি সন্ধ্যা হলে -
জানলা দিয়ে সুদীর্ঘ পথ দেখি অবিরাম |
পরদেশী তুমি ,ভুলে গেছো বুঝি ?
তাই ফিরলেনা আর !
কিশোরী মনে দোলা দিয়ে তুমি ,
হলে কেন দেশান্তর ?
জীবন কারও থেমে থাকেনা ,
থামবেনা আমারও জীবন ,
প্রথম ছোঁয়ার পরশ নিয়ে -
মনে রাখবো তোমায় আমরণ |

যখন আমি নিস্তব্ধ ঘরে -
থাকবো বসে একা ;
পড়বে মনে তোমার পরশ ,
নাইবা পেলাম এ জনমে আর দেখা |

সেদিনের সেই শিহরিত শরীর ,
পড়লে মনে আজও জাগে শিহরণ ;
ঠোঁট দু'টি তখন থরথর কাঁপে ,
বুকে ওঠে সেই একই আলোড়ন |

নন্দা 23.1

বর্ষবরণ
- যুথিকা চক্রবর্তী

চৈত্র করে ঢুলু ঢুলু
অস্তচলগামী-----
জামা-কাপড় উশৃঙ্খল
চৈত্র সেলামী,

বছর ঘোরে তারই মত
কাল বৈশাখীর ছায়া,
বর্ষ বরণ মন মাতানো
আবছা রঙের মায়া।

গাছে গাছে আমের যে দল
পরিণতির আশায়----
সাজ--সজ্জা,চড়ক -গাজন
মনকে শুধু ভাসায়,

আচ্ছাদনের মাথায় থাকে
বর্ষ বরণ ডালা,
দিনের সাথে পাল্লা দিয়ে
রৌদ্ৰ করে খেলা।

অবয়বের বর্ষবরণ
নতুন জামার ঢল,
কচি-কাঁচা ,ছেলে -বুড়ো
শুরুতেই ঝলমল,

চড়ক তলায় বাদাম ভাজা
কাঁচের চুড়ির স্বাদ,
বর্ষ বরণ জমিয়ে দিল
করলো বাজিমাৎ।

আঘাত
- মুন্সি দরুদ মহম্মদ ওয়েছ

হুদহুদ ঝড়ের মতো এসেছিলে হৃদয়ে
অনন্ত ভালোবেসেছিলে সমহিমায়
তোমার কষ্টের কথায় চোখের পানিতে
ভাসাতাম বুক । টপটপ ঝরে বুকের ব্যথা ।
বজ্রাঘাত করে চলে গেলে, ফিরে এলে না,
প্রেমের হৃদয় থেকে তাজা লাল রক্ত ঝরায়
হৃদয় পাতা ছিঁড়ে করলে বিভৎস আঘাত ।

বিরহে কাটল হাত
মুন্সি দরুদ মহম্মদ ওয়েছ

ভালোবাসা আসে না, মন না ভাসে
পাশে বসে মনের মানুষ চিন্তা করে
ধরে হাত বইমেলা যাব সময় না হয় ।
লয় হচ্ছি বিরহে, সাদা জামা কিনে
এনে রাখলাম আলনাতে সাজিয়ে
বাজিয়ে রিনিঝিনি চুড়ি, হাত থেকে
বেঁকে প্লেট পড়ল, কাঁচে কাটল হাত
রাত পোহালে হয় বিরহে অশ্রুপাত ।

ভালো আছি
- শীলা ঘটক

তুমি সেদিন ফোনে জানতে চাইলে
আমি কেমন আছি?
ভালো আছি, খুব ভালো আছি!
ভালো আছি, এই মিথ্যে বলাটা বেশ রপ্ত করে ফেলেছি,
ভালো থাকার অভিনয় করতে করতে ----
ক্লান্ত মন মাঝে মাঝে বিষন্ন হয়ে পড়ে!
হাঁপিয়ে উঠি
মন পরিহাসের হাসি হেসে বলে,
ভালো তো নেই তুমি,
তাহলে কেন বলো!?
ভালো আছি।
লৌকিক সম্পর্কের আড়ালে অন্তর গুমরে কাঁদে!
#####

এই তুমি কি জানো?
এই ভালো থাকার অভিনয়টা
বেশ চমৎকৃত করে আমায়!
নিত্যদিন অভাবের সঙ্গে লড়াই করতে করতে-----
বেকারত্বের জ্বালায় আর কষ্ট পাই না।
সেটাও বেশ রপ্ত হয়ে গেছে বলতে পারো।
দারিদ্রের জন্য তোমার আমার ভালবাসা মৃত্যুও
এখন আর কাঁদায় না আমায়।
বেশ ভালো আছি,
কোন ভবিষ্যৎ নেই,
কোন দায়িত্ব নেই,
কোন চাহিদা নেই,
শুধু এক একটা দিন এগিয়ে চলেছে
মৃত্যুর দরজার দিকে।
####

কিন্ত মনটা যে বড়ই বেয়াদপ!
ক্লান্তিতে ঘিরে থাকা মন,
ক্লান্তি জড়ানো দুনয়ন
আজও চায় সত্যিকরে ভালো থাকতে।

শীলা ঘটক
কোচবিহার
১৩ই এপ্রিল, ২০১৭

-"বিদেশী পরী"-
-মশিউর রহমান খোকন

রংপুর জেলার সদর উপজেলার মন্দিরা গ্রাম। ছেলে বুড়া সবার দৃষ্টি একটা গাড়ীর দিকে। গ্রামের ছোট ছোট বাচ্চারা মুরগীর বাচ্চার মতো গাড়ীর পিছন পিছন ছুটছে। হাতে ছুয়ে খালি গা ঘষে গাড়ী দেখার স্বাধ উপভোগ করছে। এই গ্রামে এমন গাড়ী তারা জীবনেও দেখেনি। সাইকেল, রিক্সা ভ্যান বড় জোর ট্রাক্টর পর্যন্ত তাদের দৌড়।

কালো রংয়ের এন সিরিজের একটা নতুন চকচক করা বি এম ডাবল্লিউ গ্রামের পথ ধরে আস্তে আস্তে চলে আর কি যেন খোঁজ করতে করতে যায়। বয়স্ক মানুষ দেখলেই কিছুক্ষন পর পরই কালো কাঁচ নামিয়ে গাড়ীর ড্রাইভার কি যেন জানতে চায়।

দোচালা একটা মাটির ঘর। ঘর দোচালা হলেও ভাংগা চুরার শেষ নেই। জং ধরে টিনের চালে বড় বড় ফুটা হয়ে ভেংগে পড়ছে। বাড়ীর খুঁটি গুলি ক্ষয় হতে হতে সরু হয়ে গেছে। একদিকে একটা রান্না ঘর। রান্নাঘরটা ছনের তৈরি, তাও ঝুলে পড়েছে। সামনে বড় উঠান। উঠানের মাঝক্ষানে একটা বিশাল জাম গাছ।

জাম গাছের নিচে একটা বিদেশী পরী এসে দাঁড়ায়। সে বাড়ীর চারিদিক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। তাকে ঘিরে গ্রামের বাচ্চারা বিদেশী পরীর দিকে তাকিয়ে থাকে। পরীর ড্রাইভার বাচ্চাদের তাড়িয়ে দিলেও কেউ কথা শুনে না। তাদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে।

হাইহিলের সাথে একটা স্কিন টাইট জিন্স প্যান্ট, লাল ফতুয়া, চোখে সানগ্লাস, হাতে দামি বেসলেট। বিদেশী পরীর বয়স সাতাইশ হবে, দুধ ফর্সা গায়ের রং। সে তাকিয়ে আছে মাটির বারান্দায় বসে থাকা বশির আলীর আর রান্না ঘর থেকে ছুটে আসা মরিয়ম বেগমের দিকে।

বশির আলীর বয়স ষাটের কোঠায় মরিয়ম পন্চাশ প্রায়। তারা উঠে এসে অবাক দৃস্টিতে বিদেশী পরীর দিকে তাকিয়ে থাকে। বশির আলীর তিন ছেলে। সবাই বিয়ে করে বউ নিয়ে আলাদা থাকে। বাপ মায়ের খবর কেউ নেয় না বল্লেই চলে।

বিদেশী পরী তার ড্রাইভারকে কি যেন বলে, ড্রাইভার গাড়ীর বনেট খুলে এক গাঁদা কাপড় চোপড়ের নতুন প্যাকেট আরো কি কি যেন এনে মাটির বারান্দায় রাখে।

বশির আলী মরিয়ম বেগম কিছুই বুঝতে পারেন না কি হচ্ছে এসব। বিদেশী পরী মরিয়ম বেগমের কাছে গিয়ে তার দুই হাত দুটো নিয়ে নিজের হাতে চেপে ধরে তাকিয়ে থাকে। বিদেশী পরীর দু চোখ গড়িয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়তে থাকে। কারো মুখেই কোন কথা নাই।

বিদেশী পরীর স্হায়ী নিবাস ঢাকার গুলশান হলেও সে ছয়মাস বয়স থেকেই সুইডেনে বড় হয়, বাংলা ভাষা ঠিক মতো বলতে পারেনা। কোন রকম ভাংগা ভাংগা জানে। মরিয়ম বেগমের হাত দুটো সে ছাড়ে না, হাত দুটো ধরে রেখেই সে বাবার কথা গুলি মনে করতে থাকে।

-আজ কেমন আছো বাবা?

-ঐ একই অবস্হা। আমার মনে হচ্ছে বেশী দিন আর বাঁচবো নারে মা? তোর মা গত হয়েছে আজ সাত বছর হলো। আমি মরে গেলে তোকে দেখবে কে মা?

-আব্বু, এত টেনশন করো নাতো, আর এমন উল্টা পাল্টা কথা বলবা না।

-বলি কি আর স্বাধে? আজ দেড়টা মাস ধরে এই হাসপাতালের বেডে পড়ে আছি। কিছুই ভালো লাগে না, কতো কথাই মনে পড়ে যায়।

বিদেশী পরী নিজেও জানে তার বাবা রায়হান চৌধুরী বেশী দিন বাঁচবেন না। উনার ব্লাড ক্যানসার হয়েছে এবং বর্তমানে শেষ স্টেজে আছে, ডাক্তাররা ইতি মধ্যেই ডেথ লাইন দিয়ে দিয়েছেন।
বিদেশী পরী বাবার কাছে বসে মাথায় হাত ভুলাতে থাকে। রায়হান চৌধুরী বিদেশী পরীর হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় ধরে রাখেন।

-তুমি একটু ঘুমাতে চেস্টা করো আব্বু।

-তোর চিন্তায় চিন্তায় ঘুম আসে নারে মা। মা রে, অনেক দিন ধরে তোকে একটা কথা বলবো বলবো করে ভাবছি, কিন্তু সাহস পাচ্ছি না মা।

-কি কথা আব্বু? মেয়ের সাথে কথা বলতে আবার সাহস লাগে নাকি। বলো কি বলতে চাও।

-মা রে, কথাটা তোকে বলাটা আমার জন্য জরুরী। না বলে আমি যে মরেও শান্তি পাবো না।

-আব্বু, এতো ভনিতা না করে বলে ফেলো তো।

-তোর নাম কি জানিস মা?

-হি হি হি, আব্বু তোমার কি মাথা নস্ট হয়ে গেছে। কি বলছো এসব? আমার নাম রেনেসাঁ চৌধুরী তুমি জানো না?

-জানি রে মা, সবই জানি। তোর মা শখ করে তোর নাম রেখেছিলো রেনেসাঁ চৌধুরী।

-হুম বুঝলাম, তো কি হয়েছে? তোমাদের মেয়ে, তোমরা যা ইচ্ছা নাম রাখতেই পারো আবার কাটতেই পারো। আব্বু একটু ঘুমানোর চেস্টা করো তো। আমি তোমার হাত পা টিপে দিচ্ছি।

-না রে মা, আমার কথাটা মনযোগ দিয়ে শুন। খুবই জরুরী কথা।

-বলো বাবা, শুনছি

-আজ থেকে আঠাইশ বছর আগের কথা। আমরা তখন থাকতাম ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে। সেখানে এখনো তোর মানে এক বিঘা যায়গার উপর একটা বিশাল বাড়ী আছে। তোর মায়ের সাথে সেই বাড়িতেই আমার বিয়ে হয়ে।

-বিয়ের পর আমাদের কোন সন্তান হয় না। অনেক দেশী বিদেশী ডাক্তার কবিরাজ করেছি কোন লাভ হয়নি। একটা সন্তানের জন্য তোর মা ছটপট করতো। এভাবেই কেটে গেলো কয়েকটা বছর।

-তখন আমাদের বাড়িতে একজন কেয়ারটেকার ছিলো। খুবই বিশ্বস্ত আর খুবই ভালো মানুষ। তার নাম ছিলো বশির আলী। বশির আলী আর তার বৌ মরিয়ম বেগম আমাদের বাসাতেই থাকতো। মরিয়ম বেগম রান্না বান্না দেখাশোনার কাজ করতো। তোর কি মন খারাপ করছে মা?

-না বাবা, ভেরি ইন্টারেস্টিং, তুমি বলো আমি শুনছি।

-একদিকে আমরা একটা সন্তানের জন্য ছটপট করছি অন্য দিকে মরিয়মের পেটে সাত মাসের বাচ্চা।

মরিয়মের বাচ্চাটার জন্য তোর মায়ের মায়া হয়। খুব যত্ন নেয় মরিয়মের। তাকে নিয়মিত শহরের বড় বড় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়। মরিয়মের পেটে কান পেতে বাচ্চার শব্দ শুনে। একদিন মরিয়মের সাথে তোর মা কথা বলছে, আমি পেপার পড়তে পড়তে শুনছিলাম।

-বাচ্চার নাম কি রাখবে মরিয়ম?

-আমরা গরিব মানুষ বেগম সাব। এটা আমাগো প্রথম সন্তান। বাচ্চার বাপে ঠিক করসে, যদি মাইয়া হয় তয় নাম রাখবো, রহিমুন্নেসা বেগম রহিমা। ইসলামিক নাম।

-হুম খুব সুন্দর নাম। বশির আলীর পছন্দ আছে বলতে হয়। ছেলেও তো হতে পারে।

-না বেগম সাব, উনি কয় আমাগো প্রথম বাচ্চা মেয়ে হইবো। উনার খুব ইচ্ছা একটা মেয়ে হোক। আমারো তাই ইচ্ছা। দোয়া কইরেন বেগম সাব।

-মরিয়মের যখন বাচ্চা হওয়ার সময় হলো, তখন তোর মা তাকে শহরের সব থেকে দামি হাসপাতালে নিয়ে গেলো। মরিয়মকে সব সময় টেক কেয়ার করার জন্য বাঁধা ধরা একটা নার্স রেখে দিলো। সকাল বিকাল দুইবেলা করে মরিয়মের জন্য নিজে হাতে রান্না করে হাসপাতালে খাবার নিয়ে যায়। খুবই ভালো মহিলা ছিলো তোর মা। কেন যে আমার আগে আল্লাহ তোর মা কে নিয়ে নিলো...

- তারপর কি হলো বাবা বলে যাও।

-হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দু'দিন পরই মরিয়মের একটা খুব সুন্দর ফুটফুটে বাচ্চা হয়। বাচ্চাটাকে সারাক্ষন তোর মা ই কোলে কোলে নিয়ে বসে থাকে। পাঁচ দিন পর নতুন বাচ্চা নিয়ে হাসপাতাল থেকে মরিয়মকে বাসায় নিয়ে আসে। মরিয়মের বাচ্চার খুশীতে সেদিন তোর মা এক মন মিস্টি কিনে সবাইকে খাওয়ায়।

পরদিন রাত তিনটার দিকে মরিয়ম গরম পানির জন্য রান্না ঘর যেতে গিয়ে দেখে, তোর মা সোফায় বসে নতুন বাচ্চার জন্য নিজে হাতে কাঁথা শেলাই করছে। মরিয়ম ঘরে গিয়ে তার স্বামী বশির আলীকে নিয়ে বের হয়। বশির আলী আমার খোঁজ করলে তোর মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়। সেদিন রাতে আমার সামনে মরিয়ম তার ফুটফুটে বাচ্চাটা তোর মায়ের কোলে দিয়ে বলে,

-বেগম সাহেব, আমগো রহিমা আজ থেইক্কা আপনাগো সন্তান। আমগো রহিমাকে এক্কেবারে আপনাকে দিয়া দিলাম বেগম সাব। আজ থেইক্কা রহিমা আপনার সন্তান। আজ থেইক্কা রহিমার ভালো মন্দ সব আপনার হাতে।

প্রথমে আমরা কেউ কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। রহিমাকে কোলে নিয়ে মরিয়মকে জড়িয়ে ধরে সেদিন তোর মা অনেক কেঁদেছিলো।

এর বিনিময়ে বশির আলী কোন টাকা পয়সা বা কিছুই নিতে রাজী হয়নি। এর ছয় মাস পরই আমরা রহিমাকে নিয়ে সুইডেন চলে আসি। আসার আগে তোর মা এক রকম জোর করেই মরিয়মের নামে রংপুরে দশ বিঘা জায়গা কিনে একটা টিনের বাড়ী করে দিয়ে আসে।

সে দিনের সেই রহিমাই আজকের আমার রেনেসাঁ, রেনেসাঁ চৌধুরী।

রেনেসাঁর চোখ ছল ছল করে উঠে। রায়হান চৌধুরী তার কথা চালিয়ে যেতে থাকে।

-সুইডেনে আসার পর বশির আলীর সাথে কয়েক বছর চিঠিতে যোগাযোগ থাকলেও পরে আসতে আসতে তাও বন্ধ হয়ে যায়। খুবই ভালো মানুষ ছিলো বশির আলী আর মরিয়ম বেগম। এমন সরল আর ভালো মানুষ আমি জীবনে দেখিনি।

এই আঠাশ বছরে সময়ের অভাবেই হোক আর বিভিন্ন কারনেই হোক, বাংলাদেশ আর যাওয়া হয়ে উঠেনি।

শোন মা, আমি জানি আমি বেশীদিন বাঁচবো না। আমার মৃত্যুর পর তুই বাংলাদেশে যাবি। ঢাকায় তোর নিজের বাড়ীতে উঠবি। আমার ছোটবেলার বন্ধু তোর ফয়সাল আংকেলকে টাকা দিয়ে রেখেছি, তুই যাওয়ার আগেই সে তোর জন্য একটা দামি গাড়ী কিনে রাখবে। আর এই কাগজে বশির আলীর ঠিকানা লিখে রেখেছি, তুই তোর আসোল বাবা মার খোঁজ নিস মা। আমি জানি না তারা বেঁচে আছে না মারা গেছে।

রেনেসাঁর চোখ দিয়ে ফোটা ফোটা পানি পড়ে। সে কোন কথা বলে না। এর নয় দিনের মাথায় রেনেসাঁর বাবা রায়হান চৌধুরি মারা যান।

এতক্ষন মরিয়ম বেগমের দু'হাত চেপে ধরে বাবার কথাগুলি বিদেশী পরী মনে করে।
সে মরিয়ম বেগমকে জাপটে ধরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে।

মরিয়ম বেগম বিদেশী পরীর কান্নার কারণ কিছুই বুঝতে পারেন না, তবে মরিয়ম বেগমের কাছে মনে হচ্ছে, বিদেশী পরীর শরীরের গন্ধ আর নি:শ্বাসের শব্দ তার খুব পরিচিত।

তিনি বিদেশী পরীর শরীরে তারই রক্তের ঝড় শুনতে পাচ্ছেন।

-মশিউর রহমান খোকন
-আমার ছোট গল্প-

" স্পন্দন "
------ মনিরা ফেরদৌসি

পলাশ রাঙা ফাগুন এলো
শীতের পরশ মিলিয়ে গেলো
লাল পলাশের রঙিন হাসি
প্রাঙ্গণে আজ বাজলো বাঁশী।

হাসছে পলাশ ডালে ডালে
খেলবো হলি দলে দলে
নানা রঙের অনুভূতি
আসবে নেমে প্রকৃতিতে

প্রেয়সীকে করবে মাতাল
রঙ লাগিয়ে স্নান করিয়ে।
প্রাণ-চঞ্চল নেচে গেয়ে
রঙ লাগিয়ে সারা মুখে

কোকিলের কুহুতানে
শিমুলের ডালে ডালে
দুজনে মেতেছে
প্রেমের আলিঙ্গনে

নীলের দিগন্ত আজ
আবীরে রঙীন হবে
বসন্তের আবাহনে
কৃষ্ণচূড়ার লালে।

রক্তকাঞ্চনে লেগেছে দোলা
মন রাঙিয়ে সারা বেলা।।

১৫ ফেব্রুয়ারীর রিসিপ্ট
মুন্সি দরুদ মহম্মদ ওয়েছ

১৫ ফেব্রুয়ারীর রিসিপ্ট দেখলে
আমার চোখের পানি কশটা হয়ে
গাল বেয়ে গড়ে পড়ে বালিশে ।
জীবনের পাসবুক আপডেট করে
দেখি এখনও ৯৩২৫ টাকা জমা আছে ।
সেদিন মেরিনার বুকে গিয়েছিলাম
তার ভালোবাসার দৌলতে ।
তিলতিল পরিশ্রমের ফসল
সে আমাকে দিয়েছিলো
বিনিময়ে খোঁপায় লাল গোলাপ চেয়েছিলো ।
সামসুং গ্যালাক্সি ডিসপ্লেতে
ইমুতে আমার মুখ দেখেছিলো
ফোনের কথায় আমার হৃদয় বুঝেছিলো ।
আমি জীবনের কাছে চির ঋণী
চির কলঙ্কিত এক পুরুষ ।
মিথ্যাবাদী ছিলাম, নিজের ভুল বুঝে
হয়েছি সত্যবাদী, আজও পড়ে
চোখের পানি টপটপ !
যে সত্য হারিয়ে যায় সেই সত্যের জয় হয় না
যতই কাব্য লিখি সত্য ফিরে আসবে না
মন পুড়ে যাবে
হৃদয়ে ভালোবাসা আসবে না ।
নিজেকে বেঈমান মনে হয়
নিজেকে অপরাধী মনে হয় ।
যে ভালোবাসার মূল্য বুঝিনি
সেই ভালোবাসা ফিরে পাই না
জীবন হয়েগেছে এক ভয়ংকর হায়না ।
জীবনের প্রতিটি সিঁড়ি বেয়ে
সে উঠত নামত, তার কষ্টের কথায়
আমার হৃদয় হাহাকার করত !
জানি না আমি কোন সে পুরুষ
যাকে কখনোই ভালোবাসতে পারিনি
সন্দেহ, রাগ আমাকে ঘুন ধরিয়ে ছিলো
জীবনের শেষ ষড়যন্ত্র যেন জেল হত্যা দিবস
ভালোবাসা হত্যায় বিচ্ছেদ সে ও আমি
না এপার, না ওপার !
শুধু হাইকমিশনের স্টাম্প দেওয়া ভিসা, পাসপোর্ট বন্দি,
পাসপোর্টের বাকি পাতা শাদা,
দশ বছরের ভ্যালিড ।
কিন্তু দশ বছর বাঁচবো তো ?
নাকি দেশ ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট করিনি ?
নাকি গৃহ ত্যাগের জন্য ভারতীয় পাসপোর্ট ?
আমি আর তো কোলের শিশু নয়
এখনও কি মায়ের অনুমতি নিতে হবে ?
কেন পায়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখে বুঝি না
তাই আমি জীবনের পথ চলা ভাষা খুঁজি না
হয়তো গড় আয়ু ৬০টি বছর
যৌবন থেকে কাটাতে হবে
কেঁদে কেঁদে দিনরাত কাটে তবে ।
যৌবনকাল কবর পর্যন্ত !!
কিন্তু সে একা নীরবে কাঁদবে
বাঁধবে হৃদয় যুদ্ধ, ক্ষুব্ধ হবে আমার প্রতি
শুধু কলঙ্কিত কান্না
কারণ আমি তার হৃদয় বুঝিনি
আমার হৃদয় কেউ খুঁজেনি ।
আমাকে আজও কাঁদায়
১৫ ফেব্রুয়ারীর রিসিপ্ট ।

“““ শুধরে নিও পাষন্ডতা ”””
সালামিন ইসলাম সালমান

সুললিত গ্লানিময় আর সীমাহীন নিষ্ক্রিয়তার তীব্র কটাক্ষে পিষ্ট মনুষ্যত্ব
শত বাহারী মর্যাদা ভরা জয়গান; ধিক্কারের পরতে পরতে,
অথচ নিপীড়নের কুয়াশার আবর্তে ক্ষুধিত হিংস্রতার উদাসীন চোখে -
নিমজ্জিত মানবতার হাহাকার ভরা কলঙ্কের সমুদয় সম্ভাবনা,
লাঞ্চিত বেদনায় মজলুমের আর্তনাদে ঘরে ঘরে জেগে উঠেছে ক্রন্দন !!!
.
মানবতাবাদ যেখানে মৃত্যু উপাখ্যানের মিছিলে গ্লানির হোঁচট খায়
নিরাশার ছবিগুলো কৈফিয়তের আঙুল নেড়ে শোষনের আহাজারী শোনায়
বিপরীত জীবনবোধ ভোরের প্রতীক্ষার গতিপথ ঠাহর করতে ব্যর্থ ওখানে !!!
.
যেখানে চোখ মুছে দেখেছো কড়কড়ে তাজা সকালটা মিষ্টতায় ভরে গেছে
কত শুনেছো তোমরা কাঁধে কাঁধ রাখা পুনর্জাগরণী গান,
পড়েছো কত রূপক কবিতা, বয়েছো জাতির পূর্ণ সম্মান।
তবুও অতৃপ্তির ঔদাসীন্যে নসিবে ভর করেছে নষ্ট মানসিকতা -
বিকৃত চিন্তায় বিষের বাণে ব্যাহত মানবতার মনে আজ কৌতুহলের ভিড় !!!
.
তোমারি লালসার খঞ্জরে রক্তের শ্বাসনালীতে একেকটি আঁচড় লেগেছে
লোভাতুর কামনাতে উলঙ্গ দেহখানা ঠকঠক্ করে কেঁপে উঠে এপারে,
সম্পদ, ক্ষমতা আর সম্ভোগের বাতুলতায় দানবী মুখোশ উন্মোচিত হয়েছে
প্রকৃতির ছায়াবীথি ঘুরে দেখার সাধ, আজ অবাঞ্চিতই রইলো আড়ালে -
পরম্পরাহীন বাসি নেশার ঝলকে কেন বা এমন করেছো বলো !!!
.
আদিমতার নিগ্রো দহনে মমত্ববোধের গোড়ায় পচন ধরে গেছে
তৃপ্তিহীন তিক্ত কামনায় সাগরের জলেও বুনো তৃষা মেটেনি তোমার,
অশ্রান্ত মনোবাসনায় কুৎসিত মগজে সরলতা নিধনী অভিযান চালিয়েছিলে;
চরিত্রহীন নির্যাস ছড়াতে ছড়াতে কামনার রসালো কেচ্ছায় মেতেছো -
এতটুকু যৌনতা আর অর্থালোভে পাশবিকতার কুড়াল মেরেছিলে উদ্ভ্রান্তের মত
প্রলাপের ঘোরে বাঁচতে দাও বলা হাহাকারে তোমার পশুত্ব কমেনি !!!
.
তোমারি বর্বরতার বেড়াল থেকে মুক্তি মেলেনি পাঁচ বছরের সুজাতার-
সামান্য ক’টি পয়সার বিরোধে প্রতিবেশির বিবর্ণ অবয়ব দেখার দ্বিধা লজ্জায়
খবরের শিরোনামে ভেসে আসা সকল আহাজারিতে আঁৎকে ওঠে ধরনীও,
ভাবছো কেন এই অতীত আনয়ন, কেন এই কবিতার মাঠে শয়ন?
আমাকে চিনবে- আমিতো তোমারি স্ব-হস্তে সৃষ্ট জুলুমের আর্তচিৎকার !!!
.
ধৃষ্টতার একেকটি বুলেট অপেক্ষায় আছে তোমারি শরীরে স্থায়ীত্বের আশায়
মোহের তাড়নায় সৃষ্ট কঙ্কালের সমাবেশে-
দীর্ঘশ্বাসের শোনিত ধারায় পদদলিত হবে দম্ভোক্ত প্রাণশক্তি,
স্বার্থকতার বিচারে উত্তেজিত গলায় চিৎকার করে বলবো--- তুমি পাপী !!!
.
মনুষ্যত্বের কাপড় খুলে তুমি জাহেলিয়াতের ধারাতে নগ্নতা দেখাও -
কালো থাবার আগ্রাসনে কপালে লিখেছো অশ্লীল খুদেবার্তা,
বুকের উপরে ধ্বংসের সীল এঁটেছিলে সামান্য প্রয়োজনে;
মানসিক ব্যভিচারে নিঃস্তব্দ আত্মাটা সেই ভয়ংকরতায় শিউরে ওঠে -
ধর্ষিত কন্ঠ তোমারি বেহায়া নামটি চেঁচিয়ে বলবে ----- তুমি উল্লুক !!!
.
আমি সেই আর্তনাদগুলি বলছি; আমাকে চিনতে পারো?
যার যৌবন শোষনে সাঁয় দিয়েছিলো স্বেচ্ছাসেবী স্পর্ধার স্রোতধারা -
চক্ষুমনি নিভিয়ে শরীরের ঘুণ ঝরিয়েছো ধূপের ধোঁয়ার মতন;
কঠিন মুঠিতলে যে যৌবন ছিঁড়ে ফেঁড়ে পড়েছিলো সজ্জিত পাষানস্তুপে !!!
.
আমি সেই হাহাকারগুলি বলছি; চিনতে পেরেছো কি আমাকে?
ক্ষমতাসীন বাহুবলে দূর্যোগের ঘনঘটায় নির্দোষে করেছিলে প্রাণনাশ -
পেরেশানের সরলতায় তুচ্ছ আমিত্বকে আপন ভেবে যাকে সৎকার করেছিলে;
সেই গগণ বিদারী চিৎকার আমি ---
শৌখিনতার জোসনায় মাঘরাতে যে ভোগের স্বীকার হয়ে কেঁদেছিলো !!!
.
আজই অভিসম্পাতের কুঁড়েঘরে তোমারি স্থান দিবো না -
সতর্কতার হামদ শুনতে পাও? -- ধ্বংসের মাঝ নদে তুমি ভেসে এসেছো;
মনের কপাট খুলে খোলসায় বলছি --
এবার মানুষ হও
এবার মানুষ হও তুমি-
এবার মানুষ হও !!!
.
রচনার সময়কালঃ ২৫ জানুয়ারী ২০১৭ ইং- ( অফিসের বিরতীতে )
-- গ্রন্থস্বত্ব সংরক্ষিত।Image may contain: 1 person

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget