এপ্রিল 2015

তোমার বুক ই আমার সুখ; আমার জান্নাত
- আকলিমা আক্তার রিক্তা

পাহাড় গড়ার স্বপ্ন নেই
স্বপ্ন ছিল আকাশ ছুঁব
কিন্তু আকাশ ছুঁতে পারিনি
বিমর্ষ ও একাকীত্বতা নিয়ে তবুও ব্যর্থ
প্রয়াস ছিল আকাশ ছোঁয়ার
একদিন ঈশ্বর আমার চিলেকোঠার ঘরে এসেছিল
কেমন আছি, কি করছি জানতে চেয়েছিল
উত্তর দিয়েছিলাম কিনা মনে নেই ।
সেবাযত্নাদি করিনি হয়ত
অতঃপর ঘুম ভেঙ্গেছে ।
ঈশ্বর আমার কোন কাজে সন্তুষ্ঠ হয়েছিল জানিনা
তোমাকে পেয়েছি ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া শ্রেষ্ঠ
উপহার হিসেবে ।
সেদিন মধ্যসন্ধ্যায় তোমার বুকের পাঁজরে
আমাকে জড়িয়ে ধরেছিলে
তারপর রবীঠাকুরের সেই উক্তি ধ্বনিত হল
তোমার কন্ঠচিরে
“আমি পাইলাম, ইহাকে পাইলাম, এ যে দুর্লভ, এ যে মানবী
তার রহস্যের কি অন্ত আছে !”
তোমার বুকে পরম প্রশান্তি বিরাজ করে
আমি বিমোহিত হয়ে সেই প্রশান্তির স্বাদ নিয়েছি
পিঁপড়ে সমেত প্রশান্তি নিতেও ভুল করিনি ।
অতঃপর বুঝলাম আমি আকাশ ছুঁয়েছি
আমার শিরা উপশিরার প্রতিটি পরত আকাশ
ছোঁয়ার আনন্দে বিহবল ।
তোমার কন্ঠনালীর নিচে, আরেকটু নিচে, ঠিক বাম পাশে
রয়েছে তোমার বেহেশত সমেত বুক
ঐ বুকেই স্বপ্ন আছে, প্রেম আছে ।
তোমার বুক ই আমার সুখ; আমার জান্নাত ।

বন্ধুত্বের পরিচয়
- মিলন বেরা

কথার মাঝে কথার সাথে নীরব পরিচয়,
সম্পর্কটা বন্ধুর মতো বন্ধুত্ব কিন্তু নয় ।
সুখে দুঃখে পাশে থাকবে এটাই বলা হয়,
এটা শুধুই কথার কথা মনের কথা নয় ।
অনুভূতিটা অন্যরকম লজ্জা ঘৃণা ভয়,
সম্পর্কতে জড়িয়ে পরা সময় অসময় ।
কখনও দূরের কখনও ভীষন আপন মনে হয়,
মরুভূমির মরীচিকা ছাড়া আর কিছুই নয় ।
নামহীন এক সম্পর্কের অদ্ভুত পরিচয়,
এই কবিতাটা তাদের জন্য, সবার জন্য নয়,
যারা শুধুই বন্ধুর মতো বন্ধু কিন্তু নয় ।

পুরোনো সেই বাড়ি
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

নিষীথ অন্ধাকারে বসে আছি একাঘরে,
ঘুম যেতে চাই তবু ঘুম নেই নয়নে,
অবশেষে বিছানা ছারিয়ে উঠিলাম দারিয়ে !
ছম ছম আওয়াজ দীপ্ত পাঁয়ে হেঁটে গেলাম বাতির সন্ধানে,
হাতে নিয়ে দিয়াশলয়ের কাঁঠি জ্বালালাম দীপ্ত আলোর বাতি ।
হঠাৎ করে অচেনা চেহেরা আসিলো ভেসে,
না না বলে চিৎকার দিয়ে আমি সরে এলাম দূরে,
কিছুক্ষন থামিয়া দেখতে পেলাম সেতো এক ছবি,
হা হা হা কি?ভয় না পেয়েছিলাম আমি ।
স্থির হয়ে বসিলাম পড়ার টেবিলে,
ভাল লাগে না,বসে না পড়াই মন,
একা একা ভাবি আর ভয় পেয়ে থাকি !
দুই একটি ছন্দ ভেসে আসে
মনের আঙ্গিনায়,
লিখিতে যাবো তা খাতার পাতায়,
হঠাৎ ঠক ঠক আওয়াজ দরজায়,
ভয় পেয়ে বলিলাম কে কে দরজার ঐপারে,
আমি আছি বন্ধু এসেছি দেখা করব বলে,
ওহ, বন্ধু তুমি,কি ভয় না পেয়েছিলাম আমি ।

অনুভূতি
- শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়

বুকপকেটে বেজে উঠল মোবাইল
অধীর কাউকে আশা করে
অধীর আগ্রহে তুলে ধরে ফোনটা,
কাঁপা- কাঁপা হাতে, কাঁপা গলায়
কোনমতে বলে ‘হ্যালো’ ।
টের পায় সামনে বয়ে চলা গঙ্গার
ঢেউয়ের মতই
ছলাত- ছলাত করে বয়ে চলেছে
‘ও নেগেটিভ’ গ্রুপের রক্ত ।

পরের কয়েক মুহূর্ত মনে হয় স্বপ্ন;
নামিয়ে রাখে ফোনটা ।
চোখ চলে যায় নীলাম্বরী - শুভ্র বনফুলটার দিকে ।
এত রূপ ?
আগে চোখে পড়েনি !
টের পায় হৃদয়ে আরও অসংখ্য
ওই জাতীয় ফুলের অস্তিত্ব ।

মামা,বোমা এবং আমি
- মোহাম্মদ উল্লাহ শহীদ

ঐ মামা ঐ মামা
গাড়ি থামা গাড়ি থামা
আমারে লইয়া যাও,
ফাটে বোমা ফাটে বোমা ।

মা আমারে কইছেঃ
বাহিরে যাইছ না,
অপরিচিত কারো দেওয়া
কোন কিছু খাইছ না ।
কে শুনে কার কথা ?
না শুনে দেশের নেতা
ভঙ্গ করে আসল প্রথা
মিথ্যায় রমরমা ।
ঐ মামা ঐ মামা
ফাটে বোমা ফাটে বোমা ।

আমি মরলে জানি
দেশের কিছু হবেনা,
কিন্তু আমার মায়ের মনে
এই ব্যাথা সবেনা ।
কেঁদে কেঁদে আমার শোকে
জল ভিজিয়ে দুটি চোখে
অনাহারে থেকে থেকে
মরবে আমার মা ।
ঐ মামা ঐ মামা
ফাটে বোমা ফাটে বোমা ।

আমি কি আর মানুষ হায় !
হামলা কারির কাছে
আমার রক্ত জলের মত,
কিংবা মঁধু আছে ।
তাই তো তারা রক্ত পাগল,
রক্তের নেঁশায় হইল পাগল,
না চিনে হায় মানুষ,ছাগল
অযথা ফাটায় বোমা ।
ঐ মামা ঐ মামা
গাড়ি থামা গাড়ি থামা
আমারে লইয়া যাও,
ফাটে বোমা ফাটে বোমা ।

নীল চশমা
- ডাঃ ফারহানা মোবিন


- ১ -
হঠাৎ বেজে উঠল মোবাইল ফোন । আমিনুল সাহেব ভীষণ বিরক্ত হয়ে দেখলেন তার মা মিশ কল দিয়েছেন । বিরক্ত হয়ে বৃদ্ধা মাকে বকা দিলেন সব কলিগদের সামনে । চিৎকার করে বললেন, তুমি ব্রিটিশ আমলের মানুষ, তুমি যখন তখন ফোন করে ফেলো, জানোই না যে, মিটিং এর সময় ফোন করতে হয়না । ছেলের চিৎকার শুনে ভয় পেয়ে গেলেন বৃদ্ধা মা ।
মাঃ বাবা, আমিতো জানিনারে কখন তোর মিটিং থাকে । তাই ভুল করে ফোন করে ফেলেছি ।
ছেলের বকা খেয়ে দুচোখ ভিজে উঠল বৃদ্ধা মায়ের । ছানি পড়া চোখটি আরো ঝাপসা হয়ে উঠল ।
দরজাতে কে যেন ধাক্কা দিচ্ছে । দরজা খুলতেই উপমা প্রশ্ন করলঃ দীদা, তুমি দরজা বন্ধ করে কেন ফোন করো ? তোমার এত গোপন কি কথা থাকে ?
দীদাঃ নারে দাদু ভাই, তোর বাবার সাথে আমার কোন গোপন করা নাই । কারো সাথে আমার কোন গোপন কথা থাকেনা । তাহলে এইভাবে চুরি করে ফোন করো কেন, প্রশ্ন করল উপমা ।
দীদাঃ তোর বাবাকে ফোন করতে দেখলে, তোর মা খুব বিরক্ত হবে ।
উপমাঃ আমার বাবা তোমার ছেলে, তুমি তাকে ফোন করতেই পারো ।
দীদাঃ ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গেলে সবাই বাবা মার আপন থাকে না ।
উপমাঃ তাহলে বড় হয়ে কি আমিও বাবা মায়ের পর হয়ে যাবো ?
দীদাঃ না দাদু ভাই, তুই খুব ভালো মেয়ে । ভালো মেয়েরা সবার আপন থাকে । তোর বাবা আমাকে যেভাবে কষ্ট দিচ্ছে, তুই কখনো তোর বাবা মাকে কষ্ট দিবিনা ।
উপমাঃ তুমি কাঁদছো কেন ? কই কাঁদছিনাতো ।
দীদার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পড়ল উপমা । দীদা হাত বুলাতে লাগলেন উপমার মাথায় । মনোযোগ দিয়ে উপমা শুনতে লাগলো পুরানো দিনের গল্প ।
হঠাৎ ঘরের বাহিরে প্রচন্ড চিৎকার চেঁচামেচি ।
উপমা লাফ দিয়ে উঠল বিছানা থেকে । এক চোখ দিয়ে মালতি বেগম দেখলেন তার ছেলের বউ চিৎকার করে বলছেনঃ কেন মা, তোমাকে জমির ঐ ভাগ দিবে ? মা আমার বাসায় থাকে, তার একটা খরচ আছেনা, ঐ জমির ভাগ আমাদের । মা ঐ জমি কাউকে দিতে পারবেনা । আমি কাউকে দিতে দিবোনা । জমির ভাগ আমাকে দিয়ে তারপরে এই বাসা থেকে জাহান্নামে যাক । তাতে আমার কোন আপত্তি নাই ।
ছেলের বউ এর কথা শুনে মালতি বেগমের বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব হলো । তিনি বসে থাকতে পারলেন না । বিছানায় শুয়ে পড়লেন ।
উপমাঃ দীদা আমি সোনারগাঁ হোটেলে চলে যাচ্ছি । সাঁতার কাটতে, এইসব টাকা পয়সার ঝগড়া আমার ভালো লাগছেনা । আর শোনো তোমার মোবাইলে ৫০০ টাকা দিয়েছি । তুমি যার সাথে ইচ্ছা মন খুলে কথা বলো । তুমি ৫০ টাকার জন্য বাবা আর ফুফুদের কাছে হাত পাতো আমার খুব খারাপ লাগে । তুমি আমার কাছে থেকে নিবা ।
দীদাঃ তুই টাকা পাবি কোথায় ?
উপমাঃ আমি প্রতি মাসে ১০০০ টাকা স্কলারশীপ পাই ।
এই ১০০০ থেকে ৫০০ টাকা তোমার, ৫০০ আমার । আবেগ আর আনন্দে মালতি বেগম বুকের সাথে জড়িয়ে ধরলেন তাঁর নাতিকে ।
দীদাঃ তুই ছাড়া আমার কেউ নাইরে । তুই আমার খুব ভালো বন্ধু ।


- ২ -
এক মাস পরের ঘটনা । হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল মালতি বেগমের । বাসার মধ্যে উকিল, পুলিশ, কোর্টের লোকজন । কি ভয়ঙ্কর কথা । এতো মানুষজন কেন ? বিছানা থেকে নামতে পারছিলেন না তিনি । দৌঁড়ে এসে মহিলা এক পুলিশ তাঁকে বিছানা থেকে টেনে হিচড়ে নামালেন । ৫ মেয়ে আর ৪ ছেলে, নাতি, নাতনি, মেয়ের জামাই; ছেলের বউরা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করলেন মালতি বেগমের নামে বরাদ্দ থাকা ৫ কাঠা জমির ভাগ নেবার জন্য ।
মালতি বেগমঃ বাবা তোরা আমার সাথে এইভাবে গন্ডগোল করিস না, আমার খুব শরীর খারাপ ।
মীনা বেগমঃ দেখো মা, এসব নাটক করবানা । ভালো মানুষের মতো জমিটা আমাদের লিখে দাও । তা না হলে তোমার বিরুদ্ধে কেস করবো । আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো ।
মালতি বেগমঃ মা, তুই আমার সন্তান হয়ে এই কথা বলতে পারলি !! ওই জমিটা আমি রেখেছি কাব্যর জন্য । কাব্যকে আমি রাস্তা থেকে তুলে এনে মানুষ করেছি । তোরা এতো বড় বড় চাকরি করিস যে, আমি বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি, এইটা জানার সময় তোদের নাই । আজ কতো বছর পরে তোদেরকে একসাথে দেখলাম । আমি এতো দুর্ভাগ্যবান মা যে, ঈদের দিনেও তোদের সবাইকে দেখতে পাইনা । আজ জমির ভাগ নিতে তোরা সবাই উপস্থিত । আমাকে জেলখানায় পাঠানোর জন্য এসেছিস, তবুও ভালো তোদেরকে দীর্ঘ বছর পরে অন্তত একসাথেতো দেখতে পেলাম ।
রাকিব খান (২নং ছেলে) - মা তাড়াতাড়ি দলিলে স্বাক্ষর দাও । তোমার সাথে এতো কথা বলার সময় আমাদের নাই । তুমি বেকার মানুষ । তোমার কাজ নাই । কিন্তু আমাদের অনেক কাজ আছে । তাড়াতাড়ি স্বাক্ষর দাও । নইলে সত্যিই আমরা তোমায় আদালতে নিয়ে যাবো । কাব্যকে আমাদের টাকাতে মানুষ করেছো, এটাইতো যথেষ্ট । ওকে জমি দিবা কেন ?
মালতি বেগমঃ তোদের সবাইকে আমি বাড়ী, গাড়ী, ব্যাংকের টাকা সব ভাগ করে দিয়েছি । আমার ভাগের ৯০ ভাগ তোদেরকে দিয়েছি । কাব্যকে আমি মাতৃস্নেহে বড় করেছি । ওর বাবা মার কোন পরিচয় নয় ঠিকই কিন্তু মানুষ হিসাবে সে বড় ভালো । আমি এই জমি ওকেই দিবো । এটা আমার দীর্ঘ বছরের ইচ্ছা ।
ঝগড়া, চিৎকার চেঁচামেচি আর ছেলেমেয়েদের লালসার কাছে হার মানলেন মালতি বেগম । ৫ কাঠা জমি দিয়ে দিলেন ৯ ছেলে মেয়েকে । এইবার ৫ কাঠাকে ৯ ভাগ করার জন্য বেধে গেল মহাযুদ্ধ । প্রচন্ড পরিমাণে বুকে ব্যথার জন্য মালতি বেগম ঘরে যেয়ে দরজার বন্ধ করে শুয়ে পড়লেন ।
পরদিন সকাল বেলা । আকাশ ভরা মেঘ । সরকারী ছুটির দিন । আমিনুল সাহেবের বাসার বুয়া, মালি, ড্রাইভার, উপমা দরজা ভেঙ্গে বের করল মালতি বেগমকে ।
নিথর দেহে পড়ে আছেন মেঝেতে । দুচোখ থেকে গড়িয়ে যাওয়া পানিগুলো মিশে গেছে গালের সাথে । ডান হাতে ধরে ছিলেন একটি চিঠি । তাতে লেখা, “উপমা, দাদুভাই, আমায় ক্ষমা করে দিস । তোকে ছেড়ে চলে গেলাম ওইপারে । দীর্ঘ বছর ধরে সবার এই অপমান আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম নারে । আমাকে আর কষ্ট করে ওল্ড হোমে পাঠাতে হবে না । দাদু ভাই, তোর জন্য আমার একটি কিডনী তোকে দিয়ে গেলাম । এইবার তোর কিডনী ট্রান্সপ্ল্যানটেশানটা হবে । আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি । তুই তাড়াতাড়ি সুস্থ্য হয়ে যাবি । বিদায় দাদু ভাই । আমাকে ক্ষমা করে দিস ।”
উপমা কাঁদতে পারছেনা । বাক রুদ্ধ হয়ে তাঁকিয়ে আছে দীদার এক পা ভাঙ্গা টেবিলের দিকে । শূণ্য আর নিথর হয়ে পড়ে আছে দীদার কালো চশমা । চশমাটি আজ বেদনায় হয়ে গেছে নীল ।
১৩/০৭/২০১৪ইং, ঢাকা, বাংলাদেশ ।

একটান
- সিয়ামুল হায়াত সৈকত

গভীর অথর্ব দীর্ঘশ্বাসে জমে আছে কপালের ভাজ,
নতজানু মুহূর্তে ফোঁটা কল্পনায় বুনেছিলাম চোখ-
ভেসে যাই না পাওয়া হাত ছুঁই ছুঁই করে অনন্ত!
ওপাশে সমুদ্রের গান আমার গানগুলি ভোলায়
ওপাশে সমুদ্র বড় বেশী বিলাপ-বিষন্ন; ভোগে
ওপাশে কেউ নেই নেই করে কাটায় বেলাভূম
ওপাশে প্রান্তর খুঁড়ে আত্মা খোঁজার ভান চলে
অন্ধকারে আমি ছায়া রেখে মায়া চাই সুদীর্ঘ
চোখে চোখে ভালোবাসি বলে দিও,
সময়টা বড্ড পেরিয়ে যায় রাতে !

সাপে বর - ছাতা কাহিনী
- হাসান ইমতি


কিছু কিছু মানুষ আছেন যারা বৈষয়িক প্রায় সব দিকেই খুব সচেতন। কোন কিছুতেই তারা কারো চেয়ে কম যান না। সমাজে ঘাগু লোক হিসেবে পরিচিত এরকম অনেকেরই ছাতা বিষয়ক একটি কমন সমস্যা আছে, একবার ছাতা হাতে ঘর থেকে বের হলে তারা হয়তো সব কাজ ঠিকঠাক মত সেরে ঘরে ফিরবেন কিন্তু ছাতাটি ঘরে ফিরবে কিনা তার কোন নিশ্চয়তা নেই। আমি নিজেও কিঞ্চিত এই গোত্রভুক্ত একজন মানুষ, আমার কবলে পড়ে অদ্যাবধি কত নামী বেনামী ছাতাকে যে জ্ঞাতে ও অজ্ঞাতসারে হাতে বেহাতে পড়ে অকাতরে সতীত্ব বিলিয়ে দিতে হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই । সেইসব কাহিনী লিখতে গেলে বিশাল কলেবরের একঘেয়ে ছাতা উপাখ্যান হয়ে যাবে। তাই সেদিকে না গিয়ে আজ ছাতা বিষয়ক একটি ভিন্নধর্মী কাহিনী বলব । তখন আমি সি এ আর্টিকেল স্টুডেন্ট । অডিটের কাজে সারাদেশে বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে হয় । একবার গিয়েছিলাম এল জি ই ডি মিনিস্ট্রির পক্ষ থেকে এন জি ও কেয়ার বাংলাদেশকে দেয়া রুরাল মেইন্টেন্যন্স ফান্ড অডিটের কাজে । আমার দায়িত্ব পড়েছিল চট্টগ্রাম জোনে । তৎকালীন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংক সোনালী, রুপালী, জনতা, অগ্রণী, পূবালী এবং কৃষি ব্যাংক আকউন্ট থেকে এই লোনের টাকা দেয়া হয়েছিল, ওখানে আমাদের মুল কাজটি ছিল কেয়ার বাংলাদেশ থেকে দেয়া ফান্ডের হিসাব ব্যাংক হিসাবের সাথে রিকনসিলেশন করা । এজন্য বিভিন্ন ব্যাংকে ঘুরে কাজ করতে হত আর প্রতিদিন সন্ধায় ব্যাংক থেকে পাওয়া হিসাবের কপি ঢাকা অফিসে পাঠানো। তখন বর্ষাকাল সবে মাত্র শুরু হয়েছে, এই বিবেচনায় কাজের স্বার্থে সি এ ফার্ম থেকে আগেই রেইনকোর্ট কিনে দেয়া হয়েছে, প্রথমে আকাশের অবস্থা ভালোই ছিল কিন্তু কাজের মাঝামাঝি পর্যায়ে এসে খুব জোর বর্ষণ শুরু হয়ে গেল । শুধু রেইনকোর্ট পড়ে কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছিলাম না তাই বৃষ্টির অসহযোগের তোড়ে শেষ পর্যন্ত একটি ছাতাই কিনে ফেলতে হল। এর আগেই বহু ছাতা হারানোর রেকর্ডে আমার ব্যক্তিগত প্রোফাইল অতীব সমৃদ্ধ । তাই প্রথম দিন বেশ ভয়ে ভয়ে ছাতা নিয়ে বের হলাম এবং অতি সাবধানতা বশত সারাদিন ছাতা আগলে আগলে রাখাতে সন্ধ্যায় কাজ শেষে আমি এক নতুন রেকর্ড স্থাপন করে ছাতা সাথে নিয়ে সোনালী ব্যাংকের ফটিকছড়ি শাখা থেকে বের হলাম। এখন কাজ সারাদিনের সংগৃহীত রিপোর্টগুলো ঢাকায় কুরিয়ার করে পাঠানো । বাইরে যথারীতি অবিরাম বৃষ্টি ঝড়ছে, আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি বৃষ্টি অব্যহত থাকলে সাধারনত ছাতা হারানোর ভয় কম থাকে কারন বৃষ্টির মধ্যে বের হতে গেলেই ছাতার কথা মনে পড়ে যায়। সমস্যা হয় যদি কখনো বৃষ্টির ভেতর কোথাও গিয়ে ফিরে আসার সময় বৃষ্টি থেমে যায়, তখন ছাতার কথা কিছুতেই আর মনে থাকে না। এরকম ক্ষেত্রে বেশীরভাগ মানুষেরই সাধারনত ঘরে ফেরার পর ছাতার কথা মনে পড়ে, এই বিচারেও আমি এককাঠি সরেস, আমার এটি মনে পড়ে সাধারনত পরবর্তীতে যখন ছাতার প্রয়োজনে খুঁজতে গিয়ে ছাতা না পাওয়া যায় তখন। ব্যাংক থেকে আমি ছাতা হাতে নিয়ে রেইনকোর্ট গায়ে জড়িয়ে বের হয়ে গেলাম পার্শ্ববর্তী কুরিয়ার সার্ভিসের দোকানের উদ্দেশ্যে। দোকানে গিয়ে দেখলাম বেশ ভীর, যাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে তারাও বৃষ্টির কারনে বের হতে পারছে না । আমি ভীর ঠেলেই কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম, ভেজা ছাতাটি কোথায় রাখা যায় ভেবে এদিক সেদিক তাকিয়ে দেখি সামান্য দূরে কার্নিশ মত একটি জায়গায় সবুজ বাটের একটি বহু ব্যবহৃত পুরনো ভাঙা ছাতা ঝুলিয়ে রাখা আছে, আমি ঐ ছাতাটির পাশে আমার সদ্যকেনা নতুন ছাতাটি রেখে রিপোর্ট কুরিয়ার করার জন্য কাউন্টারের দিকে এগিয়ে গেলাম, ভীর থাকাতে বেশ খানিকটা সময় লেগে গেল কাজ শেষ করতে । কাজ শেষ করে ছাতা নিতে এসে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল, আমি যেখানে আমার ছাতাটি রেখেছিলাম সে স্থানটি ফাঁকা কিন্তু সেই সবুজ বাটের পুরনো ছাতাটি সগৌরবে তার নিজের স্থান দখল করে রেখেছে । বাইরে বৃষ্টি একটু কমে আসাতে দোকানেও ভীর কিছুটা কমে এসেছিল । আমি ঘটনা দেখে ঐ পুরনো ছাতাটি নিয়ে কাউন্টারে বসা কুরিয়ারের লোকটিকে ঘটনা খুলে বললাম । সে উপস্থিত সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল এই সবুজ ছাতাটি কার বা কার্নিশের কাছ থেকে কেউ একটি কালো ছাতা নিয়েছেন কিনা । কয়েকবার জিজ্ঞেস করেও এই ছাতার মালিক বা আমার ছাতার কোন খোঁজ না পাওয়াতে কুরিয়ারের লোকটি আমাকে বলল মনে হয় ঐ ছাতার মালিক তার পুরনো ছাতাটি বদলে আপনার নতুন ছাতা নিয়ে গেছে, আপনার ছাতাটি মনে হয় আর ফেরত পাবেন না, কি আর করবেন বলুন, আপনিই বরং এই পুরনো ছাতাটি নিয়ে যান । আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কোন উপায় না দেখে বিরক্তি সহকারে আমি ঐ সবুজ বাটের ভাঙা ছাতাটি নিয়ে দোকান থেকে বের হয়ে এলাম। এরপর ঐ কাজ শেষ করে ঢাকায় ফিরতে আরও সাতদিন লাগলো । সাতদিনে ভুল করে ঐ ছাতাটি একবার ব্যাংকে এবং আরেকবার খাবার হোটেলে ফেলে এসেছিলাম, দুইবারই ছাতার খোঁজ করতে গিয়ে ফিরে পেয়েছি । ঢাকা এসে দেখলাম ঐ ছাতাটি আসলেই একটি বিস্ময় । ঢাকা ফিরে প্রথমবার ছাতাটি ভুল করে ফেলে এলাম একটি চুল কাটার সেলুনে, পরদিন গিয়ে যথারীতি ফেরত পেলাম । এরপর ফেলে এলাম চায়ের দোকানে এবং পরে গিয়ে ফেরত পেলাম । এরকম ঘটনা প্রায়ই ঘটতে থাকলো । যেখানেই ছাতাটি ফেলে আসি গিয়ে ফেরত পাই। কেউ ভুল করেও এই ছাতাটি কখনো নিয়ে যায় না । এরপর একবার অডিটের কাজে গেলাম গাজীপুর, এবং কাজ শেষে আমার নিজস্ব স্টাইলে যথারীতি ছাতাটি ফেলে ঢাকায় ফিরে এলাম । পরদিন ক্লায়েন্টের অফিসে ফোন দিয়ে কাজের কথার ফাকে একটি ছাতা ফেলে এসেছি কিনা জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পিওনকে ডাকিয়ে জেনে আমাকে জানালেন যে সে ছাতাটি পেয়েছে । তিনি আরও বললেন আপনাকে তো সামনের মাসে আবার আমাদের এখানে আসতে হবে তাই আমি ছাতাটি রেখে দিচ্ছি আপনি তখন নিয়ে যাবেন । বলাই বাহুল্য আমি একমাস পর গিয়ে ঐ ছাতাটি বহাল তবিয়তে ফেরত পেয়েছিলাম। এই ছাতাটি আমি আরও বছর দুয়েক ব্যবহার করেছিলাম এবং দুই বছরে আরও অসংখ্যবার ছাতা হারিয়েছি এবং ফেরত পেয়েছি । আসলেই এ এক বিস্ময়, এখন পর্যন্ত আমার কোন ছাতা ব্যবহারের রেকর্ড সময় । অনেকের মনেই বোধহয় প্রশ্ন জাগতে শুরু করে দিয়েছে আসলেই তো ঘটনা কি। এটি কি কোন অলৌকিক ছাতা । যদিও আমি নিশ্চিন্ত নই তবুও আমার মনে হয় ব্যপার সেরকম কিছু নয় । ছাতাটি এতো বেশী পুরনো ও ভাঙা যে কেউ ভুল করেও নিতে আগ্রহবোধ করে না । একসময় ঐ ছাতাটি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে গেলে আরেকটি ছাতা কেনার সময় ছাতার দোকানীকে মজা করে এই কাহিনী শোনালে সে আমাকে বলল এই খবর পেলে তো ছাতা কোম্পানিগুলো পুরনো ছাতা উৎপাদন শুরু করবে আর ক্রেতারাও নতুন ছাতার বদলে পুরনো ছাতাই কিনতে চাইবে । এখন তো আপনি কোথাও পুরনো ছাতা কিনতে পাবেন বলে মনে হয় না, এখন বরং নতুন একটি ছাতা নিয়ে যান গতবারের মত কোথাও কারো ব্যবহার্য পুরনো ছাতা দেখলে আপনার নতুন ছাতাটি তার পাশে রেখে দিয়ে চুপিসারে সটকে পরে দেখতে পারেন ঐ ছাতার মালিক সদয় হন কিনা । তবে দূর থেকে লক্ষ্য রাখবেন, নাহলে বেশী সদয় হয়ে দুটো ছাতাই নিয়ে যেতে পারে । আর এতেও যদি কাজ না হয় তাহলে কোন ছাতা সারাইয়ের লোকের কাছে কিছু টাকা দিলে সেই আপনার ছাতাটিতে নতুন কাপড় বদলে ফেলে পুরনো কাপড় লাগিয়ে দেবে । ফলে আপনি আবার পেয়ে যাবেন আরেকটি পুরনো অক্ষয় ছাতা । যারা সচরাচর ছাতা হারিয়ে ফেলেন তাদের জন্য এটি আসলেই হতে পারে একটি মূল্যবান পরামর্শ ।

সানুনয় নিবেদন
- হাসান ইমতি

ক্ষুধিত ইচ্ছেময় পুরুষগন্ধি রাতের বুক পকেটের
অনৈতিক ভাজে রাখা কামভেজা কোন শরীরময়
বোধের সাথে আমার আর হয়না নির্ঘুম সহবাস ...
স্পর্ধিত বিশ্বাসের উর্বশী পাখায় লোলুপ আগুন
জ্বেলে পুড়িয়ে ফেলেছি আমার সব সুখস্বপ্ন ...
একটি ছিল কবিতা, একটি সাগর, অন্যটি তুমি,
এখন আমার আর লাল বেগুনী কোন চাওয়া নেই,
আমার আর নেই জোস্ন্যা প্লাবিত মধ্যবিত্ত অসুখ ।

জীবনের কিছু আঁধারঘেরা রহস্য জানতে হয়না,
তবুও স্খলিত সময়ে অনন্ত আঁধারের মাঝে বিস্মৃত
আত্মপরিচয় খুঁজে নিতে নিতে আমি জেনে
যাই জীবনের কিছু অপ্রয়োজনীয় নির্মম সত্য,
জীবনের কিছু অনাবশ্যক বিভীষিকাময় রহস্য,
আজন্ম লালিত বিশ্বাসের শেষকৃত্য শেষে
এখন আমার হৃদয়ে কেবলই অনল দহন,
এখন আমার দুচোখে শুধুই অনিবার্য ধ্বংস,
এখন আমি শুধু বিনাশ চাই মিথ্যে প্রহেলিকার,
সানুনয় নিবেদন শুধু একটি মহা প্রলয় ও একটি নতুন শুভ সুচনার ।

এসো হে বৈশাখ
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

প্রভাতের উত্তাপ সোনালি রবি,
বৈশাখের আলো আধার নিয়ে
কতই না কবিতা লিখিয়াছে কবি,
উত্তাল ঝড়ে, শ্রীমন্তের জোয়ারে
খেয়াঘাটে মাঝি ভিড়িয়াছে তরী !
হাস্য উজ্জল আলো হারিয়ে সন্ধ্যালগ্নে
ঘনিয়েছে আধার,
শৈশবের স্বৃতি আজ মনে পরে,
ইচ্ছে করে শ্রীমন্তে কাটি সাঁতার,
এসো বৈশাখ, এসো বৈশাখ
অতীতের যত দুঃখ কষ্ট আর রাগ,
নববর্ষের আনন্দে মুছে ফেলেছি আজ !
এসো হে বৈশাখ, শুভ নববর্ষ ।

বারো মাসের বাংলাদেশ
- রুনু সিদ্দিক

বছর ঘুরে এলো আবার বৈশাখ
বাঙালীর ঘরে বাজে আনন্দের ঢাক ।

আম - কাঁঠালের সুবাস নিয়ে আসে জ্যৈষ্ঠ
প্রকৃতি যেন থাকে কিছুটা রুষ্ট ।

অঝোর ধারা নিয়ে আসে আষাঢ়
কখনো আলো কখনো আঁধার ।

ঝরো ঝরো বৃষ্টি আসে শ্রাবনে
কখনো ভাসিয়ে নিয়ে যায় প্লাবনে ।

প্রখর রৌদ্র নিয়ে ভাদ্র আসে
তাল পাকা গন্ধে সারা গ্রাম ভাসে ।

নতুন ধান নিয়ে আসে আশ্বিন
আনন্দে ভরে উঠে গৃহস্থের দিন ।

কার্তিক নিয়ে আসে পুজা উৎসব
সারা দেশে পরে যায় সাঁজ সাঁজ রব ।

অগ্রহায়ন আসে নতুন ফসলের ঘ্রানে
কত যে সুখ জাগে কৃষানীর প্রানে ।

পৌষে পিঠাপুলি ভারী মিষ্টি
বাঙালী মায়েদের হাতে - গড়া সৃষ্টি ।

মাঘ মাসে শীত আসে অযোস নিয়মে
কেউ সুখে কেউ দুঃখে কাটায় পরমে ।

ঋতুরাজ বসন্ত আসে ফাল্গুনে
কত ভাললাগা জাগায় মানুষের মনে ।

চৈত্রের খড়তাপে পোড়ায় মাটি
তারপর আমাদের দেশ বড় খাটি ।

বৈশাখী হালখাতা
- শিমুল শুভ্র

বৈশাখী সাজে সাজছে গ্রাম
চৈত্রের চৈত্রিক ভাব মলিন
কানের দুল, কোমরে বিচা'য়
কন্যা নাচছে নতুন বছরের স্বপ্নিল ।
রাখালরাজা ঘুড়ি উড়াই
কত রং বেরঙ তুলির কাজ
দোকান পাটে হালাখাতা হয়
বিনয়বাবু শত ব্যস্তময় আজ ।
হিসেব কষে দেখলেন বাবু
দোকানে বাকেয়া খুব বেশি
গালে হাত দিয়ে বসে ভাবছেন
সব টাকা উঠে আসলে খুশি ।
হালাখাতার এক সাপ্তাহ পার হল
দেখা মিলছে না তাদের কাউকে,
গুটি কয়েক এসে জমা দিয়ে গেল
তাতে শান্তনা দিতে পারলোনা নিজেকে ।

রচনাকাল
১৩।১৪।২০১৫
ইউ এ ই

স্মৃতি
- হাসান ইমতি

স্মৃতি, তোর চুল ময়ূরাক্ষীর কাক কালো জল,
আমার খেয়া শুধু বারবার ডুবে ডুবে যায়,
আমি বারবার হেরে যাই নিজের কাছে,
আমি বারবার হেরে যাই সময়ের কাছে,
আমি বারবার হেরে যাই নিয়তির কাছে,
তবুও তুই প্রবাহমান, স্রোতশিলা, তেজস্বিনী ।

স্মৃতি, তোর দুচোখ নিঃসীম নির্নিমেষ নক্ষত্রবীথি
আমার কবিতার খাতা ছিঁড়ে তৈরি হয় কাগজের
খেলনা এরোপ্লেন, হাওয়ায় হাওয়ায় উদ্দাম উড়ে,
সে এরোপ্লেন কখনো পায়না তোর ছায়াপথের দেখা,
একসময় ক্লান্ত হয়ে সে ঝড়ে পরে ভূমি শয্যায়,
তবুও তুই থেকে যাস নিঃসীম নির্নিমেষ নক্ষত্রবীথি।

স্মৃতি, তোর হৃদয় অনতিক্রম্য অনন্ত মহাকাল,
আমার হাহাকার নিঃশেষে মিশে যায় স্তব্ধ
সাগরের বুকে ঝরা এক ফোঁটা বৃষ্টির মতো,
আমার বুক থেকে উঠে আসা দীর্ঘশ্বাসের পথ
বেয়ে ধরণীতে নেমে আসে বাধভাঙা অশ্রু প্লাবন,
তবুও তুই থেকে যাস অনতিক্রম্য অনন্ত মহাকাল ।

অলীক সুখ
- হাসান ইমতি

আতস কাচের চোখ থেকে আকাশের নীল
ঢেকে দেওয়া বৃষ্টির ঝুম পর্দা সরিয়ে যখন
তুমি নারীসুলভ পেলব ছলনা মেখে পুরনো
অতীতকে ফিরে পাবার অনাবৃত বাসনায়
বহুদিন পর আবার তাকালে আমার পরিত্যক্ত
পৃথিবীর মত বদলে যাওয়া পুরুষ চোখে তখন
আর আগের মত দক্ষিণ মেরুর সব সাদা বরফ
গলে মহাপ্লাবন এলো না নুহের পৃথিবীতে ।

কেবল একাকী রাত কান্নার মত হেসে লুটিয়ে
পড়ল শরীরসর্বস্ব নারীর ক্লান্তিকর অস্তিত্বে উষ্ণতা
খোঁজা বোকা মানুষটির সুখ ভাবনার উদারতায়,
তবু তুমি স্বার্থের হিসেবী শকুন চোখের মোহ হটালে
না আমার তোমার জন্য মৃত পাথর চোখ থেকে,
সব ভুলিয়ে দেয়া মায়াবী কন্ঠে পুরনো সেই মধু
ঢেলে আগের মত জানতে চাইলে "কেমন আছো ?"

তখন ভালো থাকা না থাকার মাঝের কুমারী
পর্দাটা ছিনাল নারীর মত বেফাঁস দুলে উঠে
বলল, প্রিয়তম, আবার দেখা হবে সহরমনে,
ডানা ঝাপটানো মৃত্যুর মত বেশরম কষ্টগুলোকে
ডালপালা সহ ভেসে যাওয়া শারীরিক রাতের
নিজস্ব গল্প শোনাতে শোনাতে ফিরে পাওয়া
গাঙ হরিণের ক্ষুধিত জীবন থেকে আমি ফিরিয়ে
দিলাম স্মৃতির দংশন জর্জরিত কিছু অলীক সুখ ।

লাল সূর্যের নিচে কিছু আলোহীন মানুষ
- হাসান ইমতি

রাগ অনুরাগের স্বপ্নমেদুর রঙে অকাতর হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া
শাশ্বত ভালোবাসা আজ বিলাপহীন জীবন যুদ্ধে অসহায়
পরাভুত হয়ে সস্তা নাগরিক বিনোদনের নির্লজ্জ কাচুলি পরে
কষ্টে মুখ লুকায় সিনেমাস্কোপের বাণিজ্যিক মিথ্যাচারের আচলে ।

সময়ের চেয়ে দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় ক্লান্ত মানবিক বোধের প্রাচীন
ধুলিধুসর ধ্যান ধারনা আজ ক্ষতবিক্ষত হয়ে ক্রমশ বদলে যায় নব্য
সময়ের গতিশীল স্বার্থপর চাহিদার সীমাহীন স্পর্ধিত উস্কানিতে ।

উসর আধুনিকতার অন্তহীন রেসকোর্সর ঘোড়দৌড়ের
মাঠে খালি পায়ে পথ হেটে চলা সাদা ধবধবে অথর্ব বিবেক
বুড়োকে অবলীলায় কক্ষচ্যুত করে বিপুল গৌরবহীন
বিজয়ে সমাসীন হয় সমসাময়িক ঊর্ধ্বগতি বাজারদর ।

সামাজিক বন্ধন শিকলে আবদ্ধ মানুষের পারস্পরিক
সম্পর্কের স্থানাঙ্ক নির্ধারণে হৃদয়ের মানবিক স্থান অকস্মাৎ
জবরদখল করে নেয় হিসাব নিকাশের ডিজিটাল নিক্তি ।

সবকিছুর পরেও পুরনো লাল সূর্যটা একই থেকে যায়,
বরাবর আলোর বর্ণীল পসরা সাজিয়ে রাখে শর্তহীন ।

কেবল লাল সূর্যের নিচে কিছু মানুষ রয়ে যায় আলোহীন,
কেবল লাল সূর্যের আলোয় কিছু মানুষ বদলায় অনুতাপহীন,
সূর্যের বিপুল প্রেক্ষাপটে কিছু মানুষ কেবল নগণ্য হয়ে যায়,
অনন্ত সূর্যের নিচে কিছু অন্ধকার মানুষ কেবল সূর্যের উদার
আলোয় আলকিত হয় না, আত্মার অতল গহীনে জমে থাকা
মৃত্যুর চেয়ে কালো আঁধার ঘোঁচে না সূর্যের অমেয় আলোয় ।

আমি চাই না
- মানিক মোহাম্মদ ওমর

আমার কাছ থেকে হারাতে চেয়েছো বারংবার ।
আমি বুঝতাম ।
তাই বলেছি, তোমাকে আমি চাইনা ।

তোমাকে ছাড়া স্বপ্ন দেখা বারণ,
কল্পলোকের দোলনায় দোলা মানা ।
নিষেধাজ্ঞা আছে পড়ন্ত বিকেলের আকাশ পানে তাকানোর ।
তবুও বলেছি, তোমাকে আমি চাইনা ।

তোমাকে ছাড়া মেঘলা আকাশ দেখতে
ছাদে যাওয়া হয় না,
হয় না খালি পায়ে মাঠের
শিশির ভেজা নরম ঘাস মাড়ানো ।
তোমায় ছাড়া গুড়িগুড়ি বৃষ্টিতে
পিচঢালা পথে কারো হাত
ধরে হাঁটাও হয় না ।
তবুও বলছি, তোমাকে আমি চাইনা ।

আকাশে আজো আগের মতোই
চাঁদ উঠে ।
মধুপূর্ণিমায় ভাসে গোটা জাহান ।
সে প্রেমময় পরিবেশে আর যাওয়া
হয় না ।
উদাস মনে হেঁটে হেঁটে আর
রবি ঠাকুরের গান শোনা হয় না ।
এরপরও বলতে হয়, তোমাকে আমি চাই না ।

তোমাকে ছাড়া এখন কিছু ভাবতে
ভালো লাগে না ।
ভালো লাগে না হাসতে, খেলতে,
গাইতে এমনকি লিখতেও ।
জীবনটাই যেনো অসহ্য হয়ে উঠেছে ।
তারপরও বলি, তোমাকে আমি চাই না ।

আজ পৃথিবীটা আমার কাছে
ভ্যাকুয়াম গ্রিন হাউজ ।
নিশ্বাস আমার থেমে যাচ্ছে ।
দেখতে পাচ্ছি মৃত্যু আমায় ডাকছে
করুণ হাতছানিতে ।
তাতেও আমি বলেই যাচ্ছি, তোমাকে
আমি চাই না ।
কেনো চাইবো ?
তুমি যা কিছু চেয়েছো আজো কি
তার ব্যতিক্রমটি আমি করেছি ?
করবোই বা কেনো, আমি যে তোমায়
আমার থেকেও বেশী ভালোবাসি ।

কেন !
- শমীক বন্দ্যোপাধ্যায়

আজকাল কলম হাতে নিয়ে লিখতে বসলেই
মাথার ভেতর কিলবিল করে ওঠে
অনেকগুলো কেন পোকা ।
কেন এত হানাহানি, কেন বিদ্বেষ, কেন সন্ত্রাসবাদ,
কেন এত বিবাহ - বিচ্ছেদ !
এছাড়া, আরও অনেক কেন ? কেন ?? কেন ???
এই কেন’র মিছিলের কোলাহলে
কানে লাগে তালা,
শব্দগুলো চিনে উঠতে পারিনা,
সব তালগোল পাকিয়ে যায়,
শুধু থেকে যায় একটানা বেসুরো আওয়াজ - কেন !
কলম খাপে গিয়ে হয় নিথর ।

সেদিন চৈত্র মাস তোমার চোখে দেখে ছিলাম আমর সর্বনাশ
- শ্যামল সোম


চৈতী হাওয়ায় গাছের ঝরা শুক পাতা উড়ে যায়। শুকনো পাতার উপর মর মর শব্দে বনের নিস্তব্ধতা ব্যহত হয়। একটা কাঠবিড়ালী তর তর করে উঠে গেল পাতা বিহীন গাছ বেয়ে, গাছের কঠোর বাসায় ডিমের ওপর বসে মা পাখী তা দিচ্ছে। গিরগিটিটা সবুজ থেকে হলুদ রঙ ধরে ইতি উতি চাইছে।
গাছের আড়াল থেকে সূর্যাস্ত শেষ আলো এসে পড়েছে।
বসন্তের ছোঁয়ায় লালে লাল আগুন ফুটছে পলাশ গাছে, আর ঐ কৃষ্ণ চূড়া- রাধা চূড়া গাছে গাছে।
স্বপ্না আর রঞ্জনের মাথায় ওপর ঝরে পড়লো শুকনো পাতা। দুজনে এক সঙ্গে হেসে ওঠে।রঞ্জন পাতাটা নিয়ে স্বপ্না সারা মুখে বোলাতে থাকে।
আমার ভীষণ ভয় করে রঞ্জন ?
খুব স্বাভাবিক, তুমি নন্দিনী আহমেদ, আমি রঞ্জন মুখার্জি, আমাদের ধর্ম আলাদা--
কিন্তু আমাদের ভালোবাসা, পাঁচ বছরের প্রেম?
হা হা হা - ওদের কাছে কানাকড়ি দাম নেই--নন্দিনী
কিন্তু রঞ্জন তোমাকে ছেড়ে আমি---কি -কি করে আমি? হায় ঈশ্বর!
এখনই চোখের জল ফেলে না , পরে অনেক কাঁদে হবে--
পরস্পরকে ভালোবেসে আমরা কোন অন্যায় করিনি
কিন্তু আমাদের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির বিশাল ফারাক--
কি সব পাগলের মতো বলছো তুমি ? আমারা দুজনে বাঙালি, বাংলাভাষী
নন্দিনী! সত্য রে লহ সহজে ! আমাদের দুজনের - না আমাদের দুই সম্প্রদায় বড় প্রিয় কবি বলেছেন, সত্য কে --
হিন্দু মুসলিম সম্প্রীতি ?
প্রীতি, ভালোবাসা, অবশ্যই ধর্মের অনুশাসন মেনে -সামাজিক দায় স্বীকার করে--
আমাদের মাতৃভাষা বাংলা?
ভাষার মধ্যে ও অনেক অমিল, আমারা বলি জল তোমরা বল পানি, অথচ কি সেই একই বস্তু আমাদের তৃষ্ণা মেটায়।একই ঈশ্বর, একই সৃষ্টি কর্তা। তবু একে অপরের ধর্মে প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাস নেই- প্রীতি নেই - এইটা বাস্তব- নন্দিনী! গৌর কিশোর ঘোষের " প্রেম নেই" উপন্যাস পড়ছো?
না, না -প্লিজ রঞ্জন, চুপ কর --দোহাই চুপ কর--
কাঁদলে -তোমায় ভীষণ সুন্দর দেখায় নন্দিনী !
কাঁদাবে বলেই কী তুমি তাহলে এত বছর তুমি আমাকে--
কাঁদালে তুমি মোরে ভালোবাসারই ঘায়ে -- এ গান তো তুমি আমায় বহুবার শুনিয়েছো--
কেন! কেন! কেন ! রঞ্জন কেন এত আমাকে ভালোবেসে ছিলে?
আমার নলিনী! কখন কবে যে তোমাকে এত ভালোবেসে ফেললাম !তা আমি-আ-আমি নিজেই জানতে পারি নি--
আমি থানায় যাবো, কোর্টে হাজির বলবো আমরা পরিনত বয়স্ক ! দেশে আইন আছে--
আইন মোতাবেক ব্যবস্থা পুলিশ করবে।তারপর ওদের নির্যাতন অত্যাচার--আর আইন-- হে-হ-
আইনত নিষিদ্ধ নয় আমাদের সম্পর্ক
নন্দিনী আইনের অনুমোদনের বহু যুগ আগে ধর্মীয় অনুশাসন, আচার অনুষ্ঠান প্রতিপালন হয়ে আসছে। স্বেচ্ছাচার বা ব্যভিচার, ধর্ম বিরুদ্ধ চারণ করে বাহবা হাততালি পাওয়া যায় কিন্তু বাস্তব জীবন ভীষণ কঠিন--
রঞ্জন আজ এত বছর পরে এখন এ সব --আমি কিছু বুঝতে পারছি না--
এখন এই কথা বলছি কারণ পরবর্তী সময়ে আমাদের বিবাহিত জীবনে সমস্যা আসবে-আসবে-আমাদের সন্তানেরা কোনদিনই ভালো ভাবে ঈদ বা দুর্গা পূজা কোন আনন্দ ঠিক মতো উপভোগ করতে পারবে না। কাউকে হেসে বলতে পারবে না ঈদ মোবারক বা শুভ বিজায়ার শুভেচ্ছা।
এ সব আমি কিছু ভাবতে রাজি নই।তুমি পাশে আছো আমি সব বাধা বিপত্তি লংঘন করে তোমার হাত ধরে যে কোন মূহুর্তে চলে যেতে পারি!
মুসলিম মেয়ে কোন হিন্দু ধর্মের ছেলে কে ভালোবেসে বিবাহ করবে, সে আমার ধর্মের ও সমাজের আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশী কেউই মেনে নেমে না। ঠিক সেই ভাবেই তোমার সমাজ ও ধর্মের কেউই আমাদের এই সম্পর্ক মেনে নেবে না।এই অধর্মীয়, অসামাজিক সম্পর্কের বিরুদ্ধে ওরা হয়ত --
আজ আমি কোন বাধাই মানবো না। একটাই জীবন এ জীবনে আমি তোমায় জীবনের চলার পথে চিরকাল তোমাকে পাশে চাই রঞ্জন।
তুমি তোমার ধর্ম পরিবর্তন করে হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হতে রাজি আছো।
ধর্ম-- ধর্ম, কিন্তু ধর্ম নিয়ে কোন আপত্তি কোন দিন-আমাদের মধ্যে-
ভবিষ্যতে বিতর্ক হতে পারে ? আমি শুধু কতগুলো সমস্যা, আসন্ন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে, তারই প্রস্তুতি-- এই স্বপ্না বহুদূর থেকে ভেসে আসা কোন শব্দ শুনতে পাচ্ছো?
না, কিসের আওয়াজ?
এই জঙ্গলের আশ্রয় থেকে এখনই বেড়িয়ে পড়তে হবে--
কেন ?
আমি ঠিক শুনতে পাচ্ছি
হাঁ, আমিও শুনতে পারছি, রঞ্জন ও কিসের আওয়াজ?
জীপ গাড়ি অনেকগুলো গাড়ির দ্রুত গতিতে ছুটে আসার আওয়াজ নন্দিনী
আমাদের খুঁজে বেড় করতে--আমাদের আপনজন আত্মীয় স্বজনদের সাথে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায় লোকজন লাঠি, বন্দুক ! ছুরি ! শানিত অস্ত্র
নিয়ে ছুটে আসছে।
কেন কেন রঞ্জন? আজ এই একবিংশ শতাব্দীতে এখনও মানুষে মানুষে ভেদাভেদ মানুষের ভয়ে মানুষ প্রাণ বাঁচাতে ছুটে পালাচ্ছে?
নন্দিনী শিগ্‌গির আমার বাইকের পিছনে উঠে বসো--
রঞ্জন আমারা কোথায় চলছি--
দূরে -বহু দূরে -কোথাও -কোনখানে--সূর্য এসে যেথায় মেশে রাতের অন্ধকারে সবাই অন্ধকার মুছে দিয়ে, নূতন এক সূর্যের দেশে--!

বাস্তব বলি
- মোহাম্মদ উল্লাহ শহীদ

যে স্বপ্ন ঘুমের ঘোরে মুছে যায় সেই স্বপ্ন নিয়ে ভাবেনা কেউ ৷
যেই রত্ন অযন্তে ক্ষয়ে যায় তবুও ক্ষয়ে যাওয়া বেদনা সবেনা কেউ ৷
যেই কথা আনে ব্যাথা সেই কথা কবেনা কেউ ৷
যেই পথ অন্ধকারে হারায় ভবিষৎ,বলি সেই পথে যাবেনা কেউ ৷

ভালোবাসা ভিখারী করেছে
- শ্যামল সোম

কেন, কেন তুমি, এতটা ভালোবেসে ছিলে ?
নিঃসঙ্গ রেখে, অবহেলে তুমি চলে গেলে ?
চেনা লাগে আমাকে, যে এখন অপেক্ষায়
আছে মরণের ।
হায় ! আমার পঞ্চাশ বছর
মনামী আমার প্রাণ আমার মন, তোমাকে
ভালোবাসে আজ কাঙালের বেশে ফিরছি,
দূরে দূরে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করে ফিরি এক
মুঠো ভালো ভালোবাসা যা হারিয়ে ছিলাম
ঝিলামের ধারে ।
পঞ্চাশ বছর আগে ঐ ঝিলামের জলে তুমি
হাত ধরে নিয়ে গিয়ে ছিলে স্নানে, জলপরী
তুমি আমাকে বুকে নিয়ে ভেসে ভেসে এ কি ?
এ কোথায় আনলে, আশ্চর্য নীলাভ আলোয়
লতা, গুল্ম, জলজ উদ্ভিদ, প্রবাল, শঙ্খ, শামুক
ঝিনুক, মনি মুক্ত খচিত প্রাসাদের এ আমি
কোথায় এলাম ?
বিশাল প্রাসাদে কেউ কোথাও নেই, একা এই
নির্জন পুরীতে ।
" মনামী ! মনামী ! " চিৎকার করে ডাকছি
সে ডাক প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরছে, দিন গেলো ।
রাত এলো একা ভয়ংকর ভাবে একা একা বছরের
পর বছর অপেক্ষায় থেকে ভীষণ ক্লান্ত, অবসন্ন,
বিষাদে, বিষন্ন হয়ে চলে গেলো এতগুলো বছর ।
আজ একা পঞ্চাশ বছর পেরিয়ে এসে অপেক্ষায় আছি ।

বাবা আমার বাবা
- মনিরা ফেরদৌসি

বট বৃক্ষের ছায়া যেমন
বাবা ছিলেন আমার তেমন
বাবা ছিলেন সহজ সরল
সাদা মনের মানুষ
ছোট্ট বেলা বাবার কোলে
ঘুরতাম কি আনন্দ উল্লাসে ।
বাবা আমায় ছেড়ে গেলেন
দশটি বছর আগে
বাবার স্মৃতি আজও কাদায়
সকল কাজের মাঝে
আজও যেন খুজে বেড়াই
বিশাল ধরাতলে ।
মা যে আমার হাসপাতালে
বাবার কথা পড়ছে মনে
বাবা যদি থাকতো বেঁচে
মাকে রাখতো বুকে চেপে
শূন্য ঘরে একলা কাঁদি
দুহাত তুলি আল্লাহ্‌র কাছে ।।

রূপালী আলোয় ভরা পূর্ণিমা
- মনিরা ফেরদৌসি

একদা একদিন আঁকাশ আর সূর্যের
সীমানা পেরিয়ে শৃঙ্খল ভেঙ্গে
কাছে এসেছিলাম ভরা পূর্ণিমার
তোমারই আলোতে যেন
কাব্যিক সুর বাজে
চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে
লাল সবুজের সুতো দিয়ে
রূপ যে তোমার রং বেরঙের
উদাস চোখে চেয়ে দেখি
নেশার মত চাঁদের দ্যুতি
নির্জনতায় ঘুরব আমি
রূপালী আলোর অজানায় ।।

প্রেম
- রনি চৌধুরী

প্রভাত পাখি তুমি
আমি ঘুম কাতুরে ।
তুমি শিশির ভেজা ভোর
আমি ঘুমের রাজ্যে বিভোর ।
তোমার ভেজা, চুলের খেলা
আমার খোলা পা''য়ে
ঘুম পাড়ানো মাসিপিষি
আমার ঘুম ভাঙাতে, তখন নিরুপায় ।
এই ভাবেই প্রতিটি প্রভাত
দারুণ এক প্রেম উম্মাদনায়
শেষ হয় আমার কালো রাত ।

হিমের রাণী
- বিভূতি চক্রবর্তী

হিমানী গো ! এ কোন ভোরের আলো তোমার
আধফোঁটা ঐ পদ্মচোখে,
আবেশভরে ঘুমভাঙ্গা কোন ঢেউএর মতো
থরথরিয়ে কাঁপছে সুখে ?
বলতে পারো আমার ব্যাকুল বিবশ হৃদয়
কোন অধরার হাসির মায়ায় অকুতোভয় ।
কোন সে মায়াবিনীর হাসি আছড়ে মরে
ইচ্ছে তুফান তুলছে বুকে ।
.
হিমানী গো ! তুষার শীতল হৃদয় তোমার,
বলতে পারো গলবে কবে ?
কেমন করে শাড়ীর আগুন জ্বালিয়ে তুমি
কত হৃদয় গলিয়ে দেবে
কি চাও তুমি সত্যি করে বলতে পারো
মনের ভিতর উথাল পাতাল চলছে আরো
বলতে পারো কোন সে নেশায় জড়িয়ে আবার
ফিরে এসেই চলবে তবে ।
.
হিমানী গো, হিমের রাণি ! এসেছি আজ,
তোমার দ্বারে - ফিরিয়ে দেবে ?
আশার প্রদীপ জ্বালিয়ে আবার এলাম শেষে
ও চোখ তোমার ফিরিয়ে নেবে ?

ছোট পাখি
- নবীন প্রভাত

- শিকারি -
ছোট পাখি ছোট পাখি এসো মোর কাছে,
পরিপাতি খাঁচা একটি তোমার তরে আছে ।
সুকোমল মকমল সজ্জা দেব পেতে
পাকা পাকা মিস্টি ফল পাবে তুমি খেতে ।
- ছোট পাখি -
না ভাই যাবনা আমি তরুলতা ছাড়ি,
সুন্দর কাননে মোর আছে ঘর বাড়ি ।
উড়িতে বাসনা মোর নীল্ আকাশে ভাসি
হলেও সোনার খাঁচা ভালো নাহি বাসি ।

নস্টালজিয়া - ১১
- শফিক হীরা

পাতার কল্লোলে ঘুম ভেঙে গেলে উঠে বসি নিভৃত যতনে
খুঁজি প্রিয় স্পর্শ। হাতে ঠেকে
ঊনিশ বছরের পুরনো চশমা।
ঘষা কাঁচ।
সাময়িক নিরবতা।
জোনাকীর একঘেয়ে যান্ত্রিক যন্ত্রনা।
খানিকটা দীর্ঘশ্বাস আর
গলার কাছে আটকে থাকা বিটকেল এক অনুভূতি নিয়ে
উঠে বসি আমি। আলোক নগরী সহসা থেমে যায়।
জানালার চিকন পর্দা গলে তোমার আগমন। পূর্বের সেই
বিষাদাক্রান্ত মুখে জাগতিক মায়া।
মাথার ভেতর অসহ্য যন্ত্রণার আস্ফালন।
আলোর অভাব।
বাইরে হাওয়া দিচ্ছে খুব।
নিশাচর জীবন উন্মুখ আজ আর
ভীষণ নিঃসঙ্গ।
প্লিজ চলোনা বাগানে একটু হেঁটে আসি!

ছুঁইয়ে দিতে চাই
- মনিরা ফেরদৌসী

বারান্দাতে হাস্নাহেনা
ছড়ায় মিষ্টি গন্ধ
কৃষ্ণচূড়ায় জোনাক জলে
কি অপরূপ ছন্দ,
রাতের বেলা স্বপ্ন দেখি
মন চলে যায় তেপান্তরে
উঠোন ভরা জ্যোৎস্নার আলো
বয়ে চলা শান্ত নদী,
দিক হারিয়ে কোথায় যেন
জোয়ারে গেলাম ভেসে
নক্ষত্রের মানচিত্র ভুলে
তোমার হৃদয় দেখার জন্য ।
সপ্ত রাঙা কোন প্রতিক্ষায়
ছুটছি দিবানিশি
ঘনকালো মেঘ কেটে আজ
নাইবা এল আলো,
আমি ছুতে চাই ভারী বর্ষণে
বর্ষিত শ্রাবন ধারা
তোমার আকাশের অতি উজ্জ্বল
অনন্ত নক্ষত্র মালা ।।

উদয়ীমান প্রদীপ শিখা
- স্বজন ইসলাম নাহিদ

নবপ্রভাতের উদয়ীমান প্রদীপ শিখার
উজ্জলতার মাঝে পাখিদের একাকিত্ব
ঘোষনা;
বটমূলে বসে কাজ শেষে চাষীদের বিশ্রাম,আর সন্ধ্যালগ্নে জারি সারি
গানের আসর।
প্রভাতে শিশির ভেজা ধানক্ষেত,
রোদেলা দুপুরে সরষ্যে ফুলে ফুলে
মৌমাছির খেলা,মৃদু বাতায়নে প্রকৃতির
ডাকে, ফসলের পড়ে দোলা!
তাতেই খুশি বাংলার চাষী বাঙ্গালী,
তাদের প্রতিনিয়ত নবপ্রভাতে নতুন
স্বপ্ন নিয়ে, কোকিলের ডাকে ঘুম
ভাঙ্গে:
ছোট ছোট স্বপ্ন নিয়ে গড়ে তুলে কুটির,
আর নিজেকে সামিল করে, নবপ্রভাতে
উদয়ীমান প্রদীপ শিখার সাথে।

জোছনাকুমারী
- শিমুল শুভ্র

জোছনাকুমারী তোমার রূপে
গাছের পাতা লাজে মরে
নূপুরধ্বনির মধুর আওয়াজে
চাঁদনী আলোর রূপ ঝরে ।
রাংতা ঠোঁটে কমলা রঙ
খেলছে দারুন খেলা
শিশিরধৌত করে শুধু
মনের কোণে মেলা।
আলোর বিকিরণ তোমার প্রতি
জোছনা ভরা রাতে
মন গাংচিল উড়ে বেড়ায় সুরে
থেক আমার সাথে।
এই গভীর রাতে কোলে রেখ
তোমার চাঁদ বদন খানি
তুমি আমার জোছনাকুমারী
ওগো আমার মনের রাণী।

নষ্ট নগরে
- শফিক হীরা

একটা কালবৈশাখী ধেয়ে আসুক এই নগরে ।
লু হাওয়া ঘামমিশ্রিত কলরব আর ইতর প্রাণীর অযাচিত
মৈথুনে মুখর এই নগরীতে
বর্ষিত হোক রূদ্র বর্ষন ।
বহুদিন ধরেই বেঁধেছে ঘর পঁচাগলা খেকো কীট আমাদের
এই বিষন্ন নগরীর ফুসফুসে, যকৃতে আর হৃদয়ে। আশ্চর্য
পাখির কিছু রঙিন পালক খসে পড়ুক প্রতিটি জানালায়
চিলেকোঠার একাকী মুহূর্তে ।
অমসৃন ধূসর রাজপথে নামুক ঘন নীল বিরহী বর্ষন ।

জ্যোৎস্নাস্নান
- মনিরা ফেরদৌসি

ঘন মেঘে আঁকাশ ভরা
মনটা ভাসে চারপাশে
নীল রঙের আঁকাশ যেন
মেঘে ঢেকে করল কালো
প্রকৃতির বুক জুড়ে বাজলো
বৃষ্টির করুন সূর...
ছন্দে সূরে ঘুংগুর বাজিয়ে
পাড়ার গা উঠলো নেচে
গ্রিল বেয়ে ঝুলছে যেন
মাধবী লতা দুলে দুলে
জলবিন্দু গুলো হাসছে যেন
পাতার শেষ প্রান্তে ঝুলে
রিমঝিম বৃষ্টিতে কষ্ট ধুয়ে
দিঘীর জলে হবে জ্যোৎস্নাস্নান ।

বিনাশী শীষ
- সাঈফ ফাতেউর রহমান

বঙ্কিম গ্রীবা আলোড়িত বিষন্ন বাতাসে
তীব্রস্বর শীষ দিলো দর্পিত শিরীষ ।
এখন ক্লিওপেট্রা নেই, হেলেন তো নিখোঁজ ইতিহাসে;
ইউলিসিস আর যাবেনা সমুদ্র অভিযানে,কোন
তৈমুর লং বিধ্বংশী অভিযানে আসছেনা দূরযাত্রায় ।
নীরো বাজাচ্ছেনা বাঁশি, জ্বলছেনা রোমও ।
ইতিহাসের বলিরেখা পথে আলেকজান্ডার উধাও ।
হালাকু খান নেই, অশোক নিশ্চিহ্ন, হিটলার -মুসোলিনি
নিক্ষিপ্ত আস্তাকুড়ে।তাহলে স্পর্ধিত শিরীষ কোন ভিত্তিমূলে
অবিরাম শীষ দিয়ে প্রকম্পিত করে দিচ্ছে চরাচর !
বিনাশী অভিযান নেই দেব - দেবীদের, অন্যতর যাবতীয়
অনুষঙ্গ - সূত্রাবলীও অনুপস্থিত ।
তবুও এই বিনাশী শীষের অবসান প্রত্যাসন্ন কেন নয় ?

অস্থায়ী আবাসস্থল
- সঞ্জীব দে

অস্থায়ী আবাসের ছায়ায় আচ্ছাদিত
আমাদের প্রতিটি কোষ ও লোমকূপ
কোনো সম্মান - স্বর্ণমুকুট
ধরতে পারবেনা জীবন্ত ভ্রূণটাকে !
এ এক দূর্লভ দুষ্প্রাপ্য অনুভূতি আমার
নদীরা কি জানে
প্রথম জন্মের পরে
পিতৃহারা হয়ে ছুটে যেতে হবে
মিলনতীথীর অপেক্ষায় ...
সমুদ্র সঙ্গমে ।
তারপর বিলীন রূপরেখা
নিজেকে হারিয়ে ফেলে অসীমে ।
অস্থায়ী আবাস আমাদের
যতো খুনোখুনি হিংসা লিপ্সায়
অমর হতে চাই আমরা প্রতিটি প্রাণ ।
অমর তো আমাদের ফাঁকি দিয়ে
ছুটে চলে দিন দিনান্তের পথে,
আর আমরা ক্ষুধার্ত পৃথিবী গড়ি
স্থায়ী আবাসস্থলের অপেক্ষায় ।

মায়াবতী
- তুহিন আহমেদ

আমি তোমার চাঁদকে গিলে খাব -
চোঁখের ইশারায় লুটিয়ে পড়বে আমার
পায় ?
তোমার জোসনাকে চুষে খাব;
তোমায় আলোতে রাঙ্গিয়ে দিব ।
আমার ভালবাসা দিয়ে তোমার উর্বর
জমিতে -
মহাকালের রং ও রুপের কাব্য লিখব...
হে মায়াবতী, তোমার একটু ভালবাসা
পেলে ?

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget