ডিসেম্বর 2014

তিন সত্যি
- জোহরা উম্মে হাসান


যে মেয়েকেই পচ্ছন্দ করে ইয়াদ আলী সেইই কেমন কেমন করে যেন হাত থেকে ফসকে যায় ! যেদিন সম্পর্ক একেবারে শেষ হোয়ে যায় , সেইদিন ইয়াদ আলী ঘরের দরজা এঁটে ডুকরে ডুকরে কাঁদে । তখন তাঁকে শান্তনা দেয়ার জন্য ছুটে আসে ইয়াদ আলীর দূরসম্পর্কের খালাতো বোন রমিসা।
রমিসা অবশ্য ইয়াদ আলীর মা মবিতন বেওয়ার অনুমতি নিয়েই ইয়াদ আলীর ঘরে ঢোকে । অন্যদিন ইয়াদ আলীদের বাড়ীর উঠোনে পা রাখার ক্ষমতাও নাই তাঁর। কিন্ত ছেলের এইসব দুঃখ বা বিরহের দিনগুলোতে ইয়াদ আলীর মা উপযাচক হোয়েই রমিসাকে ডেকে পাঠায় ।
রমিসা দুরু দুরু বুকে মবিতন খালার সামনে এসে দাঁড়ায় । নিজের লম্বা খোলা চুলগুলোকে পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে হাত খোঁপা বানায় । খোলা চুল যে মবিতনের ভারী অপচ্ছন্দের , তা বেশ ভালভাবেই জানে রমিসা !
আসছিস রে রমি , মবিতন মাদি বেড়াল গিন্নীর মত রমিসার পায়ের শব্দে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে । আসলিরে মা , কিন্তুক আইজ আবার এত দেরী করলি ক্যান ? পোলা তো আমার কাঁদতে কাঁদতে পাগল প্রায় !
এই একটু দেরী হোল খালা , পথে -----,
পথে আবার কি হল রে , মবিতন আগ্রহভরে জানতে চায় । পথে কি হল রে আবার রমি ? সেই চেয়ারম্যানের শয়তান পোলা তরে তো কিছু মন্দ বাক্যি বলেটলে নাই ?
রমিজা , মাথা ঝাঁকায় । তার মানে না । হাঁ হোলেও বলবে না সে । গরীব ঘরের মাইয়া তো সবার সম্পতি ! বড়ই গাছের মত সবাই তা্তে ঝাঁকি মারতে চায় !
এই মবিতন খালার কথাই ধরা যাক না ক্যান । সেইই বা কম কিসে । কিন্তু না । ছেলে যখন তাঁর এর ওর সাথে প্রেম করে বেড়ায় তখন তাঁর বেজায় আনন্দ । ছেলেকে কাছে বসিয়ে বসিয়ে হবু বউমার গলপ শুনে এক এক করে মবিতন । আর দশ বাড়ী শুনিয়ে শুনিয়ে বলে - আমার ইয়াদ আলী এবার জাফর মিয়ার মাইয়ার প্রেমে পড়েছে । কি শন্দর সে মাইয়া । সেই মাইয়া নাকি আমার ইয়াদরে ছাড়া আর কারেও বিয়া করবে না । মাইয়া হলে হতি হয় এমুন ।
গায়ের দু চারজন বউ ঝি ইয়াদ আলীর মার গল্প রসিয়ে রসিয়ে শোনে । দু চারজন আড়ালে আবডালে এটা ওটা বলে । বলে- ইয়াদ আলীর সাথে সাথে অর মায়েরও মাথা গ্যাছে । মেন্টালে জাওন লাইগব ! কেউ আবার মনে মনে মবিতনকে গালাগালি করে । আহা , কি দোষ করেছে ঐ নিরীহ রমিসা মেয়েটি । হোলই বা একটু শ্যামলা গোছের , কিন্তু না তাঁকে নাকি ভালই লাগে না ইয়াদ আলীর খানাচ্ছি মার । বেচারা ইয়াদ আর কি করে । মায়ের ভয়ে দাঁতে দাঁত চেপে নিজের সত্যিকারের প্রেমের কথা আড়াল করে রাখে !
মবিতন এসব শোনা অশোনা কথা গায়ে মাখে না । তাঁর ইচ্ছা আর স্বপ্ন একটাই । আর তা হোল একমাত্র পোলা ইয়াদ আলীর জন্য একটা সাদা ফরসা ফুটফুটে বউ ঘরে আনা । কালো মেয়ে ভারী অছন্দের মবিতনের । ছেলেকে বহু বুঝিয়ে কষ্টে শিষ্টে নিজের আপন খালাতো বোনের মেয়ে রমিজার হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছে সে ।
মবিতন খুব ভালো করেই জানে -রমিজাকে ভারী পচ্ছন্দের ছিল বটে ইয়াদ আলীর এককালে । কিন্তু মায়ের কান্না কাটি আর রাগারাগিতে সেই ইচ্ছা সে ত্যাগ করছে ।
কিত্নু মবিতন সত্য কথাটা জানে না । ইয়াদ আলী এখনও রমিজাকেই ভালবাসে । সে মনে মনে ভাবে , রমিজার কি দোষ ? না তাঁর গায়ের রঙ কালো । কালো রঙের মাইয়ার কি কোন শন্দরজ নাই ? আছে । কিন্ত মায়ের কাছে নাই । তাঁর কথা কালো রঙের মাইয়া ঘরে তুললে সংসার ছাড়খার হইয়া জাইব । কালা কালা নাতিপুতি্তে ঘর ভইরা যাইব । তাই রমিজা বাদ । রমিজার কথা মুখে তোলাও পাপ।
ইয়াদ আলী আর মুখে তোলে না রমিজার কথা । মায়ের কাছে আইজ এ মাইয়া কাল সে মাইয়ার কথা বলে আর তাদের নিয়ে ভুরি ভুরি মিছা মিছা গলপ শোনায় । মা তাতেই মহা খুশী । বলে - বল বাবা কবে আমার বউমারে ঘরে তুলবি । প্রস্তাব পাঠাই রহিমুদ্দীরে দিয়া ।সে এ গায়ের নামকরা ঘটক । ঘটকালিতে তাঁর জুড়ী নাই দশ গায়ে।
ইয়াদ আলী কেঁদে কেঁদে মাকে শোনায়- মারে আমার কপালের ফের । কি করি আর বল ! যারেই ধরি সেই বড়শির বড় বোয়াল মাছটার মত ফাতনা টোকা দিয়ে পলায় যায় ! কি করি মা , আমার কপালে আর বোধহয় বউ নাই ।
ছেলের কান্না দেখে মবিতনও ডুকরে ডুকরে কেঁদে ওঠে । এই নিয়ে চারবার হল । ইয়াদ আলীর প্রেম ভেঙ্গে গেল । ভেঙ্গে গেলে আর কি হয় ? ইয়াদ আলী না খেয়ে না দেয়ে দরজায় খিল আঁটে আর মাকে শুনিয়ে শুনিয়ে ডুকরে ডুকরে কান্দে ।
কাঁদে বটে কিন্তু তাঁর কান খাড়া থাকে রমিজার আসার পথের দিকে চেয়ে । তবে দুঃখের এইসব দিনগুলোতে রমিজা আর ইয়াদ আলীর প্রেমালাপ ফ্রি । ঘরের দোর ভিজিয়ে দিয়ে সারাদিন গুজুর গুজুর ফুশুর ফুশুর করলেও মবিতন ভুলেও মন্দ কথা কইবে না রমিজাকে ।
এই সব দিনে রমিজাকে মা ছাড়া সম্বোধন পর্যন্ত করে না মবিতন । মনে মনে বলে - আহা , কত ভাল মাইয়াটা , আমার ছেলের দুঃখে শান্তনা দেয়ার জন্য সে ছাড়া আর কে আছে ? ইচ্ছা করলে তো রাগে রাগে সে নাও আসতে পারে । কিন্তু কি ভালো সে । ডাক নিলেই ক্যামন পোষা হরিনীর মতো ছুটে আসে !
মবিতন নিজের হাতে গলদা চিংড়ি রান্না করে ছেলের ঘরে কাজের মানুষ দিয়ে ভাত পাঠিয়ে দেয় । সেই সাথে রমিজার জন্য ভরা থালা । রমিজা চিংড়ির দপেয়াজী চেটে পুটে খায় আর ইয়াদ আলীকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে- তোমার মা আসলে জাতে মাতাল , দেখ তালে ক্যামুন ঠিক ! এর পরে ডাকাডাকি করলে আর কিন্তু আসব না , এই কিরা কেটে কোলাম !
তার মানে , ইয়াদ আলী একটু কালো মুখেই জানতে চায় । তাঁর মুখ কালো করার কারণ দুইটা । এক - আর না আসার জন্য রমিজার কিরা কাটা । আর দুই - মায়ের নামে ভালো মন্দ কথা বলা। রমিজাকে সে ভালবাসে বটে কিন্ত মাকে নিয়ে রমিজার একটু মন্দ কথা বলা বা তা শোনা ইয়াদ আলীর ধাতে শয় না ।
রমিজা এসব গায়ে মাখে না । আগের মতই মুখ বাকিয়ে বলে- তা জা হঊক ইয়াদ আলী ভাই , এইবারেই কিন্তুক আমার শেষ আসা । এরপর তুমার মা হাজার মাথা কুটে মরলেও তুমার কাঁদন থামাতে আসবে না আর এই রমি । আসব না , আসব না , আসব না ! এই তিন সত্যি ! খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে সটান ঊঠে পড়ে রমিজা ইয়াদ আলীর তোয়াক্কা না করেই !
ইয়াদ আলী সাথে সাথে রমির নরম হাতটা শক্ত কোরে চেপে ধরে বলে - এই শেষ কসম রমি । মাকে আজই বোলব তর কথা । । বোলব , বোলব , বোলব এই তিন সত্যি !
রমিজা কানে তোলে না এসব পুরান ভালবাসার কিরার কথা । বলব , বলব কোরে তো প্রায় তিন বছর চালায় দিলা ইয়াদ আলী ভাই । আর না । থাকো , তুমি আর তুমার মা । আরও প্রেম করে বেড়াও । আর তুমার মা এসব দেখে খুশীতে বাকবাকুম করুক । বলতে বলতে ধাই ধাই করে চলে যায় সে!
মাইয়াটা যে আইজ সকাল সকাল চলে গেল বাপ । কি হোল তার ? তা যাকগে , তর মন ভালা ত বাপ , মবিতন ছেলের কাছে এগিয়ে এসে জানতে চায় !
হু , ভাল । ইয়াদ আলী মাথা নাড়ে আর মনে মনে সে এক্ষুনি
রমিজার কথা মায়ের কাছে বলতে চায় । কিন্তু মায়ের চিন্তিত মুখটা দেখে ভাবে - থাকুক , আইজ না কাল বোলব !
মবিতন ছেলের মাথার কোঁকড়া চুলগুলো গভীর মমতায় নাড়ে আর বিড় বিড় করে বলতে থাকে- আমার পোলার মাইয়ার অভাব । কত মাইয়া মুখ চাইয়া আছে এ গায়ে তাঁর নজরে পড়ার জন্য ।
বাপ শোন , এই শ্যাস । আর একবার প্রেম কর বাবা । শুনছি আবেদ মিয়ার মাইয়াটা নাকি খুব শুন্দরী , পাশও দিছে একটা । তুই সেই চেষ্টা কর বাপ ঐ মেয়েটার নজরে নিজেরে আন । তকে দেইখা না কয় কার সাধ্যি , মবিতন বলতেই থাকে ! বলতেই থাকে !
ইয়াদ আলী মায়ের কথায় কোন উত্তর না দিয়ে বোবার মত চুপ করে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করে । কিন্ত এই মিথ্যা মিথ্যি চুপ করে থাকা আর কতদিন । রমিজার শ্যামলা মিষ্টি মুখটা বারে বারে তাঁর দুচোখের সামনে এসে তীব্র ঝড়ের দোলা দিয়ে বলে - আসব না , আসব না , আসব না ! এই তিন সত্যি !

দু - টুকরো আকাশ
- মশিয়ুর রাহমান খোকন


-হ্যালো
-কেমন আছো তুমি?
-এই তো আছি...
-তুমি কেমন আছো?
-ভালো
-কি করছো?
-তেমন কিছু না, একটা লেখা নিয়ে ভাবছি
-তোমার ''দু- টুকরো আকাশ'' উপন্যাস টা আমি অনেক বার পড়েছি।
-খুব খুশী হলাম। কৃতজ্ঞ হলাম। ধন্য হলাম।
-এমন করে বলো না অভি
-আমার নাম্বার কি করে পেলে?
-তোমার নাম্বারটা আমাকে অনেক কষ্ট করে জোগাড় করতে হয়েছে।
-তুমি কেমন আছো নীলা?
-ভেবেছিলাম তুমি আমাকে চিনতে পারবে না। আমাকে অবাক করলে অভি।
-প্রায় নয় বছর পর তোমার সাথে কথা হচ্ছে, তাই না নীলা?
-হুম
-নয় বছর কেন? নব্বই বছর পরও যদি তোমার সাথে আমার কথা হয়, তাহলেও আমি তোমাকে ঠিকই চিনতে পারবো নীলা। তুমি জানো না? তোমার কণ্ঠটা আমার হৃদয়ে গেঁথে আছে?
-আমি জানি, আমি আবারো জানলাম। তুমি আমাকে আবারো খুবই অবাক করলে অভি।
-দেশে কবে আসলে?
-গত পরশু দিন।
-কত দিনের জন্য?
-মাত্র দুই সপ্তাহের জন্য। আমি এবার এসেছি শুধু মাত্র তোমার জন্য অভি।
-বাহ, বেশ ভালো লাগলো। নিজেকে কি জানি কি একটা মনে হচ্ছে। আমার জন্য কেউ এখনো সুদূর টেক্সাস থেকে আসে।
-তোমার কথা গুলি ঠিক আগের মতই আছে। কোন পরিবর্তন নাই।
-তোমার বাচ্চারা কেমন আছে?
-ভালো। ওদেরকে টেক্সাসে রেখে এসেছি।
-বলো কি? মা ছাড়া একা থাকতে পারবে?
-বিদেশী বাচ্চা। ওরা সবই পারে। তাছাড়া ওর বাবা আছে সাথে।
-তোমার কয়টা ছেলে মেয়ে নীলা?
-আমার এক ছেলে এক মেয়ে। তোমার?
-আমার ছেলে মেয়ের মা ই তো নাই। ছেলে মেয়ে আসবে কোথা থেকে?
-কেন অভি? তুমি এখনো বিয়ে করোনি?
-চুপ করে আছো কেন? কথা বলো অভি।
-নীলা
-হুম
-আমাদের সম্পর্কটা কত বছরের ছিলো, তোমার মনে আছে?
-কেন মনে থাকবে না? সাত বছর।
-তোমার মনে আছে নীলা? এই সাত বছরের কোন একদিন আমি তোমাকে বলেছিলাম। আমার বিশাল আকাশটা দু টুকরো করলাম। এক ভাগ তোমাকে দিলাম অন্য ভাগ আমি।
-হুম, বেশ মনে আছে। প্রায়ই তুমি এই কথা বলতে অভি।
-দু টুকরোর মধ্যে এক ভাগ তো তোমাকে দিয়েই দিয়েছি। অন্য ভাগ আমার কাছে। যাকে আমি বিয়ে করবো। সে যদি তার পুরো আকাশটা আমাকে দিয়ে দেয়। তাহলে আমি তাকে কি দিবো বলতে পারো? আমার কাছে যে টুকু আকাশ আছে, ঐ টুকু দিয়ে সে শান্তি পাবে না। আবার পুরোটা না দিতে পারলে আমি শান্তি পাবো না। তার চেয়ে এই তো বেশ আছি...
-চুপ করে আছো কেন নীলা?
-ভাবছি। কেন এমন হল অভি?
-তা তো জানি না। তুমি কাঁদছো নীলা?
-আমি যদি সারা জীবনও কাঁদি। তারপরও তোমার ভালোবাসার কাছে আমার ভালোবাসা কিছুই না অভি।
-এমন করে বলো না নীলা। কোথায় উঠেছো তুমি?
-ভাইয়ের বাসায়। মোহাম্মদপুর। তুমি আছো কোথায়?
-সেই আগের জায়গাতেই। নিজের বাড়ী ছেড়ে কোথায় যাবো বলো?
-তোমার আম্মাকে আমার সালাম দিয়ো। আমি উনার সাথে দেখা করতে চাই।
-তা সম্ভব না নীলা।
-কেন?
-মা আরও চার বছর আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
-ওহ। সরি অভি।
-অভি
-হুম
-আমি তোমার সাথে একটু দেখা করতে চাই। না করবে না প্লিজ। আমি দেশে এসেছি শুধু মাত্র তোমাকে একটু দেখার জন্য। এই নয়টা বছরে মনে মনে তোমাকে অনেক খুঁজেছি। একা একা অনেক কেঁদেছি। প্লিজ অভি। প্লিজ আমি তোমাকে একটু দেখতে চাই।
-আমি ব্যাচালার মানুষ। একা থাকি। অগুছালো জীবন আমার, আর ধুলো ময়লার সাথে বসবাস।
-আমি কিছু শুনতে চাই না। শুধু তোমাকে একটু দেখতে চাই অভি প্লিজ।
দশ ফিট বাই আট ফিটের দুটো রুম আর একটা রান্না ঘর। ঘরের ওয়ালের রং ময়লায় ঝলসিয়ে গেছে। ধুলা ময়লা কোনায় কোনায় ঝুল আর অগুছালো চারিদিক। উপরে অনেক পুরনো একটা নষ্ট ফ্যান ঝুলে আছে।
টেবিলের উপর পুরনো বই, পেপারের স্তূপ আর একটা ভাঙ্গা টেবিল ফ্যানের ঘট ঘট আওয়াজ। একটা পানি খাওয়ার জগ, একটা গ্লাস, অনেক দিন ধোঁয়া হয় না। লাল হয়ে গেছে। একটা এসট্রে, একটা মোটা চশমা। অন্যদিকে একটা আলনা, ব্যাবহার করা কাপড়ের স্তূপ।
খাটে ময়লা বিছানা বালিশ। একটা ময়লা ছিঁড়া মশারী দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টাই ঝুলে থাকে। এর মধ্যেই শুয়ে শুয়ে বই পড়ে অভি। ফ্লোরে একটা ময়লা কার্পেট। কার্পেটের উপর একটা কাঁচের গ্লাস। গ্লাস ভরা সিগারেটের ফিল্টার। আর বই খাতায় ছড়ানো ছিটানো চারিদিক।
অন্য রুমে একটা বুক সেলফ। বুক সেলফে ঠাসা ঠাসা বই। একদিকে একটা ইজি চেয়ার। অন্যদিকে একটা টি টেবিল সাথে দুটো সোফা।
দরজায় বেল বাজছে অনেকক্ষণ ধরে। অভির মনোযোগ একটা লেখার মধ্যে। হাতে একটা জলন্ত সিগারেট।
দরজা খোলার সাথে সাথে অভির চোখের পাতা পড়ে না। লাল কুঁচি দেয়া অসম্ভব সুন্দর কাজ করা দামি একটা শাড়ি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে নীলা।
স্লিম ফিগার, ফর্সা গায়ের রঙ। টানা চোখ। খাড়া নাক। টোল পড়া গাল। ঠোঁটের উপর তিলটা এখনো আছে। খোলা চুল বাতাসে উড়ছে। কমোর পুরোটাই দেখা যায়। কপালে লাল টিপ। হাত ভরা চুড়ি আর হাতে একগুচ্ছ লালা গোলাপ।
-কি ব্যাপার? ভিতরে আসতে বলবে না?
-ওহ হ্যাঁ, এসো এসো। কত বছর পর দেখা হোল বলতো?
-তা প্রায় নয় বছরের বেশী তো হবেই।
-হুম, কোথায় যে তোমাকে বসতে দেই। এই যে এই চেয়ারটায় বসো। দাঁড়াও দাঁড়াও একটা কাপড় বিছিয়ে দেই। তা না হলে তোমার দামি শাড়িটা ময়লা লেগে যেতে পারে।
-ঘরের পরিবেশ এ কি করেছো অভি?
-একা মানুষ আমি। কোন রকমে দিন চলে যায়। কি হবে এতো পরিপাটি করে?
-সারা দেশে তোমার এতো নাম ডাক। এতো বড় লেখক তুমি। বাজারে কত বই তোমার। অথচ তুমি এভাবে নিজেকে শেষ করে দিচ্ছো কেন অভি?
-ছাড়ো তো ওসব কথা। এখন বলো কেমন আছো নীলা? কফি খাবে?
-তুমি একটু বসো, আমি বানিয়ে আনছি।
-না না, তুমি বসো। আমি বানাই।
-বানাবে? তাইলে বানাও। রান্না ঘরে সবই আছে। সামনেই আছে।
নীলা রান্না ঘরে ঢুকে দুই কাপ কফি বানায়। অভি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। অভির ঘরে এসে নীলার খুবই খারাপ লাগে। অভিকে এই ভাবে দেখবে নীলা কখনোই ভাবেনি। নীলা ভালো করেই জানে অভি কেন এমন হয়ে গেছে।
যে অভি একদিন দামি দামি পারফিউম ছাড়া ঘর থেকে বাইরে যেত না। কখনো একটি শার্ট দুই দিনের বেশী পরতে দেখেনি। আর আজ সেই অভির কত পরিবর্তন। এর জন্য একমাত্র নীলা দায়ী। সে কোন ভাবেই নিজেকে ক্ষমা করতে পারে না। কফি বানাতে বানাতে নীলার দু'চোখ ভিজে উঠে।
-তুমি কি কাঁদছো নীলা?
-কৈ? না তো? চোখটা কেমন ঝাপসা হয়ে গেছে অভি।
-অভি
-হুম
-আমাকে ক্ষমা করো অভি।
-ধুর পাগলী, ক্ষমা কিসের? কপালে নাই তাই হয়নি। আমি তো বেশ আছি।
-সে তো দেখতেই পাচ্ছি তুমি কেমন আছো। এখন মনে হয় নয় বছর আগে কেন তোমার কথা শুনলাম না? কেন আমরা পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলাম না? কেন একটি আকাশ দুইটি ভাগ হয়ে গেলো?
-থাক না নীলা সে সব কথা। এতে আরও কষ্ট বাড়বে। আমি অনেক ভালো আছি নীলা। অনেক ভালো আছি। অনেক...
নীলার বুক ফেটে কান্না আসে, সে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। বুকের ভেতরে জমানো কান্না গুলি উপচে বেড়িয়ে আসে। অভি সান্তনা দেয়। নীলা তার কান্না থামিয়ে রাখতে পারে না। অভিরও চোখ ভিজে উঠে।
পরদিন নীলা আবার আসে। সাথে করে নিয়ে আসে। নতুন দুই সেট বিছানার চাদর বালিশ কাঁথা, অভির জন্য শার্ট আরও অনেক টুকি টাকি। নিজে হাতে অভির শোবার ঘরটা পরিষ্কার করে।
বিছানায় নতুন চাদর বিছায়। নতুন বালিশ। নতুন মশারী একটা নতুন নক্সি কাঁথা। আলনা, পড়ার টেবিল, ফ্লোর, সহ সব কিছু নিজে হাতে পরিষ্কার পরিপাটি করে সাজায় নীলা।
অভি শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখে। পাসের রুমটা পরিষ্কার করতে করতে নীলা অবাক হয়ে যায়। বুক সেলফের মাঝখানে একটা কাঁচের শোপিস রাখা।
শোপিসের মধ্যে শুকনা ফুলের পাঁপড়ি। নীলার বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, এগুলি নয় দশ বছর আগে অভিকে গিফট করা তারই দেয়া ফুলের শুকনা পাঁপড়ি।
নীলার বুকটা আবার ভারী হয়ে উঠে। অভির ভালোবাসার কাছে নীলা হেরে যায়।
প্রায় প্রতিদিনই নীলা একবার করে অভিকে দেখতে আসে। অভির দুই রুমের ফ্লাটটা একটু একটু করে সাজিয়ে তুলে। প্রতিদিনই কিছু না কিছু কিনে আনে। বাইরে খুব বৃষ্টি হয়।
-নীলা
-হুম
-বাইরে খুব বৃষ্টি। তুমি বৃষ্টিতে খিচুড়ি খেতে খুব পছন্দ করতে। আমি আজ তোমার জন্য খিচুড়ি রান্না করেছি। সাথে ইলিশ মাছ ভাজা, আর সালাদ। ইলিশ মাছ ভাজা তোমার খুবই প্রিয়।
-আমি যে আজ আসবো তুমি কি করে জানলে?
-কাল তুমি আসোনি। নিশ্চয়ই কোন কাজে আটকিয়ে গেছিলে। আজ সকাল থেকেই আমার মন বলছিলো, আজ তুমি আসবেই। তাই তোমার জন্য খিচুড়ি রান্না করেছি।
-আর কত কাঁদাবে তুমি আমাকে?
অভির ভালোবাসায় নীলার চোখ আবার ভারী হয়ে উঠে।
-আই লাভ ইউ অভি। আই লাভ ইউ। আমি যে আর পারছি না অভি। তোমাকে দেখার পর থেকে কিছুতেই নিজেকে শান্ত রাখতে পারছি না। বাবা মাকে খুশী করতে, কেন সেদিন তাদের পছন্দ মত ছেলেকে বিয়ে করলাম? কেন তোমাকে দূরে ঠেলে দিলাম? আমাকে মাফ করো অভি। আমি যে আর থাকতে পাড়ছি না। খুব কষ্ট হচ্ছে... খুবই কষ্ট অভি। খুউব...
নীলা অভিকে প্রচণ্ড রকম জড়িয়ে ধরে বুকে পিঠে হাত ভুলায় আর কাঁদতে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর নীলার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠে। সে বড় বড় নিঃশ্বাস নেয়। অভি নীলা কে ছাড়ানোর প্রানপন চেষ্টা করে
-নীলা ছাড়ো, নীলা, প্লিজ ছাড়ো।
-কেন? কেন ছাড়বো অভি? আমি তোমাকে ছাড়বো না। আমি তোমার শরীরের গন্ধ নিয়ে যেতে চাই।
-প্লিজ ছাড়ো বলছি।
-অভি জোর করে নীলাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়। নীলা অভির খাটে বসে কান্না করে।
-অভি, দুই দিন পর তো আমি চলেই যাবো। আবার কবে দেখা হয় না হয়। এই টুকু বিষয় না হয় স্মৃতি হয়ে থাক। প্লিজ অভি। প্লিজ, অন্তত একটি বারের জন্য তুমি তোমাকে আমাকে দাও। একটি বারের জন্য তুমি আমাকে নাও অভি... প্লিজ...
-নীলা
-হুম
-তোমার মনে আছে? আমারা যখন ডেটিং করতাম। এমনও দিন গেছে, ভাবিদের বাসায়, বন্ধুদের খালি বাসায় সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমার একসাথে থাকতাম।
-তুমি বলতে পাড়বে নীলা? কোন দিন ভালোবাসার দাবীতে তোমার শরীর আমি ছুঁয়ে দেখেছি?
-শুধু একটি বার। মাত্র একবার তোমার এক জন্মদিনে আমি তোমাকে কিস খেয়েছিলাম। এর বেশী তো কিছুই না। তোমার হাতের আঙ্গুলের বেশী আমি কখনোই ধরিনি। কারন আমি চাইনি বিয়ের আগে আমার ভালবাসাকে অপবিত্র করতে। আর আজ এতো বছর পর কেন তা হবে?
-কেন হবে না অভি? আমরা দু জন দু জনকে খুব ভালোবাসি।
-তখনো আমরা দু জন দু জনকে খুব ভালবাসতাম। তখন হয়নি কারন, আমি তোমার শরীরকে না তোমার মনকে ভালোবেসেছিলাম। তাই শরীরটা বিয়ের পরের জন্য রেখে দিয়েছিলাম, ভালবাসাটাকে পবিত্র রাখার জন্য।
-আর এখন তুমি অন্যের আকাশ। হয়তো তার পুরো আকাশ জুড়ে তুমি। আর আমার কাছে তুমি তার আমানত। আমি কি করে অন্যের আমানত ছোঁবো বলো নীলা?
-আমি অতো কিছু বুঝি না। আমি কোন কিছু শুনতে চাইনা। আমি শুধু তোমাকে চাই অভি। প্লিজ অভি, প্লিজ। আমাকে আর কাঁদিও না। এই টুকু স্মৃতি নিয়ে আমাকে যেতে দাও।
-তা হয় না নীলা। আমাকে মাফ করো। আমি আমার পবিত্র ভালোবাসার কাছে হেরে যেতে চাই না।
-আমি যে তোমার ভালোবাসার কাছে বার বার হেরে যাচ্ছি।
-কে বলেছে তুমি হেরে গেছো নীলা? তোমার বাইরের আকাশে হয়তো তোমার সাজানো সংসার। কিন্তু তোমার ভিতরের আকাশে আমিই তো আছি।
-আর তোমার ভিতর বাহির পুরো আকাশ জুড়ে যে আমি।
-থাক না ওসব কথা। ওসব ভাবলে আরও কষ্ট পাবে। তোমার ফ্লাইট কবে?
-পরশুদিন সকাল এগারোটায়।
-একাই যাচ্ছো?
-হুম
-আমি যদি তোমাকে টেক্সাস নিতে চেষ্টা করি তুমি কি যাবে অভি।
-না নীলা। আমার দেশ আমার ঘর, আর আমার এই আকাশটা ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে ভালো লাগে না।
-অভি
-হুম
-হয়তো তোমার সাথে আমার আর দেখা নাও হতে পারে। আবার কবে আসি, না আসি জানি না। আমাকে মাফ করে দিয়ো অভি। যে ভাবে তোমাকে দেখে গেলাম, আমি বাকি জীবনটা আর শান্তিতে থাকতে পারবো না।
-ছিঃ নীলা। এমন করে বলো না। আমি বললাম তো, আমি অনেক ভালো আছি। বেশ ভালো। আমাকে নিয়ে তুমি কোন চিন্তা করো না। তোমাকে ভালো থাকতেই হবে। তোমার বাচ্চাদের জন্য।
-ঠিক মত খাওয়া দাওয়া করবে। শরীরের দিকে নজর দিবে।
অভির চোখ ভারী হয়ে উঠে। নীলার চোখ দিয়ে পানি পড়তেই থাকে। ভেজা চোখ নিয়েই সে বেড়িয়ে যায়। যাওয়ার আগে অভির দুই পা ছুঁয়ে নীলা সালাম করে।
জিয়া আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর, ঢাকা, বাংলাদেশ।
নীলা ইমিগ্রেশনের কাজ সারে। নীলাকে এয়ারপোর্টে তার বড় ভাই ভাবী এগিয়ে দেয়। তারা কাঁচের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে।
নীলা ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ করে ভিতরে ঢুকেই ভাইদের হাত ইশারা করে টা টা দিতে গিয়ে দেখে, ভাইদের পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে অভি।
নীলা একই ভাবে অভির দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাই ভাবী ভাবে নীলা তাদের দেখছে। নীলার দৃষ্টি শুধু অভির দিকে।
নীলার খুব ইচ্ছা করে ছুটে এসে অভির বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে। নীলা কিছুই করতে পারে না। অভি সরে যায়।
অভি বাসায় আসার সাথে সাথে পাসের ফ্লাটের ভাবী একটা লাল রেপিং পেপারে মোড়ক করা বক্স অভির হাতে দেয়,
-এটা আপনার একজন ভক্ত আপনাকে দিতে বলেছেন। একটা মেয়ে। খুবই সুন্দর দেখতে। বিদেশীদের মত। তিনি খুব ভোরে আসেন। আপনি ঘুমাচ্ছেন ভেবে আমরা আপনাকে ডাকিনি।
অভি বক্সটা নিয়ে ঘরে ঢুকে। বিছানায় বসে বক্সটা খুলে। প্রথমেই। একটা কার্ড। দুটো হোগো ব্র্যান্ডের দামি পারফিউম। একটা আই ফোন ফাইভ। আর একটা ছোট্ট লাল বক্স। বক্সে একটা হীরার আংটি।
অভি কার্ডটা খুলে। তাতে লেখা থাকে।
-খুব ইচ্ছা করে, সব কিছু উলট পালট করে দুটো আকাশ এক সাথে জোরা দেই।
অভি গিফট গুলির দিকে তাকিয়ে থাকে। বিছানার যেখানটায় কাল নীলা বসেছিলো, সেখানে হাত ভুলায়। সে একটা সিগারেট ধরায়। উঠে গিয়ে বারান্দায় যায়। বাইরে খুব বৃষ্টি।
অভির চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে পানি পড়ে।
সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে...

সতত অবরুদ্ধ আমি
- জোহরা উম্মে হাসান

তোমাকে ছেঁড়ে আর কোথাও যাব না বলে, অক্লেশ বলে
বেড়াচ্ছি নানা কথা । অকুণ্ঠ সত্য মিথ্যা । কেউ তা বুঝুক
না বুঝুক , অগোচর অতীন্দ্রিয় বোঝে ঠিকই ! মন ভাবে
মনে মনে , অধরা আজীবন সে , তবুও অসহিষ্ণ হৃদয়
কেন বলে বারে বারে প্রাঞ্জল মিথ্যে কথা ?
অনুরঞ্জিত কোন পথ নেই খোলা । অন্ততঃকাল তোমার কাছে
দিব্যি দিয়েছে যেন সূর্য তারা ! পা বাড়ালেই
পথ , পথের শেষে নদী জল । হাত বাড়ালেই বন , বনের ভেতর
গভীর বন , লতা গুল্ম ফুল ফল ভরা!
পাখা মেললেই আকাশ, নীল নীল
মেঘ , ঘন কালো , রূপোলী ফিতে বয়ে যাওয়া তেপান্তর
এর মাঝেই তুমি , জনান্তিক কেবল তোমায় চাওয়া!
লোকে বলুক নানা কথা , বিম্বিত হোক তা নিস্ফল প্রবোধে
তবুও সতত অবরুদ্ধ আমি তোমারই সুবাস সকাশে !

তবুও তুমি আছ
- রুনু সিদ্দিক

গ্রীষ্মের প্রচন্ড দাহনে
কালবৈশাখীর তান্ডব ঝড়ে
সবকিছু ওলট পালট
তবুও তুমি আছ !

ঘন ঘোর বর্ষায়
ডুবে আছে সবকিছু
ঘরের মেঝেতে অতিথি জল
তবুও তুমি আছ !

শরতের নীল আকাশে
সাদা মেঘের ভেলা ভাসে
উড়িয়ে দেই স্বপ্নের ঘুড়ি !
তবুও তুমি আছ !

হেমন্তের সতেজ আগমনে
কাটাই স্বজন বিহনে
স্বপনে ও জাগরনে
তবুও তুমি আছ !

তীব্র শীতের কোলে
উষ্ণতার জাগরনে
কেউ নেই কাছাকাছি
তবুও তুমি আছ !

বসন্তের পত্র পল্লব
ঝরে সাজে নতুন পাতা
ফুলে ফুলে সাজে ডালি
তবুও তুমি আছ !

অপরাজিত প্রেম
- অনন্যা চক্রবর্তী

এক বিচ্ছেদ থেকে পরের বিচ্ছেদে
যেতে যেতে...
বিশ্বাস করো...
মেঘ আসবেই । পথ ঝাপসা হবেই বৃষ্টিতে
পা পিছলে তলিয়ে যাবে,
তাই ভাবি...যতক্ষন পারা যায়...
আঙ্গুলটাকে শক্ত করে ধরে রাখি
ঠিক জয় বাবুর মতন...

ঝড়ের মতন ধাম করে পড়ল প্রেমটা
এখন তাকে কোথায় বসাই
এক ধারে একটা তুচ্ছ অতীত, আর অন্য ধারে আজে বাজে কবিতা
সবার ওপর রাখা সংবিধান এর বইটা ।

কি করি...
সে আমার পা টেনে ধরে,
সামাজিক মাধ্যমে প্রস্তুত জবাব দেয়, কত কি করে !
গন্ধ মাখা চাদরটাকে জড়িয়ে নিয়ে শনি, রবি, সোম
কিংবা বহু যুগ ধরে...

ইচ্ছে করে নদীর ধারের পাড়ে গিয়ে
হাত দুটো জড়িয়ে ধরে, কেবল বসে থাকি
এরপর জ্যোৎস্নার মায়াবী আলোয় ঢেউ দিয়ে মুক্তোর মালা বানাই
কোথায় রাখি প্রেমটা...!
এইখানেই থাক - আমার জয়ের ভরপুর কবিতায়, অন্তত বিচ্ছেদ হবে
সব ভাঙ্গা প্রেম...
অপরাজিত ।

যুগান্তরি কবি
- অনন্যা চক্রবর্তী

বিশাল ভূমি,
বিশাল আকাশ, আমার
জায়গা কোথায় !
আমার আমি, রুদ্ধ আমি পার্থিব
নানান প্রথায় ।
চাইনি হতে যুগান্তরি কবি !
তবু লক্ষ্য আমায় এনে দিল এমন করি...!
আমি তো রিক্ত, শূন্য, দেবার কিছু নাই,
আজো তাই স্বপ্নেও ভয় পাই ।
আমি তো স্বপ্ন খেকো, স্বপ্ন খাই, খেয়ে করি বিলীন,
আমার স্বপ্ন যা যা ছিল
আজ সবই মলিন ।
তবু যখনই কেউ বলে লেখো একখানা ঐতিহাসিক কবিতা
আমি স্ট্রেট কাট বলে দি...
দেখা হলেই বলে দেবো
তোমাকে ভালবাসি,
সংগ্রহে এই ছবিটা ।

ভাঙছো
- প্রণব বসুরায়

ও ভাঙছো—তবে ভাঙো, যেমন জলপ্রপাত
অশ্রু আমার লটকে আছে কাচের কিনারায়
রাত বহে যাক চতুর্দোলায়, আমার তাতে কী
সর্বনাশের ক্লান্ত রতির ঘোমটা টেনে দি

এই তো আমার সরলপাঠ, তোমার ধারাপাত
খেলতে আসুন, করুন দেখি সহজ কিস্তিমাত !

মোমদান আগুন জ্বালাও
- প্রণব বসুরায়

অকস্মাৎ ধূলিঝড়ে ঢেকে যায় মুখ, ওড়ে চুল
এলোমেলো হ’য়ে যায় সকল বাঁধন,
ভুলে যাও রন্ধন প্রণালী, কাকে দেবে খেতে...

ধান কাটা হ’লো বুঝি মাঠে ?
নবান্নের করো আয়োজন—

শীত রাতে উষ্ণতা চাই ব’লে মোমদানে আগুন জ্বালাও...।

তুমি কাহার জন
- জোহরা উম্মে হাসান

প্রথম বাড়ী , দ্বিতীয় বাড়ী , বাড়ী বাড়ী করে
অবশেষে পাল ভিরালেম নিতুই নদীর কূলে !
চারপাশে তার কেবল বালি , দূরে বৃন্দাবন
মাছরাঙ্গারা উড়ে বেড়ায় চিলের উচাটন !
হাতের কাছে জলের নদী , জলের উপবন
ঢেউ গুনি আর শব্দ শুনি কোথায় সাগর মন !
পায়ের তলায় জলের ছোঁয়া , ঢেউ জাগে না
অবশ হিয়া , কেবল শুধুই মনে পড়ে হারানো সেই ক্ষণ !
আমার প্রথম বাড়ী , দ্বিতীয় বাড়ী খিলখিলিয়ে হাসে
আজকে হেথায় বাস করে সে যারে ভালবাসে
আমি কোথায়! বসি দ্বারে , খুঁজি আমায় বারে বারে
কেউ বলে না তুমি কে গো তুমি কাহার জন !

একটা ভুতের গল্প
- রাজীব চৌধুরী


একটা ভুতের গল্প লেখার জন্য এসে শেষমেষ জ্বীনের পাল্লায় পড়ব কে ভেবেছিল?
মুল ঘটনা শোনার আগে বলে নিই- আমি একজন পাতি লেখক।
পাতি লেখক কি জানেন তো?
যারা লেখে আর টাকা পায়- তবে তা যৎসামান্য। আমি সেই দলে। গতমাসে তিনটা গল্প লিখে ইত্তেফাক থেকে দুশো টাকা পেয়েছি। তাতে আমার মাসের বেনসনের খরচা উঠেনাই। তবে লেখা ছাপানো বাবদ বখড়া হিসেবে ঠিকই ১২০০ টাকা বেড়িয়ে গেছে বন্ধুদের খাওয়াতে।
তেমনই এক বখড়া পার্টিতে বন্ধু ফাইয়াজ বলল-
"দোস্ত তুই তো জ্বীন ভুত বিশ্বাস করিস না। কি সব প্রেমের গল্প লিখিস। চল তোকে একেবারেই ভুতের ডেরায় নিয়ে যাব..."
সাথে সাথে মুস্তাকিম বলল- "হ্যাঁ তিনি লিখবেন ভুতের গল্প? এটা কি শুনলাম? হেইয়ো- তিনি শুধু লুতুপুতু প্রেম বিনে কিছুই লিখতে পারেন না। এতে নাকি অনেক পাঠক। আরে বেটা আসল পাঠক হল ভুতের গল্পের। একটা হরর লিখেই দেখা না মামা। পারবি? আমার কাছেই আছে একহাজার একশোটা প্লট..."
" ছো- আরে যে গল্প লিখে সে যে কোন রকম গল্পই লিখতে পারে। সে ভুতের গল্প হোক আর প্রেতের গল্পই হোক..." বলল আপেল।
চুপ করেই ছিলাম। হটাত গা গরম হল। আমার কাব্য প্রতিভা নিয়ে সবার হাসি ঠাট্টা করতেই পারে। কি সব মৌরি টৌরি নিয়ে লিখি। কিন্তু গল্প নিয়ে বললেই মাথা কি ঠিক থাকে? সেই ক্লাস টেন থেকে লিখছি। আর এখন বলে কিনা...
"শোন। আমি ভুত দেখিনাই। ভুতের গল্প লিখব কিভাবে?"
"ব্যাটা- ভুত যদি দেখাই লাগত তাহলে তো ভুতের গল্প লেখাই হোতনা - হা হা হা হা" বলে একচোট হাসলো
ফাইয়াজ।
বন্ধুদের মাঝে ফাইয়াজ সবচে ভীতু। আমরা চারপাচজন মিলে আড্ডা দিই মিষ্টির দোকানে। এখানে মিষ্টি খেতে আসিনা। আসি চা খেতে। সাথে মাঝে মাঝেই বাজি ধরে মিষ্টি খাই। মিঠাই খাই। একদিন এই ফাইয়াজ ই দশটা চমচম খেয়ে বলল- সে আরো দশটা খেতে পারবে। আমি জানতাম পারবে- তবুও বাজি ধরেছিলাম। ধরে হেরেছিলাম। তাতে আমাকে ও দশটা খেতে হয়েছিল। শেষমেষ সবাই মিলে ফুর্তি করে বাসায় ফিরে আমার লুজ মোশন! সেই ফাইয়াজ আজকে ভুতের কথা বলছে? ব্যাপারটা কি?
“দোস্ত আমি বাজি লাগলাম। ভুত বলে কিছু নাই...” বললাম আমি।
“ একশো টাকা...” বলল আপেল।
“ছোঃ এটা কোন কথা? পুরো একটা বই বাজি। মানে ভুত থাকলে ও বই বের করবে। মানে একটা উপন্যাস লিখবে। আর না থাকলে সে লেখালেখিই ছেড়ে দেবে...” বলল ফাইয়াজ।
এবার মাথায় বাজ। যদি ভুত প্রমাণিত হয় তাও আমি বাঁশ। না থাকলে বড় বাঁশ। এটা কোন কথা?
কিন্তু এখন কি করি?
“শোন। চল পুরান ঢাকায়। আমার এক বন্ধুর বাবার একটা মিষ্টির দোকান আছে। আজকে রাতেই চল। ওখানে বসে তোদের ভুত দেখাব” বলল ফাইয়াজ।
যেই কথা সেই কাজ।
আমরা পাঁচজন হেঁটে রওনা দিয়েছি রিকশা যোগে। নাজিরাবাজার এসে নেমে প্রথমেই ভরপেট বিরানী খেয়ে নিলাম। অবশ্যই বন্ধু ফাইয়াজের পকেট ফাঁকা করে।
রাত বারোটার আগেই ওখান থেকে সবাই কেটে পড়েছে।
মিষ্টির দোকান সারারাত খোলা থাকে। খুবই আজব। যায়গাটা নাজিরাবাজার থেকে অনেক ভেতরে। পাশেই বুড়িগঙ্গার একটা শাখা বেরিয়েছে। একারনে একটা মেছো গন্ধে যায়গাটা মৌ মৌ করছে। শব্দটা এখানে এসে মাছৌ মাছৌ হয়ে যাবে। কারন এই মাছের গন্ধ ওয়ালা পানি আমি অপছন্দ করি। যদিও ফাইয়াজ ঢুলছে। ও খুব ঘুমকাতুড়ে। এতোরাত পর্যন্ত জেগে থাকা ওর জন্য অনেক কষ্টকর। যদিও এর মাঝে দোকানে ভুত প্রেত কেউ এলে দেখার জন্য আমাকেই জেগে থাকতে হবে। প্রমান সাক্ষ্য জোগাড় করার জন্য চোখের দেখা আর অনুভুতিই দরকার।
কিন্তু ভুত কি দেখা যায়?
এখানেই একজন দোকানি বসে আছে। মানে দোকানের ম্যানেজার টেবিলে মাথা ঠুকিয়ে ঘুমাচ্ছে। প্রতিদিন ওর কাজ হল এভাবে বসে থাকা। যেকোনদিন যে কোন সময় ওরা আসে। দোকানি ওদের নাম মুখে নেয় না। তেনাদের আসার সময় হলেই কেবল সে জেগে ওঠে। তারপর চলে গেলে ক্যাশ ভাঁজ করে চলে যায় নিজের বাসায়।কিন্তু আজকে তেনাদের কোন খবর নাই। দোকানি লোকটাও জানি ক্যামন। আমাদের সাথে কথাই বলেনা। ফাইয়াজকে বার বার জিজ্ঞাসা করলাম সে ঠিক যায়গায় এসেছে কিনা। কিন্তু সে একেবারেই শিওর যে আমরা ঠিক দোকানে বসে আছি। কিন্তু ব্যাটা এখন আমাকে ফেলে ঘুমুচ্ছে।
শনশন বাতাসের শব্দ কানে আসছে। একটা ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকছে। শিন শিন শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছে। একটা কাক দূরে ডেকে উঠল। অনেক দূরে দুটো কুকুর ঘেউ ঘেউ করছে। হয়ত বউ নিয়ে ঝামেলা। নতুবা এলাকা ভাগাভাগি নিয়ে ক্যাচাল। কে জানে...আমার এসব শব্দ শুনতেই ভালো লাগে। শুধু শুধু এর মাঝে ভুত ব্যাটা ঢুকে গেলে ক্যামন একটা বিচ্ছিরি তার ছেড়া ব্যাপার ঘটবে। এর চে এসময় রোমান্টিক কবিতা লেখা অতি উত্তম প্রস্তাব।
বাতাসের একটা আজব গন্ধ আছে। এই ছোট্ট হোটেলের মাঝে আরো বিচিত্র কিছু গন্ধ বিরাজমান। মিষ্টির একটা গন্ধ আছে। পাশের টেবিল থেকে চায়ের গন্ধ আসছে। আরেকটা গন্ধ আসছে। অনেক মিষ্টি একটা গন্ধ। একটা ফুলের গন্ধ। কিন্তু কি ফুলের গন্ধ? মাথায় আসছেনা। খুব পরিচিত...ঐ যে কোণা কোণা ফুলের পাপড়িগুলো... ঐ যে লাল... ঐ... ঘুম আসছে খুব। ভয়ানক ঘুম...
এভাবে কতক্ষন বসে থাকা যায়?
দেড়টা বাজে।
কেউ আসেনি। আমি একা জেগে জেগে হয়রান হয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম কোনসময় টের পেলাম না।
সকালবেলা ঘুম ভেঙ্গে গেল কাকের কা কা ডাকে। আমি চোখে মেলে তাকিয়েই টের পেলাম আমি শুয়ে আছি। এবং আমার ওপর কিছু নেই।ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছি। কারন আমার পাশে ফাইয়াজ বসে আছে। ধানক্ষেতের মাঝে ... আমি নিজেও ধানক্ষেতের মাঝে... কিভাবে এখানে এলাম? কিভাবে রাত কাটতেই এখানে এসে পড়েছি?... কিভাবে আমাদের এখানে ফেলে দিল দোকানদার?...
কোন হদিশ না পেয়ে এই গল্পটা লিখতে বসলাম। কি করব বলুন...মাথায় হাবিজাবি ছাইপাশ লুতুপুতু কোন গল্পই আসছেনা... কি যে করি...

মনে পড়ে রুবি রায়
- জোহরা উম্মে হাসান


ঠিক তেমনি একটা বনলতা সেন আদল বসানো মুখ । তেমনি ঘন একরাশ কালো চুল পিঠ অবধি ছড়ানো । দু চোখের তারায় একটা দ্যুতি । একটা মৃদু আহ্বান ।
এমন একটা মুখকে দেখেছিল সে অনেক আগে । অনেক অনেক দিন আগে । কতই বা বয়স । চৌদ্দ বা পনের । হাফ ছেড়ে সবে ফুল প্যান্ট ধরার বয়স । বাবার মোটর বাইকের পেছনে বসে বলাই ডাক্তার বাবুর ডিসপেনসারি পাড় হচ্ছিল সে । পথের মাঝে তাঁর সঙ্গে দেখা ।
খোলা রিকশায় সে একা । পিঠের চার পাশে কৃষ্ণ কালো একতাল ভ্রমর কুন্তল ছড়ানো । গভীর একটা দীপ্তিময় মুখমণ্ডল থেকে রাশি রাশি আলো যেন ঝরে পড়ছে চারপাশটায় । তাঁর পরনে সবুজ রং ফিকে লাল পাড় ঢাকাই শাড়ী । এক হাতে ঘন কাঁচ বসানো বটুয়া । অন্য হাতে একগুচ্ছ লাল গোলাপ ।
ট্র্যাফিক সিগন্যালে অনেক অনেকক্ষণ থামল বাবার বাইক । সে সাথে বনলতা সেনের রিক্সা গাড়ী । চারপাশে ফেরি ওয়ালা , সবজী বিক্রেতা , মুদীর দোকান , ফুল ওয়ালি । চারপাশে হরেক রকম মানুষ , হরেক রকম গাড়ী । এ দেখে ওকে , ও আবার তাকে । কেউ কেউ গালাগালি করে রাস্তার ট্র্যাফিক কে । বাবা চুপচাপ , বাইকের হাতল ধরে । আর অমিত , তাঁর দু চোখ কেবলই বনলতা সেনকে ঘিরে ।
বনলতার মুখে রোদের ঝাপটা । দু চোখে আলোর আঁচড় । তবুও সে ঠায় বসে রিক্সায় । রিরক্তি নেই । নেই এদিক ওদিক চোখ মেলা । সাধের গোলাপ কুঁড়ি গুলো যাচ্ছে মিইয়ে । সে কিন্তু না । তেমনি জ্বলজ্বলে । আর উজ্জ্বল ।
বাবা একবার আড় চোখে তাকাল তাঁর দিকে । বাবার কি দোষ । বাবা তো পুরুষ মানুষ । ‘মুনিগন ধ্মান ভাঙ্গি দেয় তব পদে তপস্যার ----‘ বাবা তো কোন ছাড় ।
দেরী হচ্ছে তো হচ্ছেই । অনেক দেরী । রেলের সিগন্যাল পড়ল । আরও আধ ঘণ্টা । বা কম করে হলেও মিনিট বিশেক। সবাই চেয়ে আছে তার দিকে । কে যেন টিপ্পুনি কেটে বলল , অপ্সরী । সে ঠিক ঠিক শুনতে পেল সে কথা । বিরক্তিও নেই তবুও । নেই আনন্দ , উচ্ছাস। নেই কোন উৎকণ্ঠা। সে তেমনি ঠায় বসে আছে ।
অমিতের ভীষণ ইচ্ছে করছিল তাঁর আর একটু কাছে যেতে । আর একটু । আর একটু । বাবা বললেন, এই এত উসখুস করছিস ক্যান। রাস্তায় বেড়োলে এরকম হবেই হবে । অমিত কিছু বল্লনা । একটু সময় নষ্ট করা মানেই নক্ষত্র পথের মূল কেন্দ্রবিন্দু থেকে অনেক অনেক পিছিয়ে আসা । পিছিয়ে আসা । সে কি দেখেছে তাঁকে ?
হায়রে অর্বাচীন বালক । তুমি কোথায় । কোথায় সে । ত্রিশ ছুঁইছুঁই একটা প্রতিমা মুখ কি চেয়ে দেখবে তোমায় । দেখবে । দেখলেই বা কিভাবে ? তুমি তাঁর কথা ভাব । ভাবতেই পার । ভাশাভাশা ঊঠতি যৌবনে ভাল লাগে সব নারীকেই । দেখতে ইচ্ছে করে কলম্বাসের চোখ মেলে । ছুঁতে ইচ্ছে করে ভাল লাগার মন মেলে । বনলতা সেন ঠায় বসে , তাঁর মতো । তারই মতো কোরে ।
একটু আগে তিনি তাঁর গভীর কালো দুচোখ ঢেকে দিয়েছেন রোদ চশমায় । অমিতের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল । খুউব । আর কথা হবে না চোখে চোখে ।
বাবা বললেন , ঐ যে রিক্সায় সুন্দর মহিলাটি দেখছিস , উনি এখানকার বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা । প্রধান শিক্ষিকা ! মাঝে মধ্যে বাবা বেশ কায়দা করে খাঁটি বাংলায় ঘুরিয়ে পেছিয়ে কথা বলতে ভালবাসেন । আজও বললেন , বলাই যেন শেষ হোচ্ছে না তার । জানিস , খুব গুনী আর খুব ডাঁটের মহিলা । ডাঁট মানে স্মার্ট । বাবা আর একটু সুন্দর শব্দ ব্যবহার করতেই তো পারতেন ! করলেন না ।
দেখ, দেখে মনে হচ্ছে না কত কম বয়সী , বয়স আছে । তোর মার মতো না হোক তার বেশ কাছাকাছি । আহা , কোথায় মা আর কোথায় সেই সুচিত্রা সেন ! বাবার বোধ হয় মাথাটা দিন দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে । অমিত মনে মনে বলল । এ মুহূর্তে বাবা বোধহয় নিজেকে উত্তম কুমার ভাবচেন । কি জানি ? হতেও পারে । বাবার চোখেও সানগ্লাস ।
হু হু ভুস ভুস করে কড়া সিগন্যাল বাজিয়ে রেল গাড়িটা চলে গেল । এগোচ্ছে গাড়ী, বাই সাইকেল, মোটর বাইক , রিক্স । এগোচ্ছে মানুষ । মহিলা , পুরুষ , নারী , ছেলেমেয়ের দল । এগোচ্ছে ঝুড়ি মাথে লাউয়ের সারি , মুলো , কুমড়ো , আলু , পটল । বিয়ের সাজানো একটা গাড়ী । হৈ হৈ মানুষ । এগোচ্ছে সবাই । অমিত কেবল পিছিয়ে যাচ্ছে । সে চলে যাচ্ছে । সামনে টিং টিং রিক্সাটা সারা পথে গোলাপ সুবাস ছড়িয়ে একটু পড়েই ঢুকে পড়বে মস্ত লোহার গেট স্কুল দরজায় । দরজাটা সটান খুলে দেবে নাটোর বালিকা বিদ্যালয়ের দারোয়ান জামাল মিয়া । পুরো শরীরটা দু ভাজ করে , বলবে , আদাব আপা , সালাম ।
বনলতা সেন গোলাপ গুচ্ছ তাঁর হাতে দিয়ে বলবেন , ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখতে । তারপর এ্যাসেম্লী । বারান্দার বুক ঘেঁষে দাঁড়ানো সার সার ক্লাসগুলো ভিজিট । সব ক্লাসে ক্লাস টিচার আছে কি না, কে ছুটিতে । তাঁর পক্ষে কে ডিউটি করেছে । রুমে ফিরে গার্ডিয়ান মিট । কত কথা বলা , শোনা । রেজাল্ট শীট নিয়ে আলোচনা । এসব আরও কত কি ।
আজোও অমিতের মন ঘিরে আছে সেই কলাবতী মুখ । সেই গুচ্ছ লাল গোলাপ । রোদ চশমা । রিক্সার হুডে ঠেকানো মাথা । অনেক অনেকক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা সেদিন চৌরাস্তার মোড়ের সব সৃতি সুধা । এসব সে ভুলবে কেমন করে । ভালবাসার একটা ক্ষণ বুকে ধরে কাটানো যায় সারাজীবন । সারা কাল ।
আবার অনেক অনেক কাল বাদে সেই চৌরাস্তার মোড় । সেই প্রতিমা মুখ । সেই ঘন কুন্তল । সেই দেখা না দেখা দৃষ্টি । বাবা নেই সাথে । এখন একাই চলতে পারে অমিত । লেখা পড়ার পাঠ শেষ । ভাল , বেশ ভাল একটা সরকারি চাকরিও পেয়ে গেছে সে ।
আজ রেলের যাবার তাড়া ছিল না । একটু বিরতি । তারপর দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতেই চলে গেল সে । অমিত ফিরে এল বাড়িতে।
মা একটা ছবি মেলে দেখালেন । পাত্রীর ছবি । যে মেয়েটির সাথে অমিতের বিয়ের কথা চলছে । বললেন , খুব সুন্দরী মেয়ে । ওকে দেখলেই তোর মনে ধরবেই ধরবে ।
তাঁকে আবার নুতুন করে এভাবে দেখতে হবে স্বপনেও ভাবে নি অমিত । একটু আগেই তো এ মেয়েটির সাথে পথে দেখা হল । বড় দেখা , বড় চেনা সে জন । তাঁকে ভোলে কি করে অমিত । সেই ক্লাস নাইনের প্রথম ভালবাসা ।
বাবা লুকোচুরি হাসি হেসে বললেন , অমিতের তো একে না চেনার কথা নয় । ও তো চেনে একে অনেক কাল থেকে। রুবী রায় !
কিভাবে ? মা প্রচণ্ড উৎসুক ।
বাবা বললেন , কেন দেখনি ওর পড়ার টেবিলে । খাতার পাতায় । কবিতায় । সেই রুবী রায় ! বাবা তাহলে কি সব জানে । জানে কি করে । নির্ঘাত বাবা লুকিয়ে লুকিয়ে পড়তেন বুঝি অমিতের সে সব ছেলে বেলার প্রেম আকুতি । আমি খাতার পাতায় এঁকেছিলেম সেই যে তোমার নাম গো । সেদিন থেকে তুমি হলে , হলে আমার সই গো । কিন্তু এতকাল বাদে কেমন করে , কেমন করে সে আগের মতই আছে , তেমনি সুন্দর । তেমনি কাঁপাকাঁপা দু চোখ , তেমনি চাওয়া !
বাবা মৃদু কেশে এক লহমায় বলে ফেললেন , বোকা ছেলে, তোর সেই রুবী রায়ের মেয়ে রে !
রুবী রায়ের মেয়ে ! অমিত তো রুবী রায়কে চেয়েছিল । আজও চায় । কিন্তু রুবী রায়ের মেয়েকে তো নয় ! এখন কি করবে সে !!

সতীন
- জোহরা উম্মে হাসান


এক
এতদিন এ বিষয়টা কেবল রাজীবই জানতো । অন্য কেউ নয় । কিন্তু এখন আর তা হবার নয় । এবার নির্ঘাত ধরা খেয়েছে সে চামেলী নামের টগবগে মেয়েটির সূক্ষ্ম বুদ্ধির জ্বালে। চা বাংলোর রাজীব মানে ছোট বাবুর বাসায় রান্না বান্নার কাজ করতো চামেলী । প্রায় প্রতিদিনই বাবুর বাড়ীতে রান্নার কাজ করার সময় সে তাঁর পিচ্চি ভাইটাকে সাথে কোরে আনতো । আবার কোনদিন একা ! চা বাগানের মেয়ে সে। সাপখোপ দেখেই ভয় ডর লাগতো না তাঁর আর মানুষ তো কোন ছাড় । কিন্তু মানুষও যে অনেক সময় হিংস্র প্রাণী পশুদের চেয়ে ভয়ঙ্কর হয় , সেই বেড়ে ওঠা বয়সে জানতো না সে।
মা মরা মেয়ে ,ঘরে সৎ মা কেইবা শিখাবে এতশত । নিজের মা বেঁচে থাকলে হয়তো বা সে- যুবতী বয়সের চামেলীকে চা বাবুদের ঘরে রান্না বান্নার কাজে পাঠাতো না । কিন্তু সৎ মা বলে কথা । সেইই চামেলীর বাবাকে বারে বারে প্ররোচিত কোরে তাঁকে বাগান বাড়ীতে বাবুর রান্নার কাজে পাঠিয়েছে । সৎ মার কাছ থেকে অনেকদিন হয় গালমন্দ খেয়ে খেয়ে রান্না বান্নার কাজটা ভালো মতেই শিখেছে সে। প্রতি মাসের শুরুতে চামেলীর সৎ মা এসে হাসতে হাসতে বাবুর কাছ থেকে মজুরীর টাকাটা নিয়ে যায় ।
চামেলী তাঁর মায়ের হাত থেকে পঞ্চাশ একশ টাকার ভাগ বসায় । বলে , আমার মজুরী আর আমাকে ন দিবি । চামেলীর গলার ধারে সৎ মা আর বেশী তেড়ীবেড়ি কোরতে পারে না ।
সৎ মা প্রায়শঃ তাকে ভয় দেখায় । বলে , ওই রকম জোয়ান মরদের ঘড়ে কাজ করিস , আশপাশের মানুষজন তো তর বাপকে এটাউটা বলে। তর অখানে কাজ বন্দ করার কথা বলি দিছে তর বাপ !
না , না মা অই কথা না কও । ছুট বাবুর মতো মানুষই হয় না । কি সোন্দর চিহারা আর কি সোন্দর তার স্বভাব ।
আসলে অনেকদিন হয় কাজ করতে করতে চামেলী তাঁর ছোট বাবু রাজীবের প্রেমে পড়ে গেছে । একদিনও তাঁকে না দেখে শান্তি পায় না সে । ছুট বাবুর টিলায় কাজ না কোরতে গেলে , তাঁকে চক্ষের দেখা হারাবে সে , নানা তা কিছুতেই হতে দিবে না চামেলী !
বাবুও তাঁকে ভালবাসে । একদিন সে না এলে লোক পাঠিয়ে খোঁজ নেয় , কি হোল তার । কোন কোন দিন শহরে গেলে , বন্দর থেকে চামেলীর জন্য নানা জাতের মিঠাই কিনে আনে । বাবু জানে চামেলী মিষ্টি খেতে খুব ভালবাসে । চামেলীর জন্য ফুলতোলা বাহারী শাড়ী চুড়ি মালা এসব আনতেও ভোলে না সে । চামেলী বাপের ভয়ে বাড়ীতে এসব নিয়ে যায় না। ছোট বাবুর ডেরায় লুকিয়ে রাখে ।
বাবু যখন তাঁকে ভালবেসে বলে , কই চামেলী এবারের কেনা শাড়ীটা তো আমাকে পরে দেখালি না , তোকে কেমন মানাচ্ছে । ভালো লাগেনি বুঝি ?
চামেলী তাঁর চিক্কন শরীরটা দুলিয়ে খিল খিল কোরে হেসে হেসে বলে , রাম রাম বাবু সেকথা জিভে আনাও পাপ । তুমার কুন জিনিস আমার না পচ্ছন্দের বাবু । তারপর পাশের ঘরে ঢুকে নিজের বাড়ী থেকে পড়ে আসা শাড়ী ব্লাঊজ খুলে বাবুর দেয়া উপহারগুলো হেসে হেসে এক এক কোরে পড়ে আর সামনের লম্বাটে আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজের কৃষ্ণ কালো সুন্দর মুখটা বারে বারে দেখে । চোখে লাগায় পুরু করে কালো কাজল । কপালে মেরুন টিপ । ইচ্ছে কোরেও কি ভেবে সিন্দুরেরও ছোঁয়া লাগায় । তারপর লজ্জায় লাল হয়ে ভীরু ভীরু পায়ে ছোট বাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়ায় !
যেদিন যেদিন ছোট বাবু তাঁকে কিছু না কিছু কিনে দিবে , সেই সেই দিন বাবু তাঁকে নির্ঘাত ভালবাসবেই জানে চামেলী । ছোট বাবুর দেহ মন উজার কোরে দেয়া ভালবাসায় সাড়া না দিয়ে পারে না সে। কোন কোন দিন বাবু তাঁকে আদর কোরে বুকে টেনে খোঁপায় কাঠাল চাপা পড়িয়ে দেয়। তারপর ভালবাসা আর ভালবাসায় উতলা কোরে দেয় তাঁর দেহ মন। চামেলী বাবুর সে ভালবাসার ডাকে সাড়া না দিয়ে কি আর পারে ?
তোর ভয় কি চামেলী , তোকে আমি বিয়ে কোরে ঘরে তুলব । এবার দেশে যেয়ে মাকে বোলবই বোলব তোর কথা । তোকে আমি কত ভালবাসি ,সে কথাই ।
চামেলী সরল মনে তাঁর ছোটবাবুর সব কথা বিশ্বাস করে । আর বাবুর ঘরের বহু হওয়ার স্বপন দেখতে দেখতে আরও নিবিড় কোরে বুকের মধ্যে তাঁকে জড়িয়ে ধরে !


দুই
চামেলী আমার বউ আসছে রে ঘরে , চামেলী শুনিয়ে শুনিয়ে রাজীব তাঁর শোবার ঘরের ওপাশ থেকে জোরে জোরে সেদিন বলি না বলি কোরে সত্য কথাটা বলেই ফেলে ।
প্রথমে চামেলী ভেবেছিল বাবু তাঁর সাথে ঠাট্টা করছে । তাঁকে মিছেমিছি ভয় দেখাচ্ছে । কিন্তু না, বাবু তাঁকে তাঁর সুন্দরী নতুন বউয়ের অনেক অনেক ছবি দেখালো । লাল বেনারসি আর জড়োয়ার মোড়া । পাশে হাসি হাসি মুখ ছোট বাবু !
চামেলীর ছবি দেখা শেষ হোলে , বাবু তাঁকে ধীর গলায় বললো , মাকে অনেক কোরে বলেছিলাম রে তোর কথা । মা কানেই তুললো না। কেবল বললো , তাই কি হয় ? তেলে আর জলে কি মেশে ?
তারপর সে চামেলীর দুহাত ধরে মিনতি মাখা সুরে বললো , তুই দুঃখ পাস না চামেলী । আমি তোর বিয়ের জন্য তোর বাবাকে অনেক টাকা দেব । তা দিয়ে তোর বাপ তোর জন্য দামী শাড়ী , গয়না কিনে দেবে । তারপর একটা জোয়ান ভালো ছেলে দেখে তোর সাথে বিয়ে দিয়ে দেবে !
আমার আবার বিয়ে ? এক ঝটকায় বাবুর হাতটা টেনে ফেলে চামেলী বলে , আমার আবার নতুন কোরে কিসের বিয়া গো বাবু ! আমার ত তুমার সাথে মনে মনে বিয়া হয়া গেছে বহুত দিন আগেই !
রাজীব প্রমাদ গোনে মনে মনে । সে বেশ ভালো করেই জানে , এই মুহূর্তটা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর । এটা সামাল দিতে পারলেই আর সব ঠিক হয়ে যাবে ।
সেদিন আর বাবুর ঘরে কোন কাজ করলো না চামেলী। বাবু না খেয়ে থাকবে । মনে মনে সেসব ভেবে তাঁর কষ্ট হোল বটে । কিন্তু একটা ভারী দুঃখ আর অভিমান বুকে সে পায়ে পায়ে বাবুকে না বলেই বাংলোটা ছেড়ে চলে এল !
পথে যেতে যেতে কেবলি মনে হোতে লাগলো তাঁর -এতই তুচ্ছ সে । আসলে বাবুর কাছে তাঁর কোন দাম নাই । সে কেবল তাঁর সুন্দর শরীরটা নিয়ে খেলেছে ! আসলে এতদিন বাবুকে বাহির থাকে সে যা ভেবে বসেছিল আদতে সে তা নয় । একটা আস্ত শয়তান ! কিন্তুক , ভগবান যাকে এত সুন্দর কোরে পাঠাইছে ভবে , সে এত শয়তান হয় কি কোরে , চামেলী ভেবে পায় না !


তিন
কিন্তু এরপর যা ঘটলো –তার জন্য কোনমতেই প্রস্তুত ছিল না রাজীব !
বেশ কয়েকদিন পর চামেলী এসে ধীর গলায় তাঁকে জানালো যে সে অন্তঃসত্ত্বা । বাবুর সন্তান তাঁর পেটে ।
কি , কি বললি , বলেই রাজীব ভয়ে ভয়ে আড় চোখে চামেলীর দিকে তাকায় । না , মিথ্যে বলার মেয়ে সে নয় । আর এ কদিনেই চলন বলন আর আচাড় আচড়নের অনেক পরিবর্তন হোয়েছে তাঁর । মেয়েটির কালো অথচ সিগ্ধ সুন্দর মুখটা জুড়ে একটা রুঢ় অবজ্ঞার ভাষা । শরীর জুড়ে সর্বনাশা ক্রোধ । কি ব্যাপার চামেলী কি তাঁকে মারতে এসেছে নাকি । ভয়ে ভয়ে চামেলীর কাছ থেকে দশ হাত পিছিয়ে যায় সে।
এখন রাজীব বেশ বুঝতেই পারে চামেলীর জ্বালে ধরা পড়েছে সে । ইচ্ছে কোরেই চামেলী যে এ জ্বালটা পাতেনি তাই বা বোলবে কে ?
চামেলী রাগ ভুলে ছোটবাবুর সুন্দর মুখটার দিকে এক পলকে চেয়ে থাকে । এবার নির্ঘাত বাবুর মন গলবে , নিজের ছিলে বুলে কথা ।
চামেলী ধরা গলায় রাজীবকে বলতে থাকে , বাবু তর বড় বিবি থাকে থাকুক । এই চামেলী তাঁর কুনদিন মন্দ চাইবে না । তুই কেবল আমায় তাঁর সতীন নামটা দে। তুর এই পেটের ছিলের বাপের নামটার জন্যি তা খুব দরকার বাবু !
চা বাগানের কুলি কামিনদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা । ভাগ্য বটে আমাদের চামেলী বেটির । ছোট বাবুর বউ হোতে চলছে সে । বাবুর ছেইলে তার পেটত ।
চামেলীর বাপ এসে রাতভর হাত জোর করে বাবুর সামনে বসে থাকে । একটাই মিনতি তাঁর – চামেলীকে তুই ঘরের ব হু কোরে নে বাবু সাব । সারাজীবন মুই তুর কিনা গোলাম হয়া থাকবো বাবু !
রাজীব গলা উঁচিয়ে বলে – মাথা খারাপ হোয়ে গেছে তোর । ঘরে আমার নতুন বউ আছে । তারপর চামেলীর বুড়া বাপ রাজনের মাথা হাতরিয়ে বলে , মনে করে নে এটা একটা নিছক দুর্ঘটনা । আর তোর মেয়েও তো ধোয়া তুলসী পাতা নয় । তারও তো সায় ছিল এতে।
-এক হাতে তালি বাজে না বাবু , তুই না চাইলে আমার মিয়া কি -----
-রাজনের কথা শেষ করতে দেয় না রাজীব । বলে , শোন তার চেয়ে ভালো তুই একটা রফা কর । এমন ঘটনা তো চা বাগানে এই প্রথম নয় । বল , কি চাস তুই ।
-কিছু না , তোকেই চায় বাবু আমার বেটী । ওঁর সাথে বেঈমানী করিস না । ভগবান সইবে না ।
- পাগল হয়েছিস তুই । শোন , আমার কথা শোন । আগে শহরের ডাক্তারের কাছে চেয়ে চামেলীর পেটের বাচ্চাটা তাড়াতাড়ি নষ্ট করে ফেলে দে । যা টাকা লাগে আমি দেব !
পরদিন চামেলী সৎ মা এসে কাড়ি খানিক টাকা আঁচলে বেঁধে ছোট বাবুর কুটিরের ঢাল বেয়ে মনের আনন্দে নীচে নামতে থাকে ! আগে তাঁর নিজের পেটের মেয়ে রুক্মিণীর বিয়া । তারপর চামেলী । জাতপাত যাওয়া মেয়ে মানুষের ভালো বিয়া দেওয়া এতই সুজা !
শহরের ডাক্তারের চেম্বারে বাচ্চা নষ্ট করতে গিয়ে চামেলী মারা গেল !
চা পাড়ার কুলি কামিনরা কানাঘুষা করলো ছোট বাবুই চামেলীর সৎ মাকে দিয়ে তাঁকে মেরে ফেলেছে । তাই রাজীবকে আবারও কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালতে হোল চামেলীর সৎ মা কপিলার মুখ বন্ধ করতে!


চার
চামেলী মারা যাবার কয়েকমাস বাদে রাজীব তাঁর বিয়ে করা অপূর্ব সুন্দরী বউকে নিয়ে এসেছে চা বাগানের বাংলোতে । চা বাগানের কুলি কামিন বউ ঝিরা দূর থেকে তাঁকে দেখে আর নিজেরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে , এই না হলে কি আর সাহেব ঘরের বউ ! যারা যারা এতদিন চামেলীকে ভালবাসতো , তাঁরা মাথা নাড়িয়ে বলে – না না , মিছা কথা , মুগোর চামেলীও ত কুম শুন্দর ছিল না । কালোর কি রঙ নাই রে ? কিন্তুক কপাল ! কপালে নাই তাঁর তাই সাহেব ঘরের বহু হতে পারে নাই ।
টিলার উপর চা বাগানের এ্যাসিসটেন্ট ম্যানেজারের মস্ত বাংলো । চারদিকে বয় বেয়ারা । শাহানার বলতে গেলে কিছুই করতে হয় না । বিকেলে রাজীব ফেরার আগে সে পরিপাটি হোয়ে সাজগোজ করে । তারপর বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে বসে হুমায়ুনের উপন্যাস পড়ে । রাজীবের গাড়ীর হর্নটা শোনা গেলেই সে হাসতে হাসতে চঞ্চল পায়ে সামনের চিলতে বাগানটায় এসে দাঁড়ায় । কাঁঠাল চাপার গাছের নীচে পড়ে থাকা হলুদ হলুদ সুগন্ধী চাঁপা ফুল। তা মাথা নীচু কোরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তুলে তুলে আঁচলে ভরে !
নাহ , রাজীব আসে নাই । এক্ষুনি শহরে তাঁর যেতে হবে। ফিরতে রাত হবে । ফোনের লাইন না পাওয়ায় সেই কথা বোলতেই সে পাঠিয়েছে গাড়ীর ড্রাইভারকে ।
শাহানার বড় অভিমান হয় । নিজে একটু এলে কি ক্ষতি হোত তাঁর ! আসলে প্রায় এক বছর হয় এই কোলাহল মুক্ত জনবিহীন পরিবেশে থাকতে থাকতে সে বড়ই হাপিয়ে উঠেছে । বিয়ের পর পর নিজেকে চা বাগানের ম্যানেজারের বউ মনে করে যে তৃপ্তি পেত এখন তাঁর বিন্দুমাত্র অনুভব করে না সে । এ ক্যামন অদ্ভুত একটা জীবন । আশে পাশে কথা বোলবার মতো , দেখা করার মতো তেমন কোন মানুষ নেই ।
- এই দিদি , কি কর গো তুমি । ফুল কুড়াও । ভালো । দাও , তুমার খুপায় আমি একটা বাহারী ফুল
প ড়ায় দেই , একটা রিনিঝিনি মেয়েলী গলা শাহানাকে কথাগুলো বলে!
- কে , কে বলে , সচকিত ভঙ্গীতে শাহানা এদিক ওদিক তাকায় !
- আমি গো দিদি , এই ধরে লাও তুমার সতীন ! দাও ফুল্টা পড়ায় দেই । বলে সন্ধ্যার আলো আঁধারীতে একজন অচেনা যুবতী শাহানার দিকে এগিয়ে আসে ।
ঠিক স্পষ্ট কোরে মেয়েটিকে দেখতে পারে না শাহানা । কিন্তু সে যে কালোর মাঝেও অপরূপ সুন্দরী তা বেশ ভালো করেই বুঝতে পারে সে !
কিন্তু মেয়েটি তাঁকে তার সতীন বলছে ক্যান ? ভাবতে গিয়েই মনটা কেমন একটু খচ খচ কোরে উঠে । সতীন ? রান্নার রাধুণী বুড়িটা প্রায় রোজই কি যেন বলতে চায় তাঁকে । আবার পরক্ষণেই কি ভেবে সে কথা ফিরিয়ে নেয় । কি বোলতে চায় সে? রাজীবকে বিষয়টা বলাতে সেদিন সে খুব রাগ করেছে । উল্টা ঝিটাকে বেশ বকা ঝকা কোরে বিদায় দেয়ার ভয় দেখিয়েছে !
- সতীন ?
- হাঁ গো দিদি , সতীন । এই নিজের মাথার দিব্যি কেটে বলছি গো । তুমার সতীন হই গো দিদি । ইচ্ছা করলে দশজনের কাছে পুছতে পারো । ত তুমার স্বামী খুব খারাপ মানুষ গো দিদি । তুমার ভালর জন্যই কইছি । এই দ্যাখো আমার সারা শরীরটা জুড়ে ক্যামন বিষের বড়ী !
রাজীবের গাড়ীর পরিচিত হর্নটা শোনা যায় । শিথিল শরীর আর মনটা নিয়ে তা দূর থেকে অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে দেখতে থাকে শাহানা । অচেনা সেই মেয়েটি তখনও সেই কাঁঠাল চাপা গাছের নীচে !
স্বামী কাছে এলে , তাঁকে প্রায় অপ্রস্তুত করেই শাহানা হঠাৎ করেই তাঁর হাতটা শক্ত কোরে ধরে বলে , সত্যি কোরে বলতো তুমি কি আমাকে বিয়ে করার আগে এখানে আর একটা বিয়ে করেছিলে ?
এই কথাটুকু বলতে গিয়ে শাহানা মনে মনে বারে বারে কামনা করে , না বলুক রাজীব । না বলুক । না ! না ! উল্টো তাঁকে এই আজেবাজে প্রশ্ন করার জন্য গাল মন্দ করুক সে । যেভাবে সে কুলী কামিনদের সাথে মাঝে মধ্যে রেগে উঠে ঠিক তেমনি করে তাঁকে সে বকা ঝকা করুক। কিছুই মনে করবে না সে । বুঝে নেবে স্বামীর সামনে তাঁকে নিয়ে এই মন্দ কথাটা বলার শাস্তি এটাই । এমন মধুর শাস্তিই সে চায় এক্ষণে রাজীবের কাছ থেকে !
কিন্তু রাজীব শাহানার সেসব কথার উত্তর দেয়ার আগেই কাঁঠাল চাপার গন্ধ বুকে , সেই অচেনা সুন্দরী তরুণীটি হুট কোরে কোথা থেকে যেন উড়ে এসে জুড়ে বসে তাঁদের স্বামী স্ত্রি দুজনার মাঝে ।
- আমি সতীন হই না বাবুজি তর বউয়ের ? এই চামেলী তর বউয়ের সতীন নয় বাবুজি । উয়ারে বুঝা , আমি তর কি লাগি । বলেই নিঝুম চারপাশটা ভেদ কোরে খিল খিল , খিলখিল করে হাসতে থাকে চামেলী । স-----তী------ন । তুয়ার স—তী—ন গো দিদি !
শাহানার কথার উত্তর দেয়ার আগেই চোখের সামনে মূর্তিমান চামেলীকে দেখতে পেয়ে ভয় তরাশে সংজ্ঞা হারায় রাজীব ! চা--------তুই ?
চামেলী , চামেলী – জোরে জোরে ডাকতে থাকে শাহানা !
কোন উত্তর ভেসে আসে না ।
কেবলি একটা বিড়াল হিংস্র দু চোখে তাঁকে দূরে টিলার জঙ্গলের ফাঁক থেকে দেখতে থাকে ! দেখতেই থাকে !

পায়ের ঘুঙ্গুর
- জোহরা উম্মে হাসান

দক্ষিণের দুয়ারটা রেখেছো বন্ধ করে দুঃখিনী সীতার
বনবাসের মতো , থাক সে এমন করেই যতকাল ইচ্ছে তোমার !
পাছে খুলে যায় দোর , অর্গল রেখেছো এঁটে , মনের মতন কোরে
সাধ্যি কি তা খুলে যায় পাখীর ডানার বাতাসে ! আভাসে !
দুয়ারের ভেতর দুয়ার , মধ্যিখানে দুয়ার , দুয়ার মনের মাঝে
রাক্ষসের প্রাণ ভোমরা যেন , ছিঁড়তে হলে ছিঁড়তে হবে এক
এক কোরে । সাধ্যি কার বলো , খুলে দ্বার তোমার
পিঞ্জিরা মন বনের !
পাখীদের গান সারেগামা আসে না ভেসে , চাঁদের আলো হাসে না জানালা
পেরিয়ে বিছানার গলি পথে । নাইতে নদীর জলে
জল কন্যেরা তবুও ডাকে তোমায় ,করে আহ্বান - চীৎকার অথবা
ডুব সাঁতারে । ভাসতেও পারো ইচ্ছে হোলে !
দুয়ারের এত সাধ্যি বল , বাতাস এসে ফিরে ফিরে যায়
সুবাস এসে পথ ভুলে চায় । পায়ের ঘুঙ্গুর লাজহীন বটে
আজোও বাঁশরী বাজায় বদ্ধ দরজার অলিতে গলিতে !

তাঁহার জন্য কেউ বসে নেই
- জোহরা উম্মে হাসান

তাঁহার জন্য কেউ বসে নেই , নেই বসে নেই আলোর সকাল
সূর্য গেল অস্তাচলে , কখন গেল বিকেল আকাল
বিকেল গেলো ছায়ায় আলোয় –যাদের ঘরে পিদিম আছে
আলোর মালা গেঁথে আঁধার কেবল তাঁদের আঁচল খোঁজে !
তাঁহার জন্য সকাল কালো , কালো গাছের সবুজ পাতা
আসা যাওয়ার পথটা বুকে কেবল যত কথামালা !
তাঁহার জন্য কেউ বসে নেই - নদীর ধারে ,সাগর পাড়ে
কেউ বসে নেই পালক ঠোঁটে পড়িয়ে দিতে খোঁপার বাঁকে
হাতের কাঁকন মান করে না , ভুলেই গেছে মানের ভাষা
আঁখির তারা রাত বিরতে নাইতে গেছে জলের ধারা !
সে বড় একা , একা বড় , একা যেমন অন্ধকারের পথটি রেখা
একা যেমন পিলসুজের সলতে বুকে প্রদীপ আঁকা !
তাঁহার জন্য কেউ বসে নেই , একা আসা , একাই যাওয়া
আলোর কাছে হাতটি পেতে কেবল কদিন ভিক্ষে মাগা
তাঁহার জন্য কেউ বসে নেই , তাঁহার জন্য কেউ বসে নেই
তবে কেন তাঁহার মিছে থাকা , ভালো আছির রঙ বাহানায়
নিজেই নিজের ছায়া খোঁজা ! তাঁহার জন্য কেউ বসে নেই ,
নিজেই কেবল বসে একা , নিজেই কেবল বসে একা !

নিতু
- রাজীব চৌধুরী


নিতু অনেকক্ষন ধরে বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। বাসার বউ বাসার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকাটা একটু অশোভন কিন্তু নিতু ঢুকছেনা। কলিং বেলের কাছে হাতটা থেমে গেছে। তারপর শুধুই শ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে সিড়ি ঘরে।
আর নিতু শুনছে ঘরের ভেতরের শব্দ।
- তোমার বউ কোথায়?
- ও এখন বাজারে গেছে।
- তুমি বাজার করোনা?
- করি তো
- বাচ্চাকাচ্চা নিচ্ছনা কেন
- আস্তেধীরে নিব
- তাইলে আজকে কেন?
- ওকে ভাওতা দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছি বলেইনা...
- এইইই আসতে...
- আরে কখন ঐ ছেনালি এসে পড়বে...
- নিজের বউকে এভাবে?... ছি... আঃ ...
- আরে বইলোনা... সারাদিন রোগী রোগী...আমার খেয়াল রাখেনা। রান্না বান্না করেনা... কি সব রাধে- এভাবে নার্সগিরী করে কি জীবন চলে?
- কি শেষ?
- হ্যাঁ... যাও- দ্রুত ফ্রেশ হও। ও যেকোন সময় এসে পড়বে...


নিতু জুতোর শব্দ পেয়ে একধাপ সিড়ি উঠে যায় - আড়াল থেকে দেখে ফেলার হাজারো সুযোগ থাকলেও সে দেখলোনা মেয়েটা কে... ওর বর মেয়েটার সাথে কি কি করেছে কিছুই সে যেন দেখেনি এমনভাবে মিনিট তিনেক পরেই সে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে অনেক চেষ্টা করে শেষে না পেরে বাথরুমে ঢুকে কয়েক দফা কাঁদল।কেদে নিজেকে কিছুটা শান্ত মনে হল ওর।
তারপর একটা মেডিক্যাল কিট থেকে দুটো যন্ত্র বের করল সে। এগুলো এখন খুব কাজে লাগবে। লম্পট হাজব্যান্ড জানেনা নিতু ওর জন্য কি নিয়ে অপেক্ষা করছে... নিতুর হাতে একটা টিউব... কড়া ঘুমের ঔষধ খাইয়ে দিয়েছে সে নপুরুষটাকে। তার কাজ এখন একটা সুক্ষ নল দিয়ে একটা কষে গিট দেয়া...দুটো সুই দিয়ে সে একটা ছোট্ট শিরা কে সুক্ষ্মভাবে বিশেষ অংগ থেকে বের করে এনে সুক্ষ একটা সুতো দিয়ে গিট দিলো।মেডিক্যালের ভাষায় যার নাম ভ্যাসেক্টমি...।

সিংহাসন
- রাজীব চৌধুরী


আজ আপনাকে এক অদ্ভুত গল্প শোনাবো। যদি ও জানি আপনি এর এক দন্ড ও বিশ্বাস করবেন না। ভাববেন আমি পাগল কিনবা বদ্ধ উন্মাদ। কিনবা মানসিক হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসা কেউ।কিন্তু বিশ্বাস করেন আমি আজ যে কথা গুলো বলবো তাতে বিন্দু মাত্র মিথ্যা লুকানো নেই। আমি লেখক হতে পারি, বানিয়ে বানিয়ে প্রচুর গল্প লিখতে পারি - কিন্তু আমি আজ যে জিনিসটা নিয়ে আপনাদের কাছে লিখছি সেটা সত্যি আমার কাছেই আছে। এটা একটা সামান্য সিংহাসন মাত্র। এটাতে বসেই আমি চিঠি টা লিখছি। আমি এটা স¤পর্কে যা যা লিখবো সব সত্য লিখবো এটা প্রতিজ্ঞা করেই শুরু করলাম।


ঘটনার শুরু যখন আমি মেসে থাকি- ঢাকায় এক অভিজাত এলাকায়।আমার বাবা ছিলেন একজন শিল্পপতি।তাই টাকা পয়সার অভাব আমার কখনো হয়নি।মেসে থাকতাম লেখা পড়া করার জন্য -কিন্তু আমার উদ্দেশ্য ছিল আমোদফুর্তি করা।বাসায় থাকলে যেটা কোনদিন সম্ভব হতনা। আর আমোদ ফুর্তিতে আমি ছিলাম একেবারেই খাপছাড়া। আমি পড়তাম এক অভিজাত প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি তে। সারাদিন আড্ডা-গান-বিভিন্ন যায়গায় হঠাৎ করে বেড়িয়ে পরা ছিল আমার নিত্য দিনের অভ্যাস।


আমি কুমিল্লার ধর্ম সাগরে নির্ঘুম রাতে ঘুম ঘুম চোখে নৌকায় ঘুরেছি- সমুদ্রে চাঁদের আলোর নিচে বসে বসে বন্ধুদের মাঝে বিলিয়েছি ঘুমের নেশাতুর মন্ত্র। নীল পাহাড়ের চুড়ায় হেটেছি প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝে। এসব করে অভিজ্ঞতা ও আমার কম হয়নি। আমি সেই অভিজ্ঞতা গুলো জমিয়েই লিখেছি ১০টা উপন্যাস। সব গুলোই বই আকারে আছে। আপনারা হয়ত "নীলাভ তারার কালচে আলো" উপন্যাস টা পড়েছেন। এইত কদিন আগে ঈদে এটা থেকে নাটক হয়ে গেল।জেহাদ হাসান আর জয়িতা অভিনয় করেছিল।


এরকম একটা উপন্যাস লেখার জন্যেই প্লটের খোঁজে এক সময় আমি গিয়েছিলাম সুন্দর বন। সময়টা বেশিদিন আগের না। মাত্র তিন মাস আগে। প্রথমে গিয়েছিলাম খুলনা- সেখান থেকে বরগুনা ঘুরে সুন্দরবন।একসপ্তাহ ছিলাম আমি সেখানে- সাথে ছিল আমার তিন বন্ধু। আমরা একসাথেই পড়তাম।
লেখা পড়া শেষ হবার উপলক্ষে আমাদের এই ট্যুরের স্পন্সর ছিলাম আমি। ফেরার আগেই ছয়দিন আমরা অনেক অনেক আনন্দ করেছি। এক বনবিভাগের লোককে ফুসলিয়ে সুন্দরবনের গহীনে ঢুকে ছিলাম হরিণ শিকারে। আমি নিজেই একটা মেরেছি। সেটার মাংস পুড়িয়ে খেয়েছি নদীর পাড়ে।


আমি যেখানেই যাই বেশ কিছু টাকা পয়সা আমার সাথে থাকে । সেইবার ও আমার সাথে ভালই টাকা ছিল । ইচ্ছা ছিল সব উড়িয়ে তবে খালি হাতে ঢাকা ফিরব। হয়েছিল ও তাই ।


সুন্দরবন থেকে ফেরার পথে আমরা খোঁজ পেলাম একটা বজরা আছে নদীতে। এটা এক সৌখিন মানুষ সুজন মোল্লার। উনার বজরা তে আমরা উঠলাম নৌকা ভ্রমণের জন্য। কিন্তু সেখানে গিয়েই আমরা জানতে পারি এই বজরা ছিল কুখ্যাত ডাকাত করিম মোল্লার। এবং এই সুজন মোল্লা তারই সন্তান। শুনে আমরা অনেক ভয় পেয়ে যাই। কিন্তু আমাদের সুজন মোল্লা অভয় দেয়। সে এখন ডাকাতি করেনা। তার বাবার রেখে যাওয়া অঢেল টাকা আছে। সে কোন কাজ করেনা- পায়ের উপর পা তুলে খায়। এভাবে কথায় কথায় আমাদের সাথে সুজন মোল্লার বেশ ভাব হয়ে যায় । আমরা সেইদিন রাতে বজরায় পিকনিক করলাম। রাতে সবাই মিলে বারবিকিউ পার্টি শেষে উপভোগ করলাম চন্দ্রালোকিত জোছনা।


পরদিন সকালে আমাদের তিনজন কে সুজন মোল্লা কিছু অদ্ভুত জিনিস দেখালো। সেগুলো ছিল তার বাবার রেখে যাওয়া ডাকাতির মাল পত্র। নানা রকম সোনাদানার তৈরি আসবাব পত্র- সাথে বিভিন্ন রকম পাথরের মূর্তি। এর মাঝে একটা সিংহাসন দেখে আমার খুব ভাল লেগে গেল। আমি এটার কাহিনী জানতে চাইলেই উনি বললেন -আজ থেকে প্রায় বছর পঞ্চাশ আগে একবার ডাকাতি করতে গিয়ে আরেক ডাকাত এর সাথে লড়াই করে এই সিংহাসন কেড়ে নেন করিম মোল্লা। সেই ডাকাত- যে এই সিংহাসন এর মালিক ছিল - সে এটা পেয়েছিল তার বাবার কাছ থেকে। তার বাবা ছিল ব্রিটিশ আমলের কুখ্যাত ডাকাত নিরঞ্জন পালী। তিনি এটা নিয়ে এসেছিলেন উত্তর বাংলার জমিদার জ্ঞানদা চরণ মজুমদার এর সভাকক্ষ থেকে। নিরঞ্জন পালী বেশ হিংস্র ছিল। তিনি যখন এই সিংহাসন কেড়ে নিতে যান তখন এটাতেই বসা ছিলেন জ্ঞানদা চরণ এর ভাই মোক্ষদা চরন । একটা তলোয়ার মোক্ষদা চরণের পেটে আমুল বসিয়ে লাশ সহ সিংহাসন নিয়ে আসেন তার আস্তানায় । তারপর এটা অনেক দিন পড়েছিল মোল্লা দের বাড়িতে। পরে সেটা সুজন মোল্লা এখানে এনে রাখে। এটা পাওয়ার পর প্রায় ১৫০ বছর অতিবাহিত হয়েছে। কিন্তু এখন ও সিংহাসনটার গায়ে নানা মনিমুক্তার অদ্ভুত জেল্লা দেখে আমি অবাক হলাম।


সিংহাসন এর উচ্চতা আনুমানিক চার ফুট। সবার উপরে একটা ময়ুরের মাথা আর পালক। সেই পালকে গাঁথা শ'খানেক মুক্তা আর নীলা। দুই হাতলে আছে অদ্ভুত সিংহ খচিত কারুকাজ। হাতলের শেষে সিংহের মুখ হা করে আছে। আর চোখ দুটো তে উজ্জ্বল পাথর। পিঠের নিচে আছে মখমলের নরম আবরন। পায়া চারটার মাঝে জ্বল জ্বল করছে সাতটা করে নীলা। কালচে রং এর কাঠের আবরনে এখন ও কেমন যেন রাজা মহারাজা আবেশ ছড়িয়ে আছে।


আমি অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে ছিলাম সিংহাসনটার দিকে। আসলে এই রকম একটা জিনিস এই ভাঙ্গা বজরাতে থাকতে পারে সেটা নিজের চোখেই বিশ্বাস হচ্ছিল না। যাদুঘরে রাখার মত এই স¤পদ এই আস্তাকুড়ে নৌকায় পড়ে আছে ভাবতেই মনটাই খারাপ হয়ে গেল। আমার সাথে এক লাখের মত টাকা ছিল। আমি সুজন মোল্লা কে তখন ই সিংহাসনটা কেনার জন্য আবদার করলাম।সুজন মোল্লা ও না করেনি। আমাদের কে জিনিস গুলো দেখানো মানেই ছিল এগুলো আমাদের কাছে বিক্রি করবে। এটাই তার পেট চালানোর ধান্ধা। কিন্তু সে যা দাম চাইল তাতেই মাথায় হাত পড়ল আমার। সেই এই সিংহাসন এর দাম হাঁকল দশ লাখ টাকা। আমি ঊষ্ণা প্রকাশ করতেই সে বরিশাল থেকে একজন জহুরী ডাকাল। সেই জহুরী প্রতিটা পাথর আমাদের সামনে পরীক্ষা করে জানাল প্রতিটি পাথর ই মহামুল্যবান। সব মিলিয়ে এই সিংহাসন এর দাম কম করে হলেও কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।


আমি সেই দিনেই আব্বাকে ফোন করে টাকার ব্যাবস্থা করলাম। উনি সাথে দুইজন লোক ও পাঠিয়ে দিলেন। ঐ লোকগুলো সিংহাসনটাকে নিয়ে রওনা দেয় আমার মেসে এর উদ্দেশ্যে। আমি ঢাকায় পৌছানোর একদিন পরেই ঢাকায় পৌছায় আমার সিংহাসনটা।


কিন্তু এটা আনার পরদিন ই এক অদ্ভুত কান্ড ঘটে। ঐদিন রাতে আমি নতুন উপন্যাসটা শুরু করে ঘুমাতে ঘুমাতে দেরী করে ফেলেছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি সিংহাসন এর বসার যায়গায় মরে পড়ে আছে একটা বাচ্চা ইদুর।আমি কাজের বুয়া কে ইদুরটা সরাতে বলেই চলে গেলাম ভার্সিটি। যখন ঘরে ফিরি তখন সন্ধ্যা। আমি কলিং বেল অনেক বার টিপে ও কেউ খুলে না দিলে দাড়োয়ান ডেকে দরজা ভাঙ্গার ব্যাবস্থা করি। এবং দরজা ভেঙ্গে আমার রুমে গিয়ে যা দেখি তার জন্য আমি কোনদিন প্রস্তুত ছিলাম না। দেখলাম সিংহাসন এর উপর কাজের বুয়া অদ্ভুত ভাবে পড়ে আছে। নাক দিয়ে রক্তের একটা কালচে ধারা নেমে এসেছে । আর কোন আঘাতের চিহ্ন নেই। দেখে আমি হতভম্ভ। তাড়াতাড়ি হাসপাতাল নিয়ে যাই। সেখানে কর্তব্যরত ডাক্তার জানায় সে মারা গেছে অনেকক্ষণআগে। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারনে। ডাক্তার পুলিশ কেস করতে বলেছিল। আমি টাকা পয়সা দিয়ে ডাক্তারকে ম্যানেজ করি। টাকা দিয়ে দাড়োয়ানের মুখ ও বন্ধ করি। এবং কাজের বুয়ার পরিবার কে দশহাজার টাকা দিয়ে চুপ থাকতে বলে ছেড়ে দেই সেই মেস। এবং সিংহাসনটাকে পাঠিয়ে দেই আমার গ্রামের বাড়িতে। সেখানে আব্বাই আমাকে সেটা পাঠিয়ে দিতে বলেন। এবং আমার দুর্ভাগ্যের শুরু সেখান থেকেই।


দুই সপ্তাহ পর বাসা থেকে জরুরী ফোন আসল। বলা হল আমার খালা খুব অসুস্থ। আমি যেন চলে আসি। আমি তড়িঘড়ি করে গিয়ে দেখি খালা মারা গেছেন। আমি লাশের মুখটা দেখতে চাইতেই দেখলাম খালার নাকের কাছে জমে থাকা লালচে রক্ত । বুঝতে বাকি থাকল না যে খালা সেই সিংহাসন এ বসেই মারা গেছেন।
আমি সেইদিন ই জানাজার পর ফোন করলাম সুজন মোল্লা কে। সে আমাকে জানাল এই সিংহাসন অভিশপ্ত। কেউ এটাতে বসলেই সে একটা ঘোরের মাঝে চলে যায়। তারপর সে আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ে। সেই ঘুম কখনো ভাঙ্গে না। এতেই সুজন মোল্লার বাবা করিম মোল্লা মারা যান। এটাতেই মারা যায় সুজন মোল্লার মেয়ে জামাই।এই কথা আমাকে আগে কেন জানায় নি জানতে চাইতেই ঐ পাশ থেকে ফোন কেটে দেয় সুজন মোল্লা। বুঝলাম ডাকাতি না করলে ও স্বার্থের জন্য করেনা কিছু বাকি নেই তার। দশ লাখ টাকার জন্য মেরে ফেলেছে দুজন মানুষ কে। আমি সেই দিন ই লুকিয়ে ফেললাম সিংহাসনটাকে। বাড়িটা বিশাল আমাদের। পুরোনো বাড়ি- অনেক গুলো রুম। আমি একটা স্টোর রুমে লুকিয়ে ফেললাম সেটাকে। কিন্তু থামাতে পারলাম না মৃত্যু।


ঠিক দুইদিন পর খবর আসল আমার বড় ভাই মারা গেছেন। আমি গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখলাম ভাইয়ার ও একই অবস্থা। নাকের কাছে এক ফোঁটা রক্ত। আম্মা বলল ভাইয়া কোন একটা কাজে সেই স্টোর রুমে গিয়েছিলেন। গিয়েই চেয়ারটা দেখে লোভ সামলাতে না পেরে বসে পড়ে। আর মারা যায়। আমি প্রায় উন্মাদ হয়ে গেলাম।ভাইয়ার মৃত্যু কে আমার আম্মা মেনে নিতে পারেন নি। তিনি পরদিন স্ট্রোক করে মারা যান। এবং একে একে আমাদের পরিবারের এগার জন এই সিংহাসন এ বসে বসে মারা গেলেন। আমি শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কিছু ই করার ছিলনা। কারো কাছে বিক্রি ও করতে পারলাম না লুকিয়ে ও রাখতে পারলাম না। যেন একের পর এক মানুষ কে টেনে নিয়ে মারে ইচ্ছা মত সিংহাসনটা।আমাদের পারিবারিক গোরস্থানে একটু আগে আমার আব্বাকে কবর দিয়ে এসে সিংহাসনটাতে বসেই লিখছি এই সব। বিশ্বাস করেন এর একবিন্দু ও মিথ্যা না। আমি যা যা লিখেছি তার সব সত্য।


একটু আগে থেকে আমি একটা খুব সুন্দর মেয়েকে দেখতে পাচ্ছি। চমৎকার একটা লাল পেড়ে শাড়ি পড়ে আছে। হাতে একটা থালা। তাতে নানা রকম ফল। আমি লেখার ফাঁকে ফাঁকে মেয়েটাকে দেখছিলাম। এখন মেয়েটা আস্তে আস্তে সামনে এসে আমাকে ফল খাওয়ালো। আমি ও খেলাম।কি ফল জানিনা। কোনদিন খাইনি। কিন্তু আশ্চর্য স্বাদ। মেয়েটা এরপর থালাটা মাটিতে রেখে নাচ শুরু করল। কোথা থেকে যেন বেজে উঠতে শুরু করেছে করতাল আর মৃদঙ্গ। সাথে সানাইয়ের সুর।আমি উঠে মেয়েটার সাথে নাচতে চাইলাম। কিন্তু আমাকে জোর করে বসিয়ে দিল আরো দুই জন হঠাৎ করে উদয় হওয়া মেয়ে। তারপর আমাকে একজন একটা হাত পাখা দিয়ে বাতাস করতে লাগল। আরেকজন একটা রুপার পাত্রে ঢেলে দিল মদ।


আমি মদ খেয়ে মাতাল হতে শুরু করেছি। তাই লিখতে পারছিনা। হয়ত এটাই আমার জীবনের শেষ ক্ষন। কারন একটু আগেই নাকের কাছে একটা সরু রক্তের ধারা টের পেয়েছি। কিন্তু কিছুই করার নেই। আমি ঊঠতে পারছি না সিংহাসন ছেড়ে। মেয়েটার নাচের তাল বেড়েই চলল। কেউ একজন হাতের তালি দিয়ে তবলার বোল দিচ্ছে। মেয়েটা নেচে চলেছে।


তা ধিন ধিন ধা/তা ধিন ধিন ধা/ না তিন তিন না/তেটে ধিন ধিন ধা/ ধা-
আহ মাথার চার পাশ কেমন যেন হালকা হয়ে আসছে। এখন সামনে শুধু মেয়েটা নাচছে। আর কিছু দেখতে পারছিনা। খুব ঘুম পাচ্ছে। প্রচন্ড ঘুম। আমি ঘুমালাম- জীবনের শেষ ঘুম। আপনি এই সিংহাসন টাকে ধবংস করে দেবেন। ভুলেও লোভে পড়ে এতে বসবেন না। বসলেই নিশ্চিত মৃত্যু ।
ইতি
রাওসিভ হাসান


. . . দুই মাস পর
বর্ষা যাদুঘরে এসেছে ওর মা বাবার সাথে।ওর খুব শখ পুরাতন জিনিস পত্র দেখার। তাই প্রতিমাসে সে আসে জাতীয় যাদুঘরে। দেশের প্রায় প্রতিটি যাদুঘরে ও ঘুরে ঘুরে সব মুখস্থ করে ফেলেছে। কিন্তু সে এখন তিন তলার ডান পাশের রুমে নতুন যে সিংহাসন টার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেটা সে আগের বার আসার সময় দেখেনি। তাই মন যোগ দিয়ে সিংহাসন এর সামনে লেখা বর্ণনা পড়তে লাগল। তাতে লেখা-


" পশ্চিম বাংলার জমিদার জ্ঞানদা চরণ এর হারিয়ে যাওয়া সিংহাসন এটা। পাওয়া গেছে গাজিপুরের হাসান পরিবারে। সিংহাসনটা জ্ঞানদা চরণ নিজে বসার জন্য বানায় নি। সেটা বানিয়ে ছিলেন তার ভাই মোক্ষদা চরণের জন্য। কিন্তু এটা ছিল একটা মরন ফাঁদ। এই সিংহাসন এর সব খানেই মেশানো আছে একধরনের অজানা বিষ। এই সিংহাসন এ বসলেই এই বিষ প্রবেশ করে বসা ব্যক্তির শরীরে। তারপর আস্তে আস্তে ঐ ব্যক্তির মৃত্যু হয়। জ্ঞানদা চরণ তার ভাইকে মারার জন্য এটা বানালে ও কুখ্যাত ডাকাত নিরঞ্জন পালী এটাকে হস্তগত করে। এর পর প্রায় ১৫০ বছর এটার অস্তিত্ব অজানা ছিল। একমাস আগে হাসান ফ্যামিলির রাওসিব হাসানের মৃতদেহ আবিষ্কারের মাধ্যমে এটা উঠে আসে সভ্যতার সামনে। নিরীহ দর্শন এই সিংহাসন হত্যা করেছে প্রায় ৪০ জনের মত নিরীহ মানুষ কে। তাই এটা থেকে দূরে থাকুন ................
লেখাটা পড়েই বর্ষা খুব ভয় পেল। তারপর দৌড়ে চলে গেল ওর বাবার কাছে ...........

জীবনের জলসা ঘরে
- মিন্টু উপাধ্যায়
জানালার ধারে চুপ করে বসে বাইরের দিকে তাকিয়েই ছিলাম । বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ায় বেশি দূর নজরই চলে না । মাঝে মধ্যে বৃষ্টির ঝাপটা এসে আমাকে ভিজিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল । বৃষ্টির একটানা ঝম ঝম শব্দে কোন কিছুই শুনতে পাচ্ছিলাম না ।
আকাশে মেঘের ছোটাছুটি ক্রমশ বেড়েই চলেছে । সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটুকরো বেদনা কখন যে চোখের কোন দিয়ে অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পরেছে তা আমি বুঝতেও পারিনি । বুকের ভেতরটা কেমন যেন কনকন করে উঠলো । এই অব্যক্ত বেদনার হাত থেকে আমি কেমন করে মুক্তি পাব জানিনা । দুচোখ জলে ভরে উঠলো, আমি হারিয়ে গেলাম অতীতের স্মৃতির মায়াজালে ।
শহর থেকে অনেক দূরে একটা ছোট্ট গ্রাম, গ্রামের নাম বলুহাটি । গ্রামের একদম শেষপ্রান্তে ছিল আমাদের ঘর । অভাব অনটনের সংসার হওয়ায় মনের মধ্যে শান্তি ছিল না, কিন্তু ছিল ভালোবাসা । গ্রামেরই একজন মেয়েকে আমি মনে মনে খুবই ভালোবাসতাম ।
''টিনা'' নামটা শুনলেই, আমি কেমন যেন হয়ে যেতাম । সময় যেন থমকে যেতো । বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠতো । খুবই অসহায় লাগতো নিজেকে । হ্যা, টিনাকে আমি ভালোবাসতাম কিন্তু সে আমায় ভালোবাসতো কিনা সেটা জানতাম না ।
একদিন জানালাম তাকে আমার মনের কথা । উত্তরে সে শুধু একটা কথাই বললো আমাকে ''বামন হয়ে চাঁদে হাত দেওয়ার চেষ্টা করোনা'' । ক্ষণিকের মধ্যেই ওকে নিয়ে দেখা আমার জীবনের ছোট ছোট স্বপ্ন গুলো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল ।
মাথা নিচু করে চলে এসেছিলাম । এই ঘটনার পর থেকে কোন দিনও ওর সামনে মাথা তোলার সাহস আমার হয়নি । মনের মধ্যে শুধু একটাই প্রশ্ন বার বার আঘাত করছিলো, কেন, কেন আমায় টিনা এমন কথা বললো । গরীব ঘরের ছেলে আমি, আমার না আছে টাকা-পয়সা, না আছে একটু শুখের অনুভুতি । আর আজ না আছে ভালোবাসা । কখনও কখনও ভাবতাম শুধুমাত্র টাকা - পয়সা আর বিলাসিতাই কি ওর জীবনের লক্ষ ছিলো ? ভালোবাসার কি কোন দামই ছিল না ওর কাছে । এই প্রশ্নের উত্তর আমি কোনদিনও পাইনি । অনেকদিন আড়ালে লুকিয়ে লুকিয়ে নিরবে কেঁদেছি আমি । আমার ভালোবাসাকেই আমি পাইনি । আমি তাকে হারিয়ে ফেলেছি, আমার টিনা । সেই দিনের পর থেকেই আমার জীবনের সবকিছুই তছনছ হয়ে গেছে । জীবনের কালচক্রে কেটে গেছে অনেকগুলো বছর । ইতিমধ্যেই টিনার বিয়ে হয়ে গেছে, শুনেছি বেশ শুখেই আছে সে । আমার সাথে ওর আর দেখা হয়নি । আমার জীবনের কিছু স্মৃতিই হল এই গল্পের মূল বৈশিষ্ট্য । শুধু আমিই জানি এটা গল্প নয়, আমার জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু চরম সত্য ।


লাশের অভিনেতা
- রাজীব চৌধুরী

চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার-মাঝে মাঝে খানিকটা কৃত্রিম আলোক। ঝিঁঝিঁ পোকার কৃত্রিম ডাক। আর কোন সাড়াশব্দ নেই- এমন একটা পরিবেশে অনেক দূর থেকে শোনা গেল -"লাইট -ক্যামেরা- অ্যাকশন"। আমি যেখানে শুয়ে আছি সেখানে শোয়ানো আছে আমার মত আরো তিনজন অভিনেতা। আমি সহ মোট অভিনেতা চারজন। এই হরর ফিল্মটার শুটিং হচ্ছে এফডিসিতে- চার নম্বর ফ্লোরে। আমি নতুন অভিনেতা। এর আগে মাত্র একটা হরর ফিল্মে অভিনয় করেছি মাত্র- তাও একটা লাশের ভুমিকায় মিনিট খানেক এর অভিনয়। আমি কোন কাজ ও পাচ্ছিলাম না মনের মত। আমি এর আগের অভিনয়ের জন্য বেশ ভাল একটা রোল পেয়েছিলাম।

কিন্তু গোলমাল বাঁধে একদম শেষ এ গিয়ে। আমি ভুল করে লম্বা একটা শর্টের একদম শেষ তিন সেকেন্ড এর আগে শ্বাস নিয়ে ফেলি। কেঁপে ওঠার জন্য আমার এই শর্টটাই বাদ দিয়েছিলেন আগের ছবির পরিচালক- কারন এর আগে প্রায় ১০ মিনিটের শর্ট নেয়া হয়ে গিয়েছিল এবং তাতে খরচ হয়ে গিয়েছিল প্রায় দুই লাখ টাকার কাছাকাছি। তাই আমাকে একদম একটা বাজে মরার পার্ট করতে দেন করুনা করে।

এই একটা পার্টের জন্য আমাকে বর্তমান ছবির পরিচালক এর কাছে ধরনা দিতে হয়েছে অনেক বার। হাতে পায়ে ধরে টাকা না নেবার শর্তে আমি রাজি হই এই মরার ভুমিকায় অভিনয় করতে। কোন কারনে আমার ভুল হলে টাকা দেবেন না আমাকে এই শর্তে আমি এখন শুয়ে আছি এই ফ্লোরের নকল স্টেজ এর একপাশে একটা কফিনের সাথে হেলান দিয়ে।

অনেক বার অনুরোধের পর এই রোল আমি পেলেও এতে অনেক রিস্ক ছিল। কারন আমার শরীরে একটা ইঞ্জেকশন নিতে হয়েছে আমার সকল পেশিকে ঘণ্টা খানেক এর জন্য অলস করে দেবার জন্য। এই ইঞ্জেকশন নেবার পর প্রায় মিনিট বিশেক কেটে গেছে। এর মাঝে আমার হার্ট বিট কমে দাড়িয়েছে মোটে ৩০ এর ঘরে। খুব ধীরে ধীরে শ্বাস নিচ্ছি আমি। নিচ্ছি না- নিতে বাধ্য হচ্ছি। কারন আমি মরার মত পড়ে আছি চারটা ক্যামেরার সামনে। শর্ট টেক শেষ হলে ই আমাকে আরেকটা ইনজেক্ট করে ঠিক করে দেয়া হবে- এমনটাই বলেছেন ছবির পরিচালক ইসহাক সাহেব।আমি প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম-কিন্তু শেষে চিন্তা করলাম- অনাথ পরিবারের সন্তান আমি - কিছু টাকা পেলে এই মাসটা কিছুটা শান্তিতে কেটে যাবে। কাজটা না পেলে আমার আগের খারাপ রেকর্ডের কারনে আমাকে না খেয়ে থাকতে হবে প্রায় সারা মাস। এর চেয়ে কয়েক ঘণ্টায় হাজার খানেক টাকা পাওয়া যাবে ভেবে এই লাশের ভুমিকায় আমি পড়ে আছি। দেখতে হয়তবা সত্যিকারের লাশের মতই লাগছে আমাকে।

শর্ট টা ছিল এরকম যে কিছু লাশ পড়ে থাকবে এদিক সেদিক। একটা টেবিলে অনেক গুলো অস্ত্র থাকবে- যেমন চাপাতি ছুড়ি ইত্যাদি। এর মাঝে একজন কসাই এসে লাশ গুলো কাটতে শুরু করবে। আমাকে ইসহাক সাহেব অভয় দিয়েছিলেন এই বলে যে এই কসাইয়ের ভুমিকায় তিনি নিজে অভিনয় করবেন। উনি আমাকে কথাটা বলে উপরে বেশ গর্ভবোধ করলেও ভেতরের খবর হল -ডামি হলেও কোন লাশের হাত পা কাটতে কোন কেউ রাজি হয়নি। উনার বাজেট ও এমন নেই যে কেউ সাধে এসে রাজি হবে। আমার মতই তিনি ও খরচ বাঁচাতে নিজেই অভিনয় করতে যাচ্ছেন। উপরে উপরে খুশি হলে ও ভেতর ভেতর কেমন যেন ভয় পাচ্ছিলাম-কারন শক্তিমান অভিনেতা শাকিল খান পর্যন্ত এই ছবিতে অভিনয়ের অফার ফিরিয়ে দিয়েছেন এতে বাজেট খুব কম বলে।আর শাকিল খানের মত অভিনেতার কি দায় পড়েছে যে উনি একটা কসাইয়ের ভুমিকা করবেন- তাও সব অখ্যাত মানুষের ভিড়ে? তাই কাউকে রাজি করাতে না পেরে শেষে নিজেই শুরু করলেন অভিনয় পরিচালক ইসহাক সাহেব।

অ্যাকশন শব্দ শোনার কিছুক্ষন পর অভিনয়ের এলাকায় প্রবেশ করল কসাই।কিন্তু ইসহাক খান কে ছাপিয়ে গেছে কসাইয়ের অভিনয়। আর মেকআপ এত ভাল হয়েছে যে আমি ই চিনতে পারছিনা। বয়স এক লাফে ৪৫ থেকে নেমে এসেছে ২৫ এর কোঠায়। আমি আগেই বলে রেখেছিলাম ইসহাক খান কে যে আমি লাশের ভুমিকায় অভিনয় করলে ও চোখ খোলা রাখবো। প্রথমে গাইগুই করলেও পরে রাজি হন তিনি দুই ডোজ ঔষধ ইঞ্জেকশন দেবেন এই শর্তে। মেকআপ রুম থেকে লাশের মেকআপ আর কস্টিউম পড়ে যখন উনার রুমে গেলাম তখন উনি মাত্র মেকআপ নিচ্ছেন। আমি যাওয়ার পর তিনি নিজেই আমার হাতে ইনজেকশন দিলেন। এটা পুশ করা মাত্রই মনে হয়েছে আমার শরীরের একটা পেশী ও কোন কাজের না। সব যেন একটা একটা করে ঘুমিয়ে পড়েছে। সেই থেকে আমি শুয়ে আছি এই কাঠের বাক্সের উপর। কোনরকমে চোখ মেলে তাকাতে পারছি। মস্তিষ্ক কাজ করছে-কিন্তু অনেক কিছু বুঝতে সমস্যা হচ্ছে। কানে ভালই শুনতে পারছি। বস্তুতই একটা লাশের মত অবস্থা আমার।তিনজন লোক আমাকে ধরে এই খানে শুইয়ে দিয়েছে। এরপর শুরু হয়েছে ক্লান্তিকর অপেক্ষা।

ভৌতিক পরিবেশ বেশ ভালভাবেই জমিয়েছে ইসহাক খানের স্টেজ শিল্পীরা। চারপাশে ধোয়া ধোয়া অন্ধকার। একটা হালকা আলো ছড়িয়ে পড়েছে আমি সহ তিন লাশের ডামির উপর। আর কোন আলো ছিলনা। আর এখন আরেকটা লালচে আলো এখন ইসহাক খানের উপর।উনার পোশাকটা ও সেই রকম ভয়ঙ্কর। মনে হচ্ছে কোন এক ইংরেজি মুভি থেকে ঊঠে এসেছেন মৃত্যুপুরীর কসাই।বেশ পরিণত মেকআপ। আমি ও চিনতে পারছিনা ভাল মত। সেটে এসেই নিপুন অভিনয় শুরু করে দিয়েছেন। একটা টেবিলের উপর সাজানো ছিল নানা রকম অস্ত্র ও সরঞ্জাম। সেখান থেকে একটা চাপাতি তুলে নিয়ে নিখাদ কসাই এর মত ধার পরীক্ষা করলেন চোখ দিয়ে। তারপর টেবিলে রাখা একটা ডামি র পায়ের নিচ দিক থেকে কাটতে শুরু করলেন। বাহ কি নিপুন অভিনয়। যেন ইসহাক খানের জন্মই হয়েছে কসাই এর ভুমিকায় অভিনয় করার জন্য।

সেটে সুনসান নিরবতা। শুধু কসাই এর একটানা থপথপ মাংস কাটার শব্দ শোনা যাচ্ছে। টেবিলের উপর রাখা একটা কাটা পা কে কেটে পাঁচ টুকরা করলেন কসাই সাহেব।যে এই হাড় বানিয়েছে তার জুড়ি মেলা ভার।আমি দশ হাত দূর থেকে হাড়ের সাদা অংশ আর চুইয়ে পড়া রক্তের মাঝে লালচে মাংস দেখতে পাচ্ছি। আজ থেকে ইসহাক সাহেব কে এই নামেই ডাকবো আমি। অন্তত আমি এই অভিনয় করতে পারতাম না। একবার ও কাট না বলে এভাবে একটানা অভিনয় করা সহজ কথা না।

উফ আর পারলাম না। চোখের পাতা নবম বারের মত বন্ধ করে আবার খুললাম আমি। এবং সাথে সাথে ভয়ঙ্কর ভাবে কসাই আমার দিকে তাকাল। এই প্রথম মনে হল এই চোখ ইসহাক খানের চোখ নয়। আমি ইসহাক সাহেব কে ভালভাবেই চিনি। ইনি ইসহাক খান হতেই পারেন না। হয়ত অভিনয়ের আগে উনি আরেকজন অভিনেতা পেয়ে গেছেন। কিনবা অন্য কোন মানুষ চলে এসেছে সেট এ। আমার দিকে খানিক টা তাকিয়ে থপ থপ করে আমার সামনে এসে আমাকে পাজকোলা করে নিয়ে গিয়ে ফেললেন বড় টেবিলটার উপর। তারপর একটা ছুড়ি দিয়ে আমার গায়ে পড়া টিশার্ট ছিড়ে ফেলল দুই ভাগ করে। কথা ছিল এরপর একটা ধামা নিয়ে কোপ দেবার আগেই ইসহাক সাহেব কাট বলে শর্ট শেষ করবেন।

কিন্তু কসাই বাবাজি বোধহয় ভুলে গেছে আমার টিশার্ট কাটার সময় আস্তে করে ছুড়িতে চাপ দেবার কথা। এত জোরে চাপ দিয়েছে ছুড়িতে যে আমি নিজেই বুঝতে পারছি ছুড়ির একটা কোনা লেগে আমার বুকের কাছটায় সৃষ্টি হয়েছে একটা লাল দাগ। আমি বেশ ব্যাথা পেলাম। কিন্তু এই সময় কোনভাবেই শ্বাস নেয়া যাবেনা। তাই মরার মত পড়ে রইলাম আমি। টিশার্ট ছিড়েই হিংস্র একটা হাসি দিল কসাই। শুনেই বুকের ভেতরটা দুপদুপ করে উঠল। তারপর একটা ধামা হাতে নিয়ে ভালমত ধার পরীক্ষা করে একটা হাসি দিল সে। এবং মাথার উপর ধামাটা ধরে কোপদিতে যাবে এমন ভঙ্গিতে দাঁড়াল কসাই- এবং শর্ট শেষ।

কিন্তু না-কাট শব্দটা কেউ চিৎকার করে আগের মত বল্লনা। কেউ কাট শব্দটা এখন ও বলছেনা। পরিচালক যদি আমার সামনে কসাই এর ভুমিকায় হয় তাহলে সে কেন কাট বলছে না? সে কেন আস্তে আস্তে ধামা নামিয়ে আনছে আমার ডান পায়ের গোড়ালির দিকে? কেউ কাট বলেনি –তাই ক্যামেরা রোলিং করে চলেছে। এবং আস্তে আস্তে ধামাটা নেমে আসছে আমার পায়ের দিকে। আমি বুঝতে পারছি কোন একটা দারুন ভুল হতে চলেছে।কিন্তু আমি মুখ নাড়াতে পারছিনা। আমি কিছু বলে ঊঠার আগেই ধামাটা এসে কোপ বসাল আমার ডান পায়ে। এবং এক কোপে আমার পায়ের একটা অংশ কেটে ফেলল কসাই। উফ তীব্র যন্ত্রনায় আমার মাথা থেকে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত কেঁপে উঠল। আমার হার্ট বিট বেড়ে গেল প্রচন্ড গতিতে। রক্তের ধারায় ভিজে গেল আমার আরেকটা পা। আমি টের পাচ্ছি গরম তরলের অবিরাম ধারা-বের হয়ে যাচ্ছে আমার শরীর থেকে। কিন্তু আমি আমি কাউকে জানাতে পারছিনা। আস্তে আস্তে নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে আমার দেহ। আমার দিকে আরেকবার তাকিয়ে আবার ধামা তুলে ধরল কসাই। এবার ধামাটা এগিয়ে আসছে আমার গলার দিকে। আমি শেষ বার নিঃশ্বাস নিলাম প্রাণ ভরে। ঠান্ডা বাতাসে শেষ ছোয়া এসে ভরিয়ে দিল আমার ছটফটে ফুসফুস ...


পরদিন আবার শ্যুটিং এর সেট ফেলা হয়েছে এফডিসির পাঁচ নম্বর ফ্লোরে।চার নম্বর ফ্লোরে “তুমি আমার প্রেম” সিনেমার গানের শ্যুটিং হবে। তাই পাঁচ নম্বর ফ্লোরে সেট সাজানোর জন্য টিম প্রস্তুত।“কসাই” ছবির পরিচালক ইসহাক খান নিজে এসে বুঝিয়ে দিলেন ডিজাইনার দের কিভাবে সাজাতে হবে।ওদের দেয়া হয়েছে চাপাতি, ধামা সহ অনেক গুলো অস্ত্র। সাথে নকল হাত ,পা, রক্ত ইত্যাদি। একটা কম বয়সী ছেলে আজ এসেছে এখানে সেট সাজাবার জন্য। সে এক মনে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে আছে একটা কাটা মাথার দিকে। প্রথমে চিনতে পারেনি। কিন্তু পরে চিনেছে এটা নতুন অভিনেতা নিয়াজ মোরশেদ এর মত। যেই বানিয়েছে অবিকল বানিয়েছে। গতমাসে নিয়াজ মোরশেদের সাথে প্রথম দেখা। একটা পার্ট দেবার জন্য অনেক ধরেছিল। তাই ইসহাক খানের কাছে নিয়ে গিয়েছিল সে। এই কথা গুলো ভাবতে ভাবতে তন্ময় হয়ে গিয়েছিল সে- হটাত ইসহাক সাহেবের ধমক খেয়ে মাথাটা টেবিলের উপর রেখে আবার কাজে মন দিল সে। এরপর কাটা হাত পা গুলো আংটা দিয়ে দেওয়ালের সাথে ঝুলাতে ব্যাস্ত হয়ে গেল সে ...

মরা চোখ
- রাজীব চৌধুরী


"মাগো- আমি আর পারিনা গো" বলেই মাটিতে বসে পড়ল মুন্নি। চোখে মুখে ব্যাথা স্পষ্ট হয়ে আছে। পা দুটো ধরে কাঁদতে শুরু করেছে। তার মত ১৪ বছরের মেয়ের জন্য এভাবে মাইলের পর মাইল পথ পারি দেয়া খুবই কষ্টের। সবে মাত্র যৌবনে পা দিয়েছে মুন্নি। কিন্তু এখন তাকে যেতেই হবে। কারন পেছনে হানাদার বাহিনী চলে এসেছে অনেক কাছে। মুন্নির দিকে তাকিয়ে সন্দীপ রায়ের চোখে মুখে স্পষ্ট ভয় প্রকাশ পেল।


"মা গো- আর একটু- আরেকটু পরেই আমরা পৌছে যাবো রে" বলেই হু হু করে কেঁদে ফেললেন সন্দীপ রায়। পেশায় স্কুল শিক্ষক। বয়স হয়ে গেছে দেখে উনি হাঁটতে পারছেন না। দু বছর আগে থেকে উনার বাতের ব্যাথাটা বেড়েছে। যৌবনে তিনি অনেক রাজনীতি করেছেন। কিন্তু এখন এসে আর পারেন না। কিন্তু এখন উনাকে পারতেই হবে। মেয়েকে সীমানার ওপারে আগরতলায় পাঠিয়ে তিনি ছোট ছোট বাচ্চা ছেলে দুটোকে নিয়ে যাবেন।


"বাবা আমরা এখানে থেকে যেতে পারিনা? আমার প্রচন্ড খিদা পেয়েছে। কিছু একটা না খেলে আর আমি এগোতে পারবোনা "-চোখ দুটো ছল ছল করে তাকালো বাবার দিকে।সারি সারি লোক হাঁটছে। সবার উদ্দেশ্য যেকোন উপায়ে সকাল সবার আগেই পৌছাতে হবে বর্ডারে। সেখানে একবার যেতে পারলেই নাকি খাবার পানির অভাব হবেনা। কিন্তু এই সময়টা কিভাবে বাঁচবে সে চিন্তায় মানুষ গুলো ব্যাতিব্যাস্ত। কারো হাতে ছোট খাটো কিছু পোটলাতে খাবার ছিল। কিন্তু এখন মানুষকে দয়া দেখানোর সময় নয়। একজনকে দয়া দেখাতে গিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ার কোন মানে হয়না। এই চিন্তায় কেউ কাউকে সাহায্য করছেনা। বিশাল রাস্তায় একেবারেই একা হয়ে আছে সবাই। যে যার মত পালাতে চেষ্টা করছে। যারা যাচ্ছে সবাই প্রাণের মায়ায় ছেড়ে যাচ্ছে নিজের দেশ- নিজের জন্মভুমি। কিন্তু কেউ কাউকে সাহায্য করার চিন্তা ও করছেনা।


"মা রে- আর সামান্য দূরে। এর পরেই শুনেছি বর্ডার চলে আসবে" বলেই মাথায় হাত বুলিয়ে দিল সন্দীপ রায়- বিখ্যাত সন্দীপ স্যার। চট্টগ্রামের রাউজান গ্রাম থেকে চলে এসেছেন একেবারেই আগরতলায়। তিনি যেতে চেয়েছিলেন পুরো পরিবার নিয়েই। কিন্তু এখন কোণ উপায় নেই। উনার দুই ছেলে সুদীপ আর প্রবীর মাত্র ক্লাস থ্রি তে পড়ে। ওদের এতোদুর হাটার মত সামর্থ নেই। তাই পঞ্চাশোর্ধ স্ত্রী সুতপার কাছে রেখে মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন তিনি। এককালে তিনি যাদেরকে পড়িয়েছেন তাদের রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে দেখে অনেক অবাক হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কিছুই করার ছিলনা উনার। ছেলেগুলো তেড়া তেড়া কথা শুনিয়ে দেয় উনাকে। কাউকে বোঝাতে পারেননি তিনি। উলটো নিজের জীবন নিয়ে টানাটানি পড়ে গেছে। সবচাইতে বেশি সমস্যা তৈরি করেছে উনার পাশের বাড়ির তমিজ নামের ছেলেটা। ক্লাসে বার বার ফেইল করতো বলে বেশ বকা ঝকা করতেন সন্দীপ বাবু। কিন্তু সেই ছেলেই রাজাকার বাহিনীতে প্রথমে যোগদান করে। তারপরের দিনেই সন্দীপ বাবুর গোয়ালঘরে আগুন দেয় সে। কিন্তু সবচাইতে খারাপ অবস্থা হয় যখন সেই তমিজ আলাউদ্দিন শান্তিকমিটির রাউজান শাখার তমিজবাহিনীর প্রধান হিসেবে রাউজানে মিলিটারি বাহিনীকে সামনে থেকে পথ দেখানো শুরু করে। মিলিটারি গ্রামে আসার সাথে সাথে গ্রামের মেয়েদের আর মাঝবয়সী মহিলাদের সবাইকে ধরে নিয়ে যেতে শুরু করে তমিজ বাহিনী নামে নতুন সৃষ্ট এই বাহিনী।সেই তমিজের নজর পড়ে মুন্নির উপর। এই খবর টা পাওয়ার পর থেকে ঘর ছেড়েছেন সন্দীপ বাবু। কিন্তু ঘর ছাড়লেও মন পড়ে আছে ঘরে দুটো দুধের শিশুর কাছে। ওরা উনার জন্য পথ চেয়ে আছে। হটাত করেই যেন হারিয়ে গিয়েছিলেন সন্দীপ বাবু। আবার বাস্তবে ফিরে এলেন তিনি। কারন মেয়েটা উনার খিদেয় কষ্ট পাচ্ছে। উনার ও বেশ খিদে পেয়েছে। দুই দিন ধরে কিছু জোটেনি কপালে। একেবারে কাহিল অবস্থা। খিদে নিয়ে ঘুমিয়ে থাকা যায়।কিন্তু হাঁটতে গেলেই শরীর খাবার চায়। আর সেই খাবার নেই আশে পাশের কারোরই। যাদের আছে তারাও...।


“ভাই আমাকে দুটো বিস্কিট দিতে পারবেন?” মোটা সোটা এক লোক দৌড়াতে দৌড়াতে বেলা বিস্কিট খেয়ে যাচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল তার পোটলার ভেতর আরো অনেক কিছু আছে।


“ আরে না না- ভাই – সামনের ত্থোন সরেন। এখন সময় নাই। মিলিটারি পেছনে আইসা পড়ছে। এখন মনে হয় আমাগো ধইরাই ফালাইবো” বলেই ছুটলেন তিনি। পেছনে একবারো তাকালেন না। সন্দীপ বাবুর একটা কথা ও শুনলেন না।


ধীরে ধীরে ঘোলা চোখে আশেপাশে তাকাতে শুরু করলেন তিনি। উনারা যেখানে আছেন সেখানে দুইপাশে ঘন জঙ্গল। মাঝে মাঝে কিছু ডোবার মত আছে। আর কিছু নেই। একেবারেই শুনশান এলাকা। এর মাঝে পিচঢালা রাস্তায় এগিয়ে চলেছে হাজারো মানুষ। ধীরে ধীরে আকাশে সুর্যের আলো দেখা দিতে শুরু করেছে। কিছু পাখি ডেকে চলেছে নতুন দিনের আগমনী জানাতে। এটা ছাড়া আশে পাশে আর কোন শব্দ নেই। খসখস শোনা যাচ্ছে শুধুই ধাবমান পায়ের শব্দ। এই নিরবতার মাঝে এটাই যেন বিশাল কোন শব্দ। খানিকটা আওয়াজ হলেই যেন একেবারেই হানাদার বাহিনীর মুখে পড়ে যাবে সবাই।


হটাত করেই কি মনে করে রাস্তা থেকে নামা শুরু করলেন সন্দীপ বাবু। বিশেষ কিছু একটার দিকে তিনি এগিয়ে চলেছেন। মেয়ে মুন্নি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে উনার দিকে। একটা পায়জামা পড়া ছিলেন তিনি। সেটা গুটিয়ে নেমে পড়লেন কাছের একটা ডোবায়। আর খানিক দূর গিয়ে সেখান থেকে তুলে আনেলন একটা শাপলা ফুল। সেটা থেকে পাতা গুলো ঝড়িয়ে নিয়ে ভাল মত ঝেড়ে ভেতর থেকে বের করে আনলেন সাদা সাদা কিছু বিচি। তারপর মুখে দিয়েই ঝাপ দিলেন যেন পানির ভেতর। আর দু হাত দিয়ে পনের বিশটা শাপলা ফুল কুড়িয়ে নিয়ে উঠে পড়লেন পানি থেকে।
কিন্তু তিনি বুঝতেই পারেননি তিনি কি ভুল করেছেন। উনার সাথে যারা সহযাত্রী ছিল সবার মাঝেই খিদে রাক্ষসের মত বিরাজ করছিল সেটা টের পাননি সন্দীপ বাবু। উনার হাত দশেক পেছনের থেকে কিছু চ্যাংড়া ছেলে উনার দিকে নজর রেখেছিল সেটা টের পাননি তিনি। আর উনার হাতে শাপলা ফুল গুলো দেখেই যেন ঝাপিয়ে পড়ল ওরা। মিনিট খানেকের মাঝেই শাপলা ফুল গুলো ছিনতাই হয়ে গেল সন্দীপ বাবুর হাত থেকে। পেছনে ফিরে দেখলেন সেখানে ঝাপিয়ে পড়েছে আর জন বিশেক বৃদ্ধ আর মহিলা। সবাই যে যার মত করে কাড়াকাড়ি করে খেয়ে চলেছে শাপলা ফুলের শ্বাস।


শেষে শুন্য হাতে ফিরে এলেন সন্দীপ বাবু। প্রথম যে ফুলটা তিনি ছিড়েছিলেন সেটাই অবশিষ্ট আছে উনার হাতে। আর কিছুই নেই। ফিরে এসে মেয়েকে ধরে কেঁদে ফেললেন তিনি। খিদের যন্ত্রনার চাইতে বড় যন্ত্রনা উনাদের পেছনে ধাওয়া করেছে। এখন পালাতেই হবে ভেবে দুইজনে আবার ছুটতে শুরু করলেন।


মুন্নির পা দুটো ফুলে উঠেছে ভয়ানক ভাবে। এর মাঝেই কিছুক্ষন বসে জিরিয়ে নেবার কারনে এখন কিছুটা হাঁটতে পারছে সে। কিন্তু সেটা কতক্ষন পারবে সেটা ভাবনার বিষয়। এর মাঝেই নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। হটাত করেই যেন সকাল হয়ে গেছে। এতক্ষন তাও আশপাশ থেকে লুকিয়ে পথ চলা যাচ্ছিল। কিন্তু এখন পুরো ফকফকা। আর সকালবেলা মানেই মিলিটারির ভয়। একজন জানালো সামনে নাকি মিলিটারি ক্যাম্প করেছে। ওরা সবাই তাক করে আছে পথ চলা মানুষগুলোর উপর।


খবরটা শোনার পর থেকে পথ চলা মানুষগুলোর মাঝে নেমে এল শীতল আতংক। যাদের সাথে কিশোরী মেয়ে ছিল তারা যেন ভয়েই কুঁকড়ে আছে। সবার মাঝে টানটান উত্তেজনা। ভয়ে কেউ সামনে আগাতেই চাইছেনা। আবার কেউ পেছাতেও পারছেনা। ঠিক এমন সময় সামনে থেকে দ্রিম করে একটা শব্দ হল। আর শব্দ শুনে যে যেদিকে পারলো সেদিকে পালাতে শুরু করে দিল। সামনে কিসের শব্দ হচ্ছে সেদিকে না তাকিয়ে মুন্নি আর সন্দীপ বাবু। কিন্তু বেশি দূর এগোতে পারলেন না। তার আগেই ঠা-ঠা-ঠা করে গুলির শব্দ ভেসে এল। আর তার সাথে সাথে দু তিন জন ওমাগো বাবাগো বলে মাটিতে পড়ে গেল। সন্দীপ বাবু বুঝলেন সামনে পাক বাহিনীর শক্ত ঘাটি বসেছে। এখন উনাদের যে কোন মুল্যে এখান থেকে পালাতে হবে। শেষে নিরুপায় হয়ে পানিতে নেমে গেলেন দুইজনেই। কিন্তু পানিতে নামার আগেই দেখতে পেলেন বহু দূর থেকে ভেসে আসছে ঠা ঠা আওয়াজ। আর গাড়ির গর্জন। ভারী অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে চলে এসেছে পাকবাহিনী। পানিতে নেমেই প্রথমে ডূব দিলেন সন্দীপ বাবু। কিন্তু বেশি ক্ষন দম আটকে রাখতে পারলেন না তিনি। ঝপ করে উঠে পড়লেন। এদিকে মুন্নি পানিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে ওর বাবার কান্ড। শেষে নিরুপায় হয়ে কিছুক্ষন আগে ক্ষুধার্ত মানুষগুলোর ফেলে যাওয়া শাপলা ফুলের ডাটা তুলে নিল সে। তারপর সেটা নিয়েই ডুব দিল মুন্নি। মুন্নির দেখাদেখি সন্দীপ বাবুর মাথায় ও বুদ্ধিটা ভালই ঠেকল। তিনি একটা আধা খাওয়া ডাটা নিয়ে ডুব দিলেন পানিতে।


পানির খুব একটা গভীরে যেতে পারলেন না দুইজনের কেউই। তাই বাইরে থেকে ভেসে আসছে চিৎকার। মানুষের চিৎকার। বৃদ্ধের চিৎকার। শিশুর কান্না। সব মিলে মিশে একাকার। এর মাঝে একটা বিশেষ শব্দ চিনতে কোন কষ্ট হচ্ছেনা দুইজনের কারোই।সেটা হল বুলেটের শব্দ। মিলিটারিরা গুলি করতে করতে এগিয়ে চলেছে। যেদিক থেকে পারছে গুলি করে করে মারছে। তিন চারটা গাড়িতে করে এসে পড়েছে মিলিটারি।


যেখানে সন্দীপ বাবু আর মুন্নি লুকিয়ে ছিলেন সেখানেই কি মনে করে গাড়ির চাকা গুলো যেন থেমে গেল। ঝপাঝপ করে নেমে আসল ডজন খানেক মানুশ। সন্দীপ বাবু পানির নিচ থেকে শুনতে পারছেন সবকিছু। কিন্তু অনেক কষ্টে নিজের দম আটকে শ্বাস নিয়ে চলেছেন। শেষ আশা- পাক বাহিনিরা কেউ বুঝতে পারবেনা উনারা এখানে লুকিয়ে আছেন।
“ইয়ে- ইধারমে এক আদমি অর এক আওরাত কো মেইনে দেখা- সার্চ করো- ও দোনো কিধার গেয়া” বলে কে যেন অর্ডার দিল। আর সাথে সাথে ঝপঝপ করে শব্দ শুরু হয়ে গেল। বেয়নেট দিয়ে খোঁচানোর শব্দ শুরু হয়েছে। পাক বাহিনীর সৈন্য গুলোর শকুন দৃষ্টি বাপ বেটির দিকে পড়েছে।
কিন্তু কিছুক্ষন খোঁচা খুচি করে ফিরে আসল সবাই। একজন বলল-


“স্যার- হামলোগ কুচ নেহি পায়া। ইধারমে কুচ নেহি হ্যা” – বলেই ইশারায় দেখিয়ে দিল ডোবার এক কোনায়। সেখানেই লুকিয়ে আছে সন্দীপ বাবু। আর সেখানে ধীরে ধীরে হেঁটে গিয়ে পানি থেকে এক মুঠোয় তুলে আনল সন্দীপ বাবুকে। মুখে নল লাগানো। সেই নলের নাড়াচাড়া দেখে টের পেয়েছে ওরা। তারপরেই পানি থেকে উঠে দাড়াতে বাধ্য হল মুন্নি। কারন মুন্নির চুলের গোছা ধরে টেনে নিয়ে চলে দুই পাক সেনা।


“স্যার- ইয়ে মাল বহত খুব সুরত হ্যায়” বলেই ঠোট চাটল এক পাক সেনা।


“লো ইসে হামারা গাড়িমে ডালো অর ইয়ে আদমি কো উধার পৌছাদো” বলে আকাশে দেখিয়ে দিল কমান্ডার। আর সাথে সাথে একটা বেয়নেট ঢুকিয়ে দিল সন্দীপ বাবুর এক চোখ দিয়ে।চোখ দিয়ে ঢুকে সেটা মাথার পেছন দিয়ে বেরিয়ে আসল বিশ্রী ভাবে। সন্দীপ বাবুর শরীর টা ধুকপুক করতে করতে হটাত করে থেমে গেল। উনার চোখ থেকে বেয়নেট টা বের করে নিয়ে পাকিস্থানি সৈন্য টা উর্দুতে বলল-


“সালা হারামি” বলে এক দলা থুথু ফেলল ভাল চোখটার উপর।


থুথুর দলাটা ঢেকে থাকায় দেখতে পেলেন না সন্দীপ বাবু তার মরা চোখ দিয়ে। নতুবা দেখতে পেতেন উনার মেয়েকে পাকবাহিনী তুলে নিয়েছে গাড়িতে।এখন পথ চলতে একটুও কষ্ট হবেনা তার। শুধু সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে কলংকের দাগ!

পান
- রাজীব চৌধুরী


মদের বোতলটা পুরো খালি করে মোতাচ্ছের ঘোলা চোখে তাকাল লাশের দিকে। লাশের গাড়িটা বিগড়েছে। এও রাতে শুনশান নিরবতা। গাড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে। ঝুম বৃষ্টি। এর মাঝে লাশের গাড়ি খারাপ হলে কেমন লাগে?
ভাবছে মোতাচ্ছের।
কি করা যায়?
ভেতরে একটা মেয়ের লাশ। খানিক আগে এটাকে নিয়ে রওনা দিয়েছিল। অবশ্য নেশার ঘোরে খানিক আগে মনে হলেও আসলে অনেকক্ষণ আগে। কম করে হলেও ঘন্টা দুয়েক আগে। বিষ খাওয়া লাশ। এমন লাশ নেয়ার মত কষ্টের কিছু নাই। কারন আর কিছুই না। এসব লাশ নেয়ার সময় মাইক্রোতে নিজেরই ভয় লাগে মোতাচ্ছের এর। যদিও সে অনেক বার করেছে এসব কাজ। কিন্তু কেন যেন খুব ভয় লাগে।
গুম গুম শব্দে বাজ পড়ল কোথাও।
এমন রাতে কার না ঘুমাতে ইচ্ছা করে?
কিন্তু এই ঝুম বৃষ্টিতে যে দ্রুত সদর হাসপাতালে লাশটা পৌছে দিয়ে ঘরে এসে ঘুমাবে সেই আশা নেই। কারন এখন গাড়িটা চলছেনা। আর সকাল হবার আগে এই এলাকায় কাউকে পাওয়াও যাবে বলে মনে হয়না।
আজকে বিকেলে ঠিক করেছিল একটু ঘুরে বেড়াবে। ঈদের দিন। কোরবানির ঈদ। মোতাচ্ছের এর কোরবানি করার মত টাকা নাই। তাই গোরু কোরবানির সময় ধরাধরি করে। আজকে পা বাঁধার দায়িত্ব পেয়েছিল। এজন্য দুই কেজি মাংস পেয়ে গেছে। রানের মাংস। বাসায় সবে মাত্র রান্না বসিয়েছে এমন সময় মোবাইলে কল এল।
পুলিশগুলো বড়ই বেরসিক। ওদের কাজ নেই। কম্ম নেই। সারাদিন পাহাড়া দেয়া। আজকে ঈদের দিনেও ওরা পাহারা দিচ্ছিল। কিন্তু এর মাঝেই এই মেয়েটা বিষ খেয়েছে। আচ্ছা বাবা কিদরকার ছিল এই ঈদের দিনে বিষ খাওয়ার?
কি করা যায়?
দূরে কোথাও বাজ পড়ল।
এর খানিক পরেই শব্দ হল। কান ফেটে যাওয়ার যোগাড়। এ সময় গাড়ি থেকে বের হবার প্রশ্নই আসেনা। কিন্তু বের না হলে এই শুনশান পথের মাঝখানে গাড়ি ঠিক করার আশা ও নাই। গাড়ির পেছনে যেখানে লাশ শোয়ানো সেখানে কিছু যন্ত্রপাতি আছে একটা টুল বাক্সে।কিন্তু এখন ভয় লাগছে। এগুলো মোতাচ্ছের কোনভাবেই আনতে পারবেনা। আর পেছনের ডালা খুলে এগুলো আনতে গেলেই পুরো ভিজে যাবে।
সবচেয়ে খারাপ সংবাদ হল একমাত্র ছাতিটাও টুলবাক্সের ওপর।
এখন কি করা যায়?
দুপাশের জানালা দিয়ে এদিক ওদিক তাকানোর চেষ্টা করল মোতাচ্ছের। কিছু তেমন কিছু দেখা যাচ্ছেনা। কিছু গাছের দুলুনি দেখে হটাত করেই একটা ভয়ের শিহরন খেলে গেল ওর মেরুদন্ড বেয়ে। যেন হটাত করেই মুর্ছা যাবে সে।
ও এখন রয়েছে পাকদীঘির পাড়ে।
দুপাশে ঘন জঙ্গল মনে হলেও এখান দিয়ে খুব বেশি গাছ নেই। সরু একটা রাস্তা। দুপাশে বড়বড় গাছ। আর দুদিকেই দুটো মাঝারি আকারের দীঘি।
এই যায়গাটাতে সহজে কেউ আসেনা। কেউ আসেনা কারন আর কিছুনা। খুব ভয়াবহ কিছু ঘটনা ঘটে গেছে গত কয়েকবছরে। ফলে এ এলাকা দিয়ে সহজে কেউ আসেনা। কিন্তু এ পথে আসবে সেটা ভাবতেও পারেনি মোতাচ্ছের। ও যাচ্ছিল ঠিক উলটো পথের রাস্তায়। সে এখানে কিভাবে এল সেটা একটা প্রশ্ন বটে।
“আরে আরে- কে ওটা?”
বেশ খানিকটা দূরে রাস্তায় একটা আলো দেখা দিল।
যেন মোতাচ্ছের এর সামনে টিমটিম করে এগিয়ে আসছে কোন এক আশার আলোকবর্তীকা।
ধীরে ধীরে পরিষ্কার হল – কিন্তু যেন কালো ধোয়ার মাঝে প্রবেশ করল মোতাচ্ছের। কারন এত রাতে একটা মেয়ে আসছে এ পথে। মাথায় একটা ছাতা। হাতে হারিকেন। এমন রাতে কোন মেয়ে এভাবে বেরোয়? কিন্তু কে এ? ডাকাত নয়তো?
এ একালায় ডাকাতের উপদ্রব আছে। ডাকাতগুলো বড়ই বেরসিক।ধরলে একেবারে উলংগ করে ছেড়ে দেয়। সাথে যা থাকে সব কেড়ে নেয়। এ মেয়েটা কি সেরকম কোন ডাকাত দলের সদস্য?
“ আমারে একটু সদরে পৌছায়ে দেবেন?”
কন্ঠটা বড়ই কোমল। একেবারেই নিখাদ গ্রামের মেয়ের কন্ঠ। একটা সবুজ সাদার চেক শাড়ি পড়ে আছে। নাকে নথ। চুল খোলা। খানিকটা ভিজে ও গেছে। মুখে পান। সে পানের থেকে গ্রাম্য জর্দার ঘ্রাণ বেরুচ্ছে।ও কি ভাত খেয়ে পান খেতে খেত এত রাতে এখানে এসেছে। ভাবতে ভাবতে হাত ঘড়ি দেখল মোতাচ্ছের।
আরে বেশি রাত ও তো হয়নি। বৃষ্টির জন্য অনেক রাত মনে হচ্ছে। মাত্র রাত দশটা। যদিও এটা মোতাচ্ছের এর জন্য অনেক রাত।
“আমার তো গাড়ি নষ্ট হইচে। আপ্নে অন্য কোথাও দেখেন। আমার গাড়ি সারাইতে হইব” গাড়ি থেকে গলা বের করে বৃষ্টি থেকে মাথা বাঁচিয়ে কথা গুলো বলল মোতাচ্ছের।
“ক্যান? দেহেন বালা কইরা। আরেকবার। আমার যাওন নাইগবো। ঘরে হক্কলে অপেক্ষা করতাসে”
কথাটা শুনে নিরাশ বদনে ধীরে ধীরে গাড়ির চাবি ঘুরিয়ে স্টার্ট করতেই ঘরঘর করে উঠল গাড়ির মৃত ইঞ্জিন। নিজেই বেয়াক্কেল হয়ে গেল মোতাচ্ছের। তারপর গাড়ির দরজা খুলে দিল। মেয়েটা উঠে আসল গাড়ির ভেতর।মিষ্টি জর্দার মেঠো গন্ধে ভরে গেল গাড়ির ভেতরটা।
মোতাচ্ছের চালাত শুরু করেছে।
ভাবছিল মেয়েটাকে কিছু এটা জিজ্ঞাসা করবে।
“কই থাকুইন?”
“ সদরে”
“ এইহানে এত রাইতে...”
“ আপনের এত জাননের কাম কি?”
চুপ করে গেল মোতাচ্ছের। মেয়েটা দেখতে দারুন। চোখ দুটো ভাসা ভাসা। মোতাচ্ছের এর খুব প্রেম করার ইচ্ছে জাগল মেয়েটাকে দেখে। এত মিষ্টি একটা মেয়ে বউ হয়ে আসলে মন্দ হতনা। রাতের বেলা ভাত রান্না করে খাওয়াত। দিনে ভাত বাইরে খায় সে। রাতে নিজের রান্না নিজেকেই করতে হয়। অনেক কষ্ট হয়। এই মেয়েটা কি রান্না করতে জানে?
“এইহানে রাখুইন”
“আইচ্ছা। তোমার নামডা ...”
“ মনি। আমার নাম মনি। যাই ভাল থাকুইন”
বলে মনি নামের মেয়েটা চলে গেল।যাওয়ার পরেই মোতাচ্ছের টের পেল মেয়েটা ওর হাতের হারিক্যান ফেলে গেছে। গাড়ির ভেতরেই। পরে একসময় ফেরত দেবে চিন্তা করতে করতে সে আর দুটো গলি পরেই পৌছে গেল সদর হাসপাতালে। লাশকাটা ঘরের সামনে তখন সবার চলে যাওয়ার তোড়জোর। নরেশ ডোম মাল খেয়েছে। তেমন তাগড়া শরীরে গাড়ির পেছন থেকে লাশটাকে টেনে নামালো লাশটা।তারপর কাধে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় হোঁচট খেলো সে। তখনই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল মোতাচ্ছের এর। সামনে পড়ে থাকা সেলাই খুলে বেরিয়ে যাওয়া লাশটার সাথে মনি নামের মেয়েটার খুব মিল। সেই টানা টানা চোখ। সেই নাকের নথ।
তবে কে ছিল সেই গাড়িতে?
দৌড়ে গাড়ির দরজা খুলে ফেলল মোতাচ্ছের। ওখানে কিছু নেই। শুধু সিটের ঊপর এক খিলি পান রাখা। পানের ভেতর শোভা জর্দা। জর্দা থেকে মেটে গন্ধ করছে। ঠিক সেই মেয়েটার মতো... নাম যার মনি...

প্রেমের চিঠি
- রাজীব চৌধুরী

আমার
না লেখা প্রেমের চিঠি তুমি
দ্রবীভূত হও আজ গোলাপে
গোলাপ বিগড়ে গ্যালে
কবিতার ডায়েরিতে মুখ গুজে
কাদো তুমি অক্ষর সামলে
দ্রবীভূত হও আজ সেরাবে।
আমার
না লেখা কবিতা তুমি
বুকের পাজরে যাও মিশে যাও
আজ কলপে।।

বাবাজি
- সূরজ দাশ

তিনি ছিলেন স্বপ্নদ্রষ্টা । পথ দেখাতেন ।
নিশানা পাক্কা ছিল । এলেম ছিল তার ।
কয়লা পুড়ে ছাই এখন । ছাই মেখে বাবাজি তিনি ।
আমাকে শিখিয়েছিলেন গীতগোবিন্দ পাঠ ।
বস্তু জগতের মায়ার কি সব খেলা ...

চ্যালা ছিলাম তার অনেক বছর । এখন স্বনির্ভর ।
মুদি দোকান করেছি । প্রভুর আশীর্বাদে খেয়ে পড়ে দিব্যি তাজমহল
ক্ষয়ে যাচ্ছি । সিংহাসনে বসে থাকা পাথরের রাধাগোবিন্দের সাথে
নিশ্চুপ, নিরালায় বসে, গৌরাঙ্গ - কথা ভাবছি
আর বাবাজির নিপুন কুশলতা অনুসরণ করছি মাত্র ।

জটায়ু
- সূরজ দাশ

প্রতিটি ভোরই মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যায়
অলিখিত পতনের দিকে
ছিন্নশির প্রাচীন জটায়ু
লোকাল বাসের ছাদে দুর্বল তীর্থের কাক
দিন গোনে, ঘণ্টা গোনে, মিনিট সেকেন্ড পল অনুপল
গুনতে গুনতে ভেঙে যায় বানানো গল্পের পাহাড়
ভোরের প্রথম গানে সেই কবে বেজে উঠেছিল হাওয়ার উৎসব
আজ কেবল জেগে থাকা শূন্য পথঘাট
ভয়ের রোদ্দুর মাখা দু একটা তীব্র দুপুর ।

বাথানে বসে অলৌকিক চর্চা
- সূরজ দাশ

আকাশে লটকে থাকা চাঁদ, কাঁটাতার, রাধাকৃষ্ণ
হেলেঞ্চায় মজে থাকা মন, ঢকঢক, বথুয়ার
গন্ধে দুপাড়ার জেগে থাকা দুপুর বেড়ানি দল
সব একাকার, মিসিং ডায়েরি বুকে সাবানার
আব্বা এর কাছে, ওর কাছে, কোনও কিনারা হলো না
বাজারে মেয়ের দাম কত, জানা নেই মোস্তাফার
রহিমের বউ আজও কিল-চড় গিলে সন্তানের
ঠোঁটে গুঁজে দেয় মহার্ঘ্য লালন, পতি দেবতার
নির্যাতন কোনও নতুন বিষয় নয়, এ পাড়ার
সকলে বাথানে বসে চর্চা করে দুঃখ শোক কষ্ট
ভাটিয়ালি , দেবতার অলৌকিক জলযান, গল্প ।

বুকভারী যোগ-বিয়োগ
- সূরজ দাশ

যাতায়াতের পথে বহুবার ভেবেছি
উঠোনে দাঁড়াবো তোর

নদীর দুহাত তুলে
তোর জন্য রেখে আসবো
অগাধ গানবাজনা আর পানকৌড়ি নেশা

তারপর অনেক অনেক সহভাগী ধুকপুক
মাথার ওপর দিয়ে
উড়ে গেল বেসামাল শালিখ-সন্ধ্যায়

রোদের কিনার ধরে এগোতে এগোতে
ধৈর্যের ডালপালা সেও গুটিয়ে নিচ্ছে অতীত

বুকের বোতামে সেঁটে থাকা বুকভারী যোগ-বিয়োগ
এখনও নিপাতনে সিদ্ধ হতে
তান্ত্রিক হতে চায়
ভাঙা সাইনবোর্ডের নিচে ওই তো
ওই তীর চিহ্নটা তোর দিকেই তাক করা এখনও ।

ঘুমের ক্রসিং
- সূরজ দাশ

কলিজা ঘিরে দ্রাক্ষারস
পান করি ভোরের গেলাসে

হেলেঞ্চা পাতার খোঁজে উপচে পরে
কৌটোভর্তি সকাল

রাস্তায় হাসিখুশি মাছওয়ালা
আলো বাতাসের সাথে
ফেরি করেন হরিদ্রাভ সুসময়

হা মুখে হাট করে খোলা হাওয়ার দরজা
খুলে দাও, খুলে দাও নিভৃতে গোপনচারিণী

সাঁকোর নিচে যেতে যেতে অনিবার্য অন্ধকার এলে
দেখে পার হও ঘুমের ক্রসিং ।

ওরা ছয়জন
- রাজীব চৌধুরী


ভীষন ঠান্ডা পড়েছে। বাইরে উষ্ণ থাকলেও এখন এখানে ভয়ানক ঠান্ডা বিরাজ করছে।
ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে ওরা।
ওরা ছয়জন।
ছিল।
এখন ওরা চার জন।
ছিল মানে ওরা ছয়জন মিলে এসেছিল এখানে। এই ঘরে।
এই ঘরে আজকের রাতে একটা বিকট পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। খুব ভাল ছয় জন ছেলেমেয়ে এখন নিজেদের শত্রুতে পরিণত হয়েছে। অথচ ঘন্টাখানেক আগেও ওদের মাঝে ছিল দারুন এক ভালোবাসার লীলাকীর্তন!
সজল ভালোবাসতো নীলাকে।
জুনুন ভালোবাসতো সাইমাকে।
জেবু ভালোবাসতো সাইমনকে।
খানিক আগে সজল আর সাইমা খুন হয়েছে।
খুন হয়েছে নাকি খুন করা হয়েছে বাকিদের কেউ জানেনা।
অবশ্য এখন ওদের মনের অবস্থা ভয়াবহ। লিফটের ভেতরের আবহাওয়া ধীরে ধীরে ঠান্ডা হচ্ছে। খানিক আগে ওরা ঘর থেকে বেড়িয়ে যাওয়ার সময় লিফটে চড়ে বসতেই ধাতব লিফটখানি থেমে গেছে কোন এক অজানা ফ্লোরের মাঝবরাবর। সেই থেকে ভয়াবহ কিছু ঘটনা ঘটে চলেছে। মেঝেতে রক্ত। কার রক্ত বোঝা যাচ্ছেনা। চুলগুলো উষ্কশুষ্ক জুনুনের। ওর কোকড়া চুলের জন্য ওকে সাইমা নিজেই প্রেম নিবেদন করেছিল এমন ই এক শীতের রাতে। সেই সায়মার শরীরটা পড়ে আছে মেঝেতে। খানিক আগেও যাকে আপন মমতায় হাতের বাঁধনে জড়িয়ে রেখে ঢুকেছিল এই এপার্টমেন্টে তখনো মেয়েটার জন্য অদম্য প্রেম ও কামনা ছিল ওর মনে, এখন সেসব শুধুই স্মৃতি। কিংবা ভুলে যাওয়া অপপিষ্ট বেদনা।
জেবুঃ আমি বার বার বলেছি এসব করার কোন দরকার নেই। কেউ আমার কথা শুনিসনি। এখন বোঝ ঠেলা। এক ...
নীলাঃ তুই থামবি? কথা বললে আরো বেশি অক্সিজেন পুড়বে। আর আমরা মরতে থাকব। দেখছিস না? এই আধুনিক এপার্টমেন্টের লিফটে সামান্য ভেন্টিলেশন সিস্টেম ও নেই?
জুনুনঃ আমি কি ওপরের ফ্যানের পেছনের পার্টিশনটা ভেঙ্গে দেখব কি করা যায়?
জেবুঃ নাআআআআ- থাক। এর মাঝেই হয়ত কারেন্ট এসে পড়বে।
জুনুনঃ মজার বিষয় হচ্ছে কারেন্ট যায়নি এখনো।
জেবুঃ তোর মজা লাগছে? দুজন মরে পড়ে আছে তোর মজা লাগছে?
নীলাঃ প্লিইইইইজ। এখান থেকে কিভাবে উদ্দ্বার পাওয়া যায় এটা নিয়ে ভাব তোরা। প্লিজ। আমি এসব রক্তারক্তির মাঝে টিকতে পারছিনা।
ঠিক এমন সময় আরেকবার অন্ধকার হয়ে গেল লিফটের ভেতরটা। নীলার নীলরঙ্গের নাকফুলটা কোন পাথরের ভাবছে জুনুন। সাইমন ভাবছে জেবুর টসটসে ফিগারের কথা। সাইমন জেবুকে ভালোবাসে গোপন সত্ত্বায়। মাঝে মাঝেই ওর আফসোস ও হয়। কিন্তু কিছুই করার নেই ওর। ওর চোখের সামনে দিয়েই...
কারেন্ট চলে এসেছে। আসলে ভুল কথা। কারেন্ট কখনোই যায়নি। এমনকি লিফটের লাইনেও কোন গন্ডগোল নেই। শুধু ওদের বয়ে নিয়ে চলা লিফটটা যেন নিয়ন্ত্রণ করছে অন্য কেউ। এখন সাইমনের চোখের সামনে জেবু পড়ে আছে। আসলে ওর মাথাটা মুচড়ে দিয়েছে কেউ। পটেটো ক্রাকার্সের মত চুড়মাচুড় হয়ে গেছে গলার হাড় গুলো।ওর চোখ দুটো গর্ত থেকে বেড়িয়ে এসেছে বেশ খানিকটা। ওগুলো নিচ থেকে বেড়িয়ে আসছে রক্ত। কিছু রক্ত মুখের কষ বেয়ে লাল রঙের সসের মত গড়িয়ে পড়ছে। সস হলে নির্ঘাত এগুলো চেটে খেতো সাইমন। কিন্তু দুর্ভাগ্য ওর। ঘেন্নায় ও মুখ ফিরিয়ে নিয়েই লিফটের ভেতরেই বমি করে দিল হরবর করে।
ঠিক এমন সময় দুলে উঠল লিফট টা। তারপর হুট করে ছিড়ে পড়তে শুরু করল।
মেঝেতে পড়ে থাকা তিনটে লাশ উঠে গেল শুন্যে।
রক্তগুলো ভেসে উঠল শুন্যতায়। ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা ফোঁটা। ভেসে উঠল জীবন্ত তিন বন্ধু বান্ধবী। ভেসে উঠল সবকিছু...
তারপর একগাদা রক্তাক্ত দেহ নিয়ে ধসে পড়ল মালিবাগের বিলকিস টাউয়ারের লিফটটি। ভেতরে বন্দী ছটি লাশ থেকে ততক্ষনে বয়ে চলেছে চব্বিশ লিটার তরতাজা রক্ত। সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে ওদের সকলের শরীরেই বিজ্ঞানের নিয়মে চার লিটার করে রক্ত মজুদ করাই ছিল...
............
- স্বপ্নটা কি এইমাত্র দেখলি?
- আরে আমি মাত্র দেখেছি।
- কেউ কি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখে?
- ধুর পাগল। আদতেই দেখেছি। দেখেছি এই লিফটটা বন্ধ হবার পরেই থেমে গেছে। তারপর আমরা এক এক করে মরে যাচ্ছি।
- শোন প্ল্যানচ্যাটের আসরে এসেই তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। বাসায় যা বাসায় গিয়ে একটা সিডাটিভ খেয়ে ঘুমিয়ে যা...
বলতে বলতে ছয় বন্ধু লিফটাতে উঠে পড়ল। তারপর নিচে নামার বোতাম টিপতেই ........

পথ যদি না শেষ হয়
- রাজীব চৌধুরী


গল্পটার শুরু ছিল শীতের সকালে।
ছেলেটা মেয়েটাকে প্রথম ফুলহীন দেখতে গিয়ে বিপদে পড়ে গিয়েছিল। মেয়েটা ভয়ানক মন খারাপ করে বসেছিল ছেলেটার পাশে। ছেলেটা জানতোনা মেয়েটার প্রিয় রঙ কি... জানতোনা ছেলেটার পরনের কাপড়টা মেয়েটার পছন্দ হয়নি। জানতোনা অতীব সুন্দরী মেয়েটা এমন ছেলে আশা করেনি। অথচ মুঠোফোনে অন্যরকম মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল ঠিক উল্টোটা। মেয়েটা ভেবেছিল ওর স্বপ্নের রাজপুত্তুর শেষমেষ দেখা দিয়েছে।
কিন্তু ব্যাপারটা সেরকম ছিলোনা।
ছেলেটা মোটেও রাজপুত্তুরের মতোন দেখতে ছিলোনা। ওর নাক ছিলো মোটা আর থ্যাবড়া। নাকের ওপর হাই পাওয়ার চশমা। পুরোমাত্রায় নার্ড ছেলেটাকে দেখতে মোটেও রাজপুত্তুর মনে হলোনা। তার উপর ছেলেটা মেয়েটার চেয়ে খুব একটা লম্বা ও ছিলোনা। অথচ মেয়েটা ভেবেছিল ছেলেটা হবে উচু ও লম্বা। টিকালো নাকের সামনে রোদচশমায় ঝিকিয়ে উঠবে কাবেরী রোদ্দুর। মীনাক্ষী চন্দ্রালোকে হেঁটে গেলে সে হবে জেমস বন্ডের মতোন দীর্ঘদেহী।
কিন্তু ওর কপাল ভালো ছিলোনা।
ছেলেটা ওর জন্য একটা গোলাপ ও আনেনি।
গোলাপ মেয়েটার প্রিয় ফুল ছিল। সে ইনিয়ে বিনিয়ে বলেছিল ফুল আনার জন্য। সোজাসাপটা ছেলেটা বোঝেনি মেয়েটার মনের কথা।
মেয়েটা ভেবেছিল ছেলেটা মেয়েটাকে গান শুনিয়ে মুগ্ধ করে দেবে। কিন্তু ছেলেটা গাইতে পারেনা। সে কবিতাও আবৃত্তি করতে পারেনা। অথচ মেয়েটার খুব স্বপ্ন ছিল- ওর রাজপুত্তুর কবিতা আবৃত্তি করতে জানবে। কিন্তু স্বপ্ন আর বাস্তবে ছিল বিস্তর ফারাক। মেয়েটার খুব ইচ্ছে ছিল কুয়াশার মাঝে ঘোড়া ছুটিয়ে ছেলেটা আসবে । অথচ ছেলেটা এলো একটা ভাঙ্গা সাইকেল চেপে। মুখে লাল গোলাপের বদলে ছিল কিম্ভুত দৃষ্টি।
ছেলেটার চোখগুলোও অনেক ঘোলাটে ছিল। মেয়েটা চেয়েছিল নীল চোখ।
ছেলেটাকে ফিরিয়ে দিয়ে রাস্তায় অনেক কেঁদেছিল সে। ওর কোন স্বপ্নই পূরণ হয়নি। কিছুই মেলেনি নার্ড ছেলেটার সাথে। চশমা পড়া খাড়া চুলের ছেলেটাকে শেষ মেষ দূরে ঠেলে দিয়ে মেয়েটা স্বপ্নের রাজপুত্তুর খুঁজতে লেগে গেল।
দিনের পর দিন যায়।
মাসের পর মাস।
বছরের পর বছর।
একদিন মেয়েটা বড় হয়ে গেল। সে হয়ে উঠল বিবাহ যোগ্যা। কিন্তু মেয়েটার কোন ছেলেকে পছন্দ হয়না। সে খুঁজে খুঁজেও রাজপুত্তুর পেলোনা। এদিকে মেয়েটার বয়স বেড়ে চলল।ওর রুপ গেল থমকে। ওর সেই ষোল বছরের কমনীয়তা কমে গিয়ে ঠেকল শুন্যে। চুলগুলো রুক্ষ্ম। ও কমনীয়হীনতায় লালচে হয়ে উঠল ওগুলো। যত্নের অভাবে মেয়েটার রুক্ষ হয়ে গেল মসৃণ ত্বক।
একদিন ম্লান হয়ে যাওয়া ত্বক নিয়ে সে শীততর সকালে ঘর থেকে বারান্দায় বেড়িয়ে দেখল ওর বারান্দায় এক গোছা শুকনো গোলাপ। গোলাপের নিচে গোলাপী খাম। তাতে একটা চিঠি। চিঠি থেকে নিচে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা সুঠামদেহী একজন।
চিঠিটা খুলেই নিস্তব্ধ হয়ে গেল মেয়েটা। ওতে বছর দশেক আগে লেখা একটা প্রেমপত্র। আর সেই বছর দশেক আগে লুকিয়ে রাখা একগাদা গোলাপ। আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা চশমাপড়া ছেলেটাই সেই হারিয়ে যাওয়া ছেলে। ওর চুলগুলো এখন আর রুক্ষ নয়। ওর পাশে একটা সুদৃশ্য বাইক।চুলগুলো সুন্দর ও মোলায়েম। মুখে মানিয়ে যাওয়া সোনালী ফ্রেমের চশমা। আর হাতে একগাছি লাল গোলাপ।
ছেলেটা এখনো ওকে ভালোবাসে। ওর সুন্দর মুখশ্রী ম্লান হয়ে যাওয়ার পরেও সে মেয়েটাকে চায় বলেই খুঁজে খুঁজে চলে এসেছে ওর বারান্দায়।
মেয়েটা বারান্দা থেকে ঘরে ঢুকলো। তারপর এককাপড়েই বেড়িয়ে এলো বাইরে। ঘর থেকে বেড়িয়ে সে গিয়ে দাঁড়ালো ছেলেটার কাছে।
একদিন ছেলেটা ওর যোগ্য ছিলোনা।
আজকে সেই ছেলেটার যোগ্য নয়।
তবুও ছেলেটা ওকে ভুলে যায়নি।
যাবেও না।
সে ভালোবাসে মেয়েটাকে।
আর মেয়েটা... মেয়েটা ছেলেটার বাইকে উঠে বসল। ছেলেটা বাইক চালিয়ে দিল কুয়াশার ভেতর। আর মেয়েটা গুনগুন করে গেয়ে উঠল-
"এই পথ যদি না শেষ হয়..."

অক্ষম দুঃখের পায়ে
- সূরজ দাশ

অক্ষম দুঃখের পায়ে
ঝলমল করে ওঠে বেড়ি

বুকের রবীন্দ্র জুড়ে শুকনো কবিতা
শালিখ–চড়ুই আর অশরীরী নদী-হাওয়া

হে শ্রাবণ ! আষাঢ়স্য দিবসে আজ
নেমেছি জলসেচে !

দুচোখে সন্ধ্যার নিষ্প্রভ শুভেচ্ছা
পাহাড় ডিঙিয়ে শূন্যহাত এখন

আনত হই তবু ফুস-মন্তর আত্মজ্ঞান
অখণ্ড ভুলের পাহাড় – শ্রীনিকেতনের ওপর ।

অপেক্ষা
- সূরজ দাশ

কখন আসবে তুমি ? পশ্চিমে ব্যাঙডুবি ধানক্ষেত ।
পুবের সরণি ধরে যেতে যেতে পারি না এগোতে , রাত গুনি শুধু ।
গুনি রাত ; তিন দুই এক ... । বিড়ির শেষের টানে কি যাদু –
থেমে যায় অন্ধকার , রাত্তিরের নিশি পাওয়া চেনা ও অচেনা স্তব ।

মিথ্যা রাত-পাহারার ছলে বৃথা কি নয় এই বসে থাকা ?

প্রশ্বাসের সাথে ডেকে ওঠে ভোরের মোরগ ।

দুচোখে নির্জন ঘুম । এইসব দখিনা আবেগ
কোথাও লিখিনি কোনোদিন । উত্তুরে দরজা খুলে
একমাত্র আমিই জানি, আকাশের তারা গোনা ছাড়া
তোমার নামে তারাদের নাম দেওয়া ছাড়া
আর করি না কিছুই । কিছুই করি না আর !

অরুন্ধতী,তোমার সাথে
- সূরজ দাশ

আরও রোদ, আরও ঝাঁঝ, ঝাঁঝালো রোদের আকাশ চাই
প্রতি রাতে আকাশের দরজা খুলে ঢুকে যেতে চাই
তোমার সাথে অরুন্ধতী, তোমারই মনখারাপ কুয়াশা, আশ্বিন অঞ্চলে

তোমার টেরাকোটা চুলে গুঁজে দিতে চাই পুরুলিয়ার ছৌ
আঁচলে বরেন্দ্রভূমির যূঁই, আর কপালে ঝিঙেফুল

জানি, প্রিয় অসুখের গ্রাম-পোষ্ট-জেলা মুখস্হ সবার
তবু কি আশ্চর্য, কেউ পৌঁছুতে চাই না সেখানে

অথচ আমরা শিকড়ের টানে অল্প অল্প গল্পে
রোজ দ্রবীভূত হই, অপেক্ষার স্নেহময়ী স্পর্শে
জেগে থাকি সারারাত

এক আকাশ অন্ধকার কাছে এলেও ভাবি
তোমার হলুদ হৃদি হতে আজ রাতেই চুঁয়ে পড়বে
চাঁদের পারমাণবিক ধূলো

অনেক অনেক দূরত্ব পেরিয়ে এখন ধরে নেওয়া যাক
বশিষ্ঠের সাথে দেখা হয়নি বহুদিন তোমার !!

ঘুম পাড়ানি বালিশের ওপাশে
- সূরজ দাশ

উঠোনে ঝাপটায় সব আশ্চর্য বৃষ্টির দানা
অন্ধকারের ব্যথা জাগে
জ্বলে ওঠে অনিচ্ছা, বিষাদ প্রবাহ

ছায়ায় রেখো না স্মৃতি
গেঁথো না বুকে নিবেদিত শ্রাবণ বাগান

বেদনা, তোমাকে যে নামেই ডাকি না কেন
ঘুম পাড়ানি বালিশের ওপাশে
তোমার সাথেই হাঁটি, আগুনে, কিম্বা আত্মায়

এ বছরের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক পালা
- সূরজ দাশ

যেকোনো ভুলের ভেতর ঘুমিয়ে থাকে সূর্য
শুকিয়ে যাওয়া শব্দ, রোদ – মরা বাতাস আর
নিবেদনে সিদ্ধ মন্ত্রপূত পবিত্রতা
কোনও কিছুই বাঁধ মানে না

ভাসতে থাকা বুদবুদের পৃষ্ঠদেশ থেকে
জন্ম নেয় ব্রজ সুন্দরীর বেহুলা গান

এই তো ডাণ্ডিবুড়ির মাঠ পেরোলেই
একটা দুটো অ্যাজোলা চাষ
গুটি কয়েক ভারমি কম্পোস্ট
আর আত্রেয়ী ভরা তরমুজ যাপন

বিশ্বাসের সাঁকো নড়বড়ে হলে
এখানে আলুচাষে পোকার মাত্রা বাড়ে

ঢেউ এর কলধ্বনি নেই
লালনে নেই যাত্রাপালা, তবু
আজ রাতে মঞ্চস্থ হবে এ বছরের শ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিক পালা
নবাব সিরাজদ্যোল্লা

সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারিনি কোনোদিন
- সূরজ দাশ

কেউই বলেনি কোনোদিন ‘সোজা হয়ে দাঁড়াও’ !
যেকোনো স্ট্যাচু কিম্বা গাছের সামনে
চিরকাল নতমস্তকে কাচুমাচু দাঁড়িয়েছি

কোনোদিন নিজেকে জিজ্ঞেস করিনি
ভাঙা জাহাজের মাস্তুলে
একদিন তো আমারই চিবুক থেকে
রক্ত লেগেছিল

ঠোঁট চুইয়ে, ভেঙেচুরে যে প্রবল প্লাবন
নেমেছিল ধলদিঘির মাঠে, সে তো আটকাতে পারিনি

এই তো আদর, ক্ষতচিহ্ন, তোমাকে দিলাম
আহত শূন্যতার মাঝে দিকভ্রান্ত সকাল

আগুনে পোড়ানো বর্শা থেকে ভাতপাখি
কাক, শকুন আমারই
দেহ খুঁটে পান করেছিল ইহকাল

স্তব্ধ সময়
- রাজীব চৌধুরী

কবিতা শোনার স্তব্ধ সময়
খুব আবেগী
এক ফালি রোদ
উছলে গেলে
খুব ইচ্ছে করে তাকেই বলি
কাব্য তোমায় দিলাম ছুটি
যাও ছুটে যাও অস্তপারের ঠিক ওখানে ।

কবিতা পড়ার সময় হলে
কাব্য তোমার রুদ্র বিকেল
একলা একা
খুব আবেগে কেঁদে ফেলা
আর চাইনি - চাইবোনা আর
দৌড়ে পালাও
ঐ উঠোনে
যেখান থেকে রোজ বিকেলে হাতটি নেড়ে
আমায় ডাকো
ঠিক সেখানে ।

বড় লোকের বউ
- রাজীব চৌধুরী

বড় লোকের বউ
ঐ পথে হেঁটে যায় লাল গালিচা বেয়ে
শরীরে তার ভেসে যায় ক্যামোফ্লেজ কাবেরির গন্ধ
মাতাল করে দেয় রাস্তায় দাঁড়ানো যুবকের চোখ
ধুকপুকে হৃদয় তার শুনিয়ে দেয় কামোন্মাদ দামামা
শেষ ছিটেফোটাতেই
বড় লোকের বউ-
তার
ঠোঁট ভরা গোলাপী মখমল লিপস্টিক
চুলে বারগ্যান্ডির মোলায়েম ছোঁয়া
কানে এন্টিক হিরের হিরোগিরি
থামিয়ে দেয় দোতলার জানলাটা নিমেষেই
শরীরের পাকিস্তানি স্যালোয়ার ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায়
ছোটলোক মারানো পথে
হাইহিল খটখট শব্দে
ধুপধাপ হৃদক্রিয়া ঢেকে যায়
নাকের ফুটোতে থেমে যায় চোখের খাদ্যক্রিয়া
বড় লোকের বউ
তার
সুউচ্চ স্তনযুগল ঘুম কেড়ে নেয় হাজারো যুবকের
বুক বেয়ে নেবে আসে বারুদের দীর্ঘশ্বাস
মিশে যায় বাতাসে- ঘাসে
তার হেঁটে চলা নিতম্ব ত্রাসে
ছেলেবুড়ো সকলের কামক্রিয়া হাসে
ছেলে বুড়ো সকলের লোমকূপে ঘাম জমে
কাম জমে চকচকে চোখের প্রয়াসে।।

বাসর ঘরে
- রাজীব চৌধুরী


বাসর ঘরে সেজে গুজে বসে আছে রুনি। দেখলে মনেই হবেনা বাসরঘর। যদিনা কেউ বলে দেয়। যদিও ঘরের এক কোনে খাটের ওপর বসে আছে রুনি।
আজ খানিক আগে ওর বিয়ে হয়ে গেছে। এখন বাসরঘরে একা একা ঝিমোনো ছাড়া কোন কাজ নেই ওর। কিন্তু এখন ঝিমোলে চলবেনা। খানিক পরেই ছেলেটা ঢুকবে। ওর নাম নিষাদ। হুমায়ুনের গল্পের কোন চরিত্রের মতোন ওর চোখ দুটো বড় মায়াময়। এত বেশি মায়াময় আর বোকাবোকা যে রুনি প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গ্যাছে। আর প্রেমের মাঝামাঝি কোন অস্তিত্ব সে বিশ্বাস করেনা বলেই সামান্য একটা মিথ্যেকে আশ্রয় করে সে নিষাদকে বিয়ে করে ফেলেছে। সে নিষাদকে বলেছিল ওর একটা প্রেমিক আছে। ওর সাথে পালানোর জন্য নিষাদের সাহায্য চেয়েছিল। কিন্তু কাজী অফিসের সামনে নিষাদকেই কবুল বলে ফেলেছে সে।


নিষাদ ছেলেটা বোকা। সে বুঝতেই পারেনি ঘটনা কি ঘটতে চলেছে। কাজী অফিস থেকে সে সোজা পালিয়ে এসেছে একটা গেস্ট হাউজে। বাড়িটা উত্তরার শেষ প্রান্তে। এদিকটায় সাধারনত মানুষজন আসেনা। এজন্যে দুজনে এসে পৌঁছেছে এখানে। স্বামী স্ত্রী পরিচয় দিয়ে রুম এন্ট্রি করেছে। কিন্তু এর পর থেকেই ঘটেছে আসল সমস্যা। ওরা বিয়ের নিয়ম কানুন তেমন কিছুই জানেনা। শুধু নাটক সিনেমা দেখে দেখে শিখেছে কিছু কিছু। কিন্তু বাস্তব জীবনের সাথে ওগুলোর তেমন কোন মিল নেই।
বিকেল থেকে নিষাদ কেশে চলেছে। শুনেছিল বাসর রাত মানেই স্পেশাল কিছু। কিন্তু পালানোর পর থেকে এটা আরও বেশি স্পেশাল মনে হচ্ছে। এতো বেশি স্পেশাল মনে হচ্ছে যে নিষাদ ভয়ের চোটে এক প্যাকেট সিগারেট খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু টেনশন কমছেনা।


টেনশন হবার যথেষ্ট কারন আছে। ওদের সাথে কোন টাকা পয়সা নেই। নিষাদের নিজের গাড়িটা নিয়ে এসেছিল বলে রক্ষা। কিন্তু টাকা না থাকলে গাড়ি দিয়ে কি করবে? নিষাদের বাড়িতে কি হচ্ছে সেটা ও জানেনা সে। ফোনটা তাড়াহুড়া করে ফেলে এসেছে। ওটা থাকলে জিপিএস এ পাওয়া যেত ওদের। কিন্তু অফিস থেকে এখন শতশত ফোন কল করেও ওর টিকির খোঁজ পাচ্ছেনা কেউ। নাহ এ পাগলামির কোন মানে হয়না- ভাবতে ভাবতে ধীরে ধীরে ঢূকল নিজের ঘরে। ঘরটার বর্তমান নাম বাসরঘর।


রুনিকে দেখে আবার মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল নিষাদ। চোখ থেকে চশমাটা খুলে আবার পড়ে নিল সে। বাসরঘরে কি চশমা পড়ার নিয়ম আছে? কিন্তু না পড়লেতো সে কিছুই দেখতে পাবেনা। এত সুন্দর একটা রাত অন্ধ হয়ে বসে থাকার মানে হয়? এজন্য আবারো চশমা পড়ে নিল সে।


-আচ্ছা আমাদের কি এভাবে পালানো টা উচিত হয়েছে? খুক খুক করে কেশে বলল নিষাদ।
- খুব হয়েছে।
-আমরা এখন কি করব?
-আপাতত বাসর করব।
- বাসরে লোকজন কি করে?
- জানিনা তো!
- চুমু খায়?
- ছিঃ
- ছি কেন?
- প্রথম রাতেই ওসব করতে নেই।
- আমার খুব ইচ্ছা বাসর ঘরে আমি চুমু খাব,কিন্তু সব প্ল্যান উলটে গেছে।
- আচ্ছা আমরা আজকে গান গেয়ে কাটাব
- কি গান?
- রবীন্দ্রসংগীত।
- নোপ। আমার ঘুম পায়।
-তাইলে নজরুল?
- মোর প্রিয়া হবে এসো রানী?
- ধ্যাত ওসব না- এই যেমন "আলগা করোগো খোপার বাঁধন ..."
- নাআআআআ
- অনেক পুরোনো কোন গান?
- ময়ুর কন্ঠী রাতের নীলে/ আকাশে তারাদের ঐ মিছিলে/তুমি আমি আজ চলো চলে যাই/শুধু দুজনে মিলে...
- এটাও বেশ পুরোনো।
- এই রুপালী রাতে তোমারি হাত দুটি...মেহেদী লাল রঙ্গে আমি সাজিয়ে দিতে চাই...
- হ্যাঁ মেহেদীর বিজ্ঞাপন পাইসো?
- হাহাহাহা
- শোন কাল সকালে খাবে কি?
- জানিনা।
- কেন? খেতে হবেনা?
- জানিনা।
- কি জানো?
- শুধু জানি আজকের রাতটা শেষ হবে কিছুক্ষন পর। এর পর এই রাত আর আসবেনা।
-তো?
- কিন্তু এই রাতের মানে কি জানো?
- কোণ মানে নাই। আমার কাছে সব রাতের মতোই...
- কি?
- হ্যাঁ। আমরা চাইলে প্রতিটি রাত এমন রাতের মতোন হবে....
কথা বলতে বলতে দুজনে নেমে আসে খাট থেকে। হাটতে হাটতে চলে আসে বারান্দায়। সেখানে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। কেমন যেন মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ে রুনির চোখে। সেই চোখ দুটি দেখে অবাক হয় নিষাদ। খুব ইচ্ছে করে এমন রাতে চাঁদোয়া রাতে রুনিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেতে। ইচ্ছে করছে সব কিছু ভুলে গিয়ে এমন একটা রাতকে খুব আপন করে নিতে। খানিকটা ইচ্ছে করে রুনিকে ছুঁয়ে ফেলতেই রুনি নিষাদের কাছে এসে টুক করে মিষ্টি একটা চুমু খেতেই নিষাদ জড়িয়ে ধরল রুনিকে। ঘর থেকে অনেক দূরে তখন ওদের খুজে খুজে হয়রান হচ্ছে কতগুলো মানুষ। ওদের তখন সে সব কিছুই খেয়াল নেই। ওদের মাঝে এখন বেরিক্যাড শুধুই দুটো ঠোঁট।
খানিক পরে চন্দ্রালোকে তাও মুছে গেল। খানিক আগেও ওরা কেউ কাউকে চিনতোনা। আর এখন দুজন শুধুই দুজনের... ওদের মাঝে কোন ব্যারিক্যাড নেই... যেন ছিলোনা কখনোই...

অনুগমন
- রাজীব চৌধুরী

চোখ অনুগমন।।
চোখ সর্বস্ব অভিমান চোখের জলে মিশে যাচ্ছে
তাকিয়ে থাকা দুঃখের জলগমনে
আমি চোখের আকাল অনুভব করতে গিয়ে টের পেলাম
আমার চোখেও জল আছে ।

ঠোট অনুগমন।।
নরম আকুতি মিশে থাকে বেদনায়
মিশে যেতে চায় অস্থির কোলাহলে
একটু ছায়া পেলে কেঁপে ওঠে
মনে হয় যাক না মিশে তার ঠোঁটে
এই আমার ঠোঁট।।

চুল অনুগমন।।
সামনে থেকে কিনবা পেছনে
যেদিকের খোপা লুকিয়ে রাখো
মনে রেখো এই চুলে আমার হাত কিলবিল করেছিল
কোণ এক ঘুম ভাঙ্গা রাতে।।

চব্বিশ ঘন্টা
- রাজীব চৌধুরী

উনাদের কাজ করতে দিন
উনাদের কাজ ঠিক মত করতে দিন। উনারা কাজ করছেন
জঞ্জাল সরাচ্ছেন
গঠিত হয়েছে ট্রাইব্যুনাল- মাত্র চব্বিশ ঘন্টায় জানা যাবে কে দোষী
এখন দয়া করে উনাদের কাজ করতে দিন
- কি? ভুল বলছেন- মৃতের সংখ্যা এখনো সরকারি হিসেবে তিন
সরকার হিসেব করে চলেছেন-আপনারা সরুন-উনাদের কাজ করতে দিন
উনারা জঞ্জাল সরাচ্ছেন-লাশ সরাচ্ছেন- লুকিয়ে ফেলছেন মরা মানুষ
আপনারা উনাদের কাজ করতে দিন
আমাদের সময় দিন মাত্র চব্বিশ ঘন্টা- এর মাঝেই
একটা এসপার ওসপার আমরা করেই ছাড়বো।
কি? আগুন?
আগুন দিচ্ছেন কেন?
কি বললেন? ৩০০ মানুষ মরেছে?
না- না- ও সব ধোয়া-সব চক্রান্ত- মানুষ মরেছে মাত্র তিনজন
এই দেখুন আমি সরকারি হিসেব দেখাচ্ছি- ওইসব বেনিয়া দের হিসাব নয়
একেবারে কড়করে সরকারী হিসাব।
কে আগুন দিয়েছে মার্কেটে? কে?
আমি সাবধান করে দিচ্ছি-পুলিশ আর দমকল বাহিনীকে কাজ করতে দিন
আমরা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে চাইছি-আপ্নার আগুন দিচ্ছেন কেন?
কি বললেন? আমরা খুনি?
খামোশ--
এই কে আছিস- এগুলোকে ধর- ওরা আমাদের কাজে বাধা দিচ্ছে
আপনারা শান্ত হোন- সবাই শান্ত হয়ে বসুন- এই নিন ঘুমের ঔষধ
খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন
আমরা মাত্র চব্বিশ ঘন্টা সময় চাইছি। মাত্র চব্বিশ ঘন্টা।।

Social

{facebook#https://facebook.com}

যোগাযোগ ফর্ম

নাম

ইমেল *

বার্তা *

Blogger দ্বারা পরিচালিত.
Javascript DisablePlease Enable Javascript To See All Widget