জানুয়ারী 2015

একজন মুক্তিযোদ্ধার কড়চা
- কবীর হুমায়ূন

সদ্য যুবতী আমি- কলেজের চৌকাঠ পার হয়ে
পা দিয়েছি বিশ্ব বিদ্যালয়ের বিশাল জমিনে,
ভাই আমার তোখোর ছাত্র নেতা ‘ইকবাল হলে’ থাকে;
পঁচিশ মার্চ একাত্তর, ঝাঁপিয়ে পড়ে হায়েনারা,
আমাদের স্বপ্নের চাঁদ গিলে খেতে চায়;
অভীক ভাই সূর্যের অন্বেষনে ঘর ছেড়ে যায়।

এর কয়েকদিন পরে-
কিছু পশু আমাদের বাড়ি আসে ভাই-এর খোঁজে,
জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আমরা,
স্কুল শিক্ষক বাবা, জ্ঞানের অহমিকা নিয়ে বলেঃ
গণতন্ত্রের কথা, ন্যায়ের কথা, ভালোবাসার কথা।

পশুদের সাথের শেয়াল ছিলো দু’টি,
ইতিউতি করে দরজার পেছনে চোখ ফেলে,
ভয়ে থরথর করে কাঁপে আমার শরীর,
ঘৃণায় এক কলসী থুতু জমে মুখে;
কি জানি কি ভেবে হঠাৎ হায়েনারা
ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার বুকে-
ছিন্ন-ভিন্ন করে তাঁর সমস্ত শরীর- অজস্র গুলি!
মা আমার পাশের ঘর থেকে ছুটে আসেন-
তীব্র ঝড়ে আক্রান্ত, ভীত সন্ত্রস্তা;
বাবাকে বাঁচানোর ফুসরতই পেলেন না,
লুটিয়ে পড়েন বাবার পায়ের কাছে,
বড়ো লক্ষ্মী ছিলো মা আমার।
আমার দৃষ্টির সীমানায় ঘটে গেলো
পৃথিবী পরিবর্তনের ধ্বংসাত্মক লহরী,
চেতনবিদ্ধতাহীন আমি অচিন দেশের যুবতী।

যখন হুঁস হলো নিজেকে আবিস্কার করি
অয়োময় খাঁচায় বন্দী বিধ্বস্ত পাখি এক ;
প্রচন্ড ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছে সমস্ত শরীর,
নারীত্বের অহংকারে জ্বলছে হাবিয়ার তীব্র আগুন!
মেঝেতে রক্ত- অজস্র অশোক ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়;
গবাক্ষ গলে পড়া একটি আলোর রেখা ছাড়া
আর কিছুই দেখছি না; অন্ধকার জতুগৃহে
কতো লক্ষ বছর ছিলেম! আমি কিছুই জানি না।

একদিন বুঝতে পারলাম আমি ,
সব সুনসান- নেকড়ে, হায়েনা, কুকুর, শেয়ালের
কোন আনাগোনা নেই, চিৎকার নেই;
কাঁদার ভেতরে শুয়োরের ঘোঁৎঘোঁৎ নেই;
শুঁকতে শুঁকতে আসে না কোন পশু, শুয়োরের বাচ্চা,
আমার দেহের কাছে, প্রচন্ড ঘৃণার নাগালে।

কোথাও দূর থেকে ভেসে আসে সমুদ্রের গর্জনের মতো
জলোদ্ভাবিত হিরন্ময় শ্লোগান- ‘জয় বাংলা’ ...।
আমার রক্তে ঝড় ওঠে, কন্ঠ মেলাতে চাই;
অক্ষম আমি, নিস্তেজ হয়ে পড়ি নিষ্প্রভতায়।
অনুভবে ধরা পড়ে আমার ভেতরে আরেকটা ‘আমি’।

এমন সময় , অন্ধকার ভেদ করে সমস্ত ঘরে
ছড়িয়ে পড়ে তীব্র সূর্যালোক ;
তীব্র আলোর আঘাতে চোখে জ্বালা ধরে
শরীরের সমস্ত শক্তি নিংড়ে দাঁড়াই আমি-
সূর্যের পানে যাওয়ার প্রচন্ড শক্তি নিয়ে।

চোখের সামনে দেখি আমার ভাই!
দাঁড়িয়ে আছে শশ্রুমন্ডিত, রাইফেল কাঁধে।
এই সে-ই ভাই-
যে আমাকে আদর করতো পুতুলের মতো,
ভর দুপুরে সবচেয়ে উঁচু ডালের পাকা আমটি পেড়ে দিতো,
নিজের শরীর রক্তাক্ত করে পেড়ে আনতো বেতস ফল,
বৈশাখী মেলা হতে আমারই জন্য কিনে আনতো-
চুলের রঙিন ফিতা, কাঁচের বেলোয়ারি চুড়ি,
মাটির পুতুল, সোলার পাখি, আলতার বড়ি।
তাকে চিনতেই আমি অবশ হয়ে গেলাম,
নিংড়ে তোলা শরীরখানি হারিয়ে গেলো।

আমি শুয়ে আছি- প্রেমময় ভাইয়ের কোলে,
মমতার হাত আমার জট-পাকানো চুলে বিলি কাটে।
দু’চোখে তাঁর অশ্রুর নদী- বরফ গলা জলের ধারা।
বিহ্বল তাকিয়ে রই অনিমেষে-
আমার সূর্য সন্তান ভাইয়ের প্রতি...

[একজন বীরাঙ্গনা- একজন মুক্তিযোদ্ধা।]

লুকোনোর উপপাদ্য
- সিয়ামুল হায়াত সৈকত

রাত ফিরলেই আমি দাড়কাক
সোডিয়াম বাতি আমাকে অস্পষ্ট রাখুক-
গোলের পাল্লায় আমি অভাগা দিনেদিন
কালো-ছায়ায় থাকিনা কয়েকযুগ..
প্রতিযোগ আমাকে ডানাভাঙা বলুক
তবুওতো আমি কিছুএকটা!
আমাকে অস্পষ্ট রাখুক
আমাকে ছুঁতে য্যানো না যায়।
ঢেঁর …এই ভালো।

২৫.০১.১৫ইং

ফিরে তাকাও তথাগত
- কৃষ্ণা দাস

যে পথে গেছো চলে
এঁকে-বেঁকে ঝরণা তলে,
হে তথাগত,-
শুধু একবার হও অবগত-,
দেখো রয়েছে কলস ভরে
অমৃত ভাবনা নির্যাস,
অনন্ত স্মৃতিসুধা গীতিময় কাব্য
বৃন্তখসা রক্তিম পলাশ ।
জানি সময় বড় কম
সামনে ওই অসীমের হাতছানি,
তবু তারে বলে দাও
কিছুটা সময় তারও পাওনা
যে পিছে উত্তরীয় রয়েছে টানি ।
কিছু না, শুধু কিছু ভাবনা,
কিছু না বলা অনুভব,
কিছু মাটি-জল-ঘাস ভরা ভিজে মনের
অস্ফুট কলরব ।
শুনতে কী পাও?
আঘাত করে কী তন্ত্রীতে
ইথর তরঙ্গ?
কিছুটা আঁধার তারও প্রাপ্য,
কিছুটা আলোরও চাই সঙ্গ।
দেবেনা তারে?
দেবেনা ঝরা পাতার নিঃসঙ্গতা,
অব্যক্ত ব্যথার নির্মাল্য ?
দিগন্তের সীমানায় মুছে যাওয়া তারা কথার
গভীর গোপন সারল্য ?

স্মৃতির রেবতী
- কবীর হুমায়ূন

স্মৃতির রেবতী চলে দ্রুত গতি
হারায় আঁধারে কোন ছলে?
(বহু) তির্যক বাণ ঝরে অফুরান
ফিরবে সে ফের মন বলে।
তুর্য-নিনাদে বিরহীরা কাঁদে
গোপন কুঠিরে শব্দহীন,
(দেখো) ঘন মেঘ ভাসে দূরের আকাশে
সময়ের কোলে রুদ্ধ দিন।
কবিতারা আজ তুলে কারুকাজ
শানানো শব্দে আসেনাকো,
(তবু) সুর তুলে গাই প্রণতি জানাই,
সুন্দরতায় ভালো থাকো।

১১/১২/২০১৪।
পল্লবী, ঢাকা।

জননী
- কবীর হুমায়ূন

জীবন ধারায় চেয়ে চেয়ে যাই প্রেমের ফল্গুধারা;
প্রেম কিরে হায়, বুঝিনিকো তায় জীবন হলো যে সারা।
ভালোবাসা এক নির্মোহ প্রেম সংঘাত হরে নেয়,
হৃদয়ের মাঝে শুদ্ধতা আনে অরূপের রূপ দেয়।

জীবন প্রভাতে ভালোবেসে আমি দুঃখ করেছি ক্রয়,
এখনো মূল্য দিতেছি তাহার জীবনকে করে ক্ষয়।
মাতৃ-ক্রোড়ের ভালোবাসা পেয়ে ভুলেছি জগৎ-দুখ,
স্বার্থপর এ বুকের ভেতর আনিয়াছি কতো সুখ।

জননী আমার কোথায় আজিকে চারিধারে মরি খুঁজে;
স্বার্থের টানে সকল ভুলিয়া চলছি কি চোখ বুজে?
ডাকিতেছে মাতা- 'আয় খোকা আয়, পরানের ধন, সোনা!'
জটিল সময় পার করে যাই সময় যে হাতে গোনা।

যাবো যাবো করে হয়নি যাওয়া অভিমান করে হায়,
জননী আমার নিরবে গিয়েছে দূর পথ অজানায়।
বুকেতে পাথর বাঁধিয়া কাঁদিছে প্রেমময় এক মন,
অভিসপ্ত হে! সারাটি জীবন করে যাবি ক্রন্দন।

মাগো তুমি ক্ষম, অধম বালকে দয়াময় হে জননী!
কুপূত্র হয় যথায় তথায়, কুমাতা হয় না শুনি।
২২/১০/২০১২।
চর বাউশিয়া, গজারিয়া
মুন্সীগঞ্জ।

শাস্তি
- জোহরা উম্মে হাসান

সব কথা শেষ , তবু কেন মুখোমুখি বসে আছি
এখনো দুজনা ? দুজনা ? এই মাত্রর ওয়েটার হাতে ধরিয়ে দিয়ে গ্যাছে বিলটা । শোধ করে দিলে চুকে বুকে যাবে সবটা !
পেয়ালা জুড়ে ধুমায়িত চা সকাতর , শুকিয়ে যাওয়া
চৌবাচ্চার মতো মরমে মরে। নো অ্যাডেড সুগার
কুকিজ এর পাশ ধরে সারি বাঁধা পিঁপড়ার কসরত চলছে বেড়ে ।
সিনার দেয়ালের বুকে লাফালাফি টিকটিকি জুটি
প্রাইভেসীর সীমারেখা লঙ্ঘন করে কেবলি পাতছে আঁড়ি ! জোড়ায় জোড়ায় নরনারী আসছে যাচেছ, যাচেছ আসছে রেস্তোরায় । আমরা তার কোনটির দলে ? কোনটির দলে ?
পকেটে অযথা হাত অথবা ঘনঘন ঘড়ি গোনা
বারে বারে মনে করিয়ে দিচেছ, সময় বড়ই সংক্ষিপ্ত !
বড়ই সংক্ষিপ্ত !পাতলা চুলে নখের ডগা চালিয়ে ওদের একজন বললো,কেউ যদি কিছু মনে না করেন , আমরা আর একটু
বসতে চাই এখানে । আর একটু । প্লীজ ! প্লীজ !
অন্যজন মাথা নাড়িয়ে একাগ্রতা প্রকাশ করলো
প্লীজ ! প্লীজ !
চিলতে কাপ-পেয়ালা হঠাৎ করে বলে উঠলো :
না , না , কিছুতেই না ,তোমাদের শাস্তি
সময় মতো আস্বাদ গ্রহন না করার জন্য !!

বুকের মানিক
- সোনম মনি

মায়ের
পাশ কপালে পাকা চুল
ভাঁজ হয়ে যাওয়া গাল
কুঁচকানো কালো চামড়া ,
চোখের নীচে কালি।
ভেঙ্গে যাওয়া দাঁত
পিঠের ব্যাথা,
পায়ের ক্রাম্প ,
আলোথালো উড়না,
সব কিছুই যে মা।
এই সব কিছুই মা কে
আরো মায়ের মতন ক‘রে তোলে
সন্তানের কাছে।
কোন প্রসাধনী লাগে না,
চোখ ভর্তি ক্লিউপ্রেট্রা কাজল,
কুমকুমে টিপ, কিছুই লাগে না,
যে কোন মা তার সন্তানের কাছে
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ এবং অদ্বিতীয় মানুষ!
স্কুল থেকে ফিরেই ঐ মুখটা না দেখলে
সন্তান কি কিছুতেই শান্তি পায়?
দূরে থাকলে এই মুখটা দেখতেই
মনটা খাঁ খাঁ করে।
এই মুখেই সন্তান চুমু খেতে
পৃথিবীর একপ্রান্ত অন্যপ্রান্তে ছুটে যায়।
মায়ের আঁচল ধরা এই সন্তান ,
মায়ের বুকের মানিক!
আর যে কোন নারীর
শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তী এই মাতৃত্ব!
এই ভালোবাসার তুলনা নেই।
প্রেমিকের কাছে তুমি, ধূসর হতে পারো,
স্বামীর চোখে,অন্য নারী লেগে যেতে পারে
কিন্তু তোমার
সন্তানের ভালোবাসা হলো- কাঁচা সোনা।

বর্ণিল ক্যানভাসে
- রেবেকা রাহমান

কোন এক গোপন ঘরে
কর্ণকুহরে ঢেলে দিলে প্রেম
তা ছড়িয়ে পড়েছে মন থেকে দেহে
দেহেতত্ত্বের বর্ণিল ক্যানভাসে
আঁকা আমাদের প্রণয়ের সুখ ছবি ...

সমুদ্রের দিকে দু বাহু বাড়ালাম
বালুময় পৃথিবী পার করে
একটি সামুদ্রিক স্বপ্ন ছুঁটে আসছে
আমাদের দিকে ...।।

আমি কোন কবি নই
- কবীর হুমায়ূন

আমি কোন কবি নই,
তবু, কবিতার কথা কই।
কবিতা আমার মগজের কোণে তোলপাড় করে, তাই,
শব্দকে এনে ঘসামাঝা করে কবিতা বানাতে চাই।
শব্দ ও সুর থাকে বহুদূর, যেন পরিযায়ী পাখি,
শীতের ছোঁয়াচ পরিহার করে উষ্ণতা ধরে রাখি।

কবিতা বানাতে পারি নাকো আমি কভু,
সোমত্ত যোয়ানীর মতো ধরে তবু
শব্দ-ছন্দ-সুরের লহরী আঁকতে যদিবা চাই,
কোত্থেকে এসে হাজির হয় যে আস্ত কবিতাটাই।

কবি. কবিতার খোঁজে হাঁটে দুস্তর পথ,
কবিতারা এসে কবিকে বানায় কাব্য কলার রথ।
আমি কোন কবি নই; তবু, কবিতার কথা কই,
কবিতার গায়ে আঁক কষে কষে উন্মুখ চেয়ে রই।

১৬/০১/২০১৫।

আত্মোপলব্ধি
- কবীর হুমায়ূন

(১)
কান পেতে শোনো বাঁশের বাঁশরী কাঁদছে করুন সুরে,
বিচ্ছিন্নতার বিরহ যাতনা উঠছে জগৎ জুড়ে।
কবে সে আবার মিশবে তাঁহার আপন-হৃদয়-সনে,
নিশিদিন বাজে হিয়াতল মাঝে সুগভীর সকরুণে।

(২)
আমার আমিই তোমাতে বিলীন, তোমাতে আমাকে খুঁজি -
আমার 'আমি'কে পাওয়ার তরে আমার সাথেই জুঝি;
আমার মাঝেই উদ্ভাসিত হয় তোমার আলোকটাই,
আমার মাঝেই তোমার প্রকাশ, আমি ছাড়া তুমি নাই।

(৩)
আমি যদি কভু 'তুমি' হতাম গো, তুমি হতে যদি 'আমি'-
আমাতে তোমাতে থাকেতো কি ভেদ, হে অন্তর্যামী!
আমাকে সৃজন করিয়া তুমি-ই বিচরণ করো তাহে,
তোমার সুরভী-মাখা-গীতধারা আমার হৃদয় গাহে।

(৪)
জ্ঞানকে করো এ দেহের রাজন চরম শিখরে উঠি',
রিপুগুলো সব স্তব্ধ করো, চেপে ধরে তাদের টুঁটি;
এমন জ্ঞানের আলোক ধারায় উচ্চে উঠো রে মন-
'জানিনা কিছুই' জগতের বিধি জাগবে এই বোধন।

কষ্টের ফেরী
- আকলিমা আক্তার রিক্তা

সুখ গুলো বড্ড ছোঁয়াচে
কিন্তু কষ্টগুলো বড্ড একরোখা
ঝাপটে ধরে দশহাত দিয়ে
রুপের বদল করে ফেরী হয়

হঠাৎ করেই বাড়িয়ে দেয়া ভালবাসার সময়
- জোহরা উম্মে হাসান

ফুটপাতের উপর বসে গায়ে গায়ে রোদ্দুরের
নাকছাবি পোহাচেছ কজন ! টেরিকাট চুল
উড়ু উড়ু মনের উসকো খুসকো যুবকটি লেপটে আছে
ডোরা কাটা শাড়ি , নীল চুড়ি যুবতীটির গায় ! পাশে গোমড়া মুখো একজন,
শাশুড়িই হবে হয়তো , চারদিকে পান পিকছিটিয়ে চোখে মুখে জানান দিচেছ- আমাদেরও তো বয়স ছিলো , তা বোলে এতো আদিখ্যেতা ?
কয়েকটা চুনো পুঁটী রোদ কাঁথা গায়ে । বট পাতার নীচে সুখ সুখ রোদে থৈ থৈ নানান জাতের মুখ !
যে যার মতো মহা ব্যস্ত যেন !
রোদেরও তো আবার হিসেব আছে।কতোটা সময় সে দেবে পোহাবার ,
কতটা সময় ধান কাঁথা শুকোবার
কতটা সময় হেলা ফেলা করে কাটিয়ে দেয়ার আর কতটা সময় অভিসারের ...।
এখন সময় পোহাবার , হয়তো বা
অভিসারের ! ঝুড়ি বাদাম বুকে ফিঁকে ঠোঁট ছেলেটির মন আজ ভারী ।
ভীষণ ভারী ! য়ুনিভা বন্দ অকারনেই
বাদাম খোলার জলে ডুব দেবে কারা ?
ফুলের দোকানীরও একটুএকটু করে কষ্ট জমছে বুকে ! বুকের মধ্যে !
অতঃপর তাদের দেখা মিললো , জোড়ায় জোড়ায় বাঁধা
কপোত –কপোতী যেন !
লাল, নীল , সাদা , বেগুনী
হলুদ , সবুজ কত কত !
ওরা এসে চিলতে ফুটপাতের
বুক জুড়ে বসলো । হাসলো , খেললো –করলো যত হুটোপুটি ,খুনসুটি । বাদাম চিবলো , কেউ ফুল পড়লো
খোঁপায় , কেউবা রেখে দিলো সযত্নে বুক পকেটে !
রোদটা তখন হঠাৎ করেই ভালবাসার সময় দিলো বাড়িয়ে !

মায়ের প্রতি ভালবাসা
- মুহাম্মদ হাবীব উল্লাহ

সবাই দেখি ভালোবেসে
জীবন দিতে পারে,
কে আছে জীবন দিবে
শুধুই মায়ের তরে।
মাতো হলেন তিনি
গর্ভে রাখলেন যিনি,
কেমনে হলে মীর জাফর
মাকে না চিনি।
কি এমন পাবে তুমি
এই জগতের কাছে ??
মাকে তুমি ভালবাসো
জগত রেখে পিছে।
স্বর্গ তুমি কেন খোজ
বল কিসের নেশায় ??
স্বর্গতো পাবে তুমি
মায়ের ভালবাসায়।

ফড়িং এর যাযাবর প্রেম
- আকলিমা আক্তার রিক্তা

কীটপতঙ্গগুলো যাযাবর হয়ে ঘোরে
সুযোগ পেলেই মাকড়শার জাল বুনে
জাল ছিড়ে গাঙের জলে ভাসায়
সভ্যতাকে বিলায় কানামাছির খেলায়
গড়ে তোলে নোংড়া সভ্যতার বিরাট উৎসব
পায়ে পিষে প্রিয়জনের ভালবাসা,অনুভূতি সব ।
ধিক তারে হাজার ধিক পতঙ্গের দুয়ারে
সমাজের উত্তম মম রাও এর মাঝেই পরে ।

তোর কাছে বার বার ফিরে আসি
- কৃষ্ণা দাস

তোর কাছে বার বার ফিরে আসি,
আঘাত আঘাতে তোকে নিষ্পেষণে
বার বার গোঙানির মতো শুনতে চাই
“ভালবাসি”।
আমি ক্ষয় হতে হতে ফিরে আসি ,
ঘুরে দাঁড়িয়ে বিজয় ঝান্ডা ওড়াই,
পৃথিবীর মাটিকে দুহাতে আঁকড়ে
জীবনের নোঙ্গর গাঁথি ।
তুই বার বার ভেঙ্গে গুড়িয়ে
আমাকে টুকরো টুকরো করে
উড়িয়ে দিস শূন্যতায়,
তোর অঙ্গুলী হেলনে সব জড়ো করে
নিজের ছাঁচে ফের গড়ে নিস আমায় ।
ভ্রূকুটিতে জন্ম নেয় উল্লাস ,
আলিক স্বপ্নে মাখিয়ে তোকে এবার
উড়িয়ে দিই নীল আকাশে ।
তুই উড়তে থাকিস ,
উড়তে উড়তে ক্লান্ত হয়ে
আশ্রয় চাইলে,
বুকের ভেতরে তালা বন্ধ ঘরে রাখি ততক্ষণ -
যতক্ষণ না সহনীয় হয়,
সহনীয় হলেই টেনে হিঁচড়ে বার করে
ফের উড়িয়ে দিই অসীমে ।
আসলে আমরাদের অভ্যেসে নয়, -
অনভ্যেসে ,
জয়ের আনন্দে ,
চিনচিনে ব্যাথা পাওয়াই নেশা,
তানা হলে তুই আমি কবেই
বুড়ো হয়ে ফুরিয়ে আকাশ নীল হয়ে যেতাম ।
বেঁচে আছি বোঝার জন্যই, কষ্ট পেতেই,
তাই বার বার ফিরে আসা
একে অন্যের কাছে ।।

স্বর্গীয় আবসান
- সোনম মনি

রুপালী আবসান
স্বর্গীয় মহিমায় অবিরাম
ঝিকমিক করে
পড়ছিল চারিধারে।
আকাশের দিকে
দুই হাত প্রসারিত করে
উর্ধপানে দৃষ্টি মেলে
সেই আলোক ধারা
মন প্রান ভরেই
উপভোগ করেছি ।
আঁখীযুগল,
সহাস্য ঠোঁট
কপোল,
চিবুক
সমস্ত দেহবল্লরী
সপে দিয়েছিলাম।
প্রকৃতির স্নিগ্ধ পবিত্র
সেই ঐন্দ্রজালিক প্রতিবেশে।
আশে পাশে
এদিক ওদিক
কোথাও
তোমাকে দেখিনি।
তবে আমি কেন
কানায় কানায়
পূর্ন ছিলেম
জানোকি?

শুধু তুমি
- প্রিয়দর্শিনী

শান্তদিনের মেঘলা আকাশে শুধু তুমি ,
পাতাঝরা অচেনা পথে শুধু তুমি ,
মনের একাকীত্বে শুধু তুমি ,
তোমাকে লেখা হাজার চিঠিতে শুধু তুমি ।
তোমার কি মনে আছে এই আমি ?
আমি জ্বালাই প্রদীপ তোমার নামে ,
আমি লিখি চিঠি তোমার নামে ,
আমি দেখি স্বপ্ন তোমার নামে ,
হাজার ব্যাস্ততায় একটুকু সময় তোমার নামে ,
লিখে যাই হাজার কবিতা তোমার নামে ।
তুমি হয়তো আজ অন্য সুখে, অন্য মায়ায় ,
তাই পড়না চিঠি আর, আজ--
তোমার কাছে আমি ব্যাস্ততা ,
তোমার কাছে আমি পালিয়ে যাওয়া ,
তোমার কাছে আমি হয়তো ক্লান্তি ,
তবুও আমি বিশ্বাসের মালা গাঁথি ,
অন্ধকারে হারিয়ে পাই আলো ,
না পাওয়ার মাঝে খুঁজে পাই পাওয়া ,
তাই, তোমার দেওয়া কষ্টগুলো আজ লাগে ভালো ।।

আমি আসব ফিরে
- শিল্পী চৌধুরী

তোমার আমার স্বপ্নের পৃথিবী গড়ার জন্য আমি আসব ফিরে তোমার কাছে
আমি আসব ফিরে ঐ আকাশ থেকে রামধনুর রঙ নিয়ে স্বপ্নগুলোকে রাঙাতে ।
পেছন ফিরে চাইব না আর যেন কোনো বিস্মৃতি আমায় ঘিরে না রাখে
উদ্দেশ্যহীন জীবন বাঁচব না আর , বাঁচব তোমার ঐ রিক্ত বাহুডোরে এসে
সেই জীবন দেব তোমার নামে লিখে স্বয়ং ঈশ্বরের আশীর্বাদ নিয়ে এসে
আমি আসব ফিরে আবার এই ধরণীর বুকে
যদি তুমি কথা দাও রইবে শুধু আমার জন্য অপেক্ষা করে
কিছুটা পথ চললে না হয় নিঃসঙ্গে , ভাবনায় আমাকে রেখে
হাজার বছরের পথ নয় মাত্র কয়েক দিন হাঁটবে তুমি আমাকে ছেড়ে ।
কথা দাও , আশার আলো নেভাবে না হৃদয় থেকে
আমার অনন্তকালের আশ্রয় যে তোমার বুকে ।
কথা দাও , বাঁচবে না তুমি কখনো ঘুণে ধরা বিশ্বাস নিয়ে ।
প্রেম তুমি যে মেঘলা আকাশ নও , তুমি আমার ভোরের ঝলমলে আলো ,
আমি আসব ফিরে মহাকালের পথ পাড়ি দিতে তোমার সাথে
যদি তুমি কথা দাও তুমি রইবে শুধু আমারই অপেক্ষা করে ।
আমি আসব ফিরে দু-জনের দেখা স্বপ্নের পৃথিবীকে রুপ দিতে ।

আবর্তমান অতীত
- সা'দ বিন সাঈদ

স্মৃতির গেলাশে অনেক ফরাশ কাব্য আছে,
মহুয়ার গ্রামে আছে খালি বাড়ি
সন্ধ্যার বিছানা।
জীবনের হ্যাংগারে ছিয়ানব্বই থেকে দু'হাজার-
ঝুলে আছে পরবর্তী আরো বসন্ত তেরো।
চোখ হয়ে বেঁচে আছে
বিকালের ক্রিকেট,
লালসাদা বল
আছে অগণিত চকলেট।
আমাদের চাচাজান, আকাশের মতো তার শুভ্র কাপড়, এবং
লাশের দুইটি দাঁত আছে।
দোকানের গায়ে রূপালী সাটার- মধ্যরাত।
উড়ুক্কু জোছনার মতো ওইখানে-
কতোবার হারিয়েছে হ্যাডলাইট।
কতোবার জীবনের কাছে এসে প্রেমের পাহাড়,
ফানুশ হয়ে গেছে।
হয়তো এটাই সময়- আগোছালো ইতিহাস হবে।
জন্মমৃত্যু সনের পাশেও- কবিতার সহবাস রবে।

মন
- পিয়ালী বসু

কুয়োতলাটা ফাঁকা
তবুও ইতস্তত এদিকে ওদিকে পড়ে থাকা
প্লাস্টিকের বালতি গুলি ভরন্ত
পোয়াতি দুপুর
উঠোন টাও ফাঁকা
তবুও ইতস্তত এদিকে ওদিকে পড়ে থাকা
শূন্যতা গুলি ভরন্ত
বহুদিন আগে ছেড়ে যাওয়া প্রত্যাখ্যাত মন
আজ শুধু তোমাকেই ভাবছে ।

স্বপ্ন বুনুন
- রুনু সিদ্দিক

কাটেনা কষ্টের ঘোর
হয়না রাত ভোর

বিচ্ছেদে বিবর্ণ হৃদয়
স্বপ্নেরা দিয়ে যায় ফাঁকি
তবু ও মনের ঘরে
কল্পনার উঁকি ঝুকি

ভাবনার জলকেলিতে
মনের অলি-গলিতে
উদাসী পাগল হাওয়া
বাঁধাতেও আসা যাওয়া

খোলা জানালায় আশার আলো
দুয়ারে এসে কেউ দাঁড়ালো...।

বৃষ্টিসুখ
- পিয়ালী বসু

বৃষ্টি আসন্ন
মেঘের চিরকুটে তার আগাম আগমণ বার্তা জানিয়ে
আমার এই ১০/১০ ঘর জোড়া ব্যাপক শূন্যতার হাওয়া
ভেজা বাতাসও আটকাতে অক্ষম এই মুহূর্তে
Nothing gonna change my love for you
পৃথিবী বদলাচ্ছে , বদলাচ্ছে পৃথিবীর রঙ
প্রথম চুমু , প্রথম শরীর সুখ
আর তোমার প্রলয় খোঁজা সঙ্গোপনে
Touch me now I close my eyes n dream away
ইজেল আর ক্যানভাস জুড়ে শুধু ছেড়ে আসা মুখের প্রোফাইল
বৃষ্টি এলো
তুমুল ভাসমান অন্ধকার গ্রে বৃষ্টি
নিকট আর দুরের সীমারেখা রাবারে মুছছে
It must have been love !

মুক্ত আলিঙ্গন
- স্বর্নেন্দু মুখোপাধ্যায়

আমি আর কোন বন্ধন চাইনা;
শুধু চাই তোমার মুক্ত আলিঙ্গন।
আমি চাইনা-
যৌবনের মোহে তোমাকে নিমজ্জিত করতে,
পরাশ্রয়ী লতা হয়ে আবদ্ধ করতে সম্পর্কের মায়াজালে।
শান্ত নদীর বুকে জমে থাকে গল্প; আমারও আছে।
মেঘের আড়ালে লুকিয়ে রাখা কান্না,
শতাব্দীর প্রাচীন বৃষ্টিতে মিশে থাকা যন্ত্রণা।
আমি ভুলে যেতে চাই সেই সব অতীত;
হৃদয়ে বেঁধে রাখা কষ্টগুলিকে আজ মুক্তি দিতে চাই।
বন্ধনহীন উন্মুক্ত পথ চলা ক্লান্ত পথিক,
শিশুর মত দ্বিধাহীন বাহু প্রসারিত করে অপেক্ষায়।
কবোষ্ণ স্পর্শে আজ ফিরিয়ে দাও-
একই কক্ষপথে আবর্তনের কারণ...

স্মৃতি গুলো আজ বড্ড জ্বালাচ্ছে আমায়
- আকলিমা আক্তার রিক্তা

স্মৃতি গুলো আজ বড্ড জ্বালাচ্ছে আমায়
সচেতন বা অবচেতন মনে উদাসীন হয়ে
ফিরে যাই সেই সে বেলার কথায়
কোন এক পূজোর ছুটিতে
সুস্থ নিঃশ্বাসের জন্য আপন করেছিলাম
সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা গ্রামটিকে
পথের ধারে কাশফুল
বিলে ছিল হাঁটুপানি
ক্ষেতের আলে আধো আধো কাঁদা
পুকুড় পাড়ে তুমি আর আমি
স্মৃতি গুলো আজ বড্ড জ্বালাচ্ছে আমায়
কোন এক ঈদের ছুটিতে
তুমিও এসেছিলে সেই গ্রামটিতে
লাউওয়ের মাচায় লাউ ঝুলানো
বাগানের গাছে বড়ুই,পেয়ারা
কাঁচা রোদ এর সমাহার উঠোনে
তার সাথে আমরা ও তোমরা
কোন এক শীতের বিকেলে
তোমার চোখে আমার চোখ খেলা করেছিল
আমার চোখ তোমাতে খেলা করেছিল
চোখের ভাষায় এক অন্যরকম খেলা
খেলতে খেলতে কেটে যায় বেলা
গোপনে হত চিরকুট এর আদান প্রদান
আর মূঠোফোনে মিষ্টি কিছু আলাপ।
স্মৃতি গুলো আজ বড্ড জ্বালাচ্ছে আমায়
প্রতি সন্ধ্যায় ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক
রাতে গভীর কালো আঁধার
মাঝে মাঝে উঠোন হাসে চাঁদনিতে
আর আমরা মেতে উঠতাম কানামাছিতে
ভর দুপুরে খালি পায়ে তুমি হাটতে
শ্বসান ঘাটে নিস্তব্ধ নিরবতা
মাঝে মাঝে তুমি কবরস্থানে হেটে বেড়াতে
আর মুঠোফোনে আমায় বলতে
টুনটুনি,আমি অনেকদিন বাচঁতে চাই
যারা নিস্তব্ধে ঘুমিয়ে আছে ঐ নিরালায়
ওদের মত পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চাইনা আমি
আমি তোমাকে ভালবেসে অনেক- দিন, অনেক-বছর,
হাজার বছর বাঁচতে চাই
আর আমি আহলাদে মিষ্টি হেসে বলতাম
এই টুনটুনির বর,
তুমি হাজার বছর,লাখো বছর,কোটি বছর
বেঁচে থাকবে আমার হৃদয়ে
আমার ভালবাসা দিয়ে বাঁচিয়ে
রাখব তোমায়।
স্মৃতি গুলো আজ বড্ড জ্বালাচ্ছে আমায়
দুটো আকাশ কে একত্রিত করে
বিশাল আকাশে এ রূপদান করেছিলাম
সেই আকাশে রোদেরা খেলা করত
রঙধনুরা আপন মনে ভাসত
আর মেঘেরা হাসত
হঠাত নভোমন্ডল কাঁপিয়ে তান্ডবীর ঝড় এসে
শত যত্নে ,ভালোবাসায় ঘেরা আকাশটিকে
চূর্ন,বিচুর্ন করে দিল
নিথর নিঃশব্দ হয়ে গেলাম আমি
আর তুমি নষ্ট হয়ে গেলে
আর আমি অবহেলায়,অবেলায়
দিন গুনছি তোমার সুস্থ হয়ে ফেরার প্রতীক্ষায়
এভাবে দিন ফুরিয়ে যায়
রাত আসে
আবার দিন
আবার রাত!

আমায় একটু হাসি ধার দেবে?
- আকলিমা আক্তার রিক্তা

এই যে তুমি ,হাস্যদেবী তোমাকেই বলছি
তোমার পাগল করা মন মাতানো হাসি থেকে
আমায় একটু হাসি একটু
শুধু একটু হাসি ধার দেবে?
আমিও ম-ন ভরে,প্রা-ন ভরে হাসতে চাই।
এমন হাসি যা আমাকে অন্য স-ব কষ্ট ভুলিয়ে দিবে।
এমন করে হাসতে চাই যে হাসি সমদ্রের ঢেউকে
থামিয়ে দিবে,পৃথিবীকে স্তব্ধ করে দিবে।
জানো, আজকাল এত্ত এত্ত কষ্ট এসে আমাকে
ঝাপটে ধরছে যে
আমি শত চেষ্টা করেও কষ্ট গুলোকে
দূরে ঠেলে দিতে পারছিনা!
যত ই দূরে ঠেলে দিতে চাইছি কষ্টগুলো যেন আমায়
আরো বেশী করে আকড়ে ধরছে!
আমি স-ব কষ্ট ভুলে একটু হাসতে চাই।
হাস্যদেবী আমায় একটু হাসি ধার দেবে???

বহুরুপি প্রানী
- আকলিমা আক্তার রিক্তা

উত্তরের জঙ্গলের পাশে পাহাড়ের চুঁড়োয়
কিছু আজব প্রানী বসে প্রান জুড়োয়
দখল করা গাছের নিচে চলে আড্ডা বেশ
গল্প আর আড্ডায় দিন হয়ে যায় শেষ।
জঙ্গলের ওই পাড় থেকে ভাবে পিপীলিকা
মজার সেই প্রানীদের সাথে হবে কি কভু দেখা?
পিল পিল পায়ে হেঁটে যায় সে স্বপ্নের ঠিকানায়
সন্ধ্যে নামার পথে সে উত্তরের জঙ্গলে পৌছায়।
প্রানীগুলোর মিষ্টি কথা দুষ্টু কাজ;অবহেলার নানা ঢং
বহুরুপি কথার প্রানী দেখে পিপীলিকায় ধরেছে জং
অবহেলিত পিপীলিকা পিল পিল পায়ে সঠিক সন্ধানে যায়
অবহেলাকারী সব হিংস্র প্রানী শিকারীর হাতে প্রান হারায়।

পেন্ডুলাম
- দেবাশীষ মজুমদার

খুব ভোরে
ছিটকে আসা পার্পল হাওয়ায় সন্নাটা উড়ে গেল, ইদানীং
কোলাহলগুলো বালিয়াড়ি ছেড়ে পৌঁছে যাচ্ছে পকেটের সেলফোনে।
কিছু কিছু আত্মকথা কোনদিন ঘুম ভেঙ্গে জেগে ওঠে, টগবগ করে,
ওরা যে কোথা থেকে আসে! শ্লোগান শুনে জানা গেল
তাদের কারো কারো হুইলচেয়ার নেই।

দুপুরের
রোদগুলো লিউকেমিয়া টাইপ রক্তশূন্যতায় ভুগছে দেখে দু’চামচ
ভালবাসা চায়ের কাপে মিশিয়ে নেড়ে চেরে দেখি সুনামিগুলোর
পূর্বাভাস কেঁপে উঠছে এনাক্ষী রায়ের শাড়ির কুঁচিতে, ধীরে ধীরে
তার চোখ চিঁড়ে বেড়িয়ে পরছে গ্রহণের কোলাহল।

বিকেলের
ঠোঁটের মধ্যে মগ্ন রং-এ
শ্বাস ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে বিপরীত দিক থেকে দেখছি-
সারাটা দিন পেরিয়ে আসা বিভ্রান্ত পথ, আর তার ধারে
বড় বড় হোর্ডিং এর পটে এক একটা দীর্ঘ সিলেবাস।

রাতের
কথা কাউকে বলবনা, এরা একান্ত আমার, শুধুমাত্র
পাতা ঝরবার দিন এলো বলেই এভাবে ঝরে পরতে নেই-
বাইরে কিংবা ভেতরে; চিন্তার কথা হল রাতেও ঠোঁটের গন্ধ
টেনে নেয় পকেটের সেলফোন।

ফেসবুক বন্ধু
- দিঘী সেনগুপ্তা


রিতা রায় একটা বেসরকারি প্রতিষ্টানে আছেন। একমাত্র ছেলে ।বয়স পনের। স্বামী আজ ১৪ বছর বিদেশে। মাঝে মাঝে আসেন। মাসখানি থেকে চলে যান। এতদিন ছেলেকে নিয়ে তার সময় বেশ কাটছিল। কিন্তু এখন ছেলে বড় হয়েছে। নিজস্ব একটা জগত হয়েছে। বেশী কাছে আসে না। অফিস থেকে ফিরে রিতার যেন সময় কাটে না। তাই ফেসবুক খুলে নিয়েছেন। এখন সময় বেশ কাটছে। ইদানিং রাজিব নামে এক বন্ধুকে ভীষণ ভালো লাগছে। রাজিব একজন ব্যবসায়ী।রাজিবের সাথে ফোনেও কথা হচ্ছে। কেমন যেন এক আকর্ষন। এভাবে রিতার মাস ছয় চলল। রাজিব কে রিতা ভালবেসে ফেলছে। রাজিবকে অনেক ছবিও দিয়েছে। কিন্তু রাজিব কখনও তার ছবি দেয় না। বলে আমি দেখতে ভাল না তোমার পছন্দ হবে না। অনেকবার দেখা করার কথাও রিতা বলেছে। কিন্তু দেখা করতেও চায় না। রিতা জোরাজুরিও বেশি করেনি। যদি রাজিবকে হারাতে হয়। এভাবে চলছিল।
হঠাৎ রাজীবের কোন খোঁজ নেই। রিতা ফোন দেয় ধরে না। ফেসবুকে মেসেস দেয়। উত্তর নেই। এভাবে ৪দিন কেটে গেল। রিতা অস্থির হয়ে গেল। হঠাৎ মনে পড়ল রাজিবের এক বন্ধুর কথা। রাজিবই তাকে এড করতে বলছিল। তাকে মেসস দিয়ে রাজিবের কথা জানতে চাইলো। সে জানাল ব্যবসায় বিরাট ক্ষতি হওয়ায় রাজিব টাকা যোগাড়ে ব্যস্ত আছে। আমি আপনার কথা বলবো তাকে। আমি কিছু টাকা দিয়ে হেলপ করছি। রিতার মন একটু ঠান্ডা হয়। পরদিন রিতা ফোন দিতেই রাজিব ধরে বলে আমি ভীষন ঝামেলায় আছি। ঝামেলা মিটলে কথা হবে। রিতা বলল কত টাকা তোমার দরকার। আজকের মধ্যে ২লাখ টাকা লাগবে। কোথাও পাচ্ছি না। রিতা বলে টাকাটা যদি আমি দেই।
তুমি কেন দিবে?
দিলে কি হবে? ব্যবসায় লাভ হলে আমার টাকা ফেরত দিয়ে দিবে। রাজিব চুপ থাকে। রিতা বলে তোমার ব্যাংক একাউন্ট দাও।এক্ষুনি পাঠিয়ে দিচ্ছি। রাজিব বলে ব্যাংকে পাঠাতে হবে না। আমি লোক পাঠাচ্ছি । রিতা রাজিবকে এতটাই ভালবেসে বিশ্বাস কয়েছিল যে টাকা দিয়ে দিল।
টাকা পাবার পর রাজিব জানিয়ে দেয় টাকা পেয়েছে। এর পর থেকে রাজিবের ফোন বন্ধ। ফেসবুক খুলে দেখে রাজিবের একাউন্টটাও নেই। রিতা পাগলের মতো হয়ে যায়। এ কি হলো? রাজিবের বন্ধুকেও আর খুঁজে পাওয়া যায় না।
তখন রিতা বুঝতে পারে সে প্রতারকের ফাঁদে পড়ছে।
রিতা তার এক বান্ধবীকে সব বলে। বান্ধবী তার আইডি দিয়ে রাজিবকে মেসেস পাঠায়। রাজিব তাতে উত্তর দেয় রিতা যেন এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি না করে। ওর ছবি আছে আমার কাছে। এডিট করে সব পাঠিয়ে দেব ওর স্বামীর কাছে। ইন্টারনেটেও ছেড়ে দিব।
রিতা এখন মানসিকভাবে ভীষণ অসুস্থ। বান্ধবীরা তাকে পুলিশের কাছে যেতে বলে। কিন্ত সে বলে তার টাকার কোন প্রয়োজন নেই। কষ্ট কেবল ভালবাসা তার সাথে প্রতারনা করলো সেটা কি সে ফিরে পাবে....
বন্ধুরা এটা একটা সত্য ঘটনা। এমন মেয়েরা যেমন প্রতারনা শিকার হচ্ছে তেমনি ছেলেরাও অনেক মেয়েদের দ্বারা হচ্ছেন। তাই সাবধান থাকবেন ।

আবার ফিরব আমি
- কৃষ্ণা দাস

আবার ফিরব আমি,
চেনা মাটি চেনা পথে
বারাণাবত ঘুরে,
বিষন্ন স্মৃতির আলস্য ঘুম
ভেঙ্গেচুরে,
তারা খসা শেষ রাতে
সুস্নিগ্ধ সলাজে,
ছেঁড়া ছেঁড়া সুখের
রঙিন কোলাজে,
দাঁড়াব আবার
ভাঙ্গা ভিটের স্তূপে,
শিউলি তলায়
অসমাপ্ত কবিতা রূপে ।
তখন প্রথম ভোর
বিদগ্ধ আত্মকথার
আলোক বর্তিকা ;
ভাললাগায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাবে
আমার পানকৌড়ি দেহের
অহমিকা।
ভেসে ওঠা নিপুণ তুলির টানে
কিছু তাজা খুশি,
কিছু বাসি মতান্তর ,
কিছু না বলা ভিজে অনুভূতি
জ্বরের ঘোরের মত
নড়াবে অধর।
তখন হেমন্তের শিশির ভেজা পথে
কেমনে পেয়ে সে ঘ্রাণ;
ঝড়ের গতিতে উদ্ভ্রান্ত আবহে
আমার ঘাটে তুমি
ভিড়াবে সাম্পান।
দক্ষিণায়নের পথে যেতে যেতে
পৃথিবী হটাৎ
অবাক অচঞ্চল,
ঘোর বিস্ময়ে
চলা ভুলে স্থির
কালের অতল স্রোতজল।
আর সুতীব্র অনুরাগে
তুমি বিশ্বাসে-
ওষ্ঠ পরে ওষ্ঠ
যুথবদ্ধ শ্বাসে -
আলোকিত পৃথিবীর
দেবে উপহার।
আবার নুতনদিনে
পুরাতন আমি
ফিরব আবার ।।

করবে ক্ষমা , প্রিয়তমা !
- জোহরা উম্মে হাসান

কোন ভুলের ক্ষমা আছে
কোন ভুলের জরিমানা
খোলাখুলি বললে তবু
প্রাণটা বাচেঁ নিরুপমা !
চোখ মেলে চাইলে দূরে
অন্য ছবি ভাসতে পারে
মন খুলে কইলে কথা
অন্য কেহ হাসতে পারে !
বাড়িয়ে দেয়া হাত দুখানি
অন্য কেউ ছুঁইয়ে দিয়ে
মিলিয়ে গিয়ে হঠাৎ কোরে
উদাস সুরে বাধঁতে পারে !
বুকের মাঝে জমা যত
নাম ঠিকানা- এ সব সব ধূয়ে মুছে
হাজির হলে তোমার কাছে
করবে ক্ষমা , প্রিয়তমা !

সম্পাদকীয়...


অগোছালো ছিন্ন - ভিন্ন পাতাছেঁড়া দিশাহীন - লক্ষহীন জীবনের অনেকগুলি গোঁৎ খাওয়া বছর কেটে গেল । কিন্তু কোন স্থায়ী জীবন বিন্যাসের চিহ্ন পর্যন্ত এখনোও পরিলক্ষিত হলো না । ছিন্ন - ভিন্ন, বেবাগী মনটার সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমি প্রায় পরিশ্রান্ত ও ক্লান্ত । সমুদ্রের জোয়ার ভাটার মতই কখনো চড়াই তো আবার কখনও উতরাই । জীবনে সুখের চেয়ে দুখের ভাগই বেশী তাই মনটাকে যেন আরো বেশী অস্থির করে তোলে । ঠিক কি করবো, কি দিয়ে শুরু করবো, বা কি ভাবে করবো তার সঠিক নিশান বা লক্ষন দেখতে পাচ্ছি না । সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কম্পিউটারের মনিটারের সামনে চোখ রেখে জীবনের কতগুলি বছর যে গেছে কেটে, তার পিছনের পাতা উল্টাতে গিয়ে নিজেই অবাক হয়ে পড়ি । কম্পিউটারের কাজ করতে করতে ইন্টারনেটের ওয়েবসাইটের পাতায় মুখ গুজে দিয়ে দেখি বেশ ভালই জীবনের বেলা গড়িয়েছে । ছেলেবেলা থেকেই লেখালিখির প্রতি একটা অজানা ঝোঁক আমার বরাবরই ছিল । বেশ কিছু লেখা দু-একটা গ্রামীন পত্রিকাতে প্রকাশিতও হয়েছিল । পরে শশব্যস্ত মুম্বাই মহানগরীতে এসে ঐ লেখালিখির ঝোঁকটা একেবারে প্রায় স্তিমিত হয়ে পড়ে । কিন্তু ওয়েব সাইটের পাতায় চোখ রাখতে রাখতে বিভিন্ন লেখক - লেখিকাদের কবিতা, গল্প, উপন্যাস পড়তে পড়তে সেই ছেলেবেলার সুপ্ত লেখক বাসনাটা কখন যে চেগে উঠেছিল তা আমি বলতে পারছি না । ওয়েব ব্লগার তৈরী করে কখন কবে থেকে যে লেখার পাতা তৈরী করে ফেলেছি তা বলতে পারবো না । একটু একটু করে পাতাগুলিকে নিজের হৃদয়ের রঙে রাঙিয়ে দিতে থাকি । তুলে ধরি আমার লেখক - লেখিকা বন্ধু - বান্ধবীদের সামনে । তাঁরা আমায় তাঁদের আন্তরিক উৎসাহ আর উদ্দীপনা যোগান দেন । তাঁদের উৎসাহ - উদ্দীপনায় আর নিজেকে গুটিয়ে না রেখে নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টা করি ওয়েব পেজগুলিতে । আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস আপনাদের কাছে সমাদৃত হলে তবেই আমার পরিশ্রম সার্থক বলে মনে করবো । লেখক - লেখিকা বন্ধু - বান্ধবীদের সংখ্যা খুবই দ্রুত হারে বাড়ছে । আমার ব্লগারে আপনাদের আন্তরিক আমন্ত্রন । আপনাদের সকলের উৎসাহ, উদ্দীপনা, সাহায্য ও সহযোগিতাই হোক আমার আগামী জীবনের চলার পথের পাথেয় ।


আপনাদের আরও একবার বলি নব দিবাকর পত্রিকাটি আমাদের একটি সাহিত্য চর্চার অনলাইন সামাজিক প্রচেষ্টা । নতুন লেখক, লেখিকাদের মধ্যে নতুন লেখনি উৎসাহের জোয়ার আনাই হল নব দিবাকরের কয়েকটি উদ্দেশ্যর মধ্যে একটি । অনলাইন সংস্করণে ছোট বড় সমস্ত লেখক, লেখিকাদের লেখাই প্রকাশিত করা হবে । কবিতা, ছোট গল্প, কিশোর সাহিত্য, নাটক, ফিচার, ধারাবাহিক গল্প-উপন্যাস, অনুগল্প, বিজ্ঞান ভিত্তিক প্রভৃতি আধুনিক লেখা আর অবশ্বই সমস্ত লেখক লেখিকাদের নিয়েই হবে আমাদের এগিয়ে চলার পথ ।


পত্রিকার সম্পর্কে আপনাদের যে কোন মতামত, প্রশ্ন-উত্তর, পরামর্শ, অভিযোগ বা যে কোন কিছু জানাতে হলে অবশ্যই আমাদের ইমেল আইডিতে ইমেল করতে পারেন । আপনাদের গুরুত্বপুর্ন পরামর্শই আমাদেরকে করবে আরো বেশি গতিশীল এবং সাফল্যমন্ডিত । আপনাদের মূল্যবান পরামর্শ আমরা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবো । তাই আমরা আছি আপনাদের সকল মতামতের অপেক্ষায় । নতুন বছরের প্রক্কালে সকলে ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন এই কামনা করে শেষ করলাম । সম্পাদক - মিন্টু উপাধ্যায় ।

স্বপ্নের জন্ম
- তুলিকা বন্দ্যোপাধ্যায়

আরও একবার জন্ম নেবো আমি
স্নিগ্ধ আলো আর নরম পাতার সতেজতা
থাকবে আমার সাথে,
কোনও ঘৃনা, লোভ, কলুষতা
স্পর্শ করবে না আমায়
সোনালী ধানের মতো উজ্জল হবে
আমার জীবন - আমার মনন
সমস্ত সুখ - দুঃখের সাথে
নিজের মতো করে বাঁচবো আমি,
আর - পৃথিবীর যত রং ভরে নেবো
আমার জঠরে
জন্ম দেবো শতশত স্বপ্নের...
শুধু রঙিন স্বপ্নের ।

কি পেলাম ভালোবেসে
- শিমুল শুভ্র

আমার মনের কোণে নতুন স্থানে
বাঁধলে তুমি ঘর,
অচল স্মৃতিদের ভুলিয়ে দিলাম
দারুণ সুখের স্তর।

তুমি গাইতে যখন সুরের টানে
মনে জাগে ঢেউ,
অনেক কষ্টে বুকে রেখেছি চাপা
জানলো নাতো কেউ।

তোমার দারুণ সুরে কবিতা লিখি
ছন্দে বাঁধি আশা,
সেই কবিতা তোমার কন্ঠে ভাসে
মধুর ভালোবাসা।

মনের অনুভবে গীতিকাব্য লিখি
তোমার সুরের টান,
মাধুরী মিশিয়ে তুমি গাইয়ে দিলে
আমার বুকের প্রাণ।

তোমার শ্রোতারা সুরের জাদুতে নাচে
যেথায় মনের কথন,
লিখে গেছি কত মনের কথা তোমাকে
আমার মনের মতন।

কোন এক গানে লিখে ছিলাম যতনে
চাই একরত্তি সুখ,
বুঝতে পেরেছ স্বরলিপির মধুর টানে
ঝাঁপিয়ে পড়লে বুক।

বিশ্ব যখন কাঁপছে তোমার গানের সুরে
সুখে ভাসা মন,
কে জানতো সেই সুখ কাঁদিয়ে যাবে
মনের রক্তক্ষরণ।

আমার গীতিকাব্যরা সাক্ষী রইলো যার
জন্ম তোমার গলে,
আমি জানি তারা তোমায় মনে করাবে
ছন্দ কথার তলে।

রচনাকাল
০৭।১০।২০১৪
ইউ এ ই

জীবনের রঙ
- অরুণোদয় কুণ্ডু

হোকনা অনেক স্টাইল, স্ট্যাটাস, অর্কিড আর ক্যাকটাসে,
ব্যালকনির ওই চিলতে মাটি, হিরের নোলক হোকগে খাটি,
জংলা গাছের আদিম নেশা ডাকছে "ওরে আয়" ।
সভ্যতার ওই দেয়াল তুলে মন কি বাঁধা যায় ?

জুতোর কালি, কম্পিউটার, কনফিগারে কচকচি,
ফোনটা আমার নতুন, তোর ওই চোখের মাটি প্যাচপ্যাচে,
মাল্টিপ্লেক্স অনেক হল, লুকিয়ে কোনে কাঁদি, হাঁচি,
কোমরটা আজ বারুক খানিক, আমার ভারি বয়ে গেছে ।
আচীন গুহার রহস্য আজ ডাকছে "ওরে আয়" ।
চার দেওয়াল আর ছাদ দিয়ে কি মনটা আঁটা যায় ?

তার চেয়ে চল ছুট্টে মাঠে, নরম ঘাসের গন্ধ,
রাত দুপুরে মরুর মাঝে না শোনা নীরবতা,
পাহাড়চুরায় শেষ বিকেলে সোনালি রোদের সাজ,
পরিযায়ী পাখির চোখের না বলা সেই কথা ।
সবাই এরা প্রানের মাঝে ডাকছে "ওরে আয়" ।
কাঁচ, কংক্রিট, ইট, পাথরে, সিলিকন চিপ জড়িয়ে ধরে,
সংখ্যা লেখা কাগজ খুঁজে, সমাজ, সঙ্ঘ, পলিটিক্স বুঝে,
রাত চাদরে আদিমতা নিয়ে কতদিন থাকা যায় ?

অনির্বাণ প্রেম
- শিমুল শুভ্র

আসিতেছে শীত গাহিবো গীত
খড়ের স্তুপে তোমারি আঁচল পাতিয়া,
মশালের আলোয় দেখিবো তোমায়
ঠকঠকে কাঁপুনি অধর ধরিয়া।

ধরিবো হাতখানি রূপে রুক্মিণী
এলোমেলো খোলা চুলে শুঁকিবো ঘ্রাণ,
হালকা বসনে কোমল শরীরের গড়নে
আমি খুঁজিয়া লইবো মন-প্রাণ।

প্রাণে অরুণ জাগে প্রেম পরাগে
শীতের কুয়াশায় ভেজা-ভেজা বসনে,
আমি চুষিবো জল,সোনার পায়ে মল
মনে ফোটাইব ফুল বক্ষ আসনে।

আসন পাতিবো তোমারি কোলে
মুখখানি ঢাকিবো তোমারি নাভি দ্বারে,
খুঁজিয়া লইবো কাঁটা গোলাপের সুবাস
দারুণ শীতেলা রাতে অভিসারে।

অভিসারে ঢেউ জানিবে না কেউ,
লক্ষ ঝিঝি পোকা উড়িয়া দিবে পাহারা,
হাসি উচ্ছ্বাসে কাটাইয়া দিব কুসুমকলি
রঙ্গে বিভল সঙ্গ সঙ্গিন সাহারা।

সাহারা দিবে তোমারি অম্বরখানি
হাসিয়া হাসিয়া লাল ঠোঁটের গাঢ় বাহারে,
শীতেলা অনলে দগ্ধ করিবো প্রেমানলে
আমারি বুকে গদগদ প্রেম তাহারে।

রচনাকাল
০৬।০৮।২০১৪
ইউ এ ই।

কাঁটা ও ফুল
- সঞ্জীব দে

যে ফুল ফোটালে তুমি
সে ফুলের কাঁটাতেই বিঁধল তোমার
হাত,
তারপর রক্তাক্ত যতিচিহ্ন
থেকে যাচ্ছে ঐ স্বপ্নের ঘর
সাজাতে ...।

আমি অতি সাধারণ মানুষ
- রীতা ঘোষ

আমি দুদিন খুব চোখের জল ফেলি
আতঙ্কবাদীদের অভিশাপ দিই
মৃত শিশুদের আত্মার শান্তি কামনা করি
আর অভিভাবকদের সান্ত্বনা দিই,
''যে আসে তাকে তো যেতেই হয়,
কেও আগে কেও বা পরে,
ওদের আয়ু এতোটাই বোধহয়''...
আসলে আমি সাধারণ মানুষ অতিশয় ।।

তারপর ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিই
বন্ধুরা নিজ নিজ মতামত জানায়
কেও গালি দেয় যাচ্ছেতাই,
রেগে নপুংশক অমানুষ কয় …
আমরা অনেকেই দেয়ালে মোমবাতি জ্বালায়
আমি শান্তিপ্রিয়, তাই নীরব প্রতিবাদ বোধহয়
আসলে আমি সাধারণ মানুষ অতিশয় ।।

মন ভারাক্রান্ত, তবু মস্তিষ্ক জাগ্রত রয়
কতো শত ভয়াবহ উৎসব রোজই তো হয়
খবরের কাগজে, নিউজ চ্যানেলে প্রতি ঘণ্টায় - চব্বিশ ঘণ্টায় ...
'' নির্মম পূজো পরিক্রমা, কন্যার বলিদান, আর্তের ভজন
নারীর ভোগ , হোমানলে মনুষ্য দহন ,
রক্তের হোলি খেলা ,চলে ধ্বংস লীলা, উৎসব নর সংহার ।''
আমি এসব দেখতে দেখতে অভ্যস্ত বোধহয়
আসলে আমি সাধারণ মানুষ অতিশয় ।।

এরপর আসে পূজো পার্বণ , শুভ বড়দিন
যে শিশুরা ধরাতে সবে চোখ খুলছে
হাঁটছে , ছুটছে , সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছে
এরাই তো আমাদের সুখস্বপ্ন ,সমাজের ভবিষ্যৎ
দেশের গৌরব , আগামীর সম্ভাবনা উজ্জ্বল ।
ওরা কি দেখবে না, জানবে না ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য !
উৎসব মানেই তো মিলন, ভালোবাসা ,
হাসি, খুশী আর পরস্পর কাছে আসা ,
এই উপহারটুকুও কি ওদের প্রাপ্য নয় !!
আসলে আমি সাধারণ মানুষ অতিশয় ।।

গরল পানে কেও নীলকণ্ঠ ,শরীরে জখম মেখে ক্রুশবিদ্ধ
অত্যাচারী অসুর দমনে মা, দুর্গতিনাশিনী, বিপদ তারিণী...
আগামীরা জানুক এঁদের গুণগান, মাহাত্ম্য কাহিনী ,
গীতা , কোরান , বাইবেলের পবিত্র বাণী ...
বন্ধ হোক প্রতারণা , ভণ্ডামি , হিংসা , হানাহানি , ধর্মের অপপ্রচার
জাগ্রত হোক বিবেক ,বুদ্ধি , মনুষ্যত্ব ... আসুক বিপ্লব !!!
বন্ধুত্ব , প্রেম , ক্ষমার মন্ত্রে , দীক্ষিত হই সবাই
তাই উৎসবের আয়োজন প্রয়োজন বোধহয় ,
আসলে আমি সাধারণ মানুষ অতিশয় ।।

একা আমি দুর্বল , পরিবর্তনে অক্ষম তাই
একে একে মিলে দুই -তিন -চার ... অনেক হই ।
সংসার হতে সমাজ , রাষ্ট্র , বিশ্বব্যাপী ছড়ায়…
ভালোবাসার রামধনু মাখা একমুঠো আশার আলো
আঁধার রাতের অবসানে , উদারতা ক্ষমার মন্ত্র উচ্চারণে
প্রতিশোধের ভয়ংকর স্বপ্ন শেষে , নতুন সূর্য উঠুক হেসে
সুন্দর ,মঙ্গলময়, নির্মল পৃথিবীতে, আগামীর প্রতীক্ষায় ...
আমি অতিশয় সাধারণ মানুষ তাই !!

থাকব প্রতিক্ষায়
- কৃষ্ণা দাস

আমার উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম
ছেয়ে আছো
তুমি,-
পায়ের নীচে পৃথিবী
আমাকে ধারণ করে আছে,
আর মাথার উপর নীল আকাশ প্রস্তুত
আমার মনের পাখনা মেলার জন্য ।
আমার দিগন্ত জুড়ে স্বপ্নরা ভিড় করে থাকে,
আর চার দিক থেকে জড়িয়ে আছো
তুমি,-
উষ্ণতায় আবেগে ।
আমার বর্ষা, শীত, শরৎ, হেমন্ত, বসন্ত জুড়ে
তুমি,-
গ্রীষ্ম শুধু আমার একার,
আমার নিরাবতার,
আমার দীর্ঘশ্বাসের ।
আমার ভোরের আলো,
সন্ধ্যার প্রদীপ, পূর্ণিমা
তুমি,-
শুধু ক্লান্ত দুপুর
আর অমাবস্যার অন্ধকার রাত
আমার একার,
আমার অসাফল্যের,
আমার পরাজয়ের।
আমার হাসি,আমার সুখ,
আমার শান্তি
তুমি,-
শুধু নিরব চেয়ে থাকা,
আর কান্নাগুলি আমার একার,
একান্ত নিজের।
আমি গ্রীষ্মের ক্লান্ত দুপুরে
অথবা অমাবস্যার গভীর অন্ধকারে
একাএকা পার হয়ে যাব
আমার অসাফল্য, পরাজয়
আর দীর্ঘশ্বাসকে সাথী করে।
তুমি এস ভোর হলে,
শরতের সুবাসে,
বসন্তের রঙিন সন্ধ্যায়,
বর্ষার মাদকতায় পূর্ণিমায় ।
আমি হাসি, সুখ আর শান্তি নিয়ে
থাকব দাঁড়িয়ে
তোমার প্রতিক্ষায়।।

মৃত সম্পর্ক
- রেবেকা রাহমান

মৃত সম্পর্কের গর্ভে খোয়া যাচ্ছিলো সময়
বার বার জড়িয়েছি এক প্রেমহীন শরীর
উত্তাপবিহীন দেহের কিছু ধুলো
মেখে মেখে নিঃশেষ হয়েছে প্রান...
স্বপ্নের চোখ শুধুই নর্দমার জঞ্জাল
কেউ বুঝেনি আমারও নিভৃতে আসে গ্রীষ্ম
কামনার আগুনে পুড়ে আমিও অংগার হই
আমারও চাই একটু বর্ষার জল...
মৃত সম্পর্ক এখন শুধুই শব ...।
বসন্তের শেষে ফিরছে বসন্ত আবার
চোখের কোল জুড়ে এক ফোঁটা শিশির ।

মুক
- সোনালী ব্যানার্জ্জী

অশান্ত সময়ের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে
টের পাই সময় থমকে গেছে কোথায় যেন ।
ঘড়ির কাঁটায় মরচে দিন-মাস-বছরের ,
তাই হিসাব মেলে না শত প্রচেষ্টাতেও ।
স্বপ্নে একটা মরা গাছ দেখি ধূ ধূ মাঠে
এক ভয়ঙ্কর সুন্দর ভাস্কর্যের প্রতীকের মতো ।
প্রতিবার ঘুম ভেঙে বোঝার চেষ্টা করি এ অতীত ,
বর্তমান না ভবিষ্যৎ ।
এরপর একসময় হঠাৎই নিজের মুখোমুখি হয়ে উপলব্ধি করি ,
বৃত্তের পরিধি পথে ঘুরেছি এতকাল ।
আমার সঙ্গে আমি আবার করে মিশে গিয়ে বলে যায় ,
সময়ের হৃৎস্পন্দন থামেনি কখনই।
আমি নিজেই থমকে থাকা সময়।

কাব্যমালা
- সঞ্জীব দে

আহত পাখির মতো জীবন আমার
স্রোতহীন মেরুপথ
উষ্ণ বাতাসের আলোড়নে ,
মাটির ঘরের মতোই এই ভাঙে এই গড়ে ।
তবু ভালোবাসি দিশারী চোখের
অশ্রুসজল রেখাটিকে ।

হেরে যাচ্ছি
তবুও তোমার চরণ ধুলায় লুটিয়ে
ধূপের ঘ্রাণ শুকছি ...

মরতে মরতে বেঁচে উঠি
তাই পুনর্জন্ম আঁকি ।

প্রতিরাত ঘুমের ঘোরে
স্বপ্নকে আঁকি ,
তারপর
রাত কেটে ভোর হলে
নিশিপাখিদের মতো স্বপ্নগুলো
দিনের আলোতে মিলায় ।

জলকে কোরো না ছল
ছলের আঁধারে কতোশত সভ্যসমাজ
নারীবাদী লিপ্সার জালে
নিজেকে বিলায় ।

কারবালা তোমার নাম
আর আমি শুধু
বিন্দু বিসর্গে থেকে গেলাম ।

রক্তকণিকা
- সঞ্জীব দে

আশাহীন মানুষের বেদনার গভীর
আর্তনাদ মৃতমানুষের
মতো বাতাসে মেশে কান্নার মাতম
হয়ে ...

শামুকখোল উড়ে যায় আকাশপথে
সেই জানে কোথায় তার শেষ ঠিকানা
থামবে জীবন কোন পথে !
আশ্চর্য অনাশ্চর্যের আভিজাত্যে
কতো পথ ভূলে
বেপথে ছুটে চলি আমরা
নিশি ভোর প্রাত্যে ...
তবুও আমরা আশাবাদী
লক্ষের খোঁজে ।

তোমার সমস্ত
গোপনীয়তা লুকানো আছে ব্ল্যাকবক্সে ,
খুঁজে নিতে পারো যদি কখন অনিত্য পুরুষ
ছেড়ে ফিরে যাও মনবিহারে ...

যৌবনে ভরসা পেলে
তুমি এসো...
একদিন ভালোবাসা হয়ে যাবে ,
তোমার
চারদিকে মৌমাছিগুলো উড়ে বেরাবে...

তারপর ,
সুযোগ পেলে একবার না হয় হাজারবার
মধুসুরা বিলাবে মধুকীটেদের দল ।

সম্পর্ক
- জোহরা উম্মে হাসান

আমাদের মধ্যে একটি সম্পর্ক আছে
সে সম্পর্কের কোন নাম নেই
ধাম নেই-নেই আবাস-বাড়ি
বিনিসুতোর মতো এমন কোন সুতো নেই
যা দিয়ে বেঁধে রাখা যায়
সম্পর্কবিহীন এ সম্পর্ককে । তবুও তো তা টিকে
আছে , হয়তো অনেকদিন -----।
সব সম্পর্কই রক্তের নয়
অথচ দেখ ; রক্ত কেমন এক মুগ্ধ কপটতায় বেঁধে রেখেছে সবাইকে মায়াজালে, অন্যায় -অপবাদে
তুচ্ছ-অবহেলায় ! সেরা সম্পর্কের তবকে
একচেটিয়া বাজারে অভিনব কায়দায়------।
আমাদের সম্পর্কের কোন নাম
নেই, হতে পারে এ কোন নিদারুন ছলনা
রাজা-রানি, সখা-সখী , প্রেমিক-প্রেমিকা
মা-বাবা, ভাই-বোন, কেউ নই কারো
তবুও টিকে আছে এ সম্পর্ক
ইচ্ছা-অনিচ্ছার দোলাচলে ।
নকল সিংহাসনে বসে জাহির করিনা
অসম্ভব ক্ষমতার কথা,বলিনা ব্যাকুল
আদ্র সুরে কোন ভালবাসার কথা ।
তবুও টিকে আছি দেখ কি অসম্ভব বিশ্বাসে
ও অবিশ্বাসে আমরা। যেমন করে টিকে আছে
আলোকলতার সারি সুউচ্চ গাছের মাথায়
পরস্পর পরস্পরকে আঁকড়ে ধরে ।

দশেরার চাঁদ
- কৃষ্ণা দাস

আর একটু অপেক্ষা চাই,-আর একটু তর
দশেরার চাঁদ ঐ;-এই এলো বলে,
এখনো আকাশের মুখভার মেঘ,
এখনো ফোটেনি সেঁজুতি অরণ্যের কোলে ।
গাছে গাছে নিমন্ত্রিত সুসজ্জিত পাতা
এখনো গায়নি কোরাস পাগল হয়ে ,
গোপন ইচ্ছারা চুপ, মাথাকুটে মরে
এখনো বৃষ্টি হয়ে পড়েনি ঝড়ে ।
নদীপথ জঙ্ঘায় আঁকেনিতো ছাপ
রক্তবিন্দু জ্বলে উঠে পোড়ায়নি পাপ ,
নাভিতলে কুয়াশায় সুরময় লেশ-
এখনো ছন্দে ছন্দে হয়নি ছয়লাপ ।
আর একটু অপেক্ষা চাই,-আর একটু তর
স্নায়ুর কোঠরে উঠুক তুফান দাদামা,
তাল বেতাল ঢেউরা ফুলে উঠে বুকে;
পুড়ে যাক বিদ্যুতে মন মনরমা ।
তার পর ভেসে ভেলা আষাঢ়ের বাণ;
দুহাতে ফুটিও গোলাপ পরম আবেশে ,
এক এক পাপড়ি তার সুগন্ধ সহাস-
কল-কল হাসিতে উঠুক হেসে ।
অনাবৃত গ্রীবাতে আগুন পরশ
পৃথিবীর মাটিতে তখন বিধ্বংসী ঝড়,
তছনছ লন্ডভন্ডে সে ঝড়ে পতন
দারুচিনি দ্বীপে বাঁধা সময়ের ঘর ।
বেঁচে থাকা উদযাপন বুঝি এভাবেই হয়
উদ্ভাসিত জীবন প্রদীপ জীবন জ্বেলে ।
আর একটু অপেক্ষা তাই, আরো একটু তর
দশেরার চাঁদ ঐ,-এই এলো বলে ।।

অভিশপ্ত বাড়ি
- রুনু সিদ্দিক


হঠাত ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। কত রাত হবে! কয়টা বাজে কে জানে! ঘড়ি দেখতে ইচ্ছা করছিল না। জায়গা বদল হলে যা হয়! ঘুম ভাল হয়না। আজ দু’দিন হল আমি এই বাড়িতে এসেছি।
বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। নিঝুম রাত। সুনসান নিরবতা। কোথাও কোনো প্রাণের সাড়া নেই। মেঘহীন কালচে নীল আকাশ। কিছু দূর দূর ঝলমল করছে দু-একটা তারা... হীরার দ্যুতির মত।
বিশাল আকাশটাকে আমার চোখে ছোট করে দিয়েছে বিরাট এক অট্টালিকা। অসংখ্য তাল, নারিকেল আর সুপারি গাছগুলো যেন এক পায়ে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে বিশাল ঐ বাড়িটাকে। অন্ধকার রাতে বাড়িটার দিকে তাকিয়ে কেমন যেন ভুতূড়ে মনে হল। এক দৃষ্টিতে চেয়েছিলাম বাড়িটার দিকে। ছাদের উপর কিছু একটার নড়াচড়া দেখতে পেলাম। পরক্ষণেই মনে হল হয়ত চোখের ভুল।
ধীরে ধীরে যেন আকাশটা আলোকিত হতে লাগলো। ব্যাপার কী! হঠাত করেই যেন বিশাল দালানের উপর দিয়ে উদয় হল পূর্ণিমার ক্ষয়ে যাওয়া আধখানি চাঁদ। তারই আলতে দেখতে পেলাম অদ্ভুত একটা কিছু!
প্রথমে মনে হল কোনো কিছুর ছায়া। দেখতে অনেকটা পাখির ছায়ার মত। পরক্ষণেই মনে হল বাদুর হবে হয়ত। কিন্তু এত বড় বাদুর হয়? হলেও ছাদের উপর বাদুর আসবে কোত্থেকে! বাদুর তো গাছে উলটো হয়ে ঝুলে থাকে। চাঁদ টা একটু উপরে উঠতেই অদ্ভুত ছায়াটা নড়েচড়ে উঠলো। আর তাতেই বোঝা গেল এটা বিশাল একটা বাজপাখি। কিন্তু বাজপাখি তো নিশাচর নয়! তাহলে?? রাতের বেলা ছাদে কেন!
আরে এ কী!!
এর মুখটা এমন কেন! অসম্ভব! একটা মেয়েলি মুখের আদলে মুখ। বাকিটা বিরাট এক বাজপাখির শরীর! আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম। হঠাত ডানা ঝাপ্টানোর শব্দে আমার সম্বিত ফিরে এলো। অদ্ভুত পাখিটা কয়েকবার ডানা ঝাপ্টে বিরাট পাখা দুটো মেলে দিয়ে উড়ে গেল চাঁদ কে পিছনে ফেলে।
পলকহীন চোখে চেয়েছিলাম যতক্ষণ দেখা গেল। আর ভাবছিলাম এটা কী ধরণের পাখি! কোত্থেকে এলো? আসলেই কি এরকম পাখি আছে? নাকি আমি ভুল দেখলাম! ভুল কেন হবে? ব্যাপারটা অশুভ লাগলো। বিষয়টা জানতে হবে। মনে কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
বাড়িতে খোজ নিয়ে জানতে পারলাম ঐ বাড়ির ছট ছেলের বউ এর প্রথম মেয়ে হয়েছিল। মেয়েটা গতকাল রাতে মারা গেছে। বয়স ছিল সাতদিন।
আরো জানলাম, অনেক আগে এই বাড়ির কোনো এক মেয়ের পেট থেকে জন্মেছিল একটা বাজপাখি। পাখিটাকে সাতদিনের মাথায় মেরে ফেলা হয়েছিল। সেই থেকে এই পরিবারে কোনো মেয়ে জন্মালে সাতদিনের মাথায় মারা যায়।
শুনেই আমার সারা শরীর শিউরে উঠলো। কাল রাতটা সত্যি অশুভ ছিল!!

আগুন চাই
- কৃষ্ণা দাস

“আগুন চাই, আগুন চাই” -বলে বুড়োটা অস্থির হয়ে চিৎকার করছে,
“কি বুড়ো আগুন চাও কেন” ?
“ঘরেতে অভাব, মেয়ে দুটো সমথ্থ,
বড় ছেলেটা চাকরীহীন ,কাঁধে ঝোলা নিয়ে দেশোদ্ধারে,
ছোটটা পড়া ছেড়ে আঁতেল ,
বুড়িটা রোগে ধুঁকছে,
সারটা সকাল জুড়ে হিজিবিজি চিন্তার জঞ্জাল,
চাই আগুন,
পুড়িয়ে দেব সব,
আমার আগুন চাই”।
“আগুন চাই,আগুন চাই”-বলে মেয়ে দুটোর আয়ত চোখ ছলছল ।
“কি গো মেয়েরা আগুন চাও কেন?”
জীবন লক্ষ্যহীন,
ডিগ্রীর কদর নেই,
কর্মের সংস্থান নেই,
ভালবাসায় বিশ্বাস নেই,
চেতনা শৈত্যপ্রবাহে ম্রিয়মান প্রাণহীন,
চাই আগুন ,
উজ্জিবিত হব,
আমাদের আগুন চাই” ।
“আগুন চাই ,আগুন চাই”-বলে ছেলেটা উৎত্তেজিত মুষ্টিবদ্ধ হাত আকাশে ছুড়েদিল ।
“কি ছেলে আগুন কি করবে”?
“দেশটা ঠক যোচ্চোরে ভরে গেল,
রাজনিতীর ঘৃণ্য খেলায় চারিদিকে আর্তনাদ,
বিশ্বাস হীনতায়, অত্যাচারে ,বিভৎসতায় ।
চাই আগুন,
প্রতিবাদে ফেটে পড়ব,
আমার আগুন চাই”।
“আগুন চাই, আগুন চাই”- বলে তরুণ ছেলেটা একমাথা চুল খামছে ধরেছে,
“কি কবি আগুন চাও কেন”?
“সকাল স্থবির, দুপুর অলস,
সন্ধ্যায় উড়ন্ত চিল জীবন
গানে কবিতায় উদ্বেল,
নিরাকার প্রেমে সার্থকতা চায়,
চাই আগুন,
ভাষায় মননে ,
আমার আগুন চাই,
তাপ আলোক চাই,
উদ্ভাসিত জীবন চাই,
আমার আগুন চাই”।।
“আগুন চাই, আগুন চাই,”-বলে বুড়িটা যন্ত্রণায় গোঁঙাচ্ছে,
“কি মা আগুন চাও কেন”?
“ফলাফল না ভেবে যা ছিল আদর্শ
তাতেই সারাটা জীবন করেছি উৎসর্গ,
মেলেনি হিসাব কখনো চাওয়া পাওয়া যত,
মৃত্যু সহযাত্রী আজ আমারই প্রতীক্ষায় রত,
চাই আগুন,
মায়ার শৃঙ্খল পুড়িয়ে সহযাত্রী হব,
আমার আগুন চাই,
আমার আগুন চাই” ।

মেয়েবেলার চুরি
- কৃষ্ণা দাস

বয়স সাত বুলবুলিটা
জানতনা সেই গুঢ় কথা,
হাসতো খেলতো প্রজাপতি
দঙ্গলেতে চড়ুইভাতি ।
ঠাম্মা দাদু কাকা জ্যাঠা,
তেঁতুল আচার মিষ্টি কথা ।
তারই মধ্যে যেত চুরি
শৈশব কাল ভুরি ভুরি ।
কথায় কথায় আদর সোহাগ
কাকার বড় নিয়ত খারাপ ।
লুকিয়ে বাঁচা এক বাড়িতে ।
যন্ত্রণা বিষ তল নাভিতে ।
ঠাম্মি শুনে ''চুপ চুপ
কেউ না জানে এইরূপ,
এমন কথায় পরিবার ভাঙ্গে,
যায়না যেন কারুর কানে'' ।
আকাশ কালো মেঘ নামে
মেয়ের জীবন কম দামে ।
মেয়ে ভাবে কেন এমন
যন্ত্রণা বিষ, কাঁদে মন ।
স্কুলের গাড়ি ভোঁ ভোঁ,
গাড়ির কাকুর পাগলামো,
কথায় কথায় জড়ায় ধুম,
সিক্ত লালায় গোঁফের চুম ।
পাড়ার পিসে গাল টিপে দেয়,
থাবড়া হাতে গা চটকায় ।
মা শুনে কয় ''হায় হায়
মেয়ে হওয়াই বড় দায়'' ।
সাত সতের নিষেধ জ্ঞান
মেয়ের মাথায় ঠুসে দেন ।
মেয়ে ভাবে কেন এমন
আমায় বকে আপন জন ।
মেঘ জমে যায় জীবনভোর,
আঁধার কালো মনের দোর ।
বাবার বুকের আহ্লাদি,
ফুঁপিয়ে কাঁদে প্রতিবাদী ।
খেলনা পুতুল আনন্দ, আর
চুরি যে যায় শৈশব তার ।

ভুলিয়ে দেয় কষ্ট
- দিঘী সেনগুপ্তা

অন্য আলো অন্য চোখে অন্য কষ্ট জীবন
কপালে ধুলো খড়কুটো গোঁজা ছোট কুঁড়ে
ঢেঊ ঢেউ নদী কাদামাটি পথে হেঁটে চলা
দুর্বল দেহ খোয়া খোয়া চোখে জীর্ণ স্বপ্ন।
হেঁশেল গোয়াল নিকানো উঠান কলতলা জল
ঘটভরা কাঁধে থমকে দাঁড়ানো বটের ছায়ায়
দিনের আলো গড়িয়ে গড়িয়ে রাত জমে যায়
হেয়ালি জীবন অন্য তিমিরে কেন যেতে চায়?
হাতছানি দেয় স্বপ্ন সুখের মিথ্যা আশা
মরীচিকা হয়ে আলোর পিছে মিছে ভালবাসা।
ভালোলাগা রোদ ভালোলাগা মেঘ ভালোলাগা পাখি
ভালোলাগা ঐ মাটির কুটিরে জ্বল জ্বল করা
ছোটো দুটি আখিঁ ।
মায়াময় দেহ তুলতুলে দুটো ছোটো ছোটো হাত
বুলিয়ে দু’গালে সব কষ্ট যেন দেয় ভুলিয়ে।

গদগদ প্রেম
- শিমুল শুভ্র

আড়াল থেকে দেখ'ছ কেন,লাজবাঁধা আঁখিদ্বয়,
মৃদু হাসি আমায় পাগল ক'রে,মনে গেঁথে রই।
চাউনি তোমার হরিণ স্বভাব, স্পর্শ করে মন,
মাঘের হিমের শীতলপরশ,অনুভবে সারাক্ষণ।

শ্রাবণ মেঘের বৃষ্টিধারা তোমার অধরের জল,
লাল টুকটকে ঠোঁটের রঙ্গে,মনে জাগে সচল।
রবি হাসে সুন্দর আলোর তরে এ বিশ্বচরাচরে,
তোমার হাসির রূপের ঝিলিক বক্ষভেদে ছিঁড়ে।

মণিহার খানি তোমার গলে,সদা চিকচিক ক'রে,
তোমার অঙ্গের রূপে মুক্তা যেন,খসে,খসেপড়ে।
মধুকর বুকের জমাট পাহাড় যেন রূপের খনি,
দোলা দিয়ে যায় মনের কোণে আমার চন্দ্রামনি।

দীর্ঘদিনের এই চুপি চুপি,মনে বেঁধে'ছ কেন জমাট,
যে প্রেমেতে তুমি ভাসছ,আমি ঐ প্রেমেতে তামাট।
এই নিবিড়মনে তোমার সনে,বলি লাজেবাঁধা কথা,
ক্লান্তহৃদয় শান্ত করো,দীপ্ত মনে প্রেমের সুখে গাঁথা।

রচনাকাল
০৩।০১।২০১৫
ইউ এ ই ।

পৌষ এলো রে পৌষ এল
- শিমুল শুভ্র

পৌষ এলো রে পৌষ এল
শীতের কাঁথা গায়ে মেলো
রসের হাঁড়ি,পায়েস মিঠাই
বাড়ি বাড়ি ধুম পড়লো।

শিশির জলে পায়ের মলে
খুকু নাচে তালে তালে
শীতের বাঁকল গায়ে দিয়ে
ছুটে চলে দলে দলে।

মিষ্টি ঐ অধর খানি
শীতে ফেটে টানাটানি,
শুকনো নিঃশ্বাস নাসারন্ধ্রে
হিমেল হাওয়ার কানাকানি।

বরফ জলে কুয়াশা তলে
ঊষায় রবির দীপ জ্বলে
প্রভাতের রোদ পোহানী
মধুর সুখে আয়েস তোলে।

পৌষ এলো রে পৌষ এল
কোমল ত্বকে শক খেলো
ছোট দিনের বড় রাতে
শীতকাহনে ঘুম বাড়ালো।

রচনাকাল
২৩।১২।২০১৪
ইউ এ ই ।

আজ তোমার জন্মদিন
- শিমুল শুভ্র

আজ তোমার জন্মদিন, হাসছে আকাশের চাঁদ,
এসে কেঁদেছ তুমি সবায় হেসেছে, আলোয় ভরা রাত।
ওগো মোর রূপময়ী রুম্পাললনা তোমার জামকালো চুল,
অঙ্গে অঙ্গে ঝড়ছে, অমৃতবৃষ্টি পরশ পাথরে ফুল।

আমি যেন খবর পেলাম,এলে আকাশবীণার সুরে,
অনেক খুঁজে পেয়েছি কিন্তু, তুমি কাছে থেকে ও দূরে।
আয়োজন করে বিধাতা পাঠিয়েছেন, শুধু আমার তরে,
তোমার আলোয় আলোকিত, বউ সেজে ঘরে।

হে অন্তর্যামী অন্তরমাঝে করে দিয়েছ তাঁকে স্থান,
সেই আনন্দে মাতি সারাবেলা ধরে কবিতাস্রোতের বান।
হৃদয় জুড়ে দিও শুধু হাসি-খুশি ভরা, সুস্থ সবল শিখর,
সকল সংকটছায়াশঙ্কিল দূর করো আরতি এ নখর।

আজ তোমার জন্মদিনে বলো কি দিবো উপহার,
অন্তরমাঝে আছো থাকবে চিরদিন,তুমি বন্ধু,সাথী আমার।
শিশিরে ভেজা গাঁদা ফুলের শুভেচ্ছা দিলাম,কবিতায় কেক
আজ তোমার জন্মদিনে বলছি,তুমিবিনে জীবন ব্রেইক।

রচনাকাল
০৫।০১।২০১৫
ইউ এ ই ।

ঝরাপাতা
- প্রদীপ ঘড়া

শুকনো কুঁড়ি
ঝরা পাতা
একই সাথে শোনায়
বিরহের ব্যথা
ঝরা পাতা
দিল মুছে
তার স্মৃতিকে
শুকনো কুঁড়ি
পেলোনা
ভ্রমরার সোহাগ তাতে
মনের অনেক গভীরে
অনেক আশাতে
দ্বীপ জালিয়ে ছিল
ওই ছোট বুকে
সেই এক আলোর রশ্মিতে
শুকিয়ে গেল
সোহাগের আগে
মন আর হৃদয়
ঝরা পাতা আর
শুকনো ফুল
ও তাদের মতো
কখনো মরুভূমি
কখনো বা
সাগর ভরা জমি
কখনও বা খরা চৈত্র
মন যে রইল না
আর মনে
সাড়া দিল
ওই মরুভূমির ডাকে ।

নো অ্যানসার
- জোহরা উম্মে হাসান


দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালের পদত্যাগের খবরটা বেশ মনে ধরেছে আমিন খান ব্যাপারির । সবাই তাঁকে বলে চলেছে , বিনা ভোটের মন্ত্রী । এসব কথা শুনে শুনে নাকি কান ঝালা পালা হয়ে গেছে তার । সকলকে কিছু একটা দেখিয়ে দেয়ার জন্য তিনি এক্ষণে একটা রেজিগনেশন লেটার হাতে নেতার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন !
নেতা তাঁকে যদিও খুব স্নেহ করেন , তবুও তাঁর এহেন হটকারিতায় বেশ ক্ষুব্ধ হলেন তিনি । জিজ্ঞাসু নয়নে বললেন , তোমার বউ জানে , তুমি যে ইস্তাফা দিতে এসেছো ?
আমিন ব্যাপারি নাক মুখ চুলকিয়ে মাথা নাড়িয়ে দশ বছরের অনুগত পোলার মত মিন মিন করে যা বল্লেন তাঁর অর্থ গিয়ে দাড়াল , না , কিছুই জানে না সে ।
তাহলে ? নেতা অবাক হয়ে আবারও তাকে প্রশ্ন করলেন ।
আমিন ব্যাপারি এবার একটু বেশ খোলা মেলা ভাবেই বললেন , স্যার আপনি তো জানেন সবই । ইদানীং শরীরও ভাল যাচ্ছে না । প্রেশার , ডায়াবেটিক !
তো এখন কি করবে ? তোমার বউয়ের সাথে মিলে মিশে গরু ছাগল এর ব্যবসা করবে ? নেতা একটু মশকরার সুরেই কইলেন ।
আমিন ব্যাপারি একটা ক্লিষ্ট হাসি টেনে বলল , জি স্যার , বউ ছেলে মেয়েদেরও তো কিছু পাওনা আছে ! তবে কার জন্যই বা কার ঠেকে থাকে ! আমাকে ছাড়াও যে তারা বেশ চলতে পারবে , জানি বটে ।
তা বটে । নেতা মহাবিজ্ঞের মত মাথা নাড়ালেন । আর মনে মনে বললেন , অসম্ভব । কারো জন্য নাকি কারো কিছু ঠেকে থাকে না । থাকে , থাকে ! ও ব্যাটা ব্যাপারি বুদ্ধু তার কি বোঝে ! তারপর আপন মনে একটা গভীর আত্নতীপ্তির ভাব নিয়ে বললেন , এই আমি গদিতে আসীন না থাকলে এই দেশটা কি আর আগের মত চলবে হে ?
নেতাকে তো শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবলে চলে না । অনেককে নিয়েই ভাবতে হয় । তিনি ব্যাপারির এই স্বেচ্ছায় সোনার গদি ছেঁড়ে ছুড়ে দিয়ে বনবাসি হওয়ার ব্যাপারটাকে অত সহজ চোখে দেখলেন না । বিষয়টা কি রকম ? ব্যাপারির কথায় আর কাজের মধ্যে মিল হচ্ছে আবার হচ্ছেও না ।
দীর্ঘক্ষণ বাদে আমিন ব্যাপারি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে উঠলেন, হুজুর , আমি কেজরিওয়ালের মতো হতে চাই । দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল । চলে গেলে তার মত তামাম জনগন আমার যেন জন্য হায় হায় করে ! আমার সেই খায়েস ! আর এখনি সেই সময় !
নেতা তৎক্ষণাৎ অতি রুষ্ট মুখে বললেন , কোথায় সে আর কোথায় তুমি ? তার হাজারো এজেন্ডা । আম জনতার খেদমত । আর তোমার কি ? তোমার তো কোন এজেন্ডা ফেজেন্ডা নাই হে । নিজের খেদমত ছাড়া ।
ব্যাপারি যদিও নেতার চেয়ে কম করে হলেও বছর পনেরোর বড় , তবুও নেতা তাকে তুমি করেই ডাকেন । তাতে এত দিন মনে কিছু নেন নি ব্যাপারি । নেতার তুই তোকারি মানে শীতের রাতে মুগ ডাল খিচুরি আর মুরগি ভুনী ! কিন্তু আজ মনে হচ্ছে , নেতা তাঁকে এমন তুই তোকারি না করলেও পারেন । মন্ত্রী করেছেন বলে কি তিনি তাঁর মাথাটা কিনে নিয়েছেন ! নিজের খেদমত ? কি এমন ধন সম্পদের মালিক হয়েছে সে ? অন্যদেরটা দেখলে-----।
তবে হাঁ , এ মুহূর্তে কেজরিওয়ালের সাথে সরাসরি নিজের তুলনা করাটা ঠিক হয় নাই তার । তুলনা যে করতেই হবে তার কি মানে আছে । তুলনা ছাড়া মানুষ বাঁচে না , নাকি ? নেতা বোধহয় বেশ একটু বেজারই হলেন । যাগগে যাক , সে নিজেই যখন নিজের ইচ্ছায় চলে যাচ্ছে , তখন কে কি ভাবল তা নিয়ে মাথা না খাটালেই চলবে ।
তাইতো , তার এজেন্ডা কি । ব্যাপারি মনে মনে ভাবতে লাগলেন । জীবনের প্রথমে খুলনা জেলার এক প্রত্যন্ত গায়ে চিংরি মাছের চাষ করতেন । প্রথমে নিজের হালের জমিতে । তারপর একটু একটু করে জমি লিজ নেয়া। এরপর নিজের নগদ টাকা দিয়ে জমির পর জমি কেনা ।
এই যে তিন তিন বার মন্ত্রী তিনি নিজের এলাকার , তারপরও স্থানীয় লোকজন তাঁকে ‘মাছুয়া’ বলেই ডাকে । এই সব মূর্খ , বেইমান লোকের উন্নতির জন্য আর কি নতুন পরিকল্পনা থাকবে তার মাথায় । সরকারি টাকায় রাস্তা , ঘাট, স্কুল , কলেজ ও তো কম হোল না তাঁর অঞ্চলে । তারপরও নাকি তারা খুশী না। চাই আরও চাই । ব্যাটারা বোঝেনা যে , নিজের ট্যাঁকের টাকা খরচ করে কোন নেতাই দেশের উপকার করে না । সরকারি টাকা না মিললে , সে কি গাছ থেকে বড়াই ফল পারার মতো ঝাঁকি মেরে উঠোনে রাশি রাশি টাকার ছয়লাব ঘটায় দেবে ?
যা হোক সেদিন নেতার কাছ থেকে এরকম রিক্ত হাতেই ফিরতে হোল আমিন ব্যাপারিকে । ইস্তাফা পত্রটা হাতেই ধরা । তবে নিজের আলিসান বাড়ীটার অন্দরমহলে ঢুকবার আগে কি মনে করে তিনি পত্রটা সযত্নে বুক পকেটে রেখে দিলেন ।
মন্ত্রী মহোদয়ের গাড়ির শব্দ পেয়ে বয় বেয়ারা দারোয়ান সব মোটামুটি সজাগ হোল । এখনো তো তাঁর হাতে অনেক ক্ষমতা । কানা ঘুষা শোনা যাচ্ছে বটে মন্ত্রিত্ব ইস্তাফা দিতে চলেছেন তিনি । কিন্তু এসব রাজনীতিবিদদের কথার কি সত্যতা আছে ? আজ এ কথা তো কাল সে কথা । সে যাই হক, ব্যাপারির আগমনে বিন্দু মাত্র সচেতন হোলনা তাঁর বউ মোসাম্মদ আলেয়া বেগম ওরফে মনি ।সে কি যেন একটা ছোটখাট ব্যাপার নিয়ে ব্যস্ত ছিল , স্বামীকে দেখে সে ব্যস্ততা আরও বেড়ে গেল ।
বউ এর দিকে একবার আড় চোখে চেয়ে ব্যাপারি বেড রুমের দিকে এগোলেন । রুমে গিয়ে আগে তিন মিনিট বিছানায় আধ শোয়া অবস্থায় বিশ্রাম নিলেন। মন্ত্রীর গাড়ী ! তবুও চলতি পথে ট্রাফিক জ্যামের হ্যাফা কম সামলাতে হয় না । আজও হোয়েছে তেমনি । যা হোক আর কদিন পর থেকে তো সাধারণ পাবলিক হয়ে যাবেন তিনি । আগে পিছে পুলিস গাড়ির বহর ভেপু বাজিয়ে গোল্লা ছুট খেলবে না । সব খেলাই শেষ । তাও ভাল । নাই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো । একটা নির্ভেজাল প্রেমময় জীবন তিনি উপভোগ করতে চান । জীবনের এই প্রায় শেষ সময়গুলোতে ।
বিশ্রাম নেয়া শেষ হলে ব্যাপারি তাঁর ধরা চূড়া ছাড়লেন । ডিসেম্বরের শেষ । জানুয়ারীর শুরু । শীতের তবুও যেন চিলতে গরজ নেই যাবার । বাতাস আটা গাড়ীতেও কেমন যেন শীত শীত লাগে । এটা নাকি বয়সের ব্যারাম।
তবে বয়স বাড়ার কথা মনে করলে মনের ভিতর থেকে কেমন যেন একটা তীব্র ব্যথার খোঁচা অনুভব করেন তিনি । বয়স যদি বেড়েই গেল , তবে সালমাকে আর নুতুন করে কি দেবেন তিনি । তাকে তো কিছু দিতেই হবে , নাকি সে খালি খালি হাতে ফিরে যাবে আগের মতোই ।
প্রায় পঁচিস বছর পরে দেখা পাওয়া ছেলেবেলার প্রেমিকাকে এবার কোনক্রমেই নিরাশ করতে চান না তিনি । এখন পর্যন্ত নতুন সম্পর্কটা কেবল ফোনে ফোনেই সীমাবদ্ধ রয়েছে বটে , কিন্তু তা জেঁকে বসার আর বোধ হয় বেশিদিন বাকি নেই ।
ফিরতি পথে অবশ্য ব্যাপারির তাঁর গার্ল ফ্রেন্ড সালমার সাথে বার তিনেক মোবাইল ফোনে কথা হয়েছে । কিন্তু তা অত্যন্ত চুপিসারে। গাড়ীর ড্রাইভার বা সামনের কর্তব্যরত পুলিস যেন মনে করে , স্যার ম্যাডামের সাথে আলাপ করেছেন।দু দূ বার তাঁকে সালমাই কল করেছিল । একবার তিনি নিজে। মন মানে না তাই !
কয়েক মাস আগে এভাবে অতি সঙ্গোপনে ফোনে ফোনে সালমার সাথে কথা কইতে গিয়েই স্ত্রী আলেয়া বেগমের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলেন তিনি । এরপর আর কি ? গেরস্তের সামনে চোর ধরা পড়লে সব চোরের যা হয় , তারও তাই হয়েছে । এখন আলেয়ার সাথে তার যেটুকু ভাব ভালবাসা আছে তার সবটাই লোক দেখানো । মেকী !
তবে ভাব ভালবাসা নেই বলে অবশ্য আলেয়া তাকে এখনও একেবারে নিঃস্বত্ব মুক্তি দেয় নাই । একটা রফা দফা চলছে । এবং তা অত্যন্ত সূক্ষ্মতার সাথে । এ সময়টা ব্যাপারির মনে হচ্ছে আলেয়া যেন আগের সেই গেয়ো মূর্খ মেয়ে মানুষটি নেই । তাঁর জীবনশক্তি আর মনোবলও বেড়েছে ঢের । বিপদকালে মানুষের যেভাবে বাড়ে , সেভাবেই কি ?
ব্যাপারি যদিও আলেয়াকে এখন তার পহেলা শত্রু মনে করছেন , তবুও তো এখনো সব শেষ হয়ে যায় নি । হারজিতের খেলা তো এখনো চলছেই । চলুক । দেখা যাক কে হারে , আর কে জেতে ।
এ বাড়ীর এখনকার পরিস্থিতি অন্য রকম । বাড়ীর ড্রাইভার থেকে শুরু করে দারোয়ান , মালি, গরু ছাগল হাস মুরগি দেখার তাগড়া জোয়ান লোকটা , কিচেনের বাবুর্চি , আয়া এরা এখন যেন সবাই বেগম সাহেবারই লোক। কিন্তু মাত্রর কদিন আগের অবস্থা ছিল ঠিক এর বিপরীত । বাড়ীর প্রত্যেকটা কিট পতঙ্গ থেকে শুরু করে প্রতিটা প্রানি ব্যাপারির ভয়ে থরথর করে কাঁপত । এমনকি আলেয়া বেগম ওরফে মনিও তাঁর সাথে হিসাব করেই কথা বলত ।
বউ এর এত জড়তা টরতা অবশ্য কোন দিনই ভাল লাগেনি ব্যাপারির । বিশেষত মন্ত্রী হবার পর থেকেই । আর তার সহকর্মীরা সবাই যখন ফিট ফাট বউ নিয়ে ঘুরতো , আর তখন ব্যাপারির বঊ কোন পাটি ফারটিতে তো যেতই না , আর গেলেও এমন করে নিকাব এর ফাঁসে নিজেকে জড়িয়ে রাখতো যে কারো পক্ষে তাঁর মুখের চিলতে আদল দেখারও জো ছিল না । দেখতে শুনতে এমনিতে আলেয়া মন্দ না । বাপ মার পছন্দ করা মেয়ে । প্রেমিকা সালমার ব্যাপারে তাঁর পরিবারের প্রথম থেকেই আপত্তি । বেশী সাজ গোঁজ করা মেয়েরা নাকি ভাল হয় না । সেকেলে সব দৃষ্টিভঙ্গি ! আর যত সব আজগুবি কথা ।
ব্যাপারির নিজেরও তো তিন তিনটে মেয়ে আছে । তাঁর মেয়েরা সব নাম করা কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে । সাজগোঁজও তো তারা ভালোই করে । তাদের সাজাগোঁজা নিয়ে আজ তো আর কারো আপত্তি নেই । কিন্তু তাদের সময়ে ? ওরে বাবা , যত দোষ যেন মেয়ে মানুষের !
যা হোক মেয়েদের পর , ব্যাপারির পর পর তিনটা ছেলে । ছেলেগুলো সবার ছোট । ওরা ছোট বলে আগে আক্ষেপ হত তার । এখন হয় না । হলে যে কি হতো । মনে মনে শিউড়ে ওঠে সে এক চোট । পেটাতো , মায়ের হয়ে নির্ঘাত মার দিত তারা তাকে । বাপের এই বুড়ো বয়সে ভীমরতি । মেয়েদের বোধ করি , এ পযন্ত তেমন কিছুই বলেনি তার মা । তারা তো আগের মতোই ঘুরছে, ফিরছে ।
সালমার ভালবাসায় যে এক্ষণে দিওয়ানা ব্যাপারি , তা কেবল আলেয়া জানে । আর সালমা তো জানেই । অনেক কথা হয় পুরান দিনের ভালবাসার বান্ধবীর সাথে । কথা যেন ফুরায় না দু জনের । সেই প্রেমের সময়কার কথা । ব্যাপারি টেনে টেনে পুরানো কথা তোলে । আর অন্য পাশ থেকে সালমা যখন তাকে অহ , নো ডারটি বয় বলে সম্বোধন করে , তখন তাঁর এ কথাগুলো যেন মুগ্ধ ভালবাসায় ব্যাপারির দম বন্ধ করে দেয় । মনে মনে ভাবে , আহা, কি করেই যে সালমা এত স্মার্ট হল , বলনে , চলনে । তাঁর যে বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই , তা তাঁকে দেখে কে বললে ? আর হিসাব নিকেশেও তো দারুন পোক্ত হয়ে উঠেছে সে । ব্যাপারির সব আয় ব্যয়ের কথা তার জানা। ব্যাপারি অবশ্য এতে কোন দোষ দেখে না । মেয়েরা জন্মেই একটু হিসেবী হয় । আর তাছাড়া প্রায় বছর পাঁচেক হয় , স্বামী হারিয়েছে বেচারী । সে একটু হিসেবি হবে না তো আর কে হবে ।
ব্যাপারি মনে মনে অবশ্য ভেবেই রেখেছেন , বিয়ের পরে তাঁর প্রোপার্টির একটা বড় অংশ তিনি সালমার নামে লিখে দেবে । যেমন , বনানীর সাড়ে তিন হাজার স্কয়ার ফিটের এপার্টমেন্টটা । তবে হ্যাফাও আছে । মেয়ে, কেবলই মেয়ে হওয়াতে আগের সব প্রোপার্টির সিংহ ভাগের মালিক এখন আলেয়া । সালমাকে এত কথা বলা হয় নি বটে । আর প্রেম মধুরতার ক্ষণে এসব হিসাব টিসাবের কথা এতো মানায়ও না ।
ব্যাপারি ভাবে , নেতাকে সাহস করে বললেই হতো তার মিশনের কথা ! তাঁর নিজের ব্যক্তিগত এজেন্ডার কথা । তাহলে তো অনেকটাই চুকেবুকে যেত । সে যে সপ্তম এডওয়ার্ডের মত রাজ সিংহহাসন ছেড়ে লেডী সিমসনকে নিয়ে উধাও হচ্ছে , তা নেতাকে বলা উচিত ছিল তার । তবে এই রাজপুত্রের গল্পটা তার অন্যের কাছ থেকে শোনা । আগে সেই রাজকুমারকে ভীষণ গদ্ভব মনে হতো তাঁর । এখন মনে হয় , আহা , এই না হলে প্রেম ! এ রকম নিখাদ প্রেম আছে বলেই তো পৃথিবীটা চলছে ।
অবশ্য এখন এ সংসারে প্রেম ট্রেম বলে কিছু নেই । নেই কারো ইচ্ছে অনিচ্ছের কোন মূল্য । আসল কথা হোল তার কথায় কিছুই চলছে না আর । সব কলকাঠি এখন আলেয়া বেগমের হাতে । কোথা থেকে সে যে পেয়ে গেল এমন অসুর শক্তি !
ব্যাপারি ঝিমুচ্ছিল আর ভাবছিল । এরপর কি হবে । ভাবনার বেশীর ভাগ অংশই সালমাকে ঘিরে । যা বলতেও লজ্জা লাগে আর ভাবতেও । তারপরও আহা কি মধুর মধুর সে ভাবনাগুলো !
আলেয়ার হিসাব গোনা । ব্যাপারিকে গো টো বলা সেই সব মধুর সম্ভাষণ , সে তো আজ পাচ ছ মাস আগে থেকেই ছেড়ে দিয়েছে । লোকজন যাতে না বোঝে , তাই তো এক ঘরে এক বিছানায় কাল কাটানো । এক্ষণে সব বাদ ছাদ দিয়ে আলেয়া তাঁর রেজিগনেশন লেটারের কথাটাই জিজ্ঞেস করলো । কি বললেন নেতা ঐ ব্যাপারে ?
ব্যাপারি ভাব করা হাসি মুখে ধরে বলল , হবে , আর একটু ভাববার সময় দিয়েছেন তিনি ।
আলেয়া বলল , জানোতো মন্ত্রিত্ব না ছাড়লে আমি কিন্তু কোন মতেই তোমাকে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি দেব না ।
এই দ্বিতীয় বিয়ের সাথে ইস্তাফা পত্রের কি সম্পর্ক তা আজতক ব্যাপারির বোধগম্য হোল না । কি লাভ এতে আলেয়ার । হয়তো মেয়েলি ঈর্ষা । আরেকজনকে মন্ত্রীর বউ হতে দেবে না সে , কেবল বউ হতে দেবে । তাতে আপত্তি নেই । আহা এতদিনের ভালবাসার কি নমুনা ! আসলে আলেয়া হয়তো তাঁকে কোনদিনই ভাল বাসেনি । কেবল স্ত্রীর দায়িত্বই পালন করেছে হিসাব নিকেশ করে । যাক , এখন এসব অতীত । সালমার ভালবাসার কাছে সব মিথ্যে , সব ঠুনকো ।
আশ্চর্য ! একটু পরে ব্যাপারির লাল ফোনটা বেজে উঠলো । নেতা তার ইস্তাফা পত্র নিজে চেয়ে পাঠিয়েছেন । শুনে সামান্যতর মন খারাপ হোল না তার । যাক যা গেছে তা যাক । এবার নতুন প্রেমময় জীবন ।
ব্যাপারি সাহেব পরম নিশ্চিতে ঘুমোচ্ছিলেন । পরম আদরের সে ঘুম । চরম ভালোলাগার । বিছানার একদিকে রাখা টিভির নবটা ঘুড়িয়ে ফিরিয়ে কে যেন অন করেই রেখেছিল আগে ভাগে !
এবারে একটা খবরে দারুন চমকিত আর আতংকিত হলেন তিনি । আর সে সাথে মহাঅবাকও হলেন , এমন অবাক তিনি জন্মেও হন নি ।
এই মাত্র আলেয়া বেগম ------ মন্ত্রিত্বের ভার গ্রহণ করলেন। উল্লেখ্য তাঁর স্বামী --- ব্যাপারী স্ব- ইচ্ছায় শারীরিক কারণে মন্ত্রির দায়িত্ব থেকে ইস্তাফা দিয়েছেন।
ব্যাপারি ঢূলু ঢূলু চোখে বার বার , অন্তত ২৫ বার তাঁর প্রেমিকা সালমার চেনা নাম্বারটার প্প্রানপণে টিপ দিলেন । ওপাশ থাকে কেবলই ভেসে এল নো অ্যানসার ।

পরকীয়া
- মশিয়ুর রাহমান খোকন


-হ্যালো,
-আসস্লামুয়ালাইকুম,
-অয়ালাইকুআসসালাম,
-আপনি কি যূথী বলছেন?
-জী, আপনি কে?
-আমি মিরা, আমি কি আপনার সাথে একটু কথা বলতে পারি?
-জী, বলেন।
-আমি মিরা। আমি মোহাম্মদপুরে থাকি। আপনার সাথে আমার একটু কথা আছে। যদি কিছু মনে না করেন, আপনি কি আমাকে কিছু সময় দিতে পারেন? আমি আপনার সাথে একটু দেখা করতে চাই।
-কেন বলুন তো?
-দেখুন যূথী, সব কথা তো আর ফোনে বলা যায় না। কিছু কথা থাকে, যা সামনা সামনি বসে বোলতে হয়। আমি আপনার কাছে মাত্র এক ঘণ্টা সময় চাইছি বোন। প্লিজ।
-কিন্তু, আমি তো আপনাকে চিনি না।
-জন্মের পর আতুর ঘরের শিশুও, তাঁর বাবা মাকে চিনে না। চিনা পরিচিতো হয় আস্থে আস্থে। আমরা হয়তো কেউ কাউকে চিনি না। কোনদিন হয়তো দেখিনি। কিন্তু চিনতে তো কোন দোষ নাই। আপনি যখন যেখানে বলবেন, আমি সেখানেই আসবো। প্লিজ বোন না করো না।
-তোমার কথা গুলি খুবই সুন্দর। আমিও তোমাকে তুমি করেই বললাম। কিছু মনে করো না।
-না না মনে করবো কেন? বোন তো বোনকে তুমি তুই করেই ডাকে। তোমার যা খুশী আমাকে ডাকতে পারো যূথী।
-টিক আছে মিরা। আজ বিকাল চারটায় ধানমণ্ডি পিজা হাটে আসো। আমি তোমার জন্য ওয়েট করবো।
-ঠিক আছে যূথী। আমি পিজা হাটে এসে তোমাকে ফোন দিবো। আমি সাদা জামা পড়ে থাকবো। সাদা শান্তির প্রতীক।
শান্তির খোঁজে মিরা যূথীর সাথে দেখা করে। ওরা পিজা হাটের কোনার টেবিলে মুখামুখি বসে। মিরা দুইটা পিজার অর্ডার দেয়। সাথে মিল্কসেখ।
-ক্যামন আছেন।
-আপনি না, তুমি।
-ওহ সরি, তুমি। তুমি ক্যামন আছো যূথী?
-জী ভালো।
-খুব অবাক হচ্ছ। তাই না?
-অবাক হওয়ারই কথা। তুমি খুবই সুন্দর দেখতে। অসাধারণ রকম সুন্দর। সাদা জামায় তোমাকে পরীর মতো লাগছে।
-থ্যাংকস। তুমিও খুব সুন্দর। খুব মিষ্টি হাঁসি তোমার। হাসলে তোমার গালে টোল পড়ে। তখন তোমাকে বারবিকিউ ডলের মতো সুন্দর লাগে। কি পরছো তুমি?
-আমি এমবিএ করছি।
-আচ্ছা যূথী, আমারা বরং আসল কথায় আসি। কেন তোমার সাথে আমি দেখা করতে চেয়েছি? আমি কথাটা কোথায় থেকে শুরু করবো বুঝতে পারছি না। তাঁর থেকে বরং আমি আমার মোবাইল দিয়ে, তোমার মোবাইলে একটা করে এস এম এস পাঠাবো। তুমি পড়বে। তাহলে আমাদের কথা বলতে সুবিধা হবে।
-কিন্তু মিরা। এমন কি কথা আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। মুখেই বলো এস এম এস লিখতে তো অনেক সময় লাগবে।
-এস এম এস আমার মোবাইলে লেখাই আছে। আমি অলরেডি একটা এস এম এস তোমার মোবাইলে সেন্ড করেছি। তুমি পরে দেখো।
''রক্তের মতো ভয়ংকর, ইতিহাসের মতো নির্মম, আর,
মৃত্যুর মতো ত্যাগ দিয়ে, মানুষকে ভালবাসতে হয়।
আমি তোমাকে সে রকমই ভালোবাসি জানু।''
-আশ্চর্য, এই এস এম এস আপনি কোথায় পেলেন? এটা তো আমার এস এম এস।
-প্লিজ যূথী, বসো। আপনি না বোন। তুমি করে বলো। এই রকম তোমার দুইশ বাইশ টা এস এম এস আমার মোবাইলে আছে।
-আশ্চর্য! প্লিজ মিরা, আমাকে সব কিছু খুলে বলো। তুমি আমার এই এস এম এস গুলি কোথায় পেলে? কি করে পেলে? কে তুমি?
-এত অস্থির হচ্ছ কেন যূথী? তুমি শান্ত হও। আমি সব কিছু বলতেই তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছি। এতে তোমারও উপকার হবে, আমারও।
-তুমি অনিককে খুব ভালোবাসো। তাই না? অনিককে পাঠানো তোমার সব এস এম এস পড়ে আমি তাই বুঝেছি।
-হ্যাঁ, আমি অনিক কে খুবই ভালোবাসি। অনিক ও আমাকে খুবই ভালোবাসে।
-তোমাদের সম্পর্ক প্রায় দুই বছর।
-হ্যাঁ, কিন্তু তুমি কেন আমাকে...?
-বলছি যূথী। আমরা কথা বলতে বসেছি। তুমি আমাকে বোনের মতো করে মন খুলে সব কথা বলবা, আমিও তাই। এতে তোমারও ভালো হবে আমারও। অনিকে কে তুমি কতো টুকু জানো?
-ও খুবই ভালো একটা ছেলে। স্মার্ট, শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র, তাঁর একটা বিজনেস ফার্ম আছে।
-তোমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছো তাই না? আমি তোমার এস এম এস থেকে জেনেছি।
-তুমি তো দেখি আমাদের সব কিছুই জানো। হ্যাঁ, বিয়ের কথা তো, গত ছয় মাস ধরেই হচ্ছে। অনিকই সময় নিচ্ছে। ওর একটা কি বলে সমস্যা আছে। সমাধান হলেই আমরা বিয়ে করবো।
-তোমারা প্রায়ই দুইজনে মিলে দেশের বাইরে, ঢাকার বাইরে ঘুরতে যাও, তাই না? থাইল্যান্ডে গেছো দুইবার। ভুটান গেছো একবার। কক্সবাজার গেছো তিন বার।
-মিরা তুমি তো দেখি সব কিছুই জানো। কিন্তু তুমি কে? আমাদের গোপন বিষয় নিয়ে তুমি কেন আমাকে এতো প্রশ্ন করছো?
-সরি যূথী, আমি তোমাকে বোন ডেকেছি। বোনের কোন ক্ষতি হোক তা আমি চাইনা। আমি যা প্রশ্ন করছি, তুমি আমাকে ঠিক ঠিক উত্তর দাও। আমি আমার কথাও তোমাকে বলছি।
-তুমি যে মোবাইল টা ব্যাবহার করছো সেটা খুব দামি তাই না? অ্যাই ফোন ফাইব এস। তিন মাস আগে এটা অনিক তোমাকে গিফট করেছে। মোবাইলটার দাম আঠাত্তর হাজার টাকা, তাই না?
-হ্যাঁ,
-তুমি যে জামাটা পড়ে আছো, সেটার দাম আঠারো হাজার টাকা, তোমার হাতের আঙ্গুলে যে আংঠি পড়ে আছো, তোমার গত জন্মদিনে অনিক তোমাকে গিফট করে। আংঠির দাম একুশ হাজার ছয়শো টাকা। তাই না?
-হ্যাঁ,
-তোমাকে একটা ছবি দেখাই আমার মোবাইলে আছে। এই যে, দেখতো ছবিটা ক্যামন?
-ওয়াও, দারুন কিউট বেবি। লাইক এ ডল। এটা কি তোমার বাচ্চা?
-হ্যাঁ, এটা আমার একমাত্র মেয়ে নূপুর। ওর বয়স এখন তিন বছর। তুমি যাকে প্রচণ্ড ভালোবাসো এটা তাঁরই মেয়ে। আর আমি তাঁর স্ত্রী।
-হোয়াট?
-হ্যাঁ, অনিক আমার হ্যজবেণ্ট। নূপুরের বাবা। তুমি চাইলে, আমি নূপুর কে মেরে ফেলে, নিজে ফ্যানের সাথে ঝুলে থাকবো। তোমাকে বলার আমার আর কিছুই নাই যূথী।
মিরার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়ে।
যূথী মিরার দিকে তাকিয়ে থাকে।

রাই-কৃশানু - দুটি মন একটি হৃদয়
- মশিয়ুর রাহমান খোকন


আকাশ ছোঁয়া অনেক উঁচু একটি পাহাড়। মেঘের সাথে মিশে গেছে। চারিদিক দিয়ে মেঘ ভেসে যায়। পাহাড়ের উপর সবুজ ঘাস। মাঝখানে একটা দেবদারু গাছ।
দেবদারু গাছের নিচে সবুজ ঘাসের উপর শুয়ে আছে পৃথা চক্রবর্তী। পৃথার পেটের উপর মাথা রেখে আড়াআড়ি শুয়ে কথা বলে শান্তনু দত্ত।
ওরা দুজন দুইজনকে ভালোবাসে পাগল পারার মতো।
রাধা কৃষ্ণের নামের সাথে মিলিয়ে ওরা দুজন দুজনের নাম রাখে ''রাই'' আর ''কৃশানু''।
ওদের ভালোবাসার সম্পর্ক প্রায় তিন বছর হতে চললো। এই সম্পর্কের কথা সবাই জানে। দুই পরিবারে ওদের বিয়ে নিয়ে কথা চলছে।
রাই মনে করে, কৃশানু তাকে যত টুকু ভালোবাসে, সে কৃশানু থেকেও এক হাজার গুণ বেশী তাকে ভালোবাসে।
আবার কৃশানু মনে করে, রাই তাকে যতটুকু ভালোবাসে তার থেকেও লাখো গুণ বেশী সে রাইকে ভালোবাসে।
প্রায়ই দু'জন দু'জনের ভালোবাসা নিয়ে খুনসুটি প্রতিযোগিতা চলে। ভালোবাসার প্রতিযোগিতা থেকে কেউ কাউকে ছাড় দিতে রাজী না।
-কৃশানু
-হুম
-তুমি কি বিয়ের পরও আমাকে এমন করে ভালবাসবে?
-এটা তুমি কি বললে রাই? আমি যতদিন পৃথিবীতে বেঁচে থাকবো শুধু তোমার জন্য। শুধু মাত্র তোমাকে ভালোবাসার জন্যই আমি বেঁচে আছি রাই।
-আমিও কৃশানু। আই লাভ ইউ।
-লাভ ইউ টু রাই। ...রাই,
-হুম
-এই পাহাড়টা তোমার কাছে ক্যামন লাগছে।
-অসাধারণ কৃশানু, অপূর্ব, গায়ের সাথে মেঘ ভেসে যায়, কোলাহল অনেক দূরে। এমন একটা জায়গায় নিয়ে আসার জন্য তোমাকে উউম্মাআহহ,
-বলতো রাই, এই পাহাড়ের নাম কি?
-তা তো জানি না কৃশানু।
-এই পাহাড়ের নাম ''কালা পাহাড়''।
-কাল পাহাড়। দারুণ নাম তো।
-এই পাহাড়টা মাটি থেকে দুই হাজার নয়শো ফুট উঁচু। আর সমুদ্র থেকে তিন হাজার দুশো ফুট উঁচু। এশিয়ার মধ্যে এটাই একমাত্র উঁচু পাহাড়। এই পাহাড়ের কিন্তু একটা ইতিহাস আছে, জানো রাই?
-কি ইতিহাস কৃশানু?
-শুনবে রাই?
-বলনা কৃশানু, আমি শুনতে চাই।
-অনেক অনেক বছর আগে। বলতে পারো প্রায় সাতশো বছর আগের কথা। এই এলাকায় একটা ছেলে ছিলো। ছেলেটার নাম ছিলো কালান্তর। কালান্তর ছিল গরিব ঘরের চাষীর ছেলে।
সে একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসতো। মেয়েটার নাম ছিল পরী। যেমন নাম তেমন দেখতে ছিল। দশ গ্রামে পরীর মতো সুন্দর মেয়ে আর ছিল না।
পরী ছিল জমিদারের মেয়ে। জমিদার লোকটা ছিল খুব খারাপ।
তাদের ভালোবাসার কথা যখন জানাজানি হয়ে যায়। তখন কেউ তাদের সম্পর্কটা মেনে নেয় না। তাদের আরও একটা সমস্যা ছিল রাই।
-কি সমস্যা কৃশানু?
-কালান্তর ছিল সনাতন ধর্মের, হিন্দু ছেলে। আর পরী ছিল মসুলমান ধর্মের জমিদারের মেয়ে।
-তাদের সম্পর্ক যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন পরীর বাবা পরীকে ভুলে যাওয়ার জন্য পরীর সামনে, লাঠিয়ালদের দিয়ে কালান্তরকে দেবদারু গাছের সাথে হাত পা বেঁধে সারা গ্রামবাসীর সামনে অনেক মারে।
-কালান্তর থেকে থেকে অজ্ঞান হয়ে যায়। যখনি জ্ঞান ফিরে আসে, তখনি সে বলে উঠে, আমি মরে যাবো তাও পরীকে ভুলতে পারবো না।
-পরীর জমিদার বাবা, আরেক জমিদার বংশের ছেলের সাথে পরীর বিয়ে ঠিক করে।
-কালান্তরের সাথে পরী, বা পরীর সাথে কালান্তর আর কোন ভাবেই যোগাযোগ করতে পারে না।
-থামলে কেন কৃশানু? তারপর কি হল?
-পরীদের জমিদার বাড়ীর সামনে ছিল একটা বড় দেবদারু গাছ। যে গাছের সাথে বেঁধে কালন্তরকে মারা হয়।
বিয়ের ঠিক পাঁচ দিন আগে, পরী তার জমিদার বাবার কাছে একটা চিঠি লিখে, সেই দেবদারু গাছে ঝুলে থাকে।
-বোলো কি কৃশানু? আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছে। তারপর? তারপর কি হল? কি লেখা ছিল সেই চিঠিতে?
-পরীর সেই চিঠিতে লেখা ছিল,
-বাবা,
আমার মৃত্যুর এক মাত্র কারণ, আমার ভালোবাসা, আমার প্রেম। যাকে না পেলে এই পৃথিবী আমার কাছে মূল্যহীন।
আমি জানি আমার কালান্তর যদি আমার মৃত্যুর সংবাদ পায়। সেও সাথে সাথেই আমার সাথে স্বর্গে মিলিত হবে।
তোমাদেরকে আরেকটা কথা বলা হয়নি। আমার কালান্তর শুধু আমার জন্য তার ধর্ম ত্যাগ করে মসুলমান হয়েছে।
মৃত্যুর পর তোমরা আমার কালান্তরকে আমার থেকে আলাদা করে দিয়ো না বাবা।
-পরদিন এই কথা যখন কালান্তরের কানে গেলো। সাথে সাথে কালান্তর গভীর জংগল পেড়িয়ে এই পাহাড়ে উঠে নিচে ঝাঁপ দেয়।
তাদের দুজনকে মুসলিম ধর্মের রীতি হিসাবে এই পাহাড়ের উপরেই কবর দেয়া হয়। তাদের কবরের মাথার কাছে একটা দেবদারু গাছের চারা লাগিয়ে দেয়া হয়। আমারা এখন তাদের কবরের উপরই শুয়ে আছি রাই।
-বোলো কি কৃশানু? কি বলছো তুমি?
রাই সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। সে কবরের জায়গাটা আর দেবদারু গাছের দিকে তাকিয়ে থাকে।
-তাদেরকে এখানে কবর দেয়ার চল্লিশ দিনের মাথায় এই পাহাড়ে উঠার একমাত্র রাস্তার মাটি সম্পূর্ণ ধসে যায়।
-এরপর থেকে আজ পর্যন্ত এই পাহাড়ের উপর কোন মানুষের পা পরেনি। আজ এতো বছর পর আমারাই প্রথম কোন মানুষ, যারা কালন্তর আর পরীর কবরের কাছে দাঁড়িয়ে আছি রাই।
-ঐ সময় এই পাহাড়ের নাম ছিল, ''কালাপরী পাহাড়''। আস্তে আস্তে পরী নামটা মুছে এখন কালা পাহাড় নামে পরিচিতি পায়।
-তখন এই পাহাড়ে সহজে কেউ আসতে পারতো না। চারিদিকে ছিল ঘন বন আর গভীর জংগল। বাঘ সিংহের মতো ভয়ংকর জন্তু জানোয়ার থাকতো সেই জংগলে।
-এই ঘটনার কয়েক বছর পর থেকে আজ পর্যন্ত, এই পাহাড়ের গোঁড়ায় প্রেমিক প্রেমিকারা এসে মনের মানুষের জন্য মানত করে সুতা বেঁধে দিয়ে যায়। এখনে মানত করে সুতা বেঁধে দিলে নাকি সম্পর্ক কখনো ভেঙ্গে যায় না।
-আশ্চর্য তো!
-হুম, এবার বুঝেছো রাই? আমি যে তোমাকে তোমার থেকেও বেশী ভালোবাসি। আমি তোমাকে কালান্তরের মতোই ভালোবাসি। এই জন্যই তো তোমাকে কালা পাহাড়ে নিয়ে আনলাম।
-হুম, আর আমি তোমাকে পরীর মতো ভালোবাসি।
-কালান্তর কিন্তু পরীকে ভালোবেসে এই পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলো। আমিও তোমাকে ভালোবেসে এই পাহাড় থেকে ঝাঁপ দিতে পারবো। দেখবে রাই? তবে দেখো।
-না না কৃশানু. পাগলামো করো না.. না...কৃশানু...
কৃশানু রাইয়ের কপালে চুমু দিয়েই সাথে সাথে কালা পাহাড় থেকে নিচে ঝাঁপ দেয়। রাই বাধা দেয়ার আগেই চোখের পলকে কৃশানু নিচে হারিয়ে যায়।
রাই চিৎকার করে উঠে।
-কৃ.....শা......নু...
মাথার উপর সিলিং ফ্যান ঘুরছে। বাথরুমের কলে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার শব্দ। সেই শব্দের সাথে তাল মিলায় দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির কাঁটা টা।
খোলা জানালা দিয়ে পূর্ণিমা রাতের চাঁদের আলোয় সারা বিছান ভরে গেছে। পৃথা চক্রবর্তীর সারা শরীর ঘামতে থাকে।
পৃথা এখনো বুঝে উঠতে পারছে না, সে এতক্ষণ কোথায় ছিলো?
বালিশের নিচে থেকে মোবাইলটা টেনে হাতে নেয়। ঘড়ির কাঁটায় রাত তিনটা।
পৃথা শান্তনু দত্তকে একটা ফোন দেয়। রিং হয় শান্তনু ফোন ধরে না। আবার দেয়... আবার... আবার...
পৃথা বারান্দায় এসে চেয়ারে বসে। শান্তনুর পাঠানো রাইয়ের মোবাইলের সব এস এম এস গুলি একটা একটা করে পড়ে।
শেষ রাতের সচ্ছ বাতাস পৃথাকে শীতল করে দেয়। আস্তে আস্তে আকাশ ফর্সা হয়ে উঠে। পৃথা বারান্দায় বসেই থাকে। হটাৎ ফোনটা বেজে উঠে...
-রাই, তুমি ফোন দিয়েছিলে। আমি টের পাইনি। ঘুমাচ্ছিলাম।
-তুমি ঠিক আছো কৃশানু? এখন কি করছ তুমি?
-রাই, কি হয়েছে তোমার? তুমি এমন করে কথা বলছ কেন? কাঁদছো কেন রাই? আমাকে বলো রাই, কি হয়েছে?
রাই কোন কথা বলে না। শুধু কাঁদতেই থাকে।
-জানো রাই, আমি আজ একটা দারুণ স্বপ্ন দেখেছি। কালা পাহাড়ের স্বপ্ন। দেখা হলে তোমাকে সব বলবো। তোমার মন ভালো হয়ে যাবে।
-রাই চমকে উঠে। সে কিছুই বলে না। শুধু বলে উঠে,
-আই লাভ ইউ কৃশানু। আমি তোমাকে পরীর মতোই ভালোবাসি...।

তোর ভালোবাসাই আমার মরণ রে...
- মশিয়ুর রাহমান খোকন
-একটা পুরুষ মানুষ কখন ঘরের বাইরে যায় তুমি বোঝো? এমনি এমনি একজন স্বামী কখনো বাইরে যায় না। তোমরা ভালো স্ত্রী হতে পারো, কিন্তু ভালো বন্ধু হতে পারো না।
-একজন বান্ধবি একটা পুরুষকে যা দিতে পারে, একজন স্ত্রী তা দিতে পারে না। আবার একজন স্ত্রী যা দিতে পারে, একজন বান্ধুবি তা দিতে পারে না। কেন তোমারা তা পারো না, আমি তা জানি না।
-তোমরা শুধু একটা বিষয় খুবই ভালো পারো, সেটা হলো, শুধু শুধু স্বামীকে সন্ধেহের চোখে দেখা, আর খোঁচা মেরে কথা বলা। আরেকটা জিনিষও তোমরা খুব ভালো পারো। বেগুন ভাজির মতো কারনে অকারনে স্বামীদের সাথে উঠতে বসতে ক্যাটক্যাট করা।
-একটা বিষয় তোমরা কখনও বুঝো না যে, একজন পুরুষ মানুষ সারাদিন ঘরের বাইরে থেকে কাজ কর্ম করে। কত রকম চিন্তা ভাবনার মধ্যে সে থাকে সারাটা দিন। বাবা মা ভাই বোন আত্মীয় স্বজন ছাড়াও নিজের সংসার নিয়ে, আয় ইনকাম নিয়ে, বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে, কত রকম চিন্তা করতে হয়।
-আমাদের পুরুষদের এক মাত্র বিনোদন নারী। মানে স্ত্রী। আর স্ত্রী কাছে যখন একজন পুরুষ বেগুন ভাজির আচরন পায়, তখন সে একটু বিনোদনের জন্য বাইরে দৌড়াবেই। এর জন্য দায়ী তোমারা মেয়েরাই। কারন তোমারা জানো না কি করে স্বামীদের ধরে রাখতে হয়।
-কথা গুলি বার বার করে লতার কানে বাজে। তার এখন কিছুই ভালো লাগে না। মাঝে মাঝে মনে হয় ভুলটা সে নিজেই করেছে। আবার মনে হয়, না ঠিকই আছে। আবীরের কাছে কেন এতো মেয়েদের ফোন আসবে?
আবীর লতার দাম্পত্য সম্পর্ক আজ প্রায় চার বছর হল। অনেক আগে থেকে লতা আবীরের জানা শোনা আছে। আবীর তার খুব ভালো বন্ধু ছিলো। বন্ধু থেকে ভালোবাসা। তারপর বিয়ে। সংসার চার বছরের। দুই বছরের তাদের একটা মেয়ে আছে। মেয়ে নাম মাইশা।
লতা আবীরের সাথে এই সব নিয়ে প্রায় ঝগড়া লেগেই থাকে। ঝগড়ার ফলাফল লতা মাইশাকে নিয়ে বাপের বাড়ী চলে আসে।
বাবার বাড়ী এসেও তার কিছুই ভালো লাগে না। আজ এতো দিন হয়ে গেলো, আবীর কোন যোগাযোগ করে না। বাবার বাড়ীর সবাই কেমন জানি করে।
কেমন যেন পর পর মনে হয় সব কিছু। এমন কিছু বিষয় থাকে যা বলাও যায় না, আবার সয়াও যায় না। তখন নিজেকে খুবই অসহায় মনে হয়।
লতার এখন নিজেকে খুবই অসহায় মনে হচ্ছে। মাঝে মাঝে লতা ভাবে, আবীর অন্য মেয়ে বন্ধুদের নিয়ে খুবই ভালো আছে।
-আচ্ছা,ও একবারও ফোন করে না কেন? কেন একটি বারের জন্য আসে না? ওর কি আমাকে দেখতে একটুও ইচ্ছা করে না? আমি না হয় বাদ ই দিলাম। মেয়েটার জন্য হলেও তো একবার যোগাযোগ করতে পারে। পুরুষ মানুষ সবই পারে।
-আমি কি আসলেই ওকে খুব বেশী সন্ধেহ করি? তাহলে ওর মোবাইলে মেয়েদের এতো ফোন আসে কেন?
লতার এখন কিছুই ভালো লাগে না। সে নিজের ভুল গুলি খোঁজার চেষ্টা করে। কোথায় যে তার ভুল, সে সেটা খুঁজে পায় না। কেন স্বামীরা বুঝে না যে, একটা মেয়ে মানুষ সব সম্পর্ক ত্যাগ করে স্বামীর ঘরে যায়।
মাথার উপর ছাদ আর পায়ের তলায় মাটি বলতে তারাই। তারপরও কেন সে অন্য মেয়ে মানুষের পিছনে ঘুরবে?
আজ এতদিন হোল আমি এখানে পড়ে আছি, একটা ফোন পর্যন্ত করে না। করবে কি করে? তার তো ফোন করার মানুষের অভাব নাই।
-আপু তুমি ছাদে বসে আছো? মা তোমাকে ডাকছে
-কেন রে?
-জানি না, তুমি গিয়ে দেখো
-মা, আমাকে ডাকছো?
-হ্যাঁ মা, এখনে বোস।
-বলো কি বলবে?
-আবীর কি তোকে ফোন করেছিলো?
-না মা, ও আর ফোন টোন করেনি, আমিও করিনি।
-তোদের যে কি হল? আমি কিছু বুঝি না। তবে আমার কাছে ছেলেটাকে খুবই ভালো মনে হয়।
-উপর দিয়ে সব ছেলেকেই তো তোমার ভালো মনে হয়। তোমার পা ছুঁয়ে যে ছেলে সালাম করবে, সেই তোমার কাছে খুব ভালো।
-এমন করে কথা বলছিস কেন? আমার মনে হয় তুই শুধু শুধু ওকে ভুল বুঝছিস,
-মা, ছাড়ো তো ও সব কথা। আমি আর ওর সাথে সংসার করবো না।
-ওসব কথা এক কালে তোর বাপকে আমিও অনেক বলতাম। শোন
-বলো কি বলবে?
-মেয়েদের এতো রাগ ভালো না। তুই আবীরকে একটা ফোন কর।
-না মা, আমি কোন দিন ই ওকে ফোন করবো না। ওর ইচ্ছা হলে করবে না হলে নাই। তোমার জামাই কি করে তুমি জানো?
-আমি সব জানি, এই বয়সের ছেলেদের মোবাইলে একটু আধটু ফোন টোন আসবেই। ও কিছু না। ছেলে হিসাবে আবীর খুবই ভালো।
-ঠিক আছে আমার আর বলার কিছু নাই। আমি আর তোমাদের জামাইয়ের সাথে সংসার করবো না ব্যাস।
-মিষ্টি খেয়েছিস?
-হ্যাঁ খেয়েছি,
-মাইশার জামা গুলি কেমন হইসে রে?
-দারুণ মা, তিনটা জামাই খুব সুন্দর।
-শাড়ি গুলি তোর পছন্দ হয়েছে।
-হ্যাঁ খুব পছন্দ হয়েছে। এতো দামি শাড়ি দিলে কেন মা? একটা কিনলেই তো পারতে। আমার তো শাড়ি আছেই।
-আমি দিলাম কোথায়?
-মানে?
-আজ দুপুরে আবীর এসেছিলো, তুই ঘুমাচ্ছিলি। কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে তোর মাথা ব্যাথা করে বলে, তোকে তুলতে মানা করেছে। যতক্ষণ ছিলো, মেয়েটাকে কোলে নিয়ে বসে ছিল।
ছেলেটার মুখটা খুবই শুকনা লেগেছে। দুপুরে মনে হয় ভাত খায়নি। এতো করে বললাম খেয়ে যেতে তাও খেয়ে গেলো না। খুব মায়া হচ্ছিলো আমার। আর এই খামটা তোকে দিতে বলেছে।
লতা খামটা খুলে, ভিতরে নগদ বিশ হাজার টাকা আর একটা চিঠি।
-লতা,
-জানি তুমি ভালো নেই। সব সময় আমার কথা ভাবো। আর আমার বান্ধুবিদের উপর তোমার খুব রাগ। আমি তো আমার বান্ধুবিদের নিয়ে অনেক সুখে আছি, তুমি তো জানোই।
-শোন, তোমার হাত খরচের জন্য বিশ হাজার টাকা পাঠালাম। কারন তুমি এমন একটা মানুষ যে কষ্ট পেলেও কারো কাছে থেকে কিছু চাইবে না।
-দুইটা খবর আছে লতা। একটা সুখবর, একটা দুখবর। আগে সুখবর টা বলি,
-আমরা যে ফ্ল্যাটটা দেখতে গেছিলাম, সেটা ফাইনাল করে ফেলেছি। তোমার নামে রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে। সামনে মাসেই ওরা হ্যান্ড ওভার করবে। সেটা শুধুই তোমার ফ্ল্যাট। তুমি মনের মতো করে সাজাবে আর আমাকে নিয়ে বেগুন ভাজি করবে। আমি কিছু বলবো না। শুধু শুনবো।
-দ্বিতীয় খবরটা তোমাকে বলতে চাইনি। আবার না বলেও পারছিনা।
-তুমি তো জানো, আমার হার্টের সমস্যা আছে। বাইপাস সার্জারি করার কথা ছিলো। পরশু দিন আমার অপারেশন। আজ রাত থেকেই আমি হাসপাতালে থাকছি।
-দোয়া করো যেন বাঁচতে গিয়ে মরে যাই। তাইলে তোমার কষ্ট গুলি আর থাকবে না। মাইশার দিকে খেয়াল রেখো। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিয়ো। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করবে। বেশী চিন্তা করবে না।
-না লতা, তোমাকে আমি কোন দিনও আসার জন্য বলবো না বা জোর করবো না। আসা, না আসা বা সংসার করা না করা সব কিছু আমি তোমার উপর ছেড়ে দিলাম।
-কারন, আমার বিশ্বাস, আমার ভালবাসাই তোমাকে একদিন আমার কাছে নিয়ে আসবে। তুমি স্বামীদের শুধু দেখেছো, বাইরের মেয়েদের সাথে মিশতে। কিন্তু তুমি দেখনি, স্ত্রীর প্রতি স্বামীদের ভালোবাসা কতোটা গভীর হয়।
-আরেকটা কথা, আমার কাছে যে মেয়েটা বার বার করে ফোন করতো, সে অন্য কেউ নয়। সে তোমারই ছোট বোন পাতা।
-একটা বিরাট বড় গ্রুপ অফ কোম্পানিতে, গত মাসে তার চাকরী হয়। চাকরীটা আমি তাকে নিয়ে দেই। ইন্টারর্ভিউতে কি কি প্রশ্ন আসবে, ভাইভা তে কি হতে পারে, তাকে কি কি করতে হবে, এই সব নিয়েই ওর সাথে আমার প্রতিদিন ফোনে কথা হতো। ও খুবই নার্ভাস ছিলো। তাকে সাহস দিতাম।
-সে আমাকে বারণ করেছিলো, চাকরীটা না হওয়া পর্যন্ত যেন তোমাকে কিছু না বলি। কি বিশ্বাস হচ্ছে না? পাতাকে জিজ্ঞাস করে দেখো, সব জানতে পারবে।
-এই চিঠি যখন লিখছি তখন আমার খুবই ভালো লাগছে। কেন ভালো লাগছে জানো লতা?
-পাঁচ বছর আগে আমরা যখন প্রেম করতাম, তখন তোমাকে চিঠি লিখেছি। আর পাঁচ বছর পর আবার তোমাকে চিঠি লিখছি।
-এই জন্য আমার খুব ভালো লাগছে। থ্যাঙ্কস তোমাকে, রাগ করে বাপের বাড়ী গিয়ে আমাকে আবার প্রেম পত্র লেখার সুযোগ করে দেয়ার জন্য।
ভালো থেকো তুমি। ভালো থেকো মাইশা। আর আমিতো বান্ধুবিদের নিয়ে বেশ ভালোই আছি। তারপরও বলবো, তোর ভালোবাসাই আমার মরণ রে...
ইতি
মাইশার আব্বু আর তোমার...
লতার চোখ ভিজে উঠে। আবীরের উপর যত রাগ ছিলো তা নিজের উপর উঠে। সে মোবাইলটা হাতে নিয়ে আবীরকে বার বার ফোন করে। আবীরের মোবাইল বন্ধ।
-কাকে ফোন করছিস?
-মা আবীর কে
-কেন? তুই তো ওর সাথে সংসারই করবি না। তো বার বার করে ফোন দিচ্ছিস কেন?
-মা বেশী কথা বোলো না তো। খুব রাগ হচ্ছে আমার। পাতা কৈ মা?
-কেন? ও তো ওর ঘরেই আছে।
-পাতা এই পাতা...
-আসছি, দাঁড়াও আপু, বলো আপু কি বলবে?
পাতার কিছু বুঝে ওঠার আগেই তার কানের নীচে একটা শব্দ হয়।
পাতাকে থাপ্পড় মেরে লতা নিজেই কষ্ট পায়। সে পাতাকে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে...
লতা লেগেজ গুছায়, সে চলে যাবে।
-কি করছিস তুই?
-আমি চলে যাবো মা।
-এখন রাত আটটা বাজে, এতো রাতে তুই কোথায় যাবি? তাছাড়া তোর বাড়ীতে এখন তালা দেয়া। আবীর নাই। সে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কোন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে আমাকে কিছু বলেনি। কাল খোঁজ নিয়ে দেখবো।
লতা কাঁদতে থাকে। আবীরকে দেখার জন্য মনটা খুব আনচান করে। আবীরের প্রতি তার ভালোবাসা আরও অনেক গুন বেড়ে ওঠে...

বুক জুড়ে কেবলি হলদিবাড়ী
- জোহরা উম্মে হাসান

ট্রেনটা ছুঁই ছুঁই গন্তব্য পার্বতীপুর রেলওয়ে ষ্টেশন
এরপর হলদিবাড়ী ২২/এক , ব্যাস এটুকুই । তারপর
ভাবনা বদল , টিপ টিপ চলতে চলতে এই তো আর
বড়জোড় আর কয়েক মিনিট , পার্বতীপুর রেলওয়ে ষ্টেশন
গন্তব্য হলদিবাড়ী ২২/এক , ব্যাস এটুকুই !
তেমন কিছুই নেই সাথে, হাতে ধরা ব্যাগ , কিনবা সুটকেস
চামড়ার ! কাঁধে ঝোলানো অজন্তা ব্যাগ বড়জোড় শান্তিপুরী
স্লিপারে পাছে লেগে যায় পাড় শাড়ীর, তাই তাড়াহুড়া বাদ
আলতো খোঁপা নয় বাহারী , তারপরও খুলে উঁচিয়ে বাঁধা
ঝুমকো লতায় আটা কাঁটা!
গন্তব্য হলদিবাড়ী ২২/এক , সারি সারি মানুষ নেমে যায় একে একে
কত রঙ , কত ঢং , কত সাজ, হাঁকাহাঁকি, ডাকাডাকি । তাঁকেই কেবল
চেনেনা কেউ , শুধুই একজন যে থাকে হলদিবাড়ী ! সিঁড়ি দুই কিংবা
তিন । এরপর লাল ইট বুকে বিশাল প্লাটফর্ম , এপার ওপার
যায় না দেখা লোকের ভিড়ে । মানুষের সমুদ্দুর । যাওয়া আসা
যেন জোয়ার ভাটার খেলা , সারা বেলা !
রেল বাবুর কামরা একটু এগোলেই , ভয়ানক ব্যস্ত । যেন তাঁর
চোখের সামনে রাহুটা । গাড়ীটাকে কাঁটা ধরে না তাড়ালেই নয় !
লাল ঝাণ্ডা , খাকী প্যান্ট , সাদা কোট চোখে চশমা পাশেই । সন্ধ্যে
ছুঁইছুঁই , একে একে জ্বলে উঠে আলোর পাখিরা .। রাতের তারারা যেন
অগুন্তি জ্বলে আর নেবে , রেলের আকাশ মাথার উপরে!
কমলা ঝুড়ি কাঁধে দেহাতি নারী , ছোকরা বুট বাদাম গলে বাবড়ী চুল
জুতা পালিস লাল কালো কালি ঢিব্বা ওয়ালা, পা নুলো ভিখিরি , ক্লান্ত কয়লা শ্রমিক
আলো আঁধারিতে বারোয়ারী নারী আর মিলিত হাসি ফিক ফিক ।
যৌবন ছুঁই ছুঁই বালক বালিকা, চাপা জিন্স ট্রেট্রন যুবক , ঘোমটা বধূ
এক দুই তিন রাবনের দলবল ।
হলদিবাড়ী ২২/এক । লোহার গেট , এক পাশে টিকিট চেকার
উল্টায় পালটায় দ্বিতীয় শ্রেণী টিকিট । দেরী করে যেমন সচারাচর
করে পুরুষ মন্থন নারী ছল ছুতোয় ।এরপর দুই চাকা রিক্সা
অথবা চারচাকা টেম্পো গাড়ী, আগ্রহ মুখ ক্লান্ত চালক
উথসুক পথচারী , হলদিবাড়ী ২২/এক তাঁর বাড়ী !
ঠিকানাটা হাতে লেখা , দেখে দেখে বারে বারে জীর্ণ পাতা
কালি অস্পষ্ট ফ্যাঁকাসে , নিজের মতো যেন ! অন্ধকার অচেনা পথ
আলো আধারী ইটের বাড়ী সার সারি , অবুঝ বটের পাতা । বাতাসে
দোল খায় অদেখা নারীর শাড়ী , বেলোয়ারী ! হলদিবাড়ী
২২/এক সে কোন বাড়ী ?
সে কি এখনও সেই ঠিকানায় । এখনও কি একই বাড়ী , একা ?
নাকি দোকা , পাশে রূপসী অবুঝ রমণী ! খোলা চুলে বনলতার ছায়া
যেন এক আশালতা দেবী । তবে সে কে ? পরনে সবুজ অবুঝ শাড়ী
স্লিপারে ক্লান্ত চরণ। অজন্তা ব্যাগ শান্তিপুরী । বুক জুড়ে কেবলি হলদিবাড়ী !

শেষ বেলায়
- রুনু সিদ্দিক

জীবনের সন্ধিক্ষনে, উপলব্ধির ধূপছায়ায়,
সম্পর্কের টানাপোড়েনে, স্মৃতির ধূসর পাতায়,
পড়ন্ত বিকেলে, দক্ষিণের খোলা জানালায়,
এক টুকরো আকাশ ঝুলে থাকে জানালার বাইরে ।
ওটাই আমার পৃথিবী ।
শূণ্য হাতে সাজাই প্রহর,
খালি পড়ে থাকে স্বপ্নের বিছানা,
অঘোরে ঘুমায় অতীত বর্তমান
ভাবনারা সাদা-কালো, কখনোবা নিকষ কালো ।
আঁধারে ঘনায় সময়ের চাকা-বিনিদ্র রজনী,
খোলা চোখে নেই স্বপ্নের ছায়া,
সবকিছু এখন অনুভূতিহীন,
জগৎ সংসার এখন আমার,
তাড়না করে না কোন কিছু,
ভাটির টানে চলছে জীবন,
কোথাও কেউ নেই, সীমাহীন শূণ্যতা ।
মনে পড়েনা এখন আর কিছু -
একসময় ছিল সবই রঙিন !

প্রেমের অংশ বিশেষ
- শিমুল শুভ্র

উষার আলোয় মিঠে তেজে,তোমার চিকচিক করে মুখ,
আজ শীতেলা পরশে ভরিয়ে দিবো মনের মাঘের সুখ।
চাদর হবো আমি তোমার অঙ্গ জুড়ে,অন্তরে ফোটা ফুল,
স্নান শেষে এলোকেশী চুল শুকাতে দিবে,সুগন্ধে আকুল।

আঁচলখানি উড়িয়ে দিবে,শীতের বাতাসে ঠকঠক অধর,
মধুকর বুকের উঠানামা যেন,ভালোলাগার পরশ সদর।
তোমার মৃদু হাসিতে প্রেমবরিষার স্রোতে,প্রবল জোয়ার,
নয়নের এক এক চাউনিতে ,উতাল করে মন মনোহর।

মনকাননে ডাকছে পাখি এত রূপ কোথায় রাখি,অপরূপা,
আঁচলখানি বক্ষে তুলোনা প্রেয়সী, ভালোবাসার শতরূপা।
দীপ জ্বেলেছি তোমার তৃষিত রূপের ঘরেএক পলক দেখ,
সেকি হায়!দীপ লাজে নিভে যায়,মোর নয়নে নয়ন রাখো।

এই হৃদয় সড়কে তোমার যাতায়ত,পায়েলের তালে তালে,
নক্ষত্রের রুপালি আগুনভরা রাতে দীপ,নরম তুলোর গালে।
আজ শরম টুটা মন,লজ্জাহীন প্রদীপ, জোছনার উঁকি ঝুঁকি,
নোঙ্গর ফেলবো শীতেলা চুমু'র হাসিতে,উষ্ণতায় চুপি চুকি।

রচনাকাল
২৯।১২।২০১৪

আমি আজ বিদ্রোহ করি
- শিমুল শুভ্র

ধরার এই আপন বুকে
প্রভাত রবির আলো ফোটে,
ঝিলিক মারে পিলিক হাসে নিত্যলীলা সর্বনাশে।
ওরে ধর অসুর দানা
ধ্বংস কর ষোলা আনা
যে জন দেশের মান বুঝে না,নিত্য ভাসায় বিষাদবাসে।

ওরে যে বলে আমি রাজা
অন্যায় করে ঢোল বাজা,
তারে ধর দে'রে সাজা, মন্ত্রীর ব্যাটা বড় ঘ্যাচাং গাজা
নে'রে নে শোধনগারে
মানব জনম সারে সারে
বুঝা তারে হাঁড়ে হাঁড়ে কত প্রেম এই সংসারে,অন্যায় যে ক্ষারভাজা।

দেখরে কালো মেঘ জমেছে,
সন্ত্রাসীরা সং সেজেছে ,
মাতৃমন্ত্রীর ছায়াতলে,অসহায় মানুষের ঐ লাল জলে,
কিসের বলে আগুন জ্বলে
ভাসে মানুষ আজ গঙ্গাজলে,
এই কোন মেলা মধুমালা,হরণ করলো সতীর বেলা,খেলার ছলে?

ঘৃণার কামান দাগরে তাদের
অমরত্বের লোভ যাদের
স্বদেশভূমি স্বাধীন তুমি কেন এত নীরব চুমি বঙ্গকানন,
তোমার বুকে যাদের ক্ষত
হে ভগবান বিচার শত,
চাঁদের হাঁটের আলো জালাও স্বপ্নপুরে ,কেন এই রক্তক্ষরণ?

নে রে নে হাল তুলে নে গভীর গাঙ্গে
জনারণ্যে যেজন সুখের বাঁধ ভাঙ্গে
তুলে ফেল তার হাঁড়ের খাতা,লবন ছিঁটা লাল মরিচ বাটা,
সোনার বাংলায় রং সাজা
স্বাধীন দেশের আমি প্রজা ,
দূঃখ সুখে সংসার সাজা বঙ্গকানন সুখের আটা।
ওরে চল'রে চল পাল তুলে চল
ঈষান কোণে বাজে মাদল,
জেলে তাঁতি হাল ধরেছে কামার কুমার সঙ্গে আছে,
যারা ধর্মনাশে মাঠে নেমেছে,
মানব মনে আঘাত হেনেছে
দে'রে সাজা ঐ পথের রাজা,বিক্রম তেজে দেশের কাজে।

পাষাণপিঞ্জর যাদের বুকে
সর্বগ্রাসী সর্বত্রাসে
আত্মমাঝে কষ্টে নাচে নিধন কর,তাদের মূল সমুলে,
ধর ভাই হাতের লাঠি
ন্যয়ের পথে সুখ বাটি,
হৃদয় মাটি বঙ্গ খাঁটি নৈবদ্যে সোনার আঁটি,তাল তমালে।

ওরে জেগে উঠ তরুণ সমাজ
গীতা পাঠে- রোজা নামাজ
তুলে ধর বিশ্ব কূলে বঙ্গ দেশের মান যে দোলে সদল বলে,
আমি স্বপ্ন দেখি ছবি আঁকি,
ন্যায়ের পথে অন্যায় ঢাকি
চন্দ্রের আলোয় বাতি জ্বালি,যে জন পথের বাঁকে উল্টা চলে।

ওরে তুলে ধর সব বঙ্গবাসী
আলোর নিশান পতাকা রশি
যার ছায়াতে মায়ের আঁচল সুখের পথের ক্ষণ অবিচল,
তরুণ সমাজ অরুণ জ্বালো,
ছড়িয়ে পড়ুক গৌরব আলো
যে আলোয় হাসবে রাশি আমার এই বঙ্গবাসী,সুখ অবিরল।



নবদিবাকর পত্রিকা'র প্রত্যেক পাঠক, পাঠিকা, লেখক, লেখিকা, কবিদের নতুন বছরের শুভেচ্ছা । নতুন বছর আপনি কেমন করে কাটাতে চান ? নতুন বছরে আপনার লক্ষ কী ? আপনি আপনার জীবনে নতুন কী পেতে চান ? আপনার প্রিয়জনকে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বার্তা পাঠান । আমাদের কমেন্ট করে জানান আপনার লক্ষ । আসুন সবাই মিলে নতুন বছরকে বরণ করে নিই, আর মেতে উঠি আনন্দে । 




Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগের ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget