মে 2015

অন্ধকার
- আশরাফুল ইসলাম শিমুল

"সময় ফুরিয়ে গেছে রে পাগলী
বয়ে চলা নদীর স্রোত ধরে,
অপেক্ষার এক শতাব্দী পার হয়ে
বাঁইশটা চৌরঙ্গীর অন্তবাসে এসে
এখন আর আত্মবিলাপ করি না ।
সময়ের সাথে সাথে বদলে গেছে অনুভব
ক্যানভাসের বুকে চিড়ে আর আর্তনাদ বের হয়না,
স্নায়ু গুলো বদ্ধ স্মৃতির দহনে নির্জাতিত হয়না,
ব্যস্ত হৃদয়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলে মরিচিকার দল ।
স্মৃতির পাহাড়, ক্ষয়ে ক্ষয়ে
বহুবর্ণের নারীতে স্বর্গবিলাসে লিপ্ত,
পথভ্রষ্ট নাবিকের মতো নিত্যনতুন
সঙ্গ খুঁজে চলে লোভাতুর দৃষ্টি ।
পাপাচারে বিধিবদ্ধ দরখাস্ত
হাতে কড়া, বন্দীশালায় আবদ্ধ শতশত নিপীড়নে
জর্জরিত ক্ষতবিক্ষত দেহ চাষ ।
উষ্ণ হৃদয়ে বয়ে চলা রক্তস্রোতে ভেসে উঠে
তোর নিরবধি প্রেম,
চুপিসারে তোর জন্য কাব্য লিখে যেত নিরবে,
তবুও বিবেক স্বর্গরাজ্য চায়না, চায় বিভীষিকা,
কই ছিলি এতোদিন, এতটা প্রহর ?
বড় দেরী করে ফেলেছিস রে পাগলী,বড় দেরী -
এখন চারিদিকে শুধু অন্ধকার, ধুধু অন্ধকার
বিদিশার নেশায় আসক্ত হাহাকারের ক্রন্দন,
পাপাত্মাদের ভীড়ে আমি হারিয়ে গেছি
আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না, কোনদিন না,
তুই ফিরে যা আলোতে, উজ্জ্বল আলোতে " ।

অরণ্য
- মেহেদী হাসান আকাশ

বসে আছি পথ চেয়ে
তোমার অপেক্ষায়
গুনছি তারা হাজার মেলা
রাতের আকাশে
আসবে কবে বলবে কথা
পাহার অরণ্যের মাঝে
পড়বে শাড়ি,দিবে কপালে টিপ
বসবে আমার পাশে
তোমার সাথে বলবো কথা
নীরব স্তব্দতার মাঝে
আসবে কবে সেই শুভদিন
তার ই ভাবনায় আছি
আর হাটছি আমি একা একা
অজানা কোনো দিকে
গহিন অরণ্যের মাঝে ।

রুশি
- শিমুল শুভ্র (উদ্যমী কবি)

লাজময়ি মুখে চোখের পলক ঠোঁটে তার হাসির ঝলক
স্বচ্ছ আয়নার মত দেখি নিজেকে তার অধরের আলোয়,
যে চাউনিতে মৃদু হাসে আঁধার আলোয় ঝরে মুক্তা রাশে
আকাশতলে ঝলক জ্বলে,সুখের পলে গভীর ভালোবাসায় ।
জাম কালো চুলে উড়ে উড়ে দোলে,মায়াবী ঐ আঁখি তলে
আলোর ঝরণায় রঙিন স্রোতে,অঙ্গ'দে ভরা রূপের পরতে,
ঐ অন্তর্যামী শিল্পীর কারুকাজ,অতি নিখুঁত বুনট তরুরাজ
স্বপ্নে আঁকা শিশিরের শব্দের মত তাকে দেখলাম ঐ শরতে ।
কোন এক ঘুম ভাঙানো পাখির ডাকে,দেখলাম চলার বাঁকে
আঁচলখানি উড়ছে হিমেল হাওয়ায়, আনজান মন দোলনায়,
দোলা দিলো সন্ধ্যা ক্ষণে শ্বাস - নিঃশ্বাস অশান্ত প্রতি রণে
ভরসাভরা প্রাণ আনন্দময় গান,তার যৌবন মধুর মোহনায় ।
আমি দেখেছি শিল্পীর স্বরলিপির কারুকার্য সুর অনিবার্য
রূপের পরতে পরতে ঢেউ খেলে যায় নবীন আলোয় মুখ,
আসন পেতেছে ছোট্ট তিলটি তার কোমল গালে মায়াময়ী
যেন ঐ আঁধারের বিশাল আকাশে এক টুকরো চাঁদের সুখ ।
যে দিকে তাকায় ভূবন মাঝে মুখ ভাসে তার সদা অঙ্গরাজে
ভোরের কোণে কিরণ লাজুক হাসে,মনমানবী শীতল অমুল,
আমি যেথা খুঁজি সদা সুখের খনি,ভেসে উঠে তার চক্ষু মনি
তৃষ্ণাভরা এই গভীর প্রতুল সে যে আমার প্রিয়া রুম্পা শিমুল ।

রচনাকাল
১৪।১১।২০১৪

প্রেম কম্পিত
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

স্বর্গপল্লিত দেখেছি মেঘাচ্ছন্ন আকাশ
পানে...!
ঠোট চুম্বনের পরিতৃপ্তি খুজেছি,
স্বর্গরাজ্যের ক্ষুদাময় প্রেম প্রাঙ্গনে !
তোমার শিশির ভেজা নবপ্রভাতে
আমি কম্পিত, আর হৃদয় বরই সঙ্কিত,
এইকি ঘাটি ফুটন্ত প্রেম কম্পন !

না...!
কোন ঝলনার রূপে কলঙ্কময় দর্শন,
আর যাই হোক...
আমার হৃদয় নিঙরানো প্রেম দিয়ে স্নানে হবে পরিশুদ্ধ,
নতুনত্ত পেয়ে প্রেমের স্বাধ হবে পরিতৃপ্তি ।

অপরুপ চন্দ্র
- ইয়া হাদিয়া সোনামনি

রাত নিঝুম, চোখে নেই ঘুম,
বসে আছি একা একা ।
দেখছি চেয়ে আকাশে হাজারো;
তারার মেলা । পাশে আছে,
ছোট বড় গাছের বাগানখানি,
তার মধ্য দিয়ে দেখা যাচ্ছে,
পূনিমা রাতের ঐ চন্দ্রখানি ।
কী সুন্দর রুপ তাহার !!!

যার ঝলকে চলে গেছে আমার,
একাকী থাকার দুঃখটা ।
আমি এখন আছি ঐ চন্দ্রের রুপের মহীয়ান হয়ে
লিখছি ঐ চন্দ্র কে নিয়ে কবিতা ।

অপেক্ষা
- মেহেদী হাসান আকাশ

অপেক্ষায় আছি তোমার জন্য রাস্তার
সেই মোড়ে ৷
আসবে কখন বলবে আমায় ভালোবাসি
তোরে ৷
তোমার হাতটি ধরে হাটবো আমি নদীর
সেই পাড়ে ৷
বলবো কথা দুজন মিলে
দুজনের চোখের দিক চেয়ে তুমি বলবে
আমায়
তুমি থাকবে আমার অপেক্ষায় ? বলবো
আমি সারাটা জীবন থাকবো তোমারেই
অপেক্ষায় ৷

ধুসর মেঘ
- আশরাফুল ইসলাম শিমুল

"ধুসর আকাশটার বুকে এক ফালি মেঘ
ছুটে চলেছে ভেসে ভেসে গন্তব্যহীন নীড়ে,
আকাশের বুক ছুঁয়ে নীল কষ্টরা বেভুলে খোঁজে অরণ্য,
ব্যর্থ প্রলাপের ডাঁকে নিঃসঙ্গ একাকীত্বকে ঘিরে স্পর্শকাতর স্মৃতির দেয়ালে লেগে আছে নিঃস্বাসের ঘ্রাণ ।
আজ মেঘ গুলো ছন্নছাড়া,
রাতের তারায় মিশে গেছে ধুসর সবটুকু রঙ,
তারাগুলো ঢেকে গেছে মেঘেদের আড়ালে ।
এক ফালি জোৎস্না স্নান বহুদূরের অপেক্ষায়,
আনকোরায় জীবন্ত এক প্রহরী স্মৃতি সমারোহ" ।

প্রার্থনা
- আশরাফুল ইসলাম শিমুল

"আমি যে তোমারী দুয়ারে এসে দুহাত পেতেছি
ফিরায়ে দিওনা তুমি, মোর অশ্রু আঁখি আঁখি
পাপে পাপে জর্জরিত হয়ে, পূর্ণতার বস্তা গিয়াছে ঢাকি !
লালসার স্বীকারে ধর্ষিত মোর সকল কর্মরাজী
মাপ করো প্রভু, মাপ করো মোরে ।
শক্তি দেয় মোরে...
দুর্বলচিত্তকে করো মুক্ত
সকল বন্ধ দয়ার খুলে দেয় বিভীষিকাময় ক্রন্দনের দাসত্ব থেকে,
পাপের পাহাড় ধবংস করে জ্বালিয়ে দেয় প্রদীপ
নিগর্সশক্তির প্রেমে করো হে যুক্ত
প্রকৃতির প্রেমে মমোচিত্তে জাগ্রত করো সত্ত্বা
পাপ মোচনের দ্বার খুলে দেয় প্রভু
আমি যে তোমার দারস্থে এসে দুহাত পেতেছি
ফিরায়ে দিওনা তুমি, মোর অশ্রু আঁখি আঁখি ।
জাগ্রত করো হে প্রভু আমার পূর্ণ কিরণ
আলোর পথের সন্ধানে করাও সমর্পণ
আমি যে আত্মসমর্পণ করেছি তোমার দুয়ারে এসে
মাপ করো প্রভু মোর সকল পাপ " ।

চিরকুট
- আশরাফুল ইসলাম শিমুল

"হাতের আঙ্গুল কেটে
নিভৃতে বসে বেলকুনিতে,
পরন্তু বিকেল গড়িয়েছে গোধূলির স্নানে
পাংশু মেঘের ভেলায় নদীর বুক থেকে
সাদা বকেরা ঘরে ফেরার আয়োজনে ব্যস্ত,
ততক্ষণে দু এক ফোঁটা রক্ত জমে জমে
জমাটবাঁধা ভালোবাসায় ঘর বেধেঁছে,
মাঝে মাঝে পিপীলিকার অস্তিত্ব অনুভব করছি ক্ষতস্থান জুড়ে ।

কি লিখবো তোমায় নিয়ে এই চিরকুটে ?

আগে তো কত লিখেছি ডাইরির পাতায় পাতায়
লাল, নীল বেশুনী, কালো কলমের কালি দিয়ে,
আজ লিখতে বসেছি আঙ্গুল ছুঁয়ে ছুঁয়ে পড়া রক্ত দিয়ে ।

সন্ধ্যা গড়িয়ে কখন যে গভীর রাত হয়ে গেছে
বুঝে উঠার আগেই ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখি রাত একটা !

শহরের সব কোলাহল থেমে গেছে
মৃদু বাতাস শরীরের শিরায় শিরায় বিচরণে মহা ব্যস্ত,
জ্যোৎস্না ভরা মায়াবী রাতে
জরাজীর্ণ শহরের বুকে ভেসে চলে হাহাকার
ইট পাথরের দালানকোঠায় রুদ্ধশ্বাসের নিদারুন নিঃশ্বাস,
ঝিঁঝিপোকার ডাক নেই,
ডাহুকী পাখির কলরব নিঃস্তব্ধতায় শূণ্য,
জোনাকি পোকার সোনালি আলো বিলীনপ্রায় ।

নীল কষ্টেরা বেভুলে চায়ের কাপের ধোঁয়ায় মিশে
একাকার হয়ে গেছে,
সতেজতা উড়ে গেছে দুর গগনস্পর্শী কালোমেঘের দলে ।

তবুও আমি রাত জাগা পাখি হয়ে
তোমার চিরকুট হয়েই বেচেঁ থাকবো
তোমার শ্বাস প্রশ্বাসের নিরবতায়,
দেখা হবে চিরকুটে যুগের পরে আরেক যুগে,
তোমার আমার আধোছায়াতে জাগ্রত প্রেম
নেশায় নেশাগ্রস্ত বন্দী পাখিটি ইমোটিক হয়ে চিরকুটে জীবন্ত প্রহরী হবে" ।

আমি সিগারেট বলছি
- ডাঃ ফারহানা মোবিন


আমার নাম সিগারেট । বিড়ি নামেও আমি পরিচিত । আমি সাদা কাগজে মোড়ানো । দেখতে কলমের মতো একটি মাদকদ্রব্য । আমাকে দেখতে শান্তির প্রতীকের মতো মনে হয় । কারণ আমি দেখতে সাদা । কিন্তু আমি ভীষণ ভয়ানক একটি মাদকদ্রব্য । আমি খুব সহজলভ্য একটি মাদক । আমি পৃথিবীর সব দেশে, শহরে এবং গ্রামেও পাওয়া যায় ।


যে কোন দেশের মানুষের মধ্যে আমি খুব দ্রুত নেশা তৈরী করতে পারি । ছোট, বড় নারী, পুরুষ যে কেউ আমার নেশাতে আক্রান্ত হয় । দুই থেকে তিন দিন কয়েকবার আমাকে গ্রহণ করলেই, আমি নেশাতে পরিণত হই । যে কোন দেশের, যে কোন পরিবেশের মানুষকে আমি দ্রুত আসক্ত করে ফেলি । আমার অপর নাম ‘ধূমপান’ ।


আমার দেহের ক্ষতিকর পদার্থগুলো রক্তে মিশে নেশা তৈরী করে । রক্তে মিশে যাবার পরে মস্তিষ্কের স্নায়ুগুলো বার বার ধূমপান করার জন্য মনুষকে বাধ্য করে । পরিণামে তীব্র নেশাতে পরিণত হয় । তখন ধূমপান হয়ে যায় জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি সদস্য ।


সিগারেটের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর পদার্থটির নাম হলো ‘নিকোটিন’ । নিকোটিন দেহের রক্তের সাথে মিশে পুরো দেহের অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপকে পরিবর্তন করে দেয় । তখন দেহ বার বার নিকোটিন কেই চায় । মানুষ না চাইলেও তখন নেশা হয়ে যায় । সিগারেট খাওয়া মানে ধূমপান । আর ধূমপান মানেই বিষপান । সারা পৃথিবী জুড়ে রয়েছে নানান রকমের সুন্দর সুন্দর প্যাকেটে আর বাক্সে ভরা সিগারেট । নামীদামী কোম্পানিরও রয়েছে প্রচূর সিগারেট । কিন্তু যতো বড়ো কোম্পানিরই হোক না কেন সিগারেট বা ধূমপান হলো বিষপান ।


এই বিষপান দেহে তৈরী করে নিকোটিনের প্রতি নির্ভরতা । যা চাইলেও ছাড়া যায় না । মাত্র ৪-৫ দিন নিয়মিত খেলেই নেশা হয়ে যায় । তখন সিগারেট না খেলে ভালো লাগে না । মাথা জ্যাম হয়ে আসে । মাথা ঠিক মতো কাজ করছেনা । এই ধরণের অনুভূতি হয় ।


অর্থাৎ সিগারেটের নিকোটিন দেহের মধ্যে এমনভাবে বাসা বেধে ফেলে যে, তখন নিকোটিন ছাড়া ভালো লাগেনা । দূর্বল লাগে, অস্বস্তি আর বিরক্তিতে মাথা ঘুরায় । অনেকের ভয়ঙ্কর মাথা ব্যাথা শুরু হয় । যারা উচ্চ রক্তচাপের রোগী তাদের রক্তচাপ পর্যন্ত বেড়ে যায় বিরক্তি আর অস্বস্তির কারণে । ছোট্ট একটি জিনিস কিন্তু দেহের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর । একটি সিগারেট দেহের একবিন্দু রক্ত নষ্ট করে ফেলে । দেহের রক্তের মূল উপাদান হলো লোহিত রক্ত কণিকা । একটি সিগারট একটি লোহিত রক্ত কণিকাকে দূর্বল করে দেয় ।


লোহিত রক্ত কণিকা দূর্বল হয়ে পড়লে মানুষও দূর্বল হয়ে যায় । তখন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে আসে । ফলে দেহে বাসা বাথে নানান রকমের অসুখ ।


আমি ‘সিগারেট’ বলছি, তোমরা আমাকে ঘৃণা করো । আমার কোন ভালো দিক নায় । আমি শুধু তোমাদের ক্ষতিই করি । আমার উপকারী কোন গুণ নায় । এই পৃথিবীতে শুধু সিগারেট না, প্রতিটি মাদক দ্রব্যই হলো স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ খারাপ । মাদক দ্রব্য দেহের প্রতিটি অঙ্গের উপর ফেলে বিরূপ প্রভাব । ঘুনে ধরা পোঁকার মতো মানুষকে দূর্বল করে দেয় । মৃত্যু এসে দ্রুত নিয়ে যায় না ফেরার দেশে ।


আমি ‘সিগারেট’ বলছি । তোমরা আমাকে ঘৃণা করো । যারা আমাকে গ্রহণ করেছে, আমি শুধু তাদের না, যারা আমাকে গ্রহণ করেনি আমি তাদেরও ক্ষতি করি । যদি একটি বাসায় একজন ধূমপান করে, তবে অন্য যারা ধূমপান করেনা তাদেরকেও হুমকির মুখে ফেলে দেয় ধূমপান ।


ধূমপান বলতে বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, তামাক সব কিছুকেই বোঝায় । যে কোন প্রকারের ধূমপানই হলো বিষপান । গর্ভস্থ শিশুর জন্যও ধূমপান ভীষণ খারাপ । যেসব মা বাবা ধূমপান করেন, তাদের সন্তানেরা হয় নানান রকম রোগের শিকার । অন্য শিশুদের তুলনায় তারা হয় দূর্বল ও কম মেধা সম্পন্ন । জীবন যুদ্ধে তারা পিছিয়ে পড়ে । কোন বাসায় একজন ধূমপান করলে ধূমপানের সময় নির্গত হওয়া বিষাক্ত গ্যাসের জন্য বাসার অন্যরাও ক্ষতিগ্রস্থ হয় । গর্ভবতী মায়ের শিশুরাও হয় বিভিন্ন অসুখের শিকার ।


মায়ের পেটে থাকলেও তারা আক্রান্ত হয় বিভিন্ন জটিলতায় । যেমন - নির্দিষ্ট সময়ের পূর্বেই তাদের জন্ম হতে পারে, যাদেরকে বলে প্রিমেটিউর (Premature) বেবি । অনেকের শ্বাসকষ্টও হয় জন্মের পূর্বে (পেটের মধ্যে) ও পরে (জন্মের সময় বা পরে) ।


ধূমপানের সময় নির্গত হওয়া বিষাক্ত গ্যাস বাতাসে মিশে পুরো পরিবেশকে করে তোলে বিষাক্ত । যা ছোট বড় সবার জন্য ক্ষতিকর । সিগারেট পুরো দেহের সব অঙ্গকে বৃদ্ধ করে তোলে । ত্বকে আনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া । দেহের সবগুলো অঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ করে ফুসফুসকে । (ফুসফুস বুকের মধ্যে অবস্থিত দেহের একটি জরুরী অঙ্গ; যার মাধ্যমে আমরা নিঃশ্বাস নিই) ।


দীর্ঘবছর প্রচুর পরিমাণে সিগারেট খেলে শ্বাসকষ্ট থেকে যক্ষ্মা, ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে । যারা ধূমপান করে তারা এ্যাকটিভ (Active) স্মোকার (Smoker) আর যারা ধূমপায়ীর পাশে থাক বা ধোয়া ধূমপায়ীর আশে পাশে যাদের মধ্যে পৌছে তারা হলে প্যাসিভ স্মোকার (Passive Smoker) ।


এ্যাকটিভ আর প্যাসিভ স্মোকার দুজনেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় । তাই বিরত থাকুন ধূমপান সহ সব ধরণের মাদক থেকে ।


ধূমপান, কারখানার বিষাক্ত ধোয়া, পরিবেশ দূষণে দিনে দিনে বৃদ্ধি পাচ্ছে কার্বন মনো অক্সাইড, ক্লোরোফ্লুরো কার্বন সব যাবতীয় ক্ষতিকর গ্যাসের পরিমাণ । এতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমরা বিভিন্ন শারীরিক মানসিক জটিলতার শিকার হচ্ছি । যা কখনোই কাম্য নয় ।


আসুন আমাদের দেহ, মন, পরিবেশকে আমরা ভালো রাখি । ধূমপান সহ যাবতীয় মাদককে ‘না’ বলি । শুধু এই দেশ নয়, পুরো পৃথিবীকে ভালো রাখার জন্য আমরা ধূমপানকে ঘৃণা করি । তাই আমি ‘সিগারেট’ তোমাদের আবারো বলছি - “তোমরা আমাকে ঘৃণা করো” ।


- ডাঃ ফারহানা মোবিন
মেডিকেল অফিসার, গাইনী এ্যান্ড অবস,
স্কয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

ভাসবান ঘর
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

দাম্ভিকতার কষাঘাতে ছুঁরে ফেলে ছিলে,
আকাশে ভাসমান স্বপ্ন, আর মুখ ভরা
চাঁদনি হাঁসি !
আজ হোক না বাঁধা ঘর, জমাট বাঁধা সহস্র
মেঘের পর...

মাঝে মাঝে অদৃশ্য হয়ে মেঘ, বৃষ্টি ধারায়
পতিত মাটিতে... !
তবুও থেমে নেই ঘর, প্রতিটি নদীর পর, বয়ে
চলে অনন্তকাল ।
যাইনি ধ্বংস হয়ে গুরুম গুরুম ভয়নাক
মেঘের গর্জনে !
পরিতৃপ্তি নবপ্রভাতে উদায়ীমান সূর্য,
আর...
গৌধুলি সন্ধ্যালগ্নে রক্ত রঙিন সূর্যওয়াস্ত ।
তোমার দাম্ভিকতা ছুরে ফেলেছিল,
আমার"
অনন্তকাল ধরে বয়েচলা রঙিন স্বপ্ন ।

পহেলা বৈশাখ
- মেহেদী হাসান আকাশ

টাক ঢুমা টুম ঢোল বাজে খুশির বৈশাখ
বছর ঘুরে আবার এলো
পহেলা বৈশাখ
বৈশাখ এলে মেলা আসে
অনেক লোকের ঢল
সকাল বেলা পান্তা - ইলিশ পাড়ায় পরে
রোল
পাড়ায় পাড়ায় সব দোকানি খোলে
হালখাতা, দোকানি - খদ্দের মিলে করে
শুভ - হালখাতা ৷
সকাল সকাল উঠে সবাই
শোভা যাত্রায় যাই,
নানা রঙ্গের সং সেজে সবাইকে শুভ-
নববর্ষ জানাই ৷

আসছে দিন
- ইয়া ছাদিয়া রুকাইয়া

আসছে দিন বদলে যাওয়ার,
আসছে দিন আকাশ ছোওয়ার,
আসছে দিন আলোর পথে,
আসছে দিন এগিয়ে যাওয়ার,
আসছে দিন স্বপ্ন দেখার,
আসছে দিন ঘুড়ে দাড়াবার,
আসছে দিন প্রতিবাদের,
আসছে দিন অন্যায়ের সাথে লড়াই করার,
আসছে দিন সোনার বাংলা গড়ার ।

ভাবনা
- মেহেদী হাসান আকাশ

প্রচন্ড দাবদাহে দাড়িয়ে আছি
শুধু তোমারই অপেক্ষায় তোমাকে বলবো
ভালোসাবি তোমায় তোমার হাতে
পড়িয়ে দিব
আমার ভালোবাসার আংটি
থাকবো তোমার দিকে তাকিয়ে শুনবো
তোমারেই কথা
তোমারেই হাতটি ধরে
হাটবো নদীর পাড়ে
আমি জানি এসব কিছুই হবেনা কারন এসব
তোমায় নিয়ে আমার ভাবনা ।

বিশ্বময় বাংলাদেশ
- শোভন কর্মকার

সকলেই জেনে গেছে,
তার আগে জেনে গেছে রজনী ভাঙ্গা প্রভাত,
কালকের পৃথিবীটা আমাদের হবে
মাটির উঠানে বসবে রোদের মেলা,
বাংলাদেশের মাথায় উঠবে মুকুট রাঙা,
বিশ্ব বিবেক বলবে 'জয় বাংলা' ।

নয়ন ভরা স্বপ্ন
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

আমার নয়ন ভরা স্বপ্ন সাঁজিয়েছি,
রেখেছি না নয়নে,
যদি অশ্রু হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় ঝরে
বিলুপ্ত হয় অকালে,
তাই নয়ন ভরা স্বপ্নগুলো রেখেছি
সাগরে ভাসিয়ে পরিতক্ত ঝিনুক খোলসে !
সাগরের পারে আঁছরে পরে বারে বার,
জলের নৃত্যয় আবছা স্বপ্ন গুলো
ধুয়ে মুছে রূপ পায় নতুনত্বের !
আবার,
ভেসে যাবে সাগরের গর্জনে তর্জনের
মাঝে,মিশে যাবে সাগরের প্রতিটি
ঢেউয়ে, ঢেউয়ে.....
তবুও...হারাবে না অতল সমুদ্রগহীনে !
আমার নয়ন ভরা স্বপ্ন সাঁজানো,
পরিতক্ত ঝিনুক খোঁলোসে ।

ভরা পূর্ণিমার রাতে
- রুনু সিদ্দিক


রাতে ঘুমোবার সময় কিছুক্ষণ বই না পড়লে আমার ঘুম আসেনা । কাজী আনোয়ার হোসেন এর মাসুদ রানা পড়ছিলাম । ঘুম আসছিলোনা । কী ব্যাপার ! বইটা বন্ধ করে ঘড়ি দেখলাম । রাত দুইটা বেজে সাত মিনিট । খাটের পাশেই জানালা ছিলো । বাইরে তাকালাম । এমন অপরূপ দৃশ্য আমি আগে কখনো দেখিনি ! পূর্ণ জোছনা । চাঁদ থেকে যেন চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে কুসুম রঙের স্নিগ্ধ আলো । পাহাড়ের গায়ে চাঁদের আলো পড়ে রহস্যময় করে তুলছে পাহাড়টাকে ।


পাহাড়ের কাছেই একটা হোটেল এ উঠেছি আজ দুপুরে । অফিসের একটা কাজে চিটাগং এসেছি । হোটেলের পাঁচ তলার একটি রুমে শুয়ে ভাবছিলাম আমাদের ঢাকাতে এমন দৃশ্য একেবারেই দুর্লভ । মুগ্ধ হয়ে দেখছি চাঁদের রূপ । আমার ভাগ্য খুবই ভালো যে তিনদিন এখানে থাকছি, বাড়তি পাওনা হিসেবে পেয়ে যাচ্ছি এই ভরা পূর্ণিমা ।


সিদ্ধান্ত নিলাম আজ সারারাত জেগে থাকব পূর্ণিমার সাথে । এমন অপরূপ মোহনীয় রাত... জেগে থাকলে কোনো ক্ষতি নেই । চোখে চাঁদের আলো, ভাবনায় জেগে থাকার হিসেব নিকেশ । হঠাৎ করেই কান্নার মত করুণ একটা সুর ভেসে আসলো পাহাড়ের ওপাশ থেকে । নারী কণ্ঠের কান্নার শব্দ মনে হচ্ছে । প্রিয় কোনো কিছু হারানোর বেদনায় আকুল হয়ে কাঁদছে । কান্নার সুরটা আর্তনাদ হয়ে আমার কানে বাজতে লাগলো । কে কাঁদছে ! কেন কাঁদছে ! কান্নার শব্দ রাতের সৌন্দর্যটাকে ফিকে করে দিল । মনটা খারাপ হয়ে গেল আমার । কোথায় ভাবলাম না ঘুমিয়ে সারারাত গায়ে জোছনা মাখব ! কান্নার শব্দটা সব এলোমেলো করে দিল । রাত বাড়ছে... কান্নার সুরটা আরো করুণ আর ভারী হচ্ছে । শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়লাম । সকালে উঠে ব্যস্ত হয়ে গেলাম যে কাজে এসেছি তার জন্য ।


বিকেলে হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে ঘুম দিলাম । একটানা পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়ে জেগে উঠলাম রাত দশটায় । ঘুম ভাঙতেই জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম । আজো চাঁদ তার আলো বিলিয়ে দিচ্ছে পৃথিবীকে । মনে হচ্ছে আজ যেন আলোটা আরো বেশী উজ্জ্বল । যেন পাহাড়ের গায়ে ঘাস ভেদ করে মাটি দেখা যাচ্ছে । আজও ভাবলাম পূর্ণিমা দেখে রাত কাটিয়ে দেব । পাঁচ ঘণ্টা ঘুমিয়ে খুব সতেজ লাগছে ।


মাসুদ রানা বইটা হাতে নিলাম । কিছুক্ষণ বই পড়ব । কিছুক্ষণ জোছনা দেখব । বই পড়তে পড়তে ভুলেই গিয়েছিলাম রাতের সৌন্দর্যের কথা । কান্নার শব্দে ফিরে এলাম বাস্তবে । ঘড়ি দেখলাম... রাত বারোটা বেজে পঁয়তাল্লিশ মিনিট । গত রাতের একই কান্নার সুর ! করুণ ! অনেকটা স্বজন হারানোর মত । আবারো মনটা খারাপ হয়ে গেল । ভাবছি...কার মনে এত কষ্ট যে মাঝরাতে এভাবে কাঁদে ! কার জন্য কাঁদে ! এসব ভাবতে ভাবতে একসময় ঘুমিয়ে পড়লাম । খুব ভোরে উঠতে হল । আজকের মধ্যে অফিসের কাজটা শেষ করতে পারলে রাতের গাড়ীতেই ঢাকা ফেরা যাবে । সারাদিন ব্যস্ততার মাঝে কাটিয়ে সব কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় হোটেল এ ফিরলাম ।


এত ক্লান্ত ছিলাম যে বিছানায় শুতেই ঘুম চলে আসলো । ঘুম ভাঙলো রাত বারোটায় । ঘুম ভাঙার পর কিছুই বুঝতে পারছিলাম না । ধীরে ধীরে মনে হল আমার আজ ঢাকায় ফেরার কথা ছিল । যাওয়ার সময়টা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দিলাম । কী আর করা ! কাল সকালে প্রথম বাসটা ধরতে হবে ।


মুখ হাত ধুয়ে এসে সাথে করে নিয়ে আসা এক প্যাকেট বিস্কিট হাতে নিয়ে জানালার পাশে বসলাম । আজও চাঁদ তার আলো বিলিয়ে যাচ্ছে বাধাহীন । ভাবছি, আজো কি কান্নার সুর ভেসে আসবে পাহাড়ের ওপাশ থেকে ? যদি আসে তবে তার উত্তর খুঁজে বের করব । এই পণ করলাম মনে মনে । আজ আর বই হাতে নিলাম না । কান্নার শব্দ শোনার জন্য ব্যগ্র হয়ে কান পেতে ছিলাম । যেন আমাকে স্বস্তি দেয়ার জন্যই কান্নার সুরটা ভেসে আসলো । যে কান্নার জন্য আমার রাতের সৌন্দর্য উপভোগ করা হ্য়নি সে কান্নার উৎস আমাকে বের করতেই হবে । দেরী না করে বেরিয়ে পড়লাম রুম থেকে । তালা দিয়ে নিচে নেমে এলাম । রিসেপশনিস্ট জানতে চাইলো এত রাতে কোথায় যাচ্ছি । আমি বললাম, “এইতো একটু বাইরে থেকে হেঁটে আসি” । সে বললো, “বেশী দূরে যাবেননা । তাড়াতাড়ি চলে আসবেন” । আমি আচ্ছা বলে বেরিয়ে পড়লাম । হাঁটতে হাঁটতে পাহাড়ের কাছটায় চলে এলাম । ভাবছি কীভাবে যাব পাহাড়ের অপর পাশে !


‌পাহাড়ের আশেপাশে হাঁটছি আর পথ খুঁজে বেড়াচ্ছি । কাছে চলে আসায় কান্নার শব্দটা আরো তীব্র হল । মনে হয় যেন পেয়ে গেছি ! চাঁদের আলোতে পরিষ্কার দেখা গেল দুই পাহাড়ের মাঝখানে সরু একটা রাস্তা গেছে । সে পথে হাঁটতে শুরু করলাম । ছোট ছোট পাথরে যদিও হাঁটতে কষ্ট হচ্ছিলো তবুও কান্নার উৎস ধরে হাঁটছিলাম । একসময় পথ শেষ হল । ওই পাশে যখন পৌঁছলাম অবাক না হয়ে পারলামনা । অদ্ভুত সুন্দর বিশাল একটা মাঠ ! সবুজ ঘাসের কার্পেটে মোড়ানো যেন পুরো মাঠটা । কিছু দূর দূর একমানুষ সমান একটা করে ফুলের গাছ । সাদা রঙের অজানা ফুল ফুটে রয়েছে থোকায় থোকায় ! মিষ্টি একটা ঘ্রাণ ভেসে আসছে সেই ফুলের গাছ থেকে ।


সব সৌন্দর্য ছাপিয়ে কান্নাটা কোথ্থেকে আসছে তাই খুঁজছিলাম । একটু খুঁজতেই পেয়ে গেলাম । একটা গাছের নিচে একটা মেয়ে বসে আছে । কান্নাটা সেখান থেকেই আসছে ! দ্রুত হেঁটে তার কাছে গেলাম । আমাকে দেখে কান্না থামিয়ে সে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল । চোখ নয় যেন কোনো মায়াবী হরিণীর কাতর নয়ন ! যেন দুটি নীল সমুদ্র... ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে তার দুই কপোলে ! এত অপরূপ রমনী আমি জীবনে দেখিনি । যেন স্বর্গের অপ্সরী !


যে গাছের নিচে সে বসেছিল সে গাছের ফুল দিয়ে বানানো মালা তার হাতে, গলায় ও খোঁপায় । কিছু ফুল তার কোলের কাছে আঁচলে রাখা । দু’হাত দিয়ে তুলছিলো আর ফেলছিল কোলের উপর । কাঁদছিল আর্তনাদ করে । সাদা রঙের শাড়িতে তাকে মনে হচ্ছে যেন পূর্ণিমার চাঁদ মাটিতে নেমে এসেছে ! আমি তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে জানতে চাইলাম কান্নার কারণ । কাঁদতে কাঁদতে সে বলল তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে গেছে কোনো এক পূর্ণিমার রাতে ! কথা দিয়েছিল ফিরে আসবেও পূর্ণিমার রাতে । তাই সেদিন থেকে সে প্রতি পূর্ণিমার রাতে তার স্বামীর জন্য অপেক্ষা করে আর হৃদয় বিদীর্ণ করে কেঁদে বুক ভাসায় । প্রতি মাসে পূর্ণিমা আসে... তার প্রিয়জন আসেনা । এতটুকু বলে সে আবার কাঁদতে লাগলো । কিছুক্ষণ কেঁদে আবার বলতে শুরু করলো সে । আজ থেকে পঁচিশ বছর আগে ঢাকা থেকে একজন সুদর্শন ছেলে আসে এখানে চাকরি নিয়ে । সেই ছেলের সাথে তার প্রেম হয় এবং তারা নিজেরাই বিয়ে করে এক পূর্ণিমার রাতে । তার স্বামী তাকে কথা দিয়ে যায় পরের পূর্ণিমার রাতে এসে তাকে নিয়ে যাবে ! কিন্তু পূর্ণিমা যায়, পূর্ণিমা আসে, তার স্বামী আসেনা ! তাই সে পাহাড় থেকে লাফিয়ে পড়ে ! তারপর ?


রাত প্রায় শেষ হতে চলল । হোটেলের বোর্ডার ফিরছেনা দেখে ম্যানেজার উদ্বিগ্ন হলেন । চারিদিকে খোঁজ নিলেন । পরদিন সকালে পুলিশে খবর দিলেন । পুলিশ এসে একটা নিখোঁজ ডায়েরী করে গেল । অনেক খোঁজাখুঁজি করা হল... সে বোর্ডারকে আর কোথাও পাওয়া গেলনা । সেই ঘটনার পর থেকে আর কোনো পূর্ণিমার রাতে মেয়েটির কান্নার শব্দ কেউ শোনেনি !!

বৃক্ষ অসুখ
- আতিকুর রহমান হিমু

গাছেদের কোন ব্যক্তিগত স্বপ্ন নেই
জেনেও আমি
বৃক্ষ হয়ার ইচ্ছে পুষি...

ক'দিন ধরে বিষম ইচ্ছে অসুখ ।

এই অরণ্যে বার মাস শীত ঋতু
হটাত্‍ হটাত্‍ কন্যারাশির বাতাস আসে
বুকের ভেতর পাতাঝরে অবিরত...

তবু কেন বৃক্ষ হয়ার ইচ্ছে পুষি ?

২২আষাঢ়১৪২১

কোথায় দাড়িয়ে
- ডঃ সুজাতা ঘোষ

বাহ, বেশ লাগছে তো দেখতে
কাজের বোঝা থেকে চোখ তুলতেই
সবকিছু অন্যরকম ।
ভিতরের সব হিংসা, রাগ, কান্না মুছে যায় ।
জানলার লোহার গরাদের ওপারে
ছোট্ট মালভূমি, এপাশে – ওপাশে ঝোপ জঙ্গল ।
দূরে বহুদূরে ঘন, গাঢ় – হাল্কা সবুজ
পেড়িয়ে হাল্কা হয়ে যাওয়া আবছা দূরত্ব ।

আমি হাঁটছি পাথর ডিঙিয়ে
ধোঁয়াশা নেচে বেড়ায় হাওয়ার পাখনায়
ছুঁয়ে যায় বিস্ময় আর ভালোবাসা
মাখামাখি করে আমার খোলা চোখের পাতায় ।
এখানে কেউ নেই, কোথাও নেই
নেই কোন সিমানা,
লোহার দরজায় দাঁড়ানো চৌকিদার অথবা
প্রতিদিনের একঘেয়ে জীবনের তেলচিটে গন্ধ ।

অনেক উঁচুতে একটা বাজ উরে যায় শান্তিতে ।
ওকি কাউকে খুঁজছে ?
আমি? আমি কি কাউকে খুঁজছি ?
ওফ, দমকা হাওয়ায় পা বাড়ানো দায়,
ধুলোগুলো আনন্দে মাখামাখি খাচ্ছে ধরায় ।
আমি উড়ে যাই দূর বহুদূর
ওই যে লাল আগুন আকাশ হাতছানি দেয়
আমিও খুব কাছাকাছি ওই যে বাজপাখির ।

আঃ, বড় চেনা এই সুর, কে ডাকে আমায় ?
সমস্ত ধুলো, শুধু ধুলোময় ।
হাতড়াচ্ছি সবুজ আর আবছা নেশার মাটি
কিছু নেই, কোথায়ও নেই, শুধু আমি আর আমি ।
সামনে লোহার গরাদ আর নিয়মের মোটা বই
চোখ ফেরাতেই অন্ধকারের শক্ত চোয়াল ।
রোজের বড় ঘড়িটা জানে না শ্বাস ছাড়তে
আমি আছি দাড়িয়ে বর্তমানের হাত ধরে ।।

আমার তুমি
- এন. এ. খোকন

ভেবে পাই না চোখ তুলে আমি কোথায় তাকাব,
তোমার চোখে ?
নাকে ?
মুখে ?
বুকে ?
ওড়নার একটু আগে সৌভাগ্যের তিলে ?
নাকি নিবিড় নিদ্রার আগে
প্রিয় অন্ধকারের মতো তোমার চুলে ?
অনেক খোঁজার শেষে
সামনে তোমাকে পেয়ে, মেয়ে
কিংকর্তব্যবিমূঢ় কবি আমি এক,
মুহূর্তরা থেমে গেছে আজ ।
ওই চোখ পৃথিবীর অধিকারে
ওই নাক কেড়ে নেবে ফুলের সুবাস
সুবর্ণ শশীর মতো তোমার ওই মুখ
চলে গেছে জনতার অধিকারে ।
শীতের চাদরে ঢেকে যাবে তিল,
যুগল বেড়ে উঠা নরম উচ্চতায়
চেয়ে চেয়ে বেয়ে উঠবে লম্পট আরোহী ।
আমার জন্যে তবে কী রেখেছ তুমি ?
কিছুই তো নয় !
সকলের অগোচরে রয়ে গেছে তবু
স্বচ্ছ দর্পণের মতো তোমার হৃদয় ।
ওইখানে পৃথিবীর আনাগোনা নেই
ওইখানে প্রতিবিম্ব হয়ে রই যদি আমি
নিজেরেই মুগ্ধ হয়ে দেখব তবে,
ওই আমার নিজস্ব তুমি ।

মুখটা
- এন. এ. খোকন

তোমার ওই মুখটাতে
কি এমন মায়া আছে ?
যা দেখে আমি হতবাক
হয়ে যায় বিস্ময়ে,
ভালোবাসার হাত প্রসারিত করি
নিজেরই অজান্তে ।
নিজেকে আবার চুপিচুপি
গুটিয়েও নিই
কিছুটা দ্বিধায়, সংকোচে ।
অকৃত্রিম ভালোবেসে যাচ্ছে
শত অবজ্ঞা উপেক্ষা করে ।

আমি কেন পারি না তুমি হতে ?

তরুনতা
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

তরুনতা মানে সোনালি সূর্যদয়, বাংলাদেশ
গড়ার দৃহপ্রত্যয়, রক্তিম স্বাধিনতার জয়
তরুনতা মানে উদ্ভাসিত বিপ্লব, স্বাধীনতার
ধব্নি বাতায়নে কলরব !
দুষ্কৃতদের স্বমুখে দারাবার সময়, রক্ষা
করিতে হবে, মৃত্যুভয়কে তুচ্ছ করে
রক্তিম স্বাধীনতার বিজয় ।

রক্ত দিয়ে অর্জিত মাতৃভাষা, ত্রিশ লক্ষ
জীবন মা বোনের সন্মানের বিনিময়ে স্বাধীনতা !
তাদের গভীর শ্রদ্ধায় স্বরন করে আজকের তরুনতা ।

তরুনতা মানে বিপদগামি মানুষের পাশে
দাঁরানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা
বিপ্লবী কন্ঠ ।
ছিন্নমুল অসহায় অন্তিম মানুষের
নয়নের অশ্রু মুছানো !
তরুনতা কথা বলে ব্যাক্তিসত্তায়, মনুষ্বত্তের
বিবেচনায়, তরুনতার কলমের কালি
অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁরাই ।
একমুঠো স্বপ্ন আগামি প্রজন্ম,
মাতৃভূমিকে ভালোবেসে বাংলাকে সাঁজানো,
তরুনতায় রত্ন ।

অভিমানি বন্ধু
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

ওগো বন্ধু তোমারি হৃদয়ে দিয়েছি দহন
আজ আমি বুঝেছি ভুল পরেছি... অনুশোচোনায়
অনুতাপের পীড়ায় মনে হয় হলো না
কেন ... মরন !
হয়তোবা অভিমান একটু একটু রাগ
বন্ধু হাত বারিয়ে দিলাম এই ক্লান্তময় দিনশেষে
মুছে ফেলো যত সব রাগ যন্ত্রনার কষাঘাত
হাতে হাত রেখে মানব সেবার পথে
মিলিবো বন্ধুত্বের প্লাটফর্মে ।
বন্ধু তোমার খুঁনসুটি আর মজার দুষ্টুমি
ভেঙ্গে দিয়েছে আমার অভিমান, আর
আনন্দ গুলো জানালায় দিচ্ছে উঁকি
ওগো বন্ধু ভেঙ্গে ফেলে ও তুমি !

একটু প্রশান্তি চাই
- আকলিমা আক্তার রিক্তা


তোহা স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছে । গেইট দিয়ে ঢুকে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতেই দারোয়ান ডেকে বলে “ঐ তোর মারে কইস বাড়ি ভাড়া দিয়া যাইতে । আইজ মাসের ২০ তারিখ হইয়া গেছে এখনো ভাড়া দেয়ার নাম নাই হুহ” । দারোয়ান এর এই রূঢ় ব্যবহারে তোহা খুব ব্যথিত হলো । চরমভাবে কষ্ট পেলো । তোহা অষ্টম শ্রেনীতে পড়ে । পরিবার ও পরিবেশের অনেক কিছুই ধীরে ধীরে বুঝতে শিখছে । সেদিন সন্ধ্যায় বিস্কিট কিনে বাইরে থেকে আসার সময় দেখলো দারোয়ান ইতি নামের এক মেয়ের সাথে খুব ভাল ব্যবহার করছে । ইতি কে তুমি বলে সম্বোধন করছে । তোহা খেয়াল করল পরক্ষনে চলে গেল । ইতি একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে ৭ম শ্রেনীতে পড়ে । দারোয়ান তোহা কে সর্বদা তুই বলে ডাকে দেখে দারোয়ান কে খুব অপছন্দ করে সে । তার মতে তুই ডাকবে কেনো ? আমি তো আর কাজের বুয়া না । আর খারাপ ব্যবহার ই বা কেনো করবে ? পরক্ষনে তোহার পাঠ্যবইয়ের একটি প্রবাদ বাক্য এর কথা মনে পরে যায় যে তেলের মাথায় সবাই তেল দেয় ।


উক্ত বাড়িটির সপ্তম তলায় তোহা তার পরিবারের সাথে থাকে । সপ্তম তলায় একপাশে বারান্দাসহ একটি রুম এবং অন্যপাশে খোলা ছাদ । প্রায় সময় তোহা খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে দূর আকাশের সাথে কথা বলে, শুভ্র নীলাভ আকাশ দেখে । আর মনে মনে আকাশের মত উচ্ছল, বিশাল ও চিন্তামুক্ত হতে ইচ্ছে করে । তোহার মতে আকাশ হল চিন্তামুক্ত । আপন ইচ্ছায় সে পৃথিবীর সকল মানুষকে ছায়া দেয়, আগলে রাখে । আকাশ খুব দায়িত্ববান । আকাশের সাথে কেউ রূঢ় ব্যবহার করে না । কেউ কষ্ট দেয় না । যখন যা ইচ্ছা তাই করতে পারে । তোহার আকাশ হতে বড্ড ইচ্ছে করে । তোহার তেমন কোন বন্ধু নেই, এমনকি কারো সাথে মিশতেও পারেনা । নিজেকে নিয়ে মগ্ন থাকে সারাক্ষন আর পরিবারের কথা চিন্তা করে ।


তোহার বাবা একটি অফিসে চাকুরী করত । অফিস থেকে বাসায় অনেক ফোন আসে । বাবার অফিসের কলিগরা বাসায় ফোন দিয়ে জানিয়েছে বেশ কয়েকমাস যাবত অফিসে ডিওটি করেনা । এমন করে আগের চাকুরীটা চলে গিয়েছে । এইবার এই চাকুরীতে জয়েন করার পরেও একই অবস্থা । চাকুরীটা বুঝি চলেই যাবে ! তোহা এবং তোহার মা অনেক খোজ খবর নিয়ে জানতে পারে অন্য এলাকায় জুয়া ও তাস খেলতে চলে যায় । সারাক্ষন তাস নিয়েই ব্যস্ত থাকে । পকেটে টাকা না থাকলে অন্য মানুষের কাছ থেকে ধার করে তাস খেলে । বাসায় এলে অফিস এ গিয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করলে খুব সুন্দরভাবে উত্তর দেয় । অফিসে অনেক কাজ ছিল । তাই আসতে দেরী হয়েছে । কাজের খুব চাপ বেড়েছে ইত্যাদি ।


মায়ের সাথে এইসব সত্য মিথ্যা কথা নিয়ে প্রায় রাতেই ঝগরা হত । এমনকি মাঝে মাঝে তোহার ঘুম ভেঙ্গে গেলে মায়ের কান্নার শব্দ শুনত । বাবার সাথে খুব রাগারাগি করত তোহা । মায়ের পক্ষ নিয়ে কথা বললে তোহার সাথেও খুব বাজে ব্যবহার করে । তোহার মনে হয় এইরকম একটি জীবনের চেয়ে মৃত্যু অনেক ভালো ।


দিন যত বাড়ছে তোহার বাবা কাশেম আলীর জুয়া খেলা ততই বাড়ছে । রাতে বাসায় ফেরে না, বাসায় ঠিকভাবে বাজার করেনা, বাসা ভাড়া দেয় না, দোকান থেকে বাকীতে এটা সেটা কিনে, স্কুলের বেতন দেয় না । সবকিছু মিলিয়ে হযবরল অবস্থা । তোহার আম্মু সারাক্ষন মনমরা হয়ে থাকে । অর্ধশিক্ষিত মা না পারছে কোন চাকুরী করতে না পারছে সংসার চালাতে । নানা বাড়ি থেকে টাকা এনে বেশ কয়েকমাস বাসা ভাড়া এবং স্কুলের বেতন পরিশোধ করেছে । নিত্যদিন তো আর অন্যের কাছ থেকে টাকা আনা যায় না । মায়ের অনেক স্বপ্ন তোহাকে লেখাপড়া করাবে । কিন্তু হায় এই কি হাল ! চারদিক থেকে বাবার নামে বদনাম শুনতে শুনতে বাবার উপর খুব অতিষ্ঠ তোহা । বাবা আগে কত্ত আদর করত, ভালবাসতো কিন্তু এখন আর আদর করেনা বরং তোহা বাবাকে ভালো কথা বললে ধমক দেয় । বাবাকে শত বোঝালেও সে বোঝে না । আল-কোরান ছুয়ে জুয়া না খেলার শপথ করেছে বহুবার । কিন্তু সেই দাড়ি চৌদ্ধ ই । সেই ছোট থেকে এই পর্যন্ত কখনো একটু সস্থির প্রশান্তি পায়নি তোহা । পাওনাদারগণ বাসায় এসে টাকা চায়, বাবার অফিসে না যাওয়া, দিনরাত তাসের নেশায় বিভোর থাকা, স্কুলে বেতন দিতে না পারা, বাড়ি ভাড়া দিতে না পারা সব মিলিয়ে মাথায় যেন ঘুনপোকা ধরে যায় । মাঝে মাঝে বুকটা প্রচন্ড ব্যথা করে,মাথাটা খুব ব্যথা করে ।


তোহার খুব ইচ্ছে সে হাসবে, খেলবে, তার অনেক বন্ধু হবে, বাবার সাথে ভালভাবে কথা বলবে, ঘুরতে যাবে, মায়ের সাথে বাবার আর ঝগড়া হবে না, বাবা সম্পূর্ন ভালো হয়ে কাজে মনোযোগ দিবে, জন্মদিন পালন করবে আরো কত্ত কি ! তোহার কোন বন্ধু নেই । সর্বদা সে ভয়ে থাকে যদি তার বাবার জুয়া খেলার কথা বন্ধুরা জেনে যায় তাহলে সবাই লজ্জা দিবে, অপমান করবে । সবাই ছি ছি করবে, এত লজ্জা অপমান সহ্য করতে পারবেনা তোহা । তাই স্কুলে, বাসায় সারাক্ষন একা একা থাকে সে । পড়াশুনায় ঠিকভাবে মনযোগ দিতে পারেনা সে । অথচ তোহার স্বপ্ন বড় হয়ে ভালো চাকুরী করে মায়ের চোখের জল মুছে দিবে । আর মাকে কষ্ট করতে হবেনা, কারো বকা শুনতে হবেনা, নিরবে চোখের জল ঝড়াতে হবে না ।


সেদিন সকালে একটা চিঠি এসেছে চিঠির বাক্সে । চিঠিটা বাবার চাকুরী চলে যাওয়ার খবরটি নিশ্চিত করেছে । তোহা এবং তার মায়ের মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়েছে । এইদিকে তোহার বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে । প্রতিটি বিষয়ে সে ৩৩ এর নিচে নম্বর পেয়েছে । প্রচন্ড মাথা ব্যথা আর বুক ব্যথার কারনে সে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি । মা বেড এর পাশে বসে চোখের জল ঝড়াচ্ছে, কাছের আত্মীয়দের খবর দিচ্ছে, বাবা কাশেম আলীর ফোন বন্ধ রয়েছে । টানা চার ঘন্টা পর তোহার মুখ থেকে শুধু একটা বাক্য উচ্চারিত হয় “বাবা, আমি প্রশান্তি চাই, শান্তি চাই, তুমি ভালো হয়ে ফিরে এসো” । তোহার মুখ থেকে আর কোন বাক্য উচ্চারিত হয়েছে কিনা জানা যায় নি ।

আনন্দের সংবাদ
- মোহাম্মদ উল্লাহ শহীদ

আজ তুমি সুন্দর,অসুন্দর চিনে গেছো
ভাল,মন্দ জেনে গেছো ।
আজ তুমি পার্থক্য জানো আলো,অন্ধকারের ।
তাই আমার কাছে এসেছো
ভালোবাসার গতিতে ভালোবেসেছো ।
একদিন আমি তোমার পিছে
ঘুর ঘুর..ঘুর ঘুর..ঘুর ঘুর করেছিলাম লাটিমের মতো ।
আর তুমি
সর সর..সর সর..সর সর ঠেলে ফেলেছো ময়লা ভেবে ।
আজ তুমি বুঝতে শিখেছো,
বুঝতে শিখেছি আমিও ।
আজ আমি লাটিমও নয়,
ময়লাও নয় ।

পৃথিবীর উপহার
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

আমি পৃথিবীর তরে যা পেয়েছি
তার মাঝে সেরা প্রকৃতির সৌন্দর্যে
ভরা আমার মাতৃভূমি !
রক্ত দিয়ে শ্লোগান লেখা হয়েছে
আমার লক্ষ মা বোনের সন্মানের আঁচলে,
আমার মা আমার জননী
শহীদের রক্তে ভেজা মাতৃভূমি ।
পৃথিবী আমাকে করেছে গর্বিত
দিয়েছে জন্ম বাংলায়, আমি বাঙ্গালি
নদী আর সবুজ প্রকৃতির আড়ালেতে
আমি জ্বলে উঠতে দেখেছি সোনালি রবি
পৃথিবী আমায় দিয়েছে শ্রেষ্ঠ উপহার মাতৃভুমি ।
সেই দিন সেই এক্ষাত্তর আমি দেখি নাই,
শুনেছি আর দেখেছি ইতিহাসের পাতায়,
কামার কুমার ছাত্র কিশোর কিশোরিরা
শুনেছিল কবির বিদ্রোহি সুরের কবিতা,
পৃথিবী সেরা উপহার আমি পেয়েছি,
অর্জিত স্বাধীনতা আমার মাতৃভূমি ।

মা
- রীতা ঘোষ

নামের অক্ষর একটি
ভগবানের অদ্ভূত সৃষ্টি
সন্তানের ওপর সর্বদা
রাখো কৃপাদৃষ্টি ।
মমতার সাগর তুমি
ভালোবাসার মূর্তি
তোমার কোলে জন্ম নিয়ে
জাগে মনে ফুর্তি ।
পৃথিবীর আলো দেখাও প্রথম
স্নেহ ভরে ডাকো
চুমুতে চুমুতে ভরো বদন
হৃদয় জুড়ে থাকো ।
কতো ব্যথা পাও তুমি
জন্ম নিয়ে হেথায়
ত্যাগ করে নিজের সুখ
মানুষ করো আমায় ।
আদরে আদরে ভরো তুমি
ধন্য হয় জীবন
সার্থক হোক জনম আমার
ছুঁয়ে তোমার চরণ ।
যখনই কোন দুঃখে
কাঁদে আমার মন
কি করি পাই না ভেবে
করি তোমায় স্মরন ।
আশীষ ভরা হাত দুখানি
রাখো আমার মাথায়
মাতৃ দিবসের শুভ ক্ষণে
প্রনাম জানায় তোমায় ।

একজন বাবলা
- ডাঃ ফারহানা মোবিন


- আপা, আমারে যদি বেতনটা দিতেন !
- বুয়া তোমাকে কতোবার বলেছি এখন হাতে টাকা নাই । তুমি জানো না, সন্ধির বাবা আগামী নির্বাচনে দাঁড়াবে । ভোট পাবার জন্য তাকে অনেক টাকা খরচ করতে হবে । তাছাড়া আমার প্রতিমাসে দুস্থ নারীদের জন্য মিটিং থাকে । এই যে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দুস্থ নারীদের যে ক্ষতি হলো, তাদের সাহায্যতো শুধু আমরাই করছি । ভাগ্যিস তুমি নারীনেত্রী হওনি । হলে বুঝতে পরে জন্য কতো চিন্তা হয় । চিন্তায় রাতে ঘুমাতেই পারবে না ।
- আপা বুঝছি । তয় আমার পুলাডা শুধু ট্যাকা চায় ।
- কেন ছোট মানুষের টাকা কি দরকার ? তুমি তো এই বাসা থেকে তিন বেলা খাবার নিয়ে যাও । ও টাকা নিয়ে কি করবে ?
- আপা, তার খুব শখ সে ইস্কুলেত পইড়ব । নামী মানুষ হইবো । আমার কাছে ট্যাকা চায় বই কিনার লাগি । আর তার খুব শখ নতুন একটা জামা কিনার জন্যি । গত বছরের ঈদ থেইকা হে নতুন জামা চায় তারে দিতে পারিনা । আপা আপনার কাছে ছয় মাসের ব্যাতন পাই । আপনে যদি দিতেন । একটা মাত্র পুলার শখ মিটাইতে পারি না ।
- বুয়া, এক কথা বার বার বলো কেন ? তোমার ছেলেকে পুরানো জামা কোথা থেকে দিবো ? তুমি দেখোনি পুরানো সব জামা আমি বস্তা ভরে অসহায় মানুষজনদের কাছে পাঠালাম । দাতাগোষ্ঠীদের টাকা দিয়ে নামী - দামী লোকদেরকে গিফ্ট পাঠালাম পত্রিকায় আমার ছবি ছাপানোর জন্য । এটা আমার ক্যারিয়ারের জন্য লাভ । তোমার পঙ্গু ছেলে ঘরের বাইরে যেতে পারে না । তার নতুন জামার এতো লোভ কেন ? আর পঙ্গুদের লেখাপড়া করে কোন লাভ নেই বুঝেছো ? আজকাল কত এম.এ পাশ লোক বেকার হয়ে বসে আছে । ওরে বরং আমার বাসার কাজে লাগাও । সিড়ি ঝাড় – দিলেই তো পারে ।
- আপা, হেই তো পলিওর রোগী । ঠিক মতো খাড়াইতেই পারেনা ।
- আর কথা বলোনাতো । তোমার কথার অত্যাচারে আমি নোট লিখতে পারছি না । আজ আমাকে শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে বক্তৃতা দিতে হবে । যাও তাড়াতাড়ি আমার শাড়ি ইস্ত্রি করে দাও ।
- বুয়া বিষন্ন মনে ইস্ত্রি চালায় । সে ইস্ত্রিতে শাড়ির প্রতিটি ভাজ সোজা হতে থাকে । আদরের ধনটার চোখদুটো ভেসে ওঠে তার স্মৃতিপটে । কতোক্ষণ দেখিনি তাকে সেকি (বাসী ভাতটুকু) খেয়েছে ?
চুলায় ফুটতে থাকে টগবগে ডাল । ডালা ভরা পেঁয়াজ কাটতে কাটতে থেমে আসে বুয়ার হাত ।
সন্ধি - বুয়া আজ কিন্তু স্কুলে যাবোনা । তুমি মাকে বলবে না । প্রতিদিন স্কুলে যেতে ভালো লাগেনা ।
বুয়া - বাবাজান আমার, ইস্কুলে যাও ।
সন্ধি - বুয়া, তোমার ছেলেকে আমার দেখার খুব শখ । মামনি বাইরে চলে গেলে চলো আমরা তোমার বাসায় যাই । ড্রাইভার আঙ্কেলকে নিষেধ করে দিবো । তাহলে আমাদের কথা কেউ জানতে পারবেনা । তোমার ছেলে হাটতে পারেনা । তুমি ভোরে কাজে এসেছো । চলো বুয়া গাড়ী নিয়ে তোমার ছেলেকে দেখে আসি ।
বুয়া - সত্যি যাইবা । চলো চলো । বাবলা ভাত খাইলো কিনা আমার খুব চিন্তা হইতাছে । তয় বাপজান, আপারে কোনদিন কইয়োনা । জানলে আমারে খুব মাইর দিবো ।
পরের দৃশ্য
গাড়ী যেতে থাকে বস্তির রাস্তা ধরে । হঠাৎ কাঁদায় আটকে যায় গাড়ীর দুই চাকা ।
বুয়া - বাবজান, গাড়ীতো আর যাইবো না । এই রাস্তাগুলো তোমারে হাটতে হইবো । তুমিতো হাটতে পারবানা । আসো বাবজান, আমার কুলে আসো । তুমিতো এত্তো রাস্তা হাটতি পাইরবানা ।
ড্রাইভার গাড়ী নিয়ে থেকে যায় । রাস্তার একধারে গাড়ী লক করে রাখে । আয়েশের ভঙ্গিতে টানতে থাকে বন্ধুর দেয়া গোল্ডলিফ সিগারেট । হঠাৎ একদল মাদকাসক্ত তরুণ অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ড্রাইভারের উপর । ড্রাইভারের বুকে বসিয়ে দেয় রামদা-র অগ্রভাগ । ছিনতাই বিদ্যার কৌশলে পাজেরো গাড়ীটার লক ভেঙ্গে দেয় । গাড়ী নিয়ে চলে যায় মাদকাসক্ত তরুণেরা । রক্তাক্ত ড্রাইভারকে ঘিরে ধরে উৎসুক বস্তিবাসী ।
বুয়া - বাবলা, বাবলারে ! দেখ বাবজান, তোরে দেখতে কেডা আসছে । আমার মালিকের পুলা । তোরে দ্যাখার জন্যি হে আজ ইস্কুলেও যায় নাই । বাবজান (সন্ধ্যি) আমাদের বিছানা নাইকা । তুমারে যে মাটিতেই বইসতে হইবো ।
সন্ধ্যি - বুয়া, মেঝেতে বসতে আমার ভালোই লাগে । তুমি দুশ্চিন্তা করোনাতো ।
বুয়া - বাবজান, তোমার ঠান্ডা লাগবিনাতো !
সন্ধ্যি - না বুয়া, লাগবে না । তোমার ছেলে আমারই সমান তাই না ?
বুয়া - হ ।
সন্ধ্যি - তাহলে আমাদের স্কুলে ভর্তি করে দাও । আমরা দু’জনে একসাথে ক্লাস করবো ।
বুয়া - হেইডা যে অয়না বাবজান ।
সন্ধ্যি - কেন হয় না ? মামনিকে বলো তোমাকে টাকা দিবে । মামনিতো আমাদের বয়সী ছেলে - মেয়েদের টাকা দেয় । দেখোনা টিভিতে মামনির কতো সাক্ষাতকার দেখায় । শিশুদের লেখাপড়ার জন্য অনেক বক্তৃতা দেয় । (ক্ষুধার্ত সন্ধি হঠাৎ বলে) আমি পান্তা খাবো ।
বুয়া - হায় আল্লাহ ! হেডা হয়নাগো ।
সন্ধ্যি - হয় ।
মাটির সানকিতে বুয়ার পান্তা ভাতের সাথে মিশে যায় সন্ধ্যির উচ্ছাস । সে উচ্ছাসে চোখ ভিজে আসে ফুলি বেগমের । ভুলে যায় সন্ধিদের বাসাতে ফেলে রাখা কাজগুলোর কথা ।
বাবলা - মা পুলিশের গাড়ির শব্দ, নাকি দমকল বাহিনীর ? কোথাও কি আগুন লাগছে ?
বুয়া - জানিনাতো বাবজান । তুই খা । কথা বন্ধ কর ।
ফুলি বেগম গল্পের আসরে । বস্তির চারপাশ ঘিরে ফেলে পুলিশ । চুরির দায়ে ফুলিবেগমকে পুলিশ উপহার দেয় হাতকড়া । পুলিশের গাড়ীতে টেনে হিচড়ে নিয়ে যায় ফুলি বেগম আর সন্ধিকে । বাবলা চিৎকার করে কাঁদতে থকে । জড়িয়ে ধরে মায়ের পা’দুটো । কিন্তু পুলিশ অফিসার লাথি মারে বাবলাকে । বাবলা ছিটকে পড়ে ঘরের কোনে । দূর্বল হাড়গোড়ের শরীরটা তার অবশ হয়ে যায় । বোবা দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মায়ের যাবার দিকে । আর চোখ দিয়ে ঝড়তে থাকে অশ্রু ।
বস্তিবাসী মিনারা চিৎকার করে ওঠে ।
মিনারা - পুলিশ সাব, আমার একটা কথা শুনেন । স্যার আপনার পায়ে পড়ি ।
পুলিশ - অ্যায় বেটি, সামনে থেকে সরে যা ।
মিনারা ছুটে যায় প্রীতি হকের কাছে ।
মিনারা - মেডাম, আপনেরে বহুতবারি টিভিতে দেখছি । আপনে দয়ার সাগর । দয়া করেন মেডাম । ফুলি বু আপনের গাড়ি চুরি করে নায় । আপনের ড্যারাইবাররে বস্তিবাসী হাসপাতালে নিসে । হ্যাগো থেইকা জাইননা নেন । আপনের গাড়ী ছিনতাই হইছে ।
সন্ধি ভীত কম্পিত পায়ে মায়ের ডান হাতের অনামিকা ধরে । অস্ফুট গলায় কাতর স্বরে করতে থাকে মিনতি । মামনি, Please, listen to me, বুয়া আমাকে চুরি করেনি । আমি বাবলাকে দেখার জন্য এখানে এসেছি । প্লীজ বুয়াকে জেলে পাঠিওনা । মামনি প্লীজ, মামনি, দেখো, বুয়া ছাড়া বাবলার কেউ নেই । বুয়া আমাকে অজ্ঞান করার জন্য কোন খাবার খাওয়ায় নি । পান্তা নামের ভাতটা দেখতে কর্ণ স্যুপের মতো । তাই আমার খেতে ইচ্ছে করছিল ।
প্রীতি হকের ইশারাতে পুলিশ কিছুক্ষণ থামে । ঝড়ের বেগে তাঁর পা ঝাপটে ধরে মিনারা ।
মিনারা - মেডাম গো ! ফুলি বুর স্বামী পকেট মারতো । হের লাগি হেই তারে ছাইড়্যা এহানে থাকে । হেই কারো এক পয়সাও ধরে নাগো । আপনে দয়ার সাগর । আপনে তারে বাঁচান ।
প্রীতি হক - এ্যায় ছাড়ো, ছাড়ো, আমার পা ছাড়ো । তোমাদের মতো লোকদের আমি ভালোভাবে চিনি । তোমরা হচ্ছো দু’মুখো সাপ ।
পুলিশ - ম্যাডাম কিছু বলবেন ?
প্রীতি হক - সহজেতো কথা বলবেনা । রিমান্ডে নেবেন । গাড়ী উদ্ধার করতেই হবে বুঝলেন । গাড়ীর কাগজপত্রে একটু সমস্যা আছে তো (দাতাগোষ্ঠীর ত্রানের টাকা দিয়ে কেনা এই গাড়ী), লাইসেন্সেও একটু ঝামেলা আছে । গাড়ী যেন অন্যের হাতে চলে না যায় ।
পুলিশ - আপনি চিন্তা করবেন না ম্যাডাম । আমরাতো আছিই । আমাদের স্যারের সাথেতো আপনার ভালো সম্পর্ক । ম্যাডাম দাতাগোষ্ঠীর কিছু গিফ্ট - তো আমাদের দিলেও পারেন !
মিনারা প্রীতি হকের পা ধরেই থাকে । তাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরায় প্রীতি হক । আর পুলিশ ফুলি বেগমের গলায় ধাক্কা দিয়ে ভ্যানে উঠায় ।
সন্ধি চিৎকার করে কাঁদতে থাকে । বাবলা কাঁদতে পারেনা । ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত দেহটা নিয়ে লুটিয়ে পড়ে মেঝেতে । পঙ্গু পাটা নিয়ে উঠে দাঁড়াতে যায় । দেখতে চায় মাকে শেষ বার । কিন্তু দেখা আর হয়না । এক পা নিয়ে কিছুতেই দাঁড়াতে পারে না । দাঁড়াতে গিয়ে অপর পায়ের ধাক্কায় ভেঙ্গে যায় পান্তা ভাতের সানকি । ভাতগুলো ছিটিয়ে পরে যায় ঘরের স্যাঁতস্যাতে মাটিতে । বাবলার বুক ফেটে বের হয়ে আসে অস্ফুট স্বর । সে স্বরে শোনা যায় - মা, তুমি যাইওনা মা, মাগো, তুমি যাইও না, আমি আর কোনদিন তুমার কাছে জামা চাইবোনা, ইস্কুলেও পড়তি চাইবো না । যাইওনা মা । তুমি ছাড়া যে আমার আর কেউ নেই ।

আমরা মজুর
- ডাঃ ফারহানা মোবিন

আমাদের রক্ত ঘামে
আজকের ধরণী,
এই বিশাল সভ্যতা
আমাদের কাছে ঋণী ।
পৃথিবীর পথে এই
আমাদের পদ ধূলো,
তবু ঠিক মতো চলেনা
আমাদের ভাতের চুলো ।
আমরা মজুর
কাজ আমাদের মান,
পৃথিবীর সভ্যতায়
আমাদের অভিযান ।
ভাগ্যে জোটে না আমাদের
কাজের প্রতিদান,
যুগে যুগে আমরা
নির্যাতিত পরাণ ।
চাই মজুরদের
সুষ্ঠু শপথ,
মজুরদের রক্তে
না ভিজে রাজপথ ।

প্রলয়
- ডাঃ ফারহানা মোবিন


উড়ছে নীল মেঘ । পার্কের দূর্বা ঘাসগুলো বাতাসে দুলছে । স্নিগ্ধ বাতাসে ছুঁয়ে যাচ্ছে মন । বিরক্তির চোখে ‘অর্পিতা’ বারবার দেখছে ঘড়ি । বেলা ৬টা বাজে, কিছুক্ষণ পরেই সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আমাকে বাসায় যাবার জন্য দৌঁড়াতে হবে । নইলে আন্টি আমাকে বাসায় ঢুকতেই দিবেনা । ওহ, কেন যে প্রলয় এখনো আসছেনা । এতো দেরী করলে আমায় বাসায় ফিরবো কখন ।
পার্কের লেকের পাড়ে বসে আছে অর্পিতা । হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন তার ঘন কালো চুলে বুলাতে লাগল মমতার স্পর্শ ।
অর্পিতা - খবরদার তুমি আমার চুল স্পর্শ করবে না । এতো দেরী করে কেন আসলা ? তুমি জানোনা, আন্টি আমার সাথে খুব খারাপ আচরণ করে ।
দুই হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলো প্রলয় । প্রলয়ের জোড়া হাতের কাছে হার মানল অর্পিতার অভিমান ।
অর্পিতা - তুমি এতো দেরী করলে কেন ?
প্রলয় - বিসিএস পরীক্ষার জন্য টাকা জমা দিতে গেছিলাম ।
- কত টাকা লাগবে ?
- ত্রিশ হাজার ।
- সরকারী পরীক্ষা দিতে কি ত্রিশ হাজার টাকা লাগে ।
- তুমিতো জানোনা, এখন সব কিছুর খরচ বেড়ে গেছে । একেকবার একেক সরকার আসে । আর নূতন নূতন খরচ বাড়ায় । তুমি কি চাওনা যে, আমি বিসিএস ক্যাডার হই ?
- অবশ্যই চাই । আমি জানি তোমার টাকার সমস্যা । তাই আমার হীরার এই নাম ফুলটা এনেছি । মারা যাবার আগে আম্মা আমাকে এটা দিয়েছিল ।
- তুমি আমাকে এত দূর্লভ স্মৃতির জিনিসটা দিয়ে দিলা । তোমার কষ্ট হবে না ।
- তুমি ভালো একটা চাকরি পেলে তো, আমারই সুবিধা । তাড়াতাড়ি আমরা জীবন শুরু করবো । মায়ের শেষ স্মৃতির থেকে আমার কাছে তোমার প্রতিষ্ঠা অনেক বেশী জরুরী । আমি তোমাকে ভালোবাসি ।
প্রলয়ের নিজেকে খুব ছোট মনে হতে লাগলো । অর্পিতা মায়ের শেষ স্মৃতিতা পর্যন্ত তাকে দিয়ে দিচ্ছে । অথচ সে নানা ভাবে মিথ্যা বলে অর্পিতার কাছে টাকা নেয় । কিন্তু কি করবে প্রলয় ? তার যে উপায় নাই ।
প্রলয় - অর্পিতা তুমি যদি জানতে পারো যে, এই আমিটা আমি না, অন্যজন, তবে তোমার কেমন লাগবে ?
- তোমার এই তুমি আর আমির প্রশ্ন শুনলে আমার কাছে অবাক লাগে ! আমিটা আমি না এটা কোন ধরণের কথা ? কি সব সাহিত্যের কঠিন কথা !
হঠাৎ সামনে হাজির ছোট্ট একটি মেয়ে । ধূলাতে জট বেধেছে তার চুলে । নোংরা কুঁচকে যাওয়া জামা আর দেহ ভরা ধূলা -বালি । করুণ কন্ঠে চাইতে থাকে ‘৫টা টাকা’ । প্রলয় মানি ব্যাগে হাত দিয়েই চিৎকার করে হায় হায় ! আমার সব টাকা ছিনতাই হয়ে গেছে !
- ছোট্ট মেয়েটি প্রচন্ড ভয় পেয়ে যায় । কান্নাভেজা কন্ঠে বলে, স্যার আমি আপনার টাকা চুরি করিনি, বিশ্বাস করেন ।
প্রলয় - নারে তোকে চোর ভাবছিনা । মনে হয়, পকেট থেকে পড়ে গেছে ।
অর্পিতার খুব মায়া হলো । মেয়েটার হাতে গুঁজে দিলো ১০০ টাকা । চোখ ছলছল করে উঠল মেয়েটির । মাথা নীচু করে, দৌঁড়ে চলে গেল ।
- ২ -
পরের দিন দুপুর বেলা পাগল প্রায় হয়ে ছুটে এসেছে প্রলয় । দুচোখ ফোলা, সিঁদুর লালচে । মেডিকেলের কলেজের ওয়েটিং রুমে বসে আছে প্রলয় । কলেজের অফিস রুম থেকে ডেকে পাঠানো হলো তাকে ।
অর্পিতা - একি প্রলয়, তোমাকে এমন বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে কেন ?
- আমার হোস্টেলের রুম থেকে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ক্যামেরা চুরি হয়ে গেছে । এই মাসের খরচ চালানোর ২০ হাজার টাকাও নাই হয়ে গেছে ।
- কি বলছো তুমি !
- অর্পিতা, আমাকে এক লক্ষ টাকা ধার দিতে পারো ?
- এতো টাকা ! তুমি চিন্তা করো না, মার গহনা বিক্রি করে তোমাকে টাকা দিবো । আমি চাই তুমি ভালো থাকো ।
- থ্যাংকস ডিয়ার, তুমি না থাকলে আমি পথে বসে যেতাম ।
- প্রলয়, আমি তোমাকে ভালবাসি । আমি তোমাকে আলোর পথে নিয়ে যাবো ।
৬ মাস পরের ঘটনা । মেডিকেলের ২য় বর্ষের ছাত্রী সে । অর্পিতাকে বিয়ে দিতে চায় তার আন্টি (সৎ মা) । সৎমায়ের সাথে অর্পিতার বাবাও রাজী হন । এলাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ীর সাথে ঠিক হয় বিয়ে । প্রলয় দায়িত্ব নিতে চায়না । বলতে থাকে তার অসহায়ত্বের কথা, বেকারত্বের কথা ।
প্রলয় বলে দেখো, আমরা দুজনেই এখনো ছাত্র, তোমার দায়িত্ব নেবার মতো যোগ্যতা এখনো আমার নায় । আমি প্রতি মাসে তোমার কাছে থেকে হাজার হাজার টাকা নিই । আমি কিভাবে তোমার দায়িত্ব নিবো ?
অর্পিতা - আমরা দুইজনে টিউশনি করে সংসার চালাবো । অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হবেই ।
ঘর বাঁধার স্বপ্ন আর প্রলয়কে হারানোর ভয়ে, অর্পিতা বাবার বাড়ী ছাড়ল । বিয়ের দুইদিন পূর্বে পালিয়ে গেল প্রলয়ের সাথে ।
- ৩ -
সুসজ্জিত মনোরম একটি ফ্ল্যাট । ফ্ল্যাট ভর্তি কয়েকজন যুবতী মেয়েরা আধুনিক পোষাক আর উগ্র সাজে সজ্জিত সবাই । প্রতিটি কক্ষে নারী আর পুরুষ ।
নম্বর দেয়া ৬টি কক্ষ । পছন্দমত তরুণীকে নিয়ে, টাকা জমা দিয়ে একেকজন পুরুষ ঢুকছে একেকটি কক্ষে । অর্পিতার মাথা ঘুরাতে থাকে ।
তরুণীদের লীডার ভ্রু উঁচু করে প্রশ্ন করে, গাধা তুমি, মেডিকেলের ছাত্রী হয়েও ভয়াবহ মাদকাসক্তকে চিনতে পারোনি ! নেশার লোভে তোমাকে বোকা বানাত, আর তুমি টাকা দিতা । তোমার প্রলয়, তোমাকে এখানে বিক্রি করে দিয়েছে ।
এই কথা শুনে মূর্ছা যায় অর্পিতা । জ্ঞান ফিরে নিজেকে দেখে হাসপাতালের বিছানায় । জোরে পড়ে যাওয়ার জন্য মাথা ফেটে যায় । জ্ঞান ফিরেই চিৎকার করে ওঠে সে । হাসপাতালের ডাইরেক্টর অর্পিতার বাবার বন্ধু । তিনি অর্পিতাকে ফিরিয়ে আনেন, এই নোংরা জগৎ থেকে । কিন্তু অর্পিতাকে গ্রহণে অস্বীকার করে তার বাবা মা ।
অর্পিতার অভিভাবক হয়ে যায় ডাইরেক্টার স্যার । ঢাকা মেডিকেল কলেজের পোস্ট মর্টেম ক্লাসে যায় অর্পিতা । জীবন যুদ্ধে হেরে গেলেও, লেখাপড়ার যুদ্ধে প্রথম হয় সে ।
ছোট্ট বেলা থেকেই বড় ডাক্তার হবার স্বপ্ন অর্পিতার । কাটাছেড়া, সেলাই, ড্রেসিং- এ ভীষণ দক্ষ সে । স্যার এর পাশে দাঁড়ায় সে । বেওয়ারিশ একটি লাশ উল্টো হয়ে পড়ে আছে চাটাই এর উপর । ডোম লাশটিকে সোজা করতেই, মুহূর্তে নাই হয়ে যায় তার পৃথিবী । পায়ের তলা থেকে সরতে থাকে মাটি । চোখের পানি গড়িয়ে পড়তে থাকে গাল বেয়ে ।
চোখের সামনে টুকরা টুকরা করে ফেলা হয় প্রলয়কে । হাতুড়ি দিয়ে ফাটানো হয় মাথা । পোস্ট মর্টেমের জন্য মগজ বের হতে থাকে ছিটকে । সহ্য করতে পারে না অর্পিতা । আবারো অজ্ঞান হয়ে যায় ।

ডাঃ ফারহানা মোবিন
মেডিকেল অফিসার, গাইনী এ্যান্ড অবস,
স্কয়ার হসপিটাল, ঢাকা।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget